ফাতেমা - বেগম খালেদা জিয়ার ছায়া হয়ে থাকা এক নিঃস্বার্থ ত্যাগ
কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে একদিন এক প্রবীণ বিএনপি নেতা ফাতেমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, "ফাতেমা, তুমি তো এখন সেলিব্রিটি। বাইরে গিয়ে এমপি ইলেকশন করলে তো তুমি অনায়াসেই পাস করে যাবা। ভোট করবা নাকি?" ফাতেমা সেই কথার কোনো রাজনৈতিক উত্তর দেননি। উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেননি। তিনি কেবল লাজুক হেসে মাথা নিচু করেছিলেন। সেই হাসিতে কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না, ছিল কেবল তার প্রিয় 'ম্যাডাম'-এর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার প্রতিফলন।

TruthBangla

কারাগারের অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে প্রকোষ্ঠ। চারপাশের দেয়ালগুলো যেন বন্দিদশার নির্মম সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই বিষণ্ন পরিবেশে একদিন এক প্রবীণ ও উচ্চপদস্থ বিএনপি নেতা কৌতুহল এবং কিছুটা কৌতুক মেশানো কণ্ঠে ফাতেমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন:
“ফাতেমা, তুমি তো এখন দেশের জাতীয় সেলিব্রিটি। বাইরে গিয়ে যদি এমপি ইলেকশন করো, তবে তো তুমি অনায়াসেই পাস করে যাবা। তা ভোট করবা নাকি?”
ফাতেমা সেই কথার কোনো রাজনৈতিক বা চটকদার উত্তর দেননি। এমনকি উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেননি। তিনি কেবল অত্যন্ত লাজুক ভঙ্গিতে হেসে মাথা নিচু করেছিলেন। সেই সাধারণ হাসিতে কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না, ক্ষমতার লোভ বা পদের মোহ ছিল না; ছিল কেবল তাঁর প্রিয় ‘ম্যাডাম’-এর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা, নিবেদিতপ্রাণ ভালোবাসা আর আত্মত্যাগের এক বিরল প্রতিফলন।
আজ যখন বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে, ক্ষমতার অলিন্দে নতুন নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, ঠিক তখন ফাতেমার এই নীরব ত্যাগের গল্পগুলো আমাদের সমাজের তোষামোদকারী ও সুবিধাবাদী চরিত্রের মুখে এক চরম চপেটাঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। রাজনীতিতে যেখানে সুসময়ে মাছি আর তোষামোদকারীদের ভিড় জমে, সেখানে দুঃসময়ে নিঃস্বার্থভাবে পাশে থাকার মানুষ যে কতটা দুর্লভ, ফাতেমা তা নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন।
ভোলার সাধারণ মেঘনাপাড়ের মেয়ে থেকে গুলশানের ‘ফিরোজা’য়
ফাতেমার জীবনকাহিনি কোনো কাল্পনিক রূপকথা নয়; এটি চরম দারিদ্র্য, কষ্ট এবং সেখান থেকে গড়ে ওঠা এক অসামান্য আত্মত্যাগের বাস্তব উপাখ্যান। ২০০৮ সালের কথা। ভোলার সদর উপজেলার এক অতি সাধারণ নদীভাঙা ও অভাবী সংসারে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। ফাতেমার স্বামী মারা যান। ছোট ছোট সন্তানদের মুখে দুবেলা দুমুঠো অন্ন জোগাতে এবং জীবনসংগ্রামে টিকে থাকতে তিনি ঢাকা শহরে পাড়ি জমান।
ভাগ্যচক্রে ২০০৯ সালে তিনি তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন।
শুরুতে ফাতেমার উপস্থিতি ছিল কেবলই একজন সাধারণ বেতনভুক্ত কর্মচারীর মতো। কিন্তু ফাতেমার নিষ্ঠা, সততা এবং নিখাদ কাজের প্রতি অনুরাগের কারণে খুব দ্রুতই তিনি বেগম খালেদা জিয়ার ঘরের একজন অত্যন্ত অপরিহার্য ও বিশ্বস্ত সদস্য হয়ে ওঠেন। বেগম জিয়ার দৈনন্দিন রুটিন, তাঁর ওষুধের সময়সূচি, শারীরিক সীমাবদ্ধতা, পছন্দ-অপছন্দ সবকিছুই ফাতেমার নখদর্পণে চলে আসে। একজন বেতনভুক্ত কর্মচারী থেকে ফাতেমা হয়ে ওঠেন বেগম খালেদা জিয়ার পরম নির্ভরতার ছায়াসঙ্গী।
২০১৪ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’, বালির ট্রাক ও একলা খালেদা জিয়া
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের আগে বেগম খালেদা জিয়া আন্দোলনকে বেগবান করতে “রোড টু ডেমোক্রেসি” বা “মার্চ ফর ডেমোক্রেসি” কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিলেন। দিনটি ছিল ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর। সারা বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ নেতা-কর্মীকে ঢাকায় আসার উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেদিন রাজনীতির ভেতরের চেহারাটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় তো দূরের কথা, বেগম জিয়ার গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’র সামনের রাস্তা সারিবদ্ধভাবে বালির ট্রাক দিয়ে ব্লক করে দেওয়া হয়েছিল। ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যারিকেডে বন্দি হয়ে পড়েছিলেন দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
সেদিন টেলিভিশনের স্ক্রিনে সারা বিশ্ব দেখেছিল এক নজিরবিহীন দৃশ্য। মূল সারির বড় বড় কেন্দ্রীয় নেতারা যখন গ্রেফতারের ভয়ে বা আত্মরক্ষার তাগিদে গা ঢাকা দিয়েছিলেন, তখন বাসভবনের গেটের ভেতরে ক্ষিপ্ত ও গর্জে ওঠা খালেদা জিয়াকে দেখা যাচ্ছিল। রাগে তাঁর শরীর কাঁপছিল, কণ্ঠে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। কিন্তু সেই কঠিন, একা ও বিপজ্জনক মুহূর্তে তাঁর ঠিক পেছনে, হাতটি শক্ত করে ধরে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন একজনই তিনি ফাতেমা।
চারদিকে যখন শত শত পুলিশের চোখ রাঙানি, মিডিয়ার ক্যামেরার ঝলকানি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, তখন ফাতেমাই ছিলেন সেই বিশ্বস্ত হাত, যা বেগম জিয়াকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছিল। কোনো রাজনৈতিক নেতা সেদিন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাশে দাঁড়াতে না পারলেও, ফাতেমা তাঁর নেত্রীর পাশে পাহাড়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
২০১৮ সালের ঐতিহাসিক কারাদণ্ড ও স্বেচ্ছায় কারাবরণ
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে পুরোনো ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
রাজনীতির ইতিহাসে বহু শীর্ষ নেতা জেলে গেছেন, কিন্তু ফাতেমা সেদিন যা করেছিলেন, তা কেবল বাংলাদেশের ইতিহাসেই নয়, বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসেও এক অভূতপূর্ব ও বিরল ঘটনা। ফাতেমা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না, তিনি নিজে কোনো অপরাধ করেননি, তাঁর নামে কোনো মামলা বা আদালতের সমনও ছিল না। বাইরের মুক্ত ও স্বাধীন আকাশে তাঁর জন্য ছিল নিরাপদ জীবন। কিন্তু তিনি চাইলেন তাঁর অসুস্থ ও প্রবীণ ‘ম্যাডাম’-এর সেবা করার জন্য নিজেই কারাগারে যেতে।
আইনজীবীদের মাধ্যমে আদালতের কাছে বিশেষ আবেদন করা হলো। দীর্ঘ আইনি পর্যালোচনা শেষে আদালত ফাতেমাকে বেগম খালেদা জিয়ার সাথে কারাগারে ব্যক্তিগত সেবিকা হিসেবে থাকার অনুমতি দেন। একজন সাধারণ নারী হয়েও কেবল গভীর ভালোবাসার টানে রাজকীয় জীবনের স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে তিনি কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠকে নিজের বাসস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
পুরোনো জেলখানার স্যাঁতসেঁতে ও নির্জন সেলে তিনি বেগম জিয়ার খাবার প্রস্তুত করা, নিয়মিত ওষুধ দেওয়া, হাঁটাচলায় সাহায্য করা এবং মানসিক সঙ্গ দেওয়ার কাজ করেছেন দিনের পর দিন। বন্দী জীবনে ফাতেমা ছিলেন বেগম জিয়ার চোখ, কান এবং হাত।
"ভোট করবা নাকি, ফাতেমা?"
কারাগারে বন্দি থাকাকালীন সময়ে বিএনপির এক প্রবীণ নেতার সেই মন্তব্য ছিল মূলত তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক নিখুঁত বাস্তবতা। ফাতেমা তখন সারাদেশের মানুষের কাছে এক পরিচিত নাম। সংবাদপত্রের শিরোনাম, টকশো এবং সাধারণ মানুষের চর্চায় ফাতেমা ছিলেন আনুগত্যের এক মহৎ প্রতীক।
যেকোনো সাধারণ মানুষ হলে হয়তো এই খ্যাতির সুযোগ নিয়ে রাজনীতিতে পদ বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করত। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক রাতের পরিচয়ে এমপি বা বড় পদের মনোনয়ন পাওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটে।
কিন্তু ফাতেমার সেই লাজুক নীরব হাসি প্রমাণ করে দিয়েছিল তাঁর ত্যাগের বিশুদ্ধতা।ফাতেমা জানতেন, তাঁর ভালোবাসা কোনো দরদামের বিষয় নয়। তিনি জানতেন, ম্যাডামের সেবা করাটা তাঁর কাছে কোনো রাজনৈতিক পদ পাওয়ার সিঁড়ি নয়, বরং এটি তাঁর ঈমানি ও মানবিক দায়িত্ব।
প্রবীণ নেতার প্রশ্নের জবাবে ফাতেমার সেই মাথা নিচু করা হাসিটি রাজনীতির তথাকথিত বড় বড় নীতি নির্ধারকদের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, আত্মত্যাগের মূল্য কখনো সংসদ সদস্যের আসন বা ক্ষমতার পদের চেয়ে অনেক উঁচুতে অবস্থান করে।
২০২১ সালের করোনাকালের বিভীষিকা ও এভারকেয়ার হাসপাতালের ৫১ দিন
২০২১ সালে যখন পুরো বিশ্ব মরণঘাতী করোনা ভাইরাসের (COVID-19) ভয়ে কাঁপছিল, তখন বাংলাদেশেও মহামারি চরম আকার ধারণ করে। গৃহবন্দি অবস্থায় থাকা বেগম খালেদা জিয়াও এই মরণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হন।
সে সময়ের সামাজিক ও পারিবারিক পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ ছিল, তা সবারই জানা। নিজের জন্মদাতা বাবা-মা বা সন্তানের করোনা হলে মানুষ ছোঁয়াচে হওয়ার ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল, লাশের কাছে পর্যন্ত যেতে চাইছিল না। মানুষের ভেতরের সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কের সব বন্ধন যখন করোনা ভীতিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছিল, তখন ফাতেমা আবার তাঁর অদম্য সাহসের পরিচয় দেন।
বেগম জিয়াকে যখন রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউ (CCU) ও কেবিনে টানা ৫১ দিন জীবনের সাথে লড়াই করতে হয়েছিল, ফাতেমা একদিনের জন্যও তাঁর পাশ থেকে সরেননি। নিজের জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে, দিন-রাত পিপিই (PPE) পরে, গ্লাভস ও মাস্ক দিয়ে মুখ ঢেকে তিনি বেগম জিয়ার পাশেই ছিলেন।
সেই ৫১ দিন ফাতেমা ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি। কখন নেত্রীর অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়, কখন ওষুধ দিতে হবে এই চিন্তায় তিনি প্রহর গুণতেন। যেখানে রক্ত সম্পর্কের অনেক আত্মীয়ও সংক্রমণ ভীতিতে দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন, সেখানে ফাতেমা ছিলেন এক পরম নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট: রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও লন্ডনের পথে ছায়াসঙ্গী
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিনের অন্যায্য বন্দিদশা ও গৃহবন্দিত্ব থেকে পূর্ণ মুক্তি পান।
দীর্ঘদিনের সঠিক চিকিৎসার অভাবে অত্যন্ত জীর্ণ ও জটিল শারীরিক অবস্থায় পৌঁছানো বেগম জিয়াকে যখন উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়, তখনও তাঁর সাথে ছায়ার মতো ছিলেন সেই ফাতেমা।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাজকীয় বিদায় ও মিডিয়ার ভিড়ের মধ্যে যারা গভীর পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, তারা লক্ষ্য করেছেন-
১. হুইলচেয়ারে বসা অসুস্থ ও ক্লান্ত নেত্রীর ঠিক পেছনেই নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন ফাতেমা।
২. তাঁর চোখেমুখে কোনো অহংকার বা ক্যামেরার সামনে আসার তৃপ্তির ছাপ ছিল না।
৩. তাঁর চোখ কেবলই নিবদ্ধ ছিল বেগম জিয়ার অক্সিজেন সিলিন্ডার, তাঁর আরাম এবং স্বাস্থ্যের দিকে।
মিডিয়ার আলো, রাজনৈতিক নেতাদের হুড়োহুড়ি আর স্লোগানের মাঝে ফাতেমা তখনও ছিলেন সেই আগের মতোই নির্লিপ্ত ও দায়িত্বশীল।
শেষ বিদায় ও কফিনের পাশে একাকী ফাতেমা
পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার জীবনাবসানে পুরো দেশ যখন শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় এবং মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখ লাখ মানুষের জানাজা ও শোকমিছিলের ঢল নামে, তখনো ফাতেমার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত বেদনাবিধুর।
সেদিন জানাজায় এমন হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা এসেছিলেন, যাদের অনেকেই ২০১৩ সালের বালির ট্রাকের ব্যারিকেড ভাঙতে রাজপথে আসেননি, কিংবা ২০১৮ সালে বেগম জিয়া যখন কারাবরণে যাচ্ছিলেন তখন দূর থেকে নিরব দর্শক হয়ে দেখছিলেন।
কিন্তু শেষ বিদায়ে, যখন বেগম জিয়ার কফিনের পাশে ক্যামেরা জুম হলো, তখন দেখা গেল সেই একই ফাতেমাকে।
আগের মতোই নিরহংকারী ও স্তম্ভিত চেহারা। চোখে অনবরত ঝরতে থাকা অশ্রুধারা।জীবনের সেরা ১৬-১৭টি বছর যিনি একজনের ছায়া হয়ে কাটিয়েছেন, আজ সেই মূল মানুষটির চিরতরে চলে যাওয়ায় ফাতেমা যেন নিজেও এক জ্যান্ত লাশে পরিণত হয়ে পড়েছিলেন।
ফাতেমার জীবনকাহিনি ও বেগম খালেদা জিয়ার সাথে ত্যাগ
নিচে ফাতেমার জীবনসংগ্রাম, বেগম খালেদা জিয়ার সাথে তাঁর দীর্ঘ পথচলা এবং বিভিন্ন সংকটময় মুহূর্তে তাঁর অবদানের একটি সার্বিক সময়ক্রম তুলে ধরা হলো:
বছর / সময়কাল | ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ঘটনা | ফাতেমার ভূমিকা ও গৃহীত পদক্ষেপ | ঘটনাটির রাজনৈতিক ও মানবিক তাৎপর্য |
২০০৮ - ২০০৯ | স্বামী বিয়োগের পর জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় আগমন এবং ‘ফিরোজা’য় যোগদান। | সাধারণ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করে দ্রুতই ব্যক্তিগত বিশ্বস্ত সেবিকা হয়ে ওঠা। | অতি সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসে কেবল সততা ও কাজের মাধ্যমে শীর্ষ নেত্রীর আস্থা অর্জন। |
২০১৩ (২৯ ডিসেম্বর) | ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ ভেস্তে দিতে ফিরোজার সামনে বালির ট্রাক ও পুলিশ ব্যারিকেড। | কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুপস্থিতিতে একলা খালেদা জিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে হাত শক্ত করে ধরে রাখা। | রাজনৈতিক তোষামোদকারীদের ব্যর্থতার মাঝে এক সাধারণ নারীর অভূতপূর্ব সাহস ও সহমর্মিতা। |
২০১৮ (৮ ফেব্রুয়ারি) | জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার সাজার রায় ও কারাবরণ। | কোনো মামলা বা অপরাধ না থাকা সত্ত্বেও স্বেচ্ছায় আবেদন করে নাজিমউদ্দিন রোডের জেলে গমনাগমন। | বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে কোনো নেত্রীর সেবায় সাধারণ গৃহকর্মীর স্বেচ্ছায় কারাবরণের অনন্য নজির। |
২০১৯ - ২০২০ | নাজিমউদ্দিন রোডের স্যাঁতসেঁতে ও পরিত্যক্ত কারাকক্ষে দীর্ঘ বন্দি জীবন। | ছোট সেলে থেকে বেগম জিয়ার খাবার রান্না, ওষুধ দেওয়া এবং দৈনন্দিন সেবা নিশ্চিত করা। | ক্ষমতার লোভে নয়, কেবল ভালোবাসার টানে রাজকীয় স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে নির্জন কারাবাস। |
২০২১ | দেশে করোনা মহামারির তাণ্ডব এবং বেগম খালেদা জিয়ার কোভিডে আক্রান্ত হওয়া। | জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পিপিই পরিহিত অবস্থায় এভারকেয়ার হাসপাতালে টানা ৫১ দিন অবিরাম সেবা প্রদান। | স্বজন ও রক্ত সম্পর্কের মানুষ যেখানে দূরত্ব রেখেছিল, সেখানে পরম নির্ভরতার প্রতীক হওয়া। |
২০২৪ (৫ আগস্ট) | গণঅভ্যুত্থানের পর বেগম জিয়ার পূর্ণ মুক্তি এবং চিকিৎসার জন্য লন্ডন গমন। | বিমানবন্দরে শত শত মিডিয়া ও নেতার ভিড়ে নেত্রীর হুইলচেয়ার ও অক্সিজেনের খেয়াল রাখা। | জনপ্রিয়তার মোহে না পড়ে নীরবে নিজের দায়িত্ব পালন করে যাওয়া। |
শেষ প্রহর | বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ ও সর্বস্তরের মানুষের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন। | কফিনের পাশে অশ্রুসজল চোখে নীরব ও পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। | জীবনের মূল ছায়াসঙ্গীকে হারিয়ে নিঃস্ব ফাতেমার নিখাদ ভালোবাসার মহাকাব্যিক সমাপ্তি। |
ফাতেমার শিক্ষা: নিখাদ আনুগত্য বনাম আধুনিক রাজনীতির সুবিধাবাদ
ফাতেমার এই দীর্ঘ জীবনসংগ্রাম ও ত্যাগ আমাদের বর্তমান সমাজ ও কলুষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এক বিরাট শিক্ষণীয় পাঠ। আধুনিক রাজনীতিতে ‘সুসময়ের বন্ধু’ বা মাছিদের কোনো অভাব হয় না। ক্ষমতা থাকলে চারপাশ তোষামোদকারী ও আত্মকেন্দ্রিক সুবিধাভোগীদের ভিড়ে গমগম করে। কিন্তু দুঃসময়ে, যখন ক্ষমতার আলো নিভে যায়, তখন অধিকাংশ তোষামোদকারীই প্রথম সুযোগে সরে পড়ে।
ফাতেমার চরিত্র থেকে আমরা তিনটি মৌলিক শিক্ষা পাই:
নিঃস্বার্থ সেবা ও ভালোবাসার বিশুদ্ধতা: ফাতেমা প্রমাণ করেছেন, কাউকে সম্মান বা ভালোবাসতে হলে কোনো রাজনৈতিক পদ, বড় ডিগ্রি বা আর্থিক স্বার্থের প্রয়োজন হয় না। ভালোবাসা আসে মন থেকে।
প্রলোভনহীন অটল বিশ্বাস: জেলখানায় প্রবীণ নেতার সেই কৌতুকপূর্ণ প্রশ্নের মুখেও ফাতেমা বিচলিত হননি। কোনো ক্ষমতা, প্রলোভন বা পদের স্বপ্ন তাঁকে তাঁর দায়িত্ব থেকে একচুলও সরাতে পারেনি।
নীরব আত্মত্যাগ: ফাতেমা কখনোই তাঁর এই ত্যাগের কথা বলে বেড়াননি। তিনি কখনো মিডিয়ার সামনে কোনো সাক্ষাৎকার দিয়ে নিজের অবদান জাহির করেননি। তিনি নীরবে কাজ করে গেছেন এবং ইতিহাসকে বাধ্য করেছেন তাঁর নাম নথিভুক্ত করতে।
আমাদের সমাজে একটি বাস্তবসম্মত রূপক প্রচলিত রয়েছে:
"সুসময়ে যারা ভিড় করে তারা হলো মশা; আর দুঃসময়ে যারা রক্ত দিয়েও কামড়ে ধরে পাশে থাকে, তারাই হলো ফাতেমা।"
বিএনপি ও তারেক রহমানের প্রতি নৈতিক প্রশ্ন
আজ বেগম খালেদা জিয়া আমাদের মাঝে নেই। যে মানুষটির জন্য ফাতেমা নিজের জীবনের সেরা যৌবন, সময়, পরিবার এবং স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়েছেন, সেই মানুষটি আজ চিরতরে বিদায় নিয়েছেন। বিদায়বেলায় ফাতেমা আজ সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন ও একাকী।
এখন সবচেয়ে বড় নৈতিক প্রশ্নটি এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং দলটির নীতি নির্ধারকদের সামনে-
তারা কি ফাতেমার এই দীর্ঘ ১৬-১৭ বছরের অসামান্য ও অভূতপূর্ব ত্যাগের সঠিক মূল্য দেবেন?
ক্ষমতার সম্ভাব্য ভাগবাটোয়ারা কিংবা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ভিড়ে ফাতেমা নামক এই বিরল নারী কি হারিয়ে যাবেন?
ফাতেমা হয়তো রাজনীতি বা ডিপ্লোমেসি বুঝতেন না, কিন্তু তিনি বিশ্বস্ততা ও আনুগত্য বুঝতেন। যে নারী একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেত্রীর জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর বাকি জীবনের সার্বিক নিরাপত্তা, সামাজিক সম্মান এবং সম্মানজনক জীবিকা নিশ্চিত করা দলটির জন্য কেবল কোনো দয়া নয়, বরং এক পরম নৈতিক ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব।
ইতিহাসে ফাতেমার স্থান ও এক অমর মানবিকতা
পৃথিবীর ইতিহাস সাধারণত নির্মিত হয় বড় বড় রাজা-বাদশাহ, সেনাপতি, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক বিপ্লবীদের নামে। কিন্তু সেই ইতিহাসের অন্তরালে থেকে যাওয়া ফাতেমাদের মতো সাধারণ মানুষের গল্পগুলো খুব কমই আলোচিত হয়। ফাতেমা কোনো প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ নন, কোনো বুদ্ধিজীবী বা সিভিল সোসাইটির সদস্য নন। তিনি ছিলেন কেবল একজন অতি সাধারণ নারী, যিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে এক অসাধারণ মানবিক উচ্চতায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন।
বেগম খালেদা জিয়া হয়তো তাঁর অনুসারীদের জন্য এক সুবিশাল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, কিন্তু ফাতেমা আমাদের সমাজের জন্য রেখে গেছেন এক অমূল্য ‘মানবিক ও নৈতিক উত্তরাধিকার’।
যে সমাজে ক্ষমতা আর অর্থের লোভে মানুষ প্রতিদিন নিজের নীতি বিক্রি করে দেয়, সেই সমাজে ফাতেমা এক জ্বলন্ত আলোকবর্তিকা। বাংলার রাজনীতি ও ইতিহাসের পাতায় বেগম খালেদা জিয়ার নামের পাশে ফাতেমার নামটিও চিরকাল এক অনন্য বিশ্বস্ততা, ভালোবাসা এবং প্রতিদানহীন ত্যাগের প্রতিশব্দ হিসেবে অমর হয়ে থাকবে।















