>

>

বাঙালির মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর শেষ বিদায় - টুঙ্গীপাড়ার সেই করুণ বিকেল

বাঙালির মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর শেষ বিদায় - টুঙ্গীপাড়ার সেই করুণ বিকেল

শ্রাবণের সেই কালরাত ও স্তব্ধ বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট। বাংলার আকাশে সেদিন সূর্য উঠেছিল এক বিভীষিকাময় বার্তা নিয়ে। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের সেই বাড়িটি, যা ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু, তা তখন নিথর, নিস্তব্ধ এবং রক্তে রঞ্জিত। জাতির গাদ্দার বিশ্বাসঘাতকের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গেছেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সপরিবারে তাঁকে হত্যার মাধ্যমে এক কলঙ্কিত অধ্যায়ের সূচনা হয়। কিন্তু রাজনীতির এই মহানায়কের পার্থিব শরীরের শেষ গন্তব্য কোথায় হবে? ঘাতকরা চেয়েছিল তাঁকে লোকচক্ষুর অন্তরালে কোথাও ফেলে দিতে, কিন্তু বিধাতার লিখন ছিল তাঁর জন্মভূমি সবুজ ঘাসে ঘেরা নিভৃত পল্লী টুঙ্গীপাড়ায়।

TruthBangla

বাঙালির মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর শেষ বিদায় - টুঙ্গীপাড়ার সেই করুণ বিকেল

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত, বিষাদময় ও নিষ্ঠুরতম একটি দিন। যে শ্রাবণ মেঘের বর্ষণ বাংলার প্রকৃতিকে নতুন প্রাণ দেয়, সেই শ্রাবণের শেষ লগ্নেই নেমে এসেছিল এক অমাবস্যার অন্ধকার। বাংলার আকাশে সেদিন যে সূর্য উঠেছিল, তা আলো ছড়াতে পারেনি; বরং বহন করে এনেছিল এক বিভীষিকাময় ও রক্তভেজা বার্তা।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের সেই ঐতিহাসিক বাসভবনটি যা ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন এবং '৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল নির্দেশক ও স্বপ্নপূরণের কেন্দ্রবিন্দু তা তখন নিথর, নিস্তব্ধ এবং তাজা রক্তে রঞ্জিত। ঘাতকের বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হয়ে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সপরিবারে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যার মাধ্যমে বাঙালি জাতির কপালে আঁকা হয়েছিল এক চিরন্তন কুখ্যাত দাগ।

কিন্তু রাজনীতির এই মহানায়কের পার্থিব শরীারের শেষ গন্তব্য কোথায় হবে? ষড়যন্ত্রকারী ও ঘাতক চক্র চেয়েছিল তাঁকে লোকচক্ষুর অন্তরালে, অচেনা কোনো গণকবরে কিংবা ঢাকার কোনো গুমোট কোণে তড়িঘড়ি মাটিচাপা দিয়ে ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে চিরতরে মুছে ফেলতে। কিন্তু বিধাতার লিখন ও প্রকৃতির অমোগ বিধান ছিল অন্যরকম। যাঁর জন্ম হয়েছিল টুঙ্গিপাড়ার সবুজ-শ্যামল পল্লিঘেরা শ্যামলিমায়, যে মাটির ধূলিকণা গায়ে মেখে তিনি 'খোকা' থেকে 'বঙ্গবন্ধু' এবং অবশেষে 'জাতির পিতা' হয়ে উঠেছিলেন শেষ পর্যন্ত সেই জন্মভূমির নিভৃত কোণেই তাঁকে ফিরে যেতে হয়েছিল। ঘাতকদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়ে টুঙ্গিপাড়ার মাটিই বুকে টেনে নিয়েছিল তার সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানকে।

১৫ই আগস্টের কালরাত: রক্তাক্ত ধানমণ্ডি ৩২ ও থমকে যাওয়া বাংলাদেশ

১৫ই আগস্টের প্রথম প্রহরে, যখন সমগ্র ঢাকা নগরী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন একদল বিপথগামী ও উচ্চাভিলাষী সামরিক কর্মকর্তা ট্যাঙ্ক ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আক্রমণ চালায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে। যে বাড়িটিতে কোনো ধরনের বিলাসবহুল রাজকীয় নিরাপত্তা ছিল না, ছিল কেবল জনগণের প্রতি এক অকৃত্রিম ও অগাধ বিশ্বাস।

সেই গভীর রাতেই খুনীরা কেবল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি, তারা হত্যা করেছিল তাঁর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, জ্যেষ্ঠ পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামাল, কনিষ্ঠ পুত্র ১০ বছরের অবোধ শিশু শেখ রাসেল, দুই নবপরিণীতা বধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ নাসেরকে। একই রাতে ঘাতকদের বুলেটে শহীদ হন বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি এবং তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, বঙ্গবন্ধুর প্রধান রাজনৈতিক সচিব কর্নেল জামিল উদ্দীন আহমেদসহ আরও অনেকে।

রক্তে ভেসে গিয়েছিল ৩২ নম্বরের সিঁড়ি ও ঘরগুলো। বঙ্গবন্ধুর বুক ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল ঘাতকের ১৮টি বুলেট। চশমাটি ছিটকে পড়েছিল, প্রিয় তামাকের পাইপটি রক্তে রঞ্জিত হয়ে মেঝেই পড়েছিল। ঘাতকরা ভেবেছিল, একটি সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর জাতির আত্মাকে তারা চিরতরে পঙ্গু করে দিতে পারবে। কিন্তু খুনীদের মূল ভীতি তখনও কাটেনি বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ নিয়েও তাদের মধ্যে কাজ করছিল এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক।

খুনীদের কুচক্র ও লাশ গুম করার ভয়াবহ সিদ্ধান্ত

১৫ই আগস্ট সারাদিন বঙ্গবন্ধুর রক্তস্নাত মরদেহ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনের সিঁড়িতে অবহেলায় পড়ে থাকে। রাজধানী ঢাকায় তখন অঘোষিত কারফিউ, আকাশে সামরিক বিমানের আনাগোনা, রেডিওতে বেজে চলেছে ঘাতক চক্রের উদ্ধত ও কর্কশ ঘোষণা। ষড়যন্ত্রকারীদের প্রধান খন্দকার মোশতাক ও তার সহযোগী সামরিক খুনীরা খুব ভালো করেই জানত যদি বঙ্গবন্ধুর লাশ ঢাকায় দাফন করা হয়, তবে হাজার হাজার মানুষ কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে আসবে। বঙ্গবন্ধুর মাজার বা কবর ঢাকায় হলে তা তাৎক্ষণিকভাবেই এক বিশাল প্রতিরোধের দুর্গে পরিণত হতে পারে।

তাই খুনীচক্র সিভিল ও মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল বা কোনো আনুষ্ঠানিক মর্যাদার ধার না ধেরে সিদ্ধান্ত নেয় বঙ্গবন্ধুর মরদেহ ঢাকাজুড়ে রাখা নিরাপদ নয়। তাকে অনেক দূরে, বিচ্ছিন্ন কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠাতে হবে, যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্গম এবং সাধারণ মানুষের পৌঁছানো অসম্ভব। সেই লক্ষ্যেই বেছে নেওয়া হয় তাঁর জন্মস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামকে। তৎকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থায় টুঙ্গিপাড়া ছিল ঢাকা থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন এক নিভৃত পল্লি, যেখানে পৌঁছাতে নদী ও আকাশপথ ছাড়া সহজ কোনো উপায় ছিল না। ঘাতকদের উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার খুব গোপনে, দ্রুততম সময়ে, সাধারণ মানুষকে না জানিয়ে লাশ মাটিচাপা দিয়ে ঢাকায় ফিরে আসা।

টুঙ্গীপাড়ায় মরদেহ পাঠানোর সুদূরপ্রসারী কৌশল

১৫ই আগস্ট সকাল থেকে ১৬ই আগস্টের সকাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর মরদেহ ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের সিঁড়িতেই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। ঘাতক চক্র ও তাদের পেছনের রাজনৈতিক রূপকারেরা চরম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও আতঙ্কে ভুগছিল কী করবে এই হিমালয়সম নেতার মরদেহ নিয়ে?

ঢাকার আজিমপুর বা বনানী কবরস্থানে না দেওয়ার নেপথ্য কারণ

১. জনরোষের ভয়: খুনীরা ভালো করেই জানত, ঢাকার আজিমপুর বা বনানী কবরস্থানে শেখ মুজিবকে দাফন করা হলে ঢাকা শহরের লক্ষ লক্ষ মানুষ কারফিউ ভেঙে রাজপথে নেমে আসতে পারে। সেই জানাজা এক গণবিস্ফোরণে রূপ নিতে পারত।

২. স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হওয়ার আতঙ্ক: রাজধানী ঢাকায় তাঁর কবর থাকলে তা পরবর্তীতে মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলনের কেন্দ্রে পরিণত হবে এবং ঘাতকদের ভিত্তি নাড়িয়ে দেবে।

৩. একঘরে করে ফেলার কৌশল: খুনীদের পরিকল্পনা ছিল বঙ্গবন্ধুকে রাজধানী থেকে বহুদূরে এক প্রত্যন্ত ও বিচ্ছিন্ন গ্রামে নিয়ে গিয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে তাড়াহুড়ো করে মাটিচাপা দেওয়া, যাতে দেশের মানুষ কোনোদিন জানতেও না পারে তাঁর শেষ গন্তব্য কোথায় হয়েছিল।

এই সুদূরপ্রসারী ও কুটিল কৌশল থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বঙ্গবন্ধুর মরদেহ হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হবে তাঁর জন্মস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায়।

খুনীদের আতঙ্ক ও টুঙ্গীপাড়ায় মরদেহ: ১৬ই আগস্টের থমথমে দুপুর

অতীতের দিনগুলোতে টুঙ্গীপাড়ার আকাশে যখনই কোনো হেলিকপ্টারের শব্দ শোনা যেত, গ্রামে উৎসবের আমেজ নেমে আসত। বাঘিয়া নদীর পাড়ে শিশু-কিশোর, কৃষক ও আবালবৃদ্ধবনিতা দৌড়ে যেত। আকাশ থেকে নেমে আসতেন তাঁদের প্রিয় 'মিয়া ভাই', তাঁদের হৃদয়ের স্পন্দন শেখ মুজিব। তিনি সবাইকে বুকে জড়িয়ে ধরতেন, কারও কাঁধে হাত রাখতেন, খোঁজ নিতেন সাধারণ মানুষের।

কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৬ই আগস্ট দুপুরের দিকে টুঙ্গীপাড়ার আকাশে যখন আবার হেলিকপ্টারের গুঞ্জন শোনা গেল, তখনকার দৃশ্যপট ছিল একদম বিপরীত।

১৬ই আগস্ট ১৯৭৫, শনিবার। টুঙ্গিপাড়ার থমথমে পরিবেশ। ১৫ই আগস্ট সকাল থেকেই দেশজুড়ে রেডিওর মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশের মতো টুঙ্গিপাড়ার মানুষের মধ্যেও নেমে আসে এক অসীম শোক ও আতঙ্ক। পুলিশ ও সেনাসদস্যরা টুঙ্গিপাড়ায় টহল দিতে শুরু করে, জারি করা হয় কড়া নিষেধাজ্ঞা।

দুপুর দেড়টা থেকে দুইটার দিকে টুঙ্গিপাড়ার নদীঘেরা শান্ত নীল আকাশে শোনা গেল এক বিকট ও থমথমে গুঞ্জন একটি বিশাল সামরিক হেলিকপ্টারের (রাশিয়ান তৈরি এমআই-৮) শব্দ।

এর আগেও বহুবার টুঙ্গিপাড়ার মানুষ আকাশে হেলিকপ্টারের শব্দ শুনেছে। কিন্তু তখনকার পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অতীতে যখনই টুঙ্গিপাড়ার আকাশে হেলিকপ্টার উড়ত, গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা, সব বয়সের মানুষ বাঘিয়া ও মধুমতি নদীর পার ধরে দৌড়ে আসত। তারা জানত, তাদের প্রিয় 'মিয়া ভাই', তাদের হৃদয়ের স্পন্দন শেখ মুজিব এসেছেন তাঁর ভিটেমাটিতে। শিশু-কিশোররা হাত নেড়ে স্বাগত জানাত, বৃদ্ধরা দিতেন পরম স্নেহের দোয়া। টুঙ্গিপাড়া পরিণত হতো এক উৎসবের নগরীতে।

কিন্তু ১৬ই আগস্টের সেই থমথমে দুপুরে দৃশ্যপট ছিল এক বিভীষিকাময় নাটকের মতো। আকাশে হেলিকপ্টার চক্কর দিচ্ছে, কিন্তু কেউ ঘর থেকে বের হওয়ার সাহস পাচ্ছিল না। সেনাসদস্যরা আগেই এলাকাটি ঘিরে ফেলেছিল। চারদিকে বন্দুকের নল, কড়া পাহারা আর এক অজানা আতঙ্ক। টুঙ্গিপাড়া সেদিন এক শোকাতুর, স্তম্ভিত ও শ্মশানপুরীর নিস্তব্ধতায় ডুবে গিয়েছিল।

বাঙালির মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর শেষ বিদায় - টুঙ্গীপাড়ার সেই করুণ বিকেল

কফিনের ফাঁক চুইয়ে পড়া রক্ত: জন্মমাটির বুকে শেষ অঞ্জলি

টুঙ্গিপাড়া থানার পাশের হেলিপ্যাডে সামরিক হেলিকপ্টারটি অবতরণ করে। সেখান থেকে কোনো হাস্যোজ্জ্বল, চশমা পরা দীর্ঘদেহের মহানায়ক হেঁটে বেরিয়ে এলেন না। নামানো হলো একটি অপূরণীয় শূন্যতা একটি অপরিসর, অপরিপাটি এবং সাধারণ মেহগনি বা দেবদারু কাঠের তৈরি বাক্স বা কফিন। রক্তে ভেজা সেই কফিনটি দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা ছিল। সেনাসদস্যরা অত্যন্ত অবহেলা ও তাড়াহুড়োর সাথে কফিনটি নামিয়ে আনল।

হেলিকপ্টার থেকে নেমে এল সশস্ত্র কিছু সেনাসদস্য এবং কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা। সঙ্গে ছিলেন গোপালগঞ্জ ও টুঙ্গিপাড়া থানার কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা ও সরকারি কর্মচারী। সেখান থেকে কফিনটি বহন করে নিয়ে যাওয়া হয় বঙ্গবন্ধুর পৈতৃক বাড়ির আঙিনায়। কফিনটি বহন করার জন্য ডাকা হয়েছিল স্থানীয় কয়েকজন অধিবাসী, ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে যাদের মধ্যে ছিলেন সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন ম্যানেজার কাশেম, পোস্টমাস্টার আনোয়ার হোসেন, আব্দুল হাই মেম্বার, আকবর কাজী, ইলাইয়াস হোসেন প্রমুখ।

কফিনটি যখন বঙ্গবন্ধুর বাড়ির উঠানে, খোলা আকাশের নিচে রাখা হলো, তখন সেটিকে খোলার জন্য ডাকা হয় স্থানীয় কাঠমিস্ত্রি আইয়ুব আলী শেখ ও তাঁর বাবা হালিম শেখকে। কুড়াল ও হাতুড়ি দিয়ে যখন কাঠের কফিনটি খোলা হলো, তখন উপস্থিত কয়েকজন মানুষের হৃদয়ে যে দৃশ্য আঁকা হয়েছিল, তা তারা আজীবন ভুলতে পারেননি।

কফিনের ভেতরে জমে থাকা বরফ গলে পানি আর রক্তে একাকার হয়ে গিয়েছিল। কফিন খোলার সাথে সাথেই বেরিয়ে আসে বাঙালির রাখাল রাজার নিথর দেহ। বঙ্গবন্ধুর পরনে ছিল রক্তাক্ত সাদা পাঞ্জাবি, চেক লুঙ্গি আর গায়ে জড়ানো একটি সাধারণ চাদর। তাঁর বুকের মধ্যে তখনও চশমাটি ভাঁজ করে রাখা ছিল, আর পকেটে ছিল প্রিয় তামাকের পাইপটি।

খুনীদের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল জাতির পিতার বিশাল বুক ও শরীর। ১৮টিরও বেশি বুলেটের ক্ষতচিহ্ন সুস্পষ্ট ছিল তাঁর দেহে। যে হাত দিয়ে তিনি ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বিশ্ববাসীকে হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন:

"রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।"

সেই আঙুল ও হাত বুলেটে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ক্ষতস্থান থেকে চুইয়ে পড়া তাজা রক্ত তখন টুঙ্গিপাড়ার সবুজ ঘাসকে লাল করে তুলছিল। যে মাটিতে শৈশবে ধুলোবালি মেখে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন, সেই মাটি আজ তাঁরই রক্তে স্নাত হলো।

মৌলভী শেখ আব্দুল হালিমের স্মৃতিচারণে মেজরের সাথে তাঁর সাহসী লড়াই

বঙ্গবন্ধুর খুনীরা চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর মরদেহকে ঢাকার বাইরে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নিয়ে গিয়ে সাধারণ মানুষের অজান্তে এমনভাবে মাটিচাপা দিতে, যাতে সেখানে কোনো জনসংযোগ বা প্রতিবাদ গড়ে উঠতে না পারে। আর এই ঘৃণ্য উদ্দেশ্যে তারা বেছে নিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া

বঙ্গবন্ধুর খুনীদের সামরিক নির্দেশ ও কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও যিনি নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে সাহসিকতা, ইসলামিক শরিয়তের স্পষ্ট নিয়ম এবং অদম্য জোরালো দাবির মুখে জাতির পিতার মৃতদেহের কফিন উন্মুক্ত করিয়েছিলেন, ইসলামিক বিধানানুযায়ী গোসল করিয়েছিলেন এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর শরীরে খুনীদের রেখে যাওয়া ১৮টি বুলেটের ক্ষতচিহ্ন প্রত্যক্ষ করেছিলেন তিনি হলেন স্থানীয় টুঙ্গিপাড়া মসজিদের ইমাম মৌলভী শেখ আব্দুল হালিম

তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড, কাফন ও দাফন সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেছিলেন,

"১৫ আগস্ট সকালে প্রথম রেডিও খুলেই আমিসহ টুঙ্গিপাড়ার সাধারণ মানুষ শুনলেন সেই কুখ্যাত ঘোষণা। রেডিওতে অত্যন্ত কর্কশ ও অমার্জিত ভাষায় প্রচার করা হচ্ছিল যে, 'শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে'।"

"কথাটি টুঙ্গিপাড়া গ্রামে পৌঁছামাত্র পুরো জনপদ থমকে যায়। টুঙ্গিপাড়ার প্রতিটি মাটি ও মানুষ যাঁর স্নেহে বড় হয়েছে, যাঁর হাত ধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে, সেই খোকা অর্থাৎ শেখ মুজিবুর রহমান আর নেই এই খবরটি গ্রামীণ সাধারণ মানুষের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। মনে হয়েছিল যেন আক্ষরিক অর্থেই 'বিনা মেঘে বজ্রপাত' ঘটেছে।"

টুঙ্গিপাড়ার প্রতিটি মাটি ও মানুষ যাঁর স্নেহে বড় হয়েছে, যাঁর হাত ধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে, সেই খোকা অর্থাৎ শেখ মুজিবুর রহমান আর নেই এই খবরটি গ্রামীণ সাধারণ মানুষের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর পুরো পরিবারকে নির্বিচারে হত্যা করা হলেও এবং লাশগুলোকে বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে ফেলার প্রক্রিয়া চললেও, বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব এলাকা টুঙ্গিপাড়ায় কী হতে যাচ্ছে তা কেউ নিশ্চিত ছিল না।

১৬ আগস্ট সকালবেলা টুঙ্গিপাড়া থানায় শুরু হয় এক বিশেষ চাঞ্চল্য। সামরিক জান্তা ও স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নির্দেশে পুলিশ সদস্যরা স্থানীয় গণ্যমান্য ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের খুঁজে বের করতে থাকে। টুঙ্গিপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দ্রুত মৌলভী শেখ আব্দুল হালিমকে ডেকে পাঠান। মৌলভী হালিম সেখানে পৌঁছালে ওসি তাঁকে অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে একটি নির্দেশ দেন:

“আপনি অনতিবিলম্বে ১৩টি কবর খোঁড়ার বন্দোবস্ত করুন।”

এই নির্দেশ শুনে মৌলভী হালিম বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। ১৩টি কবর কেন? ঢাকায় যে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেল, ভ্রাতা শেখ নাসেরসহ স্বজনদের ওপর নারকীয় গণহত্যা চালানো হয়েছে, তা গ্রাম বাংলায় তখনও পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না। খুনীলা হয়তো প্রথমে চিন্তা করেছিল ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের সব মরদেহ টুঙ্গিপাড়ায় একসাথে কবর দেবে।

মৌলভী হালিম বুদ্ধিমান ও প্রজ্ঞাবান মানুষের মতো সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মনে মনে চিন্তা করলেন:

“একসাথে ১৩টি কবর খুঁড়ে লাভ কী? আগে একটি কবর খুঁড়ি। পরিস্থিতি কী দাঁড়ায় দেখি, তারপর দেখা যাবে।”

সকাল ৯টা বা সাড়ে ৯টার দিকে মৌলভী হালিম বঙ্গবন্ধুর শেখ বাড়ির পারিবারিক গোরস্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তাঁর সাথে কবর খোড়ার কাজে হাত মেলান স্থানীয় কয়েকজন সাধারণ মানুষ মদেল ফকিন (চৌকিদার), আব্দুল মান্নাফ এবং ইমাম উদ্দিন গাজী। তিনি বলেন,

"বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক গোরস্থানে প্রবেশের পর সর্ব উত্তরে থাকা বঙ্গবন্ধুর স্নেহময়ী মায়ের কবর এবং ঠিক তার পাশে বাবার (শেখ লুৎফর রহমান) কবর পর্যবেক্ষণ করি। স্থির করলাম বাবার কবরের ঠিক পশ্চিম পাশে সামান্য কিছু জায়গা ফাঁকা রেখে কবর খোদাই করা হোক।"

দুপুর ১২টার সংবাদে রেডিওতে ঘোষণা করা হয়: “শেখ মুজিবের লাশ টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং সেখানেই তাঁর দাফন সম্পন্ন হবে।” তখন পুরো গোপালগঞ্জ ও টুঙ্গিপাড়া অঞ্চলে কড়া সামরিক পাহারা বসানো শুরু হয়।

দুপুর দেড়টার দিকে টুঙ্গিপাড়া গ্রামে হেলিকপ্টার থেকে সামরিক কফিন নামিয়ে একদল সশস্ত্র সেনাসদস্য তা বহন করে বঙ্গবন্ধুর নিজ বাসভবনে নিয়ে আসে। মেজর পদমর্যাদার এক সামরিক কর্মকর্তা স্থানীয় ইমামকে ডেকে আনার নির্দেশ দিলে মৌলভী শেখ আব্দুল হালিম সামনে এগিয়ে যান।

স্মৃতিকথায় মৌলভী হালিম লিখে গেছেন সেই নাটাকীয় মুহূর্তের কথা:

মেজর: "আপনি কি এখানকার মৌলভী?"
মৌলভী হালিম: "জ্বি হ্যাঁ।"
মেজর: "আপনাকে এই লাশের জানাজার নামাজ পড়াতে হবে।"
মৌলভী হালিম: "কার জানাজার ব্যবস্থা করব?"
মেজর: "শেখ মুজিবের ডেড বডি।"
মৌলভী হালিম (ইংরেজি ভাষায়): "ইজ দ্য ডেড বডি অব শেখ মুজিব?" (Is this the dead body of Sheikh Mujib?)
মেজর: "হ্যাঁ।"

মেজর তখন টুঙ্গীপাড়া কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম ও কাজি মাওলানা আব্দুল হালিমকে ডেকে পাঠালেন অনতিবিলম্বে বন্ধ করা কাঠের কফিনটি কাঠামোর ওপর রেখে জানাজা পড়িয়ে মাটিচাপা দেওয়ার নির্দেশ দিলেন:

"অবিলম্বে লাশ কফিনসহ কবরে নামিয়ে মাটিচাপা দাও। সময় মাত্র ১০-১৫ মিনিট। কোনো বড় আয়োজনের দরকার নেই। গর্ত খোঁড়া তৈরি আছে, ফেলে মাটি দিয়ে দিন।"

মাওলানা আব্দুল হালিম ছিলেন একজন খাঁটি ঈমানদার ও স্বাধীনচেতা আলেম। সেনাসদস্যদের হাতের উঁচানো রাইফেল ও বেয়োনেটের মুখেও তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। চারপাশে থমথমে সশস্ত্র সৈনিক, মেশিনগান ও বন্দুকে লোডেড বুলেট সেই ভয়াবহ মুহূর্তে দাঁড়িয়েও তিনি নতি স্বীকার করেননি। মৌলভী হালিম অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে কফিন খুলতে চাইলেন।

মৌলভী হালিম: "আই মাস্ট সী দ্য ডেড বডি।" (I must see the dead body - আমাকে অবশ্যই লাশ দেখতে হবে।)
মেজর (বিরক্ত হয়ে): "ডু ইউ নট বিলিভ আস?" (Do you not believe us? - আপনি কি আমাদের বিশ্বাস করছেন না?)
মৌলভী হালিম: "আই বিলিভ ইউ, বাট আই ওয়ান্ট টু সি ফর মাই স্যাটিসফেকশন।" (I believe you, but I want to see for my satisfaction - আমি আপনাকে বিশ্বাস করি, তবে আত্মতৃপ্তির জন্য দেখতে চাই।)

মৌলভী হালিমের এই অনমনীয় মনোভাবের কাছে মেজর বাধ্য হন। ৩-৪ জন সেনাসদস্য এগিয়ে এসে কফিনের ওপর লাগানো পেরেক ও তালাগুলো খুলে ফেলে। কফিন খোলার পর মৌলভী শেখ আব্দুল হালিম দেখতে পান জাতির পিতার রক্তাপ্লুত মুখমণ্ডল। কাঠের কফিনের বাইরে রক্ত লেগে না থাকলেও ভেতরের অংশ জমাট রক্তে রঞ্জিত ছিল।

কফিন খোলার পর মৌলভী হালিম মেজরকে বলেন:

“ওনাকে তো গোসল দেওয়া হয়নি। বিনা গোসলে কোনো মুসলমানের জানাজা পড়া ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী জায়েজ নয়।”

মেজর প্রশ্ন করেন: “সময় নেই! তোমরা কি আদেশ অমান্য করছ? বিনা গোসলে কি মুসলমানের জানাজা হয় না?”

মাওলানা হালিম তখন আরবি ও ইংরেজির মিশ্রণে ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে উত্তর দেন:

"আপনারা যদি বলেন তিনি শহীদ হয়েছেন, তবে শহীদের জন্য গোসল না দিয়ে দাফনের বিধান আছে। সেক্ষেত্রে আমাকে লিখিত কাগজে সই দিয়ে লিখে দিন যে শেখ মুজিবুর রহমান 'শহীদ'। আর যদি তিনি শহীদ না হন, তবে একজন সাধারণ মুসলিম হিসেবে তাঁকে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী গোসল ও কাফন দিতেই হবে।"

একজন পল্লিগ্রামের ইমামের জ্ঞান ও স্পষ্টবাদী যুক্তির সামনে খুনী জান্তার মেজর স্তব্ধ হয়ে পড়েন। কারণ লিখিতভাবে 'শহীদ' ঘোষণা করলে খুনীদের রাজনৈতিক ভিত্তিই ধসে পড়বে, অন্যদিকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। মেজর কড়া গলায় বললেন:

“ঠিক আছে, আপনাকে গোসলের জন্য মাত্র ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হলো। এর মধ্যে শেষ করতে হবে।”

মৌলভী হালিম অনুরোধ করলেন: “গোসল করাতে আমার সাথে সাহায্য করার জন্য অন্তত ৮ জন লোক লাগবে।” মেজর সর্বোচ্চ ৮ জন স্থানীয় মানুষকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেন।

বঙ্গবন্ধুর শেষ গোসল ও ১৮টি বুলেটের ক্ষতচিহ্ন

সময় মাত্র ৩০ মিনিট! একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি, যিনি সারাজীবন বাঙালির অধিকারের জন্য জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, তাঁর শেষ বিদায়ের আয়োজন কতই না সাদামাটা ও করুণ ছিল!

বেলা তখন আনুমানিক দুপুর ২টা। মৌলভী শেখ আব্দুল হালিমসহ স্থানীয় ৮ জন মানুষ কফিন থেকে বঙ্গবন্ধুর রক্তাক্ত দেহ বের করে টুঙ্গিপাড়া বাড়ির চৌকাঠের তক্তার ওপর শুইয়ে দেন। কাপড় খুলে যখন পুরো শরীর ধৌত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন মৌলভী হালিম নিজ চোখে পর্যবেক্ষণ করেন মহান নেতার রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত দেহের বীভৎস চিত্র।

মৌলভী শেখ আব্দুল হালিমের স্বচক্ষে দেখা হিসাব অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর শরীরে ঘাতকদের ছোঁড়া মোট ১৮টি বুলেটের ক্ষতচিহ্ন বিদ্যমান ছিল। তিনি বলেন,

"বঙ্গবন্ধুর গায়ে ১৮টি গুলি লেগেছিল তবে মুখে কোন গুলি লাগেনি। দু'পায়ের গোড়ালীর ২টি রগই ছিল কাটা। মৃত্যুর পরেও গায়ের পাঞ্জাবীর বুক পকেটে চশমা, সাইড পকেটে তার প্রিয় পাইপ ছিল। মিলিটারীরা রক্তাক্ত কাপড় চোপড়সহ বিনা গোসলে লাশ কবর দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।"

মৌলভী শেখ আব্দুল হালিম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় বঙ্গবন্ধুর বাম বুকের নিচের অংশে চক্রাকারে প্রবেশ করেছিল ৯টি বুলেট। এই ৯টি বুলেটের কোনোটি পিঠ দিয়ে বের হয়নি, বরং শরীরের ভেতরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল। আরেকটি বুলেট শরীরের পেছন দিক থেকে তলপেট ভেদ করে সামনের দিকে বের হয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধুর বাম হাতের তর্জনী আঙুলে একটি বুলেট লেগেছিল, যার আঘাতে আঙুলটি প্রায় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ও থেঁতলানো অবস্থায় ঝুলে ছিল। এছাড়া দুই বাহুর উপরিভাগে দুটি এবং ডান হাতের তালুতে একটি বুলেটের ক্ষত চিহ্ন ছিল। দুই পায়ে মোট ৪টি বুলেটের ক্ষত ছিল দুটি হাঁটুতে এবং দুটি উরুর উপরে ও নিচের মাংসপেশিতে।

বুলেটের আঘাতের চেয়েও বীভৎস ছিল বঙ্গবন্ধুর দুই পায়ের গোড়ালির অবস্থা। ঘাতকরা কেবল গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি; নিশ্চিত মৃত্যুর পরও বঙ্গবন্ধুর দুই পায়ের গোড়ালির প্রধান দুটি রগ (Achilles tendon) কেটে দিয়েছিল। তবে খুনীদের কোনো বুলেট বঙ্গবন্ধুর মুখমণ্ডলে লাগেনি। মুখাবয়ব ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত, তবে চারপাশে তাজা রক্ত লেগে ছিল।

মৌলভী হালিম অত্যন্ত আবেগপ্লুত হয়ে লক্ষ্য করেন, চরম নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরও বঙ্গবন্ধুর পরিহিত পাঞ্জাবীর বুক পকেটে অক্ষত অবস্থায় ছিল তাঁর প্রিয় চশমাটি এবং সাইড পকেটে ছিল তাঁর বিশ্বখ্যাত ধূমপানের পাইপটি।

বঙ্গবন্ধুকে শেষ গোসল করানোর জন্য সাবানের প্রয়োজন হলে পার্শ্ববর্তী আশরাফ মোল্লা বা তৈয়ব আলীর সাধারণ মোদির দোকান থেকে কিনে আনা হয় কাপড় ধোয়ার '৫৭০ মার্কা সাবান'। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতিকে শেষবারের মতো পবিত্র করার জন্য ব্যবহার করা হলো সেই কাপড় কাচার '৫৭০ সাবান'! টিউবওয়েলের পানি গরম করে আব্দুল মান্নাফ শেখ, ইমাম উদ্দিন গাজী, মুন্নাফ শেখ, সোনা মিয়া ও কেরামত হাজীকে সঙ্গে নিয়ে মাওলানা আব্দুল হালিম পরম মমতায় জাতির পিতাকে গোসল করান।

রিলিফের শাড়িতে চরমতম ট্র্যাজেডির কাফন-দাফন

গোসল শেষে কাফনের কাপড়ের জন্য হাহাকার পড়ে যায়। টুঙ্গীপাড়ায় তখন কোনো নতুন সাদা থান কাপড় বা কাফনের পপলিন কাপড় পাওয়া যাচ্ছিল না। সেনাসদস্যরা কোনো কাফনের কাপড় সাথে আনেনি। অবশেষে রেডক্রসের (Red Cross) ত্রাণের জন্য আসা কাপড়ের গাঁট থেকে একটি সাদা সূতি শাড়ি নিয়ে আসা হয়। শাড়িটির লাল বা কালো পাড় (Border) কেঁচি দিয়ে কেটে বা ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়। সেই পাড়ছাঁটা রিলিফের শাড়িটিকেই জাতির পিতার কাফনের কাপড় হিসেবে ব্যবহার করা হয়!

ইতিহাসের কী নির্মম ও হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি! যে মানুষটি সারাজীবন বাংলার গৃহহীন, বস্ত্রহীন মানুষকে কাপড় ও রুটি দেওয়ার জন্য সংগ্রাম করেছেন, যে মানুষটি নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছেন এদেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর শেষ বিদায়ের সম্বল হলো ত্রাণের শাড়ির পাড়-ছেঁড়া টুকরো কাপড়। ইতিহাসের এর চেয়ে বড় ও নির্মম পরিহাস আর কী হতে পারে!

নিভৃত জানাজা ও নিস্তব্ধ দাফন

গোসল ও কাফন পরানোর প্রক্রিয়া শেষ হতেই সেনাসদস্যরা পুনরায় তাড়া দিতে থাকে: "সময় শেষ, দ্রুত জানাজা ও দাফন শেষ করতে হবে।"

টুঙ্গিপাড়ার সাধারণ মানুষ ও পাশের গ্রামের হাজার হাজার লোক তখন নিজ ঘরের জানালায়, গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন। তারা এসে প্রিয় 'মিয়া ভাই' এর জানাজায় অংশ নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেনাসদস্য ও পুলিশের বন্দুকের বাধার কারণে কাউকেই কাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি।

অবশেষে সেনাসদস্যদের ঘেরাও করা কড়া নজরদারির মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির আঙিনায় অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক জানাজা। সেনাবাহিনীর প্রচণ্ড তাড়াহুড়ার কারণে জানাজায় সাধারণ মানুষের প্রবেশের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত ছিল।

সারিতে দাঁড়ান মাত্র ২০ থেকে ৩৫ জন মানুষ। তাদের মধ্যে ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুল হালিম, কফিন বহনকারী ২০-২৫ জন স্থানীয় লোকজন, মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্র, সাথে থাকা কয়েকজন সেনা সদস্য এবং টুঙ্গিপাড়া থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্য ও ডিএসপি।

ইমামতি করেন মাওলানা আব্দুল হালিম। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভারাক্রান্ত সেই জানাজার সালাত শেষ হয় চোখের পানিতে। মোনাজাতে হাত তুলে উপস্থিত সবাই নিরবে কেঁদেছিলেন দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানের জন্য।

জানাজার নামাজ শেষ হওয়ামাত্রই মেজর ও তাঁর সৈন্যরা কফিন থেকে লাশ তুলে নিয়ে পূর্বে খুঁড়ে রাখা কবরে নামিয়ে দেয় এবং তড়িঘড়ি মাটিচাপা দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। পড়ন্ত বিকেলের বিষাদময় রোদে বঙ্গবন্ধুকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান এবং মাতা শেখ সায়েরা খাতুনের কবরের ঠিক পাশে।

১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ যে নবজাতকের প্রথম কান্নায় টুঙ্গিপাড়ার বাঘিয়া নদীর তীরের মেঠো পথ মুখরিত হয়েছিল, ১৯৭৫ সালের ১৬ই আগস্ট মাত্র ৫৫ বছর ৫ মাস ২৮ দিন বয়সে সেই মাটিতেই চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়লেন স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি। মাত্র সাড়ে ৫৫ বছরের এক ঝড়ো, মহাকাব্যিক ও সৃষ্টিশীল জীবনের অবসান ঘটেছিল টুঙ্গীপাড়ার সেই নির্জন মাটিতে।

দাফন পরবর্তী টুঙ্গিপাড়ার অবরুদ্ধ অবস্থা

বঙ্গবন্ধুকে টুঙ্গিপাড়ায় মাটিচাপা দেওয়ার পর সামরিক সরকারের নির্দেশে টুঙ্গিপাড়া শেখ বাড়িকে এক প্রকার বন্দিশালায় পরিণত করা হয়। কবর পাহারা দেওয়ার নামে ১০-১৫ জন সশস্ত্র পুলিশ দিনরাত মোতায়েন রাখা হয়। বাড়ির নিকটাত্মীয় ছাড়া কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হতো না।

দাফনের চারদিনের দিন (কুলখানি) টুঙ্গিপাড়া শেখ বাড়ির মসজিদে বা টুঙ্গিপাড়া কেন্দ্রীয় মসজিদে আত্মীয়স্বজনরা যখন মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করতে যান, তখন পুলিশ তাতে সরাসরি বাধা প্রদান করে। সরকারি বাধা ও ভয়ের মুখে পরবর্তীতে কেবল শেখ বাড়ির গৃহভ্যন্তরে একাকী একজন মৌলভী ডেকে বঙ্গবন্ধুর রুহের মাগফিরাত কামনায় গোপনে দোয়ার আয়োজন করা হয়েছিল।

১৫ ও ১৬ই আগস্ট ১৯৭৫-এর ঘটনাপঞ্জি

জাতির পিতার জীবনের শেষ যাত্রা ও টুঙ্গিপাড়ায় ঐতিহাসিক দাফনের প্রতিটি ধাপের তথ্য নিচে একটি ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

ঘটনাক্রম ও বিষয়

বিস্তারিত তথ্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

হত্যাকাণ্ডের তারিখ ও সময়

১৫ই আগস্ট ১৯৭৫; ভোর আনুমানিক ৫:০০ টা।

ঘটনাস্থল

বাড়ি নম্বর-৬৭৭, সড়ক নম্বর-৩২, ধানমন্ডি আ/এ, ঢাকা।

শাহাদাতকালীন বয়স

৫৫ বছর ৫ মাস ২৮ দিন (জন্ম: ১৭ই মার্চ ১৯২০)।

মরদেহ স্থানান্তরের মাধ্যম

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর রাশিয়ান তৈরি এমআই-৮ সামরিক হেলিকপ্টার।

টুঙ্গিপাড়ায় পৌঁছানোর সময়

১৬ই আগস্ট ১৯৭৫; দুপুর আনুমানিক ১:৩০ থেকে ২:০০ টা।

কফিন খোলার কারিগর

স্থানীয় কাঠমিস্ত্রি আইয়ুব আলী শেখ ও হালিম শেখ।

কফিনে লাশের অবয়ব

শরীরে ১৮টির বেশি বুলেটের চিহ্ন; বুকে চশমা ও পকেটে তামাকের পাইপ।

গোসলের নেতৃত্ব ও ইমাম

মাওলানা শেখ আব্দুল হালিম (টুঙ্গিপাড়া মসজিদের ইমাম)।

ব্যবহৃত সাবান

আশরাফ মোল্লা/তৈয়ব আলীর দোকান থেকে আনা '৫৭০ মার্কা' কাপড় কাচার সাবান।

কাফনের কাপড়ের উৎস

শেখ সাহেরা খাতুন রেডক্রস হাসপাতালের রিলিফের সুতি শাড়ি (পাড় কাটা)।

জানাজায় উপস্থিত লোকসংখ্যা

মাত্র ২০ থেকে ৩৫ জন (সেনা ও পুলিশের কড়া পাহারায়)।

দাফনের চূড়ান্ত স্থান

টুঙ্গিপাড়ায় পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা শেখ সায়েরা খাতুনের কবরের পাশে।

সুদূর লন্ডনে এম আর আখতার মুকুলের স্মৃতি ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর যখন বিশ্ব গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন বিশ্বনেতা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল। বিখ্যাত বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স, টাইম ম্যাগাজিন, গার্ডিয়ানসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পত্রপত্রিকাগুলো এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর বড় শিরোনামে প্রকাশ করে।

তখন প্রখ্যাত সাংবাদিক, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের 'চরমপত্র' খ্যাত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব এম আর আখতার মুকুল ছিলেন যুক্তরাজ্যের লন্ডনে। পরবর্তীতে তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মুজিবের রক্ত লাল’-এ সেই দিনগুলির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন কীভাবে লন্ডনের রাস্তায় ও বিবিসি কার্যালয়ে বসে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে তাঁদের জীবন থমকে গিয়েছিল।

এম আর আখতার মুকুল লিখেছেন:

"১৬ই আগস্ট লন্ডনে বসে যখন বিবিসির বুলেটিনে শুনলাম যে শেখ মুজিবকে তাঁর জন্মগ্রাম টুঙ্গীপাড়ায় নিয়ে গিয়ে পুলিশ ও সেনার পাহারায় তড়িঘড়ি করে দাফন করা হয়েছে, তখন আমার পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গিয়েছিল। লন্ডনের একটি বাঙালি রেস্টুরেন্টে বসে আমি একাকী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম। যে মানুষটিকে বিশ্বনেতারা সম্মান করতেন, যিনি একটি দেশের জন্ম দিলেন, তাঁকে নাকি দাফন করা হয়েছে রিলিফের শাড়ি দিয়ে! এ লজ্জা কেবল ঘাতকদের নয়, এ লজ্জা পুরো জাতির।"

নিউজউইক ম্যাগাজিন বঙ্গবন্ধুকে 'রাজনীতির কবি' (Poet of Politics) হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। সেই কবির শেষ বিদায় এমন ট্র্যাজিক ও নীরবতার মধ্য দিয়ে হবে, তা ছিল পুরো মানবজাতির জন্য এক বিরাট লজ্জা ও ব্যর্থতা।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া

দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ (The Daily Telegraph): পত্রিকাটি লিখেছিল, "সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবকে যদি এই পরিণতি বরণ করতে হয়, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে চরম মূল্য দিতে হবে।"

ওয়েস্ট জার্মান রেডিও (West German Radio): তাদের মন্তব্যে বলা হয়েছিল, "বাঙালি জাতিকে আর বিশ্বাস করা যায় না। যে জাতি তাদের নিজেদের পিতাকে হত্যা করতে পারে, তারা যেকোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।"

দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian): লিখেছিল, "শেখ মুজিব কেবল একটি রাজনৈতিক দল বা দেশের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন পুরো তৃতীয় বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের প্রতীক। তাঁকে হত্যা করে বাংলাদেশ তার নিজের আত্মাকেই বিসর্জন দিল।"

বাঙালির মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর শেষ বিদায় - টুঙ্গীপাড়ার সেই করুণ বিকেল

টুঙ্গীপাড়ারূপী সর্বজনীন তীর্থস্থান ও খুনীদের পরাভব

ঘাতক চক্র, মেজর ডালিম, ফারুক, রশীদ এবং তাদের পেছনে থাকা খন্দকার মোশতাক ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুকে রাজধানী থেকে বহুদূরে এক প্রত্যন্ত গ্রামে মাটিচাপা দিয়ে দিলে মানুষ তাঁকে ধীরে ধীরে ভুলে যাবে। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে, খুনীদের সেই হিসাব কতটা ভুল ছিল!

টুঙ্গীপাড়ার রূপান্তর: ১৯৭৫ সালের ১৬ই আগস্টের সেই থমথমে, নিস্তব্ধ ও রক্তস্নাত টুঙ্গীপাড়া আজ আর কোনো সাধারণ বিচ্ছিন্ন গ্রাম নয়। এটি আজ স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে পবিত্র স্থানসমূহের একটি বাঙালির চেতনার তীর্থস্থান।

যে মাটি একদা রক্তের ফোঁটা শুষে নিয়েছিল, সেই মাটিতে আজ গড়ে উঠেছে সুউচ্চ ও মহিমান্বিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসে এই মহানায়কের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। মধুমতি ও বাঘিয়া নদীর হাওয়ায় আজও যেন ভেসে বেড়ায় তাঁর সেই অমলিন উপস্থিতি।

টুঙ্গিপাড়ার ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট ও শৈশবের শিকড়

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতিকে বুঝতে হলে টুঙ্গিপাড়ার ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বোঝা অত্যন্ত জরুরি। গোপালগঞ্জ জেলা সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত টুঙ্গিপাড়া গ্রামটি মধুমতি ও তার শাখা নদী বাঘিয়ার অববাহিকায় গড়ে উঠেছে। নদীঘেরা সবুজ-শ্যামল এই পল্লিগ্রামটি ছিল প্রকৃতির এক অপূর্ব লীলাভূমি।

শৈশবে শেখ মুজিব এই নদীর পানিতে সাঁতার কেটেছেন, এখানকার ধানক্ষেত ও কাঁচা মেঠো পথে বন্ধুদের সাথে খেলে বেড়িয়েছেন। টুঙ্গিপাড়ার সাধারণ কৃষক, জেলে, মাঝিমাল্লাদের দুখ-কষ্ট প্রত্যক্ষ করেই তাঁর ভেতরে গড়ে উঠেছিল শোষিত মানুষের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা।

কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়াকালীন কিংবা পরবর্তীকালে ঢাকার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার সময়ও তিনি টুঙ্গিপাড়াকে কখনোই ভুলে যাননি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট পদ নয়, কিংবা স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় জাকজমক নয় তাঁর মন পড়ে থাকত টুঙ্গিপাড়ার সেই কাঁচা টিনের ঘর আর বাঘিয়া নদীর পাড়ে।

ঘাতকরা ভেবেছিল, টুঙ্গিপাড়ার মতো দূরবর্তী ও দুর্গম অঞ্চলে দাফন করলে শেখ মুজিবকে পৃথিবীর মানুষ ভুলে যাবে। তারা বুঝতে পারেনি যে, শেখ মুজিব এবং টুঙ্গিপাড়া দুটি আলাদা সত্তা নয়; বরং টুঙ্গিপাড়া হলো বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার অখণ্ড মূল শিকড়।

ইতিহাস মুছে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা ও আজকের টুঙ্গিপাড়া

১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ ২১ বছর ধরে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা নিষিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। সরকারি বেতার ও টেলিভিশনে তাঁর নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে, এমনকি বঙ্গবন্ধুর ছবি প্রদর্শনও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর কবরে সাধারণ মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি বসানো হয়েছিল।

ঘাতক ও তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকরা ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুকে মাটির নিচে চাপা দেওয়ার সাথে সাথে তাঁর আদর্শও শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, মানুষ মারা যায়, কিন্তু মানুষের আদর্শ ও কাজের কোনো মৃত্যু নেই।

আজকের টুঙ্গিপাড়া আর ১৯৭৫ সালের সেই নিস্তব্ধ, থমথমে টুঙ্গিপাড়া এক নয়। যে টুঙ্গিপাড়ায় একসময় সেনাসদস্যদের ভয়ে কেউ কাছে আসতে পারেনি, আজ সেই টুঙ্গিপাড়া পরিণত হয়েছে কোটি বাঙালির প্রাণের তীর্থস্থানে।

বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থল ঘিরে গড়ে উঠেছে এক সুদৃশ্য, গাম্ভীর্যপূর্ণ সমাধিসৌধ (Mausoleum)। প্রতিদিন দেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে আসেন টুঙ্গিপাড়ায়। যে মাটির ওপর একসময় রক্ত চুইয়ে পড়েছিল, সেই মাটি আজ কোটি মানুষের শ্রদ্ধা ও অশ্রুতে স্নাত হয়।

টুঙ্গিপাড়া সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স

টুঙ্গিপাড়ায় যেখানে বঙ্গবন্ধুকে সমাহিত করা হয়েছিল, সেখানে নির্মিত হয়েছে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর 'বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স'। ৩৮.৩০ একর জমির ওপর নির্মিত এই কমপ্লেক্সে রয়েছে মূল সমাধিসৌধ, উন্মুক্ত মঞ্চ, জাদুঘর, গবেষণা কেন্দ্র, পাঠাগার ও প্রদর্শনী কেন্দ্র। যে কফিনে করে ১৬ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর মরদেহ টুঙ্গিপাড়ায় নেওয়া হয়েছিল, সেটিও দর্শনার্থীদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে।

খুনীদের কঠোর পরিণতি ও বিচার প্রক্রিয়া

দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১২ই নভেম্বর সংসদে 'ইনডেমনিটি বাতিল আইন' পাস হয়, যা বিচার শুরুর পথ উন্মুক্ত করে। ১৯৯৬ সালের ২রা অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় এফআইআর দায়ের করা হয় এবং পরবর্তীতে সিআইডি তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।

বিচার বিভাগের রায়: ১৯৯৮ সালের ৮ই নভেম্বর নিম্ন আদালত ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘ আপিল শুনানি শেষে ২০০৯ সালের ১৯শে নভেম্বর আপিল বিভাগ ১২ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।

ফাঁসি কার্যকর: ২০১০ সালের ২৮শে জানুয়ারি প্রথম দফায় ৫ জন খুনীর (ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বাজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন ও মহিউদ্দিন আহমেদ) ফাঁসি কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে ২০২০ সালের এপ্রিলে ভারতে আত্মগোপনে থাকা আরেক ঘাতক ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদকে গ্রেপ্তার করে এনে ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস থেকে শিক্ষা

১৫ই আগস্টের কালরাত এবং ১৬ই আগস্টের নিভৃত দাফনের ঘটনাবলী কেবল একটি অতীত ইতিহাস নয়; এটি বাঙালির জন্য এক চিরন্তন শিক্ষা ও সতর্কবার্তা। এই ট্র্যাজেডি আমাদের শেখায় বিশ্বাসঘাতকতা ও চক্রান্ত কীভাবে একটি জাতির স্বপ্নকে মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।

যে জাতির জন্য শেখ মুজিবুর রহমান জীবনের প্রায় ১৩টি বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন, দুই বার ফাঁসির মঞ্চের মুখোমুখি হয়েছেন, সেই জাতিরই কিছু কুলাঙ্গার ও গাদ্দার তাঁর বুকে গুলি চালিয়েছে। এটি আমাদের রাজনৈতিক ও জাতীয় জীবনে চরম সতর্ক থাকার শিক্ষা দেয়।

তবে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো বুলেট দিয়ে একজন মানুষের দৈহিক অস্তিত্ব দূর করা যায়, কিন্তু তাঁর চিন্তা, দর্শন ও মূল্যবোধকে হত্যা করা যায় না। খুনীরা চেয়েছিল মুজিবকে টুঙ্গিপাড়ায় লুকিয়ে রাখতে, কিন্তু টুঙ্গিপাড়াই আজ গোটা বাংলাদেশের চেতনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বৈশ্বিক ক্ষেত্রে যে অগ্রযাত্রার পথে হাঁটছে, তার পেছনে প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক স্বপ্ন 'সোনার বাংলা' গড়ার প্রত্যয়। বঙ্গবন্ধুর রক্ত টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে মিশে গিয়ে এই দেশকে এক অপরাজেয় শক্তির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে দিয়ে গেছে।

রক্তভেজা ঘাস থেকে জেগে ওঠা চিরন্তন বাংলাদেশ

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের কালরাত এবং ১৬ই আগস্ট টুঙ্গীপাড়ার নিভৃত দাফন আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ও ট্র্যাজেডি।

বুলেট বনাম আদর্শ: খুনীরা বুলেট দিয়ে ৫৫ বছর বয়সী শেখ মুজিবুর রহমানের স্থূল শরীরটিকে নিঃশেষ করতে পেরেছিল, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন, আদর্শ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনাকে হত্যা করতে পারেনি।

বিশ্বাসঘাতকতার শিক্ষা: ইতিহাস শেখায় যে, শত্রুর চেয়ে ঘরের ভেতরের 'খন্দকার মোশতাক' মার্কা চরম বিশ্বাসঘাতকরা অনেক বেশি বিপজ্জনক।

অনশ্বর নাম: ঘাতকরা আজ ইতিহাসের আণবিক ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, তাদের নাম উচ্চারিত হয় ঘৃণার সাথে। আর যে মুজিবকে তারা মাটিতে পুঁতে দিতে চেয়েছিল, সেই মুজিব আজ একটি পতাকা, একটি মানচিত্র এবং কোটি কোটির হৃদয়ের ভালোবাসার অম্লান প্রতীক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি ভৌগোলিক রাষ্ট্র, একটি পতাকা, একটি জাতীয় সংগীত এবং একটি জাতির আত্ম পরিচয়ের রূপকার। ঘাতকরা ভেবেছিল ১৫ই আগস্টে তারা একটি ইতিহাসের সমাপ্তি টেনেছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা একটি অমর মহাকাব্যের সূচনা করেছিল।

টুঙ্গিপাড়ার যে রক্তভেজা ঘাসে ১৬ই আগস্টের পড়ন্ত বিকেলে তাজা রক্ত জমে গিয়েছিল, সেই ঘাস আজও নীরব সাক্ষ্য বহন করে চলেছে এক মহামানবের আত্মত্যাগের। মধুমতি নদীর ঢেউ আর বাঘিয়া নদীর হাওয়ায় আজও যেন ভেসে আসে সেই বজ্রকণ্ঠের প্রতিধ্বনি।

যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন বঙ্গোপসাগরের জলধারা প্রবহমান থাকবে, ততদিন টুঙ্গিপাড়ার সেই নিভৃত শয্যায় শায়িত থাকবেন বাঙালি জাতির পিতা। তিনি আজ কেবল টুঙ্গিপাড়ার মাটির গভীরে নন; তিনি বেঁচে আছেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের গভীরে, অসীম ভালোবাসায় ও অমর সম্মানে। খুনীরা তাঁকে মাটিচাপা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তারা জানত না যে তিনি ছিলেন একটি বীজ, যা মাটির নিচে গিয়ে আরও লক্ষ-কোটি মুজিবের জন্ম দিয়েছে।

টুঙ্গীপাড়ার সেই রক্তস্নাত ঘাস, ৫৭০ সাবান আর রিলিফের শাড়ির কাফন আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা কতটা ঋণগ্রস্ত এই মহানায়কের কাছে। রক্ত দিয়ে যে রাষ্ট্র তিনি গড়ে দিয়ে গেছেন, সেই বাংলাদেশ যতদিন মানচিত্রে টিকে থাকবে, টুঙ্গীপাড়ায় শায়িত শেখ মুজিবুর রহমান ততদিন বাঙালির পরম অভিভাবক হিসেবে আমাদের আলো যুগিয়ে যাবেন।

“যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।”

তথ্যসূত্রঃ মুজিবের রক্ত লাল - এম আর আখতার মুকুল

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 15, 2025

/

Post by

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গুজব, অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডার ভিকটিম হলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন আর কোনো নেতা নেই, যিনি তাঁর জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর এত তীব্র, নির্লজ্জ ও সুসংগঠিত মিথ্যাচারের শিকার হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানো হয়েছে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে মেরে ফেলার পর খুনীচক্র ও তাদের সুবিধাভোগীরা হাজারো গুজব ও বিকৃত গল্প ছড়িয়েছে।

Aug 9, 2026

/

Post by

সুদূর ইরাকের বাগদাদ নগরীর পুণ্যভূমি থেকে শুরু হয়ে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে আসা বাংলার পলিমাটি পর্যন্ত বিস্তৃত তেমনই এক কালজয়ী ও অলৌকিক বংশধারার ইতিহাস হলো টুঙ্গিপাড়ার ঐতিহ্যবাহী 'শেখ পরিবার'। ইসলামের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি সাধক, সুলতানুল আউলিয়া বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)-এর পুণ্যময় রক্তের ধারা কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করে সুদূর ইরাক থেকে এসে বাংলাদেশের রাজনীতি, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের সূতিকাগার টুঙ্গিপাড়ায় শিকড় গেড়েছিল তা এক পরম বিস্ময়কর ইতিহাস।

Aug 9, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধু যে উদার মন নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং পাকি-তোষামোদকারী গোষ্ঠীসমূহকে ক্ষমা প্রদর্শন করেছিলেন, সেই ক্ষমার মহত্ত্ব উপলব্ধি করার মতো মানবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেই পরাজিত অপশক্তির ছিল না। বিষধর সাপকে আশ্রয় দিলে তার হিংস্রতা যেমন কমে না, তেমনি সাধারণ ক্ষমার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নেপথ্যে সংগঠিত হয়েছিল সেইসব দেশদ্রোহী ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী, যারা শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বুকেই মারণ-কামড় বসিয়েছিল।

Jun 22, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে কেবল হাজার বছরের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন; দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কীভাবে এই ভূষিত রূপটি একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। কবে, কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রত্যক্ষ ভোটে শেখ মুজিব এই অনন্য খেতাব অর্জন করেছিলেন? সেই ঐতিহাসিক জরিপে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা সহযোগী অন্যান্য বাঙালি শ্রেষ্ঠরাই বা কারা ছিলেন?

May 23, 2026

/

Post by

একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিকে তাঁর নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটিয়েছিল সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী কর্মকর্তা ও জওয়ান। কিন্তু এই চরম জাতীয় ট্র্যাজেডির অব্যবহিত পরেই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে চোখের পলকে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছিল, তা কেবল নজিরবিহীনই নয়, বরং চরম বিস্ময় ও লজ্জার এক ঐতিহাসিক দলিল।

May 15, 2026

/

Post by

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালটি নিয়ে দুটি বিপরীতমুখী বয়ান পাওয়া যায়। একদল একে দেখেন ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচারের’ কাল হিসেবে, আর অন্যদল একে দেখেন একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শূন্য হাতে রাষ্ট্র গড়ার মহাবীরত্বগাথা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা এই সময়কালকে কেবল ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচার’ তকমা দিয়ে মুছে ফেলতে চায়। অন্যদিকে, সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসবিদরা দেখেন এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি জাতিকে টেনে তোলার প্রাণপণ লড়াই।

Aug 15, 2025

/

Post by

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গুজব, অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডার ভিকটিম হলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন আর কোনো নেতা নেই, যিনি তাঁর জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর এত তীব্র, নির্লজ্জ ও সুসংগঠিত মিথ্যাচারের শিকার হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানো হয়েছে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে মেরে ফেলার পর খুনীচক্র ও তাদের সুবিধাভোগীরা হাজারো গুজব ও বিকৃত গল্প ছড়িয়েছে।

Aug 9, 2026

/

Post by

সুদূর ইরাকের বাগদাদ নগরীর পুণ্যভূমি থেকে শুরু হয়ে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে আসা বাংলার পলিমাটি পর্যন্ত বিস্তৃত তেমনই এক কালজয়ী ও অলৌকিক বংশধারার ইতিহাস হলো টুঙ্গিপাড়ার ঐতিহ্যবাহী 'শেখ পরিবার'। ইসলামের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি সাধক, সুলতানুল আউলিয়া বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)-এর পুণ্যময় রক্তের ধারা কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করে সুদূর ইরাক থেকে এসে বাংলাদেশের রাজনীতি, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের সূতিকাগার টুঙ্গিপাড়ায় শিকড় গেড়েছিল তা এক পরম বিস্ময়কর ইতিহাস।

Aug 9, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধু যে উদার মন নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং পাকি-তোষামোদকারী গোষ্ঠীসমূহকে ক্ষমা প্রদর্শন করেছিলেন, সেই ক্ষমার মহত্ত্ব উপলব্ধি করার মতো মানবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেই পরাজিত অপশক্তির ছিল না। বিষধর সাপকে আশ্রয় দিলে তার হিংস্রতা যেমন কমে না, তেমনি সাধারণ ক্ষমার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নেপথ্যে সংগঠিত হয়েছিল সেইসব দেশদ্রোহী ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী, যারা শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বুকেই মারণ-কামড় বসিয়েছিল।

Jun 22, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে কেবল হাজার বছরের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন; দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কীভাবে এই ভূষিত রূপটি একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। কবে, কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রত্যক্ষ ভোটে শেখ মুজিব এই অনন্য খেতাব অর্জন করেছিলেন? সেই ঐতিহাসিক জরিপে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা সহযোগী অন্যান্য বাঙালি শ্রেষ্ঠরাই বা কারা ছিলেন?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.