শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী - বিশ্বস্ততার এক হিমালয় ও এক অকুতোভয় সেনানি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় নক্ষত্র, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন বিশ্বস্ত সহচর এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কাণ্ডারি শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী। বাংলার রাজনৈতিক আকাশে যে কটি নাম ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল, তাঁদের মধ্যে অন্যতম শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক, আইনজীবী এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এক অতন্দ্র প্রহরী।

TruthBangla
Jan 16, 2026
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় নক্ষত্র, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবন বিশ্বস্ত সহচর এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কাণ্ডারি শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী। বাংলার রাজনৈতিক আকাশে যে কটি নাম ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল, তাঁদের মধ্যে অন্যতম শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক, আইনজীবী এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এক অতন্দ্র প্রহরী।
১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর খুনি মোশতাক চক্র যখন জাতীয় চার নেতাকে ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে বা ভয় দেখিয়ে নিজেদের পক্ষে টানতে চেয়েছিল, তখন মনসুর আলীসহ চার নেতা জেলখানাকে বেছে নিয়েছিলেন, কিন্তু আদর্শের সাথে আপস করেননি। ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে যে চারজন জাতীয় নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম।
আজকের এই বিস্তারিত নিবন্ধে আমরা শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর বর্ণাঢ্য জীবন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অবদান, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন এবং ১৯৭৫-এর সেই কলঙ্কিত জেলহত্যার নেপথ্যের ষড়যন্ত্র ও প্রকৃত ঘটনাবলি নিয়ে আলোচনা করব।
জন্ম, শৈশব ও শিক্ষা জীবন
১৯১৯ সালের ১৬ জানুয়ারি সিরাজগঞ্জ জেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের কুড়িপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ মনসুর আলী। তাঁর শৈশব কেটেছে যমুনা তীরের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের সাথে মিশে।
গ্রাম্য পাঠশালা ও স্থানীয় স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি। তিনি তৎকালীন সময়ের বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। মেধাবী ছাত্র হিসেবে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ এবং পরবর্তীতে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ ও আইন বিষয়ে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন।
আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীনই তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে, যা পরবর্তীকালে তাঁকে শোষিত মানুষের পক্ষে কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
‘ক্যাপ্টেন’ উপাধির রহস্য
অনেকেই মনে করেন তিনি হয়তো নিয়মিত সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ছিলেন। বিষয়টি আসলে একটু ভিন্ন। ১৯৪৮ সালে তিনি পাকিস্তান ন্যাশনাল গার্ড (PNG)-এ যোগ দেন। সেখানে তিনি ‘ক্যাপ্টেন’ পদে অধিষ্ঠিত হয়ে যশোর সেনানিবাসে নিবিড় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই প্রশিক্ষণের সময় থেকেই তিনি ‘ক্যাপ্টেন মনসুর’ নামে পরিচিতি পান। যদিও তিনি পেশাদার সৈনিক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়েননি, কিন্তু এই সামরিক প্রশিক্ষণ তাঁর মধ্যে নিয়মানুবর্তিতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ও ১৯৫৪-এর নির্বাচন
আইন পেশায় নিয়োজিত থাকলেও মনসুর আলীর মন পড়ে ছিল সাধারণ মানুষের রাজনীতিতে। ১৯৫১ সালে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।
যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন (১৯৫৪): ১৯৫৪ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তিনি পূর্ব বাংলা আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন।
ছয় দফা আন্দোলন: ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু যখন বাঙালির মুক্তির সনদ ‘ছয় দফা’ পেশ করেন, তখন মনসুর আলী পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে এই আন্দোলনকে সুসংগঠিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই আন্দোলনের সময় তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়।
১৯৭০-এর নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিকাল
১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। ১৯৭১-এর উত্তাল মার্চে যখন অসহযোগ আন্দোলন চলছিল, তখন তিনি সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে ছাত্র-জনতাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে থাকেন। ২৫ মার্চ কালোরাতে পাকিস্তানি বাহিনী অপারেশন সার্চলাইট শুরু করলে বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হন। এম মনসুর আলী তখন সুকৌশলে ঢাকা ত্যাগ করেন।
যুদ্ধের সেই কঠিন দিনগুলি
২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হওয়ার পর মনসুর আলী ঢাকার সোবহানবাগ কলোনি থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কেরানীগঞ্জ হয়ে নিজ গ্রাম কুড়িপাড়ায় পৌঁছান। কিন্তু সেখানেও পাকিস্তানি বাহিনীর শকুনি নজর থাকায় তিনি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যান।
আসামের মাইনকার চর হয়ে তিনি কলকাতায় পৌঁছান। সেখানে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং কামারুজ্জামানের সাথে মিলিত হয়ে বাংলাদেশের প্রথম সরকার বা মুজিবনগর সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।
১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে (বর্তমান মুজিবনগর) গঠিত সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তিনি অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। যুদ্ধের ৯ মাস তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে যুদ্ধের খরচ ও অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করেন। ৮নং থিয়েটার রোডের অস্থায়ী অফিস থেকে তিনি প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করতেন।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র গঠন ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু যখন স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন, তখন থেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনে মনসুর আলীর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। তিনি সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী এবং পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
বাকশাল ও প্রধানমন্ত্রীর পদ
১৯৭৫ সালে দেশের বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’-এর ডাক দিয়ে বঙ্গবন্ধু যখন বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) গঠন করেন, তখন শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং দক্ষ একজন সহচর, যার ওপর বঙ্গবন্ধু চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে পারতেন।

জাতীয় চার নেতা - বাংলাদেশের চার স্তম্ভ
এই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা বুঝতে হলে আমাদের জানতে হবে কাদের আমরা হারিয়েছিলাম:
সৈয়দ নজরুল ইসলাম: যিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
তাজউদ্দীন আহমদ: বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠক। যার মেধা ও নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়েছিল।
এম মনসুর আলী: মুক্তিযুদ্ধের সময় অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকারী এবং বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহচর।
এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামান: স্বরাষ্ট্র ও ত্রাণমন্ত্রী হিসেবে যুদ্ধের সময় ১ কোটি শরণার্থীর খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন।
আগস্টের ট্র্যাজেডি ও জেলহত্যার নীল নকশা
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনি চক্র খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে ক্ষমতা দখল করে। মোশতাক জানতেন, আওয়ামী লীগের প্রথম সারির এই চার নেতা (সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান) বেঁচে থাকলে এবং বাইরে থাকলে তার ক্ষমতা চিরস্থায়ী হবে না।
কেন তাঁদের হত্যা করা হলো? খুনিরা তাঁদের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল মোশতাক সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে। কিন্তু শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ঘৃণাভরে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেছিলেন, "যাঁরা আমার নেতাকে হত্যা করেছে, তাঁদের সাথে আমি হাত মেলাতে পারি না।" এই অটল দেশপ্রেম ও আনুগত্যের কারণেই তাঁদের কারারুদ্ধ করা হয়।
৩রা নভেম্বর - ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সেই ভয়াবহ রাত
বাংলার আকাশে তখনো ১৫ই আগস্টের শোকের মেঘ কাটেনি। শোকাতুর জাতি যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ভেতরে সংঘটিত হয় ইতিহাসের অন্যতম জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড। পৃথিবীর ইতিহাসে কারাগারের ভেতরে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকাকালীন এমন পরিকল্পিত ও বর্বরোচিত হত্যার নজির খুব কমই আছে।
১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর রাত। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ১ নম্বর সেলে বন্দি ছিলেন চার জাতীয় নেতা। তৎকালীন তথাকথিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরাসরি মদদে একদল ঘাতক সেনাসদস্য গভীর রাতে কারাগারের প্রধান ফটকে উপস্থিত হয়। কারারক্ষীরা প্রথমে তাদের ভেতরে প্রবেশ করতে বাধা দিয়েছিলেন, কারণ নিয়মানুযায়ী রাতে কারাগারের ভেতরে সশস্ত্র বাহিনীর প্রবেশের কোনো বিধান নেই।
ঘাতক দল যখন বাধার মুখে পড়ে, তখন তারা সরাসরি যোগাযোগ করে বঙ্গভবনে। খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজে টেলিফোনে আইজি প্রিজনকে নির্দেশ দেন ঘাতকদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়ার জন্য। কারাগারের নিরাপত্তা ভেঙে খুনিরা ভেতরে ঢুকে পড়ে। এরপর ১ নম্বর সেলে চার নেতাকে একত্রিত করা হয়।
ঘাতকদের পরিচয় ও হত্যার ধরণ
ঘাতক দলের নেতৃত্বে ছিল রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন। তার সাথে ছিল দফাদার মারফত আলী শাহ এবং দফাদার মো. আবুল হাশেম মৃধা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ মতে, খুনিরা কারাকক্ষে ঢুকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ব্রাশফায়ার শুরু করে। চার নেতার রক্তাক্ত দেহ মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে।
কিন্তু এখানেই তাদের রক্তপিপাসা মেটেনি। মৃত্যু নিশ্চিত করতে তারা অর্ধমৃত নেতাদের দেহের ওপর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে। জানা যায়, তাজউদ্দীন আহমদ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পানি চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই পিপাসা মেটানোর সুযোগও তাকে দেওয়া হয়নি। ঘাতকরা যখন কারাগার থেকে বের হয়ে যায়, তখন সেখানে পড়ে ছিল কেবল নিথর দেহ আর রক্তের সমুদ্র।
কেন এই জেলহত্যা?
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং জেলহত্যাকে অনেকেই কেবল গুটিকয়েক 'বিপথগামী' সেনাসদস্যের কাজ বলে চালিয়ে দিতে চান। কিন্তু গভীর বিশ্লেষণ বলছে অন্য কথা। এটি ছিল একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ।
ঘাতকরা জানত, বঙ্গবন্ধু বেঁচে না থাকলেও এই চার নেতা যদি মুক্ত থাকেন, তবে তারা যেকোনো সময় আবারও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ পরিচালনা করতে পারবেন। বিশেষ করে তাজউদ্দীন আহমদের মতো প্রখর মেধাবী ও দক্ষ সংগঠক বেঁচে থাকলে তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ত। তাই বাংলাদেশকে নেতৃত্বহীন করার জন্য জেলহত্যা ছিল তাদের অপরিহার্য 'অ্যাসাইনমেন্ট'।
মার্কিন ষড়যন্ত্র ও সিআইএ (CIA)-র সম্পৃক্ততা
১৯৭৫-এর ট্র্যাজেডির পেছনে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। তৎকালীন শীতল যুদ্ধের (Cold War) প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত প্রভাব কমানো এবং মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং জেলহত্যা কি কেবল গুটিকয়েক বিপথগামী সেনাসদস্যের কাজ ছিল? ইতিহাসের তথ্য কিন্তু অন্য কথা বলে। ১৯৮১ সালে ‘দৈনিক খবর’ পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর প্রধান খুনি কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান এক চাঞ্চল্যকর সাক্ষাতকার দিয়েছিল।
ফারুক স্বীকার করেছিল যে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-র সবুজ সংকেত পাওয়ার পরেই তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। এমনকি পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-র প্রত্যক্ষ নির্দেশেই জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল যাতে দেশে কোনো শক্তিশালী নেতৃত্ব পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যাতে সোভিয়েত ব্লকের দিকে বেশি ঝুঁকে না পড়ে এবং মার্কিন স্বার্থ রক্ষা পায়, সেজন্যই এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গবন্ধু সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখছিল, যা তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন ভালো চোখে দেখেনি। জাতীয় চার নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পরম অনুসারী। তাই তাদের সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশকে মার্কিন বলয়ে নিয়ে আসা এবং ভারত-সোভিয়েত প্রভাবমুক্ত করার একটি ব্লু-প্রিন্ট সিআইএ কার্যকর করেছিল বলে ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ ইঙ্গিত দেয়।
বিচার ও ন্যায়বিচারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা
জেলহত্যার পর দীর্ঘ ২১ বছর এই হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার হয়নি। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে খুনিদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এই কলঙ্কিত অধ্যায়ের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
আদালত এই ঘটনাকে একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০০৪ সালে নিম্ন আদালত এবং পরবর্তীতে উচ্চ আদালত ও সুপ্রিম কোর্ট খুনিদের মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। কর্নেল ফারুক, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খানদের ফাঁসি কার্যকর হলেও রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনসহ কয়েকজন এখনো বিদেশে পলাতক।
শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর উত্তরাধিকার
শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর রক্ত তাঁর পরবর্তী প্রজন্মও ধারণ করছে। তাঁর সুযোগ্য সন্তান মোহাম্মদ নাসিম (প্রয়াত) বাংলাদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। সিরাজগঞ্জের মানুষের কাছে মনসুর আলীর পরিবার আজও সততা ও ত্যাগের প্রতীক।
তথ্যসূত্র ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব (Table of Quick Facts)
বিষয় | তথ্য |
জন্ম | ১৬ জানুয়ারি ১৯১৯, সিরাজগঞ্জ |
রাজনৈতিক পদ | বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, প্রথম সরকারের অর্থমন্ত্রী |
উপাধি | ক্যাপ্টেন (পাকিস্তান ন্যাশনাল গার্ডের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত) |
প্রধান অবদান | মুজিবনগর সরকার গঠন, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, বাকশাল প্রশাসন |
শাহাদাত | ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ (জেলহত্যা দিবস) |
হত্যাকারী দল | রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনের নেতৃত্বে ঘাতক দল |
আমাদের শিক্ষা
শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী আমাদের শিখিয়ে গেছেন, রাজনীতির মূল ভিত্তি হলো আদর্শ এবং নেতার প্রতি অবিচল আনুগত্য। ক্ষমতার মোহ বা মৃত্যুর ভয় তাঁকে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ৩রা নভেম্বরের জেলহত্যা কেবল কয়েকজন ব্যক্তিকে হত্যা ছিল না, এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার একটি অপচেষ্টা।
আজকের তরুণ প্রজন্মের উচিত ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর মতো দেশপ্রেমিক নেতাদের জীবনী পড়া এবং তাঁদের ত্যাগ থেকে শিক্ষা নেওয়া। একটি সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে তাঁর মতো সৎ ও সাহসী নেতৃত্বের আদর্শ আজও প্রাসঙ্গিক।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















