>

>

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ - পাকিস্তান ফেরত সেনা কর্মকর্তা থেকে স্বৈরাচার ও গণ-অভ্যুত্থানে পতন

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ - পাকিস্তান ফেরত সেনা কর্মকর্তা থেকে স্বৈরাচার ও গণ-অভ্যুত্থানে পতন

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের পথপরিক্রমায় যেসব সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গভীর এবং বিতর্কিত দাগ রেখে গেছেন, তাঁদের মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের ৯ম রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ (১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০ – ১৪ জুলাই ২০১৯) অন্যতম। স্বাধীনতার রক্তক্ষয়ী সূচনালগ্নের ঠিক এক দশকের মাথায় ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ রক্তপাতহীন এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্ষমতা দখল করেছিলেন তিনি। পরবর্তী নয় বছর (১৯৮২ – ১৯৯০) ধরে তাঁর পরিচালিত শাসনব্যবস্থা কেবল সামরিক শাসনের তকমাই পায়নি, বরং বাংলাদেশের সংবিধান, প্রশাসনিক কাঠামো, সামাজিক ব্যবস্থা এবং রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী ও স্থায়িত্বশীল পরিবর্তন এনেছিল।

TruthBangla

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ - পাকিস্তান ফেরত সেনা কর্মকর্তা থেকে স্বৈরাচার ও গণ-অভ্যুত্থানে পতন

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের পথপরিক্রমায় যেসব সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গভীর এবং বিতর্কিত দাগ রেখে গেছেন, তাঁদের মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের ৯ম রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ (১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০ – ১৪ জুলাই ২০১৯) অন্যতম। স্বাধীনতার রক্তক্ষয়ী সূচনালগ্নের ঠিক এক দশকের মাথায় ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ রক্তপাতহীন এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্ষমতা দখল করেছিলেন তিনি। পরবর্তী নয় বছর (১৯৮২ – ১৯৯০) ধরে তাঁর পরিচালিত শাসনব্যবস্থা কেবল সামরিক শাসনের তকমাই পায়নি, বরং বাংলাদেশের সংবিধান, প্রশাসনিক কাঠামো, সামাজিক ব্যবস্থা এবং রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী ও স্থায়িত্বশীল পরিবর্তন এনেছিল।

পাকিস্তানি সামরিক কাঠামো থেকে ফিরে আসা এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কীভাবে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ পদে আরোহণ করলেন, কীভাবে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধানকে উৎখাত করে ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত হলেন, এবং কীভাবে নয় বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পর রক্তক্ষয়ী গণ-আন্দোলনের মুখে সেনাবাহিনীর নিজস্ব সমর্থনে ফাটল ধরে পদত্যাগে বাধ্য হলেন এই পুরো ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনীতি বিশ্লেষণের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

সামরিক ক্যারিয়ার ও মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা (১৯৩০ - ১৯৭৫)

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৩০ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কুচবিহার জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার পরবর্তীতে রংপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা রংপুরে শেষ করার পর তিনি ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন ও পদোন্নতি: ১৯৫২ সালে এরশাদ পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে (কাকুল) কমিশন লাভ করেন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে তাঁর নিয়মিত সামরিক জীবন শুরু করেন। ১৯৬০-এর দশকে তিনি একাধিক পদাতিক ব্যাটালিয়নে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৬৯ সালে তাঁকে ৫৪তম পদাতিক ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে শিয়ালকোটে পদায়ন করা হয়।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও রহস্যময় নিষ্ক্রিয়তা: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী যখন বাঙালি নিধনে 'অপারেশন সার্চলাইট' শুরু করে এবং বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ সূচনা হয়, তখন এরশাদ ছুটিতে রংপুরে অবস্থান করছিলেন। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর সামনে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ থাকলেও তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি। বরং রহস্যজনকভাবে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যান এবং সেখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়মিত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এবং যুদ্ধপরবর্তী সময়ে আটকে পড়া অন্যান্য বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের মতোই তিনি পাকিস্তানে অবস্থান করেন। ১৯৭৩ সালে ভারত ও পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের বন্দি বিনিময় চুক্তির পর আটকে পড়া বাঙালি কর্মকর্তারা দেশে ফিরে এলে এরশাদও বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও আগ্রা ডিপ্লোম্যাসি (১৯৭৫): দেশে ফেরার পর মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ না নিলেও প্রথাগত সামরিক জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার কারণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল (Adjutant General) পদে পদায়ন করা হয় এরশাদকে। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে যখন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়, সে সময় লে. কর্নেল/ব্রিগেডিয়ার এরশাদ ভারতের আগ্রায় 'ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ' (NDC)-এ উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণে অবস্থান করছিলেন।

বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর রাজনৈতিক দৃশ্যপটের যে পটপরিবর্তন ঘটে, তা এরশাদের সামরিক ক্যারিয়ারকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতার শীর্ষে উঠে এলে তিনি পাকিস্তান-ফেরত কর্মকর্তাদের সমন্বয় ও সামরিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। এই প্রক্রিয়ায় এরশাদকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান (Deputy Chief of Army Staff) হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়।

জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড ও ক্ষমতা দখলের প্রেক্ষাপট (১৯৮১ - ১৯৮২)

মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এরশাদের ওপর গভীর আস্থা রেখেছিলেন। ১৯৭৮ সালে এরশাদকে পদোন্নতি দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধান (Chief of Army Staff) নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে সেনাবাহিনীতে ক্ষমতার নতুন সমীকরণ তৈরি হয়।

বিচারপতি সাত্তারের দুর্বল সরকার ও এরশাদের বাসনা

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তৎকালীন উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন এবং পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের নভেম্বর মাসের গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন। কিন্তু সামরিক বাহিনীর ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ছিল দুর্বল। সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ অত্যন্ত ধীরগতিতে ও পরিকল্পনা অনুসারে নিজের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে শুরু করেন।

তিনি তৎকালীন সংবাদপত্র ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে দাবি করতে শুরু করেন যে বাংলাদেশে কেবল ব্যারাকে বসে থাকা সেনাবাহিনীর কাজ নয়; বরং দেশের রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক প্রশাসনে সেনাবাহিনীর একটি "সাংবিধানিক অংশীদারিত্ব" (National Security Council বা রাজনৈতিক ক্ষমতা) থাকা আবশ্যক।

ফেব্রুয়ারি ১৯৮২: রাষ্ট্রপতির ওপর প্রকাশ্যে চাপ সৃষ্টি

সাত্তার সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক সংকটের অভিযোগ তৎকালীন সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হতে থাকে। ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এরশাদ বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে সরাসরি হুমকি ও চাপ প্রদান করেন। তিনি মন্ত্রিসভার আকার ছোট করা, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের বাদ দেওয়া এবং সেনাবাহিনী মনোনীত সামরিক প্রতিনিধিদের সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন। প্রশাসনিকভাবে কোণঠাসা সাত্তার সরকার সেনাপ্রধানের চাপের মুখে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়।

২৪শে মার্চ ১৯৮২: রক্তপাতহীন ক্যু ও সামরিক আইন জারি

১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ ভোরে এরশাদ একটি সংক্ষিপ্ত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে পদচ্যুত করেন। কোনো প্রকার রক্তপাত ছাড়াই পুরো বঙ্গভবন ও শাসনকাঠামো সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

সামরিক আইন জারি: সংবিধান স্থগিত করা হয় এবং পুরো দেশে সামরিক আইন (Martial Law) জারি করা হয়।

প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (CMLA): এরশাদ নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ঘোষণা করেন এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের পদ গ্রহণ করেন।

পুতুল রাষ্ট্রপতি: বিশ্ববাসীকে গণতন্ত্রের আবহ দেখানোর জন্য ২৭শে মার্চ ১৯৮২ তারিখে বিচারপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধিষ্ঠিত করা হয়। তবে প্রকৃত সকল নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত ছিল প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল এরশাদের হাতে।

প্রশাসনিক সংস্কার, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা ও উপজেলা ব্যবস্থা (১৯৮৩ - ১৯৮৮)

১১ই ডিসেম্বর ১৯৮৩ তারিখে এরশাদ রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে নিজেই আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর ৮ বছরের শাসনকালে তিনি কিছু প্রশাসনিক কাঠামোগত পরিবর্তন আনেন, যা আধুনিক বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ও সাংবিধানিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।

উপজেলা ব্যবস্থার উদ্ভাবন ও স্থানীয় নির্বাচন

এরশাদ সরকারের সবচেয়ে আলোচিত ও স্থায়ী নীতিগত অর্জন ছিল 'উপজেলা পরিষদ' ব্যবস্থার উন্মোচন। ক্ষমতা ও প্রশাসনিক সুবিধা রাজধানীর কেন্দ্রীভূত কাঠামো থেকে গ্রামের সাধারণ মানুষের দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৮২ সালে 'প্রশাসনিক সংস্কার ও পুনর্গঠন কমিটি' গঠন করা হয়।

এর ভিত্তিতে ১৯৮৫ সালে দেশে প্রথমবারের মতো 'উপজেলা পরিষদ' গঠন করা হয় এবং প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যদিও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এই নির্বাচনকে সামরিক শাসনের বৈধতা দেওয়ার চক্রান্ত বলে বর্জন করেছিল, তবুও স্থানীয় উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং আমলাতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে এই উপজেলা পদ্ধতি বাংলাদেশে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল।

সংবিধানের ৮ম সংশোধনী ও 'রাষ্ট্রধর্ম' ঘোষণা (১৯৮৮)

নিজের অগণতান্ত্রিক শাসনকে ধর্মীয় জনপ্রিয়তা ও গ্রামীণ সামাজিক সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রাখার কৌশলের অংশ হিসেবে এরশাদ ১৯৮৮ সালে সংবিধানের ৮ম সংশোধনী বিল পাস করেন। এই সংশোধনীর সবচেয়ে বিতর্কিত ও উল্লেখযোগ্য দিক ছিল:

ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি: অনুচ্ছেদ ২এ সংযোজন করে ইসলামকে বাংলাদেশের ‘রাষ্ট্রধর্ম’ (State Religion) হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

আদালত বিকেন্দ্রীকরণ: হাইকোর্ট বিভাগের ৬টি স্থায়ী বেঞ্চ ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগে (রংপুর, যশোর, কুমিল্লা, সিলেট, বরিশাল, চট্টগ্রাম) স্থানান্তরের পদক্ষেপ নেওয়া হয় (যদিও পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট এটি বাতিল করেন)।

পরিকাঠামো ও যমুনা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর

এরশাদের আমলে যমুনা নদীর ওপর বহুমুখী সেতু (বর্তমান বঙ্গবন্ধু সেতু) নির্মাণের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। ১৯৮৫ সালে 'যমুনা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষ' গঠিত হয় এবং সারচার্জ আদায় শুরু হয়, যা পরবর্তীতে দেশের অর্থনৈতিক ও পরিবহন যোগাযোগে বৈপ্লবিক মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

জাতীয় পার্টি গঠন ও বিতর্কিত সাধারণ নির্বাচনসমূহ (১৯৮৬ ও ১৯৮৮)

নিজের সামরিক শাসনকে বেসামরিক ও রাজনৈতিক রূপ দিতে এরশাদ সামরিক পোশাকে থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করেন। তিনি প্রথমে 'জনদল' এবং পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালের ১লা জানুয়ারি 'জাতীয় পার্টি' (Jatiya Party) নামে নিজের রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করান।

১৯৮৬ সালের সাধারণ নির্বাচন ও বিএনপি-আওয়ামী লীগ বিতর্ক

১৯৮৬ সালের ৭ই মে ৩য় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক বিতর্কিত অধ্যায়:

বিএনপির বয়কট: বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এই নির্বাচনকে 'সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার চক্রান্ত' আখ্যা দিয়ে কঠোরভাবে বয়কট করে।

আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ: শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সিপিবি এবং জামায়াতে ইসলামী এই নির্বাচনে অংশ নেয়।

ফলাফল: জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসন নিয়ে বিজয়ী হয় এবং আওয়ামী লীগ ৭৬টি আসন পেয়ে বিরোধী দলের ভূমিকায় বসে। তবে ব্যাপক অনিয়ম ও মিডিয়া কুপে (Media Coup)-এর অভিযোগ ওঠার কারণে ৭ই ডিসেম্বর ১৯৮৭ সালে বিরোধী আন্দোলনের মুখে এই সংসদ বাতিল করতে বাধ্য হন এরশাদ।

১৯৮৬ সালের বিতর্কিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

সংসদ নির্বাচনের পর নিজের রাষ্ট্রপতি পদের সামরিক তকমা ঘোচাতে ১৯৮৬ সালের ১৫ই অক্টোবর এরশাদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আয়োজন করেন। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এই নির্বাচন বর্জন করলেও এরশাদ প্রথাগত কিছু প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নির্বাচনটি সম্পন্ন করেন।

১৯৮৬ সালের ১৫ই অক্টোবর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা

১৯৮৬ সালের ১৫ই অক্টোবর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের ৩য় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ১৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। বাছাই পর্বে কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়নি। পরবর্তীতে ৪ জন প্রার্থী স্বেচ্ছায় প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেওয়ায় চূড়ান্ত ভোটযুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ জন। নিচে তাঁদের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ছক আকারে তুলে ধরা হলো:

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নাম

রাজনৈতিক পরিচয় / পেশাগত পটভূমি

সংগৃহীত ভোট সংখ্যা

শতকরা হার (%)

লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

জাতীয় পার্টি (তৎকালীন সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি)

২,১৭,৯৫,৩৩৭

৮৪.১২%

মওলানা মোহাম্মদুল্লাহ (হাফেজ্জী হুজুর)

খেলাফত আন্দোলন (বিশিষ্ট প্রবীণ আলেম)

১৫,১০,৪৪১

৫.৮৩%

Lieutenant Colonel (Retd.) Syed Farook Rahman

ফ্রিডম পার্টি (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের আত্মস্বীকৃত খুনি)

১২,১৫,৩৫৮

৪.৬৯%

আলহাজ্ব মোটর অব. আফসার উদ্দিন

স্বতন্ত্র / সাবেক সামরিক কর্মকর্তা

৩,৬১,৪৭৪

১.৩৯%

মোহাম্মদ খলিলুর রহমান মজুমদার

স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব

১,৪৯,৩৯৬

০.৫৭%

মোহাম্মদ আনছার আলী

রাজনৈতিক কর্মী

১,৪২,৩০০

০.৫৫%

অলিউল ইসলাম চৌধুরী (সুক্কু মিয়া)

স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি

১,০২,৫৮৪

০.৪০%

আলহাজ্ব মাওলানা খায়রুল ইসলাম যশোরী

প্রবীণ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব

৮৫,৩৮২

০.৩৩%

স্কোয়াড্রন লিডার (অব.) মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী

সাবেক বিমান বাহিনী কর্মকর্তা

৮৪,৬৯৪

০.৩৩%

সৈয়দ মুনিরুল হুদা চৌধুরী

স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব

৬৮,৭৮৯

০.২৬%

মোঃ আব্দুস সামাদ

স্বতন্ত্র প্রার্থী

৩৭,৭৮৮

০.১৫%

মোঃ জহির খান

স্বতন্ত্র প্রার্থী

১৬,১০৫

০.০৬%

(তথ্যসূত্র: নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ, ১৯৮৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সরকারি গেজেট)

এই নির্বাচনে এরশাদ বিজয়ী হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন, তবে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বর্জনের কারণে এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রশ্ন ওঠে।

১৯৮৮ সালের ৩রা মার্চের নির্বাচন: 'গৃহপালিত বিরোধী দল'

১৯৮৭ সালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একত্রিত হয়ে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে তুললে এরশাদ সংসদ ভেঙে দেন। এরপর ১৯৮৮ সালের ৩রা মার্চ ৪র্থ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবার আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ দেশের প্রধান সব রাজনৈতিক দল একজোট হয়ে নির্বাচন বয়কট করে।

এরশাদ আন্দোলন প্রতিহত করতে আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে কিছু ছোট ছোট দলকে একত্র করে 'সম্মিলিত বিরোধী দল' (COP) গঠন করান, যাকে তৎকালীন রাজনীতিক ও সংবাদমাধ্যম হাস্যরস করে ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ নামে অভিহিত করেছিল। এই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসনে জয়লাভ করে একক প্রভাব বিস্তার করে।

গণ-আন্দোলন, নূর হোসেন ও ডা. মিলন হত্যা (১৯৮৭ - ১৯৯০)

১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৮৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি মজিদ খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্র সংগ্রামে রক্তপাতের মধ্য দিয়ে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে স্বৈরাচার হটাতে রাজপথের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৮-দলীয় জোট, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৭-দলীয় জোট এবং ৫-দলীয় বাম জোট একযোগে রাজপথে নামে। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ নির্বাচনের যৌথ রূপরেখা ঘোষণার মাধ্যমে আন্দোলন পূর্ণাঙ্গ গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিতে শুরু করে।

শহীদ নূর হোসেন ও ১০ই নভেম্বরের 'ঢাকা অবরোধ'

১৯৮৭ সালের ১০ই নভেম্বর বিরোধী জোটগুলোর ডাকা 'ঢাকা অবরোধ' কর্মসূচিতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন অভূতপূর্ব গতি পায়। এই দিন যুবলীগ কর্মী নূর হোসেন তাঁর খালি গায়ে সাদা রঙে বুকে 'গণতন্ত্র মুক্তি পাক' এবং পিঠে 'স্বৈরাচার নিপাত যাক' লিখে মিছিলের অগ্রভাগে জিরো পয়েন্টে (বর্তমান নূর হোসেন স্কয়ার) উপস্থিত হন। পুলিশের গুলিতে নূর হোসেন, নুরুল হুদা বাবুল ও আমিনুল হুদা টিটো শহীদ হন। নূর হোসেনের জীবন্ত পোস্টার রূপী আত্মত্যাগ সারাদেশের মানুষকে রাজপথে নামিয়ে আনে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এরশাদ সরকার ২৭শে নভেম্বর জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেয়, কিন্তু আন্দোলন থামানো যায়নি।

শহীদ ডা. মিলন ও ২৭শে নভেম্বর ১৯৯০

১৯৯০ সালের অক্টোবরে আন্দোলনের গতি ত্বরান্বিত করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২টি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে 'সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য' গঠিত হয়। একই সাথে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), শিক্ষক সমিতি ও আইনজীবী সমিতিসহ পেশাজীবী সংগঠনগুলো আন্দোলনে পূর্ণ সমর্থন দেয়। ১৯৯০ সালের ২৭শে নভেম্বর বিএমএ-র তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডা. সামসুল আলম মিলন রিকশাযোগে একটি সভা শেষে ফেরার পথে টিএসসি এলাকায় সরকারের সশস্ত্র ক্যাডারদের গুলিতে নিহত হন।

সান্ধ্য আইন অমান্য ও স্বৈরাচারের চূড়ান্ত পতন

ডা. মিলনের হত্যাকাণ্ডের খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে দেশের সাধারণ জনগণ, পেশাজীবী, শিক্ষক, শ্রমিক ও সর্বস্তরের মানুষ একযোগে রাজপথে নেমে আসে। সরকার সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি করলেও বিপুল জনতার বাঁধভাঙা জোয়ারের কাছে তা ব্যর্থ হয়। তৎকালীন সরকারি কর্মকর্তা, বিটিভি ও রেডিওর সংবাদকর্মী এবং চিকিৎসকরা কর্মবিরতি ও পদত্যাগের ঘোষণা দেন। দেশের সংকটময় মুহূর্তে সেনাবাহিনীও সাধারণ জনতার ওপর বলপ্রয়োগ করতে অপারগতা প্রকাশ করে। চূড়ান্ত গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৪ই ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং ৬ই ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হন।

সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষ অবস্থান ও ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ

১৯৯০ সালের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনবিরোধী আন্দোলন যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন তিনি নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় সামরিক বাহিনীকে ব্যবহারের শেষ চেষ্টা চালিয়েছিলেন। ১৯৮২ সালে রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা এরশাদ ভেবেছিলেন সশস্ত্র বাহিনী যথারীতি তাঁর পেছনে থাকবে।

কিন্তু ২৭শে নভেম্বর ডাকসু ভবনের কাছে ডা. সামসুল আলম খান মিলন শহীদ হওয়ার পর আন্দোলন দমানোর জন্য ঘোষিত জরুরি অবস্থা ও সান্ধ্য আইন সাধারণ জনগণ সম্পূর্ণ অমান্য করে রাজপথে নেমে আসে। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য এবং প্রধান রাজনৈতিক জোটগুলোর (৮ দল, ৭ দল ও ৫ দল) ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মুখে সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষ অবস্থান এরশাদের নয় বছরের একচ্ছত্র শাসনের পতন ত্বরান্বিত করে।

১লা ডিসেম্বর ১৯৯০: সেনাসদরের বিশেষ বৈঠক

জরুরি অবস্থা সত্ত্বেও রাজপথে জনতার ঢল সামলাতে ব্যর্থ হয়ে সরকার যখন সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছিল, তখন ১৯৯০ সালের ১লা ডিসেম্বর ঢাকা সেনানিবাসে সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূর উদ্দিন খানের নেতৃত্বে ঊর্ধ্বতন সেনাকর্মকর্তাদের এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ব্রিগেড কমান্ডার ও মধ্যম সারির তরুণ কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানান যে, জনগণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেনা সদস্যদের রক্তপাতে জড়ানো অনুচিত হবে।

সভায় সেনাকর্মকর্তারা উপলব্ধি করেন যে, চলমান অস্থিতিশীলতা কোনো সাধারণ আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়, বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক সংকট। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয় এবং রাজপথে নেমে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালিয়ে সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার কোনো দায় তারা নেবেন না। এই বৈঠকের মূল সিদ্ধান্ত ছিল সেনাবাহিনী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াইয়ে কোনো পক্ষ নেবে না, সান্ধ্য আইন কঠোরভাবে বলবৎ করবে না এবং সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ এড়াতে পেশাদার নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে।

সেনাকর্মকর্তারা একমত হন যে:

"চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি একটি রাজনৈতিক সংকট। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। সেনাসদস্যদের রাজপথে নামিয়ে জনগণের ওপর গুলি চালানোর কোনো দায়িত্ব সেনাবাহিনী নেবে না।"

৩রা ডিসেম্বর ১৯৯০: সেনাপ্রধানের চূড়ান্ত বার্তা

পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় এবং ৪ঠা ডিসেম্বরের জন্য প্রধান রাজনৈতিক জোটগুলোর ডাকা ‘ঢাকা ঘেরাও’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্ট এরশাদ সেনাসদরের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। ৩রা ডিসেম্বর সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূর উদ্দিন খান বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি এরশাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন।

সেনাপ্রধান রাষ্ট্রপতিকে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ মনোভাব সম্পর্কে সরাসরি অবহিত করেন এবং স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে পদাতিক বাহিনী ও তরুণ সেনা কর্মকর্তারা কোনো ধরনের অরাজনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ কিংবা সান্ধ্য আইন বলবৎ করতে জনগণের ওপর বলপ্রয়োগের দায়িত্ব নিতে রাজি নন। সেনাপ্রধানের এই বার্তা এরশাদের জন্য ছিল সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ধাক্কা, কারণ এর মাধ্যমে তিনি তাঁর ক্ষমতার প্রধান ক্ষমতার উৎস বা ক্ষমতার মূল ভিত্তি সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থন আনুষ্ঠানিকভাবে হারিয়ে ফেলেন।

৪ঠা ডিসেম্বর ১৯৯০: সিজিএস-এর বার্তা ও পদত্যাগের ঘোষণা

৪ঠা ডিসেম্বর সকালে সান্ধ্য আইন উপেক্ষা করে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেশাজীবী ও সর্বস্তরের মানুষের রাজপথ দখলের ফলে প্রশাসনিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দুপুরবেলা চিফ অব জেনারেল স্টাফ (CGS) মেজর জেনারেল আব্দুস সালাম সেনাসদরের পক্ষ থেকে সরাসরি এরশাদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং অহেতুক রক্তপাত এড়াতে অবিলম্বে পদত্যাগের পরামর্শ দেন।

একই সাথে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকেও রিপোর্ট দেওয়া হয় যে রাজপথের পরিস্থিতি আর সেনা প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। চতুর্মুখী সামাজিক চাপ, পেশাজীবীদের কর্মবিরতি, রাজপথে সর্বাত্মক গণজোয়ার এবং সেনাবাহিনীর সুনির্দিষ্ট নিরপেক্ষ অবস্থানের বাস্তবতা অনুধাবন করে ৪ঠা ডিসেম্বর রাতে এরশাদ পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। রাত ৮টার পর বাংলাদেশ বেতার ও টিভিতে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক জরুরি ভাষণে এরশাদ আন্দোলনরত দলগুলোর রূপরেখা অনুযায়ী রূপরেখা মেনে পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ উন্মুক্ত হয়।

৬ই ডিসেম্বর ১৯৯০: ক্ষমতা হস্তান্তর ও 'গণতন্ত্র মুক্তি দিবস'

১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর। ১৯৮৭ সালের নূর হোসেনের আত্মত্যাগ থেকে শুরু করে ১৯৯০ সালের ২৭শে নভেম্বর চিকিৎসক নেতা ডা. শামসুল আলম খান মিলনের হত্যাকাণ্ডের পর আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, সম্মিলিত শিক্ষক সমাজ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর লাগাতার ধর্মঘট ও অসহযোগ আন্দোলনে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র অচল হয়ে পড়ে। তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নুরুদ্দীন খান সান্ধ্য আইন প্রয়োগ ও আন্দোলন দমনে সামরিক বাহিনী ব্যবহারে অনিচ্ছা প্রকাশ করলে এরশাদ রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সম্পূর্ণ একঘরে হয়ে পড়েন।

তিন রাজনৈতিক জোটের (৮ দল, ৭ দল ও ৫ দল) সর্বসম্মত রূপরেখার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হন তিনি। সংবিধানের ধারা বজায় রাখতে প্রথমে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং এরপর এরশাদ পদত্যাগ করলে সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

ক্ষমতা হস্তান্তর, গ্রেপ্তার, বিচার ও কারাবাস

ক্ষমতা হস্তান্তরের পরপরই ৬ই ডিসেম্বর এরশাদকে তোপখানা রোডের সুসংরক্ষিত গুলমেহের ভবনে অন্তরীণ করা হয় এবং পরবর্তীতে ১২ই ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র রাখা, জনতা টাওয়ার দুর্নীতি মামলা, রাডার কেনাকাটায় অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের একাধিক মামলা দায়ের করা হয়।

বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র ও জনতা টাওয়ার দুর্নীতি মামলায় তিনি দণ্ডিত হন। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৭ সালের ৯ই জানুয়ারি জামিনে মুক্তি পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি দীর্ঘ ৭ বছর কারাগারে বন্দি ছিলেন। কারাবন্দি থাকা অবস্থাতেই ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে রংপুর অঞ্চলের পাঁচটি করে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতে বিজয়ী হওয়ার অনন্য রেকর্ড গড়েন তিনি।

অস্থায়ী সরকার ও সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন

বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্দলীয় অস্থায়ী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মূল লক্ষ্য ছিল একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান। ১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়।

এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা পুনরুদ্ধার হয় এবং বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার গঠন করেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সর্বসম্মত উদ্যোগে জাতীয় সংসদে দ্বাদশ সংবিধান সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুনরায় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করে।

৬ই ডিসেম্বরের তাৎপর্য: আওয়ামী লীগ ও বিএনপির উদযাপিত দিন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৬ই ডিসেম্বর দিনটি নাগরিক অধিকার পুনরদ্ধার ও স্বৈরাচারমুক্ত নতুন সূচনার প্রতীক। আন্দোলন-সংগ্রামে ডা. মিলন, নূর হোসেন, জেহাদ, তাজুলসহ অসংখ্য শহীদের রক্তে অর্জিত এই দিনটিকে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নিজস্ব কর্মসূচির মাধ্যমে পালন করে:

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ: দিনটিকে ‘গণতন্ত্র মুক্তি দিবস’ হিসেবে উদযাপন করে। তারা এই দিনটিকে ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং স্বৈরাচারের হাত থেকে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে পাওয়ার দিন হিসেবে গণ্য করে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি): দিনটিকে ‘স্বৈরাচার পতন ও গণতন্ত্র মুক্তি দিবস’ হিসেবে পালন করে। দীর্ঘ ৯ বছরের আপসহীন সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি এবং একনায়কতন্ত্রের পতনের স্মারক হিসেবে তারা দিনটির মূল্যায়ন করে।

অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন: দিনটিকে ‘স্বৈরাচার পতন দিবস’ হিসেবে পালন করে এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

এরশাদ পরবর্তী রাজনীতি ও সংসদীয় অভিজ্ঞতা (১৯৯১ - ২০১৯)

জেলখানায় বন্দি থাকা সত্ত্বেও এরশাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কিন্তু সেখানে শেষ হয়ে যায়নি। রংপুরে তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং জাতীয় পার্টির ভোটব্যাংকের কারণে তিনি ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের দুটি সাধারণ নির্বাচনে জেলে বসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও রংপুর অঞ্চলের ৫টি করে আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

জাতীয় পার্টির বিভাজন ও জোটের রাজনীতি

ক্ষমতা হারানোর পর জাতীয় পার্টি একাধিক খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়:

জাতীয় পার্টি (এরশাদ): মূল দল হিসেবে এরশাদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়।
জাতীয় পার্টি (মঞ্জু): আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগপন্থী ধারা।
জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর): কাজী জাফরের নেতৃত্বে বিএনপিপন্থী ধারা।

এরশাদ পরবর্তী সময়ে কখনো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন 'মহাজোট', আবার কখনো বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের সাথে নমনীয় অবস্থান নিয়ে দরকষাকষির রাজনীতি চালু রাখেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে সমর্থন দিয়েছিলেন তিনি।

জীবনের শেষ অধ্যায় ও একাদশ জাতীয় সংসদ (২০১৮-২০১৯)

২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রংপুর-৩ আসন থেকে পুনরায় জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তৎকালীন রাজনৈতিক সমঝোতা অনুযায়ী তিনি একাদশ জাতীয় সংসদে সরকারি দল আওয়ামী লীগের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রধান 'বিরোধী দলীয় নেতা' হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৯ সালের ১৪ই জুলাই ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (CMH) বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে ৮৯ বছর বয়সে এই বিতর্কিত ও দীর্ঘ সামরিক-রাজনৈতিক অধ্যায়ের প্রধান চরিত্রের জীবনাবসান ঘটে।

১৯৮৩ সালের ছাত্র আন্দোলন ও 'মাজেদ শিক্ষানীতি'

১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখলের পর এরশাদ ভেবেছিলেন সামরিক শক্তির বলে তিনি দীর্ঘকাল শাসন চালিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু ক্ষমতার প্রথম বছরেই তাঁর মুখোমুখি হয় দেশের ছাত্রসমাজ।

মাজেদ খান শিক্ষানীতি (১৯৮২): এরশাদ সরকারের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ড. এজি মাজেদ খান একটি নতুন শিক্ষানীতি প্রস্তাব করেন। এতে প্রাথমিক স্তর থেকেই আরবি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, উচ্চশিক্ষাকে ব্যয়বহুল করা এবং শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের রূপরেখা দেওয়া হয়।

১৪ই ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩-র রক্তঝরা দিন: মাজেদ খান শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৮৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি বটতলা থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী সচিবালয় ঘেরাওয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিলে হাইকোর্টের গেটের সামনে সামরিক পুলিশ নির্দয়ভাবে গুলি চালায়।

শহীদের তালিকা: ওই দিন পুলিশের গুলিতে জয়নাল, দীপালী সাহা, মোজাম্মেল, কানাই সহ বহু শিক্ষার্থী শহীদ হন। ১৫ই ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম ও অন্যান্য স্থানে সেলিম, দেলোয়ার সহ আরও অনেকে শহীদ হন। এই আন্দোলনটিই ছিল এরশাদ শাসনের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের প্রথম প্রত্যক্ষ প্রতিরোধ।

১৯৮৫ সালের 'হাঁ/না' ভোট (Referendum) ও সামরিক শাসনের বৈধতা তৈরির চেষ্টা

সামরিক শাসনকে বৈধতা দিতে বিশ্বব্যাপী একনায়করা প্রায়ই গণভোটের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। এরশাদও একই পথ অনুসরণ করেছিলেন:

গণভোটের আয়োজন (২১শে মার্চ ১৯৮৫): দেশে যখন প্রধান বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন চলছিল, তখন এরশাদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহাল রাখা এবং তাঁর নীতির পক্ষে জনসমর্থন প্রমাণ করতে একটি ‘হাঁ/না’ গণভোটের আয়োজন করেন

প্রশ্নটি ছিল: "আপনি কি রাষ্ট্রপতি এরশাদের নীতি ও কর্মধারা সমর্থন করেন এবং নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁর পদে বহাল থাকা সমর্থন করেন?"

ফলাফল ও বিতর্ক: বিরোধী দলগুলো এই ভোট পুরোপুরি বর্জন করে। তবে সরকারি ফলাফলে দাবি করা হয় যে ৯৪.১৫% ভোটার 'হাঁ' সূচক ভোট দিয়েছেন এবং প্রদেয় ভোটের হার ছিল ৭২%। তৎকালীন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো এই পরিসংখ্যানকে সম্পূর্ণ সাজানো ও কারচুপিপূর্ণ হিসেবে অভিহিত করেছিল।

তিন জোটের রূপরেখা ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন (১৯৯০)

১৯৯০ সালের নভেম্বরের আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ৮-দলীয় জোট, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭-দলীয় জোট এবং বামপন্থী ৫-দলীয় জোট আলাদা আলাদা কর্মসূচি পালন করছিল। আন্দোলনের মূল মোড় ঘোরে যখন তিন জোট এক প্ল্যাটফর্মে আসে।

১৯৯০ সালের ১৯শে নভেম্বর তিন জোটের এই ঐতিহাসিক 'যৌথ ঘোষণা' (Joint Declaration) প্রকাশিত হয়। এই একটি রূপরেখাই মূলত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার অবিশ্বাস দূর করে এরশাদের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।

এরশাদ আমলের আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও সামরিক কূটনীতি

এরশাদের শাসনকাল বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি পশ্চিমা বিশ্ব এবং মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের এক নতুন ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করেন।

উপসাগরীয় যুদ্ধ (Gulf War - ১৯৯০) ও সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে সেনা পাঠানো

১৯৯০ সালে ইরাকের স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেন যখন কুয়েত দখল করেন, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বহুজাতিক মিত্রবাহিনী গঠিত হয়। এরশাদ সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের পক্ষে অবস্থান নেয়।

'অপারেশন ডেজার্ট শিল্ড'-এর অংশ হিসেবে এরশাদ সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি ব্রিগেড পাঠায়। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এরশাদ সরকারের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভিষেক (১৯৮৮)

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ সাফল্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগদানের সূচনা হয় এরশাদের শাসনামলে।

প্রথম মিশন (১৯৮৮): ইরান-ইরাক যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণে 'UNIIMOG' মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সামরিক পর্যবেক্ষকদের প্রথম দল পাঠানো হয়।

কৌশলগত সুবিধা: সামরিক কর্মকর্তাদের উচ্চ অর্থ উপার্জন ও আন্তর্জাতিক এক্সপোজারের সুযোগ করে দিয়ে এরশাদ সেনাবাহিনীতে নিজের প্রতি আনুগত্য ধরে রাখার কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়েছিলেন।

ভারত ও আঞ্চলিক কূটনীতি (সার্ক প্রবর্তন)

সার্ক (SAARC) শীর্ষ সম্মেলন (১৯৮৫): জিয়াউর রহমানের পরমেয়াদের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় ১ম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে এরশাদ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ফোরামে বড় ধরনের স্থান পান।

তিন বিঘা করিডোর ও গঙ্গার পানি: ভারতের সাথে তিন বিঘা করিডোর ইজারা চুক্তি (১৯৮২) স্বাক্ষর এবং ফারাক্কা বাঁধ ও গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে জাতিসংঘে আলোচনার চেষ্টা করা হয়।

এরশাদের বিরুদ্ধে আলোচিত মামলাসমূহ ও আইনি বিচার

১৯৯০ সালে ক্ষমতাচ্যুতির পর এরশাদ দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ডজনখানেক দুর্নীতি ও অপশাসনের মামলা দায়ের করা হয়।

অন্যান্য মামলা: সোনা চোরাচালান মামলা, অবৈধ অস্ত্র রাখার মামলা (যেটিতে ৫ বছরের সাজা হয়েছিল), এবং সেনানিবাসে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও উপহারসামগ্রী উদ্ধারের মামলা।

দীর্ঘ কারাবাস: ১৯৯০ সালের ৮ই ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৭ সালের ৯ই জানুয়ারি পর্যন্ত (দীর্ঘ ৬ বছর ১ মাস) তিনি একটানা কারাগারে বন্দি ছিলেন। পরবর্তীতে ২০০১ ও ২০০৬ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি সাময়িক জামিনে মুক্ত হন।

স্বৈরাচার বিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও মিডিয়ার ভূমিকা

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি দেশের কবি, লেখক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়।

জাতীয় কবিতা পরিষদ ও 'স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কবিতা': ১৯৮৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত হয় 'জাতীয় কবিতা পরিষদ'"শৃঙ্খল মুক্তির জন্য কবিতা" স্লোগান নিয়ে রাজপথে কবিরা সমাবেশ করতেন। শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদ সহ শীর্ষস্থানীয় কবিরা তাঁদের লেখনী দিয়ে আন্দোলনকে বেগবান করেছিলেন।

বিটিভি ও মিডিয়া সেন্সরশিপ: এরশাদ আমলেই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন (বিটিভি) ও রেডিওকে চরমভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা শুরু হয়। তবে সেই সেন্সরশিপকে তোয়াক্কা না করে 'সাপ্তাহিক খবরের কাগজ', 'সাপ্তাহিক সময়', 'দৈনিক সংবাদ' সহ বিভিন্ন পত্রিকা কার্টুন ও ব্যঙ্গাত্মক ফিচারের মাধ্যমে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলে।

পারিবারিক ও রাজনৈতিক ট্র্যাঙ্গেল এবং জাতীয় পার্টির রূপান্তর

ক্ষমতা হারানোর পর এরশাদ ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি (জাপা) এক অদ্ভুত নাটकीय রাজনৈতিক চরিত্রের সৃষ্টি করে।

দলের অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দল: জাতীয় পার্টিতে সবসময় তিনটি বলয় সক্রিয় ছিল এরশাদের ভাই জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ, এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ এবং পরবর্তীতে বিদিশা সিদ্দিকীকে ঘিরে গড়ে ওঠা চাপ।

জোট পরিবর্তনের রাজনীতি: ২০০১ থেকে ২০১৮ সালের রাজনীতিতে এরশাদ ছিলেন 'কিংমেকার' বা সমীকরণের প্রধান অনিশ্চয়তা। প্রতি নির্বাচনের আগে তিনি হঠাৎ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া, জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাহার করা আবার পর মুহূর্তেই ফিরে আসার মতো রাজনৈতিক চমক দেখাতেন, যা তৎকালীন বাংলাদেশে 'এরশাদীয় নাটক' নামে পরিচিতি পেয়েছিল।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনকালের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক

দীর্ঘ ৯ বছরের সামরিক শাসন এবং পরবর্তীতে ৩ দশকের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এরশাদের অবদান ও বিতর্ককে সংক্ষেপে মূল্যায়ন করা যায়:

নেতিবাচক ও বিতর্কিত দিকসমূহ

গণতন্ত্র হত্যা: গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে উৎখাত করে ৯ বছর সংবিধান স্থগিত রাখা এবং সামরিক শাসন জারি রাখা।
প্রহসনের নির্বাচন: ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে বাইরে রেখে প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠান করে শাসনকে বৈধ করার চেষ্টা।
দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি: সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানাবিধ অনৈতিক বিতর্কের মুখোমুখি হওয়া।
রাজনৈতিক হত্যা: নূর হোসেন, ডা. মিলন, ডা. কাফি, এবং বহু ছাত্রনেতাকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে প্রাণ দিতে হওয়া।

ইতিবাচক ও কাঠামোগত অর্জনসমূহ

উপজেলা পদ্ধতি: বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে কার্যকর এবং সফল রূপরেখা প্রবর্তন।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ: ঢাকা থেকে জেলা ও থানা পর্যায়ে অবকাঠামোগত সুবিধা ও রাজস্ব বণ্টন পৌঁছানোর সূচনা।
যমুনা সেতু উদ্যোগ: জাতীয় অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক রূপান্তরকারী যমুনা সেতুর প্রারম্ভিক কাঠামো ও ফান্ড গঠন।
শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি: দেশে ধর্মীয় ও সামাজিক বিবেচনায় শুক্রবারকে সাপ্তাহিক ছুটি ঘোষণা করা।

উপসংহার

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জীবন ও রাজনৈতিক জীবনধারা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বর্ণিল, বৈপরীত্যপূর্ণ এবং শিক্ষাগ্রহণযোগ্য অধ্যায়। একদিকে একজন পাকিস্তান-ফেরত সেনাকর্তা থেকে বাংলাদেশের ক্ষমতার শীর্ষতম শিখরে আরোহণ, অন্যদিকে একনায়কতন্ত্র, রক্তপাত এবং গণ-আন্দোলনের মুখে সেনাবাহিনীর নিজস্ব সমর্থনে ফাটল ধরে ক্ষমতাচ্যুতির ট্র্যাজেডি এই উভয় রূপই তাঁর চরিত্রকে ঘিরে রয়েছে।

১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বরের স্বৈরাচার পতন ও গণতন্ত্র মুক্তি দিবস কেবল এরশাদ নামের এক সামরিক শাসকের পতন ঘটায়নি; বরং তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে এই শিক্ষা দিয়েছিল যে জনগণের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাকে অগণতান্ত্রিক সামরিক আইন বা কৃত্রিম নির্বাচন দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য চেপে রাখা যায় না। আজ পাঁচ দশক পর দাঁড়িয়ে এরশাদের শাসন আমল একদিকে নীতিগত ভুল ও স্বৈরাচারের সতর্কবার্তা হিসেবে, অন্যদিকে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের এক অনন্য দলিল হিসেবে ইতিহাসবিদদের আলোচনার খোরাক হয়ে রয়েছে।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Aug 9, 2026

/

Post by

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সামাজিক নৃবিজ্ঞান এবং জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের আলোচনায় ‘জাতির পিতা’ (Father of the Nation) একটি সর্বজনস্বীকৃত ধারণা। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজস্ব ইতিহাস, সার্বভৌমত্ব অর্জন এবং জাতীয় সত্তা গঠনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালনকারী নেতৃত্বকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও ভাষাগত পরিচয়। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক মাধ্যমে, বিভিন্ন রাজনৈতিক আলোচনায় এবং কোনো কোনো বিভ্রান্তিকর ধর্মীয় ব্যাখ্যায় ‘জাতির পিতা’ ধারণাটি নিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম দ্বন্দ্ব বা বিতর্কের অবতারণা হতে দেখা যায়।

Aug 9, 2026

/

Post by

গণতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রধানত তিন ধরনের দলীয় ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় একদলীয় (যেখানে বিরোধী মতের অবকাশ থাকে না), দ্বিদলীয় (যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যগত ব্যবস্থা) এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর রাষ্ট্র। এই ধরনের বহুদলীয় রাজনীতিতে একটি দল এককভাবে জনগণের সম্পূর্ণ সমর্থনের ওপর ভর করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া কিংবা স্থায়ী রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এখানেই আবির্ভূত হয় 'জোট রাজনীতি' বা Coalition Politics-এর ধারণা।

Jan 18, 2026

/

Post by

১৫ আগস্টের সেই চরম বিশ্বাসঘাতকতার অগ্রভাগে ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর পালিত ও দীর্ঘলালিত কিছু কুখ্যাত চরিত্র কর্নেল ফারুক রহমান, কর্নেল আবদুর রশিদ ও মেজর বজলুল হুদাদের মতো খুনিরা। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তারা স্বৈরাচারী শাসনের ছত্রছায়ায় 'ফ্রীডম পার্টি' নামক এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক মোড়কে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-২০২৫ সালের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দেশের রাজপথে সেই একই স্লোগান, একই রণকৌশল এবং একই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বয়ান (Narrative) শুনতে পাই, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বুক কেঁপে ওঠে।

Aug 9, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ফাটল, আদর্শগত বৈপরীত্য এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার যে সূচনা হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় একের পর এক ঐতিহাসিক রক্তপাত। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরের ইতিহাসে দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ কিংবা ছদ্মবেশী সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই সময়কালের মধ্যে যেসব অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল সেনানিবাসের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের সংবিধান, পররাষ্ট্রনীতি, রাজনৈতিক ভাবাদর্শ এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার খোল-নলচে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল।

Aug 9, 2026

/

Post by

দীর্ঘ দেড় দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং চ্যালেঞ্জিং মন্ত্রণালয় অর্থাৎ ‘বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পূর্ণ মন্ত্রী কে ছিলেন? কাজে ও পরিসংখ্যানে তার উত্তরটি হলো: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। হ্যাঁ, কেবল সরকারপ্রধান হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দেওয়াই নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্বাহী প্রধান বা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার নিজের কাঁধে রেখেছিলেন তিনি নিজেই। প্রধানমন্ত্রীত্বের বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় সুরক্ষার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

Aug 9, 2026

/

Post by

পাকিস্তানকে সামরিক শাসন ও ক্যু-এর প্রধান তীর্থভূমি হিসেবে গণ্য করা হলেও ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিষয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। সফল ও ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যা এবং ক্ষমতার প্রত্যক্ষ দখলের দিক থেকে উভয় দেশের সামরিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উদ্ভাসিত হয় গভীর কিছু বৈপরীত্য ও নজিরবিহীন বাস্তবতা। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রবেশ করলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা বেসামরিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। একটি সেনাবাহিনীর প্রকৃত দেশপ্রেমের মাপকাঠি কী সীমান্ত রক্ষা ও সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকা, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.