বাংলাদেশে ভুট্টো রাজকীয় সংবর্ধনা পেলো কেন?
যে পাকিস্তান মাত্র দুই বছর আগেও এই দেশের ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে এবং বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ চালিয়েছে, সেই দেশের নেতাকে কেন এমন উষ্ণ অভ্যর্থনা? ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচক্ষণ ও বাস্তববাদী কূটনীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

TruthBangla
Aug 23, 2025
১৯৭৪ সালের জুনে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাত্র আড়াই বছর পর, পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো যখন শতাধিক ব্যক্তির বিশাল বহর নিয়ে ঢাকা সফরে আসেন, তখন তাঁকে দেওয়া রাজকীয় সংবর্ধনা অনেককেই বিস্মিত করেছিল। যে পাকিস্তান মাত্র দুই বছর আগেও এই দেশের ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে এবং বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ চালিয়েছে, সেই দেশের নেতাকে কেন এমন উষ্ণ অভ্যর্থনা? ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচক্ষণ ও বাস্তববাদী কূটনীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে দ্রুত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্থিতিশীলতা এনে দিতে ভুট্টোকে অভ্যর্থনা দেওয়া ছিল মূলত একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যার লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মাধ্যমে প্রভাবশালী মুসলিম দেশ সৌদি আরব এবং পশ্চিমা পরাশক্তি আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করা।
তিক্ততা ভুলে কূটনীতির মঞ্চে বাংলাদেশ
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যার স্মৃতি তখনো দগদগে। তবুও সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। স্বাধীন হলেও বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের স্বীকৃতি এবং অর্থনৈতিক টিকে থাকার লড়াই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ১৯৭৪ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি, যা ছিল লাহোরে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)-এর শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক আগে। এই স্বীকৃতির পর মাত্র চার মাসের মাথায় ভুট্টো ঢাকায় আসেন।
কৌশলগত সংবর্ধনা: শেখ মুজিব জানতেন, ভুট্টোকে প্রত্যাখ্যান করা মানে আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের হাতে আরেকটি অজুহাত তুলে দেওয়া। তাই তিক্ততা ভুলে ভুট্টোকে বিশাল অভ্যর্থনা দেওয়া হয়। এটি ছিল কেবল সৌজন্যতা নয়, বরং এক কৌশলগত ডিপ্লোমেসি-র অংশ।
কেন ভুট্টো এলেন – পাকিস্তানের কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা
জুলফিকার আলী ভুট্টো নিজের ইচ্ছায় বা আন্তরিকতা থেকে বাংলাদেশে আসেননি। আন্তর্জাতিক চাপ এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ স্বার্থেই তাঁর এই সফর ছিল অনিবার্য।
ওআইসি সম্মেলন ও আন্তর্জাতিক চাপ
স্বীকৃতির বাধ্যবাধকতা: ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিতব্য ওআইসি সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু পাকিস্তান প্রথমে তাতে বাধা দিতে থাকে।
মুসলিম বিশ্বের চাপ: মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই সম্মেলনে বাংলাদেশকে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে পাকিস্তান বাধ্য হয়। এই চাপের মুখে, এবং কূটনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
সফরের যৌক্তিকতা: স্বীকৃতির পর, সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হিসেবেই ভুট্টোর এই সফর ছিল অনিবার্য। আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং বাংলাদেশ নিয়ে চলা বিতর্কের অবসানে এই সফর জরুরি ছিল।
যুদ্ধবন্দী ও সম্পদের মীমাংসা
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কয়েকটি অমীমাংসিত বিষয় ছিল, যার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন ছিল। ভারত ও পাকিস্তানের হেফাজতে থাকা প্রায় ৯০ হাজার যুদ্ধবন্দীর প্রত্যাবর্তন এবং আটকে থাকা বাঙালি ও অবাঙালিদের বিনিময় প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা।
স্বাধীনতা-পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের বিষয়ে আলোচনা শুরু করা। ভুট্টোর সফর এই জটিল বিষয়গুলোর সমাধানের জন্য ব্যক্তিগত আলোচনার মঞ্চ তৈরি করেছিল।
শেখ মুজিবের কূটনীতি – কেন রাজকীয় সংবর্ধনা অপরিহার্য ছিল?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে যা উচিত মনে করেছিলেন, তাই করেছিলেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা দূর করা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা। ভুট্টোকে রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়ার পেছনে ছিল তাঁর তিনটি সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক লক্ষ্য।
(১) সৌদি আরব ও মুসলিম বিশ্বের স্বীকৃতি অর্জন
তখনও পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। সৌদি আরবের স্বীকৃতি না থাকার কারণে বাংলাদেশ বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছিল:
শ্রমবাজার বন্ধ: সৌদি আরবে বাঙালিদের জন্য শ্রমবাজার পুরোপুরি বন্ধ ছিল, যা সদ্য স্বাধীন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের জন্য ছিল বিশাল বাধা।
জাতিসংঘে বাধা: সৌদি সরকার পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করায় বাংলাদেশ সঙ্গে সঙ্গে জাতিসংঘে যোগ দিতেও পারেনি (যদিও ১৯৭৪ সালে যোগ দেয়)।
কৌশল: শেখ মুজিব জানতেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে আর কোনো আপত্তি করবে না। ভুট্টোর সংবর্ধনা ছিল সৌদি আরবকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া যে, বাংলাদেশ এখন নিরপেক্ষ কূটনীতিতে বিশ্বাসী এবং মুসলিম উম্মাহর অংশ হতে প্রস্তুত।
(২) আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ
১৯৭৪ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ এক ভয়াবহ খাদ্য সংকটের মুখে পড়েছিল, যা পরে দুর্ভিক্ষে রূপ নেয়।
PL-480 নিষেধাজ্ঞা: আমেরিকা তখনো বাংলাদেশকে বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। তারা জাতিসংঘের PL-480 খাদ্য সহায়তা আটকে রেখেছিলো, যা বাংলাদেশের জন্য ছিল মারাত্মক। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধে ভারত ও সোভিয়েতকে সমর্থনের জন্য আমেরিকার এক ধরনের প্রতিশোধ।
কূটনৈতিক মুক্তি: পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু আমেরিকাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ এখন আর 'ভারত-সোভিয়েত' ব্লকের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। এর ফলে আমেরিকার খাদ্য সহায়তা প্রাপ্তি এবং তাদের শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার পথ তৈরি হতে পারত।
(৩) স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ভিত্তি
একাত্তরের যুদ্ধে বাংলাদেশের অবকাঠামো, কৃষি, পরিবহন এবং ব্যাংক রিজার্ভ - সবকিছু ধ্বংস হয়েছিল। একটি দেশ হিসেবে টিকে থাকার জন্য দরকার ছিল স্থিতিশীলতা।
শান্তি ও নিরাপত্তা: উপমহাদেশের প্রধান শত্রু পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করা ছিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম শর্ত। সংবর্ধনা ছিল সেই শান্তি স্থাপনের প্রতীকী পদক্ষেপ।
সম্পদ আদায়: সম্পদ বণ্টনের আলোচনা শুরু করার জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা জরুরি ছিল। তিক্ততা বজায় রেখে সেই আলোচনা সফল করা অসম্ভব ছিল।
সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বার্তা
ভুট্টোকে রাজকীয় সংবর্ধনা দিয়ে শেখ মুজিব বিশ্বকে এক স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন: বাংলাদেশ প্রতিশোধ নয়, বরং প্রগতি ও কূটনীতিতে বিশ্বাসী।
রাষ্ট্রের নৈতিক উচ্চতা: বাংলাদেশ বিশ্বকে দেখিয়েছিল যে, তারা একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও ক্ষমাশীল জাতি। ভুট্টোকে সংবর্ধনা দিয়ে বঙ্গবন্ধু প্রমাণ করেছিলেন যে, বাংলাদেশ ইতিহাসের তিক্ততা পেছনে ফেলে সামনে তাকাতে প্রস্তুত। এটি আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিল।
গণতন্ত্রের প্রতি আস্থার প্রকাশ: বঙ্গবন্ধু যদিও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন, তবুও তিনি গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। ভুট্টোকে স্বাগত জানানো ছিল, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের একটি দৃঢ় প্রত্যয়। এটি পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বা ভুট্টোকে ব্যক্তিগতভাবে সম্মান দেখানো ছিল না, বরং কূটনৈতিক শিষ্টাচারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
সফরের ফলাফল – অর্জনের খাতা
ভুট্টোর সফরটি তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী, উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের জন্য ফলপ্রসূ হয়েছিল।
তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক অর্জন
সম্পর্কের উন্নতি: সফরের পরপরই পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনীতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।
মুসলিম বিশ্বের স্বীকৃতি: পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার কিছুদিন পরই সৌদি আরবসহ অন্যান্য মুসলিম দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান শুরু করে।
অর্থনৈতিক সুবিধা: এই কূটনৈতিক বিজয়ের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার বাঙালিদের জন্য উন্মুক্ত হয় এবং বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ পায়।
ট্র্যাজেডি – অপূর্ণ রয়ে যাওয়া আশা
যদিও ভুট্টোকে অভ্যর্থনা দেওয়ার ফলে কূটনৈতিক সুবিধা এসেছিল, তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অপূর্ণই থেকে যায়। স্বাধীনতা-পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও, পাকিস্তান কখনোই বাংলাদেশকে তার ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দেয়নি।
ভুট্টো আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন যেন বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসে। যদিও বঙ্গবন্ধু দেশীয় আইনে বিচার চালিয়ে যেতে চেয়েছেন, তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাঁকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে।
একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কের সিদ্ধান্ত
ইতিহাসের যেকোনো রাষ্ট্রনায়কের সিদ্ধান্তকে সেই সময়ের প্রেক্ষাপটেই বিচার করতে হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত এবং কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন একটি রাষ্ট্রের নেতৃত্ব যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে, তখন তাঁর সামনে দুটি পথ ছিল:
আবেগ ও প্রতিশোধ: ভুট্টোকে অপমান করে বা প্রত্যাখ্যান করে প্রতিশোধ নেওয়া - যা আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়াত।
কৌশল ও বাস্তববাদ: তিক্ততা ভুলে ভুট্টোকে স্বাগত জানিয়ে সৌদি আরব ও আমেরিকাকে পাশে পাওয়ার পথ তৈরি করা।
বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছিলেন। ভুট্টোকে রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়া ছিল আবেগহীন, দূরদর্শী এবং চরম বাস্তববাদী একটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই তিনি ধ্বংসস্তূপ থেকে বাংলাদেশকে টেনে তুলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করার কাজ শুরু করেন। আজকের বাংলাদেশ যে শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানে আছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু তাঁর এই কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমেই।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















