বিনা অস্ত্রে বিনা যুদ্ধে যেভাবে উদ্ধার হয়েছিল বঙ্গবন্ধু পরিবার
১৬ই ডিসেম্বর ঢাকা মুক্ত হলেও বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বড় এলাকা এবং বিচ্ছিন্নভাবে আরও কিছু পাকিস্তানি সেনাঘাঁটি ও তাদের অনুগত মিলিশিয়া বা রাজাকারদের অবস্থান তখনো আত্মসমর্পণ করেনি। তারা ঢাকার বুকে এক একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো টিকে ছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বিপজ্জনক অবস্থানটি ছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক ভবন যেখানে বন্দি ছিলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় ও রক্তস্নাত দিন। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ এবং ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এই ঐতিহাসিক দিনের সকালে ঢাকার পাকিস্তানি সামরিক শিবিরের জন্য অপেক্ষা করছিল এক চরম বিস্ময় ও আতঙ্কের মুহূর্ত।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল গন্ধর্ব সিং নাগরা পাকিস্তানি ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল এ এ কে নিয়াজিকে একটি সংক্ষিপ্ত অথচ চূড়ান্ত চিরকুট পাঠান। চিরকুটের বার্তাটি ছিল পরিষ্কার ও অমোঘ। নাগরা লিখেছিলেন:
"প্রিয় আব্দুল্লাহ, আমি এখানে এসে গেছি। তোমার খেলা শেষ। আমি তোমাকে পরামর্শ দিচ্ছি, তুমি নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করো এবং আমি তোমার দায়িত্ব নেব।"
এই চিরকুট পাওয়ার পর পাকিস্তানি শিবিরে চরম শোরগোল পড়ে যায়। পরবর্তীতে দুই পক্ষ এক জরুরি বৈঠকে বসে। ভারতীয় সামরিক কমান্ড বারবার পাকিস্তানি জেনারেলদের মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে, যদি তারা দ্রুত আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত না নেয় এবং জেনারেল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন 'কাদেরিয়া বাহিনী' কিংবা বীর মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকায় ঢুকে পড়ে, তবে পাকিস্তানি সেনাদের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। উত্তেজিত ও ক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে তাদের বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এর পরের ইতিহাস আমাদের সবারই জানা। ক্ষুব্ধ মুক্তিকামী জনতা ও মুক্তিবাহিনীর ভয়ে পাকিস্তানি বাহিনী তড়িঘড়ি করে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করে। পাকিস্তানি হাই কমান্ড মূলত তার আগের দিনই, অর্থাৎ ১৫ই ডিসেম্বরই যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ জারি করেছিল। কিন্তু ১৬ই ডিসেম্বরের সেই নিয়মতান্ত্রিক আত্মসমর্পণের পরও বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অন্ধকার ও রুদ্ধশ্বাস অধ্যায়ের অবসান ঘটতে তখনো বাকি ছিল।
১৬ই ডিসেম্বর ঢাকা মুক্ত হলেও বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি বড় এলাকা এবং বিচ্ছিন্নভাবে আরও কিছু পাকিস্তানি সেনাঘাঁটি ও তাদের অনুগত মিলিশিয়া বা রাজাকারদের অবস্থান তখনো আত্মসমর্পণ করেনি। তারা ঢাকার বুকে এক একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো টিকে ছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বিপজ্জনক অবস্থানটি ছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক ভবন যেখানে বন্দি ছিলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বর: জিম্মি দশা ও দুর্ভেদ্য পাকিস্তানি দুর্গ
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, ঠিক তার প্রথম প্রহরেই ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবন থেকে বন্দি করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তাঁকে বন্দি করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলেও তাঁর পরিবারকে ঢাকাতেই অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। বিশেষ করে যুদ্ধের শেষ দিকে এই ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটিকে পাকিস্তানি বাহিনী একটি দুর্ভেদ্য সামরিক দুর্গে পরিণত করে।

বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে সেনা অবস্থান
বহুতল নিরাপত্তা ও বাংকার বিন্যাস
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কয়েক স্তরের কঠোর নিরাপত্তা বলয় সাজিয়েছিল। বাড়িটির কৌশলগত অবস্থান এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেন দূর থেকে কোনো মুক্তিবাহিনী বা ভারতীয় সেনা সেখানে প্রবেশ করতে না পারে:
ছাদের বাংকার: বাড়ির ছাদে বালির বস্তা স্তূপ করে বাংকারের মতো তৈরি করা হয়েছিল। এর ভেতরে স্থাপন করা হয় অত্যন্ত শক্তিশালী ও ভারী মেশিনগান।
টেরাসের প্রতিরক্ষা: বাড়ির টেরাস বা বারান্দাগুলোতেও বাংকার খুঁড়ে পাকিস্তানি সেনারা সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছিল।
গেটের ভারী অস্ত্র: প্রধান প্রবেশদ্বারের ঠিক পাশেই বসানো হয়েছিল ভারী ও স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়ান্ত্র।
পার্শ্ববর্তী অবস্থান: শুধু মূল বাড়িই নয়, আশেপাশের সড়ক ও মোড়গুলোতেও বেশ কয়েকটি মেশিনগান পোস্ট স্থাপন করে পুরো এলাকাটিকে একটি যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ দেওয়া হয়েছিল।
মুজিব পরিবারের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা
এই দুর্ভেদ্য দুর্গের ভেতরে সম্পূর্ণ গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু পরিবারকে। কাগজে-কলমে এটিকে 'গৃহবন্দি' বলা হলেও বাস্তবিক অর্থে তাঁরা ছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হিউম্যান শিল্ড বা জিম্মি। ভেতরের বন্দিদের মধ্যে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা (যিনি তখন তাঁর দুগ্ধপোষ্য শিশুসন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়কে কোলে নিয়ে দিন পার করছিলেন), কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। প্রতি মুহূর্তে এই পরিবারটিকে গ্রাস করে নিচ্ছিল এক চরম আতঙ্ক। বাইরে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণ আর ভেতরে উন্মত্ত পাকিস্তানি সেনাদের হিংস্র চাহনি সব মিলিয়ে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল বাড়িটিতে।
বিচ্ছিন্ন সেনাদলের মনস্তত্ত্ব ও কমান্ড কাঠামোর ভাঙন
ধানমন্ডির এই বাড়িতে অবস্থান নেওয়া পাকিস্তানি সেনাদের মনস্তত্ত্ব বোঝা অত্যন্ত জরুরি। এই সেনাদলটির ওপর কঠোর নির্দেশ ছিল যে, যেকোনো মূল্যে এই এলাকার প্রতিরক্ষা ধরে রাখতে হবে এবং তাদের এই অবস্থান ছেড়ে বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে ১৬ই ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে কী ঘটে গেছে, বাইরের জগত কীভাবে মুক্ত হয়েছে সে সম্পর্কে এই সেনারা ছিল সম্পূর্ণ অন্ধকারে।
প্রোপাগান্ডা ও ব্রেনওয়াশ
অন্যান্য সাধারণ পাকিস্তানি সেনাদের মতোই, ধর্মের দোহাই এবং উগ্র জাতীয়তাবাদের নামে মিথ্যা বুলি ব্যবহার করে এই সেনাদের মগজ ধোলাই (Brainwash) করা হয়েছিল। তাদের বোঝানো হয়েছিল যে তারা এক পবিত্র যুদ্ধ লড়ছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখভাগে থাকা পাকিস্তানি সেনারা যখন মুক্তিযোদ্ধাদের অদম্য সাহস আর ভারতীয় সেনাবাহিনীর কামানের গোলা দেখছিল, তখন তারা দ্রুতই বুঝতে পেরেছিল যে তাদের দিয়ে কেবল নিরীহ মানুষ হত্যা করানো হচ্ছে এবং তাদের পরাজয় নিশ্চিত। কিন্তু ধানমন্ডির এই সেনাদলটি ছিল বিশ্ব থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন। যার কারণে বাইরের পরাজয়ের খবর না পাওয়ায় তারা তাদের আগ্রাসী ও অহংকারী মনোভাব পূর্ণমাত্রায় ধরে রেখেছিল।
কমান্ডারদের পলায়ন ও নেতৃত্বের শূন্যতা
১৬ই ডিসেম্বর যখন ঢাকায় আত্মসমর্পণ চলছিল, ঠিক তার দুই-তিন দিন আগেই ধানমন্ডির এই সেনাদলের কমান্ডিং অফিসার অত্যন্ত কাপুরুষের মতো নিজের অধীনস্থ সেনাদের ফেলে রেখে লাপাত্তা হয়ে যান। এদিকে বেতার বা ওয়্যারলেস যোগাযোগ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় তারা উপর মহল থেকে আত্মসমর্পণের কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশও পায়নি। এশিয়ার স্বঘোষিত 'শ্রেষ্ঠ বাহিনী'র সিনিয়র অফিসাররা যখন নিজেদের পিঠ বাঁচাতে জুনিয়রদের মৃত্যুর মুখে ফেলে পালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন এই দিকবিদিক জ্ঞানহীন সেনাদের হাতে বন্দি ছিল পুরো বঙ্গবন্ধু পরিবার। এই নেতৃত্বের শূন্যতাই পরিস্থিতিকে আরও শতগুণ বিপজ্জনক করে তুলেছিল।
১৬ই তারিখ দুপুর থেকে ঢাকার আকাশে ঘনঘন ভারতীয় বিমান এবং রাস্তায় উল্লাসিত মুক্তিবাহিনীর চলাচল দেখে তারা কিছুটা আঁচ করতে পারছিল যে পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। মুক্তিবাহিনীও ততক্ষণে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছিল। কিন্তু সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস কেউ পাচ্ছিল না। কারণ, খুলনায় তখনো আত্মসমর্পণ না করা পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে তীব্র যুদ্ধ চলছিল। আর এখানে ধানমন্ডির হিসাবটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। এখানে অস্ত্র বা বীরত্বের চেয়ে ঠান্ডা মাথার কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের দরকার ছিল সবচেয়ে বেশি। পাকিস্তানি সেনাদের মেজাজ সামান্য বিগড়ে গেলেই বা সামান্যতম সন্দেহের উদ্রেক হলেই তারা ভেতরের পুরো পরিবারকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করতে পারত।
মেজর অশোক কুমার তারা ও ১৪ গার্ড কোম্পানি
ঠিক এই চরম সংকটের মুহূর্তে নাটকের প্রধান চরিত্রের মতো আবির্ভাব ঘটে এক তরুণ ভারতীয় সামরিক অফিসারের। তিনি হলেন ১৪ গার্ড কোম্পানির কোম্পানি কমান্ডার মেজর অশোক কুমার তারা (যিনি পরবর্তীতে কর্নেল হিসেবে অবসর নেন)।
গঙ্গাসাগরের বীরত্ব ও 'বীর চক্র'
মেজর অশোক কুমার তারা ছিলেন একজন খাঁটি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উঠে আসা যোদ্ধা। ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক এলাকা 'গঙ্গাসাগর'-এ তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ পরিচালনা করেন। গঙ্গাসাগরে এমন কোনো সপ্তাহ ছিল না যখন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়নি। সেই ভয়াবহ যুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব, রণকৌশল এবং সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে এই তরুণ অফিসার ভারতের সম্মানজনক সামরিক পদক 'বীর চক্র' (Vir Chakra) উপাধিতে ভূষিত হন।

সযত্নে রাখা সেই ছবি
বীরের প্রোফাইল: মেজর অশোক কুমার তারা কেবল একজন অস্ত্রধারী সৈনিক ছিলেন না, বরং তাঁর ছিল মানুষের মনস্তত্ত্ব পড়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গঙ্গাসাগরে নিজের জীবন বাজি রেখে লড়াই করা এই তরুণ অফিসার জানতেন, কখন অস্ত্র চালাতে হয় আর কখন শত্রুর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হয়।
১৭ই ডিসেম্বরের জরুরি তলব
১৭ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ সাল। ঢাকা তেজগাঁও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক সার্বিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই ১৪ গার্ড কোম্পানিকে। মেজর অশোক তারা তখন বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যস্ত। এমন সময় ব্যাটালিয়নের কমান্ডার বিজয় কুমার চান্নার কাছে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন বাংলাদেশের এক শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতা। তিনি অত্যন্ত আবেগতাড়িত ও আতঙ্কিত কণ্ঠে জানান যে, ঢাকা মুক্ত হলেও বঙ্গবন্ধু পরিবার এখনো ধানমন্ডির বাড়িতে বন্দি এবং তাঁদের পাহারা দেওয়া পাকিস্তানি সেনারা চরম হিংস্র আচরণ করছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে।
কমান্ডার বিজয় কুমার চান্না তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি অনুধাবন করেন এবং মেজর অশোক তারাকে ডেকে পাঠান। নির্দেশ আসে যেকোনো মূল্যে মুজিব পরিবারকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে হবে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর তখন তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে মাত্র ২০ মিনিটের দূরত্বে। মেজর অশোক তারা আর সময় নষ্ট করেননি। তিনি সেই রাজনৈতিক নেতা এবং মাত্র ৩ জন ভারতীয় জওয়ানকে সাথে নিয়ে একটি জিপে চেপে ধানমন্ডির উদ্দেশ্যে রওনা হন।
রক্তহীন অভিযান ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
মেজর অশোক তারা যখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের কাছাকাছি পৌঁছান, তখন চারপাশের পরিবেশ ছিল থমথমে। স্থানীয় মুক্তিবাহিনী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা তাঁদের জানান যে, আগের দিন রাতেও এক নারীসহ ৫ জন সাধারণ মানুষকে এই বাড়ির পাকিস্তানি সেনারা গুলি করে হত্যা করেছে। এমনকি আত্মসমর্পণ চুক্তির পর এই সীমানা ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করায় একজন বিদেশি সাংবাদিকের গাড়ি লক্ষ্য করেও তারা নির্বিচারে গুলি চালায়। গাড়ির ভেতরেই পড়ে ছিল সেই গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া সাংবাদিকের রক্তাক্ত মরদেহ।
এই তথ্য জানার পর মেজর তারা বুঝতে পারেন যে, এখানে অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করতে গেলে ভেতরের বন্দিদের বাঁচানো সম্ভব হবে না। তিনি এক অভাবনীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর নিজের হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি সাথে থাকা ভারতীয় জওয়ানের হাতে তুলে দেন। নিজের জওয়ানদের নির্দেশ দেন পেছনের কভারে থাকার জন্য।
মৃত্যুর মুখোমুখি সেই একক যাত্রা
মেজর অশোক তারা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায়, দুই হাত উঁচুতে তুলে একাই রাস্তা পার হয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করেন। এই দৃশ্য দেখে বাড়ির ছাদ ও বাংকার থেকে পাকিস্তানি সেনারা চিৎকার করে হুঁশিয়ারি দেয় আর এক পা এগোলেই সরাসরি গুলি করা হবে। ছাদ থেকে তাক করা মেশিনগানটি একবার ফায়ার শুরু করলে সেই খোলা রাস্তায় অশোক তারার কভার নেওয়ার মতো কোনো জায়গা পর্যন্ত ছিল না। কিন্তু তিনি থামেননি।
তিনি অত্যন্ত জোরালো ও গম্ভীর গলায় উর্দুতে কথা বলতে শুরু করেন। তিনি জানান যে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন দায়িত্বশীল অফিসার এবং তিনি এখানে কোনো অস্ত্র ছাড়া সম্পূর্ণ শান্তিকামী আলোচনা করতে এসেছেন। তিনি চিৎকার করে বলেন:
"আমি এখানে অস্ত্র ছাড়া এসেছি কারণ তোমাদের পুরো বাহিনী অলরেডি ১৬ই ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করেছে। তোমরা যদি বিশ্বাস না করো, তবে তোমাদের অফিসারের কাছ থেকে জেনে নাও।"
এই কথা শোনার পর ভেতরের সেনাদের মধ্যে এক ধরণের গুঞ্জন তৈরি হয়। তখনই তারা স্বীকার করে যে তাদের কোনো অফিসার নেই, সবাই তাদের ফেলে পালিয়ে গেছে এবং তাদের রেডিও যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন। ঠিক এই সময়ে অশোক তারা আকাশের দিকে আঙুল তুলে দেখান, যেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার উড়ে যাচ্ছিল। তিনি কিন্তু কথা বলতে বলতে অনবরত গেটের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তাঁর হাঁটা এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি।
অশোক তারা খুব চমৎকারভাবে পাকিস্তানি সেনাদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে খেলতে শুরু করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই সাধারণ সৈন্যরাও আসলে বাঁচতে চায়। তিনি তাদের বলেন:
"তোমরা যদি আত্মসমর্পণ করো, তবে আমি ভারতীয় অফিসার হিসেবে কথা দিচ্ছি, তোমাদের নিরাপদে তোমাদের দেশে, তোমাদের পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হবে। তোমরা আবার তোমাদের মা, স্ত্রী আর সন্তানদের মুখ দেখতে পারবে। কিন্তু তোমরা যদি এই পরিবারটির কোনো ক্ষতি করো, তবে বাইরে যে হাজার হাজার মুক্তিবাহিনী ঘিরে রেখেছে, তারা তোমাদের একজনকেও জ্যান্ত কবর দেবে। আত্মসমর্পণ ছাড়া তোমাদের বেঁচে থাকার আর কোনো রাস্তা নেই।"
এখানে উল্লেখ্য যে, পাকিস্তানি সেনাদের মনে এক তীব্র ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, তারা যদি বাঙালিদের কাছে বা মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে, তবে তাদের জেনেভা কনভেনশন (Geneva Convention) অনুযায়ী কোনো অধিকার দেওয়া হবে না এবং তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হবে। অশোক তারা তাদের এই ভীতি দূর করেন এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জীবনের নিরাপত্তা গ্যারান্টি দেন।
চূড়ান্ত ক্ষণ এবং অলৌকিক উদ্ধার
কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে মেজর অশোক তারা একদম মূল ফটকের সামনে পৌঁছে যান। কিন্তু পরিস্থিতি তখনো সম্পূর্ণ শান্ত হয়নি। গেটে থাকা প্রধান সেন্ট্রি বা পাহারাদার সেনাটি অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে তার বন্দুকের নলের অগ্রভাগ সরাসরি মেজর তারার বুকের ওপর ঠেকিয়ে দেয়। বন্দুকের ট্রিগারে থাকা আঙুলটি সামান্য একটু নড়ে উঠলেই ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। অশোক তারা চোখ বন্ধ করে জীবনের শেষ মুহূর্তের জন্য ঈশ্বরের নাম জপছিলেন এবং গুলির অপেক্ষা করছিলেন।
অন্ধকারের মাঝে আলোর চিৎকার: ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন বন্দুকের নল অশোক তারার বুকে ঠেকানো, বাড়ির ভেতরের একটি জানালা দিয়ে এক নারীর আর্তচিৎকার ভেসে আসে। তিনি চিৎকার করে বলছিলেন, “আপনি যদি আমাদের না বাঁচান তবে ওরা আমাদের নিশ্চিত মেরে ফেলবে।”
এই নারী কণ্ঠটি আর কারো নয়, এটি ছিল স্বয়ং বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের। এই আর্তচিৎকার শোনার পর মেজর অশোক তারা নিজের মনের ভেতর এক নতুন ও অভাবনীয় উদ্যম ফিরে পান। তিনি বুঝতে পারেন, এখন তাঁর হেরে যাওয়া চলবে না। এই অসহায় পরিবারটিকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতেই হবে।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ছাদের ওপর থাকা প্রধান সেন্ট্রির সাথে চোখের চোখ রেখে কথা বলতে থাকেন এবং একপর্যায়ে আলতো করে নিজের হাত দিয়ে বুক থেকে বন্দুকের নলটি সরিয়ে ফেলেন। তাঁর এই অদম্য সাহস আর যৌক্তিক কথার সামনে পাকিস্তানি সেনাদের দীর্ঘদিনের ধোলাই করা মগজের দেয়াল তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। তারা বুঝতে পারে যে আত্মসমর্পণই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ। শেষ পর্যন্ত বাড়ির ভেতরে থাকা ১০-১২ জন পাকিস্তানি সেনা তাদের ভারী অস্ত্র মাটিতে নামিয়ে রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে মেজর অশোক তারার কাছে আত্মসমর্পণ করে। মেজর তারা অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে তাদের নিরস্ত্রীকরণ সম্পন্ন করেন এবং তাদের সুরক্ষিতভাবে সামরিক ব্যারাকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
ঘরের ভেতরে বেগম মুজিবের সেই অশ্রুসজল আলিঙ্গন
পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্র জমা দিয়ে চলে যাওয়ার পর মেজর অশোক কুমার তারা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সেই ঐতিহাসিক ও জীর্ণ বাড়িতে প্রবেশ করেন। দীর্ঘ ৯ মাসের বন্দিত্ব ও প্রতি মুহূর্তের মৃত্যুর আতঙ্ক থেকে মুক্ত হয়ে পরিবারের সদস্যরা তখনো কাঁপছিলেন।
বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথেই বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি প্রথাগত সামরিক দূরত্বের তোয়াক্কা না করে এই তরুণ ভারতীয় অফিসারকে জড়িয়ে ধরেন এবং অশ্রুসজল চোখে বলেন:
"তুমি আমার পোলা বাবা। তুমি আজ আমাদের নতুন জীবন দিলে।"
মেজর তারার নিজস্ব স্মৃতিকথা ও বর্ণনা অনুযায়ী, সেই সময় বাড়ির ভেতরের অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। বাড়ির ভেতরে কোনো বিলাসবহুল আসবাবপত্র অবশিষ্ট ছিল না, পাকিস্তানি সেনারা প্রায় সবকিছুই ভাঙচুর বা লুটপাট করেছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের হবু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা এবং পরিবারের বাকি সবাই মেঝের ওপর সাধারণ চাদর বিছিয়ে ঘুমাতেন। দীর্ঘ কয়েকদিন ধরে তাদের কোনো ভালো খাবার দেওয়া হয়নি। পুরো পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ ছিল কিছু শুকনো বিস্কুট আর পানি। এই চরম অবমাননাকর ও জিম্মি দশা থেকে মাত্র ২০ মিনিটের এক মনস্তাত্ত্বিক ও রক্তহীন যুদ্ধের মাধ্যমে পুরো পরিবারকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন এই বীর সেনা।
ইতিহাস ও পদকের একটি সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক টাইমলাইন ছক
এই পুরো রোমাঞ্চকর ও ঐতিহাসিক ঘটনার মূল তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এবং কালানুক্রমিক বিবরণ নিচে একটি বিস্তারিত ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
সুনির্দিষ্ট তারিখ ও সময় | স্থান / অবস্থান | প্রধান চরিত্রসমূহ | ঐতিহাসিক ঘটনা ও রণকৌশলগত গুরুত্ব |
১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ (সকাল) | পাক সামরিক সদর দফতর, ঢাকা | মেজর জেনারেল গন্ধর্ব সিং নাগরা, জেনারেল এ এ কে নিয়াজি | জেনারেল নাগরার ঐতিহাসিক চিরকুট লাভ। নিয়াজিকে রেসকোর্সে আত্মসমর্পণের জন্য মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি। |
১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ (দুপুর) | রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা | যৌথ কমান্ড ও পাকিস্তানি হাই কমান্ড | ঢাকায় মূল পাকিস্তানি বাহিনীর ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ। তবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে ধানমন্ডির পকেট পজিশন আত্মসমর্পণ করেনি। |
১৭ই ডিসেম্বর ১৯৭১ (সকাল) | তেজগাঁও বিমানবন্দর, ঢাকা | মেজর অশোক কুমার তারা, ক্যাপ্টেন বিজয় কুমার চান্না | বিমানবন্দর পাহারায় থাকা ১৪ গার্ড কোম্পানির কাছে বাংলাদেশী রাজনৈতিক নেতার আগমন ও মুজিব পরিবারের জিম্মি দশার খবর প্রদান। |
১৭ই ডিসেম্বর ১৯৭১ (সকাল ১০:১৫) | ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকা | মেজর অশোক তারা, ৩ জন জওয়ান, ১ জন বাংলাদেশী নেতা | তেজগাঁও থেকে জিপে করে ধানমন্ডিতে আগমন। চারপাশে মুক্তিবাহিনীর অবরোধ এবং পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে নিহত সাংবাদিকের মরদেহ দর্শন। |
১৭ই ডিসেম্বর ১৯৭১ (সকাল ১০:৩০) | ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের মূল ফটক | মেজর অশোক তারা, পাকিস্তানি সেন্ট্রি ও ছাদের সেনাদল | অশোক তারার অস্ত্রহীন পদযাত্রা। বুকে বন্দুকের নল ঠেকালেও উর্দুতে মনস্তাত্ত্বিক আলোচনা ও জেনেভা কনভেনশনের নিশ্চয়তা প্রদান। |
১৭ই ডিসেম্বর ১৯৭১ (সকাল ১০:৪৫) | বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের ভেতর | বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা | ১০-১২ জন পাকিস্তানি সেনার আত্মসমর্পণ। বেগম মুজিব কর্তৃক অশোক তারাকে 'পোলা' (পুত্র) সম্বোধন ও আলিঙ্গন। |
জানুয়ারি ১৯৭২ | ঢাকা ও মিজোরাম | বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, অশোক তারা | বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরার আগেই অশোক তারার মিজোরামে প্রত্যাবর্তন। পরে ঢাকায় তাঁদের ঐতিহাসিক পুনর্মিলন। |
২০১২ সাল | ঢাকা, বাংলাদেশ | প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কর্নেল (অব.) অশোক তারা | বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক এই বীর সেনাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে 'মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা পদক' প্রদান। |
অশোক তারার জবানবন্দিতে মৃত্যুর মুখোমুখি
মেজর অশোক তারা যখন তাঁর অস্ত্রটি জওয়ানের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে একা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করেন, তখন সেই পথটুকু পার হতে তাঁর সময় লেগেছিল মাত্র ১৪ মিনিট। কিন্তু অশোক তারা পরবর্তীতে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তাঁর জীবনের এই ১৪ মিনিটকে তাঁর কাছে ১৪ বছরের চেয়েও দীর্ঘ মনে হয়েছিল।
উন্মত্ত সেন্ট্রির ট্রিগারে আঙুল: গেটের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর যে পাকিস্তানি সেন্ট্রি তাঁর বুকে বন্দুক ঠেকিয়েছিল, সে প্রচণ্ড কাঁপছিল। সে অনবরত উর্দুতে বলছিল, "আগে মাত আও, গুলি চালা দুঙ্গা" (সামনে এসো না, গুলি করে দেব)। অশোক তারা বুঝতে পেরেছিলেন, সেনাটি তীব্র ভয়ে ভুগছে। আর যুদ্ধবিদ্যায় জানা কথা ভীত সৈনিক সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক, কারণ সে যেকোনো মুহূর্তে অবচেতনভাবেই ট্রিগার চেপে দিতে পারে।
চোখের ভাষা পড়ার কৌশল: অশোক তারা সেন্ট্রির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে কথা বলছিলেন। তিনি তাঁর গলার স্বরকে রাগান্বিত বা আদেশসূচক না করে অত্যন্ত শান্ত ও সহানুভূতিশীল (Empathetic) রেখেছিলেন, যাতে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে শত্রু না ভেবে একজন উদ্ধারকর্তা বা সহায়তাকারী হিসেবে অবলোকন করে।
বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার সাথে পুনর্মিলন এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের এই সফল রক্তহীন অভিযানের পর মেজর অশোক তারা বেশিদিন বাংলাদেশে অবস্থান করেননি। সামরিক আদেশের কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে (১০ই জানুয়ারি, ১৯৭২) প্রত্যাবর্তন করার আগেই তিনি তাঁর ব্যাটালিয়নের সাথে ভারতের মিজোরামে ফেরত যান।
পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু যখন জানতে পারেন যে একজন তরুণ ভারতীয় মেজর নিজের জীবন বাজি রেখে তাঁর পরিবারকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন, তখন তিনি অশোক তারাকে বিশেষভাবে স্মরণ করেন। পরবর্তীতে অশোক তারা পুনরায় বাংলাদেশে আসেন এবং ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সেই বাড়িতেই শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে এক আবেগঘন সাক্ষাৎ ও বৈঠকে মিলিত হন। বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন।
২০১২ সালের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা
ইতিহাসের চাকা ঘুরে যায়। ১৯৭১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর যে দুগ্ধপোষ্য শিশু জয়কে কোলে নিয়ে শেখ হাসিনা বন্দি অবস্থায় অশোক তারার হাত ধরে মুক্ত হয়েছিলেন, সেই শেখ হাসিনা পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘ চার দশক পর হলেও এই বীর সেনার অবদানকে ভুলে যায়নি। ২০১২ সালে (স্বাধীনতার ৪১ বছর পর, রাষ্ট্রীয় সম্মাননার ধারাবাহিকতায়) বাংলাদেশ সরকার কর্নেল (অব.) অশোক কুমার তারাকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানায় এবং তাঁকে সম্মানজনক 'মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা পদক' (Friends of Liberation War Honour) প্রদান করে।
ইতিহাসের বৃত্তের পূর্ণতা: সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে উপস্থিত থেকে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে ১৯৭১ সালের ১৭ই ডিসেম্বরের সেই রুদ্ধশ্বাস সকালের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন কীভাবে এই ভারতীয় বীর কোনো অস্ত্র ছাড়াই কেবল সাহসের ওপর ভর করে তাঁদের পুরো পরিবারকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন।
অশোক তারা পরবর্তীতে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, এত বছর পরেও এবং রাষ্ট্রীয় এত ব্যস্ততার মাঝেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও দেশের মানুষ যে তাঁকে এবং তাঁর ভারতীয় সহযোদ্ধাদের বীরত্বকে মনে রেখেছেন, এতেই তাঁর সৈনিক জীবনের সবচেয়ে বড় তৃপ্তি ও পাওনা।
শেখ হাসিনার স্মৃতিচারণ
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরবর্তীতে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এবং স্মৃতিচারণামূলক লেখায় ১৭ই ডিসেম্বরের সেই সকালের ভয়ংকর পরিস্থিতির বিবরণ দিয়েছেন।
শিশুসন্তানের কান্না ও খাবারের সংকট: বাড়ির ভেতরে তখন মাত্র ৫ মাস বয়সী শিশু সজীব ওয়াজেদ জয়। পাকিস্তানি সেনারা দুধ বা বাচ্চার প্রয়োজনীয় খাবার পর্যন্ত ভেতরে সরবরাহ করতে দিচ্ছিল না। ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকা মুক্ত হওয়ার পর যখন পুরো শহর উল্লাস করছিল, তখনো এই বাড়ির ভেতরে বন্দিরা ভাবছিলেন তারা হয়তো বিজয়ের ঠিক পরমুহূর্তে পাকিস্তানি সেনাদের শেষ আক্রোশের শিকার হয়ে মারা যাবেন।
জানালার ফাঁক দিয়ে দেখা সেই দৃশ্য: শেখ হাসিনা তাঁর স্মৃতিচারণে বলেছিলেন, তাঁরা জানালার ফাঁক দিয়ে দেখতে পাচ্ছিলেন একজন তরুণ ভারতীয় সেনা অফিসার একাই বুক চিতিয়ে কোনো অস্ত্র ছাড়া বাড়ির দিকে হেঁটে আসছেন, আর ছাদ থেকে পাকিস্তানিরা মেশিনগান তাক করে আছে। সেই দৃশ্যটি তাঁদের মনে একাধারে তীব্র আতঙ্ক এবং অলৌকিক আশার আলো সঞ্চার করেছিল।
পাকিস্তানি বন্দীদের উত্তেজিত জনতার হাত থেকে বাঁচানো
মেজর অশোক তারার বীরত্ব কেবল মুজিব পরিবারকে উদ্ধার করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তিনি বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করার ঠিক পরমুহূর্তেও।
ক্ষুব্ধ মুক্তিবাহিনীর মুখোমুখি: পাকিস্তানি সেনারা যখন অস্ত্র ফেলে গেট খুলে বাইরে আসে, তখন বাড়ির চারপাশে ঘিরে থাকা শত শত ক্ষুব্ধ জনতা এবং স্থানীয় মুক্তিবাহিনী তাদের ওপর চড়াও হতে চেয়েছিল। ৯ মাসের ক্ষোভ ও আগের রাতে নিরীহ মানুষকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে জনতা তখন উন্মত্ত।
জেনেভা কনভেনশনের মর্যাদা রক্ষা: অশোক তারা তখন এক অভূতপূর্ব কাণ্ড করেন। তিনি পাকিস্তানি সেনাদেরকে নিজের পেছনে দাঁড় করান এবং উত্তেজিত জনতার সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "এরা এখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর যুদ্ধবন্দী (POW)। এদের গায়ে হাত তোলার অর্থ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর আঘাত করা।" তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিলেন এবং পাকিস্তানি সেনাদের অক্ষত অবস্থায় নিরাপদ ক্যাম্পে পৌঁছে দিয়েছিলেন। এটি ছিল সামরিক নৈতিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
২০১৭ সালে মোদী-হাসিনা-অশোক তারা ত্রয়ী
২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে 'মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা' দিলেও, ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় নয়া দিল্লিতে এক অভূতপূর্ব আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়।

নয়া দিল্লির মানেকশ সেন্টারে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যৌথভাবে ১৯৭১ সালের ভারতীয় শহীদ ও প্রবীণ সৈনিকদের সম্মাননা জানান। সেখানে কর্নেল (অব.) অশোক কুমার তারা যখন মঞ্চে ওঠেন, তখন শেখ হাসিনা প্রটোকল ভেঙে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে শেখ হাসিনা উপস্থিত বিশ্ব মিডিয়া ও দর্শকদের সামনে নিজে মাইক নিয়ে ১৭ই ডিসেম্বরের সেই রোমহর্ষক গল্পটি পুনরুল্লেখ করেন এবং অশোক তারার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
যুদ্ধ-পরবর্তী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সাথে আজীবন বন্ধুত্ব
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সেই ঘটনার পর শেখ হাসিনার স্বামী, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সাথে অশোক তারার এক গভীর ও স্থায়ী ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল।
ভারতে নির্বাসনকালে (১৯৭৫-১৯৮১) যখন শেখ হাসিনার পরিবার দিল্লিতে পান্ডারা পার্কের ফ্ল্যাটে থাকতেন, তখনো অশোক তারা (যিনি তখনো সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন) গোপনে ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে ড. ওয়াজেদ মিয়ার সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং তাঁদের খোঁজখবর নিতেন। ড. ওয়াজেদ মিয়া তাঁর লেখা 'বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ' বইটিতেও মেজর অশোক তারার এই অনন্য অবদানের কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে লিপিবদ্ধ করে গেছেন।
অশোক তারার সামরিক ক্যারিয়ার ও পদকের সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল
বিষয় | বিবরণ ও তথ্য |
পুরো নাম | কর্নেল (অব.) অশোক কুমার তারা (Ashok Kumar Tara) |
যোগদানকৃত রেজিমেন্ট | ১৪ গার্ডস, ভারতীয় সেনাবাহিনী (14 Guards, Indian Army) |
প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র (১৯৭১) | গঙ্গাসাগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), আখাউড়া এবং ঢাকা। |
অর্জিত ভারতীয় পদক | 'বীর চক্র' (Vir Chakra) – গঙ্গাসাগরের যুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য। |
অর্জিত বাংলাদেশী পদক | 'মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা' (২০১২) – বঙ্গবন্ধু পরিবারকে অক্ষত উদ্ধারের জন্য। |
বিশেষ সামরিক কৌশল | বিনা অস্ত্রে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Psy-Ops) এবং আলোচনা। |
রক্তহীন বিজয়ের চিরন্তন শিক্ষা
১৯৭১ সালের ১৭ই ডিসেম্বরের ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের এই উদ্ধার অভিযানটি সামরিক ইতিহাসের এক অনন্য ও ক্লাসিক উদাহরণ। সাধারণত সামরিক বাহিনী মানেই আমরা বুঝি অস্ত্রের গর্জন, কামানের গোলা আর রক্তের নদী। কিন্তু মেজর অশোক কুমার তারা প্রমাণ করেছিলেন যে, সঠিক সময়ে সঠিক মনস্তাত্ত্বিক কৌশল, মানবিক মূল্যবোধ এবং অদম্য ব্যক্তিগত সাহসের মাধ্যমে একটি বুলেটও না ফুটিয়ে, এক ফোঁটা রক্তও না ঝরিয়ে কত বড় ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করা সম্ভব।
এই রক্তহীন উদ্ধার অভিযানের সাফল্য যদি সেদিন না আসত, তবে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অন্ধকারাচ্ছন্ন হতে পারত। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ তুলির আঁচড়ে মেজর অশোক কুমার তারার এই অস্ত্রহীন পদযাত্রা এক অবিনাশী ও সোনালী অধ্যায় হিসেবে চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবে।














