বাংলাদেশে ভুট্টো রাজকীয় সংবর্ধনা পেলো কেন?
১৯৭১ সালের গণহত্যার মূল খলনায়কদের অন্যতম, পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো শতাধিক কূটনীতিক, সাংবাদিক ও কর্মকর্তার এক বিশাল বহর নিয়ে ঢাকা সফরে আসেন। তার চেয়েও বড় বিস্ময় ছিল, যে পাকিস্তান মাত্র আড়াই বছর আগে এ দেশের ৩০ লাখ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, লাখ লাখ নারীর সম্ভ্রম লুণ্ঠন করেছে, সেই দেশের প্রধানমন্ত্রীকে তৎকালীন তেজগাঁও বিমানবন্দরে দেওয়া হয়েছিল এক রাজকীয় ও উষ্ণ সংবর্ধনা।

TruthBangla

ইতিহাস কেবল বীরত্বগাঁথা, যুদ্ধের ময়দানের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ কিংবা অবিনাশী আবেগ দিয়ে রচিত হয় না; ইতিহাসের স্থায়ী ও টেকসই ভিত্তিটি নির্মিত হয় সামরিক কৌশল, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল ও রূঢ় সমীকরণের ওপর। একটি সদ্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ রাষ্ট্রের টিকে থাকা কিংবা বিলুপ্ত হওয়া নির্ভর করে তার নেতৃত্বের প্রজ্ঞার ওপর। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি জাতি যে অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছিল, তা ছিল আমাদের স্বাধীনতার মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু বিজয়ের পর, সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বপ্নকে একটি বাস্তব রাষ্ট্রে রূপান্তর করার প্রক্রিয়াটি ছিল আরও অনেক বেশি চাতুর্যপূর্ণ এবং চ্যালেঞ্জিং।
স্বাধীনতার মাত্র আড়াই বছর পর, ১৯৭৪ সালের জুন মাসে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে একটি অভূতপূর্ব এবং তৎকালীন জনমানসের জন্য চরম বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। ১৯৭১ সালের গণহত্যার মূল খলনায়কদের অন্যতম, পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো শতাধিক কূটনীতিক, সাংবাদিক ও কর্মকর্তার এক বিশাল বহর নিয়ে ঢাকা সফরে আসেন। তার চেয়েও বড় বিস্ময় ছিল, যে পাকিস্তান মাত্র আড়াই বছর আগে এ দেশের ৩০ লাখ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, লাখ লাখ নারীর সম্ভ্রম লুণ্ঠন করেছে, সেই দেশের প্রধানমন্ত্রীকে তৎকালীন তেজগাঁও বিমানবন্দরে দেওয়া হয়েছিল এক রাজকীয় ও উষ্ণ সংবর্ধনা।
বাইরে থেকে দেখলে এই ঘটনাকে অনেকের কাছেই আদর্শিক স্খলন কিংবা জাতীয় আবেগের পরিপন্থী মনে হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গভীর তত্ত্ব বিশেষ করে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা বাস্তববাদী রাষ্ট্রনীতির আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এক অনন্য, দূরদর্শী ও যুগান্তকারী কূটনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক। আবেগতাড়িত হয়ে প্রতিশোধের রাজনীতিতে লিপ্ত না হয়ে, একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে টিকিয়ে রাখা এবং অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য এই সংবর্ধনা ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এক রাজনৈতিক চাল। আজ আমরা সেই ঐতিহাসিক সফরের নেপথ্য কারণ, বঙ্গবন্ধুর ত্রিবিধ কূটনৈতিক লক্ষ্য এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সেই দাবার চালের এক নির্মোহ ও বিস্তারিত বিশ্লেষণ করব।
তিক্ততা ভুলে কূটনীতির মঞ্চে বাংলাদেশ
১৯৭৪ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের আলো ছড়ালেও, বিশ্বমঞ্চে একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থানকে সুসংহত করা এবং ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল করা ছিল পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও স্বীকৃতির লড়াই
স্বাধীনতার পর পরই সমাজতান্ত্রিক ব্লক (সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার সহযোগী দেশসমূহ) এবং ভারত বাংলাদেশকে তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি দিলেও, মুসলিম বিশ্বের সিংহভাগ দেশ এবং পশ্চিমা পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণ করতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিল। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশকে ‘ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানের একটি বিচ্ছিন্ন অংশ’ হিসেবেই দেখছিল।
লাহোর ওআইসি সম্মেলন এবং পাকিস্তানের বাধ্যবাধকতা
এই অচলাবস্থা ভাঙার প্রথম বড় সুযোগ আসে ১৯৭৪ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছিল ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (OIC)-এর দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলন। মুসলিম বিশ্বের তীব্র চাপ এবং আলজেরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুয়ারী বুমেদিনের মধ্যস্থতায়, ওআইসি সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার স্বার্থে ২২শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। এর ঠিক পরের দিনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে পৌঁছান এবং মুসলিম বিশ্বের নেতাদের সাথে সমমর্যাদায় বসেন।
পাকিস্তানের এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের একটি বিশাল আইনি ও রাজনৈতিক বিজয়। কারণ, যে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই রাষ্ট্র স্বয়ং যখন স্বীকৃতি দিয়ে দেয়, তখন অন্য কোনো দেশের পক্ষে বাংলাদেশকে ‘অবৈধ রাষ্ট্র’ বলে গণ্য করার আর কোনো আন্তর্জাতিক আইনি সুযোগ থাকে না।
জুনের ঢাকা সফর: সৌজন্যের আড়ালে কৌশল
লাহোর সম্মেলনের ঠিক চার মাসের মাথায়, ১৯৭৪ সালের ২৭শে জুন জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকা সফরে আসেন। বঙ্গবন্ধু খুব ভালো করেই জানতেন, পাকিস্তানের প্রতি জনগণের ক্ষোভ এবং তিক্ততা কতটা গভীর। কিন্তু একজন ঝানু রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি এও জানতেন যে, ভুট্টোকে বিমানবন্দরে প্রত্যাখ্যান করা কিংবা শীতল অভ্যর্থনা জানানো মানে আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের হাতে এই অজুহাত তুলে দেওয়া যে “আমরা তো সম্পর্ক ঠিক করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বাংলাদেশই এখনো যুদ্ধের তিক্ততা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।”
অতএব, সমস্ত ব্যক্তিগত ও জাতীয় ক্ষোভকে একপাশে সরিয়ে রেখে, বঙ্গবন্ধু ভুট্টোকে রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল অনুযায়ী সর্বোচ্চ সম্মান জানান। তোপধ্বনি, লাল গালিচা আর গার্ড অব অনারের মাধ্যমে বিশ্বকে এই বার্তা দেওয়া হয় যে, বাংলাদেশ এখন একটি পরিপক্ব, আত্মবিশ্বাসী এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র, যা কোনো আন্তর্জাতিক উস্কানির শিকার নয়।
কেন ভুট্টো এলেন? পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা
জুলফিকার আলী ভুট্টো কোনো আন্তরিকতা কিংবা অনুশোচনা থেকে বাংলাদেশে আসেননি। তিনি এসেছিলেন সম্পূর্ণ নিরুপায় হয়ে, আন্তর্জাতিক চাপ এবং পাকিস্তানের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ রক্ষার তাগিদে। ১৯৭১ সালের পরাজয় পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক মহলে তাদের ভাবমূর্তি ছিল এক গণহত্যাকারী ও পরাজিত রাষ্ট্র হিসেবে।
যুদ্ধবন্দী ও আটকে পড়া নাগরিকদের সংকট
যুদ্ধের পর প্রায় ৯৩,০০০ পাকিস্তানি সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি ভারতের হেফাজতে যুদ্ধবন্দী (POW) হিসেবে আটক ছিল। এদের মুক্ত করে আনা ছিল ভুট্টোর জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। কারণ, পাকিস্তানের সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট এবং সাধারণ জনগণ তাদের বন্দীদের ফিরিয়ে আনার জন্য ভুট্টোর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছিল। ১৯৭২ সালের সিমলা চুক্তি এবং পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসের ত্রিপক্ষীয় দিল্লি চুক্তির (Tripartite Agreement) মাধ্যমে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান একটি সমঝোতায় পৌঁছায়, যার অধীনে বাংলাদেশ ১৯৫ জন তালিকাভুক্ত যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি সেনাকে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি ত্যাগ করে এবং বিনিময়ে পাকিস্তান সমস্ত যুদ্ধবন্দীকে ফেরত পায়।
অবাঙালি ও আটকে পড়া বাঙালিদের বিনিময়
পূর্ব পাকিস্তানে কয়েক লাখ সাবেকি পাকিস্তানি (বিহারি) রয়ে গিয়েছিল, যারা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যান করে পাকিস্তানের অনুগত থাকতে চেয়েছিল। অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানে হাজার হাজার বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা আটকে পড়েছিলেন, যাদেরকে বন্দিশিবিরের মতো অবস্থায় রাখা হয়েছিল। এই জনসংখ্যা বিনিময়ের জটিল প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া ভুট্টোর জন্য অপরিহার্য ছিল।
সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের ভয় ও কূটনীতি
১৯৭১ সালের আগে অবিভক্ত পাকিস্তানের সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা আসত পূর্ব পাকিস্তানের পাট ও চামড়া রপ্তানি থেকে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিমান ও নৌবাহিনীর সমস্ত সদর দফতর ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের মোট জাতীয় সম্পদে বাংলাদেশের যে ন্যায্য অংশ ছিল, তা আদায়ের দাবি বাংলাদেশ ক্রমাগত তুলে আসছিল। ভুট্টো ঢাকা এসেছিলেন মূলত এই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে একটি দ্বিপাক্ষিক কাঠামোর মধ্যে এনে পাকিস্তানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক আইনি দায়ের চাপ কমাতে।

বঙ্গবন্ধুর কৌশলগত রিয়েলপলিটিক: রাজকীয় সংবর্ধনার ত্রিবিধ লক্ষ্য
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবেগ দিয়ে রাজনীতি করলেও, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন চরম বাস্তববাদী। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে হলে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে বর্জন নয়, বরং অন্তর্ভুক্তির নীতি (Policy of Inclusion) গ্রহণ করতে হবে। ভুট্টোকে রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়ার পেছনে বঙ্গবন্ধুর তিনটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও দূরদর্শী কৌশলগত লক্ষ্য ছিল।
লক্ষ্য ১: সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের দ্বার উন্মোচন
১৯৭৪ সাল পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও পবিত্র দুটি মসজিদের দেশ সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। সৌদি বাদশা ফয়সাল পাকিস্তানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন এবং তিনি বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি ও ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠতাকে সন্দেহের চোখে দেখতেন।
সৌদি আরবের এই নীতিগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের সামনে দুটি বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল:
বৈদেশিক মুদ্রা ও শ্রমবাজারের ক্ষতি: মধ্যপ্রাচ্যে তখন তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জোয়ার শুরু হয়েছিল। সেখানে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল। সৌদি আরব স্বীকৃতি না দেওয়ায় বাংলাদেশের বিশাল বেকার যুবসমাজের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের সেই লাভজনক শ্রমবাজারের দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল।
জাতিসংঘে ওআইসি ব্লকের বাধা: সৌদি আরবের প্রভাবে অনেক ছোট ছোট মুসলিম দেশ জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছিল।
বঙ্গবন্ধুর মাস্টারস্ট্রোক: বঙ্গবন্ধু জানতেন, সৌদি আরবকে সরাসরি বোঝানোর চেয়ে পাকিস্তানের মাধ্যম দিয়ে বোঝানো বেশি কার্যকর। ভুট্টোকে ঢাকায় এনে রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়ার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সৌদি আরবসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি স্পষ্ট জিয়ো-পলিটিক্যাল সিগন্যাল পাঠান "যদি পাকিস্তান নিজেই বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে নেয়, তবে সৌদি আরবের আর কোনো নৈতিক বা রাজনৈতিক কারণ থাকে না বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার।"
এই চালটি নিখুঁতভাবে কাজ করেছিল। ভুট্টোর সফরের পর পরই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর বরফ গলতে শুরু করে এবং বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের কিছুদিন পর হলেও, এই ধারাবাহিক কূটনীতির ফলেই সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় এবং আজ যে কোটি খানেক বাংলাদেশী মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, তার ভিত্তিপ্রস্তরটি সে দিনই স্থাপিত হয়েছিল।
লক্ষ্য ২: আমেরিকার পিএল-৪৮০ (PL-480) খাদ্য অবরোধ ও কূটনৈতিক মুক্তি
১৯৭৪ সালটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায়। এ দেশে তখন এক ভয়াবহ বন্যা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। দেশের খাদ্য গুদামগুলো ছিল শূন্য, মানুষের হাহাকার আর লজিস্টিকস বিপর্যয়ে দেশ তখন খাদের কিনারায়। এই মানবিক সংকটের সময়েও পশ্চিমা পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর এক চরম অমানবিক ও রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
PL-480 এর খাদ্য নিষেধাজ্ঞা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি আইন ছিল ‘Public Law 480’ (PL-480), যার অধীনে তারা অনুন্নত দেশগুলোকে কম মূল্যে বা অনুদানে খাদ্য সহায়তা দিত। ১৯৭৪ সালে যখন বাংলাদেশের খাদ্য দরকার, তখন রিচার্ড নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জারের প্রশাসন বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্যবাহী জাহাজ মাঝপথ থেকে ঘুরিয়ে নেয়।
কেন এই নিষেধাজ্ঞা? আমেরিকার অজুহাত ছিল, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দেশ কিউবার কাছে কিছু পাটের চট বা বস্তা রপ্তানি করেছিল। মার্কিন আইন অনুযায়ী, আমেরিকার শত্রু ভাবাপন্ন দেশের সাথে বাণিজ্য করলে সেই দেশ মার্কিন খাদ্য সহায়তা পাবে না। কিন্তু আসল সত্য ছিল, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতার কারণে ওয়াশিংটন ঢাকাকে একটি ‘সোভিয়েত-ভারত ব্লকের স্যাটেলাইট স্টেট’ বা পুতুল রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করত এবং তারই প্রতিশোধ নিচ্ছিল।
কূটনৈতিক ডাইভারসিফিকেশন: বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর নির্ভরশীল থাকলে বৈশ্বিক রাজনীতিতে বাংলাদেশ টিকে থাকতে পারবে না। আমেরিকাকে বোঝাতে হবে যে বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের দাস নয়, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসী রাষ্ট্র। ভুট্টোকে রাজকীয় সংবর্ধনা দিয়ে বঙ্গবন্ধু ওয়াশিংটনকে বার্তা দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ তার চিরশত্রুর সাথেও টেবিলে বসতে পারে। এই সফরের পর আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তরের সুর নরম হয় এবং তারা বাংলাদেশকে সোভিয়েত বলয় থেকে বের করে আনার লক্ষে খাদ্য ও অর্থনৈতিক সাহায্য পুনরায় চালু করতে বাধ্য হয়।
লক্ষ্য ৩: আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ভিত্তি
একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের প্রথম অগ্রাধিকার হলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শান্তি। যদি সীমান্তের ওপারে পাকিস্তান সার্বক্ষণিকভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকত, তবে বাংলাদেশের পক্ষে শান্তিতে দেশ পুনর্গঠন করা সম্ভব হতো না।
আঞ্চলিক পরাশক্তিদের ভারসাম্য: উপমহাদেশে ভারত, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে যে ভারসাম্য ছিল, তাতে বাংলাদেশ নিজেকে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন সত্ত্বা হিসেবে প্রমাণ করতে চেয়েছিল। পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মাধ্যমে চীনের সাথেও বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের পথ সুগম হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের শেষের দিকে চীনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে পূর্ণতা পায়।
সম্পদ আদায়ের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা: পাকিস্তানের কাছ থেকে ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের সম্পদ (যেমন পিআইএ-এর উড়োজাহাজ, নৌবাহিনীর জাহাজ, পাটকলের শেয়ার এবং পাকিস্তানের গোল্ড রিজার্ভের অংশ) আদায়ের জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করার একমাত্র উপায় ছিল উচ্চ পর্যায়ের এই সফর। তিক্ততা বজায় রাখলে পাকিস্তান এই আলোচনার টেবিলই বয়কট করত।
১৯৭৪ সালের ঢাকা সফরের কৌশলগত ও কূটনৈতিক সমীকরণ
১৯৭৪ সালের জুন মাসে জুলফিকার আলী ভুট্টোর ঢাকা সফরের প্রেক্ষাপট, অবিকৃত উদ্দেশ্য, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং তার দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবসমূহকে একটি বিশদ বিবরণী ছকের মাধ্যমে নিচে তুলে ধরা হলো:
কূটনৈতিক ডাইমেনশন | পাকিস্তানের বাধ্যবাধকতা ও লক্ষ্য | বঙ্গবন্ধুর কৌশল ও রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল | অর্জিত ফলাফল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব |
মুসলিম বিশ্ব ও ওআইসি (OIC) | ওআইসি সম্মেলনে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করে নিজেদের উদার প্রমাণ করা। | ভুট্টোকে ওআইসি-র প্রভাবশালী নেতার মর্যাদা দিয়ে রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়া। | সৌদি আরব, লিবিয়া ও জর্ডানের মতো কট্টর পাকিস্তানপন্থী দেশগুলোর বৈরিতা দূরীকরণ। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার পথ প্রশস্ত হওয়া। |
অর্থনৈতিক ও খাদ্য নিরাপত্তা | বাংলাদেশের সম্পদ আদায়ের দাবিকে ধামাচাপা দেওয়া এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য শুরু করা। | বাণিজ্য আলোচনা শুরু করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের 'নিরপেক্ষ' ইমেজ তৈরি করা। | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের PL-480 খাদ্য ব্লকেড শিথিল হওয়া। পশ্চিমা সাহায্য গোষ্ঠী (Aid Consortium) থেকে ঋণ ও অনুদান প্রাপ্তি সহজ হওয়া। |
ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য | ভারত-বাংলাদেশ অক্ষকে দুর্বল করা এবং চীনকে আশ্বস্ত করা। | ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে বৈশ্বিক মঞ্চে 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়' নীতির বাস্তবায়ন। | জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে চীনের বৈরিতা হ্রাস পাওয়া এবং ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ লাভ নিশ্চিত হওয়া। |
মানবিক ও নাগরিক বিনিময় | ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী সেনার বিচার প্রক্রিয়া চিরতরে বন্ধ করা। | যুদ্ধাপরাধীদের চেয়ে আটকে পড়া ৫ লাখ নিরপরাধ বাঙালির নিরাপত্তা ও স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে অগ্রাধিকার দেওয়া। | পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে আটকে থাকা হাজার হাজার বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার সসম্মানে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন। |
ঐতিহাসিক নৈতিকতা | পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যার বৈশ্বিক দায় থেকে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি উদ্ধার করা। | প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মাধ্যমে বাংলাদেশের নৈতিক উচ্চতা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা। | বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ একটি প্রতিহিংসাপরায়ণ জাতি নয়, বরং একটি পরিপক্ব ও প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। |
বিমানবন্দরের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগানের নেপথ্য সত্য
২৭ জুন ১৯৭৪ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো যখন ঢাকার মাটিতে পা রাখেন, তখন তেজগাঁও বিমানবন্দরে এক অদ্ভুত ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। একদিকে সাভার স্মৃতিসৌধের শোকের আবহ, অন্যদিকে বিমানবন্দরের বাইরে জড়ো হওয়া একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মুখে হঠাৎ শোনা যায় "পাকিস্তান জিন্দাবাদ" এবং "জুলফিকার আলী ভুট্টো জিন্দাবাদ" স্লোগান।
তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার জ্যোতিন্দ্র নাথ ডিক্সিটের (J.N. Dixit) স্মৃতিকথা এবং পরবর্তীকালের গোয়েন্দা রিপোর্টে এই ঘটনার পেছনের রূঢ় সত্যটি উন্মোচিত হয়:
তৎকালীন ক্ষোভের রাজনৈতিক ব্যবহার: ১৯৭৪ সালের সেই সময়টায় বাংলাদেশ তীব্র অর্থনৈতিক সংকট এবং আসন্ন দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি ছিল। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা (ISI) এবং এ দেশের স্বাধীনতাবিরোধী ডানপন্থী চক্র এই জনঅসন্তোষকে পুঁজি করে ভুট্টোর আগমনকে ভারত-বিরোধী ও আওয়ামী লীগ-বিরোধী সেন্টিমেন্ট উসকে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
বঙ্গবন্ধুর কৌশলগত সহনশীলতা: শেখ মুজিব চাইলে এই স্লোগানধারী চক্রকে কঠোরভাবে দমন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি পুলিশকে শক্তি প্রয়োগ করতে নিষেধ করেন। তিনি বিশ্বকে এবং ভুট্টোকে দেখাতে চেয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্ত ও গণতান্ত্রিক দেশ, যেখানে ভিন্নমতের প্রকাশও সম্ভব। তবে এর পেছনে বঙ্গবন্ধুর আরেকটি সূক্ষ্ম চাল ছিল তিনি ভুট্টোকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, যদি পাকিস্তান দ্রুত সম্পদ বণ্টন ও দ্বিপাক্ষিক সমস্যার সমাধান না করে, তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে পাকিস্তানের জন্য মুসলিম বিশ্বে নেতিবাচক ইমেজ তৈরি করবে।
ডিনার টেবিলের বাকযুদ্ধ: মুজিব বনাম ভুট্টোর কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব
২৮ জুন রাতে ভুট্টোর সম্মানে বঙ্গভবনে একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। সেই ডিনার টেবিলের আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে দুই নেতার মধ্যে যে তীব্র বাকযুদ্ধ হয়েছিল, তা তৎকালীন প্রোটোকল অফিসারদের ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ আছে।
বঙ্গবন্ধুর স্পষ্ট অবস্থান:
বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তৃতায় সরাসরি ১৯৭১ সালের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি কূটনৈতিক ভাষার মারপ্যাঁচ এড়িয়ে ভুট্টোকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক তখনই অর্থপূর্ণ হবে, যখন অতীতের ভুলগুলোকে সাহসের সাথে স্বীকার করা হবে এবং বাংলাদেশের মানুষের ন্যায্য পাওনা ফিরিয়ে দেওয়া হবে।" তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, ক্ষমা করার অর্থ এই নয় যে আমরা আমাদের ওপর হওয়া অন্যায় ভুলে গেছি।
ভুট্টোর চাতুর্যপূর্ণ উত্তর:
জুলফিকার আলী ভুট্টো ছিলেন অক্সফোর্ড-কেমব্রিজে পড়া এক ধূর্ত কূটনীতিক। তিনি সরাসরি ক্ষমা প্রার্থনা এড়িয়ে গিয়ে এক আবেগঘন নাটকের অবতারণা করেন। তিনি বলেন, "আমি অতীতের কালো মেঘ সরিয়ে নতুন ভোরের দিকে তাকাতে চাই। আমার হৃদয় বাংলাদেশের মানুষের জন্য কাঁদে।" কিন্তু যখনই সুনির্দিষ্ট কোনো চুক্তির কথা আসত, তিনি কৌশলে আইনি জটিলতার দোহাই দিয়ে তা এড়িয়ে যেতেন।
সম্পদ বণ্টনের অংক: কেন ভেস্তে গিয়েছিল অফিশিয়াল আলোচনা?
ভুট্টোর এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আনুষ্ঠানিক অংশটি ছিল দুই দেশের অর্থমন্ত্রী ও সচিব পর্যায়ের বৈঠক। বাংলাদেশ শক্ত তথ্য-প্রমাণ সহ পাকিস্তানের কাছে তাদের ন্যায্য পাওনার দাবি পেশ করে। কিন্তু পাকিস্তানের অনমনীয় মনোভাবের কারণে এই আলোচনাটি সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক দাবি: বাংলাদেশ অঙ্ক কষে দেখায় যে, ১৯৭১ সালের আগে অবিভক্ত পাকিস্তানের মোট বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, স্বর্ণ তহবিল এবং বিমান-নৌবাহিনীর সম্পদের ৫৬ শতাংশের মালিক ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (জনসংখ্যার অনুপাতে)।
বাংলাদেশ দাবি করে, পাকিস্তানের তৎকালীন মোট ক্যাশ অ্যাসেট এবং বৈদেশিক রিজার্ভ থেকে অন্তত ৪ বিলিয়ন ডলার (তৎকালীন বাজার মূল্যে) বাংলাদেশকে বুঝিয়ে দিতে হবে। অবিলম্বে পিআইএ (PIA)-এর বিমান এবং করাচি বন্দরে আটকে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
পাকিস্তানের চতুর পাল্টা চাল: ভুট্টো এবং তাঁর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মুবাশ্বির হাসান এক অদ্ভুত যুক্তি খাড়া করেন। তাঁরা বলেন, পাকিস্তানের যেমন সম্পদ ছিল, তেমনি আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণও ছিল। পাকিস্তান দাবি করে, যদি বাংলাদেশ সম্পদের ৫৬% চায়, তবে ১৯৭১ সালের আগের সমস্ত আন্তর্জাতিক ঋণের ৫৬%-এর দায়ও বাংলাদেশকে নিতে হবে!
ফলাফল: এটি ছিল একটি চরম অবাস্তব দাবি, কারণ যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পক্ষে সেই ঋণের বোঝা নেওয়া ছিল আত্মঘাতী। ভুট্টো মূলত সম্পদ না দেওয়ার জন্যই এই ঋণের ফাঁদ পেতেছিলেন। ফলে সম্পদ বণ্টনের আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়।
‘রেপাবলিক অব বাংলাদেশ’ বনাম ‘ইসলামিক রেপাবলিক’
সফরের দ্বিতীয় দিনে ভুট্টো একটি অত্যন্ত বিতর্কিত প্রস্তাব টেবিলে তোলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দেন যে, বাংলাদেশ যদি তার সংবিধানের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ নীতি পরিহার করে নিজেদের একটি ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণা করে, তবে পাকিস্তান খুব সহজেই সমস্ত সম্পদ ও বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে রাজি হবে। এটি ছিল মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার এক গোপন চেষ্টা।
বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠ জবাব: বঙ্গবন্ধু ভুট্টোর এই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, "বাংলাদেশ সাড়ে সাত কোটি মানুষের দেশ, যার মধ্যে কোটি খানেক অমুসলিম নাগরিক রয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা এসেছে সব ধর্মের মানুষের রক্তে। বাংলাদেশ তার ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক চরিত্র কখনো বিসর্জন দেবে না।" এই একটি সিদ্ধান্তেই প্রমাণিত হয় যে, বঙ্গবন্ধু মুসলিম বিশ্বের স্বীকৃতির জন্য ব্যাকুল হলেও দেশের মূল আদর্শের জায়গায় এক চুলও ছাড় দেননি।
যৌথ ইশতেহার (Joint Communique) ছাড়া বিদায়: তাৎক্ষণিক ব্যর্থতা বনাম দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত জয়
২৯ জুন যখন ভুট্টো ঢাকা ত্যাগ করেন, তখন প্রথা অনুযায়ী দুটি দেশের রাষ্ট্রীয় সফরের শেষে কোনো ‘যৌথ ইশতেহার’ বা Joint Communique প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। কূটনৈতিক পরিভাষায়, যৌথ ইশতেহার ছাড়া কোনো সফর শেষ হওয়া মানে সেই সফরটি অফিশিয়াল বা প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে সফল হয়নি।
ভুট্টোর হতাশা: ভুট্টো ভেবেছিলেন ঢাকায় এসে তিনি সস্তা আবেগ দেখিয়ে যুদ্ধবন্দী ও যুদ্ধাপরাধের ইস্যুগুলো চিরতরে ধামাচাপা দিয়ে কোনো অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা ছাড়াই পার পেয়ে যাবেন। কিন্তু বাংলাদেশের কঠোর দরকষাকষির মুখে তিনি তা পারেননি।
বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘমেয়াদি জয়: অফিশিয়াল কোনো চুক্তি না হলেও, এই সফরের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বিশ্বমঞ্চে যে বৃহৎ উদ্দেশ্য হাসিল করতে চেয়েছিলেন, তা শতভাগ সফল হয়েছিল।
১৯৭৪ সালের জুন সফরের তিন দিনের ঘটনাপঞ্জি
ভুট্টোর সেই ঐতিহাসিক ঢাকা সফরের প্রতিদিনের নাটকীয় মোড় এবং কূটনৈতিক টেবিলে ঘটা ঘটনাগুলোকে নিচে ছক আকারে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
তারিখ ও সময় | অফিশিয়াল কর্মসূচি (Official Schedule) | পর্দার অন্তরালের প্রকৃত ঘটনা (Behind-the-Scenes) | কৌশলগত তাৎপর্য ও ফলাফল (Strategic Impact) |
২৭ জুন, ১৯৭৪ | তেজগাঁও বিমানবন্দরে আগমন, গার্ড অব অনার এবং তোপধ্বনি। | বিমানবন্দরের বাইরে ডানপন্থী ও পাকিস্তানপন্থীদের সুসংগঠিত স্লোগান প্রোপাগান্ডা। | ভারত ও রাশিয়ার ব্লকের বাইরে বাংলাদেশের একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি প্রদর্শিত হয়। |
২৭ জুন (বিকেল) | সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা। | ভুট্টো প্রথমে স্মৃতিসৌধে যেতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু প্রোটোকলের চাপে বাধ্য হন। | পাকিস্তানি রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক পরোক্ষভাবে ১৯৭১ সালের গণহত্যার ঐতিহাসিক দায় স্বীকার। |
২৮ জুন (সকাল) | গণভবনে বঙ্গবন্ধু ও ভুট্টোর মধ্যে একান্ত (One-to-One) বৈঠক। | ভুট্টো বাংলাদেশকে ‘ইসলামিক ব্লক’-এ যোগ দেওয়ার এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ছাড়ার টোপ দেন। | বঙ্গবন্ধু দৃঢ়তার সাথে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখেন। |
২৮ জুন (দুপুর) | দুই দেশের সচিব ও মন্ত্রী পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। | ৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ দাবি বনাম পাকিস্তানের পাল্টা আন্তর্জাতিক ঋণের বোঝা চাপানোর চেষ্টা। | সম্পদ বণ্টনের আলোচনা সম্পূর্ণ অচলাবস্থায় (Deadlock) রূপ নেয়; কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। |
২৮ জুন (রাত) | বঙ্গোভবনে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ এবং দুই নেতার আনুষ্ঠানিক ভাষণ। | ভাষণে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক অতীতের ভুল স্বীকারের তাগিদ এবং ভুট্টোর চাতুর্যপূর্ণ আবেগী নাটক। | বিশ্বমঞ্চে প্রমাণিত হয় যে বাংলাদেশ প্রতিশোধপরায়ণ নয়, বরং প্রাজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। |
২৯ জুন, ১৯৭৪ | যৌথ ইশতেহার ছাড়াই ভুট্টোর পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ। | বিমানবন্দরে বিদায়ের সময় দুই নেতার শীতল করমর্দন এবং অফিশিয়াল ব্যর্থতার গ্লানি। | প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তি না হলেও, এই সফরের পরপরই সৌদি আরব ও ওআইসি ব্লকের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের বরফ গলে যায়। |
আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা নজরদারি এবং দিল্লির উদ্বেগ
ভুট্টোর এই ঢাকা সফরের ওপর ভারতের তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তীক্ষ্ণ নজর ছিল। ইন্দিরা গান্ধী সরকার কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিল যে, যুদ্ধের মাত্র আড়াই বছরের মাথায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় এসে যদি বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তির কোনো ক্ষতি করে বসেন।
তৎকালীন ভারতীয় কূটনৈতিক নথিপত্র থেকে জানা যায়:
বঙ্গবন্ধুর অগ্রিম নিশ্চয়তা: বঙ্গবন্ধু সফরের আগেই ভারতকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা মানে ভারতের সাথে বন্ধুত্ব কমানো নয়। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক টিকে থাকার লড়াই।
ডিলিং উইথ দ্য ডেভিল: ভারতের কূটনীতিকরা পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু যেভাবে ভুট্টোর চাতুর্যকে রুখে দিয়েছিলেন এবং কোনো ধরনের ফাঁদে পা না দিয়ে নিজের দাবিগুলোতে অনড় ছিলেন, তা এক কথায় ছিল অনন্য। ভুট্টো ভেবেছিলেন তিনি চাল চালছেন, কিন্তু দিনশেষে তিনি বঙ্গবন্ধুর রিয়েলপলিটিকের দাবার ঘুঁটি হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছিলেন।
সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নৈতিক উচ্চতার বার্তা
১৯৭৪ সালের সেই জুনের দিনগুলোতে ঢাকার রাস্তায় সাধারণ মানুষের একটি অংশ হয়তো আবেগের বশে পাকিস্তানের পক্ষে স্লোগান দিয়েছিল, যা অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে ব্যথিত করেছিল। কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি ছিল অনেক গভীরে। তিনি ভুট্টোকে স্বাগত জানিয়ে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বা ভুট্টোকে ব্যক্তিগতভাবে কোনো ক্ষমা করেননি, বরং তিনি বিশ্বমঞ্চে বাঙালি জাতির নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্ব (Moral Superiority) প্রমাণ করেছিলেন।
ক্ষমাশীল কিন্তু আত্মমর্যাদাশীল জাতি
বঙ্গবন্ধু বিশ্বকে দেখিয়েছিলেন যে, বাঙালি কেবল যুদ্ধ করতেই জানে না, তারা বিজয়ী হয়ে শত্রুকে ক্ষমা করার মতো বিশাল হৃদয়ের অধিকারী। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটি কথা আছে "দুর্বল কখনো ক্ষমা করতে পারে না, ক্ষমা হলো শক্তিশালীর লক্ষণ।" বাংলাদেশ যে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে, এই সংবর্ধনা ছিল তারই এক রাজকীয় ঘোষণা।
লোক দেখানো আবেগ বনাম বাস্তব রাষ্ট্রনীতি
ভুট্টো যখন সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে বাংলাদেশের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বাধ্য হন, তখন সেটি ছিল পাকিস্তানের জন্য এক চরম ঐতিহাসিক পরাজয় ও গ্লানি। যে মাটিকে তারা ‘বিদ্রোহীদের আস্তানা’ বলে বুটের তলায় পিষ্ট করতে চেয়েছিল, সেই মাটির শহীদদের সামনে পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে মাথা নত করতে হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু এই দৃশ্যটি নিশ্চিত করেছিলেন কোনো যুদ্ধ না করেই, স্রেফ প্রটোকল এবং ডিপ্লোমেসির মাধ্যমে। এটি ছিল পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের এক নীরব মনস্তাত্ত্বিক প্রতিশোধ।
সফরের ফলাফল: অর্জনের খাতা বনাম অপূর্ণ স্বপ্নের ট্র্যাজেডি
ইতিহাসের যেকোনো বড় কূটনৈতিক ঘটনার মতো ১৯৭৪ সালের এই সফরেরও কিছু তাৎক্ষণিক সুফল ছিল, আবার কিছু দীর্ঘমেয়াদি সীমাবদ্ধতাও ছিল। রিয়্যালপলিটিকের ময়দানে শতভাগ অর্জন সবসময় সম্ভব হয় না।
তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি অর্জনসমূহ
১. জাতিসংঘের সদস্যপদ নিশ্চিতকরণ: এই সফরের মাত্র তিন মাসের মাথায়, ১৭ই সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে ২৯তম সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। পাকিস্তান বা চীনের পক্ষ থেকে আর কোনো বাধা আসেনি।
২. রেমিট্যান্স অর্থনীতির সূচনা: মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর ১৯৭৫ সালের শেষভাগ থেকে বাংলাদেশী জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়, যা আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি (Forex Reserve)-র মূল ভিত্তি।
৩. আটকে পড়া বাঙালিদের উদ্ধার: পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত শত শত বাঙালি অফিসার এবং পাইলট (যারা ১৯৭১ সালে বন্দি ছিলেন) তারা এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং সদ্য গঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে পুনর্গঠিত করতে মূল ভূমিকা পালন করেন।
অপূর্ণ রয়ে যাওয়া আশা ও ট্র্যাজেডি:
তবে জুলফিকার আলী ভুট্টো তার চিরাচরিত চাতুর্য ও বিশ্বাসঘাতকতার চরিত্র থেকে বের হতে পারেননি।
সম্পদের অধিকার বঞ্চিত করা: সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিয়ে আলোচনার জন্য একটি যৌথ কমিটি গঠনের কথা থাকলেও, পাকিস্তান পরবর্তীতে নানা অজুহাতে বাংলাদেশের পাওনা বুঝিয়ে দেয়নি। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছ থেকে সেই ন্যায্য পাওনা পায়নি।
বিহারে আটকে পড়া নাগরিকদের প্রত্যাখ্যান: পাকিস্তান তাদের অনুগত অবাঙালিদের (বিহারি) ফিরিয়ে নেওয়ার যে মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা তারা পুরোপুরি রক্ষা করেনি। ফলে বাংলাদেশে এক বিশাল শরণার্থী সংকট দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়।
একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কের কালজয়ী উত্তরাধিকার
ইতিহাসের যেকোনো মহান নেতার সিদ্ধান্তকে মূল্যায়ন করতে হয় তার সমসাময়িক প্রেক্ষাপট, সীমাবদ্ধতা এবং দূরবর্তী ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে। ১৯৭৪ সালের জুন মাসে যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত, আন্তর্জাতিকভাবে আংশিক অবরুদ্ধ এবং এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের নেতৃত্ব যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে, তখন আবেগতাড়িত হয়ে প্রতিশোধের রাজনীতি করা ছিল সবচেয়ে সহজ পথ। তিনি চাইলেই ভুট্টোকে আসতে বাধা দিতে পারতেন, তাকে অপমান করতে পারতেন। এতে হয়তো সাময়িকভাবে দেশের মানুষের সস্তা আবেগ ও হাততালি পাওয়া যেত, কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ চিরতরে একঘরে হয়ে পড়ত। আমেরিকার খাদ্য সাহায্য বন্ধ থাকত, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার বন্ধ থাকত এবং জাতিসংঘের দরজা আমাদের জন্য অবরুদ্ধই রয়ে যেত।
বঙ্গবন্ধু সস্তা আবেগের স্রোতে গা না ভাসিয়ে বেছে নিয়েছিলেন রিয়েলপলিটিক ও দূরদর্শী বাস্তববাদের কঠিন পথ। ভুট্টোকে রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়া কোনো দাসত্ব ছিল না, এটি ছিল একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌম অধিকারের সর্বোচ্চ ও স্বাধীন প্রয়োগ। তিনি শত্রুকে তার নিজের আঙিনায় এনে, তাকে দিয়ে শহীদ মিনারে ও স্মৃতিসৌধে মাথা নত করিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে "যুদ্ধ শেষ হয়েছে, বাংলাদেশ জিতেছে এবং পাকিস্তান পরাজিত হয়েছে।"
আজকের বাংলাদেশ যে ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে, বিশ্বমঞ্চে আমরা যে একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর এই দূরদর্শী, অসাম্প্রদায়িক ও বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমেই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারা কেবল আবেগ দিয়ে রাষ্ট্র চালাতে চায় তারা ধ্বংস হয়ে যায়; আর যারা ইতিহাসের তিক্ততাকে পেছনে ফেলে প্রজ্ঞার সাথে সামনে তাকায়, তারাই টিকে থাকে। বঙ্গবন্ধু সেই প্রজ্ঞারই এক কালজয়ী প্রতীক।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা















