ভারত যদি মুক্তিযুদ্ধে না জড়াতো তাহলে বাংলাদেশ কি স্বাধীন হতো?
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি বিতর্ক প্রায়ই শোনা যায় - "ভারত সহায়তা না করলে আমাদের হয়তো দেরি হতো, কিন্তু আমরা স্বাধীন হতামই।" এই ধারণাটি শুনতে আবেগপ্রবণ মনে হলেও, সামরিক বিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় এর ভিত্তি অত্যন্ত নড়বড়ে। ১৯৭১ সালে বাঙালির অদম্য সাহস যদি যুদ্ধের 'ইঞ্জিন' হয়ে থাকে, তবে ভারত ছিল সেই ইঞ্জিনের 'জ্বালানি' এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর 'নিরাপদ পথ'।

TruthBangla
Dec 15, 2025
ইতিহাস কেবল বীরত্বগাঁথা দিয়ে রচিত হয় না; ইতিহাস রচিত হয় সামরিক কৌশল, ভৌগোলিক সুবিধা এবং কূটনৈতিক মিত্রতার সমীকরণে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি বিতর্ক প্রায়ই শোনা যায় - "ভারত সহায়তা না করলে আমাদের হয়তো দেরি হতো, কিন্তু আমরা স্বাধীন হতামই।" এই ধারণাটি শুনতে আবেগপ্রবণ মনে হলেও, সামরিক বিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় এর ভিত্তি অত্যন্ত নড়বড়ে। ১৯৭১ সালে বাঙালির অদম্য সাহস যদি যুদ্ধের 'ইঞ্জিন' হয়ে থাকে, তবে ভারত ছিল সেই ইঞ্জিনের 'জ্বালানি' এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর 'নিরাপদ পথ'। ভারতের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া একটি আধুনিক এবং সুসংগঠিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কেবল সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ দিয়ে বিজয় অর্জন করা কতটা অসম্ভব ছিল, আজ আমরা সেই নির্মোহ সত্যটিই বিশ্লেষণ করব।
ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা ও ভারতের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ
১৯৭১ সালে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে দূরত্ব ছিল প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার (১০০০ মাইল)। মাঝখানে ছিল বিশাল ভারতীয় ভূখণ্ড। যুদ্ধের শুরুতেই ভারত একটি অত্যন্ত দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা পাকিস্তানের সামরিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
আকাশপথের অবরোধ
ফেব্রুয়ারি ১৯৭১-এ 'গঙ্গা' নামক একটি ভারতীয় বিমান হাইজ্যাক হওয়ার পর ভারত তার আকাশসীমা পাকিস্তানের জন্য বন্ধ করে দেয়। এর ফলে পাকিস্তান তাদের সৈন্য ও রসদ সরাসরি পূর্ব পাকিস্তানে পাঠাতে পারছিল না। তাদের ঘুরে শ্রীলঙ্কা হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতো। যদি ভারত আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিত, তবে মার্চের 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর সময় পাকিস্তান হাজার হাজার সৈন্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় নামাতে পারত। ভারতের এই বাধার কারণে পাকিস্তান নেপাল বা ভুটানের ভূখণ্ডও ব্যবহার করতে পারেনি, কারণ ভারত তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল।
নৌপথের সীমাবদ্ধতা
ভারতের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় পাকিস্তান পুরোপুরি নৌপথের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু বঙ্গোপসাগরে ভারতীয় নৌবাহিনীর আধিপত্যের কারণে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে রসদ পৌঁছানো ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এই ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাই পাকিস্তানকে যুদ্ধের শুরুতেই মানসিকভাবে অর্ধেক পরাজিত করে ফেলেছিল।
মুক্তিবাহিনী বনাম পাকিস্তান সেনাবাহিনী
অনেকেই মনে করেন, কেবল গেরিলা যুদ্ধ দিয়ে একটি আধুনিক বাহিনীকে পরাজিত করা সম্ভব। কিন্তু সামরিক ইতিহাস বলে, কোনো গেরিলা বাহিনী কখনোই একটি শক্তিশালী নিয়মিত বাহিনীকে পরাজিত করতে পারে না যদি না তাদের কোনো 'সেফ হ্যাভেন' বা নিরাপদ আশ্রয় এবং নিয়মিত সামরিক সহায়তা থাকে।
প্রশিক্ষণ ও আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা
মার্চের পর যখন পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডব শুরু হয়, তখন প্রায় ১ কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়। এই শরণার্থীদের মধ্য থেকেই গড়ে ওঠে মুক্তিবাহিনী। ভারত যদি তার সীমান্ত খুলে না দিত, তবে এই বিশাল জনগোষ্ঠী দেশের ভেতরেই গণহত্যার শিকার হতো। মুক্তিবাহিনী তাদের ট্রেনিং ক্যাম্পগুলো ভারতের মাটিতেই স্থাপন করেছিল। ভারতের 'র' (RAW) এবং বিএসএফ (BSF) সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ করেছিল। ভারতের মাটি ব্যবহারের সুযোগ না থাকলে মুক্তিবাহিনীর পক্ষে পুনর্গঠিত হওয়া এবং পাল্টা আঘাত করা অসম্ভব ছিল।
২.২. কামানের সামনে লাঠি: আধুনিক যুদ্ধের সীমাবদ্ধতা
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ছিল সেই সময়ের অন্যতম সুসংগঠিত বাহিনী। তাদের ছিল ট্যাঙ্ক, কামান এবং বিমানবাহিনী। সাধারণ জনগণের অদম্য ইচ্ছা থাকলেও, আধুনিক মরণাস্ত্রের সামনে তারা কতদিন টিকতে পারত? পর্যাপ্ত ভারী অস্ত্র ছাড়া মুক্তিবাহিনী কখনোই পাকিস্তানি বাঙ্কারগুলো ধ্বংস করতে পারত না। ৩ ডিসেম্বর ভারত সরাসরি যুদ্ধে নামার পর তাদের বিমানবাহিনী ও ট্যাঙ্ক ডিভিশন মাত্র ১৩ দিনে ঢাকাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এই দ্রুত বিজয় ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া কল্পনাও করা যায় না।
কূটনৈতিক যুদ্ধ - ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্ব অভিযান
একটি যুদ্ধের জয় কেবল রণাঙ্গনে হয় না, তা অর্জিত হয় বিশ্বনেতাদের টেবিলও। ১৯৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। সেই সময়ে বাংলাদেশের ন্যায্যতার কথা বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা ছিল পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ।
ভারতের জোরালো কূটনীতি
তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বজুড়ে সফর করে বাংলাদেশের গণহত্যার ভয়াবহতা এবং যুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বিশ্ব জনমতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশের পক্ষে নিয়ে আসেন। ভারত যদি এই কূটনৈতিক লড়াই না করত, তবে আন্তর্জাতিক সমাজ একে পাকিস্তানের 'অভ্যন্তরীণ বিষয়' হিসেবেই দেখে যেত।
ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তি ও আমেরিকার গতিরোধ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন সপ্তম নৌবহর (7th Fleet) বঙ্গোপসাগরে পাঠিয়েছিল, তখন ভারত যদি রাশিয়ার (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) সাথে ' Indo-Soviet Treaty of Peace, Friendship and Cooperation' না করত, তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারত। রাশিয়ার সহায়তা নিশ্চিত করেই ভারত আমেরিকাকে রুখে দিয়েছিল। এই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দাবার চালে ভারত না থাকলে বাংলাদেশ একা কখনোই পরাশক্তিদের মোকাবিলা করতে পারত না।
স্বাধীনতা কেন আসেনি অন্য দেশগুলোতে
ভারতের সহায়তার গুরুত্ব বুঝতে হলে আমাদের তাকাতে হবে বিশ্বের অন্যান্য স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে। অনেক জাতি দশকের পর দশক লড়াই করেও স্বাধীন হতে পারছে না কেবল একটি শক্তিশালী 'বন্ধুরাষ্ট্রের' অভাবে।
কাশ্মীর ও বেলুচিস্তান - বন্ধুহীন লড়াই
কাশ্মীর বা বেলুচিস্তানের মানুষেরা দীর্ঘকাল ধরে লড়াই করছে। কিন্তু তাদের ভৌগোলিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমীকরণ এমন যে, কোনো পরাশক্তি বা প্রতিবেশী রাষ্ট্র তাদের হয়ে সরাসরি লড়ছে না। বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবি পাকিস্তান সেনাবাহিনী কঠোরভাবে দমন করছে, কিন্তু তাদের পাশে ভারতের মতো কোনো দেশ দাঁড়াতে পারছে না ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে।
চেচনিয়া - রাশিয়ার পাহাড়সম শক্তি
চেচনিয়া রাশিয়ার হাত থেকে স্বাধীন হওয়ার জন্য কয়েক দফা যুদ্ধ করেছে। তাদের যোদ্ধারা অত্যন্ত দুর্ধর্ষ ছিল। কিন্তু রাশিয়ার সামরিক শক্তির সামনে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর নীরবতার কারণে তারা আজ পরাজিত ও পর্যুদস্ত। একইভাবে কুর্দিরা (Kurds) দীর্ঘকাল লড়াই করেও একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পাচ্ছে না, কারণ তুরস্ক, ইরান ও ইরাকের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের শত্রু।
বন্ধুর প্রয়োজনীয়তা
এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, কেবল ন্যায্য দাবি আর অদম্য সাহস একটি দেশকে স্বাধীন করার জন্য যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্র যদি সরাসরি যুদ্ধে না জড়ায়, তবে স্বাধীনতা পাওয়া প্রায় অসম্ভব বা অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ভাগ্যবান ছিল যে, ভারত তার স্বার্থেই হোক বা মানবিক কারণেই হোক, সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়েছিল।
দালাল নাকি প্রজ্ঞাবান নাগরিক
বাংলাদেশে একটি প্রচলিত প্রবণতা হলো - ভারতের অবদানের কথা বললেই তাকে স্বাধীনতা বিরোধীরা 'ভারতের দালাল' তকমা দেয়। কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আর দাসত্ব করা এক বিষয় নয়।
যারা মনে করেন ভারত ছাড়াও আমরা স্বাধীন হতাম, তারা মূলত যুদ্ধের রসদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সামরিক কৌশলের গুরুত্বকে উপেক্ষা করেন। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা তৈরি হয় সত্যকে স্বীকার করার মাধ্যমে। ভারত ১৯৭১ সালে আমাদের শুধু অস্ত্র দেয়নি, তারা তাদের ভূখণ্ড দিয়েছে এবং যুদ্ধের চরম মুহূর্তে ভারতীয় জওয়ানদের রক্ত দিয়েছে।
ভারতকে ঘৃণা করা বা পছন্দ করা আপনার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, কিন্তু ১৯৭১ সালের বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হলো ঐতিহাসিক অসততা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভারতের সামরিক ও কূটনৈতিক অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশ হয়তো আরেকটি কাশ্মীর বা চেচনিয়ায় পরিণত হতো, যেখানে স্বাধীনতার স্বপ্ন আজও রক্তের সাগরে ভাসছে।
সার্বভৌমত্ব ও কৃতজ্ঞতা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাঙালির বীরত্ব আর ভারতীয় সহায়তার এক অনন্য সংমিশ্রণ। ভারত যদি যুদ্ধে না জড়াতো, তবে পাকিস্তানের 'পোড়ামাটি নীতি' বাস্তবায়িত হয়ে যেত এবং বাঙালির দীর্ঘদিনের সংগ্রাম হয়তো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতো অথবা এক অন্তহীন গৃহযুদ্ধের রূপ নিত।
আমরা আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিক। এই সার্বভৌমত্ব আমাদের অহংকার। কিন্তু এই স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে ভারতের যে অসামান্য ঋণ রয়েছে, তা স্বীকার করলে আমরা ছোট হই না, বরং আমাদের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পরিপক্বতা প্রকাশ পায়। যারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে, তারাই ভবিষ্যতে নিজেদের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখতে পারে।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















