>

>

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশ, কলকাতা ও বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশ, কলকাতা ও বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা

একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিকে তাঁর নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটিয়েছিল সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী কর্মকর্তা ও জওয়ান। কিন্তু এই চরম জাতীয় ট্র্যাজেডির অব্যবহিত পরেই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে চোখের পলকে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছিল, তা কেবল নজিরবিহীনই নয়, বরং চরম বিস্ময় ও লজ্জার এক ঐতিহাসিক দলিল।

TruthBangla

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশ, কলকাতা ও বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা

ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত এমন থাকে যা কেবল একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভাগ্যকেই বদলে দেয় না, বরং সেই রাষ্ট্রের স্তম্ভগুলোর ভেতরের কঙ্কালকেও উন্মোচিত করে দেয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনই এক নিকষ কালো অধ্যায়। সেদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিকে তাঁর নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটিয়েছিল সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী কর্মকর্তা ও জওয়ান। কিন্তু এই চরম জাতীয় ট্র্যাজেডির অব্যবহিত পরেই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে চোখের পলকে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছিল, তা কেবল নজিরবিহীনই নয়, বরং চরম বিস্ময় ও লজ্জার এক ঐতিহাসিক দলিল। যে গণমাধ্যম কয়েক ঘণ্টা আগেও বঙ্গবন্ধুকে প্রশংসার জোয়ারে ভাসিয়ে দিচ্ছিল, তারাই খুনি চক্রের ক্ষমতা দখলের সাথে সাথে সুর বদলে চাটুকারিতার নতুন রেকর্ড গড়েছিল।

এই দীর্ঘ প্রবন্ধে আমরা বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করব কীভাবে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের ট্র্যাজেডির আগে ও পরে বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলো তাদের চরিত্র পরিবর্তন করেছিল, কীভাবে বেতারের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছিল, সীমান্ত পেরিয়ে কলকাতার সংবাদমাধ্যমে এই ঘটনার কী প্রভাব পড়েছিল এবং বিশ্ব গণমাধ্যম এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে কীভাবে তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের আয়নায় দেখেছে।

১৫ই আগস্টের শান্ত ভোর এবং সংবাদপত্রের অপ্রস্তুত স্তুতিবাদ

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ছিল একটি বিশেষ দিন। ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক সমাবর্তনে অংশ নেওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের। পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাজানো হয়েছিল বর্ণিল সাজে, রাষ্ট্রপ্রধানকে বরণ করে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল পুরো দেশ। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে, যখন ভোরের আলোয় ঢাকার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, তখনো মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সংবাদপত্রগুলোতে ছিল অন্য এক সুর।

প্রেস ডেডলাইন ও সময়ের ফাঁদ

সংবাদপত্র ছাপার সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ১৫ই আগস্ট সকালে যে পত্রিকাগুলো বাজারে এসেছিল, সেগুলোর ভেতরের এবং প্রথম পাতার সংবাদ সাজিয়ে প্রেসে পাঠানো হয়েছিল ১৪ই আগস্ট মধ্যরাতের আগেই। ফলে ১৫ই আগস্টের পত্রিকা হাতে নিয়ে দেশের মানুষ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের খবর পড়ছিল, তখন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত মরদেহ পড়েছিল সিঁড়িতে। স্বাভাবিকভাবেই, ১৫ই আগস্ট প্রকাশিত কোনো পত্রিকাতেই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের কোনো সংবাদ ছিল না।

তবে এই পত্রিকাগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অন্য জায়গায়। এগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, মৃত্যুর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেও দেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর চোখে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান এবং তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচি কেমন গুরুত্ব পাচ্ছিল।

চারটি প্রধান দৈনিকের ১৫ই আগস্টের চিত্র

১. দৈনিক ইত্তেফাক: নুরুল ইসলাম পাটোয়ারী সম্পাদিত এই প্রভাবশালী পত্রিকাটির ১৫ই আগস্টের প্রধান শিরোনাম ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বঙ্গবন্ধুর যাওয়ার কর্মসূচি। তারা প্রথম পাতায় বঙ্গবন্ধুর বিশাল আলোকচিত্র প্রকাশ করার পাশাপাশি একটি বিশেষ ক্রোড়পত্রও প্রকাশ করেছিল, যেখানে বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রশংসা করা হয়েছিল।

২. দৈনিক বাংলা: এহতেশাম হায়দার চৌধুরী সম্পাদিত এই প্রগতিশীল পত্রিকাটির ১৫ই আগস্টের প্রধান শিরোনাম ছিল:

“গ্রাম পর্যায়ে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে”

বাকশালের (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) জেলা সম্পাদকদের প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নিয়ে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামান যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রেখেছিলেন, তার ওপর ভিত্তি করে এই ইতিবাচক সংবাদটি করা হয়েছিল।

৩. দ্য বাংলাদেশ অবজারভার (The Bangladesh Observer): ওবায়দুল হক সম্পাদিত এই ইংরেজি দৈনিকটি সেদিন প্রথম পাতায় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বঙ্গবন্ধুর খবর ছেপেছিল। প্রথম পাতার মোট ছয়টি আলাদা সংবাদের শিরোনামে সরাসরি ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল। তাদের প্রধান শিরোনামটি ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়:

“Bangobandhu visits D.U. today, Hearty welcome will be accorded” (আজ ঢাবি সফরে বঙ্গবন্ধু, উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুতি)

এর ঠিক ডানপাশেই আরেকটি সংবাদের শিরোনাম ছিল: “Korean envoy lauds leadership of Bangobandhu” (কোরিয়ান দূতের চোখে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রশংসা)। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উপলক্ষে তারা একটি দীর্ঘ বিশেষ ক্রোড়পত্রও প্রকাশ করেছিল।

৪. দ্য বাংলাদেশ টাইমস (The Bangladesh Times): আব্দুল গনি হাজারি সম্পাদিত এই দৈনিকটিও অন্যান্য পত্রিকার মতোই বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানিয়ে বিশেষ নিবন্ধ ও প্রথম পাতার প্রধান সংবাদ প্রকাশ করেছিল।

১৬ই আগস্টের চরম ভোলবদল: যখন রাতারাতি পাল্টে গেল ইতিহাসের ভাষা

১৫ই আগস্টের রক্তপাতের পর ১৬ই আগস্ট সকালে যখন নতুন করে সংবাদপত্রগুলো মানুষের হাতে পৌঁছাল, তখন পুরো দেশের মানুষ স্তম্ভিত হয়ে গেল। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের প্রতিটি জাতীয় দৈনিকের ভাষা, সুর এবং সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছিল। যে মানুষটিকে আগের দিনও ‘জাতির পিতা’ এবং ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছিল, ১৬ই আগস্টের পত্রিকায় তাঁর নাম থেকে সমস্ত সম্মানসূচক বিশেষণ উধাও হয়ে গেল। এমনকি তাঁর পরিবারের শিশু ও নারীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিষয়টিও সম্পূর্ণ চেপে যাওয়া হলো।

১৬ই আগস্টের ভাষাগত পরিবর্তন:

  • ১৫ই আগস্ট: "জাতির জনক", "বঙ্গবন্ধু", "আমাদের মহান নেতা"

  • ১৬ই আগস্ট: "শেখ মুজিব", "সাবেক রাষ্ট্রপতি", "স্বৈরাচারী মুজিব" (বেতারে)

চারটি প্রধান দৈনিকের ১৬ই আগস্টের ভূমিকা

১. দৈনিক বাংলা: দৈনিক বাংলার ১৬ই আগস্টের প্রথম পাতার সমস্ত কলাম জুড়ে প্রধান শিরোনাম করা হয়েছিল:

“খোন্দকার মুশতাক নয়া রাষ্ট্রপতি”

আর সেই খবরের শোল্ডারে অত্যন্ত শীতল ও নির্মম ভাষায় লেখা ছিল: “শেখ মুজিব নিহত: সামরিক আইন ও সান্ধ্য আইন জারি: সশস্ত্র বাহিনীসমূহের আনুগত্য প্রকাশ”

পুরো পত্রিকার কোথাও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাঁর শিশুসন্তান রাসেল বা পরিবারের অন্তসত্ত্বা নারীদের ওপর কীভাবে গুলি চালানো হয়েছে তার কোনো বিবরণ ছিল না। মূল প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্বাভাবিক ঢঙে লেখা হয়েছিল:

“শুক্রবার সকালে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী ‘বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে’ সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের পতন ঘটিয়ে প্রেসিডেন্ট খোন্দকার মুশতাক আহমদের নেতৃত্বে ক্ষমতা গ্রহণ করে।”

আরও লজ্জাজনক বিষয় ছিল, দৈনিক বাংলা তাদের প্রথম পাতাতেই একটি বিশেষ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল “ঐতিহাসিক পদক্ষেপ”। সেখানে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং অবৈধ ক্ষমতা দখলকে স্বাগত জানানো হয়েছিল।

২. দ্য বাংলাদেশ অবজারভার (The Bangladesh Observer): এই ইংরেজি দৈনিকটির ১৬ই আগস্টের প্রধান শিরোনাম ছিল:

“Mushtaque becomes President” (প্রেসিডেন্ট হলেন মুশতাক)

এবং এর নিচে অত্যন্ত ছোট হরফে লেখা ছিল: “MUJIB KILLED : SITUATION REMAINS CALM” (মুজিব নিহত: পরিস্থিতি শান্ত)

তারাও প্রথম পাতায় একটি সম্পাদকীয় ছাপে যার শিরোনাম ছিল “Historical Necessity” (ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা)। এই সম্পাদকীয়তে বঙ্গবন্ধুর শাসনকালকে অন্ধকার যুগ হিসেবে দেখানোর অপচেষ্টা করা হয়েছিল।

৩. দৈনিক ইত্তেফাক: ১৬ই আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ছিল অত্যন্ত উস্কানিমূলক ও তোষামোদিপূর্ণ:

“দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি উচ্ছেদ: খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর শাসনক্ষমতা গ্রহণ”

তারাও দেশের এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ও হত্যাকাণ্ডকে আড়াল করে খুনিদের এজেন্ডাকেই মূল সংবাদ হিসেবে প্রচার করেছিল। প্রথম পাতায় তাদের সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল “ঐতিহাসিক নবযাত্রা”

৪. দ্য বাংলাদেশ টাইমস (The Bangladesh Times): এই পত্রিকাটির প্রধান শিরোনাম ছিল:

“MUSHTAQUE ASSUMES PRESIDENCY”

আর এর শোল্ডারে লেখা ছিল: “Martial law proclaimed in the country : Mujib killed”। প্রথম পাতায় তাদের প্রকাশিত সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল “ON THE THRESHOLD OF A NEW ERA” (নতুন যুগের দ্বারপ্রান্তে), যা ছিল মূলত অবৈধ খুনি সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের শামিল।

মুশতাক সরকারের তোষামোদি

১৬ই আগস্টের সংবাদপত্রগুলোতে কেবল বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুই ঢাকা পড়েনি, বরং খুনি খোন্দকার মুশতাক আহমদের নতুন মন্ত্রিসভাকে জনগণের সামনে বৈধ হিসেবে জাহির করার এক নোংরা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। সংবাদপত্রগুলো দাবি করতে শুরু করে যে, দেশের ‘বিভিন্ন স্তরের জনসাধারণ’ এই পরিবর্তনকে অত্যন্ত আনন্দের সাথে গ্রহণ করেছে এবং নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়েছে।

পত্রিকাগুলোতে এমনভাবে সংবাদ সাজানো হয়েছিল যেন মনে হচ্ছিল পুরো দেশ এই হত্যাকাণ্ডে হাফ ছেড়ে বেঁচেছে। ‘বিভিন্ন স্তরের জনসাধারণ’ হিসেবে যাদের অভিনন্দন বার্তা গুরুত্বের সাথে ছাপা হয়েছিল, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:

  • বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সংস্থা বা আন্তর্জাতিক ফোরামের প্রতিনিধিরা।

  • বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন সহ-সভাপতি।

  • বাংলাদেশ গণকর্মচারী সংযুক্ত পরিষদ।

  • জাতীয় হকার্স লীগের সভাপতি।

  • কয়েকজন সুবিধাবাদী সংসদ সদস্য, যারা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে বা ক্ষমতার লোভে দ্রুত মুশতাক সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন।

নতুন মন্ত্রিসভার রূপরেখা

১৬ই আগস্টের পত্রিকায় মুশতাক সরকারের অধীনে শপথ নেওয়া নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের নামের তালিকা গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করা হয়। নিচে এই সুবিধাবাদী ও বিতর্কিত মন্ত্রিসভার তালিকা দেওয়া হলো:

মন্ত্রী পরিষদ:

১. বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী (যিনি একসময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন)

২. অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী (যিনি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন)

৩. ফণী মজুমদার

৪. মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন

৫. আবদুল মান্নান

৬. মনোরঞ্জন ধর

৭. আব্দুল মোমিন

৮. আসাদুজ্জামান খান

প্রতিমন্ত্রী পরিষদ:

১. শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন

২. দেওয়ান ফরিদ গাজী

৩. তাহেরউদ্দিন ঠাকুর (যিনি এই ষড়যন্ত্রের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড ছিলেন)

৪. নুরুল ইসলাম চৌধুরী

৫. নুরুল ইসলাম মঞ্জুর

৬. কে এম ওবায়দুল রহমান

৭. ড. আজিজুর রহমান মল্লিক

৮. ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরী

আগস্টের বাকি দিনগুলো: ইতিহাস মুছে ফেলার সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা

১৬ই আগস্টের পর থেকেই এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদপত্রগুলো সত্য প্রকাশের সাহস হারিয়ে ফেলেছে। আগস্টের বাকি দিনগুলোতে এই ধারাই অব্যাহত থাকে।

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় দাফন: ইতিহাসের সবচেয়ে সংকুচিত সংবাদ

১৬ই আগস্ট বিকেলে কড়া সামরিক পাহারায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মরদেহ হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁর জন্মস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। সেখানে অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে, সাধারণ সাবান দিয়ে জানাজা শেষে তাঁকে সমাহিত করা হয়। ১৭ই আগস্টের পত্রিকায় এই দাফনের খবরটি ছাপা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তা ছিল সংবাদপত্রের ইতিহাসের সবচেয়ে উপেক্ষিত খবর।

দৈনিক বাংলা: এই পত্রিকাটিতে বঙ্গবন্ধুর দাফনের খবরটি ছিল মাত্র দুই লাইনের

দৈনিক ইত্তেফাক: খবরটি প্রকাশ করেছিল মাত্র ৩৭টি শব্দের মধ্যে, ভেতরের পাতায় অত্যন্ত অবহেলায়।

দ্য বাংলাদেশ অবজারভার: এই ইংরেজি দৈনিকটি মাত্র ২৪টি শব্দের মধ্যে পুরো খবরটি শেষ করেছিল।

মুশতাকের মহিমান্বিত রূপ ও সত্যের অপলাপ

১৭ই আগস্ট দেশের চারটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় খোন্দকার মুশতাকের জীবনবৃত্তান্ত ও ছবি প্রকাশ করা হয়, যেখানে আওয়ামী লীগের সাথে তার ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও অবদানের কথা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করা হয়। ওই একই দিনের প্রধান সংবাদ করা হয়েছিল সৌদি আরব ও সুদান কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতির খবর। এর উদ্দেশ্য ছিল জনগণকে বোঝানো যে, নতুন সরকার আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করেছে।

এছাড়াও, ২৩শে আগস্ট রাতে যখন সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ ২৬ জন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়, তখন ২৪শে আগস্টের পত্রিকায় সেই খবরটিকে প্রকাশ করা হয় ‘দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ’ হিসেবে। এই গ্রেফতারকৃত নেতাদের মধ্যেই ছিলেন জাতীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামান, যাদের পরবর্তীতে ৩রা নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

বাংলাদেশ বেতারে সেন্সরশিপের করাল গ্রাস

সংবাদপত্রের চেয়েও দ্রুত এবং সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডের বার্তা দিয়েছিল তৎকালীন বেতার মাধ্যম। ১৫ই আগস্ট ভোরের দিকে প্রথম যখন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের দিকে গুলি বর্ষণ চলছিল, ঠিক তখনই বেতারের দখল নেয় খুনি চক্র।

মেজর ডালিমের কুখ্যাত ঘোষণা

বেতারে মেজর শরিফুল হক ডালিমের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, যা ছিল বাঙালির ইতিহাসে অন্যতম বড় এক বজ্রপাত:

“আমি মেজর ডালিম বলছি। শেখ মুজিবকে হত্যা করা হইয়াছে এবং খন্দকার মুশতাকের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করিয়াছে। দেশবাসী সবাই শান্ত থাকুন। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।”

এই ঘোষণাটি রেডিওতে বারবার বাজানো হয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই যখন খুনি চক্র বুঝতে পারে যে সপরিবারে হত্যার খবরটি সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে, তখন তারা সুর নরম করে। পরবর্তী ঘোষণাগুলোতে ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার’ বিষয়টি আড়াল করে কেবল ‘স্বৈরাচারী শেখ মুজিবের পতন’ এবং ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের’ কথা প্রচার করা হতে থাকে।

সংস্কৃতির ওপর আঘাত ও ‘রেডিও বাংলাদেশ’

হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মেজর শাহরিয়ার রশিদের নির্দেশে বেতারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়:

বঙ্গবন্ধুর নাম নিষিদ্ধ: বেতারের কোনো অনুষ্ঠানে বা সংবাদে ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ বা ‘বঙ্গবন্ধু’ নামটি উচ্চারণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।

সাংস্কৃতিক নিষেধাজ্ঞা: রবীন্দ্রসংগীত প্রচার করা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

স্লোগানের পরিবর্তন: মুক্তিযুদ্ধের প্রধান স্লোগান ‘জয় বাংলা’ নিষিদ্ধ করে পাকিস্তানি আদলে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ চালু করা হয়।

নাম পরিবর্তন: খোন্দকার মুশতাকের মৌখিক আদেশে ‘বাংলাদেশ বেতার’-এর নাম পরিবর্তন করে পাকিস্তানি স্টাইলে ‘রেডিও বাংলাদেশ’ রাখা হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগপর্যন্ত দীর্ঘ ২১ বছর বেতারে বঙ্গবন্ধুর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চারিত হয়নি।

কলকাতার সংবাদমাধ্যমের সংশয়, শোক ও আমেরিকার হস্তক্ষেপ

বাংলাদেশের এই অভূতপূর্ব সংকটের সময় প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিশেষ করে কলকাতার সংবাদপত্রগুলোর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌতূহল উদ্দীপক।

ভারতের অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা ও সেন্সরশিপ

১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে ভারতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল না। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেশে অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা (Emergency) জারি করে রেখেছিলেন। ফলে ভারতের সংবাদমাধ্যমের ওপরও ছিল কঠোর সরকারি সেন্সরশিপ। কোনো খবর প্রকাশের আগে সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর অনুমোদন লাগত।

১৭ই আগস্টের বিলম্বিত সংবাদ

১৫ই আগস্ট ছিল ভারতের স্বাধীনতা দিবস। ছুটির দিন থাকার কারণে ১৬ই আগস্ট ভারতের বা কলকাতার কোনো পত্রিকা প্রকাশিত হয়নি। ফলে কলকাতার মানুষকে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খবর জানতে ১৭ই আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

১. আনন্দবাজার পত্রিকা: ১৭ই আগস্ট কলকাতার সবচেয়ে প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ছিল অত্যন্ত আবেগপূর্ণ:

“বন্ধুর মৃত্যুতে ভারত শোকাহত”

তারা অত্যন্ত সাহসের সাথে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের বুলেটে মৃত্যুর কথা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছিল। তবে ভারতের কূটনৈতিক সতর্কতার কথা উল্লেখ করে তারা লিখেছিল ভারত সরকার বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং এটি সম্পূর্ণ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়।

২. যুগান্তর: ১৭ই আগস্ট যুগান্তর পত্রিকা তাদের প্রধান শিরোনাম করেছিল:

“অভ্যুত্থান: মুজিব ও মনসুর আলী নিহত, সামরিক আইন জারি”

(উল্লেখ্য, ঘটনার প্রাথমিক বিশৃঙ্খলার কারণে মনসুর আলী নিহত হওয়ার খবরটি ভুলভাবে ছাপা হয়েছিল, কারণ তিনি তখনো বেঁচে ছিলেন এবং পরবর্তীতে ৩রা নভেম্বর ঢাকা জেলে শহীদ হন)

৩. দ্য সানডে স্টেটসম্যান (The Sunday Statesman): স্টেটসম্যানের ১৭ই আগস্টের শিরোনাম ছিল:

“India Keeping Watch On Events In Bangladesh : Grief Over Mujib’s Tragic Death” (বাংলাদেশের ঘটনার ওপর নজর রাখছে ভারত: মুজিবের দুঃখজনক মৃত্যুতে গভীর শোক)

সিআইএ (CIA) বিতর্ক ও মার্কিন ক্ষোভ

১৯শে আগস্ট কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় শিরোনাম করা হয় “বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শোকাহত”। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সংসদে এবং জনসভায় বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে গভীর ব্যক্তিগত শোক ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। কলকাতায় কংগ্রেস ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (CPI) উদ্যোগে এক বিশাল শোকসভার আয়োজন করা হয়। সেখানে কমিউনিস্ট নেতা ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত সরাসরি অভিযোগ তোলেন:

“মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং সিআইএ-র (Central Intelligence Agency) সরাসরি মদদ ও চক্রান্তে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে।”

এই খবরটি কলকাতার যুগান্তর পত্রিকাতেও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে একটি বিশেষ সম্পাদকীয়তে প্রকাশিত হয়। এই সংবাদ প্রকাশের পর কলকাতায় নিযুক্ত মার্কিন প্রতিনিধিরা চরম ক্ষুব্ধ হন। তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের কাছে গিয়ে আমেরিকার পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয় এবং দাবি করা হয় যে যুগান্তর পত্রিকাকে প্রথম পাতায় মার্কিন সরকারের কাছে ক্ষমা চেয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে।

মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় অত্যন্ত চতুরতার সাথে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু এর পর থেকেই রাইটার্স বিল্ডিং (পশ্চিমবঙ্গের সরকারি সদর দফতর) থেকে কলকাতার পত্রিকাগুলোকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে, বাংলাদেশ এবং মার্কিন চক্রান্ত বিষয়ক কোনো খবর ছাপার আগে অবশ্যই সরকারের উচ্চমহলের অনুমতি নিতে হবে। ফলে কলকাতার সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠও আংশিক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের আয়নায় পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডি

শুধু বাংলাদেশ বা ভারত নয়, সারা বিশ্বের প্রধান প্রধান পরাশক্তি ও তাদের সংবাদমাধ্যমগুলো এই হত্যাকাণ্ডকে তাদের নিজস্ব বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং শীতল যুদ্ধের (Cold War) সমীকরণ অনুযায়ী বিশ্লেষণ করেছিল।

১. দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian - যুক্তরাজ্য): বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বিস্তারিত এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান। ২৮শে আগস্ট সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ ও মার্টিন উলাকটের যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি এই পত্রিকার প্রধান সংবাদ হিসেবে প্রকাশিত হয়।

পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের ১৫ই আগস্ট লরেন্স লিফশুলৎজ আরেকটি দীর্ঘ বিশ্লেষণাত্মক নিবন্ধ লেখেন, যেখানে তিনি অত্যন্ত জোরালো তথ্যপ্রমাণসহ দেখান যে:

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সেনা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা সম্পর্কে আগে থেকেই বিস্তারিত জানত। ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অভ্যুত্থানের প্রায় ছয় মাস আগে থেকেই ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে নিয়মিত গোপন বৈঠকে বসতেন।

২. ওয়াশিংটন পোস্ট (Washington Post - যুক্তরাষ্ট্র): ১৬ই আগস্ট ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের নয়া দিল্লী প্রতিনিধির পাঠানো সংবাদ প্রকাশ করে। মার্কিন সরকারের মনোভাবের সাথে মিল রেখে তারা নতুন ক্ষমতা দখলকারী মুশতাক সরকারকে ‘ইসলামপন্থী এবং পশ্চিমা ঘরানার’ হিসেবে স্বাগত জানায়। পাশাপাশি তারা শেখ মুজিবুর রহমানকে একজন ‘বামপন্থী ও সমাজতান্ত্রিক ঘেঁষা রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে তকমা দেয়, যার পতন মার্কিন স্বার্থের জন্য অনুকূল ছিল।

৩. সোভিয়েত ইউনিয়নের সংবাদমাধ্যম (ইজভেস্তিয়া ও প্রাভদা): তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন এই ঘটনায় চরম বিব্রত ও ক্ষুব্ধ হয়েছিল। তবে প্রাতিষ্ঠানিক কূটনৈতিক কারণে তারা প্রথম দিকে কিছুটা সংযত ছিল।

ইজভেস্তিয়া (Izvestia): তারা ভেতরের পাতায় অত্যন্ত সংক্ষেপে ঘটনাটি প্রকাশ করে কোনো দীর্ঘ মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকে।

প্রাভদা (Pravda): সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র প্রাভদা কিন্তু তাদের ক্ষোভ লুকিয়ে রাখেনি। তারা লিখেছিল যে, বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী কোনো ‘প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি’ হয়তো এই পরিবর্তনের পেছনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।

৪. দ্য সানডে টাইমস (The Sunday Times - যুক্তরাজ্য): যুক্তরাজ্যের এই পত্রিকাটি প্রখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের একটি বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পেছনে মূলত তিনটি অভ্যন্তরীণ কারণ চিহ্নিত করেছিলেন:

সামরিক বাহিনীর প্রতি বঙ্গবন্ধুর এক ধরণের অবিশ্বাস এবং জাতীয় রক্ষীবাহিনীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। প্রশাসন ও সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কারণে রক্ষণশীল মহলে ইসলামের তথাকথিত অবনয়নের মিথ্যা প্রচারণা। বাকশাল গঠনের পর সাধারণ আমলাতন্ত্র ও জনগণের একটি অংশের সাথে নেতৃত্বের দূরত্ব সৃষ্টি।

৫. দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস (The New York Times - যুক্তরাষ্ট্র): হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ পর, ২৩শে আগস্ট দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের এক প্রতিবেদনে দূরদর্শী পূর্বাভাস দিয়ে লিখেছিল:

“শেখ মুজিবুর রহমানের এই দুঃখজনক উৎখাত হয়তো ঢাকাকে অচিরেই সোভিয়েত বলয় থেকে বের করে দিয়ে চীন এবং মার্কিন শিবিরের দিকে ধাবিত করবে।”

ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে, পরবর্তী দিনগুলোতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ঠিক এই পরিবর্তনটিই ঘটেছিল।

১৯৭১ বনাম ১৯৭৫ এবং ঘটনার আগে ও পরে গণমাধ্যমের আচরণের তুলনামূলক বিবরণ

নিচে বাংলাদেশের মূলধারার চার দৈনিকের ১৫ই আগস্টের (হত্যাকাণ্ডের আগে) এবং ১৬ই আগস্টের (হত্যাকাণ্ডের পরে) সংবাদ পরিবেশনের চরিত্র ও নৈতিক অবস্থানের একটি তুলনামূলক চিত্র ছক আকারে উপস্থাপন করা হলো:

সংবাদপত্রের নাম

১৫ই আগস্টের প্রধান শিরোনাম ও সুর

১৬ই আগস্টের প্রধান শিরোনাম ও সুর

সম্পাদকীয়র শিরোনাম ও অবস্থান

ঐতিহাসিক অবক্ষয় ও মন্তব্য

দৈনিক ইত্তেফাক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন কর্মসূচি এবং বঙ্গবন্ধুকে বরণ করে নেওয়ার দীর্ঘ সচিত্র প্রতিবেদন।



(সুর: অত্যন্ত ভক্তিপূর্ণ ও অনুগত)

“দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি উচ্ছেদ: খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর শাসনক্ষমতা গ্রহণ।”



(সুর: খুনিদের ক্ষমতার প্রশংসাকারী)

“ঐতিহাসিক নবযাত্রা”



(অবস্থান: অবৈধ সামরিক শাসনকে স্বাগত জানানো)

বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নির্মম হত্যার খবর আড়াল করে খুনি মুশতাককে রক্ষাকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার নিকৃষ্ট চেষ্টা।

দৈনিক বাংলা

বাকশাল জেলা সম্পাদকদের প্রশিক্ষণ নিয়ে “গ্রাম পর্যায়ে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।”



(সুর: উন্নয়নমুখী ও বাকশালের প্রচারক)

“খোন্দকার মুশতাক নয়া রাষ্ট্রপতি।” শোল্ডারে অতি সংক্ষেপে ছিল: “শেখ মুজিব নিহত।”



(সুর: নির্লিপ্ত ও নির্মম)

“ঐতিহাসিক পদক্ষেপ”



(অবস্থান: নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন বলে দাবি)

বঙ্গবন্ধুর টুঙ্গিপাড়ার দাফনের খবরটি মাত্র দুই লাইনে প্রকাশ করে চরম অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দেয়।

দ্য বাংলাদেশ অবজারভার

“Bangobandhu visits D.U. today” সহ প্রথম পাতার ৬টি সংবাদে সরাসরি ‘বঙ্গবন্ধু’ সম্বোধন।



(সুর: স্তুতিবাচক ও উন্নয়নকামী)

“Mushtaque becomes President” এবং নিচে ছোট হরফে “MUJIB KILLED”।



(সুর: চরম উদাসীন ও পশ্চিমা এজেন্ডাঘেঁষা)

“Historical Necessity”



(অবস্থান: বঙ্গবন্ধুর সরকারকে চরম ব্যর্থ ও স্বৈরাচারী প্রমাণ করার অপচেষ্টা)

লণ্ডনে কিছু ভাড়াটে বাঙালি কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর ছবি পোড়ানোর খবরটিকে প্রথম পাতায় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে।

দ্য বাংলাদেশ টাইমস

সমাবর্তন উপলক্ষে বিশেষ ক্রোড়পত্র এবং বঙ্গবন্ধুকে বরণ করার বিপুল আনন্দ উৎসবের সংবাদ।



(সুর: অতি-উৎসাহী চাটুকারিতা)

“MUSHTAQUE ASSUMES PRESIDENCY” এবং শোল্ডারে “Mujib killed”।



(সুর: সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনপন্থী)

“ON THE THRESHOLD OF A NEW ERA”



(অবস্থান: নতুন সামরিক শাসনকে এক নতুন সোনালী যুগের সূচনা বলা)

নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের সচিত্র পরিচিতি দিয়ে তাদের দেশের ‘ত্রাতা’ হিসেবে জাহির করার অপচেষ্টা।

ঢাকা থেকে বিদেশি সাংবাদিকদের বহিষ্কার ও ব্ল্যাকআউট

১৫ই আগস্টের পর খুনি চক্র এবং মোশতাক সরকার সবচেয়ে বড় যে ভয়টি পাচ্ছিল, তা হলো ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর, মিন্টো রোড এবং ধানমণ্ডির অন্যান্য জায়গায় যে নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে, তার সঠিক তথ্য যেন আন্তর্জাতিক মহলে না পৌঁছায়। এর জন্য তারা এক অভিনব ও নিষ্ঠুর কৌশল নেয়।

অপারেশন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল

সে সময় ঢাকায় আসা সমস্ত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অবস্থান করছিলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল-এ (বর্তমান ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা)। ১৫ই আগস্ট ভোরের পরপরই সেনাবাহিনীর একটি বড় দল ট্যাংক ও সাঁজোয়া গাড়ি নিয়ে হোটেলটি চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে।

বিবিসি, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP) এবং এএফপি (AFP)-র প্রায় ৩০ জন বিদেশি সাংবাদিককে হোটেলের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। তাদের রুমের টেলিফোন সংযোগ কেটে দেওয়া হয় এবং তেজগাঁও সেন্ট্রাল টেলিগ্রাম অফিস থেকে আন্তর্জাতিক তেলাক্স (Telex) লাইনের প্লাগ টেনে দেওয়া হয়, যাতে ঢাকা থেকে একটি শব্দও বাইরে না যেতে পারে।

জোরপূর্বক বহিষ্কার (Deportation)

১৬ই আগস্ট সকালের মধ্যে এই সমস্ত বিদেশি সাংবাদিকদের সামরিক ট্রাকে করে ঢাকা বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের সমস্ত নোটবুক, ক্যামেরার ফিল্ম এবং অডিও টেপ জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া হয়।

বিবিসির প্রখ্যাত সাংবাদিক ব্রায়ান ব্যারন (Brian Baron) পরবর্তীতে তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, সামরিক কর্মকর্তারা তাদের হুমকি দিয়ে বলেছিল যে যদি কোনো সাংবাদিক ঢাকা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানায় বা লুকিয়ে তথ্য পাঠানোর চেষ্টা করে, তবে তার নিরাপত্তার দায়িত্ব সেনাবাহিনী নেবে না। ১৬ই আগস্ট দুপুরের মধ্যে প্রায় সব বিদেশি সাংবাদিককে জোর করে করাচি বা ব্যাংককগামী বিমানে তুলে দিয়ে ঢাকাকে সম্পূর্ণ 'তথ্যশূন্য' করে ফেলা হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের রোমাঞ্চকর লড়াই ও তথ্য পাচার

মোশতাক সরকার ও ঘাতক চক্র ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল অবরুদ্ধ করে তেলাক্স ও ফোন লাইন কেটে দিলেও, সত্যকে বেশিদিন আটকে রাখা সম্ভব হয়নি। কিছু আন্তর্জাতিক সাংবাদিক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর উপায়ে ঢাকার নারকীয় হত্যাকাণ্ডের তথ্য সীমান্তের ওপাড়ে পাচার করেছিলেন।

রয়টার্স ও এপির গোপন কুরিয়ার সার্ভিস

১৬ই আগস্ট সকালে যখন সাংবাদিকদের জোরপূর্বক করাচি বা ব্যাংককে ডিপোর্ট (বহিষ্কার) করার প্রক্রিয়া চলছিল, তখন রয়টার্সের একজন স্থানীয় বাঙালি সহকারী অত্যন্ত চতুরতার সাথে একটি মাইক্রোফিল্ম ও লিখিত প্রতিবেদন তাঁর জুতার ভেতরে লুকিয়ে ফেলেন।

বেনাপোল সীমান্ত পাড়ি: তিনি ছদ্মবেশে লোকাল বাসে চড়ে ঢাকা থেকে রওনা হন এবং প্রায় ১৮ ঘণ্টার দীর্ঘ ও বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে যশোর হয়ে বেনাপোল সীমান্ত অতিক্রম করেন।

কলকাতা থেকে বিশ্ব কাঁপানো সংবাদ: ১৭ই আগস্ট সকালে তিনি কলকাতার হ্যারিসন রোডের একটি গোপন আস্তানা থেকে রয়টার্সের লণ্ডন অফিসে ট্র্যাজেডির বিস্তারিত চিত্র তেলাক্সের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেন। ১৮ই আগস্ট সকালে যখন বিশ্ববাসী জানতে পারে যে কেবল শেখ মুজিবুর রহমানই নন, তাঁর শিশুপুত্র রাসেল, অন্তসত্ত্বা আরজু মনি এবং পুরো পরিবারকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়েছে, তখন স্তম্ভিত হয়ে যায় পুরো বিশ্ব।

নিউজরুমে বন্দুকের নল: ১৬ই আগস্টের পত্রিকা যেভাবে তৈরি হয়েছিল

১৬ই আগস্টের যে পত্রিকাগুলোর তোষামোদি শিরোনাম আজ আমরা দেখছি, সেগুলো কিন্তু স্বাভাবিক পরিবেশে লেখা হয়নি। ১৫ই আগস্ট দুপুর থেকেই দৈনিক বাংলা, ইত্তেফাক এবং অবজারভার কার্যালয়ে অবস্থান নিয়েছিল সশস্ত্র সেনাদল।

তাহেরউদ্দিন ঠাকুরের প্রত্যক্ষ সেন্সরশিপ

খুনি চক্রের অন্যতম প্রধান বেসামরিক ষড়যন্ত্রকারী এবং মোশতাক সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুর নিজে বেতার কেন্দ্র এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন। ১৬ই আগস্টের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম কী হবে, শোল্ডারে কী লেখা থাকবে এবং সম্পাদকীয়র ভাষা কেমন হবে তা তাহেরউদ্দিন ঠাকুর নিজে ড্রাফট (খসড়া) করে পত্রিকা অফিসগুলোতে পাঠিয়েছিলেন।

কোনো কোনো প্রবীণ সাংবাদিক পরবর্তীতে স্বীকার করেছেন, নিউজরুমে সাব-এডিটররা যখন কাঁপানো হাতে নিউজ লিখছিলেন, তখন তাদের পেছনে স্টেনগান নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ল্যান্স নায়েক পদমর্যাদার সৈন্যরা। যেকোনো সামান্যতম ভুল বা বঙ্গবন্ধুর প্রতি সহানুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটলে পুরো পত্রিকা অফিস উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

শাহবাগের বেতার কেন্দ্র দখল এবং সামরিক বাহিনীর আনুগত্য প্রকাশের নাটক

১৫ই আগস্ট ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই ঘাতক চক্রের প্রথম টার্গেট ছিল তৎকালীন ঢাকা বেতার কেন্দ্র (যা শাহবাগে অবস্থিত ছিল)। বেতারের দখল নেওয়ার পরই খুনিরা বুঝেছিল, কেবল বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করলেই ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করা যাবে না, যদি না দেশের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মুখ দিয়ে নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করানো যায়।

বন্দুকের নলে সেনা প্রধানদের বক্তব্য আদায়

১৫ই আগস্ট দুপুরের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার, নৌবাহিনী প্রধান কমোডোর এম এইচ খান এবং বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেলস) প্রধান মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানকে জোরপূর্বক বেতার কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়।

সেখানে তাঁদের মাথায় স্টেনগান ঠেকিয়ে খসড়া কাগজ ধরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁরা অত্যন্ত ভারী ও কম্পিত কণ্ঠে নতুন রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক আহমদের সরকারের প্রতি তাঁদের অনুগত থাকার ঘোষণা রেকর্ড করতে বাধ্য হন। এই ঘোষণাগুলো রেডিওতে প্রচার হওয়ার সাথে সাথেই সারাদেশে অবস্থানরত প্রতিরোধকারী সাধারণ সেনাসদস্য এবং মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ভেঙে পড়ে। কারণ তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, দেশের পুরো সামরিক নেতৃত্বই এখন খুনি চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

ভয়াল সেই মুহূর্তের বিবরণ: পরবর্তীতে সেনাপ্রধান সফিউল্লাহ তাঁর জবানবন্দিতে বলেছিলেন, বেতার স্টুডিওর ভেতরে ঘাতক মেজর ডালিম ও রশীদ হাত গ্রেনেড নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। একটু এদিক-ওদিক হলেই পুরো বেতার কেন্দ্র উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিল তারা।

আকাশবাণী কলকাতা ও দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্তব্ধতা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ভরসার জায়গা ছিল আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র এবং সংবাদ পাঠক দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৭১-এ তাঁর বজ্রকণ্ঠ বাঙালিদের যেভাবে উজ্জীবিত করত, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর সেই আকাশবাণীই পরিণত হয়েছিল শোকের মাতমে।

সংবাদ প্রচারের সংকট: ১৫ই আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসের কারণে ভারতের সরকারি অফিস-আদালত বন্ধ ছিল। কিন্তু দুপুরের দিকে যখন গোয়েন্দা সূত্রে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে খবর পৌঁছায় যে শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে, তখন আকাশবাণীর নিয়মিত অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং কেবল শোকাবহ ধ্রুপদী সঙ্গীত (Classical Music) বাজানো হতে থাকে।

দেবদুলালের কান্না: ১৭ই আগস্ট যখন প্রথম বিশদ সংবাদ আকাশবাণীতে পড়া হয়, তখন সংবাদ পড়তে গিয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৭১ সালের যে মহানায়ককে নিয়ে তিনি অজস্র বিজয়ের সংবাদ পড়েছেন, আজ তাঁরই নির্মম মৃত্যুর খবর পড়তে গিয়ে তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছিল। ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার সেন্সরশিপের কারণে আকাশবাণী সরাসরি রাজনৈতিক মন্তব্য করতে না পারলেও, তাদের শোকের আবহ স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে ভারত তার সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে হারিয়েছে।

কলকাতার সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী মহলের নীরব হাহাকার

পশ্চিমবঙ্গে তৎকালীন ভারত সরকারের জারিকৃত জরুরি অবস্থার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ বিষয়ে কড়া সেন্সরশিপ থাকলেও, কলকাতার লেখক ও বুদ্ধিজীবী সমাজ এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ভেতর থেকে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন।

অন্নদাশঙ্কর রায়ের সেই ঐতিহাসিক অনুশোচনা: ১৯৭১ সালে কবি অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত লাইন: “যতকাল রবে পদ্মা মেঘনা গৌরী যমুনা বহমান / ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।”

কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর এই পরম বন্ধুর মৃত্যুতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তৎকালীন ভারত সরকারের কড়া নজরদারির মধ্যেই তিনি কলকাতার এক ঘরোয়া সাহিত্যসভায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন:

“বাঙালি তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সন্তানকে হত্যা করেছে। এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত বাঙালিকে আরও এক শতাব্দী ধরে করতে হবে।”

কলকাতার কফি হাউজ ও বুদ্ধিজীবী মহলে তখন শোক ও ক্ষোভের এক নীরব ছায়া নেমে এসেছিল। অনেক কবি ছদ্মনামে ছোট ছোট লিফলেট ও অনিয়মিত সংকলন (Little Magazine) বের করে বঙ্গবন্ধু হত্যার তীব্র নিন্দা ও ঘৃণা প্রকাশ করেছিলেন, যা পরবর্তীতে ইতিহাসের অত্যন্ত মূল্যবান দলিলে পরিণত হয়।

বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-র ভিজ্যুয়াল সেন্সরশিপ

বেতারের মতো বাংলাদেশ টেলিভিশনও (বিটিভি) ১৫ই আগস্ট সকাল থেকেই খুনিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সে সময় টেলিভিশন ছিল সাদা-কালো (Monochrome)।

প্রতিকৃতি অপসারণ: বিটিভির রামপুরা স্টুডিওতে থাকা বঙ্গবন্ধুর সমস্ত বড় ছবি এবং দেয়ালচিত্র ১৫ই আগস্ট দুপুরের মধ্যে টেনে-হিঁচড়ে নামানো হয় এবং ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়।

স্ক্রিন কালার ও পোশাকের কোড: বিটিভির সংবাদ পাঠক ও ঘোষিকাদের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে কেউ কালো বা শোকের পোশাক পরতে পারবেন না। রঙিন বা জমকালো পোশাক পরে পর্দায় আসতে হতো, যাতে বিশ্বকে দেখানো যায় যে দেশে কোনো শোকের পরিবেশ নেই, বরং পরিস্থিতি অত্যন্ত 'স্বাভাবিক ও আনন্দময়'। সংবাদের ব্যাকগ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধুর লোগো বা 'জয় বাংলা' মনোগ্রামটি সরিয়ে সেখানে কেবল একটি জ্যামিতিক নকশা বসানো হয়েছিল।

১৫ই আগস্ট থেকে ২০শে আগস্ট পর্যন্ত গণমাধ্যমের ব্ল্যাকআউট টাইমলাইন

তারিখ (১৯৭৫)

গণমাধ্যমের ধরন

গৃহীত পদক্ষেপ ও সেন্সরশিপের রূপ

নেপথ্যের মূল কুশীলব

১৫ই আগস্ট (ভোর)

রাষ্ট্রীয় বেতার

'বাংলাদেশ বেতার' নাম পরিবর্তন করে 'রেডিও বাংলাদেশ' করা। 'জয় বাংলা' স্লোগান ও রবীন্দ্রসংগীত চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা।

মেজর ডালিম ও মেজর শাহরিয়ার রশিদ

১৫ই আগস্ট (দুপুর)

আন্তর্জাতিক মিডিয়া

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল অবরুদ্ধকরণ। তেলাক্স ও আন্তর্জাতিক ফোন লাইন বিচ্ছিন্নকরণ।

খুনি চক্রের ফিল্ড কমান্ডারেরা

১৬ই আগস্ট (সকাল)

জাতীয় সংবাদপত্র

৪টি প্রধান দৈনিকে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিবরণ সম্পূর্ণ চেপে গিয়ে খোন্দকার মোশতাকের ক্ষমতা গ্রহণকে 'ঐতিহাসিক আবশ্যকতা' বলে প্রচার।

তাহেরউদ্দিন ঠাকুর (তথ্য প্রতিমন্ত্রী)

১৬ই আগস্ট (দুপুর)

বিদেশি সাংবাদিক

বিবিসি, রয়টার্স ও এপির সাংবাদিকদের জোরপূর্বক ঢাকার বাইরে ডিপোর্ট বা বহিষ্কার করা।

ঢাকা সামরিক প্রশাসন

১৭ই আগস্ট (সকাল)

ভারতীয় গণমাধ্যম

ভারতের জরুরি অবস্থার সেন্সরশিপের মধ্যেই কলকাতার আনন্দবাজার ও যুগান্তর পত্রিকায় শেখ মুজিবের সপরিবারে হত্যার বিস্তারিত খবর ও শোক প্রকাশ।

ইন্দিরা গান্ধী সরকার ও ভারতীয় প্রেস সেন্সর

১৯শে আগস্ট

আন্তর্জাতিক কূটনীতি

যুগান্তর পত্রিকায় 'সিআইএ' জড়িত থাকার খবর প্রকাশের পর মার্কিন দূতাবাসের তীব্র চাপ ও কলকাতায় প্রেস সেন্সরশিপ আরও কঠোর করা।

সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় (মুখ্যমন্ত্রী, প.বঙ্গ)

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের ভিন্ন সুর ও 'সিআইএ' তত্ত্ব

লরেন্স লিফশুলৎজ যখন ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান-এ মার্কিন চক্রান্তের কথা ফাঁস করেন, তখন আমেরিকার ভেতরের কিছু সংবাদমাধ্যমও এই নিয়ে তদন্ত শুরু করে।

পরবর্তীতে জানা যায়, ১৯৭৫ সালের মার্চ মাস থেকেই (হত্যাকাণ্ডের ৫ মাস আগে) ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের পলিটিক্যাল অফিসার ফিলিপ চেরি (Philip Cherry)-র সাথে খুনি ফারুক এবং রশিদের একাধিক গোপন বৈঠক হয়েছিল। মার্কিন পত্রিকাগুলো তখন একে 'ডিপ স্টেট' (Deep State) বা সিআইএ-র নিজস্ব এজেন্ডা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল, যা তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে জানতেনই না। ওয়াশিংটন পোস্টের মতো পত্রিকাগুলো এই ঘটনাকে কম্যুনিজম বা সোভিয়েত বলয়ের বিরুদ্ধে আমেরিকার একটি বড় 'কূটনৈতিক বিজয়' হিসেবেই পরোক্ষভাবে চিত্রায়িত করেছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিক্লাসিফাইড ক্যাবলস ও মিডিয়া গেম

পরবর্তী সময়ে উইকিলিকস এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবমুক্তকৃত (Declassified) ক্যাবল বা গোপন নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৫ই আগস্টের ক্যু এবং মিডিয়ার ভূমিকা আগে থেকেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নখদর্পণে ছিল।

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের নীরবতা ও সমর্থন: ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার (Davis Eugene Boster) ১৫ই আগস্ট সকাল ১০টার মধ্যেই ওয়াশিংটনে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে একটি অত্যন্ত গোপন জরুরি বার্তা পাঠান। সেই বার্তায় তিনি লেখেন:

“বাংলাদেশে একটি সফল সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে। শেখ মুজিব নিহত হয়েছেন। নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে খোন্দকার মোশতাক আহমদ দায়িত্ব নিয়েছেন। পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ শান্ত এবং নতুন সরকার কঠোরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে।”

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এই ক্যাবল পাওয়ার পরই তাদের বিশ্বস্ত গণমাধ্যমগুলোকে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ দেয় যাতে তারা এই অভ্যুত্থানকে একটি ‘অনিবার্য ঘটনা’ এবং ‘সমাজতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্রের অবসান’ হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে। এটি ছিল তৎকালীন স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের এক চরম ভূ-রাজনৈতিক মিডিয়া গেম।

১৯৭৫ সালের আগস্টের এই মিডিয়া ব্ল্যাকআউটের ইতিহাস আমাদের শেখায় কীভাবে স্বৈরাচার ও বন্দুকের নলের সামনে সত্যকে সাময়িকভাবে কবর দেওয়া হয়।

ইতিহাস বিকৃতির ২১ বছর (১৯৭৫-১৯৯৬)

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর থেকে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসার পূর্ববর্তী ২১ বছর ছিল বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও পাঠ্যপুস্তকে এক ইতিহাসের পদ্ধতিগত বিনাশের যুগ (Systematic Erasure of History)।

১. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস - BSS): রাষ্ট্রীয় এই প্রধান সংবাদ সংস্থাটির আর্কাইভ থেকে বঙ্গবন্ধুর হাজার হাজার ছবি, বক্তৃতা, ৭ই মার্চের ভাষণের অডিও রেকর্ড এবং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক নথিপত্র সুপরিকল্পিতভাবে পুড়িয়ে ও ডিলিট করে ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

২. পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ইতিহাস বিকৃতি: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) থেকে প্রকাশিত ইতিহাসের বইগুলোতে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটিই মুছে ফেলা হয়। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডিত ইতিহাস পড়ানো হতো, যেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো উল্লেখ থাকত না। স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বকে সম্পূর্ণ আড়াল করে অন্যান্য গৌণ চরিত্রগুলোকে মহিমান্বিত করার এক নির্লজ্জ রাষ্ট্রীয় প্রয়াস চালানো হয়েছিল।

৩. ডকুমেন্টারি ও সিনেমা সেন্সরশিপ: চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এমন কোনো তথ্যচিত্র বা চলচ্চিত্রকে সেন্সর ছাড়পত্র দেওয়া যাবে না যেখানে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্বর, তাঁর ৭ই মার্চের ভাষণ কিংবা তাঁর অবয়ব দেখা যায়। ফলে প্রায় দুই প্রজন্ম বাংলাদেশের স্বাধীনতার আসল নায়ক কে ছিলেন, সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভুল ও বিকৃত তথ্য জেনে বড় হয়েছিল।

ইতিহাসের বিচার ও গণমাধ্যমের চিরন্তন শিক্ষা

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের এই ঐতিহাসিক চরিত্রহনন আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান শিক্ষা। এটি প্রমাণ করে যে, সম্পাদকীয় নীতিমালা ও পেশাদারিত্ব যদি কেবল শাসকের ভয়ে বা ক্ষমতার লোভে নির্ধারিত হয়, তবে সত্য কতটা অবহেলিত হতে পারে।

বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে সেদিন সাংবাদিকতার যে নৈতিক মৃত্যু ঘটেছিল, তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। কিন্তু ইতিহাসের নিজস্ব একটা গতি আছে। বন্দুকের জোরে সাময়িকভাবে সংবাদপত্র বা বেতারের কণ্ঠ রোধ করা গেলেও, সত্যকে চিরতরে মুছে ফেলা যায় না। যার প্রমাণ আজ দীর্ঘ বছর পরেও ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে খুনি খোন্দকার মুশতাক আর তার স্তাবকেরা; অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে এবং ইতিহাসের পাতায় ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ হিসেবে সগৌরবে আসীন রয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Jun 22, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে কেবল হাজার বছরের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন; দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কীভাবে এই ভূষিত রূপটি একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। কবে, কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রত্যক্ষ ভোটে শেখ মুজিব এই অনন্য খেতাব অর্জন করেছিলেন? সেই ঐতিহাসিক জরিপে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা সহযোগী অন্যান্য বাঙালি শ্রেষ্ঠরাই বা কারা ছিলেন?

May 8, 2026

/

Post by

১৬ই ডিসেম্বর ঢাকা মুক্ত হলেও বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বড় এলাকা এবং বিচ্ছিন্নভাবে আরও কিছু পাকিস্তানি সেনাঘাঁটি ও তাদের অনুগত মিলিশিয়া বা রাজাকারদের অবস্থান তখনো আত্মসমর্পণ করেনি। তারা ঢাকার বুকে এক একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো টিকে ছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বিপজ্জনক অবস্থানটি ছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক ভবন যেখানে বন্দি ছিলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার।

Mar 7, 2026

/

Post by

৭ই মার্চের ভাষণ কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়; এটি একটি জাতির জন্মসনদ, একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর মুক্তির মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের সেই পড়ন্ত বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বজ্রকণ্ঠ ঘোষণা করেছিলেন, তা আজ ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য ঐতিহ্য।

Feb 2, 2026

/

Post by

বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় একটি বিতর্ক প্রায়শই ডান-বাম বা বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী থেকে ছুড়ে দেওয়া হয় "মুজিব তো স্বাধীনতা চাননি, তিনি চেয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে।" এই একটি বাক্যকে কেন্দ্র করে গত পাঁচ দশকে বহু আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু আমরা যদি ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করি এবং ১৯৭০-এর নির্বাচনের প্রকৃত জনআকাঙ্ক্ষা বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যাবে এই অভিযোগটি আসলে কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়, বরং এটি ছিল একটি আইনি ও গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের চূড়ান্ত পর্যায়।

Jan 25, 2026

/

Post by

বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনে যে সিদ্ধান্তটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি তর্ক-বিতর্ক ও চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়, তা হলো 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' তথা বাকশাল গঠন। বঙ্গবন্ধু বাকশাল নামে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। একদলীয় এই শাসনব্যবস্থাকে কেউ দেখেন দেশ বাঁচানোর অন্তিম চেষ্টা হিসেবে, আবার কেউ দেখেন গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করার একনায়কতান্ত্রিক পদক্ষেপ হিসেবে।

Jan 10, 2026

/

Post by

ইতিহাসের মহাকাব্যিক ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ১টা ৪১ মিনিট। তেজগাঁও বিমানবন্দরের আকাশে একটি ব্রিটিশ রাজকীয় কমেট বিমান দেখা যাচ্ছে। নিচে কয়েক লক্ষ মানুষের উত্তাল সমুদ্র। সেই বিমানে করে ফিরে আসছেন এমন এক ব্যক্তি, যাঁর অনুপস্থিতিতে একটি দেশ স্বাধীন হয়েছে, যাঁর নামে ৭ কোটি মানুষ (তৎকালীন সময়ে) জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছে। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে মৃত্যুর প্রহর গুনে তিনি ফিরছেন তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে।

Jun 22, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে কেবল হাজার বছরের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন; দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কীভাবে এই ভূষিত রূপটি একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। কবে, কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রত্যক্ষ ভোটে শেখ মুজিব এই অনন্য খেতাব অর্জন করেছিলেন? সেই ঐতিহাসিক জরিপে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা সহযোগী অন্যান্য বাঙালি শ্রেষ্ঠরাই বা কারা ছিলেন?

May 8, 2026

/

Post by

১৬ই ডিসেম্বর ঢাকা মুক্ত হলেও বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বড় এলাকা এবং বিচ্ছিন্নভাবে আরও কিছু পাকিস্তানি সেনাঘাঁটি ও তাদের অনুগত মিলিশিয়া বা রাজাকারদের অবস্থান তখনো আত্মসমর্পণ করেনি। তারা ঢাকার বুকে এক একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো টিকে ছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বিপজ্জনক অবস্থানটি ছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক ভবন যেখানে বন্দি ছিলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার।

Mar 7, 2026

/

Post by

৭ই মার্চের ভাষণ কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়; এটি একটি জাতির জন্মসনদ, একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর মুক্তির মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের সেই পড়ন্ত বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বজ্রকণ্ঠ ঘোষণা করেছিলেন, তা আজ ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য ঐতিহ্য।

Feb 2, 2026

/

Post by

বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় একটি বিতর্ক প্রায়শই ডান-বাম বা বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী থেকে ছুড়ে দেওয়া হয় "মুজিব তো স্বাধীনতা চাননি, তিনি চেয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে।" এই একটি বাক্যকে কেন্দ্র করে গত পাঁচ দশকে বহু আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু আমরা যদি ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করি এবং ১৯৭০-এর নির্বাচনের প্রকৃত জনআকাঙ্ক্ষা বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যাবে এই অভিযোগটি আসলে কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়, বরং এটি ছিল একটি আইনি ও গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের চূড়ান্ত পর্যায়।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.