বাঙালির মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর শেষ বিদায় - টুঙ্গীপাড়ার সেই করুণ বিকেল
শ্রাবণের সেই কালরাত ও স্তব্ধ বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট। বাংলার আকাশে সেদিন সূর্য উঠেছিল এক বিভীষিকাময় বার্তা নিয়ে। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের সেই বাড়িটি, যা ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু, তা তখন নিথর, নিস্তব্ধ এবং রক্তে রঞ্জিত। জাতির গাদ্দার বিশ্বাসঘাতকের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গেছেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সপরিবারে তাঁকে হত্যার মাধ্যমে এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা হয়। কিন্তু রাজনীতির এই মহানায়কের পার্থিব শরীরের শেষ গন্তব্য কোথায় হবে? ঘাতকরা চেয়েছিল তাঁকে লোকচক্ষুর অন্তরালে কোথাও ফেলে দিতে, কিন্তু বিধাতার লিখন ছিল তাঁর জন্মভূমি সবুজ ঘাসে ঘেরা নিভৃত পল্লী টুঙ্গীপাড়ায়।

TruthBangla
Jan 2, 2026
শ্রাবণের সেই কালরাত ও স্তব্ধ বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট। বাংলার আকাশে সেদিন সূর্য উঠেছিল এক বিভীষিকাময় বার্তা নিয়ে। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের সেই বাড়িটি, যা ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু, তা তখন নিথর, নিস্তব্ধ এবং রক্তে রঞ্জিত। জাতির গাদ্দার বিশ্বাসঘাতকের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গেছেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সপরিবারে তাঁকে হত্যার মাধ্যমে এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা হয়। কিন্তু রাজনীতির এই মহানায়কের পার্থিব শরীরের শেষ গন্তব্য কোথায় হবে? ঘাতকরা চেয়েছিল তাঁকে লোকচক্ষুর অন্তরালে কোথাও ফেলে দিতে, কিন্তু বিধাতার লিখন ছিল তাঁর জন্মভূমি সবুজ ঘাসে ঘেরা নিভৃত পল্লী টুঙ্গীপাড়ায়।
টুঙ্গীপাড়ার আকাশে শঙ্কার হেলিকপ্টার
১৫ই আগস্ট সকাল থেকেই দেশজুড়ে অঘোষিত কারফিউ। রেডিওতে বার বার ঘোষণা করা হচ্ছে মেজর ডালিমের সেই কর্কশ কণ্ঠস্বর। বিকালের দিকে টুঙ্গীপাড়ার শান্ত নীল আকাশে শোনা গেল এক পরিচিত গুঞ্জন হেলিকপ্টারের শব্দ। এর আগেও বহুবার টুঙ্গীপাড়ার মানুষ এই শব্দ শুনেছে। কিন্তু তখন আকাশ থেকে নামতেন তাদের প্রিয় 'মিয়া ভাই', তাদের হৃদয়ের স্পন্দন শেখ মুজিব। হেলিকপ্টারের শব্দ শোনা মাত্রই হাজার হাজার মানুষ ঘর ছেড়ে দৌড়ে আসত তাদের নেতাকে এক নজর দেখার জন্য।
কিন্তু এবারের দৃশ্যপট ভিন্ন। গ্রামের মানুষের মনে এক অজানা আতঙ্ক। আকাশে হেলিকপ্টার চক্কর দিচ্ছে, কিন্তু কেউ ঘর থেকে বের হওয়ার সাহস পাচ্ছে না। চারদিকে সেনাসদস্যদের কড়া পাহারা আর কারফিউ-এর ভয়। টুঙ্গীপাড়া সেদিন যেন এক মৃত্যুপুরীর নিস্তব্ধতায় ডুবে ছিল।
বস্তাবন্দি লাশ এবং ঘাসের বুকে জমাট রক্ত
হেলিকপ্টারটি যখন মাটিতে নামল, সেখান থেকে কোনো হাস্যোজ্জ্বল নেতা বেরিয়ে এলেন না। নামানো হলো একটি কফিন, যা ছিল সাধারণ একটি কাঠের বাক্সে বন্দি এবং দড়ি দিয়ে বাঁধা। কারো কারো মতে, সেটি ছিল বস্তাবন্দি লাশের মতো অবহেলিত। হেলিকপ্টার থেকে নেমে এলেন সশস্ত্র কিছু সিপাহী এবং সামরিক কর্মকর্তা।
উন্মুক্ত আকাশের নিচে যখন সেই কফিন বা বস্তাবন্দি দেহটি রাখা হলো, তখন দেখা গেল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। ঘাতকের বুলেটে ক্ষতবিক্ষত বঙ্গবন্ধুর শরীর থেকে রক্ত চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। টুঙ্গীপাড়ার যে সবুজ ঘাসে তিনি শৈশবে খেলে বেড়িয়েছেন, সেই ঘাস আজ তাঁরই রক্তে ভিজে লাল হয়ে উঠল। বাতাসের মর্মর ধ্বনিতে সেদিন যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।” তিনি রক্ত দিয়েছেন, তাঁর কথা রেখেছেন, কিন্তু বিনিময়ে দেশ পেল এক সীমাহীন শূন্যতা।
ইমামের তেজ ও ইসলামের অমিয় বিধান
লাশ দাফনের জন্য তাড়াহুড়ো করছিল সেনাসদস্যরা। তাদের লক্ষ্য ছিল যত দ্রুত সম্ভব দাফন শেষ করে ঢাকা ফিরে যাওয়া। হেলিকপ্টারের সাথে আসা মেজর সাহেব টুঙ্গীপাড়া মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুল হালিমকে ডেকে পাঠালেন। মেজরের নির্দেশ ছিল অত্যন্ত কঠোর: "দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যে দাফন শেষ করতে হবে।"
কিন্তু একজন প্রকৃত মুমিনের মতো ইমাম সাহেব সেদিন দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি বিনীত কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বললেন, "একজন মুসলমানের লাশ এভাবে দাফন করা যায় না। মৃতদেহের গোসল, কাফন এবং জানাজা নামাজ পড়া ইসলামের বিধান। এগুলো ছাড়া আমি দাফন করতে পারব না।"
মেজর সাহেব প্রথমে উত্তেজিত হলেও ইমামের যুক্তির কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হন। কারণ জানাজা ছাড়া দাফন করলে স্থানীয় মানুষ ও ধর্মীয় ভাবাবেগে বড় আঘাত লাগতে পারত। অবশেষে ইমাম সাহেবকে সামান্য সময় দেওয়া হলো।
৫৭০ সাবান, রিলিফের কাপড়, একটি ঐতিহাসিক জানাজা ও নিভৃত দাফন
বঙ্গবন্ধুর মতো একজন বিশ্বনেতা, যিনি একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর শেষ বিদায় কতই না সাদামাটা ছিল! তখন টুঙ্গীপাড়ায় ভালো কোনো সাবান বা কাফনের কাপড় পাওয়ার মতো অবস্থা ছিল না। স্থানীয় একটি দোকান থেকে আনা হলো কাপড় ধোয়ার '৫৭০ সাবান'। সেই সাবান দিয়েই জাতির পিতাকে শেষ গোসল করানো হলো।
কাফনের কাপড়ের জন্য হাহাকার পড়ে গিয়েছিল। শেষে রেডক্রসের রিলিফের একটি শাড়ি (কারো মতে পাড় ছিঁড়ে সাদা কাপড় করা হয়েছিল) দিয়ে তাঁর কাফনের ব্যবস্থা করা হয়। বাংলার মানুষের জন্য যিনি সারাজীবন বিলিয়ে দিয়েছেন, তাঁর শেষ বিদায়ের সম্বল হলো সাধারণ রিলিফের কাপড়। এটি ইতিহাসের এক চরম পরিহাস এবং ট্র্যাজেডি।
মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্র এবং স্থানীয় গুটিকতক মানুষকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হলো বঙ্গবন্ধুর জানাজা। সেনাসদস্যদের কড়া পাহারায় সেই ছোট অথচ অত্যন্ত ভারাক্রান্ত জানাজা শেষে বিকেলে পড়ন্ত রোদে তাঁকে দাফন করা হলো।
বঙ্গবন্ধুর বয়স তখন ছিল ৫৫ বছর ৫ মাস ২৮ দিন। মাত্র সাড়ে ৫৫ বছরের এক ঝোড়ো জীবন। ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ যে শিশুর কান্না টুঙ্গীপাড়ার বাঘিয়া নদীর পাড়কে মুখরিত করেছিল, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সেই একই মাটিতে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন।
টুঙ্গীপাড়ার ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট ও শৈশবের টান
টুঙ্গীপাড়া গ্রামটি গোপালগঞ্জ জেলার এক নিভৃত কোণে অবস্থিত। এর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মধুমতির শাখা নদী বাঘিয়া। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই গ্রামটিই ছিল বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ের টান। ক্ষমতার উচ্চ শিখরে থেকেও তিনি বারবার ফিরে আসতেন এই মাটির টানে। ঘাতকরা ভেবেছিল টুঙ্গীপাড়ায় দাফন করলে মানুষ তাঁকে ভুলে যাবে, কিন্তু তারা জানত না যে মুজিব মানেই বাংলাদেশ, আর টুঙ্গীপাড়া মানেই বাঙালির তীর্থস্থান।
সুদূর লন্ডনে বসে এম আর আখতার মুকুলের স্মৃতি
তৎকালীন প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং 'চরমপত্র' খ্যাত ব্যক্তিত্ব এম আর আখতার মুকুল তখন লন্ডনে ছিলেন। তিনি তাঁর ‘মুজিবের রক্ত লাল’ গ্রন্থে স্মৃতিচারণ করেছেন যে, বিবিসিতে বসে তিনি যখন এই খবর শুনছিলেন, তখন তাঁর পৃথিবী যেন থমকে গিয়েছিল। লন্ডনের রেস্টুরেন্টে বসে একাকী অশ্রু বিসর্জন দিয়েছিলেন এই মহান নেতার জন্য। তিনি লিখেছেন, কীভাবে এক মহানায়ককে অতি সাধারণ অবস্থায় দাফন করা হয়েছিল, তা শুনে সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষ স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল।
সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস থেকে শিক্ষা
আজকের টুঙ্গীপাড়া আর ১৯৭৫ সালের টুঙ্গীপাড়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আজ সেখানে গড়ে উঠেছে সুউচ্চ সমাধিসৌধ, যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে আসে। কিন্তু ১৫ই আগস্টের সেই বিকেলটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় বিশ্বাসঘাতকতার চরম সীমা। এটি আমাদের শেখায় যে, বুলেট একজন মানুষকে হত্যা করতে পারে, কিন্তু তাঁর আদর্শকে নয়।
বঙ্গবন্ধুর রক্ত টুঙ্গীপাড়ার মাটিতে মিশে আছে। তাঁর সেই রক্তই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ আজ যে উন্নয়নের পথে হাঁটছে, তার মূলে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর সেই ত্যাগ ও রক্তধারা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একটি নাম নন, তিনি একটি জাতিসত্তার পরিচয়। ঘাতকরা তাঁকে নিভৃত পল্লীতে দাফন করে আড়াল করতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি আজ প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে সিংহাসন গেড়ে বসে আছেন। মধুমতি নদীর ঢেউয়ে, বাঘিয়া নদীর কলতানে আজও যেন শোনা যায় সেই চিরচেনা বজ্রকণ্ঠ। টুঙ্গীপাড়ার সেই রক্তস্নাত ঘাস আজও সাক্ষ্য দেয় এই বাংলার মাটি তাঁর ঋণী।
সূত্রঃ মুজিবের রক্ত লাল - এম আর আখতার মুকুল
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.














