একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বিহারী জনগোষ্ঠী ও চাকমা সম্প্রদায়ের ভূমিকা
মুক্তিযুদ্ধে বিহারী জনগোষ্ঠী এবং চাকমা সম্প্রদায়ের অবস্থান ছিল এমনই দুটি সংবেদনশীল ও ভিন্নধর্মী উপাখ্যান। একদিকে ছিল বিহারী জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশের পাকিস্তানপন্থী অবস্থান, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। অন্যদিকে ছিল চাকমা সম্প্রদায়ের দ্বিধাবিভক্ত অবস্থান, যেখানে একটি অংশের নেতৃত্ব স্বাধীনতার বিপক্ষে গিয়েছিলেন, যদিও সাধারণ চাকমাদের অনেকেই নীরব ভূমিকা পালন করেন বা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

TruthBangla

Dec 10, 2025
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার মাধ্যমে অর্জিত একটি জনযুদ্ধ। তবে এই যুদ্ধের ক্যানভাসে কিছু আঞ্চলিক ও জাতিগোষ্ঠীগত জটিলতা ছিল, যা প্রায়শই মূলধারার আলোচনায় চাপা পড়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধে বিহারী জনগোষ্ঠী এবং চাকমা সম্প্রদায়ের অবস্থান ছিল এমনই দুটি সংবেদনশীল ও ভিন্নধর্মী উপাখ্যান। একদিকে ছিল বিহারী জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশের পাকিস্তানপন্থী অবস্থান, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। অন্যদিকে ছিল চাকমা সম্প্রদায়ের দ্বিধাবিভক্ত অবস্থান, যেখানে একটি অংশের নেতৃত্ব স্বাধীনতার বিপক্ষে গিয়েছিলেন, যদিও সাধারণ চাকমাদের অনেকেই নীরব ভূমিকা পালন করেন বা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। এই প্রবন্ধে আমরা ইতিহাসের গভীরতা থেকে এই দুটি গোষ্ঠীর অবস্থান, তাদের সিদ্ধান্তের কারণ এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এর প্রভাব নিয়ে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করব।
জাতিগোষ্ঠীগত জটিলতা ও একাত্তরের প্রেক্ষাপট
১৯৭১ সালের সংঘাত কেবল বাঙালি ও পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল সাংস্কৃতিক, ভাষাগত এবং অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং এর পরবর্তী অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কিছু গোষ্ঠীর অবস্থানকে জটিল করে তুলেছিল।
বিহারী জনগোষ্ঠী: এরা ছিল উর্দুভাষী মুসলমান, যারা দেশভাগের সময় ভারতের বিহার ও সংলগ্ন এলাকা থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসে বসতি স্থাপন করেছিল।
চাকমা সম্প্রদায়: এরা ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যাদের সংস্কৃতি, ভাষা এবং জীবনধারা ছিল বাঙালিদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এই দুটি গোষ্ঠীর ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, একাত্তরের জনযুদ্ধটি বহুস্তরীয় ছিল এবং বিভিন্ন পক্ষ তাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
বিহারী জনগোষ্ঠী - পাকিস্তানপন্থী অবস্থানের ঐতিহাসিক ভিত্তি
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিহারী জনগোষ্ঠীর ভূমিকা ছিল প্রধানত পাকিস্তানপন্থী এবং অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচক। এর পেছনে ছিল তাদের ঐতিহাসিক ও সামাজিক অবস্থান।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আত্মপরিচয়ের সংকট
বিহারীরা পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিল মূলত ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়। তারা নিজেদেরকে 'মুহাজির' (অভিবাসী) হিসেবে দেখত এবং ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক কারণে স্থানীয় বাঙালিদের থেকে আলাদা ছিল।
ভাষাগত সংযোগ: তাদের মাতৃভাষা উর্দু ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। ফলে তারা ভাষাগতভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের কাছাকাছি ছিল।
আশ্রয় ও সুরক্ষা: পূর্ব পাকিস্তানে তাদের আগমন ঘটেছিল নিরাপত্তা ও ধর্মীয় কারণে। তারা মনে করত, একটি মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানই তাদের একমাত্র রক্ষাকর্তা।
চাকরি ও সুযোগ: রেলওয়ে, শিল্প কারখানা এবং সরকারি চাকরিতে তুলনামূলকভাবে তাদের প্রবেশাধিকার বেশি ছিল, যা বাঙালি মধ্যবিত্তের সঙ্গে তাদের দূরত্ব আরও বাড়ায়।
একাত্তরে বিহারীদের সক্রিয় বিরোধিতা
একাত্তরে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন গণহত্যা শুরু করে, তখন বিহারী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ পাকিস্তানের পক্ষে সক্রিয়ভাবে অবস্থান নেয়।
সহযোগী বাহিনীতে অংশগ্রহণ: রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস এবং শান্তি কমিটির মতো কুখ্যাত সহযোগী বাহিনীগুলোতে বিহারী যুবকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা বাঙালি নিধন ও মানবতাবিরোধী অপরাধে সরাসরি অংশ নেয়।
সশস্ত্র প্রতিরোধ: অনেক এলাকায় বাঙালি ও বিহারীদের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত হয়েছিল। বিশেষ করে খুলনা, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর ও মিরপুরের মতো এলাকাগুলোতে বিহারী কলোনিগুলো ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি।
গোয়েন্দা ও লজিস্টিক সাপোর্ট: তারা পাকিস্তানি বাহিনীকে স্থানীয় তথ্য, রসদ এবং অন্যান্য লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করত।
পরিণাম ও ট্র্যাজেডি
মুক্তিযুদ্ধের সময় বিহারী জনগোষ্ঠী মূলত দুটি কারণে ট্র্যাজেডির শিকার হয়: প্রথমত, তাদের মধ্যে যারা অপরাধে যুক্ত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে বাঙালিদের গণরোষ সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয়ত, যারা অপরাধী ছিল না, তাদেরও দেশভাগের পর উদ্বাস্তু হওয়ার পর দ্বিতীয়বারের মতো অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সম্মুখীন হতে হয়। যুদ্ধের পর তারা বাংলাদেশে 'আটকে পড়া পাকিস্তানি' (Stranded Pakistanis) হিসেবে পরিচিত হয় এবং তাদের অনেকেই আজও নিজ বাসভূমে ফিরতে পারেনি।
চাকমা সম্প্রদায় - স্বায়ত্তশাসন বনাম জাতীয় সংহতি
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অবস্থান ছিল বিহারীদের থেকে ভিন্ন, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে জটিল। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য উপজাতিদের মধ্যে চাকমারা ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী।
ঐতিহাসিক বিচ্ছিন্নতা ও রাজনৈতিক আশঙ্কা
চাকমা সম্প্রদায় দীর্ঘকাল ধরে পাহাড়ি অঞ্চলে নিজস্ব সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করেছে। তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ছিল।
ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল: পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসীরা বাঙালিদের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে সতর্ক ছিল। তারা 'পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি' (CHT Regulation, 1900) অনুযায়ী তাদের স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে চেয়েছিল।
কাপ্তাই বাঁধের প্রভাব: ১৯৬০-এর দশকে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে হাজার হাজার চাকমা বাস্তুচ্যুত হন। এই ঘটনা তাদের মনে বাঙালি ও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি গভীর অবিশ্বাস সৃষ্টি করে।
একাত্তরে বিতর্কিত নেতৃত্ব
মুক্তিযুদ্ধের সময় চাকমা নেতৃত্ব দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বিতর্কিত ভূমিকা ছিল চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়-এর।
ত্রিদিব রায়ের অবস্থান: চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় প্রকাশ্যে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন। তিনি পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘে যান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন। তাঁর এই পদক্ষেপ চাকমা সম্প্রদায়ের একটি অংশের অবস্থানকে প্রভাবিত করে। তাঁর মূল আশঙ্কা ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে পাহাড়িদের স্বায়ত্তশাসন ও ভূমি অধিকার দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
সশস্ত্র অংশগ্রহণ: চাকমা সম্প্রদায়ের কিছু যুবক পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে রাজাকার এবং অন্যান্য স্থানীয় সহযোগী বাহিনীতে যোগদান করে, বিশেষ করে রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান অঞ্চলে।
নীরবতা ও মুক্তিযুদ্ধের অংশগ্রহণ
তবে চাকমা সম্প্রদায়ের সবাই ত্রিদিব রায়ের অবস্থানকে সমর্থন করেননি।
নিরপেক্ষতা: জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ যুদ্ধের সময় নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করে, কারণ তারা কোনো পক্ষেই নিজেদের নিরাপদ মনে করেনি।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ: চাকমা যুবকদের অনেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এদের মধ্যে এম এন লারমা-সহ অনেকে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
যুদ্ধের পর ত্রিদিব রায় পাকিস্তানে চলে যান এবং সেখানকার কূটনীতিক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর এই বিতর্কিত অবস্থান পরবর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি এবং বাঙালি-পাহাড়ি সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ - অবস্থানের ভিন্নতা ও কারণ
বিহারী জনগোষ্ঠী এবং চাকমা সম্প্রদায়ের ভূমিকা কেন এত ভিন্ন ছিল? এর পেছনে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কারণ।
মানদণ্ড | বিহারী জনগোষ্ঠী | চাকমা সম্প্রদায় |
আদর্শিক অবস্থান | পুরোপুরি পাকিস্তানপন্থী। দ্বিজাতিতত্ত্বের সমর্থক। | মূলত স্বায়ত্তশাসনপন্থী। দ্বিধাবিভক্ত, কিন্তু নেতৃত্ব স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল। |
ভাষাগত ভিত্তি | উর্দুভাষী, যা কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষা। | নিজস্ব ভাষা (চাকমা), বাঙালিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। |
আগমনের প্রেক্ষাপট | ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় ভারত থেকে আগত 'মুহাজির' (উদ্বাস্তু)। | এই অঞ্চলের আদিবাসী, শত শত বছর ধরে বসতি। |
সশস্ত্র ভূমিকা | সক্রিয় ও সুসংগঠিতভাবে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস-এ অংশগ্রহণ। | স্বল্প সংখ্যায় এবং মূলত স্থানীয় নেতাদের প্রভাবে সশস্ত্র অংশগ্রহণ। |
মূল ভীতি/আশঙ্কা | বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানে তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুযোগ হারানোর ভয়। | স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের স্বায়ত্তশাসন ও ভূমি অধিকার হারানোর ভয়। |
যুদ্ধ-পরবর্তী পরিণতি | 'আটকে পড়া পাকিস্তানি' হিসেবে পরিচিতি ও অনিশ্চিত জীবন। | রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিকীকরণ এবং ভূমি অধিকার নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের শুরু। |
ভয়ের ভিন্নতা
বিহারীদের ভয়: তাদের ভয় ছিল মূলত জাতীয়তা ও নিরাপত্তাভিত্তিক। তারা নিজেদেরকে পূর্ব পাকিস্তানে বহিরাগত মনে করত এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের কাছে নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করত।
চাকমাদের ভয়: তাদের ভয় ছিল আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও ভূমিভিত্তিক। তারা আশঙ্কা করত, স্বাধীন বাংলাদেশে বাঙালিরা তাদের ঐতিহ্যবাহী ভূমি ও অধিকার কেড়ে নেবে।
প্রভাব ও একাত্তরের ছায়া
মুক্তিযুদ্ধে এই দুটি গোষ্ঠীর অবস্থান স্বাধীন বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলেছিল।
বিহারী সমস্যা - মানবিক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
বিহারী জনগোষ্ঠীর পাকিস্তানপন্থী অবস্থানের কারণে যুদ্ধের পর বাঙালি জনতা তাদের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়। অনেক বিহারীকে হত্যা করা হয় এবং যারা বেঁচে থাকে, তারা মানবিক সংকটের সম্মুখীন হয়। বাংলাদেশ ত্যাগ করতে না পারা লক্ষ লক্ষ বিহারী আজও বাংলাদেশে এক অনিশ্চিত জীবনযাপন করছে। এই সমস্যাটি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি অমীমাংসিত মানবিক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে রয়ে গেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত - স্বায়ত্তশাসনের দাবি
চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের অবস্থান এবং কিছু চাকমা যুবকের পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়ার ঘটনা পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে ঐতিহাসিক আস্থার ঘাটতি সৃষ্টি করে। স্বাধীন বাংলাদেশেও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসনের দাবি পূরণ না হওয়ায় সংঘাত সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে দীর্ঘস্থায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম সংঘাত (CHT Conflict)-এর জন্ম দেয়। এই সংঘাতের অবসানে ১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তি হলেও ভূমি অধিকার এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক আজও চলমান।
সংবেদনশীল ইতিহাসের পাঠ
মুক্তিযুদ্ধে বিহারী এবং চাকমা সম্প্রদায়ের ভূমিকা দুটি ভিন্ন ট্র্যাজেডি ও সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। বিহারীদের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি আদর্শিক সংঘাত, যেখানে তারা ১৯৪৭ সালের দ্বিজাতিতত্ত্বকে আঁকড়ে ধরেছিল, যার পরিণতি ছিল ভয়াবহ। চাকমাদের ক্ষেত্রে এটি ছিল জাতিগত পরিচয়ের সংঘাত, যেখানে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক আশঙ্কা ও নেতাদের ভুল সিদ্ধান্ত চরম মূল্য দিতে বাধ্য করেছিল।
এই সংঘাতপূর্ণ ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন জাতীয়তাবাদী আবেগে পরিচালিত হয়, তখন সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর আশঙ্কা ও অধিকারকে যথাযথভাবে বিবেচনা করা অপরিহার্য। বাংলাদেশের ইতিহাসকে পূর্ণাঙ্গরূপে বুঝতে হলে, এই সংবেদনশীল এবং জটিল জাতিগোষ্ঠীগত ভূমিকাগুলোকেও বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কেবল তবেই আমরা একাত্তরের সেই জটিল মানচিত্রের প্রকৃত চিত্রটি দেখতে পাব।














