বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ নির্বাচিত হন
বঙ্গবন্ধুকে কেবল হাজার বছরের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন; দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কীভাবে এই ভূষিত রূপটি একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। কবে, কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রত্যক্ষ ভোটে শেখ মুজিব এই অনন্য খেতাব অর্জন করেছিলেন? সেই ঐতিহাসিক জরিপে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা সহযোগী অন্যান্য বাঙালি শ্রেষ্ঠরাই বা কারা ছিলেন?

TruthBangla

একটি জাতির ইতিহাস কেবল কিছু ঘটনার সমষ্টি নয়, বরং তা যুগে যুগে জন্ম নেওয়া কিছু অসাধারণ মানুষের জীবন, কর্ম এবং ত্যাগের আলোকবর্তিকা। পলিগঠিত এই বাংলা ভূখণ্ড হাজার বছর ধরে বহু মনীষী, বিজ্ঞানী, কবি, দার্শনিক ও রাজনৈতিক নেতার জন্ম দিয়েছে। তাঁরা তাঁদের মেধা, মনন ও রক্ত দিয়ে এই জনপদকে সমৃদ্ধ করেছেন, বিশ্ব দরবারে বাঙালির মাথাকে করেছেন উঁচু। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় এই দীর্ঘ ইতিহাসে, হাজার বছরের পথচলায় বাঙালির আত্মপরিচয়কে যিনি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন এবং যিনি একটি স্বাধীন ভূখণ্ড উপহার দিয়ে বাঙালিকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছেন, তিনি কে? আমাদের সিংহভাগ মানুষের মনেই যে নামটি সবার আগে প্রস্ফুটিত হয়, তিনি হলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
বঙ্গবন্ধুকে কেবল হাজার বছরের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন; দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কীভাবে এই ভূষিত রূপটি একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। কবে, কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রত্যক্ষ ভোটে শেখ মুজিব এই অনন্য খেতাব অর্জন করেছিলেন? সেই ঐতিহাসিক জরিপে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা সহযোগী অন্যান্য বাঙালি শ্রেষ্ঠরাই বা কারা ছিলেন? আমার এই বিস্তারিত প্রবন্ধে সেই রোমাঞ্চকর, তথ্যবহুল ও ইতিহাসের কষ্টিপাথরে যাচাইকৃত অধ্যায়টিই আপনাদের সামনে নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হলো।
বিবিসির '১০০ গ্রেটেস্ট ব্রিটনস' জরিপ
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচনের নেপথ্য কাহিনীটি বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে এবং বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের (BBC) একটি অত্যন্ত সফল উদ্যোগের দিকে নজর দিতে হবে।
'১০০ গ্রেটেস্ট ব্রিটনস' এবং চার্চিলের শ্রেষ্ঠত্ব
২০০২ সালে যুক্তরাজ্যে বিবিসি একটি অভিনব ও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী টেলিভিশন সিরিজ প্রচার করে, যার নাম ছিল '১০০ গ্রেটেস্ট ব্রিটনস' (100 Greatest Britons)। এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাজ্যের সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ ভোট বা জরিপের ওপর ভিত্তি করে ব্রিটিশ ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও শ্রেষ্ঠ ১০০ জন ব্যক্তির তালিকা তৈরি করা।

‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রিটন’ স্যার উইনস্টন চার্চিল
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং দেশজুড়ে চলা এই মহাসংগ্রামের পর, ব্রিটিশ জনগণের ভোটে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্রিটন হিসেবে নির্বাচিত হন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে ব্রিটেনের জয়ের পেছনে তাঁর অদম্য নেতৃত্ব ও বাগ্মিতা ব্রিটিশদের মানসপটে গভীর দাগ কেটেছিল। এই তালিকায় চার্চিলের ঠিক পরের দুটি অবস্থানে জায়গা করে নিয়েছিলেন প্রখ্যাত প্রকৌশলী ইসামবার্ড কিংডম ব্রুনেল এবং বিশ্বজুড়ে সমাদৃত 'প্রিন্সেস অভ ওয়েলস' লেডি ডায়ানা।
বিশ্বব্যাপী উন্মাদনা ও বিতর্ক
টেলিভিশন সিরিজটি প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকেই তা কেবল যুক্তরাজ্যেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে তুমুল সাড়া ফেলে দেয়। উইনস্টন চার্চিল যখন শীর্ষস্থান অর্জন করেন, তখন বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। একদিকে যেমন কোটি কোটি ব্রিটিশ এই রায়কে বিপুল আনন্দে স্বাগত জানায়, অন্যদিকে বহু ঐতিহাসিক ও সমালোচক এর তীব্র সমালোচনাও করেন। সমালোচকদের মতে, সাধারণ মানুষ অনেক সময় ইতিহাস সচেতনতার চেয়ে সমকালীন আবেগ ও জনপ্রিয়তাকে বেশি প্রাধান্য দেয়। কেউ কেউ তো রসিকতা করে বলেছিলেন, এই তালিকার বিন্যাস প্রমাণ করে যে আধুনিক ব্রিটিশরা তাদের নিজস্ব ইতিহাস সম্পর্কে কতটা অসচেতন!
তবে সমস্ত বিতর্ক ছাপিয়ে যে সত্যটি সামনে আসে তা হলো বিবিসির এই অনুষ্ঠানটি অভাবনীয় বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সফলতা লাভ করে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আধুনিক যুগের সাধারণ মানুষ তাদের ইতিহাসের কোন কোন চরিত্রকে নিজেদের আদর্শ মনে করে এবং কার অবদানকে সবচেয়ে বেশি মূল্যায়ন করে। এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পর, বিবিসির অন্যান্য আঞ্চলিক ও ভাষাগত সার্ভিসগুলো নিজ নিজ অঞ্চলের মানুষের মতামত জানতে একই ধরণের জরিপ পরিচালনার কথা চিন্তা করতে শুরু করে।
বিবিসি বাংলার ঐতিহাসিক উদ্যোগ (২০০৪)
যুক্তরাজ্যের সেই মূল ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে, বিবিসি বাংলা রেডিও সার্ভিস ২০০৪ সালের শুরুতে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তারা স্থির করে যে, বাঙালি জাতির দীর্ঘ ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মূল্যায়নের জন্য তারা একটি বৈশ্বিক জরিপ পরিচালনা করবে, যার শিরোনাম হবে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি'।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ নির্বাচনের আয়োজন করে বিবিসি বাংলা
শ্রোতা ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি
২০০৪ সালের দিকে দক্ষিণ এশিয়া তথা বিশ্বজুড়ে বাংলাভাষী জনগণের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৫ কোটি, যার মূল অংশটি বাস করত বাংলাদেশ এবং পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসাম রাজ্যে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে ছিল বিশাল এক প্রবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১ কোটি ২০ লক্ষেরও বেশি মানুষ নিয়মিত বিবিসি বাংলা রেডিওর অনুষ্ঠান শুনতেন। এই বিশাল ও বৈচিত্র্যময় শ্রোতাকুলকে লক্ষ্য করেই বিবিসি বাংলা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কর্মযজ্ঞের সূচনা করে।
জরিপের সময়সীমা ও অংশগ্রহণ
২০০৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২২ মার্চ পর্যন্ত টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে এই ঐতিহাসিক জরিপটি পরিচালিত হয়। বিবিসি বাংলার শর্টওয়েভ রেডিও এবং তৎকালীন ইন্টারনেট ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরা এই জরিপে অংশ নেন। প্রতিদিন হাজার হাজার চিঠি, ইমেইল এবং টেলিফোন কল আসতে থাকে বিবিসি বাংলার লন্ডন কার্যালয়ে। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা ছাড়াও দূরপ্রাচ্য, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা দেশগুলো থেকে প্রবাসীরা তাঁদের পছন্দের কথা জানাতে শুরু করেন।
কঠোর ও বৈজ্ঞানিক ভোটগ্রহণ পদ্ধতি
এই জরিপটিকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও পদ্ধতিগতভাবে ত্রুটিমুক্ত রাখার জন্য বিবিসি বাংলা একটি নির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল নিয়মাবলী প্রণয়ন করেছিল। এটি কোনো সাধারণ 'এক ব্যক্তি এক ভোট' পদ্ধতি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বহুমাত্রিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া।
পয়েন্ট বিন্যাস পদ্ধতি
জরিপে অংশ নেওয়া প্রত্যেক শ্রোতাকে একটি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হতো। শর্তটি ছিল- প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে তাঁদের দৃষ্টিতে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ৫ জন বাঙালির নাম লিখিত বা মৌখিকভাবে জানাতে হবে। এই ৫ জন ব্যক্তির নাম এলোমেলোভাবে দিলে চলবে না, তাঁদেরকে শ্রেষ্ঠত্বের ক্রমানুসারে (Ranked Order) সাজাতে হবে। এই ক্রমানুসারের ওপর ভিত্তি করেই মনোনীত ব্যক্তিদের পয়েন্ট হিসাব করা হতো।
পয়েন্ট বণ্টনের গাণিতিক নিয়মটি ছিল নিম্নরূপ:
প্রথম স্থান = ৫ পয়েন্ট
দ্বিতীয় স্থান = ৪ পয়েন্ট
তৃতীয় স্থান = ৩ পয়েন্ট
চতুর্থ স্থান = ২ পয়েন্ট
পঞ্চম স্থান = ১ পয়েন্ট
এই জটিল ও নিখুঁত পয়েন্ট ব্যবস্থার কারণে কোনো একজন ব্যক্তি কেবল অনেক বেশি মানুষের তালিকায় থাকলেই শীর্ষে যেতে পারতেন না, বরং তাঁকে সিংহভাগ মানুষের তালিকায় 'প্রথম পছন্দ' বা উচ্চ র্যাঙ্কিংয়ে থাকতে হতো।
ফলাফল প্রক্রিয়াকরণ ও কাউন্টডাউন
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিশ্বজুড়ে বাঙালিদের কাছ থেকে আসা সমস্ত ডেটা বা তথ্য বিশ্লেষণ করে বিবিসি বাংলা মোট ১৪০ জন বিশিষ্ট বাঙালির নাম সংগ্রহ করে। এই ১৪০ জনের মধ্য থেকে প্রাপ্ত মোট পয়েন্টের ভিত্তিতে একটি চূড়ান্ত 'শীর্ষ ২০' (Top 20) তালিকা প্রস্তুত করা হয়।
বাঙালি শ্রোতাদের মধ্যে উত্তেজনা ও কৌতুহল ধরে রাখার জন্য বিবিসি বাংলা এক অনন্য প্রচার কৌশল বেছে নেয়। ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের দিন থেকে প্রতিদিন রেডিও তরঙ্গে ২০তম স্থান থেকে শুরু করে একেকজন শ্রেষ্ঠ বাঙালির নাম, তাঁদের সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং সমাজ ও জাতি গঠনে তাঁদের অবদান নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রচার করা শুরু হয়। ২০, ১৯, ১৮ এভাবে প্রতিদিন পেছনের দিক থেকে নাম প্রকাশ করতে করতে চূড়ান্ত দিন হিসেবে বেছে নেওয়া হয় ১৪১ বৈশাখ (১৪ এপ্রিল, ২০০৪), যা ছিল বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ। এই উৎসবের দিনেই বিবিসি বাংলা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেয় সেই কাঙ্ক্ষিত নাম।
ঐতিহাসিক রায়ে শীর্ষস্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
২০০৪ সালের ১৪ এপ্রিল, বাংলা নববর্ষের প্রভাতে যখন সারা বিশ্বের বাঙালি মেতে উঠেছে উৎসবে, ঠিক তখনই বিবিসি বাংলার তরফ থেকে আসে সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা: বিশ্বব্যাপী অবস্থানরত বাংলাভাষী মানুষের সম্মিলিত ভোটে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হয়েছেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুর এই বিজয় কোনো সাধারণ বা টেনেটুনে পাওয়া জয় ছিল না। এটি ছিল একটি একচেটিয়া ও ঐতিহাসিক ল্যান্ডস্লাইড (Landslide) বিজয়। জরিপের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে বঙ্গবন্ধু প্রায় দ্বিগুণ ভোট ও পয়েন্ট পেয়ে শীর্ষে আসন গেড়েছিলেন।
অনুরূপভাবে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর পরের অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ পয়েন্ট পেয়েছিলেন। আবার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও চতুর্থ স্থানে থাকা অবিভক্ত বাংলার জনপ্রিয় জননেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের চেয়ে দ্বিগুণ ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন।
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ: এই পরিসংখ্যানটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমাজতাত্ত্বিক সত্যকে উন্মোচন করে। তা হলো তালিকায় ৪ নম্বর থেকে শুরু করে ২০ নম্বর পর্যন্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পয়েন্টের ব্যবধান ছিল অত্যন্ত সীমিত ও হাড্ডাহাড্ডি। কিন্তু শীর্ষ তিন ব্যক্তি অর্থাৎ শেখ মুজিব, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম বাকিদের চেয়ে যোজন যোজন দূরত্বে এগিয়ে ছিলেন। সাধারণ বাঙালির মানসপটে এই তিন ব্যক্তিত্ব যে অন্য সবার চেয়ে অনেক উঁচুতে অবস্থান করছেন, তা এই জরিপ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে দেয়।
বিবিসি বাংলা জরিপে নির্বাচিত শীর্ষ ২০ শ্রেষ্ঠ বাঙালির বিবরণ
নিচে বিশ্বব্যাপী বাঙালিদের ভোটে নির্বাচিত শীর্ষ ২০ জন শ্রেষ্ঠ বাঙালির নাম, তাঁদের মূল ক্ষেত্র, ঐতিহাসিক অবদান এবং তাত্ত্বিক গুরুত্ব একটি বিস্তারিত ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
নাম | মূল ক্ষেত্র/পেশা | ঐতিহাসিক অবদান ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণ |
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান | রাজনীতি ও রাষ্ট্র নেতৃত্ব | স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, যিনি বাঙালি জাতিকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র ও নিজস্ব মানচিত্র উপহার দিয়েছেন। |
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন | এশিয়ার প্রথম নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক, যাঁর রচনা বাঙালির চিন্তাজগত ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছে। |
কাজী নজরুল ইসলাম | সাহিত্য, সংগীত ও বিপ্লব | বাংলাদেশের জাতীয় কবি, যাঁর অগ্নিঝরা কবিতা ও গান শোষণের বিরুদ্ধে এবং সাম্যের পক্ষে বাঙালিকে আজীবন অনুপ্রাণিত করে। |
শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক | রাজনীতি ও সমাজসেবা | অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, কৃষক-প্রজা আন্দোলনের নেতা এবং লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক; বাংলার সাধারণ মানুষের শিক্ষার প্রসারে অসামান্য অবদান। |
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু | সশস্ত্র বিপ্লব ও জাতীয়তাবাদ | ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কিংবদন্তি নেতা এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের অধিনায়ক, যিনি ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। |
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন | সমাজ সংস্কার ও সাহিত্য | মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত, যিনি নারীদের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে বের করে শিক্ষার আলোয় এনেছিলেন। তালিকার একমাত্র নারী। |
স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু | বিজ্ঞান ও গবেষণা | উদ্ভিদের যে প্রাণ আছে তা প্রমাণকারী বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী; বেতার ও ক্রেসকোগ্রাফ যন্ত্রের আবিষ্কারক। |
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী | রাজনীতি ও গণআন্দোলন | মজলুম জননেতা হিসেবে পরিচিত; আজীবন শোষিত মানুষের পক্ষে এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গণসংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছেন। |
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর | শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজ সংস্কার | বাংলা গদ্যের জনক, সমাজ সংস্কারক যিনি বিধবা বিবাহ প্রচলন এবং নারী শিক্ষার প্রসারে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। |
রাজা রামমোহন রায় | সমাজ সংস্কার ও ধর্ম | আধুনিক ভারতের জনক; সতীদাহ প্রথার মতো কুৎসিত ও অমানবিক সামাজিক কুসংস্কার বিলোপের মূল স্থপতি। |
তিলক মীর নিসার আলী (তিতুমীর) | সশস্ত্র প্রতিরোধ ও বিপ্লব | ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ও অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক 'বাঁশের কেল্লা' বানিয়ে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তোলা শহীদ। |
মহাত্মা লালন শাহ | আধ্যাত্মিক সংগীত ও দর্শন | বাউল সম্রাট এবং মানবতাবাদী দার্শনিক, যাঁর গান জাতি-ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে ভালোবাসার শিক্ষা দেয়। |
সত্যজিৎ রায় | চলচ্চিত্র নির্মাণ ও সাহিত্য | অস্কার বিজয়ী বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক, যিনি 'পথের পাঁচালী' সহ বহু কালজয়ী চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বাংলা সিনেমাকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। |
অধ্যাপক অমর্ত্য সেন | অর্থনীতি ও দর্শন | দুস্থ ও দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের কল্যাণে কল্যাণ অর্থনীতি (Welfare Economics) নিয়ে কাজ করে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ। তালিকার একমাত্র জীবিত ব্যক্তি (২০০৪ সালে)। |
ভাষা আন্দোলনের শহীদগণ | অধিকার আদায় ও মাতৃভাষা রক্ষা | ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার মর্যাদার জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীর সন্তানেরা। তালিকার একমাত্র সামষ্টিক (Collective) অন্তর্ভুক্তি। |
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ | ভাষাতত্ত্ব ও শিক্ষাবিদ | বহুভাষাবিদ ও প্রখ্যাত পণ্ডিত, যিনি বাংলা ভাষার উৎস, বিবর্তন এবং ব্যাকরণ গঠনে অতুলনীয় অবদান রেখেছেন। |
স্বামী বিবেকানন্দ | ধর্ম, দর্শন ও সমাজসেবা | রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিষ্ঠাতা; শিকাগোর ধর্মমহাসভায় সনাতন ধর্মের উদারতা ও মানবতাবাদকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা সন্ন্যাসী। |
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান | বৌদ্ধ ধর্ম ও জ্ঞানচর্চা | প্রাচীন বাংলার প্রখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত ও দার্শনিক, যিনি তিব্বতে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্মের সংস্কার সাধন এবং জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছিলেন। |
জিয়াবুর রহমান | সামরিক বাহিনী ও রাজনীতি | বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার এবং পরবর্তীকালের রাষ্ট্রপতি, যিনি দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। |
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী | রাজনীতি ও আইন | গণতন্ত্রের মানসপুত্র হিসেবে খ্যাত; অবিভক্ত বাংলার শেষ মুখ্যমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, যিনি তরুণ শেখ মুজিবের রাজনৈতিক মেন্টর ছিলেন। |
শীর্ষ ২০ তালিকার কিছু অনন্য ও তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
বিবিসি বাংলার এই তালিকাটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে কিছু অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও অনন্য বৈশিষ্ট্য আমাদের নজরে আসে, যা বাঙালির মনস্তত্ত্ব ও সমাজ কাঠামোর এক নিখুঁত প্রতিফলন।
বেগম রোকেয়া: তালিকার একমাত্র নারী
এই পুরো তালিকায় একমাত্র নারী হিসেবে স্থান পেয়েছেন মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। ষষ্ঠ স্থানে তাঁর অবস্থান প্রমাণ করে যে, বাঙালি জাতি লিঙ্গ সমতা এবং নারী শিক্ষার পেছনে তাঁর ঐতিহাসিক অবদানকে কতটা গভীরভাবে মূল্যায়ন করে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাঁর লড়াই আজো প্রতিটি বাঙালির অনুপ্রেরণা।
অধ্যাপক অমর্ত্য সেন: একমাত্র জীবিত কিংবদন্তি
২০০৪ সালে যখন এই জরিপটি পরিচালিত হয়, তখন এই তালিকার বাকি ১৯টি অবস্থানের ব্যক্তিরা (কিংবা সমষ্টি) ইহলোক ত্যাগ করেছিলেন। একমাত্র জীবিত ব্যক্তি হিসেবে এই তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন। সমকালীন সময়ে বেঁচে থেকেও ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেওয়ার এই গৌরব তাঁর মেধা ও বিশ্বব্যাপী তাঁর কাজের প্রভাবকে প্রমাণ করে।
১৫তম অবস্থান: ভাষা আন্দোলনের শহীদদের সামষ্টিক সম্মান
এই তালিকার সবচেয়ে আবেগঘন ও অনন্য দিক হলো এর ১৫তম অবস্থান। এখানে কোনো একক ব্যক্তির নাম নেই। বিবিসি বাংলার শ্রোতারা কোনো নির্দিষ্ট নাম বেছে না নিয়ে, ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে যারা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন, সেই ভাষা শহীদদের সমষ্টিগতভাবে ১৫তম স্থানে বসিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, ভাষা আন্দোলনের প্রতি বাঙালির ঋণ ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার ঊর্ধ্বে।

অন্যদের চেয়ে বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন তারা তিনজন
বাঙালির অসাম্প্রদায়িক ও ভৌগোলিক সীমারেখাহীন মনস্তত্ত্ব
এই জরিপের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল এটি বাঙালির একটি অত্যন্ত সুন্দর ও উদার মানসিকতাকে বিশ্ব দরবারে উন্মোচিত করেছে।
কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে ভোট: জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সিংহভাগই ছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক। তা সত্ত্বেও, বাংলাদেশিরা কেবল নিজেদের ভূখণ্ডের বা স্বাধীনোত্তর যুগের মানুষদের ভোট দেননি। তাঁরা উদারভাবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বা অবিভক্ত বাংলার মনীষীদের ভোট দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, জগদীশ চন্দ্র বসু কিংবা সত্যজিৎ রায়ের মতো ব্যক্তিত্বদের উচ্চ অবস্থান প্রমাণ করে যে, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বাঙালি ভৌগোলিক সীমারেখা বা কাঁটাতারের বেড়াকে তোয়াক্কা করে না।
রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পক্ষপাতহীনতা: এই জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক গোঁড়ামি খুব একটা দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষ মানুষের কর্মকে মূল্যায়ন করেছেন। এমনকি জরিপের ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কোনো কোনো ভোটার একই সাথে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানুষকে মনোনীত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ একই ভোটার তাঁর তালিকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতা গোলাম আজমকে রেখেছেন! এটি দেখায় যে সাধারণ মানুষের ভোট দেওয়ার পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা ছিল না, বরং যার যার ব্যক্তিগত পছন্দই সেখানে প্রতিফলিত হয়েছে।
অন্যান্য আলোচিত নাম
শীর্ষ ২০-এর এই মূল তালিকায় স্থান না পেলেও, ভোটের দৌড়ে বেশ ভালো অবস্থানে ছিলেন আরও কিছু পরিচিত মুখ। তাঁদের মধ্যে তৎকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের দুই শীর্ষ নেত্রী শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং তৎকালীন ভারতীয় ক্রিকেট দলের সফল বাঙালি অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলীও শ্রোতাদের পছন্দের তালিকায় উপরের দিকেই ছিলেন।
একটি 'রাষ্ট্র' নয়, বরং 'ভাষাগত জাতি'র মূল্যায়ন
বিবিসির মূল ফরম্যাটটি (Greatest Nationals) বিশ্বের অন্যান্য দেশে যখন প্রয়োগ করা হয়েছিল, তখন তার ভিত্তি ছিল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক রাষ্ট্র বা দেশ। যেমন:
যুক্তরাজ্য নির্বাচন করেছিল তাদের শ্রেষ্ঠ ব্রিটন (উইনস্টন চার্চিল)।
যুক্তরাষ্ট্র করেছিল শ্রেষ্ঠ আমেরিকান (রোনাল্ড রেগান)।
দক্ষিণ আফ্রিকা করেছিল শ্রেষ্ঠ সাউথ আফ্রিকান (নেলসন ম্যান্ডেলা)।
জার্মানি করেছিল শ্রেষ্ঠ জার্মান (কনরাড এডেনাওয়ার)।
কিন্তু বিবিসি বাংলার এই উদ্যোগটি ছিল বিশ্ব ইতিহাসে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সীমানা বা রাষ্ট্রকে (যেমন শুধু বাংলাদেশ বা শুধু ভারতের পশ্চিমবঙ্গ) ভিত্তি ধরেনি। তাদের ভিত্তি ছিল 'বাংলা ভাষা'। অর্থাৎ, কাঁটাতারের বেড়া, ভিন্ন পাসপোর্ট বা ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীর সমস্ত বাংলাভাষী মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে এই জরিপটি করা হয়েছিল। এটি ছিল একটি ভূ-রাজনৈতিক রাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বড় একটি ভাষাগত জাতিরাষ্ট্রের (Linguistic Nation) আত্মানুসন্ধান।
নেপথ্যের কারিগর ও ২০০৪ সালের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ
আজকের দিনে যেকোনো অনলাইন পোল বা জরিপ করা যতটা সহজ, ২০০৪ সালে পরিস্থিতি তেমন ছিল না। তখন ফেসবুক, এক্স (টুইটার) বা স্মার্টফোনের যুগ ছিল না। ইন্টারনেট ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং ধীরগতির।
বস্তা বস্তা চিঠির আগমন: বিবিসি বাংলার লন্ডন কার্যালয় (বুশ হাউজ) এবং ঢাকা ও কলকাতার ব্যুরো অফিসে প্রতিদিন বস্তা বস্তা চিঠি ও পোস্টকার্ড এসে পৌঁছাত। তৎকালীন বিবিসি বাংলার সম্পাদক সাবির মুস্তফা এবং তাঁর দল (যার মধ্যে ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক আতাউস সামাদ, কাদির কল্লোল প্রমুখ) এই হাজার হাজার চিঠি হাতে গণনা করেছিলেন।
ভয়েস মেইল ও ফোন কল: অনেক শ্রোতা শর্টওয়েভ রেডিওতে অনুষ্ঠান শুনে ল্যান্ডফোনের মাধ্যমে ভয়েস রেকর্ড করে তাঁদের পছন্দের পাঁচজন বাঙালির নাম জানাতেন। সেই অডিও রেকর্ডগুলো শুনে শুনে নাম এবং পয়েন্ট ডায়েরিতে নথিভুক্ত করা হতো। এই বিশাল লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ পার করে ১৪০ জনের তালিকা থেকে শীর্ষ ২০ জনকে বের করা ছিল এক অভূতপূর্ব পরিশ্রমের কাজ।
শীর্ষ তিন ব্যক্তিত্ব: বাঙালির ত্রিমাত্রিক সত্তার প্রতিফলন
জরিপে শেখ মুজিব, রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের প্রাপ্ত ভোট বাকি ১৭ জনের চেয়ে এতটাই বেশি ছিল যে, সমাজবিজ্ঞানীরা একে বাঙালির 'ত্রিমাত্রিক জাতীয় সত্তা' হিসেবে আখ্যায়িত করেন। সাধারণ বাঙালি তাঁদের অবচেতন মন থেকেই এই তিনজনকে বেছে নিয়েছিল, কারণ এই তিনজন বাঙালির তিনটি মূল আবেগকে প্রতিনিধিত্ব করেন:
রাজনীতি ও স্বাধীনতা (বঙ্গবন্ধু): তিনি বাঙালিকে একটি ভৌগোলিক পরিচয় ও রাজনৈতিক মুক্তি দিয়েছেন।
উচ্চমার্গীয় সংস্কৃতি ও মনন (রবীন্দ্রনাথ): তিনি বাঙালির ভাষা, চিন্তা ও দর্শনকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করেছেন। বাঙালির প্রতিদিনের সুখ-দুঃখে রবীন্দ্রনাথ অপরিহার্য।
বিদ্রোহ ও ধর্মনিরপেক্ষ গণসংস্কৃতি (নজরুল): তিনি বাঙালির অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূল চালিকাশক্তি।
ভোটের রসায়ন: এই তিনজনের মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল জ্যামিতিক হারের মতো। অর্থাৎ, বাঙালি তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বরে রাখলেও, তাঁর সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের জন্য রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে প্রায় সমান্তরালভাবে শীর্ষ তিন-এ স্থান দিয়েছে।
ইতিহাসতাত্ত্বিক সমালোচনা: 'নিকট-অতীতের পক্ষপাত'
এই জরিপটি প্রকাশের পর ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে একটি তাত্ত্বিক বিতর্ক তৈরি হয়, যাকে বলা হয় 'রিসেন্সি বায়াস' বা নিকট-অতীতের পক্ষপাত।
সমালোচকদের মতে, সাধারণ মানুষের স্মৃতিশক্তি সাধারণত নিকট-অতীতের (গত ১৫০ থেকে ২০০ বছর) ঘটনা ও চরিত্রগুলোকে বেশি মনে রাখে। হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন স্মৃতিতে ততটা উজ্জ্বল থাকে না। এই কারণেই:
প্রাচীন বাংলার মহান শাসক শশাঙ্ক, পাল বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা ধর্মপাল কিংবা সুলতানি আমলের স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ-এর মতো ঐতিহাসিক চরিত্ররা তালিকায় স্থান পাননি।
অথচ মধ্যযুগ বা প্রাচীন যুগের বাংলা গঠনে ও সীমানা নির্ধারণে তাঁদের অবদান ছিল অপরিসীম। তালিকায় প্রাচীন ও মধ্যযুগের প্রতিনিধি হিসেবে কেবল অতীশ দীপঙ্কর (১৮তম) এবং লালন শাহ (১২তম) স্থান পেয়েছিলেন, যা ইতিহাসের বিশাল ব্যাপ্তির তুলনায় বেশ কম।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: একটি উপাধির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ
২০০৪ সালের ১৪ এপ্রিলের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে একটি বড় পরিবর্তন আসে। এর আগে বঙ্গবন্ধুকে 'জাতির জনক' বা 'বঙ্গবন্ধু' হিসেবে সম্বোধন করা হতো। কিন্তু এই জরিপের পর 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' বাক্যাংশটি তাঁর নামের একটি স্থায়ী এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশেষণ (Epithet) হিসেবে গেঁথে যায়।
পরবর্তীতে বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তক, সরকারি নথিপত্র, গণমাধ্যম এবং জাতীয় দিবসগুলোর বক্তৃতায় এই উপাধিটি রাষ্ট্রীয়ভাবে ও সর্বজনীনভাবে গৃহীত হয়। বিবিসি বাংলার একটি রেডিও জরিপ কীভাবে একটি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উপাধিকে সিলমোহর দিয়ে দিল, তা গণমাধ্যমের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
বিবিসি বাংলার এই তালিকাটি যেমন আমাদের গৌরবের ইতিহাসকে সামনে এনেছে, তেমনই এটি আমাদের আত্মদর্শনের সুযোগও করে দিয়েছে।
বিতর্ক, সমালোচনা ও নিরপেক্ষতার কষ্টিপাথর
যুক্তরাজ্যের স্যার উইনস্টন চার্চিলকে নিয়ে যেমন বিতর্ক হয়েছিল, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই কিছু সমালোচনা ও বিতর্ক উঠেছিল, বিশেষ করে ভারতের কিছু মহলে।
স্বামী বিমলানন্দের অভিযোগ
২০২০ সালে বিবিসি বাংলা যখন তাদের এই ঐতিহাসিক তালিকার ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এটি পুনরায় তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে, তখন নতুন করে কিছু বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কলকাতা থেকে রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামী বিমলানন্দ নামের এক ব্যক্তি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তোলেন যে, এই জরিপটি মোটেও নিরপেক্ষ ছিল না। তাঁর দাবি ছিল এই জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৯৫ শতাংশই ছিলেন বাংলাদেশি এবং তাঁদের মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি ছিলেন মুসলমান। ফলে এই তালিকায় ভারতীয় বা অমুসলিম মনীষীরা সঠিক মূল্যায়ন পাননি।
বিবিসি বাংলা সম্পাদকের যুক্তিযুক্ত জবাব
এই ধরণের জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় পক্ষপাতের অভিযোগকে সম্পূর্ণ তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে নাকচ করে দিয়েছিলেন বিবিসি বাংলার তৎকালীন সম্পাদক। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে দেখান যে, ২০ জনের এই তালিকায়:
ধর্মীয় ভারসাম্য: ১০ জন মুসলিম, ৬ জন সনাতন (হিন্দু) ধর্মাবলম্বী, ২ জন ব্রাহ্ম সমাজের অনুসারী (রামমোহন ও রবীন্দ্রনাথ), ১ জন বৌদ্ধ (অतीश দীপঙ্কর) এবং ১ জন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে আবদ্ধ না থাকা মানবতাবাদী (লালন শাহ)।
ভৌগোলিক ভারসাম্য: তালিকায় ৮ জনকে স্পষ্টত বাংলাদেশি বলা যেতে পারে এবং ১০ জন ছিলেন ভারতীয় বা পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। বাকি ২ জন (অতীশ দীপঙ্কর ও লালন শাহ) এমন এক যুগের মানুষ, যখন দেশভাগের কোনো অস্তিত্বই ছিল না, তাই তাঁদেরকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের গণ্ডিতে বাঁধা অসম্ভব।
এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে, ভোটারদের সংখ্যায় বাংলাদেশি বেশি থাকলেও, ফলাফলে একটি নিখুঁত অসাম্প্রদায়িক এবং ভারসাম্যপূর্ণ বাঙালি চেতনারই প্রতিফলন ঘটেছিল।
অমরত্বের ফ্রেমে আমাদের পরিচয়
২০০৪ সালের বিবিসি বাংলার এই জরিপটি কেবল একটি রেডিও অনুষ্ঠান বা সাধারণ পরিসংখ্যান ছিল না। এটি ছিল হাজার বছর ধরে নানা নির্যাতন, শোষণ আর দেশভাগের মধ্য দিয়ে যাওয়া একটি সংকর জাতির নিজেদের আয়নায় নিজেদের দেখার এক ঐতিহাসিক দলিল।
এই জরিপ চিরতরে সিলমোহর দিয়ে দিয়েছে যে, বাঙালি জাতি তার হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ সেই মানুষটির প্রতি, যিনি তাকে একটি স্বাধীন দেশ এনে দিয়েছিলেন। কবিরা সাহিত্য দিয়ে বাঙালির মন জয় করেছেন, বিজ্ঞানীরা মেধা দিয়ে বিশ্বের দরবারে বাঙালির বুদ্ধিদীপ্ত রূপ তুলে ধরেছেন; কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালিকে দিয়েছেন একটি রাষ্ট্রীয় পরিচয়, একটি নিজস্ব পাসপোর্ট, এবং বিশ্বের বুকে বুক ফুলিয়ে 'আমি বাঙালি' বলার অধিকার।
রবীন্দ্রনাথের কবিতা আর নজরুলের গানকে বুকে ধারণ করে, ভাষা শহীদদের রক্তকে পাথেয় বানিয়ে, বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন বুনেছিলেন, সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নেই লুকিয়ে আছে আমাদের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালিকে দেওয়া প্রকৃত সম্মান। এই তালিকা আজো আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা যেখানেই থাকি না কেন, আমাদের শিকড় এক এবং আমাদের শ্রেষ্ঠত্বের গৌরবও অভিন্ন।














