বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব - বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রাজনৈতিক প্রাণভোমরা
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এক অদম্য রাজনীতিকের প্রতিটি পদক্ষেপে, কারান্তরালে কিংবা রাজপথের উত্তাল তরঙ্গে, নেপথ্যের এক প্রদীপ্ত শিখা হয়ে যিনি নীরব আলো ছড়িয়ে গেছেন, তিনি আর কেউ নন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। সংক্ষেপে যাঁকে বলা হতো ‘রেনু’। বঙ্গবন্ধু যাঁকে আখ্যা দিয়েছিলেন তাঁর জীবনের “রাজনৈতিক প্রাণভোমরা” ও “জানেন টুকরা প্রিয়তমা”, সেই বঙ্গমাতা কেবল একজন রাজনীতিবিদের সহধর্মিণী ছিলেন না; তিনি ছিলেন তৎকালীন রাজনীতির এক নীরব দূরদর্শী কাণ্ডারী, ক্রান্তিকালের সংগঠক এবং বঙ্গবন্ধুর অবিচল শক্তির আধার।

TruthBangla

বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের আলোকোজ্জ্বল অধ্যায় হলো আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম। আর এই সংগ্রামের মহাকাব্যিক রূপকার ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এক অদম্য রাজনীতিকের প্রতিটি পদক্ষেপে, কারান্তরালে কিংবা রাজপথের উত্তাল তরঙ্গে, নেপথ্যের এক প্রদীপ্ত শিখা হয়ে যিনি নীরব আলো ছড়িয়ে গেছেন, তিনি আর কেউ নন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। সংক্ষেপে যাঁকে বলা হতো ‘রেনু’।
বঙ্গবন্ধু যাঁকে আখ্যা দিয়েছিলেন তাঁর জীবনের “রাজনৈতিক প্রাণভোমরা” ও “জানেন টুকরা প্রিয়তমা”, সেই বঙ্গমাতা কেবল একজন রাজনীতিবিদের সহধর্মিণী ছিলেন না; তিনি ছিলেন তৎকালীন রাজনীতির এক নীরব দূরদর্শী কাণ্ডারী, ক্রান্তিকালের সংগঠক এবং বঙ্গবন্ধুর অবিচল শক্তির আধার। শেখ মুজিবের জীবন ছিল মূলত সংগ্রামের, রাজপথের এবং কারাগারের। সেই ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ জীবনে ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন সেই বটবৃক্ষ, যার ছায়াতলে আশ্রয় পেয়েছিল সমগ্র পরিবার, এমনকি দিশাহারা আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা-কর্মী। গৃহকোণের পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অসীম সাহস, ধৈর্য ও ত্যাগের মাধ্যমে তিনি যেভাবে বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনকে স্বাধীনতার অভিমুখে ধাবিত করতে ভূমিকা রেখেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত বিরল।
রেনু থেকে বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা
১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা। ডাকনাম ছিল ‘রেনু’। শৈশবেই তিনি পিতা শেখ জহুরুল হক এবং মাতা সেলিনা বেগমকে হারান। মাতাপিতাহীন পিতৃহীন এই বালিকাকে পরম স্নেহে কোল তুলে নেন তাঁর পিতামহ শেখ কাশেম এবং বঙ্গবন্ধুর মা সায়েরা খাতুন। পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী খুব ছোটবেলাতেই শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়, তবে প্রথাগত সংসার জীবন শুরু হয় বহু পরে।
বাল্যকাল থেকেই রেনু ছিলেন আত্মমর্যাদাশীল, শান্ত, অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ও চিন্তাশীল। গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি বই পড়ার প্রতি তাঁর ছিল প্রবল অনুরাগ। টুঙ্গিপাড়ার শান্ত-শ্যামল পরিবেশে বেড়ে ওঠার সময় থেকেই তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন শেখ মুজিবের ভেতরের এক প্রদীপ্ত রাজনৈতিক সত্তাকে। ছাত্ররাজনীতি, দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষের সেবা এবং দেশভাগের উত্তাল দিনগুলোতে শেখ মুজিব যখন কলকাতার রাজপথে বা সারা বাংলায় ঘুরে বেড়াতেন, রেনু তখন টুঙ্গিপাড়ায় নিজের আবেগ-অনুভূতিকে সংযত রেখে স্বামীর রাজনৈতিক জীবনকে উৎসর্গীকৃতভাবে গ্রহণ করে নিচ্ছিলেন।
১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও ফরিদপুর কারাগারের অনশন
বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রথম সোপান ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলনের মূল রূপকারদের একজন ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথ যখন উত্তাল, তখন পাকি শাসকগোষ্ঠী তাঁকে বিনা বিচারে দীর্ঘ ২৬-২৭ মাস ধরে বন্দি করে রেখেছিল। ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের (IB) গোপনীয় ফাইল ও সিক্রেট ডকুমেন্ট থেকে জানা যায়, পাকিস্তানি গোয়েন্দারা প্রতি মুহূর্তে কীভাবে শেখ মুজিবের ওপর কড়া নজরদারি চালিয়েছিল।
১৯৫২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব এবং মহিউদ্দিন আহমেদকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ফরিদপুর কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়। ভাষার অধিকার এবং বন্দিমুক্তির দাবিতে তারা ১৬ই ফেব্রুয়ারি থেকে রাজবন্দি হিসেবে আমরণ অনশন শুরু করেন। অনশনের ফলে শেখ মুজিবের শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। হৃদযন্ত্রের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে, ঘন ঘন পালপিটিশন হতে থাকে। নিজের জীবনপ্রদীপ নিভে আসছে বুঝতে পেরে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অনশন শুরুর পূর্বেই তিনি ৪টি গোপন চিরকুট বা চিঠি লেখেন যার একটি ছিল তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী রেনুর উদ্দেশ্যে।
দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২৭শে ফেব্রুয়ারি মুক্তি পেয়ে যখন তিনি টুঙ্গিপাড়ার নিজ গৃহে পৌঁছান, তখন রেনুর ভেতরের জমে থাকা কষ্ট ও উদ্বেগের আগ্নেয়গিরি আত্মপ্রকাশ করে। তবে সেখানে কোনো কৃত্রিম কান্না বা অভিযোগ ছিল না, ছিল এক জীবনসঙ্গীনীর চরম প্রজ্ঞা ও অধিকারবোধ। বঙ্গমাতা রেনু বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ্য করে সেদিন বলেছিলেন:
"তোমার চিঠি পেয়ে আমি বুঝেছিলাম, তুমি কিছু একটা করে ফেলবা। আমি তোমাকে দেখবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। কাকে বলব নিয়ে যেতে, আব্বাকে বলতে পারি না লজ্জায়। নাসের ভাই বাড়ি নাই। যখন খবর পেলাম খবরের কাগজে, তখন লজ্জা শরম ত্যাগ করে আব্বাকে বললাম … রওয়ানা করলাম ঢাকায়, সোজা আমাদের বড় নৌকায় তিনজন মাল্লা নিয়ে। কেন তুমি অনশন করতে গিয়েছিলে? কিছু একটা হলে কি উপায় হত? আমি এই দুইটা দুধের বাচ্চা নিয়ে করে বাঁচতাম? হাসিনা, কামালের অবস্থা কি হত? তুমি বলবা, খাওয়া-দাওয়ার কষ্ট তো হত না? মানুষ কি শুধু খাওয়া পরা নিয়েই বেঁচে থাকতে চায়? আর মরে গেলে দেশের কাজই বা কিভাবে করতা?"
বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী-তে এই আবেগময় মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন:
"আমি তাকে কিছুই বললাম না। তাকে বলতে দিলাম, কারণ মনের কথা প্রকাশ করতে পারলে ব্যথাটা কিছু কমে যায়। রেণু খুব চাপা, আজ যেন কথার বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। শুধু বললাম, 'উপায় ছিল না'।"
রেনুর সেই অমর উক্তি "মানুষ কি শুধু খাওয়া পরা নিয়েই বেঁচে থাকতে চায়?" এটি কেবল একজন স্ত্রীর আকুতি ছিল না, বরং মানুষের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার দর্শনের এক গভীরতম প্রকাশ ছিল। তিনি অনুধাবন করেছিলেন, বেঁচে থাকার অর্থ কেবল অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান নয়, বরং নীতি ও অধিকারের সঙ্গে মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকা।

১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ‘ছয় দফা’ ছিল বাঙালির ম্যাগনাকার্টা বা মুক্তির সনদ। এই ছয় দফাকে কেন্দ্র করে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলন এক নতুন মোড় নেয়। বঙ্গবন্ধু ছয় দফাকে বাঙালির দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া চষে বেড়িয়েছেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাঁর এই জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক রাজনৈতিক মামলা দায়ের করতে থাকে।
পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, এক জেলায় জামিন পেয়ে মুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই কারাগারের ফটক থেকে তাঁকে অন্য জেলার নতুন মামলায় গ্রেফতার করা হতো। সেই উত্তাল সময়ে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে বঙ্গবন্ধুকে আটবার কারাগারে যেতে হয়েছিল!
শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করে আন্দোলন স্তব্ধ করার যখন অপচেষ্টা চলছিল, তখন আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত রাখার দায়িত্বটি এসে পড়ে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কাঁধে। প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক পদে না থেকেও তিনি কার্যত দলের মূল নেতৃত্ব প্রদান করেন:
গোপন বৈঠক পরিচালনা: দলীয় নেতা-কর্মী, ছাত্রনেতা, শিক্ষক ও শ্রমিক নেতাদের সাথে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে গোপনে বৈঠক করতেন এবং আন্দোলনের নির্দেশাবলি দিতেন।
ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকদের সাহায্য: তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগের যে নেতাকেই ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হতো, তাকেই পাকিস্তানি পুলিশ গ্রেফতার করতো। এমন সঙ্কটে বঙ্গমাতা নিজের বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতা দিয়ে অঘোষিতভাবে সাধারণ সম্পাদকের ভূমিকা পালন করেন।
আর্থিক সংস্থান ও সাহায্য: বঙ্গবন্ধু জেলে থাকায় দলের সাংগঠনিক খরচ এবং রাজবন্দিদের মামলা চালানের জন্য অর্থের প্রচণ্ড সংকট দেখা দেয়। বঙ্গমাতা নিজের গহনা, আসবাবপত্র ও ঘরের সম্পদ বিক্রি করে সানন্দে রাজবন্দিদের পরিবার ও দলীয় তহবিলে অর্থ যোগান দিয়েছেন।
পাকিস্তানি সামরিক ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা তাঁকে বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় প্রস্তাব দিয়েছিল আন্দোলন থামানোর জন্য। কিন্তু তিনি আপসহীন মনোভাব প্রদর্শন করে সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বঙ্গমাতার এই অনমনীয় ও দেশপ্রেমিক ভূমিকার কারণেই ছয় দফা আন্দোলন গণবিস্ফোরণে রূপ নিয়েছিল।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও প্যারোল প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ (রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য) দায়ের করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানোর সমস্ত আয়োজন যখন চূড়ান্ত, তখন ১৯৬৯ সালে সমগ্র পূর্ব বাংলা গণঅভ্যুত্থানে কেঁপে ওঠে। স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের ক্ষমতার ভিত্তি কেঁপে উঠলে তিনি গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনার জন্য বঙ্গবন্ধুকে ‘প্যারোলে’ (শর্তাধীন মুক্তি) লাহোর নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন।
তৎকালীন আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষনেতা এমনকি আইনজীবীরাও বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তিতে সম্মত ছিলেন। তারা ভেবেছিলেন বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে আলোচনা হওয়া দরকার। কিন্তু বেগম মুজিব পরম দূরদর্শিতায় বুঝতে পেরেছিলেন, প্যারোলে মুক্তি নিলে মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হবে না এবং গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক আবেগ ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
তিনি জেলখানায় বঙ্গবন্ধুর কাছে চিরকুট পাঠিয়ে দৃঢ় বার্তা দেন: "কোনো অবস্থাতেই প্যারোলে মুক্তি নেওয়া যাবে না। মুক্তি যদি হতে হয়, তবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নিঃশর্ত মুক্তি পেতে হবে।"
আইয়ুব খানের সামরিক সরকার বেগম মুজিবকে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়েছিল। কিন্তু তিনি একচুলও বিচলিত হননি। উল্টো তিনি আইনজীবীদের সাথে নিজে বসে আইনি লড়াই জোরদার করেন এবং প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করেন। বঙ্গমাতার সেই দূরদর্শী চিরকুটের বার্তা পেয়ে বঙ্গবন্ধু আইয়ুব খানের প্যারোলের প্রস্তাব সজোড়ে প্রত্যাখ্যান করেন। পরিণতিতে, জাগ্রত জনতার তীব্র গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খান বাধ্য হন আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করতে এবং বঙ্গবন্ধুকে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে। পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। বঙ্গমাতার একটি সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সেদিন ইতিহাস বদলে দিয়েছিল।
৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ: বঙ্গমাতার মনস্তাত্ত্বিক নির্দেশনা
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামের এক চরম মহাকাব্যিক মুহূর্ত। রেসকোর্স ময়দানে সেদিন লাখ লাখ মানুষের জনসমুদ্র। পাকিস্তান মিলিটারি ও ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস কামানের নল উঁচিয়ে বসে আছে, অন্যদিকে জনগণ শুনতে চায় স্বাধীনতার চূড়ান্ত বার্তা। দলের অনেক প্রভাবশালী নেতা বঙ্গবন্ধুকে লিখিত খসড়া ভাষণ দিচ্ছিলেন, হরেক রকম পরামর্শে বাতাস ভারাক্রান্ত ছিল।
বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিতে যাওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বঙ্গবন্ধুকে আলাদা ডেকে নিয়ে অত্যন্ত সহজ অথচ গভীর একটি পরামর্শ দেন। তিনি বলেছিলেন:
"তোমার সামনে লাখ লাখ মানুষ, তাদের হাতে বাঁশের লাঠি। পেছনে পাকিদের বন্দুক-কামান। তোমার রাজনৈতিক জীবনে অনেক নেতা অনেক পরামর্শ দিয়েছে, কিন্তু আজ কেউ তোমার পাশে নেই। তুমি সারা জীবন মানুষের জন্য লড়াই করেছ। তোমার মন যা বলতে বলে, তুমি কেবল সেটাই বলবে। কারো লিখিত ভাষণ পড়বে না।"
বঙ্গমাতা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে অনুধাবন করেছিলেন, দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন কেবল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রজ্ঞা ও হৃদয়ের সাথেই সংযুক্ত। বেগম মুজিবের এই এক বাক্যের মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি বঙ্গবন্ধুকে এনে দিয়েছিল পরম আত্মবিশ্বাস। রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণটি দিয়েছিলেন, যা আজ ইউনেস্কোর বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও খন্দকার মোশতাক চক্রের চক্রান্ত নস্যাৎ
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এরপর ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে বঙ্গমাতা, শেখ হাসিনাসহ পরিবারের সদস্যদের গৃহবন্দি করে রাখা হয়। একদিকে বন্দিজীবন, অন্যদিকে স্বামী পাকিস্তানে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি, ছেলেরা (শেখ কামাল ও শেখ জামাল) মুক্তিযুদ্ধে এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেও বেগম মুজিব ধৈর্য হারাননি।
ঐতিহাসিক ক্রান্তিকালে মুজিবনগর সরকারের ভেতরে খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও তার কতিপয় চক্রান্তকারী এক সুচতুর কৌশল অবলম্বন করে। মোশতাক চক্র প্রচারপত্র বিতরণ শুরু করে যার মূল বক্তব্য ছিল: ‘আগে মুজিব, না আগে স্বাধীনতা?’
তারা যুক্তি দেখায়, আগে স্বাধীনতা চাইলে শেখ মুজিবকে পাকিদের হাতে প্রাণ দিতে হবে, তাই আগে আপসের মাধ্যমে মুজিবকে মুক্ত করে এনে তারপর তাঁর নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জন করা ভালো। মোশতাক চক্রের মূল নিশানা ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। তারা ভাবছিল স্বামীকে বাঁচানোর আকুতি জানিয়ে বেগম মুজিব হয়তো আপস সংলাপে রাজি হবেন।
স্বাধীনতা লাভের পরপরই মোশতাক শেখ পরিবারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে বঙ্গমাতার কাছে গিয়ে বিষোদ্গার করেছিল "তাজউদ্দিন আহমেদ উচ্চাকাঙ্ক্ষী, সে ক্ষমতা ধরে রাখতে চায় বলে মুজিবকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছে না।"
কিন্তু বেগম মুজিব চক্রান্তকারীদের ফাঁদে পা দেননি। তিনি জানতেন, শেখ মুজিবুর রহমান এমন একজন নেতা যিনি নীতির প্রশ্নে ও স্বাধীনতার প্রশ্নে কখনো আপস করতে পারেন না। আগরতলা মামলার সময়ও বঙ্গবন্ধু বঙ্গমাতাকে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন ঐ মামলায় ফাঁসি হলেও তিনি মার্জনা ভিক্ষা করবেন না এবং পরিবারের কেউ যেন সেই চেষ্টা না করে।
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের এই অবিচল মানসিকতা ও দূরদর্শিতার কারণে মোশতাক চক্রের বাংলাদেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র পুরোপুরি নস্যাৎ হয়ে যায়।
স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশ: বঙ্গমাতার আদর্শ, বিনয় ও ত্যাগ
১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি দেশে ফিরে আসেন। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হন। রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবনযাত্রায় বিন্দুমাত্র অহংকার বা বিলাসিতা স্পর্শ করেনি।
সরকারি বাসভবন বা বঙ্গভবনে না থেকে তিনি আমৃত্যু ধানমন্ডির সাধারণ ৩২ নম্বর বাড়িতই বসবাস করে গেছেন।
বীরঙ্গনাদের পুনর্বাসন: ১৯৭১ সালের যুদ্ধে সম্ভ্রম হারানো হাজার হাজার বীরঙ্গনাদের সামাজিক মর্যাদা দেওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং তাঁদের পুনর্বাসনে বঙ্গমাতা নিজে উদ্যোগ নেন। নিজ হাতে অনেক বীরঙ্গনা কন্যাকে বিয়ে দিয়েছেন এবং সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে এনেছেন।
সাধারণ মানুষের আশ্রয়: ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঘরটি ছিল সাধারণ মানুষ, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও দলীয় কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত। তিনি নিজে রান্না করে শত শত মানুষকে খাওয়াতেন।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে বঙ্গমাতার ভূমিকার মূল্যায়ন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু নিজেই ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের এক অনুষ্ঠানে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেছিলেন:
"আমার জীবনেও আমি দেখেছি যে গুলির সামনে আমি এগিয়ে গেলেও কোনো দিন আমার স্ত্রী আমাকে বাধা দেয় নাই। এমনও আমি দেখেছি যে, অনেকবার আমার জীবনের ১০/১১ বছর আমি জেল খেটেছি। জীবনে কোনো দিন মুখ খুলে আমার ওপর প্রতিবাদ করে নাই। তাহলে বোধ হয় জীবনে অনেক বাধা আমার আসত। এমন সময়ও আমি দেখেছি যে আমি যখন জেলে চলে গেছি, আমি এক আনা পয়সা দিয়ে যেতে পারি নাই আমার ছেলে-মেয়ের কাছে। আমার সংগ্রামে তার দান যথেষ্ট রয়েছে।"
এক নজরে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবন
নিচে বঙ্গমাতার জীবন, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও ঐতিহাসিক ভূমিকা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
বিষয়/ক্ষেত্র | ঐতিহাসিক ঘটনা ও বঙ্গমাতার ভূমিকা | রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য |
জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন | ৮ আগস্ট ১৯৩০, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম। শৈশবে পিতা-মাতাকে হারিয়ে টুঙ্গিপাড়াতেই প্রতিপালিত ও বিকশিত হন। | সাধারণ গ্রামীণ আবহ থেকে উঠে এসে সহনশীলতা, প্রজ্ঞা ও অসীম সাহসের প্রতীক হয়ে ওঠা। |
১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন | ফরিদপুর জেলে বঙ্গবন্ধুর অনশনের সময় ঢাকায় আসা, ৩ জন মাল্লা নিয়ে বড় নৌকায় যাতায়াত এবং বিখ্যাত উক্তি "মানুষ কি শুধু খাওয়া পরা নিয়েই বেঁচে থাকতে চায়?" | আত্মমর্যাদাশীল জীবন দর্শনের প্রকাশ এবং জীবনসঙ্গীর নীতিগত লড়াইয়ের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন। |
১৯৬৬-এর ছয় দফা | বঙ্গবন্ধুর ঘনঘন গ্রেফতারের মুখে গোপনে দলীয় নেতা, ছাত্র ও শ্রমিকদের নির্দেশনা প্রদান; পোস্টার ও আন্দোলন পরিচালনার খরচ মেটাতে ঘরের অলঙ্কার বিক্রি। | দলের নেতৃত্ব ধরে রাখা এবং ছয় দফাকে গণমানুষের আন্দোলনে রূপান্তরে নেপথ্য চালিকাশক্তি। |
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান | আইয়ুব খানের দেওয়া ‘প্যারোল’ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের জন্য বঙ্গবন্ধুর কাছে কড়া বার্তা ও চিরকুট পাঠানো এবং আইনজীবীদের অর্থ সংস্থান। | প্যারোল প্রত্যাখ্যানের ফলে আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তি অর্জন। |
১৯৭১-এর ৭ই মার্চের ভাষণ | ভাষণের পূর্বে পরামর্শ: "কারো দেওয়া কাগজ নয়, মন থেকে যা আসে তাই বলো।" | বিশ্ব ঐতিহ্যে স্থান পাওয়া ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের কালজয়ী ভাষণের মানসিক ভিত তৈরি। |
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ | ধানমন্ডিতে গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় খন্দকার মোশতাকের "আগে মুজিব, না আগে স্বাধীনতা" চক্রান্ত ও বিভ্রান্তিকর প্রচার নস্যাৎ করা। | স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন থেকে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাকে সুরক্ষিত রাখা। |
স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশ | সাধারণ জীবনযাপন, বঙ্গভবনে না গিয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অবস্থান, বীরঙ্গনাদের পুনর্বাসন ও বিয়ে দেওয়া। | রাষ্ট্রপ্রধানের স্ত্রী হয়েও অতুলনীয় বিনয়, মানবতা ও সাধারণ মানুষের প্রতি মমত্ববোধ। |
১৫ই আগস্টের ট্র্যাজেডি ও মহাপ্রস্থান
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাঙালি জাতির ইতিহাসে কালোতম অধ্যায়। দেশি-বিদেশি চক্রান্তে ঘাতকের দল ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। ঘাতকেরা যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করে, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিন্দুমাত্র ভীত বা পরাস্ত হননি।
ঘাতকেরা যখন তাঁকে প্রদেয় ঘরে গিয়ে আত্মসমর্পণের বা প্রাণভিক্ষার ইঙ্গিত দেয়, বঙ্গমাতা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন: "তোমরা তাঁকে মেরে ফেলেছ, আমাকেও মেরে ফেলো।"
তিনি ঘাতকের কাছে প্রাণভিক্ষা চাননি, বরং বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী হিসেবে বীরদর্পে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর রক্তে রঞ্জিত ৩২ নম্বরের মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাঙালির এই মহীয়সী মা।
শৈশব, চরিত্র গঠন ও স্বশিক্ষার প্রতি অনুরাগ
মাতৃহীন-পিতৃহীন বালিকার আত্মপ্রত্যয়: ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া ‘রেনু’ মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পিতা শেখ জহুরুল হক এবং সাত বছর বয়সে মাতা সেলিনা বেগমকে হারান। মাতাপিতাহীন বালিকা পরম স্নেহে লালিত-পালিত হন তাঁর পিতামহ শেখ কাশেম এবং শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে।
স্বশিক্ষায় নিজেকে গড়ে তোলা: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের সুযোগ তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটে সীমিত থাকলেও, বঙ্গমাতার জানার পরিধি ছিল সীমাহীন। তিনি ঘরে বসেই বাংলা সাহিত্য, ইতিহাস, দেশ-বিদেশের রাজনীতি এবং পত্রিকা পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য ছিল তাঁর পছন্দের তালিকায়।
রাজনীতিকে আপন করে নেওয়া: কৈশোর অতিক্রম করার আগেই তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে শেখ মুজিবের জীবন সাধারণ পাঁচটা মানুষের মতো নয়; তাঁর জীবন বাংলার মানুষের জন্য উৎসর্গীকৃত। এই অনুধাবন থেকেই তিনি নিজের চাওয়া-পাওয়াকে বিদায় দিয়ে স্বামীর রাজনৈতিক মিশনকে জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন।
বঙ্গবন্ধুর কারান্তরীণ জীবন ও গৃহকোণের সংগ্রাম (১৯৪৮–১৯৭১)
বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের প্রায় ৪,৬৮২ দিন (১৩ বছরেরও বেশি সময়) কারাগারে কাটিয়েছেন। যখনই বঙ্গবন্ধু জেলে যেতেন, পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব এক হাতে সামলাতেন বঙ্গমাতা।
সন্তানদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা: শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রেহানা এবং শেখ রাসেল এই পাঁচ সন্তানকে বাবার অনুপস্থিতি বুঝতে না দিয়ে নীতি-নৈতিকতা ও সাধারণ জীবনযাপনের শিক্ষায় বড় করেছেন তিনি। সন্তানদের তিনি শিখিয়েছিলেন অহংকারমুক্ত থাকতে।
আর্থিক সঙ্কট মোকাবিলা: বঙ্গবন্ধু যখন জেলে থাকতেন, তখন অনেক সময় সংসারে চরম আর্থিক অনটন দেখা দিত। বঙ্গমাতা কখনো ভেঙে পড়েননি। ঘরের আসবাবপত্র, অলঙ্কার বিক্রি করে একদিকে সংসার চালিয়েছেন, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহকর্মীদের অর্থ সাহায্য পাঠিয়েছেন।
জেলগেটের সাক্ষাৎকার: জেলে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে তিনি কেবল পারিবারিক খবর দিতেন না; বরং বাইরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বিস্তারিত তুলে ধরতেন এবং রাজবন্দী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর মনোবল দৃঢ় রাখতেন।
রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ইতিহাসের মোড় ঘোরানো ভূমিকা
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন: ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে গোপালগঞ্জে শেখ মুজিবের নির্বাচনী প্রচারণায় পর্দার আড়াল থেকে কাজ করেছিলেন বঙ্গমাতা। টুঙ্গিপাড়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নারীদের ঘরে ঘরে গিয়ে সংগঠিত করেছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর বিজয় সুনিশ্চিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন।
১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন ও ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি নির্মাণ: ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করার পর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরিবারকে সেগুনবাগিচার বাসা থেকে উচ্ছেদ করা হয়। সেই কঠিন সময়ে বঙ্গমাতা ছোট সন্তানদের নিয়ে চরম কষ্টে দিনাতিপাত করলেও নিজের মনোবল হারাননি। পরবর্তীতে তাঁর নিজের সঞ্চয় ও প্রচেষ্টায় ১৯৬১ সালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ঐতিহাসিক বাড়িটি নির্মাণের কাজ শুরু করেন, যা পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলা অর্জনের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়।
১৯৬৬ সালের ৬ দফা ও ৮ জুনের হরতাল: বঙ্গবন্ধু ৬ দফা ঘোষণা করার পর যখন দেশজুড়ে চরম দমন-পীড়ন শুরু হয় এবং দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করা হয়, তখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি কার্যত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পরিণত হয়।
বঙ্গমাতা ছদ্মবেশে ও গোপনে ছাত্রনেতা, শ্রমিকনেতা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে দেখা করতেন। ১৯৬৬ সালের ৭ জুনের ঐতিহাসিক ৬ দফা বাস্তবায়নের হুকুম এবং ৮ জুনের হরতাল সফল করার নির্দেশাবলি তিনি জেলে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করে এনে বাইরে নেতাদের কাছে পৌঁছে দিতেন।
আন্দোলনের জন্য পোস্টার, লিফলেট ছাপানো এবং আত্মগোপনে থাকা কর্মীদের কাছে টাকা পৌঁছানোর কাজ তিনি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে করতেন।
১৯৬৯ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও ‘প্যারোল’ প্রত্যাখ্যান: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেওয়ার ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত হয়েছিল। আইয়ুব সরকার যখন গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে 'প্যারোলে' (শর্তাধীন মুক্তি) লাহোর যাওয়ার প্রস্তাব দেয়, তখন দলের অনেক সিনিয়র নেতা ও আইনজীবীও প্যারোলে রাজি ছিলেন।
বঙ্গমাতা স্পষ্টভাবে অনুধাবন করেছিলেন, প্যারোলে গেলে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের নৈতিক মৃত্যু ঘটবে এবং আন্দোলন ভেস্তে যাবে। তিনি জেলে চিরকুট পাঠিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নির্দেশ দেন: "নিঃশর্ত মুক্তি ছাড়া কোনো আপস নয়।"
বঙ্গমাতার সেই সঠিক ও কঠোর সিদ্ধান্তের কারণেই আইয়ুব সরকার আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় এবং গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু নিঃশর্ত মুক্তি পান।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ
৭ই মার্চের ভাষণের আগে নেতাদের বিভিন্ন মতামত ও খসড়া প্রেসারে যখন বঙ্গবন্ধু চিন্তিত ছিলেন, তখন বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে নিভৃতে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন:
"তুমি সারা জীবন মানুষের জন্য আন্দোলন করেছ। তোমার মন যা বলে, মানুষের জন্য যা ভালো মনে হয় তুমি সেটাই বলবে। কারো লিখে দেওয়া কথা বলার দরকার নেই।" বঙ্গমাতার এই একটি মানসিক পরামর্শই বঙ্গবন্ধুকে সম্পূর্ণ চাপমুক্ত হয়ে সেই বিশ্বজয়ী ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদানের শক্তি জুগিয়েছিল।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকারের ক্রান্তিকাল
গৃহবন্দী জীবন: ২৫শে মার্চ কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের পর বঙ্গমাতা, শেখ হাসিনাসহ পরিবারের সদস্যদের ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে কড়া পাহারায় গৃহবন্দী করে রাখা হয়।
সন্তানদের যুদ্ধে পাঠানো: নিজের দুই ছেলে শেখ কামাল ও শেখ জামালকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি ও সার্বিক প্রেরণা দেন তিনি।
মোশতাক চক্রের চক্রান্ত নস্যাৎ: প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের কিছু ষড়যন্ত্রকারী (বিশেষ করে খন্দকার মোশতাক) যখন "আগে মুজিব না আগে স্বাধীনতা" প্রচারণা চালিয়ে পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন গঠনের অপচেষ্টা করছিল, তখন বঙ্গমাতা বার্তা পাঠান যে, শেখ মুজিবুর রহমান কখনো দেশের স্বাধীনতার সাথে আপস করবেন না। তাঁর এই শক্ত অবস্থানের কারণে মুক্তিযুদ্ধে আপসকামীদের ষড়যন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়ে।
স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বঙ্গমাতার অবদান (১৯৭২-১৯৭৫)
বীরাঙ্গনাদের সামাজিক পুনর্বাসন: মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হাজার হাজার বীরাঙ্গনাকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে বঙ্গমাতা অতুলনীয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি নিজে তাঁদের সেবা করতেন, বীরাঙ্গনাদের ‘নিজের মেয়ে’ হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং সামাজিক অপবাদ দূর করে নিজ উদ্যোগে অনেক বীরাঙ্গনার বিয়ে দেন।
বিনয়ী ও বিলাসিতাহীন জীবন: বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী, দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা নেননি। তিনি সরকারি বাসভবন 'বঙ্গভবনে' না থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের সাধারণ বাড়িতেই থেকেছেন।
ঐতিহ্যবাহী আতিথেয়তা: ইন্দিরা গান্ধী, মার্শাল টিটো, সাদার্ন বা বিদেশি বড় বড় রাষ্ট্রপ্রধান ও কূটনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আপ্যায়নে বঙ্গমাতা নিজে রান্নাঘরে গিয়ে বাঙালি ঐতিহ্যবাহী খাবার প্রস্তুত করতেন এবং বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ফুটিয়ে তুলতেন।
বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্মৃতিচারণে বঙ্গমাতা
বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থে বেগম ফজিলাতুন্নেছার অবদান সম্পর্কে বার বারবার শ্রদ্ধার সাথে উল্লেখ করেছেন:
"রেণু আমার পাশে না থাকলে আমি আজকের শেখ মুজিব হতে পারতাম না। সে কখনো নিজের কথা ভাবেনি, সারা জীবন শুধু আমার কথা এবং দেশের মানুষের কথা ভেবেছে।"
বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর স্মৃতিচারণে বঙ্গমাতা সম্পর্কে বলেছেন:
"আমার মায়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না, কিন্তু রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও মনস্তাত্ত্বিক ধারণক্ষমতায় তিনি ছিলেন অনন্য। বাবার জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে আমার মায়ের গোপন অথচ দূরদর্শী পরামর্শ কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল।"
ইতিহাসের পাতায় ও বাঙালির হৃদয়ে চিরঞ্জীব বঙ্গমাতা
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন সেই বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি ক্ষমতার আলোয় আলোকিত না হয়েও ইতিহাস তৈরি করেছেন। তিনি ছিলেন ছায়ার মতো, কিন্তু তাঁর প্রভাব ছিল বটবৃক্ষের মতো বিস্তৃত।
শেখ মুজিবুর রহমান থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ এবং পরবর্তীতে ‘জাতির পিতা’ হয়ে ওঠার যে দীর্ঘ মহাকাব্যিক পথপরিক্রমা, তার প্রতিটি পাতায় বঙ্গমাতার ঘাম, অশ্রু, ত্যাগ ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা মিশে আছে। সহধর্মিণী, প্রজ্ঞাবান রাজনৈতিক অভিভাবক, দূরদর্শী সংগঠক এবং পরম মমতাময়ী মা হিসেবে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বাঙালি জাতির প্রাতঃস্মরণীয় এক প্রেরণার উৎস। তিনি চিরদিন বেঁচে থাকবেন স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এবং কোটি বাঙালির হৃদয়ে অমর, অবিনশ্বর বঙ্গমাতা হিসেবে।















