>

>

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও মহাকাব্যিক ১০ জানুয়ারি – Thus I entered, thus I go

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও মহাকাব্যিক ১০ জানুয়ারি – Thus I entered, thus I go

ইতিহাসের মহাকাব্যিক ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ১টা ৪১ মিনিট। তেজগাঁও বিমানবন্দরের আকাশে একটি ব্রিটিশ রাজকীয় কমেট বিমান দেখা যাচ্ছে। নিচে কয়েক লক্ষ মানুষের উত্তাল সমুদ্র। সেই বিমানে করে ফিরে আসছেন এমন এক ব্যক্তি, যাঁর অনুপস্থিতিতে একটি দেশ স্বাধীন হয়েছে, যাঁর নামে ৭ কোটি মানুষ (তৎকালীন সময়ে) জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছে। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে মৃত্যুর প্রহর গুনে তিনি ফিরছেন তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে।

TruthBangla

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও মহাকাব্যিক ১০ জানুয়ারি – Thus I entered, thus I go

১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি। স্বাধীন বাংলাদেশের ক্যালেন্ডারে এটি কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি সদ্যোজাত সার্বভৌম রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ আত্মপ্রকাশের মহাকাব্যিক মুহূর্ত। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ১টা ৪১ মিনিট। তেজগাঁও বিমানবন্দরের সুনীল আকাশে ধীরে ধীরে দেখা দিল একটি ব্রিটিশ রাজকীয় কমেট বিমান। রানওয়ের চারপাশে এবং সমবেত ঢাকা নগরীর রাজপথে তখন লাখো মানুষের উত্তাল জনসমুদ্র। সেই সমুদ্রে অশ্রু, আবেগ, ক্লান্তি আর অর্জনের অনাবিল আনন্দ একাকার হয়ে গিয়েছিল। সেই বিমানে চড়ে নিজ স্বাধীন স্বভূমিতে ফিরে আসছিলেন এমন এক মহাকাব্যিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর অনুপস্থিতিতে একটি গোটা দেশ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, যাঁর অমর নামটি বুকের ভেতরের অগ্নিশিখা বানিয়ে তৎকালীন সাত কোটি বাঙালি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবন বাজি রেখেছিল। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানের অন্ধকার ও নির্মম প্রকোষ্ঠে মৃত্যুর প্রহর গুনে, যে কবরের পাশে তাঁকে দাঁড় করানো হয়েছিল সেই মৃত্যুকূপকে পেছনে ফেলে, তিনি অবশেষে ফিরছিলেন তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয়েছিল ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সামরিক বিজয়। কিন্তু সেই বিজয় যেন ছিল আত্মা ছাড়া এক দেহ অসম্পূর্ণ, রূপক ও গভীর উৎকণ্ঠায় ঘেরা। ১০ই জানুয়ারি জাতির পিতার স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমেই সেই অর্জিত বিজয় পূর্ণতা পেয়েছিল, অর্জিত হয়েছিল প্রকৃত রাষ্ট্রিক রূপ।

একজন আইনের শিক্ষার্থী বা আইনি বিশ্লেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বঙ্গবন্ধুর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবলই আবেগপ্রবণ এক রাষ্ট্রনায়কের দেশে ফেরা ছিল না। এর পেছনে কাজ করেছিল আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, কূটনীতি এবং সার্বভৌমত্বের এক গভীর ও নিগূঢ় সমীকরণ।

'হৃদয় তোর রতনরাশি' ও টিডব্লিউএআইএল (TWAIL)

জন্ম-পরিক্রমা থেকেই আন্তর্জাতিক আইনের পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ কিছু অনন্য ও সুন্দরতম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ১৯৭১-৭২ সালের সেই ভঙ্গুর দিনগুলোতে বাহ্যিক ও অর্থনৈতিক চেহারায় বাংলাদেশ নিঃস্ব, যুদ্ধবিধ্বস্ত ও ‘গরিব’ হলেও, এই দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, আইনি ভিত্তি ও শাসনতান্ত্রিক ঐতিহ্য ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও ঋদ্ধ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর গানটির কথা এ প্রসঙ্গে গভীরভাবে মনে পড়ে-

“যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক, আমি তোমায় ছাড়বো না মা!
কে বলে তোর দরিদ্র ঘর, হৃদয় তোর রতনরাশি।”

আমাদের জাতীয় ও দেশজ মনন সত্যি আইনি ও নীতিগত ‘রতনে’ ভরপুর। আমি যেহেতু আইনের একজন তালেবে এলেম (শিক্ষার্থী), তাই আন্তর্জাতিক আইনের জটিল নীতিমালার নিরিখে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করাকে আমার নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব বলে মনে করি।

আন্তর্জাতিক আইনের ধারায় বিশ্বকে দেখার একটি বহুল আলোচিত তত্ত্ব রয়েছে, যাকে বলা হয় TWAIL (Third World Approaches to International Law) বা ‘আন্তর্জাতিক আইনের আন্তর্জাতিক তৃতীয় বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি’। পাশ্চাত্য রাষ্ট্রগুলো যেভাবে আন্তর্জাতিক আইনকে নিজেদের সুবিধাজনক কাঠামোয় সংজ্ঞায়িত করে এসেছে, উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সেই চশমা খুলে নিজস্ব রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতা থেকে আন্তর্জাতিক আইনি নীতি গড়ে তুলেছিল।

১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের জিন্দানখানা থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডনে গমন, সেখান থেকে দিল্লিতে স্বল্প সময়ের যাত্রাবিরতি এবং অবশেষে ঢাকায় পদার্পণ এই পুরো প্রক্রিয়াটির মধ্যে আন্তর্জাতিক আইনের কতকগুলো সুনির্দিষ্ট ও অত্যন্ত নিগূঢ় মাত্রা নিহিত ছিল, যা একটি নবীন রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও মহাকাব্যিক ১০ জানুয়ারি – Thus I entered, thus I go

আন্তর্জাতিক আইনি বিশ্লেষণের ত্রিমাত্রিক পরিক্রমা

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘটনাটিকে প্রধানত তিনটি মৌলিক আইনি ও কূটনৈতিক মাত্রায় বিভক্ত করে বিশ্লেষণ করা যায়:

কনফেডারেশনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ও পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌমত্ব: পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন বুঝতে পেরেছিল যে সামরিক শক্তি দিয়ে বাঙালিকে আর দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয় এবং ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় তাদের ৯৩ হাজার সৈন্য আত্মসমর্পণ করেছে, তখন পাকিস্তানের তৎকালীন ক্ষমতাধর নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এক চতুর কূট চাল চালেন। মিয়ানওয়ালি কারাগারে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে ভুট্টো তাঁর সঙ্গে দেখা করে প্রস্তাব দেন, পাকিস্তান ও সদ্যঘোষিত ‘পূর্ব পাকিস্তান’ বা বাংলাদেশের মধ্যে কোনো না কোনো রূপ ‘কনফেডারেশন’ (Confederation) বা শিথিল যৌথ আইনি সম্পর্ক বজায় রাখা হোক।

ভুট্টোর ধারণা ছিল, দীর্ঘ কারারুদ্ধতা ও মানসিক চাপের পর বঙ্গবন্ধু হয়তো এই প্রস্তাবে কিছুটা নমনীয় হবেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের একজন দূরদর্শী ধারক হিসেবে শেখ মুজিব তাৎক্ষণিকভাবে এবং অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাঁর দেশের মানুষের মতামত না জেনে এবং স্বাধীন স্বভূমিতে পা না দিয়ে তিনি কোনো বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবেন না।

আইনি তাৎপর্য: যদি সেদিন বঙ্গবন্ধু অনভিজ্ঞতা বা তাড়াহুড়োবশত কনফেডারেশনের মতো কোনো অস্পষ্ট বা শিথিল আইনি কাঠামোয় সম্মতি দিতেন, তবে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের ‘পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা’ (Absolute Sovereignty) প্রশ্নের মুখে পড়ত। পাকিস্তান আন্তর্জাতিক আদালতে ও জাতিসংঘে দাবি করতে পারত যে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র নয়, বরং তা একটি স্বায়ত্তশাসিত বা কনফেডারেট অংশমাত্র। এর ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভে চরম আইনি জটিলতায় পড়ত এবং রাষ্ট্রসমূহের উত্তরাধিকার (State Succession) সংক্রান্ত নীতিমালার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতো। বঙ্গবন্ধুর সেই অটল ও আপসহীন প্রত্যাখ্যান বাংলাদেশকে এক ধাক্কায় পূর্ণাঙ্গ ও অখণ্ড সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা এনে দেয়।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মন্টিভিডিও কনভেনশনের প্রতিফলন

লন্ডনে পৌঁছানোর পর ৮ই জানুয়ারি ক্ল্যারিজেস হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সাথে ১০ ডাউননিং স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত প্রায় ঘণ্টাব্যাপী ঐতিহাসিক বৈঠকে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জোরালো আইনি ভিত্তি তুলে ধরেন।

বঙ্গবন্ধুর অসামান্য ব্যক্তিত্ব এবং যুক্তিতে প্রভাবিত হয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ মাত্র দুই-তিন দিনের মাথায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে একটি ঐতিহাসিক চিঠি লেখেন (যা বর্তমানে ইন্টারনেটে ও ব্রিটিশ আর্কাইভে পাবলিক ডোমেইনে সংরক্ষিত রয়েছে)। সেই চিঠিতে হিথ যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন যে ব্রিটেন খুব জলদি বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে এবং আমেরিকার উচিত ভুট্টো ও পাকিস্তানকে বাস্তবধর্মী অবস্থান গ্রহণ করতে চাপ দেওয়া।

ফলাফলস্বরূপ, ১৯৭২ সালের ৪ই ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্য বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে। এরই ধারাবাহিকতায়, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাত্র এক মাসের মধ্যে বিশ্বের ৩১টি প্রভাবশালী দেশ বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ যখন জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যপদ লাভ করে, ততদিনে ৮৬টি দেশ বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিয়েছিল।

মন্টিভিডিও কনভেনশন (Montevideo Convention 1933) ও রাষ্ট্রত্ব (Statehood)

আন্তর্জাতিক আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘রাষ্ট্রের উপাদান’ ও ‘স্বীকৃতি’ বিষয়ক অধ্যায়টি অত্যন্ত মৌলিক। ১৯৩৩ সালের মন্টিভিডিও কনভেনশনের ১ম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একটি সার্থক রাষ্ট্র হওয়ার জন্য চারটি পূর্বশর্ত প্রয়োজন:
১. নির্দিষ্ট স্থায়ী জনসংখ্যা (Permanent Population)
২. সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ড (Defined Territory)
৩. কার্যকর সরকার (Government)
৪. অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক ও আইনি সম্পর্ক স্থাপনের সামর্থ্য (Capacity to enter into relations with other States)

আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্র স্বীকৃতির দুটি প্রধান তত্ত্ব প্রচলিত 'ঘোষণামূলক তত্ত্ব' (Declaratory Theory) এবং 'গঠনমূলক তত্ত্ব' (Constitutive Theory)। প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ জে. জি. স্টার্কের (J.G. Starke) 'Introduction to International Law' বইয়ের "Recognition of States" (রাষ্ট্রের স্বীকৃতি) অধ্যায়টি পাঠ করলে বোঝা যায়, কোনো রাষ্ট্র বাস্তবে টিকে থাকার পর অন্যান্য রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ কীভাবে তার আইনি সক্ষমতাকে চূড়ান্ত পূর্ণতা দেয়।

বঙ্গবন্ধুর ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব এবং দেশে ফিরে সরাসরি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করার মাধ্যমেই মন্টিভিডিও কনভেনশনের ৪ নম্বর শর্তটি (অন্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের সামর্থ্য) নিশ্চিত হয়েছিল। এর ফলে বাংলাদেশ কেবল একটি তত্ত্বগত রাষ্ট্র রইল না, বরং বিশ্বমঞ্চে এক আইনসংগত রাষ্ট্রিক সত্তা (De Jure State) হিসেবে স্থায়ী আসন লাভ করল।

'জাস পোস্ট বেলাম' ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর দ্রুত প্রত্যাবর্তন

১০ই জানুয়ারি ঢাকা আসার পথে বঙ্গবন্ধু ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি. ভি. গিরি এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উপস্থিতিতে হাজার হাজার মানুষের জনসভায় ভাষণ দেওয়ার পূর্বেই, বিমানবন্দরে রাজকীয় সংবর্ধনার ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বঙ্গবন্ধুর এক অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ঐতিহাসিক ফোনালাপ/কথোপকথন হয়।

প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর লেখা “ফল অব ঢাকা” (Fall of Dhaka) বইসহ বিভিন্ন স্মৃতিচারণমূলক সূত্রে বর্ণিত রয়েছে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক প্রোটোকল ও সৌজন্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে হঠাৎ করেই অত্যন্ত সোজা ভাষায় মিসেস গান্ধীকে প্রশ্ন করে বসেন:

"ম্যাডাম, আপনি আপনার সৈন্যবাহিনী বাংলাদেশ থেকে কবে প্রত্যাহার করছেন?"

প্রশ্নটির আকস্মিকতায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী কিছুটা বিস্মিত হলেও, বঙ্গবন্ধুর অদম্য রাষ্ট্রনায়কোচিত ব্যক্তিত্বের সামনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে উত্তর দেন:

"আপনি যখনই বলবেন! ভারতের সেনাবাহিনী আপনার জন্মদিন, অর্থাৎ ১৭ই মার্চ ১৯৭২-এর আগেই বাংলাদেশ ত্যাগ করবে।"

কথাটি কেবল মুখের কথা থাকেনি। ১৯৭২ সালের ১২ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের নির্ধারিত তারিখের পাঁচ দিন আগেই ভারতীয় মিত্রবাহিনীর শেষ রেজিমেন্টটি বাংলাদেশের মাটি ছেড়ে ভারতে ফিরে যায়।

আন্তর্জাতিক আইনের নিরিখে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব

যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজে বা সংঘাত-পরবর্তী রাষ্ট্রে বিদেশি সৈন্যের উপস্থিতি ও অবস্থানসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনকে বলা হয় "পোস্ট জাস বেলাম" (Jus Post Bellum)। আন্তর্জাতিক আইনের এই শাখাটি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল। বিদেশি কোনো মিত্রবাহিনী যুদ্ধশেষে যদি নিজ দেশে ফেরত যেতে না চায় বা বিলম্ব করে, তবে তা একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে একটি 'বেআইনি সামরিক দখল' (Illegal Occupation) বা সার্বভৌমত্বের ওপর অবৈধ হস্তক্ষেপ বলে গণ্য হয়।

বিশ্ব ইতিহাসের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আমরা দেখিসাহায্যের নামে প্রবেশ করা মিত্রবাহিনী আর সহজে সেই দেশ ত্যাগ করতে চায়নি:

দক্ষিণ কোরিয়া: ১৯৫০-এর দশকে প্রবেশ করা মার্কিন সৈন্য আজও সেখানে স্থায়ী ঘাঁটি গেড়ে রয়েছে।
আফগানিস্তান ও ইরাক: বিদেশি মার্কিন ও ন্যাটোর বাহিনীর দুই দশকের অব্যাহত অবস্থান সেখানকার সার্বভৌমত্বকে স্থায়ীভাবে ভঙ্গুর করে দিয়েছিল।
কুয়েত: প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের পর বহুজাতিক বাহিনীর ক্রমাগত উপস্থিতি।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) বিখ্যাত নামিবিয়া অ্যাডভাইজরি ওপিনিয়ন (Namibia Advisory Opinion, 1971), জেরুজালেম ওয়াল অ্যাডভাইজরি ওপিনিয়ন (2004) এবং নিকারাগুয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্র মামলা (1986)-এর সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিদেশি সৈন্যের সম্মতিহীন বা প্রলম্বিত উপস্থিতি কীভাবে সেই রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক আইনি অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বাংলাদেশকে এই করুণ ও জটিল আইনি ফাঁদে পড়তে হয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অনেক আন্তর্জাতিক ন্যারেটিভে দেখা যায়, মুজিবনগর সরকারের সাথে ভারতের একধরনের অনানুষ্ঠানিক সামরিক সমঝোতা ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে ফেরার দিনই সার্বভৌমত্বের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটিয়ে যেভাবে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট তারিখ আদায় করে নেন, তা বিশ্ব ইতিহাসের এক বিরল ব্যতিক্রম।

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতিত্বকারী একমাত্র বাংলাদেশী কূটনীতিক এবং পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এক নিবন্ধে মন্তব্য করেছিলেন:

"১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ পাকিস্তানি সৈন্যমুক্ত হয়েছিল সত্য, কিন্তু বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থে 'স্বাধীন ও সার্বভৌম' রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করেছিল ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়েই।" (মহিউদ্দিন আহমদ, জাসদের উত্থান পতন, ঢাকা, ২০১৪)।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আন্তর্জাতিক আইনি ও কূটনৈতিক প্রভাব

নিচে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের তিন মূল আইনি স্তম্ভ, আন্তর্জাতিক আইনি নীতি ও বিশ্ব রাজনীতিতে এর প্রভাব একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

আইনি মাত্রা ও ক্ষেত্র

ঐতিহাসিক ঘটনা ও বঙ্গবন্ধুর পদক্ষেপ

প্রয়োগকৃত আন্তর্জাতিক আইনি নীতি/দলিল

বিশ্ব রাজনীতি ও বাংলাদেশের ওপর স্থায়ী প্রভাব

১. কনফেডারেশন প্রত্যাখ্যান

মিয়ানওয়ালি জেলে ভুট্টো কর্তৃক প্রস্তাবিত 'শিথিল কনফেডারেশন' বা যৌথ পাকিস্তান কাঠামোর অফার সরাসরি প্রত্যাখ্যান।

- Doctrine of State Continuity

- Right to Self-Determination

বাংলাদেশ কোনো অংশিদারী বা বিভাজিত ভূখণ্ড হিসেবে নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

২. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন

লন্ডনে এডওয়ার্ড হিথের সাথে বৈঠক; হিথ কর্তৃক নিক্সনকে চিঠি প্রেরণ এবং মাত্র ১ মাসে ৩১টি ও পরে ৮৬টি দেশের স্বীকৃতি লাভ।

- Montevideo Convention 1933 (Art. 1)

- J.G. Starke's Recognition Theory

বাংলাদেশে কার্যকর সরকার (De Jure Govt) প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের দ্বার উন্মোচিত হয়।

৩. বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহার

দিল্লিতে নেমেই ইন্দ্রিরা গান্ধীকে সরাসরি সৈন্য প্রত্যাহারের প্রশ্ন; ১২ মার্চ ১৯৭২-এর মধ্যে ভারতীয় সৈন্য অপসারণ সম্পন্ন।

- Jus Post Bellum (পোস্ট-কনফ্লিক্ট আইন)

- ICJ Namibia Opinion (1971)

বাংলাদেশ সামরিক দখলের আইনি বিপদ থেকে রক্ষা পায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিরপেক্ষ সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হয়।

সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রবৈজ্ঞানিক মাত্রা: রেসকোর্সের ভাষণ ও রাষ্ট্র পুনর্গঠন

১০ই জানুয়ারি বিকেলে তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে সোজা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) গিয়ে বঙ্গবন্ধু যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, তার রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অপরিসীম। লাখো অশ্রুসজল জনতার সামনে দাঁড়িয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেছিলেন:

"কবিগুরু, তুমি বলেছিলে 'সাত কোটি বাঙালিরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ সন্তান করে মানুষ করোনি।' তুমি দেখে যাও, তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে!"

সেই ভাষণে কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না, ছিল সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র (শোষণহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা), গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এর স্পষ্ট রূপরেখা, যা পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ৪ই নভেম্বর গৃহীত বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের মূল ভিত্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

একই সাথে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নবীন বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির মূলমন্ত্র ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু সেদিন বলেছিলেন:

"সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়" (Friendship to all, malice towards none)।

এই একটি বাক্য আন্তর্জাতিক পাবলিক আইনের (Public International Law) শান্তি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান (Peaceful Coexistence) নীতিকে বাংলাদেশের পরনীতির প্রধান স্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

মোহনলাল ভাস্করের পর্যবেক্ষণ ও ১৫ই আগস্টের অন্ধকার

বঙ্গবন্ধুর ওপর পাকিস্তানি কতৃপক্ষের নির্মম নির্যাতন ও মৃত্যুঝুঁকিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন এমন একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন ভারতীয় গুপ্তচর মোহনলাল ভাস্কর। পাকিস্তানি কারাগারে বন্দি থাকাকালীন তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রকোষ্ঠের ঠিক পাশেই ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর রচিত বহুল পঠিত গ্রন্থ “An Indian Spy in Pakistan” (Srishti Publishers, New Delhi, 2012, Page 252)-এ ভাস্কর অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও দার্শনিক একটি পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করেছেন:

"আজও শেখ মুজিব মিয়ানওয়ালি জেলে যে দিনগুলো কাটিয়েছেন তা আমাকে তাড়া করে। বারবার তারা তাঁর গলার ফাঁস প্রস্তুত করত এবং তাঁর প্রাণহীন দেহ গ্রহণের জন্য একটি কবর খনন করত .... কিন্তু শত্রুদের হাতে তিনি মারা যাননি। তিনি তাঁর নিজের লোকদের হাতে মারা গিয়েছিলেন যাদের তিনি তাঁর সন্তান বলে ডাকতেন। এটা সত্যিই বলা হয় যে, ভাগ্যের নেকড়ে একজন মানুষকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়ায়, তাকে ক্লান্ত করে এবং যখন সে ক্লান্ত ও শ্রান্ত হয়ে পড়ে তখন সেই নেকড়ে তাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে এবং গ্রাস করে।"

কী করুণ ও অদ্ভুত নিয়তি! যে পাকিস্তানের জল্লাদ বাহিনী, যারা কামানের নল ও ফাঁসির দড়ি উঁচিয়েও জাতির পিতাকে মারতে পারেনি, ১০ই জানুয়ারি যিনি বীরের বেশে বিজয়ী হয়ে নিজ দেশে ফিরলেন, মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট এই বাংলার মাটিতেই কিছু পথভ্রষ্ট গাদ্দার সেনা কর্মকর্তা এবং দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীদের বুলেটের আঘাতে তাঁকেই সপরিবারে প্রাণ দিতে হলো!

রবার্ট ব্রাউনিঙের 'দ্য পেট্রিয়ট' এবং শেখ মুজিবের জীবন-মহাকাব্য

১০ই জানুয়ারির সেই অবিস্মরণীয় আনন্দ-উৎসব, মানুষের দিগন্তবিদারি উল্লাস এবং পরবর্তীতে ১৫ই আগস্টের নির্মম ট্র্যাজেডি এই বৈপরীত্য চিন্তা করলে ভিক্টোরিয়ান যুগের বিখ্যাত ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিং (Robert Browning)-এর কালজয়ী কবিতা 'দ্য প্যাট্রিয়ট' (The Patriot, 1855)-এর কথা গভীরভাবে মনে পড়ে। আমাদের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণীতে ইংরেজি সাহিত্যে কবিতাটি পাঠ্য ছিল।

কবিতাটির দিকে তাকালে দেখা যায়, একজন দেশপ্রেমিক (Patriot) যখন যুদ্ধে জয়ী হয়ে স্বদেশে ফিরেছিলেন, তখন সমগ্র শহর জুড়ে উৎসবের আমেজ ছিল। রাস্তায় রাস্তায় ছিটানো ছিল তাজা গোলাপ ও মার্টল ফুল, গির্জার চূড়ায় চূড়ায় বাজছিল আনন্দের ঘণ্টা, বাতাসে ভাসছিল লাখো মানুষের জয়ধ্বনি।

কবিতার ভাষায়:

"It was roses, roses, all the way,
With myrtle mixed in my path like mad:
The house-roofs seemed to heave and sway,
The church-spires flamed, such flags they had,
A year ago on this very date."

উচ্ছ্বসিত জনগণ সেদিন সেই দেশপ্রেমিককে বলেছিল তুমি যা চাইবে, আমরা তা-ই দেব। এমনকি আকাশ থেকে সূর্যটা এনে দিতে বললেও আমরা এনে দেব।

কিন্তু সেই প্যাট্রিয়ট সাধারণ চাওয়ায় সন্তুষ্ট হননি। গ্রীক পৌরাণিক চরিত্রের 'ইকারুস'-এর মতো ডানায় মোম লাগিয়ে তিনি নিজেই উর্ধ্বে উঠেছিলেন তাঁর দেশের মানুষের জন্য সূর্য (অর্থাৎ পরম স্বাধীনতা) ছিনিয়ে আনতে। কবি বলছেন, তিনি দেশের মানুষের ভালো করার জন্য নিজের জীবন বাজি রাখতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি।

কিন্তু হায়! মাত্র এক বছর যেতে না যেতেই সেই একই দেশের মানুষ তাঁকে ভুল বুঝল। তাঁর সমস্ত ত্যাগ ভুলে গিয়ে তাঁকে ‘ব্যর্থ’ আখ্যা দিয়ে, রসি দিয়ে তাঁর হাত দুটো শক্ত করে বেঁধে, কপালে আঘাত করে রক্ত ঝরিয়ে বৃষ্টির মধ্যে বধ্যভূমিতে নিয়ে গেল হত্যা করার জন্য! বধ্যভূমির দিকে হেঁটে যেতে যেতে প্যাট্রিয়ট দেখছেন, রাজপথ আজ জনশূন্য। কেবল কিছু পঙ্গু ও প্রান্তিক মানুষ জানালা দিয়ে অবাক হয়ে দেখছে।

তখন প্যাট্রিয়ট বিয়োগান্তক সুর তুলে মনে মনে ভেবেছিলেন:

"Thus I entered, and thus I go!
In triumphs, people have dropped down dead.
‘Paid by the world, what dost thou owe
Me?’ – God might question; now instead,
‘Tis God shall repay: I am safer so."

(বাংলা ভাবানুবাদ:
এভাবেই আমি এসেছিলাম অগণিত পুষ্পবৃষ্টির মাঝে, আর এভাবেই আজ চলে যাচ্ছি রক্তাক্ত হয়ে!
মানুষ তাদের বিজয়ের চরম মুহূর্তে নীতি ভুলে গিয়ে নিথর হয়ে পড়ে।
বিধাতা হয়তো পরকালে আমাকে প্রশ্ন করবেন 'দুনিয়ার মানুষের কাছ থেকে তো পুরষ্কার ও প্রতিদান পেয়েছ, আমার কাছে আর কি চাও?'
আমার কোনো জবাব থাকবে না। তবে আজ পৃথিবীর এই অবিচার দেখে মনে হচ্ছে, বিধাতাই আমাকে প্রকৃত প্রতিদান দেবেন; আর সেখানেই আমি সবচেয়ে নিরাপদ।)
রবার্ট ব্রাউনিং গোলাপ, সূর্য, মোমের ডানা, শিলাবৃষ্টি আর রক্তের অদ্ভুত সব ইমেজেরি (Imagery) দিয়ে এক করুণ বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও পরাধীনতার অন্ধকার থেকে বাঙালির জন্য স্বাধীনতার সূর্যটা ছিনিয়ে আনতে গিয়ে নিজের জীবনের সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ক্ষয় করে দিয়েছিলেন। জীবনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় (১৩ বছরেরও বেশি) তিনি কাটান অন্ধকার কারাগারে। তিনি চেয়েছিলেন সোনার বাংলা গড়তে, চেয়েছিলেন ‘সোনার মানুষ’। কিন্তু দীর্ঘ গোলামির জিনজির পর রাতারাতি পরম সৎ ও সোনার মানুষ হওয়া তৎকালীন অরাজক সমাজে সম্ভব হয়নি।

পাকিস্তানি শাসক আর আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তে, এই দেশেরই কিছু অর্থলোভী, পদলোভী সেনা গাদ্দার ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রীরা সেই মহামানবকে বুলেটের আঘাতে চালঝাঁঝরা করে দিল। যে হাত দুটি বাঙালিকে স্বাধীনতা দিয়েছিল, সেই হাত দুটোকেই রক্তে রঞ্জিত করা হলো।

৮ থেকে ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২: বঙ্গবন্ধুর যাত্রাপথের পরিক্রমা

বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও স্বদেশে ফেরার পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক রোমাঞ্চকর ও নাটকীয় অধ্যায়।

লন্ডন পৌঁছানো ও ক্ল্যারিজেস হোটেলের ঐতিহাসিক সংবাদ সম্মেলন (৮ই জানুয়ারি): ১৯৭২ সালের ৮ই জানুয়ারি ভোর সাড়ে ৬টায় পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের (PIA) একটি বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। ভুট্টো তাঁকে রিলিজ করলেও সোজা ঢাকায় পাঠাতে চাননি, চেয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের মাধ্যমে একটি কূটনৈতিক মধ্যস্থতা তৈরি করতে।

ক্ল্যারিজেস হোটেল: হিথ্রোতে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা ইয়ান সাদারল্যান্ড। সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্র লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী 'ক্ল্যারিজেস হোটেলে' (Claridge's Hotel)। খবর ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে শত শত প্রবাসী বাঙালি ও বিশ্ব গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা হোটেলের সামনে ভিড় জমান।

সংবাদ সম্মেলন: ক্ল্যারিজেস হোটেলের বলরুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের অন্যতম প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য দেন। তিনি উচ্চারণ করেন:

"আজ আমি মুক্ত। আমি আমার স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছি... বাংলাদেশ একটি অমলিন বাস্তব। এটিকে আর কখনো মুছে ফেলা যাবে না।"

১০ ডাউননিং স্ট্রিটে বৈঠক ও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের অভূতপূর্ব প্রোটোকল: লন্ডনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ এবং বিরোধীদলীয় নেতা হ্যারোল্ড উইলসনের সাথে বঙ্গবন্ধুর পৃথক বৈঠক হয়।

ঐতিহাসিক প্রোটোকল লঙ্ঘন: আন্তর্জাতিক প্রোটোকল অনুযায়ী, কোনো দেশের অনস্বীকৃত বা নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সরাসরি ১০ ডাউননিং স্ট্রিটের দরজায় এসে গাড়ি খোলার নিয়ম নেই। কিন্তু এডওয়ার্ড হিথ বঙ্গবন্ধুর বিশ্বমানের ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক উচ্চতা সম্মান জানিয়ে নিজে বাইরে এসে গাড়ির দরজা খুলে দেন।

পরবর্তীতে হিথ যখন নিক্সনকে চিঠি লেখেন, তখন তিনি বলেছিলেন- "Sheikh Mujib is the undisputed leader of a new nation. Recognizing Bangladesh is merely acknowledging reality."

নয়াদিল্লি যাত্রাবিরতি ও কৌশলগত সংলাপ (১০ই জানুয়ারি সকাল): বৃটিশ রাজকীয় বিমানবাহিনীর (RAF) 'কমেট' জেটে করে বঙ্গবন্ধু লন্ডনের সাইপ্রাস ও ওমান হয়ে ১০ই জানুয়ারি সকালে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দরে পৌঁছান।

সেখানে তাঁকে ২১ বার তোপধ্বনি দিয়ে স্বাগত জানান ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি. ভি. গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং পুরো মন্ত্রিপরিষদ।

নয়াদিল্লির প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় বঙ্গবন্ধু বাংলায় ভাষণ দেন এবং শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বসেন। সেখানেই অত্যন্ত সুচতুর ও দৃঢ় কূটনৈতিক চাতুর্যের সাথে তিনি ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেন।

ভূ-রাজনীতি ও পরাশক্তি সমীকরণ (১৯৭২ সালের বিশ্বরাজনীতি)

বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের সময় বিশ্বরাজনীতি প্রধানত দুই মেরুতে বিভক্ত ছিল (স্নায়ুযুদ্ধকাল):

সোভিয়েত ইউনিয়নের অবদান ও চট্টগ্রাম বন্দর উদ্ধার অভিযান: মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়ে আসছিল। ১০ই জানুয়ারির পর বাংলাদেশ যখন অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে ধ্বংসস্তূপের মুখোমুখি, তখন পাকিস্তানি বাহিনীর পুঁতে রাখা মাইন এবং ডুবে যাওয়া জাহাজের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর ও চালনা (মংলা) বন্দর পুরোপুরি অচল ছিল।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে মস্কো সফর করেন। তাঁর অনুরোধে সোভিয়েত ইউনিয়নের নৌপ্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল সের্গেই জুয়েনকোর (Rear Admiral Sergei Zuyenko) নেতৃত্বে советский নৌবাহিনীর মাইন অপসারণকারী একটি বিশাল দল চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। তারা দীর্ঘ ২৪ মাস জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রে মাইন পরিষ্কার করে চট্টগ্রাম বন্দরকে পুনরায় সচল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপযোগী করে তোলে।

মার্কিন কূটনীতি ও হেনরি কিসিঞ্জারের অবস্থান পরিবর্তন: ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার স্পষ্টতই পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন (Seventh Fleet প্রেরণ ইত্যাদি)।

কিন্তু ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরে সরকার গঠন করার পর এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ঢল নামায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের অবস্থান বদলাতে বাধ্য হয়। ১৯৭২ সালের ৪ই মে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

কমনওয়েলথ ভুক্তি ও পাকিস্তানের ক্ষোভ: ১৯৭২ সালের ১৮ই এপ্রিল বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে 'কমনওয়েলথ' (Commonwealth of Nations)-এর সদস্যপদ লাভ করে।

এর প্রতিবাদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ক্ষুব্ধ হয়ে তড়িঘড়ি করে পাকিস্তানকে কমনওয়েলথ থেকে বের করে নেন (যদিও পরবর্তীতে পাকিস্তান আবার কমনওয়েলথে ফিরে আসে)।

ওআইসি (OIC) ও ইসলামিক বিশ্বের সাথে কূটনীতি: শুরুতে অনেক মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশকে "পাকিস্তানের অঙ্গচ্ছেদকারী" হিসেবে মনে করত। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী কূটনীতির কারণে ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সম্মেলন সংস্থার (OIC) সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

বঙ্গবন্ধু সেখানে শর্ত দেন পাকিস্তানি শাসককে লাহোর বিমানবন্দরে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে হবে। ভুট্টো তা মেনে নেন এবং ১৯৭৪ সালেই সৌদি আরব, মিশর, পাকিস্তানসহ প্রধান মুসলিম দেশগুলো বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

'প্রেসিডেন্সিয়াল' থেকে 'পার্লামেন্টারি' সরকার

১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের আইনি কাঠামোর ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক মোড় ঘুরিয়ে দেয়:

প্রোক্লেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স (১০ই এপ্রিল ১৯৭১): এটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী আইনি ভিত্তি, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছিল একনায়কত্বমূলক বা রাষ্ট্রপতিশাসিত (Presidential) সরকার ব্যবস্থা হিসেবে। মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানই ছিলেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

অস্থায়ী সংবিধান আদেশ (Provisional Constitution Order, 11th January 1972): স্বদেশে পা রাখার পরের দিনই (১১ই জানুয়ারি) বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর বিশেষ ক্ষমতাবলে 'অস্থায়ী সংবিধান আদেশ, ১৯৭২' জারি করেন।

সংসদীয় গণতন্ত্রে অভিষেক (১২ই জানুয়ারি): বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকা উচিত। তাই তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ত্যাগ করে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করেন এবং নিজে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এটি বিশ্ব ইতিহাসে বিরল একটি উদাহরণ যেখানে একজন স্বঘোষিত বা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নেতা স্বেচ্ছায় নিজের পদমর্যাদা নামিয়ে এনে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

১০ মাসে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান রূপায়ন: বঙ্গবন্ধুর একক নির্দেশনায় ১৯৭২ সালের ৪ঠা নভেম্বর (মাত্র ১০ মাসের মধ্যে) গণপরিষদে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭২ থেকে তা কার্যকর হয়।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দী ও ত্রিদেশীয় চুক্তি

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বঙ্গবন্ধুর সামনে সবচেয়ে বড় আইনি ও মানবিক চ্যালেঞ্জ ছিল ৯৩,০০০ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দী (POWs) এবং পাকিস্তানে আটকে থাকা প্রায় ৩ লাখ নির্দোষ বাঙালিকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা।

১৯৫ জন চিহ্নিত পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী: বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৫ জন সুনির্দিষ্ট পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাকে (যেমন: জেনারেল নিয়াজী, রাও ফরমান আলী প্রমুখ) চিহ্নিত করেছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন (Geneva Conventions) এবং আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী আইনের অধীনে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এই উদ্দেশ্যে ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদে "International Crimes (Tribunals) Act, 1973" পাস করা হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনি ইতিহাসে একটি পথিকৃৎ আইন।

ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও ট্রাইপার্টাইট চুক্তি: পাকিস্তান ও তার বন্ধু রাষ্ট্রসমূহ (বিশেষ করে চীন) বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক স্তরে কোণঠাসা করার চেষ্টা করে। চীন ১৯৭২ সালের আগস্টে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদের আবেদন আটকে দিতে প্রথম ভিটো (Veto) প্রয়োগ করে।

একই সাথে পাকিস্তান হুমকি দেয় যে ১৯৫ জন সেনা কর্মকর্তার বিচার করলে পাকিস্তানে বন্দি থাকা ৩ লাখ বাঙালিকে কোনো দিন ফিরতে দেওয়া হবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের বিচার করা হবে।

মানবতা এবং নিজ দেশের ৩ লাখ নিষ্পাপ নাগরিকের জীবন রক্ষার্থে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত কঠিন এক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হন। অবশেষে ১৯৭৪ সালের ৯ই এপ্রিল নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি (Tripartite Agreement) স্বাক্ষরিত হয়। পাকিস্তান গণহত্যা ও নির্যাতনের জন্য অনানুষ্ঠানিক অনুশোচনা প্রকাশ করে এবং কথা দেয় যে এই ১৯৫ জনকে পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে তাদের নিজস্ব সামরিক আইনে বিচার করা হবে। বাংলাদেশ ৩ লাখ বাঙালির জীবন রক্ষার্থে যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দিতে সম্মত হয়।

প্রথম পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থনীতি পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক সংগ্রাম

১৯৭২ সালে পাকিস্তান বাহিনী কেবল গণহত্যাই চালায়নি, তারা বাংলাদেশের অর্থব্যবস্থা, ব্যাংক নোট, খাদ্য গুদাম এবং যোগাযোগ অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছিল। ইউএসআইডি (USAID)-এর রিপোর্টে তখন বাংলাদেশকে 'তলাবিহীন ঝুড়ি' (Bottomless Basket) বলে আখ্যা দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছিল।

অর্থনৈতিক রূপরেখা ও জাতীয়করণ: বঙ্গবন্ধু সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমতাভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতীয়করণ নীতি গ্রহণ করেন। পরিত্যক্ত ব্যাংক, পাটকল, বস্ত্রকল ও চা বাগানসমূহকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় এনে উৎপাদন সচল করা হয়।

বিখ্যাত পরিকল্পনা কমিশন (Planning Commission): ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতেই বঙ্গবন্ধু দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে গঠন করেন প্রথম 'বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন'। এর নেতৃত্বে ছিলেন:

ড. নুরুল ইসলাম (ডাইরেক্টর)
অধ্যাপক রেহমান সোবহান
ড. আনিসুর রহমান
ড. মোশাররফ হোসেন

প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (1973-1978): মাত্র এক বছরের মাথায় ১৯৭৩ সালে কমিশন প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রকাশ করে, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে দাঁড় করানোর বৈপ্লবিক কৌশলপত্র ছিল।

বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের দিন বঙ্গমাতা ও পরিবারের দৃশ্যপট

১০ই জানুয়ারি যখন সমগ্র ঢাকা শহর আনন্দে আত্মহারা, তখন ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের একটি ভাড়া বাড়িতে (যেখানে পাকিস্তানি বাহিনী ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও তাঁর সন্তানদের বন্দি করে রেখেছিল) ঘটে যাচ্ছিল এক নীরব আবেগময় অধ্যায়।

বঙ্গমাতার রেসকোর্সে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত: বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সেদিন লাখ লাখ মানুষের ভিড় ঠেলে রেসকোর্স ময়দানে যাননি। তিনি ঘরে বসেই রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ শুনেছিলেন। তিনি জানতেন, আজ দেশের মানুষ তাদের 'মুজিব'কে বুঝে নেওয়ার দিন; পারিবারিক মিলন হবে সবার উদযাপনের শেষে।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে প্রত্যাবর্তন: বিকেলের ভাষণ ও শোভাযাত্রা শেষে বঙ্গবন্ধু যখন ১৮ নম্বর সড়কের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছান, তখন সেখানে এক অনাবিল পারিবারিক দৃশ্য তৈরি হয়। পরবর্তীতে তাঁরা তাঁদের প্রিয় ও স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে ফিরে যান, যে বাড়িটি স্বাধীন বাংলাদেশের সমস্ত ইতিহাস ও সিদ্ধান্তের সাক্ষী হয়ে আছে।

বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও আইনি তাৎপর্য

১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ কেবল একটি একক ঐতিহাসিক দিনের গল্প নয়; এটি ছিল:

১. আন্তর্জাতিক আইনের বিজয়: যেখানে গায়ের জোরে একটি ভূখণ্ড দখল করে রাখার সমস্ত অপচেষ্টাকে ভুল প্রমাণিত করে মন্টিভিডিও কনভেনশনের অধীনে 'সার্বভৌম রাষ্ট্র' হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।
২. সামরিক দখলের অবসান: বিশ্বের ইতিহাসে কোনো মিত্রবাহিনীর এত দ্রুত (দুই মাসের মধ্যে) নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ঘটনা বিরল।
৩. গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উন্মেষ: একজন নেতা কীভাবে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়েও স্বীয় ইচ্ছায় দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন, তার এক অনন্য বিশ্বমানদণ্ড।
৪. বাংলাদেশের সার্বভৌম অস্তিত্ব সুসংহতকরণ: বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব ও উপস্থিতি না থাকলে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ বা প্রশাসনিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার শতভাগ ঝুঁকি ছিল, যা তিনি প্রথম দিনেই তাঁর ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব দিয়ে নিরসন করেছিলেন।

ইতিহাসের দায়, কালজয়ী ঐতিহ্য ও অমর শেখ মুজিব

১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ কেবল একটি ব্যক্তিবিশেষের স্বদেশে ফেরার গল্প নয়; এটি ছিল একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের মানচিত্র থেকে ‘বাংলাদেশ’ নামক আইনসম্মত সার্বভৌম রাষ্ট্রের চূড়ান্ত জন্মের সনদ। এটি প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক আইন কেবল শক্তিশালী পশ্চিমের লিখিত অনুচ্ছেদ নয়, বরং পূর্বের এক আপসহীন প্রজ্ঞাবান নেতার সুদৃঢ় সিদ্ধান্তেরও ফসল হতে পারে।

বঙ্গবন্ধু সেদিন যদি কনফেডারেশনে সই করতেন, যদি লন্ডন ও দিল্লিতে যথাযথ কূটনৈতিক পদক্ষেপ না নিতেন, আর যদি ভারতীয় সৈন্য দ্রুত প্রত্যাহারের ঐতিহাসিক রূপরেখা তৈরি না করতেন তবে আজকের বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আইনি অস্তিত্ব হয়তো ভিন্ন ও সংকটাপন্ন হতে পারত।

আজ এত বছর পরও, যখন আমরা ১০ই জানুয়ারির তেজগাঁও বিমানবন্দরের সেই উত্তাল জনতার চোখের জল আর বঙ্গবন্ধুর কান্নাভেজা চশমার ছবি দেখি, তখন শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। দেশের অর্জিত স্বাধীনতাকে সুসংহত করতে গিয়ে তিনি নিজেকে নিঃশেষ করে গেছেন।

তিনি দুনিয়ার মানুষের কাছে সঠিক প্রতিদান পাননি, পেয়েছিলেন ঘাতকের নির্মম বুলেট। কিন্তু ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। ঘাতকদের নাম আজ ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত, আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্তর্জাতিক আইনের পাতায়, স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রে এবং কোটি বাঙালির হৃদয়ে চিরঞ্জীব, অমর ও অক্ষয় হয়ে আছেন।

তোমাকে হাজার সালাম হে আমাদের কালজয়ী প্যাট্রিয়ট, হে চিরঞ্জীব বজ্রমানব শেখ মুজিবুর রহমান!

লেখক: বিল্লাহ মাসুম, এক্টিভিটিস্ট

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 15, 2025

/

Post by

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গুজব, অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডার ভিকটিম হলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন আর কোনো নেতা নেই, যিনি তাঁর জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর এত তীব্র, নির্লজ্জ ও সুসংগঠিত মিথ্যাচারের শিকার হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানো হয়েছে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে মেরে ফেলার পর খুনীচক্র ও তাদের সুবিধাভোগীরা হাজারো গুজব ও বিকৃত গল্প ছড়িয়েছে।

Aug 9, 2026

/

Post by

সুদূর ইরাকের বাগদাদ নগরীর পুণ্যভূমি থেকে শুরু হয়ে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে আসা বাংলার পলিমাটি পর্যন্ত বিস্তৃত তেমনই এক কালজয়ী ও অলৌকিক বংশধারার ইতিহাস হলো টুঙ্গিপাড়ার ঐতিহ্যবাহী 'শেখ পরিবার'। ইসলামের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি সাধক, সুলতানুল আউলিয়া বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)-এর পুণ্যময় রক্তের ধারা কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করে সুদূর ইরাক থেকে এসে বাংলাদেশের রাজনীতি, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের সূতিকাগার টুঙ্গিপাড়ায় শিকড় গেড়েছিল তা এক পরম বিস্ময়কর ইতিহাস।

Aug 9, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধু যে উদার মন নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং পাকি-তোষামোদকারী গোষ্ঠীসমূহকে ক্ষমা প্রদর্শন করেছিলেন, সেই ক্ষমার মহত্ত্ব উপলব্ধি করার মতো মানবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেই পরাজিত অপশক্তির ছিল না। বিষধর সাপকে আশ্রয় দিলে তার হিংস্রতা যেমন কমে না, তেমনি সাধারণ ক্ষমার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নেপথ্যে সংগঠিত হয়েছিল সেইসব দেশদ্রোহী ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী, যারা শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বুকেই মারণ-কামড় বসিয়েছিল।

Jun 22, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে কেবল হাজার বছরের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন; দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কীভাবে এই ভূষিত রূপটি একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। কবে, কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রত্যক্ষ ভোটে শেখ মুজিব এই অনন্য খেতাব অর্জন করেছিলেন? সেই ঐতিহাসিক জরিপে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা সহযোগী অন্যান্য বাঙালি শ্রেষ্ঠরাই বা কারা ছিলেন?

May 23, 2026

/

Post by

একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিকে তাঁর নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটিয়েছিল সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী কর্মকর্তা ও জওয়ান। কিন্তু এই চরম জাতীয় ট্র্যাজেডির অব্যবহিত পরেই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে চোখের পলকে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছিল, তা কেবল নজিরবিহীনই নয়, বরং চরম বিস্ময় ও লজ্জার এক ঐতিহাসিক দলিল।

May 15, 2026

/

Post by

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালটি নিয়ে দুটি বিপরীতমুখী বয়ান পাওয়া যায়। একদল একে দেখেন ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচারের’ কাল হিসেবে, আর অন্যদল একে দেখেন একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শূন্য হাতে রাষ্ট্র গড়ার মহাবীরত্বগাথা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা এই সময়কালকে কেবল ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচার’ তকমা দিয়ে মুছে ফেলতে চায়। অন্যদিকে, সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসবিদরা দেখেন এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি জাতিকে টেনে তোলার প্রাণপণ লড়াই।

Aug 15, 2025

/

Post by

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গুজব, অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডার ভিকটিম হলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন আর কোনো নেতা নেই, যিনি তাঁর জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর এত তীব্র, নির্লজ্জ ও সুসংগঠিত মিথ্যাচারের শিকার হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানো হয়েছে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে মেরে ফেলার পর খুনীচক্র ও তাদের সুবিধাভোগীরা হাজারো গুজব ও বিকৃত গল্প ছড়িয়েছে।

Aug 9, 2026

/

Post by

সুদূর ইরাকের বাগদাদ নগরীর পুণ্যভূমি থেকে শুরু হয়ে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে আসা বাংলার পলিমাটি পর্যন্ত বিস্তৃত তেমনই এক কালজয়ী ও অলৌকিক বংশধারার ইতিহাস হলো টুঙ্গিপাড়ার ঐতিহ্যবাহী 'শেখ পরিবার'। ইসলামের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি সাধক, সুলতানুল আউলিয়া বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)-এর পুণ্যময় রক্তের ধারা কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করে সুদূর ইরাক থেকে এসে বাংলাদেশের রাজনীতি, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের সূতিকাগার টুঙ্গিপাড়ায় শিকড় গেড়েছিল তা এক পরম বিস্ময়কর ইতিহাস।

Aug 9, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধু যে উদার মন নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং পাকি-তোষামোদকারী গোষ্ঠীসমূহকে ক্ষমা প্রদর্শন করেছিলেন, সেই ক্ষমার মহত্ত্ব উপলব্ধি করার মতো মানবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেই পরাজিত অপশক্তির ছিল না। বিষধর সাপকে আশ্রয় দিলে তার হিংস্রতা যেমন কমে না, তেমনি সাধারণ ক্ষমার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নেপথ্যে সংগঠিত হয়েছিল সেইসব দেশদ্রোহী ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী, যারা শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বুকেই মারণ-কামড় বসিয়েছিল।

Jun 22, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে কেবল হাজার বছরের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন; দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কীভাবে এই ভূষিত রূপটি একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। কবে, কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রত্যক্ষ ভোটে শেখ মুজিব এই অনন্য খেতাব অর্জন করেছিলেন? সেই ঐতিহাসিক জরিপে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা সহযোগী অন্যান্য বাঙালি শ্রেষ্ঠরাই বা কারা ছিলেন?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.