১৯৭২-৭৫ বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে কত হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল?
বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের সময়কালটি বাংলাদেশের ইতিহাসে যেমন পুনর্গঠনের মহাকাব্য, তেমনি এটি এক গভীর বিতর্কেরও ক্ষেত্র। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে নিহতের সংখ্যা এবং রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে গত ৫০ বছর ধরে নানামুখী প্রচারণা চালানো হয়েছে। কেউ বলেন নিহতের সংখ্যা হাজার হাজার, কেউ বলেন রক্ষীবাহিনীই লক্ষাধিক মানুষ মেরেছে। কিন্তু আবেগের কুয়াশা সরিয়ে যদি আমরা দালিলিক প্রমাণের দিকে তাকাই, তবে প্রকৃত সত্য কী?

TruthBangla
Jan 21, 2026
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রকৃত যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে। তাঁর হাতে ছিল মাত্র ৩ বছর ৭ মাস ৫ দিনের এক সংক্ষিপ্ত সময়। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের সময়কালটি বাংলাদেশের ইতিহাসে যেমন পুনর্গঠনের মহাকাব্য, তেমনি এটি এক গভীর বিতর্কেরও ক্ষেত্র। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে নিহতের সংখ্যা এবং রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে গত ৫০ বছর ধরে নানামুখী প্রচারণা চালানো হয়েছে। কেউ বলেন নিহতের সংখ্যা হাজার হাজার, কেউ বলেন রক্ষীবাহিনীই লক্ষাধিক মানুষ মেরেছে। কিন্তু আবেগের কুয়াশা সরিয়ে যদি আমরা দালিলিক প্রমাণের দিকে তাকাই, তবে প্রকৃত সত্য কী? আজকের এই নিবন্ধে আমরা বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের ভিত্তিতে সেই রহস্য উন্মোচন করব।
বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক বিতর্ক
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামল নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের মতো ব্যক্তিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ট্যাটাসে যখন "হাজার হাজার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড" এর দাবি করা হয়, তখন ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হয়ে পড়ে মূল উৎস বা সোর্স খুঁজে বের করা। বছরের পর বছর ধরে চলা এই সংখ্যাতাত্ত্বিক রাজনীতি কি আদৌ কোনো মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে, নাকি এটি কেবলই রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা?
১৯৭২-এর বাংলাদেশ - ভিন্ন বাস্তবতার যুদ্ধক্ষেত্র
অনেকে প্রশ্ন তোলেন, বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে কেন কঠোর হওয়া লেগেছিল? বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের নিহতের সংখ্যা বিশ্লেষণের আগে সেই সময়ের পরিস্থিতি বোঝা জরুরি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যুদ্ধ শেষ হলেও স্বাধীন বাংলাদেশের ভেতরে তখনো এক ছদ্ম-যুদ্ধ বা ‘Shadow War’ চলছিল। কেন নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক হয়? এই উত্তরগুলো লুকিয়ে আছে সেই সময়ের 'শ্যাডো ওয়ার' এর গভীরে।
ক) অস্ত্রের ঝনঝনানি - অবৈধ মারণাস্ত্রের রাজত্ব
বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর প্রথম যে বড় চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করেন, তা হলো সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের হাত থেকে অস্ত্র তুলে নেওয়া। ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অস্ত্র জমা দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।
বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীসহ অনেক বড় দল অস্ত্র জমা দিলেও, একটি বড় অংশ ভবিষ্যতের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে আধুনিক সব মারণাস্ত্র (যেমন: এসএলআর, এলএমজি) মাটির নিচে বা গোপন আস্তানায় লুকিয়ে রাখে।
পরাজিত পাকিস্তান সেনাবাহিনী পালিয়ে যাওয়ার আগে তাদের স্থানীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসদের হাতে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ তুলে দিয়ে যায়। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ যেন কখনো স্থিতিশীল হতে না পারে। ফলে রাতের আঁধারে গ্রাম বাংলায় শুরু হয় ডাকাতি, ছিনতাই এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।

খ) সশস্ত্র বামপন্থী বিপ্লবের বিভীষিকা
বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অনেক আন্তর্জাতিক শক্তি মেনে নিতে পারলেও, দেশের ভেতরে থাকা কিছু উগ্রপন্থী দল একে ‘আসল স্বাধীনতা’ বলে স্বীকার করেনি। তাদের কাছে এটি ছিল ‘দুই কুকুরের লড়াই’ বা ‘ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ’।
সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন 'পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি' রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে। তারা বিশ্বাস করত, বুর্জোয়া গণতন্ত্র উৎখাত করে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমেই মুক্তি সম্ভব। এই লক্ষ্যে তারা থানা আক্রমণ করে পুলিশের অস্ত্র লুট শুরু করে।
গ্রামে গ্রামে তথাকথিত ‘শ্রেণি শত্রু’ খতমের নামে সাধারণ জোতদার, স্কুল শিক্ষক এবং সরকারি কর্মকর্তাদের হত্যা করতে থাকে। দেশকে অস্থিতিশীল করতে পাটের গুদামে আগুন দেওয়া এবং রেললাইন উপড়ে ফেলার মতো অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (ইপিসিপিএমএল) এবং পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (ইবিসিপি)-র মতো দলগুলো তখন মাওবাদী আদর্শের দোহাই দিয়ে গ্রামাঞ্চলে সমান্তরাল সরকার চালানোর চেষ্টা করে। তাদের এই সশস্ত্র তৎপরতা সরকারকে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেয়।
গ) জাসদ ও গণবাহিনীর উত্থান
১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগ ভেঙে জন্ম নেয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান দিয়ে তারা তৎকালীন তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষিত করে। কিন্তু ১৯৭৪ সালে তারা গঠন করে তাদের সশস্ত্র শাখা ‘গণবাহিনী’।
গণবাহিনীর সদস্যরা একের পর এক থানা লুট করতে থাকে। রাষ্ট্রীয় কোষাগার তখন এমনিতেই শূন্য, তার ওপর ব্যাংক লুট করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগের স্থানীয় ত্যাগী নেতাকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধাদের টার্গেট করে হত্যা শুরু হয়। সরকারি তথ্যমতে, তখন কয়েক হাজার আওয়ামী লীগ কর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল।
ভারতীয় হাইকমিশন ঘেরাও ও ক্যু-র চেষ্টা করা হয়। জাসদ ও গণবাহিনীর এই কার্যক্রম কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল একটি নবজাতক রাষ্ট্রকে আঁতুড়ঘরেই মেরে ফেলার নামান্তর।
পুলিশের অভাব ও রক্ষীবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা
একটি দেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য দক্ষ পুলিশ বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রয়োজন হয়। কিন্তু ১৯৭২-এ বাংলাদেশের চিত্র ছিল ভিন্ন।
পুলিশের বড় একটি অংশ যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন, বাকিদের প্রশিক্ষণের অভাব এবং অস্ত্রের সংকট ছিল। উগ্রপন্থীদের আধুনিক অস্ত্রের সামনে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল নিয়ে পুলিশ দাঁড়াতে পারছিল না। বঙ্গবন্ধু যখন দেশ গড়ায় ব্যস্ত, তখন একদল আমলা পাকিস্তানের প্রেতাত্মা হয়ে ভেতরে ভেতরে অন্তর্ঘাত চালাচ্ছিলেন।
এই চরম নৈরাজ্য দমনের জন্যই 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী' গঠন করা হয়েছিল। যদিও রক্ষীবাহিনীর কিছু কর্মকাণ্ড পরবর্তীতে বিতর্কিত হয়েছে, কিন্তু সেই সময়ের সশস্ত্র সন্ত্রাস দমনে একটি দক্ষ আধাসামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা ছিল অনস্বীকার্য।
ফলে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলটি ছিল মূলত একটি অন্তর্ঘাতমূলক যুদ্ধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময়।
বেবী মওদূদের অকাট্য গবেষণা
মিথ্যার কুয়াশা ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালটি সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত এবং অপপ্রচারের শিকার। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী গোষ্ঠী দাবি করে আসছে যে, বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে হাজার হাজার বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। কেউ কেউ এই সংখ্যাকে ত্রিশ হাজার, আবার কেউ কেউ একে অনির্দিষ্ট উচ্চতায় নিয়ে ঠেকিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসের সত্য কখনো চাপা থাকে না।
বঙ্গবন্ধু শাসনামলে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা কত এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা করেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক বেবী মওদূদ। তাঁর অনুসন্ধানী গবেষণার মাধ্যমে এই প্রোপাগান্ডার পাহাড় ধসিয়ে দিয়েছেন। তিনি কোনো জনশ্রুতি বা রাজনৈতিক ভাষণের ওপর ভিত্তি না করে সমকালীন সংবাদপত্রের আর্কাইভ ঘেঁটে বের করে এনেছেন প্রকৃত সত্য।
কেন এই অনুসন্ধান?
স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা করা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। একদিকে পাকিস্তানপন্থীদের গোপন তৎপরতা, অন্যদিকে জাসদের গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির সশস্ত্র সংঘাত সব মিলিয়ে দেশ ছিল উত্তাল। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলকে কলঙ্কিত করতে 'বিপুল সংখ্যক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড'র তত্ত্ব বাজারে ছাড়া হয়। বেবী মওদূদ একজন সচেতন সাংবাদিক হিসেবে অনুভব করেছিলেন যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান প্রয়োজন।
তথ্যসূত্রের বস্তুনিষ্ঠতা - কেন এই গবেষণা অনন্য?
বেবী মওদূদের গবেষণার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো তাঁর তথ্য সংগ্রহের উৎস বা সোর্স। তিনি জানতেন, যদি তিনি সরকারি নথিপত্র বা আওয়ামী লীগ সমর্থিত পত্রিকা ব্যবহার করেন, তবে সমালোচকরা একে 'একপেশে' বলে উড়িয়ে দেবে।
গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে তিনি সেই সময়ের সরকারি মুখপত্র যেমন 'দৈনিক বাংলা' বা সরকার সমর্থক 'বাংলার বাণী'কে এড়িয়ে গেছেন। তাই তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে এবং সততার সাথে তথ্যসূত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সরকারের সবচেয়ে কট্টর সমালোচক পত্রিকাগুলোকে।
দৈনিক গণকণ্ঠ: তৎকালীন সময়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর মুখপত্র ছিল 'দৈনিক গণকণ্ঠ'। কবি আল মাহমুদ ছিলেন এর সম্পাদক। এই পত্রিকাটি প্রতিদিন বঙ্গবন্ধুর সরকারের ভুল ধরা, সমালোচনা করা এবং কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করার জন্য পরিচিত ছিল। সরকারবিরোধী জনমত গঠনে এর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
দৈনিক ইত্তেফাক: ইত্তেফাক ছিল তৎকালীন সব মহলে গ্রহণযোগ্য একটি পত্রিকা। তবে স্বাধীনতার পর বিভিন্ন ইস্যুতে তারা সরকারের কড়া সমালোচনা করত। বিশেষ করে উপসম্পাদকীয়গুলোতে সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে তারা ছিল সোচ্চার।
বেবী মওদূদ এই দুটি পত্রিকা থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিটি সংখ্যা নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করেছেন।
পরিসংখ্যানে আসল সত্য - ১৯৭২-৭৫ নিহত ৬৩০
দীর্ঘ গবেষণার পর বেবী মওদূদ যে ফলাফল পান, তা ছিল চমকে দেওয়ার মতো। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক গণকণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিটি মৃত্যুর সংবাদ বিশ্লেষণ করেছেন। যেখানে প্রোপাগান্ডাকারীরা হাজার হাজার লাশের কথা বলে, সেখানে দুই প্রধান বিরোধী পত্রিকার পাতায় উঠে আসা নিহতের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৩০ জন।
এটি কোনো আনুমানিক সংখ্যা নয়। এই ৬৩০ জনের প্রত্যেকের:
নাম ও পরিচয় (যেখানে পাওয়া গেছে)
মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট তারিখ
ঘটনার স্থান
মৃত্যুর কারণ (ক্রসফায়ার, রাজনৈতিক সংঘাত বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি)
সবকিছুই নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যানটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলার যে সংকটের কথা বলা হয়, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে।
বছরভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যান
বেবী মওদূদের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধুর শাসনকাল অর্থাৎ ৩ বছর ৭ মাস ৫ দিনের বছরভিত্তিক চিত্রটি নিচে দেওয়া হলো:
বছর | নিহতের সংখ্যা | প্রেক্ষাপট ও সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ |
১৯৭২ | ১২৫ জন | যুদ্ধের ঠিক পরে অস্ত্র উদ্ধার ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সময়। |
১৯৭৩ | ২৭৮ জন | জাসদ ও সর্বহারা পার্টির সশস্ত্র তৎপরতা যখন তুঙ্গে ছিল। |
১৯৭৪ | ১৭৬ জন | দুর্ভিক্ষ এবং চোরাকারবারি দমনে সেনাবাহিনীর অভিযানের সময়। |
১৯৭৫ (১৪ আগস্ট পর্যন্ত) | ৫১ জন | বাকশাল গঠনের পর পরিস্থিতি যখন স্থিতিশীল হতে শুরু করেছিল। |
মোট | ৬৩০ জন | সম্পূর্ণ শাসনামলের বস্তুনিষ্ঠ পরিসংখ্যান। |
নিহতদের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়
যাঁরা বলেন কেবল বিরোধী দল দমন করা হয়েছে, তাঁদের জন্য বেবী মওদূদের সংগৃহীত তালিকাটি একটি বিশাল ধাক্কা। তালিকায় দেখা যায়, নিহতের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি ছিল স্বয়ং সরকারি দলের!
পরিচয়/দল | সংখ্যা |
আওয়ামী লীগ | ১২৩ জন |
সাধারণ নাগরিক (দলীয় পরিচয়হীন) | ২৭৭ জন |
জাসদ | ৩৭ জন |
ছাত্রলীগ | ৩১ জন |
পুলিশ | ২৬ জন |
মুক্তিযোদ্ধা | ১৮ জন |
লালবাহিনী ও মুজিব বাহিনী | ২৮ জন |
বাকশাল (তৎকালীন একক জাতীয় দল) | ১৫ জন |
অন্যান্য (ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, সাংবাদিক) | ২০+ জন |
বিশ্লেষণ: এই তালিকা থেকে স্পষ্ট যে, নিহতদের একটি বড় অংশ ছিল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, যাদের তৎকালীন উগ্রপন্থী সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছিল। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু সরকার নিজেই সশস্ত্র অপশক্তির টার্গেট ছিল।
ঘাতক কারা ছিল? সংবাদপত্র কী বলে?
তৎকালীন সংবাদপত্রগুলোতে এই ৬৩০ জন হত্যাকাণ্ডের পেছনে কাদের দায়বদ্ধ করা হয়েছে? রিপোর্ট অনুযায়ী ঘাতকদের তালিকায় ছিল:
সশস্ত্র ডাকাত ও দুষ্কৃতকারী।
অজ্ঞাতনামা মুখোশধারী দুর্বৃত্ত।
পুলিশ-জনতার গণপিটুনি (আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রেক্ষাপটে)।
উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসবাদী দল (সর্বহারা ও গণবাহিনী)।
রক্ষীবাহিনী (কিছু নির্দিষ্ট সংঘর্ষের ক্ষেত্রে)।
লক্ষণীয় যে, তথাকথিত 'লক্ষ লক্ষ' নিহতের দাবির বিপরীতে 'রক্ষীবাহিনী'র হাতে নিহতের সংখ্যা নিয়ে যে কথা বলা হয়, সংবাদপত্রের নথিতে তার কোনো প্রমাণ মেলে না। বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেই অধিকাংশ সময় হামলার শিকার হয়েছিল।
প্রোপাগান্ডা বনাম বাস্তবতা - ৩০ হাজার বনাম ৬৩০
বেবী মওদূদের এই গবেষণা পরবর্তীতে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় যার নাম “১৯৭২-৭৫ নিহত ৬৩০” (সময় প্রকাশন)। এই বইটিতে প্রতিটি ঘটনার তারিখসহ বিবরণ দেওয়া আছে।
রাজনৈতিক ময়দানে প্রায়ই শোনা যায়, রক্ষীবাহিনী নাকি ৩০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে সরব পত্রিকা 'গণকণ্ঠ' কেন তবে মাত্র ৬৩০ জনের হিসাব দিল? এখন প্রশ্ন জাগে, যারা হাজার হাজার বা লক্ষ মানুষের মৃত্যুর গল্প শোনান, তাদের কাছে কি কোনো তথ্যসূত্র আছে?
যদি থেকে থাকে, তবে কেন গত ৫০ বছরে সেই মৃত ব্যক্তিদের নাম-ঠিকানা বা তালিকা জনসমক্ষে আনা হলো না? যদি বাস্তবেই ৩০ হাজার মানুষ নিহত হতো, তবে বাকি ২৯ হাজার ৩৭০ জনের খবর কি কোনো সংবাদপত্রে এল না? একটি বৈজ্ঞানিক ও সাংবাদিকতাসম্মত গবেষণাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে হলে আরেকটি তথ্যসমৃদ্ধ গবেষণার প্রয়োজন হয়, যা তথাকথিত সমালোচকরা কখনোই হাজির করতে পারেননি।
বেবী মওদূদের এই গবেষণা প্রমাণ করে যে, ৩০ হাজারের তত্ত্বটি ছিল মূলত একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক 'মিথ' বা কাল্পনিক গল্প, যা ছড়িয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী গোষ্ঠী যারা বঙ্গবন্ধুকে খুনি হিসেবে চিত্রায়িত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছিল।
ইতিহাসের সত্য বড় কঠিন। ১৯৭২-৭৫ সময়কালে ৬৩০ জন মানুষের মৃত্যুও অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল এবং প্রতিটি মৃত্যুই দুঃখজনক। কিন্তু এই সংখ্যাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ৫০ গুণ বাড়িয়ে প্রচার করা কি নৈতিকতা?
কেন এই পরিস্থিতিকে ‘স্বৈরাচার’ বলা ভুল?
যাঁরা বঙ্গবন্ধুর শাসনামলকে কেবল 'নিপীড়ন' হিসেবে চিত্রায়িত করেন, তাঁরা ভুলে যান যে সেই সময়টি ছিল মূলত একটি Counter-Insurgency বা বিদ্রোহ দমনের সময়। যখন দেশের ভেতরে প্রতিদিন ব্যাংক লুট হয়, এমপিদের হত্যা করা হয় এবং বিদেশি কূটনীতিকদের ওপর হামলা হয়, তখন যেকোনো রাষ্ট্রপ্রধান কঠোর হতে বাধ্য হন।
বঙ্গবন্ধু কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি রাষ্ট্রের স্থপতি। তাঁর সামনে ছিল দুটি পথ: হয় সন্ত্রাসীদের হাতে দেশ ছেড়ে দেওয়া, না হয় কঠোর হস্তে দমন করে রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা। তিনি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন।
বিবেকের কাছে প্রশ্ন
ইতিহাস কোনো মিথ বা কল্পনার ওপর টিকে থাকে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন এক সময়ে দেশ পরিচালনা করেছিলেন যখন রাষ্ট্রের চারদিকে ছিল শত্রু বাইরে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত আর ভেতরে সশস্ত্র সন্ত্রাস। সেই সংকটময় সময়ে ৬৩০ জনের মৃত্যুও কাম্য ছিল না, কিন্তু একে 'গণহত্যা' বা 'লক্ষ লক্ষ নিহতের' তকমা দেওয়া এক চরম ঐতিহাসিক অবিচার।
বঙ্গবন্ধু কোনো ভিনগ্রহের মানুষ ছিলেন না, তাঁর শাসনামলে ত্রুটি থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ত্রুটিকে অতিরঞ্জিত করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা মানে হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সত্যের অপলাপ ঘটানো। বেবী মওদূদের গবেষণা আমাদের চোখ খুলে দেয় যে, সত্যের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু নেই।
ইতিহাসের সত্যটা আজ আমাদের নতুন করে জানতে হবে। যারা প্রচার করেন হাজার হাজার নিহতের কথা, তাদের প্রতি বিনীত অনুরোধ অনুমান বা আবেগ নয়, দালিলিক প্রমাণ নিয়ে কথা বলুন। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর শাসনামল নিয়ে মিথ্যার দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসাই হোক আজকের প্রজন্মের কাজ।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















