স্বাধীনতা ঘোষণা করলো বেলুচিস্তান - পাকিস্তান কি ভেঙে যাচ্ছে?
১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির ওপর যে নির্মম অত্যাচার আর লুণ্ঠন চালিয়েছিল পাকিস্তানি জান্তা, ঠিক একই ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তি তারা গত ৭৮ বছর ধরে করে আসছে বেলুচিস্তানের দেড় কোটি মানুষের ওপর। কিন্তু রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বালুচ জাতি আজ স্বাধীনতার চূড়ান্ত দ্বারপ্রান্তে উপনীত। বালুচ লিবারেশন আর্মি (BLA) সহ এক ডজনেরও বেশি সশস্ত্র মুক্তিকামী সংগঠনের সাঁড়াশি আক্রমণে আজ খণ্ডবিখণ্ড হতে চলেছে পাকিস্তান।

TruthBangla

ইতিহাসের এক অমোঘ নিয়ম হলো জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা কৃত্রিম রাষ্ট্রকাঠামো কখনোই চিরস্থায়ী হয় না। শোষক শ্রেণী যখন বন্দুকের নলের জোরে কোনো বীর জাতিকে পদানত করে রাখতে চায়, তখন সেই জাতির পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। আর তখনই জন্ম নেয় বিপ্লব। আজ দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ঠিক তেমনই এক ঐতিহাসিক ও ভূকম্পনকারী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। পাকিস্তান নামক এক ব্যর্থ ও কৃত্রিম রাষ্ট্রের শোষণ, নিপীড়ন আর গণহত্যার শৃঙ্খল ভেঙে পৃথিবীর ১৯৬-তম রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে বেলুচিস্তান।
১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির ওপর যে নির্মম অত্যাচার আর লুণ্ঠন চালিয়েছিল পাকিস্তানি জান্তা, ঠিক একই ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তি তারা গত ৭৮ বছর ধরে করে আসছে বেলুচিস্তানের দেড় কোটি মানুষের ওপর। কিন্তু রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বালুচ জাতি আজ স্বাধীনতার চূড়ান্ত দ্বারপ্রান্তে উপনীত। বালুচ লিবারেশন আর্মি (BLA) সহ এক ডজনেরও বেশি সশস্ত্র মুক্তিকামী সংগঠনের সাঁড়াশি আক্রমণে আজ খণ্ডবিখণ্ড হতে চলেছে পাকিস্তান। বর্তমান প্রবন্ধে আমরা বেলুচিস্তানের এই ঐতিহাসিক স্বাধীনতা ঘোষণা, এর নেপথ্যের সশস্ত্র প্রতিরোধ, ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং পাকিস্তানের অনিবার্য পতনের কারণগুলো গভীর বিশ্লেষণসহ তুলে ধরব।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতি বনাম বালুচ মনস্তত্ত্ব
বেলুচিস্তানের আজকের এই বিদ্রোহ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্য আর ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক গৌরবময় ইতিহাস। বাঙালিদের যেমন রয়েছে ৫০০০ বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঠিক তেমনি বালুচদের রয়েছে ৯০০০ বছরের এক প্রাচীন ও গৌরবময় জাতিসত্তার ইতিহাস।
উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় ইংরেজরা খুব ভালো করেই জানত যে, এই অঞ্চলের সব জাতিগোষ্ঠীকে একই নিয়মে বশে আনা সম্ভব নয়। বিশেষ করে দুটি দুর্ধর্ষ ও স্বাধীনচেতা বীর জাতিকে নিয়ে তাদের সবচেয়ে বেশি মাথাব্যথা ছিল পশতু আর বালুচ। ব্রিটিশদের একটি ঐতিহাসিক শাসননীতি ছিল:
"পাঞ্জাবিদের শাসন করো, সিন্ধিদের ভয় দেখাও, পশতুদের টাকা দিয়ে কিনে নাও, আর বালুচদের সম্মান করো।"
ব্রিটিশরা প্রথমে শক্তি দিয়ে বেলুচিস্তান ও আফগান সীমান্ত দখল করতে চেয়েছিল। কিন্তু ১৮৪২ সালে প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধে কাবুল থেকে ব্রিটিশ বাহিনীর লজ্জাজনক ও ঐতিহাসিক পিছু হটার ঘটনা তাদের চোখ খুলে দেয়। তারা বুঝতে পারে, শুধু লাঠির জোরে বা অস্ত্রের মুখে পশতু এবং বালুচদের দমিয়ে রাখা অসম্ভব। তাই তারা কৌশল বদলে যুদ্ধের পরিবর্তে মোটা অঙ্কের ভাতা আর চুক্তির মাধ্যমে তাদের শান্ত রাখার নীতি গ্রহণ করে।
পশতু ও বালুচ মনস্তত্ত্বের মৌলিক পার্থক্য
ব্রিটিশদের পর্যবেক্ষণে পশতু ও বালুচদের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্যটি খুব স্পষ্ট ছিল।
পশতু মনস্তত্ত্ব: পশতুদের কাছে ধর্মের অবস্থান ছিল সবার ওপরে। তারা ধর্মের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকত।
বালুচ মনস্তত্ত্ব: বালুচদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো নিজের ভূমি, নিজের গোত্র এবং নিজের ‘সরদার’ বা নেতা। তাদের কাছে আত্মসম্মানবোধই জীবনের শেষ কথা।
ব্রিটিশ আমলে যে বালুচদের সম্মান দিয়ে সমীহ করে চলা হতো, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্তির পর তারা দেখল যে তাদের সেই সম্মান ধূলিসাৎ করা হয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি শুরু থেকেই বালুচদের কেবল একটি উপনিবেশ হিসেবে গণ্য করেছে এবং তাদের ভূখণ্ডকে লুটপাটের চারণভূমি বানিয়েছে। এর ফলেই বালুচদের মনে তীব্রভাবে জাগ্রত হয়েছে তাদের সম্মান, স্বাধীনতা এবং অস্তিত্ব রক্ষার চূড়ান্ত লড়াই।
স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবচিত্র
বর্তমানে বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি আর পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে নেই। বালুচ লিবারেশন আর্মি (BLA) এবং অন্যান্য মুক্তিকামী সংগঠনগুলো পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ওপর একের পর এক সফল ও বিধ্বংসী হামলা পরিচালনা করে চলেছে। গত এক বছরে বালুচ মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন রণক্ষেত্রে সরাসরি আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানের এক হাজারেরও বেশি সেনাসদস্যকে খতম করেছে।
বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয়টি বিশ্বমঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে জোরালো ধাক্কা দেয় যখন প্রখ্যাত বালুচ সাহিত্যিক ও নেতা মীর ইয়ার বালুচ তাঁর অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির একটি ঐতিহাসিক ভিডিও শেয়ার করে বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে বার্তা দেন। তিনি ঘোষণা করেন:
"আমরা আমাদের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়েছি। আমরা ভারতের কাছে আবেদন জানাই দিল্লিতে স্বাধীন বেলুচিস্তানের দূতাবাস স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হোক। জাতিসংঘের কাছেও আমাদের আকুল আবেদন, আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হোক এবং সেই সঙ্গে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠিয়ে পাকিস্তানি ঘাতক সেনাদের আমাদের পবিত্র ভূমি থেকে হটানো হোক।"
মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ ও পাকিস্তানের পরাজয় স্বীকার
বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির দাবি অনুযায়ী, বেলুচ ভূখণ্ডের প্রায় ৭৫ শতাংশ ভূমির নিয়ন্ত্রণ এখন সম্পূর্ণভাবে মুক্তিকামীদের হাতে চলে এসেছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা এখন কেবল তাদের সুরক্ষিত গ্যারিসন ও সেনানিবাসের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে দিন কাটাচ্ছে।
এই চরম সত্যটি খোদ পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শহীদ খাকান আব্বাসি এক সাক্ষাৎকারে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “বেলুচিস্তানের নিয়ন্ত্রণ এখন আর পাকিস্তান সরকারের হাতে নেই।” মীর ইয়ার বালুচের নেতৃত্বে ইতিমধ্যে স্বাধীন বেলুচিস্তানের খসড়া সনদ প্রকাশ করা হয়েছে, প্রস্তুত হচ্ছে বেলুচিস্তানের নিজস্ব পার্লামেন্ট এবং খুব দ্রুতই একটি স্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করার প্রক্রিয়া চলছে।
রক্তাক্ত ইতিহাস ও পাকিস্তানি জান্তার নৃশংসতা (১৯৭১ বনাম ২০২৬)
পাকিস্তানের ইতিহাস মানেই গণহত্যা, ধর্ষণ আর লুণ্ঠনের ইতিহাস। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে তারা যেভাবে ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল এবং দুই লক্ষাধিক নারী ও শিশুকে নির্যাতন ও ধর্ষণ করেছিল, ঠিক একই কায়দায় তারা গত আট দশক ধরে বেলুচিস্তানে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালাচ্ছে। এ পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২ লক্ষাধিক নিরীহ বালুচ মুসলমানকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।
২০১৬-এর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও শাম্মি বুগতির ট্র্যাজেডি
২০১৬ সালে বেলুচিস্তানের অভ্যন্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালায়। প্রায় ১০টি পাকিস্তানি বেল এইচ (Bell H) যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার নিয়ে বালুচ গ্রামগুলোর ওপর নির্বিচারে বোমাবর্ষণ করা হয়। ১৯৭১ সালের মতোই ঘরে ঘরে আগুন দিয়ে পুরুষদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই অভিযানের সবচেয়ে লোমহর্ষক ও কলঙ্কজনক অধ্যায়টি ছিল শাম্মি বুগতি নামের এক বালুচ নারীর ওপর চালানো নির্যাতন। পাকিস্তানি হায়েনারা তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে টানা ৩০ দিন অবরুদ্ধ রেখে গণধর্ষণ করে। এরপরও তাদের পৈশাচিক ক্ষুধা মেটেনি; শাম্মি বুগতির দেহকে টুকরো টুকরো করে কেটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে বেলুচিস্তানের পাহাড়ি উপত্যকায় ফেলে দেওয়া হয়। শত শত বালুচ পুরুষকে গুম করে হত্যা করা হয়েছে, যাদের লাশ আজও খুঁজে বেড়ায় তাদের স্বজনেরা।
২০২৬ সালের সাম্প্রতিক ভয়াবহতা ও আন্তর্জাতিক নীরবতা
সর্বশেষ ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বেলুচিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী দুই শতাধিক বালুচ নারীকে বন্দি শিবিরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ ও পাশবিক নির্যাতন করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যম এই নির্মম সত্যতার প্রমাণ দাখিল করেছে।
বিশ্বের এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজ ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি আগ্রাসন নিয়ে দিনরাত কান্নাকাটি করলেও, গত ৭৮ বছর ধরে পাকিস্তানের হাতে নির্যাতিত বেলুচিস্তানের মুসলমানদের এই চরম দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে সম্পূর্ণ নীরব। অথচ বাস্তব সত্য হলো, ফিলিস্তিনে ইসরায়েলও এত বছর ধরে যে পরিমাণ পদ্ধতিগত হত্যা ও গণধর্ষণ করেনি, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি বর্বরতা পাকিস্তানি সেনারা তাদেরই সহকর্মী মুসলিম বালুচদের ওপর করেছে। তাই আজ সময় এসেছে মানুষ হিসেবে জাগ্রত হওয়ার, বেলুচিস্তানের পক্ষে দাঁড়ানোর এবং ঘরের ছাদে স্বাধীন বেলুচিস্তানের পতাকা উড়িয়ে এই মজলুম জাতির প্রতি সংহতি প্রকাশ করার।
পাকিস্তান ও চীনের ঔপনিবেশিক দোস্তি ও সম্পদের মহালুটপাট
বেলুচিস্তানের এই দীর্ঘ লড়াইয়ের মূল অর্থনৈতিক কারণ হলো পাকিস্তানের সীমাহীন লোভ এবং ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন। ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিকভাবে বেলুচিস্তান খনিজ সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এই অঞ্চলে প্রায় ৮০টিরও বেশি মূল্যবান খনিজ সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। অথচ চরম পরিহাসের বিষয় হলো, পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ প্রদেশ (পাকিস্তানের মোট ভূখণ্ডের ৪৪ শতাংশ) হওয়া সত্ত্বেও বেলুচিস্তানের ৪১ শতাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে।
চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর (CPEC) ও সম্পদের নিলাম
পাকিস্তান সরকার নিজের ঋণের বোঝা কমাতে এবং পাঞ্জাবি এস্টাবলিশমেন্টকে টিকিয়ে রাখতে বেলুচিস্তানের বিশাল বিশাল খনিজ ভাণ্ডার যেমন সাইন্দক (Saindak), ডুডার (Duddar) এবং রেকো-ডিক (Reko Diq) চীনের কাছে পানির দামে বিক্রি করে দিয়েছে।
ডুডার খনিজ প্রকল্প: ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিশাল ডুডার খনিজ প্রকল্প থেকে যে পরিমাণ তামা ও সোনা উত্তোলন করা হয়, তার রক্ষণাবেক্ষণ ও লভ্যাংশের মাত্র ১০ শতাংশ পায় বেলুচিস্তানের স্থানীয় জনগণ।
লুটের বণ্টন: বাকি ৯০ শতাংশ লভ্যাংশ সম্পূর্ণভাবে লুট করে নিয়ে যাচ্ছে বেইজিং ও ইসলামাবাদের শাসকেরা। লোহা, তামা, সীসা, সোনা, দস্তা, ব্যারাইট, ক্রোমাইট, কয়লা, জিপসাম এবং মূল্যবান চুনাপাথর প্রতিদিন কন্টেইনার ভরে চীনে পাচার হচ্ছে।
বালুচ মুক্তিযোদ্ধারা এর উপযুক্ত জবাব দিতে শুরু করেছে। তারা পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড গ্যাসক্ষেত্রগুলোর ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। বর্তমানে ১০০টিরও বেশি সক্রিয় গ্যাস কূয়া সমৃদ্ধ বিশাল গ্যাসক্ষেত্রগুলো এখন বালুচ মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা পাকিস্তানের জ্বালানি খাতকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
গোয়াদর বন্দর ও সিপেক (CPEC): শোষণের আধুনিক এপিসেন্টার
বেলুচিস্তানের সাধারণ মানুষের ক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ হলো তাদের উপকূলীয় শহর গোয়াদর (Gwadar)। চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর (CPEC)-এর অধীনে এই গভীর সমুদ্র বন্দরটিকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ হিসেবে দেখানো হলেও, স্থানীয় বালুচদের জন্য এটি একটি অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মৎস্যজীবীদের জীবিকা হরণ: গোয়াদর বন্দরের নিরাপত্তার অজুহাতে স্থানীয় বালুচ মৎস্যজীবীদের সমুদ্রের একটি বিশাল অংশে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেখানে চীনের বড় বড় ট্রলার এসে আধুনিক প্রযুক্তিতে মাছ লুটে নিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে স্থানীয় হাজার হাজার পরিবার কর্মহীন হয়ে পড়েছে।
'হক দো তেহরিক' (حق دو تحریک): এই অর্থনৈতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে মাওলানা হেদায়েত উর রহমানের নেতৃত্বে গোয়াদরে ‘হক দো তেহরিক’ (আমাদের অধিকার দাও আন্দোলন) নামে এক অভূতপূর্ব গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। লাখো সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, মাসের পর মাস বন্দরে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানান। এটি প্রমাণ করে যে সশস্ত্র লড়াইয়ের পাশাপাশি বেলুচিস্তানে এখন তীব্র সিভিল রেজিস্ট্যান্স বা নাগরিক প্রতিরোধও গড়ে উঠছে।
প্রতিরোধের নতুন সমীকরণ: সশস্ত্র জোট ও গণআন্দোলন
বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা যুদ্ধ আজ আর কোনো বিচ্ছিন্ন আন্দোলন নয়। এটি এখন একটি সমন্বিত ‘গণযুদ্ধে’ রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বেলুচিস্তানের প্রায় ১২টি সক্রিয় সশস্ত্র মুক্তিকামী দল এখন একক কমান্ডের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
প্রধান বিদ্রোহী সংগঠন ও কৌশলগত জোট
বেলুচ লিবারেশন আর্মি (BLA): এই যুদ্ধের প্রধান চালিকাশক্তি এবং অগ্রগামী গেরিলা বাহিনী।
বেলুচ রিপাবলিকান আর্মি (BRA) ও বেলুচ লিবারেশন ফ্রন্ট (BLF): মাঠপর্যায়ে পাকিস্তানি সামরিক কনভয়ের ওপর অ্যামবুশ ও গেরিলা হামলায় পারদর্শী।
ইউনাইটেড বেলুচ আর্মি (UBA): কৌশলগত স্থাপনা ও অবকাঠামো ধ্বংসের দায়িত্বে নিয়োজিত।
এই সংগঠনগুলো কেবল নিজেদের মধ্যেই ঐক্যবদ্ধ হয়নি, বরং তারা কৌশলগতভাবে পাকিস্তানের অন্যান্য নির্যাতিত জাতিগোষ্ঠীর সাথেও হাত মিলিয়েছে। তারা পাকিস্তানের পশতুন প্রদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP)-এর সাথে সামরিক বোঝাপড়া তৈরি করেছে। একই সাথে সিন্ধু প্রদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা সিন্ধু বিদ্রোহীদের (Sindh Separatists) সাথেও জোট গঠন করেছে। তাদের বর্তমান সাধারণ রণকৌশল হলো “যেই অঞ্চলেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, সেখানেই একযোগে সর্বাত্মক হামলা।”
মাহরাং বালুচ: সিংহীর হুঙ্কার ও প্রতিরোধের নতুন প্রতীক
বেলুচিস্তানের এই স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস কখনোই পূর্ণতা পাবে না ড. মাহরাং বালুচ-এর বীরত্বগাথার উল্লেখ ছাড়া। বর্তমানে তিনি লক্ষ কোটি বালুচ জনগণের স্বপ্নের মহানায়ক এবং বেলুচিস্তানের মুক্তির প্রধান কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছেন।
মাহরাং বালুচের ঐতিহাসিক পদযাত্রা (Turbat to Quetta/Islamabad): পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানের তুরবত থেকে প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে ঐতিহাসিক লংক মার্চ পরিচালনা করেন মাহরাং বালুচ।
তাঁর এই দুঃসাহসিক পদযাত্রা এবং পাকিস্তানের সামরিক জান্তার চোখের ওপর চোখ রেখে দেওয়া বক্তব্যগুলো বিশ্বজুড়ে নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। একজন সাধারণ নারী হয়েও যেভাবে তিনি সমগ্র বালুচ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন, তা সমসাময়িক বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। তাঁর এই অসামান্য নেতৃত্ব ও প্রভাবের কারণে বিশ্বখ্যাত ‘টাইম ম্যাগাজিন’ (Time Magazine) বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় মাহরাং বালুচের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা “সিন্ধু নদ থেকে শুরু করে আরব সাগর পর্যন্ত সমগ্র বেলুচিস্তানকে আমরা পাকিস্তানি হায়েনাদের হাত থেকে মুক্ত করবই।”
শেখ মুজিবের পথ ও ৯৩ হাজার অস্ত্রের আহবান
একটি ঐতিহাসিক ও আবেগঘন সত্য হলো, বাংলাদেশের ১৭.৫ কোটি মানুষ আজ হয়তো তাদের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ত্যাগকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছে, কিন্তু পাকিস্তানের শৃঙ্খলে আবদ্ধ বেলুচিস্তানের দেড় কোটি মানুষের কাছে আজ সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী ও জনপ্রিয় নাম বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান।
পাকিস্তানের শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একমাত্র সঠিক পথ হিসেবে বালুচ জনতা বেছে নিয়েছে বঙ্গবন্ধুর দেখানো ৭ই মার্চের সেই বিপ্লবী আদর্শকে। তাই আজ বেলুচিস্তানের আকাশে-বাতাসে, পাহাড়ে-উপত্যকায় একটি স্লোগানই সবচেয়ে জোরে ধ্বনিত হচ্ছে:
“শেখ মুজিবের পথ ধরো; বেলুচিস্তান স্বাধীন করো!”
বিলাল বালুচের ঐতিহাসিক আহবান
প্রখ্যাত বালুচ নেতা বিলাল বালুচ সম্প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে এক ঐতিহাসিক আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বেলুচিস্তানের চূড়ান্ত স্বাধীনতার জন্য তাদের এই মুহূর্তে ৯৩ হাজার আধুনিক অস্ত্রের প্রয়োজন। এই ৯৩ হাজার সংখ্যার পেছনে রয়েছে এক গভীর ঐতিহাসিক মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণ।
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যেভাবে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যকে হাঁটু গেড়ে বাঙালির কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল, ঠিক একই কায়দায় বেলুচিস্তানের মাটি থেকেও ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনাকে তাড়িয়ে পৃথিবীর বুকে ১৯৬-তম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বেলুচিস্তানের লাল-সবুজ-নীল পতাকা ওড়ানো হবে। এই লক্ষ্যে বালুচ তরুণ, বৃদ্ধ, নারী ও শিশু সবাই আজ হাসিমুখে জীবন দিতে প্রস্তুত।
বেলুচিস্তানের মুক্তি সংগ্রামের সামগ্রিক সমীকরণ
নিচে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা যুদ্ধ, সম্পদের বিন্যাস এবং শোষণের খতিয়ানের একটি সুবিন্যস্ত তথ্য ছক উপস্থাপন করা হলো:
বিষয়ের শিরোনাম | মূল উপাত্ত ও পরিসংখ্যান | প্রধান লক্ষ্য ও কৌশলগত প্রভাব | বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের সাথে সাদৃশ্য |
ভৌগোলিক আয়তন | পাকিস্তানের মোট ভূখণ্ডের ৪৪% এলাকা। | বিশাল সীমান্ত ও আরব সাগরের কৌশলগত অবস্থান নিয়ন্ত্রণ। | বাংলাদেশের মতোই বিশাল ভৌগোলিক দূরত্ব ও বৈষম্য। |
মোট জনসংখ্যা | প্রায় ১.৫ কোটি (১৫ মিলিয়ন)। | স্বাধীনতার পক্ষে সর্বাত্মক গণজোয়ার ও সশস্ত্র অংশগ্রহণ। | ৭ কোটি বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের অবিকল রূপ। |
প্রধান খনিজ সম্পদ | সোনা, তামা, ক্রোমাইট, কয়লা, লোহা ও প্রাকৃতিক গ্যাস। | পাকিস্তানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ও গ্যাসক্ষেত্র মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে। | পূর্ব পাকিস্তানের পাট ও সম্পদ যেভাবে করাচিতে লুট হতো। |
অর্থনৈতিক বণ্টন (ডুডার প্রজেক্ট) | ১০% লাভ পায় বেলুচিস্তান, ৯০% লুট করে চীন ও পাকিস্তান। | স্থানীয় জনগণকে চরম দারিদ্র্যের (৪১%) মধ্যে ঠেলে দেওয়া। | তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য। |
সশস্ত্র প্রতিরোধ জোট | BLA, BRA, BLF, UBA সহ মোট ১২টি সংগঠনের ঐক্য। | সিন্ধু ও পশতুন বিদ্রোহীদের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে চতুর্মুখী আক্রমণ। | ১৯৭১ সালের ‘মুক্তিবাহিনী’ ও ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা যুদ্ধকৌশল। |
চূড়ান্ত লক্ষ্য ও প্রতীক | ৯৩,০০০ অস্ত্রের আহ্বান ও শেখ মুজিবের আদর্শ। | স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি অর্জন। | ৯৩,০০০ পাকিস্তানি সেনার আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্ম। |
'কিল অ্যান্ড ডাম্প' পলিসি ও বলপূর্বক গুম
বেলুচিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটি হলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘কিল অ্যান্ড ডাম্প’ (Kill and Dump) নীতি। গত দুই দশক ধরে এই অমানবিক প্রক্রিয়াটি চলছে।
সংগঠিত গুম (Enforced Disappearances): বালুচ ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক বা কবি যারা সামান্যতম অধিকারের কথা বলেন, তাদের পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) এবং আধাসামরিক বাহিনী ফ্রন্টিয়ার কোপস (FC) তুলে নিয়ে যায়। বছরের পর বছর তাদের কোনো খোঁজ মেলে না।
মামা কদীরের ঐতিহাসিক লং মার্চ: মাহরাং বালুচের বহু আগে, ২০১৩-২০১৪ সালে ‘ভয়েস ফর বালুচ মিসিং পারসন্স’ (VBMP)-এর প্রতিষ্ঠাতা মামা কদীর (যাঁর নিজের ছেলকেও গুম করে হত্যা করা হয়েছিল) নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে কোয়েটা থেকে করাচি হয়ে ইসলামাবাদ পর্যন্ত প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে এক ঐতিহাসিক লং মার্চ করেছিলেন।
মজিদ ব্রিগেড (Majeed Brigade) ও গেরিলা যুদ্ধকৌশলের বিবর্তন
বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (BLA)-এর একটি অত্যন্ত এলিট এবং আত্মঘাতী উইং হলো ‘মজিদ ব্রিগেড’। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হামলায় নিহত বালুচ যোদ্ধা মজিদ ল্যাঙ্গোভের নামে এই ব্রিগেডের নামকরণ করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের যুদ্ধকৌশলে এক আমূল ও ভয়ংকর পরিবর্তন এসেছে।
নারী ফিদায়ী বা আত্মঘাতী হামলাকারীদের উত্থান
বেলুচ আন্দোলনে ঐতিহাসিকভাবে নারীরা কখনো আত্মঘাতী হামলায় অংশ নেননি। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চরম নির্যাতন বালুচ নারীদের মনস্তত্ত্ব বদলে দিয়েছে।
শারি বালুচ (২০২২): করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটে চীনা শিক্ষকদের লক্ষ্য করে প্রথম আত্মঘাতী হামলা চালান শারি বালুচ নামের এক বালুচ নারী। বিস্ময়কর বিষয় হলো, শারি কোনো অশিক্ষিত বা ব্রেনওয়াশড তরুণী ছিলেন না; তিনি ছিলেন দুই সন্তানের জননী, পেশায় শিক্ষিকা এবং প্রাণিবিদ্যায় এমফিল ডিগ্রিধারী।
সুমাইয়া বালুচ (২০২৩) ও অন্যান্য: এরপর সুমাইয়া বালুচসহ আরও বেশ কয়েকজন উচ্চশিক্ষিত নারী এই আত্মঘাতী স্কোয়াডে যোগ দেন। এটি প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর ওপর বালুচদের ক্ষোভ কতটা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাদের উচ্চশিক্ষিত নারীরাও আত্মঘাতী হতে কুণ্ঠাবোধ করছেন না।
দ্বিমুখী বেলুচিস্তান: ইরান-বেলুচ সীমান্ত সমীকরণ
বেলুচিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত জটিল। বালুচ জাতি কেবল পাকিস্তানেই বাস করে না; তাদের ভূখণ্ডটি মূলত তিনটি দেশে বিভক্ত পাকিস্তান (বলুচিস্তান প্রদেশ), ইরান (সিস্তান ও বেলুচেস্তান প্রদেশ) এবং আফগানিস্তানের কিছু অংশ।
ইরানের ভেতরের প্রতিরোধ: ইরানের শিয়া শাসিত সরকারের অধীনে সুন্নি বালুচরাও তীব্র বৈষম্যের শিকার। সেখানে ‘জৈশ আল-আদল’ (Jaish al-Adl) নামক একটি বালুচ সুন্নি সশস্ত্র গোষ্ঠী ইরানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
২০২৪-এর ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধ: ২০২৪ সালের শুরুতে ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে যে নাটকীয় ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময় হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই বেলুচিস্তান। ইরান পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বালুচ বিদ্রোহীদের ঘাঁটিতে আঘাত হানে এবং পাল্টা জবাবে পাকিস্তানও ইরানের ভেতরে থাকা বালুচ স্বাধীনতাকামীদের ওপর হামলা চালায়। অর্থাৎ, দুই প্রতিবেশী দেশই বালুচদের সাধারণ শত্রু হিসেবে গণ্য করে, যা বালুচদের লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা
আপনার আবেগ ও উদ্দীপনা অত্যন্ত যৌক্তিক এবং পাকিস্তানের চরম অত্যাচার ও গণহত্যার ইতিহাস দিবালোকের মতো সত্য। তবে একজন সচেতন বিশ্লেষক হিসেবে বিশ্বরাজনীতির বর্তমান সমীকরণ ও বাস্তব মানচিত্রের অবস্থানটি আমাদের সরাসরি এবং পরিষ্কারভাবে বোঝা প্রয়োজন:
স্বীকৃতির বাস্তবতা: বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (BLA) বা মীর ইয়ার বালুচদের মতো প্রবাসে থাকা নেতারা স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেও এবং পাকিস্তানের প্রায় ৭৫% গ্রামীণ ও পাহাড়ি অঞ্চলে তাদের শক্তিশালী গোপন নিয়ন্ত্রণ থাকলেও আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের নথিতে বেলুচিস্তান এখনো অফিশিয়ালি পৃথিবীর ১৯৬-তম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি।
পরাশক্তিদের নীরবতা: বিশ্ব রাজনীতির এক নিষ্ঠুর সত্য হলো, কোনো দেশই নৈতিকতার ভিত্তিতে স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয় না, দেয় নিজেদের স্বার্থে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ভারত পাকিস্তানের বেলুচ নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র সমালোচনা করলেও, চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ (CPEC) এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক বোমার কারণে বিশ্ব সম্প্রদায় এখনো সরাসরি বেলুচিস্তানের ভৌগোলিক স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধাবোধ করছে। তবে মাঠপর্যায়ে পাকিস্তানের প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ যেভাবে প্রতিদিন ভেঙে পড়ছে, তাতে দেশটির ভবিষ্যৎ যে ১৯৭১ সালের মতোই খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার দিকে যাচ্ছে—তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
বেলুচ প্রতিরোধের কৌশলগত রূপান্তর
যুগ / সময়কাল | প্রতিরোধের ধরন | মূল নেতৃত্ব / চালিকাশক্তি | মূল লক্ষ্য ও কৌশল |
১৯৪৮ - ১৯৭0 এর দশক | গোত্রভিত্তিক ও প্রথাগত লড়াই। | নওয়াব আকবর বুগতি, মীর হাজার খান। | পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে প্রথাগত পদ্ধতিতে পাকিস্তানি চ্যারাভানের ওপর হামলা। |
২০০০ - ২০১০ এর দশক | আধুনিক গেরিলা যুদ্ধ ও রাজনৈতিক লং মার্চ। | বালুচ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন (BSO), মামা কদীর। | গুমের বিরুদ্ধে নাগরিক আন্দোলন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ফাঁড়িতে আক্রমণ। |
২০২০ - ২০২৬ (বর্তমান) | হাইব্রিড যুদ্ধ, আত্মঘাতী স্কোয়াড ও আন্তর্জাতিক লবিং। | ড. মাহরাং বালুচ, মীর ইয়ার বালুচ, বিএলএ মজিদ ব্রিগেড। | চীনা নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা, প্রবাসে সরকার গঠনের চেষ্টা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্ব জনমত গঠন। |
বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে যে ঐতিহাসিক সত্যটি প্রমাণ করেছিলেন তা হলো, কোনো জাতিকে শোষণ ও বন্দুকের জোরে অনন্তকাল গোলাম বানিয়ে রাখা যায় না। বেলুচিস্তানের দেড় কোটি মানুষ আজ যে ‘শেখ মুজিবের পথ’ অনুসরণের স্লোগান দিচ্ছে, তা কেবল কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি হলো শৃঙ্খলমুক্তির এক চিরন্তন ফর্মুলা।
রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়, স্বাধীন হবেই বেলুচিস্তান
ইতিহাসের শিক্ষা হলো, কোনো জাতিকে চিরকাল দাস বানিয়ে রাখা যায় না। রক্তের বন্যায় শেষ পর্যন্ত সমস্ত অন্যায় ও জুলুম ভেসে যেতে বাধ্য। আজ থেকে ৫৪ বছর আগে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাঙালি জাতি যেভাবে পাকিস্তানি হায়েনাদের কবল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছিল, বেলুচিস্তানও আজ ঠিক সেই মুক্তির দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
পাকিস্তানের শোষক শ্রেণী যতই নির্যাতন করুক, চীন যতই তাদের আধুনিক অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করুক দেড় কোটি বালুচ জনতার ইস্পাতকঠিন ইচ্ছাশক্তির সামনে তাদের পরাজয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। পাকিস্তানের এই চূড়ান্ত পতন ও বেলুচিস্তানের উদয় দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন ভোরের সূচনা করবে। আজ নয়তো কাল, পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম বেলুচিস্তানের উদয় হবেই এটিই ইতিহাসের অমোঘ ও ধ্রুব সত্য।















