>
>
হিযবুত তাহরীরের ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান - ২০১১ সালে জঙ্গিবাদী ষড়যন্ত্র যেভাবে নস্যাৎ হয়
হিযবুত তাহরীরের ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান - ২০১১ সালে জঙ্গিবাদী ষড়যন্ত্র যেভাবে নস্যাৎ হয়
একটি চরম আশঙ্কাজনক ও সংবেদনশীল ঘটনা ঘটেছিল ২০১১ সালের শেষভাগে। নিষিদ্ধ ঘোষিত প্যান-ইসলামিস্ট ও চরমপন্থী সংগঠন ‘হিযবুত তাহরীর’-এর প্রত্যক্ষ ইন্ধন ও মদদে সেনাবাহিনীতে কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন কট্টরপন্থী কর্মকর্তা একটি সশস্ত্র সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাত করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এই ঘটনাটি ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে সামরিক বাহিনীর সময়োপযোগী ও পেশাদার পদক্ষেপের মাধ্যমে জনসম্মুখে উন্মোচিত হয়।

TruthBangla

বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতির গতিপথে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা সর্বদাই অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেবল দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই নিশ্চিত করেনি, বরং এটি একটি অসাম্প্রদায়িক, পেশাদার এবং শৃঙ্খলিত সার্বভৌম শক্তি হিসেবে বৈশ্বিক অঙ্গনেও সুনাম অর্জন করেছে। তবে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং কতিপয় পথভ্রষ্ট সদস্যের অপচেষ্টার কারণে সামরিক বাহিনী বেশ কিছু কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে।
এরকমই একটি চরম আশঙ্কাজনক ও সংবেদনশীল ঘটনা ঘটেছিল ২০১১ সালের শেষভাগে। নিষিদ্ধ ঘোষিত প্যান-ইসলামিস্ট ও চরমপন্থী সংগঠন ‘হিযবুত তাহরীর’-এর প্রত্যক্ষ ইন্ধন ও মদদে সেনাবাহিনীতে কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন কট্টরপন্থী কর্মকর্তা একটি সশস্ত্র সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাত করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
এই ঘটনাটি ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে সামরিক বাহিনীর সময়োপযোগী ও পেশাদার পদক্ষেপের মাধ্যমে জনসম্মুখে উন্মোচিত হয়। ঘটনার পর থেকেই দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মনে বেশ কিছু মৌলিক ও জটিল প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে: হিযবুত তাহরীর কীভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরের কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত ও সংগঠিত করেছিল? এই ব্যর্থ অভ্যুত্থান কি কোনোভাবে সফল হতে পারতো? এবং তারা যদি অভ্যুত্থান ঘটাতে সক্ষম হতো, তবে কি বাংলাদেশে একটি ‘খেলাফত’ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব ছিল?
আমার এই নিবন্ধে ২০১১ সালের সেই ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার পটভূমি, মূল কুশীলবদের ভূমিকা, সেনা গোয়েন্দা বিভাগের সাহসিকতা ও নিখুঁত নস্যাৎ প্রক্রিয়া, এবং ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতার আলোকে প্রশ্নগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ ও গভীর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।
হিযবুত তাহরীরের সেনা অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্রের পটভূমি
২০১১ সালের শেষভাগে ঢাকা সেনানিবাসসহ দেশের প্রধান সামরিক ঘাঁটিগুলোতে এক থমথমে ও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সাধারণ নাগরিক কিংবা সংবাদমাধ্যম কেউই এই সুগভীর চক্রান্তের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল না। সারাদেশে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে কোনো অঘটন ঘটতে যাচ্ছে কি না, কিংবা সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করতে পারে কি না এমন নানা গুঞ্জন ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। অতীতের রক্তক্ষয়ী সেনা অভ্যুত্থানের ইতিহাস প্রত্যক্ষ করা সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল গভীর উদ্বেগ।
এই থমথমে পরিস্থিতির অবসান ঘটে ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি। ঢাকা সেনানিবাসের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (ISPR) মিলনায়তনে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে আইএসপিআর-এর তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ মাসুদ রাজ্জাক আনুষ্ঠানিকভাবে জানান যে,
“সেনাবাহিনীতে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কিছু ধর্মীয় উগ্রপন্থী কর্মকর্তা সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করেছিল, যা সেনাবাহিনীর সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে নস্যাৎ করা হয়েছে। এতে মোট ১৬ জন বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তার জড়িত থাকার কথা জানানো হয়, যার নেপথ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী রাজনৈতিক সংগঠন হিযবুত তাহরীর যুক্ত ছিল।”
পিলখানা ট্র্যাজেডির ক্ষত ও সেনাবাহিনীর মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা
এই অভ্যুত্থান চেষ্টার পটভূমি বুঝতে হলে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় ঘটে যাওয়া বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) বিদ্রোহের দিকে নজর দেওয়া আবশ্যক। পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ৫৭ জন মেধাবী ও প্রথিতযশা সেনা কর্মকর্তাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনা সমগ্র সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে নজিরবিহীন শোক, গভীর ক্ষোভ এবং এক ধরনের শূন্যতার জন্ম দেয়।
পিলখানা ট্র্যাজেডি-পরবর্তী সময়ে ঘটনা সামাল দেওয়ার পদ্ধতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সেনাসদস্যদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তাদের মনে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে, যা সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
হিযবুত তাহরীরের উগ্রবাদী উসকানি ও প্রচার কৌশল
সেনাসদস্যদের এই মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত, হতাশা এবং ক্ষোভকে পুঁজিতে পরিণত করতে অপচেষ্টা চালায় নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী সংগঠন হিযবুত তাহরীর। ২০০৯ সালে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হওয়ার পরও সংগঠনটি গোপনে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। তারা তথ্যপ্রযুক্তি, সোশ্যাল মিডিয়া, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং এবং বিদেশভিত্তিক সিম কার্ড ব্যবহার করে উগ্র ভাবাদর্শ ছড়াতে থাকে।
হিযবুত তাহরীর সামরিক বাহিনীর মধ্যম সারির এবং ধর্মীয় অনুভূতিপ্রবণ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে প্রচারপত্র ও উস্কানিমূলক বার্তা পাঠাতে শুরু করে। তারা সেনাসদস্যদের বোঝানোর চেষ্টা করে যে তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অস্থিতিশীল করা এবং সরকার উৎখাতের জন্য সেনা কর্মকর্তাদের উসকানি দেয়।
ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা, উন্মোচন ও চক্রান্ত নস্যাৎ
ষড়যন্ত্রের মূল সমন্বয়ক ছিলেন তৎকালীন মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক (মেজর জিয়া), যিনি অন্যান্য কর্মকর্তাদের যুক্ত করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইমেইলে বার্তা পাঠাতেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ও সেনানিবাস ঘিরে ফেলে সরকার উৎখাতের চেষ্টা চালাতে চেয়েছিল। এই উদ্দেশ্যে হংকং প্রবাসী ব্যবসায়ী ইশরাক আহমেদসহ কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তার সমন্বয়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিকল্পনা সাজানো হয়।
২০১১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ষড়যন্ত্রকারীরা নতুন কিছু সেনা কর্মকর্তাকে দলে টানার চেষ্টা করলে পুরো বিষয়টি উন্মোচিত হয়ে পড়ে। দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তারা এই অসাংবিধানিক ও উগ্র পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্তৃপক্ষকে জানান। সেনাসদরের নির্দেশে এই চক্রান্তের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে সেনাবাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর লেফটেন্যান্ট কর্নেল এহসান ইউসুফ, ২৮ ডিসেম্বর মেজর এরশাদ উল্লাহ এবং পরে ৩১ ডিসেম্বর সাবেক এক ক্যাপ্টেনকে গ্রেফতার করে।
তদন্তে চক্রান্তের বিশদ তথ্য বেরিয়ে আসলে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে হেফাজতে নেওয়া হয় এবং মূল পরিকল্পনাকারী মেজর জিয়াউল হক আত্মগোপনে চলে যান। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সময়োচিত গোয়েন্দা নজরদারি ও দ্রুত পদক্ষেপের কারণে অসাংবিধানিক এই অভ্যুত্থান চেষ্টা সম্পূর্ণ নস্যাৎ হয়।
হিযবুত তাহরীর ও তাদের ‘নুসরাহ’ কৌশল
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান ঘটানোর এই চেষ্টার স্বরূপ বুঝতে হলে হিযবুত তাহরীরের মূল মতাদর্শ এবং ক্ষমতা দখলের কৌশল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
হিযবুত তাহরীর কী?
হিযবুত তাহরীর (Party of Liberation) ১৯৫৩ সালে জেরুজালেমে তকীউদ্দীন আল-নাবহানী নামক একজন বিচারক ও সুন্নি আলেম দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক প্যান-ইসলামিস্ট রাজনৈতিক সংগঠন, যার মূল দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলো সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে একত্রিত করে একটি একক 'খেলাফত' (Caliphate) পুনপ্রতিষ্ঠা করা।
রাজনৈতিক দর্শন: সংগঠনটি বিশ্বাস করে যে ১৯২৪ সালে উসমানীয় (অটোমান) সাম্রাজ্যের পতনের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব তার রাজনৈতিক অভিভাবকত্ব হারিয়েছে। তাই আধুনিক পুঁজিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে তারা সম্পূর্ণ বাতিল বলে গণ্য করে।
প্রচার ও সদস্য সংগ্রহ: বৈশ্বিক পর্যায়ে ৪০টিরও বেশি দেশে এর কার্যক্রম বিস্তৃত। এটি মূলত দেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং পেশাজীবীদের লক্ষ্য করে গোপন ও প্রকাশ্যে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ যেমন জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ইন্দোনেশিয়া ও বেশ কয়েকটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় হুমকির অভিযোগে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ বা কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: ২০০০-২০০১ সালের দিকে বাংলাদেশে সংগঠনটি কার্যক্রম শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তরুণদের দলে ভিড়িয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। উগ্রপন্থা ছড়ানো, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকা এবং দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্টের অভিযোগে ২০০৯ সালের অক্টোবরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে হিযবুত তাহরীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
‘নুসরাহ’ (Nusrah) বা সামরিক ক্ষমতা দখল
হিযবুত তাহরীরের কৌশলটি অন্যান্য উগ্রপন্থী ইসলামি গোষ্ঠীগুলোর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল-কায়েদা বা আইএসের মতো তারা বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা, আত্মঘাতী আক্রমণ বা দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা যুদ্ধে লিপ্ত হয় না। আবার অন্যদিকে মুসলিম ব্রাদারহুড বা অন্যান্য ইসলামি দলের মতো তারা গণতান্ত্রিক নির্বাচনেও অংশ নেয় না। তাদের সম্পূর্ণ ক্ষমতা দখলের মূল স্তম্ভটি হলো ইসলামি পরিভাষার ‘নুসরাহ’ (যার আক্ষরিক অর্থ সামরিক বা শক্তিমানদের সাহায্য লাভ)।
ঐতিহাসিক ও মতাদর্শিক বিচারে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক মদিনার গোত্রপতিদের কাছ থেকে সমর্থন লাভ করে প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘটনাকে হিযবুত তাহরীর আধুনিক সামরিক বাহিনীর ওপর প্রয়োগ করে। তাদের কৌশল অনুযায়ী:
প্রথম ধাপ (তাছকিফ বা শিক্ষা ও গঠন): গোপন স্টাডি সার্কেলের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের দলের আদর্শে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ও প্রশিক্ষিত ক্যাডার হিসেবে গড়ে তোলা।
দ্বিতীয় ধাপ (তফাউল বা সামাজিক মিথস্ক্রিয়া): লিফলেট বিতরণ, সেমিনার, জুমার নামাজের পর বক্তব্য এবং অনলাইন মিডিয়ার মাধ্যমে বিদ্যমান গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা।
তৃতীয় ধাপ (ইস্তিলাম আল-হুকম বা নুসরাহের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ): ইসলামি রাষ্ট্র বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত ধাপ হলো 'নুসরাহ' অর্জন। 'নুসরাহ' শব্দের অর্থ হলো সামরিক বা সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তা লাভ করা।
প্রচলিত উগ্রপন্থী সংগঠন যেমন আল-কায়েদা বা আইএসআইএস (ISIS)-এর কৌশল থেকে হিযবুত তাহরীরের মূল পার্থক্য হলো, তারা দলের সাধারণ সদস্যদের দিয়ে সরাসরি বোমা হামলা বা গেরিলা যুদ্ধে লিপ্ত হয় না। এর পরিবর্তে, তারা লক্ষ্যবস্তু দেশের সশস্ত্র বাহিনীর (বিশেষ করে সেনাবাহিনী) কট্টরপন্থী, আদর্শিকভাবে প্রভাবিত বা রাজনৈতিকভাবে অসন্তুষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে গোপন সেল তৈরি করে। সামরিক বাহিনীর ভেতরের এই অংশটিকে ব্যবহার করে একটি অভ্যন্তরীণ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানো এবং রাতারাতি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হিযবুত তাহরীরের হাতে হস্তান্তর করে 'খেলাফত' ঘোষণা করাই হলো এই 'নুসরাহ' কৌশলের মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অনুসৃত ‘নুসরাহ’
বাংলাদেশে ২০০৯ সালে নিষিদ্ধ হওয়ার পরও হিযবুত তাহরীর নিষ্ক্রিয় হয়নি, বরং তারা তাদের 'নুসরাহ' কৌশল বাস্তবায়নে সেনা কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করে তৎপরতা বাড়ায়। ২০১১ সালের শেষভাগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান চক্রান্তের মধ্য দিয়ে তাদের এই কৌশলের প্রয়োগ প্রকাশ্যে আসে।
অনুপ্রবেশের মাধ্যম: সংগঠনটি সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে তাদের আদর্শিক বার্তা সংবলিত গোপন নথি, ইমেইল এবং সোশ্যাল মিডিয়া বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগ গড়ে তোলে। ২০০৯ সালের পিলখানা বিডিআর বিদ্রোহ পরবর্তী পরিস্থিতি এবং ভৌগোলিক-রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনীর কিছু মধ্যম সারির কর্মকর্তার মধ্যে তৈরি হওয়া অসন্তোষকে তারা কাজে লাগানোর চেষ্টা করে।
অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা (২০১১): চাকরিচ্যুত ও তৎকালীন কর্মরত কর্মকর্তা যেমন মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক (মেজর জিয়া) এবং লেফট্যানেন্ট কর্নেল এহসান ইউসুফসহ অন্যান্যদের সমন্বয়ে সরকার পতনের পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্র ও বঙ্গভবন ঘেরাও করে বেসামরিক সরকারকে হটিয়ে শাসনক্ষমতা দখলের ছক আঁকা হয়েছিল।
ব্যর্থতা ও প্রকাশ: ২০১১ সালের ডিসেম্বরে সেনা গোয়েন্দা সংস্থা এই চক্রান্ত ধরে ফেলে এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার বা নজরদারিতে আনে। পরবর্তীতে ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (ISPR) এক সংবাদ সম্মেলনে জানায় যে, চরমপন্থী ভাবাদাপন্ন কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত ১৬ জন সেনা কর্মকর্তা সরকারের বিরুদ্ধে এই অভ্যুত্থান চক্রান্তে জড়িত ছিলেন। এই চক্রান্তের পেছনে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সরাসরি উস্কানি ও সমর্থনের বিষয়টি সেনা সূত্রে নিশ্চিত করা হয়।
পরবর্তী তৎপরতা: চক্রান্ত নস্যাৎ হওয়ার পর হিযবুত তাহরীর বিভিন্ন স্থানে লিফলেট ছড়ায় এবং জুমার নামাজের পর বক্তব্যের মাধ্যমে সেনা কর্মকর্তাদের আহ্বান জানায় বেসামরিক সরকারকে সরিয়ে তাদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্পণ করার জন্য।
অভ্যুত্থান চেষ্টার ঘটনাক্রম ও উন্মোচন
২০১১ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসজুড়ে সামরিক বাহিনীর ভেতরে এক দল উগ্র জঙ্গিবাদী ভাবধারায় প্রভাবিত কর্মকর্তা চরম গোপনীয়তা বজায় রেখে অভ্যুত্থানের নীল নকশা প্রণয়ন করে। তাদের মূল পরিকল্পনা ছিল ২০১১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার পাশাপাশি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেনানিবাসে একযোগে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সরকারের পতন ঘটানো এবং সামরিক নেতৃত্বকে জিম্মি করা।
মূল চক্রান্তকারী ও কুশীলবগণ
এই ব্যর্থ ষড়যন্ত্রের প্রধান নেপথ্য নায়ক ও মাস্টারমাইন্ড ছিলেন সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের বরখাস্তকৃত কর্মকর্তা মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক (যিনি পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চরমপন্থী পরিমণ্ডলে ‘মেজর জিয়া’ নামে পরিচিত হন)। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (MIST)-এর প্রাক্তন এই শিক্ষার্থী তথ্যপ্রযুক্তি, এনক্রিপশন এবং সাইবার নেটওয়ার্কিংয়ে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠন হিযবুত তাহরীরের চরমপন্থী ভাবধারায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন এবং সামরিক বাহিনীর ভেতরের কর্মকর্তাদের উসকে দেওয়ার দায়িত্ব নেন।
জিয়াউল হকের সরাসরি সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত ও আটক হন তৎকালীন দায়িত্বশীল ও সাবেক মিলিয়ে প্রায় ১৬ জন মধ্যম ও নিম্ন সারির কর্মকর্তা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ১/১১ পরবর্তী সময়ে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে বিদেশে অবস্থানরত অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারী, মেজর এরশাদ উল্লাহসহ আরো কয়েকজন ক্যাপ্টেন ও মেজর পর্যায়ের কর্মকর্তা। তদন্ত শেষে অভিযুক্তদের সেনাদল থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং সেনা আইনের (Army Act) অধীনে গঠিত উচ্চপর্যায়ের ‘কোর্ট অব ইনকোয়ারি’র মুখোমুখি করে শাস্তি প্রদান করা হয়।
তথ্য আদান-প্রদান ও ডিজিটাল নেটওয়ার্কিং
অভ্যুত্থানকারীরা সামরিক বাহিনীর প্রথাগত ও নজরদারিকৃত যোগাযোগ মাধ্যম সম্পূর্ণ এড়িয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করেছিল। মেজর জিয়া ও তার সহযোগীরা সেনাসদস্যদের সংগঠিত করতে ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে সোশ্যাল মিডিয়া (বিশেষ করে ফেসবুক), এনক্রিপ্টেড ইমেইল, গোপন প্রক্সি সার্ভার ও ছদ্মনামে নিবন্ধিত মোবাইল সংযোগ ব্যবহার করতেন।
তারা ঢাকার বাইরে ও ভেতরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর ইউনিটে কর্মরত কর্মকর্তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট ইমেইল ও উসকানিমূলক বার্তা পাঠাতেন। প্রেরিত বার্তা ও লিফলেটের মূল সুর ছিল:
"দেশের সার্বভৌমত্ব ও ধর্মীয় মূল্যবোধ চরম সংকটাপন্ন, সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে, তাই দেশকে বাঁচাতে অবিলম্বে এই সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ক্ষমতা দখল করতে হবে।"
সেনা গোয়েন্দারা উসকানিমূলক ইমেইলের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট, আইপি (IP) অ্যাড্রেস এবং ট্রাফিক অ্যানালাইসিস পর্যবেক্ষণ করে এই এনক্রিপ্টেড ডিজিটাল নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব উন্মোচন করে এবং মূল চক্রান্তকারীদের চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়।
প্রকাশ্য উন্মোচন: ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারির ঐতিহাসিক সংবাদ সম্মেলন
২০১১ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসজুড়ে ঢাকা সেনানিবাসসহ কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও দেশের বিভিন্ন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে গোপনে থমথমে পরিবেশ ও চরম নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ তৈরি হচ্ছিল। সাধারণ মানুষ কিংবা গণমাধ্যম তখনও টের পায়নি যে একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে রাষ্ট্রের ভিত্তি নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য কট্টরপন্থী ভাবাদর্শে বিশ্বাসী একদল কর্মকর্তা সশস্ত্র অভ্যুত্থানের চক্রান্ত করছিল। তবে সেনাবাহিনীর নিজস্ব সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (MI) এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (DGFI)-এর আগাম নজরদারিতে ২০১১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়েই এই গভীর ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেওয়া হয়। মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক অন্যান্য সহযোগীদের সংগঠিত করে ১৭ ও ১৮ ডিসেম্বরের দিকে সেনাপ্রধানসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বন্দি করে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু গোয়েন্দাদের তৎপরতায় ডিসেম্বর মাসের শুরুতেই কয়েকজন চক্রান্তকারী কর্মকর্তা আটক হলে পুরো ষড়যন্ত্র ভেস্তে যায়।
অবশেষে ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সকালে ঢাকা সেনানিবাসস্থ ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (ISPR) মিলনায়তনে সেনা সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে এক জরুরি ও অভূতপূর্ব সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের সামনে সেনা সদরের প্রতিনিধি হিসেবে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন তত্কালীন পার্সোনেল সার্ভিসেস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তারেকুল ইসলাম।
সংবাদ সম্মেলনে সেনা সদরের পক্ষ থেকে উত্থাপিত মূল তথ্য ও স্পর্শকাতর বিবরণগুলো ছিল নিম্নরূপ:
ষড়যন্ত্রকারীদের গঠন ও সংখ্যা: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত মিলিয়ে মোট ১৬ জন মধ্যম সারির ধর্মান্ধ ও কট্টরপন্থী কর্মকর্তা এই সশস্ত্র অভ্যুত্থান চক্রান্তে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
মূল চক্রান্তকারী ও মাস্টারমাইন্ড: চক্রান্তের মূল নেপথ্য কারিগর ছিলেন সেনাবাহিনীর বরখাস্তকৃত ও পলাতক কর্মকর্তা মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক (যিনি পরবর্তীতে 'মেজর জিয়া' নামে পরিচিতি পান)। তিনি সেনানিবাসের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ইমেইল ব্যবহার করে বিভিন্ন সেনা কর্মকর্তাকে উস্কানি দিয়েছিলেন।
বহিরাগত ইন্ধন ও হিযবুত তাহরীর: এই অভ্যুত্থান চেষ্টার পেছনে আদর্শিক, প্রচারণামূলক ও কৌশলগত ইন্ধন যুগিয়েছিল বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী প্যান-ইসলামিস্ট সংগঠন হিযবুত তাহরীর (Hizb ut-Tahrir)। তারা সেনানিবাসের ভেতরে ও সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারগুলোর মাঝে গোপনে সরকারবিরোধী ও উগ্রবাদী লিফলেট বিতরণ করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছিল।
আইনি ও সামরিক পদক্ষেপ: সেনাবাহিনীতে উগ্রবাদী ভাবাদর্শ উপড়ে ফেলতে সেনা আইন (Army Act) অনুযায়ী একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত আদালত (Court of Inquiry) গঠন করা হয় এবং আটককৃতদের বিচার প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়।
এই সংবাদ সম্মেলনটি বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল ও স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সামরিক বাহিনীর ভেতরের কোনো অভ্যন্তরীণ চরমপন্থী ষড়যন্ত্রের ঘটনাকে ধামাচাপা না দিয়ে এভাবে দ্রুত, পেশাদারত্ব ও স্বচ্ছতার সাথে জনসম্মুখে তুলে ধরার নজির অত্যন্ত কম। এই পদক্ষেপটি সেনাবাহিনীকে কট্টরপন্থী প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে সাহায্য করার পাশাপাশি পেশাদার বাহিনী হিসেবে জনগণের আস্থা পুনর্প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীতে পলাতক মেজর জিয়া উগ্রবাদী সংগঠন আনসার আল ইসলামের (আনসারুল্লাহ বাংলা টিম) শীর্ষ কমান্ডার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যার প্রথম সংগঠিত রূপ প্রকাশ্যে এসেছিল ২০১১-২০১২ সালের এই ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার মধ্য দিয়ে।
সংক্ষেপে ২০১১ সালের ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান
ঘটনাটির প্রধান উপাদানসমূহ একনজরে পর্যালোচনা করার জন্য নিচে একটি তথ্যসারণী প্রদান করা হলো:
বিষয়/উপাদান | বিস্তারিত বিবরণ |
ঘটনার সময়কাল | ২০১১ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর (ষড়যন্ত্র) এবং ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি (আনুষ্ঠানিক প্রকাশ)। |
সংবাদ সম্মেলনের স্থান | আইএসপিআর (ISPR) মিলনায়তন, ঢাকা সেনানিবাস। |
প্রধান চক্রান্তকারী (Mastermind) | বরখাস্তকৃত মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক (পলাতক 'মেজর জিয়া')। |
সহযোগী ও অভিযুক্ত সংখ্যা | প্রায় ১৬ জন বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারীসহ)। |
ইন্ধনদাতা মূল সংগঠন | হিযবুত তাহরীর (Hizb ut-Tahrir - নিষিদ্ধ ঘোষিত প্যান-ইসলামিস্ট দল)। |
অভ্যুত্থানকারীদের মূল লক্ষ্য | গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাত, শরিয়াহ আইন প্রয়োগ ও খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া। |
যেভাবে ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয় | একজন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তার সততা ও সেনাসদরের মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স (MI)-এর সময়োপযোগী কাউন্টার-অপারেশন। |
ফলাফল ও পরিণতি | সামরিক আদালতে (Court Martial) বিচার, অভিযুক্তদের চাকরিচ্যুতি ও কারাদণ্ড; সামরিক বাহিনীতে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার। |
বিভিন্ন দেশে হিযবুত তাহরীরের সেনা অভ্যুত্থানের ব্যর্থ প্রচেষ্টা
হিযবুত তাহরীর তাদের ‘নুসরাহ’ (সামরিক বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সহযোগিতায় ক্ষমতা গ্রহণ) তত্ত্ব কেবল আদর্শিক বই-পুস্তকে সীমাবদ্ধ রাখেনি। ইসলামিক খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তারা সশস্ত্র বাহিনীর ভেতর গোপন সেল তৈরি করে ক্ষমতার শীর্ষবিন্দু দখল করার এই কৌশল বাস্তবায়নে বারবার প্রয়াসী হয়েছে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা তাকীউদ্দীন আন-নাবহানীর মতাদর্শ অনুযায়ী, একটি সমাজে দাওয়াতী কাজের পাশাপাশি সামরিক শক্তিকে নিজ পক্ষে আনা অপরিহার্য। এই দর্শনের আলোকেই গত কয়েক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অনুগত গোষ্ঠী তৈরি করে ক্ষমতা দখলের একাধিক সুনির্দিষ্ট ও প্রত্যক্ষ চেষ্টা চালিয়েছে সংগঠনটি।
মধ্যপ্রাচ্যে প্রাথমিক সামরিক চক্রান্ত (১৯৬০, ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশক)
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা তাকীউদ্দীন আন-নাবহানীর জীবদ্দশাতেই মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক রাষ্ট্রে শাসনক্ষমতা দখলের চেষ্টা করা হয়:
জর্ডান (১৯৬৮ ও ১৯৬৯): ১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালে জর্ডানি সশস্ত্র বাহিনীর উচ্চপদস্থ ও মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের মতাদর্শিকভাবে প্রভাবিত করে সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালায় হিযবুত তাহরীর। তৎকালীন জর্ডানি গোয়েন্দা সংস্থার সময়োপযোগী তৎপরতায় এই ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হয়, যার ফলে অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের বহিষ্কার ও সামরিক আদালতে দণ্ড প্রদান করা হয়। এই ব্যর্থতার পর আন-নাবহানী নিজেই জর্ডান থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
সিরিয়া ও ইরাক: ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে সিরিয়ার ক্ষমতাসীন বাথ পার্টিকে উৎখাত করে খেলাফত কায়েমের লক্ষ্যে সামরিক বাহিনীতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালানো হয়। তবে তৎকালীন কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও গোয়েন্দা নজরদারির কারণে চক্রান্তটি শুরুতেই নস্যাৎ করা হয়। একইভাবে ১৯৬৯ ও ১৯৭২ সালে ইরাকি সামরিক অফিসারদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে সেখানেও তাদের একাধিক কর্মী ও সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
মিশর (১৯৭৪): ১৯৭৪ সালে মিশরের 'টেকনিক্যাল মিলিটারি একাডেমি' (আল-ফান্নিয়্যা আল-আসকারিয়্যা) আক্রমণ এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে উৎখাত করার চেষ্টা চালানো হয়। সালেহ সিরিয়া নামক এক নেতার নেতৃত্বে পরিচালিত এই চক্রান্তের পেছনে হিযবুত তাহরীরের নুসরাহ কৌশলের প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল। মিশরীয় নিরাপত্তা বাহিনী এই অভ্যুত্থান চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করে, যার ফলে বিচারে সালেহ সিরিয়াসহ বেশ কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
টিউনিশিয়া (১৯৮৩): ১৯৮৩ সালে টিউনিশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী এবং নিরাপত্তারক্ষীদের একটি অংশকে উদ্বুদ্ধ করে সরকার উৎখাতের চেষ্টার অভিযোগে হিযবুত তাহরীরের বেশ কয়েকজন সদস্য ও সামরিক সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সামরিক ট্রাইব্যুনালে সাজা দেওয়া হয়।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অনুপ্রবেশ ও ষড়যন্ত্র (২০১০-২০১১)
দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের নেটওয়ার্ক বিস্তারের পর পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান এবং ভৌগোলিক কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীতে নজর দেয় হিযবুত তাহরীর।
পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানে প্রভাব বিস্তারে হিযবুত তাহরীর দেশটির সামরিক বাহিনীতে বিশেষ নজর দেয়। ২০১১ সালের মে মাসে রাওয়ালপিন্ডির সেনাসদর দপ্তরে (GHQ) কর্মরত ব্রিগেডিয়ার আলী খানসহ চারজন সামরিক কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত হিযবুত তাহরীরের শীর্ষ নেতাদের (বিশেষ করে মুখপাত্র নাভিদ বাট) সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন। এই গোষ্ঠীটি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভেতরে একটি গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করে শীর্ষ নেতৃত্বকে উৎখাত করা এবং পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ খেলাফতী শাসনকাঠামোর অধীনে নেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। পরবর্তীতে ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্সালের (FGCM) মাধ্যমে ২০১২ সালে ব্রিগেডিয়ার আলী খানসহ অভিযুক্তদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর আগেও ২০০৩ ও ২০০৯ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একাধিক তরুণ অফিসারকে হিযবুত তাহরীরের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল।
মধ্য এশিয়া ও বিশ্বব্যাপী নুসরাহ কৌশলের ধারাবাহিক ব্যর্থতা
১৯৯০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মধ্য এশিয়ার নতুন স্বাধীন হওয়া দেশগুলোতে, বিশেষ করে উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানে হিযবুত তাহরীর দ্রুত তাদের কাজ বিস্তার করে। সেখানেও সরকারের সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে অনুগত দল তৈরির চেষ্টা করা হয়। ২০০-এর দশকের শুরুর দিকে উজবেক সরকারের কঠোর গোয়েন্দা নজরদারির কারণে তাদের সামরিক অনুপ্রবেশের সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যায় এবং হাজার হাজার ক্যাডার গ্রেপ্তার হয়।
হিযবুত তাহরীর জনসম্পৃক্ততাহীন ও সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে অনুগত গোষ্ঠী তৈরির এই ‘নুসরাহ’ কৌশল ব্যবহার করে গত অর্ধশতকে বিশ্বের একাধিক দেশে সরকার উৎখাতের চেষ্টা চালিয়েছে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে আধুনিক সামরিক গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কাছে তাদের এই ষড়যন্ত্রগুলো ধরা পড়েছে। ফলে সংগঠনটি অর্জনের চেয়ে নিজেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক বাহিনীতে কঠোর নজরদারিই বেশি ত্বরান্বিত করেছে।
হিযবুত তাহরীর যেভাবে বাংলাদেশে সেনা অভ্যুত্থান ঘটাতে চেয়েছিল
হিযবুত তাহরীরের কৌশল ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম, মনস্তাত্ত্বিক ও দীর্ঘমেয়াদী। তারা মূলত তিনটি ধাপে সামরিক বাহিনীতে অনুপ্রবেশ ও অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল:
আবেগ ও ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার
হিযবুত তাহরীরের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মতাদর্শের একটি মূল ভিত্তি হলো 'নুসরাহ' (Nusrah) বা ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে সামরিক বাহিনীর অস্ত্র ও সমর্থনের ওপর নির্ভর করা। তারা মনে করে, গণতান্ত্রিক বা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নয়, বরং সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরের ইসলামপন্থী অংশকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করাই খেলাফত প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ। ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডি-পরবর্তী সামরিক বাহিনীর ভেতরের মানসিক বিশৃঙ্খলা ও অসন্তোষের সুযোগ নিয়ে সংগঠনটি এই কৌশল প্রয়োগ তীব্র করে।
প্রচারণামূলক নেটওয়ার্ক: মহাখালী, মিরপুর, উত্তরা ও কচুক্ষেতসহ সেনানিবাস সংলগ্ন ডিওএইচএস (DOHS) এলাকা ও পার্শ্ববর্তী মসজিদগুলোকে তারা মূল প্রচারকেন্দ্র হিসেবে বেছে নেয়। গোপন স্টাডি সার্কেল বা ‘হালাকা’ পরিচালনার পাশাপাশি কর্মকর্তাদের আবাসিক ঠিকানায় নিয়মিত বেনামী চিঠি, 'আল-ওয়াই' নামক প্রচারপত্র, সিডি এবং বিশেষ লিফলেট পৌঁছানো হতো।
ভূ-রাজনীতি ও জাতীয় সার্বভৌমত্বকে ব্যবহার: এসব প্রকাশনায় বাংলাদেশের সাথে প্রতিবেশী ভারতের বাণিজ্য, ট্রানজিট ও সীমান্ত চুক্তি এবং সামরিক সহযোগিতা নীতির তীব্র সমালোচনা করা হতো। তারা প্রচার করতো যে, দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিচ্ছে এবং সার্বভৌমত্ব ও ইসলাম রক্ষার একমাত্র দায়িত্ব সেনা কর্মকর্তাদের ওপরই বর্তায়।
মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের টার্গেট করা
অভ্যুত্থানকারীরা শীর্ষ জ্যেষ্ঠ জেনারেল বা কমান্ডিং অফিসারদের (CO) পাশ কাটিয়ে প্রধানত মেজর ও ক্যাপ্টেন পর্যায়ের তরুণ কর্মকর্তাদের টার্গেট করেছিল। ২০১১ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার নেপথ্যেও এই কৌশলটি সুস্পষ্ট ছিল (যেমন বরখাস্তকৃত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক ও তাঁর সহযোগীদের মাধ্যমে পরিচালিত নেটওয়ার্ক)।
সরাসরি ট্রুপস ও অস্ত্রাগারের নিয়ন্ত্রণ: সিনিয়র অফিসাররা নীতি নির্ধারণ করলেও মধ্যম সারির কর্মকর্তারা সরাসরি ব্যাটালিয়ন, কন্টিনজেন্ট, সাজোঁয়া যান এবং অস্ত্রাগার (Armoury) নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে মাঠপর্যায়ে সরাসরি অস্ত্র হাতে সৈন্য পরিচালনা করার ক্ষমতা কেবল এই তরুণ কর্মকর্তাদেরই ছিল।
মনস্তাত্ত্বিক প্রলোভন ও পরিবর্তনশীল মানসিকতা: জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের তুলনায় তরুণ অফিসাররা সিস্টেম, ক্যারিয়ার প্রমোশন ও তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দ্রুত প্রভাবিত হতেন। তাদের ভেতরের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখানো সহজ ছিল।
কম্পার্টমেন্টালাইজড সেল কাঠামো: তারা অত্যন্ত গোপনে 'সেল' পদ্ধতিতে কাজ করত। একজন কর্মকর্তা কেবল তাঁর সমন্বয়কারী এবং দু-একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে চিনতেন। এনক্রিপ্টেড চ্যাট, বেনামী ইমেইল ও নিভৃত স্থানে বৈঠকের মাধ্যমে তারা এমনভাবে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটালিয়ন কমান্ডারকে ভিড়াতে চেয়েছিল, যাতে একটি নির্দিষ্ট রাতে ঢাকা সেনানিবাস থেকে সরাসরি সৈন্য নিয়ে সেনাসদর, বঙ্গভবন ও প্রধান কার্যালয় ঘেরাও করা সম্ভব হয়।
কৌশলগত অসন্তোষ সৃষ্টি
পিলখানা ট্র্যাজেডিতে ৫৭ জন অভিজ্ঞ সেনা কর্মকর্তার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর ভেতরে যে তীব্র ক্ষোভ ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, হিযবুত তাহরীর তাকে একটি আদর্শিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
প্রাতিষ্ঠানিক অসন্তোষ উস্কে দেওয়া: তারা সেনা সদস্যদের মধ্যে প্রচার করতে থাকে যে, সরকারের কারণে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার বিঘ্নিত হচ্ছে এবং সেনাবাহিনীতে ইসলামি নিয়মকানুন বা ধর্মচর্চায় বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। কিছু তরুণ কর্মকর্তার মনে তারা এটি গেঁথে দিতে পেরেছিল যে, বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থা উল্টে দিয়ে ক্ষমতা দখল করাই তাদের পরম ঈমানী দায়িত্ব।
দ্রুত সামরিক দখলের ব্লুপ্রিন্ট: তাদের পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত দ্রুতগতির অভিযান পরিচালনা করা। সীমিত কিন্তু সুসংগঠিত সশস্ত্র ইউনিট ব্যবহার করে সেনানিবাসের চেইন অফ কমান্ড অকার্যকর করা, সিনিয়র অফিসারদের বন্দি করা এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বেতার কেন্দ্র দখল করে দেশের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
জনসমর্থন আদায়ের মনস্তত্ত্ব: তারা ভেবেছিল, সেনাসদর বা বঙ্গভবন দখল করে একতরফাভাবে 'খেলাফত' ঘোষণা করতে পারলে সাধারণ সৈনিকদের একটি বড় অংশ এবং ধর্মপ্রাণ জনগণ আবেগের বশবর্তী হয়ে তাদের এই সিদ্ধান্ত মেনে নেবে ও সমর্থন যোগাবে।
এই সেনা অভ্যুত্থান কি সফল হতে পারতো?
সাময়িক উত্তেজনা ও কিছু চক্রান্তকারী কর্মকর্তার বিভ্রান্তি সত্ত্বেও সামরিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, ২০১১ সালের ডিসেম্বরে পরিকল্পিত এই অভ্যুত্থান চেষ্টা সফল হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এর সাফল্যের সম্ভাবনা ছিল শূন্যের কাছাকাছি।
তৎকালীন সামরিক গোয়েন্দা পরিদপ্তরের (ডাইরেক্টরেট অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স) তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক নিষিদ্ধ উগ্রবাদী সংগঠন 'হিযবুত তাহরীর'-এর আদর্শিক মদদে একদল মধ্যম সারির কর্মকর্তা এই চক্রান্ত সাজিয়েছিল, যা সেনাবাহিনীর সুদৃঢ় অভ্যন্তরীণ কাঠামোর সামনে শুরুতেই ভেস্তে যায়। এর প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
সুদৃঢ় চেইন অব কমান্ড ও প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারিত্ব: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি সুশৃঙ্খল, সুসংগঠিত এবং চেইন অব কমান্ড ভিত্তিক পেশাদার প্রতিষ্ঠান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মহান চেতনা এবং সুদীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই বাহিনীতে একদল বা কতিপয় মেজরের নির্দেশে পুরো বাহিনী চালিত হওয়া অসম্ভব। সেনাপ্রধান, ফর্মেশন কমান্ডার, ডিভিশনাল জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (GOC) এবং সাধারণ জোয়ানদের মধ্যবর্তী যে সুনির্দিষ্ট ও জটিল কমান্ড কাঠামো রয়েছে, তা ভেঙে কতিপয় মেজরের কথা শুনে গোটা সেনাবাহিনী রাজপথে নেমে আসবে এমন ধারণা ছিল হিযবুত তাহরীরের চরম রাজনৈতিক ও সামরিক অপক্কতা। তৎকালীন মেজর জিয়াউল হক (মেজর জিয়া) ও তার সহযোগীরা ভেবেছিলেন ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট ব্যবহার করে মধ্যম সারির কয়েকজন কর্মকর্তার নির্দেশে বিপুলসংখ্যক সেনাসদস্যকে পরিচালনা করা সম্ভব, যা বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল।
অনুগত সেনা কর্মকর্তার দেশপ্রেম ও কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স অপারেশন: অভ্যুত্থানের মূল পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায় চক্রান্তকারীদের নিজেদের ভুলে এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সততার কারণে। চক্রান্তকারীরা (মেজর জিয়া ও অবসরপ্রাপ্ত লেফট্যানেন্ট কর্নেল এহসানসহ চক্রটি) যখন তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অন্য একজন অত্যন্ত অনুগত ও পেশাদার জ্যেষ্ঠ ব্রিগেড কমান্ডার/সিনিয়র অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে দলে টানার চেষ্টা করে, তখনই মূল গোপনীয়তা বিনষ্ট হয়। সেই সিনিয়র কর্মকর্তা দেশের সংবিধান, সামরিক বাহিনীর শপথ ও পেশাদারিত্বের প্রতি অনুগত থেকে সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সেনাসদরকে অবহিত করেন।
খবর পাওয়ামাত্রই সেনাসদরের মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স (MI) ও ডিজিএফআই (DGFI) একটি যৌথ কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স অপারেশন শুরু করে। চক্রান্তকারীদের প্রতিটি ইমেইল বার্তা, কল রেকর্ড, এনক্রিপ্টেড চ্যাট ও গতিবিধি ২৪ ঘণ্টা কড়া নজরদারিতে আনা হয়। ফলে কোনো দল সামরিক যান বা অস্ত্র নিয়ে ব্যারাক থেকে বের হওয়ার আগেই ২০১২ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি উদঘাটিত হয় এবং মূল চক্রটিকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার বা বরখাস্ত করা হয়।
সাধারণ সৈনিকদের (Troops) মানসিকতা ও আনুগত্য: সেনাবাহিনীর মূল শক্তি হলো সাধারণ সৈনিকরা। যেকোনো সামরিক অভ্যুত্থান সফল করতে হলে পদাতিক ও সাঁজোয়া বাহিনীর জোয়ানদের সরাসরি সমর্থন লাগে। তবে সাধারণ জোয়ানরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং তারা কেবল তাদের প্রত্যক্ষ অধিনায়ক (Unit Commander) ও সেনাসদরের প্রাতিষ্ঠানিক আদেশ মান্য করে। ধর্মীয় চরমপন্থা বা উগ্রবাদী কোনো গোষ্ঠীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাধারণ সৈনিকরা কখনোই নিজেদের কমান্ডারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে না। মেজর জিয়া বা হিযবুত তাহরীরের কাছে এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব, সাংগঠনিক ভিত্তি বা জনপ্রিয়তা ছিল না যা দিয়ে তারা হাজার হাজার সৈনিককে বিভ্রান্ত করতে পারে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও জোয়ানদের একটি বড় অংশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping) দায়িত্ব পালন করে বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ও আর্থিক পেশাদারিত্ব বজায় রাখেন। উগ্রবাদী কোনো অভ্যুত্থানে জড়ালে পুরো বাহিনীর ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি ধ্বংস হতে পারে এই চরম বাস্তবতা সেনাসদস্যদের অজানা ছিল না। ফলে কট্টরপন্থীদের আদর্শিক ডাকে সাড়া দিয়ে নিজেদের পেশাগত ও আন্তর্জাতিক অবস্থান বিসর্জন দেওয়ার মতো পরিবেশ সামরিক বাহিনীতে ছিল না।
কৌশলগত লজিস্টিকস ও ফায়ারপাওয়ারের অনুপস্থিতি: একটি সফল অভ্যুত্থানের জন্য ভারী অস্ত্রশস্ত্র, সাঁজোয়া যান (ট্যাংক বা এপিসি), কৌশলগত ইউনিটগুলোর পূর্ণ সমর্থন এবং গণমাধ্যম/যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। ২০১১ সালের চক্রান্তকারীদের কাছে এই ধরনের কোনো ফায়ারপাওয়ার বা কৌশলগত লজিস্টিক সাপোর্ট ছিল না। পুরো চক্রান্তটি মূলত কয়েকটি গোপন বৈঠক ও ডিজিটালি উগ্রবাদী বার্তা ছড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, যা একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রযন্ত্র বা সেনাসদরকে অচল করার জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত ছিল।
২০০৯ পরবর্তী উচ্চ সতর্কাবস্থা: ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডির পর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বাহিনীর ভেতর যেকোনো ধরনের অসাংবিধানিক তৎপরতা, বিশৃঙ্খলা বা উগ্রবাদী ভাবধারা রোধে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় (High Alert) ছিল। এই ধরণের নজরদারি ও নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে কোনো উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর পক্ষে বড় ধরনের সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানো কার্যত অসম্ভব ছিল।
হিযবুত তাহরীর কি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ‘খেলাফত’ শাসন শুরু করতে পারতো?
যদি কাল্পনিকভাবে ধরেও নেওয়া হয় যে, তারা সাময়িকভাবে সেনানিবাসের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছিল, তথাপি বাংলাদেশে হিযবুত তাহরীরের পক্ষে ক্ষমতা দখল করে ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব ও অলীক একটি কল্পনা ছিল। এর পেছনে বিদ্যমান বস্তুনিষ্ঠ, ভূ-রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণগুলো হলো:
জনগণের রাজনৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং সর্বজনীন প্রতিরোধ: বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি শতবছরের সুফিবাদী ঐতিহ্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর প্রতিষ্ঠিত। দেশের সিংহভাগ মানুষ ধর্মপ্রাণ হলেও কট্টর থিওক্রেটিক বা আফগানিস্তানের তালেবান-শৈলীর চরমপন্থী শাসনব্যবস্থার প্রতি তাদের কোনো সমর্থন নেই। হিযবুত তাহরীর মূলত উচ্চবিত্ত ও নগরকেন্দ্রিক শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে গোপনে সক্রিয় একটি চরমপন্থী দল, যাদের গ্রামে কিংবা সাধারণ জনগণের মাঝে কোনো তৃণমূল ভিত্তি নেই। তারা রাতারাতি কোনো শাসন চাপিয়ে দিলে দেশের সর্বস্তরের রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন, নারী সমাজ ও সাধারণ শ্রমিক শ্রেণী স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতো।
পেশাদার সেনাবাহিনীর কাউন্টার-অপারেশন ও শৃঙ্খলা: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি সুশৃঙ্খল, পেশাদার এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরীক্ষিত সামরিক বাহিনী, যা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অন্যতম শীর্ষ অবদানকারী। কতিপয় বিপদগামী বা উগ্রবাদে প্রভাবিত কর্মকর্তার মাধ্যমে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি করা গেলেও বাহিনীর মূল চেইন অব কমান্ড ভেঙে ফেলা অসম্ভব। বিদ্রোহের খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পদাতিক, আর্মার্ড, আর্টিলারি এবং স্পেশাল ফোর্স ব্রিগেডগুলো তাৎক্ষণিকভাবে অভিযানে নামতো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মূল বাহিনীর সমন্বিত সামরিক অভিযানের মুখে এই ক্ষুদ্র চরমপন্থী চক্রটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেত।
ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণ: বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে তিন দিক থেকে ভারত দ্বারা বেষ্টিত এবং বঙ্গোপসাগরের সংবেদনশীল সামুদ্রিক সীমানায় অবস্থিত। বঙ্গোপসাগরীয় ও দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে কোনো নিষিদ্ধ প্যান-ইসলামিস্ট সংগঠনের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল কোনো আঞ্চলিক পরাশক্তিই মেনে নিত না। বিশেষ করে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও সীমান্ত স্থিতিশীলতার প্রশ্নে এটি সরাসরি হুমকি তৈরি করতো। এমন পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার অজুহাতে আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সামরিক হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে উঠতো। কোনো শক্ত আঞ্চলিক মিত্র বা ভৌগোলিক গভীরতা (Strategic Depth) ছাড়া এই বাস্তবতায় তারা এক দিনও টিকে থাকতে পারতো না।
আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক ধস ও ব্যাংকিং অচলাবস্থা: একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব। জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন এবং প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলো (যেমন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক) হিযবুত তাহরীরকে চরমপন্থী বা নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে গণ্য করে। অভ্যুত্থানের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নেমে আসতো। তৈরি পোশাক খাত (RMG), যা দেশের রপ্তানি আয়ের মূল ভিত্তি, তা তাত্ক্ষণিক বন্ধ হয়ে যেতো। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক (SWIFT) থেকে বিচ্ছিন্ন হলে প্রবাসী আয় (Remittance) আসা বন্ধ হতো, ফলে চরম খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়ে পুরো দেশ অর্থনৈতিক ধসে তলিয়ে যেতো।
সাংগঠনিক দুর্বলতা ও 'নুসরাহ' কৌশলের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা: হিযবুত তাহরীরের কৌশল হলো সামরিক বাহিনীর ভেতর থেকে 'নুসরাহ' বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ খোঁজা। তবে তাদের নিজস্ব কোনো সুসংগঠিত ক্যাডার বাহিনী, সশস্ত্র উইং বা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নেই। কেবল গোপন লিফলেট বিতরণ ও সামরিক চক্রান্তের ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা গেলেও আধুনিক রাষ্ট্রের হাজারো জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া পরিচালনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
মূলধারার আলেম-ওলামা ও ইসলামি দলগুলোর বিরোধিতা: হিযবুত তাহরীরের খিলাফত সংক্রান্ত তত্ত্বীয় ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক দর্শন বাংলাদেশের মূলধারার ইসলামি চিন্তাবিদদের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। কওমি/দেওবন্দি আলেম সমাজ (যেমন হেফাজতে ইসলাম), আহলে হাদিস, সুফি-সুন্নি ঐতিহ্যবাহী দলসমূহ এবং মূলধারার রাজনৈতিক ইসলামি দলগুলো হিযবুত তাহরীরের মতাদর্শকে বিচ্যুত ও উগ্রপন্থী মনে করে। ধর্মভিত্তিক অন্যান্য দল বা আলেমদের কোনো সমর্থন না থাকায় তারা সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আস্থা লাভ করতেও পুরোপুরি ব্যর্থ হতো।
গোয়েন্দা সংস্থা ও বিশেষায়িত কাউন্টার-টেররিজম সক্ষমতা: বাংলাদেশের কাউন্টার-টেররিজম ইউনিটসমূহ (যেমন CTTC, ATU, RAB এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ) দীর্ঘদিন ধরে উগ্রপন্থী ও নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর নেটওয়ার্ক মনিটর করে আসছে। আধুনিক নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতার কারণে এ ধরনের সংগঠনের পক্ষে জাতীয় স্কেলে সামরিক ক্যু বা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতা দখলের লজিস্টিক প্রস্তুতি নেওয়া অসম্ভব। প্রাথমিক স্তরেই এই ধরনের ষড়যন্ত্র চিহ্নিত হয়ে আইনপ্রয়োগকারী বাহিনীর অভিযানে নস্যাৎ হয়ে যেতো।
বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও বিচার বিভাগের অসহযোগিতা: একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কেবল বন্দুকের শক্তি যথেষ্ট নয়; অর্থ মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বিচার বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ পরিচালন ক্ষমতা প্রয়োজন। হিযবুত তাহরীরের মতো চরমপন্থী গোষ্ঠীর বেআইনি নির্দেশনার সামনে দেশের পুরো বেসামরিক প্রশাসন অচল হয়ে যেতো। সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তা ও আমলাদের চরম অসহযোগিতার কারণে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র মুহূর্তে অকার্যকর হয়ে পড়তো।
ফলাফল, বিচারিক প্রক্রিয়া ও দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব
২০১১ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টা নস্যাৎ হওয়ার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বেশ কিছু কঠোর ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করে:
সামরিক আদালতে কঠোর বিচার প্রক্রিয়া: ২০১১ সালের ডিসেম্বরে সেনাবাহিনীতে ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সামরিক আইন (Army Act) অনুযায়ী অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত আদালত (Court of Inquiry) গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ কোর্ট মার্শাল (Court Martial) প্রতিষ্ঠা করা হয়।
বিচারে মূল অভিযুক্তদের বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং সামরিক মর্যাদা, ব্যাজ ও পেনশন সুবিধা বাতিলসহ বাহিনী থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হয়। ঘটনার সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত বা তথ্যের অপ্রতুলতার কারণে ক্যু-তে সরাসরি যুক্ত প্রমাণিত না হওয়া কয়েকজন কর্মকর্তাকে সেনাবাহিনী থেকে প্রাক-প্রভাবিত মেয়াদের আগেই অকাল অবসর বা প্রশাসনিক শাস্তি প্রদান করে অপসারণ করা হয়।
পলাতক মেজর জিয়া: অভ্যুত্থানের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক (মেজর জিয়া) সেনাসদস্যদের গ্রেফতারের পরিকল্পনা টের পেয়ে সেনানিবাস থেকে কৌশলে পালিয়ে আত্মগোপন করেন।
সামরিক শৃঙ্খলা থেকে পালিয়ে তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী সংগঠনের অনুসারী গোষ্ঠী 'আনসারউল্লাহ বাংলা টিম' (পরবর্তীতে 'আনসার আল ইসলাম', যা ভারতীয় উপমহাদেশের আল-কায়েদা বা AQIS-এর বাংলাদেশ শাখা) এর সামরিক কমান্ডারের দায়িত্ব নেন।
২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে সংঘটিত বেশ কয়েকজন মুক্তমনা লেখক, ব্লক প্রকাশনা ও মানবাধিকার কর্মী (যেমন অভিজিৎ রায়, ফয়সল আরেফিন দীপন, জুলহাস মান্নান) হত্যাকাণ্ডের প্রধান নকশাকার ও নির্দেশদাতা হিসেবে তদন্তে তার নাম উঠে আসে।
সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল একাধিক হত্যা মামলায় পলাতক জিয়াকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে গ্রেফতারের জন্য ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে 'রেড নোটিশ' জারি করে।
সেনাবাহিনীতে কাউন্টার-রেডিক্যালাইজেশন: এই ঘটনার পর নিষিদ্ধ ঘোষিত 'হিযবুত তাহরীর' বা অন্যান্য চরমপন্থী গোষ্ঠীর সামরিক বাহিনীতে ছদ্মবেশে মতাদর্শ ছড়ানোর চেষ্টা চিরতরে নস্যাৎ করতে অভূতপূর্ব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আনা হয়।
ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই) এবং কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর নজরদারি সক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানো হয়। কর্মকর্তা ও সৈনিকদের গতিবিধি এবং সন্দেহভাজন বহিরাগত নেটওয়ার্কের সাথে যোগাযোগের ওপর গভীর তদারকি শুরু হয়।
নতুন নিয়োগ ও নিয়মিত পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার মাধ্যমে চরমপন্থী প্রবণতা যাচাই ব্যবস্থা চালু হয়। সেনানিবাসের অভ্যন্তরের মসজিদগুলোতে নিয়োজিত ইমামদের মাধ্যমে ইসলামের সহনশীল ও বিভ্রান্তিমুক্ত বার্তা নিয়মিত প্রচার নিশ্চিত করা হয়।
ডিজিটাইজেশন, সাইবার নিরাপত্তা ও কঠোর আইটি নীতি: উগ্রবাদীরা প্রধানত এনক্রিপ্টেড ডিজিটাল মাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে সেনা সদস্যদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। এই হুমকি মোকাবেলায় একটি সমন্বিত 'সামরিক আইটি সিকিউরিটি পলিসি' প্রণয়ন করা হয়।
সেনাসদস্যদের ব্যক্তিগত ডিজিটাল ডিভাইস, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট এবং এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশিকা তৈরি করা হয়।ডিজিএফআই-এর অধীনে একটি বিশেষ সাইবার উইং গঠন করা হয় যা সেনানিবাস এলাকায় ইন্টারনেট ট্রাফিক ও ডিজিটাল যোগাযোগের গতিপ্রকৃতির ওপর নজর রাখে, যাতে যেকোনো সম্ভাব্য ডিজিটাল অনুপ্রবেশের শুরুতেই পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
উপসংহার
২০১১ সালের ডিসেম্বরে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও তৎকালীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হিযবুত তাহরীর ও কয়েকজন পথভ্রষ্ট কর্মকর্তার একটি দুঃসাহসিক ও চরম অবাস্তব চক্রান্ত। তারা সেনাবাহিনীর পেশাদারত্বকে অবমূল্যায়ন করেছিল এবং বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ ভুলভাবে পরিমাপ করেছিল।
সেনাবাহিনীর নিজস্ব দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের সততা এবং সেনাসদরের পেশাদার গোয়েন্দা তৎপরতার কারণে এই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কোনো রাজনৈতিক বা চরমপন্থী গোষ্ঠীর হাতের পুতুল নয়; এটি একটি সুশৃঙ্খল ও পেশাদার বাহিনী।
বাংলাদেশে কোনো উগ্রবাদী শক্তি বা নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মধ্যযুগীয় বা কট্টরপন্থী শাসন চাপিয়ে দেওয়া অসম্ভব। দেশের সাধারণ জনগণ এবং সামরিক বাহিনী সর্বদা অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক এবং সার্বভৌম বাংলাদেশের সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ।
পরিশেষে, এই ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টাটি বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে একটি কঠিন শিক্ষা হিসেবে কাজ করেছে, যা সশস্ত্র বাহিনীকে আরও সতর্ক, শৃঙ্খলিত এবং পেশাদার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা রেখেছে।
তথ্যসূত্র:
১. আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (ISPR) প্রেস বিজ্ঞপ্তি (১৯ জানুয়ারি, ২০১২): ঢাকা সেনানিবাসের আইএসপিআর মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ মাসুদ রাজ্জাক এবং পার্সোনেল সার্ভিসেস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তারেকুল ইসলাম কর্তৃক পাঠকৃত লিখিত বক্তব্য।
২. স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন (২২ অক্টোবর, ২০০৯): উগ্রপন্থা ও রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার অভিযোগে 'হিযবুত তাহরীর বাংলাদেশ'কে নিষিদ্ধ করে জারিকৃত সরকারি প্রজ্ঞাপন।
৩. পিলখানা বিডিআর বিদ্রোহ তদন্ত কমিশন রিপোর্ট (২০০৯): ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সেনা কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গঠিত জাতীয় তদন্ত কমিটি ও সামরিক তদন্ত কমিটির মূল প্রতিবেদন।
৪. বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আইনের (Army Act) আওতাধীন নথি: ২০১১-২০১২ সালে গঠিত ‘কোর্ট অব ইনকোয়ারি’ (Court of Inquiry) এবং সমকক্ষ সামরিক আদালতের বিচারিক তথ্যাদি।
৫. প্রথম আলো: "সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থানচেষ্টা নস্যাৎ: ১৬ কর্মকর্তা জড়িত, নেপথ্যে হিযবুত তাহরীর" (প্রকাশিত: ২০ জানুয়ারি, ২০১২)।
৬. বিবিসি নিউজ (BBC News): "Bangladesh army 'foils coup plot by radical officers'" (প্রকাশিত: ১৯ জানুয়ারি, ২০১২)।
৭. রয়টার্স ও আল জাজিরা (Reuters & Al Jazeera): "Bangladesh army says foils coup attempt against government" (প্রকাশিত: জানুয়ারি, ২০১২)।
৮. ডন (Dawn - Pakistan): "Brigadier Ali Khan court-martialled over Hizb ut-Tahrir links" (প্রকাশিত: ২০১২) — পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার আলী খানের ব্যর্থ চক্রান্ত সংক্রান্ত নথিপত্র।
৯. Taji-Farouki, Suha (1996): A Fundamental Quest: Hizb al-Tahrir and the Search for the Islamic Caliphate (হিযবুত তাহরীরের গঠন, 'নুসরাহ' মতাদর্শ ও কৌশলগত ইতিহাস)।















