ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ - একটি তর্জনী ও একটি জাতির জেগে ওঠা
৭ই মার্চের ভাষণ কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়; এটি একটি জাতির জন্মসনদ, একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর মুক্তির মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের সেই পড়ন্ত বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বজ্রকণ্ঠ ঘোষণা করেছিলেন, তা আজ ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য ঐতিহ্য।

TruthBangla

Mar 7, 2026
৭ই মার্চের ভাষণ কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়; এটি একটি জাতির জন্মসনদ, একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর মুক্তির মহাকাব্য। ১৯৭১ সালের সেই পড়ন্ত বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বজ্রকণ্ঠ ঘোষণা করেছিলেন, তা আজ ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য ঐতিহ্য।
আজকের এই বিস্তারিত ব্লগে আমরা আলোচনা করব ৭ই মার্চের ভাষণের পটভূমি, এর গূঢ় রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, কৌশলগত দিক এবং কীভাবে এই ১৮ মিনিটের একটি ভাষণ একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র যোদ্ধায় রূপান্তরিত করেছিল।
একটি তর্জনী ও একটি জাতির জেগে ওঠা
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ। ঢাকার আকাশ-বাতাস তখন উত্তাল। চারদিকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান আর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। রেসকোর্স ময়দানে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। লক্ষ লক্ষ মানুষের চোখেমুখে তখন একটাই প্রশ্ন বঙ্গবন্ধু আজ কী বলবেন? পাকিস্তান সরকারের শোষণ, বৈষম্য আর টালবাহানায় দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া একটি জাতির সামনে তিনি দাঁড়ালেন। তাঁর পরনে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি আর কালো মুজিব কোট।
তিনি যখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন, তখন তাঁর হাতে কোনো লিখিত কাগজ ছিল না। ছিল কেবল তেইশ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস আর হৃদয়ে মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। তিনি শুরু করলেন সেই অমোঘ শব্দগুলো দিয়ে "আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি..."
ঐতিহাসিক ৭ মার্চের পূর্ণাঙ্গ ভাষণ
আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বুঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে।
আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। কী অন্যায় করেছিলাম, নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করব এবং এই দেশকে আমরা গড়ে তুলব, এ দেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, তেইশ বৎসরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। তেইশ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু নর–নারীর আর্তনাদের ইতিহাস; বাংলার ইতিহাস এ দেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করে দশ বৎসর পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলনে ৭ই জুনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯-এর আন্দোলনে আইয়ুব খানের পতন হওয়ার পর যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, তিনি বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন, গণতন্ত্র দেবেন। আমরা মেনে নিলাম।
তারপরে অনেক ইতিহাস হয়ে গেল, নির্বাচন হলো। আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি, শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাঁকে অনুরোধ করলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, প্রথম সপ্তাহে মার্চ মাসে হবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে, আমরা অ্যাসেম্বলিতে বসব। আমি বললাম, অ্যাসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করব; এমনকি আমি এ পর্যন্ত বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজনও যদি সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।
জনাব ভুট্টো সাহেব এখানে এসেছিলেন, আলোচনা করলেন। বলে গেলেন যে আলোচনার দরজা বন্ধ না, আরও আলোচনা হবে। তারপর অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ করলাম, আপনারা আসুন বসুন, আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করি। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা যদি এখানে আসেন, তাহলে কসাইখানা হবে অ্যাসেম্বলি। তিনি বললেন, যে যাবে তাকে মেরে ফেলে দেওয়া হবে। যদি কেউ অ্যাসেম্বলিতে আসে তাহলে পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত দোকান জোর করে বন্ধ করা হবে। আমি বললাম, অ্যাসেম্বলি চলবে। তারপর হঠাৎ ১ তারিখে অ্যাসেম্বলি বন্ধ করে দেওয়া হলো।
ইয়াহিয়া খান সাহেব প্রেসিডেন্ট হিসাবে অ্যাসেম্বলি ডেকেছিলেন। আমি বললাম যে, আমি যাব। ভুট্টো সাহেব বললেন, তিনি যাবেন না। ৩৫ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে আসলেন। তারপরে হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হলো। দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। বন্দুকের মুখে মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল।
আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে আপনারা হরতাল পালন করেন। আমি বললাম, আপনারা কলকারখানা সবকিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ সাড়া দিল। আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। তারা শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো।
মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ্।
কী পেলাম আমরা? যে আমার পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরিব-দুঃখী আর্ত মানুষের বিরুদ্ধে, তার বুকের উপর হচ্ছে গুলি। আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু। আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি, তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। টেলিফোনে আমার সঙ্গে তাঁর কথা হয়। তাঁকে আমি বলেছিলাম, জনাব ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কীভাবে আমার গরিবের উপরে, আমার বাংলার মানুষের উপরে গুলি করা হয়েছে, কী করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে। আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন। তিনি বললেন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ১০ তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স ডাকব।
আমি বলেছি, কিসের বৈঠক বসবে, কার সঙ্গে বসব? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে, তাদের সঙ্গে বসব? হঠাৎ আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে পাঁচ ঘণ্টা গোপনে বৈঠক করে যে বক্তৃতা তিনি করেছেন, সমস্ত দোষ তিনি আমার উপরে দিয়েছেন, বাংলার মানুষের উপর দিয়েছেন।
ভাইয়েরা আমার, ২৫ তারিখে অ্যাসেম্বলি কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি ১০ তারিখে বলে দিয়েছি যে ওই শহীদের রক্তের উপর পা দিয়ে কিছুতেই মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না। অ্যাসেম্বলি কল করেছে। আমার দাবি মানতে হবে: প্রথম, সামরিক আইন মার্শাল ল উইথ ড্র করতে হবে, সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে, যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে, আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে । তারপর বিবেচনা করে দেখব, আমরা অ্যাসেম্বলিতে বসতে পারব কি পারব না। এর পূর্বে অ্যাসেম্বলিতে বসতে আমরা পারি না।
আমি, আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই যে আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি, আদালত-ফৌজদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সে জন্য সমস্ত অন্যান্য জিনিসগুলো আছে, সেগুলির হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা, গরুর গাড়ি চলবে, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে; শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি গভর্নমেণ্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদা কোনো কিছু চলবে না।
২৮ তারিখে কর্মচারীরা বেতন নিয়ে আসবেন। এর পরে যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে, এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দমাতে পারবে না।
আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগের থেকে যদ্দুর পারি তাদের সাহায্য করতে চেষ্টা করব। যারা পারেন আমার রিলিফ কমিটিতে সামান্য টাকাপয়সা পৌঁছিয়ে দেবেন। আর এই সাত দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইরা যোগদান করেছেন, প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাঁদের বেতন পৌঁছায়ে দেবেন। সরকারি কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো, কেউ দেবে না। মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটপাট করবে। এই বাংলায় হিন্দু মুসলমান বাঙালি অবাঙালি যারা আছে, তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে। আমাদের যেন বদনাম না হয়। মনে রাখবেন রেডিও টেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনেন, তাহলে কোনো বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, কোনো বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না। দুই ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাদের মায়নাপত্র নিবার পারে। কিন্তু পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ব বাংলায় চলবে এবং বিদেশের সঙ্গে নিউজ পাঠাতে চালাবেন। কিন্তু যদি এ দেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালিরা বুঝে–শুনে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা
তেইশ বছরের শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস
বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বারবার ‘তেইশ বছরের’ কথা উল্লেখ করেছেন। এই তেইশ বছর (১৯৪৭-১৯৭০) ছিল বাঙালির ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণের কাল।
১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন: পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রথম আঘাত আসে আমাদের মায়ের ভাষার ওপর। রক্ত দিয়ে বাঙালি প্রমাণ করে তারা মাথা নত করবে না।
১৯৫৪-এর নির্বাচন: যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয়ের পর বাঙালির ক্ষমতায় বসার কথা থাকলেও ষড়যন্ত্র করে তা নস্যাৎ করা হয়।
১৯৫৮-এর সামরিক শাসন: আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেন এবং দশ বছর ধরে চলে শোষণ।
১৯৬৬-এর ছয় দফা: বঙ্গবন্ধু বাঙালির বাঁচার দাবি ‘ছয় দফা’ পেশ করেন। একে বলা হয় বাঙালির ‘ম্যাগনা কার্টা’। এর ফলেই শুরু হয় ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান: ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনে আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং বঙ্গবন্ধু জেল থেকে মুক্তি পান।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ৩১৩টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন লাভ করার অর্থ ছিল বাঙালির হাতে পাকিস্তানের শাসনভার আসা। কিন্তু ইয়াহিয়া খান এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করেন। ৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকার কথা থাকলেও ১লা মার্চ তা হঠাৎ স্থগিত করা হয়। এই স্থগিতাদেশ ছিল বাঙালির পিঠে ছুরিকাঘাতের মতো।
উত্তাল মার্চ ও অসহযোগ আন্দোলনের ডাক
১লা মার্চের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তান কার্যত অচল হয়ে পড়ে। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসে। ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুরে পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালায়। বাঙালির রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। এই প্রেক্ষাপটেই বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চে জনসভার ডাক দেন।
অনেকে ধারণা করেছিলেন তিনি হয়তো সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতা। তিনি এমনভাবে স্বাধীনতার ডাক দিলেন যাতে তাকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে অভিযুক্ত করা না যায়, আবার বাঙালির সামনে গন্তব্যও পরিষ্কার থাকে।
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন: "আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি তাঁকে অনুরোধ করলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা।"
বঙ্গবন্ধু শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক পন্থায় সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শাসকগোষ্ঠী ছিল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
৭ই মার্চের ভাষণের রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণ
বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণটি পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘ইমপ্রম্পটু’ (পূর্বপ্রস্তুতিহীন) বক্তৃতা। এর প্রতিটি শব্দ ছিল মাপা এবং প্রতিটি বাক্য ছিল গভীর অর্থবহ।
১. গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতা: বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট বলেছিলেন, "যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজনও যদি সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।" এটি ছিল তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের গণতান্ত্রিক আদর্শের বহিঃপ্রকাশ।
২. অসহযোগ আন্দোলনের রূপরেখা: তিনি কেবল আবেগঘন বক্তৃতা দেননি, বরং একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও দিয়েছিলেন।
ট্যাক্স-খাজনা বন্ধের ঘোষণা।
অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ।
ব্যাংক এবং রেল চলাচল নিয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা।
এটি ছিল মূলত একটি সমান্তরাল সরকার বা ‘শ্যাডো গভর্নমেন্ট’ চালানোর ঘোষণা। তিনি জানতেন, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যেকোনো সময় হামলা করতে পারে, তাই তিনি সাধারণ মানুষকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন।
৩. চার দফা দাবি: অ্যাসেম্বলিতে যোগ দেওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু চারটি শর্ত আরোপ করেন:
সামরিক আইন (Martial Law) প্রত্যাহার করতে হবে।
সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে।
তদন্ত করতে হবে নির্বিচারে হত্যার।
জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
"প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল" - যুদ্ধের প্রস্তুতি
ভাষণের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অংশ ছিল যখন তিনি যুদ্ধের আহ্বান জানালেন। তিনি জানতেন, শান্তিপূর্ণ আলোচনার দিন শেষ হয়ে আসছে। তাই তিনি বজ্রকণ্ঠে বললেন:
"তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে... আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব।"
এটি ছিল গেরিলা যুদ্ধের একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত। তিনি সাধারণ মানুষকে নির্দেশ দিলেন যার কাছে যা আছে লাঠি, বল্লম কিংবা স্রেফ মনের জোর তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে। তিনি নিজের অনুপস্থিতিতেও নেতৃত্ব যাতে থেমে না থাকে, সেজন্য বললেন, "আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।"
মানবিকতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি
বঙ্গবন্ধুর ভাষণে কেবল বিদ্রোহ ছিল না, ছিল গভীর মানবিক বোধ। তিনি পাকিস্তানি সেনাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, "তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না।" তিনি রক্তপাত এড়াতে চেয়েছিলেন।
একই সঙ্গে তিনি এই ভূখণ্ডের বৈচিত্র্য রক্ষা করার তাগিদ দিয়েছিলেন। তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, "এই বাংলায় হিন্দু মুসলমান বাঙালি অবাঙালি যারা আছে, তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে।" এক উত্তাল যুদ্ধের মুহূর্তেও এমন অসাম্প্রদায়িক ও উদার মানসিকতা কেবল বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই সম্ভব ছিল।
৭ই মার্চের ভাষণের বিশ্বজনীন স্বীকৃতি
বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ কেবল বাংলাদেশের সম্পদ নয়, এটি এখন সারা বিশ্বের সম্পদ।
ইউনেস্কো স্বীকৃতি (Memory of the World): ২০১৭ সালের ৩০শে অক্টোবর, ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণকে ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ বা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটি 'মেমোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার'-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কেন এই ভাষণ অনন্য? বিশ্বের ইতিহাসে অনেক বিখ্যাত ভাষণ আছে আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ অ্যাড্রেস, মার্টিন লুথার কিং-এর ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ কিংবা উইনস্টন চার্চিলের ‘উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস’। তবে ৭ই মার্চের ভাষণ অনন্য কারণ: এটি ছিল সম্পূর্ণ অলিখিত। এটি একটি জনসমুদ্রের সামনে দেওয়া জীবন্ত নির্দেশনা। এই ভাষণের মাত্র ১৮ দিন পরেই শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। এটি একটি ভূখণ্ডের মানুষকে একটি স্বাধীন জাতিসত্তায় রূপান্তর করেছিল।
অবিনাশী মহাকাব্যের শেষ কথা
৭ই মার্চের ভাষণের শেষ বাক্য দুটি ছিল একটি জাতির ভাগ্যলিপি: "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা!"
এই কয়েকটা শব্দ সাত কোটি বাঙালিকে একটি মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল। এরপর ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে যখন বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, তখন বাঙালি আর সাধারণ মানুষ ছিল না; তারা হয়ে উঠেছিল অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা।
আজ এত বছর পরেও যখন সেই বজ্রকণ্ঠ বেজে ওঠে, তখন আমাদের শরীরের রক্তে নাচন শুরু হয়। এটি কেবল একটি বক্তৃতা নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, ততদিন ৭ই মার্চের এই অবিনাশী মহাকাব্য বাঙালির হৃদয়ে প্রজ্জ্বলিত থাকবে।













