>

>

কল্পিত বিহারী গণহত্যা - একাত্তরের পরাজিত শক্তির অপকৌশল

কল্পিত বিহারী গণহত্যা - একাত্তরের পরাজিত শক্তির অপকৌশল

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া তথা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে, পাকিস্তানপন্থী গোষ্ঠী, জামায়াত-শিবির চক্র এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের বেতনভুক্ত কিছু তথাকথিত ‘সুশীল’ ও লবিস্ট একটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তাদের মূল দাবি হলো: “একাত্তরে বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা নাকি ৫ লক্ষ নিরীহ বিহারীকে হত্যা বা গণহত্যা করেছে।” এই দাবিটি কেবল অসত্য ও কাল্পনিকই নয়, এটি অত্যন্ত সুকৌশলে সাজানো একটি ভূ-রাজনৈতিক ও আইনি অপকৌশল।

TruthBangla

কল্পিত বিহারী গণহত্যা - একাত্তরের পরাজিত শক্তির অপকৌশল

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর এই নয়টি মাস ছিল বাঙালি জাতির অস্তিত্বের লড়াই, যা পৃথিবীর ইতিহাসে এক নজিরবিহীন আত্মত্যাগ ও বীরত্বের মহাকাব্য। কিন্তু এই মহাকাব্যের সমান্তরালে রয়েছে মানব ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও পদ্ধতিগত গণহত্যার কালো ইতিহাস। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং তাদের দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী এবং একটি সুনির্দিষ্ট উর্দূভাষী অ-বাঙালি গোষ্ঠী (সাধারণভাবে ‘বিহারী’ নামে পরিচিত) মিলে ৩০ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করে, ৫ লক্ষ নারীকে পরিকল্পিতভাবে ধর্ষণ করে এবং ১ কোটি মানুষকে নিজেদের ভিটেমাটি থেকে তাড়িয়ে প্রতিবেশী ভারতে শরণার্থী হতে বাধ্য করে। এই সত্য আজ শুধু বাংলাদেশের নয়, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং দলিলভুক্ত ইতিহাস।

তবে, ইতিহাসের একটি চিরন্তন সত্য হলো পরাজিত শক্তি কখনো তাদের অপরাধ সহজে স্বীকার করে না। তারা সব সময় তাদের নৃশংসতাকে আড়াল করতে ইতিহাসের সমান্তরাল এক কাল্পনিক আখ্যান (Counter-Narrative) তৈরি করার চেষ্টা করে। গত কয়েক দশক ধরে, বিশেষ করে বাংলাদেশে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া তথা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে, পাকিস্তানপন্থী গোষ্ঠী, জামায়াত-শিবির চক্র এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের বেতনভুক্ত কিছু তথাকথিত ‘সুশীল’ ও লবিস্ট একটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর চেষ্টা করছে।

তাদের মূল দাবি হলো: “একাত্তরে বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা নাকি ৫ লক্ষ নিরীহ বিহারীকে হত্যা বা গণহত্যা করেছে।”

এই দাবিটি কেবল অসত্য ও কাল্পনিকই নয়, এটি অত্যন্ত সুকৌশলে সাজানো একটি ভূ-রাজনৈতিক ও আইনি অপকৌশল। এর উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিসংগ্রামকে একটি ‘পারস্পরিক জাতিগত দাঙ্গা’ (Ethnic Riot) বা ‘উভয়পক্ষের নিধনযজ্ঞ’ হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা, যাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মূল যুদ্ধাপরাধ এবং তাদের স্থানীয় দোসরদের ফাঁসির রায়কে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। তথ্য, যুক্তি, সমসাময়িক নথিপত্র এবং আন্তর্জাতিক গবেষণার নিরিখে এই কাল্পনিক ‘বিহারী গণহত্যা’র ভেতরের ফাঁকফোকর ও সত্যের অপলাপের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা এ যুগের এক ঐতিহাসিক তাগিদ।

‘ব্লাড অ্যান্ড টিয়ার্স’ গ্রন্থ: মিথ্যার জন্ম ও সংখ্যার কারসাজি

যেকোনো প্রোপাগান্ডা বা মিথ্যা প্রচারণাকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে প্রথমে প্রয়োজন হয় একটি মনগড়া ‘উৎস’ (Source) এবং একটি বড়সড় ‘সংখ্যা’ (Number)। কারণ সাধারণ মানুষ বড় সংখ্যা দেখে সহজেই বিভ্রান্ত হয়। একাত্তরে তথাকথিত ৫ লক্ষ বিহারী হত্যার এই কাল্পনিক সংখ্যার পেছনের ইতিহাস ঘাঁটলে একটি সুনির্দিষ্ট পাকিস্তানি যোগসূত্র পাওয়া যায়।

৫ লক্ষের কাল্পনিক সংখ্যাটি কোথা থেকে এলো?

এই অসত্য সংখ্যার মূল কারিগর হলেন পাকিস্তানের একজন কট্টরপন্থী সাংবাদিক এবং প্রোপাগান্ডিস্ট কুতুবউদ্দিন আজিজ। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে পাকিস্তানের যে চরম নৈতিক পরাজয় ঘটেছিল এবং তাদের সেনাবাহিনীর যে যুদ্ধাপরাধের চিত্র ফুটে উঠেছিল, তা ঢাকতে পাকিস্তান সরকার মরিয়া হয়ে ওঠে। এই উদ্দেশ্যে কুতুবউদ্দিন আজিজকে দিয়ে ১৯৭৪ সালে করাচি থেকে একটি বই প্রকাশ করা হয়, যার নাম 'ব্লাড অ্যান্ড টিয়ার্স' (Blood and Tears)

এই বইটিতে কুতুবউদ্দিন আজিজ কোনো প্রকার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, মাঠপর্যায়ের জরিপ বা নিরপেক্ষ উৎস ছাড়াই দাবি করেন যে, একাত্তরের মার্চ মাসে (বিশেষ করে ২৫শে মার্চের আগে) এবং যুদ্ধকালীন সময়ে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা পূর্ব পাকিস্তানে ১ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ বিহারীকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করেছে।

"The Awami League militants and Bengali mobs slaughtered between 100,000 to 500,000 non-Bengalis (Biharis) across East Pakistan..." - Qutubuddin Aziz (Blood and Tears, 1974)

হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্টের চাতুর্য

পাকিস্তান সরকার ১৯৭১ সালের পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানে যে ‘হামুদুর রহমান কমিশন’ গঠন করেছিল, তারাও এই মিথ্যাকে রাষ্ট্রীয় সিলমোহর দেওয়ার জন্য কুতুবউদ্দিন আজিজের এই ‘ব্লাড অ্যান্ড টিয়ার্স’ বইটিকে প্রধান প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে। কমিশন তাদের রিপোর্টে এই ৫ লক্ষের দাবিকে হুবহু তুলে ধরে প্রচার করে যে, বাঙালিরাই মূলত আগে বিহারীদের হত্যা করে উস্কানি দিয়েছিল, যার ফলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘বাধ্য হয়ে’ অ্যাকশনে গিয়েছিল। এটি ছিল এক নির্লজ্জ ঐতিহাসিক চাতুর্য।

এই দাবির অযৌক্তিকতা ও ফাঁকফোকরসমূহ

কুতুবউদ্দিন আজিজের বই এবং পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডার এই দাবিটি যে কতটা সস্তা এবং কাল্পনিক, তা নিচের যুক্তিগুলোর দিকে তাকালেই পরিষ্কার হয়ে যায়:

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নীরবতা (কেন একটি রিপোর্টও হলো না?): ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় সমস্ত বড় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সাইমন ড্রিং, ডেভিড লোশাক, মাইকেল লরেন্ট, নিকোলাস টোমালিনের মতো বাঘা বাঘা সাংবাদিকরা ঢাকার প্রতিটি কোণে নজর রাখছিলেন। যদি সত্যি সত্যিই ৫ লক্ষ বা ১ লক্ষ তো দূরের কথা, ১০ হাজার বিহারীকেও বাঙালিরা হত্যা করত, তবে কি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তা চেপে যেত? অথচ সমসাময়িক কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রে বাঙালিদের দ্বারা বিহারী গণহত্যার একটি খবরও খুঁজে পাওয়া যায় না।

জনমিতিক অসম্ভবতা (Demographic Impossibility): ১৯৭১ সালের আদমশুমারি এবং তৎকালীন হিসাব অনুযায়ী, পূর্ব পাকিস্তানে বিহারী বা অ-বাঙালি উর্দূভাষী জনগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যাই ছিল প্রায় ৭ লক্ষ থেকে ১০ লক্ষের কাছাকাছি। যদি তার মধ্যে ৫ লক্ষ বিহারীকেই হত্যা করা হতো, তবে দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশে কোনো বিহারী অবশিষ্ট থাকার কথা ছিল না। অথচ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে প্রায় ৫ থেকে ৬ লক্ষ বিহারী বহাল তবিয়তে ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর এবং দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে (যেমন জেনেভা ক্যাম্প) বসবাস শুরু করে, যারা পরবর্তীতে পাকিস্তানে প্রত্যাবাসনের দাবি জানায়। এই সরল সমীকরণই প্রমাণ করে যে ৫ লক্ষের এই দাবিটি গাণিতিকভাবে সম্পূর্ণ অসম্ভব ও হাস্যকর।

লাশের কোনো অস্তিত্ব নেই: ৫ লক্ষ মানুষ মারা গেলে তাদের তো কবর বা গণকবর থাকার কথা ছিল। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা শত শত গণকবর (বধ্যভূমি) থেকে যে হাজার হাজার কঙ্কাল ও হাড়গোড় উদ্ধার করা হয়েছে, তার সবকটিই ছিল বাঙালিদের। বিহারীদের কোনো গণকবরের হদিস আজও কেউ দিতে পারেনি।

১ মার্চের তথাকথিত ‘উস্কানি’ তত্ত্ব ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা

পাকিস্তানি প্রচারক এবং তাদের দোসরদের আরেকটি বড় দাবি হলো ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ যখন জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন, তখন ক্ষুব্ধ বাঙালিরা নাকি তাৎক্ষণিকভাবে বিহারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাদের নির্বিচারে হত্যা করা শুরু করে। একে তারা ২৫শে মার্চের ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর যৌক্তিকতা হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করে।

সত্যের অপলাপ ও অহিংস অসহযোগ আন্দোলন

ইতিহাসের দলিল ঘেঁটে দেখা যায়, ১লা মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি যে আন্দোলন পরিচালনা করেছিল, তা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম সফল ও শান্তিপূর্ণ অহিংস অসহযোগ আন্দোলন (Non-Violent Non-Cooperation Movement)

বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন: "মনে রাখবেন, শত্রু বাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-ননবাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই, তাদের রক্ষার দায়িত্ব আমাদের ওপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়।"

বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষুব্ধ জনতার সাথে বিহারী বা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর টুকটাক সংঘর্ষ হলেও, কোনো পদ্ধতিগত বা পরিকল্পিত বিহারী নিধনযজ্ঞের ঘটনা ঘটেনি।

বাস্তবতা ছিল উল্টো। এই সময়ে অ-বাঙালি বিহারী গোষ্ঠী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে উস্কানিমূলক আচরণ শুরু করে। তারা বিভিন্ন স্থানে অবাঙালি এলাকায় অস্ত্র মজুত করতে শুরু করে এবং বাঙালি বসতিতে হামলা চালায়। ২৫শে মার্চের আগেই ঢাকার মিরপুর এবং চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে পাকিস্তানি পতাকাবাহী বিহারী যুবকেরা বাঙালি সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালিয়েছিল, যা তৎকালীন স্থানীয় দৈনিকগুলোতে ছাপা হয়েছিল।

একাত্তরে বিহারীরা: জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও গণহত্যার দোসর

পাকিস্তানের এই ‘শিকার’ (Victim) কার্ড খেলার বিপরীতে আসল ঐতিহাসিক সত্য হলো একাত্তরের পুরো নয়টি মাস জুড়ে বিহারী জনগোষ্ঠী কোনো নিরীহ দর্শক ছিল না; বরং তারা ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অন্যতম প্রধান সহযোগী, ঘাতক এবং নৃশংস নিপীড়ক।

জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও ধর্মীয় সংকীর্ণতার মনস্তত্ত্ব

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারতের বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা উর্দূভাষী মুসলমানরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসে বসতি স্থাপন করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী প্রথম থেকেই এই অ-বাঙালিদের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে মাথায় তুলে রাখে। ফলে, বিহারীদের মধ্যে এক ধরনের কৃত্রিম জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববোধ (Ethnic Superiority) তৈরি হয়।

তারা নিজেদের ভাবত ‘আশরাফ’ (উচ্চ বংশীয় বা খাঁটি মুসলমান) এবং বাঙালিদের ভাবত ‘আতরাফ’ (নিচু জাতের বা হিন্দুয়ানি সংস্কৃতিতে আক্রান্ত মুসলমান)। তারা মনে করত, পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখা এবং বাঙালিদের ‘ইসলামীকরণ’ করার দায়িত্ব একমাত্র তাদেরই। এই চরমপন্থী মনস্তত্ত্বের কারণে তারা শুরু থেকেই বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করে এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার মূল মাঠপর্যায়ের চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।

আধা-সামরিক বাহিনী (Razakar, Al-Badr) ও ডেথ স্কোয়াডে অংশগ্রহণ

একাত্তরে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালিদের প্রতিরোধের মুখে কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখন তারা বিহারী যুবকদের নিয়ে বিভিন্ন সশস্ত্র আধা-সামরিক বাহিনী গঠন করে।

রাজাকার ও আল-শামস বাহিনী: এই বাহিনীর একটি বড় অংশ গঠিত হয়েছিল বিহারীদের নিয়ে। তারা পাকিস্তানি সৈন্যদের পথ দেখিয়ে বাঙালির ঘরে ঘরে নিয়ে যেত, ধনসম্পদ লুট করত এবং নারীদের তুলে দিত পাকিস্তানি ক্যাম্পে।

শান্তি কমিটি (Peace Committee): স্থানীয় পর্যায়ে শান্তি কমিটির নেতৃত্বে থেকে তারা মুক্তিকামী বাঙালিদের তালিকা তৈরি করত এবং সেই তালিকা ধরে ধরে যুবকদের ধরে নিয়ে হত্যা করত।

যেখানে বিহারীরা মেতেছিল উৎসবের হত্যাযজ্ঞে

পূর্ব পাকিস্তানের যেসব অঞ্চলে বিহারীদের সংখ্যাধিক্য ছিল বা যেখানে তারা রেলওয়ে বা শিল্পকারখানায় কাজ করত, সেই এলাকাগুলোকে তারা বাঙালিদের জন্য জীবন্ত নরক বানিয়ে তুলেছিল। কয়েকটি অঞ্চলের কুখ্যাত কিছু ঘটনার বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

১. চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ও হালিশহরের বিভীষিকা

চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ছিল রেলওয়ের প্রধান কেন্দ্র এবং সেখানে বিপুলসংখ্যক অ-বাঙালি বিহারী কর্মরত ছিল। একাত্তরে পাহাড়তলীর পাঞ্জাবী লেন ও বিহারী কলোনিগুলো হয়ে উঠেছিল বাঙালির কসাইখানা।

পাহাড়তলীর ওয়্যারলেস কলোনির রেলওয়ে বধ্যভূমিতে বিহারীরা প্রতিদিন শত শত বাঙালিকে ধরে এনে জবাই করত। হালিশহর ও লালখান বাজার এলাকায় বিহারীরা স্থানীয় বাঙালিদের বাড়িঘর দখল করে এবং নারীদের আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতন চালায়। চট্টগ্রামের স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, চট্টগ্রামে বিহারীদের হাতে যত বাঙালি মারা গেছে, তার সংখ্যা কয়েক হাজার।

২. মিরপুরের দোজখখানা ও জল্লাদখানা বধ্যভূমি

ঢাকার মিরপুর ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় বিহারী অধ্যুষিত এলাকা। একাত্তরের নয়টি মাস মিরপুর ছিল বাঙালিদের জন্য একটি নিষিদ্ধ নগরী। কোনো বাঙালি ভুল করেও মিরপুরে ঢুকলে আর জীবিত ফিরতে পারত না।

মিরপুরের জল্লাদখানা বধ্যভূমি (লোহার ব্রিজ): মিরপুরের পাম্প হাউজ এবং নূরী মসজিদের পেছনের বধ্যভূমিগুলো ছিল বিহারী জল্লাদদের মূল আখড়া। সেখানে তারা বাঙালিদের ধরে এনে জীবন্ত কুয়া বা কুয়োর ভেতর ফেলে দিত এবং ওপর থেকে গরম পানি বা এসিড ঢেলে দিত।

মিরপুরের শেষ মুক্ত হওয়া (৩১শে জানুয়ারি, ১৯৭২): ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও মিরপুর কিন্তু স্বাধীন হয়নি। সেখানে সশস্ত্র বিহারী এবং লুকিয়ে থাকা পাকিস্তানি সেনারা অবস্থান নিয়েছিল। মিরপুরকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে বাঙালি বাহিনীকে ১৯৭২ সালের ৩১শে জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এই অভিযানে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হানসহ বহু বাঙালি সেনা ও পুলিশ সদস্য বিহারীদের অতর্কিত গুলিতে শহীদ হন।

৩. সৈয়দপুরের শ্মশান ও ‘গোলাহাট গণহত্যা’

নীলফামারীর সৈয়দপুর ছিল আরেকটি বড় বিহারী এলাকা। এখানে ২৫শে মার্চের আগেই বিহারীরা মেতে উঠেছিল বাঙালি নিধনে।

২৫শে মার্চের রেলওয়ে ওয়ার্কশপ হত্যাকাণ্ড: ২৫শে মার্চ রাতে যখন ঢাকায় অপারেশন সার্চলাইট শুরু হয়, ঠিক একই সময়ে সৈয়দপুরের রেলওয়ে কারখানায় বিহারীরা বাঙালি শ্রমিক ও প্রকৌশলীদের জীবন্ত বয়লারের আগুনে পুড়িয়ে এবং লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে।

১৩ই জুনের ‘গোলাহাট গণহত্যা’: ১৯৭১ সালের ১৩ই জুন সৈয়দপুরের প্রায় ৪৫০ জন গণ্যমান্য বাঙালি হিন্দু পরিবারকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে ট্রেনে তোলা হয়। ট্রেনটি গোলাহাট নামক স্থানে পৌঁছালে বিহারীরা ট্রেন থামিয়ে রামদা এবং তলোয়ার দিয়ে কুপিয়ে শিশু ও নারীসহ ৪৩৭ জন বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এটি ছিল সরাসরি বিহারী বেসামরিক নাগরিকদের দ্বারা পরিচালিত একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যা।

মৃত্যুর পরিসংখ্যান

একটি নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় এই প্রশ্ন আসতেই পারে “একাত্তরের নয় মাসে বা ১৬ই ডিসেম্বরের পর কি কোনো বিহারী মারা যায়নি?”

এর উত্তর হলো অবশ্যই মারা গেছে। কিন্তু সেই মৃত্যুর চরিত্র, সংখ্যা এবং প্রেক্ষাপটকে পাকিস্তানি অপপ্রচারকারীরা সম্পূর্ণ বিকৃত করে উপস্থাপন করে। একাত্তরে যেসব বিহারী নিহত হয়েছিল, তাদের মৃত্যুর কারণ ও বাস্তব পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো:

তারা নিরীহ বেসামরিক নাগরিক ছিল না, ছিল ‘সশস্ত্র যোদ্ধা’

একাত্তরে নিহত হওয়া বিহারীদের প্রায় ১০০% কোনো নিরীহ বা নিরস্ত্র মানুষ ছিল না। তারা ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বেতনভুক্ত সশস্ত্র আধা-সামরিক বাহিনী (যেমন রাজাকার বা ইপিসিএএফ)-এর সক্রিয় সদস্য। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সম্মুখ সমরে লিপ্ত হওয়া মিলিশিয়া। বাঙালিদের বাড়িঘর দখল করতে গিয়ে পাল্টা প্রতিরোধের মুখে পড়া আক্রমণকারী।

আন্তর্জাতিক আইন এবং জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো সশস্ত্র যুদ্ধে যখন একপক্ষ অন্য সশস্ত্র পক্ষের সাথে লড়াইয়ে মারা যায়, তাকে কখনোই ‘গণহত্যা’ (Genocide) বলা যায় না। তা হলো যুদ্ধের স্বাভাবিক ক্ষয়ক্ষতি বা যুদ্ধকালীন মৃত্যু।

মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মাইনরিটি অ্যাট রিস্ক’ (MAR) প্রজেক্টের অকাট্য প্রমাণ

আমেরিকার বিখ্যাত মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় (University of Maryland) বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু ও তাদের ওপর হওয়া সহিংসতার ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা প্রজেক্ট পরিচালনা করে, যার নাম 'Minorities at Risk' (MAR)

এই নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রজেক্টটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে বিহারী জনগোষ্ঠীর ক্ষয়ক্ষতির ওপর গভীর অনুসন্ধান চালায়। তাদের গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফলে যা উঠে এসেছে, তা পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডাকারীদের গালে চপেটাঘাতের সমতুল্য:

"During the 1971 war in East Pakistan, approximately 1,000 Biharis were killed in clashes and retaliatory violence. The claim of hundreds of thousands of deaths is entirely unsubstantiated and politically motivated." - Minorities at Risk (MAR) Project, University of Maryland

কোথায় পাকিস্তানের দাবি করা ৫,০০,০০০ (পাঁচ লক্ষ), আর কোথায় আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে আসা ১,০০০ (এক হাজার)! এই এক হাজার মৃত্যুর ঘটনাও ছিল বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ এবং যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিজেদের অপরাধের কারণে হওয়া ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ, যা কোনো রাষ্ট্রীয় বা পদ্ধতিগত নিধনযজ্ঞ ছিল না।

পাকিস্তানি ও জামায়াতি অপপ্রচারের তুলনামূলক তথ্যচিত্র

নিচের ছকটি বিশ্লেষণ করলে খুব সহজেই বোঝা যায় যে, একাত্তরের আসল সত্যের বিপরীতে কীভাবে একটি সমান্তরাল মিথ্যা অপপ্রচার দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে:

বিষয়

পাকিস্তানি ও জামায়াত-শিবির চক্রের কাল্পনিক দাবি

ঐতিহাসিক দলিল ও আন্তর্জাতিক গবেষণার অকাট্য সত্য

বিহারী মৃত্যুর সংখ্যা

৫,০০,০০০ (পাঁচ লক্ষ) থেকে ১,০০,০০০ (এক লক্ষ)

প্রায় ১,০০০ (এক হাজার)—যার সিংহভাগই ছিল সশস্ত্র যুদ্ধে নিহত মিলিশিয়া। (উৎস: মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়)

ঘটনার প্রকৃতি

বাঙালিদের দ্বারা পরিচালিত পরিকল্পিত ‘জাতিগত গণহত্যা’।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে বিহারীদের সশস্ত্র হামলা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা প্রতিরোধ।

মূল প্রমাণ বা উৎস

১৯৭৪ সালে করাচি থেকে প্রকাশিত কুতুবউদ্দিন আজিজের প্রোপাগান্ডা বই 'Blood and Tears'।

সমসাময়িক কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে (BBC, New York Times, Time) কোনো প্রমাণ মেলেনি।

মার্চ ১-২৫ পরিস্থিতি

বাঙালিরা নাকি এই সময়ে লক্ষ লক্ষ বিহারীকে কেটে কুচি কুচি করেছে।

বাঙালিরা সম্পূর্ণ অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে লিপ্ত ছিল, বিহারীরাই উল্টো উস্কানি ও হামলা শুরু করে।

স্বাধীনতার পর অবস্থা

বাংলাদেশ সরকার নাকি স্বাধীন দেশে বিহারীদের পদ্ধতিগতভাবে হত্যা করেছে।

বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের উদ্যোগে বিহারীদের আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের অধীনে আইনি সুরক্ষা ও ক্যাম্পে থাকার ব্যবস্থা করা হয়।

দেশভাগের পর থেকে একাত্তর: যেভাবে তৈরি হয়েছিল ‘লয়ালিস্ট বাফার ক্লাস’

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারতের বিহার থেকে প্রায় ১০ থেকে ১৩ লক্ষ উর্দূভাষী মুসলমান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাড়ি জমায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই এদেরকে বাঙালিদের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক চাল হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।

প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক পক্ষপাতিত্ব: পাকিস্তানি শাসকেরা জানত যে বাঙালিরা সংখ্যায় বেশি এবং তাদের নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি টান প্রবল। তাই বাঙালিদের প্রতিহত করতে তারা বিহারীদের জন্য বিশেষ কিছু সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দেয়।

রেলওয়ে ও শিল্পকারখানায় আধিপত্য: তৎকালীন ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে (EBR), চটকল (যেমন আদমজী জুট মিল) এবং বড় বড় কারখানার গুরুত্বপূর্ণ পদে বিহারীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। বাঙালিদের জন্য সেখানে প্রবেশাধিকার ছিল অত্যন্ত সীমিত।

ভাষাভিত্তিক বিভাজন: উর্দূকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পেছনে বিহারী জনগোষ্ঠীর একটি প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল, কারণ তাদের মাতৃভাষাও ছিল উর্দূ। এই ভাষাগত নৈকট্য তাদের নিজেদেরকে বাঙালির চেয়ে ‘বেশি পাকিস্তানি’ মনে করতে প্ররোচিত করেছিল।

এই পরিকল্পিত বৈষম্যের ফলে বাঙালি ও বিহারীদের মধ্যে একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়, যা ১৯৭১ সালে এসে চূড়ান্ত রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়।

যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি (১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১)

একটি বড় মিথ্যা প্রচারণা রয়েছে যে, ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের পরপরই বাঙালিরা নাকি মেতে উঠেছিল উন্মত্ত প্রতিশোধে এবং লক্ষ লক্ষ বিহারীকে হত্যা করেছিল। কিন্তু প্রকৃত সত্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।

স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের কড়া নির্দেশনা: ১৯৭১ সালের ১৮ই ডিসেম্বর এবং পরবর্তীতে ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ সালে দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নির্দেশ দেন যে, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারবে না। তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন প্রবাসী সরকার এবং পরবর্তীতে মুজিবনগর প্রশাসন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভারতের মিত্রবাহিনী ও সদ্য গঠিত বাংলাদেশ পুলিশকে নির্দেশ দেয় যেন অ-বাঙালিদের বসতিগুলো (যেমন মিরপুর ও মোহাম্মদপুর) কড়া পাহারায় রাখা হয়।

বিক্ষিপ্ত প্রতিশোধ বনাম পদ্ধতিগত গণহত্যা: যেকোনো বড় যুদ্ধের পর দীর্ঘ ৯ মাসের তীব্র ক্ষোভ ও স্বজন হারানোর বেদনা থেকে কিছু বিক্ষিপ্ত প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনা (Mob Violence) ঘটেছিল যা পৃথিবীর সমস্ত যুদ্ধোত্তর ইতিহাসে (যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সে নাৎসি সহযোগীদের ওপর ফরাসীদের হামলা) দেখা যায়। কিন্তু সেগুলোকে কোনোভাবেই রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত বা সমাজ-পরিকল্পিত ‘গণহত্যা’ বলা চলে না।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাঙালিরা কেবল সেই সব বিহারীকে টার্গেট করেছিল যারা চিহ্নিত খুনি, লুণ্ঠনকারী বা আল-বদর বাহিনীর সরাসরি সদস্য ছিল। সাধারণ অ-বাঙালি নারীদের বা শিশুদের ওপর কোনো পরিকল্পিত আক্রমণের ঘটনা স্বাধীন বাংলাদেশে ঘটেনি।

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস (ICRC) এবং ‘জেনেভা ক্যাম্প’ প্রতিষ্ঠা

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন উদাহরণ বিরল যেখানে একটি সদ্য স্বাধীন হওয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র, তার ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যাকারী শত্রুদের প্রধান সহযোগীদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য আশ্রয় শিবিরের ব্যবস্থা করে। বাংলাদেশ সরকার ঠিক এই মানবিক কাজটিই করেছিল।

শিবিরের নিরাপত্তা ও রেশন সুবিধা: ১৬ই ডিসেম্বরের পর যখন অনেক বিহারী নিজেদের সুরক্ষার অভাব বোধ করছিল, তখন বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের (ICRC) সাথে যৌথভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৬৬টি ক্যাম্প বা আশ্রয় শিবির স্থাপন করে। এর মধ্যে বৃহত্তম হলো ঢাকার মোহাম্মদপুরের ‘জেনেভা ক্যাম্প’

সুরক্ষা: এই ক্যাম্পগুলোকে পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছিল যাতে বাইরের কোনো উত্তেজিত জনতা ভেতরে হামলা করতে না পারে।

বিনামূল্যে জমি ও বিদ্যুৎ: ক্যাম্পের ভেতরের বাসিন্দাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার জায়গা বরাদ্দ করে এবং দশকের পর দশক ধরে সেখানে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করে। একটি ‘হত্যাকারী’ বা ‘নিপীড়ক’ রাষ্ট্র কখনো তার চরম শত্রুদের এভাবে সরকারি খরচে লালন-পালন করে না।

পাকিস্তানের চরম দেউলিয়াত্ব ও ‘আটকে পড়া পাকিস্তানি’ বিতর্ক

বিহারী জনগোষ্ঠীর আজকের এই করুণ অবস্থার জন্য যদি কেউ ১০০% দায়ী থাকে, তবে তা হলো পাকিস্তান রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালের পর বিহারীরা নিজেদের ‘বাংলাদেশি’ পরিচয় দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং নিজেদের ‘আটকে পড়া পাকিস্তানি’ (Stranded Pakistanis) হিসেবে ঘোষণা করে। তারা পাকিস্তানের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আকুল আবেদন জানায়।

১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি (Tripartite Agreement): ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দীকে ক্ষমা করে পাকিস্তানে ফেরত পাঠায়। পাকিস্তান প্রতিশ্রুতি দেয় যে, বাংলাদেশে বসবাসরত যে সমস্ত অ-বাঙালি পাকিস্তানের নাগরিকত্ব বেছে নিয়েছে (প্রায় ৫,৩৯,০০০ জন), তাদের ধাপে ধাপে পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।

পাকিস্তানের ঐতিহাসিক প্রতারণা: চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান প্রথম দফায় মাত্র ১ লক্ষ ২০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ৭০ হাজার বিহারীকে তাদের দেশে ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু এরপরই তারা হঠাৎ করে এই প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। পাকিস্তানের তৎকালীন শাসকেরা অজুহাত দেখায় যে, বিহারীদের ফিরিয়ে নিলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও সামাজিক ভারসাম্যে (বিশেষ করে সিন্ধু প্রদেশে উর্দূভাষীদের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভের কারণে) আঘাত আসবে।

আজ পর্যন্ত পাকিস্তান তাদের নিজেদের প্রতি অনুগত থাকা এই সাচ্চা পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নেয়নি। যে রাষ্ট্র নিজের নাগরিকদের এভাবে রাস্তায় ফেলে চলে যায়, সেই রাষ্ট্রের মুখেই আবার ‘বিহারী গণহত্যা’র বানোয়াট কান্নাকাটি সবচেয়ে বড় পরিহাস।

২০০৮ সালের বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়

বাংলাদেশ সরকার বিহারীদের কেবল ক্যাম্পেই আটকে রাখেনি, বরং তাদের স্থায়ী পুনর্বাসন ও সাংবিধানিক অধিকার দেওয়ার জন্য আইনি লড়াই লড়েছে।

"Under Article 6 of the Constitution of Bangladesh, the members of the Urdu-speaking community living in the camps are citizens of Bangladesh and they are entitled to get National Identity Cards (NID) and voting rights." - Bangladesh High Court Verdict (Sadaqat Khan vs. Chief Election Commissioner, 2008)

রায় এবং এর প্রভাব: ২০০৮ সালের ১৮ই মে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ একটি ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে। ‘সদাকত খান বনাম প্রধান নির্বাচন কমিশনার’ মামলায় আদালত রায় দেয় যে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া বা ১৯৭১ সালের পর থেকে এ দেশে বসবাসরত সমস্ত উর্দূভাষী মানুষ বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক। তাদের অবিলম্বে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এই রায়ের পর থেকে প্রায় ৩ লক্ষেরও বেশি বিহারী বা উর্দূভাষী মানুষ বাংলাদেশের ভোটার হয়েছেন এবং দেশের সাধারণ নাগরিকদের মতো সমস্ত আইনি ও রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করছেন। এটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ একটি মানবিক, উদার এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যা কোনো নিধনযজ্ঞে বিশ্বাস করে না।

বিশ্ববিখ্যাত গবেষকদের মূল্যায়ন ও গবেষণামূলক তথ্যাদি

একাত্তরের প্রকৃত গণহত্যার খতিয়ান এবং বিহারী বিতর্কের সত্যতা বুঝতে বিশ্বখ্যাত বেশ কয়েকজন ইতিহাসবিদ ও গবেষকের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে:

আর. জে. রুমেল (R. J. Rummel) – 'Death by Government'

আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং গবেষক আর. জে. রুমেল তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, একাত্তরে সংঘটিত হওয়া সহিংসতাকে কোনোভাবেই ‘পারস্পরিক দাঙ্গা’ বলা যায় না। এটি ছিল একটি একতরফা ‘স্টেট-স্পন্সরড ডেমোসাইড’ (Democide) বা রাষ্ট্রীয় গণহত্যা, যা পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালিদের ওপর চালিয়েছিল। বিহারীদের মৃত্যু ছিল এই যুদ্ধের একটি অতি ক্ষুদ্র ও আনুষঙ্গিক অংশ।

অ্যান্থনি মাসকারেনহাস (Antony Mascarenhas) – 'The Rape of Bangla Desh'

পাকিস্তানি এই সাহসী সাংবাদিক একাত্তরে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাস্তব চিত্র সশরীরে প্রত্যক্ষ করে লন্ডনের Sunday Times-এ প্রথম গণহত্যার খবর ফাঁস করেছিলেন। তিনি তাঁর বইতে বিস্তারিত দেখিয়েছেন কীভাবে বিহারী যুবকদের অস্ত্র দিয়ে বাঙালিদের বাড়িঘর লুটপাট ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

বিহারী জনগোষ্ঠী ও একাত্তরের কিছু মূল ঘটনাপ্রবাহ (টাইমলাইন)

নিচের টাইমলাইনটির মাধ্যমে একাত্তর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিহারী সংকটের একটি সামগ্রিক চিত্র সহজে বোঝা সম্ভব:

[১৯৪৭] ভারত থেকে বিপুল সংখ্যক উর্দূভাষী বিহারীর পূর্ব পাকিস্তানে আগমন।

[১৯৫২-১৯৭০] পাকিস্তানি শাসকদের প্রচ্ছায়ায় বিহারীদের একটি সুবিধাভোগী শ্রেণী হিসেবে উত্থান।

[মার্চ ১৯৭১] অসহযোগ আন্দোলনের সময় বিহারীদের উস্কানিমূলক তৎপরতা ও বাঙালিদের ওপর হামলা।

[মার্চ-ডিসেম্বর ১৯৭১] রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশজুড়ে বাঙালি হত্যা ও নারী নির্যাতন।

[ডিসেম্বর ১৯৭১] পাকিস্তানের পরাজয়। বাংলাদেশ সরকার ও রেড ক্রসের উদ্যোগে বিহারীদের রক্ষায় আশ্রয় শিবির স্থাপন।

[১৯৭৪] ত্রিপক্ষীয় চুক্তি। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে তাদের অনুগত বিহারীদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি ও প্রতারণা।

[২০০৮] বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়। ক্যাম্পের বিহারীদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার প্রদান।

যুদ্ধাপরাধকে ঢাকার নোংরা খেলা

প্রশ্ন জাগতে পারে, একাত্তরের এত বছর পর কেন হঠাৎ করে এই ‘বিহারী গণহত্যা’র গান নতুন করে গাওয়া হচ্ছে? এর পেছনে রয়েছে একটি গভীর রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক আইনি চক্রান্ত।

"The narrative of Bihari genocide is a manufactured equivalent to dilute the gravity of the Pakistani Army's war crimes."

‘মোরাল ইকুইভ্যালেন্স’ বা সমকক্ষতা সৃষ্টির অপচেষ্টা

আন্তর্জাতিক আইনি পরিভাষায় একটি শব্দ আছে ‘মোরাল ইকুইভ্যালেন্স’ (Moral Equivalence)। এর অর্থ হলো, অপরাধের তীব্রতা কমিয়ে দেওয়া। পাকিস্তান এবং তাদের এদেশীয় দোসর জামায়াত-বিএনপি চক্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি প্রমাণ করতে চায় যে, একাত্তরে কেবল পাকিস্তানিরা অপরাধ করেনি, বাঙালিরাও সমান অপরাধ করেছে।

তারা বলতে চায়, "যদি আমরা (পাকিস্তানিরা) বাঙালি মেরে থাকি, তবে বাঙালিরাও তো বিহারী মেরেছে। সুতরাং, এটি কোনো একতরফা গণহত্যা ছিল না, এটি ছিল একটি গৃহযুদ্ধ (Civil War)।" এই তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে একাত্তরের ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের ঋণকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া সম্ভব হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT)-কে বিতর্কিত করা

২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশে যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অধীনে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের (যেমন কাদের মোল্লা, আলী আহসান মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী) বিচার শুরু হয় এবং তাদের ফাঁসি কার্যকর হতে থাকে, তখন পাকিস্তান সরকার এবং জামায়াতের আন্তর্জাতিক উইং প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

তারা লন্ডন, ওয়াশিংটন ও জেনেভায় লাখ লাখ ডলার খরচ করে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করে। এই লবিস্টদের প্রধান কাজই হলো জাতিসংঘের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাকে ভুল বুঝিয়ে এই রিপোর্ট দেওয়া যে, বাংলাদেশে একতরফা বিচার হচ্ছে এবং বাঙালিরা যে বিহারীদের ওপর ‘গণহত্যা’ চালিয়েছিল, তার কোনো বিচার হচ্ছে না। এটি ছিল যুদ্ধাপরাধের ট্রায়ালকে বাধাগ্রস্ত করার একটি প্রধান আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র।

নব্য প্রজন্মের মগজ ধোলাই

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (Facebook, YouTube, X) ব্যবহার করে এই পরাজিত শক্তি এখন নতুন প্রজন্মের তরুণদের সামনে চমৎকার সব গ্রাফিক্স ও ইংরেজি ভিডিও বানিয়ে এই মিথ্যাটি পরিবেশন করছে। যারা একাত্তর দেখেনি, সেই সব তরুণদের মনে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে একটি নেতিবাচক ও কলঙ্কিত ধারণা তৈরি করাই এদের মূল লক্ষ্য।

সত্যের জয় ও আমাদের করণীয়

ইতিহাসের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, একে সাময়িকভাবে চেপে রাখা গেলেও চিরতরে মুছে ফেলা যায় না। একাত্তরে বিহারী জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ যে বাঙালির বুকে ছুরি চালিয়েছিল, রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়ে গণহত্যা-ধর্ষণের হোলিখেলায় মেতে উঠেছিল এবং পরবর্তীতে নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে ‘ভিকটিম’ বা শিকারের কার্ড খেলছে তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

‘বিহারী গণহত্যা’র এই কাল্পনিক ৫ লক্ষের ফানুসটি মূলত মিথ্যাচার, রাজনৈতিক চাতুর্য এবং পাকিস্তানের পরাজয়ের গ্লানি ঢাকার একটি মরিয়া চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। তথ্য ও প্রমাণ বলে, বাঙালি জাতি কখনো কোনো নিরস্ত্র বা নিরীহ মানুষের ওপর পদ্ধতিগত গণহত্যা চালায়নি। বাঙালি লড়াই করেছিল নিজের স্বাধীনতার জন্য, নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য।

আজকের এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আমাদের দায়িত্ব হলো এই সব কুৎসিত প্রোপাগান্ডা ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে তথ্যের হাতিয়ার নিয়ে রুখে দাঁড়ানো। আমাদের উচিত আন্তর্জাতিক মহলে একাত্তরের প্রকৃত গণহত্যার পক্ষে আরও বেশি বৈজ্ঞানিক ও তথ্যভিত্তিক তথ্যচিত্র এবং আর্টিকেল প্রকাশ করা।

নতুন প্রজন্মের কাছে মিরপুর, সৈয়দপুর বা পাহাড়তলীর বধ্যভূমিগুলোর প্রকৃত ইতিহাস এবং সেখানে বিহারীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াকে কোনো প্রকার আন্তর্জাতিক চাপের মুখে নতি স্বীকার না করে অব্যাহত রাখা এবং এর যৌক্তিকতা বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা।

একাত্তরের ইতিহাস কোনো সাধারণ বিজয়ের গল্প নয়; এটি ছিল পাশবিকতার বিরুদ্ধে মানবতার, মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের এবং শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার এক চিরন্তন মহাকাব্য। এই মহাকাব্যকে কলঙ্কিত করার যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দেওয়াই হোক স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র অঙ্গীকার।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Aug 9, 2026

/

Post by

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সামাজিক নৃবিজ্ঞান এবং জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের আলোচনায় ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation) একটি সর্বজনস্বীকৃত ধারণা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজস্ব ইতিহাস, সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং জাতীয় সত্তা গঠনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী নেতৃত্বকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ভাষাগত পরিচয়। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক মাধ্যমে, বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় এবং কোনো কোনো বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ‘জাতির পিতা’ ধারণাটি নিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের অবতারণা হতে দেখা যায়।

Aug 9, 2026

/

Post by

গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রধানত তিন ধরনের দলীয় ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় একদলীয় (যেখানে বিরোধী মতের অবকাশ থাকে না), দ্বিদলীয় (যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যগত ব্যবস্থা) এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর রাষ্ট্র। এই ধরনের বহুদলীয় রাজনীতিতে একটি দল এককভাবে জনগণের সম্পূর্ণ সমর্থনের ওপর ভর করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া কিংবা স্থায়ী রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এখানেই আবির্ভূত হয় 'জোট রাজনীতি' বা Coalition Politics-এর ধারণা।

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.