শেখ মুজিবকে নিয়ে কিছু গুজব ও মিথ্যাচারের জবাব
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানো হয়েছে। ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডির পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বিরোধী শক্তি, বিশেষত জামায়াতে ইসলামী, আল-বদর ইসলামী ছাত্রসংঘ (বর্তমান ইসলামী ছাত্রশিবির) এবং তাদের দোসররা হাজারো গুজব ও বিকৃত গল্প ছড়িয়েছে।

TruthBangla
Aug 1, 2025
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কোনো নেতা নেই, যিনি তাঁর জীবন ও মৃত্যুর পর এত তীব্র, নির্লজ্জ ও সুসংগঠিত মিথ্যাচারের শিকার হয়েছেন, যেমনটি হয়েছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানো হয়েছে। ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডির পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বিরোধী শক্তি, বিশেষত জামায়াতে ইসলামী, আল-বদর ইসলামী ছাত্রসংঘ (বর্তমান ইসলামী ছাত্রশিবির) এবং তাদের দোসররা হাজারো গুজব ও বিকৃত গল্প ছড়িয়েছে। বিশেষত, তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং ব্যক্তিগত জীবনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চলে আসছে।
মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনে বড় হওয়া প্রজন্ম হিসেবে আমাদের কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একজন নেতা নন, তিনি একটি জাতির আত্মপরিচয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও কিছু মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁকে বিতর্কিত করার জন্য নির্লজ্জভাবে মিথ্যাচার করে চলেছে। আমাদের মতো নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব হলো, এই রাজনৈতিক অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সঠিক তথ্য ও ইতিহাস দিয়ে জবাব দেওয়া। এই প্রবন্ধটি ঐতিহাসিক দলিল, আন্তর্জাতিক তথ্য এবং প্রামাণিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রধান কয়েকটি অভিযোগের অকাট্য জবাব দেবে।
এসব গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ায় কারা?
বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির কাজে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী সশস্ত্র সংগঠনগুলো যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের সাথে মিলে সশস্ত্র যুদ্ধ, গণহত্যা, লুটপাট ও ধর্ষণে জড়িত ছিল। স্বাধীনতার এত বছর পরেও তারা এখনো পাকিস্তানের প্রতি এখনো বিশ্বস্ত অনুসারীর প্রমাণ দিয়ে আসছে।
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ: একাত্তরে যারা প্রকাশ্যে ও সশস্ত্রভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা করেছিল।
আল-বদর / ইসলামী ছাত্রশিবির: জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের (বর্তমান ইসলামী ছাত্রশিবির) ক্যাডাররাই মূলত আল-বদর ও আল-শামস নামে ঘাতক বাহিনী গঠন করেছিল। এরা বিজয়ের প্রাক্কালে দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় নেতৃত্ব দেয়। স্বাধীনতার পরও এরা আদর্শগতভাবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী।
পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা (ISI)-এর মদদপুষ্ট এক্টিভিটিস্ট: বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে দুর্বল করতে পাকিস্তানপন্থী কিছু গোষ্ঠী ও সামরিক-বেসামরিক চক্র তথা এক্টিভিটিস্ট এখনো সক্রিয়।
অস্থিরতা সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক পক্ষ (বিশেষত এককালের জাসদ ও কিছু বামপন্থী অংশ): যদিও এরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই ছিল, কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টায় লিপ্ত হয়ে এরাও সরকার এবং বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে নানা ধরনের অতিরঞ্জিত ও উস্কানিমূলক তথ্য ছড়িয়েছিল।
সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট: বর্তমান সময়ে এই মিথ্যাচারগুলো ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম হলো সোশ্যাল মিডিয়া। বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত কিছু অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপ অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে এই গুজবগুলো উৎপাদন ও প্রচার করে।
এসব গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানোর প্রধান উদ্দেশ্য কী?
এই গুজব ও মিথ্যাচারগুলো ছড়ানোর পেছনে একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও আদর্শিক উদ্দেশ্য রয়েছে। এই উদ্দেশ্যগুলো বহুস্তরিক। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধ্বংস করাই অপপ্রচারকারীদের প্রধানতম লক্ষ্য। মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করতে হলে এর মূল নেতা এবং এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে আঘাত করতে হবে।
বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করা: শেখ মুজিবকে ব্যর্থ, দুর্বল, দুর্নীতিপরায়ণ বা স্বৈরাচারী প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়। এর মাধ্যমে জাতির কাছে স্বাধীনতার স্থপতির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা: যদি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ভুল বা দুর্বল প্রমাণ করা যায়, তবে পুরো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। যেমন, ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো, গণহত্যার ভয়াবহতা লঘু করে মুক্তিযুদ্ধের ন্যায্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।
ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে আঘাত: মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ। এই গুজবগুলো ছড়িয়ে তারা দেশের মানুষকে আদর্শিকভাবে বিভক্ত করতে চায়।
ইতিহাসের দায় লঘু করা: একাত্তরের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য জামায়াত ও তাদের সহযোগী রাজাকাররা দায়ী। বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করার মাধ্যমে তারা নিজেদের ঐতিহাসিক অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পেতে চায়।
পাকিস্তান প্রীতি জাগিয়ে তোলা: পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে পুনরায় পাকিস্তানপন্থী আদর্শ বা ধর্মীয় উগ্রবাদের বিস্তার ঘটাতে চায়।
ক্ষমতা দখলের পথ তৈরি: বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে শুরু হওয়া সামরিক শাসন ও পাকিস্তানপন্থীদের রাজনৈতিক উত্থান মূলত এই মিথ্যাচারের ওপর ভর করেই টিকে ছিল। গুজব ছড়িয়ে জনগণের মধ্যে অস্থিরতা ও অনাস্থা সৃষ্টি করে ক্ষমতা দখলের পথ সুগম করাই ছিল তাদের কৌশল।
তারুণ্যের বিভ্রান্তি: নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে তাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা থেকে দূরে সরিয়ে আনা হয়। এতে তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে।
মিথ্যাচার #১ - শেখ মুজিব কি পাকিস্তান বিরোধী ছিলেন না?
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা প্রায়শই প্রচার করে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আসলে স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন না, তিনি নাকি বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে চাননি। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তারা তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতাকে অস্বীকার করতে চায়।
বিচ্ছিন্নতাবাদী তকমা: পাকিস্তান সরকার প্রথম থেকেই শেখ মুজিবকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বানানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে। বিভিন্ন বিদেশী সংবাদমাধ্যম তাঁকে বারবার জিজ্ঞাসা করত, তিনি কি পাকিস্তানের অখণ্ডতা চান, নাকি বিচ্ছিন্নতা?
রাজনৈতিক প্রজ্ঞা: বঙ্গবন্ধু কখনোই নিজেকে সরাসরি বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে ঘোষণা করেননি, কারণ তিনি জানতেন, সরাসরি ঘোষণা দিলে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়াই সামরিক আক্রমণ শুরু করে দিতে পারত। তিনি সবসময় বাঙালির অধিকার, স্বায়ত্তশাসন এবং বৈষম্য দূর করার কথা বলতেন। তাঁর কৌশল ছিল জনগণের ম্যান্ডেটকে ভিত্তি করে ধাপে ধাপে স্বাধীনতা অর্জন করা।
৭ মার্চের জবাব: এই চক্রান্তের চূড়ান্ত জবাব তিনি দেন তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে। পাকিস্তান সরকারের সাথে আলোচনা শেষে, বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে স্পষ্ট করেই বলেছিলেন:
"তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো... রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, তবুও এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম!" এই ভাষণই প্রমাণ করে, তিনি কেবল পাকিস্তান বিরোধী ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্বাধীনতার মহানায়ক। যারা তাঁর এই বক্তব্যকে মিসইউজ করে, তারা ইতিহাসের প্রেক্ষাপটকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে।
মিথ্যাচার #২ - মুক্তিযুদ্ধের পর তাজউদ্দীন বা ভাসানী কেন প্রেসিডেন্ট হলেন না?
মুক্তিযুদ্ধের পরে কেন মাওলানা ভাসানী বা তাজউদ্দীন আহমদ প্রেসিডেন্ট না হয়ে শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট হলেন এই প্রশ্নটিও প্রায়শই বিভ্রান্তি ছড়াতে ব্যবহৃত হয়।
তাজউদ্দীনের অবস্থান: তাজউদ্দীন আহমদ নিজেই মুজিবের অধীনস্থ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে গঠিত মুজিবনগর সরকার-এর সাংবিধানিক কাঠামোতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়েছিল। তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা: শেখ মুজিব ছিলেন ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের নির্বাচিত সংসদীয় নেতা। গণতান্ত্রিক দেশের অংশ হিসেবে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে ফিরে এসে তিনি সংসদীয় পদ্ধতির সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
ভাসানীর অবস্থান: মাওলানা ভাসানী অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় নেতা হলেও, তিনি সরাসরি আওয়ামী লীগের মূল নেতৃত্বের অংশ ছিলেন না। স্বাধীনতার প্রশ্নে মাওলানা ভাসানী সবসময়ই শেখ মুজিবকে প্রধান নেতা হিসেবে সমর্থন দিয়েছেন।
সুতরাং, স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবের প্রেসিডেন্ট হওয়া বা পরে প্রধানমন্ত্রী হওয়া ছিল গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং মুজিবনগর সরকারের কাঠামোরই ফল, যা তাজউদ্দীন আহমদসহ অন্যান্য জাতীয় নেতারা নিজেরাই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
৪. মিথ্যাচার #৩ - পাকিস্তানি অস্ত্র কেন ভারত নিয়ে গেল, বাংলাদেশে থাকল না?
অনেকে অভিযোগ করে যে, মুক্তিযুদ্ধের পরে পাকিস্তান আর্মির সব অস্ত্র গোলাবারুদ কেন ভারতীয় আর্মি নিয়ে গেল এবং কেন সেগুলো বাংলাদেশে থেকে গেল না। এই অভিযোগের মাধ্যমে ভারতীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করা হয়।
আত্মসমর্পণের নিয়ম: ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়মে ভারতীয় বাহিনীর কাছে "আত্মসমর্পণ" করে। ফলস্বরূপ, আত্মসমর্পণকারী বাহিনীর অস্ত্র ও গোলাবারুদের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে চলে যায়।
নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা: বাংলাদেশ তখন সদ্য স্বাধীন, অস্থির অবস্থা বিরাজমান। দেশে কোনো স্থায়ী সেনা বা আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এত বিপুল অস্ত্র (লক্ষ লক্ষ সামরিক অস্ত্র) রেখে দিলে দেশে বড় ধরনের গৃহযুদ্ধ, দাঙ্গা বা দুষ্কৃতকারীদের হাতে চলে যাওয়ার চরম আশঙ্কা ছিল।
জাসদের উদাহরণ: ১৯৭২ সালে জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) এই দেশে চরম আকারের বিশৃঙ্খলা শুরু করে ক্ষমতা দখলের জন্য। যদি সেই সময়ে পাকিস্তান আর্মির বিপুল অস্ত্র জাসদের গণবাহিনী বা অন্যান্য দুষ্কৃতকারীদের হাতে যেত, তবে দেশে আরেকটি গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হতো।
পরবর্তীতে ভারত ও অন্যান্য বন্ধুরাষ্ট্রের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গড়ে ওঠে। অস্ত্রগুলো হস্তান্তরের এই সিদ্ধান্ত ছিল সেই সময়ের সদ্য স্বাধীন দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য গৃহীত একটি অপরিহার্য সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
মিথ্যাচার #৪ - ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের জন্য কি শেখ মুজিব দায়ী?
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষকে পুঁজি করে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অপপ্রচার চালানো হয়। তাঁকে এই দুর্ভিক্ষের জন্য সরাসরি দায়ী করা হয়, যা নির্লজ্জ মিথ্যাচার।
ইতিহাসবিদরা এবং অর্থনীতিবিদরা প্রমাণ করেছেন, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের মূল কারণ ছিল বহুমাত্রিক এবং এর পেছনে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রও ছিল:
যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি: মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের কৃষি, অবকাঠামো, পরিবহন এবং পুরো অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়। পাকিস্তান সামরিক জান্তা পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাংকগুলো থেকে সমস্ত টাকা ও রিজার্ভ পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ: জুলাই-আগস্টে ভয়াবহ বন্যায় দেশের ধানক্ষেত ও খাদ্য মজুদ নষ্ট হয়ে যায়, যা খাদ্য উৎপাদনকে তীব্রভাবে কমিয়ে দেয়।
আমেরিকার ষড়যন্ত্র (PL-480): মুক্তিযুদ্ধে ভারত ও সোভিয়েত সরকার সহযোগিতা করায় আমেরিকা ক্ষুব্ধ হয়। এর প্রতিশোধ হিসেবে তারা PL-480 খাদ্য সহায়তা (যা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল) বন্ধ করে দেয়।
কিসিঞ্জারের ষড়যন্ত্র: বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে যোগদান করলেও, পাকিস্তানের অনুরোধে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তা আটকে রাখেন। কিসিঞ্জার ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের প্রতি বিদ্বেষী ছিলেন এবং এটিকে 'বটমলেস বাস্কেট' বলে উপহাস করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের নীতি: সৌদি সরকার পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করায় বাংলাদেশ সঙ্গে সঙ্গে জাতিসংঘে যোগ দিতে পারেনি। শেখ মুজিব যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন সৌদি আরবের শ্রমবাজার বন্ধ ছিল, ফলে বৈদেশিক মুদ্রা থেকেও বাংলাদেশ বঞ্চিত ছিল।
ইতিহাসবিদরা মনে করেন, শেখ মুজিব এই দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী নন, কারণ তিনি তখন বিভিন্ন দেশের কাছে তাঁর দেশকে সহায়তা করতে অনুরোধ করেছিলেন। তবে, এতগুলো আন্তর্জাতিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নিয়ন্ত্রণে তাঁর সরকার ব্যর্থ ছিলো এই সমালোচনা অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু তাঁকে সরাসরি 'দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিকারী' হিসেবে দায়ী করা সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার।
মিথ্যাচার #৫ - দুর্ভিক্ষের মধ্যে কি মুজিব তাঁর ছেলেদের বিয়ে দিয়েছিলেন?
এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জনপ্রিয় মিথ্যাচার, যা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় মুজিবপুত্রের বিয়ের গল্পকে কেন্দ্র করে ছড়ানো হয়।
ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া এই দাবিটি সম্পূর্ণ গুজব ও মিথ্যাচার, যা ঐতিহাসিক সময়রেখা দিয়ে সহজেই debunk করা যায়:
দুর্ভিক্ষের সময়কাল: নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এবং অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান-এর লেখা এবং বাংলাপিডিয়ার নিবন্ধ অনুযায়ী, ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছিল মার্চ মাসে এবং অক্টোবর-নভেম্বর মাসের দিকে স্বাভাবিক হওয়া শুরু করেছিল আমন ধান কাটার মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকে। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসের পর দুর্ভিক্ষ-সংক্রান্ত কোনো খবর পত্র-পত্রিকায় পাওয়া যায়নি।
বিয়ের তারিখ: শেখ কামাল ও শেখ জামালের বিয়ে ও তার অনুষ্ঠান হয় ১৯৭৫ সালের ১৭ই জুলাই।
ভুয়া দাবি: সুতরাং, ১৯৭৪ সালের মর্মান্তিক দুর্ভিক্ষের সময়কাল পার হয়ে যাওয়ার প্রায় ৮ মাস পরে এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। ফেসবুকের পোস্টগুলোতে '১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের মধ্যে মুজিবপুত্রের বিয়ে' হয়েছিল এই দাবিটি নির্লজ্জ মিথ্যাচার। (সূত্র: Fact Watch, বাংলাপিডিয়া)
গুজব #৬ - জাসদের ৩০ হাজার নেতাকর্মীকে কি শেখ মুজিব খুন করেছিলেন?
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জাসদ এবং তার সশস্ত্র শাখা গণবাহিনীর সঙ্গে তৎকালীন সরকারের সংঘাতকে কেন্দ্র করে এই অতিরঞ্জিত অভিযোগটি ছড়ানো হয়।
সংঘাতের প্রেক্ষাপট: জাসদ সশস্ত্র শাখা গণবাহিনী গঠন করে, যা সরকারবিরোধী তীব্র আন্দোলন এবং অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। এই গণবাহিনী আওয়ামী লীগ সদস্য এবং পুলিশের ওপর হামলা চালাত। এর জবাবে রক্ষী বাহিনীও ধরপাকড় ও দমননীতি গ্রহণ করে।
সহিংসতা: রক্ষী বাহিনী ও জাসদের গণবাহিনীর মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতা ও দমনপীড়ন ঘটেছে। ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ জাসদের একটি মিছিলে রক্ষীবাহিনীর গুলিতে ৫০ জনের বেশি জাসদ কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল।
সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক: জাসদপন্থী কিছু সূত্র দাবি করেছে যে, হাজার হাজার নেতাকর্মী নিহত হয়েছিল। কিন্তু সরাসরি শেখ মুজিবের নির্দেশে ৩০ হাজার জাসদ কর্মীকে হত্যা করেছে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য বা আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান নেই। ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকরা এই সংখ্যাটিকে রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কাজ মনে করেন।
এটি ছিল সে সময়ের সদ্য স্বাধীন দেশের চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ফল, যেখানে একপক্ষ সশস্ত্র বিদ্রোহে নেমেছিল এবং সরকার কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেছিল। তবে ৩০ হাজার মৃত্যুর দাবিটি প্রমাণবিহীন।
গুজব #৭ - মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে শেখ মুজিব কি পাকিস্তান সরকার থেকে বেতন ভাতা পেতেন?
একটি বহুল প্রচলিত অপপ্রচার হলো, বঙ্গবন্ধু নাকি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে নয় মাস পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে বেতন-ভাতা পেতেন। এর সোজা উত্তর হলো, না, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সরকার থেকে কোনো বেতন-ভাতা পাননি। তবে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আমলে বিভিন্ন সরকারি ও রাজনৈতিক পদে তথা মন্ত্রী বা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমপিএ) থাকার কারণে পাকিস্তান সরকার থেকে বেতন-ভাতা পেতেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট' শুরু করে, ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে যান।
গ্রেফতার ও কারাবাস: গ্রেফতারের পর শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রথমে ঢাকায় রাখা হলেও পরবর্তীতে দ্রুতই তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মিয়ানওয়ালি কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। পুরো নয় মাস ধরে যখন তাঁর নামে এবং তাঁর নির্দেশনায় বাংলাদেশে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ চলছে, তখন তিনি ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের একটি নির্জন কারাগারে, যেখানে তাঁর ওপর মৃত্যুদণ্ডের খড়গ ঝুলছিল।
বেতন-ভাতার প্রশ্ন: যেহেতু তিনি একটি শত্রু রাষ্ট্রের কারাগারে বন্দি ছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা চলছিল, তাই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের বেতন বা ভাতা পাওয়ার প্রশ্নই আসে না। একজন বন্দি নেতা, যাঁর দল স্বাধীনতা যুদ্ধে লিপ্ত, তাঁর প্রতি শত্রুপক্ষের বেতন-ভাতা প্রদান করা কেবল অযৌক্তিকই নয়, সামরিক এবং প্রশাসনিক দিক থেকেও তা অসম্ভব।
গুজব ও মিথ্যাচারের শিকার পরিবার: বঙ্গবন্ধুর বেতন পাওয়ার বিষয়টি যেমন অসম্ভব ছিল, তেমনি তাঁর পরিবারকে ঘিরেও কিছু সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ছড়ানো হয়, যা মূলত গুজব ও মিথ্যাচার। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যরা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, শেখ হাসিনা, শেখ জামাল, শেখ রেহানা, শেখ রাসেল এবং অন্যদের ঢাকায় ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে গৃহবন্দি ছিলেন। তাঁরা নিরাপত্তা ও খাদ্য সংকটে দিন কাটিয়েছেন, তবে পাকিস্তানের সেনাসদস্যরা তাঁদের পাহারা দিত।
ভাতার অভিযোগের গুজব: স্বাধীনতা-বিরোধীরা অভিযোগ করে যে, পাকিস্তান সরকার বন্দি থাকা সত্ত্বেও তাঁর পরিবারের সদস্যদের কিছু সুযোগ-সুবিধা, যেমন মাসিক ভাতা, প্রদান করেছিল। এই ধরনের ভাতার অভিযোগের সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি বা ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। পরিবার বন্দি থাকাকালীন জীবনধারণের জন্য খাদ্য ও সীমিত নিরাপত্তা সরবরাহ করা হলেও, তা কখনোই 'বেতন-ভাতা' বা 'সুবিধা' হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে শেখ মুজিবের আয়-উৎস: মুক্তিযুদ্ধকালীন বেতন না পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হলেও, এই গুজব রটনাকারীরা প্রায়শই মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে বঙ্গবন্ধুর আয়ের উৎস নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। তাদের উদ্দেশ্য হলো, একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাঁর সরকারি বেতন-ভাতা পাওয়ার বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করা। এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আমলের বিভিন্ন সময়ে সরকারি ও রাজনৈতিক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা এবং প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমপিএ/এমএনএ) ছিলেন। এসব পদে থাকার কারণে তিনি সরকারি বেতন-ভাতা পেতেন। যেমন, প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে অন্যান্য সদস্যদের মতো তিনিও নির্ধারিত বেতন গ্রহণ করতেন। তবে এই বেতন-ভাতা তাঁর আয়ের একমাত্র বা প্রধান উৎস ছিল না।
তাঁর ব্যক্তিগত আয় আসত ব্যবসা, কৃষিখাত (পিতা শেখ লুৎফর রহমানের পৈতৃক সম্পত্তি) এবং রাজনৈতিক অনুদান থেকেও। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জীবনের এক দীর্ঘ অংশ কারাগারে কাটিয়েছেন। ১৯৬৮ সালের 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা'সহ বিভিন্ন সময়ে তিনি দীর্ঘ কারাবাস করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই, যখন তিনি কারারুদ্ধ থাকতেন, তখন সরকারি বেতন-ভাতা বন্ধ থাকত।
ইতিহাস রক্ষায় তথ্যভিত্তিক প্রতিরোধ
বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ছড়ানো এসব গুজব ও মিথ্যাচারগুলো কেবল রাজনৈতিক বিদ্বেষের ফসল নয়, বরং এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার আদর্শের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ।
আমাদের বাপ-দাদাদের কাছ থেকে শোনা মুক্তিযুদ্ধের গল্প এবং ঐতিহাসিক দলিলগুলোর ভিত্তিতে এই প্রজন্মের দায়িত্ব হলো, এই মিথ্যাচারগুলোকে তথ্য ও যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা। শেখ মুজিব ছিলেন বিচ্ছিন্নতাবাদী নন, আপোষহীন স্বাধীনতার নেতা। তাজউদ্দীন তাঁকে প্রেসিডেন্ট বানিয়েছিলেন। পাকিস্তানি অস্ত্র দেশের নিরাপত্তার জন্য ভারত নিয়ে গিয়েছিল। দুর্ভিক্ষের মূল কারণ ছিল বন্যা ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, তাঁর ছেলের বিয়ে হয়েছিল দুর্ভিক্ষের অনেক পরে। এবং ৩০ হাজার জাসদ কর্মীকে হত্যার দাবিটি চরমভাবে অতিরঞ্জিত।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের সঠিক ইতিহাসকে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই আমরা ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে পারি।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.














