বঙ্গবন্ধু ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী - গুরু-শিষ্যের আদর্শিক সমীকরণ ও 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পর্কটি সবচেয়ে বর্ণিল, জটিল এবং গভীরভাবে দ্বান্দ্বিক। একদিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যার হাত ধরে উদীয়মান তরুণ শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দীক্ষা, যিনি ছিলেন তৎকালীন উপমহাদেশের অন্যতম শীর্ষস্তরের আইনজীবী, তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান, পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ধারায় বিশ্বাসী এক অভিজাত রাজনীতিক। অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমান যিনি তৃণমূল থেকে উঠে আসা গণমানুষের নেতা, আপসহীন বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল স্থপতি এবং পরবর্তীতে একটি স্বাধীন জাতির পিতা।

TruthBangla

বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাস কোনো একক রৈখিক পথ ধরে হেঁটে আসেনি। এটি নির্মিত হয়েছে তীব্র মতাদর্শিক সংঘাত, ক্ষমতার লড়াই, রাজপথের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন এবং প্রাসাদরাজনীতির জটিল নাটকের মধ্য দিয়ে। এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক পরিক্রমায় যেসব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বাঙালি জাতির ভাগ্য নির্ধারণে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের মধ্যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পর্কটি সবচেয়ে বর্ণিল, জটিল এবং গভীরভাবে দ্বান্দ্বিক।
একদিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যার হাত ধরে উদীয়মান তরুণ শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দীক্ষা, যিনি ছিলেন তৎকালীন উপমহাদেশের অন্যতম শীর্ষস্তরের আইনজীবী, তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান, পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ধারায় বিশ্বাসী এক অভিজাত রাজনীতিক। অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমান যিনি তৃণমূল থেকে উঠে আসা গণমানুষের নেতা, আপসহীন বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল স্থপতি এবং পরবর্তীতে একটি স্বাধীন জাতির পিতা।
সোহরাওয়ার্দী ছিলেন শেখ মুজিবের রাজনৈতিক গুরু; মুজিবকে তিনি কাজ শিখিয়েছেন, রাজনীতির মারপ্যাঁচ বুঝিয়েছেন, পরম স্নেহে কাছে টেনে নিয়েছেন। তবে গুরুর প্রতি চরম শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখেও আদর্শিক, রাজনৈতিক কৌশলগত এবং ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে শেখ মুজিব গুরুর ছায়া হয়ে থাকেননি। যখনই গুরুর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পূর্ব বাংলার স্বার্থ, গণতান্ত্রিক নীতি কিংবা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানের বিরুদ্ধে গেছে, তখনই তরুণ শেখ মুজিব সোচ্চার হয়েছেন, মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন কঠোর নীতিগত দৃঢ়তা নিয়ে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কালজয়ী গ্রন্থ অসমাপ্ত আত্মজীবনী, তৎকালীন রাজনৈতিক দলিলপত্র, বিভিন্ন স্বনামধন্য ইতিহাসবিদ ও গবেষকের বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করলে গুরু-শিষ্যের এই অনন্য ঐতিহাসিক সমীকরণটি আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। আমার এই আলোচনায় ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট পরবর্তী সংকট, ১৯৫৬ সালের সংবিধান বিতর্ক, বৈদেশিক নীতিতে আন্তর্জাতিক অক্ষে পাকিস্তানের অবস্থান এবং শেখ মুজিবের স্বকীয় নেতা হিসেবে গড়ে ওঠার এক বস্তুনিষ্ঠ ও গভীর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
১৯৫৪-র রাজকীয় জয়, কেন্দ্রীয় ষড়যন্ত্র ও ঐতিহাসিক শাসনতান্ত্রিক বিপর্যয়
১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ছিল বাঙালি জাতির রাজনৈতিক চেতনায় এক বিশাল যুগান্তকারী মোড়। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত 'যুক্তফ্রন্ট' তৎকালীন শোষক শাসকদল মুসলিম লীগকে এক অভূতপূর্ব ধস নামানো পরাজয়ে পিষে ফেলেছিল। পূর্ব বাংলার ২৪৩টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট একাই লাভ করে ২২৩টি আসন, আর ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন।
কিন্তু বাঙালি জনগণের এই বিশাল গণরায়কে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। গণরায়ের মাধ্যমে অর্জিত গণতান্ত্রিক সাফল্যকে নস্যাৎ করতে কেন্দ্রীয় পাকিস্তানি আমলাতন্ত্র ও সামরিক চক্র তৎক্ষণাৎ প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। মাত্র দুই মাসের মাথায়, অর্থাৎ ১৯৫৪ সালের ৩০ মে, পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ৯২-ক (Section 92A) ধারা জারি করে নির্বাচিত যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দেন এবং পূর্ব বাংলায় গভর্নর শাসন জারি করেন।
শুরু হয় তীব্র দমন-পীড়ন। তরুণ ও ক্ষুরধার রাজনৈতিক সংগঠক, সদ্য গঠিত মন্ত্রিসভার কনিষ্ঠ কৃষি ও সমবায় মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হন। তাঁর সাথে বন্দি করা হয় শত শত রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে। কারান্তরালে যখন প্রগতিশীল ও তরুণ নেতৃত্ব অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিন কাটাচ্ছেন, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক ও কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নাটকীয় ও বিতর্কিত মোড় ঘটে।
তৎকালীন সময়ে মুসলিম লীগের স্বৈরাচারী ও ষড়যন্ত্রমূলক শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে লড়াই পরিচালনা করা দলীয় প্রধান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দেশে ছিলেন না। হৃদরোগ ও সার্বিক অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য তিনি অবস্থান করছিলেন সুইজারল্যান্ডের জুরিখে। জুরিখে চিকিৎসাধীন সোহরাওয়ার্দীর শারীরিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগাতে চতুর গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ এক সূক্ষ্ম চালে নামেন। তিনি বার্তা পাঠান যে, সোহরাওয়ার্দী যদি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যোগ না দেন, তবে গোটা পাকিস্তানেই পূর্ণাঙ্গ সামরিক শাসন জারি করা হবে।
ভয়, প্রলোভন এবং কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান পোক্ত করার তীব্র বাসনার এক মিশেলে সোহরাওয়ার্দী এই ফাঁদে পা দেন। তিনি ঢাকায় অবস্থানরত নিজের দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে কোনো যোগাযোগ না করে, কারারুদ্ধ তরুণ সহকর্মীদের মতামত তো দূরের কথা, পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে বিন্দুমাত্র পরামর্শ না করেই জুরিখ থেকে করাচি পৌঁছে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভায় আইনমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন।
করাচির হোটেল মেট্রোপোল: গুরু ও শিষ্যের নজিরবিহীন সংঘাত
জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে যখন তরুণ শেখ মুজিব এবং তাঁর সহবন্দিরা এই খবরটি শুনলেন, তখন তাঁরা পুরোপুরি হতবাক ও স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলেন। যাঁর ওপর ভরসা করে, যাঁকে ভবিষ্যতের পাকিস্তানের গণতন্ত্রী ও প্রগতিশীল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কল্পনা করে বছরের পর বছর ধরে গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে প্রচার চালিয়েছেন, রাজপথে লাঠিসোটা সহ্য করেছেন এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলো কারাগারে কাটিয়েছেন সেই পরম শ্রদ্ধাভাজন নেতাই কিনা সহযোদ্ধাদের অন্ধকারে রেখে প্রতিপক্ষ স্বৈরাচারী শক্তির সাথে হাত মেলালেন!
শেখ মুজিবের ভেতরের আগুন ও আত্মসম্মানবোধ এতটাই তীব্র ছিল যে, সোহরাওয়ার্দী সুস্থ হয়ে ইউরোপ থেকে দেশে ফেরার পর সহবন্দিরা তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে টেলিগ্রাম পাঠানোর প্রস্তাব দিলেও মুজিব স্পষ্ট ভাষায় তা অস্বীকার করেন।
পরবর্তীতে বাবার গুরুতর অসুস্থতার খবর পেয়ে বিশেষ প্যারোলে বা মুক্তি পেয়ে জেল থেকে বেরিয়ে মুজিব ছুটে যান ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়ায় নিজ বাড়িতে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই করাচি থেকে সোহরাওয়ার্দীর জরুরি তলব আসে অনতিবিলম্বে করাচি পৌঁছাতে হবে।
অসুস্থ বাবার পাশে দাঁড়িয়েও যুবনেতা মুজিবের মন শান্ত হচ্ছিল না। চিন্তার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল: "নেতা কেন স্বৈরাচারী মন্ত্রিসভার আইনমন্ত্রী হলেন?"
করাচি পৌঁছেই সেদিন রাতে তিনি সোহরাওয়ার্দীর সাথে দেখা করতে যাননি। মুজিব তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী-তে স্বকীয় সততায় উল্লেখ করেছেন, রাতে দেখা করতে গেলে তীব্র ক্ষোভের বশে গুরুর সাথে বেয়াদবি বা অসম্মানজনক আচরণ করে ফেলতে পারেন এই ভয়েই তিনি নিজেকে সংবরণ করেছিলেন।
পরদিন সকালে করাচির বিখ্যাত 'হোটেল মেট্রোপোল'-এ ঘটে সেই ঐতিহাসিক ও নাটকীয় সাক্ষাৎকার।
ঘরে প্রবেশ করতেই সোহরাওয়ার্দী অনুযোগের সুরে বললেন:
"মুজিব, তুমি কাল রাতে এলে না কেন? তোমার তো রাতেই আসা উচিত ছিল।"
তরুণ মুজিব কোনো ভূভূমিকা না করে, অত্যন্ত চাঁচাছোলা ও সরাসরি ভাষায় খোঁচা দিয়ে বললেন:
"আপনি তো এখন মোহাম্মদ আলী সাহেবের আইনমন্ত্রী। আপনার কাছে আসার সময় কোথায়?"
সোহরাওয়ার্দী কিছুটা চমকে গিয়ে শিষ্যকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলেন:
"রাগ করেছ নাকি, মুজিব?"
শেখ মুজিবের জবাব ছিল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা এক নীতিদীপ্ত অভিব্যক্তি:
"রাগ করব কেন, স্যার? আমি তো ভাবছি, সারা জীবন আপনাকে নেতা মেনে ভুলই করেছি কি না।"
একজন ৩৩-৩৪ বছরের প্রগতিশীল তরুণ রাজনীতিকের কাছ থেকে এমন কঠোর মন্তব্য শুনে সোহরাওয়ার্দীও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। ওই দিন বিকেলে দুজন আবার দীর্ঘ বৈঠকে বসেন। সোহরাওয়ার্দী তাঁর অবস্থান ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন; তিনি জানান কীভাবে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ তাঁকে সরাসরি হুমকি দিয়েছিলেন যে মন্ত্রিসভায় যোগ না দিলে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করবে।
কিন্তু আবেগ নয়, কঠোর রাজনৈতিক বাস্তবতা দিয়ে শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দীর যৌক্তিকতাকে খণ্ডন করেন। মুজিব স্পষ্ট ভাষায় জানান:
"এটি ছিল শাসকগোষ্ঠীর একটি বিশাল রাজনৈতিক ফাঁদ। এই স্বৈরাচারী মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে সোহরাওয়ার্দী পূর্ব বাংলার কিংবা গণতন্ত্রের কোনো কল্যাণ করতে পারবেন না, বরং জীবনের পুরোটা সময় ধরে রাজপথে রক্ত ও ঘাম ঝরিয়ে অর্জিত তাঁর বিশাল গণপ্রিয়তা ও নৈতিক অবস্থানকেই বিসর্জন দেবেন।"
এমনকি সোহরাওয়ার্দী যখন ক্ষোভ প্রশমনের জন্য ঢাকায় এসে গণসংযোগের ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন তরুণ মুজিব তাঁকে স্পষ্ট মানা করে দিয়ে বলেন যতক্ষণ না মাওলানা ভাসানী নিরাপদে দেশে ফেরেন এবং কারাগারে বন্দি সমস্ত রাজবন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়, ততক্ষণ তাঁর ঢাকায় পা রাখা সমীচীন হবে না।
তবে এই নীতিগত বিরোধের মধ্যেও শেখ মুজিবের ভেতর গুরুর প্রতি যে অতুলনীয় রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও ব্যক্তিগত আনুগত্য ছিল, তার প্রমাণ মেলে অল্প কিছুদিন পরেই। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক যখন এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন যে, "সোহরাওয়ার্দী যুক্তফ্রন্টের কেউ নন," তখন শেখ মুজিব নিজের সব ব্যক্তিগত ও কৌশলগত রাগ ভুলে গুরুর সমর্থনে শক্ত হয়ে দাঁড়ান। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, নীতিগত জায়গায় সোহরাওয়ার্দীর সাথে তাঁর শত দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু অন্য কোনো রাজনীতিক গুরুর অপমান করবে এটি শিষ্য হিসেবে সহ্য করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। তিনি ফজলুল হকের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার উদ্যোগ পর্যন্ত গ্রহণ করেছিলেন।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী: বুর্জোয়া রাজনীতি ও প্রান্তিক বিচ্ছিন্নতা
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক বর্ণাঢ্য নাম হলেও, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তিনি ছিলেন এক জটিল, দ্বান্দ্বিক এবং প্রান্তিক গণবিচ্ছিন্ন চরিত্র। উচ্চশিক্ষিত, ধুরন্ধর আইনজীবী এবং অলংকারসমৃদ্ধ বক্তৃতাশৈলীতে দক্ষ এই নেতা সারাজীবন পশ্চিমা স্টাইলের বুর্জোয়া গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে গেছেন।
কিন্তু তাঁর রাজনীতির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল এর মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল শহুরে অভিজাত শ্রেণী কেন্দ্রিক (Urban Elitist Culture)। গ্রামীণ কৃষক, শ্রমিক কিংবা তৃণমূলের প্রান্তিক মেহনতি মানুষের দুঃখ-কষ্ট, মনস্তত্ত্ব এবং গণচেতনার সাথে তাঁর কোনো সরাসরি ও গাঢ় সামাজিক সংযোগ কখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে বাংলার সাধারণ মেহনতি মানুষের সাথে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্কটি কখনোই আত্মার গভীরে প্রবেশ করতে পারেনি। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁকে বাংলায় পশ্চিমা ঘরানার 'বুর্জোয়া রাজনীতির জনক' হিসেবে আখ্যায়িত করাই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত।
সোহরাওয়ার্দীর রাজনীতির মূল ভিত্তিই ছিল আইনগত সংস্কার, সমঝোতা এবং আপসকামী রাজনীতি। আর এই আপস নীতির ওপর ভর করতে গিয়ে তিনি একাধিকবার নীতিগত অবক্ষয়ের সম্মুখীন হয়েছেন এবং উগ্র অগণতান্ত্রিক বা সাম্প্রদায়িক প্রতিপক্ষকেও রাজনৈতিক মসনদে জায়গা করে দিয়েছেন:
১. যুক্ত বাংলা আন্দোলন থেকে পিছু হঠা: ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ঠিক পূর্বমুহূর্তে শরৎচন্দ্র বসু এবং আবুল হাশিমের সাথে মিলে সোহরাওয়ার্দী সার্বভৌম 'যুক্ত বাংলা' (United Bengal) গড়ার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, পরবর্তীতে মুসলিম লীগের উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ও জিন্নাহর রাজনীতির কাছে আপস করে তিনি সেই আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন।
২. প্যারিটি নীতি (Parity Principle) মেনে নেওয়া: পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ জনগোষ্ঠী বসবাস করত পূর্ব বাংলায়। গণতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী পূর্ব বাংলারই রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রধান ভূমিকা পালন করার কথা ছিল। কিন্তু কেন্দ্রকে খুশি রাখা এবং নিজের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ সুগম করার উদ্দেশ্যে সোহরাওয়ার্দী 'প্যারিটি' বা দুই পাকিস্তানের জনসংখ্যা ও ক্ষমতার ৫০:৫০ সমতা নীতি মেনে নেন। এর ফলে পূর্ব বাংলার অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যার গণতান্ত্রিক অধিকারকে বলি দেওয়া হয়, যা কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের স্বপ্নের ওপর এক মরণাঘাত হিসেবে আঘাত হানে।
৩. অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতা: ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগকে অসাম্প্রদায়িক ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য দল থেকে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দেওয়ার জোরালো দাবি তোলে তরুণ প্রগতিশীল গোষ্ঠী, যার নেতৃত্বে ছিলেন শেখ মুজিব। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী শুরুতেই এতে সম্মত হতে চাননি। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন এতে হয়তো মুসলিম ভোটারদের সমর্থন হারিয়ে যাবে। পরবর্তীতে শেখ মুজিব অত্যন্ত ধৈর্য ও রাজনৈতিক কুশলতা দিয়ে গুরুকে রাজি করান। শিষ্যের দূরদর্শিতা এবং গুরুর মনের উদারতায় শেষ পর্যন্ত দলটি 'আওয়ামী লীগ' নামে অসাম্প্রদায়িক রূপ লাভ করে।
গুরু-শিষ্যের এই জটিল আত্মিক সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ পায় স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর লেখায়। কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে বসে অসমাপ্ত আত্মজীবনী-তে বঙ্গবন্ধু স্মৃতিচারণ করে লিখেছিলেন:
"ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ছোট কোঠায় বসে বসে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবছি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথা। কেমন করে তাঁর সাথে আমার পরিচয় হলো, কেমন করে তাঁর সান্নিধ্য আমি পেয়েছিলাম, কিভাবে তিনি আমাকে কাজ করতে শিখিয়েছিলেন এবং কেমন করে তাঁর স্নেহ আমি পেয়েছিলাম।"
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইতিহাসবিদ ও প্রখ্যাত চিন্তাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থ বাঙালীর জাতীয়তাবাদ-এ সোহরাওয়ার্দীর ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির এক নির্মম সত্য তুলে ধরে লিখেছেন:
"তিনি সবচেয়ে বড় মনে করতেন নিজের ক্ষমতাকে।"
সোহরাওয়ার্দীর এই চরম ক্ষমতাকেন্দ্রিক মনস্তত্ত্বের কারণে ১৯৫৫ সালে তিনি স্বৈরাচারী গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ও চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর "অসততা ও আন্তরিকতার" ওপর অবিশ্বাস্য অন্ধ ভরসা রেখে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর এই ক্ষমতার সিঁড়ি তৈরি করতে তিনি পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তিকে প্রকাশ্যে বৈধতা দেওয়া শুরু করেন।
কিন্তু আমলা-সামরিক চক্র সোহরাওয়ার্দীকে কেবল ব্যবহারই করেছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি চরমভাবে প্রতারিত হন; চৌধুরী মোহাম্মদ আলী কৃষক-শ্রমিক পার্টির সাথে চতুর জোট গঠন করে নিজেই প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান। মারাত্মকভাবে আহত সোহরাওয়ার্দী তখন সংবাদপত্রে আবেগঘন বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন:
"আমি মানবতার ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়েছি।"
কিন্তু রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবে সোহরাওয়ার্দী এটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন যে পাকিস্তানি আমলাতন্ত্র, সামরিক চক্র এবং 'মানবতা' এরা কখনোই এক বিন্দুতে মিলতে পারে না; তারা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর বাসিন্দা।
১৯৫৬ সালের বিতর্কিত সংবিধান ও জাতীয়তাবাদী মোড়
১৯৫৬ সালে যখন পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান গৃহীত হয়, তখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা। কিন্তু ১৯৫৬ সালের এই খসড়া সংবিধানে পূর্ব বাংলার মানুষের কোনো মৌলিক স্বাধিকারের স্বীকৃতি ছিল না, অর্থনৈতিক শোষণের চাবি রদ করা হয়নি এবং রাষ্ট্রকে জোরপূর্বক 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র' নামে রূপায়িত করা হচ্ছিল।
বাঙালি জাতির পিঠে এই চরম অবিচারের প্রতিবাদে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দল একযোগে সংসদ বয়কটের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে, দলের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সোহরাওয়ার্দী একাই সংসদে যান, সংবিধান প্রণয়ন বৈঠকে যোগ দেন এবং বিতর্কিত সংবিধানে স্বাক্ষর করেন।
গুরুর এই চরম রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ও দলের স্বার্থবিরোধী ভূমিকায় তরুণ শেখ মুজিব মানসিকভাবে প্রচুুর ব্যথিত ও হতাশ হয়েছিলেন। বিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইতিহাসের রক্তপলাশ-এ উল্লেখ করেছেন যে, সংসদ থেকে বেরিয়ে চরম হতাশায় ও ক্ষোভে শেখ মুজিব সরাসরি 'দৈনিক ইত্তেফাক' কার্যালয়ে ছুটে যান এবং সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার কাছে নিজের গুরুর বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও হতাশা উগরে দেন।
সোহরাওয়ার্দীর অতীত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলেও দেখা যায় নানা বৈপরীত্যের ইতিহাস। তিনি ছিলেন মূলত উর্দুভাষী অবাঙালি অভিজাত পরিবারের সন্তান। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যিক (যেমন আহমদ রফিক তাঁর দেশভাগ : ফিরে দেখা গ্রন্থে) লিখেছেন যে, ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে'-র দাঙ্গায় তাঁর কিছু অস্পষ্ট ভূমিকাকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ তাঁকে "কলকাতার আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেতা" বলে অবিহিত করেছিলেন।
তবে এর অপর পিঠে তাঁর মেধা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রশংসাও ছিল। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসেবে সোহরাওয়ার্দীকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন এবং ১৯২৩ সালে গঠিত তাঁর স্বরাজ পার্টির 'ডেপুটি লিডার' নির্বাচন করেছিলেন। পরবর্তীতে দেশবন্ধু যখন কলকাতা করপোরেশনের মেয়র হন, সোহরাওয়ার্দী তাঁর সহায়তায় ডেপুটি মেয়র মনোনীত হন।
পরবর্তীকালে ১৯২৭ সালে তিনি শ্রমিক রাজনীতিতে পা রাখেন এবং 'ন্যাশনাল লেবার ফেডারেশন' গঠন করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তৎকালীন বাংলার চটকল, কাপড়কল এবং জাহাজ শ্রমিকদের সংগঠিত করে প্রায় ৩৬টি সক্রিয় ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন।
পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালের শেষভাগে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর আকস্মিক পদত্যাগের পর সোহরাওয়ার্দী অবশেষে রিপাবলিকান পার্টির সাথে জোট বেঁধে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে সক্ষম হন। কিন্তু এই 'রিপাবলিকান পার্টি' ছিল কোনো রাজনৈতিক দল নয়; বরং সামরিক জান্তা ইস্কান্দার মির্জার পকেটের দল যার সাথে গণতন্ত্র, প্রগতিশীলতা বা পূর্ব বাংলার স্বার্থের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিল না।
ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অক্ষ: 'নূরী আস সাইদ' বনাম 'প্যাট্রিস লুমুম্বা'
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সোহরাওয়ার্দীর নীতিগত পতন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিশেষ করে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে। তিনি সম্পূর্ণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বলয়ে পাকিস্তানকে সঁপে দেন। মার্কিন সামরিক চুক্তি (SEATO ও CENTO) এবং সাম্রাজ্যবাদী অক্ষকে তিনি অন্ধভাবে সমর্থন করতে শুরু করেন।
এই মার্কিনঘেঁষা নীতি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, প্রগতিশীল রাজনীতির বাতিঘর মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সাথে সোহরাওয়ার্দীর চরম মুখোমুখি সংঘর্ষের সৃষ্টি করে। ঐতিহাসিক ১৯৫৭ সালের 'কাগমারী সম্মেলন'-এ বৈদেশিক নীতি নিয়ে ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর দ্বন্দ্ব তুঙ্গে ওঠে। সোহরাওয়ার্দী মার্কিন চুক্তি থেকে একচুল সরতে রাজি না হওয়ায় মাওলানা ভাসানী শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে 'ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি' (ন্যাপ) গঠন করেন।
দলের এই ভয়াবহ ভাঙনের মুখে তরুণ শেখ মুজিবকে এক অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হতে হয়েছিল। একদিকে তাঁর রাজনৈতিক পিতা সোহরাওয়ার্দী, অন্যদিকে প্রগতিশীল মানসিকতার প্রাণপুরুষ মাওলানা ভাসানী। মুজিবকে যেকোনো একজনকে বেছে নেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তৎকালীন সাংগঠনিক বাস্তবতা ও দলীয় ঐক্য রক্ষার খাতিরে শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দীর পক্ষে অবস্থান নিলেও, প্রগতিশীল ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নীতির প্রশ্নে তিনি মন থেকে গুরুর অবস্থানকে কোনোদিন মেনে নিতে পারেননি।
গুরু ও শিষ্যের মধ্যকার প্রকাশ্য ও গভীর আদর্শিক বিরোধ সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বৈদেশিক নীতি নিয়ে তাঁদের মধ্যকার একটি ঐতিহাসিক সংলাপে।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রতি সোহরাওয়ার্দীর অন্ধ আনুগত্য দেখে তরুণ শেখ মুজিব একদিন সোজা গুরুকে গিয়ে বলেছিলেন:
"প্রো-আমেরিকান পলিসি (মার্কিনপন্থি নীতি) আমাদের জাতীয় স্বার্থবিরোধী হলে আমরা অবশ্যই তাকে পরিত্যাগ করব। আমেরিকা যত বড়ই শক্তি হোক না কেন, তার 'স্টুজ' বা অনুগত পুতুলদের রক্ষা করার ক্ষমতা আমেরিকার নাই। ইরাকের নূরী আস সাইদের পরিণতি সবাই জানে।"
(উল্লেখ্য, ইরাকের মার্কিনপন্থি স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী নূরী আস সাইদ ১৯৫৮ সালের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন এবং রাজপথে ক্ষুব্ধ জনতার হাতে নির্মমভাবে নিহত হন।)
মুজিবের এই দূরদর্শী ও ঐতিহাসিক হুঁশিয়ারি শুনে সোহরাওয়ার্দী সেটাকে এক বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি উল্টো মার্কিনবিরোধী অবস্থানের ভয়াবহতা বোঝাতে গিয়ে ইরানের জাতীয়তাবাদী নেতা হোসেন ফাতমী (যাঁকে সিআইএ সমর্থিত ক্যু-র পর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল) এবং কঙ্গোর স্বাধীনতার নায়ক প্যাট্রিস লুমুম্বার (যাঁকে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল) ট্র্যাজিক পরিণতির কথা তুলে ধরেন।
সোহরাওয়ার্দীর এই যুক্তি শুনে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান যে উত্তরটি দিয়েছিলেন, তা কেবল বাঙালির ইতিহাস নয়, সমগ্র বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুক্তিকামী মানুষের এক চিরন্তন হুঙ্কার:
"আপনি যতই বলুন, আমাকে কোনোদিন যদি বেছে নিতে বলা হয় আমি হোসেন ফাতমী কিংবা লুমুম্বার মৃত্যুই বেছে নেব, নূরী আস সাইদের মৃত্যু নয়!"
কী অভূতপূর্ব ও রোমহর্ষক রাজনৈতিক ভবিষ্যৎবাণী! পরবর্তী ইতিহাস প্রমাণ করেছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশি-বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী ও সামরিক চক্রান্তে সপরিবারে প্রাণ হারিয়ে শেখ মুজিব ঠিকই প্যাট্রিস লুমুম্বা কিংবা হোসেন ফাতমীর মতো অমর বিপ্লবীর মৃত্যু বেছে নিয়েছেন, কিন্তু কখনোই নূরী আস সাইদের মতো মার্কিন দাসত্বের অপমানজনক পরিণতি গ্রহণ করেননি।
দুই রাজনৈতিক প্রথিকের ঐতিহাসিক তুলনা
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতি, আদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গি ও ঐতিহাসিকভাবে অর্জিত ভূমিকার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে নিচের টেবিলটি অত্যন্ত সহায়ক:
মূল মূল্যায়ন ক্ষেত্র | হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী | বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান |
১. সামাজিক পটভূমি ও ভিত্তি | কলকাতার উর্দুভাষী, ধনাঢ্য ও অভিজাত বুর্জোয়া শ্রেণীভিত্তিক। | টুঙ্গিপাড়ার সাধারণ মধ্যবিত্ত, গ্রাম থেকে উঠে আসা খাঁটি বাঙালি গণমানুষের নেতা। |
২. রাজনৈতিক দর্শন | পশ্চিমা সংসদীয় গণতন্ত্র, আইনগত সংস্কার ও অগণতান্ত্রিক শক্তির সাথে 'আপস নীতি'। | গণমুখী বিপ্লব, রাজপথের সংগ্রাম, স্বাধিকার আন্দোলন ও আপসহীন জাতীয়তাবাদ। |
৩. গণমানুষের সাথে সম্পর্ক | প্রধানত শহুরে বুদ্ধিজীবী ও উচ্চবিত্ত কেন্দ্রিক; সরাসরি তৃণমূল গণসংযোগের অভাব। | গ্রামের কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের সাথে গভীর আত্মিক ও সামাজিক বন্ধন। |
৪. পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক অবস্থান | দুই পাকিস্তানের সংহতি রক্ষায় 'প্যারিটি' (৫০:৫০ সমতা) মেনে নিয়ে ৫৬% বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকার বিসর্জন। | বাঙালির শতভাগ অধিকার আদায়ে সোচ্চার; পরবর্তীতে ঐতিহাসিক 'ছয় দফা'র মাধ্যমে স্বাধীনতার রূপরেখা প্রদান। |
৫. অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি | শুরুতে দল থেকে 'মুসলিম' শব্দ বাদ দেওয়ার বিরোধী ছিলেন; ভোটের রাজনীতির হিসাব করতেন। | শুরু থেকেই অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রভাবনা; ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় আওয়ামী লীগকে সর্বজনীন রূপ দান। |
৬. দাঙ্গা ও সামাজিক প্রীতি | ১৯৪৬-এর দাঙ্গায় কলকাতার রাজনীতিতে বিতর্কিত ও অস্পষ্ট ভূমিকার অভিযোগ। | ১৯৪৬-এর কলকাতা, ১৯৫৪-র আদমজী দাঙ্গা ও ১৯৭০-এর দাঙ্গায় নিজের জীবন বাজি রেখে হিন্দু-মুসলিমদের রক্ষা। |
৭. বৈদেশিক নীতি ও ভূ-রাজনীতি | চরম মার্কিনপন্থি, সেটো (SEATO) ও সেন্টো (CENTO) সামরিক চুক্তির শক্ত সমর্থক। | সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, নিরপেক্ষ ও অসংলগ্ন নীতি; মার্কিন সামরিক ব্লকের তীব্র বিরোধী। |
৮. চূড়ান্ত ঐতিহাসিক পরিণতি | ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও বারবার প্রতারিত; শেষ বয়সে বৈরুতে নিঃসঙ্গ ও বিষাদময় মৃত্যু (১৯৬৩)। | বাঙালির স্বাধীনতার মহান স্থপতি, 'জাতির পিতা'; আত্মত্যাগের মাধ্যমে ইতিহাসের অমর নায়ক। |
কলকাতা পর্ব, বেকার হোস্টেল ও রাজনৈতিক গুরুপ্রাপ্তি (১৯৪০-এর দশক)
শেখ মুজিবুর রহমান ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সম্পর্কের সূচনা ঘটে ১৯৪০-এর দশকের শুরুতে, কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমান মাওলানা আজাদ কলেজ) শেখ মুজিবের ছাত্রাবস্থায়।
বেকার হোস্টেলের কক্ষ নং ২৪: শেখ মুজিব কলকাতার বেকার হোস্টেলের ২৪ নম্বর কক্ষে থাকতেন। তখন থেকেই তিনি বেঙ্গল প্রোভিন্সিয়াল মুসলিম স্টুডেন্টস লিগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে সুহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে আসেন।
১৯৪৩-এর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ: ১৯৪৩ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় সুহরাওয়ার্দী ছিলেন বাংলার খাদ্যমন্ত্রী। তখন তরুণ মুজিব পড়াশোনা শিকেয় তুলে দিনরাত লঙ্গরখানা পরিচালনা ও খাদ্য বিতরণের কাজ করেছিলেন। সুহরাওয়ার্দী তরুণের এই নিঃস্বার্থ সাংগঠনিক দক্ষতা দেখে তাঁকে পরম স্নেহে আপন করে নেন।
কলকাতা দাঙ্গা ও ত্রাণকাজ (১৯৪৬): ১৯৪৬ সালের 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে'-র দাঙ্গার সময় সুহরাওয়ার্দী ছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। শেখ মুজিব তখন রক্তাক্ত রাজপথে নেমে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে রক্ষা করেছিলেন এবং পরবর্তীতে বিহারের দাঙ্গাপীড়িত মুসলমানদের জন্য ত্রাণ শিবিরে কাজ করেছিলেন। সুহরাওয়ার্দীর প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও রাজপথের বাস্তবতার এই বৈপরীত্য তরুণ মুজিবের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
১৯৪৭-এর 'স্বাধীন যুক্ত বাংলা' (United Bengal) পরিকল্পনা
দেশভাগের ঠিক পূর্বমুহূর্তে (মে-জুন ১৯৪৭) হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, কংগ্রেস নেতা শরৎচন্দ্র বসু এবং আবুল হাশিম মিলে ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে একটি অখণ্ড ও সার্বভৌম 'স্বাধীন যুক্ত বাংলা' (Sovereign United Bengal) গঠনের ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
মুজিবের ভূমিকা: তরুণ শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দীর এই উদ্যোগকে বিপুল উৎসাহে সমর্থন করেছিলেন এবং তরুণ কর্মীদের সংগঠিত করেছিলেন।
পরিকল্পনার ব্যর্থতা: কিন্তু কংগ্রেস হাইকমান্ড (বিশেষ করে বল্লভভাই প্যাটেল ও জওহরলাল নেহেরু) এবং মুসলিম লীগের জিন্নাহ-আকরাম খাঁ উপদলের উগ্র সাম্প্রদায়িক অবস্থান ও ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্তে এই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। বাংলা বিভক্ত হয়।
শিক্ষা: এই ব্যর্থতা থেকে শেখ মুজিব একটি শিক্ষা পান বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের জন্য অন্য কোনো অঞ্চলের নেতা বা কেন্দ্রীয় কাঠামোর ওপর নির্ভর করা যাবে না, নিজেদের শক্তিতেই দাঁড়াতে হবে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও সুহরাওয়ার্দীকে রাজি করানোর গল্প
ভাষা আন্দোলনের সময়ও সুহরাওয়ার্দীর প্রাথমিক ভূমিকা ছিল বিতর্কিত।
উর্দু বিষয়ক বক্তব্য: ১৯৫২ সালের গোড়ার দিকে পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থানকালে সুহরাওয়ার্দী এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, "পাকিস্তানের জাতীয় সংহতির স্বার্থে উর্দুই রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত।" এই বিবৃতিতে তৎকালীন পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা চরম ক্ষুব্ধ হয়।
মুজিবের করাচি যাত্রা: জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর শেখ মুজিব সুহরাওয়ার্দীর এই ভুল দূর করতে করাচি যান। তিনি অত্যন্ত যুক্তিসহকারে সুহরাওয়ার্দীকে বোঝান যে, ৫৬% মানুষের ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করলে পূর্ব বাংলার মানুষ কখনোই তা মেনে নেবে না।
সোহরাওয়ার্দীর নতি স্বীকার: শিষ্যের ক্ষুরধার যুক্তি ও পূর্ব বাংলার জনভাবনা অনুধাবন করে সুহরাওয়ার্দী তাঁর আগের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন এবং বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সমর্থনের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেন।
১৯৫৭ সালের কাগমারী সম্মেলন ও সাংগঠনিক জটিলতা
১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক সম্মেলনে দলের মূল সভাপতি মাওলানা ভাসানী ও সুহরাওয়ার্দীর মধ্যে আন্তর্জাতিক পররাষ্ট্রনীতি (পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি) নিয়ে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
মুজিবের রাজনৈতিক অবস্থান: শেখ মুজিব মনে-প্রাণে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সামরিক চুক্তির বিরোধী ছিলেন। কিন্তু দলীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি জানতেন, সেই মুহূর্তে সুহরাওয়ার্দীকে বাদ দিলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাহীন ও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।
কঠিন পছন্দ: মুজিব সাংগঠনিক শৃঙ্খলার স্বার্থে সুহরাওয়ার্দীর পাশে দাঁড়ান, যার ফলে মাওলানা ভাসানী দল ত্যাগ করে 'ন্যাপ' গঠন করেন। এটি ছিল শেখ মুজিবের জীবনের অন্যতম কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আদর্শিকভাবে ভাসানীর কাছাকাছি হয়েও দলীয় সংহতির জন্য তাঁকে গুরুর পক্ষ নিতে হয়েছিল।
১৯৬০-এর 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ' ও গুরুর অগোচরে প্রস্তুতি
১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করলে সুহরাওয়ার্দী বিশ্বাস করতেন 'গণতান্ত্রিক আন্দোলন' এবং আইয়ুববিরোধী সর্বদলীয় মোর্চার মাধ্যমে পাকিস্তানের সংবিধানে ফিরে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু শেখ মুজিব ততদিনে বুঝে গিয়েছিলেন, পাকিস্তানের কাঠামোতে থেকে বাঙালির মুক্তি সম্ভব নয়।
গোপন সংগঠন গঠন: সুহরাওয়ার্দীকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে শেখ মুজিব ১৯৬০ সালে সিরাজুল আলম খান, কাজী আরেফ আহমেদ প্রমুখ তরুণ ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠন করেন গোপন 'স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ'।
কৌশলগত দূরত্ব: সুহরাওয়ার্দী যখন করাচি বা লাহোরে বসে সর্বপাকিস্তানভিত্তিক রাজনীতি (NDF) পুনর্বহালের চেষ্টা করছিলেন, শেখ মুজিব তখন তলে তলে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছিলেন।
১৯৬২ সালের এনডিএফ (NDF) বিতর্ক এবং আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবন
১৯৬২ সালে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে সুহরাওয়ার্দী আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের জন্য 'ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট' (NDF) গঠন করেন। তিনি চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল তাদের নিজস্ব পরিচয় স্থগিত রেখে এনডিএফ-এর ছাতার তলায় কাজ করুক।
মুজিবের দ্বিমত: শেখ মুজিব মনে করতেন, আওয়ামী লীগকে বিলুপ্ত বা স্থগিত করলে বাঙালির নিজস্ব স্বাধিকার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম ধ্বংস হয়ে যাবে।
আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবন (১৯৬৪): গুরু সুহরাওয়ার্দী বেঁচে থাকা অবস্থায় মুজিব চরম শ্রদ্ধা থেকে তাঁর আদেশের বাইরে যাননি। কিন্তু ১৯৬৩ সালের ডিসেম্বরে সুহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর মাত্র এক মাসের মাথায় (১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে) শেখ মুজিব উদ্যোগ নিয়ে আওয়ামী লীগকে পুনরায় সক্রিয় ও পুনরুজ্জীবিত করেন।
ব্যক্তিগত ভালোবাসা, স্নেহের সম্পর্ক ও বৈরুত ট্র্যাজেডি (১৯৬৩)
রাজনৈতিক ও আদর্শিক মতপার্থক্য যতই থাকুক না কেন, সুহরাওয়ার্দী ও মুজিবের মধ্যে যে ব্যক্তিগত ভালোবাসা ও স্নেহের সম্পর্ক ছিল, তা রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল।
পিতার মতো স্নেহ: সুহরাওয়ার্দীর কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। তিনি শেখ মুজিবকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। মুজিবের রাজনীতি ও পরিবার চালানোর জন্য অর্থনৈতিক সংকটের সময় সুহরাওয়ার্দী বহুবার গোপনে আর্থিক সাহায্য পাঠাতেন।
অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে মুজিব: বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, "শহীদ সাহেব আমাকে খবরের কাগজের টাকা পর্যন্ত দিতেন। আমি যখন জেলে থাকতাম, তখন তিনি আমার পরিবারের খোঁজ রাখতেন।"
রহস্যময় মৃত্যু ও মুজিবের কান্না: ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর লেবাননের বৈরুতের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের রুমে রহস্যজনক অবস্থায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃতদেহ পাওয়া যায়। খবরটি শোনার পর শেখ মুজিব শিশুদের মতো হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন।
শেষ বিদায়: শেখ মুজিব নিজেই বৈরুত ও করাচি থেকে গুরুর মরদেহ ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) কোণে তাঁকে সমাহিত করার সমস্ত বন্দোবস্ত করেন। জানাজায় কান্নায় ভেঙে পড়ে মুজিব বলেছিলেন, "আজ থেকে আমি সত্যিই নেতাশূন্য হয়ে গেলাম।"
গণমানুষের মুজিব: আপসহীন জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবোধের বিরুদ্ধে প্রাচীর
সোহরাওয়ার্দীর বিপরীতে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাতুতে গড়া এক মহামানব। তিনি গুরুর ছায়া পেরিয়ে নিজের মেধা, ত্যাগ ও আপসহীন দূরদর্শিতা দিয়ে ইতিহাস নির্মাণ করেছেন। তিনি অনুভব করেছিলেন, পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও সিভিল আমলাতন্ত্রের সাথে কোনো ধরনের 'আপস' করে বা প্রাসাদরাজনীতি খেলে বাঙালির ভাগ্যের পরিবর্তন সম্ভব নয়।
শেখ মুজিব কেবল মাঠের নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সবচেয়ে শক্ত প্রহরী। পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলায় বারবার বাঙালি-অবাঙালি এবং হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাধাতে চেয়েছে। তাদের কৌশল ছিল তিনটি:
১. নিজেদের অযোগ্যতা ও শোষণ থেকে জনগণের নজর অন্যদিকে ঘোরানো;
২. বাঙালিদের সরকার বা প্রশাসন চালনায় অযোগ্য বলে প্রচার করা;
৩. সংখ্যালঘু হিন্দুদের সম্পদ ও ভিটেমাটি লুটপাটের সুযোগ দিয়ে মুসলিম লীগের গুন্ডাবাহিনীকে পুষে রাখা।
কিন্তু তরুণ শেখ মুজিব পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই এই ষড়যন্ত্র অনুধাবন করেছিলেন।
১৯৪৬ সালের কলকাতায় যখন রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা বাধে, তখন তরুণ মুজিব নিজের জীবন তুচ্ছ করে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে রক্ষায় রাজপথে নেমেছিলেন। বিহারে দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মুসলমানদের ত্রাণ পুনর্বাসনে দিনরাত কাজ করেছেন।
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে যখন বিহারি-বাঙালি দাঙ্গা বাধায় শাসকগোষ্ঠী, শেখ মুজিব সরাসরি দাঙ্গাস্থলে গিয়ে নিজের বুক দিয়ে দাঙ্গা থামিয়েছিলেন।
তিনি বারবার সোচ্চার কণ্ঠে সতর্ক করে বলতেন:
"কোনো অবস্থায় দাঙ্গা হতে দেওয়া যাবে না। কারণ পূর্ব বাংলায় দাঙ্গা হলে সংখ্যালঘু হিন্দুরা ভারতে পাড়ি জমাবে, যা এই অঞ্চলের জনসংখ্যা, সামাজিক ভারসাম্য ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর জন্য এক মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।"
১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব যখন তাঁর ঐতিহাসিক 'ছয় দফা' পেশ করেন, তখন কার্যত সোহরাওয়ার্দীর রেখে যাওয়া পুরনো 'পাক-সংহতি' ও 'আমলাতান্ত্রিক আপস নীতি'র কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া হয়। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, মার্কিন সামরিক বলয়ের অংশ হয়ে বা পশ্চিম পাকিস্তানের দাসত্ব মেনে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব নয়।
উত্তরসূরির হাতে পূর্বসূরির অসম্পূর্ণ স্বপ্নের পূর্ণতা
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন আইনি ও সংসদীয় রাজনীতির এক বিশাল স্তম্ভ। তিনি শেখ মুজিবকে শিখিয়েছিলেন:
১. কীভাবে নিখুঁত রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে হয়;
২. কীভাবে বিরোধীদের মোকাবেলা করতে হয়;
৩. রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংসদীয় পদ্ধতির সূক্ষ্ম কৌশলগুলো কী।
শেখ মুজিব গুরুর কাছ থেকে এই সমস্ত জ্ঞান অর্জন করেছিলেন, কিন্তু গুরুর সীমাবদ্ধতাগুলোকেও অতিক্রম করেছিলেন। সুহরাওয়ার্দী ছিলেন পাকিস্তানের একজন জাতীয় নেতা, যিনি সমগ্র পাকিস্তানের গণতন্ত্রীকরণের স্বপ্ন দেখতেন। আর শেখ মুজিব নিজেকে রূপান্তর করেছিলেন বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের মহানায়কে, যিনি বুঝেছিলেন পাকিস্তানের সংস্কার নয়, বরং একটি স্বাধীন-সার্বভৌম 'বাংলাদেশ' গঠনই বাঙালির একমাত্র ভবিষ্যৎ।
ছায়া ডিঙিয়ে ইতিহাস নির্মাণের পথ
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আজ এক অন্যতম স্মরণীয়, চর্চিত এবং একই সাথে চরম বিতর্কিত ও আলোচিত নাম। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অলংকারিক মেধা এবং পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দর্শনে বিশ্বাস প্রশংসনীয় হলেও তাঁর রাজনৈতিক আপসমুখিতা, অগণতান্ত্রিক শাসকের সাথে হাত মেলানো, ক্ষমতার মোহ এবং ভূ-রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত তাঁকে চূড়ান্ত বিচারে এক ট্র্যাজিক চরিত্রে পরিণত করেছে।
শেখ মুজিব তাঁর গুরুকে ভালোবাসতেন, পিতৃবংশের মতো শ্রদ্ধা করতেন। ১৯৬৩ সালে বৈরুতের এক হোটেলে যখন সোহরাওয়ার্দীর রহস্যময় মৃত্যু ঘটে, তখন শিশুসুলভ কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন শেখ মুজিব। কিন্তু রাজনীতির ময়দানে তিনি সোহরাওয়ার্দীর অন্ধ অনুসারী ছিলেন না।
শেখ মুজিব ১৯৫৫ সালেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কেবল এক অনুগত ছায়া হয়ে থাকবেন না; বরং বাঙালি জাতির শৃঙ্খল মুক্তির জন্য যা করা প্রয়োজন, তা-ই করবেন। তিনি নিজেকে তৈরি করেছিলেন তৃণমূলের গণমানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে, আপসহীন রাজনীতির প্রতীক হিসেবে।
সোহরাওয়ার্দী যেখানে বারবার অগণতান্ত্রিক সামরিক আমলাদের কাছে প্রতারিত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন, শেখ মুজিব সেখানে পুরো বাঙালি জাতিকে এক সুতোয় গেঁথে, রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে উপহার দিয়েছেন এক স্বাধীন-সার্বভৌম 'বাংলাদেশ'।
ইতিহাসের নির্মম বিচারে সোহরাওয়ার্দী রয়ে গেছেন পাকিস্তান আমলের এক ক্ষুরধার কিন্তু ট্র্যাজিক পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে; আর তাঁরই সুযোগ্য শিষ্য শেখ মুজিবুর রহমান নিজেকে উন্নীত করেছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও 'জাতির পিতা' হিসেবে।















