বাংলাদেশকে স্বীকৃতি ও ইন্দিরা গান্ধীর বিচক্ষণতা
প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় ১৭ এপ্রিল ১৯৭১। এর পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বীকৃতির জন্য ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দাপ্তরিক পত্র পাঠনো শুরু করে। স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া বাঙালিদের প্রত্যাশা, অবিলম্বে ভারতের স্বীকৃতির ঘোষণা আসবে এবং ভারতকে অনুসরণ করে অন্যান্য দেশও স্বীকৃতি দেবে। অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি ভারতের অনেকগুলো রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন তুলল।

TruthBangla
Dec 6, 2025
প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয় ১৭ এপ্রিল ১৯৭১। এর পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বীকৃতির জন্য ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দাপ্তরিক পত্র পাঠনো শুরু করে। স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া বাঙালিদের প্রত্যাশা, অবিলম্বে ভারতের স্বীকৃতির ঘোষণা আসবে এবং ভারতকে অনুসরণ করে অন্যান্য দেশও স্বীকৃতি দেবে। অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি ভারতের অনেকগুলো রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন তুলল। বড় মাপের নেতাদের মধ্যে জয়প্রকাশ নারায়ণ ভারত সরকারের ওপর রীতিমতো চাপ দিতে থাকেন।
১৯৭১-এর ৭ মে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিরোধীদলীয় নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশ পরিস্থিতি ও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন। সে সময় বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের পক্ষে যেসব রাজনৈতিক দল দাবি জানায় তার মধ্যে রয়েছে সিপিএম, সিপিআই, ডিএমকে, জনসংঘ, আদি কংগ্রেস, পিএসপি, এসএসসি ও আরএসপি। ইন্দিরা গান্ধীর নিজের দল কংগ্রেসেরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্বীকৃতির পক্ষে ছিল।
আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মেলন করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানায় একটি ভারতীয় মজদুর সংগঠন। আসামের কামরূপ-কামাখ্যা জেলার পাণ্ডুতে অনুষ্ঠিত সভায় কাউন্সিল নির্দোষ স্বাধীনতাকামী জনগণের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতা ও হত্যাযজ্ঞের নিন্দা করে। এ ধরনের চাপ তখন ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেসের ভেতর ও বাইরে থেকে ছিল। পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার সরকারের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ডি পি ধর, পি এন হাকসার, রামনাথ কাও প্রমুখ।
নীল শাড়ি এবং পূর্ণ হাতার ব্লাউজ পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে প্রথম এলেন একাত্তরের মে মাসে। এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়া নিয়ে তিনি সাংবাদিকদেরও বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হন। দমদম বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের কাছে স্পষ্ট করে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য আশু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তিনি বলেন, এ প্রশ্নের মুখোমুখি অনেকবারই তাকে হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি সব সময়ই মনে করেছেন, ভারতের একটি নিজস্ব নীতি রয়েছে, সেই নীতির আলোকে বিভিন্ন বিষয়ে কী করণীয় তা নির্ধারণের জন্য অন্য কারও ওপর নির্ভর করতে হয় না।
দমদম থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং তার সঙ্গীরা হেলিকপ্টারে বনগাঁ যান। অন্য একটি হেলিকপ্টারে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রীরা তাদের অনুসরণ করেন। সাড়ে ৫টার কিছু পর তারা দমদম ফিরে আসেন। শরণার্থী শিবির দেখে তার কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, সমস্যা অনেক বড়, কেমন করে এর সমাধান করা হবে তা বের করাও আমাদের জন্য কঠিন কাজ। আমাদের সম্পদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রয়োজনীয় সামগ্রীরও অভাব রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ভালো কাজই করে যাচ্ছে।
ইন্দিরা বলেন, ‘যারা দেশ ছেড়ে এখানে এসে শরণার্থী হয়েছে যত শিগগির সম্ভব তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে।’ কিন্তু কত তাড়াতাড়ি তা সম্ভব হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আমার জানা নেই।’ তবে তিনি আশা করেন আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ দেশত্যাগী এই মানুষদের দেশে ফেরার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে পাকিস্তান সরকারের এই দাবি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘দেশ থেকে মানুষ বের করে দিয়ে স্বাভাবিক অবস্থার দাবি করা স্বাভাবিক মানসিকতার পরিচায়ক নয়।’
সীমান্ত এলাকা থেকে শরণার্থীদের সরিয়ে আনার ব্যাপারে ইউনিয়ন গভর্নমেন্টের প্রস্তাব নিয়ে গান্ধী বলেন, ‘ত্রিপুরা খুব ছোট রাজ্য। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শরণার্থীদের স্থানসংকুলান করার বিষয়টি বিবেচনাধীন আছে।’ তবে তা কতটা সম্ভব হবে এখনই তিনি নিশ্চিত নন। বাংলাদেশের মুক্তিফৌজকে অস্ত্র সরবরাহ করার জন্য জনতার বিভিন্ন অংশ এবং রাজনৈতিক দলের দাবি প্রসঙ্গে গান্ধী বলেন, ‘নো কমেন্ট’। (বিবরণটি ভারতীয় পত্রিকা স্টেটসম্যান থেকে নেয়া)।
কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী মনে করেছেন এবং যথার্থই মনে করেছেন, তখনই স্বীকৃতি প্রদান করলে বাংলাদেশ এমন কোনো স্বার্থোদ্ধার করতে পারত না। পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের অনুকূলে আনার সুযোগ সৃষ্টি করার পর ভারত ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। একাত্তরের যুদ্ধের তৃতীয় দিন ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যুক্তিসম্মত আলোচনায় এটা প্রতিষ্ঠিত হবে যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সঠিক সময়েই স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যখন পাকিস্তানের পরাজয় ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে লেখা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর চিঠি।
প্রিয় প্রধানমন্ত্রী,
হিজ এক্সিলেন্সি, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আপনি ৪ ডিসেম্বর যে বার্তাটি পাঠিয়েছেন, তা আমাকে এবং ভারত সরকারে আমার সহকর্মীদের বিশেষভাবে স্পর্শ করেছে। বার্তাটি পাওয়ার পর আপনারা যেভাবে আত্মনিবেদিত হয়ে বাংলাদেশকে পরিচালনা করছেন, সেই দেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি ভারত সরকার পুনরায় বিবেচনা করে।
আমি হৃষ্টচিত্তে আপনাকে জানাতে চাই, বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজ করছে নিশ্চয়ই তার আলোকে ভারত সরকার স্বীকৃতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ সকালে এ বিষয়ে আমি আমাদের সংসদে একটি বিবৃতি দিয়েছি। বিবৃতির অনুলিপি সংযুক্ত করছি।
বাংলাদেশের মানুষকে অনেক ভুগতে হয়েছে। আপনার তরুণ ছেলেরা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য আত্মবলিদানের সংগ্রামে লিপ্ত। ভারতের জনগণও একই আদর্শের প্রতিরক্ষায় লড়ে যাচ্ছে। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, এই শ্রেষ্ঠতম উদ্যোগ এবং আত্মদান ভালো কাজের জন্য আমাদের আত্মনিবেদনকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দুই দেশের জনগণের বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ন রাখবে। যাই হোক, পথ যত দীর্ঘই হোক, আত্মদান যত বেশিই হোক, আমাদের দুই দেশের মানুষের ভবিষ্যতে ডাক পড়বে, আমি নিশ্চিত আমরা বিজয়ীই হব।
ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে, আপনার সহকর্মীদের এবং বাংলাদেশের বীর জনতাকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগ নিচ্ছি।
আপনার মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিজ এক্সিলেন্সি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে আমার সর্বোচ্চ সম্মানের নিশ্চয়তা জ্ঞাপন করবেন।
আপনার একান্ত
(স্বাক্ষরিত)
ইন্দিরা গান্ধী
হিজ এক্সিলেন্সি মিস্টার তাজউদ্দীন আহমদ
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী
মুজিবনগর।
(বিদেশির চোখে ১৯৭১, নালন্দা ২০১২ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ থেকে)
ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পাকিস্তানের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছিল। একজন বিদেশি পর্যবেক্ষক বললেন, ‘ভারতীয় মন্ত্রিপরিষদকে মার্চের শেষে সেনা ও গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শ ছিল- ভারত পূর্ব বাংলার আশু সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য এখনো প্রস্তুত নয়। বাঙালিদের সামরিক সাহায্য করতে হলে তাদের আরও কিছু অপেক্ষায় থাকতে হবে। ভারত কৌশলগত কারণেই সে অপেক্ষা করেছে।
এয়ার মার্শাল কপিল কাক লিখেছেন: ১৯৭১-এ সাফল্যের প্রশংসাপ্রাপ্য ইন্দিরা গান্ধীরই। তিনিই ‘মাস্টার স্ট্রাটেজিস্ট’। তিনি তার সশস্ত্র বাহিনীর ওপর বিশ্বাস রেখেছেন এবং তাদের লড়াই করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। এই যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট, পরিকল্পনায় ছিল পেশাদারিত্ব, তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ছিল অনবদ্য। তিনি স্বীকৃতিও এমন সময় দিয়েছেন যা তাকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নের মুখোমুখি করবে না।
ভারত ও ভুটান একই দিন ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলেও ভূটানের ঘোষণাটি ভারতের কয়েক ঘণ্টা আগের। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবই এ ঘোষণা দিয়েছেন। কয়েক ঘণ্টা আগে তা নিশ্চিত না করলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি থেকে এটা উঠে এসেছে যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদাতা প্রথম দেশ হচ্ছে ভুটান। এ সম্মান ভুটান অবশ্যই পেতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সে সময় ভারত স্বীকৃতি না দিলে এবং ভারতীয় পরামর্শ না পেলে কি ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার মতো সাহসিকতা দেখাতে পারত? অবশ্যই না। এটাকে বরং ভারতীয় কর্মকৌশলের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। ভারতই চেয়েছে সে সময় ভারতের অনুগত ভুটানকে দিয়ে প্রথম স্বীকৃতি দেয়াবে, তাই হয়েছে। অবশ্য নয়াদিল্লি থেকে ডেনজিল পিরিসের ক্রিশ্চিয়ান সাায়েন্স মনিটরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া দ্বিতীয় দেশ ভুটান। এই রিপোর্টে আরও বলা হয়, ভারত বাংলাদেশের জন্য স্বীকৃতি আদায়ে বার্মা, আফগানিস্তানসহ তার মিত্র অনেক দেশের ওপর চাপ দিচ্ছে।
একাত্তরের ডিসেম্বরে ভারত ও ভুটান ছাড়া অন্য কোনো দেশ এমনকি ১৬ ডিসেম্বরের পরও স্বীকৃতি দেয়নি। পরবর্তী স্বীকৃতি এসেছে ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে। সেদিন সোভিয়েত ব্লকের দুটি ইউরোপীয় দেশ পোল্যান্ড ও বুলগেরিয়া বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন আরও অপেক্ষা করে।
পরদিন ১৩ জানুয়ারি বার্মা (এখন মিয়ানমার) স্বীকৃতি দেয়। অত্যন্ত সহজ বিশ্লেষণ- সে সময় বার্মা চীনের প্রভাবের অজ্ঞাবহ হয়ে ওঠেনি। স্বাধীনভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। তখনকার জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট ছিলেন বার্মার নাগরিক এবং শুরু থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।
১৫ জানুয়ারি ১৯৭২ স্বীকৃতি দেয় নেপাল, ২০ জানুয়ারি বার্বাডোজ, ২২ জানুয়ারি যুগোস্লাভিয়া, ২৪ জানুয়ারি সোভিয়েত ইউনিয়ন। ২৫ জানুয়ারি স্বীকৃতি দেয় টোঙ্গা। ২৬ জানুয়ারি স্বীকৃতি দেয় চেকোস্লোভাকিয়া, সাইপ্রাস, হাঙ্গেরি, অস্ট্রেলিয়া, ফিজি ও নিউজিল্যান্ড।
তথ্যসূত্র: দৈনিক বাংলা
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















