>

>

বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও ইন্দিরা গান্ধীর বিচক্ষণতা - একাত্তরের কূটনীতি

বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও ইন্দিরা গান্ধীর বিচক্ষণতা - একাত্তরের কূটনীতি

প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় ১৭ এপ্রিল ১৯৭১। এর পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বীকৃতির জন্য ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দাপ্তরিক পত্র পাঠনো শুরু করে। স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া বাঙালিদের প্রত্যাশা, অবিলম্বে ভারতের স্বীকৃতির ঘোষণা আসবে এবং ভারতকে অনুসরণ করে অন্যান্য দেশও স্বীকৃতি দেবে। অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি ভারতের অনেকগুলো রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন তুলল।

TruthBangla

বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও ইন্দিরা গান্ধীর বিচক্ষণতা - একাত্তরের কূটনীতি

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে ৯০ হাজারেরও বেশি পাকিস্তানি সৈন্যের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বমানচিত্রে সার্বভৌম স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল। তবে রক্তক্ষয়ী এই ৯ মাসের মুক্তিসংগ্রাম কেবল রণক্ষেত্রের বন্দুকের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর পেছনে ছিল বিশ্ব কূটনীতির এক জটিল, সূক্ষ্ম এবং মহাকাব্যিক সমীকরণ। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার (মুজিবনগর সরকার) গঠিত হওয়ার পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে স্বীকৃতির জন্য চিঠি পাঠানো শুরু হয়। বাঙালির আকুল প্রত্যাশা ছিল নিকটতম প্রতিবেশী ও পরম মিত্র ভারত অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে এবং ভারতকে অনুসরণ করে পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহও স্বীকৃতি প্রদান করবে।

কিন্তু ভারত সরকার তাৎক্ষণিকভাবে সেই স্বীকৃতি দেয়নি। আন্তর্জাতিক আইনি ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামরিক প্রস্তুতি, স্নায়যুদ্ধকালীন বিশ্ব রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলার কৌশল হিসেবে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী একটি অত্যন্ত হিসেবি ও সুদূরপ্রসারী বিলম্বের নীতি গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের মে মাস থেকে শুরু করে ৬ই ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতির জোয়ার পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে লুকিয়ে ছিল ভূ-রাজনৈতিক চাল।

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপ ও জনমত

প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় ১৭ এপ্রিল ১৯৭১। মুজিবনগর সরকার শপথ নেওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির দাবি ভারতের মাটিতে এক দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ের সাধারণ মানুষ এবং ভারতের প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংশ্কৃতিক সংগঠন ভারত সরকারের ওপর অবিলম্ব স্বীকৃতির জন্য প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে থাকে।

এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বীকৃতির জন্য ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দাপ্তরিক পত্র পাঠনো শুরু করে। স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া বাঙালিদের প্রত্যাশা, অবিলম্বে ভারতের স্বীকৃতির ঘোষণা আসবে এবং ভারতকে অনুসরণ করে অন্যান্য দেশও স্বীকৃতি দেবে। অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি ভারতের অনেকগুলো রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন তুলল। সর্বোচ্চ মাপের গান্ধীবাদী নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ ভারত সরকারের ওপর নীতিগত ও নৈতিক চাপ তৈরি করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রচারণা শুরু করেন।

১৯৭১ সালের ৭ই মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নতুন দিল্লির সংসদ ভবনে বিরোধীদলীয় নেতাদের সাথে বাংলাদেশ পরিস্থিতি এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতি নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন। ঐতিহাসিক এই বৈঠকে ভারতের প্রায় সমস্ত প্রধান বিরোধী দল সর্বসম্মতভাবে বাংলাদেশকে অবিলম্বে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানায়। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত ধৈর্য ও বিচক্ষণতার সাথে নেতাদের আশ্বস্ত করে স্পষ্ট বুঝিয়েছিলেন যে, ভুল সময়ে নেওয়া একটি আবেগঘন সিদ্ধান্ত মুক্তিকামী বাঙালি ও ভারতের সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে বিপন্ন করতে পারে।

সে সময় বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের পক্ষে যেসব রাজনৈতিক দল দাবি জানায় তার মধ্যে রয়েছে সিপিএম, সিপিআই, ডিএমকে, জনসংঘ, আদি কংগ্রেস, পিএসপি, এসএসসি ও আরএসপি। ইন্দিরা গান্ধীর নিজের দল কংগ্রেসেরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্বীকৃতির পক্ষে ছিল।

আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মেলন করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানায় একটি ভারতীয় মজদুর সংগঠন। আসামের কামরূপ-কামাখ্যা জেলার পাণ্ডুতে অনুষ্ঠিত সভায় কাউন্সিল নির্দোষ স্বাধীনতাকামী জনগণের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা ও হত্যাযজ্ঞের নিন্দা করে। এ ধরনের চাপ তখন ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেসের ভেতর ও বাইরে থেকে ছিল। পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার সরকারের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ডি পি ধর, পি এন হাকসার, রামনাথ কাও প্রমুখ।

ইন্দিরা গান্ধীর মে মাসের পশ্চিমবঙ্গ সফর

১৯৭১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের ঢল ভারতের সীমান্ত এলাকাগুলোতে আছড়ে পড়তে শুরু করে। নীল শাড়ি এবং পূর্ণ হাতার ব্লাউজ পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে প্রথম এলেন একাত্তরের মে মাসে। তিনি বিমানযোগে কলকাতা পৌঁছে হেলিকপ্টারে চড়ে সরাসরি বনগাঁ সীমান্ত ও সংলগ্ন শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করেন।

এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়া নিয়ে তিনি সাংবাদিকদেরও বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হন। দমদম বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের কাছে স্পষ্ট করে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য আশু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।

বাংলাদেশকে তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি প্রদান সংক্রান্ত সাংবাদিকদের বহু প্রশ্নের উত্তরে তিনি মন্তব্য করেন:

"এ মুহূর্তে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য আশু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। এই প্রশ্নের মুখোমুখি আমাকে অনেকবারই হতে হয়েছে। তবে আমি সবসময় মনে করি, ভারতের একটি নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি রয়েছে। সেই নীতির আলোকে কখন, কী করণীয় তা নির্ধারণের জন্য ভারতকে অন্য কোনো রাষ্ট্র বা আবেগের ওপর নির্ভর করতে হয় না।"

দমদম থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং তার সঙ্গীরা হেলিকপ্টারে বনগাঁ যান। অন্য একটি হেলিকপ্টারে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রীরা তাদের অনুসরণ করেন। সাড়ে ৫টার কিছু পর তারা দমদম ফিরে আসেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শরণার্থী সংকটকে একটি বিশালাকার আন্তর্জাতিক বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেন।

শরণার্থী শিবির দেখে তার কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,

"সমস্যা অনেক বড়, কেমন করে এর সমাধান করা হবে তা বের করাও আমাদের জন্য কঠিন কাজ। আমাদের সম্পদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রয়োজনীয় সামগ্রীরও অভাব রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ভালো কাজই করে যাচ্ছে।"

ইন্দিরা গান্ধী আরো বলেন,

"সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ভারত মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু এই শরণার্থীদের অবশ্যই পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে তাদের নিজ জন্মভূমিতে ফিরে যেতে হবে।যারা দেশ ছেড়ে এখানে এসে শরণার্থী হয়েছে যত শিগগির সম্ভব তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে।"

কিন্তু কত তাড়াতাড়ি তা সম্ভব হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "এটা আমার জানা নেই"। তবে তিনি আশা করেন আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ দেশত্যাগী এই মানুষদের দেশে ফেরার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে পাকিস্তান সরকারের এই দাবি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “দেশ থেকে মানুষ বের করে দিয়ে স্বাভাবিক অবস্থার দাবি করা স্বাভাবিক মানসিকতার পরিচায়ক নয়।"

সীমান্ত এলাকা থেকে শরণার্থীদের সরিয়ে আনার ব্যাপারে ইউনিয়ন গভর্নমেন্টের প্রস্তাব নিয়ে গান্ধী বলেন, “ত্রিপুরা খুব ছোট রাজ্য। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শরণার্থীদের স্থানসংকুলান করার বিষয়টি বিবেচনাধীন আছে।" তবে তা কতটা সম্ভব হবে এখনই তিনি নিশ্চিত নন।

পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহইয়া খানের "পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে" সংক্রান্ত মিথ্যা দাবির জবাবে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন: "কোটি কোটি মানুষকে নিজের ভিটেমাটি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে বলে দাবি করা কোনো সুস্থ বা স্বাভাবিক মানসিকতার পরিচয় হতে পারে না।"

এদিকে যখন সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, "ভারত কি বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীকে সরাসরি আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করছে?", তখন অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়কের মতো ইন্দিরা গান্ধী জবাব দিয়েছিলেন: "নো কমেন্ট" (কোনো মন্তব্য নয়)। (বিবরণটি ভারতীয় পত্রিকা স্টেটসম্যান থেকে নেয়া)।

কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী মনে করেছেন এবং যথার্থই মনে করেছেন, তখনই স্বীকৃতি প্রদান করলে বাংলাদেশ এমন কোনো স্বার্থোদ্ধার করতে পারত না। পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের অনুকূলে আনার সুযোগ সৃষ্টি করার পর ভারত ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। একাত্তরের যুদ্ধের তৃতীয় দিন ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যুক্তিসম্মত আলোচনায় এটা প্রতিষ্ঠিত হবে যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সঠিক সময়েই স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যখন পাকিস্তানের পরাজয় ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

মাস্টার স্ট্র্যাটেজিস্ট ইন্দিরা গান্ধী

তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিয়ে কৌশলগত বিলম্ব ঘটানোর পেছনে ইন্দিরা গান্ধীর পেছনে কাজ করছিল ভারতের তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী ও সামরিক মস্তিস্কের সমন্বয়ে গঠিত এক শক্তিশালী 'থিঙ্কট্যাংক'। এই দলে ছিলেন:

ডি পি ধর (D.P. Dhar): প্রখ্যাত কূটনীতিবিদ ও ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ প্রতিনিধি।
পি এন হাকসার (P.N. Haksar): প্রধানমন্ত্রীর প্রধান সচিব ও মাস্টার স্ট্র্যাটেজিস্ট।
রামনাথ কাও (R.N. Kao): ভারতের গবেষণা ও বিশ্লেষণ উইং (R&AW)-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান।
ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ' (Sam Manekshaw): ভারতীয় সেনাপ্রধান।

কেন এই কৌশলগত বিলম্ব?

১৯৭১ সালের মার্চের শেষে যখন গণহত্যা শুরু হয়, তখন ভারতীয় মন্ত্রিপরিষদ সেনা ও গোয়েন্দা প্রধানদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেছিল। সেনাপ্রধান স্যাম মানেকশ' প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি পরামর্শ দিয়েছিলেন 'এপ্রিল বা মে মাসে সামরিক হস্তক্ষেপ করা আত্মঘাতী হবে।'

এর পেছনে প্রধান চারটি সামরিক ও কূটনৈতিক কারণ ছিল:

১. বর্ষাকাল ও ভৌগোলিক বাস্তবতা: মে-জুন মাসে বাংলাদেশে বর্ষাকাল শুরু হয়। নদীমাতৃক বাংলাদেশে পলিমাটি ও কাদায় ভারতের সাঁজোয়া যান ও ট্যাঙ্ক আটকে পড়ার ঝুঁকি ছিল শতভাগ।

২. হিমালয়ের গিরিপথ খোলা থাকা: মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত হিমালয়ের পার্বত্য গিরিপথগুলো বরফমুক্ত থাকে। এই সময়ে ভারত আক্রমণ করলে চীন সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করার সুযোগ থাকত। কিন্তু শীতকালে (নভেম্বর-ডিসেম্বর) তুষারপাতে গিরিপথ বন্ধ হয়ে গেলে চীন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

৩. শস্য কাটাই ও খাদ্য নিরাপত্তা: ভারতে তখন ফসল কাটাইয়ের মৌসুম চলছিল। দ্রুত সেনা চলাচলের জন্য যে রেল ও সড়ক পরিবহন প্রয়োজন, তা খাদ্যশস্য পরিবহনে ব্যস্ত ছিল।

৪. আন্তর্জাতিক আইনি বৈধতা: ১৯৭১ সালের এপ্রিল-মে মাসে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে বিশ্ব সম্প্রদায় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটিকে 'বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম' হিসেবে না দেখে 'ভারত-পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধ বা ভারতের আগ্রাসন' হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ পেত।

এয়ার মার্শাল কপিল কাক পরবর্তীতে যথার্থই লিখেছিলেন: "১৯৭১-এ সফলতার সমস্ত প্রশংসাপ্রাপ্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীরই। তিনিই ছিলেন প্রকৃত 'মাস্টার স্ট্র্যাটেজিস্ট'। তিনি তাঁর সশস্ত্র বাহিনীর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রেখেছিলেন এবং তাদের লড়াই করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট, পরিকল্পনায় ছিল সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব এবং তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ছিল অনবদ্য।"

ইন্দিরা গান্ধী মে থেকে নভেম্বর এই সময়টুকুকে ব্যবহার করেছিলেন বিশ্বজনমত গঠন করতে, মুক্তিবাহিনীকে রিক্রুট ও ট্রেইনিং দিতে এবং ১৯৭১ সালের ৯ই আগস্ট 'ভারত-সোভিয়েত শান্তি ও মৈত্রী চুক্তি' স্বাক্ষর করে মার্কিন-চীন-পাকিস্তান অক্ষকে কূটনৈতিকভাবে অকার্যকর করে দিতে।

৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১: ইন্দিরা গান্ধীর ঐতিহাসিক স্বীকৃতি

১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর বিকেলে পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতের একাধিক বিমানঘাঁটিতে একযোগে হামলা (Operation Chengiz Khan) চালালে ভারত-পাকিস্তান প্রত্যক্ষ যুদ্ধ শুরু হয়। এর ফলে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে যে আইনি ও সামরিক বাধা ছিল, তা এক মুহূর্তে অপসারিত হয়। ৩রা ডিসেম্বর মধ্যরাতেই যৌথ কমান্ড গঠিত হয় এবং মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী একযোগে পূর্ব পাকিস্তানে চড়ান্ত অভিযান শুরু করে।

যুদ্ধের তৃতীয় দিনে, অর্থাৎ ৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় ভারত সরকার। ৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে লেখা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর চিঠি।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী,

হিজ এক্সিলেন্সি, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আপনি ৪ ডিসেম্বর যে বার্তাটি পাঠিয়েছেন, তা আমাকে এবং ভারত সরকারে আমার সহকর্মীদের বিশেষভাবে স্পর্শ করেছে। বার্তাটি পাওয়ার পর আপনারা যেভাবে আত্মনিবেদিত হয়ে বাংলাদেশকে পরিচালনা করছেন, সেই দেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি ভারত সরকার পুনরায় বিবেচনা করে।

আমি হৃষ্টচিত্তে আপনাকে জানাতে চাই, বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজ করছে নিশ্চয়ই তার আলোকে ভারত সরকার স্বীকৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ সকালে এ বিষয়ে আমি আমাদের সংসদে একটি বিবৃতি দিয়েছি। বিবৃতির অনুলিপি সংযুক্ত করছি।

বাংলাদেশের মানুষকে অনেক ভুগতে হয়েছে। আপনার তরুণ ছেলেরা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য আত্মবলিদানের সংগ্রামে লিপ্ত। ভারতের জনগণও একই আদর্শের প্রতিরক্ষায় লড়ে যাচ্ছে। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, এই শ্রেষ্ঠতম উদ্যোগ এবং আত্মদান ভালো কাজের জন্য আমাদের আত্মনিবেদনকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দুই দেশের জনগণের বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ন রাখবে। যাই হোক, পথ যত দীর্ঘই হোক, আত্মদান যত বেশিই হোক, আমাদের দুই দেশের মানুষের ভবিষ্যতে ডাক পড়বে, আমি নিশ্চিত আমরা বিজয়ীই হব।

ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে, আপনার সহকর্মীদের এবং বাংলাদেশের বীর জনতাকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগ নিচ্ছি।

আপনার মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিজ এক্সিলেন্সি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে আমার সর্বোচ্চ সম্মানের নিশ্চয়তা জ্ঞাপন করবেন।

আপনার একান্ত
(স্বাক্ষরিত)
ইন্দিরা গান্ধী
হিজ এক্সিলেন্সি মিস্টার তাজউদ্দীন আহমদ
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী
মুজিবনগর।

(বিদেশির চোখে ১৯৭১, নালন্দা ২০১২ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ থেকে)

ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পাকিস্তানের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছিল। একজন বিদেশি পর্যবেক্ষক বললেন, ‘ভারতীয় মন্ত্রিপরিষদকে মার্চের শেষে সেনা ও গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শ ছিল- ভারত পূর্ব বাংলার আশু সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য এখনো প্রস্তুত নয়। বাঙালিদের সামরিক সাহায্য করতে হলে তাদের আরও কিছু অপেক্ষায় থাকতে হবে। ভারত কৌশলগত কারণেই সে অপেক্ষা করেছে।

ভূটানের স্বীকৃতি বনাম ভারতের স্বীকৃতি

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে একটি অতিচেনা বিতর্ক হলো "প্রথম স্বীকৃতিদাতা দেশ কোনটি, ভারত নাকি ভুটান?"

ঐতিহাসিক দলিল ও কূটনৈতিক বিবরণী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখেই ভারত এবং ভুটান দুটি দেশই বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

ভারত ও ভুটান একই দিন ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলেও ভূটানের ঘোষণাটি ভারতের কয়েক ঘণ্টা আগের। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবই এ ঘোষণা দিয়েছেন। কয়েক ঘণ্টা আগে তা নিশ্চিত না করলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি থেকে এটা উঠে এসেছে যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদাতা প্রথম দেশ হচ্ছে ভুটান। এ সম্মান ভুটান অবশ্যই পেতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সে সময় ভারত স্বীকৃতি না দিলে এবং ভারতীয় পরামর্শ না পেলে কি ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার মতো সাহসিকতা দেখাতে পারত? অবশ্যই না। এটাকে বরং ভারতীয় কর্মকৌশলের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।

ভারতই চেয়েছে সে সময় ভারতের অনুগত ভুটানকে দিয়ে প্রথম স্বীকৃতি দেয়াবে, তাই হয়েছে। অবশ্য নয়াদিল্লি থেকে ডেনজিল পিরিসের ক্রিশ্চিয়ান সাায়েন্স মনিটরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া দ্বিতীয় দেশ ভুটান। এই রিপোর্টে আরও বলা হয়, ভারত বাংলাদেশের জন্য স্বীকৃতি আদায়ে বার্মা, আফগানিস্তানসহ তার মিত্র অনেক দেশের ওপর চাপ দিচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতির তরঙ্গ (ডিসেম্বর ১৯৭১ - জানুয়ারি ১৯৭২)

৬ই ডিসেম্বর ভারত ও ভুটানের স্বীকৃতির মাধ্যমে যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল, ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার বিজয়ের পর তা এক অপ্রতিরোধ্য তরঙ্গে পরিণত হয়। ১৬ই ডিসেম্বরের আগে ভারত ও ভুটান ছাড়া অন্য কোনো রাষ্ট্র বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। তবে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বিশ্বজুড়ে একের পর এক দেশ বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিতে শুরু করে।

একাত্তরের ডিসেম্বরে ভারত ও ভুটান ছাড়া অন্য কোনো দেশ এমনকি ১৬ ডিসেম্বরের পরও স্বীকৃতি দেয়নি। পরবর্তী স্বীকৃতি এসেছে ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে। সেদিন সোভিয়েত ব্লকের দুটি ইউরোপীয় দেশ পোল্যান্ড ও বুলগেরিয়া বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি এই দুই দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। যদিও সোভিয়েত ইউনিয়ন মূল পরাশক্তি হিসেবে আর কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করে ২৪শে জানুয়ারি স্বীকৃতি দিয়েছিল।

১৩ই জানুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় প্রতিবেশী রাষ্ট্র বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার)। এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক কূটনৈতিক মুহূর্ত। তৎকালীন সময়ে বার্মা চীনের রাজনৈতিক বা সামরিক প্রভাবের অধীন ছিল না, বরং সম্পূর্ণ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখত। তদুপরি, তৎকালীন জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট (U Thant) ছিলেন বার্মার নাগরিক এবং তিনি শুরু থেকেই বাংলাদেশের মানবতাবাদী আন্দোলনের প্রতি গভীরভাবে সহানুভূতিশীল ছিলেন। বার্মার স্বীকৃতির মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক দুয়ার খুলে যায়।

অন্যান্য এশীয়, ইউরোপীয় ও কমনওয়েলথ দেশের জোয়ার

১৫ই জানুয়ারি: হিমালয় অঞ্চলের আরেক প্রতিবেশী নেপাল স্বীকৃতি দেয়।

২০শে জানুয়ারি: ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রথম দেশ হিসেবে বার্বাডোজ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

২২শে জানুয়ারি: জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (NAM) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মার্শাল টিটোর দেশ যুগোস্লাভিয়া স্বীকৃতি প্রদান করে।

২৪শে জানুয়ারি: বিশ্ব পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR) বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়, যা জাতিসংঘে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির পথ সুগম করে।

২৫শে জানুয়ারি: প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র টোঙ্গা স্বীকৃতি দেয়।

২৬শে জানুয়ারি: ইউরোপ ও ওশেনিয়া অঞ্চলের একাধিক শক্তিশালী দেশ একই দিনে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এর মধ্যে ছিল চেকোস্লোভাকিয়া, সাইপ্রাস, হাঙ্গেরি, অস্ট্রেলিয়া, ফিজি এবং নিউজিল্যান্ড

অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের এই স্বীকৃতি কমনওয়েলথভুক্ত পশ্চিমা গণতান্ত্রিক বিশ্বেও বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে গতিশীল করেছিল।

ইন্দিরা গান্ধীর দূরদর্শিতা ও স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব

ইতিহাসের নির্মোহ পর্যালোচনায় এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, ১৯৭১ সালের মে মাসে কিংবা জুনে তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার বিষয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সিদ্ধান্তটি ছিল শতভাগ সঠিক ও দূরদর্শী।

যদি মে মাসে ভারত বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিত, তবে তিনটি মারাত্মক রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটতে পারত:

১. পাকিস্তান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচার করার সুযোগ পেত যে, 'পূর্ব পাকিস্তানের আন্দোলন কোনো স্বাধিকার আন্দোলন নয়, বরং এটি ভারতের দ্বারা উসকে দেওয়া একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আগ্রাসন।'

২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সরাসরি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক প্রস্তাব পাস করিয়ে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগ পেত।

৩. ভারতের সামরিক বাহিনী বর্ষাকালের প্রতিকূল পরিবেশে বাংলাদেশে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ফাঁদে আটকে পড়তে পারত, যার ফলে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ঝুলে যেত।

ইন্দিরা গান্ধী সঠিক সময়টির জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। তিনি একদিকে বিশ্বজুড়ে ঘুরে ঘুরে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন করেছেন, অন্যদিকে ভারতের সশস্ত্র বাহিনীকে পূর্ণ প্রস্তুতির সময় দিয়েছেন। এবং যখন ৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তান নিজেই ভারতে হামলা চালিয়ে যুদ্ধ শুরু করল, তখন সমস্ত আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে যায়। ৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে এবং ১০ দিনের মাথায় ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্ণ আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ কমান্ড এক ঐতিহাসিক বিজয়ের ইতিহাস গড়ে তোলে।

ইন্দিরা গান্ধীর এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ধৈর্য এবং সামরিক নেতৃত্বের স্বাধীনতা প্রদানের ইতিহাস কেবল দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেই নয়, বরং বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে এক অনবদ্য 'মাস্টারস্ট্রোক' হিসেবে অমর হয়ে থাকবে। আর তার ওপর ভর করেই ১৯৭১ সালের ৬ই ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের জানুয়ারির মধ্যে উদয় ঘটেছিল স্বাধীন, সার্বভৌম ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের।

তথ্যসূত্র: দৈনিক বাংলা

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 9, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এবং তার শাসনযন্ত্রের মূল নিয়ামক 'সামরিক-গোয়েন্দা অক্ষ' (Military-Intelligence Establishment) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক সত্তা এবং অগ্রযাত্রাকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, পরবর্তীকালে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের একটি নিরবচ্ছিন্ন অশুভ ভূমিকা বিদ্যমান।

Aug 8, 2026

/

Post by

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নেপথ্য চক্রান্তকারী হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা শরীফুল হক ডালিম (যিনি ‘মেজর ডালিম’ নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত করে এক বিতর্কিত ও জাতির বিশ্বাসঘাতক চরিত্রে পরিণত করেছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

Jul 29, 2026

/

Post by

এতদিন ধরে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান যে অঞ্চলটিকে তথাকথিত "স্বাধীন কাশ্মীর"-এর মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে, আজ তা এক সুবিশাল উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তান সরকারের পরিচালিত নজিরবিহীন দমন-পীড়ন আর কেবল সাধারণ কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাময়িক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, মানবিকতা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের সমস্ত সীমানা লঙ্ঘন করেছে।

Jul 27, 2026

/

Post by

দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র ‘ভারত প্রজাতন্ত্রের’ (Republic of India) জন্য এই ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জের চরমতম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে অবস্থিত অতি সংকীর্ণ একটি ভূখণ্ডে যার নাম শিলিগুড়ি করিডোর (Siliguri Corridor)। কৌশলগত পরিমণ্ডলে করিডোরটি সর্বজনীনভাবে ‘চিকেনস নেক’ (Chicken’s Neck) বা ‘মুরগির ঘাড়’ নামে পরিচিত। শিলিগুড়ি করিডোরকে ভারতের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রেক্ষাপটে এক ‘ভূরাজনৈতিক দোধারী তলোয়ার’ (Double-edged Sword) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

Aug 9, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি এবং তার শাসনযন্ত্রের মূল নিয়ামক 'সামরিক-গোয়েন্দা অক্ষ' (Military-Intelligence Establishment) বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অসাম্প্রদায়িক সত্তা এবং অগ্রযাত্রাকে মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের বর্বর গণহত্যা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের পথে কৃত্রিম সংকট তৈরি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, পরবর্তীকালে উগ্রবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের একটি নিরবচ্ছিন্ন অশুভ ভূমিকা বিদ্যমান।

Aug 8, 2026

/

Post by

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলব এবং নেপথ্য চক্রান্তকারী হিসেবে যে নামটি বারবার উঠে আসে, তিনি হলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা শরীফুল হক ডালিম (যিনি ‘মেজর ডালিম’ নামে সমধিক পরিচিত)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, সামরিক শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর তাঁকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আসন থেকে বিচ্যুত করে এক বিতর্কিত ও জাতির বিশ্বাসঘাতক চরিত্রে পরিণত করেছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত তা সে ভিয়েতনাম হোক, কোরিয়া, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক আমেরিকা যেসব সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছে, তার প্রায় কোনোটিতেই তারা কাঙ্ক্ষিত 'চূড়ান্ত বিজয়' হাসিল করতে পারেনি। ২০২১ সালে প্রায় দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পর আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে মার্কিন সেনাদের বিশৃঙ্খল প্রস্থান কিংবা ইরাককে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফিরে আসা সামরিক দিক থেকে এগুলোকে জয় বলা যায় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংঘাতের ফলাফল বা সামরিক পরাজয় যাই হোক না কেন, প্রতিটি যুদ্ধ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে অভূতপূর্ব লাভবান হয়েছে।

Aug 5, 2026

/

Post by

বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তির মূল কাণ্ডারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার। বিশ শতকের বৈশ্বিক কূটনীতিতে ‘রিয়েলপলিটিক’ (Realpolitik) বা নীতিনৈতিকতাহীন পরম স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতির সবচেয়ে কুখ্যাত রূপকার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি, জাতিগত নিধন কিংবা গণতন্ত্র হত্যাকে তিনি স্রেফ ক্ষমতার সমীকরণের সামান্য ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ (Collateral Damage) বলে গণ্য করতেন।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.