>
>
বাকশাল - শেখ মুজিবুর রহমান যে কারণে বিতর্কিত এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন
বাকশাল - শেখ মুজিবুর রহমান যে কারণে বিতর্কিত এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন
বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনে যে সিদ্ধান্তটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি তর্ক-বিতর্ক ও চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়, তা হলো 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' তথা বাকশাল গঠন। বঙ্গবন্ধু বাকশাল নামে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। একদলীয় এই শাসনব্যবস্থাকে কেউ দেখেন দেশ বাঁচানোর অন্তিম চেষ্টা হিসেবে, আবার কেউ দেখেন গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করার একনায়কতান্ত্রিক পদক্ষেপ হিসেবে।

TruthBangla
Jan 25, 2026
বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনে যে সিদ্ধান্তটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি তর্ক-বিতর্ক ও চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়, তা হলো 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' তথা বাকশাল গঠন। বঙ্গবন্ধু বাকশাল নামে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। একদলীয় এই শাসনব্যবস্থাকে কেউ দেখেন দেশ বাঁচানোর অন্তিম চেষ্টা হিসেবে, আবার কেউ দেখেন গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করার একনায়কতান্ত্রিক পদক্ষেপ হিসেবে।
কোন প্রেক্ষাপটে কেন শেখ মুজিব বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়, তখন দেশটির সামনে ছিল এক বিশাল পর্বতসম চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশের অবকাঠামো, অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল।
দেশটির সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় সংসদীয় সরকার পদ্ধতি বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকায় এক জনসভায় বাকশাল নিয়ে বক্তব্যে ঘুনেধরা সমাজ পাল্টানোর কথা বলেছিলেন।

কিন্তু এর প্রেক্ষাপট নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিব যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের দায়িত্ব নেয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই পরিস্থিতি তাঁকে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার পথে নিয়ে যায় বলে তারা মনে করেন।
শেখ মুজিবের জীবন ও রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খুরশিদা বেগম। তিনি বলছিলেন, বাকশাল গঠনের পেছনে প্রতিকূল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেয়ার বিষয় যেমন ছিল, একই সাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন ছিল বলে তিনি মনে করেন।
"যুদ্ধ-পরবর্তী অবস্থা যেটা ছিল, একেবারে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। আমাদের কলকারখানা সব নষ্ট বা ভেঙে গেছে। রাস্তাঘাট বা অবকাঠামো নাই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ চলছে না। কোষাগার শূণ্য। এক কোটি মানুষ ফিরে এসেছে ভারত থেকে।"
"এই যে একটা অবস্থা, সেই সুযোগে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোও কিন্তু বসে থাকলো না। এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভাল ছিল না। এরকম একটা পরিস্থিতিতে দেশটাকে সামাল দিতে বঙ্গবন্ধু একপর্যায়ে এই বাকশাল গঠন করেছেন।"
ঐতিহাসিকদের মতে, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর হাতে কোনো জাদুকরী সমাধান ছিল না। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল শূন্য। কোনো সোনা বা হার্ড কারেন্সি ছিল না। রাস্তাঘাট, সেতু, বন্দর এবং রেললাইন ছিল বিধ্বস্ত। ৪০০ এর বেশি ছোট-বড় সেতু ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।

ভারত থেকে ফিরে আসা এক কোটি মানুষের পুনর্বাসন এবং দেশের অভ্যন্তরে গৃহহীন লাখ লাখ মানুষকে ঘর দেওয়া ছিল এক হিমালয়সম কাজ।
বাকশাল গঠনের আগে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি এবং দায় কার?
স্বাধীনতার মাত্র দু-তিন বছরের মধ্যে দেশে এক ভয়াবহ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই পরিস্থিতির জন্য শাসক দল এবং বিরোধী শক্তি উভয়কেই দায়বদ্ধ করেন বিশ্লেষকরা। বাকশাল তৈরির পটভূমি নিয়ে আলোচনায় বিশ্লেষকদের অনেকের কথায় সেই সময়কার নৈরাজ্যকর একটা পরিস্থিতির কথা উঠে আসে।
জাসদ ও চরমপন্থীদের সশস্ত্র তৎপরতা
১৯৭২ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগের একদল তরুণ নেতা বেরিয়ে গিয়ে গঠন করেন 'জাসদ' (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)। তারা 'বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র' প্রতিষ্ঠার কথা বলে সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দেয়। তাদের সামরিক শাখা 'গণবাহিনী' সরকারি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। অন্যদিকে, ডাকু সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন 'সর্বহারা পার্টি' সহ বিভিন্ন চরমপন্থী বাম দল 'শ্রেণিশত্রু খতম' এর নামে বিভিন্ন স্থানে থানা লুট, ব্যাংক ডাকাতি এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হত্যা করতে শুরু করে।
লেখক ও গবেষক বদরুদ্দিন উমর বলেছেন, শেখ মুজিবের জন্য তাঁর দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দুর্নীতি একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অন্যদিকে দলের একটি অংশ বেরিয়ে যাওয়ার পর সরকার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছিল।"
তখন বিরোধীদের ওপর নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা নিয়েও পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে শেখ মুজিব সব ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে বাকশাল গঠন করেছিলেন বলে বদরুদ্দিন উমর উল্লেখ করেছেন। "ঐ সময় প্রশাসন থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ দল ইত্যাদির মধ্যে একটা ভাঙন তৈরি হয়েছিল। যে ভাঙনটা তথাকথিত আওয়ামী লীগের যে সংগঠন ছিল, সেটা দিয়ে সামাল দেয়া সম্ভব ছিল না।"
বদরুদ্দিন উমর বলছেন, "সেখানে তাদের সহমতের দল সিপিবিসহ অন্যদের নিয়ে একটা সংগঠন করা দরকার ছিল এবং যেটা সামাল দিতে পারে। শেখ মুজিব তা মনে করেছিলেন। সেজন্যই তিনি বাকশাল করেছিলেন।"
আওয়ামী লীগ নেতা নূহ আলম লেনিন বাকশাল প্রতিষ্ঠার সময় আওয়ামী লীগের মিত্র কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে ছিলেন। মি. লেনিন বলছেন, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এবং '৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, সব মিলিয়ে ভয়াবহ সংকটের মুখে বাধ্য হয়ে বাকশাল গঠন করা হয়েছিল।
"একদিকে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তর থেকে বেরিয়ে একটা অংশ জাসদ নামের দল করার পাশাপাশি গণবাহিনীও গঠন করলো তাদের সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে তথাকথিত বিপ্লবের চিন্তা থেকে।"
"অন্যদিকে আগে থেকেই অতিবাম বা চরমপন্থীরা যেমন সর্বহারা পার্টির মতো, তারা বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রেনিশত্রু খতমের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করলো। বিভিন্ন জায়গায় হত্যা, সন্ত্রাস, বাড়ি-ঘর লুট, দেশের সম্পদ লুট চললো।"
সেই পটভূমি তুলে ধরতে গিয়ে মি. লেনিন আরও বলেন, "তখনকার জাসদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনে আক্রমণ চালায়। তখন সরকার নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো উপক্রম হয়। এছাড়া '৭৪ সালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখনই বঙ্গবন্ধু ভাবতে শুরু করেন যে, রাষ্ট্রীয়ভাবে একটা দল গঠন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক সব শক্তিকে নিয়ে দেশ পুনর্গঠনের কাজটি করবেন।"
জাসদ ও রক্ষীবাহিনীর সংঘর্ষ
১৯৭৪ সালের ১৭ই মার্চ ঢাকার রমনা এলাকায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসভবন ঘেরাও করেছিল জাসদ। তখন সেখানে জাসদ ও রক্ষীবাহিনীর মধ্যে অনেক গোলাগুলি হয়েছিল এবং হতাহত হয়েছিল অনেক মানুষ। এর আগে দু'বছর ধরে অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে হত্যা, খাদ্য ও পাটের গুদামে আগুন, থানা লুটের মতো নাশকতা চলছিল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
আওয়ামী লীগের একজন বর্ষীয়ান নেতা ডা. এস এ মালেক বলছিলেন, সেই সময়ের পরিস্থিতি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সামাল দেয়া সম্ভব ছিল না।
"সেদিন ৭২-এর সংবিধান প্রণয়ন করে সংসদের নির্বাচন দিয়ে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার হলো। কিন্তু আমরা কি দেখলাম? একদিকে সংসদীয় অবাধ গণতন্ত্র অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি আক্রমণ। পাঁচজন সাংসদকে মেরে ফেলে দেয়া হলো। রেল লাইন তুলে ফেলা হলো। এবং স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি সেখানে তৎপর হলো।"
তিনি আরও বলেছেন, "এই পরিস্থিতিতে আমার মতে, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সংসদীয় গণতন্ত্র দিয়ে দেশ শাসন করা সম্ভব ছিল না। সেজন্য তিনি বাকশালের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যের কথা বললেন। তিনি সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে এগুতে চেয়েছিলেন।"
অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও ৭৪ এর দুর্ভিক্ষ
বঙ্গবন্ধুর নিজের দল আওয়ামী লীগের ভেতরেও ছিল দুর্নীতির ঘুণপোকা। বদরুদ্দিন উমরের মতে, দলের অনেক নেতাকর্মী ত্রাণ চুরি এবং চোরাচালানের সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তোলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক কারণে খাদ্যবাহী জাহাজ মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে নেওয়ায় বাংলাদেশে খাদ্যাভাব চরমে পৌঁছায়।
কেন বাকশাল? বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য কি ছিল?
বঙ্গবন্ধু প্রায়ই বলতেন, “আমি চাই শোষিতের গণতন্ত্র, শোষকের নয়।” বাকশাল ছিল মূলত একটি ‘জাতীয় ফ্রন্ট’। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দল ছিল না, বরং এটি ছিল কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, সশস্ত্র বাহিনী এবং আমলাতন্ত্রের এক সমন্বিত রূপ।
১৯৭৫ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু বাকশালকে "দ্বিতীয় বিপ্লব" হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি কেন এই পথ বেছে নিয়েছিলেন?
ক) জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা: তৎকালীন বহুদলীয় ব্যবস্থায় রাজনৈতিক কোন্দল এতই তীব্র ছিল যে, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্তব্ধ হয়ে পড়ছিল। বঙ্গবন্ধু মনে করেছিলেন, সব দলকে এক পতাকাতলে এনে একটি 'জাতীয় ঐক্য' গঠন করলে দেশ পুনর্গঠন সহজ হবে। তিনি কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং ন্যাপকে সাথে নিয়ে এই বিশাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন।
খ) ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জেলা গভর্নর সিস্টেম: বাকশালের অন্যতম বৈপ্লবিক পদক্ষেপ ছিল ৬১টি জেলা গঠন এবং প্রতিটি জেলায় একজন করে 'গভর্নর' নিয়োগ। প্রশাসনকে সরাসরি জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি আমলাতন্ত্রের বদলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে জেলার দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলেন।
গ) সমবায় ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা: বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন গ্রামে গ্রামে 'বহুমুখী সমবায়' গড়ে তুলতে। যেখানে মালিক তার জমি দেবেন, রাষ্ট্র দেবে সার-বীজ-সেচ এবং ভূমিহীন কৃষকরা সেখানে শ্রম দেবেন। উৎপাদিত ফসল তিন ভাগে (মালিক, শ্রমিক ও রাষ্ট্র) ভাগ হবে। এটি ছিল মূলত গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার একটি সমাজতান্ত্রিক মডেল।
বাকশাল কি একনায়কতন্ত্রের সূচনা?
বাকশাল গঠনের সাথে সাথেই সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের বদলে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু হয়। এর ফলে আওয়ামী লীগসহ সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়। চারটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পত্রিকা রেখে বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। নাগরিক অধিকার সংকুচিত করে বিচার বিভাগের ক্ষমতা হ্রাস করা হয়।
বদরুদ্দিন উমর বলেছেন, বাকশাল ছিল একনায়কতন্ত্র, সেজন্য মানুষ তা গ্রহণ করেনি। তবে শেখ মুজিব বাকশালকে দ্বিতীয় বিপ্লব হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন।

"বাকশাল গঠনের পরে দেশের ওপর ফ্যাসিস্ট জুলুম আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। সব দলকে বন্ধ করে দিয়ে, নিষিদ্ধ করে দিয়ে, সব খবরের কাগজ নিষিদ্ধ করে দিয়ে লোকজনকে ধরপাকড় করে ব্যাপকভাবে জুলুম করেছিলেন।"
বিশ্লেষকদের অনেকে আবার পটভূমিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলছিলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর প্রত্যাশা অনুযায়ী গণতন্ত্রের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়নি। সেকারণে রাজনীতি এবং অর্থনীতি সব দিক থেকেই বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। শেখ মুজিবের ক্ষমতা অল্প সময়ের মধ্যেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল।
"একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে দেশটা স্বাধীন হয়েছিল। এই যুদ্ধের সময় জনগণের মাঝে আশা আকাঙ্খা যেমন বেড়েছিল, সে রকম জনগণ এটাও বুঝেছিল যে, আবার দরকার হলে আমরা অস্ত্র ধরে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবো। যেটা বামপন্থীরা করেছিল। তাঁর রেজিমকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।"
"উনিতো গণতন্ত্র পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন নাই। তার আগেইতো উনার রেজিমকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এই বামরা এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, তারা সেটা করেছিল। সেজন্য এটা করা হয়েছিল। এটা আমার বিশ্লেষণ।"
খুরশিদা বেগম বাকশালকে দেখেন শেখ মুজিবের দর্শন হিসাবে। "এটি বঙ্গবন্ধুর দর্শন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। ঐ মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা, সেটাকে একটা পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর দর্শনকে বাকশাল রুপে এনে সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।"
গণতন্ত্র পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার আগেই এই ব্যবস্থা জনগণের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল। বদরুদ্দিন উমর মনে করেন, কৃষক-শ্রমিকের নাম নেওয়া হলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের ওপর আমলাতান্ত্রিক ও দলীয় জুলুম বেড়ে গিয়েছিল।
বাকশাল নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তুষ্টি
বাকশালকে কৃষক শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা এবং সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি হিসাবে তুলে ধরেন এর সমর্থকরা। কিন্তু সে সময় বাকশাল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছিল এবং সেজন্য এর পক্ষে জনসমর্থন পায়নি বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলছিলেন, বাকশালের আদর্শের ভিত্তিতে এবং সাংগঠনিক কাঠামোতে দুর্বলতা ছিল।

"এটা মূলত আদর্শের ভিত্তিটা অত্যন্ত দুর্বল ছিল। কারণ বাকশালের মতো একটা ওয়ান পার্টি স্টেট করতে হলে সেই পার্টিটার গ্রাম গঞ্জ সর্বত্র একেবারে কমিউনিস্ট পার্টির মতো মানুষের মাঝে ঢুকে যেতে হয়।”
"আদর্শের ভিত্তিটাকে একেবারে স্ট্রং করে নিয়ে আসতে হয় গ্রাসরুট লেভেল থেকে। সেই ভিত্তিটাতো ছিল না। সেজন্য জনগণের মধ্যে অসন্তুষ্টি দেখা দিয়েছিল।"
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বাকশালের প্রভাব
৭০-এর দশকে বিশ্ব রাজনীতি দুই মেরুতে বিভক্ত ছিল। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লক, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী ব্লক। বঙ্গবন্ধুর বাকশাল কর্মসূচিতে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের কিছুটা প্রভাব ছিল। এটি অনেক পশ্চিমা দেশ এবং তাদের এদেশীয় সমর্থকদের ক্ষুব্ধ করেছিল। পাকিস্তানপন্থী এবং ইসলামপন্থী শক্তিগুলো এই সুযোগে সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারণা জোরদার করে।
বাকশালের উল্লেখযোগ্য সাফল্য
একদল মানুষ খুব সহজেই বলে দেন, “বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে দেশ রসাতলে গিয়েছিল।” কিন্তু একবারও কি আমরা গভীরে গিয়ে দেখেছি, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে কোন অবস্থার প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু বাকশাল প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়েছিলেন? বাকশালের যেমন সমালোচনা রয়েছে, তেমনি উল্লেখযোগ্য সাফল্যও রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্য দমন
৯ মাসের যুদ্ধে মানুষের হাতে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র রয়ে গিয়েছিল। এর পাশাপাশি পাকিস্তানি দোসর, অতি-বামপন্থী চরমপন্থীদের সশস্ত্র তৎপরতা এবং সীমান্ত দিয়ে পণ্য পাচার বা চোরাচালান নবজাতক রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছিল।
বাকশাল গঠনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। সে সময় রাতের আঁধারে থানা লুট করা, পাটের গুদামে আগুন দেওয়া এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যার মতো ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, পশ্চিমা ধাঁচের বহুদলীয় গণতন্ত্রের শিথিলতা ব্যবহার করে একদল মানুষ দেশকে অস্থিতিশীল করছে। বাকশালের মাধ্যমে তিনি একটি কেন্দ্রীয় কমান্ডিং সিস্টেম চালু করেন, যার ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো সরাসরি তদারকির আওতায় আসে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই চোরাচালান ও কালোবাজারি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও দুর্নীতিমুক্ত আমলাতন্ত্র
ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানি আমল থেকে আমরা যে আমলাতান্ত্রিক কাঠামো উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলাম, তা ছিল মূলত ‘শাসক’ সুলভ, ‘সেবক’ সুলভ নয়। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন এই কাঠামো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে।
বাকশালের অধীনে সরকারি কর্মকর্তা বা আমলাদের জনগণের মুখোমুখি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, "সরকারি কর্মচারীরা জনগণের কেনা গোলাম নয়।" তিনি চেয়েছিলেন আমলারা যাতে এসির নিচে বসে ফাইল সই না করে সরাসরি মাঠে গিয়ে মানুষের সমস্যার সমাধান করে। এতে করে সাধারণ মানুষের মাঝে একধরনের স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছিল।
জেলা গভর্নর ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ
বাকশালের সবচেয়ে আধুনিক পদক্ষেপ ছিল দেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া। ১৯৭৫ সালে তিনি মহকুমাগুলোকে জেলায় উন্নীত করে মোট ৬১টি জেলা গঠন করেন। প্রতিটি জেলায় একজন করে ‘গভর্নর’ নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। এই গভর্নররা কেবল রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, বরং তাদের অধীনেই ছিল জেলার আইন-শৃঙ্খলা এবং উন্নয়ন কাজ।
এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। স্থানীয় সমস্যা স্থানীয়ভাবেই সমাধান করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল এই গভর্নরদের। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম এবং সবচেয়ে সাহসী প্রশাসনিক সংস্কার, যা সফল হলে আজ হয়তো আমাদের প্রতিটি জেলা এক একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে উঠত।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠন
বাকশালের অর্থনৈতিক মডেলে কৃষক ও শ্রমিককে রাষ্ট্রের মালিকানায় অংশীদার করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কারখানার শ্রমিকরা যাতে কেবল বেতনভুক্ত কর্মচারী না থেকে লভ্যাংশের অংশীদার হতে পারে, সেই লক্ষ্য নিয়ে আইন প্রণয়নের কাজ চলছিল। অন্যদিকে কৃষকদের জন্য ‘বাধ্যতামূলক বহুমুখী সমবায়’ ব্যবস্থায় কৃষকের জমির মালিকানা ঠিক থাকবে, কিন্তু চাষাবাদ, সার, বীজ এবং বিপণন হবে সমবায়ের মাধ্যমে। এতে করে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হতো এবং কৃষকের প্রকৃত আয় বহুগুণ বেড়ে যেত।
খাদ্য উৎপাদন ও কৃষিতে স্বনির্ভরতার যুদ্ধ
১৯৭৪ সালের বৈশ্বিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ খাদ্য ঘাটতির পর বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভর করে সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন। তাই বাকশাল গঠনের পর কৃষি খাতে রাষ্ট্রীয় তদারকি বাড়ানো হয়। উন্নত জাতের বীজ, সার এবং সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রতিটি গ্রামে সমবায় গঠনের কাজ শুরু হয়।
বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা ছিল, বাংলাদেশের উর্বর মাটিকে ব্যবহার করে বছরে তিনটি ফসল ফলানো। তিনি প্রায়ই বলতেন, "আমার দেশের মাটি যদি থাকে, আর আমার দেশের মানুষ যদি থাকে, তবে আমি এই সোনার বাংলা গড়বই।" বাকশালের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ১৯৭৫ সালে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছিল, যা ছিল সেই কৃষি বিপ্লবেরই প্রাথমিক ইঙ্গিত।
জাতীয় ঐক্য গঠন “এক মঞ্চে এক দেশ”
মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে রাজনৈতিক অনৈক্য চরমে পৌঁছেছিল। বিভিন্ন দল ও উপদল নিজেদের স্বার্থে দেশকে বিভক্ত করে ফেলছিল। বাকশাল কোনো একক দলের শাসন ছিল না, বরং এটি ছিল ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি এবং আওয়ামী লীগের মতো প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তির একটি মোর্চা।
তিনি চেয়েছিলেন ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সেনাবাহিনী এবং পেশাজীবীদের এক জায়গায় এনে দেশ গড়ার কাজে লাগাতে। তাঁর যুক্তি ছিল, একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে হাজারটা মতভেদ নিয়ে ঝগড়া করার চেয়ে অন্তত ১০ বছর একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করা বেশি জরুরি। এই জাতীয় ঐক্যের ফলে সামাজিক স্থিতিশীলতা দ্রুত ফিরে আসছিল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছিল।
বাকশালের ফলাফল
বাকশাল ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার আগেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ফলে এই ব্যবস্থার চূড়ান্ত ফলাফল আমরা দেখতে পাইনি। তবে তথ্য-উপাত্ত বলে, বাকশাল গঠনের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমতে শুরু করেছিল। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষণ স্পষ্ট হয়েছিল। দুর্নীতিবাজদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, "আমি সিস্টেম পরিবর্তন করেছি যাতে চোরেরা আর চুরি করতে না পারে।" বাকশালের মাধ্যমে তিনি যে শোষণহীন সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা ছিল বৈষম্যমুক্ত এক আধুনিক বাংলাদেশের ভিত্তি।
বাকশাল কি সফল হতে পারতো?
বাকশাল পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার তারিখ নির্ধারিত ছিল ১৯৭৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর। কিন্তু তার ১৫ দিন আগেই ১৫ই আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়।
নূহ আলম লেনিনের মতো সমর্থকরা মনে করেন, এই ব্যবস্থা সফল না ব্যর্থতা বিচার করার সময় বঙ্গবন্ধু পাননি। তার আগেই ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে একটি নতুন ব্যবস্থার অপমৃত্যু ঘটে। অন্যদিকে সমালোচকরা মনে করেন, এই ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শিকড় কোনোদিনই মজবুত হতো না।
ইতিহাসের শিক্ষা
বাকশাল ছিল একটি চরম সংকটে থাকা রাষ্ট্রের 'শক থেরাপি'র মতো। বঙ্গবন্ধু হয়তো চেয়েছিলেন অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে আবার গণতন্ত্রে ফিরে যেতে। পার্লামেন্টে তিনি বলেছিলেন, "আমি সেন্টিমেন্ট বুঝি... সবকিছু ঠিক হলে আমি আবার গণতন্ত্রে ফিরে আসবো।"
কিন্তু ইতিহাস তাকে সেই সুযোগ দেয়নি। বাকশাল আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অমীমাংসিত বিতর্কের নাম। তবে এ কথা সত্য যে, যে মহান লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধু একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন, তার সেই আকুতি ছিল অকৃত্রিম।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.














