ফাতেমা - বেগম খালেদা জিয়ার ছায়া হয়ে থাকা এক নিঃস্বার্থ ত্যাগ
কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে একদিন এক প্রবীণ বিএনপি নেতা ফাতেমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, "ফাতেমা, তুমি তো এখন সেলিব্রিটি। বাইরে গিয়ে এমপি ইলেকশন করলে তো তুমি অনায়াসেই পাস করে যাবা। ভোট করবা নাকি?" ফাতেমা সেই কথার কোনো রাজনৈতিক উত্তর দেননি। উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেননি। তিনি কেবল লাজুক হেসে মাথা নিচু করেছিলেন। সেই হাসিতে কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না, ছিল কেবল তার প্রিয় 'ম্যাডাম'-এর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার প্রতিফলন।

TruthBangla

Jan 2, 2026
কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে একদিন এক প্রবীণ বিএনপি নেতা ফাতেমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, "ফাতেমা, তুমি তো এখন সেলিব্রিটি। বাইরে গিয়ে এমপি ইলেকশন করলে তো তুমি অনায়াসেই পাস করে যাবা। ভোট করবা নাকি?"
ফাতেমা সেই কথার কোনো রাজনৈতিক উত্তর দেননি। উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেননি। তিনি কেবল লাজুক হেসে মাথা নিচু করেছিলেন। সেই হাসিতে কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না, ছিল কেবল তার প্রিয় 'ম্যাডাম'-এর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার প্রতিফলন। আজ যখন বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে, তখন সেই ফাতেমার ত্যাগের গল্পগুলো আমাদের সমাজের সুবিধাবাদী চরিত্রের মুখে এক চরম চপেটাঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ভোলার সাধারণ মেয়ে থেকে গুলশানের 'ফিরোজায়'
ফাতেমার জীবনকাহিনি কোনো রূপকথা নয়, বরং এটি এক চরম বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ত্যাগের উপাখ্যান। ২০০৮ সালের কথা। ভোলার সদর উপজেলায় এক অভাবী সংসারে ফাতেমার স্বামী মারা যান। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে এবং সন্তানদের মুখে অন্ন জোগাতে তিনি ঢাকায় পাড়ি জমান। ভাগ্যচক্রে ২০০৯ সালে তিনি তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন।
শুরুটা কেবল কাজের সন্ধানে হলেও, খুব দ্রুতই ফাতেমা বেগম জিয়ার ঘরের একজন অপরিহার্য সদস্য হয়ে ওঠেন। বেগম জিয়ার রুটিন, তার ওষুধ, তার পছন্দ-অপছন্দ সবকিছুই ফাতেমার নখদর্পণে চলে আসে। বেতনভুক্ত কর্মচারী থেকে তিনি হয়ে ওঠেন বেগম জিয়ার ছায়াসঙ্গী।
২০১৪ - 'মার্চ ফর ডেমোক্রেসি' ও বালির ট্রাক
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বেগম খালেদা জিয়া "রোড টু ডেমোক্রেসি" বা "মার্চ ফর ডেমোক্রেসি" কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিলেন। দিনটি ছিল ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৩। সারা বাংলাদেশ থেকে নেতা-কর্মীদের ঢাকায় আসার ডাক দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
নয়াপল্টন তো দূর থাক, বেগম জিয়ার গুলশানের বাসভবন 'ফিরোজা'র সামনে সারিবদ্ধভাবে বালির ট্রাক দিয়ে রাস্তা ব্লক করে দেওয়া হয়েছিল। পুলিশি ব্যারিকেডে বন্দি ছিলেন দেশনেত্রী। সেদিন কোনো বড় নেতাকে তার পাশে দেখা যায়নি। জামায়াত-শিবিরের মিছিলে গুলি চললে একজন নিহত হয়, কিন্তু বিএনপির মূল সারির নেতারা সেদিন মাঠে নামতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
সেই উত্তাল সময়ে টিভি ক্যামেরায় আমরা দেখেছিলাম এক ক্ষিপ্ত খালেদা জিয়াকে। রাগে তার শরীর কাঁপছিল, কণ্ঠে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। সেই কঠিন মুহূর্তেও তার হাতটি ধরে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন একজনই তিনি ফাতেমা। চারদিকে যখন শত শত পুলিশ আর গোয়েন্দা নজরদারি, তখন ফাতেমাই ছিলেন সেই বিশ্বস্ত হাত, যা বেগম জিয়াকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছিল।
স্বেচ্ছায় কারাবরণ - বিশ্ব রাজনীতির এক বিরল দৃষ্টান্ত
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। রাজনীতির ইতিহাসে অনেক নেতা জেলে গেছেন, কিন্তু ফাতেমা যা করলেন, তা ছিল নজিরবিহীন। তিনি নিজে কোনো অপরাধ করেননি, তার নামে কোনো মামলা ছিল না। তবুও তিনি চাইলেন তার অসুস্থ 'ম্যাডাম'-এর সেবা করার জন্য কারাগারে যেতে।
আদালতের কাছে আবেদন করা হলো। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর আদালত ফাতেমাকে বেগম জিয়ার সাথে কারাগারে থাকার অনুমতি দেয়। একজন সাধারণ গৃহকর্মী হয়েও কেবল ভালোবাসার টানে রাজকীয় জীবন বা বাইরের স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে তিনি অন্ধকার প্রকোষ্ঠকে বেছে নিয়েছিলেন। ৫ ফুট বাই ৫ ফুটের নির্জন সেলে তিনি বেগম জিয়ার সেবা করেছেন দিনের পর দিন। জেলখানায় ফাতেমা ছিলেন বেগম জিয়ার চোখ, কান এবং হাত।
কেন এই ত্যাগ?
মানুষ সাধারণত ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চায় লাভের আশায়। কিন্তু ফাতেমা ক্ষমতার লোভে নয়, বরং যখন বেগম জিয়া সব হারিয়ে নিঃস্ব, তখনই তার হাত শক্ত করে ধরেছিলেন। এটিই ফাতেমাকে সাধারণ একজন সেবিকা থেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
করোনা মহামারি - যখন রক্ত বিমুখ, তখন ফাতেমা অটল
২০২১ সালে যখন পুরো বিশ্ব করোনা মহামারিতে কাঁপছিল, তখন বেগম খালেদা জিয়াও আক্রান্ত হন। সেই সময়কার পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। অনেক সন্তান তাদের বাবা-মায়ের লাশ ফেলে পালিয়ে যাচ্ছিল, আত্মীয়-স্বজনরা ছোঁয়াচে হওয়ার ভয়ে দূরে থাকছিল।
বেগম জিয়া যখন এভারকেয়ার হাসপাতালে ৫১ দিন জীবনের সাথে পাঞ্জা লড়ছিলেন, ফাতেমা একদিনের জন্যও তাকে ছেড়ে যাননি। পিপিই পরে, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি বেগম জিয়ার পাশেই ছিলেন। সেই ৫১ দিন ফাতেমা ঠিকমতো ঘুমাননি, কেবল তার নেত্রীর একটু আরামের কথা ভেবেছেন। রক্ত সম্পর্কের মানুষও যেখানে দূরত্ব বজায় রাখছিল, সেখানে ফাতেমা ছিলেন আঠার মতো লেগে থাকা এক পরম নির্ভরতা।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও লন্ডনের পথে
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ বন্দিদশা ও গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পান। উন্নত চিকিৎসার জন্য যখন তাকে লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়, তখনও তার সাথে ছায়ার মতো ছিলেন ফাতেমা।
এয়ারপোর্টের সেই দৃশ্যগুলো যারা দেখেছেন, তারা লক্ষ্য করেছেন একজন ক্লান্ত, অসুস্থ নেত্রীর হুইলচেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ফাতেমার চোখেমুখে কোনো তৃপ্তির হাসি নেই, আছে কেবল উদ্বেগের ছাপ। ম্যাডাম সুস্থ আছেন কি না, ঠিকমতো অক্সিজেন পাচ্ছেন কি না এটাই ছিল তার একমাত্র চিন্তা।
বিদায় বেলায় সেই একই ফাতেমা
সম্প্রতি বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে সারা দেশ স্তব্ধ হয়ে যায়। জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নামে। এই বিশাল জনসমুদ্রের মধ্যে অনেকেই হয়তো ছিলেন যারা ২০১৩ সালে বালির ট্রাকের ব্যারিকেড ভাঙতে আসেননি, কিংবা ২০১৮ সালে বেগম জিয়া যখন জেলে যাচ্ছিলেন তখন দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন।
কিন্তু কফিনের পাশে যখন ক্যামেরা জুম হলো, তখন সেখানে আবার দেখা গেল সেই চিরচেনা মুখটি। আগের মতোই নির্লিপ্ত ভঙ্গিমা, কান্নায় ভেজা চোখ আর পাথর হয়ে যাওয়া এক চেহারা। জীবনের অনেকটা সময় যিনি একজনের ছায়া হয়ে কাটিয়েছেন, আজ সেই মানুষটির চিরতরে চলে যাওয়ায় ফাতেমা যেন নিজেও প্রাণহীন হয়ে পড়েছেন।
ফাতেমার শিক্ষা - আনুগত্য বনাম সুবিধাবাদ
ফাতেমার এই গল্প আমাদের সমাজের জন্য এক বড় শিক্ষা। রাজনীতিতে আজ 'সুসময়ের বন্ধু'দের অভাব নেই। ক্ষমতা থাকলে চারপাশ ভরে যায় তোষামোদকারীতে। কিন্তু দুঃসময়ে যারা পাশে থাকে, তারাই হলো প্রকৃত মানুষ।
নিঃস্বার্থ সেবা: ফাতেমা প্রমাণ করেছেন যে, ভালোবাসার জন্য কোনো পদের প্রয়োজন হয় না।
অটল বিশ্বাস: শত প্রলোভন বা ভয়ভীতি তাকে বেগম জিয়ার কাছ থেকে সরাতে পারেনি।
নীরব ত্যাগ: ফাতেমা কখনও মিডিয়ার সামনে এসে তার ত্যাগের বয়ান দেননি। তিনি নীরবে কাজ করে গেছেন।
এই পৃথিবী বড় নিষ্ঠুর। মানুষের ত্যাগ মানুষ খুব দ্রুত ভুলে যায়। এখন প্রশ্ন উঠছে, বিএনপি বা তারেক রহমান কি ফাতেমার এই আজীবনের ত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন করবেন? ফাতেমা হয়তো রাজনীতি বুঝতেন না, কিন্তু তিনি আনুগত্য বুঝতেন।
বেগম জিয়ার অবর্তমানে ফাতেমা আজ অভিভাবকহীন। দলের বড় বড় নেতারা হয়তো ক্ষমতার ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন, কিন্তু এই দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর যিনি জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো তিলে তিলে বিলিয়ে দিয়েছেন, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত।
ইতিহাসে ফাতেমার স্থান
ইতিহাসের পাতায় অনেক বড় বড় যুদ্ধ আর বিপ্লবের কথা লেখা থাকে। কিন্তু সেই ইতিহাসের আড়ালে থেকে যাওয়া ফাতেমাদের মতো মানুষদের গল্প খুব কমই আলোচিত হয়। ফাতেমা কোনো বিখ্যাত রাজনীতিবিদ নন, কোনো বুদ্ধিজীবী নন। তিনি কেবল একজন সাধারণ নারী, যিনি অসাধারণ এক আনুগত্যের উদাহরণ তৈরি করেছেন।
বেগম খালেদা জিয়া হয়তো তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, কিন্তু ফাতেমা রেখে গেছেন 'মানবিক উত্তরাধিকার'। সুসময়ে যারা ভিড় করেন, তারা 'মশা'; আর দুঃসময়ে যারা কামড়ে ধরে পাশে থাকেন, তারাই হলো 'ফাতেমা'।
বাংলার মাটিতে বেগম খালেদা জিয়ার নামের সাথে ফাতেমার নামটিও অনাদিকাল টিকে থাকবে এক বিশ্বস্ততার প্রতিশব্দ হিসেবে।
আপনি কি মনে করেন ফাতেমার মতো নিঃস্বার্থ মানুষদের মূল্যায়ন আমাদের সমাজে সঠিক উপায়ে হয়?














