>
>
৮ জানুয়ারি ১৯৭২ - পাকিস্তানের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্তি পেয়ে বিশ্বমঞ্চে বঙ্গবন্ধু
৮ জানুয়ারি ১৯৭২ - পাকিস্তানের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্তি পেয়ে বিশ্বমঞ্চে বঙ্গবন্ধু
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে যখন পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে, তখন বাঙালির বিজয় পূর্ণতা পেলেও একটি অপূর্ণতা ছিল বিষাদের মতো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনও পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগারে বন্দি। পুরো জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল তাদের প্রিয় নেতার ফেরার। অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ৮ জানুয়ারি, ১৯৭২। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু যখন লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পা রাখেন, তখন সেটি কেবল একজন ব্যক্তির মুক্তি ছিল না, বরং তা ছিল একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের বিশ্বমঞ্চে আনুষ্ঠানিক পদার্পণ।

TruthBangla

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর ৯৩ হাজার সৈন্যের লজ্জাজনক আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাঙালির রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু এই ঐতিহাসিক সামরিক বিজয়ের পর পুরো জাতির মহাআনন্দের মাঝেও এক গভীর বিষাদের ছায়া জমেছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান তখনও পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগারের মৃত্যুপ্রকোষ্ঠে বন্দি। স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতাকে ছাড়া সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অর্জিত বিজয় ছিল সম্পূর্ণ অপূর্ণ ও অভিভাবকহীন।
পুরো জাতি প্রতিদিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল তাঁদের প্রিয় 'বঙ্গবন্ধুর' ফিরে আসার। অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ৮ই জানুয়ারি, ১৯৭২। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু যখন লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পা রাখেন, তখন সেটি কেবল একজন মহাপুরুষের ব্যক্তি-মুক্তি ছিল না; বরং তা ছিল বিশ্বমানচিত্রে নবজাত স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক ও কূটনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ। ৮ই জানুয়ারি লন্ডনে পৌঁছানো থেকে শুরু করে ১০ই জানুয়ারি ঢাকার মাটিতে পা রাখা এই ঐতিহাসিক ও ঘটনাবহুল ঘণ্টার প্রতিটি মুহূর্ত বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। আজকের এই বিশদ ও তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদনে আমরা পুনর্নির্মাণ করব ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেই পথচলা এবং বিশ্লেষণ করব একটি নবগঠিত রাষ্ট্রের বিশ্বমঞ্চে উদয়ের মহাকাব্য।
রাওয়ালপিন্ডি থেকে লন্ডন
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই বঙ্গবন্ধুকে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবন থেকে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোর এবং তারপর করাচির কাছে মিয়ানওয়ালি কারাগারের প্রকোষ্ঠে। সেখানে সামরিক আদালতের প্রহসনের বিচারে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করার সমস্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। এমনকি কারাগারের প্রাঙ্গণে তাঁর জন্য কবরও খোড়া হয়েছিল।
তবে ১৬ই ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি এবং ভারতীয় ও যৌথ বাহিনীর কাছে পাকি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এবং দেশের নতুন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (PPP) প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো।
কেন পাকিস্তান বঙ্গবন্ধুকে হত্যা না করে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, যে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি, তারা কেন মৃত্যুকূপে থাকা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা না করে সসম্মানে মুক্তি দিল? এর পেছনে ছিল বৈশ্বিক কূটনীতি ও কৌশলগত বাধ্যবাধকতা:
১. আন্তর্জাতিক সুশীল সমাজ ও বিশ্বনেতাদের অভূতপূর্ব চাপ: ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিশ্ব সফরে গিয়ে আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষার জোর দাবি তোলেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল যে, মুজিবের গায়ে হাত দিলে পাকিস্তানকে বৈশ্বিক অঙ্গনে সম্পূর্ণ একঘরে করা হবে।
২. ৯৩ হাজার পাকি যুদ্ধবন্দী (POWs): ভারতে তখন ৯৩ হাজার সুপ্রশিক্ষিত পাকিস্তানি সেনা ও কর্মকর্তা বন্দি ছিল। পাকিস্তানি জনগণ ও তাদের স্বজনরা তাঁদের ফিরিয়ে আনার জন্য তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। ভারতের সাথে দরকষাকষি করতে এবং এই ৯৩ হাজার সেনার নিরাপদে ফেরা সুনিশ্চিত করতে বঙ্গবন্ধুকে অক্ষত অবস্থায় মুক্তি দেওয়া ছাড়া ভুট্টোর সামনে দ্বিতীয় কোনো বিকল্প ছিল না।
৩. ভুট্টোর কুটিল রাজনৈতিক চাল: ভুট্টো চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সাথে ব্যক্তিগতভাবে আলাপ করে একটি 'সহানুভূতিশীল সম্পর্ক' তৈরি করতে। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে রাজি করিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বদলে 'অখণ্ড পাকিস্তান' বা কোনো একটি ঢিলেঢালা 'কনফেডারেশন' রক্ষা করা যায় কিনা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ভুট্টোর এই প্রস্তাব শুরুতেই ধূলিসাৎ করে দেন।
রাওয়ালপিন্ডির গোপন রাতের ফ্লাইট
১৯৭২ সালের ৭ই জানুয়ারি গভীর রাতে (আট জানুয়ারি প্রথম প্রহরে) পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির চাকলালা বিমানবন্দর থেকে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের (PIA) একটি বিশেষ ফ্লাইটে (ফ্লাইট নং-০৫৯) বঙ্গবন্ধুকে তোলা হয়। বিমানে সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর সাথে ছিলেন তাঁর বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহযোগী ড. কামাল হোসেন ও তাঁর পরিবার।
যাত্রাটিকে পাকিস্তান সরকার চরম গোপনীয়তার চাদরে ঢেকে রেখেছিল। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, বিমানটি আকাশে ওড়ার পর প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত বিশ্ব গণমাধ্যম জানতে পারেনি বঙ্গবন্ধু ঠিক কোথায় যাচ্ছেন বা তাঁর গন্তব্য কী। পাকিস্তান চেয়েছিল বিষয়টিকে কেবল তাঁদের অভ্যন্তরীণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখাতে। কিন্তু আকাশসীমা পেরিয়ে বিমানটি যখন লন্ডনের আকাশসীমায় প্রবেশ করে, তখন বিশ্ববাসী বুঝতে পারে যে একটি নতুন ইতিহাসের জন্ম হতে যাচ্ছে।
লন্ডনের ক্লারিজ হোটেলে ‘এক টুকরো বাংলাদেশ’
১৯৭২ সালের ৮ই জানুয়ারি, গ্রিনিচ মান সময় (GMT) সকাল ৬টা ৩৬ মিনিটে রাজকীয় বার্তা নিয়ে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরের ৩ নম্বর টার্মিনালে অবতরণ করে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমানটি। পরনে ছিল একটি সাধারণ টাইবিহীন সাদা শার্ট, ধূসর রঙের সুতির স্যুট এবং কালো রঙের ওভারকোট। দীর্ঘ ৯ মাসের কারানির্যাতন, নির্জন বাস এবং মৃত্যুর মুখোমুখি থাকার পর ক্লান্ত হলেও বঙ্গবন্ধুর চোখের দৃষ্টিতে ছিল বিজয়ী বীরের দীপ্তি।

বিমানবন্দরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের (FCO) কর্মকর্তা ইয়ান সার্ফিস এবং পাকিস্তান দূতাবাসের তৎকালীন বাঙালি কূটনীতিকরা (যাঁরা আগেই বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন)। ভিআইপি লাউঞ্জে তিনি যখন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন, তখন উপস্থিত বিশ্ব গণমাধ্যম স্থির হয়ে যায়। উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলেন:
"আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন আমি অত্যন্ত সুস্থ আছি, বেঁচে আছি। এ মুহূর্তে আপনারা শুধু আমাকে দেখুন, গভীর কোনো প্রশ্ন করার চেয়ে আমার বেঁচে থাকাকে উপভোগ করুন।"
ক্লারিজ হোটেল: একটি দেশের অলিখিত সচিবালয়
বিমানবন্দর থেকে যুক্তরাজ্যের সরকারি নিরাপত্তা প্রহরায় সোজা লন্ডনের মেফেয়ার এলাকার ঐতিহাসিক ও অভিজাত 'ক্লারিজ হোটেল'-এ নিয়ে যাওয়া হয় বঙ্গবন্ধুকে। ক্লারিজ হোটেলে যাওয়ার পথে একটি চমৎকার শিষ্টাচারের জন্ম হয়। ভিআইপি বুলেটপ্রুফ গাড়িতে ওঠার সময় পরম বিনয়ী বঙ্গবন্ধু পাশে থাকা ব্রিটিশ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
"আমি কি সামনে বসতে পারি?"
ব্রিটিশ কর্মকর্তা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে উত্তর দিয়েছিলেন,
"অবশ্যই, স্যার। আপনি একটি মুক্ত স্বাধীন দেশের প্রধান।"
ক্লারিজ হোটেলটি পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার জন্য যেন রূপ নিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের 'অলিখিত সচিবালয়ে'। ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে তখনও কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়নি, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার কাছে প্রটোকল শিথিল হয়ে যায়। রাজকীয় প্রটোকল অফিসার এবং স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তাঁকে একজন স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রধানের (Head of State) মতোই পূর্ণ নিরাপত্তা ও সম্মান প্রদান করে।
লন্ডনে প্রথম আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলন: "বাংলাদেশ এক অনস্বীকার্য বাস্তব সত্য"
৮ই জানুয়ারি বিকেলে ক্লারিজ হোটেলের বলরুমে আয়োজিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর জীবনের প্রথম অফিসিয়াল আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলন। দেশি-বিদেশি শত শত সাংবাদিক, টিভি ক্যামেরা ও সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধিদের ভিড়ে গমগম করছিল পুরো রুম।
সম্মেলন কক্ষে প্রবেশ করেই বঙ্গবন্ধু ডান হাত তুলে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেন: "জয় বাংলা!" তাঁর এই ঐতিহাসিক ও পরিচিত শ্লোগানে পুরো বলরুম এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি যে বক্তব্য রেখেছিলেন, তা ছিল একজন দক্ষ, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কের প্রতিচ্ছবি।

সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তাঁর প্রধান মূল বক্তব্যসমূহ নিচে উদ্ধৃত হলো:
১. স্বাধীনতার স্থায়িত্ব: "আমার বাংলাদেশ এখন এক অনস্বীকার্য বাস্তব সত্য। এই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রকে পৃথিবীর কোনো শক্তি আর মুছে ফেলতে পারবে না। আমি বিশ্বের সমস্ত মুক্তিকামী ও গণতান্ত্রিক দেশের প্রতি আহ্বান জানাই, আপনারা অনতিবিলম্বে স্বাধীন বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান করুন। আমি এক মুহূর্ত এখানে থাকতে রাজি নই, আমি আমার মানুষের কাছে ফিরতে চাই।"
২. পাকি বর্বরতাকথা: "পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী আমার নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষের ওপর যে পৈশাচিক গণহত্যা ও নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছে, তা দেখলে স্বয়ং হিটলারও লজ্জায় মাথা নোয়াত। তারা আমার লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে, কোটি মানুষকে গৃহহীন করেছে।"
৩. ভুট্টোর প্রস্তাবের চিরস্থায়ী সমাপ্তি: জুরফিকার আলী ভুট্টোর সাথে কোনো কনফেডারেশন বা বাঁধনে যাওয়ার সম্ভাবনাকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, "ভুট্টো সাহেবের সাথে আমার কথা হয়েছিল। কিন্তু আমি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন হয়ে গেছে। আমরা এখন স্বাধীন প্রতিবেশী।"
পরিবারের সাথে প্রথম ফোনালাপ: "বেঁচে আছো তো?"
দীর্ঘ ৯ মাসের অবরুদ্ধ বন্দিজীবনে শেখ মুজিবুর রহমান একদমই জানতেন না তাঁর প্রিয়তম স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, সন্তান শেখ কামাল, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা এবং ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেল আদৌ বেঁচে আছেন কি না। ২৫শে মার্চের কালরাতে ধানমণ্ডি থেকে গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁদের সাথে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। অন্যদিকে ধানমণ্ডির ১৮ নম্বর সড়কের এক রুদ্ধদ্বার বাড়িতে পরিবারের সদস্যরাও জানতেন না বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন না তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে।
৮ই জানুয়ারি সন্ধ্যায় লন্ডনের ক্লারিজ হোটেলের ১০১ নম্বর রুম থেকে ঐতিহাসিক টেলিফোন যোগাযোগটি স্থাপন করা হয় ঢাকার ধানমণ্ডির সেই বাড়ির সাথে।
ফোনটি যখন কানে তোলেন, বঙ্গবন্ধুর গলা ধরে এসেছিল। ওপ্রান্তে ফোন ধরেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধুকে জীবিত শুনে ও তাঁর বজ্রকণ্ঠ কানে আসতেই বঙ্গমাতা কান্নায় ভেঙে পড়েন। আবেগের অতিশয্যে প্রথম কয়েক মিনিট তিনি কোনো কথাই বলতে পারেননি।
বঙ্গবন্ধু শান্ত গলায় বারবার বলছিলেন: "শান্ত হও, কান্নাকাটি কোরো না। তোমরা সবাই ভালো আছো তো? সবাই বেঁচে আছো?"
এরপর একে একে বড় ছেলে শেখ কামাল, বড় মেয়ে শেখ হাসিনা (যিনি তখন সন্তানসম্ভবা ছিলেন ও পরবর্তীতে জয় জন্মগ্রহণ করেন), ছোট মেয়ে শেখ রেহানা এবং ছোট্ট শেখ রাসেল বাবার সাথে কথা বলেন। রাসেলের অবুঝ প্রশ্ন ছিল, "আব্বু, তুমি আবার কখন চলে যাবে?" একটি মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের পেছনে পরিবারের এই ব্যক্তিগত আবেগ ও ত্যাগ ইতিহাসের পাতায় এক অমলিন ও অশ্রুসজল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
বিশ্বনেতাদের সাথে কূটনীতি: এডওয়ার্ড হিথ ও ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সংলাপ
লন্ডনে কাটানো এই সংক্ষিপ্ত সময়টিকে বঙ্গবন্ধু কেবল পারিবারিক আবেগে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তিনি একজন ঝানু রাষ্ট্রনায়কের মতো নবজাত বাংলাদেশের বৈশ্বিক কূটনৈতিক অবস্থান শক্ত করার কাজে নেমে পড়েন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সাথে সাক্ষাৎ
যুক্তরাজ্যের তৎকালীন কনজারভেটিভ পার্টির প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ তখন ছুটির দিনে লন্ডনের বাইরে চেকার্সে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডনে এসেছেন শুনে তিনি তড়িঘড়ি করে ১০ ডাউননিং স্ট্রিটে ফিরে আসেন।
৮ই জানুয়ারি রাতে ১০ ডাউননিং স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত হয় তাঁদের সেই ঐতিহাসিক বৈঠক। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী আলোচনায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং কমনওয়েলথে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে কথা বলেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ নিজে গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে সসম্মানে বঙ্গবন্ধুকে বিদায় জানান যা ছিল আন্তর্জাতিক প্রটোকলের ইতিহাসে বিরল এক সম্মান।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে ফোনালাপ
লন্ডনে থাকা অবস্থাতেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী টেলিফোনে বঙ্গবন্ধুর সাথে কথা বলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্তিতে উষ্ণ অভিবাদন জানান এবং নতুন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের যাত্রায় সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
কথোপকথনে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলেন: "ম্যাডাম গান্ধী, আপনার প্রতি, আপনার সরকারের প্রতি এবং ভারতের মহান জনগণের প্রতি আমার ও আমার সাড়ে সাত কোটি বাঙালির কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। আপনি আমার মানুষকে আশ্রয় দিয়েছেন, আমার মুক্তি নিশ্চিত করেছেন।" ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে স্বদেশ ফেরার পথে নয়াদিল্লিতে যাত্রাবিরতি করার আমন্ত্রণ জানান এবং বঙ্গবন্ধু আনন্দের সাথে সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন।
তাজউদ্দীন আহমদের সাথে ফোনালাপ ও দেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনা
লন্ডন থেকে বঙ্গবন্ধু ফোন করেন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও তৎকালীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে। ফোন ধরেই বঙ্গবন্ধু জানতে চান: "তাজউদ্দীন, আমার দেশের মানুষের খবর কী? কত মানুষ শহীদ হয়েছে? দেশ কীভাবে চলছে?"
তাজউদ্দীন আহমদ যখন পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ, ৩০ লাখ মানুষের শাহাদাত বরন ও চার লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিবরণ দেন, তখন বঙ্গবন্ধু বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তিনি আর এক মুহূর্তও লন্ডনে থাকবেন না, যত দ্রুত সম্ভব নিজ দেশের মাটিতে ফিরবেন।
১০ই জানুয়ারি: ধ্বংসস্তূপ ঢাকায় রাজকীয় প্রত্যাবর্তন
৯ই জানুয়ারি সন্ধ্যায় ব্রিটিশ সরকারের সরবরাহ করা রয়্যাল এয়ারফোর্সের (RAF) বিশেষ কমেট বিমানে (Comet Aircraft) চড়ে লন্ডনের স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন বঙ্গবন্ধু। পথে ৯ই জানুয়ারি রাতে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির পালম বিমানবন্দরে (বর্তমান ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি বরোদা গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে অভূতপূর্ব ও রাজকীয় সামরিক সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। ২১ বার তোপধ্বনি ও তিন বাহিনীর সুসজ্জিত গার্ড অব অনারের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বরণ করা হয়।
অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ ১০ই জানুয়ারি, ১৯৭২। ঢাকা সময় দুপুর ১টা ৪১ মিনিটে তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী রূপালী রঙের ব্রিটিশ বিমানটি।

লাখো জনতার উচ্ছ্বাস ও অশ্রুর মহাসমুদ্র
বিমান অবতরণের সাথে সাথেই চারদিকের আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করে হাজার হাজার কণ্ঠ একসাথে গেয়ে ওঠে "জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু!" বিমানে সিঁড়ি লাগানো হলে সর্ব প্রথম নামেন জাতির পিতা। বিমানবন্দর প্রাঙ্গণে তাঁকে বরণ করে নেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, জাতীয় চার নেতা এবং তরুণ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ (নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আ স ম আব্দুর রব ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন)।

সহযোদ্ধাদের জড়িয়ে ধরে বঙ্গবন্ধু নিজ দেশের মাটিতে শিশুর মতো কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেই কান্না ছিল বিজয়ের, সেই কান্না ছিল স্বজন হারানোর এবং সেই কান্না ছিল নতুন রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকারের।
কলকাতার আকাশবাণী বেতারে সেদিন বাজছিল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কালজয়ী সেই গান:
"বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে তোমার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলায় গো... আজকের এই শুভ দিনে।"
কবি কামাল চৌধুরীর ভাষায়: "তিনি ফিরে আসলেন, আর পোড়ামাটি ও ছাইচাপা ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ফুটে উঠল রক্তিম কৃষ্ণচূড়া।" পুরো ঢাকা শহর সেদিন পরিণত হয়েছিল এক ভালোবাসার মহাসমুদ্র। বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পর্যন্ত মাত্র কয়েক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে বঙ্গবন্ধুর উন্মুক্ত ট্রাকটির সময় লেগেছিল প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টা। লাখ লাখ বাঙালি তাঁদের নেতাকে এক নজর দেখার জন্য রাস্তার দুপাশে, গাছের ডালে এবং ছাদের ওপর ভিড় জমিয়েছিল।
রেসকোর্স ময়দানে জাতির উদ্দেশে দেওয়া কালজয়ী দিকনির্দেশনা
১০ই জানুয়ারি বিকেলে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (যেখানে তিনি ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন) প্রায় ১০ লক্ষাধিক জনতার বিশাল সমাবেশে ভাষণ দেন সদ্য মুক্ত জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর এই ভাষণটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ পরিচালনার নীতি-নৈতিকতা ও ভবিষ্যতের প্রধান রূপরেখা।
ভাষণে আবেগপ্লুত কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন:
১. স্বাধীনতার অনুভূতি: "আমার জীবনের স্বপ্ন আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার স্বাধীন বাংলাদেশে আমি ফিরে এসেছি। আজ আমি মেহনতি মানুষকে, কৃষক-শ্রমিককে অভিনন্দন জানাই।"
২. ভারতীয় সেনাপ্রত্যাহার সংকল্প: ইন্দিরা গান্ধীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে জনসভায় ঘোষণা করেন, "আমি ম্যাডাম গান্ধীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি কবে আমার দেশ থেকে আপনার সেনাবাহিনী ফেরত নিয়ে যাবেন? তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেছেন, আমি যখনই বলব তখনই ভারতীয় সৈন্য ফেরত যাবে।" (পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ১৯৭২ সালের মার্চ মাসেই ভারতীয় সেনা বাংলাদেশ ত্যাগ করে)।
৩. অসাম্প্রদায়িক চেতনার অঙ্গীকার: "বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলিম কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে সবাই শান্তিতে বসবাস করবে।"
৪. দেশ পুনর্গঠনের ডাক: মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে তিনি নির্দেশ দেন, "তোমরা অস্ত্র জমা দাও, এখন দেশ গড়ার কাজ শুরু করতে হবে। আমরা যদি হাত গুটিয়ে বসে থাকি তবে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়বে।"
এক নজরে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির যাত্রা (৮-১০ জানুয়ারি ১৯৭২)
বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের ঐতিহাসিক ৮ই জানুয়ারি থেকে ১০ই জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কালের প্রধান প্রধান ঘটনাপ্রবাহ নিচে একটি সারণীতে তুলে ধরা হলো:
তারিখ ও সময় (১৯৭২) | স্থান / রুট | প্রধান ঘটনা ও কূটনৈতিক উদ্যোগ | উপস্থিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ | ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও ফলাফল |
৮ জানুয়ারি (ভোররাত্র) | রাওয়ালপিন্ডি, পাকিস্তান | চাকলালা বিমানবন্দর থেকে পিআইএ বিমানযোগে (PIA-059) গোপনে লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা। | জুলফিকার আলী ভুট্টো, শেখ মুজিবুর রহমান, ড. কামাল হোসেন | মৃত্যুকূপ ও বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধুর চূড়ান্ত মুক্তি লাভ। |
৮ জানুয়ারি (সকাল ৬:৩৬ GMT) | হিথ্রো বিমানবন্দর, লন্ডন | রাজকীয় সম্মাননায় যুক্তরাজ্যে অবতরণ ও উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে প্রথম বক্তব্য প্রদান। | ফরেইন অফিসের ইয়ান সার্ফিস, বাঙালি কূটনীতিকবৃন্দ | স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রথম উপস্থিতি। |
৮ জানুয়ারি (দুপুর-বিকেল) | ক্লারিজ হোটেল, মেফেয়ার | ক্লারিজ হোটেলে আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলন; "বাংলাদেশ এক অনস্বীকার্য বাস্তব সত্য" ঘোষণা। | দেশি-বিদেশি সংবাদ মাধ্যম ও গ্লোবাল প্রেস | বিশ্বের স্বীকৃতি দাবি এবং পাকিস্তানি কনফেডারেশন বাতিলকরণ। |
৮ জানুয়ারি (সন্ধ্যা-রাত) | ক্লারিজ হোটেল / ১০ ডাউননিং স্ট্রিট | ঢাকায় পরিবার ও তাজউদ্দীন আহমদের সাথে ফোনালাপ; ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সাথে সাক্ষাৎ। | এডওয়ার্ড হিথ, বেগম ফজিলাতুন্নেছা, ইন্দিরা গান্ধী (ফোনে) | আন্তর্জাতিক প্রটোকল অর্জন ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সূচনা। |
৯ জানুয়ারি (রাত) | পালম বিমানবন্দর, নয়াদিল্লি | ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের বিমানে ভারতে অবতরণ; রাষ্ট্রীয় ও সামরিক অভ্যর্থনা গ্রহণ। | বরোদা গিরি (রাষ্ট্রপতি), ইন্দিরা গান্ধী, ভারতীয় সামরিক বাহিনী | মিত্র রাষ্ট্র ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের কথা। |
১০ জানুয়ারি (দুপুর ১:৪১) | তেজগাঁও বিমানবন্দর, ঢাকা | স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধুর পদার্পণ; লাখ লাখ জনতার ঐতিহাসিক স্বাগতম। | সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, জাতীয় চার নেতা, সাধারণ জনতা | অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের অভিভাবকত্ব লাভ ও পূর্ণতা অর্জন। |
১০ জানুয়ারি (বিকেল) | রেসকোর্স ময়াদন, ঢাকা | ঐতিহাসিক সংবর্ধনা জনসভায় উপস্থিতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি-নির্দেশনা প্রদান। | ১০ লক্ষাধিক স্বাধীকারকামী বাঙালি জনতা | অসাম্প্রদায়িক, সার্বভৌম ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের নীতি ঘোষণা। |
জাতির পিতার ফেরা এবং সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা
১৯৭২ সালের ৮ই জানুয়ারি থেকে ১০ই জানুয়ারি পর্যন্ত এই ৪৮ ঘণ্টা ছিল কেবল কিছু সময়ের পরিক্রমা নয়; এটি ছিল একটি পরাস্ত জাতিকে নতুন করে প্রাণের স্পন্দনে জাগিয়ে তোলার অলৌকিক মুহূর্ত।
বঙ্গবন্ধু যদি লন্ডনে নামতে না পারতেন, তবে বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হয়তো এত দ্রুত এবং সহজে স্বাধীন বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারত না। তাঁর ব্যক্তিত্ব, সাহসিকতা এবং দূরদর্শী কূটনীতির কারণেই বিশ্বের বৃহত্তম পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।
১০ই জানুয়ারির বিজয়ের রোদ আজকেও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সাড়ে সাত কোটি মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে পূর্ণতা দিতে শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো বিকল্প ছিল না। চারদিকে যখন পোড়ামাটির গন্ধ, ধ্বংসস্তূপের আহাজারি এবং খাদ্যভাব তখন তিনি ছাইচাপার মধ্য থেকেই এক নতুন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আজ আমরা যে সার্বভৌম, স্বাধীন এবং আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশে বাস করছি, তার কূটনৈতিক, আইনি এবং আন্তর্জাতিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছিল লন্ডনের সেই কনকনে শীতের সকালে এবং তেজগাঁও বিমানবন্দরের সেই অশ্রুসজল ঐতিহাসিক শুভলগ্নে।














