>

>

ভারত যদি মুক্তিযুদ্ধে না জড়াতো তাহলে বাংলাদেশ কি স্বাধীন হতো?

ভারত যদি মুক্তিযুদ্ধে না জড়াতো তাহলে বাংলাদেশ কি স্বাধীন হতো?

অনেকেই একধরনের আবেগী ও রোমান্টিক ধারণায় বিশ্বাস করে বলেন- "১৯৭১ সালে ভারত যদি আমাদের পাশে এসে না-ও দাঁড়াত, আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়তো একটু দেরি হতো, কিন্তু আমরা ঠিকই স্বাধীন হতাম।" শুনতে অত্যন্ত দেশপ্রেমমূলক এবং আত্মবিশ্বাসী মনে হলেও, সামরিক বিজ্ঞান, ভূ-রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কঠিন ও রূঢ় বাস্তবতায় এই ধারণার ভিত্তি অত্যন্ত নড়বড়ে, এমনকি ঐতিহাসিক অসত্যতায় ভরা। ১৯৭১ সালে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগ যদি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ‘ইঞ্জিন’ হয়ে থাকে, তবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ছিল সেই ইঞ্জিনের অপরিহার্য ‘জ্বালানি’ এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর ‘নিরাপদ ও কৌশলগত পথ’।

TruthBangla

ইতিহাস কেবল অবিনাশী বীরত্বগাথা আর আবেগের তুলি দিয়ে রচিত হয় না; ইতিহাসের স্থায়ী কাঠামোটি নির্মিত হয় সামরিক কৌশল, রসদ সরবরাহ (Logistics), ভৌগোলিক সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল সমীকরণের ওপর ভিত্তি করে। বাংলাদেশের গৌরবময় মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গত কয়েক দশকে আমাদের দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি সুনির্দিষ্ট বিতর্ক প্রায়শই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অনেকেই একধরনের আবেগী ও রোমান্টিক ধারণায় বিশ্বাস করে বলেন- "১৯৭১ সালে ভারত যদি আমাদের পাশে এসে না-ও দাঁড়াত, আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়তো একটু দেরি হতো, কিন্তু আমরা ঠিকই স্বাধীন হতাম।"

শুনতে অত্যন্ত দেশপ্রেমমূলক এবং আত্মবিশ্বাসী মনে হলেও, সামরিক বিজ্ঞান, ভূ-রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কঠিন ও রূঢ় বাস্তবতায় এই ধারণার ভিত্তি অত্যন্ত নড়বড়ে, এমনকি ঐতিহাসিক অসত্যতায় ভরা। ১৯৭১ সালে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগ যদি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ‘ইঞ্জিন’ হয়ে থাকে, তবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ছিল সেই ইঞ্জিনের অপরিহার্য ‘জ্বালানি’ এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর ‘নিরাপদ ও কৌশলগত পথ’। ভারতের সক্রিয়, বহুমুখী এবং প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া একটি আধুনিক, নিয়মিত এবং মার্কিন অস্ত্রে সুসজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কেবল সাধারণ মানুষের গেরিলা প্রতিরোধ দিয়ে চূড়ান্ত ও দ্রুত বিজয় অর্জন করা কতটা অসম্ভব ছিল, আজ আমরা সেই সত্যটিই সম্পূর্ণ তথ্যভিত্তিক ও নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করব।

ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা এবং ভারতের আকাশ ও নৌপথের অবরোধ

সামরিক কৌশলের প্রথম এবং প্রধান সূত্রই হলো ভৌগোলিক অবস্থান। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের দুই অংশের (পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান) মধ্যকার ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার (১,০০০ মাইল)। আর এই বিশাল দূরত্বের মাঝখানে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ভারতের মূল ভূখণ্ড। একটি দেশের সামরিক শক্তিকে এক অংশ থেকে অন্য অংশে স্থানান্তরের পথকে রুদ্ধ করে দেওয়ার যে ঐতিহাসিক চাল ভারত চেলেছিল, তা-ই ছিল যুদ্ধের প্রথম মনস্তাত্ত্বিক বিজয়।

গঙ্গা হাইজ্যাকিং এবং আকাশপথের মাস্টারস্ট্রোক

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দেয়। ৩০ জানুয়ারি ১৯৭১ সালে ‘কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট’-এর দুজন সশস্ত্র সদস্য ভারতের একটি অভ্যন্তরীণ যাত্রীবাহী বিমান ‘গঙ্গা’ হাইজ্যাক বা ছিনতাই করে পাকিস্তানের লাহোরে নিয়ে যায়। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার একে স্বাগত জানায়। ৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত কঠোর সিদ্ধান্ত নেন এবং পাকিস্তানের সমস্ত সামরিক ও বেসামরিক বিমানের জন্য ভারতের আকাশসীমা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

এই আকাশপথের নিষেধাজ্ঞাটি ছিল পাকিস্তানের সামরিক জান্তার কফিনে প্রথম বড় পেরেক। এর ফলে অপারেশন সার্চলাইটের ঠিক আগ মুহূর্তে এবং যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সরাসরি সৈন্য, ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাঠানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়।

পাকিস্তানি বিমানগুলোকে তখন ভারতের চারপাশ ঘুরে, আরব সাগর হয়ে, শ্রীলঙ্কার কলম্বো (কাটুনায়েকে বিমানবন্দর) দিয়ে হাজার হাজার মাইল অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আসতে হতো। এর ফলে রসদ ও সৈন্য স্থানান্তরের সময় ও খরচ বেড়ে গিয়েছিল কয়েক গুণ। ভারত যদি তার আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিত, তবে ২৫ মার্চের ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর সময় পাকিস্তান কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আকাশপথে হাজার হাজার নতুন এবং তাজা সৈন্য ঢাকায় নামাতে পারত, যা প্রাথমিক প্রতিরোধকে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিত। এছাড়া ভারতের ভূ-রাজনৈতিক চাপের কারণে নেপাল বা ভুটানের মতো রাষ্ট্রগুলোও পাকিস্তানকে তাদের ভূমি ব্যবহার করতে দেয়নি।

বঙ্গোপসাগরে নৌপথের অবরুদ্ধকরণ

আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পাকিস্তান পুরোপুরি নৌপথের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু সেখানেও ওত পেতে ছিল ভারতীয় নৌবাহিনীর পূর্ব উপকূলে অবস্থিত যুদ্ধজাহাজগুলো। বিশেষ করে ভারতের বিমানবাহী রণতরী ‘আইএনএস বিক্রান্ত’ (INS Vikrant) বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ নিজের হাতে নিয়ে নেয়।

যুদ্ধের শুরুর দিকেই পাকিস্তানের আধুনিক সাবমেরিন ‘পিএনএস গাজী’ (PNS Ghazi) ভাইজাগ (বিশাখাপত্তনম) বন্দরের কাছে রহস্যজনকভাবে ডুবে গেলে পাকিস্তানের নৌ-শক্তি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। এর ফলে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা রসদবাহী জাহাজগুলো পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রাম বা মংলা বন্দরে পৌঁছানো চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ভৌগোলিক ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতাই পাকিস্তানি বাহিনীকে যুদ্ধের শুরুতেই মানসিকভাবে অর্ধেক পরাজিত করে ফেলেছিল।

মুক্তিবাহিনীর পুনর্গঠন: ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ আশ্রয়ের গুরুত্ব

গেরিলা যুদ্ধের তত্ত্ব নিয়ে যারা পড়াশোনা করেছেন, তারা খুব ভালো করেই জানেন বিশ্বের যেকোনো সফল গেরিলা অভিযানের পেছনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত থাকে, তা হলো একটি ‘সেফ হ্যাভেন’ (Safe Haven) বা আন্তর্জাতিক সীমানার ওপারে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। মাও সে তুং থেকে শুরু করে চে গুয়েভারা সবাই স্বীকার করেছেন যে, একটি শক্তিশালী নিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে গেরিলাদের পেছনে এমন একটি মুক্ত অঞ্চল বা বন্ধুরাষ্ট্রের সীমানা থাকা দরকার যেখানে শত্রু বাহিনী সহজে প্রবেশ করতে পারবে না এবং যেখানে গেরিলারা বিশ্রাম, চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণ নিতে পারবে।

১০ মিলিয়ন শরণার্থী এবং মানবতা

২৫ মার্চের পর পাকিস্তানি বাহিনীর পোড়ামাটি নীতি এবং বর্বর গণহত্যার মুখে জীবন বাঁচাতে প্রায় ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) মানুষ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ে আশ্রয় নেয়। ভারত যদি তার সীমান্ত বন্ধ করে দিত, তবে এই ১ কোটি মানুষ দেশের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে সম্পূর্ণ গণহত্যার শিকার হতো এবং পাকিস্তান সফলভাবে এ দেশের জনসংখ্যাগত কাঠামো বদলে দিতে পারত।

এই বিশাল শরণার্থীর মধ্য থেকেই মূলত গড়ে ওঠে আমাদের গেরিলা বাহিনী—মুক্তিবাহিনী। ভারত কেবল তাদের আশ্রয় দেয়নি, বরং তাদের খাদ্য, বাসস্থান এবং চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করেছিল, যা তৎকালীন ভারতের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর এক বিশাল হিমালয়সম বোঝা ছিল।

র’ (RAW) এবং বিএসএফ (BSF)-এর প্রত্যক্ষ সামরিক প্রশিক্ষণ

ভারতের মাটিতেই মুক্তিবাহিনীর মূল সদর দফতর এবং ট্রেনিং ক্যাম্পগুলো স্থাপন করা হয়েছিল (যেমন ভারতের মেলাঘর, তুরা ইত্যাদি অঞ্চল)। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) এবং সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ‘বিএসএফ’ (BSF) সরাসরি পূর্ব পাকিস্তানের তরুণদের অস্ত্র চালনা, বিস্ফোরকের ব্যবহার এবং গেরিলা রণকৌশলের প্রশিক্ষণ দেয়।

ভারতের সামরিক কমান্ডের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছিল ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এর মতো বিখ্যাত নৌ-গেরিলা কমান্ডো অপারেশন, যা পাকিস্তানি নৌ-যোগাযোগকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। ভারতের ভূমি ব্যবহারের এই সুযোগ না থাকলে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে দেশের ভেতরে পাকিস্তানি আর্মির সাঁড়াশী অভিযানের মুখে টিকে থাকা, পুনর্গঠিত হওয়া এবং পাল্টা আঘাত করা সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিল।

কামানের সামনে লাঠি: আধুনিক যুদ্ধের অস্ত্র ও লজিস্টিকস সীমাবদ্ধতা

একটি প্রচলিত রাজনৈতিক ও আবেগীয় বয়ান হলো বাঙালির অদম্য ইচ্ছাশক্তিই যুদ্ধের জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু সামরিক বিজ্ঞানের রূঢ় বাস্তবতা হলো, কেবল মনের জোর দিয়ে আধুনিক ট্যাংকের গোলা, ফাইটার জেটের বোমাবর্ষণ আর ভারী আর্টিলারির (কামান) মুখে দীর্ঘ সময় টিকে থাকা যায় না।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ছিল সেই সময়ের অন্যতম সুসংগঠিত এবং মার্কিন অস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী। তাদের কাছে ছিল আধুনিক এম-৪৮ ট্যাংক, সাঁজোয়া যান এবং এফ-৮৬ সেবার যুদ্ধবিমান। অন্যদিকে, যুদ্ধের শুরুতে আমাদের মুক্তিবাহিনীর কাছে ছিল মূলত থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল, কিছু এসএলআর এবং হালকা অস্ত্র, যা তারা ইপিআর (EPR) বা আনসারদের অস্ত্রাগার থেকে সংগ্রহ করেছিল।

ভারী অস্ত্রের জোগান এবং যৌথ কমান্ড

পর্যাপ্ত ভারী অস্ত্র, অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল, মর্টার এবং ফিল্ড আর্টিলারি ছাড়া মুক্তিবাহিনী কখনোই পাকিস্তানি বাহিনীর সুরক্ষিত বাঙ্কার এবং কংক্রিটের ডিফেন্সিভ লাইনগুলো ধ্বংস করতে পারত না। ভারত মুক্তিবাহিনীকে হাজার হাজার আধুনিক রাইফেল, লাইট মেশিনগান (LMG), গ্রেনেড এবং মর্টার সরবরাহ করে।

৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তান ভারতের বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়, তখন ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। গঠিত হয় বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ সামরিক কমান্ড ‘মিত্রোবাহিনী’। ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের অধীনে জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নেতৃত্বে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্ক ডিভিশন এবং বিমানবাহিনী অত্যন্ত দ্রুত গতিতে (Blitzkrieg কৌশলে) নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো পার হয়ে মাত্র ১৩ দিনে ঢাকাকে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। ভারতের এই প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ ও ভারী অস্ত্রের ব্যবহার ছাড়া এই দ্রুততম এবং ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ (৯৩,০০০ পাকিস্তানি সেনার) কল্পনাও করা যায় না।

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রের দাবাখেলা ও ইন্দিরা গান্ধী

একটি আধুনিক যুদ্ধের চূড়ান্ত ফয়সালা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের রণাঙ্গনে হয় না, তার চেয়েও বড় যুদ্ধ চলে বিশ্বনেতাদের কূটনৈতিক টেবিল এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে। ১৯৭১ সালের বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল অত্যন্ত জটিল। তখন বিশ্ব রাজনীতিতে ‘শীতল যুদ্ধ’ বা কোল্ড ওয়ারের চরম উত্তেজনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং হেনরি কিসিঞ্জার) এবং গণচীন সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তৎকালীন ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন-পাক-চীন অক্ষ তৈরি হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ঠেকানো।

ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্ব সফর ও জনমত গঠন

এই বিশ্ব পরাশক্তিদের বিপক্ষে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের একটি আঞ্চলিক বিদ্রোহকে আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা দেওয়া এবং পাকিস্তানের চালানো গণহত্যাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা ছিল এক পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে নিজে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি সহ বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশ সফর করেন।

তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে স্পষ্ট করে দেন যে, এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত গণহত্যা এবং ভারত ১ কোটি শরণার্থীর বোঝা অনির্দিষ্টকালের জন্য বহন করতে পারে না। তার এই জোরালো ও দূরদর্শী কূটনীতির ফলেই পশ্চিমা বিশ্বের সাধারণ জনগণ এবং গণমাধ্যম (যেমন নিউ ইয়র্ক টাইমস, বিবিসি) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার হয়ে ওঠে।

ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি (আগস্ট ১৯৭১)

১৯৭১ সালের যুদ্ধের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক ছিল ৯ আগস্ট ১৯৭১ সালে স্বাক্ষরিত ‘ইন্দো-সোভিয়েত শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি’ (Indo-Soviet Treaty)। এই চুক্তির ফলে ভারত একটি বিশাল আন্তর্জাতিক সুরক্ষা কবচ পেয়ে যায়।

ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সরাসরি সহায়তা করতে এবং ভারতকে ভয় দেখাতে বঙ্গোপসাগরে তাদের পরমাণু অস্ত্রবাহী বিখ্যাত ‘সপ্তম নৌবহর’ (7th Fleet / Task Force 74) পাঠিয়েছিল। একই সাথে চীনও উত্তর সীমান্তে সেনা মোতায়েনের হুমকি দিচ্ছিল।

কিন্তু ভারত আগে থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে চুক্তি করে রাখায়, সোভিয়েত ইউনিয়ন অবিলম্বে বঙ্গোপসাগরে তাদের নিজস্ব পারমাণবিক সাবমেরিন এবং নৌবহর পাঠায় মার্কিন সপ্তম নৌবহরকে কাউন্টার করার জন্য। শুধু তাই নয়, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে স্তব্ধ করার জন্য প্রস্তাব এনেছিল, তখনই সোভিয়েত ইউনিয়ন তার একমাত্র অস্ত্র ‘ভিটো’ (Veto) প্রয়োগ করে সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। ভারত যদি এই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দাবার চালে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পাশে না রাখত, তবে পরাশক্তিদের সরাসরি হস্তক্ষেপে আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন হয়তো চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যেত।

বিশ্ব ইতিহাসের আয়নায় বন্ধুহীন স্বাধীনতা আন্দোলনের ট্র্যাজেডি

ভারতের সহায়তার গুরুত্ব কতটা অপরিহার্য ছিল, তা আরও ভালোভাবে বুঝতে হলে আমাদের তাকাতে হবে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের স্বাধীনতা আন্দোলনগুলোর দিকে। অনেক জাতি দশকের পর দশক ধরে আমাদের চেয়েও হয়তো বেশি লড়াকু মানসিকতা নিয়ে যুদ্ধ করছে, কিন্তু কেবল একটি শক্তিশালী প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তার অভাবে তারা আজ পর্যন্ত স্বাধীন হতে পারেনি।

কাশ্মীর ও বেলুচিস্তান: অবরুদ্ধ ও বন্ধুহীন লড়াই

কাশ্মীর বা পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের মানুষেরা দীর্ঘকাল ধরে স্বাধিকার বা স্বাধীনতার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবি পাকিস্তান সেনাবাহিনী অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে দমন করছে। বেলুচ যোদ্ধারা পাহাড়-পর্বতে গেরিলা যুদ্ধ চালালেও তারা চূড়ান্ত সফলতা পাচ্ছে না। এর একমাত্র কারণ তাদের কোনো শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেই যারা তাদের ভূখণ্ড দেবে, ভারী অস্ত্র দেবে কিংবা বিশ্বমঞ্চে তাদের পক্ষে ওকালতি করবে। ভূ-রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে ভারত বা অন্য কোনো দেশ বেলুচিস্তানের ভেতরে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারছে না।

চেচনিয়া: পরাশক্তির পায়ের নিচে পিষ্ট

নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর চেচন্যারা রাশিয়ার হাত থেকে স্বাধীন হওয়ার জন্য অত্যন্ত দুর্ধর্ষ গেরিলা যুদ্ধ করেছিল। চেচেন যোদ্ধাদের সাহস ও রণকৌশল বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল এবং তারা প্রথম চেচেন যুদ্ধে রাশিয়াকে বড় ধাক্কা দিয়েছিল। কিন্তু চেচনিয়ার চারপাশে কোনো বন্ধুরাষ্ট্র ছিল না এবং মুসলিম বা পশ্চিমা বিশ্ব কেউই রাশিয়ার বিরুদ্ধে গিয়ে চেচেনদের সামরিক সহায়তা দেয়নি। ফলাফল দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধে ভ্লাদিমির পুতিনের আধুনিক রুশ সেনাবাহিনী পুরো চেচনিয়াকে বোমাবর্ষণ করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় এবং তাদের স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেয়।

কুর্দিস্তান: চার শত্রুর মাঝে অবরুদ্ধ এক জাতি

কুর্দিরা (Kurds) পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম জাতি যাদের নিজস্ব কোনো রাষ্ট্র নেই। তারা দীর্ঘকাল ধরে একটি স্বাধীন ‘কুর্দিস্তান’ রাষ্ট্রের জন্য লড়াই করছে। কিন্তু তাদের দুর্ভাগ্য হলো, তাদের ভৌগোলিক অবস্থান এমন জায়গায় যে তাদের প্রতিবেশী চারটি দেশই (তুরস্ক, ইরান, ইরাক এবং সিরিয়া) তাদের কট্টর শত্রু। কুর্দিরা যখনই কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, বাকি দেশগুলো তাদের রসদ ও সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। কোনো শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সরাসরি মদদ না থাকায় কুর্দিদের স্বাধীনতার স্বপ্ন আজও এক দূরবর্তী মরীচিকা।

এই আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, কেবল ন্যায্য দাবি, অদম্য সাহস আর রক্তের সাগর বইয়ে দিলেই একটি দেশ স্বাধীন হতে পারে না, যদি না আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার ছকে একটি শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্র সরাসরি নিজের স্বার্থ বা মানবিকতার কারণে সেই যুদ্ধে অংশ নেয়। বাংলাদেশ অত্যন্ত ভাগ্যবান ছিল যে, ১৯৭১ সালের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ভারতের অনুকূলে ছিল এবং ভারত সরাসরি এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল।

১৯৭১ সালে ভারতের বহুমুখী অবদানের ঐতিহাসিক টাইমলাইন ও কৌশলগত গুরুত্ব

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের কূটনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক অবদানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও ঘটনাগুলোকে নিচে একটি বিস্তারিত টেবিল ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

সময়কাল / তারিখ

ভারতের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ও কার্যক্রম

ঐতিহাসিক ও সামরিক গুরুত্ব

যুদ্ধের মূল ফলাফলে এর প্রভাব (Impact on War)

ফেব্রুয়ারি ১৯৭১

পাকিস্তানের জন্য ভারতের আকাশসীমা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণ (গঙ্গা হাইজ্যাকিং-এর পর)।

পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের সরাসরি আকাশপথের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা।

পাকিস্তান কলম্বো হয়ে দীর্ঘ নৌ ও আকাশপথ ব্যবহারে বাধ্য হয়। দ্রুত সেনা ও রসদ মোতায়েন ব্যাহত হয়।

এপ্রিল-মে ১৯৭১

সীমান্ত উন্মুক্তকরণ এবং ১০ মিলিয়ন (১ কোটি) ফিলিস্তিনি-সদৃশ বাঙালি শরণার্থীকে আশ্রয় দান।

মানবিক বিপর্যয় রোধ এবং বিশ্ববাসীর নজর কাড়া।

এই শরণার্থীদের মধ্য থেকেই মুক্তিবাহিনীর মূল জনবল (তরুণ যোদ্ধা) রিক্রুট করা সম্ভব হয়।

মে-নভেম্বর ১৯৭১

‘অপারেশন ফ্লাডলিংক’ ও ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন (র' এবং বিএসএফ-এর মাধ্যমে)।

মুক্তিবাহিনীকে পেশাদার গেরিলা বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা।

গেরিলারা আধুনিক অস্ত্র (SLR, মাইন, মর্টার) ও বিস্ফোরক নিয়ে দেশের ভেতরে পাকিস্তানি অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।

৯ আগস্ট ১৯৭১

ইন্দো-সোভিয়েত মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর।

ভারতের জন্য পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের নিরাপত্তা গ্যারান্টি লাভ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৭১

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ২১ দিনের ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর।

বিশ্ব জনমতকে পাকিস্তানের গণহত্যার বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশের পক্ষে আনা।

আন্তর্জাতিক সমাজ একে পাকিস্তানের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে দেখার মার্কিন প্রোপাগান্ডা প্রত্যাখ্যান করে।

নভেম্বর ১৯৭১

মুক্তিবাহিনীর সাথে ভারতের সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে ‘যৌথ কমান্ড’ (Mitro Bahini) গঠন।

প্রথাগত ও চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য লজিস্টিকস ও কমান্ড কাঠামো প্রস্তুত করা।

গেরিলা যুদ্ধ থেকে মুক্তিসংগ্রামকে একটি দ্বিপাক্ষিক প্রথাগত আন্তর্জাতিক যুদ্ধে রূপান্তর করা হয়।

৩ ডিসেম্বর ১৯৭১

পাকিস্তান কর্তৃক ভারতের বিমানঘাঁটিতে হামলার পর ভারতের আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা।

ভারতের বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী এবং পদাতিক বাহিনীর পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ।

যুদ্ধের গতি তীব্র হয়। আকাশ ও সমুদ্রপথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ঢাকামুখী ফাইনাল ব্লিৎসক্রিগ শুরু হয়।

ডিসেম্বর ১৯৭১ (মাঝামাঝি)

সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পরপর ৩ বার ‘ভিটো’ (Veto) প্রয়োগ।

মার্কিন ও চীনা যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব ভণ্ডুল করা।

যুদ্ধবিরতি হলে বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হতে পারত না, বরং একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশে পরিণত হতো। ভিটো সেই ফাঁদ আটকে দেয়।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১

ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যৌথ কমান্ডের কাছে ৯৩,০০০ পাকিস্তানি সেনার ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ।

মাত্র ১৩ দিনের সরাসরি যুদ্ধে পৃথিবীর বৃহত্তম সামরিক আত্মসমর্পণ নিশ্চিতকরণ।

স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় এবং ভৌগোলিক আত্মপ্রকাশ।

ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ’র ঐতিহাসিক জুয়া: এপ্রিল বনাম ডিসেম্বরের সিদ্ধান্ত

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা শুরু হয়, তখন তদানীন্তন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী চেয়েছিলেন এপ্রিলেই ভারতীয় সেনাবাহিনী সরাসরি পূর্ব পাকিস্তানে হস্তক্ষেপ করুক। কিন্তু সে সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান, জেনারেল (পরবর্তীতে ফিল্ড মার্শাল) স্যাম মানেকশ’ প্রজ্ঞা ও সাহসের সাথে প্রধানমন্ত্রীর এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। সামরিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানেকশ’র এই সিদ্ধান্তটিই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান টার্নিং পয়েন্ট।

কেন এপ্রিল মাসে আক্রমণ আত্মঘাতী হতো?

মানেকশ’ খুব ভালো করেই জানতেন যে, যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া যুদ্ধে নামলে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়েছিলেন যে, এপ্রিল মাসে আক্রমণ করলে ভারত তিনটি বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে:

বর্ষাকাল ও নদীমাতৃক অববাহিকা: মে-জুন মাসেই পূর্ব পাকিস্তানে বর্ষা নেমে যায়। ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা ও মেঘনার মতো বিশাল নদীগুলো তখন সাগরে পরিণত হয়। এমন জলমগ্ন অবস্থায় ভারতের ভারী সাঁজোয়া যান (ট্যাংক) ও পদাতিক বাহিনী কাদার মধ্যে আটকে যেত। পাকিস্তানি সেনারা সুরক্ষিত বাঙ্কারে বসে সহজেই ভারতীয় বাহিনীকে নির্মূল করতে পারত।

হিমালয়ের গিরিপথ ও চীনা হুমকি: এপ্রিল ও গ্রীষ্মকালে ভারত-চীন সীমান্তের হিমালয়ের গিরিপথগুলো (Himalayan Passes) বরফমুক্ত থাকে। এই সময়ে ভারত যদি পূর্ব পাকিস্তানে ব্যস্ত হয়ে পড়ত, তবে চীন অনায়াসেই ভারতের উত্তর সীমান্ত দিয়ে আক্রমণ চালিয়ে বসতে পারত।

লজিস্টিকস ও ফসল কাটার সময়: এপ্রিল মাস ছিল ভারতে ফসল কাটার সময়। সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের জন্য যদি রেল ও সড়কপথ ব্যবহার করা হতো, তবে দেশজুড়ে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিত। তাছাড়া, পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে রসদ ও গোলাবারুদ মজুত করার জন্য অন্তত ৬-৭ মাস সময়ের প্রয়োজন ছিল।

কৌশলগত পরিণতি: মানেকশ’ সময় চেয়েছিলেন ডিসেম্বর পর্যন্ত। ডিসেম্বর মাসে হিমালয়ের গিরিপথগুলো প্রচণ্ড বরফে বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে চীনের পক্ষে ভারতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। একই সাথে শীতকালে বাংলাদেশের মাটি শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়, যা ভারতের ভারী ট্যাংক চলাচলের জন্য ছিল একদম উপযুক্ত। মানেকশ’র এই ‘ডিসেম্বর স্ট্র্যাটেজি’র কারণেই যৌথ বাহিনী মাত্র ১৩ দিনে ঢাকাকে পরাস্ত করতে পেরেছিল।

‘অপারেশন ক্যাকটাস লিলি’ এবং ভারতের বিশেষায়িত সামরিক সেক্টরসমূহ

৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে যখন সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়, তখন পূর্ব পাকিস্তান ফ্রন্টে ভারতের এই অভিযানের অফিশিয়াল কোডনেম ছিল ‘অপারেশন ক্যাকটাস লিলি’ (Operation Cactus Lily)। এই অপারেশনের অধীনে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ড পূর্ব পাকিস্তানকে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করার জন্য ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে বেশ কয়েকটি বিশেষায়িত সামরিক ‘সেক্টর’ এবং ‘কমান্ড’ বেস তৈরি করেছিল।

ভারতের সামরিক বিন্যাস: পূর্ব পাকিস্তানকে দ্রুত কব্জা করার জন্য ভারতীয় আর্মি তিনটি কর্পস (Corps) এবং একটি বিশেষ ডিট্যাচমেন্ট মোতায়েন করেছিল:

১. ৪র্থ কর্পস (IV Corps): জেনারেল সাগাত সিং-এর নেতৃত্বে এই দলটি আগরতলা ও ত্রিপুরা সীমান্ত দিয়ে সিলেট, কুমিল্লা ও নোয়াখালী অভিমুখে অগ্রসর হয়। জেনারেল সাগাত সিং-এর হেলিকপ্টার ল্যান্ডিং কৌশল (Heliborne Operations) মেঘনা নদী পার হতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল।

২. ৩৩তম কর্পস (XXXIII Corps): শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়ি থেকে এই দলটি উত্তরবঙ্গে (দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া) আক্রমণ চালায়।

৩. ২য় কর্পস (II Corps): পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে যশোর, খুলনা ও কুষ্টিয়া অভিমুখে অগ্রসর হয়।

৪. ১০১ কমিউনিকেশন জোন (101 Communication Zone): মেঘালয়ের তুরা থেকে সরাসরি জামালপুর ও ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়ার দায়িত্ব ছিল এদের ওপর।

এই চারদিকের সাঁড়াশী আক্রমণের (Pincer Movement) কারণে পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজির পক্ষে কোনো একটি নির্দিষ্ট ফ্রন্টে তার পুরো শক্তি মোতায়েন করা সম্ভব হয়নি। তিনি বুঝতে পারছিলেন না যে কোন দিক থেকে যৌথ বাহিনীর মূল আক্রমণটি আসছে।

র’ (RAW) এবং ব্রিগেডিয়ার উবানের ‘অপারেশন ইগল’

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গোপন ও দুর্ধর্ষ অধ্যায় হলো ‘অপারেশন ইগল’ (Operation Eagle)। এই অপারেশনটি মুক্তিবাহিনীর মূল ধারার বাইরে সম্পূর্ণ ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছিল।

স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স (SFF) বা তিব্বতি বাহিনী: ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পর ভারত তিব্বতি শরণার্থীদের নিয়ে একটি অত্যন্ত গোপন বিশেষ বাহিনী গঠন করেছিল, যার নাম ছিল Special Frontier Force (SFF) বা ‘এস্টাবলিশমেন্ট ২২’। ১৯৭১ সালের অক্টোবরে এই বাহিনীর প্রায় ৩,০০০ জওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ফ্রন্টে মোতায়েন করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুজন সিং উবান

অপারেশনের লক্ষ্য: পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কমান্ডো দল এবং মিজো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের একটি বড় ঘাঁটি। অপারেশন ইগলের মাধ্যমে এই তিব্বতি কমান্ডোরা কাপ্তাই বাঁধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, পাকিস্তানি সেনাদের চট্টগ্রাম থেকে বার্মায় (মিয়ানমার) পালিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয় এবং সম্পূর্ণ পার্বত্য অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত করে। এই অপারেশনে বহু তিব্বতি সেনা শহীদ হন, কিন্তু অত্যন্ত গোপন মিশন হওয়ায় দীর্ঘদিন এই বীরত্বের কথা ইতিহাসের আড়ালেই রয়ে গিয়েছিল।

মেজর জেনারেল জে. এফ. আর. জ্যাকব এবং ‘বাইপাস স্ট্র্যাটেজি’

১৬ ডিসেম্বরের দ্রুত বিজয়ের পেছনে যে ব্যক্তির সামরিক মস্তিষ্ক সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিল, তিনি হলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে. এফ. আর. জ্যাকব (J.F.R. Jacob)।

প্রথাগত যুদ্ধ বনাম বাইপাস কৌশল: পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজির যুদ্ধকৌশল ছিল ‘ফোর্ট্রেস ডকট্রিন’ (Fortress Doctrine)। অর্থাৎ, তিনি সীমান্ত সংলগ্ন বড় বড় শহরগুলোকে (যেমন যশোর, নাটোর, কুমিল্লা, সিলেট) একেকটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করেছিলেন। নিয়াজি ভেবেছিলেন ভারতীয় বাহিনী এই শহরগুলো দখল করতে গিয়ে মাসের পর মাস যুদ্ধ করবে এবং এই সুযোগে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করে যুদ্ধবিরতি ঘটানো যাবে।

কিন্তু জেনারেল জ্যাকব নিয়াজির এই ফাঁদ ধরে ফেলেন। তিনি ভারতীয় ও যৌথ বাহিনীকে নির্দেশ দেন "কোনো শহরের দুর্গে আক্রমণ করে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। দুর্গগুলোকে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে রেখে, পাশ কাটিয়ে (Bypass) সরাসরি ঢাকার দিকে এগিয়ে যাও।"

ফলাফল: যৌথ বাহিনী যখন যশোর বা কুমিল্লার মূল শহরগুলোকে এড়িয়ে চিপা গলি ও গ্রামীণ পথ দিয়ে সরাসরি ঢাকার দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়, তখন নিয়াজি হতভম্ব হয়ে পড়েন। তার শক্তিশালী ডিফেন্স লাইনগুলো পেছনেই রয়ে গেল, অথচ মূল রাজধানী ঢাকা অরক্ষিত হয়ে পড়ল। এই মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কাতেই নিয়াজি যুদ্ধ করার সমস্ত ইচ্ছা হারিয়ে ফেলেন।

ভারতের মাটিতে রিক্রুটমেন্ট ও লজিস্টিকসের বিশাল যজ্ঞ

একটি ৩০০০ শব্দের পূর্ণাঙ্গ আর্টিকেলের খাতিরে আমাদের অবশ্যই যুদ্ধের পেছনের অর্থনৈতিক ও লজিস্টিকস যজ্ঞের বিশদ বিবরণ তুলে ধরতে হবে। ১৯৭১ সালে ভারত কেবল একটি যুদ্ধ লড়েনি, তারা একটি সম্পূর্ণ নতুন রাষ্ট্রকে গড়ে তোলার প্রাথমিক রসদ জুগিয়েছিল।

সীমান্ত জুড়ে সামরিক সেক্টর ও লজিস্টিকস বেসসমূহ

মুক্তিযুদ্ধকে সুসংগঠিত করতে ভারতের মাটিতে যে সামরিক অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, তার একটি বিস্তারিত বিবরণ নিচে ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

ভারতীয় সেক্টর/ঘাঁটি

ভৌগোলিক অবস্থান (ভারত)

দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশী সেক্টরসমূহ

প্রধান সরবরাহ ও কারিগরি সহায়তা

Alpha Sector

কলকাতা ও চব্বিশ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ

সেক্টর ১, ৮, ৯ (খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, বরিশাল)

ভারী অস্ত্র, মর্টার, গোলাবারুদ এবং নৌ-কমান্ডোদের বিস্ফোরক (অপারেশন জ্যাকপটের জন্য)।

Bravo Sector

কৃষ্ণনগর ও বহরমপুর, পশ্চিমবঙ্গ

সেক্টর ৭ (রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া)

গেরিলা ও পদাতিক বাহিনীকে দূরপাল্লার স্নাইপার ও মাইন সরবরাহ।

Charlie Sector

আসাম ও কোচবিহার

সেক্টর ৬ (রংপুর, দিনাজপুর)

কর্দমাক্ত এলাকায় চলাচলের উপযোগী হালকা সামরিক যান ও লজিস্টিকস ক্যাম্প।

Delta Sector

ত্রিপুরা ও আগরতলা

সেক্টর ২, ৩, ৪, ৫ (ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট)

তেলিয়াপাড়া ও মেলাঘর ক্যাম্পের প্রশাসনিক ব্যয়, রেডিও নেটওয়ার্ক ও ওয়্যারলেস সাপোর্ট।

Echo Sector

শিলং ও মেঘালয়

সেক্টর ১১ (ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল)

টাঙ্গাইলের প্যারাশুট ড্রপিং (Airborne Operations)-এর জন্য লজিস্টিকস ও এয়ারফিল্ড প্রোভাইড।

ভারতের ওপর শরণার্থীদের হিমালয়সম চাপ

১৯৭১ সালে ভারতের নিজস্ব অর্থনৈতিক অবস্থা মোটেও ভালো ছিল না। তৎকালীন সময়ে ভারতের মাথাপিছু আয় ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং দেশটিতে দারিদ্র্য দূরীকরণের লড়াই চলছিল। এই অবস্থায় প্রায় ১ কোটি শরণার্থীর ৯ মাসের সম্পূর্ণ অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের দায়িত্ব নেওয়া ছিল ভারতের জন্য একটি অর্থনৈতিক আত্মহননের শামিল।

প্রতিদিনের খরচ: তৎকালীন হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ১ কোটি শরণার্থীর পেছনে ভারতের প্রতিদিন প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি রুপি খরচ হতো। ৯ মাসে এই খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ কোটি রুপিতে, যা তৎকালীন ভারতের মোট প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ!

রেল ও পরিবহন ব্যবস্থার স্থবিরতা: ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর পুরো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এবং রেলওয়ে নেটওয়ার্ক সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ করে কেবল শরণার্থী ও সামরিক রসদ বহনের কাজে নিয়োজিত করা হয়েছিল। এর ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যে বিশাল ক্ষতি হয়।

বিশেষ কর: ইন্দিরা গান্ধী সরকার এই বিশাল খরচের ঘাটতি মেটাতে ভারতের সাধারণ নাগরিকদের ওপর ‘Refugee Relief Tax’ বা শরণার্থী ত্রাণ কর আরোপ করেছিলেন। ভারতের প্রতিটি পোস্টাল স্ট্যাম্প, সিনেমার টিকিট এবং বাস ভাড়ার ওপর অতিরিক্ত ৫ পয়সা করে ট্যাক্স নেওয়া হতো এই যুদ্ধের খরচ মেটানোর জন্য। অর্থাৎ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে ভারতের সাধারণ করদাতাদেরও সরাসরি অবদান ছিল।

ঐতিহাসিক সত্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ: ১৯৭২ সালের ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আন্তর্জাতিক মহলে এবং বিশেষ করে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছিল যে "বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি, এটি আসলে ভারতের একটি নতুন কলোনি বা অধিকৃত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।" কিন্তু বিশ্ব ইতিহাসকে স্তব্ধ করে দিয়ে ভারত যে কাজটি করেছিল, তা পৃথিবীর কোনো বিজয়ী পরাশক্তি আজ পর্যন্ত করতে পারেনি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বনাম ভারতের নীতি: আমরা যদি ভিয়েতনাম, ইরাক বা আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েনের ইতিহাস দেখি, কিংবা পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত ইউনিয়নের রেড আর্মির ইতিহাস দেখি তবে দেখব কোনো দেশ যখন অন্য কোনো দেশে প্রবেশ করে, তারা দশকের পর দশক ধরে সেখানে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি গেঁড়ে বসে থাকে এবং সেই দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে।

বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধীর ঐতিহাসিক চুক্তি: স্বাধীনতার পর, ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে বিনীতভাবে অনুরোধ করেন যেন বাংলাদেশ থেকে সমস্ত ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর এই অনুরোধকে সর্বোচ্চ সম্মান জানান। ১২ মার্চ ১৯৭২ সালে, মাত্র তিন মাসের মাথায়, ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি বর্ণাঢ্য বিদায়ী কুচকাওয়াজের মাধ্যমে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের সমস্ত সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম গুটিয়ে চিরতরে ভারতের সীমানায় ফিরে যায়।

বিশ্বের সামরিক ইতিহাসে এটি একটি বিরল ও নজিরবিহীন ঘটনা। কোনো বিজয়ী দেশ এত বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে একটি নতুন রাষ্ট্র স্বাধীন করার পর, স্রেফ তিন মাসের মধ্যে এক ফোঁটা রক্তপাত ছাড়া সম্পূর্ণ সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়েছে এমন উদাহরণ আর দ্বিতীয়টি নেই। এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে, ভারতের উদ্দেশ্য বাংলাদেশকে দখল করা ছিল না; তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটি নির্যাতিত জাতিকে মুক্ত করা এবং নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

শহীদ ভারতীয় জওয়ানদের পরিসংখ্যান

কৃতজ্ঞতার রাজনীতি আর সামরিক বাস্তবতার সবচেয়ে বড় দলিল হলো জীবন উৎসর্গ করা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কেবল বাঙালিরাই জীবন দেয়নি, আমাদের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে শহীদ হয়েছেন হাজার হাজার ভারতীয় সেনা।

অফিশিয়াল রেকর্ড অনুযায়ী ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ১,৪২১ জন ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য শহীদ হন৪,০৫৮ জন ভারতীয় সেনা গুরুতরভাবে আহত হন এবং অনেকে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। নিখোঁজ হন প্রায় ৫৬ জন সেনা।

যশোরের যুদ্ধ, হিলির যুদ্ধ, কুমিল্লার যুদ্ধ এবং কুষ্টিয়ার রণাঙ্গনগুলোতে ভারতীয় জওয়ানদের রক্ত ও এ দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত একসাথে মিশে গিয়ে পূর্ব বাংলার পলিমাটিকে উর্বর করেছিল। এই ১,৪২১ জন ভারতীয় পরিবারের মায়েরা তাদের সন্তানদের হারিয়েছিলেন এমন একটি দেশের জন্য, যা তাদের নিজস্ব ভূখণ্ড ছিল না। এই সর্বোচ্চ ত্যাগকে অস্বীকার করা কেবল ঐতিহাসিক অসততা নয়, এটি মানবতার চরম অপমান।

ঐতিহাসিক সত্যের পরিপক্বতা বনাম ‘দালাল’ ট্যাগিং-এর সস্তা রাজনীতি

বর্তমান বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ১৯৭১ সালে ভারতের এই অসামান্য অবদানের কথা কেউ যদি তথ্য ও যুক্তি দিয়ে আলোচনা করেন, তবে সমাজের একটি বিশেষ অংশ এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির একাংশ তাকে অনতিবিলম্বে ‘ভারতের দালাল’ বা ‘স্বার্থান্বেষী মহল’ হিসেবে তকমা দিয়ে দেয়।

আমাদের বুঝতে হবে, "কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আর দাসত্ব করা এক জিনিস নয়।" একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ থাকবে, ভারতের সাথে আমাদের সীমান্ত সমস্যা, তিস্তা নদীর পানিবণ্টন বা বাণিজ্যিক অসমতা নিয়ে আমরা অবশ্যই আমাদের জাতীয় স্বার্থে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করব, প্রতিবাদ করব এবং নিজেদের অধিকার আদায় করব। এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পররাষ্ট্রনীতি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, নিজেদের অধিকার আদায়ের আবেগে অন্ধ হয়ে আমরা আমাদের ইতিহাসের মূল সত্যটাকেই অস্বীকার করে বসব।

যারা মনে করেন ভারত ছাড়াও আমরা স্বাধীন হতাম, তারা মূলত যুদ্ধের রসদ, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, ভূ-কৌশল এবং আধুনিক যুদ্ধবিজ্ঞানের বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেন। রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজ্ঞা তৈরি হয় সত্যকে সাহস ও শ্রদ্ধার সাথে স্বীকার করার মাধ্যমে। ভারত ১৯৭১ সালে আমাদের শুধু অস্ত্র বা অর্থ দেয়নি, তারা তাদের ভূখণ্ড দিয়েছে, তাদের অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলেছে এবং সবচেয়ে বড় কথা আমাদের স্বাধীনতার জন্য প্রায় ১,৬০০ জনেরও বেশি ভারতীয় জওয়ান ও অফিসার রণাঙ্গনে নিজেদের রক্ত দিয়েছেন এবং শহীদ হয়েছেন।

ভারতকে রাজনৈতিকভাবে পছন্দ করা বা না করা আপনার ব্যক্তিগত বা নাগরিক অধিকার হতে পারে, কিন্তু ১৯৭১ সালের বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হলো এক ধরনের ‘ঐতিহাসিক অসততা’ এবং চরম অকৃতজ্ঞতা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভারতের এই প্রত্যক্ষ সামরিক ও কূটনৈতিক অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশ হয়তো আজ আরেকটি কাশ্মীর, চেচনিয়া কিংবা কুর্দিস্তানে পরিণত হতো, যেখানে স্বাধীনতার স্বপ্ন আজও রক্তের সাগরে ভাসছে এবং প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ বন্দুকের গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছে।

বীরত্ব ও বন্ধুত্বের এক অনন্য মহাকাব্য

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক পক্ষ দিয়ে অর্জিত হয়নি। এটি ছিল বাঙালির অদম্য আত্মত্যাগ, ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং ভারতের দূরদর্শী সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তার এক অনন্য কৌশলগত সংমিশ্রণ। বাঙালির রক্ত আর ভারতীয় জওয়ানদের রক্ত ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনে একসাথে মিশে গিয়েছিল।

ভারত যদি সে সময় আন্তর্জাতিক ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি যুদ্ধে না জড়াতো, তবে পাকিস্তানের জেনারেল নিয়াজি এবং টিক্কা খানের ‘পোড়ামাটি নীতি’ (Scorched Earth Policy) সফল হয়ে যেত। তারা এ দেশের সমস্ত বুদ্ধিজীবী ও তরুণ প্রজন্মকে সম্পূর্ণ নির্মূল করে দিত এবং আমাদের দীর্ঘদিনের স্বাধিকার সংগ্রাম হয়তো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতো অথবা এক অন্তহীন, রক্তাক্ত ও ফলহীন গৃহযুদ্ধের রূপ নিত।

আমরা আজ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গর্বিত বাংলাদেশের নাগরিক। এই লাল-সবুজ পতাকা আমাদের অহংকার। কিন্তু এই স্বাধীনতা অর্জনের পেছনের কঠিন বাস্তবতাকে এবং ভারতের সেই অসামান্য ঐতিহাসিক ঋণকে যখন আমরা কোনো রকম রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে স্বীকার করি, তখন আমরা ছোট হই না; বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ঐতিহাসিক পরিপক্বতা এবং একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে আমাদের নৈতিক উচ্চতা প্রকাশ পায়। যারা নিজেদের প্রকৃত ইতিহাসকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে, তারাই ভবিষ্যতে যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 9, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এবং তার শাসনযন্ত্রের মূল নিয়ামক 'সামরিক-গোয়েন্দা অক্ষ' (Military-Intelligence Establishment) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক সত্তা এবং অগ্রযাত্রাকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, পরবর্তীকালে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের একটি নিরবচ্ছিন্ন অশুভ ভূমিকা বিদ্যমান।

Aug 8, 2026

/

Post by

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নেপথ্য চক্রান্তকারী হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা শরীফুল হক ডালিম (যিনি ‘মেজর ডালিম’ নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত করে এক বিতর্কিত ও জাতির বিশ্বাসঘাতক চরিত্রে পরিণত করেছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

Jul 29, 2026

/

Post by

এতদিন ধরে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান যে অঞ্চলটিকে তথাকথিত "স্বাধীন কাশ্মীর"-এর মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে, আজ তা এক সুবিশাল উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সরকারের পরিচালিত নজিরবিহীন দমন-পীড়ন আর কেবল সাধারণ কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, মানবিকতা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের সমস্ত সীমানা লঙ্ঘন করেছে।

Jul 27, 2026

/

Post by

দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ‘ভারত প্রজাতন্ত্রের’ (Republic of India) জন্য এই ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জের চরমতম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে অবস্থিত অতি সংকীর্ণ একটি ভূখণ্ডে যার নাম শিলিগুড়ি করিডোর (Siliguri Corridor)। কৌশলগত পরিমণ্ডলে করিডোরটি সর্বজনীনভাবে ‘চিকেনস নেক’ (Chicken’s Neck) বা ‘মুরগির ঘাড়’ নামে পরিচিত। শিলিগুড়ি করিডোরকে ভারতের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রেক্ষাপটে এক ‘ভূরাজনৈতিক দোধারী তলোয়ার’ (Double-edged Sword) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

Aug 9, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এবং তার শাসনযন্ত্রের মূল নিয়ামক 'সামরিক-গোয়েন্দা অক্ষ' (Military-Intelligence Establishment) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক সত্তা এবং অগ্রযাত্রাকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, পরবর্তীকালে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের একটি নিরবচ্ছিন্ন অশুভ ভূমিকা বিদ্যমান।

Aug 8, 2026

/

Post by

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নেপথ্য চক্রান্তকারী হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা শরীফুল হক ডালিম (যিনি ‘মেজর ডালিম’ নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত করে এক বিতর্কিত ও জাতির বিশ্বাসঘাতক চরিত্রে পরিণত করেছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.