বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মতিউর রহমানের কবরে ‘গাদ্দার’ এপিটাফ ও জামাতের ঘৃন্য রাজনীতি
করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটির প্রখর রোদে জ্বলজ্বল করছিল পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একটি 'টি-৩৩' প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমানের ক্যানোপি। রানওয়েতে উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত বিমানটির কলসাইন ছিল 'মাহি-৩৩'। কিন্তু সেই সাধারণ সামরিক মহড়ার নেপথ্যে রচিত হচ্ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে দুঃসাহসিক, ড্রামাটিক ও আত্মত্যাগের এক অনন্য মহাকাব্য। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান মনঃস্থির করেছিলেন আজই, এই মুহূর্তেই শত্রুর যুদ্ধবিমান ছিনতাই করে তিনি উড়াল দেবেন স্বাধীন স্বদেশের লক্ষ্যে, ফের যোগ দেবেন রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামে।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট। পাকিস্তানের করাচিতে অবস্থিত বিমানবাহিনীর অতিসংবেদনশীল ‘মাসরুর’ ঘাঁটির (তৎকালীন পিএএফ বেস মারিপুর) প্রখর রোদে জ্বলজ্বল করছিল একটি ‘টি-৩৩’ প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমানের কাচের ক্যানোপি। রানওয়েতে উড্ডয়নের প্রস্তুত নিয়েছিল ‘মাহি-৩৩’ কলসাইনের বিমানটি। কিন্তু সেই সাধারণ সামরিক মহড়ার নেপথ্যে রচিত হচ্ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধিকার সংগ্রামের সবচেয়ে দুঃসাহসিক, রুদ্ধশ্বাস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য মহাকাব্য। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান মনঃস্থির করেছিলেন আজই, এই প্রহরেই তিনি শত্রুর যুদ্ধবিমান ছিনতাই করে উড়াল দেবেন স্বাধীন স্বদেশের লক্ষ্যে, আবার যোগ দেবেন রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামে।
বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস অসংখ্য বীরত্ব ও আত্মত্যাগের গল্পে সমৃদ্ধ। কিন্তু শত্রুদেশের সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটির ভেতর থেকে একটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ছিনতাই করে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করার এমন নজির বিশ্ব সামরিক ইতিহাসের পাতায় বিরল। এটি ছিল একদিকে একজন অকুতোভয় বীর দেশপ্রেমিকের অসম সাহসিকতার মহাকাব্য, অন্যদিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা দেশীয় রাজনৈতিক কুচক্রী দোসরের কদর্য রূপ ও সত্যের নথিবদ্ধ দলিল।
মতিউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সিদ্ধান্ত
সামরিক ক্যারিয়ারের পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানকে তাঁর স্বজাতির সংকট থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ১৯৭১ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে তিনি দুই মাসের ছুটি নিয়ে পরিবারসহ পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে পুরো বাংলা যখন স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বেলিত, তখন তিনি স্বশরীরে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা 'অপারেশন সার্চলাইট' এর মাধ্যমে ঢাকাসহ সারা দেশে নারকীয় গণহত্যা শুরু করলে তিনি নিজের পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। সামরিক অফিসার হিসেবে হাত গুটিয়ে বসে না থেকে তিনি পৈতৃক নিবাস নরসিংদীর রায়পুরার রামনগরে চলে যান এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রত্যক্ষ প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।
রায়পুরায় প্রাথমিক প্রতিরোধ ও প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গঠন: নরসিংদী ও ভৈরব অঞ্চলে অবস্থান নিয়ে মতিউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগৃহীত থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল ও হালকা অস্ত্র দিয়ে তিনি তরুণ ও যুবকদের সামরিক কৌশল শেখাতে শুরু করেন। রায়পুরা ও ভৈরবের মধ্যবর্তী অঞ্চলে একটি সাময়িক সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করেন এবং সেখান থেকে দৌলতকান্দিসহ আশপাশের এলাকায় সমাবেশ ও মিছিলের নেতৃত্ব দেন।
১৯৭১ সালের ১৪ই এপ্রিল পাকিস্তান বিমান বাহিনীর এফ-৮৬ স্যাবরJet ভৈরব ঘাঁটির ওপর বোমাবর্ষণ করে। মতিউর রহমান তাঁর পূর্ব সামরিক অভিজ্ঞতার কারণে শত্রুর বিমান হামলার কৌশল আগাম অনুমান করতে পেরেছিলেন, ফলে ক্ষয়ক্ষতি এড়িয়ে প্রতিরোধ বাহিনীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সক্ষম হন।
করাচিতে নজরবন্দি ও ঘাঁটি নিরাপত্তা অফিসারের দায়িত্ব: মে মাসে পাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষ কৌশলে মতিউর রহমানকে ঢাকায় ডেকে পাঠায় এবং পরিবারসহ জোরপূর্বক করাচিতে ফেরত পাঠায়।
পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তৎকালীন সব বাঙালি পাইলট ও বিমানকর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে। এর অংশ হিসেবে মতিউরকে ফ্লাইট ইন্সট্রাক্টর (উড্ডয়ন প্রশিক্ষক) ও সক্রিয় উড্ডয়নের (Active Flying) দায়িত্ব থেকে সরিয়ে করাচির মৌরিপুর (বর্তমানে মাসরুর) ঘাঁটির 'গ্রাউন্ড সেফটি অফিসার' বানিয়ে রাখা হয়।
কড়া নজরদারি ও গৃহবন্দি সদৃশ অবস্থায় থেকেও মতিউর স্বাধীনতার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। করাচি ঘাঁটিতে কর্মরত অন্যান্য দেশপ্রেমিক বাঙালি কর্মকর্তা ও কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে তিনি একটি যুদ্ধবিমান ছিনতাই করে ভারতে নিয়ে যাওয়ার এবং মুজিবনগর সরকারের অধীনে স্বাধীন বাংলা বিমান বাহিনীতে যোগ দেওয়ার গোপন ছক আঁকেন। সেই দিনগুলোতেও মতিউরের হৃদয়ে স্পন্দিত হচ্ছিল কেবল একটিই লক্ষ্য যেকোনো মূল্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া এবং স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন করা।
২০ আগস্ট ১৯৭১ করাচির ককপিটে রক্ত হিম করা মুহূর্ত ও অপারেশন
করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটি (তৎকালীন পিএএফ বেস মারিপুর) ছিল পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কড়া পাহারায় আবৃত কৌশলগত সামরিক কেন্দ্র। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সেখানে বাঙালি কর্মকর্তা ও বিমানসেনাদের ওপর ২৪ ঘণ্টা কড়া গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হতো। কিন্তু মতিউর রহমান জানতেন, মুক্তিকামী বাঙালির তখন নিজস্ব কোনো বিমানবাহিনী ছিল না। যদি শত্রুর একটি উন্নত প্রযুক্তি ও অস্ত্রসজ্জিত বিমান ছিনতাই করে ভারতে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে তা কেবল একটি আক্রমণ হবে না তা হবে অনাগত ‘বাংলাদেশ বিমানবাহিনী’ গঠনের মূল ভিত।
১৯৭১ সালের ২০ই আগস্ট (শুক্রবার) সকালে মতিউর তাঁর দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পিত মিশন বাস্তবায়নের জন্য করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটিতে উপস্থিত হন। রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে মাসরুর ঘাঁটির রানওয়েতে দাঁড়িয়েছিল একটি 'টি-৩৩ Shooting Star' প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান, যার কলসাইন ছিল 'মাহি-৩৩'।
তাঁর অধীনে কাজ করা ২১ বছর বয়সী শিক্ষানবিস পাকিস্তানি পাইলট অফিসার রাশেদ মিনহাজ টি-৩৩ (কল সাইন 'ব্লু-বার্ড-১৬৬') প্রশিক্ষণ বিমানে দ্বিতীয়বারের মতো একক উড্ডয়নের (Solo flight) প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মতিউর লক্ষ্য করেন, বিমানটিতে পর্যাপ্ত জ্বালানি রয়েছে যা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের গুজরাটের ভুজ (Bhuj) বিমানঘাঁটি পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট।
ক্যানোপি খোলার কৌশল ও ককপিটে আরোহণ: সেফটি অফিসার হওয়ার কারণে মতিউরের উপস্থিতিতে কেউ প্রাথমিক সন্দেহ করেনি। তিনি রানওয়েতে গিয়ে হাত উঁচিয়ে বিমানটি থামানোর সিগন্যাল দেন। নিয়ম অনুযায়ী রশীদ মিনহাজ বিমান থামিয়ে ক্যানোপি (বিমানের কাচের ঢাকনা) খুলে কারণ জানতে চায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই মতিউর দ্রুত লাফিয়ে ককপিটে উঠে পড়েন।
ককপিটে উঠেই মতিউর পকেট থেকে ক্লোরোফর্ম ভেজানো রুমাল বের করে রশীদ মিনহাজের নাকে-মুখে চেপে ধরেন, যাতে সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে এবং তিনি একা বিমানটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন।
কিন্তু রশীদ মিনহাজ পুরোপুরি সংজ্ঞাহীন হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ককপিটের ইমার্জেন্সি রেডিও সুইচ চেপে ধরে কন্ট্রোল টাওয়ারে চিৎকার করে বার্তা পাঠায় "আই অ্যাম বিয়িং হাইজ্যাকড!" (আমাকে হাইজ্যাক করা হচ্ছে!)।
বার্তামাত্রই মাসরুর ঘাঁটিতে 'রেড অ্যালার্ট' জারি হয়। কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে তৎক্ষণাৎ ৪টি সশস্ত্র এফ-৮৬ সেবার জেট বিমানকে নির্দেশ দেওয়া হয় যেকোনো মূল্যে হাইজ্যাক করা টি-৩৩ বিমানটিকে ভূপাতিত করতে বা অবতরণে বাধ্য করতে।
৩৫ মাইলের ব্যবধানে আকাশসীমায় জীবন-মৃত্যুর ধস্তাধস্তি
কন্ট্রোল টাওয়ার সতর্ক হয়ে গেছে বুঝতে পেরে মতিউর রহমান বিমানটিকে অত্যন্ত নিচু দিয়ে (Low Altitude) উড়িয়ে নিয়ে যেতে থাকেন, যাতে পাকিস্তানি রাডারে বিমানের গতিপথ ধরা না পড়ে। তিনি দক্ষ হাতে বিমান পরিচালনা করে ভারত সীমান্তের দিকে ধাবিত হতে থাকেন। বিমানটি দ্রুত গতিতে সিন্ধু প্রদেশের থাট্টা এলাকার ওপর দিয়ে ভারতীয় গুজরাট সীমান্তের দিকে এগোচ্ছিল। ভুজ বিমানঘাঁটি তখন খুব বেশি দূরে ছিল না মাত্র ৩৫ মাইল! আর মাত্র কয়েক মিনিটের আকাশপথ অতিক্রম করতে পারলেই মিশন সফল হতো।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটে যায় মর্মান্তিক মোড়। ক্লোরোফর্মের প্রভাব কাটিয়ে পেছনের আসনে থাকা রশীদ মিনহাজ আংশিক সংজ্ঞা ফিরে পায়। বিমানটি ভারত সীমান্তে ঢুকে যাচ্ছে টের পেয়ে মিনহাজ বিমানের মূল কন্ট্রোল স্টিক টেনে ধরে এবং বিমানটি ক্র্যাশ করানোর চেষ্টা করে। সংকীর্ণ ককপিটের ভেতরে শুরু হয় দুই বিপরীতমুখী দর্শনের চরম শারীরিক ধস্তাধস্তি:
মতিউরের লক্ষ্য: বিমানটিকে আর কয়েক মিনিট সচল রেখে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নের জন্য ভারতীয় ভূখণ্ডে নিরাপদ অবতরণ করানো।
মিনহাজের লক্ষ্য: নিজেকে উৎসর্গ করে হলেও বিমানটিকে ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকতে না দিয়ে ধ্বংস করা।
ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে মিনহাজ বিমানের ইজেকশন মেকানিজম বা জয়স্টিক এমনভাবে চাপ দেয় যে মাটির খুব কাছাকাছি থাকা বিমানটি তীব্র বেগে থাট্টার ড্রামবাঘ এলাকার বালিয়াড়িতে আছড়ে পড়ে।
উচ্চতা অত্যন্ত কম থাকায় মতিউর রহমান প্যারাস্যুট খুলে বের হওয়ার সামান্যতম সুযোগও পাননি। বিস্ফোরণের পর ককপিট থেকে দূরে ছিটকে পড়ে করাচির শুকনো মাটিতে শাহাদাত বরণ করেন বাঙালির সর্বকালের অন্যতম সেরা বীর সন্তান ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান।
গ্রীক পৌরাণিক চরিত্র 'ইকারাস' যেমন মুক্ত আকাশের ডানায় ভর দিয়ে সূর্যের আলো স্পর্শ করতে গিয়ে ডানা পুড়িয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি স্বাধীন স্বদেশের সূর্যকে স্পর্শ করার অপ্রতিরোধ্য আকাক্সক্ষায় আকাশে ডানা মেলে অকালে আত্মাহুতি দিলেন আমাদের এ যুগের ইকারাস শহীদ বীর মতিউর রহমান।
করাচির মাটিতে শহীদ মতিউরের কবরে ‘গাদ্দার’ ফলক
বিমানের ধ্বংসাবশেষের সাথে সাথে থাট্টার বালিয়াড়িতে রক্তে ভেসে গিয়েছিল মতিউরের স্বপ্ন। কিন্তু মৃত্যুর পরও পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর আক্রোশ, হিংসা ও প্রতিশোধপরায়ণতা থামেনি। শত্রু দেশের মৃতদেহের প্রতি ন্যূনতম ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শন করা সভ্য সমাজের নীতি হলেও পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ চরম অসভ্যতার পরিচয় দেয়।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী কর্মকর্তা বা পাইলটদের দাফন সামরিক মর্যাদায় নির্ধারিত অফিসার্স গোরস্থানে হওয়ার কথা। কিন্তু বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে চরম অসম্মান প্রদর্শন করতে এবং মানসিকভাবে নিচু করার উদ্দেশ্যে করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটির চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত একটি অবহেলিত, ধূলিমলিন ও নিচু গোরস্থানে মাটির নিচে চাপা দেওয়া হয়।

শহীদ মতিউর রহমানের কবরের এফিটাফ ও মিনহাজের কবরের এফিটাফ।
রশীদ মিনহাজকে তারা তাদের জাতীয় বীর ঘোষণা করে এবং সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব 'নিশান-ই-হায়দার' এ ভূষিত করে। অন্যদিকে, বীর মতিউর রহমানকে অভিহিত করা হয় "গাদ্দার" (বিশ্বাসঘাতক), "ভারতের বেতনভুক্ত এজেন্ট" এবং "দুষ্কৃতকারী" হিসেবে।
কবরের এফিটাপে উর্দুতে ‘গাদ্দার’ ছন্দ
১৯৭১ সালে দাফন করার পর ১৯৭৮ কিংবা ১৯৮০ সাল পর্যন্ত মতিউর রহমানের কবরে একটি অতি সাধারণ ফলক বসানো ছিল। সেই ফলকে উর্দু ভাষায় একটি ছন্দ খোদাই করে তাঁকে ‘গাদ্দার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পাকিস্তানি গণমাধ্যম ও মিডিয়ায় তৎকালীন সময়ে অত্যন্ত অহংকার ও গর্বের সাথে প্রচার করা হতো কীভাবে তারা এই 'বিশ্বাসঘাতক'কে শাস্তি দিয়ে অবহেলায় মাটি চাপা দিয়েছে।
অন্যদিকে, নিহত রশীদ মিনহাজের কবরে একটি মার্বেল পাথরের সুদৃশ্য এফিটাপ তৈরি করে সেখানে একটি উগ্র কবিতা লিখে রাখা হয়। সেই কবিতার মূলভাব ছিল মিনহাজ হলেন ঈমানদার বা 'মুমিন', আর মতিউর রহমান হলেন ধোঁকাবাজ বা 'মুনাফিক'। মৃতদেহের সাথেও এই জাতীয় মনস্তাত্ত্বিক বৈরিতা ও বিকৃতি প্রমাণ করে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কদর্য চিন্তাধারা।
কবরের এপিটাফ পরিবর্তন
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর বাংলাদেশে যখন সামরিক শাসন ও জামায়াতে ইসলামীর পুনর্বাসনের রাজনীতি শুরু হয়, তখন পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের জিয়া ও এরশাদ সরকারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ছলে পাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষ মতিউরের কবরের সেই ‘গাদ্দার’ লেখা এপিটাফটি তুলে ফেলে দেয়।
১৯৯৪ সালে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের কন্যা, তাঁর স্বামী ও ছোট সন্তানকে সাথে নিয়ে প্রথমবার করাচির মাসরুর ঘাঁটিতে গিয়ে মতিউরের কবর জিয়ারত করেন। সেখানে গিয়ে তারা কবরের ওপর কোনো এপিটাফ দেখতে পাননি। ‘গাদ্দার’ লেখা যে পুরনো বিতর্কিত ফলকটি ছিল, কূটনৈতিক লজ্জার ভয়ে পাকিস্তানি প্রশাসন সেটি তুলে ফেলে দিয়েছিল। ফলে পুরো কবরটি একটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল।
মাসরুর ঘাঁটির প্রবেশদ্বারে অপমান ও ডেইলি স্টারের নথি: ২০০৫ সালের ২৪ মার্চ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টার (The Daily Star)-এ বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের সহধর্মিণী মিলি রহমানের একটি বিষদ সাক্ষাৎকার ও বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মতিউর রহমানের কবরের উপর তারা কোন এপিটাফ দেখতে পাননি। তারা আরো জানান, করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটির মূল প্রবেশদ্বারে (Sadar Darwaza) বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের একটি ছবি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল এবং তার নিচে বড় বড় অক্ষরে লিখে রাখা হয়েছিল "গাদ্দার" (Traitor)। পাকিস্তানের পাঠ্যপুস্তকে এবং সামরিক ঘাঁটির কনিষ্ঠ ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ ক্লাসেও মতিউর রহমানকে একাত্তরের প্রধান 'গাদ্দার' বা 'বিশ্বাসঘাতক' হিসেবে উপস্থাপন করা হতো।

২০০৬ সালে বসানো নতুন এপিটাফ
২০০৬ সালে যখন বাংলাদেশ সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বীরশ্রেষ্ঠের দেহাবশেষ ফিরিয়ে আনতে করাচি সফর করে, তখনকার প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায় একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য।
প্রতিনিধি দল দেখার ঠিক কয়েক দিন আগে করাচি সামরিক প্রশাসন দ্রুত কবরটি চুনকাম করে, নতুন করে মাটি ফেলে এবং একটি নতুন মার্বেল পাথরের এফিটাপ বসিয়ে দেয়, যাতে মতিউরের নাম, পদবী ও মৃত্যুতারিখ লেখা ছিল। এটি ছিল বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সম্মানে এবং বিশ্ব মিডিয়ার কাছে নিজেদের সভ্য প্রমাণ করার একটি চতুর কূটনৈতিক প্রসাধন। প্রকৃতপক্ষে, পাকিস্তানের সামরিক সংস্কৃতিতে আজও মতিউর রহমানকে 'গাদ্দার' হিসেবেই দেখা হয়।
৩৫ বছরের অপেক্ষা ও বীরের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন
করাচির সেই উত্তপ্ত ও ধূলিমলিন গোরস্থানে দীর্ঘ ৩৫টি বছর একাকী, স্বজনহীন অবস্থায় শুয়ে ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান। যে স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি নিজের নিশ্চিত উচ্চপদস্থ সামরিক জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়েছিলেন, সেই স্বাধীন স্বদেশের মাটি তিনি ছুঁতে পারেননি সাড়ে তিন দশক।
স্বাধীনতার পর থেকে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউরের পরিবার, বিশেষ করে তাঁর সহধর্মিণী মিলিয়া রহমান এবং বীর মুক্তিযোদ্ধারা মতিউরের দেহাবশেষ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ক্রমাগত দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান সরকারের নানা বাহানা, আইনি জটিলতা ও কূটনৈতিক তালবাহানার কারণে এই প্রক্রিয়া বারবার পিছিয়ে যায়।
অবশেষে দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনার পর ২০০৬ সালের ২৪শে জুন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের দেহাবশেষ পাকিস্তান থেকে একটি বিশেষ বিমানে করে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনা হয়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন তাঁর কফিন এসে পৌঁছায়, তখন পুরো জাতি কান্না ও গর্বের এক অনন্য আবেগে ভেসে যায়।
২০০৬ সালের ২৫শে জুন পূর্ণ সামরিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে পুনরায় সমাহিত করা হয়। যে দেশের পতাকাকে তিনি ভালোবাসতেন, সেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রিয় লাল-সবুজ পতাকায় মুড়ে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। ৩৫ বছর পর এ যুগের ইকারাস ফিরে এলেন তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিতে কোনো পরাজিত সৈনিক হিসেবে নয়, স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব 'বীরশ্রেষ্ঠ' হয়ে।
একাত্তরের ঘৃন্য রাজাকার মতিউর রহমান নিজামীর বক্তব্য ও ‘দৈনিক সংগ্রাম’ এর দলিল
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের এই মহান আত্মত্যাগের ঘটনাটি যখন সমগ্র মুক্তিকামী বাঙালি জাতির হৃদয়ে প্রেরণার অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে দিয়েছিল, ঠিক তখনই এদেশের মাটিতে জন্ম নেওয়া কিছু কুলাঙ্গার ও দেশদ্রোহী রাজনৈতিক চরিত্র এই বীরত্বকে কালিমালিপ্ত করতে ব্যস্ত ছিল।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান রক্ষার্থে গঠিত জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন 'পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘ' (যা পরবর্তীতে আলবদর বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়)-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। মতিউর রহমানের বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনার পর নিজামী এবং তার দলের সংবাদপত্রগুলো যে ঘৃণ্য বক্তব্য ছড়িয়েছিল, তা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কালো দলিল।
১ সেপ্টেম্বর ১৯৭১: দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত মতিউর রহমান নিজামীর বক্তব্য
১৯৭১ সালের ১ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামীর অফিশিয়াল মুখপত্র 'দৈনিক সংগ্রাম'-এ মতিউর রহমান নিজামীর একটি বক্তব্য সবিস্তারে প্রকাশিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রসভায় দাঁড়িয়ে নিজামী বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে চরম অসভ্য ভাষায় গালাগালি ও অপবাদ দেন:
“যে বিশ্বাসঘাতক বিগত ২০ শে আগস্ট একটি ট্রেনিংদাতা জেট বিমানকে ভারতে হাইজ্যাক করার ব্যর্থ চেষ্টা চালায় তার নাম হচ্ছে মতিউর রহমান। মতিউর রহমান ভারতের এজেন্ট ও দুস্কৃতিকারী, রশীদ মিনহাজ বীর শহীদ। পাকিস্তানি ছাত্রসমাজ তার এ মহান আত্মত্যাগে গর্বিত। ভারতীয় হানাদার ও এজেন্টদের মোকাবেলায় মহান শহীদ মিনহাজের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অক্ষুন্ন রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর।” (সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম, ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭১)

৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ রশীদ মিনহাজের পিতার কাছে পাঠানো তারবার্তা
নিজামীর কুৎসিত ভূমিকা কেবল বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি দাসত্ব প্রমাণ করতে নিজামী নিহত পাকিস্তানি পাইলট রশীদ মিনহাজের পিতার কাছে শোক ও তারবার্তা পাঠান। ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে 'দৈনিক সংগ্রাম'-এ এই খবরটি অত্যন্ত গর্বের সাথে প্রকাশ করা হয়:
“শহীদ মিনহাজের পিতার নিকট ছাত্রনেতার তারবার্তা। পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি জনাব মতিউর রহমান নিজামী শহীদ মিনহাজের পিতার কাছে গত বৃহস্পতিবার একটি তারবার্তা পাঠিয়েছেন। তারবার্তায় বলা হয়, আমরা পাকিস্তানী ছাত্রসমাজ আপনার পুত্রের মহান আত্মত্যাগে গর্বিত। ভারতীয় হামলার ও এজেন্টদের মোকাবিলায় শহীদ রশীদ মিনহাজের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা অক্ষুণ্ণ রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর।” (সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম, ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১)
এই দুটি নথিবদ্ধ ঐতিহাসিক দলিল প্রমাণ করে যে, একাত্তরের রক্তক্ষয়ী দিনে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রনেতারা কীভাবে বাংলাদেশের সূর্যসন্তানদের 'গাদ্দার' ও 'ভারতের এজেন্ট' বলে গালি দিয়েছিল এবং পাকিস্তানি দখলদারদের পা চেটে তাদের উৎসাহিত করেছিল।
জামায়াতের নব্য-অপপ্রচার ও বীরশ্রেষ্ঠকে অবমাননা
একাত্তরে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও জামায়াতে ইসলামী যে মনস্তাত্ত্বিক ঘৃণা বপন করেছিল, তা দুই দশক পেরিয়ে আজও আধুনিক ডিজিটাল সামাজিক মাধ্যমে প্রবাহমান। আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জামায়াত-শিবিরের কর্মী ও সমর্থকরা বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে অবমাননা করতে তাকে "বিমানচোর" বা "হাই জ্যাকার" বলে অভিহিত করে পোস্ট দেয়, আর শত্রুদেশের পাইলট রশীদ মিনহাজকে "শহীদ বীর" হিসেবে আখ্যায়িত করে শ্রদ্ধা জানায়! এই মনস্তাত্ত্বিক কদর্যতার শিকড় কোথায়? কেন তারা বাংলাদেশের বীরশ্রেষ্ঠদের ঘৃণা করে?
মেজর ডালিমের সাক্ষাত্কার ও জামায়াতের চরিত্র
বঙ্গবন্ধুর অন্যতম খুনি বরখাস্তকৃত মেজর ডালিম এক প্রবাসী সাংবাদিককে দেওয়া বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক চরিত্রের একটি গোপন দিক উন্মোচন করেছিলেন। ডালিম বলেছিলেন:
"শেখ মুজিব ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রধান শত্রু। আর বঙ্গবন্ধুর খুনিরা যেহেতু শেখ মুজিবকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল, তাই তারা (খুনিরা) জামায়াতে ইসলামীর পরম বন্ধু।"
এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, জামায়াত-শিবিরের মূল শত্রু কেবল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাই ছিলেন না। তাদের মূল শত্রু ছিল পুরো স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং এই রাষ্ট্র গঠনের পেছনে যাদের অবদান রয়েছে সেই সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরশ্রেষ্ঠরা।
যেহেতু বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান পাকিস্তান নামক তাদের 'পিয়ারা রাষ্ট্রকে' আঘাত করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধবিমান ছিনতাই করার চেষ্টা করেছিলেন, তাই জামায়াত-শিবিরের দৃষ্টিতে তিনি অপরাধী। তাদের চেতনা আজও পাকিস্তান সামরিক জান্তার অপপ্রচারের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
সত্য বনাম অপপ্রচারের তুলনামূলক চিত্র
বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের ভূমিকা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের মনোভাব, এবং তৎকালীন দেশদ্রোহী রাজনীতিকদের অবস্থান ও পরবর্তী ঐতিহাসিক সত্যের এক সংক্ষপ্তি ও বস্তুনিষ্ঠ খতিয়ান নিচে উপস্থাপন করা হলো:
মূল বিষয় ও ক্যাটাগরি | বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ভূমিকা ও ঐতিহাসিক সত্য | একাত্তরে পাকিস্তান ও নিজামীর বক্তব্য/বয়ান | পরবর্তী রূপান্তর ও চূড়ান্ত পরিপ্রেক্ষিত |
সামরিক পরিচয় & পদবী | ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (পিএএফ সার্ভিস নং-৪৩৫৭); বিমানবাহিনীর সেরা ইনস্ট্রাক্টর ও সেফটি অফিসার। | "ভারতের বেতনভুক্ত এজেন্ট, দুষ্কৃতকারী এবং পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান বিশ্বাসঘাতক।" | স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা 'বীরশ্রেষ্ঠ' খেতাবে ভূষিত করা হয়। |
২০ আগস্টের মিশন | 'টি-স্যুটিং স্টার' (মাহি-৩৩) ছিনতাই করে ভারতে নিয়ে যাওয়া এবং মুক্তিসংগ্রামে যোগ দান। | "পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে ভারতের ষড়যন্ত্রে একটি ট্রেনিং বিমান হাইজ্যাকের ব্যর্থ চেষ্টা।" | বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে বিরল সাহসিকতার নজির হিসেবে স্বীকৃতি লাভ ও বিমানবাহিনীর অনুপ্রেরণা। |
ককপিটের ঘাতক চরিত্র | রশীদ মিনহাজ; যে বিমানের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়ে বিমানে বিস্ফোরণ ঘটায়। | "পাকিস্তানি ছাত্রসমাজের গর্ব, বীর শহীদ যার স্মরণে ইসলামী ছাত্রসংঘ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে।" | পাকিস্তানে 'নিশান-ই-হায়দার' প্রাপ্ত হলেও স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে হানাদার বাহিনীর সহযোগী। |
কবরের সম্মান ও অবস্থান | করাচির মাসরুর ঘাঁটিতে 'গাদ্দার' লিখে অবহেলায় ফেলা রাখা হলেও ২০০৬-এ স্বদেশে প্রত্যাবর্তন। | ১৯৭৮ পর্যন্ত 'গাদ্দার' লেখা; পরবর্তীতে রাজনৈতিক স্বার্থে মুছে কেবল নাম রাখা ও মিনহাজের কবরে উগ্র কবিতা লেখা। | ২০০৬ সালে পূর্ণ সামরিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পুনঃসমাহিত। |
রাজনৈতিক কুচক্রীর ভূমিকা | দেশপ্রেমিক মতিউরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে 'দৈনিক সংগ্রাম'-এ বিষোদগার করে চিঠি ও বক্তব্য প্রদান। | মতিউর রহমান নিজামী কর্তৃক ১ ও ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১-এ মতিউরকে 'গাদ্দার' ও মিনহাজকে 'বীর' আখ্যা দান। | ২০১০-২০১৬ সালে বিচারিক প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজামীর মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসি কার্যকর। |
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মতিউর রহমান সম্পর্কে আরো তথ্য
করাচির গোপন বাঙালি সেল ও পূর্ব-পরিকল্পনা: অনেকের ধারণা ২০ আগস্টের ঘটনাটি ছিল আকস্মিক, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর পেছনে ছিল দীর্ঘ পরিকল্পনা। পশ্চিম পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালি বিমানসেনা ও কর্মকর্তাদের নিয়ে করাচিতে একটি গোপন আন্ডারগ্রাউন্ড সেল গড়ে উঠেছিল।
মতিউর রহমান কেবল একাকী সিদ্ধান্ত নেননি; তিনিসহ কয়েকজন বাঙালি কর্মকর্তা গোপনে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে যেকোনো মূল্যে একটি যুদ্ধবিমান নিয়ে পালিয়ে গিয়ে ভারতে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের হাতে তুলে দিতে হবে।
মতিউর রহমান টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে মাসরুর ঘাঁটির ডেইল উড্ডয়ন সময়সূচি (Flight Schedule) নজরদারিতে রাখেন। কোন বিমানে ফুল ট্যাঙ্ক জ্বালানি থাকে এবং কোন সময়টিতে নিরাপত্তাবেষ্টনী শিথিল থাকে, তা তিনি কোড আকারে নিজের ডায়েরিতে টুকে রাখতেন।
সহধর্মিনী মিলিয়া রহমান ও অবুঝ দুই কন্যার বন্দিদশা: ২০ আগস্টের ঘটনার পরপরই পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা (ISI) এবং পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সদস্যরা করাচিতে মতিউর রহমানের সরকারি বাসভবনে চড়াও হয়। তাঁর স্ত্রী মিলিয়া রহমান এবং দুই অবুঝ কন্যাসন্তান মাহিন (বয়স ২ বছর) ও তুহিন (বয়স মাত্র কয়েক মাস) কে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একটি গোপন কক্ষে রাখা হয়।
দিনের পর দিন মিলিয়া রহমানকে তীব্র মানসিক নির্যাতন ও জেরা করা হয়। মতিউর কোথায়, তিনি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন তা দীর্ঘদিন তাঁর স্ত্রীর কাছ থেকে গোপন রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস (ICRC) ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কূটনৈতিক চাপে তাঁদের কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দী করা হয় এবং ১৯৭৩ সালে বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে তারা স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসতে সক্ষম হন।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে ধস ও 'কিলো ফ্লাইট' এর প্রেরণা: মতিউরের এই দুঃসাহসিক চেষ্টা পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মনস্তাত্ত্বিক ভিত সম্পূর্ণ কাঁপিয়ে দিয়েছিল।ঘটনার পরদিনই পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কর্মরত প্রায় সকল বাঙালি পাইলট, নেভিগেটর ও গ্রাউন্ড টেকনিশিয়ানকে একযোগে 'গ্রাউন্ডেড' (উড্ডয়নে নিষেধাজ্ঞা) করা হয় এবং অনেককে বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়।
মতিউরের এই আত্মত্যাগ ব্যর্থ যায়নি। এই ঘটনা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে অবস্থানরত বাঙালি পাইলটদের প্রচণ্ডভাবে অনুপ্রাণিত করে। এর ফলশ্রুতিতেই ১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ভারতের নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিমানবাহিনী 'কিলো ফ্লাইট' (Kilo Flight)।
২০০৬ সালের গোপন কূটনৈতিক উদ্ধার অভিযান: করাচির মাসরুর ঘাঁটির চতুর্থ শ্রেণীর অবহেলিত গোরস্থান থেকে ৩৫ বছর পর মতিউরের দেহাবশেষ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি ছিল একটি জটিল কূটনৈতিক বিজয়। ২০০৬ সালের ২৩ জুন পাকিস্তানের প্রত্নতাত্ত্বিক ও ফরেনসিক দলের উপস্থিতিতে মাটি খুঁড়ে মতিউরের অবশেষ উদ্ধার করা হয়। আলামত হিসেবে তাঁর পরনের সামরিক পোশাকের পকেটের অংশ ও বেল্টের ধাতব অংশ সনাক্ত করা হয়।
২০০৬ সালের ২৪ জুন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর (BAF) একটি বিশেষ বিমানে অত্যন্ত গোপনীয়তা ও পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দেহাবশেষ ঢাকায় আনা হয় এবং ২৫ জুন মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
স্মৃতি রক্ষা ও পপ-কালচার: মতিউর রহমানের বীরত্বকে অমর করে রাখতে যশোরের বিমানবাহিনী ঘাঁটির নামকরণ করা হয়েছে 'বিমানবাহিনী ঘাঁটি মতিউর রহমান' (BAF Base Matiur Rahman)। তাঁর জন্মস্থান নরসিংদীর রায়পুরায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে 'বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান জাদুঘর'। এছাড়া ২০০৭ সালে তাঁর জীবন ও ঐতিহাসিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা হয় পূর্ণদৈর্ঘ্য বায়োপিক চলচ্চিত্র 'অস্তিত্বে আমার দেশ'।
শৈশব থেকে নীল আকাশের সেনানি
বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের জন্ম ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর ঢাকার ১০৩ আগাসাদেক রোডের এক ঐতিহ্যবাহী কাজী পরিবারে। ৯ ভাই ও ২ বোনের বিশাল সংসারে মতিউর ছিলেন ষষ্ঠ। তাঁর বাবা মৌলভি আবদুস সামাদ ছিলেন সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েটের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং মা মুবারকুন্নেসা খাতুন ছিলেন গৃহিনী। মতিউরের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পুরান ঢাকার সামাজিক ও সংবেদনশীল পরিবেশে, যেখানে মূল্যবোধ, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম ছিল সহজাত।
ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর মতিউর ভর্তি হন পাকিস্তানের পশ্চিম পাঞ্জাবের 'সারগোদা বিমানবাহিনী পাবলিক স্কুলে'। সেখানে অত্যন্ত মেধার পরিচয় দিয়ে ১৯৬১ সালে তিনি পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। কঠোর প্রশিক্ষণ ও অনন্য দক্ষতা প্রদর্শন করে ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান বিমানবাহিনী একাডেমি (রিসালপুর) থেকে কমিশন লাভ করেন। তাঁর সার্ভিস নম্বর নির্ধারিত হয় 'পিএএফ-৪৩৫৭'।
পাইলট হিসেবে মতিউর রহমান ছিলেন অত্যন্ত তুখোর। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি দক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। পরবর্তীতে তাকে করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটিতে (তৎকালীন পিএএফ বেস মারিপুর) 'ফ্লাইং ইনস্ট্রাক্টর' এবং 'সেফটি অফিসার' হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তরুণ ক্যাডেটদের জেট বিমান চালনা শেখানোর গুরুদায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে।
ক্ষমতার রাজনীতি ও রাজাকারের পুনর্বাসন
বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হলো, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর একাত্তরের পরাজিত অপশক্তিকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। যে মতিউর রহমান নিজামী ১৯৭১ সালে আমাদের বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে 'গাদ্দার' ও 'ভারতের এজেন্ট' বলেছিলেন, পরবর্তীতে ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে সেই নিজামীই বাংলাদেশে প্রকাশ্য রাজনীতি করার সুযোগ পান, সংসদ সদস্য হন এবং ২০০১-২০০৬ জোট সরকারে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন!
যে পতাকার জন্য বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান আকাশের বুকে প্রাণ দিয়েছিলেন, সেই লাল-সবুজ পতাকা তারা মন্ত্রী হিসেবে নিজেদের গাড়িতে উড়িয়েছিল। তবে সাময়িক ক্ষমতার অলঙ্কার কি একাত্তরের দেশদ্রোহিতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দাগ মুছে ফেলতে পেরেছে?
ইতিহাসের গতিপথ কোনো চিরস্থায়ী মিথ্যাকে সহ্য করে না:
সত্যের ঐতিহাসিক বিজয়: ২০১৬ সালের ১১ই মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের হত্যা, গণহত্যা, আলবদর বাহিনী গঠন ও বুদ্ধিজীবী নিধনের দায়ে মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ক্ষমতার দম্ভ সত্ত্বেও আইন ও ইতিহাসের বিচারে সে প্রমাণিত যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে বাধ্য হয়েছে।
বীরশ্রেষ্ঠের অমরত্ব: অন্যদিকে, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান কোনো রাজনৈতিক চালবাজির মুখাপেক্ষী নন। তিনি কোটি বাঙালির হৃদয়ে এক অমর প্রদীপ। করাচির অবহেলিত গোরস্থান থেকে ফিরে এসে তিনি আজ মিরপুরের মাটিতে শান্তিতে শুয়ে আছেন, আর তাঁর নাম লেখা আছে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের গর্বিত হৃদয়ে।
রাজনীতিতে নানা চক্রান্ত হতে পারে, ক্ষণিকের জন্য ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা হতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে রাজাকার কখনো মুক্তিযোদ্ধা বা বীর হতে পারে না। ইতিহাস তার নিজের রক্তের অক্ষরে সত্য লিখে রাখে।
বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের এই দুঃসাহসিক আত্মত্যাগ আমাদের প্রতিমুহূর্তে স্মরণ করিয়ে দেয় মাতৃভূমির স্বাধীনতার চেয়ে বড় কোনো সম্পদ নেই, আর দেশপ্রেমের চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই। আজকের নতুন প্রজন্মকে এই সত্য ধারণ করতে হবে: যারা একাত্তরে দেশের সূর্যসন্তানদের 'গাদ্দার' বলেছিল, ইতিহাস তাদেরই কপালে চিরকালের জন্য 'দেশদ্রোহী' ও 'রাজাকার' কলঙ্ক এঁটে দিয়েছে। আর যারা জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, তারা থেকে যাবেন অনাদিকালের অবিনাশী আলো হয়ে।















