বাকশাল – শেখ মুজিবুর রহমান যে কারণে এক দলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন
বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনে যে সিদ্ধান্তটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি তর্ক-বিতর্ক ও চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়, তা হলো 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' তথা বাকশাল গঠন। বঙ্গবন্ধু বাকশাল নামে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। একদলীয় এই শাসনব্যবস্থাকে কেউ দেখেন দেশ বাঁচানোর অন্তিম চেষ্টা হিসেবে, আবার কেউ দেখেন গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করার একনায়কতান্ত্রিক পদক্ষেপ হিসেবে।

TruthBangla

বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর রাজনৈতিক ইতিহাসের ক্যানভাসে সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত, পঠিত এবং পুনর্মূল্যায়িত অধ্যায়টি হলো ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ বা ‘বাকশাল’ গঠন। ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তৎকালীন বহুদলীয় সংসদীয় সরকার পদ্ধতির অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসিত একদলীয় জাতীয় ফ্রন্ট ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল। এই একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি ও সামাজিক অঙ্গনে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি প্রবাহিত হয়ে আসছে।
একপক্ষের কাছে বাকশাল ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, চোরাচালান, দুর্নীতি, দুর্ভিক্ষ ও সশস্ত্র চরমপন্থায় বিপর্যস্ত একটি নবজাতক রাষ্ট্রকে বাঁচানোর একমাত্র 'শক থেরাপি' বা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত 'দ্বিতীয় বিপ্লব'। অন্যপক্ষের কাছে এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংসদীয় গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া একনায়কতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের সূচনা।
কোন বাস্তবতায়, কোন অস্থিতিশীল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবুর রহমান এই অভূতপূর্ব ও চরম সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন? বাকশাল কি কেবলি ক্ষমতার মহাকেন্দ্রীকরণ ছিল, নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল গ্রামীণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকালের কোনো সুদূরপ্রসারী দার্শনিক ছক? তৎকালীন রাজনীতি, সাক্ষাৎকার, সাক্ষাৎকারভিত্তিক গবেষণা এবং ঐতিহাসিক দলিলে চোখ রেখে এই জটিল ও বহুমাত্রিক অধ্যায়ের একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করা হলো।
কোন প্রেক্ষাপটে কেন শেখ মুজিব বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?
দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী ও ধ্বংসাত্মক মুক্তিযুদ্ধে দেশের ভৌত অবকাঠামো, অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং সামাজিক মেলবন্ধন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি যখন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে সদ্য স্বাধীন দেশে পা রাখেন, তখন তাঁর হাতে ছিল না কোনো তৈরি জাদুকরী সমাধান।
১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশে প্রত্যাবর্তন পরবর্তী ভাষণে বলেছিলেন, "আমার কাছে সোনা নেই, রুপা নেই, বৈদেশিক মুদ্রা নেই। আছে কেবল ধ্বংসস্তূপ, আর আছে আমার দেশের মাটি ও মানুষ। এই মাটি ও মানুষকে দিয়েই আমি আমার সোনার বাংলা গড়ে তুলব।"
শূন্য অর্থনৈতিক ভিত্তি: বাংলাদেশ ব্যাংকের কোষাগার ছিল সম্পূর্ণ শূন্য। স্বর্ণ সঞ্চয় (Gold Reserve) বা কোনো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল না।
ভৌত অবকাঠামোর ধস: যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। পাকিস্তানি বাহিনী পরাজয়ের প্রাক্কালে ৪০০টিরও বেশি ছোট-বড় সেতু ধ্বংস করে দিয়েছিল। চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর মাইন পুঁতে অচল করে রাখা হয়েছিল, আর রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়েছিল মাইল কে মাইল।
শরণার্থী ও পুনর্বাসন সংকট: যুদ্ধ চলাকালীন ভারতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে এনে দ্রুত পুনর্বাসন করা এবং দেশের অভ্যন্তরে গৃহহীন হয়ে পড়া আরও লাখ লাখ মানুষকে ঘরবাড়ি বানিয়ে দেওয়া ছিল এক হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা: শিল্প কারখানাগুলো কাঁচামাল ও পুঁজির অভাবে বন্ধ ছিল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক পরিবেশ পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছিল এবং কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

কিন্তু এর প্রেক্ষাপট নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিব যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের দায়িত্ব নেয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই পরিস্থিতি তাঁকে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার পথে নিয়ে যায় বলে তারা মনে করেন।
১৯৭৫ সালে দেশের জরুরি পরিস্থিতিতে গৃহীত ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ বা বাকশাল ব্যবস্থাকে জাতীয় ঐক্যের সাময়িক কাঠামোর পরিবর্তে একদলীয় স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত হিসেবে অপপ্রচার করা হয়। অথচ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমকালীন গবেষকদের মতে, বাকশাল কোনো চিরস্থায়ী একদলীয় একনায়কতন্ত্র বা আজীবন ক্ষমতায় থাকার চক্রান্ত ছিল না। সদ্য স্বাধীন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি রাষ্ট্রকে গৃহযুদ্ধতুল্য বিশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব থেকে রক্ষা করার জরুরি ব্যবস্থা।
১৯৭৩-৭৪ সালের বৈশ্বিক তেল সংকট, ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়া খাদ্য সংকট এবং ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যা ও দুর্ভিক্ষ দেশকে এক চরম মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। একই সময়ে সদ্য স্বাধীন দেশে অবৈধ অস্ত্রের ব্যাপক বিস্তার, চোরাচালান, মজুদদারি এবং কালোবাজারির কারণে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ ধারণ করে।
এমন সময় জাসদের গণবাহিনী ও সিরাজ সিকদারের উগ্রপন্থী দলের সশস্ত্র তৎপরতা, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ধ্বংস, পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ, জনপ্রতিনিধিদের হত্যা এবং নাশকতা দমনে একটি কঠোর ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। এর ধারাবাহিকতায় ২৪ ফেব্রুয়ারি ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল) আত্মপ্রকাশ করে। এটি ছিল মূলত একটি জাতীয় মোর্চা বা সর্বজনীন প্ল্যাটফর্ম। সকল রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, সামরিক-বেসামরিক আমলা এবং কৃষক-শ্রমিককে একটি একক মঞ্চে এনে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা ছিল এর লক্ষ্য।
বাকশালের আওতায় তৎকালীন মহকুমাগুলোকে উন্নীত করে ৬১টি জেলা গঠন করা হয়।বাকশালের কল্যাণে দেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটাতে শুরু করে এবং অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার ও চোরাচালান কমে যেতে শুরু করে। কিন্তু বাকশালের সুফল পাওয়ার আগেই দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শহীদ হন। পরবর্তীতে খুনীচক্র ও ক্ষমতা দখলকারী সামরিক জান্তা সরকারগুলো তাদের অবৈধ শাসনকে বৈধ করতে বাকশালকে ‘চিরস্থায়ী স্বৈরতন্ত্র’ বলে অপপ্রচার ও মিথ্যাচার ছড়াতে থাকে যা আজও বিদ্যমান।
শেখ মুজিবের জীবন ও রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খুরশিদা বেগম। তিনি বলছিলেন, “বাকশাল গঠনের পেছনে প্রতিকূল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেয়ার বিষয় যেমন ছিল, একই সাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন ছিল বলে তিনি মনে করেন।”
তৎকালীন প্রতিকূল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন: "যুদ্ধ-পরবর্তী অবস্থা যেটা ছিল, একেবারে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। আমাদের কলকারখানা সব নষ্ট বা ভেঙে গেছে। রাস্তাঘাট বা অবকাঠামো নাই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ চলছে না। কোষাগার শূণ্য। এক কোটি মানুষ ফিরে এসেছে ভারত থেকে।"
"এই যে একটা অবস্থা, সেই সুযোগে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোও কিন্তু বসে থাকলো না। এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভাল ছিল না। এরকম একটা পরিস্থিতিতে দেশটাকে সামাল দিতে বঙ্গবন্ধু একপর্যায়ে এই বাকশাল গঠন করেছেন।"
ঐতিহাসিকদের মতে, ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর হাতে কোনো জাদুকরী সমাধান ছিল না। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল শূন্য। কোনো সোনা বা হার্ড কারেন্সি ছিল না। রাস্তাঘাট, সেতু, বন্দর এবং রেললাইন ছিল বিধ্বস্ত। ৪০০ এর বেশি ছোট-বড় সেতু ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।

ভারত থেকে ফিরে আসা এক কোটি মানুষের পুনর্বাসন এবং দেশের অভ্যন্তরে গৃহহীন লাখ লাখ মানুষকে ঘর দেওয়া ছিল এক হিমালয়সম কাজ।
বাকশাল গঠনের আগে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি এবং দায় কার?
স্বাধীনতার মাত্র দু-তিন বছরের মধ্যে দেশে এক ভয়াবহ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই পরিস্থিতির জন্য শাসক দল এবং বিরোধী শক্তি উভয়কেই দায়বদ্ধ করেন বিশ্লেষকরা। বাকশাল তৈরির পটভূমি নিয়ে আলোচনায় বিশ্লেষকদের অনেকের কথায় সেই সময়কার নৈরাজ্যকর একটা পরিস্থিতির কথা উঠে আসে। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন, অন্যদিকে সশস্ত্র অতি-বাম ও প্রাক-পাকিস্তানপন্থী চরমপন্থী গ্রুপগুলোর নাশকতা সরকারকে একদম কোণঠাসা করে ফেলে।
জাসদ ও সশস্ত্র চরমপন্থীদের তৎপরতা
১৯৭২ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগের একদল তরুণ নেতা বেরিয়ে গিয়ে গঠন করেন 'জাসদ' (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)। তারা 'বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র' প্রতিষ্ঠার কথা বলে সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দেয়। তাদের সামরিক শাখা 'গণবাহিনী' সরকারি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। অন্যদিকে, ডাকু সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বাধীন 'সর্বহারা পার্টি' সহ বিভিন্ন চরমপন্থী বাম দল 'শ্রেণিশত্রু খতম' এর নামে বিভিন্ন স্থানে থানা লুট, ব্যাংক ডাকাতি এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হত্যা করতে শুরু করে।
গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টি ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণ, নাশকতা ও ব্যাংক ডাকাতির সাথে জড়িয়ে পড়ে। তারা আওয়ামী লীগ সদস্য এবং থানায় হামলা চালিয়ে পুলিশকে আহত করতো ও পুলিশের অস্ত্র লুটপাট করে নিতো। গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টি সারা দেশে লিফলেট বিলিয়ে বোমা বিস্ফোরণ করতো ও আগ্নেয়াস্ত্র উচিয়ে টহল দিতো। আইনশৃঙ্খলা জবাবে রক্ষীবাহিনীও কঠোর ধরপাকড় ও দমননীতি গ্রহণ করে।
১৯৭৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয় “জাসদ ও সর্বহারা পার্টি ৭৩ জন পুলিশ ও বিডিআর সদস্য হত্যা করেছে। ২টি থানা ও ১৭টি পুলিশ ফাঁটি লুট করেছে।” চরমপন্থীদের সহিংসতায় অতিষ্ঠ হয়ে একই দিনে দেড়শ’ থানায় রক্ষীবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

লেখক ও গবেষক বদরুদ্দিন উমর বলেছেন, “শেখ মুজিবের জন্য তাঁর দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দুর্নীতি একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অন্যদিকে দলের একটি অংশ বেরিয়ে যাওয়ার পর সরকার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছিল।”
তখন বিরোধীদের ওপর নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা নিয়েও পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে শেখ মুজিব সব ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে বাকশাল গঠন করেছিলেন বলে বদরুদ্দিন উমর উল্লেখ করেছেন: "ঐ সময় প্রশাসন থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ দল ইত্যাদির মধ্যে একটা ভাঙন তৈরি হয়েছিল। যে ভাঙনটা তথাকথিত আওয়ামী লীগের যে সংগঠন ছিল, সেটা দিয়ে সামাল দেয়া সম্ভব ছিল না।"
বদরুদ্দিন উমর বলছেন, "সেখানে তাদের সহমতের দল সিপিবিসহ অন্যদের নিয়ে একটা সংগঠন করা দরকার ছিল এবং যেটা সামাল দিতে পারে। শেখ মুজিব তা মনে করেছিলেন। সেজন্যই তিনি বাকশাল করেছিলেন।"
আওয়ামী লীগ নেতা নূহ আলম লেনিন বাকশাল প্রতিষ্ঠার সময় আওয়ামী লীগের মিত্র কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে ছিলেন। মি. লেনিন বলছেন, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এবং '৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, সব মিলিয়ে ভয়াবহ সংকটের মুখে বাধ্য হয়ে বাকশাল গঠন করা হয়েছিল।
তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির তরুণ নেতা ও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ নেতা নূহ আলম লেনিন সেই সময়ের চিত্র তুলে ধরে বলেন: "একদিকে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তর থেকে বেরিয়ে একটা অংশ জাসদ নামের দল করার পাশাপাশি গণবাহিনীও গঠন করলো তাদের সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে তথাকথিত বিপ্লবের চিন্তা থেকে।"
"অন্যদিকে আগে থেকেই অতিবাম বা চরমপন্থীরা যেমন সর্বহারা পার্টির মতো, তারা বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রেনিশত্রু খতমের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করলো। বিভিন্ন জায়গায় হত্যা, সন্ত্রাস, বাড়ি-ঘর লুট, দেশের সম্পদ লুট চললো।"
সেই পটভূমি তুলে ধরতে গিয়ে মি. লেনিন আরও বলেন, "তখনকার জাসদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনে আক্রমণ চালায়। তখন সরকার নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো উপক্রম হয়। এছাড়া '৭৪ সালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখনই বঙ্গবন্ধু ভাবতে শুরু করেন যে, রাষ্ট্রীয়ভাবে একটা দল গঠন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক সব শক্তিকে নিয়ে দেশ পুনর্গঠনের কাজটি করবেন।"
জাসদ ও রক্ষীবাহিনীর সংঘর্ষ
১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসকে ‘কালো দিবস’ আখ্যায়িত করে জাসদের গণবাহিনী ও ডাকু সিরাজের সর্বহারা পার্টি ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতা করে ও বোমা বিস্ফোরণ করে। এসব চরমপন্থী গোষ্ঠী বিজয় দিবস বানচাল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং লিফলেট বিলি করে তারা ঘোষণা করে জাতীয় প্রেসক্লাব, পত্রিকা অফিস, কমলাপুর রেলস্টেশন, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ বোমা মেড়ে উড়িয়ে দেয়ার। এর আগে ১৪ ডিসেম্বর গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টি ঢাকায় দুটি স্থানে কয়েকটি বোমা বিস্ফোরণ করেছিল।
১৭ মার্চ জাসদের একটি মিছিল থেকে গণবাহিনীর কর্মীরা কয়েকটি ককটেল ও বোমা বিস্ফোরণ করে এবং কয়েকটি স্থানে ভাংচুর চালায়। ঢাকার রমনা এলাকায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসভবন ঘেরাও করেছিল জাসদ। তখন সেখানে জাসদ ও রক্ষীবাহিনীর মধ্যে অনেক গোলাগুলি হয়েছিল এবং হতাহত হয়েছিল অনেক মানুষ। এর আগে দু'বছর ধরে অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে হত্যা, খাদ্য ও পাটের গুদামে আগুন, থানা লুটের মতো নাশকতা চলছিল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
তৎকালীন সময়ে জাসদের মুখপত্র ‘দৈনিক গণকন্ঠ’ ও মওলানা ভাসানীর পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক হক-কথা’ পত্রিকা বঙ্গবন্ধু সরকার ও রক্ষীবাহিনীকে নিয়ে নানা মিথ্যাচার ও গুজব সংবাদ ছাপাতো। তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে দেয় "রক্ষীবাহিনী কাউকে তুলে নিলে তার হদিস পাওয়া যায় না"। এতে জনসাধারণে ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয় যা রাষ্ট্রের একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কখনোই ইতিবাচক ছিল না।
আওয়ামী লীগের একজন বর্ষীয়ান নেতা ডা. এস এ মালেক বলছিলেন, সেই সময়ের পরিস্থিতি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সামাল দেয়া সম্ভব ছিল না।
"সেদিন ৭২-এর সংবিধান প্রণয়ন করে সংসদের নির্বাচন দিয়ে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার হলো। কিন্তু আমরা কি দেখলাম? একদিকে সংসদীয় অবাধ গণতন্ত্র অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি আক্রমণ। পাঁচজন সাংসদকে মেরে ফেলে দেয়া হলো। রেল লাইন তুলে ফেলা হলো। এবং স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি সেখানে তৎপর হলো।"
তিনি আরও বলেছেন, "এই পরিস্থিতিতে আমার মতে, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সংসদীয় গণতন্ত্র দিয়ে দেশ শাসন করা সম্ভব ছিল না। সেজন্য তিনি বাকশালের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যের কথা বললেন। তিনি সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে এগুতে চেয়েছিলেন।"
অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষ
রাজনীতির বাইরের ময়দানে যেমন নাশকতামূলক তৎপরতা চলছিল, ঠিক তেমনি সরকারের ভেতরের শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক সততা বজায় রাখা শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য এক বিরাট পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও ব্লাক-মার্কেটিং: মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত দেশে একশ্রেণির উদীয়মান সুবিধাবাদী ও রাজনীতিবিদের উদয় ঘটেছিল। বিদেশ থেকে আসা ত্রাণসামগ্রী চুরি, সীমান্ত দিয়ে চাল ও পাট ভারতে চোরাচালান করা, এবং মজুদদারির মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করার পেছনে শাসকদলের নিচু ও মাঝারি সারির একশ্রেণীর নেতাকর্মীর হাত ছিল।
বঙ্গবন্ধু নিজে একাধিক জনসভায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন: "সবাই পায় সোনার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি! লাইসেন্স পারমিট দিলেই তা ফোরিয়াদের কাছে বেচে দেওয়া হয়।"
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও ভূ-রাজনৈতিক জাঁতাকল
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে নেমে আসে এক কুখ্যাত ও মানবসৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ। নদীভাঙন, প্লাবন ও অভ্যন্তরীণ চালের সংকট তো ছিলই, তার চেয়ে বড় আঘাত আসে আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে। বাংলাদেশ কিউবার কাছে মাত্র ৫ মিলিয়ন ডলারের পাটের থলে (Jute Bags) রপ্তানি করেছিল এই অজুহাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘PL-480’ চারাধীনে খাদ্যবাহী জাহাজ মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে নেয়।
খাদ্যের চরম সংকটে বাজারে চালের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায় এবং সরকারি হিসাবে প্রায় ২৬,০০০ (এবং বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক গবেষকদের মতে ১.৫ লাখ থেকে বহু বেশি) মানুষের করুণ মৃত্যু ঘটে। '৭৪-এর এই দুর্ভিক্ষ বঙ্গবন্ধুর আত্মমর্যাদা ও রাষ্ট্র পরিচালন নীতিকে প্রচণ্ডভাবে ঝাঁকুনি দেয়।
তিনি তখন দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশের কাছে অসহায়ের মতো তার দেশকে সাহায্য করতে অনুরোধও করেছিলেন। দুর্ভিক্ষকালীন বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি বঙ্গবন্ধু আকুল আহবান জানিয়েছিলেন, "আমার দেশের মানুষ না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছে। আমরা স্বাধীনতা এনেছি মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য, না খাইয়ে মারার জন্য নয়। বিশ্বের বিবেকবান মানুষের কাছে আমাদের আকুল আবেদন আমাদের মানুষকে সাহায্য করুন।"
তিনি বুঝতে পারেন, প্রথাগত নরমপন্থী প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে এই জাতীয় সংকট মোকাবিলা অসম্ভব। ফলে তিনি বাকশাল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।
ইতিহাসবিদরা মনে করেন, শেখ মুজিব এই দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী নন, কারণ তিনি তখন দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশের কাছে অসহায়ের মতো তার দেশকে সাহায্য করতে অনুরোধও করেছিলেন। দুর্ভিক্ষকালীন বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি বঙ্গবন্ধু আকুল আহবান জানিয়েছিলেন, "আমার দেশের মানুষ না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছে। আমরা স্বাধীনতা এনেছি মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য, না খাইয়ে মারার জন্য নয়। বিশ্বের বিবেকবান মানুষের কাছে আমাদের আকুল আবেদন আমাদের মানুষকে সাহায্য করুন।"
মূলত পাকিস্তানের চক্রান্ত এবং আমেরিকা ও সৌদি আরবের অসহযোগিতাই চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষকে অনেক ভয়াবহ করেছিলো।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তার 'Poverty and Famines' গ্রন্থে উল্লেখ করেন, "১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে খাদ্য সংকট যতটা না উৎপাদন ঘাটতির কারণে হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক কূটচালের ফল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় সামান্য চট রপ্তানির অজুহাতে পিএল-৪৮০ (PL-480) চুক্তির খাদ্যবাহী জাহাজ আটকে দিয়েছিল, যা কৃত্রিমভাবে দুর্ভিক্ষকে ত্বরান্বিত ও ভয়াবহ করে তোলে।"
তবে এতগুলো আন্তর্জাতিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নিয়ন্ত্রণে তাঁর সরকার ব্যর্থ ছিলো এই সমালোচনা অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু তাঁকে সরাসরি 'দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিকারী' হিসেবে দায়ী করা সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার।
কেন বাকশাল? বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য কি ছিল?
১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার চালু করার পর, ১৯৭৫ সালের ২৬শে মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেন। এই কর্মসূচিকে তিনি অভিহিত করেছিলেন "দ্বিতীয় বিপ্লব" (Second Revolution) হিসেবে।
২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ জাতীয় সংসদে 'দ্বিতীয় বিপ্লব' বা বাকশাল সংক্রান্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, "আমি চাই শোষিতের গণতন্ত্র। চোর, দুর্নীতিবাজ, চোরাকারবারি আর মজুতদারদের দমনে এই কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছি। এটি কোনো চিরস্থায়ী ব্যবস্থা নয়, এটি দেশের মানুষকে বাঁচানোর, বিশৃঙ্খলা থামানোর এবং উৎপাদন বাড়ানোর সাময়িক এক জাতীয় ঐক্য।"
বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দল হিসেবে তৈরি হয়নি। এটি ছিল একটি ‘জাতীয় মোর্চা’ বা ‘জাতীয় প্ল্যাটফর্ম’। এই প্ল্যাটফর্মে প্রধানত তিনটি রাজনৈতিক দল বিলীন হয়ে একীভূত হয়েছিল:
১. আওয়ামী লীগ
২. বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)
৩. ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ - মোজাফফর)
বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা ছিল রাজনীতিকে কেবল রাজনীতিবিদদের ড্রয়িংরুমে সীমাবদ্ধ না রেখে পেশাজীবী, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং দেশের সশস্ত্র বাহিনীকেও দেশ পুনর্গঠনের এক পতাকাতলে একত্রিত করা।
বাকশাল ঘোষণার সময় বঙ্গবন্ধু নিজেই সংসদে দেওয়া ভাষণে অত্যন্ত কান্নাভরা কণ্ঠে জানিয়েছিলেন যে, “এটি তার সারাজীবনের রাজনৈতিক আদর্শের পরিপন্থি, কিন্তু দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং স্বাধীনতা রক্ষা করার বৃহত্তর স্বার্থে তাঁকে এই কঠোর পথ বেছে নিতে হয়েছে।”
তিনি কেন এই পথ বেছে নিয়েছিলেন?
জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা: তৎকালীন বহুদলীয় ব্যবস্থায় রাজনৈতিক কোন্দল এতই তীব্র ছিল যে, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্তব্ধ হয়ে পড়ছিল। বঙ্গবন্ধু মনে করেছিলেন, সব দলকে এক পতাকাতলে এনে একটি 'জাতীয় ঐক্য' গঠন করলে দেশ পুনর্গঠন সহজ হবে। তিনি কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং ন্যাপকে সাথে নিয়ে এই বিশাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন।
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জেলা গভর্নর সিস্টেম: বাকশালের অন্যতম বৈপ্লবিক পদক্ষেপ ছিল ৬১টি জেলা গঠন এবং প্রতিটি জেলায় একজন করে 'গভর্নর' নিয়োগ। প্রশাসনকে সরাসরি জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি আমলাতন্ত্রের বদলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে জেলার দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলেন।
সমবায় ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা: বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন গ্রামে গ্রামে 'বহুমুখী সমবায়' গড়ে তুলতে। যেখানে মালিক তার জমি দেবেন, রাষ্ট্র দেবে সার-বীজ-সেচ এবং ভূমিহীন কৃষকরা সেখানে শ্রম দেবেন। উৎপাদিত ফসল তিন ভাগে (মালিক, শ্রমিক ও রাষ্ট্র) ভাগ হবে। এটি ছিল মূলত গ্রামীণ অর্থনীতিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার একটি সমাজতান্ত্রিক মডেল।
বাকশালের চার বৈপ্লবিক সংস্কার
বঙ্গবন্ধুর বাকশাল কর্মসূচি কেবল একটি দলীয় কাঠামোর পরিবর্তন ছিল না; এর ভেতরে ছিল বিশাল চারভিত্তিক প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের ছক।
৬১ জেলা ও গভর্নর সিস্টেম
বাকশালের সবচেয়ে যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল ঔপনিবেশিক মহকুমা ভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা বাতিল করে ৬১টি জেলা গঠন করা। প্রতিটি জেলায় একজন করে ‘গভর্নর’ নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়। গভর্নরদের তালিকায় কেবল জেলা পর্যায়ের রাজনীতিবিদ ছিলেন না, সেখানে সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা, পুলিশ কর্মকর্তা এবং সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
গভর্নরদের হাতে জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। সচিবালয়ের এসি রুমে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে জেলা গভর্নর সরাসরি মাঠপর্যায়ে জনগণের দুয়ারে গিয়ে সমস্যার সমাধান করবেন এটিই ছিল মূল ভাবনা।
বাধ্যতামূলক বহুমুখী কৃষি সমবায়
বাংলাদেশের উর্বর জমি ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করার জন্য বঙ্গবন্ধু প্রবর্তন করেন 'বাধ্যতামূলক বহুমুখী কৃষি সমবায়'।
জমির মালিকানা: কৃষকের জমির ব্যক্তিগত মালিকানা বজায় থাকবে, জমি রাষ্ট্র অধিগ্রহণ করবে না।
ত্রি-মুখী ফসল বণ্টন নীতি: উৎপাদিত মোট ফসল তিন ভাগে ভাগ হবে। প্রথম ভাগ: জমির মূল মালিক পাবেন। দ্বিতীয় ভাগ: যে কৃষক জমিতে সরাসরি শ্রম দিয়েছেন তিনি পাবেন। তৃতীয় ভাগ: রাষ্ট্র পাবে (কারণ রাষ্ট্র উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক ও সেচ প্রযুক্তি ফ্রিতে সরবরাহ করবে)। লক্ষ্য মধ্যস্বত্বভোগী ও জোতদারদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে খাদ্য উৎপাদনে দেশকে অতি দ্রুত স্বনির্ভর করা।
কারখানার লভ্যাংশে শ্রমিকের অংশীদারিত্ব
শিল্প খাতে শ্রমিকদের অসন্তোষ ও ধর্মঘট বন্ধ করতে বঙ্গবন্ধু উদ্যোগ নেন যাতে শ্রমিকরা কারখানায় নিজেদের কেবল 'মজুরিভুক্ত গোলাম' মনে না করেন। শিল্পের উৎপাদিত মোট লভ্যাংশের (Profit) একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি শ্রমিকদের মধ্যে বন্টন করার আইনি আদেশ জারি করা হচ্ছিল। এতে শ্রমিকের কাজের আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে এবং কারখানার মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব চিরতরে দূর হবে বলে মনে করা হয়েছিল।
আমলাতন্ত্রকে জনমুখী সেবকে রূপান্তর
ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানি শাসনামলের উচ্ছিষ্ট ‘প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র’ আমূল বদলে দেওয়ার লড়াই ঘোষণা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু বারবার প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সতর্ক করে বলেছিলেন:
"আপনারা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলেন। আপনারা জনগণের কেনা গোলাম নন, আপনারা জনগণের সেবক।"
বাকশাল প্রশাসনিক অফিসারদের এসি ঘর থেকে বের করে সরাসরি সাধারণ কৃষক-শ্রমিকের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করেছিল।
বাকশাল কি একনায়কতন্ত্রের সূচনা?
বাকশাল গঠনের সাথে সাথেই সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের বদলে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু হয়। এর ফলে আওয়ামী লীগসহ সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়। চারটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পত্রিকা রেখে বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। নাগরিক অধিকার সংকুচিত করে বিচার বিভাগের ক্ষমতা হ্রাস করা হয়।
বদরুদ্দিন উমর বলেছেন, বাকশাল ছিল একনায়কতন্ত্র, সেজন্য মানুষ তা গ্রহণ করেনি। তবে শেখ মুজিব বাকশালকে দ্বিতীয় বিপ্লব হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন।

"বাকশাল গঠনের পরে দেশের ওপর ফ্যাসিস্ট জুলুম আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। সব দলকে বন্ধ করে দিয়ে, নিষিদ্ধ করে দিয়ে, সব খবরের কাগজ নিষিদ্ধ করে দিয়ে লোকজনকে ধরপাকড় করে ব্যাপকভাবে জুলুম করেছিলেন।"
বিশ্লেষকদের অনেকে আবার পটভূমিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলছিলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর প্রত্যাশা অনুযায়ী গণতন্ত্রের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়নি। সেকারণে রাজনীতি এবং অর্থনীতি সব দিক থেকেই বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। শেখ মুজিবের ক্ষমতা অল্প সময়ের মধ্যেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল।
"একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে দেশটা স্বাধীন হয়েছিল। এই যুদ্ধের সময় জনগণের মাঝে আশা আকাঙ্খা যেমন বেড়েছিল, সে রকম জনগণ এটাও বুঝেছিল যে, আবার দরকার হলে আমরা অস্ত্র ধরে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবো। যেটা বামপন্থীরা করেছিল। তাঁর রেজিমকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।"
"উনিতো গণতন্ত্র পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন নাই। তার আগেইতো উনার রেজিমকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এই বামরা এবং বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, তারা সেটা করেছিল। সেজন্য এটা করা হয়েছিল। এটা আমার বিশ্লেষণ।"
খুরশিদা বেগম বাকশালকে দেখেন শেখ মুজিবের দর্শন হিসাবে: "এটি বঙ্গবন্ধুর দর্শন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। ঐ মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা, সেটাকে একটা পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর দর্শনকে বাকশাল রুপে এনে সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।"
গণতন্ত্র পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার আগেই এই ব্যবস্থা জনগণের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল। বদরুদ্দিন উমর মনে করেন, কৃষক-শ্রমিকের নাম নেওয়া হলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের ওপর আমলাতান্ত্রিক ও দলীয় জুলুম বেড়ে গিয়েছিল।
বাকশাল নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তুষ্টি
বাকশালকে কৃষক শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা এবং সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি হিসাবে তুলে ধরেন এর সমর্থকরা। কিন্তু সে সময় বাকশাল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছিল এবং সেজন্য এর পক্ষে জনসমর্থন পায়নি বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলছিলেন, বাকশালের আদর্শের ভিত্তিতে এবং সাংগঠনিক কাঠামোতে দুর্বলতা ছিল।

"এটা মূলত আদর্শের ভিত্তিটা অত্যন্ত দুর্বল ছিল। কারণ বাকশালের মতো একটা ওয়ান পার্টি স্টেট করতে হলে সেই পার্টিটার গ্রাম গঞ্জ সর্বত্র একেবারে কমিউনিস্ট পার্টির মতো মানুষের মাঝে ঢুকে যেতে হয়।”
"আদর্শের ভিত্তিটাকে একেবারে স্ট্রং করে নিয়ে আসতে হয় গ্রাসরুট লেভেল থেকে। সেই ভিত্তিটাতো ছিল না। সেজন্য জনগণের মধ্যে অসন্তুষ্টি দেখা দিয়েছিল।"
বাকশালের ফলাফল ও উল্লেখযোগ্য সাফল্য
একদল মানুষ খুব সহজেই বলে দেন, “বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে দেশ রসাতলে গিয়েছিল।” কিন্তু একবারও কি আমরা গভীরে গিয়ে দেখেছি, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে কোন অবস্থার প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু বাকশাল প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়েছিলেন? বাকশালের যেমন সমালোচনা রয়েছে, তেমনি উল্লেখযোগ্য সাফল্যও রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্য দমন
৯ মাসের যুদ্ধে মানুষের হাতে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র রয়ে গিয়েছিল। এর পাশাপাশি পাকিস্তানি দোসর, অতি-বামপন্থী চরমপন্থীদের সশস্ত্র তৎপরতা এবং সীমান্ত দিয়ে পণ্য পাচার বা চোরাচালান নবজাতক রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছিল।
বাকশাল গঠনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। সে সময় রাতের আঁধারে থানা লুট করা, পাটের গুদামে আগুন দেওয়া এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যার মতো ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, পশ্চিমা ধাঁচের বহুদলীয় গণতন্ত্রের শিথিলতা ব্যবহার করে একদল মানুষ দেশকে অস্থিতিশীল করছে। বাকশালের মাধ্যমে তিনি একটি কেন্দ্রীয় কমান্ডিং সিস্টেম চালু করেন, যার ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো সরাসরি তদারকির আওতায় আসে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই চোরাচালান ও কালোবাজারি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও দুর্নীতিমুক্ত আমলাতন্ত্র
ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানি আমল থেকে আমরা যে আমলাতান্ত্রিক কাঠামো উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলাম, তা ছিল মূলত ‘শাসক’ সুলভ, ‘সেবক’ সুলভ নয়। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন এই কাঠামো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে। বাকশালের অধীনে সরকারি কর্মকর্তা বা আমলাদের জনগণের মুখোমুখি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, "সরকারি কর্মচারীরা জনগণের কেনা গোলাম নয়।"
তিনি চেয়েছিলেন আমলারা যাতে এসির নিচে বসে ফাইল সই না করে সরাসরি মাঠে গিয়ে মানুষের সমস্যার সমাধান করে। এতে করে সাধারণ মানুষের মাঝে একধরনের স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছিল।
জেলা গভর্নর ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ
বাকশালের সবচেয়ে আধুনিক পদক্ষেপ ছিল দেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া। ১৯৭৫ সালে তিনি মহকুমাগুলোকে জেলায় উন্নীত করে মোট ৬১টি জেলা গঠন করেন। প্রতিটি জেলায় একজন করে ‘গভর্নর’ নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। এই গভর্নররা কেবল রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, বরং তাদের অধীনেই ছিল জেলার আইন-শৃঙ্খলা এবং উন্নয়ন কাজ।
এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। স্থানীয় সমস্যা স্থানীয়ভাবেই সমাধান করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল এই গভর্নরদের। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম এবং সবচেয়ে সাহসী প্রশাসনিক সংস্কার, যা সফল হলে আজ হয়তো আমাদের প্রতিটি জেলা এক একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক হাব হিসেবে গড়ে উঠত।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠন
বাকশালের অর্থনৈতিক মডেলে কৃষক ও শ্রমিককে রাষ্ট্রের মালিকানায় অংশীদার করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কারখানার শ্রমিকরা যাতে কেবল বেতনভুক্ত কর্মচারী না থেকে লভ্যাংশের অংশীদার হতে পারে, সেই লক্ষ্য নিয়ে আইন প্রণয়নের কাজ চলছিল। অন্যদিকে কৃষকদের জন্য ‘বাধ্যতামূলক বহুমুখী সমবায়’ ব্যবস্থায় কৃষকের জমির মালিকানা ঠিক থাকবে, কিন্তু চাষাবাদ, সার, বীজ এবং বিপণন হবে সমবায়ের মাধ্যমে। এতে করে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হতো এবং কৃষকের প্রকৃত আয় বহুগুণ বেড়ে যেত।
খাদ্য উৎপাদন ও কৃষিতে স্বনির্ভরতার যুদ্ধ
১৯৭৪ সালের বৈশ্বিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ খাদ্য ঘাটতির পর বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভর করে সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন। তাই বাকশাল গঠনের পর কৃষি খাতে রাষ্ট্রীয় তদারকি বাড়ানো হয়। উন্নত জাতের বীজ, সার এবং সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রতিটি গ্রামে সমবায় গঠনের কাজ শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা ছিল, বাংলাদেশের উর্বর মাটিকে ব্যবহার করে বছরে তিনটি ফসল ফলানো। তিনি প্রায়ই বলতেন, "আমার দেশের মাটি যদি থাকে, আর আমার দেশের মানুষ যদি থাকে, তবে আমি এই সোনার বাংলা গড়বই।"
বাকশালের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ১৯৭৫ সালে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছিল, যা ছিল সেই কৃষি বিপ্লবেরই প্রাথমিক ইঙ্গিত।
জাতীয় ঐক্য গঠন “এক মঞ্চে এক দেশ”
মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে রাজনৈতিক অনৈক্য চরমে পৌঁছেছিল। বিভিন্ন দল ও উপদল নিজেদের স্বার্থে দেশকে বিভক্ত করে ফেলছিল। বাকশাল কোনো একক দলের শাসন ছিল না, বরং এটি ছিল ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি এবং আওয়ামী লীগের মতো প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তির একটি মোর্চা।
তিনি চেয়েছিলেন ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সেনাবাহিনী এবং পেশাজীবীদের এক জায়গায় এনে দেশ গড়ার কাজে লাগাতে। তাঁর যুক্তি ছিল, একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে হাজারটা মতভেদ নিয়ে ঝগড়া করার চেয়ে অন্তত ১০ বছর একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করা বেশি জরুরি। এই জাতীয় ঐক্যের ফলে সামাজিক স্থিতিশীলতা দ্রুত ফিরে আসছিল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, "আমি সিস্টেম পরিবর্তন করেছি যাতে চোরেরা আর চুরি করতে না পারে।"
বাকশালের মাধ্যমে তিনি যে শোষণহীন সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা ছিল বৈষম্যমুক্ত এক আধুনিক বাংলাদেশের ভিত্তি।
বাকশালের ওপর আন্তর্জাতিক প্রভাব
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়টি ছিল বৈশ্বিক 'স্নায়ুযুদ্ধ' (Cold War)-এর চরম উত্তেজনাকর পর্ব। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লক, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ধনতান্ত্রিক পুঁজিবাদী ব্লক।
বঙ্গবন্ধু যখন বাকশাল গঠন করেন, তখন তাঁর নীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সোশালিস্ট মডেলের স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। সিপিবি এবং ন্যাপের সাথে বঙ্গবন্ধুর এই মৈত্রী পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্ব, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের ক্ষুব্ধ করে তোলে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এবং তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করেছিল, বাকশালের মাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে সোভিয়েত ব্লকের রাজনৈতিক কক্ষপথে ঢুকে পড়ছে। ফলে বাকশাল গঠনের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শেখ মুজিব সরকারকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে আরও বেশি নিঃসঙ্গ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি করে তোলে।
বাকশাল কি সফল হতে পারতো?
বাকশাল ব্যবস্থা পুরোপুরিভাবে মাঠপর্যায়ে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ১৯৭৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর থেকে। কিন্তু সেই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার মাত্র ১৫ দিন আগে, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের কালরাতে সপরিবারে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক জান্তা ও খন্দকার মোশতাক সরকার প্রথমেই সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী ও বাকশাল ব্যবস্থাকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে। ফলে বাকশাল ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির গতিপথ কতটা বদলে দিতে পারতো, নাকি এটি দেশকে এক চরম একনায়কতান্ত্রিক সংকটে নিপতিত করত তা যাচাই করার ঐতিহাসিক সুযোগ আর বাংলাদেশ পায়নি।
আওয়ামী লীগ নেতা নূহ আলম লেনিন বাকশালের পরিণতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে সঠিকভাবেই বলেছিলেন: "বাকশাল ভালো ছিল না খারাপ ছিল, তা সফল হতো নাকি ব্যর্থ হতো তা বিচার করার মতো সময় শেখ মুজিবকে দেওয়া হয়নি। তার আগেই ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এই ব্যবস্থার অপমৃত্যু ঘটানো হয়।"
অন্যদিকে সমালোচকরা মনে করেন, এই ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শিকড় কোনোদিনই মজবুত হতো না।
ইতিহাসের শিক্ষা
বাকশাল ছিল চরম সংকটে থাকা একটি নবজাতক রাষ্ট্রের জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের নেওয়া এক চরম রাজনৈতিক পদক্ষেপ। ইতিহাসবিদদের বিচারে বাকশাল ছিল মূলত একটি ‘দ্বিধাগ্রস্ত পরীক্ষা’। এক দিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের ক্ষুধা, চরমপন্থা, চোরাচালান ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত থেকে জাতিকে বাঁচানোর আকুল প্রয়াস; অন্যদিকে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক পথ সংকুচিত করে ক্ষমতার চরম কেন্দ্রীকরণ।
শেখ মুজিবুর রহমান হয়তো ভেবেছিলেন, অল্প সময়ের জন্য একটি কঠোর কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীনে এনে দেশকে স্থিতিশীল করে তিনি আবার স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে যাবেন। তিনি পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন: "আমি সেন্টিমেন্ট বুঝি... পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে, দেশ সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হলে আমি আবার বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসব।"
কিন্তু নিষ্ঠুর নিয়তি ও ঘাতকের বুলেট তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি। ফলে বাকশাল আজও বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় একই সাথে এক চরম বিতর্কিত একদলীয় সিদ্ধান্ত এবং শোষিতের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক অধরা স্বপ্ন হিসেবে রয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা















