বাংলাদেশে বিহারি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, আগমন এবং আত্মপরিচয়ের সংকট
সৈয়দপুর দেশের একমাত্র শহর, যেখানে বাঙালির চেয়ে অবাঙালি জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। মারোয়ারি হিন্দু, সাঁওতাল, এবং সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় উর্দুভাষী বিহারিদের সহাবস্থান এই শহরটিকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র চরিত্র। মানুষজনের আলাপচারিতা, বাচনভঙ্গি এবং মাইকিং-এর ধরণ (যেমন: ‘একটি শোক সংবাদ’ এর বদলে ‘এক মাইয়্যাত কি অ্যায়লান’) সহজেই পার্থক্য করা যায়।

TruthBangla

Dec 6, 2025
নীলফামারীর ছোট্ট বাণিজ্যিক শহর সৈয়দপুর - যেখানে পা রাখলে মনে হতে পারে আপনি যেন ইতিহাসের এক ভিন্ন পৃষ্ঠায় আছেন। এটি দেশের একমাত্র শহর, যেখানে বাঙালির চেয়ে অবাঙালি জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। মারোয়ারি হিন্দু, সাঁওতাল, এবং সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় উর্দুভাষী বিহারিদের সহাবস্থান এই শহরটিকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র চরিত্র। মানুষজনের আলাপচারিতা, বাচনভঙ্গি এবং মাইকিং-এর ধরণ (যেমন: ‘একটি শোক সংবাদ’ এর বদলে ‘এক মাইয়্যাত কি অ্যায়লান’) সহজেই পার্থক্য করা যায়। কিন্তু এই অবাঙালি জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে বিহারিরা, কেন এবং কীভাবে এই বাংলায় এলো? এর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে দেশভাগ, দাঙ্গা, এবং একাত্তরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের এক জটিল উপাখ্যান।
বিভাজনের ফল ও নবজাতক দেশের বোঝা
বাংলাদেশে অবস্থানরত উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী, যাদের সাধারণত 'বিহারি' হিসেবে অভিহিত করা হয়, তাদের ইতিহাস কেবল ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি ভারতের বিহার রাজ্য এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে ঘটে যাওয়া ১৯৪৬ সালের ভয়াবহ দাঙ্গা ও এর পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল। এই বাস্তুচ্যুত মানুষের আগমন পূর্ব পাকিস্তানের সমাজ, রাজনীতি এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।
আগমনের প্রেক্ষাপট - ১৯৪৬-এর দাঙ্গা ও দেশভাগ
বিহারি জনগোষ্ঠীর পূর্ব বাংলায় আসার মূল কারণ ছিল ধর্মীয় দাঙ্গা, যা ১৯৪৭-এর দেশভাগের পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছিল।
গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং ও নোয়াখালী ম্যাসাকার
১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট, মুসলিম লীগের ডাকা 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে' উপলক্ষে 'গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং' শুরু হয়। এই দাঙ্গার প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু-মুসলিম উভয় পক্ষই ব্যাপক সহিংসতার শিকার হয়। এর জের ধরে নোয়াখালী এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে নোয়াখালী ম্যাসাকার ঘটে, যেখানে হিন্দুরা আক্রান্ত হয়। এই সংঘাতগুলো ধর্মীয় বিভেদকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে।
বিহার দাঙ্গা ও বাস্তুচ্যুতি
নোয়াখালীর ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ১৯৪৬ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত বিহার রাজ্যে ভয়াবহ বিহার দাঙ্গা শুরু হয়। কয়েক হাজার মানুষ নারী, শিশু, বৃদ্ধ নির্বিশেষে নিহত হন। কয়েক লাখ মুসলিম বাস্তুচ্যুত হয়ে জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন।
এই আতঙ্কিত মুসলিম জনগোষ্ঠীকে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে সাময়িকভাবে বাংলার লাগোয়া এলাকায় কিছু শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় দেওয়া হয়। তারা মূলত প্রাণ বাঁচাতেই পূর্ব বাংলার দিকে ছুটে এসেছিলেন, যেখানে তাদের ধারণা ছিল তারা মুসলিম হিসেবে নিরাপত্তা পাবেন। অথচ একসময় বিহারে লোকগাথা ছিল, পূর্ব বাংলায় গেলে 'মেয়েরা মরদদের মাছি বানিয়ে দেবে' সেই বাংলাতেই তাদের আশ্রয় খুঁজতে হলো, যার নেপথ্যে ছিল উগ্র হিন্দুত্ববাদের ভয় এবং জীবন বাঁচানোর তাগিদ।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রত্যাখ্যান
বাস্তুচ্যুত এই মুসলিম জনগোষ্ঠী আশা করেছিল নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্র তাদের স্বাগত জানাবে। কিন্তু ১৯৪৭ সালের আগেই মুসলিম লীগের আপদকালীন রিফিউজি ক্যাম্প বন্ধ হয়ে যায়।
নেতাদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া: দেশভাগের পর হিন্দু ও মুসলিম নেতারা শুধু ভাগ-বাঁটোয়ারার হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত ছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা কার্যত এই অবাঙালি মুসলমানদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তৎকালীন পূর্ব বাংলার নেতা খাজা নাজিমউদ্দিন সাফ জানিয়ে দেন বিহার-ইউপি'র মুসলমানদের দায় পূর্ব বাংলা নেবে না।
পূর্ব বাংলায় প্রবেশ: এই প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও, ১৯৪৭-৫০ সাল পর্যন্ত অবাঙালি মুসলমানরা দলে দলে পূর্ব বাংলায় আসেন। বিহার থেকে আগত কবির আলকাস খানের মতে, "দাঙ্গা ভয় নিয়ে আমরা পাকিস্তানে (পূর্ব বাংলা) আসি। আমরা ছিলাম মুসলমান, উর্দু আমাদের ভাষা।"
তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের করা ষাটের দশকের শেষাংশে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় ২০ লাখ উর্দুভাষী আসেন।
সৈয়দপুর - অবাঙালি অধ্যুষিত হওয়ার কারণ
বিহার থেকে আগত বিপুল সংখ্যক উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ সৈয়দপুরে আশ্রয় নেয়। এর পেছনে ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক কারণ ছিল।
ঐতিহাসিক ভিত্তি: ১৮৭০ সালে ইংরেজ সরকার সৈয়দপুরে একটি বড় রেল কারখানা স্থাপন করে। এই কারখানার জন্য সস্তা ও সহজে পাওয়া শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল। সেই সময়ে রেলওয়েতে কাজ করার জন্য প্রায় ৭০০০ বিহারীকে শ্রমিক হিসেবে নিয়ে আসা হয়।
গার্ডেন নগরী: সেই সময়ে সৈয়দপুর ছিল ব্রিটিশদের গড়া তিলত্তমা এক 'গার্ডেন নগরী'। এখানকার নানা কারখানায় সস্তা শ্রমিক হিসেবে বিহারিরা ভালো সমাদর পেয়েছিল, যা তাদের পূর্বপুরুষদের স্থায়ী হওয়ার পথ দেখায়।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব
বিহার থেকে আগত মুসলিম বিহারিদের সাথে বাংলার মুসলিম অধিবাসীদের ধর্মের কিছু মৌলিক পার্থক্য ছিল, যা তাদের স্থানীয় বাঙালি মুসলিমদের থেকে অনেকটা দূরে ঠেলে দিয়েছিল।
ধর্মীয় মতাদর্শ: বিহারি মুসলিমদের বেশির ভাগ ছিল শিয়া মতালম্বী, অথবা রেজা খানের অনুসারী (বেরলভি ধারা)। সামান্য কিছু ছিল কাদিয়ানি মতালম্বী। অন্যদিকে বাংলার অধিবাসীদের বেশির ভাগ ছিল হানাফী মাজহাবের অনুসারী (দেওবন্দি বা স্থানীয় সুফি ধারা)। তাদের এই পৃথক ধর্ম মত স্থানীয় বাঙালি মুসলিমদের থেকে তাদের পৃথক পরিচিতি তৈরি করে।
ভাষার বিভেদ: উর্দুভাষা ছিল তাদের মূল পরিচয়ের ভিত্তি। এই ভাষা এবং সংস্কৃতির কারণে তারা স্থানীয় বাঙালির সঙ্গে পুরোপুরি মিশতে পারেনি।
তবে একটি বড় সংখ্যক বিহারি স্থানীয় বাঙালি মুসলিমদের সাথে তাদের ধর্মীয় মতাদর্শের পার্থক্য না থাকায় তাদের সাথে মিলতোভাবে বসবাস করতেও শুরু করে।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বিহারি-বাঙালি সংঘাত
বিংশ শতাব্দীর দক্ষিণ এশীয় রাজনীতির ইতিহাসে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং এর বিপরীতে পাকিস্তানি শাসকদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ বা বিভেদনীতির এক রক্তাক্ত দলিল হলো বাঙালি-বিহারি সংঘাত। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এই দীর্ঘ দুই দশকে একটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক গুটি হিসেবে ব্যবহার করে একটি জাতির মুক্তিসংগ্রামকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছিল পাকিস্তান। বিশেষ করে উত্তরের শহর সৈয়দপুরের রক্তাক্ত ইতিহাস এই সংঘাতের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও পাকিস্তানি বিভেদনীতি
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারত থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বিপুল সংখ্যক উর্দুভাষী মুসলিম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় নেন, যারা মূলত বিহার থেকে আসায় ‘বিহারি’ নামে পরিচিতি পান। পাকিস্তানি শাসকরা শুরু থেকেই এই শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একটি ‘বাফার জমানত’ বা রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যখন বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপিত হয়, তখন থেকেই পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকার বিহারিদের হাতে নানা সুযোগ-সুবিধা তুলে দিতে থাকে।
পাকিস্তানি শাসকরা অত্যন্ত সুকৌশলে বাঙালি-অবাঙালি সম্পর্কের মাঝে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করে। তারা বিহারিদের কল-কারখানা, রেলওয়ে এবং সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার দেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল দুটি: প্রথমত, একটি অনুগত ও সুবিধাভোগী অনুসারী গোষ্ঠী তৈরি করা; এবং দ্বিতীয়ত, বাঙালিদের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রাখা। এই কৃত্রিম ‘ভর্তুকি’ দিয়ে বিহারিদের মাঝে এক ধরণের শ্রেষ্ঠত্ববোধ তৈরি করা হয়, যা তাদের বাঙালি প্রতিবেশীদের থেকে যোজন যোজন দূরে সরিয়ে দেয়। ফলে বিহারিরা নিজেদের বাঙালির চেয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বেশি ঘনিষ্ঠ মনে করতে শুরু করে।
শোষণের অস্ত্র হিসেবে 'বিহারি কার্ড'
বাঙালিরা যখনই তাদের স্বাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে, পাকিস্তানি জান্তা তখনই বিহারিদের উত্তেজিত করে দাঙ্গা বা সংঘাতের উস্কানি দিয়েছে। বিহারিদের সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীতে প্রচুর পরিমাণে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা প্রয়োজনে বেসামরিক জনগণের ওপর লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করতে পারে।
১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয়ের পর যখন বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় এল, তখন পাকিস্তানি শাসকরা বিহারিদের সশস্ত্র করতে শুরু করে। এর চূড়ান্ত ও বীভৎস রূপ দেখা যায় ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে বিহারিদের একটি বিরাট অংশ রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীতে যোগ দেয়। তারা কেবল মুক্তিসংগ্রামের বিরোধিতাই করেনি, বরং স্থানীয় জনগণের ঘরবাড়ি চিনিয়ে দেওয়া, লুটতরাজ এবং সরাসরি গণহত্যায় লিপ্ত হয়ে বাঙালির ওপর পাকিস্তানি বর্বরতার প্রধান দোসর হিসেবে আবির্ভূত হয়।
সৈয়দপুরের রক্তাক্ত ইতিহাস - বিহারিদের হিংস্রতা
সচরাচর আমরা জানি ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু হয়। কিন্তু সৈয়দপুরের চিত্র ছিল ভিন্ন। এখানে সংঘাত ও রক্তপাত শুরু হয়েছিল মূল ঘটনার দুই দিন আগে, অর্থাৎ ২৩ মার্চ ১৯৭১ সালে।
সেদিন ছিল পাকিস্তান দিবস। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেদিন শহরজুড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করতে শুরু করে। এই ঘটনাটি সৈয়দপুরে বসবাসরত পাকিস্তানপন্থী বিহারিদের চরম ক্ষিপ্ত করে তোলে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরোক্ষ মদদে বিহারিরা সেদিন সশস্ত্র হয়ে বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রামদা, তলোয়ার আর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে তারা নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর হামলা চালায়। এই সংঘর্ষের মাধ্যমেই সৈয়দপুরে মুক্তিযুদ্ধের দামামা সময়ের আগেই বেজে ওঠে।
১৩ জুনের 'গোলাহাট ট্র্যাজেডি' - চলন্ত ট্রেন যখন কসাইখানা
সৈয়দপুরের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কময় এবং রক্তভেজা দিনটি ছিল ১৩ জুন, ১৯৭১। এই দিনটি 'গোলাহাট গণহত্যা' হিসেবে পরিচিত। মে মাসের শেষ দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী বিহারিরা প্রচার করে যে, সৈয়দপুরে বসবাসরত হিন্দু মাড়োয়ারি ও অবস্থাপন্ন বাঙালিদের নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেওয়া হবে। এজন্য একটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
অসহায় মানুষগুলো প্রাণ বাঁচাতে সেই ট্রেনের যাত্রী হয়েছিলেন। ট্রেনটি সৈয়দপুর স্টেশন ছেড়ে সামান্য দূরে গোলাহাট নামক স্থানে আসতেই আগে থেকে ওত পেতে থাকা বিহারি ও পাকিস্তানি সেনারা ট্রেনটি থামিয়ে দেয়। এরপর শুরু হয় এক নারকীয় তান্ডব। ট্রেন থেকে নামিয়ে একে একে অন্তত ৪৪৮ জনকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এই গণহত্যায় বন্দুকের গুলি খরচ করা হয়নি কেবল উল্লাস করার জন্য। সেই বীভৎসতা থেকে মাত্র অল্প কয়েকজন অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছিলেন, যাদের জবানবন্দিতে আজও গোলাহাটের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
মাড়োয়ারি ও বাঙালিদের ওপর লুণ্ঠন ও নির্যাতন
সৈয়দপুর ছিল তৎকালীন উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। বিশেষ করে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের বিশাল কারবার ছিল এখানে। যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে বিহারিরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে কেবল পথ চিনিয়ে দেয়নি, বরং তারা নিজেরাই জল্লাদের ভূমিকা পালন করেছিল।
লুটতরাজ: বিহারিরা মাড়োয়ারি ও বাঙালিদের বাড়িতে ঢুকে স্বর্ণালঙ্কার, টাকা-পয়সা এবং মূল্যবান সম্পদ লুট করে। অনেক বাড়ি দখল করে তারা নিজেদের আস্তানা বানায়।
সেফ হাউজ: শহরের বিভিন্ন সিনেমা হল এবং বিহারি অধ্যুষিত এলাকাগুলো টর্চার সেলে পরিণত হয়েছিল। প্রতিদিন সেখান থেকে বাঙালিদের আর্তনাদ শোনা যেত। বিহারিদের এই হিংস্রতা স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর মনে এমন এক আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল যা আজ কয়েক দশক পরেও মুছে যায়নি।
কেন সৈয়দপুর দুই দিন পর মুক্ত হলো?
সারা দেশ যখন ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের উল্লাসে মেতে উঠেছিল, সৈয়দপুর তখনো ছিল অবরুদ্ধ। ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে নিয়াজির আত্মসমর্পণের খবর যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, সৈয়দপুরের বিহারিরা তখনো হাল ছাড়েনি। তারা ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং কোনোভাবেই আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়নি।
বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর তীব্র প্রতিরোধের মুখেও বিহারিরা মরণপণ লড়াই চালিয়ে যায়। তাদের বিশ্বাস ছিল পাকিস্তান থেকে কোনো সাহায্য আসবে। অবশেষে যুদ্ধের দুই দিন পর, ১৮ ডিসেম্বর সৈয়দপুর শহর শত্রু ও বিহারি মুক্ত হয়। এই দুই দিনের বিলম্ব প্রমাণ করে যে, সৈয়দপুরে পাকিস্তানপন্থীদের শেকড় এবং প্রতিরোধের মানসিকতা কতটা গভীর ও উগ্র ছিল।
বর্তমান অবস্থা ও আত্মপরিচয়ের সংকট
মুক্তিযুদ্ধের পর, অবাঙালি বিহারি জনগোষ্ঠী যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তারা কার্যত 'রাষ্ট্রহীন' অবস্থায় পতিত হয়। তারা 'পাকিস্তানে যেতে চেয়েছিল' কিন্তু পাকিস্তান সরকার তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।
ক্যাম্প জীবন ও ভাষা
বর্তমানে সৈয়দপুরে ২২টি বিহারি ক্যাম্প রয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেও অস্থায়ী শিবিরে এরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের উর্দু ভাষাভাষী বলা হলেও তারা মূলত উর্দু-হিন্দির সঙ্গে আঞ্চলিকতার মিশেলে কথা বলেন।
ক্যাম্পে বসবাসকারী এবং ক্যাম্পের বাইরে অবস্থানকারী বর্তমান প্রজন্মের বিহারিরা বাংলাদেশেই জন্ম নিয়েছে এবং তারা মূলত এই দেশের নাগরিক।
দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
দীর্ঘদিনের সংঘাত ও বিদ্বেষের মধ্যেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। এখনো বিহারি প্রবীণ ব্যক্তিরা বাঙালিদের ভালো চোখে দেখেন না। এমনকি বাঙালি হকারকে তাদের দোকানের সামনে বসতে দিতে অনীহা দেখান।
তবে এক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম বর্তমান প্রজন্মের বিহারিরা। ক্যাম্পে বসবাসকারী ও ক্যাম্পের বাইরে অবস্থানকারী কেউ আর পাকিস্তান যেতে চান না। তারা বাংলাদেশকে নিজেদের জন্মভূমি হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং এখানকার নাগরিক অধিকার চান।
নাগরিকত্ব, সংহতি ও ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশে অবস্থানরত বিহারি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস হলো দেশভাগ, দাঙ্গা, রাজনৈতিক প্রতারণা এবং সংঘাতের এক করুণ গাথা। তারা এক অর্থে ইতিহাসের শিকার - যাদের প্রথমে একটি দেশ (ভারত) প্রত্যাখ্যান করেছে এবং পরে আরেকটি দেশ (পাকিস্তান) তাদের দায় নিতে অস্বীকার করেছে।
আদালতের রায়ের মাধ্যমে অনেক বিহারি বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করেছেন এবং জাতীয় পরিচয়পত্র পাচ্ছেন। এটি তাদের দীর্ঘদিনের 'রাষ্ট্রহীন' অবস্থার অবসান ঘটিয়েছে। সৈয়দপুরের মতো বাণিজ্যিক শহরে বিহারি, বাঙালি, মারোয়ারি এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর সহাবস্থান একটি মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। ভবিষ্যতে এই সংঘাতের ইতিহাস ভুলে গিয়ে পারস্পরিক সম্মান, সংহতি এবং শান্তি বজায় রেখে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
বিহারি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের আত্মপরিচয়ের সংকট নিরসনে এবং তাদের পূর্ণ নাগরিক হিসেবে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে কাজ করা একটি আধুনিক, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।














