আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড – ছাত্রলীগ-শিবিরের দ্বিমুখী রাজনীতি ও ছদ্মবেশী অনুপ্রবেশ
আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় ও টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত। বুয়েটের মতো দেশের সর্বোচ্চ মেধা চর্চার আঙিনায় একজন দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা কেবল পুরো দেশকে স্তব্ধই করেনি, বরং বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলোর "ট্যাগিং কালচার", রেগিংয়ের নামে মধ্যযুগীয় নির্যাতন, বিরোধী রাজনীতির ছদ্মবেশী উপস্থিতি এবং সার্বিক জাতীয় নিরাপত্তার বয়ানকে নতুন এক চরমপন্থা ও বিতর্কের মুখে দাঁড় করিয়েছিল।

TruthBangla
২০১৯ সালের ৬ই অক্টোবর মধ্যরাতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরেবাংলা হলে সংগঠিত আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় ও টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত। বুয়েটের মতো দেশের সর্বোচ্চ মেধা চর্চার আঙিনায় একজন দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা কেবল পুরো দেশকে স্তব্ধই করেনি, বরং বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলোর "ট্যাগিং কালচার", র্যাগিংয়ের নামে মধ্যযুগীয় নির্যাতন, বিরোধী রাজনীতির ছদ্মবেশী গুপ্ত উপস্থিতি এবং সার্বিক জাতীয় নিরাপত্তার বয়ানকে নতুন এক চরমপন্থা ও বিতর্কের মুখে দাঁড় করিয়েছিল।
ঘটনার পর থেকে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এই ট্র্যাজেডিকে কেন্দ্র করে একাধিক রাজনৈতিক আখ্যান ও বিতর্কের জন্ম হয়েছে। একদিকে ছিল ক্ষমতাসীন তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ক্যাডারভিত্তিক নির্যাতন ও ভিন্নমত দমনের বর্বর রূপ; অন্যদিকে পরবর্তীতে উঠে আসা বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর দাবি যেখানে অভিযুক্তদের কারো কারো পারিবারিক পটভূমি, মামলা পরিচালনায় জামায়াত-শিবিরপন্থী আইনজীবীর অন্তর্ভূক্তি, পরবর্তীতে ৫ই আগস্টের (২০২৪) পটপরিবর্তনের পর আসামি জেলখানা থেকে পালানো এবং বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার লাভ-ক্ষতির অংক বিশ্লেষণ করে "গুপ্ত শিবির" (Stealth Shibir) বা রাজনৈতিক ছদ্মবেশীদের প্ররোচনার তত্ত্বও রাজনীতিতে জোর আলোচনায় এসেছে।
৬-৭ই অক্টোবরের কালরাত: শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষের ঘটনা
২০১৯ সালের ৫ই অক্টোবর বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালীন সময়ে স্বাক্ষরিত কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারক (বিশেষ করে ফেনী নদীর পানি বণ্টন, মংলা বন্দর ব্যবহার ও এলপিজি গ্যাস রপ্তানি) নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কয়েকটি সমালোচনামূলক পোস্ট দেন বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল (EEE) বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদ।
৬ই অক্টোবর রাত আনুমানিক আটটার দিকে শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে আবরারকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় ২০১১ নম্বর কক্ষে।
নির্যাতনের ধরণ: কক্ষে নেওয়ার পর আবরারের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে তাঁর ফেসবুক বার্তা, মেসেঞ্জার ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের ফাইল তল্লাশি করা হয়। তাকে "শিবির কর্মী" হিসেবে অভিযুক্ত করে বুয়েট ছাত্রলীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, মুনতাসির আল জেমি সহ একদল নেতাকর্মী উপরিউপরি ক্রিকেট স্টাম্প, কাঁচের বোতল, প্লাস্টিক স্কিপিং রোপ ও চামড়ার বেল্ট দিয়ে মারধর শুরু করে।
চিকিৎসায় বিলম্ব ও মৃত্যু: দুই দফায় ২০১১ এবং ২০০৫ নম্বর কক্ষে স্থানান্তরিত করে টানা চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা নির্যাতন চালানো হয়। রাত বারোটার পর আবরারের শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। তিনি বমি করতে শুরু করেন এবং নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বলে আকুতি জানান। তা সত্ত্বেও ছাত্রলীগ কর্মীরা তাঁকে হাসপাতালে না নিয়ে হলের সিঁড়ির নিচে তোশকের ওপর ফেলে রাখে। রাত আনুমানিক তিনটার দিকে বুয়েট মেডিকেল অফিসার ড. মো. মাসুক এলাহী এসে আবরারকে মৃত ঘোষণা করেন।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট: ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ড. সোহেল মাহমুদ নিশ্চিত করেন, আবরারের দেহে অগণিত আঘাতের চিহ্ন ছিল। অমানুষিক পিটুনিতে তাঁর ত্বক ও মাংসপেশির নিচে রক্তক্ষরণ (Subcutaneous Hemorrhage) ঘটে এবং অভ্যন্তরীণ রক্ত জমাট বেঁধে মারা যান তিনি।
বিচারিক প্রক্রিয়া ও ২০২১ সালের ঐতিহাসিক রায়
আবরার হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটসহ সারা দেশের সকল সাধারণ শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে আসে। শিক্ষার্থীদের অভূতপূর্ব আন্দোলনের মুখে বুয়েট প্রশাসন ক্যাম্পাসে সব ধরনের রাজনৈতিক সংগঠন ও তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত অভিযান চালিয়ে ২৫ জন আসামির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশীট জমা দেয়।
২০২১ সালের ৮ই ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায়ে অভিযুক্ত ২৫ জন আসামির মধ্যে ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। একইসাথে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়।
সাজাপ্রাপ্ত প্রধান আসামিদের তালিকা
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত (২০ জন): মেহেদী হাসান রবিন, অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল, মোর্শেদ অমত্য ইসলাম, মুনতাসির আল জেমি, মেজবাউল ইসলাম, মেহদী হাসান রাসেল, মুহতাসিম ফুয়াদ, ইসতিয়াক আহমেদ মুন্না, আশিকুল ইসলাম বিটু, খন্দকার তাবাক্কারুল ইসলাম তানভীর, হোসেন মোহাম্মদ তোহা, মো শামীম হাসনাত, এ এস এম নাজমুস সাদাত, সামসুল আরেফিন রাফাত, মোর্শেদুজ্জামান জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মুজতবা রাফিদ, এস এম মাহমুদ সেতু এবং হোসেন মো. তোহা। (এর মধ্যে জিসান, তানিম ও রাফিদ শুরু থেকেই পলাতক ছিল)।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত (৫ জন): মুহতাসিম ফুয়াদ, অমিত সাহা, ইসতিয়াক আহমেদ মুন্না, আকাশ হোসেন এবং মোয়াজ আবু হুরায়রা।
"গুপ্ত শিবির" বা ছদ্মবেশী অনুপ্রবেশের বিতর্ক
আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর এবং বিশেষ করে বিচার প্রক্রিয়া ও পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কালীন সময়ে একটি গুরুতর রাজনৈতিক সমীকরণ ও প্রশ্ন সামনে উঠে আসে: আবরার ফাহাদের মূল খুনিরা কি কেবলই একনিষ্ঠ ছাত্রলীগ ক্যাডার ছিল, নাকি এর নেপথ্যে কাজ করছিল ছাত্রলীগের ভেতর রাজনৈতিক ছদ্মবেশে থাকা "গুপ্ত শিবির" বা ইনফিলট্রেটররা?
এই প্রশ্নের সপক্ষে ও বিপক্ষে একাধিক তথ্য, পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড, গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়।
মেহদী হাসান রবিন ও জেমির পারিবারিক পটভূমি
আবরার ফাহাদকে ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে এনে প্রথম আঘাত করা এবং পুরো নির্যাতনের প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন বুয়েট ছাত্রলীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন।
পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড: ঘটনার পর স্থানীয় পুলিশ ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে আসে, রবিনের গ্রামের বাড়ি পাবনায় তাঁর পরিবার সরাসরি জামায়াত-শিবির রাজনীতির সাথে যুক্ত। রবিনের দাদা মমতাজ উদ্দিন জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় প্রার্থী ছিলেন এবং তাঁর চাচা ইমরান আলী ইসলামী ছাত্রশিবিরের নাশকতামূলক মামলার আসামি। রবিন নিজে কলেজ জীবনে শিবিরের সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও পরবর্তীতে বুয়েটে এসে ছাত্রলীগে যোগ দেন, যাদের স্থানীয়ভাবে "নব্য লীগ" বলা হতো।
মুনতাসির আল জেমির ভূমিকা: প্রাথমিক তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, আবরারকে কক্ষে আনার পর সাধারণ চড়-থাপ্পড় বা ভয় দেখানোর উদ্দেশ্য ছিলো তাদের। র্যাগিং এর মতো হালকা থাপ্পড় টাপ্পড় দিয়ে শিবিরের এক্টিভিটি ঠেকানোই ছিল প্ল্যান। তাদের বয়ানের সাথে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা ঘটনারও মিল পাওয়া যায়। আবরার ফাহাদকে হত্যা করার কোনো উদ্দেশ্য বা মোটিভ ছিল না তাদের কারোরই।
কিন্তু তা হঠাৎ করে চরম সহিংস রূপ নেয় জেমির আকস্মিক উগ্রতায়। আবরার ফাহাদকে রুমে আনার পর কথোপকথনের এক পর্যায়ে মুনতাসির আল জেমি ও মেহেদী হাসান রবিনের আচরণ পরিবর্তন হয়ে যায়। আবরার ফাহাদকে প্রথম আঘাত করে রবিন, এবং এরপর জেমি চরম আগ্রাসীভাবে তার উপর আক্রমণ শুরু করে।
সহপাঠীদের কেউ কেউ দাবি করেন, ফোনে কারো বিশেষ নির্দেশনা পেয়ে জেমি অস্বাভাবিক আগ্রাসী হয়ে ওঠে এবং চড়-থাপ্পড় ও লাঠি পেটা শুরু করে, যা পুরো ঘটনাকে হত্যাকাণ্ডের দিকে ঠেলে দেয়।
সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, হত্যাকান্ডে সহযোগিতা কিংবা রুমের বাইরে জাস্ট দাঁড়িয়ে থাকার কারণে যেসব মেধাবী ছাত্রের মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিল, তারা এখনো জেলখানায়। কিন্তু ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে বিপুল পরিমাণ জঙ্গিবাদী ও তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসে, তখন আবরার ফাহাদের মূল হত্যাকারী মুনতাসির আল জেমি পালিয়ে গেছে! মূল হত্যাকারী জেমি পালিয়ে গেলো এবং দরজায় জাস্ট দাড়িয়ে থাকার কারণে এতগুলো ছাত্র মৃত্যুদন্ডের প্রহর গুণছে।
ছাত্রলীগের ভেতরের কাঠামোগত দুর্বলতা ও গুপ্ত কৌশল
বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্রলীগের একক আধিপত্য থাকায় অনেকেই নিজেদের পিঠ বাঁচাতে বা হলের সিট রক্ষা করতে ছাত্রলীগে ভিড়ত। এর সুযোগ নিয়ে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ছাত্রশিবিরের ক্যাডাররা কৌশলগতভাবে ছাত্রলীগের ভেতরে অনুপ্রবেশ করত।
শিবিরের লাভ-ক্ষতির অংক: বিশ্লেষকদের একটি অংশ দাবি করেন, বুয়েটে ছাত্রলীগের হাতে যদি আবরারের মতো একজন সাধারণ ও ধার্মিক শিক্ষার্থী নৃশংসভাবে খুন হয়, তবে শিবিরের দুটি বড় ধরনের কৌশলগত লাভ হয়:
গণপরিসরে "ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর শিবির ট্যাগ দিয়ে পৈশাচিক নির্যাতন চালায়" এই ন্যারেটিভ চিরতরে শক্ত ভিত পায়।
বুয়েট থেকে প্রকাশ্যে ছাত্রলীগের রাজনীতি উচ্ছেদ হয়, যার ফলে গোপনে সক্রিয় থাকা অপ্রকাশিত বা গোপন নেটওয়ার্কগুলো ফাঁকা মাঠে পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করতে পারে।
জামায়াত নেতা শিশির মনির যখন খুনীদের আইনজীবী
আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার অন্যতম চাঞ্চল্যকর দিকটি উন্মোচিত হয় উচ্চ আদালতে আপিল শুনানি ও আসামি পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনজীবী নির্বাচনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
শিশির মনিরের অবস্থান ও রাজনৈতিক পরিচয়
অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের একজন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং তিনি একসময়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের উচ্চপর্যায়ের রাজনীতির সাথে (সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা) যুক্ত ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাসহ দলটির অসংখ্য নেতাকর্মীর আইনি লড়াইতে তিনি প্রধান আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা তথাকথিত "ছাত্রলীগ" নেতাকর্মীদের (বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুনতাসির আল জেমিসহ কয়েকজনের) পক্ষে যখন অ্যাডভোকেট শিশির মনির আইনি লড়াইয়ে নামেন, তখন দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে।
প্রশ্ন ও সংশয়
১. রাজনৈতিক বৈপরীত্য: যে ছাত্রলীগকে জামায়াত-শিবির তাদের চিরশত্রু মনে করে, সেই ছাত্রলীগের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্যাডারদের বাঁচাতে কেন একজন চিহ্নিত জামায়াত-শিবিরপন্থী শীর্ষ আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টে লড়াই করবেন?
২. রেজিস্টার্ড ক্যাডার বিতর্ক: সমালোচকদের দাবি, জামায়াত-শিবিরপন্থী আইনজীবীরা সাধারণত তাদের নিজস্ব আদর্শের রিক্রুট বা রেজিস্টার্ড কর্মী ছাড়া অন্য কোনো সাধারণ ছাত্রলীগ কর্মীর মার্ডার কেসে লড়েন না। ফলে এটি আরও দৃঢ় রূপ নেয় যে জেমিসহ কয়েকজন অভিযুক্ত প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক ছদ্মবেশে থাকা শিবিরের লোক ছিল।
৩. পরিবারের কষ্ট: আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, "আমার ছেলের খুনিদের বাঁচাতে যখন জামায়াত নেতা শিশির মনির আদালতে দাঁড়ান, তা আমাদের পরিবারের জন্য চরম কষ্টদায়ক ও হতাশাজনক।"
তিনি আরো বলেন, "আমার ছেলেকে কোনো রাজনীতির হিসাব-নিকাশের জন্য আমরা বুয়েটে পাঠাইনি। সে দেশের সম্পদ, পানি আর সার্বভৌমত্ব নিয়ে নিজের চিন্তার কথা লিখেছিল। কিন্তু যখন দেখি আমার ছেলের ঘাতকদের বাঁচাতে আদালতে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী হাই-প্রোফাইল আইনজীবীরা মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন অনেক কষ্ট লাগে। কোনো দল বা গোষ্ঠী যেন আমার সন্তানের রক্তকে নিজেদের রাজনৈতিক সাইনবোর্ড বা ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার না বানায়।"
৪. পরবর্তী পদক্ষেপ: পরবর্তীতে ২০২৫ সালে রাজনৈতিক ও সামাজিক সমালোচনার মুখে আইনজীবী শিশির মনির নিজেকে এই মামলা থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তন ও কাশিমপুর থেকে জেমি পলায়ন
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার যে সাময়িক ধস নামে, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে দেশের কারাগারগুলোতেও। বিশেষ করে গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে অগ্নিকাণ্ড ও মব জাস্টিসের সুযোগে বহু সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন আসামি পালিয়ে যায়।
জেমির জেল পলায়ন
আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুনতাসির আল জেমি ২০২৪ সালের ৬ই আগস্ট কাশিমপুর কারাগার থেকে পালিয়ে যান।
পরিবারের প্রতিক্রিয়া: আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ এ বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে প্রশ্ন তোলেন- “যেখানে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে থাকার কথা, সেখানে কীভাবে জেমি জেলখানা থেকে পালিয়ে যায়? মাসের পর মাস তাকে গ্রেপ্তার করা হয় না? রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সুরক্ষার ছাতা না থাকলে এত বড় দুর্ধর্ষ পলায়নের পর ঘাতকরা মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াতে পারত না।”
পলাতকদের বর্তমান তালিকা: আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার মোট ২৫ জন আসামির মধ্যে বর্তমানে ৪ জন আসামি পলাতক রয়েছে (মোর্শেদুজ্জামান জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মুজতবা রাফিদ এবং জেল থেকে পলাতক মুনতাসির আল জেমি)।
বুয়েটের ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়, পরিবারের মাসিক ভাতা ও রাজনৈতিক ব্যবহার
আবরার ফাহাদের ট্র্যাজেডির পর বুয়েট প্রশাসন ও বাংলাদেশ সরকার নিহতের পরিবারকে সার্বিক আর্থিক ও আইনি সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
বুয়েটের আর্থিক বরাদ্দ: বুয়েটের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা পরিচালনার জন্য এ পর্যন্ত প্রায় ৫৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া আদালতের আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে আবরারের পরিবারকে ১২ বছর ধরে প্রতি মাসে ৮২,৩০০ টাকা করে প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মোট প্রায় ২ কোটি টাকায় দাঁড়াবে।
সাইনবোর্ড রাজনীতির অভিযোগ: কিছু বিশ্লেষক এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, আবরার ফাহাদের পিতা ও পরিবারকে কোনো কোনো বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠী "সাইনবোর্ড" হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করছে। তবে আবরারের পরিবার এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, তাঁরা কেবল তাঁদের সন্তানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই রাজপথ ও আদালতে লড়াই করে যাচ্ছেন এবং কোনো নির্দিষ্ট দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন না।
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ: আবরারের বিতর্কিত পোস্টের ব্যবচ্ছেদ
আবরার ফাহাদকে হত্যার প্রাথমিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল ২০১৯ সালের ৫ই অক্টোবর দেওয়া তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কয়েকটা ফেসবুক পোস্ট। সেই পোস্টগুলোতে তিনি তৎকালীন বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
আবরারের ফেসবুক পোস্টগুলো হলো
“৪৭ এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোন সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিলো। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মোংলা বন্দর খুলে দেওয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সে মোংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।”
“কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েকবছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চাই না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড় লাখ কিউবিক মিটার পানি দিব।”
“কয়েকবছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তরভারত কয়লা-পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব..”
“কে বলে হিন্দুস্তান আমাদের কোন প্রতিদান দেয় না। এই যে ৫০০ টন ইলিশ পাওয়ামাত্র ফারাক্কা খুলে দিছে। এখন আমরা মনের সুখে পানি খাবো আর বেশি বেশি ইলিশ পালবো। ইনশাল্লাহ আগামী বছর এক্কেবারে ১০০১ টন ইলিশ পাঠাবো।”
তার হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটের শিক্ষার্থীদের অনেকেই দাবি করেন যে মূলত এসব পোস্টের কারণেই আবরার ফাহাদকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে।
এক নজরে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড
নিচে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড, বিচারিক রায়, আসামিদের পরিচয় এবং আইনি বিতর্কের একটি সংক্ষিপ্ত সুবিন্যস্ত সারণী প্রদান করা হলো:
বিষয়/বিবরণ | সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও আইনি তথ্য |
নাম ও পরিচয় | আবরার ফাহাদ (১৭ এপ্রিল ১৯৯৮ – ৭ অক্টোবর ২০১৯); ২য় বর্ষ, ইইই বিভাগ, বুয়েট। |
ঘটনার তারিখ ও স্থান | ৬-৭ই অক্টোবর ২০১৯; রুম নং ২০১১, শেরেবাংলা হল, বুয়েট। |
হত্যার প্রাথমিক কারণ | ৫ই অক্টোবর ২০১৯-এ ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিক ফেসবুক পোস্ট। |
মামলার আসামি ও রায় | মোট আসামি: ২৫ জন; রায় (৮ ডিসেম্বর ২০২১): ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৫ জনের যাবজ্জীবন। |
পলাতক আসামিসমূহ | মোর্শেদুজ্জামান জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মুজতবা রাফিদ এবং মুনতাসির আল জেমি (জেল পলাতক)। |
"গুপ্ত শিবির" বিতর্কিত চরিত্র | মেহেদী হাসান রবিন (পারিবারিক জামায়াত সম্পৃক্ততা) এবং মুনতাসির আল জেমি (উগ্র আচরণকারী)। |
আসামিপক্ষের বিতর্কিত আইনজীবী | অ্যাডভোকেট শিশিরমনির (সাবেক শিবির নেতা ও জামায়াতের আইনজীবী; পরবর্তীতে মামলা প্রত্যাহার)। |
জেমি পলায়নের তারিখ | ৬ই আগস্ট ২০২৪ (শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি জেল থেকে)। |
বুয়েটের প্রদত্ত সহায়তা | মামলা পরিচালনায় ৫৫ লাখ টাকা এবং পরিবারকে প্রতি মাসে ৮২,৩০০ টাকা ভাতা (১২ বছর মেয়াদী)। |
জাতীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব | বুয়েটে দলীয় ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধকরণ এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রধান প্রতীকে পরিণত হওয়া। |
আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড কেবল একটি একক ফৌজদারি অপরাধ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় হলের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন্ন কোনো নৃশংসতা নয়। এটি মূলত বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতন ব্যবস্থা ('গেস্টরুম' ও 'টর্চার সেল' কালচার), বাকস্বাধীনতা সংক্রান্ত সাংবিধানিক অধিকার এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক আন্দোলন পর্যন্ত বিস্তৃত এক সুদূরপ্রসারী জাতীয় অধ্যায়।
সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধারের সংগ্রাম ও তদন্তের অকাট্য আলামত
আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত নিশ্চিত করার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল শেরেবাংলা হলের করিডোরে থাকা সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরা এবং এর ফুটেজ। তবে এই ফুটেজ উদ্ধার করা মোটেও সহজ ছিল না।
পুলিশের ফুটেজ জব্দের চেষ্টা ও শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ: ৭ই অক্টোবর সকালে পুলিশ যখন শেরেবাংলা হলে আসে, তখন তারা সিসিটিভির ডিভিআর (DVR) ডিভাইসটি গোপনে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা টের পেয়ে সাড়ে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় পুলিশ প্রশাসন ও হলের প্রভোস্টকে অবরুদ্ধ করে রাখে। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল ফুটেজের একটি কপি সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি সেলকে না দেওয়া পর্যন্ত ডিভিআর ক্যাম্পাসের বাইরে নেওয়া যাবে না।
ভয়ার্ত সেই দৃশ্যচিত্র: পরবর্তীতে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাত ৩টা ১২ মিনিটের দিকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সংজ্ঞাহীন ও নিস্পন্দ আবরারকে একটি তোশকের ওপর শুইয়ে দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামিয়ে আনছে। এই ফুটেজে অনিক সরকার, মেফতাহুল ইসলাম জিওন, মোজাহিদুর রহমান ও ইফতি মোশাররফ সকালকে স্পষ্ট দেখা যায়, যা পরবর্তীতে আদালতে ডিজিটাল প্রমাণের (Digital Evidence) অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গৃহীত হয়।
১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তি: রুম ২০১১-র ভেতরের সেই পৈশাচিক ঘণ্টাগুলো
আদালতে আসামিদের দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষের ভেতরের নরকীয় পরিবেশের বিস্তারিত বিবরণ উঠে আসে। এই জবানবন্দিগুলো প্রমাণ করে যে, এটি কোনো আকস্মিক ক্ষোভের ফল ছিল না, বরং অত্যন্ত সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন ছিল।
ইশতিয়াক আহমেদ মুন্না ও অমিত সাহার ভূমিকা: অমিত সাহা সরাসরি আবরারকে মারধরে অংশ না নিলেও, তাঁর একটি ফেসবুক মেসেঞ্জার বার্তাই আবরারকে টার্গেট করার মূল সূত্রপাত ঘটায়। তিনি অন্য ক্যাডারদের মেসেঞ্জারে জিজ্ঞেস করেছিলেন "রুম ২০১১ কি খালি আছে?" এবং আবরার হলে ফিরেছে কিনা তা নিশ্চিত করেছিলেন।
অনিক সরকারের অন্ধ আক্রোশ: আসামি ইফতি মোশাররফ সকালের জবানবন্দি অনুযায়ী, রাত ১১টার পর বুয়েট ছাত্রলীগের তৎকালীন তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার মদ্যপ অবস্থায় ২০১১ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করেন। আবরার ততক্ষণে শারীরিক প্রহারে অর্ধমৃত ও বমি করছিলেন। অন্য আসামীরা মারধর কিছুটা থামুলেও, অনিক সরকার একটি সকেটের জিআই পাইপ ও ক্রিকেট স্টাম্প নিয়ে এসে একটানা ১৫-২০ মিনিট আবরারের মাথায়, হাঁটুতে ও পায়ে সজোরে আঘাত করতে থাকেন। এক পর্যায়ে স্টাম্প ভেঙে গেলে তিনি আরেকটি ক্রিকেট স্টাম্প নিয়ে এসে পুনরায় পেটানো শুরু করেন।
বুয়েটের ঐতিহ্যবাহী 'টর্চার সেল' ব্যবস্থা ও 'গেস্টরুম' কালচার
আবরার ফাহাদের ঘটনা হঠাৎ করে একদিনে ঘটেনি। এটি ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনগুলোর গড়ে তোলা 'গেস্টরুম' ও 'টর্চার সেল' ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের চরম রূপ।
নিয়মতান্ত্রিক ভয়ভীতি প্রদর্শন: বুয়েটের বিভিন্ন হলে (যেমন শেরেবাংলা হলের ২০১১ ও ২০০৫ নম্বর কক্ষ, আহসানউল্লাহ হলের ৩১৫ নম্বর কক্ষ) দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ডেকে নিয়ে "পলিটিক্যাল ম্যানার শেখানো"র নামে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হতো।
ট্যাগিং ও ব্ল্যাকমেইল পদ্ধতি: রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে থাকা বা হলে নিজস্ব সীট ধরে রাখতে না পারা সাধারণ ছাত্রদের "শিবির" বা "জঙ্গি" ট্যাগ দিয়ে নির্যাতন করা হতো, যেন নির্যাতনের শিকার ছাত্রটি ভয়ে প্রশাসন বা পরিবারের কাছে বিচার চাইতে সাহস না পায়। আবরারের ক্ষেত্রেও ঠিক একই "ট্যাগিং" কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের ১০ দফা আন্দোলন ও তৎকালীন ভিসির ভূমিকাহীনতা
আবরার ফাহাদের নৃসংশ হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও সুসংগঠিত ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা সম্পূর্ণ বর্জন করে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করেন।
ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের ভূমিকা
ঘটনার পর বুয়েটের তৎকালীন উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম প্রায় ৪০ ঘণ্টা ধরে নিরুদ্দেশ ছিলেন। তিনি নিহতের লাশ দেখতে কিংবা শিক্ষার্থীদের সামনে আসতে অস্বীকৃতি জানান। এতে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ভিসি ভবন অবরুদ্ধ করে। পরবর্তীতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে ভিসি শিক্ষার্থীদের সামনে আসেন এবং ১০ দফা দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেন। এই আন্দোলনের মুখেই বুয়েটে দলীয় রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলোর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।
অনুচ্ছেদ ৩৯ এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি পর্যালোচনার সাংবিধানিক অধিকার
আবরার ফাহাদ হত্যা মামলাটি কেবল একটি অপরাধের মামলা নয়, এটি বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের এক জ্বলন্ত উদাাহরণ।
অনুচ্ছেদ ৩৯ (চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতা): গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রতিটি নাগরিককে অবাধ চিন্তা, বিবেক এবং বাক-স্বাধীনতার গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে। আবরার ফাহাদ ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক প্রভাব নিয়ে যে গঠনমূলক সমালোচনা করেছিলেন, তা ছিল তাঁর একজন নাগরিক ও গবেষক হিসেবে সংবিধানসম্মত অধিকার।
রাষ্ট্রীয় লেবেল বনাম স্বাধীন নাগরিক চেতনা: কোনো চুক্তি বা সরকারের নীতির সমালোচনা করলেই তাকে "রাষ্ট্রদ্রোহী" বা "ভারতবিরোধী জঙ্গি" হিসেবে চিহ্নিত করার যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল, আবরার ফাহাদ ছিলেন তার অন্যতম প্রথম শহীদ।
২০২৪ সালের মার্চ-এপ্রিলের বুয়েট সংকট, 'আবরার চত্বর' ও জুলাই অভ্যুত্থান
আবরার ফাহাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বুয়েটে রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ হলেও, ২০২৪ সালের প্রথমভাগে ক্ষমতাসীন দল পুনরায় সেখানে ছাত্ররাজনীতি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়।
মার্চ ২০২৪-এর ঘটনাপ্রবাহ: ২০২৪ সালের ২৮শে মার্চ মধ্যরাতে বুয়েট ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতাদের প্রবেশকে কেন্দ্র করে পুনরায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিশাল আন্দোলন শুরু করেন। শিক্ষার্থীরা "আবরার ফাহাদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না" স্লোগান দিয়ে পুরো ক্যাম্পাস অচল করে দেন।
হাইকোর্টের রায়: পরবর্তীতে তৎকালীন হাইকোর্ট বেঞ্চ বুয়েট প্রশাসনের ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধকরণের নোটিশ স্থগিত করেন, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আবরার ফাহাদ: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আবরার ফাহাদ হয়ে ওঠেন স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান ভাবাদর্শিক চরিত্র। রাজধানী ঢাকার বুয়েট সংলগ্ন পলাশী মোড়কে আন্দোলনকারীরা আনুষ্ঠানিকভাবে 'আবরার ফাহাদ চত্বর' হিসেবে নামকরণ করে।
রাজনৈতিক অপপ্রচারের অবসান ও প্রকৃত শিক্ষা
আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে যেসব রাজনৈতিক মিথ্যাচার ও আখ্যান তৈরি করা হয়েছে তা কখনো শিবিরের অভ্যন্তরীণ বলির পাঠা, কখনো অপপ্রচারের "গুপ্ত রাজনীতি", কিংবা আসামিপক্ষের আইনজীবী পরিবর্তন তার মূল লক্ষ্য ছিল ছাত্রলীগের ভয়াবহ প্রাতিষ্ঠানিক বর্বরতাকে আড়াল করা।
প্রকৃতপক্ষে, আবরার ফাহাদ ছিলেন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সংচেতনের ছক নয়; তিনি ছিলেন নিজের দেশের সার্বভৌমত্ব, নদী ও সম্পদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার একজন নির্ভীক মেধাবী তরুণ। তাঁর এই আত্মত্যাগ কেবল বুয়েটের ইতিহাসকেই বদলে দেয়নি, বরং স্বাধীন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে আধিপত্যবাদ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এক চিরন্তন জাতীয় সংকেতে পরিণত হয়েছে।
জাতীয় মেধা, ছদ্মবেশী রাজনীতি ও অন্যায়ের ক্যানভাস
আবরার ফাহাদ হত্যা কেবল একটি একক খুনের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লালিত পৈশাচিক রাজনীতি, ক্ষমতাকেন্দ্রিক অন্ধত্ব এবং ছদ্মবেশী রাজনৈতিক অনুপ্রবেশের এক চরম প্রামাণিক দলিল।
আবরার ফাহাদ ছাত্রলীগের ক্যাডারদের হাতে সরাসরি পিটিয়ে শহীদ হলেও, এর পেছনে ছাত্রলীগের অনিয়ন্ত্রিত "ট্যাগেটিং কালচার", প্রাতিষ্ঠানিক র্যাগিং, এবং ছদ্মবেশী রাজনৈতিক উপাদানগুলোর সুক্ষ্ম উসকানি ও সুবিধা হাসিলের মনস্তত্ত্বকে অস্বীকার করা যায় না। আবরার ফাহাদকে সাইনবোর্ড বানিয়ে কোনো পক্ষ যেমন নিজেদের অপরাধ ঢাকতে চায়, ঠিক তেমনি অন্য পক্ষ তাঁকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ক্ষমতা পোক্ত করতে চায়।
সব রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, উকিল শিশির মনিরের আইনি কৌশল এবং আসামী পলায়নের চালবাজির ঊর্ধ্বে যে সত্যটি আজো অমলিন তা হলো আবরার ফাহাদ ছিলেন এক অনমনীয় দেশপ্রেমিক তরুণ, যিনি নিজ দেশের মাটি, নদী ও সম্পদ রক্ষার কথা বলতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন। বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা কিংবা রাজনীতির কলুষতা অতিক্রম করে আবরার ফাহাদের এই আত্মত্যাগ স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক চেতনা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক চিরন্তন বাতিঘর হয়ে থাকবে।















