ইরানের আইআরজিসি বনাম বাংলাদেশের রক্ষীবাহিনী
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিশ্ব রাজনীতিতে এমন দুটি অন্যতম উদাহরণ হলো ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) বা আইআরজিসি এবং সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় রক্ষীবাহিনী (JRB)। এই নিবন্ধে প্রদত্ত উপাত্তসমূহ এবং গভীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই দুটি বাহিনীর গঠন, উদ্দেশ্য, তাদের মধ্যকার প্রাতিষ্ঠানিক মিল-অমিল এবং ইতিহাসের গতিপথে তাদের প্রভাব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

TruthBangla

Jul 10, 2026
যখনই কোনো দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপ্লব, ঔপনিবেশিক শক্তির পতন বা রক্তাক্ত স্বাধীনতা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তখনই সেই নবজাতক রাষ্ট্র বা বিপ্লবী সরকারকে রক্ষা করার জন্য প্রথাগত সামরিক বাহিনীর বাইরে বিশেষায়িত বা সমান্তরাল সশস্ত্র বাহিনী গঠনের প্রবণতা দেখা গেছে। এই ধরনের বাহিনী গঠনের মূল দর্শন হলো প্রথাগত বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর ওপর শতভাগ রাজনৈতিক আস্থা না থাকা এবং নতুন শাসনব্যবস্থার আদর্শিক বা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিশ্ব রাজনীতিতে এমন দুটি অন্যতম উদাহরণ হলো ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) বা আইআরজিসি এবং সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় রক্ষীবাহিনী (JRB)। এই নিবন্ধে প্রদত্ত উপাত্তসমূহ এবং গভীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই দুটি বাহিনীর গঠন, উদ্দেশ্য, তাদের মধ্যকার প্রাতিষ্ঠানিক মিল-অমিল এবং ইতিহাসের গতিপথে তাদের প্রভাব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
ইরানের আইআরজিসি (IRGC) - আদর্শিক বিপ্লব ও শাসনব্যবস্থার ঢাল
১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লব ইরানের আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটায় এবং আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে একটি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের থিওক্রেটিক বা ধর্মতাত্ত্বিক শাসনব্যবস্থার জন্ম দেয়। এই নতুন বিপ্লবী রাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য জন্ম নেয় ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ বা আইআরজিসি, যা স্থানীয়ভাবে ‘পাসদারান’ (Pasdaran) নামে পরিচিত।
গঠন ও বিকাশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
আইআরজিসি-র গঠন আকস্মিক কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং চরম পারানোয়া বা আশঙ্কার ফসল। আয়াতুল্লাহ খোমেনি এবং তার অনুসারীরা খুব ভালো করেই জানতেন যে, একটি বিপ্লব সফল হওয়ার চেয়ে সেটিকে টিকিয়ে রাখা অনেক বেশি কঠিন। আইআরজিসি গঠনের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কৌশলগত কারণ কাজ করেছিল:
পাল্টা অভ্যুত্থান (Counter-Coup) নসাৎ করা
ইরানের বিপ্লবী নেতাদের মনে ১৯৫৩ সালের ‘অপারেশন এজাক্স’ (Operation Ajax)-এর স্মৃতি দগদগে ছিল, যেখানে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) এবং ব্রিটিশ এমআইসিক্স (MI6)-এর সহায়তায় ইরানের তৎকালীন গণতান্ত্রিক ও জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করে শাহের একচ্ছত্র রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।
১৯৭৯ সালেও বিপ্লবী নেতারা আশঙ্কা করছিলেন যে, ক্ষমতাচ্যুত শাহের অনুসারী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা শক্তিগুলো সামরিক বাহিনীর ভেতরে থাকা তাদের মিত্রদের ব্যবহার করে আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটাতে পারে। আইআরজিসি-কে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল যেন তারা এই ধরনের যেকোনো পাল্টা অভ্যুত্থানকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিতে পারে।
নিয়মিত সেনাবাহিনী বা ‘আর্তেশ’ (Artesh)-এর প্রতি অনাস্থা
ইরানের প্রথাগত বা নিয়মিত জাতীয় সামরিক বাহিনীকে বলা হয় ‘আর্তেশ’। বিপ্লবের আগে এই আর্তেশ ছিল শাহের শক্তির প্রধান উৎস। এই বাহিনীর শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা ছিলেন পশ্চিমা শিক্ষায় ও সামরিক কৌশলে দীক্ষিত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের ছিল গভীর প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ।
বিপ্লবের পর যদিও অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড বা বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছিল, তবুও খোমেনির বিপ্লবী সরকার এই বিশাল প্রথাগত বাহিনীর ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছিল না। তাদের ভয় ছিল, আর্তেশের আনুগত্য যেকোনো সময় ডগম্যাটিক বা আদর্শিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হতে পারে। ফলে, একটি বিকল্প সশস্ত্র শক্তির প্রয়োজন দেখা দেয়, যার আনুগত্য দেশের সীমানা রক্ষার চেয়ে ‘বিপ্লবের আদর্শ’ রক্ষার প্রতি বেশি থাকবে।
অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও জাতিগত অসন্তোষ দূরীকরণ
বিপ্লবের অব্যবহিত পরেই ইরানের কুর্দিস্তান, খুজেস্তান এবং তুর্কমেন সাহরা অঞ্চলে জাতিগত ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সশস্ত্র বিদ্রোহ দেখা দেয়। একই সাথে বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল (যেমন: মুজাহিদিন-ই-খালক বা এমকেও) নতুন ইসলামিক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট এবং আইন-শৃঙ্খলার চরম অবক্ষয় রোধ করতে একটি কট্টর অনুগত এবং একনিষ্ঠ ক্যাডার বা আধা-সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন ছিল, যা আইআরজিসি সফলভাবে সম্পন্ন করে।
আর্তেশ এবং আইআরজিসি: সাংবিধানিক ও কাঠামোগত পার্থক্য
ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দুটি সমান্তরাল সামরিক বাহিনী বিদ্যমান, যা বিশ্বের প্রতিরক্ষা কাঠামোতে বেশ বিরল। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী এই দুই বাহিনীর দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে ভাগ করা হয়েছে:
বৈশিষ্ট্য | নিয়মিত সেনাবাহিনী (আর্তেশ) | রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) |
মূল দায়িত্ব | দেশের ভৌগোলিক সীমানা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং বহিরাক্রমণ থেকে সীমান্ত রক্ষা করা। | ইরানের রাজনৈতিক-ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা (ইসলামিক রিপাবলিক) এবং বিপ্লবের আদর্শ রক্ষা করা। |
আনুগত্য | রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সংবিধানের প্রতি। | সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা (Supreme Leader) এবং ওয়েলায়াত-ই ফকিহ আদর্শের প্রতি। |
গঠন কাঠামো | প্রথাগত সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী। | স্থল, নৌ, বিমান শাখার পাশাপাশি কুদস ফোর্স (বহিঃবিশ্ব অপারেশন) ও বাসিজ (স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়া)। |
অর্থনৈতিক ভূমিকা | সীমিত এবং প্রথাগত সামরিক বাজেট নির্ভর। | দেশের প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক খাত ও বৃহৎ শিল্পের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। |
ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০-১৯৮৮): সাধারণ মিলিশিয়া থেকে সামরিক জায়ান্টে রূপান্তর
আইআরজিসি-র ইতিহাসে সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট বা রূপান্তর ঘটে ১৯৮০ সালে, যখন ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ইরান আক্রমণ করেন। এই দীর্ঘ আট বছরের যুদ্ধ আইআরজিসি-কে একটি অনভিজ্ঞ, বিক্ষিপ্ত বিপ্লবী মিলিশিয়া থেকে একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত, অভিজ্ঞ এবং বিশাল সামরিক সংস্থায় পরিণত করে।
যুদ্ধের শুরুর দিকে আর্তেশের অনেক কর্মকর্তা নিষ্ক্রিয় বা সন্দেহের তালিকায় থাকায় আইআরজিসি ফ্রন্টলাইনে এসে লড়াই শুরু করে। তারা মানুষের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে ‘বাসিজ’ নামক স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠন করে তরঙ্গের মতো মানবপ্রাচীর (Human wave attacks) তৈরি করে সাদ্দামের আধুনিক সামরিক বাহিনীকে ঠেকিয়ে দেয়। এই যুদ্ধের মাধ্যমেই আইআরজিসি নিজস্ব নৌ ও বিমান শাখা গড়ে তোলে এবং ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের রক্ষীবাহিনী (JRB) - মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী যুদ্ধ সংকট ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের চ্যালেন্জ
ইরানের বিপ্লবের প্রায় সাত বছর আগে, ১৯৭১ সালে একটি রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ৯ মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার কারণে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির এক বিশেষ অধ্যাদেশের মাধ্যমে 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' গঠন করা হয়।
গঠন ও প্রয়োজনীয়তার ঐতিহাসিক পটভূমি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্পূর্ণ শূন্য হাতে একটি রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করেছিল। রক্ষীবাহিনী গঠনের পেছনে তৎকালীন সরকারের তীব্র প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা জড়িয়ে ছিল। এর প্রধান কারণগুলো নিচে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:
অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবক্ষয়
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য দেশের লাখ লাখ বেসামরিক মানুষ, ছাত্র ও যুবকদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও, যুদ্ধফেরত বহু মানুষের কাছ থেকে অস্ত্র পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে দেশজুড়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আধুনিক অস্ত্রের বিস্তার ঘটে।
এই অস্ত্র হাতে নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ডাকাতি, ছিনতাই, ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানো এবং থানা লুটের মতো ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। সাধারণ পুলিশ বাহিনীর পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত অপরাধীদের মোকাবেলা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তাই এই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনতে একটি এলিট ও কঠোর বাহিনীর প্রয়োজন ছিল।
সশস্ত্র চরমপন্থী ও আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপের উত্থান
স্বাধীনতার পরপরই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র মেরুকরণ ঘটে। বিশেষ করে কতিপয় চরমপন্থী বাম দল, নকশালপন্থী এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির অবশিষ্টাংশ আন্ডারগ্রাউন্ড বা আধা-গোপন তৎপরতা শুরু করে। তারা নতুন এই রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থাকে মেনে নিতে পারেনি।
এসব গ্রুপ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারি খাদ্যগুদাম লুট, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাদের হত্যা এবং অর্থনৈতিক স্থাপনায় নাশকতা চালাতে শুরু করে। এই ধরনের অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র রাজনৈতিক বিদ্রোহ ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড কঠোরহস্তে দমন করা ছিল রক্ষীবাহিনীর অন্যতম প্রধান এজেন্ডা।
অর্থনৈতিক অপরাধ, চোরাচালান ও কালোবাজারি রোধ
যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। এর ওপর যোগ হয়েছিল তীব্র খাদ্যসংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। এই সুযোগে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী, মজুতদার এবং কালোবাজারি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। একই সাথে দেশের সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে ভারতে পাট, খাদ্যশস্য এবং চামড়া পাচারের এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যা দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছিল।
"রক্ষীবাহিনীকে এই সমস্ত অর্থনৈতিক অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও বিশেষ অভিযান চালানোর জন্য ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, যেন দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।"
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বাসন ও সুশৃঙ্খল কাঠামোয় আনয়ন
মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া হাজার হাজার বেসামরিক গেরিলা বা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাধারণ জীবনে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের মেধা ও শক্তিকে রাষ্ট্র গঠনে কাজে লাগানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, এই তরুণ ও দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সুশৃঙ্খল সরকারি বাহিনীর আওতায় আনা হবে। এর ফলে রক্ষীবাহিনী গঠনের মাধ্যমে বহুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাকে এই বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা তাদের সম্মানজনক কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নিয়মিত সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর সীমাবদ্ধতা
১৯৭২ সালে বাংলাদেশের নিয়মিত সেনাবাহিনী (বাংলাদেশ সেনাবাহিনী) এবং পুলিশ বাহিনী ছিল একবারে প্রাথমিক স্তরে। পাকিস্তানি বাহিনী থেকে ফেরত আসা বা বাংলাদেশে থেকে যাওয়া বাঙালি পুলিশ ও সামরিক সদস্যদের দিয়ে কেবল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলছিল। তাদের জনবল ছিল অত্যন্ত কম, যোগাযোগের আধুনিক মাধ্যম ছিল না এবং লজিস্টিক সাপোর্ট বা যানবাহনের তীব্র অভাব ছিল। এই প্রশাসনিক ও সামরিক শূন্যতা পূরণ করতে এবং বেসামরিক প্রশাসনকে তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী সশস্ত্র লজিস্টিক ব্যাকআপ দেওয়ার জন্য রক্ষীবাহিনী একটি আপদকালীন স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছিল।
ইরানের আইআরজিসি (IRGC) কে নিয়ে বিতর্কসমূহ
১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির ডিক্রি বা আদেশে গঠিত আইআরজিসি বর্তমান বিশ্বে কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং এটি ইরানের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক। তবে এই বহুমুখী ক্ষমতাই একে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চরম বিতর্কিত করে তুলেছে।
'সন্ত্রাসী সংগঠন' হিসেবে তালিকাভুক্তি
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনে আইআরজিসি-র অবস্থান সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয়। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় সামরিক বাহিনীকে 'সন্ত্রাসী সংগঠন' হিসেবে ঘোষণা করার ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেশ বিরল।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা (২০১৯): ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে ২০১৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আইআরজিসি-কে একটি 'বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন' (Foreign Terroristic Organization - FTO) হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। এটি ছিল কোনো দেশের রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে সরাসরি সন্ত্রাসী আখ্যা দেওয়ার প্রথম নজির।
অন্যান্য দেশের অবস্থান: যুক্তরাষ্ট্রের পথ ধরে কানাডা, সৌদি আরব এবং বাহরাইনও এই বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) দ্বিধা: ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্যের (UK) আইনসভায় আইআরজিসি-কে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার জন্য দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চাপ ও বিতর্ক চলমান থাকলেও, কূটনৈতিক ও কৌশলগত কারণে ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকেরা এখনও এই বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত নিয়ে দোটানায় রয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সি যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক হস্তক্ষেপ
আইআরজিসি-র একটি বিশেষায়িত শাখা রয়েছে, যার নাম 'কুদস ফোর্স' (Quds Force)। এই শাখার মূল কাজ হলো ইরানের বাইরে সামরিক ও গোয়েন্দা অপারেশন পরিচালনা করা। পশ্চিমা বিশ্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর (বিশেষ করে সৌদি আরব ও ইসরায়েল) প্রধান অভিযোগ হলো আইআরজিসি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতার মূল কারিগর।
সহায়তা নেটওয়ার্ক: লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীকে অর্থ, অত্যাধুনিক ড্রোন, ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং সামরিক কৌশলগত প্রশিক্ষণ দেওয়ার পেছনে আইআরজিসি সরাসরি জড়িত।
আঞ্চলিক ভূরাজনীতি: এই প্রক্সি বা ছায়া নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে তার নিজস্ব একটি 'প্রতিরোধের অক্ষ' (Axis of Resistance) তৈরি করেছে, যা ওই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যকে অনবরত নাড়া দিচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন ও গুপ্তহত্যা
ইরানের ভেতরে যেকোনো ধরনের ভিন্নমত বা সরকারবিরোধী আন্দোলন পিষে ফেলার ক্ষেত্রে আইআরজিসি এবং এর অধীনস্থ আধা-সামরিক স্বেচ্ছাসেবী শাখা 'বাসিজ' (Basij) মিলিশিয়া অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
নৈতিকতা পুলিশিং ও বিক্ষোভ দমন: ২০২২ সালে কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, কিংবা ২০১৯ সালের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকেন্দ্রীক বিক্ষোভ সব জায়গাতেই বাসিজ মিলিশিয়া এবং আইআরজিসি সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন: নির্বিচারে সাধারণ নাগরিক ও অ্যাক্টিভিস্টদের গ্রেপ্তার, টর্চার সেলে নির্যাতন, বিক্ষোভকারীদের ওপর সরাসরি গুলি চালানো এবং তথ্য আড়াল করতে দেশব্যাপী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা বন্ধ করে দেওয়ার প্রধান কারিগর হিসেবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো (যেমন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ) এই বাহিনীকে দায়ী করে থাকে।
ইরানের অর্থনীতির ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য ও সমান্তরাল মাফিয়াতন্ত্র
সমালোচকদের মতে, আইআরজিসি কেবল একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং এটি ইরানের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য বা কার্টেল।
অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ: ইরানের জিডিপি (GDP)-র একটি বিশাল অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আইআরজিসি-র নিয়ন্ত্রণে। দেশের আবাসন, তেল ও গ্যাস ক্ষেত্র, ব্যাংকিং খাত, টেলিকমিউনিকেশন এবং বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পগুলো তাদের বিভিন্ন ফ্রন্ট কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো তাদের ইঞ্জিনিয়ারিং উইং 'খাতাম আল-আনবিয়া' (Khatam al-Anbiya)।
মুক্ত বাজারের ক্ষতি ও দুর্নীতি: সামরিক বাহিনীর এই একচ্ছত্র অর্থনৈতিক আধিপত্যের কারণে ইরানে কোনো স্বাধীন বা মুক্ত বাজার গড়ে উঠতে পারেনি। এটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, চোরাচালান, কালোবাজারি এবং অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।
পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি
ইরানের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) নজরদারি এড়ানোর চেষ্টা এবং পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির নেপথ্যে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আইআরজিসি।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি: ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং অত্যাধুনিক ড্রোন (যা বিশ্বজুড়ে সামরিক উদ্বেগের কারণ, যেমন ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ সেনাবাহিনীর ড্রোন ব্যবহার) তৈরির পুরো প্রযুক্তি ও তদারকি আইআরজিসি-র নিজস্ব বৈজ্ঞানিক ও সামরিক উইং করে থাকে। এটি বৈশ্বিক পারমাণবিক অস্ত্র অসংকোচন চুক্তি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান ও জাহাজ টার্গেট করার বিতর্ক
ইউক্রেনীয় বিমান দুর্ঘটনা (২০২০): ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে মার্কিন-ইরান উত্তেজনার মধ্যে তেহরানের বিমানবন্দর থেকে ওড়ার পরপরই ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমানকে (Flight 752) ভুলবশত দুটি মিসাইল ছুড়ে ভূপাতিত করে আইআরজিসি। এতে ১৭৬ জন বেসামরিক আরোহীর সবাই নিহত হন। প্রথমে সরকার এই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে একে 'মানবিক ভুল' হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য হয়, যা আইআরজিসি-র পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতাকে চরম প্রশ্নের মুখে ফেলে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা: বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ পারস্য উপসাগর এবং 'হরমুজ প্রণালী'-তে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ, পশ্চিমা তেলবাহী ট্যাংকার জবরদস্তিমূলকভাবে আটক এবং হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার পেছনে আইআরজিসি নেভাল উইংকে প্রতিনিয়ত অভিযুক্ত করা হয়।
বাংলাদেশের রক্ষীবাহিনী (JRB) কে নিয়ে বিতর্কসমূহ
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এক রক্তক্ষয়ী ও গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির প্রশাসনিক ও সামাজিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির এক বিশেষ অধ্যাদেশের (জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশ, ১৯৭২) মাধ্যমে গঠিত হয় 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী'। মাত্র সাড়ে তিন বছরের কার্যকালে এই আধা-সামরিক বাহিনীটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ভিন্নমত দমনের 'দলীয় লাঠিয়াল'
রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক অভিযোগ হলো এটি রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে কাজ না করে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের এক প্রকার 'দলীয় লাঠিয়াল বাহিনী' বা প্রেটোরিয়ান গার্ড (Pratorian Guard) হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
বামপন্থী দল দমন: সে সময় প্রধান বিরোধী দল জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল), মওলানা ভাসানীর ন্যাপ এবং সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন 'সর্বহারা পার্টি'-র মতো সশস্ত্র আন্ডারগ্রাউন্ড বামপন্থী দলগুলোর নেতাকর্মীদের দমনে রক্ষীবাহিনীকে নির্মমভাবে ব্যবহার করা হয়।
ভয়ের সংস্কৃতি: রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ এবং মাঠপর্যায়ের আন্দোলনকারীদের ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে দেশে একটি অগণতান্ত্রিক 'ভয়ের সংস্কৃতি' তৈরি করার পেছনে এই বাহিনীর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও টর্চার সেলের বিভীষিকা
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় অভিযোগটি ওঠে রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে।
আইনবহির্ভূত নিধন: চরমপন্থী দমন বা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের নামে রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক মাত্রায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা 'ক্রসফায়ার' এবং জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ ওঠে।
টর্চার সেল: সন্দেহভাজনদের ধরে নিয়ে গিয়ে ঢাকার রমনা পার্কের ক্যাম্পসহ বিভিন্ন গোপন টর্চার সেলে বা নির্যাতন কেন্দ্রে অমানুষিক নির্যাতন করার অসংখ্য ঘটনা সে সময়ের গণমাধ্যম ও সমকালীন ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর দাবি অনুযায়ী, রক্ষীবাহিনীর হাতে কয়েক হাজার রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষ নিখোঁজ বা নিহত হন, যদিও সরকারিভাবে এই সংখ্যা সবসময়ই অনেক কম বলে দাবি করা হয়েছে।
১৯৭৪ সালের সংশোধনী ও আইনি দায়মুক্তি
রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা যাতে কোনো রকম আইনি বাধা ছাড়াই মাঠপর্যায়ে কঠোর অপারেশন চালাতে পারে, সে জন্য ১৯৭৪ সালে 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশে' একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ও নজিরবিহীন সংশোধনী আনা হয়।
বিচার বিভাগের হাত বেঁধে দেওয়া: এই সংশোধনীর মাধ্যমে রক্ষীবাহিনীর যেকোনো কর্মকাণ্ড, গ্রেপ্তার, নির্যাতন বা হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দেশের কোনো আদালতে মামলা করার বা আইনি চ্যালেঞ্জ জানানোর অধিকার নাগরিকদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। অর্থাৎ, রক্ষীবাহিনীকে সম্পূর্ণ 'আইনি দায়মুক্তি' (Legal Indemnity) দেওয়া হয়।
বেপরোয়া আচরণ: কোনো ধরনের আইনি জবাবদিহিতা বা আদালতের নজরদারি না থাকায় এই বাহিনীর সদস্যরা আরও বেশি বেপরোয়া ও অত্যাচারী হয়ে ওঠে, যা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি
সংবিধানপ্রদত্ত নাগরিক অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে রক্ষীবাহিনীকে দেওয়া হয়েছিল অবাধ ক্ষমতা।
সার্চ ওয়ারেন্ট ছাড়া অভিযান: রক্ষীবাহিনীর যেকোনো সদস্য কেবল সন্দেহের বশে যেকোনো ব্যক্তির বাড়িতে বা প্রতিষ্ঠানে বিনা পরোয়ানায় (Warrant) প্রবেশ করতে পারত, তল্লাশি চালাতে পারত এবং মালামাল ক্রোক করতে পারত।
হয়রানি: চোরাচালান, কালোবাজারি ও মজুতদারি দমনের নামে অনেক সময় সাধারণ নিরীহ ব্যবসায়ী, গ্রামীণ পরিবার এবং গৃহস্থদের বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট এবং চরম হেনস্থার শিকার হতে হতো, যা মৌলিক মানবাধিকারের চরম পরিপন্থী ছিল।
নিয়মিত সেনাবাহিনীর সাথে প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব
রক্ষীবাহিনীর সমান্তরাল উপস্থিতি বাংলাদেশের নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনীর (বাংলাদেশ সেনাবাহিনী) মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
বাজেট ও সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য: সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের মনে গভীর ক্ষোভ ছিল যে, সরকার নিয়মিত সেনাবাহিনীকে পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নে মনোযোগ না দিয়ে রক্ষীবাহিনীকে বেশি বাজেট, নতুন বিলাসবহুল গাড়ি, উন্নত বিদেশি অস্ত্র ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে।
সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার আশঙ্কা: তৎকালীন সামরিক কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ মনে করতেন, সেনাবাহিনীকে দুর্বল ও অকার্যকর করে রাখার জন্য এবং সামরিক অভ্যুত্থান ঠেকানোর একটি পাল্টা ঢাল হিসেবে এই সমান্তরাল রক্ষীবাহিনী তৈরি করা হয়েছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক মনস্তাত্ত্বিক ফাটলই পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের ও সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় সামরিক বাহিনীর একাংশের নিষ্ক্রিয় থাকার অন্যতম একটি পরোক্ষ কারণ হিসেবে ঐতিহাসিকদের দ্বারা বিবেচিত হয়।
ভারতীয় প্রভাব ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
রক্ষীবাহিনীর গঠন ও পরিচালনার পেছনে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সরাসরি ভূমিকা ছিল, যা তৎকালীন ভারত-বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
প্রশিক্ষণ ও পোশাক: রক্ষীবাহিনীর জলপাই রঙের পোশাক ছিল হুবহু ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (BSF) বা আধা-সামরিক বাহিনীর মতো। এই বাহিনীর সদস্যদের ভারতের দেরাদুনসহ বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাদের দ্বারা বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।
সার্বভৌমত্বের বিতর্ক: সমালোচক ও তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল যে, বাংলাদেশের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করে ভারতীয় ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করার জন্য এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার একটি কৌশল হিসেবে এই বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল।
আইআরজিসি (IRGC) বনাম রক্ষীবাহিনী (JRB) তুলনামূলক ছক
নিচে ইরানের আইআরজিসি এবং বাংলাদেশের জাতীয় রক্ষীবাহিনীর গঠন, বিতর্ক, আইনি কাঠামো ও পরিণতির একটি সুনির্দিষ্ট ও তথ্যবহুল তুলনামূলক ছক তুলে ধরা হলো:
কাঠামোগত ও বিতর্ককেন্দ্রিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ
তুলনার উপাদান | ইরানের আইআরজিসি (IRGC) | বাংলাদেশের রক্ষীবাহিনী (JRB) |
গঠনকাল ও স্থায়িত্ব | ১৯৭৯ সাল থেকে বর্তমান (৪ দশকের বেশি সময় ধরে চলমান)। | ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল (মাত্র ৩ বছর ৮ মাস সক্রিয় ছিল)। |
তাত্ত্বিক/দার্শনিক ভিত্তি | থিওক্রেটিক আদর্শ (ওয়েলায়াত-ই ফকিহ) এবং ইসলামিক রেভোলিউশন রক্ষা। | বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও যুদ্ধোত্তর আইন-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার। |
আইনি দায়মুক্তির রূপ | সংবিধানে স্থায়ী আধিপত্য এবং সর্বোচ্চ নেতার সরাসরি আইনি ছত্রছায়া। | ১৯৭৪ সালের রক্ষীবাহিনী আদেশের সংশোধনীর মাধ্যমে বিশেষ আইনি দায়মুক্তি (Indemnity)। |
অভ্যন্তরীণ বিতর্কের ধরন | বাসিজ মিলিশিয়ার মাধ্যমে নাগরিক আন্দোলন দমন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, নৈতিকতা পুলিশিং। | রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ (জাসদ, নকশাল) নিধন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও টর্চার সেল। |
অর্থনৈতিক একচ্ছত্রবাদ | দেশের তেল, গ্যাস, আবাসন ও ব্যাংকিং খাতের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণকারী সমান্তরাল মাফিয়াতন্ত্র। | প্রধানত চোরাচালান ও কালোবাজারি দমনের দায়িত্বে ছিল, স্থায়ী অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য ছিল না। |
বৈদেশিক বিতর্ক ও প্রক্সি | কুদস ফোর্সের মাধ্যমে হিজবুল্লাহ, হুথি ও হামাসকে অস্ত্র ও অর্থায়ন, প্রক্সি যুদ্ধ। | কোনো বৈদেশিক উইং বা প্রক্সি নেটওয়ার্ক ছিল না, পরিধি ছিল সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ। |
আন্তর্জাতিক মর্যাদা | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও সৌদি আরব কর্তৃক 'সন্ত্রাসী সংগঠন' হিসেবে ঘোষিত। | কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ছিল না, তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য বৈশ্বিক সমালোচনা ছিল। |
প্রাতিষ্ঠানিক পরিণতি | আর্তেশ (নিয়মিত সেনা)-কে পেছনে ফেলে দেশের প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর। | ১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত ও সেনাবাহিনীতে একীভূত। |
উভয় বাহিনীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রভাব
বিতর্কিত খাত | আইআরজিসি (IRGC)-র ওপর প্রভাব | রক্ষীবাহিনী (JRB)-র ওপর প্রভাব |
জাতীয় রাজনীতি | ইরানের রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণে এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই বাহিনীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। | তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে এবং সাধারণ মানুষের সাথে দূরত্বের সৃষ্টি করে। |
নিয়মিত সামরিক বাহিনী | নিয়মিত সেনাবাহিনী (আর্তেশ)-কে কেবল সীমান্ত পাহারায় সীমাবদ্ধ রেখে আইআরজিসি নিজেদের বিমান ও নৌ উইং তৈরি করে একচেটিয়া ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে। | নিয়মিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও বিদ্রোহের মনোভাব তৈরি করে, যা ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। |
মানবাধিকারের রেকর্ড | জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) কর্তৃক অনবরত নিষেধাজ্ঞা ও নিন্দা প্রস্তাবের শিকার। | স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের কালো দাগ হিসেবে চিহ্নিত। |
ইরানের আইআরজিসি বনাম বাংলাদেশের রক্ষীবাহিনী - তুলনামূলক বিশ্লেষণ
এই দুটি বাহিনীর কার্যপ্রণালী, আইনি ক্ষমতা এবং ইতিহাসের গতিপথের দিকে তাকালে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর মিল এবং অমিল খুঁজে পাওয়া যায়। নিচে বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে এদের গভীর তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
আদর্শিক ও দার্শনিক ভিত্তি (Ideological Matrix)
আইআরজিসি: এদের মূল চালিকাশক্তি হলো ধর্মীয় এবং থিওক্রেটিক আদর্শ। তারা বিশ্বাস করে, তাদের আনুগত্য কোনো নির্দিষ্ট সীমানার প্রতি নয়, বরং সর্বোচ্চ নেতা (Supreme Leader) এবং বৈশ্বিক ইসলামিক বিপ্লবের প্রতি।
রক্ষীবাহিনী: এদের মূল চালিকাশক্তি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদ। তারা কোনো ধর্মীয় বা বৈশ্বিক এজেন্ডা নিয়ে কাজ করেনি, বরং তাদের সম্পূর্ণ ফোকাস ছিল সদ্য স্বাধীন দেশের ভেতরের অস্থিতিশীলতা দূর করা।
প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘায়ু ও স্থায়িত্ব (Institutional Longevity)
আইআরজিসি: এই বাহিনী গত চার দশক ধরে কেবল টিকেই থাকেনি, বরং এটি ইরানের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। আজ এটি একটি চিরস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।
রক্ষীবাহিনী: এটি ছিল একটি সাময়িক বা ট্রানজিশনাল (আপদকালীন) বাহিনী। মাত্র ৩ বছর ৮ মাস পর, ১৯৭৫ সালের আগস্টে পটপরিবর্তনের পর অক্টোবরের মধ্যে এই বাহিনীকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে নিয়মিত সেনাবাহিনীতে একীভূত করে নেওয়া হয়।
কাঠামোগত ব্যাপ্তি ও বহুমুখিতা (Structural Proliferation)
আইআরজিসি: এটি সাধারণ কোনো আধা-সামরিক বাহিনী নয়। এর নিজস্ব স্থলবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং মহাকাশ উইং রয়েছে। এটি নিয়মিত সেনাবাহিনীর (আর্তেশ) চেয়েও শক্তিশালী।
রক্ষীবাহিনী: এটি মূলত একটি হালকা অস্ত্রে সজ্জিত আধা-সামরিক পদাতিক বাহিনী হিসেবে কাজ করেছিল। এর কোনো নিজস্ব বিমান বা নৌ উইং ছিল না এবং এটি কখনোই নিয়মিত সেনাবাহিনীর চেয়ে বড় সামরিক কাঠামো লাভ করতে পারেনি।
বিতর্ক ও নেতিবাচক অধ্যায়সমূহ - দুই বাহিনীর অন্ধকার দিক
কোনো সমান্তরাল বাহিনী যখন প্রচলিত বিচার বিভাগ ও নিয়মিত সামরিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ক্ষমতা ভোগ করতে শুরু করে, তখন সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা ঘটে। আইআরজিসি এবং রক্ষীবাহিনী উভয়ই এই কারণে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারবহির্ভূত নিধন
আইআরজিসি: ইরানের ভেতরের যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন (যেমন ২০২২ সালের মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর বিক্ষোভ) দমনে আইআরজিসি এবং বাসিজ মিলিশিয়া নির্মম বলপ্রয়োগ করে। হাজার হাজার নাগরিককে গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার রেকর্ড রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
রক্ষীবাহিনী: বাংলাদেশের রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধেও জাসদ, সর্বহারা পার্টি এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দমনের নামে ব্যাপক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড (ক্রসফায়ার), জোরপূর্বক গুম এবং রমনা ক্যাম্পের টর্চার সেলে অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এই কারণে বাহিনীটি সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত ভীতি ও ক্ষোভের পাত্রে পরিণত হয়েছিল।
আইনি দায়মুক্তি (Legal Indemnity)
উভয় বাহিনীকেই তাদের কাজের জন্য এক ধরনের ‘ইনডেমনিটি’ বা আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল, যা তাদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
আইআরজিসি: ইরানের সংবিধানেই আইআরজিসি-কে সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার অধীনস্থ করা হয়েছে, ফলে দেশের সাধারণ আদালত বা সংসদ তাদের কোনো কাজের জবাবদিহিতা চাইতে পারে না।
রক্ষীবাহিনী: ১৯৭৪ সালে রক্ষীবাহিনী আদেশে এক বিতর্কিত সংশোধনী এনে বলা হয় যে, রক্ষীবাহিনীর কোনো কাজের বিরুদ্ধে দেশের কোনো আদালতে মামলা বা আইনি চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। এই জবাবদিহিতাহীন কালো আইনটির কারণে মাঠপর্যায়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়।
নিয়মিত সামরিক বাহিনীর সাথে দ্বন্দ্ব (Friction with Regular Armed Forces)
আইআরজিসি এবং আর্তেশ: ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী (আর্তেশ)-কে সবসময়ই আইআরজিসি-র চেয়ে কম বাজেট ও কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই নিয়ে দুই বাহিনীর মধ্যে একটি শীতল ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব সবসময়ই বজায় থাকে, যা সুপ্রিম লিডার নিজেই নিয়ন্ত্রণ করেন যেন কেউ অভ্যুত্থান করতে না পারে।
রক্ষীবাহিনী এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী: সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়মিত সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করতেন, সরকার সেনাবাহিনীকে অবহেলা করে রক্ষীবাহিনীকে বেশি বাজেট, নতুন গাড়ি, উন্নত অস্ত্র ও সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও ক্ষোভ সেনাবাহিনীর একটি অংশের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে, যা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম সেনা অভ্যুত্থান ও পটপরিবর্তনের একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।
বিতর্ক, আইনি কাঠামো ও আন্তর্জাতিক প্রভাব ম্যাট্রিক্স
বিতর্কের ক্ষেত্র | ইরানের আইআরজিসি (IRGC)-র রূপ | বাংলাদেশের রক্ষীবাহিনী (JRB)-র রূপ |
ভিন্নমত দমন | হিজাববিরোধী আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংস্কারবাদীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন। | বামপন্থী বিরোধী দল (জাসদ, ন্যাপ) এবং সর্বহারা পার্টির নেতাকর্মীদের নিধন। |
আদালতের এখতিয়ার | সম্পূর্ণ আদালতের ঊর্ধ্বে, কেবল সর্বোচ্চ নেতার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। | ১৯৭৪ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে আদালতের ও মামলার আওতার বাইরে রাখা হয়। |
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি | যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও সৌদি আরব কর্তৃক 'সন্ত্রাসী সংগঠন' হিসেবে তালিকাভুক্ত। | কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ছিল না, তবে পশ্চিমা গণমাধ্যমে সমালোচিত ছিল। |
বৈদেশিক হস্তক্ষেপ | লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেনে প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরি। | কোনো বৈদেশিক কার্যক্রম ছিল না; তবে ভারতীয় প্রশিক্ষণের কারণে ভারতীয় প্রভাবের বিতর্ক ছিল। |
বাংলাদেশের রক্ষীবাহিনী কেন প্রয়োজন ছিল?
বাংলাদেশের ইতিহাসে রক্ষীবাহিনীকে নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রচুর রাজনৈতিক সমালোচনা ও বিতর্ক তৈরি হলেও, ১৯৭২ সালের বাস্তবতায় এই বাহিনী গঠন করা তৎকালীন সরকারের জন্য একটি অনিবার্য প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা ছিল। রক্ষীবাহিনী কেন প্রয়োজন ছিল, তার প্রধান কারণগুলো নিচে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:
যুদ্ধোত্তর সমাজ ও অবৈধ অস্ত্রের ভয়াবহ বিস্তার
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে যুদ্ধ শেষ হলেও সাধারণ মানুষের হাতে থাকা লাখ লাখ আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বেসামরিক গেরিলা, ছাত্র ও যুবকদের একটি বড় অংশ স্বাধীন দেশেও অস্ত্র সমর্পণ করেনি। এর ফলে দেশজুড়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি দেখা যায়। এই অস্ত্র ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডাকাতি, ছিনতাই, ব্যক্তিগত শত্রুতা উদ্ধার এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর অত্যাচার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। তৎকালীন ভঙ্গুর ও অপ্রস্তুত পুলিশ বাহিনীর পক্ষে এই আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত অপরাধী ও ডাকাতদের মোকাবিলা করা অসম্ভব ছিল। তাই দ্রুততম সময়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনতে একটি সুপ্রশিক্ষিত ও কঠোর অ্যাকশনধর্মী বিশেষ বাহিনীর কোনো বিকল্প ছিল না।
চরমপন্থী ও আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপগুলোর সশস্ত্র সংঘাত
স্বাধীনতার পরপরই দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কতিপয় চরমপন্থী বাম দল এবং স্বাধীনতাবিরোধী চক্র নতুন রাষ্ট্র ও তার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে মেনে নিতে পারেনি। সিরাজ সিকদারের ‘সর্বহারা পার্টি’, জাসদের সশস্ত্র উইং ‘গণবাহিনী’ এবং বিভিন্ন নকশালপন্থী গোষ্ঠী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। তারা স্থানীয় থানা লুট, সরকারি খাদ্যগুদামে অগ্নিসংযোগ এবং আওয়ামী লীগের হাজার হাজার তৃণমূল নেতাকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাদের হত্যা করতে শুরু করে।
সমকালীন ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে প্রায় ৪,০০০ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থক এই আন্ডারগ্রাউন্ড চরমপন্থীদের হাতে নিহত হন। এই ধরনের সশস্ত্র রাষ্ট্রবিরোধী বিদ্রোহ ও অভ্যন্তরীণ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড কঠোরহস্তে দমন করার জন্য রক্ষীবাহিনীর প্রয়োজন ছিল অত্যন্ত তীব্র।
ভঙ্গুর অর্থনীতি, চোরাচালান ও কালোবাজারির সিন্ডিকেট
৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা, কলকারখানা এবং কৃষিখাত সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এর ওপর যোগ হয়েছিল তীব্র খাদ্যসংকট। এই মানবিক সংকটের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী, মজুতদার এবং কালোবাজারি সিন্ডিকেট নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসছিল সীমান্ত অঞ্চলে। বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পাট, চাল, চামড়া এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য হিসেবে আসা কম্বল ও ওষুধ ভারতে পাচার বা চোরাচালান হয়ে যাচ্ছিল। এটি দেশের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ দেউলিয়া করে দেওয়ার উপক্রম করেছিল। সীমান্ত পাহারা দিতে এবং এই চোরাচালানি ও অর্থনৈতিক অপরাধীদের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে রক্ষীবাহিনীকে বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামানো হয়েছিল।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বাসন ও সুশৃঙ্খল কাঠামোয় আনয়ন
মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া হাজার হাজার বেসামরিক গেরিলা ও তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের সাধারণ জীবনে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের পুনর্বাসন করা সরকারের জন্য একটি বড় মাথাব্যথার কারণ ছিল। এই বিশাল সশস্ত্র তরুণ সমাজকে যদি কোনো সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনা না যেত, তবে তাদের দিকভ্রান্ত হওয়ার বা অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। বঙ্গবন্ধু সরকার অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে সিদ্ধান্ত নেয় যে, এই দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তিকে রাষ্ট্র গঠনে কাজে লাগানো হবে। রক্ষীবাহিনী গঠনের মাধ্যমে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে এই বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা তাদের একটি সম্মানজনক প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেয়।
প্রথাগত সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর চরম সীমাবদ্ধতা
১৯৭২ সালে বাংলাদেশের নিয়মিত সেনাবাহিনী (বাংলাদেশ সেনাবাহিনী) এবং পুলিশ বাহিনী ছিল একবারে শৈশবকালে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও পুলিশে কর্মরত যে বাঙালিরা দেশে ছিলেন, তাদের নিয়ে মাত্র পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। পাকিস্তান থেকে তখনো হাজার হাজার অভিজ্ঞ বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা ও সৈনিক ফেরত আসেননি (তারা পাকিস্তানে বন্দি বা আটকে ছিলেন)। ফলে সেনাবাহিনীর জনবল ছিল অত্যন্ত সীমিত, তাদের কাছে পর্যাপ্ত গাড়ি, ওয়্যারলেস বা আধুনিক যোগাযোগের লজিস্টিক সাপোর্ট ছিল না। এই প্রশাসনিক ও সামরিক শূন্যতা পূরণ করতে এবং বেসামরিক প্রশাসনকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সরাসরি একটি শক্তিশালী সশস্ত্র ব্যাকআপ দেওয়ার জন্য রক্ষীবাহিনী গঠন সে সময় সময়ের দাবি ছিল।
উপসংহার
ইরানের আইআরজিসি এবং বাংলাদেশের রক্ষীবাহিনীর তুলনামূলক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক শিক্ষা সামনে আসে। যুদ্ধোত্তর বা বিপ্লবোত্তর একটি চরম সংকটময় মুহূর্তে রাষ্ট্রকে পুরোপুরি ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করতে, চোরাচালান রুখতে এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে রক্ষীবাহিনীর মতো একটি বিশেষ বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা হয়তো সাময়িকভাবে অস্বীকার করা যায় না; কিন্তু সেই বাহিনীকে যখন দীর্ঘমেয়াদে আইনি দায়মুক্তি দেওয়া হয় এবং আদালতের এখতিয়ারের বাইরে রাখা হয়, তখন তা হিতে বিপরীত হয়।
আইআরজিসি তার কঠোর আদর্শিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের কারণে ইরানের বুকে আজ এক অপরাজেয় দানবে পরিণত হয়েছে, যা দেশটির সাধারণ মানুষের নাগরিক স্বাধীনতাকে গ্রাস করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রক্ষীবাহিনী নির্দিষ্ট সময়ে তার প্রয়োজনীয়তা পূরণ করলেও, জবাবদিহিতার অভাব এবং নিয়মিত বাহিনীর সাথে দ্বন্দের কারণে একটি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে শেষ হয়। এই দুই বাহিনীর ইতিহাস প্রমাণ করে— একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের জন্য সমান্তরাল কোনো বাহিনীর চেয়ে নিয়মিত সামরিক ও পুলিশ বাহিনীকে শক্তিশালী, পেশাদার এবং আইনের শাসনের অধীনে আনাটাই সবচেয়ে নিরাপদ ও স্থায়ী সমাধান।














