১৯৭২-৭৫ বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে কত হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল?
বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের সময়কালটি বাংলাদেশের ইতিহাসে যেমন পুনর্গঠনের মহাকাব্য, তেমনি এটি এক গভীর বিতর্কেরও ক্ষেত্র। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে নিহতের সংখ্যা এবং রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে গত ৫০ বছর ধরে নানামুখী প্রচারণা চালানো হয়েছে। কেউ বলেন নিহতের সংখ্যা হাজার হাজার, কেউ বলেন রক্ষীবাহিনীই লক্ষাধিক মানুষ মেরেছে। কিন্তু আবেগের কুয়াশা সরিয়ে যদি আমরা দালিলিক প্রমাণের দিকে তাকাই, তবে প্রকৃত সত্য কী?

TruthBangla

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৯৩ হাজার সদস্যের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে এক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে একটি মুক্ত ভূখণ্ডের জন্ম হলেও, একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক যাত্রা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে।
পাকিস্তানের বন্দিশালা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সময় পেয়েছিলেন মাত্র ৩ বছর ৭ মাস ৫ দিন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যার মাধ্যমে সেই অধ্যায়ের ঘটে করুণ যবনিকাপাত।
বাংলাদেশের ইতিহাসের এই ৩ বছর ৭ মাস ৫ দিন একাধারে যেমন শূন্য থেকে দেশ গড়ার এক অসামান্য মহাকাব্য, তেমনি তা গভীর রাজনৈতিক বিতর্ক ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের ক্ষেত্র। বিশেষ করে এই সময়কালে রাজনৈতিক সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে নানামুখী প্রচারণা ও অপপ্রচার চালানো হয়েছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও ব্যক্তি দাবি করেন, এই সময়কালে নিহতের সংখ্যা নাকি tens of thousands বা হাজার হাজার; আবার কেউ কেউ দাবি করেন, রক্ষীবাহিনী নাকি লক্ষাধিক মানুষকে হত্যা করেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই বিতর্ক নতুন করে উস্কে দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের মতো ব্যক্তিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ট্যাটাস ও বক্তব্য যখন "হাজার হাজার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড"-এর দাবি তোলে, তখন ইতিহাসের একজন বস্তুনিষ্ঠ গবেষক ও নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হয়ে পড়ে আবেগ ও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার কুয়াশা সরিয়ে মূল উৎস বা প্রাথমিক দালিলিক প্রমাণের (Primary Historical Sources) দিকে তাকানো।
বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই সংখ্যাতাত্ত্বিক রাজনীতি কি আদৌ কোনো দালিলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, নাকি এটি একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক মিথ (Political Myth)? আজকের এই নিবন্ধে সমকালীন সংবাদপত্র, বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা ও দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা সেই ইতিহাসের সত্য উন্মোচন করব।
বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক বিতর্ক
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামল নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের মতো ব্যক্তিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ট্যাটাসে যখন "হাজার হাজার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড" এর দাবি করা হয়, তখন ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হয়ে পড়ে মূল উৎস বা সোর্স খুঁজে বের করা। বছরের পর বছর ধরে চলা এই সংখ্যাতাত্ত্বিক রাজনীতি কি আদৌ কোনো মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে, নাকি এটি কেবলই রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা?
১৯৭২-এর বাংলাদেশ: ভূ-রাজনীতি ও যুদ্ধোত্তর ছদ্ম-যুদ্ধ (Shadow War)
বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কেন অবনতি হয়েছিল এবং কেন কঠোর ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল তা বুঝতে হলে তৎকালীন বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতার গভীরে প্রবেশ করা জরুরি।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলেও সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এক কঠিন ও জটিল 'ছদ্ম-যুদ্ধ' বা Shadow War শুরু হয়েছিল। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো, পুলিশ বাহিনী, বিচারব্যবস্থা ও অর্থনীতি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে কিছু ছিল না; সেতু, কালভার্ট, রেলপথ এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ছিল বিধ্বস্ত।
"একটি রাষ্ট্র যখন যুদ্ধের ছাই ভস্ম থেকে উঠে দাঁড়ায়, তখন তার সবচেয়ে বড় শত্রু কেবল সীমানার ওপারের সশস্ত্র বাহিনী নয়; বরং সীমানার ভেতরের অরাজকতা ও অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার।"
অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সংকট
বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর প্রথম যে বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, তা হলো স্বাধীন দেশে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে থাকা আধুনিক অস্ত্রের উদ্ধার। ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকা স্টেডিয়ামে এক ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অস্ত্র জমা দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।
বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীসহ অনেক মুক্তি ফৌজের বড় বড় দল প্রকাশ্যে অস্ত্র জমা দেয়। কিন্তু একটি বড় ও বিপজ্জনক অংশ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে আধুনিক সব মারণাস্ত্র (যেমন: এসএলআর, এলএমজি, থম্পসন সাব-মেশিনগান) গোপন আস্তানায় বা মাটির নিচে লুকিয়ে রাখে।
এর পাশাপাশি ছিল পরাজিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রেখে যাওয়া মারণাস্ত্র। পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের প্রাক্কালে তাদের স্থানীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস সদস্যদের হাতে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছড়িয়ে দিয়ে যায়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ যেন প্রশাসনিক ও সামাজিকভাবে কখনো স্থিতিশীল হতে না পারে। ফলস্বরূপ, ১৯৭২ সালের শুরু থেকেই দেশের গ্রাম বাংলায় রাতের আঁধারে ডাকাতি, থানা আক্রমণ, ব্যাংক ডাকাতি, চোরাচালান এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যার মতো অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড শুরু হয়।

সশস্ত্র বামপন্থী বিপ্লবের বিভীষিকা ও রাষ্ট্রব্যাপী সন্ত্রাস
বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে তৎকালীন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং দেশের অভ্যন্তরে থাকা কিছু চরমপন্থী রাজনৈতিক দল মেনে নিতে পারেনি। তাদের কাছে ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ছিল ‘দুই কুকুরের লড়াই’ অথবা ‘বুর্জোয়াদের মধ্যকার ক্ষমতা বদল’ বা ‘ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ’।
পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি ও সিরাজ শিকদার: সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন 'পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি' স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে উৎখাত করার জন্য প্রকাশ্যে সশস্ত্র যুদ্ধ ঘোষণা করে। তারা বিশ্বাস করত, গণতান্ত্রিক উপায়ে বা ব্যালটের মাধ্যমে নয়; বরং রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র বিপ্লব এবং ‘শ্রেণি শত্রু খতম’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সর্বহারাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে।
থানা আক্রমণ ও অস্ত্র লুট: সর্বহারা পার্টির ক্যাডাররা সারা দেশে বিচ্ছিন্ন পুলিশ ফাঁড়ি ও থানায় হামলা চালিয়ে পুলিশ সদস্যদের হত্যা করে সরকারি অস্ত্র লুট করতে থাকে।
শ্রেণি শত্রু খতমের নামে হত্যাকাণ্ড: গ্রামে গ্রামে শিক্ষক, জোতদার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের ‘শ্রেণি শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে নৃশংসভাবে হত্যা করা শুরু হয়।
অর্থনৈতিক অন্তর্ঘাত: নতুন রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে সর্বহারা পার্টি পাটের গুদামে আগুন দেওয়া, পাটবাহী জাহাজে অন্তর্ঘাত করা এবং দূরপাল্লার রেললাইন উপড়ে ফেলার মতো রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম চালায়।
ইপিসিপিএমএল ও ইবিসিপির নৈরাজ্য: পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্সবাদী-লেনিনবাদী) বা EPCP(M-L) এবং পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (EBCP)-র মতো উগ্র মাওবাদী গ্রুপগুলো দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী নিয়ে সমান্তরাল 'গেরিলা শাসন' বা 'প্যারালাল গভর্নমেন্ট' পরিচালনার চেষ্টা করে। তারা আইনি শাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজস্ব ‘বিচারালয়’ বসিয়ে সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় অধিবাসীদের হত্যা করতে থাকে।
জাসদ ও ‘গণবাহিনী’: নবজাতক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ
১৯৭২ সালে তৎকালীন ছাত্রলীগ ভেঙে সিরাজুল আলম খান, আ. স. ম. আবদুর রবের মতো তরুণ নেতাদের হাত ধরে জন্ম নেয় 'জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল' (জাসদ)। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মুখরোচক স্লোগান দিয়ে তারা তৎকালীন বিপ্লবমুখী ও আবেগপ্রবণ তরুণ সমাজ এবং বহু অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধাকে আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।
তবে রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদের ভূমিকা কেবল নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৭৪ সালে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করে তাদের গোপন সশস্ত্র শাখা ‘গণবাহিনী’ (কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে)। গণবাহিনীর তাণ্ডব ও অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড সমূহ:
ব্যাংক লুট ও অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব: যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগার যখন শূন্য, বৈদেশিক মুদ্রার চরম সংকট তখন জাসদ ও গণবাহিনীর সদস্যরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাংক ও সরকারি কোষাগারে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করে।
টার্গেট কিলিং: গণবাহিনীর মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা, সংসদ সদস্য এবং মুক্তিযুদ্ধের বীর সংগঠকরা। সরকারি তথ্য ও তৎকালীন সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সময়কালে গণবাহিনীর হাতে শত শত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
উচ্চপর্যায়ের হামলা ও ক্যু-র চেষ্টা: ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসভবন ঘেরাও করে সহিংস পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। পরবর্তীতে ভারতীয় হাই কমিশনার সমর সেনকে অপহরণের চেষ্টা চালানো হয়।
এই চরমপন্থী ও নৈরাজ্যবাদী হামলাগুলো কোনো সাধারণ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বিরোধিতা ছিল না; এটি ছিল একটি নবজাতক, যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রকে আঁতুড়ঘরেই ধ্বংস করে দেওয়ার এক আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চক্রান্ত।
পুলিশের অভাব ও রক্ষীবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা
একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হলে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য দক্ষ পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং আধাসামরিক বাহিনীর প্রয়োজন হয়। কিন্তু ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার চিত্র ছিল অত্যন্ত করুণ।
পুলিশ বাহিনীর করুণ অবস্থা: মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর শত শত সদস্য শহীদ হয়েছিলেন। যাঁরা জীবিত ছিলেন, তাঁদের কাছে ছিল পুরোনো যুগের থ্রি-নট-থ্রি (.303) রাইফেল। অপরদিকে, জাসদের গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির চরমপন্থীদের হাতে ছিল আধুনিক অটোমেটিক ও সেমি-অটোমেটিক অস্ত্র (যেমন: এসএলআর, এলএমজি)।
একটি থানা আক্রমণের ঘটনা ঘটলে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল নিয়ে আধুনিক মারণাস্ত্রধারী উগ্রপন্থীদের মোকাবিলা করা পুলিশের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এছাড়া, প্রশাসনের একটি বড় অংশে তখনও পাকিস্তানফেরত বা পাকিস্তানপন্থী আমলা ও কর্মচারীরা অবস্থান করছিলেন, যারা ভেতরের তথ্য উগ্রপন্থীদের কাছে পাচার করত।
জাতীয় রক্ষীবাহিনীর আবির্ভাব: এই চরম অরাজকতা, সশস্ত্র ডাকাতি, ব্যাংক লুট এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড দমনের উদ্দেশ্যে ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির ৯ নম্বর আদেশ (Order No. 9 of 1972) দ্বারা ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’ (Jatiya Rakkhi Bahini - JRB) গঠন করা হয়।
এটি ছিল মূলত একটি বিশেষ কাউন্টার-ইনসার্জেন্সি (Counter-Insurgency) আধাসামরিক বাহিনী। যদিও পরবর্তীতে রক্ষীবাহিনীর কিছু সদস্যের অনিয়ন্ত্রিত আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপ সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল, কিন্তু সমকালীন বাস্তবতায় সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদ ও অন্তর্ঘাত দমনে একটি সুসংগঠিত আধাসামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা ছিল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই অনস্বীকার্য।
ফলে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলটি ছিল মূলত একটি অন্তর্ঘাতমূলক যুদ্ধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময়।
বেবী মওদূদের অকাট্য গবেষণা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি কাল্পনিক ইতিহাস তৈরি করা হয়েছে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে জাসদ, ডানপন্থী দলগুলো এবং পাকিস্তানপন্থী গোষ্ঠী দাবি করে আসছে যে, বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে নাকি ২০ হাজার, ৩০ হাজার বা এমনকি ১ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে! তবে ইতিহাস কখনো ধারণানির্ভর মুখরোচক গল্পে টিকে থাকে না; ইতিহাস টিকে থাকে প্রাথমিক দালিলিক প্রমাণ (Primary Documentation) এবং আর্কাইভাল তথ্যে।
বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা কত এই ঐতিহাসিক ও গবেষণামূলক প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে দীর্ঘ অনুসন্ধানী গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক, লেখক ও বিশিষ্ট গবেষক বেবী মওদূদ। তাঁর অনুসন্ধানী গবেষণার মাধ্যমে এই প্রোপাগান্ডার পাহাড় ধসিয়ে দিয়েছেন। তিনি কোনো জনশ্রুতি বা রাজনৈতিক ভাষণের ওপর ভিত্তি না করে সমকালীন সংবাদপত্রের আর্কাইভ ঘেঁটে বের করে এনেছেন প্রকৃত সত্য। তাঁর সেই ঐতিহাসিক গবেষণাকর্মের ফসল হিসেবে প্রকাশিত হয় আকরগ্রন্থ: “১৯৭২-৭৫ নিহত ৬৩০” (সময় প্রকাশন থেকে প্রকাশিত)।
কেন এই অনুসন্ধান?
স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা করা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। একদিকে পাকিস্তানপন্থীদের গোপন তৎপরতা, অন্যদিকে জাসদের গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির সশস্ত্র সংঘাত সব মিলিয়ে দেশ ছিল উত্তাল। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলকে কলঙ্কিত করতে 'বিপুল সংখ্যক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড'র তত্ত্ব বাজারে ছাড়া হয়। বেবী মওদূদ একজন সচেতন সাংবাদিক হিসেবে অনুভব করেছিলেন যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান প্রয়োজন।
তথ্যসূত্রের বস্তুনিষ্ঠতা: কেন এই গবেষণা অনন্য?
গবেষণার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে রাজনৈতিক ইতিহাসের সংবেদনশীল কোনো অধ্যায় বিশ্লেষণের সময় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বেবী মওদূদের গবেষণার সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক ছিল তাঁর অনন্য তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি (Methodology of Data Collection)।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সময়কালটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত ঘটনাবহুল ও বিতর্কিত অধ্যায়। এই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ মূল্যায়নে সরকারি প্রকাশনা, তথ্য মন্ত্রণালয়ের নথি কিংবা তৎকালীন সরকার সমর্থক সাময়িকী যেমন 'দৈনিক বাংলা' বা 'বাংলার বাণী'র ওপর নির্ভর করলে গবেষণার সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকত। সমালোচকরা সহজেই সেই কাজকে 'একপেশে', 'প্রোপাগান্ডা' বা 'সরকারঘেঁষা' বলে আখ্যা দিতে পারতেন।
এই সম্ভাব্য বিতর্কের সুযোগ শুরুতেই নির্মূল করতে বেবী মওদূদ প্রথাগত পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিপরীত পথ হাঁটেন। তিনি সরকারের প্রশংসাকারী বা সমর্থক মাধ্যমের বদলে তৎকালীন সময়ে শাসক দলের সবচেয়ে কট্টর বিরোধী, সমালোচক এবং মূলধারার নিরপেক্ষ গণমাধ্যমগুলোকে তাঁর গবেষণার প্রাথমিক ও প্রধান উৎস হিসেবে নির্বাচন করেন।
তিনি মূলত ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঐতিহাসিক দিন থেকে শুরু করে ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ঠিক আগের দিন পর্যন্ত প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর আর্কাইভভিত্তিক নিবিড় বিশ্লেষণ পরিচালনা করেন। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রকাশিত দুটি প্রধান বিরোধী ও সমালোচক পত্রিকার প্রতিটা সংখ্যা সরাসরি লাইব্রেরি আর্কাইভ থেকে তুলে এনে প্রতিটি খবরের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য যাচাই করেন।
দৈনিক গণকণ্ঠ: বিরোধী রাজনীতির প্রতিচ্ছবি
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর প্রাতিষ্ঠানিক মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত 'দৈনিক গণকণ্ঠ' ছিল তৎকালীন শেখ মুজিব সরকারের সবচেয়ে তীব্র ও কট্টর বিরোধী পত্রিকা। প্রখ্যাত কবি আল মাহমুদের সম্পাদনায় প্রকাশিত এই পত্রিকাটির সাংবাদিকতার প্রধান অভিমুখই ছিল সরকারের নীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর কড়া সমালোচনা করা।
এই পত্রিকায় সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা, দেশের অর্থনৈতিক সংকট, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক নানা ভুলত্রুটি প্রতিদিন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হতো। তৎকালীন জাতীয় রক্ষীবাহিনী বা পুলিশের সামান্যতম বিচ্যুতি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার বা সহিংসতার খবর গণকণ্ঠের প্রথম পাতায় প্রধান শিরোনাম হিসেবে ছাপা হতো।
গবেষণায় গুরুত্ব: বেবী মওদূদ অনুধাবন করেছিলেন যে, একটি কট্টর বিরোধী পত্রিকা যখন কোনো সরকারের কার্যকালের তীব্র সমালোচনা করে, তখন তাদের পরিবেশিত তথ্যের ভেতর থেকেই তৎকালীন রাজনৈতিক সংকট ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জগুলোর সবচেয়ে কঠোর রূপটি ধরা পড়ে। বিরোধী পত্রিকার চোখ দিয়ে ঘটনা বিশ্লেষণ করলে কোনো তথ্য ঢেকে রাখার সুযোগ থাকে না।
দৈনিক ইত্তেফাক: মূলধারার নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা
তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সাংবাদিকতার ঐতিহ্য বহনকারী 'দৈনিক ইত্তেফাক' ছিল তৎকালীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বহুল প্রচারিত ও গ্রহণযোগ্য মূলধারার সংবাদপত্র। স্বাধীনতার পর দেশ পুনর্গঠনের জটিল প্রক্রিয়া, খাদ্য সংকট, চোরাচালান ও দুর্নীতি নিয়ে ইত্তেফাক ছিল অত্যন্ত সোচ্চার ও বস্তুনিষ্ঠ।
ইত্তেফাক অন্ধ সমালোচনা বা অন্ধ সমর্থন কোনোটিতেই বিশ্বাসী ছিল না। তবে প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং জনদুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরতে পত্রিকাটি কখনো পিছপা হয়নি। ইত্তেফাকের সম্পাদকীয়, বিশ্লেষণাত্মক কলাম এবং দেশের দূরদূরান্তের সংবাদদাতাদের পাঠানো প্রতিবেদন তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র উন্মোচন করত।
বেবী মওদূদ ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশিত দৈনিক গণকণ্ঠ এবং দৈনিক ইত্তেফাক-এর প্রতিটি সংখ্যা লাইব্রেরি আর্কাইভ থেকে বের করে প্রতিটি খবরের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। তিনি সাড়ে তিন বছরের প্রতিটি পত্রিকার প্রথম পাতা থেকে শুরু করে ভেতরের পাতা, স্থান-কালের খবর, সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয়, পাঠকের চিঠিপত্র এবং রাজনৈতিক মন্তব্য সবকিছু ধাপে ধাপে শ্রেণিবদ্ধ করেন।
বিরোধী গণমাধ্যমের কঠোর সমালোচনার দলিলকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করার এই দুঃসাহসিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিই বেবী মওদূদের এই গবেষণাকে বাংলা রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি আকর ও অনস্বীকার্য দলিলে পরিণত করেছে।
পরিসংখ্যানে আসল সত্য: ১৯৭২-৭৫ নিহত ৬৩০
দীর্ঘ অনুসন্ধানী গবেষণা শেষে বেবী মওদূদ সমকালীন বিরোধী পত্রিকার পাতা থেকে যে নথিভুক্ত তথ্য পান, তা প্রোপাগান্ডাকারীদের ভিত্তিহীন দাবিকে এক ঝটকায় মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত (৩ বছর ৭ মাস ৫ দিন) দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক গণকণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিটি সহিংসতার ঘটনা যোগ করে নিহতের মোট সংখ্যা পাওয়া যায় ৬৩০ জন।
এটি কোনো আনুমানিক বা কাল্পনিক সংখ্যা নয়। এই ৬৩০ জন ব্যক্তির প্রতিটি ঘটনার বিপরীতে নথিভুক্ত রয়েছে:
১. নিহতের নাম ও সামাজিক/রাজনৈতিক পরিচয় (যেখানে পাওয়া গেছে)।
২. ঘটনার সুনির্দিষ্ট তারিখ ও সময়।
৩. ঘটনার স্থান ও জেলা।
৪. মৃত্যুর প্রকৃত কারণ (উগ্রপন্থীদের হামলা, রাজনৈতিক সংঘাত, ডাকাত দলের হামলা বা আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ)।
যেখানে বিরোধী দল ও তৎকালীন উগ্রপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো দাবি করত "হাজার হাজার" বা "৩০ হাজার" মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছে, সেখানে জাসদের নিজস্ব মুখপত্র দৈনিক গণকণ্ঠ-এর পুরো সাড়ে তিন বছরের আর্কাইভে খুঁজে পাওয়া গেল মাত্র ৬৩০ জনের নাম!
সবকিছুই নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যানটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলার যে সংকটের কথা বলা হয়, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে।
১৯৭২–১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিহত
নিচে সমকালীন সংবাদপত্র ও গবেষক বেবী মওদূদের আকরগ্রন্থের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বঙ্গবন্ধুর ৩ বছর ৭ মাস ৫ দিনের শাসনের বছরভিত্তিক চিত্র, নিহতের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিচয় এবং সহিংসতার নেপথ্য কারিগরদের একটি সমন্বিত মাস্টার টেবিল প্রদান করা হলো:
সময়কাল (বছর) | নথিবদ্ধ নিহতের সংখ্যা | প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত গোষ্ঠী/দল (Identity Breakdown) | প্রধান সহিংসতা সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী ও ঘাতক | রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটের সংক্ষেপ |
১৯৭২ | ১২৫ জন | সাধারণ অরাজনৈতিক নাগরিক: ৬০ জন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠন: ২৮ জন পুলিশ ও নিরাপত্তা সদস্য: ৮ জন অন্যান্য/সশস্ত্র গোষ্ঠী: ২৯ জন | উগ্রপন্থী সর্বহারা পার্টি অবৈধ অস্ত্রধারী ডাকাত দল চোরাকারবারি ও দুষ্কৃতকারী | যুদ্ধোত্তর অবৈধ অস্ত্র জমা না হওয়া, সীমান্ত চোরাচালান, থানা আক্রমণ ও ডাকাত দলের প্রাদুর্ভাব। |
১৯৭৩ | ২৭৮ জন | আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ: ৬৭ জন সাধারণ নাগরিক: ১০৫ জন জাসদ/গণবাহিনী: ২১ জন পুলিশ ও নিরাপত্তা সদস্য: ১২ জন | জাসদ গণবাহিনী সর্বহারা পার্টি প্রতিক্রিয়াশীল ও পাকিস্তানপন্থী গোষ্ঠী | জাসদের গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির সশস্ত্র হামলা তুঙ্গে ওঠা, আওয়ামী লীগ নেতা ও এমপিদের টার্গেট কিলিং। |
১৯৭৪ | ১৭৬ জন | সাধারণ নাগরিক: ৮৫ জন আওয়ামী লীগ ও বাকশাল: ৩৫ জন জাসদকর্মী: ১৪ জন পুলিশ/মুক্তিযোদ্ধা: ১৫ জন | সশস্ত্র উগ্র বামপন্থী গ্রুপ চোরাকারবারি সিন্ডিকেট যৌথ অভিযান/রক্ষীবাহিনী (সংঘাতের ক্ষেত্রে) | বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ, সীমান্ত চোরাচালান দমনে সেনাবাহিনী ও যৌথ বাহিনীর অভিযান। |
১৯৭৫ (১৪ আগস্ট পর্যন্ত) | ৫১ জন | বাকশাল ও সরকারি দল: ১৫ জন সাধারণ নাগরিক: ২৭ জন অন্যান্য দল: ৯ জন | গোপন চরমপন্থী চক্র দুষ্কৃতকারী ও ডাকাত দল | বাকশাল গঠনের পর রাজনৈতিক সহিংসতা অনেকটাই হ্রাস পাওয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা। |
সর্বমোট | ৬৩০ জন | আওয়ামী লীগ: ১২৩ জন অরাজনৈতিক নাগরিক: ২৭৭ জন জাসদ: ৩৭ জন ছাত্রলীগ: ৩১ জন পুলিশ: ২৬ জন মুক্তিযোদ্ধা: ১৮ জন লালবাহিনী/মুজিব বাহিনী: ২৮ জন বাকশাল: ১৫ জন অন্যান্য (ন্যাপ, কমিউনিস্ট, ইত্যাদি): ২৫ জন | সশস্ত্র উগ্রপন্থী (সর্বহারা ও গণবাহিনী) ডাকাত ও পেশাদার অপরাধী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী (বন্দুকযুদ্ধ/সংঘাত) ক্ষুব্ধ জনতার গণপিটুনি | ৩ বছর ৭ মাস ৫ দিনে সমকালীন প্রধান বিরোধী সংবাদপত্রগুলোতে নথিবদ্ধ মোট মৃত্যুর দালিলিক হিসাব। |
তালিকার চাঞ্চল্যকর সত্য: আক্রান্ত স্বয়ং সরকারি দল!
উপরের তালিকাটির দিকে তাকালে একটি চমকপ্রদ তথ্য উদ্ভাসিত হয়। রাজনৈতিক প্রচারণায় দাবি করা হয়, সরকার নাকি এককভাবে বিরোধী দল নিশ্চিহ্ন করেছে। কিন্তু সংবাদপত্রের দালিলিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, নিহতদের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলটি ছিল স্বয়ং শাসক দল আওয়ামী লীগ (১২৩ জন) এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ (৩১ জন)!
বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রচারণায় বারবার দাবি করা হয়েছে যে, তৎকালীন সরকার বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমন বা নিশ্চিহ্ন করতে এককভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করেছিল। কিন্তু সে সময়ের সংবাদপত্র যেমন দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, সংবাদ এবং বাংলার বাণী এর আর্কাইভ ও দালিলিক নথি বিশ্লেষণ করলে এক বিপরীত ও ভিন্ন সত্য উন্মোচিত হয়।
অর্থাৎ, রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার কেবল বিরোধী দল ছিল না; বরং সরকার নিজেই উগ্রপন্থী জাসদ গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির সশস্ত্র আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু বা Target ছিল। এই তালিকা থেকে স্পষ্ট যে, নিহতদের একটি বড় অংশ ছিল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, যাদের তৎকালীন উগ্রপন্থী সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছিল। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু সরকার নিজেই সশস্ত্র অপশক্তির টার্গেট ছিল।
ঘাতক কারা ছিল? সংবাদপত্র কী বলে?
তৎকালীন সময়ের জাতীয় পত্রিকাগুলোর তদন্ত ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ৬৩০টি হত্যাকাণ্ডের পেছনে দায়ী অপরাধীদের স্পষ্ট শ্রেণিবিভাগ পাওয়া যায়। সমকালীন সংবাদপত্র অনুযায়ী ঘাতকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল:
সশস্ত্র ডাকাত ও দুষ্কৃতকারী: মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে বিপুল পরিমাণ বেআইনি অস্ত্র থেকে যাওয়ায় কতিপয় অপরাধী চক্র সুযোগ বুঝে ডাকাতি, ছিনতাই ও সামাজিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যা করে।
অজ্ঞাতনামা মুখোশধারী দুর্বৃত্ত: রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত শত্রুতার জের ধরে রাতের আঁধারে কিংবা গোপন ফাঁদ পেতে যেসব গুপ্তহত্যা চালানো হতো, তার অধিকাংশই পরিচালনা করত গোপন সশস্ত্র সংগঠনগুলো।
উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসবাদী দল: জাসদের গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির ক্যাডাররা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ ও সরকারের সহযোগীদের হত্যা করে ইশতেহার ও লিফলেট প্রচার করত।
জনতার গণপিটুনি ও আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রেক্ষাপট: দেশের বিভিন্ন স্থানে ডাকাত, চোরাচালানকারী বা উগ্রপন্থী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় সাধারণ জনগণ সংঘবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যার ফলে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
জাতীয় রক্ষীবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘাত: নির্দিষ্ট কিছু সশস্ত্র এনকাউন্টার বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা অভিযানের সময় সংঘাতের মুখোমুখি হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে উগ্রপন্থীরা নিহত হয়।
লক্ষণীয় যে, তথাকথিত 'লক্ষ লক্ষ' নিহতের দাবির বিপরীতে 'রক্ষীবাহিনী'র হাতে নিহতের সংখ্যা নিয়ে যে কথা বলা হয়, সংবাদপত্রের নথিতে তার কোনো প্রমাণ মেলে না। বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেই অধিকাংশ সময় হামলার শিকার হয়েছিল।
রক্ষীবাহিনী সম্পর্কিত অপপ্রচার বনাম সত্য
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধুর শাসনকালকে বিতর্কিত করতে 'জাতীয় রক্ষীবাহিনী'কে কেন্দ্র করে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো হয়। দাবি করা হতো, রক্ষীবাহিনী নাকি 'লাখ লাখ' বিরোধী নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে। তবে তৎকালীন সংবাদপত্র, প্রাতিষ্ঠানিক নথি এবং গবেষণায় এই বিপুল সংখ্যার কোনো প্রমাণ মেলে না।
প্রকৃতপক্ষে, যুদ্ধবিধ্বস্ত নতুন রাষ্ট্রের ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া, চোরাচালান রোধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টির সশস্ত্র হামলা প্রতিরোধে জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়। অভিযান চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর অসংখ্য সদস্য উগ্রপন্থীদের অতর্কিত হামলায় প্রাণ হারান। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেই প্রতিনিয়ত সশস্ত্র অপশক্তির হামলার শিকার ছিল। সংবাদপত্রের সমকালীন দালিলিক রেকর্ড স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, রক্ষীবাহিনীর হাতে নিহতের যে সংখ্যা দাবি করা হয়, বাস্তবে তা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রচারিত অতিরঞ্জিত তথ্য।
প্রোপাগান্ডা বনাম বাস্তবতা: ৩০ হাজার বনাম ৬৩০ জন
১৯৭২-১৯৭৫ সময়কালের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রচুর অতিরঞ্জিত বক্তব্য ও রাজনৈতিক অপপ্রচার ছড়ানো হয়েছে। তবে আবেগ ও প্রচারণার ঊর্ধ্বে উঠে তথ্যভিত্তিক গবেষণার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক বেবী মওদুদ। তাঁর বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ “১৯৭২-৭৫ নিহত ৬৩০” (সময় প্রকাশন) সেই সময়কার বাস্তব চিত্র অনুধাবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক দলিল।
এই গ্রন্থে বেবী মওদুদ কোনো অনুমানের ওপর ভিত্তি করে মন্তব্য করেননি। তৎকালীন বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ, সরকারি-বেসরকারি নথি এবং নিরপেক্ষ তথ্য সংগ্রহ করে তিনি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়কালে রাজনৈতিক সহিংসতা, গোপন দলগুলোর তাণ্ডব এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত ব্যক্তিদের তারিখসহ পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করেছেন।
রাজনৈতিক ময়দানে প্রায়ই শোনা যায়, রক্ষীবাহিনী নাকি ৩০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে সরব পত্রিকা 'গণকণ্ঠ' কেন তবে মাত্র ৬৩০ জনের হিসাব দিল? এখন প্রশ্ন জাগে, যারা হাজার হাজার বা লক্ষ মানুষের মৃত্যুর গল্প শোনান, তাদের কাছে কি কোনো তথ্যসূত্র আছে?
প্রোপাগান্ডার ব্যবচ্ছেদ: ২৯,৩৭০ জন কোথায়?
রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে যেকোনো ঘটনাকে বড় করে দেখানোর প্রবণতা নতুন নয়, তবে ৬৩০ জনের মৃত্যুকে ৫০ গুণ বাড়িয়ে ৩০ হাজার বানিয়ে ফেলা ইতিহাস বিকৃতির এক চরম নিদর্শন। যদি বাস্তবেই ৩০ হাজার মানুষ নিহত হয়ে থাকত, তবে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের স্বার্থে কয়েকটি মূল প্রশ্ন সামনে চলে আসে:
নিখোঁজ ২৯,৩৭০ জনের পরিচয় কোথায়? ৬৩০ জনের বাইরে বাকি ২৯,৩৭০ জন নিহত ব্যক্তির নাম, ঠিকানা বা কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা গত ৫০ বছরেও কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন জনসমক্ষে আনতে পারল না কেন? তৎকালীন সময়ে দেশি-বিদেশি বহু নিরপেক্ষ সাংবাদিক বাংলাদেশে কর্মরত ছিলেন। ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটলে সংবাদপত্রের পাতায় তার কোনো না কোনো প্রমাণ অবশ্যই থাকত।
নিহতদের স্বজনদের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা, নাম-পরিচয় বা বিচারের দাবি সংবলিত দালিলিক প্রমাণের অনুপস্থিতি প্রমাণ করে যে, এই বিশাল সংখ্যাটির কোনো বাস্তব ভিত্তি ছিল না। তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানের অনুপস্থিতি স্পষ্ট করে যে, এই সংখ্যাটি ছিল একটি সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক কৌশল, যার লক্ষ্য ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক ভিত্তি ও স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসকে বিতর্কিত করা।
বেবী মওদূদের এই গবেষণা প্রমাণ করে যে, ৩০ হাজারের তত্ত্বটি ছিল মূলত একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক 'মিথ' বা কাল্পনিক গল্প, যা ছড়িয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী গোষ্ঠী যারা বঙ্গবন্ধুকে খুনি হিসেবে চিত্রায়িত করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছিল।
ইতিহাসের সত্য অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে যে ৬৩০ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, তার একটি মৃত্যুও কাঙ্ক্ষিত ছিল না। প্রতিটি স্বাধীন মানুষের প্রাণহানিই দুঃখজনক ও বেদনাকায়ক।
রাজনৈতিক 'প্রোপাগান্ডা’ ছড়ানোর কারণ
১৯৭২-৭৫ সময়কালে ৬৩০ জন মানুষের মৃত্যুও অত্যন্ত বেদনায়ক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। একটি স্বাধীন দেশে যেকোনো অপমৃত্যুই দুঃখজনক। কিন্তু সেই বাস্তবতাকে পুঁজি করে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর মিথ তৈরির পেছনে কাজ করেছিল গভীর রাজনৈতিক সমীকরণ।
বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা: মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী গোষ্ঠী এবং তৎকালীন চরমপন্থী দলগুলো একজোট হয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে খুনি হিসেবে চিত্রায়িত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়।
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস সামরিক অভ্যুত্থানের পর অবৈধভাবে ক্ষমতাদখলকারীরা নিজেদের অপরাধকে আড়াল করতে 'রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার'-এর কাল্পনিক গল্প বহুল প্রচার করে।
মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি: তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ মানুষের মনে এমন একটি ধারণা গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল যে, স্বাধীনতার পরপরই দেশে কেবল অরাজকতা ও গণহত্যার রাজত্ব ছিল।
রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল, ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন কিংবা নির্দিষ্ট কোনো শাসন আমলকে চরমভাবে কালিমালিপ্ত করার উদ্দেশ্যে একটি প্রকৃত সংখ্যাকে ৫০ গুণ বাড়িয়ে প্রচার করা রাজনৈতিক নীতি-নৈতিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। প্রোপাগান্ডা দিয়ে ইতিহাস সাময়িকভাবে বিকৃত করা গেলেও, নথি ও তথ্যের ওপর ভিত্তি করে লেখা গবেষণাই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের সত্য হিসেবে টিকে থাকে।
কেন এই পরিস্থিতি ‘স্বৈরাচার’ বনাম ‘কাউন্টার-ইনসার্জেন্সি’?
যাঁরা বঙ্গবন্ধুর ৩ বছর ৭ মাস ৫ দিনের শাসনকালকে কেবল 'রাজনৈতিক নিপীড়ন' বা 'স্বৈরাচারী শাসন' হিসেবে আখ্যায়িত করতে চান, তাঁরা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৎকালীন বাস্তবতাকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ঘটনাপ্রবাহ ছিল কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দমনপীড়ন নয়; এটি ছিল একটি Counter-Insurgency বা 'রাষ্ট্রীয় বিদ্রোহ দমন অভিযান'।
পৃথিবীর ইতিহাসে যেকোনো নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র যখন জন্ম নেয়, তখন সেই রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে সশস্ত্র অরাজকতার বিরুদ্ধে কঠোর হতে হয়।
ভারতের নকশাল আন্দোলন: ১৯৭০-এর দশকে ভারতে যখন নকশালবাড়ী সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তখন ভারতের গণতান্ত্রিক সরকার অত্যন্ত কঠোর হস্তে সশস্ত্র বিদ্রোহ দমন করেছিল।
যুক্তরাজ্য ও আইআরএ (IRA): উত্তর আয়ারল্যান্ডের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী আইআরএ-র বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার কঠোর সামরিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল।
বাংলাদেশেও যখন প্রতিদিন থানায় হামলা চালিয়া পুলিশ হত্যা করা হচ্ছিল, সংসদ সদস্যদের ওপর গুলি চালানো হচ্ছিল, দেশের অর্থনীতির রক্তনালী চোরাচালানের মাধ্যমে শুষে নেওয়া হচ্ছিল তখন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সামনে দুটি পথ খোলা ছিল: ১. চরমপন্থীদের হাতে আত্মসমর্পণ করে দেশকে সোমালিয়া বা যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের মতো একটি 'Failed State'-এ পরিণত হতে দেওয়া। ২. অথবা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর হস্তে সশস্ত্র বিদ্রোহ দমন করা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন। তিনি রাষ্ট্রকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে কাউন্টার-ইনসার্জেন্সি পরিচালনা করেছিলেন।
ইতিহাস যেখানে রাজনীতির ঊর্ধ্বে
ইতিহাস কোনো কল্পকাহিনি নয় এবং এটি রাজনৈতিক স্লোগান বা আবেগের ওপর ভর করে তৈরি হয় না। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে ৬৩০ জন মানুষের জীবনহানি অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক ছিল। একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজে একটি একটি করে ৬৩০টি প্রাণহানিই বেদনার।
কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য সেই ৬৩০ জনের মৃত্যুকে ৫০ গুণ বাড়িয়ে "৩০ হাজার" বা "লক্ষাধিক" বলে প্রচার করা একটি চরম ঐতিহাসিক অপরাধ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অবিচার।
"সত্যের নিজস্ব একটা ক্ষমতা আছে। মিথ্যা প্রোপাগান্ডার পাহাড় সাময়িকভাবে সত্যিটাকে ঢেকে রাখতে পারে, কিন্তু নথিপত্র আর দালিলিক প্রমাণের আলো পড়লে মিথ্যার সেই তাসের ঘর ভেঙে পড়তে বাধ্য।"
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনো ভিনগ্রহের দেবতা ছিলেন না; তিনি রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন। এক অভূতপূর্ব ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে, আন্তর্জাতিক তেলের চরম মূল্যবৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, চালের রাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র বিদ্রোহের মুখোমুখি হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে তাঁর সরকারের ভুলত্রুটি বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ভুলত্রুটিকে বিকৃত করে, কাল্পনিক লাশের সংখ্যা বানিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতিকে 'হত্যাকারী' হিসেবে চিত্রায়িত করার অপচেষ্টা ইতিহাস কখনোই ক্ষমা করবে না।
গবেষক বেবী মওদূদের “১৯৭২-৭৫ নিহত ৬৩০” বইটির দালিলিক প্রমাণ আজ আমাদের সামনে সত্যের আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। আজকের তরুণ প্রজন্ম ও ইতিহাসপ্রেমীদের প্রতি আকুল আবেদন কোনো রাজনৈতিক নেতার ভাষণ, ফেসবুক পোস্ট বা গুজবে কান না দিয়ে দালিলিক প্রমাণ (Primary Sources) নিয়ে কথা বলুন। মিথ্যার দেওয়াল ভেঙে বস্তুসত্যকে উন্মোচন করাই হোক আমাদের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা।















