>
>
১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থান ও মার্কিন প্রভাব - রক্তভেজা আগস্ট ও হেনরি কিসিঞ্জারের প্রতিহিংসা
১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থান ও মার্কিন প্রভাব - রক্তভেজা আগস্ট ও হেনরি কিসিঞ্জারের প্রতিহিংসা
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের রক্তঝরা ভোর ছিল স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক ও বেদনার কালো অধ্যায়। গভীর ঐতিহাসিক গবেষণা, গোপন মার্কিন নথিপত্র ডিক্লাসিফিকেশন (Declassification) এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতার পেছনের চালিকাশক্তি ছিল এক আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্ত। বিশেষ করে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের চরম ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, স্নায়ুযুদ্ধের মেরুকরণ এবং বাংলাদেশে একটি মার্কিনপন্থী সামরিক বা আধা-সামরিক জান্তা বসানোর সূক্ষ্ম নকশা এই ট্র্যাজেডির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।

TruthBangla

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের রক্তঝরা ভোর ছিল স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক ও বেদনার কালো অধ্যায়। সেদিন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর সহধর্মিণী, তিন পুত্র, দুই পুত্রবধূ, ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেল এবং নিকটাত্মীয়দেরসহ অত্যন্ত নির্মম ও পৈশাচিক উপায়ে হত্যা করা হয়েছিল। এই রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কেবল একজন রাষ্ট্রপ্রধান বা একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়নি; বরং সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশটির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সংবিধানের মৌলিক চার নীতি (জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা) এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে সমূলে বিনাশ করার এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।
দীর্ঘদিন ধরে এই হত্যাকাণ্ডকে কেবল গুটি কতক বিপথগামী সামরিক কর্মকর্তার ক্ষোভ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার ফল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু গভীর ঐতিহাসিক গবেষণা, গোপন মার্কিন নথিপত্র ডিক্লাসিফিকেশন (Declassification) এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতার পেছনের চালিকাশক্তি ছিল এক আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্ত। বিশেষ করে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের চরম ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, স্নায়ুযুদ্ধের মেরুকরণ এবং বাংলাদেশে একটি মার্কিনপন্থী সামরিক বা আধা-সামরিক জান্তা বসানোর সূক্ষ্ম নকশা এই ট্র্যাজেডির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। পরবর্তীতে খন্দকার মোশতাক আহমদ ও জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি যেভাবে আকস্মিকভাবে মার্কিন ও পাকিস্তানপন্থী বলয়ে প্রবেশ করে, তা আন্তর্জাতিক চক্রান্তের সুদূরপ্রসারীতারই অকাট্য প্রমাণ বহন করে।
একাত্তরের ব্যক্তিগত পরাজয়: কিসিঞ্জারের 'শত্রু' তালিকায় বঙ্গবন্ধুর নাম
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পেছনের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের সূত্রপাত বিশ্লেষণ করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে। ১৯৭১ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় স্নায়ুযুদ্ধের (Cold War) চরম মেরুকরণ ঘটেছিল। একদিকে ছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের অক্ষ, আর অন্যদিকে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও গণচীনকে নিয়ে গঠিত ত্রিভূজ অক্ষ।
কিসিঞ্জারের 'বেইজিং কূটনীতি' ও একাত্তরে পরাজয়ের ক্ষত
তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী) হেনরি কিসিঞ্জার চীনের কমিউনিস্ট সরকারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এক গোপন ও ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য পাকিস্তানকে সেতু বা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছিলেন। কিসিঞ্জারের প্রধান কূটনৈতিক লক্ষ্য ছিল স্নায়ুযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নকে কোণঠাসা করা।
এই চরম মুহূর্তে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ যখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নিজেদের অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই শুরু করল, তখন পাকিস্তান সামরিক জান্তার টিকে থাকা কিসিঞ্জারের কাছে অতি জরুরি হয়ে উঠেছিল। ফলে, মার্কিন জনগণ ও কংগ্রেসের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও কিসিঞ্জার ও নিক্সন প্রশাসন বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহর (Task Force 74) প্রেরণসহ পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে পূর্ণ অস্ত্র ও কূটনৈতিক সহায়তা প্রদান করেন।
কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আপসহীন নেতৃত্ব, ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ডাক এবং বাঙালি জাতির অদম্য সাহসের মুখে মার্কিন সমস্ত চক্রান্ত ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিশ্ব মানচিত্রে 'বাংলাদেশ' নামের এক নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। এই ঘটনাকে হেনরি কিসিঞ্জার কৌশলগত কূটনৈতিক পরাজয়ের চেয়েও তাঁর ব্যক্তিগত অহংকার ও 'কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব' হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
কিসিঞ্জারের 'ব্ল্যাক লিস্ট' ও রজার মরিসের বিস্ফোরক তথ্য
মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ তাঁর বিশ্বখ্যাত গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘দ্য আনফিনিশড রেভল্যুশন’ (The Unfinished Revolution)-এ হেনরি কিসিঞ্জারের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক স্টাফ অ্যাসিস্ট্যান্ট রজার মরিসের (Roger Morris) এক চাঞ্চল্যকর সাক্ষাৎকার লিপিবদ্ধ করেছেন।
রজার মরিস অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেন যে, কিসিঞ্জারের কাছে বিশ্ব রাজনীতির তালিকায় তিনজন শীর্ষপর্যায়ের আন্তর্জাতিক নেতা ছিলেন পরম ঘৃণিত ও শত্রুভাবাপন্ন:
রজার মরিস বলেছিলেন:
"কিসিঞ্জারের বিদেশি শত্রুর তালিকায় তিনজন সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি ছিলেন- চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দে, ভিয়েতনামের নেতা হো চি মিন এবং বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।" (সূত্র: দ্য আনফিনিশড রেভল্যুশন, লরেন্স লিফশুলজ, পৃষ্ঠা ১৩৭-১৩৮)
চিলির জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে ১৯৭৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-এর অর্থায়নে ও পরিকল্পনায় জেনারেল অগাস্টো পিনোচেটের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রেও কিসিঞ্জার ও তাঁর চক্র সেই একই 'চিলীয় কৌশল' (Chilean Model) বাংলাদেশে প্রয়োগ করার প্রহর গুণছিলেন।
'বাস্কেট কেস' অপপ্রচার ও কিসিঞ্জারের বাংলাদেশ সফর (১৯৭৪)
স্বাধীনতার পরপরই সদ্য স্বাধীন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে দুর্বল প্রমাণ করার জন্য কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বা 'Bottomless Basket' বলে অভিহিত করে এক কুৎসিত প্রচারণায় মেতে ওঠেন। যদিও অনেক মার্কিন ইতিহাসবিদ মনে করেন শব্দটি প্রথম অন্য এক কর্মকর্তা উচ্চারণ করেছিলেন, তবে কিসিঞ্জার এটিকে তাঁর নীতি হিসেবে গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশকে একটি 'অকার্যকর রাষ্ট্র' হিসেবে উপস্থাপন করতে থাকেন।
১৯৭৪-এর কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ ও 'খাদ্য-অস্ত্র' (Food as a Weapon)
১৯৭৪ সালে যখন বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যা ও খাদ্য সংকট দেখা দেয়, তখন কিসিঞ্জার প্রশাসন বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে ধোঁকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে জি-টু-জি (G2G) ভিত্তিতে যে খাদ্যপণ্য কেনার চুক্তি করেছিল, কিসিঞ্জারের নির্দেশে তা মাঝপথে আটকে দেওয়া হয়। অযুহাত তোলা হয় যে বাংলাদেশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কিউবায় সামান্য পরিমাণ পাট ও চটের থলে রপ্তানি করেছে!
এই 'খাদ্য-অস্ত্র' (Food Weapon) ব্যবহারের ফলে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে কৃত্রিম খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়, যার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সরকারকে জনগণের কাছে অজনপ্রিয় করার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল।
১৯৭৪ সালে কিসিঞ্জারের অশুভ ঢাকা সফর
১৯৭৪ সালের অক্টোবরে হেনরি কিসিঞ্জার কয়েক ঘণ্টার জন্য সংক্ষিপ্ত সফরে ঢাকায় আসেন। তিনি ভেবেছিলেন একাত্তরের পরাজয় এবং ১৯৭৪-এর অর্থনৈতিক সংকটের পর বঙ্গবন্ধু হয়তো তাঁর কাছে নতি স্বীকার করবেন কিংবা অনুনয়-বিনয় করবেন।
কিন্তু গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সাথে মিটিংয়ে যখন তিনি বসলেন, তখন দেখলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর চিরাচরিত আত্মমর্যাদা ও বাঙালির তেজ নিয়ে সোজা হয়ে বসে আছেন। বঙ্গবন্ধু মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সামনে কোনো সাহায্য ভিক্ষা করেননি, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌম নীতি ও জোটনিরপেক্ষতার কথা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন। ঐতিহাসিকদের মতে, কিসিঞ্জার গণভবন থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময়ই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলেন যে, এই 'দম্ভকারী' বাঙালি নেতাকে ক্ষমতা থেকে চিরতরে না সরালে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
খন্দকার মোশতাক আহমদ ও সিআইএ (CIA)-এর দীর্ঘমেয়াদি গোপন যোগাযোগ
১৫ই আগস্টের অভ্যুত্থানটি হঠাৎ করে এক রাতে ঘটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। লরেন্স লিফশুলজ এবং প্রখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক বি অ্যান্ডারসনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো প্রমাণ করে যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকাল থেকেই খন্দকার মোশতাক আহমদের সাথে মার্কিন কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
১৯৭১ সালের 'কলকাতা চক্রান্ত'
১৯৭১ সালে যখন প্রবাসী মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়, তখন খন্দকার মোশতাক আহমদকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছিল। কিন্তু মোশতাক এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ চক্র (যেমন: জহুরুল হাসান জহির) গোপনে কলকাতার মার্কিন কনস্যুলেটের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের জেলে বন্দি রেখে, পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি পরিত্যাগ করে পাকিস্তানের সাথে একটি 'কনফেডারেশন' বা আপস-রফা করা।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং আবদুস সামাদ আজাদ এই ষড়যন্ত্র ধরে ফেলেন এবং ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের প্রধান হিসেবে মোশতাককে বাদ দিয়ে আবদুস সামাদ আজাদকে পাঠানো হয়। তখন থেকেই মোশতাক হৃদয়ে প্রচণ্ড ক্ষোভ পুষে রেখেছিলেন।
১৯৭৪-১৯৭৫ ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত বোস্টার ও খুনিদের যোগাযোগ
লরেন্স লিফশুলজের তথ্যমতে, ১৯৭৪ সালের শেষদিক থেকে এবং ১৯৭৫ সালের প্রথমদিকে অভ্যুত্থানের অন্যতম মূল খুনি মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান ও মেজর খন্দকার আবদুর রশীদ একাধিকবার ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে যাতায়াত করেন। তারা সেখানে কর্মরত সামরিক সংযুক্তি ও সিআইএ কর্মকর্তাদের কাছে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করে জানতে চান যে বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে মার্কিন প্রশাসন সাহায্য করবে কিনা এবং নতুন সরকারকে মেনে নেবে কিনা।
যদিও তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার (Davis Eugene Boster) পরবর্তীতে দাবি করেছিলেন যে, তিনি তাঁর কর্মকর্তাদের এই ধরনের ষড়যন্ত্রে সরাসরি যুক্ত হতে বারণ করেছিলেন; কিন্তু গোপন বার্তাগুলো দ্রুত ওয়াশিংটনে কিসিঞ্জারের টেবিলে পৌঁছে যায়। ওয়াশিংটন থেকে এই অভ্যুত্থান ঠেকানোর কোনো পদক্ষেপ তো নেওয়া হয়নিই, বরং নীরব সবুজ সংকেত (Green Signal) দিয়ে খুনিদের উৎসাহিত করা হয়েছিল।
২০শে আগস্ট ১৯৭৫: কিসিঞ্জারের উল্লাস ও ওয়াশিংটনের গোপন তথ্য
১৫ই আগস্ট সকালে যখন রক্তঝরা ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ পড়ে ছিল, তখন খন্দকার মোশতাক আহমদ নিজেকে অঘোষিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে প্রথম কে বা কারা এই মোশতাকের অবৈধ খুনি সরকারকে স্বীকৃতি দেবে তা নিয়ে পুরো বিশ্বে এক চাপা উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।
ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, ২০শে আগস্ট ১৯৭৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে খুনি খন্দকার মোশতাকের সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান করে। কিসিঞ্জার এই স্বীকৃতি প্রদান নিয়ে এতটাই উল্লসিত ছিলেন যে, প্রকাশ্যেই নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলেন।
স্টাফ মিটিং-এর আল জাজিরা ও ডিক্লাসিফাইড গোপন নথি
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডিক্লাসিফাইড (Unclassified) নথিপত্র এবং বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা কর্তৃক প্রকাশিত গবেষণামূলক তথ্য বিশ্লেষণ করলে ২০শে আগস্ট সকাল ৮টায় অনুষ্ঠিত কিসিঞ্জারের বিশেষ স্টাফ সভার চাঞ্চল্যকর চিত্র ভেসে ওঠে:
সভার প্রথম প্রশ্ন: সভার শুরুতে ওয়াশিংটনে নিজ কক্ষে প্রবেশ করেই হেনরি কিসিঞ্জার অন্যান্য এজেন্ডা পাশে সরিয়ে রেখে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলফ্রেড আথারটনকে (Alfred Atherton) লক্ষ্য করে বলেন:
"আমরা এখন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কথা বলব। ঢাকার সর্বশেষ খবর কী?"
'মুজিব কি জীবিত না মৃত?': আথারটন যখন বলেন যে ঢাকায় এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে, তখন কিসিঞ্জার অত্যন্ত ঔৎসুক্যের সাথে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করেন:
"মুজিব কি জীবিত না মৃত?" (Is Mujib dead or alive?)
আথারটন উত্তর দেন:
"মুজিব মৃত। তাঁর পরিবারের প্রায় সব সদস্য, ভাই, ভাগ্নে ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা নিহত হয়েছেন।"
কিসিঞ্জারের আনন্দোচ্ছ্বাস ও মদ্যপান: সভার প্রত্যক্ষদর্শী ও রজার মরিসের বর্ণনা অনুযায়ী, শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে কিসিঞ্জারের চোখে-মুখে এক পৈশাচিক আনন্দের দ্যুতি ফুটে ওঠে। তিনি দীর্ঘদিনের এক মহা শত্রু থেকে মুক্ত হওয়ার স্বস্তি পান এবং মিটিং চলাকালেই বিশেষ মদ্যপান (Drink) করে নিজের আনন্দ প্রকাশ করেন।
প্রকাশ্য স্বীকৃতি বার্তা: কিসিঞ্জার কালবিলম্ব না করে ২০শে আগস্টই মোশতাক সরকারকে মার্কিন স্বীকৃতি দেওয়ার নির্দেশ জারি করেন। একই সাথে তিনি লিখিত বার্তায় বলেন:
"খন্দকার মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দিতে পেরে আমরা নিজেদের ধন্য মনে করছি। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশের নতুন সরকারকে অবিলম্বে আমাদের বার্তা পৌঁছে দেওয়া হোক, যাতে তারা পূর্ণ ভরসা পায় যে মার্কিন প্রশাসন তাদের সকল চাহিদা ও অর্থনৈতিক সহায়তার প্রতি সহানুভূতিশীল থাকবে।"
একজন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান এবং জাতির পিতাকে পরিবারের শিশুসহ নৃশংসভাবে হত্যার পর যে আন্তর্জাতিক শক্তি সবচেয়ে দ্রুত অভিনন্দন ও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, তারা হলো কিসিঞ্জারের মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের আদর্শিক ও কৌশলগত পরিবর্তন
১৫ই আগস্টের পর খন্দকার মোশতাক আহমদ (১৫ই আগস্ট - ৬ই নভেম্বর ১৯৭৫) এবং পরবর্তীতে জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও আদর্শিক ভিত্তির ওপর এক চরম আঘাত হানা হয়। বাংলাদেশ রাতারাতি তার মুক্তিযুদ্ধের পথ থেকে ১০০ ডিগ্রি বিপরীতে ঘুরে যায়।
সংবিধানের মূল চার নীতির বিনাশ
মোশতাক-জিয়া সরকার ক্ষমতায় বসেই ১৯৭২ সালের সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক ধারা ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে ছেঁটে ফেলে। বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম সংযোজন এবং ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে (যারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল) পুনর্বাসিত করা হয়।
ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ (Indemnity Ordinance)
১৯৭৫ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমদ এক কুখ্যাত অধ্যাদেশ জারি করেন, যার নাম ছিল 'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ'। এর মাধ্যমে ১৫ই আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কোনো আদালতে মামলা বা বিচার করা যাবে না বলে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান সংবিধানে ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে এই কালো আইনকে স্থায়ী রূপ দেন এবং খুনি ফারুক, রশীদ, ডালিমদের বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মার্কিন ও পশ্চিমা দূতাবাসে বড় বড় পদে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেন।
পররাষ্ট্রনীতির নাটকীয় পরিবর্তন
বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি ছিল: "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়" (Friendship to all, malice towards none) এবং বাংলাদেশ ছিল জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (NAM) সক্রিয় সদস্য।
কিন্তু ১৯৭৫-এর পর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন-চীন-পাকিস্তান বলয়ে যুক্ত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে প্রচুর পরিমাণ অর্থনৈতিক ঋণ ও খাদ্য সাহায্য দেওয়া শুরু করে, তবে তার বিনিময়ে বাংলাদেশকে আমেরিকার কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক দাসত্ব গ্রহণ করতে হয়।
কিসিঞ্জারের হিসাব-নিকাশ: কেন বঙ্গবন্ধুকে সরানো জরুরি ছিল?
হেনরি কিসিঞ্জার এবং তৎকালীন মার্কিন নিরাপত্তা নীতি নির্ধারকদের কাছে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা থেকে সরানো কেন এত অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল, তার প্রধান ভূ-রাজনৈতিক কারণগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব হ্রাস: বঙ্গবন্ধু ছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের এই শক্তিশালী অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ ছিল না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে ভারতের পূর্ব সীমান্তে এক বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের জায়গায় এক শত্রুভাবাপন্ন বা মার্কিনপন্থী সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল।
সোভিয়েত বলয় থেকে বাংলাদেশকে টেনে বের করা: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের যে ঐতিহাসিক ভেটো প্রদান ও সামরিক সহযোগিতা ছিল, তার ফলে স্বাধীন বাংলাদেশে মস্কোর বিশাল প্রভাব তৈরি হয়েছিল। কিসিঞ্জারের মূল টার্গেট ছিল যেকোনো মূল্যে বাংলাদেশকে সমাজতান্ত্রিক ও সোভিয়েত বলয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে পশ্চিমা উদার পুঁজিবাদী বলয়ে নিয়ে আসা।
চীন-পাকিস্তান অক্ষকে সন্তুষ্ট রাখা: ১৯৭১ সালে চীন ও পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করেছিল। বাংলাদেশে মার্কিনপন্থী সরকার বসিয়ে কিসিঞ্জার চীন ও পাকিস্তানকে এই বার্তা দিতে চেয়েছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের হারতে দেয় না এবং বিলম্বে হলেও সে নিজের প্রভাব পুনর্বহাল করে।
১৯৭৫ সালের আগস্ট ট্র্যাজেডি সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক তথ্যসূত্র
১৫ই আগস্টের রক্তাক্ত ঘটনা, মার্কিন সরকারের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র এবং তৎসংক্রান্ত ভূ-রাজনৈতিক উপাত্তের একটি প্রামাণ্য তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো:
ঘটনাক্রম / নথির নাম | তারিখ / সময় | প্রধান কুশীলব / ব্যক্তিত্ব | ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও গোপন প্রকাশ | তথ্যসূত্র ও প্রমাণ |
কিসিঞ্জারের 'শত্রু' তালিকা প্রকাশ | ১৯৭১ - ১৯৭৩ | হেনরি কিসিঞ্জার, রজার মরিস | আলেন্দে ও হো চি মিনের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুকে শীর্ষ 'ঘৃণিত শত্রু' গণ্য করা। | লরেন্স লিফশুলজ (দ্য আনফিনিশড রেভল্যুশন) |
'খাদ্য-অস্ত্র' প্রয়োগ | ১৯৭৪ এর মধ্যভাগ | মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট, কিসিঞ্জার | কিউবায় পাট রপ্তানির অযুহাতে খাদ্যবাহী জাহাজ আটকে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ তৈরি। | ড. রেহমান সোবহান ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিশ্লেষণ |
কিসিঞ্জারের ঢাকা সফর | অক্টোবর ১৯৭৪ | বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, হেনরি কিসিঞ্জার | গণভবনে বঙ্গবন্ধুর আত্মমর্যাদাপূর্ণ অবস্থান; নতি স্বীকারে অস্বীকৃতি। | বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিক্লাসিফাইড রেকর্ড |
১৫ই আগস্ট ট্র্যাজেডি | ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫, ভোর | বঙ্গবন্ধু পরিবার, খুনি ফারুক-রশীদ-মোশতাক | সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যা; বাংলাদেশের আদর্শিক পতনের সূচনা। | ১৫ই আগস্টের মামলার রায় ও সাক্ষ্যপ্রমাণ |
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত স্বীকৃতি | ২০শে আগস্ট ১৯৭৫ | হেনরি কিসিঞ্জার, খন্দকার মোশতাক | অভ্যুত্থানের ৫ দিনের মাথায় কিসিঞ্জারের উল্লাস এবং মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি। | মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডিক্লাসিফাইড নথি |
ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি | ২৬শে সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ | খন্দকার মোশতাক আহমদ | আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচারের হাত থেকে রক্ষা করতে আইনি সুরক্ষা দেওয়া। | বাংলাদেশ গেজেট (১৯৭৫) |
৫ম সংশোধনী ও খুনিদের পুরষ্কার | ১৯৭৯ | জেনারেল জিয়াউর রহমান | ইনডেমনিটিকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্তকরণ ও খুনিদের বিদেশে কূটনীতিক নিয়োগ। | বাংলাদেশ সংবিধান সংশোধন ইতিহাস |
সিআইএ (CIA) ঢাকা স্টেশন ও ফিলিপ চেরির রহস্যময় ভূমিকা
গবেষক লরেন্স লিফশুলজ এবং সাংবাদিক বি অ্যান্ডারসনের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'সিআইএ'-এর ঢাকা স্টেশনের তৎকালীন প্রধান ফিলিপ চেরি (Philip Cherry)-এর সরাসরি ভূমিকা উন্মোচিত হয়।
স্টেশন চিফের গোপন বৈঠক: তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশ জারি করেছিলেন যে, কোনো মার্কিন কর্মকর্তা যেন সরকার উৎখাতের মতো চক্রান্তে সরাসরি যুক্ত না হন। কিন্তু সিআইএ স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি প্রটোকল অমান্য করে ১৯৭৪ সালের শেষভাগ থেকে ১৯৭৫ সালের আগস্টের ১ম সপ্তাহ পর্যন্ত একাধিকবার মেজর ফারুক রহমান এবং মেজর খন্দকার আবদুর রশীদ চক্রের সাথে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে গোপন বৈঠক করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ সাবেক কর্মকর্তা ফিলিপ এজির সাক্ষ্য: সিআইএ-এর সাবেক কর্মকর্তা ও হুইসেলব্লোয়ার ফিলিপ এজি (Philip Agee) পরবর্তীতে প্রকাশ করেন যে, তৃতীয় বিশ্বের যেসব দেশে সমাজতান্ত্রিক বা ভারত-সোভিয়েতপন্থী সরকার ক্ষমতায় ছিল, সেখানে সিআইএ 'কভার্ট অপারেশন' (Covert Operations) পরিচালনা করত। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাত করার জন্য কিসিঞ্জারের সম্মতিক্রমে ঢাকা স্টেশনের মাধ্যমে বিশেষ তহবিল ও লজিস্টিক ব্যাকআপ নিশ্চিত করা হয়েছিল।
৩রা নভেম্বর ও ৭ই নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থান এবং জেলহত্যা
১৫ই আগস্টের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে ক্ষমতার যে চরম বিশৃঙ্খলা ও সামরিক সংকট তৈরি হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতার নৃশংস হত্যাকাণ্ড।
৩রা নভেম্বরের জেলহত্যা (Jail Killing)
খন্দকার মোশতাক আহমদ ও ১৫ই আগস্টের খুনি চক্র বুঝতে পেরেছিল যে, দেশের অভ্যন্তরে বা সশস্ত্র বাহিনীতে যেকোনো সময় তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে। এই ভয়ে ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্যায়ভাবে বন্দি করে রাখা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী-কে নির্মমভাবে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
এই হত্যাকাণ্ডের মূল লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো আর কোনো মূলধারার রাজনৈতিক অভিভাবক যেন বেঁচে না থাকেন।
৩রা নভেম্বর ও ৭ই নভেম্বরের সিপাহী বিপ্লব
৩রা নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে, যার উদ্দেশ্য ছিল অভ্যুত্থানকারী খুনিদের বিচার করা এবং সামরিক শৃঙ্খল ফিরিয়ে আনা। কিন্তু পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে খুনিদের একটি বিশেষ বিমানে করে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ৭ই নভেম্বর জাসদ ও গণবাহিনীর নেতা কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’ ঘটে। এতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ নিহত হন এবং গৃহবন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন জেনারেল জিয়াউর রহমান।
১৯৮০ সালের আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গঠন ও জিয়া সরকারের বাধা
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক তদন্তের জন্য ১৯৭৮-১৯৮০ সালে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অভূতপূর্ব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের সরকারের বাধার কারণে ব্যর্থ হয়।
লন্ডনের উদ্যোগ: ১৯৮০ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব লর্ডসের সদস্য লর্ড অ্যাভবেরি, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী শন ম্যাকব্রাইড এবং বিশিষ্ট ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার থমাস উইলিয়ামস কিউসি-র সমন্বয়ে লন্ডনে ‘শেখ মুজিব হত্যা আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন’ গঠিত হয়।
ভিসা প্রত্যাখ্যান: ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে কমিশনের পক্ষ থেকে স্যার থমাস উইলিয়ামস কিউসির নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ নিরপেক্ষ প্রতিনিধি দলের তদন্তের উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসার কথা ছিল। কিন্তু জেনারেল জিয়াউর রহমানের সরকার তাদের ভিসা দিতে সরাসরি অস্বীকার করে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের আইনি তদন্তের এই ঐতিহাসিক চেষ্টাটি ভেস্তে যায়।
দীর্ঘ ২১ বছর বিচারহীনতা ও ইনডেমনিটি আইন বাতিলের ইতিহাস
বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার রুখে দিতে ১৯৭৫ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক যে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ (Indemnity Ordinance) জারি করেছিলেন, তা ছিল মানবাধিকার ও আইনের শাসনের চরম লঙ্ঘন।
১৯৭৯ সালের ৯ই এপ্রিল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে ‘সংবিধান (পঞ্চম সংশোধন) আইন, ১৯৭৯’ পাস করার মাধ্যমে এই কুখ্যাত অধ্যাদেশকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে দীর্ঘ ২১ বছর (১৯৭৫-১৯৯৬) বাংলাদেশের কোনো আদালতে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের হত্যার বিচার চাওয়ার আইনি পথ বন্ধ ছিল।
১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর, ১৯৯৬ সালের ১২ই নভেম্বর জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়। এর ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সাধারণ ফৌজদারি আইনে করার পথ উন্মুক্ত হয়।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া ও ইতিহাস
১৯৯৬ সালের ২রা অক্টোবর ধানমণ্ডি থানায় তৎকালীন রেসিডেন্সিয়াল পিএ মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলা (মামলা নম্বর: সিআর নম্বর ৬০৯৫/৯৬) দায়ের করেন। সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক বিচারিক মান বজায় রেখে বিচারিক আদালত থেকে আপিল বিভাগ পর্যন্ত এই মামলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল।
জেলা ও দায়রা জজ আদালত (১৯৯৮): ১৯৯৮ সালের ৮ই নভেম্বর ঢাকার ভাবি জেলা ও দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল দীর্ঘ শুনানি শেষে ১৫ জন সাবেক সামরিক কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন।
হাইকোর্ট বিভাগ (২০০০-২০০১): হাইকোর্টে রিভিউ শুনানির পর তিনজন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ১২ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্তভাবে বহাল রাখেন এবং ৩ জনকে খালাস দেন।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ (২০০৯): ২০০৯ সালের ১৯শে নভেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি তাফাজ্জল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ৫ সদস্যের আপিল বেঞ্চ হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে ১২ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির আপিল খারিজ করে দেন।
এক নজরে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, আসামিদের তালিকা ও রায় কার্যকর
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জন আসামির বর্তমান অবস্থা, ফাঁসি কার্যকরের তারিখ এবং পলাতক আসামিদের সারণি নিচে তুলে ধরা হলো:
আসামির নাম ও তৎকালীন পদবি | মামলায় প্রদত্ত চূড়ান্ত রায় | ফাঁসি কার্যকর / বর্তমান অবস্থা | অবস্থানকৃত দেশ / মন্তব্য |
১. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান | মৃত্যুদণ্ড | কার্যকর: ২৭শে জানুয়ারি ২০১০ | ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার |
২. লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান | মৃত্যুদণ্ড | কার্যকর: ২৭শে জানুয়ারি ২০১০ | ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার |
৩. লে. কর্নেল (বরখাস্ত) মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি) | মৃত্যুদণ্ড | কার্যকর: ২৭শে জানুয়ারি ২০১০ | ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার |
৪. Major (বরখাস্ত) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার) | মৃত্যুদণ্ড | কার্যকর: ২৭শে জানুয়ারি ২০১০ | যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত আনার পর ফাঁসি |
৫. Major (বরখাস্ত) বজলুল হুদা | মৃত্যুদণ্ড | কার্যকর: ২৭শে জানুয়ারি ২০১০ | থাইল্যান্ড থেকে ফেরত আনার পর ফাঁসি |
৬. ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদ | মৃত্যুদণ্ড | কার্যকর: ১২ই এপ্রিল ২০২০ | দীর্ঘদিন ভারতে আত্মগোপনে থাকার পর গ্রেপ্তার |
৭. লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আবদুর রশীদ | মৃত্যুদণ্ড | পলাতক | সম্ভাব্য অবস্থান: লিবিয়া / পাকিস্তান |
৮. লে. কর্নেল (বরখাস্ত) শরিফুল হক ডালিম | মৃত্যুদণ্ড | পলাতক | সম্ভাব্য অবস্থান: পাকিস্তান / স্পেন |
৯. লে. কর্নেল (বরখাস্ত) এ এম রাশেদ চৌধুরী | মৃত্যুদণ্ড | পলাতক | অবস্থান: যুক্তরাষ্ট্র (পলিটিক্যাল আশ্রয় আবেদন) |
১০. লে. কর্নেল (বরখাস্ত) এসএইচএমবি নূর চৌধুরী | মৃত্যুদণ্ড | পলাতক | অবস্থান: কানাডা (আইনি জটিলতায় প্রত্যর্পণ স্থগিত) |
১১. লে. কর্নেল (বরখাস্ত) মোসলেম উদ্দিন | মৃত্যুদণ্ড | পলাতক | সম্ভাব্য অবস্থান: ভারত / ইউরোপ |
১২. রিসালদার (অব.) মোসলেহ উদ্দিন (মৃত) | মৃত্যুদণ্ড | ভারতে স্বাভাবিক মৃত্যু (দাবি) | আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়াধীন |
পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনার আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতা
বঙ্গবন্ধু হত্যার রায় ঘোষণার পর অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় বিদেশে পালিয়ে থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফিরিয়ে আনা। বিশেষ করে রাশেদ চৌধুরী এবং নূর চৌধুরী-কে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক জটিলতা দেখা দেয়।
কানাডা ও নূর চৌধুরী জটিলতা: কানাডার অভ্যন্তরীণ আইনি বাধ্যবাধকতা (Charter of Rights and Freedoms) অনুযায়ী, যে দেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বিদ্যমান, সেই দেশে কোনো আসামিকে ফেরত পাঠানো নিষিদ্ধ। এই আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে খুনি নূর চৌধুরী কানাডায় অবস্থান করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশেদ চৌধুরী: খুনি রাশেদ চৌধুরী মিথ্যা তথ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার ক্রমাগত মার্কিন প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে তাঁর রাজনৈতিক আশ্রয় বাতিলের জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
জাতীয় জীবনে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাব
১৫ই আগস্টের ট্র্যাজেডি কেবল একজন ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনা ছিল না; এটি বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক ক্ষত তৈরি করেছিল:
সামরিক শাসনের পুনরাবৃত্তি: ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত দেশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সামরিক শাসনের অধীনে চলে যায়। গণতন্ত্রের চর্চা রুদ্ধ হয়ে যায় এবং বারবার সামরিক অভ্যুত্থান (Coup) ও পাল্টা অভ্যুত্থানে বহু সামরিক কর্মকর্তা প্রাণ হারান।
মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস: ১৯৭৫-পরবর্তী দুই দশক ধরে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম (বিটিভি, রেডিও) ও পাঠ্যপুস্তক থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম, ৭ই মার্চের ভাষণ এবং জয় বাংলা স্লোগান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও মুছে ফেলার অপচেষ্টা করা হয়।
রাজনীতির ধর্মান্ধকরণ ও সাম্প্রদায়িকতা: বাহাত্তরের সংবিধানে থাকা অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধূলিসাৎ করে ধর্মের নামে রাজনীতি করার অনুমতি দেওয়া হয়, যার ফলে দেশে উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঘটে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি (Culture of Impunity): ইনডেমনিটি আইনের মাধ্যমে হত্যাকে আইনি বৈধতা দেওয়ার কারণে সমাজে আইনের শাসনের বদলে শক্তি ও পেশিশক্তির রাজনীতির বীজ রোপিত হয়েছিল।
'দ্য আনফিনিশড রেভল্যুশন' ও গবেষক লরেন্স লিফশুলজের ভূমিকা
১৫ই আগস্টের আন্তর্জাতিক চক্রান্ত উন্মোচনে প্রখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক ও লেখক লরেন্স লিফশুলজ (Lawrence Lifschultz)-এর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় 'ফার ইস্ট কান্ট্রি'র প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন এবং ১৯৭৫ সালের ঘটনাবলি অতি কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন।
লরেন্স লিফশুলজের বই 'দ্য আনফিনিশড রেভল্যুশন' শুধু ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান নয়, এর সঙ্গে বুদ্ধিজীবী হত্যার সংযোগ এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পটভূমি তুলে ধরে। রজার মরিসের উদ্ধৃতি অনুযায়ী:
"মুজিব ক্ষমতায় আসেন সব কিছু উপেক্ষা করে। আমেরিকা ও তার অনুগ্রহভাজন পাকিস্তানকে সত্যিই পরাজিত করে এবং মুজিবের বিজয় ছিল আমেরিকার শাসকবর্গের পক্ষে অত্যন্ত বিব্রতকর।" (সূত্র: দ্য আনফিনিশড রেভল্যুশন, লরেন্স লিফশুলজ, পৃষ্ঠা ১৩৭-১৩৮)
লরেন্স লিফশুলজ তাঁর গ্রন্থে প্রমাণ করেছেন যে:
ছায়া চক্রান্তকারী (Shadow Conspiracy): চিলিতে জেনারেল পিনোচেট যেভাবে আলেন্দেকে সরিয়েছিলেন, ঢাকায় মোশতাক-ফারুক-রশীদকে দিয়ে ঠিক একই নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছিল।
নিশ্চুপ সহযোগিতা (Silent Complicity): যদি মার্কিন প্রশাসন সত্যি অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করত, তবে তারা ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কাছে আসা অভ্যুত্থানের তথ্য বঙ্গবন্ধু সরকারকে জানাতে পারত। কিন্তু কিসিঞ্জারের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ইচ্ছা করেই তথ্য গোপন রাখে, যাতে ষড়যন্ত্রটি সফল হয়।
জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ সতর্কতার গুরুত্ব
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট কেবল অতীত ইতিহাসের এক বেদনার পৃষ্ঠা নয়; এটি যেকোনো উদীয়মান সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য এক চিরন্তন সতর্কবার্তা।
অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা ও বৈদেশিক চক্রান্তের ককটেল: আন্তর্জাতিক পরাশক্তি কখনোই একা কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করতে পারে না, যদি না দেশের ভেতরে খন্দকার মোশতাকের মতো বিশ্বাসঘাতক এবং ফারুক-রশীদের মতো সুবিধাবাদী সেনাসদস্য তৈরি হয়। অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতার সাথে যখন আন্তর্জাতিক পরাশক্তির ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের মিলন ঘটে, তখন তা যেকোনো জাতির জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়।
স্বার্থের কূটনীতি: আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো ‘স্থায়ী বন্ধু’ বা ‘স্থায়ী শত্রু’ থাকে না; থাকে কেবল 'স্থায়ী স্বার্থ'। কিসিঞ্জারের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের স্নায়ুযুদ্ধের স্বার্থে একটি সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের ৩০ লাখ শহীদের রক্তে পাওয়া গণতন্ত্রকে ধূলিসাৎ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি।
উপসংহার
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের রক্তঝরা ভোরে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে গড়িয়ে পড়া রক্ত কেবল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল না; তা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তির শুভ্র রক্ত।
ইতিহাসের নিরপেক্ষ আলোয় আজ এটি সুস্পষ্ট যে, এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের মূল ট্রিগারটি ফারুক-রশীদ-মোশতাক চক্র চেপে থাকলেও তাঁর পেছনে কারিগর হিসেবে কলকাঠি নেড়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। একাত্তরে বাংলাদেশের কাছে নিজের অহংকার চূর্ণ হওয়া, স্নায়ুযুদ্ধের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং বঙ্গবন্ধুর অটল নীতিকে মেনে নিতে না পেরে কিসিঞ্জার যে চিলীয় ধাঁচের চক্রান্তের বীজ বপন করেছিলেন, ২০শে আগস্ট মোশতাককে দ্রুত স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে তার সফল বাস্তবায়ন ঘটেছিল।
বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি বাংলাদেশকে এক দীর্ঘ সামরিক স্বৈরতন্ত্র, ইনডেমনিটির কালো আইন এবং মৌলবাদের অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। হেনরি কিসিঞ্জারের কূটাভাস ও ষোড়শ শতকীয় চক্রান্তের সমস্ত কালো দলিল আজ একে একে উন্মোচিত।
আজ এত বছর পরও দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের অমর জ্যোতি বাঙালির হৃদয়ে চিরভাস্বর, আর কিসিঞ্জার ও মোশতাকেরা ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত হয়ে আছেন মানবতার শত্রু ও পৈশাচিক চক্রান্তের কুখ্যাত খলনায়ক হিসেবে। এই ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় নিজের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও জাতীয় মূল্যবোধ রক্ষা করতে হলে রাষ্ট্রকে প্রতিটি মুহূর্তে ভেতরে এবং বাইরে চোখ-কান খোলা রাখতে হয়।
তথ্যসূত্র:
১. দ্য আনফিনিশড রেভল্যুশন, লরেন্স লিফশুলজ, পৃষ্ঠা ১৩৭-১৩৮
২. Al Jazeera Declassified US Documents on 1975 Bangladesh Coup















