>
>
জেএমবির দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলা - ১৭ আগস্টের রক্তাক্ত অধ্যায় ও নজিরবিহীন মাস্টারপ্ল্যান
জেএমবির দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলা - ১৭ আগস্টের রক্তাক্ত অধ্যায় ও নজিরবিহীন মাস্টারপ্ল্যান
মুন্সিগঞ্জ জেলা ব্যতীত দেশের বাকি ৬৩টি জেলায় প্রায় ৫০০টি স্থানে একযোগে, প্রায় একই সময়ে ৬ শতাধিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন ‘জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ’ (জেএমবি)। এই নজিরবিহীন সিরিজ বোমা হামলার প্রাথমিক লক্ষ্য ব্যাপক প্রাণহানি ঘটানো ছিল না; বরং রাষ্ট্রযন্ত্র, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ নাগরিকদের সামনে নিজেদের সুসংগঠিত উপস্থিতি, মহাদেশীয় বিস্তার এবং উগ্রপন্থী ভাবাদর্শের বার্তা পৌঁছে দেওয়া। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত টেকনাফ বা তেঁতুলিয়া সবখানেই একই সময়ে কেঁপে উঠেছিল মাটি।

TruthBangla

২০০৫ সালের ১৭ই আগস্ট, বুধবার। সময় তখন সকাল ঠিক ১১টা। আর দশটা সাধারণ কার্যদিবসের মতোই বাংলাদেশের রাজপথ, আদালত প্রাঙ্গণ, প্রশাসনিক দফতর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল কর্মব্যস্ত। কিন্তু পরবর্তী মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে সকাল ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার অবিশ্বাস্য স্বল্প ব্যবধানে পুরো স্বাধীন বাংলাদেশের সাড়ে তিন দশকের ইতিহাসে এমন এক ভয়াবহ, নজিরবিহীন ও সুসংগঠিত সন্ত্রাসী তাণ্ডব ঘটে যায়, যা কেবল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই কাঁপিয়ে দেয়নি, বরং বিশ্ব সন্ত্রাসের মানচিত্রে বাংলাদেশকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল।
মুন্সিগঞ্জ জেলা ব্যতীত দেশের বাকি ৬৩টি জেলায় প্রায় ৫০০টি স্থানে একযোগে, প্রায় একই সময়ে ৬ শতাধিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন ‘জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ’ (জেএমবি)। এই নজিরবিহীন সিরিজ বোমা হামলার প্রাথমিক লক্ষ্য ব্যাপক প্রাণহানি ঘটানো ছিল না; বরং রাষ্ট্রযন্ত্র, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ নাগরিকদের সামনে নিজেদের সুসংগঠিত উপস্থিতি, মহাদেশীয় বিস্তার এবং উগ্রপন্থী ভাবাদর্শের বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত টেকনাফ বা তেঁতুলিয়া সবখানেই একই সময়ে কেঁপে উঠেছিল মাটি। সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্ট, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জেলা জাজ কোর্ট, প্রেস ক্লাব ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সংরক্ষিত এলাকাগুলোকে টার্গেট করা হয়। এ হামলায় সাভারে এক শিশু এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক রিকশাচালক নিহত হন এবং দুই শতাধিক মানুষ গুরুতর আহত হন।
নিচে এই কাল রাততুল্য ঘটনা, জেএমবির উত্থান, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, আইনি প্রক্রিয়া এবং সার্বিক নিরাপত্তার একটি চুলচেরা রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।
১৭ই আগস্টের দেশব্যাপী তাণ্ডব: ঢাকাসহ ৬৩ জেলার ভয়াল চিত্র
২০০৫ সালের ১৭ই আগস্ট সকাল ঠিক ১১টা। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা দেশ। সকাল ১১টা থেকে ১১টা ১৫ মিনিটের মধ্যে মাত্র আধঘণ্টার ব্যবধানে বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক হামলা চালানো হয়। বান্দরবান জেলা ব্যতীত তৎকালীন ৬৩টি জেলার প্রায় ৫০০টি পয়েন্টে একযোগে ছয়শরও বেশি টাইম বোমার বিস্ফোরণ ঘটে।
প্রথম বোমাটি ফোটার পর সাধারণ মানুষ ভেবেছিল এটি হয়তো কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা কিংবা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে একে একে বিস্ফোরণের সংবাদ আসতে থাকলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে চরম অমানবিক বিভীষিকা, আতঙ্ক ও ভয়াবহ বিভ্রান্তি। মুহূর্তের মধ্যেই একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রকে স্তম্ভিত করে দেওয়ার মতো সুপরিকল্পিত ও নজিরবিহীন জঙ্গি তাণ্ডব প্রত্যক্ষ করে গোটা দেশবাসী।
উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করা। হামলায় সাভারে এক শিশু এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে এক রিকশাচালক নিহত হওয়ার পাশাপাশি পুলিশ সদস্য, বিচারক, আইনজীবী, সাংবাদিক ও সাধারণ পথচারীসহ সহাস্রাধিক মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হন।
প্রধান প্রধান টার্গেট ও ঢাকার থমথমে পরিস্থিতি
রাজধানী ঢাকায় সবচেয়ে সুরক্ষিত ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থানগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছিল, যাতে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি কেঁপে ওঠে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সচিবালয়: রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কেন্দ্রগুলোর অতি সন্নিকটে বিস্ফোরক ঘটিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখানোর অপচেষ্টা করা হয়।
সুপ্রিম কোর্ট ও নিম্ন আদালত: বিচার ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানা এবং বিচারকদের মনে ভয়ভীতি সঞ্চারের উদ্দেশ্যে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ এবং বিভিন্ন এজলাসের আশপাশে বোমা স্থাপন করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিমানবন্দর: মুক্তচিন্তার প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, কার্জন হল এবং আন্তর্জাতিক যাতায়াতের প্রধান বিন্দু বিমানবন্দর এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সাধারণ ছাত্র ও যাত্রীদের মাঝে চরম উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
জাতীয় প্রেস ক্লাব ও গণমাধ্যম: সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আতঙ্ক ছড়ানোর উদ্দেশ্যে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
ঢাকার বাইরে জেলা শহরগুলোর ভয়াবহতা
চট্টগ্রামের জেলা আদালত ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়, রাজশাহীর জাজ কোর্ট, খুলনার এসপি অফিস, সিলেটের বিচারালয় প্রাঙ্গণ, বরিশালের ডিসি অফিস, রংপুরের প্রশাসনিক ভবন এবং ময়মনসিংহের আদালত চত্বরসহ দেশের ৬৩টি জেলার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যালয়গুলোতে প্রায় একই সময়ে ছোট ছোট টাইম বোমা বা জর্দার কৌটায় সংরক্ষিত সময়নিয়ন্ত্রিত আইইডি (IED) বিস্ফোরিত হয়। প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা অচল করে দেওয়াই ছিল এই পরিকল্পিত আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য।

জঙ্গি গোষ্ঠী জেএমবির দায় স্বীকার ও আরবি বাংলায় লেখা লিফলেট
প্রতিটি বিস্ফোরণস্থল থেকে পুলিশ 'আহবান' শিরোনামে বাংলায় ও আরবিতে লেখা চরমপন্থী লিফলেট উদ্ধার করে। এর মাধ্যমে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) প্রথমবার প্রকাশ্যে এই হামলার দায় স্বীকার করে। সংগঠনটির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের নির্দেশে এই হামলা পরিচালিত হয়। লিফলেটে তারা স্পষ্ট করে জানায় যে, মানুষের তৈরি গণতান্ত্রিক আইন, সংবিধান ও বর্তমান বিচার ব্যবস্থা ইসলামবিরোধী। একই সঙ্গে বিচারক, সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী ও রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় যে, দেশে অভিলম্বে শরীয়াহ আইন জারি না করা হলে ভবিষ্যতে এর চেয়েও ভয়াবহ ও আত্মঘাতী হামলা চালানো হবে।
জেএমবির উৎপত্তি, আদর্শ ও সাংগঠনিক রূপরেখা (১৯৯৮-২০০৪)
১৭ই আগস্টের দেশব্যাপী নজিরবিহীন সিরিজ বোমা হামলা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এর পেছনে ছিল প্রায় সাত বছরের দীর্ঘ ও গোপনীয় প্রস্তুতি, সুসংগঠিত দাওয়াতি কার্যক্রম, দেশি-বিদেশি অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর আদলে ক্যাডার তৈরির এক সুদূরপ্রসারী নকশা। গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থাকে অকার্যকর ঘোষণা করে সশস্ত্র উপায়ে চরমপন্থী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই সময়জুড়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-র প্রতিষ্ঠা
১৯৯৮ সালে জামালপুর জেলার অধিবাসী ও মাদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রাক্তন ছাত্র শায়খ আবদুর রহমানের নেতৃত্বে 'জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ' (জেএমবি) আত্মপ্রকাশ করে। শায়খ আবদুর রহমান ইতোপূর্বে আফগান যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই তিনি কট্টর সালাফি-জিহাদি ভাবাদর্শ ধারণ করেন।
প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দুই বছর (১৯৯৮-২০০০) সংগঠনটি প্রকাশ্যে কোনো সহিংসতায় জড়ায়নি। এই সময়টিকে তারা কৌশলগত 'দাওয়াতি পর্ব' (Recruitment and Indoctrination Phase) হিসেবে নির্ধারণ করে।
জেএমবি মূলত বাংলাদেশে প্রচলিত সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে 'তাগুত' বা অপশাসন হিসেবে আখ্যায়িত করে ইসলামী শরীয়াহ শাসন প্রতিষ্ঠার উগ্র মতবাদ প্রচার শুরু করে। সালাফি-জিহাদি ভাবধারা অনুসরণ করে তারা গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার উগ্র ভাবাপন্ন তরুণ, মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ও স্থানীয় নেটওয়ার্কগুলোকে গোপনে সংগঠিত করতে থাকে। পুস্তিকা বিতরণ ও গোপন আসরের মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রবিরোধী ভাবাদর্শ ছড়াত।
সাংগঠনিক কাঠামো ও ছয় প্রশাসনিক বিভাগ
কার্যক্রম পরিচালনায় গতিশীলতা আনতে জেএমবি পুরো বাংলাদেশকে ৬টি প্রশাসনিক অঞ্চলে (মারকাজ) বিভক্ত করে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে:
১. উত্তরাঞ্চল (রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর): এটি ছিল জেএমবির প্রধান ও সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি। পরবর্তীতে সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে 'বাংলা ভাই' এর নেতৃত্বে 'জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ' (জেএমজেবি)-র মাধ্যমে এখানে সশস্ত্র তৎপরতা বাড়ানো হয়।
২. দক্ষিণাঞ্চল (খুলনা, যশোর, বরিশাল): নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও ক্যাডারদের চলাচলের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
৩. পূর্বাঞ্চল (সিলেট, কুমিল্লা): সীমান্ত সংলগ্ন কৌশলগত গুরুত্ব ও বৈদেশিক অর্থ স্থানান্তরের ট্রানজিট পয়েন্ট।
৪. মধ্য অঞ্চল (ঢাকা, ময়মনসিংহ, জামালপুর): রাজধানীকেন্দ্রিক তথ্য সংগ্রহ, উপাদান সংগ্রহ ও নীতি-নির্ধারণী যোগাযোগের কেন্দ্র।
৫. পশ্চিমাঞ্চল (পাবনা, কুষ্টিয়া): আঞ্চলিক অন্যান্য চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সাথে যোগাযোগের মাধ্যম।
৬. পার্বত্য অঞ্চল (চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জেলাসমূহ): অস্ত্র সংগ্রহ, সামরিক প্রশিক্ষণ ও দূরবর্তী গোপন আস্তানা তৈরির প্রধান অঞ্চল।
সংগঠনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও সামরিক কমান্ড বজায় রাখতে তিন স্তরের সদস্য কাঠামো তৈরি করা হয়:
মজলিস-এ-শূরা: শায়খ আবদুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী কমিটি (যেখানে বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানি, খালেদ সাইফুল্লাহ প্রমুখ অন্তর্ভুক্ত ছিল)। এটি নীতিনির্ধারণ, প্রকাশনা ও সশস্ত্র অভিযানের চূড়ান্ত অনুমোদন দিত।
এহসার: এরা ছিল সংগঠনের পূর্ণকালীন ও বায়আত গ্রহণকারী (শপথবদ্ধ) ক্যাডার। এরা নির্দিষ্ট মাসিক ভাতা পেত এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গোপন আস্তানায় বাস করত। যেকোনো আত্মঘাতী আক্রমণ, হামলা বা নাশকতামূলক কাজ বাস্তবায়নে এরা প্রস্তুত থাকত।
গায়রে এহসার: এরা ছিল খণ্ডকালীন সমর্থক ও সহযোগী। মূল সংগঠনের আদর্শে বিশ্বাসী হলেও তারা নিজ নিজ পেশায় নিয়োজিত থাকত, ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সন্দেহের বাইরে থাকত। প্রধান সংগঠনকে লজিস্টিক সহায়তা, বাসস্থান, তথ্য এবং অর্থ সরবরাহ করাই ছিল এদের মূল দায়িত্ব।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও প্রথম সামরিক প্রশিক্ষণ (২০০০)
২০০০ সালের দিকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে অবস্থানরত 'রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন' (আরএসও)-র গোপন প্রশিক্ষণ ঘাঁটিতে জেএমবির সামরিক শাখার ক্যাডারদের প্রথম পেশাদার সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। দুর্গম পার্বত্য এলাকা এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে তারা দীর্ঘদিন এই ক্যাম্প পরিচালনা করতে সক্ষম হয়। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত ছিল:
বিস্ফোরক ও ইলেকট্রিক সার্কিট তৈরি: সার (অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট), অ্যাসিড এবং ক্লিপ-সার্কিট ব্যবহার করে আইইডি (Improvised Explosive Device) ও টাইমার বোমা তৈরির কৌশল।
গেরিলা যুদ্ধ ও অস্ত্র চালনা: হালকা আগ্নেয়াস্ত্র চালনা, হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়ে মারা এবং পাহাড়ি ও সমতল এলাকায় ঝটিকা আক্রমণের যুদ্ধকৌশল।
নাইক্ষ্যংছড়ির এই গোপন প্রশিক্ষণ থেকেই জেএমবি বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক তৈরি ও একযোগে ব্যবহারের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করে, যা পরবর্তীতে ২০০৫ সালের ১৭ই আগস্টের সিরিজ বোমা হামলায় প্রয়োগ করা হয়েছিল।
রক্তক্ষয়ী প্রাথমিক মহড়া ও প্রশাসনিক অন্ধত্ব (২০০১-২০০৪)
২০০৫ সালের ১৭ই আগস্টের দেশব্যাপী অভূতপূর্ব নজিরবিহীন সিরিজ বোমা হামলার পটভূমি এক দিনে তৈরি হয়নি। এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ে জেএমবি (জামাত-উল-মুজাহেদিন বাংলাদেশ) দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক ছোট ও মাঝারি মাত্রার বোমা হামলা চালিয়ে নিজেদের বিস্ফোরক ক্ষমতা, কমান্ড স্ট্রাকচার এবং কৌশলগত সক্ষমতা পরীক্ষা করে নিয়েছিল। এসব রক্তক্ষয়ী ঘটনা ছিল মূলত তাদের বড় আকারের হামলার প্রাথমিক "ড্রাই রান" বা সামরিক মহড়া। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তৎকালীন রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চরম দায়িত্বহীনতা, পেশাদারিত্বের অভাব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির কারণে সেই প্রাথমিক লাল সতর্কবার্তাগুলো (Red Flags) সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়।
প্রাথমিক সন্ত্রাসী হামলার কালক্রম
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০০১ (সাতক্ষীরা): সাতক্ষীরার রক্সি সিনেমা হল এবং একটি সার্কাস প্যান্ডেলে একযোগে একাধিক বোমা হামলা চালায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি। এটিই ছিল প্রকাশ্যে সাধারণ জনগণের ওপর তাদের প্রথম সমন্বিত সামরিক উপস্থিতি ও ক্ষমতা প্রদর্শন, যা বিনোদন মাধ্যমকে 'অইসলামিক' আখ্যা দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করেছিল।
১ মে, ২০০২ (নাটোর): নাটোরের একটি জনাকীর্ণ সিনেমা হলে রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এই হামলায় বেশ কয়েকজন সাধারণ দর্শক গুরুতর আহত হন এবং পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
৭ ডিসেম্বর, ২০০২ (ময়মনসিংহ): ময়মনসিংহের চারটি সিনেমা হলে (ছায়াবাণী, অলকা, পুরবী ও অজন্তা) ঈদ পুনর্মিলনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলাকালীন একই সাথে ভয়াবহ ও সমন্বিত বোমা হামলা চালানো হয়। এতে ১৮ জন নিরীহ মানুষ নিহত হন এবং শতাধিক মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
এসব রক্তক্ষয়ী হামলার পর নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত করার পরিবর্তে তৎকালীন সরকার ও প্রশাসন ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চক্রান্ত কিংবা সাধারণ অপরাধীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। ফলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ধর্মীয় উগ্রবাদের গভীর শেকড় শনাক্ত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়, যা উগ্রবাদীদের আরও দুঃসাহসী করে তোলে।
এসব রক্তক্ষয়ী হামলার পর ঘটনার সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত না করে তৎকালীন সরকার এটিকে বিরোধী দলের চক্রান্ত অথবা সাধারণ অপরাধীদের কাজ বলে উড়িয়ে দেয়। গোয়েন্দারা উগ্রবাদের গোড়ায় হাত দিতে ব্যর্থ হয়।

'বাংলা ভাই' ও জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি)-র তাণ্ডব
২০০৪ সালের শুরুর দিকে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে (বিশেষ করে রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও বাগমারায়) চরমপন্থী সর্বহারা দমনের নামে দৃশ্যপটে আবির্ভাব ঘটে সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে 'বাংলা ভাই'-এর। তিনি জেএমবি-র সহযোগী সংগঠন ‘জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ’ (জেএমজেবি)-র ব্যানারে নিজস্ব সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী পরিচালনা শুরু করেন।
মধ্যযুগীয় নির্যাতন ও ত্রাসের রাজত্ব: বাংলা ভাই ও তাঁর সশস্ত্র ক্যাডাররা প্রকাশ্যে দিবালোকে মানুষকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে টর্চার সেলে নির্যাতন করত, হত্যা করে মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে রাখত এবং স্থানীয় এলাকায় নিজস্ব আইন জারি করে মধ্যযুগীয় কায়দায় তথাকথিত বিচারকার্য চালাত। স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন তখন নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে এবং সাধারণ মানুষ উগ্রবাদীদের কাছে একপ্রকার জিম্মি হয়ে পড়ে।
গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত: তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা চোখ এড়িয়ে কীভাবে এত বড় নেটওয়ার্ক গড়ে উঠল, সে প্রসঙ্গে মানবাধিকার ও জঙ্গি পর্যবেক্ষক নূর খান লিটন বলেন:
"২০০৫ সালের ১৭ অগাস্টের আগে বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। যেমন রমনা বটমূলে বোমা হামলা, আরো কিছু ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়গুলোকে জঙ্গি গোষ্ঠীর সংঘবদ্ধ হামলা, এই বিষয়টি তাদের গোচরীভূত হয়নি। এই ব্যাপারে তারা যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন না।"
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয়টি ছিল তৎকালীন নীতি-নির্ধারকদের রাজনৈতিক অস্বীকৃতি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনেক নেতা, মন্ত্রী ও শীর্ষ কর্মকর্তা মিডিয়ার সামনে প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন যে,
"বাংলা ভাই বলে বাস্তবে কেউ নেই; এটি মিডিয়ার সৃষ্টি।"
এই রাজনৈতিক আশ্রয়, গোয়েন্দা অন্ধত্ব এবং প্রশাসনিক সুরক্ষার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে শাইখ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাই গোপনে হাজার হাজার তরুণকে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করে ক্যাডার বাহিনীতে ভেড়ায়। এই প্রশাসনিক ব্যর্থতার সুযোগ নিয়েই জেএমবি ২০০৫ সালের ১৭ই আগস্টের ৬৩ জেলায় একযোগে হামলার মাস্টারপ্ল্যান সম্পন্ন করে।
১৭ই আগস্টের মাস্টারপ্ল্যান ও লজিস্টিকস: কীভাবে পৌঁছাল ৬০০ বোমা?
বিশ্বের সন্ত্রাসী হামলার ইতিহাসে একই দেশের ৬৩টি জেলায়, মাত্র আধা ঘণ্টার ব্যবধানে প্রায় ৫০০টি স্থানে সমন্বিত বিস্ফোরণ ঘটানোর ঘটনা এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। এটি কেবল অন্ধ মতাদর্শিক উন্মাদনার প্রকাশ ছিল না; বরং এর পেছনে ছিল একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত রূপরেখা, উচ্চমানের লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা একটি শক্তিশালী গোপন নেটওয়ার্কের গোপনীয়তা রক্ষা করার চরম সক্ষমতা।
কাঁচামাল সংগ্রহ, প্রযুক্তি ও বোমা তৈরি
জঙ্গি সংগঠন জেএমবির (জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ) মূল সামরিক ও প্রযুক্তি শাখা এই মাস্টারপ্ল্যানের নেপথ্যে কাজ করে। সংগঠনের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মাজেদুল ইসলাম ওরফে ‘ভারপ্রাপ্ত হাতকাটা মাজেদ’-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দেশব্যাপী কাঁচামাল সংগ্রহের কাজ শুরু হয়।
প্রতিবেশী দেশ থেকে চোরাইপথে আনা উপাদান এবং দেশীয় সার কারখানা থেকে সংগৃহীত পটাশিয়াম ক্লোরেট, সালফার, অ্যালুমিনিয়াম পাউডার, সায়ানাইড এবং বাজার থেকে কেনা সাধারণ ইলেকট্রনিক ঘড়ির টাইমার ব্যবহার করে তারা ছোট কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী ‘আইইডি’ (Improvised Explosive Device) তৈরি করে। এই বোমাগুলো মূলত কোকা-কোলার ক্যান, ছোট পাইপ বা জ্যামেট্রি বক্সের মতো অতি সাধারণ পাত্রে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে এগুলো খুব সহজে হাতব্যাগ, ঝোলা বা টিফিন ক্যারিয়ারে লুকিয়ে বহন করা যায় এবং কারো চোখে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না জাগায়।
চরম গোপনীয়তায় পরিবহন ও বিতরণ ব্যবস্থা
২০০৫ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই রাজধানী ঢাকা, উত্তরবঙ্গ এবং জামালপুরের দূরবর্তী গোপন আস্তানাগুলো থেকে শত শত তৈরি আইইডি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো শুরু হয়। এই পরিবহনে তারা কোনো নিজস্ব বিশেষ যানবাহন ব্যবহার করেনি; বরং সাধারণ গণপরিবহন ব্যবস্থা যেমন আন্তঃজেলা পাবলিক বাস, লঞ্চ ও ট্রেন ব্যবহার করেছিল। দূরপাল্লার বাস বা ট্রেনের সাধারণ যাত্রীদের ভিড়কে ঢাল বানিয়ে ‘এহসার’ (পূর্ণকালীন ক্যাডার) ও আঞ্চলিক প্রধানরা এসব ঘাতক পার্সেল নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। বাসের চালক, হেলপার বা সহযাত্রীদের কারো পক্ষেই ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া সম্ভব হয়নি যে তারা মৃত্যুঝুঁকি সাথে নিয়ে ভ্রমণ করছে।
হামলার দিন ও অপারেশনের কৌশল
১৭ই আগস্ট সকালে সারা দেশে একযোগে অপারেশন চালানোর জন্য সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা হয়। সকাল সাড়ে আটটা থেকে নয়টার মধ্যে প্রতিটি নির্ধারিত লক্ষ্যস্থলে (যেমন: জজ কোর্ট, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, প্রেস ক্লাব, বাসস্ট্যান্ড ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা) দুই থেকে তিনজন করে যুবক পৌঁছে যায়। তারা সাধারণ পথচারী বা অফিসে কর্মরত মানুষের পোশাকে গিয়ে ভিড়ের মাঝে মিশে যায়। টিফিন ক্যারিয়ার, ছোট ব্যাগ বা চায়ের কাপের আড়ালে টাইমার সক্রিয় করে তারা স্থানীয় জজ কোর্টের বেঞ্চ, ডাস্টবিন, চায়ের দোকানের পাশ কিংবা ঝোপঝাড়ে ব্যাগগুলো ফেলে রেখে নির্বিঘ্নে সরে পড়ে। ঠিক সকাল সাড়ে ১১টায় সারা দেশজুড়ে প্রায় একই সঙ্গে বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে শুরু করে একের পর এক বোমা।
একমাত্র ব্যতিক্রম: কেন বাদ পড়েছিল মুন্সিগঞ্জ?
৬৪টি জেলার মধ্যে একমাত্র মুন্সিগঞ্জ জেলাতেই সেদিন কোনো বিস্ফোরণ ঘটেনি। ঘটনার পর রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে প্রকাশ পায় যে, মুন্সিগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেএমবি সেল নির্দিষ্ট স্থানেই সময়মতো বোমাটি স্থাপন করেছিল। তবে তাঁদের ব্যবহৃত কেমিক্যাল টাইমারের অভ্যন্তরীণ কারিগরি ত্রুটির কারণে ডেটোনেটরটি সক্রিয় হতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় মানুষের সংবাদের ভিত্তিতে অক্ষত অবস্থায় সেই বোমা উদ্ধার করে পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট তা নিষ্ক্রিয় করে। এই একটিমাত্র যান্ত্রিক ত্রুটি না থাকলে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাই সেদিন একযোগে কেঁপে উঠত।

বিশেষজ্ঞ ও গোয়েন্দা বিশ্লেষণে জেএমবির কৌশল
জেএমবির কৌশলগত গভীরতা ও অপারেশনের নজিরবিহীন নিখুঁত পরিকল্পনা সম্পর্কে কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (CTTC)-এর তৎকালীন প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন:
"২০০৫ সালের ১৭ই অগাস্ট যখন ৬৩ জেলায় বম্বব্লাস্ট হলো, তখন জঙ্গিরা ছিল খুবই সুসংগঠিত। কারণ এই ধরণের হামলার ইতিহাস পৃথিবীতে নাই যে, একসঙ্গে একটা দেশের এতগুলো জায়গাতে সমন্বিতভাবে হামলার ঘটনা ঘটে। তারা চেয়েছিল, নো ক্যাজুয়ালটির মাধ্যমে নিজেদের জানান দেবে। এতো পরিকল্পিত সমন্বিত হামলার ইতিহাস পৃথিবীতে নাই।"
"আমরা দেখেছি, একটা দেশের অধিকাংশ জায়গায়, ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬৩টি জেলায় হামলা করার মতো তাদের সাংগঠনিক কাঠামো, সক্ষমতা, গোপন রাখার প্রক্রিয়া - সেগুলো তাদের ছিল।"
একইভাবে তৎকালীন প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা নজরদারির অভাবকে চিহ্নিত করে গবেষক ও সিনিয়র সাংবাদিক নুরুজ্জামান লাবু বলেন:
"আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যাপ্ত তৎপরতা ও গোয়েন্দা নজরদারি না থাকায় জঙ্গিরা সম্পূর্ণ আড়ালে থেকে বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরি করতে পেরেছিল। শুধু তাই নয়, চরম নিরাপত্তার চোখ ফাঁকি দিয়ে সেসব বোমা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় সরবরাহ করে এমন এক নজিরবিহীন সিরিজ হামলা পরিচালনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল।"
১৭ই আগস্টের পরবর্তী বিচারক হত্যা ও আত্মঘাতী মানববোমা (২০০৫-২০০৬)
১৭ই আগস্ট ২০০৫ সালে দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে প্রায় ৫০০ স্থানে বোমা হামলা চালিয়ে নিজেদের সুসংগঠিত উপস্থিতি জানান দিয়েছিল জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। এই নজিরবিহীন ঘটনার পর যখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাষ্ট্রযন্ত্র দেশব্যাপী ব্যাপক চিরুনি অভিযান এবং গ্রেপ্তার তৎপরতা শুরু করে, তখন জেএমবি কোণঠাসা না হয়ে চরম উগ্রপন্থার চূড়ান্ত ধাপে পদার্পণ করে। তারা সাধারণ দেশীয় হামলার কৌশল আমূল বদলে ফেলে এবং গঠন করে তথাকথিত ‘ইস্তিশহাদী স্কোয়াড’ (আত্মঘাতী দল)। তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশে আত্মঘাতী হামলার এই ধারণাটি ছিল সম্পূর্ণ নতুন ও ভয়াবহ, যা পুরো দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে নজিরবিহীন হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
ঝালকাঠিতে বিচারক হত্যা (১৪ নভেম্বর, ২০০৫)
১৭ই আগস্টের হামলাগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া এবং নিজেদের উগ্র ভাবাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া। তবে এই আতঙ্কের মধ্যেও বিচার বিভাগ যখন সংবিধান ও আইনের ধারায় বিচারকাজ অব্যাহত রাখে, তখন জেএমবি সরাসরি বিচারকদের টার্গেট করার সিদ্ধান্ত নেয়।
২০০৫ সালের ১৪ই নভেম্বর সকালে ঝালকাঠি জেলা জজ কোর্টে যাওয়ার পথে দুই সিনিয়র সহকারী বিচারক সোহেল আহমেদ এবং জগন্নাথ পাঁড়ে-কে বহনকারী গাড়িতে হামলা চালায় জেএমবির সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য আসাদুল ইসলাম ওরফে আরিফ। সে নিজের দেহে বাঁধা শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এই দুই মেধাবী ও সাহসী বিচারককে ঘটনাস্থলেই হত্যা করে। এটি ছিল বিচার বিভাগে সরাসরি আঘাত হানার প্রথম কোনো আত্মঘাতী ঘটনা, যা বিচারালয়গুলোতে গভীর আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
গাজীপুর ও চট্টগ্রাম আদালতে আত্মঘাতী হামলা
ঝালকাঠির ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই জেএমবি একই মাসে তাদের আত্মঘাতী হামলা বিচার অঙ্গনের অন্যান্য স্পর্শকাতর স্থানে ছড়িয়ে দেয়:
গাজীপুর জজ কোর্ট (২৯ নভেম্বর, ২০০৫): গাজীপুর জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের লাইব্রেরি কক্ষে বিচারপ্রার্থীর ছদ্মবেশে প্রবেশ করে আত্মঘাতী জঙ্গি সাব্বির ওরফে অমর্ত্য। আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের লক্ষ্য করে সে নিজের দেহে থাকা বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে ৮ জন আইনজীবী, সহকারী ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান এবং বহু মানুষ গুরুতর আহত হন।
চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণ (২৯ নভেম্বর, ২০০৫): ঠিক একই দিনে চট্টগ্রামের আদালত প্রাঙ্গণের মূল প্রবেশমুখে দায়িত্বরত পুলিশের চেকপোস্টকে লক্ষ্য করে আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। এতে পুলিশ সদস্যসহ বেশ কয়েকজন সাধারণ নাগরিক নিহত হন। একদিনেই দুটি প্রধান শহরের আদালত প্রাঙ্গণে হামলা চালিয়ে তারা প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবলয় ভেদ করা তাদের লক্ষ্য।
নেত্রকোনা উদীচী কার্যালয়ে ভয়াবহ বিস্ফোরণ (৮ ডিসেম্বর, ২০০৫): বিচার ব্যবস্থার পাশাপাশি মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকেও জেএমবি তাদের প্রতিপক্ষ মনে করত। ২০০৫ সালের ৮ই ডিসেম্বর নেত্রকোনা শহরের উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয় ও জেলা চেম্বার অব কমার্স ভবনের সামনের জনাকীর্ণ এলাকায় আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। একটি বাইসাইকেল নিয়ে জনসমাগমের মধ্যে ঢুকে জঙ্গি সদস্যটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এই নৃশংস ঘটনায় ৮ জন নিহত হন এবং ৫০ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
মাত্র চার মাসের ব্যবধানে একের পর এক আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে জেএমবি প্রমাণ করে যে, তারা কেবল দূর থেকে দূরনিয়ন্ত্রিত বোমা ফাটিয়েই ক্ষান্ত থাকবে না, বরং নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়ে ধ্বংসলীলা চালাতেও প্রস্তুত। এই আত্মঘাতী কৌশল কেবল আদালত ও বিচার ব্যবস্থার ওপরই আঘাত হানেনি, বরং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও প্রাত্যহিক জীবনের ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্কের ছায়া ফেলেছিল।
ক্র্যাকডাউন, শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার ও ফাঁসি (২০০৬-২০০৭)
২০০৫ সালের ১৭ই আগস্ট দেশব্যাপী নজিরবিহীন সিরিজ বোমা হামলা এবং পরবর্তীতে ঝালকাঠি ও গাজীপুরে বিচারকদের ওপর আত্মঘাতী হামলায় স্তম্ভিত হয়ে পড়ে গোটা দেশ। দেশের বিচারব্যবস্থাকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করায় এবং ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় তীব্র অভ্যন্তরীণ জনরোষ ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়। এর প্রেক্ষিতে তৎকালীন সরকার জেএমবি দমনে সর্বাত্মক জিরো-টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে। এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বাংলাদেশ পুলিশ, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও ডিজিএফআই সমন্বিতভাবে জেএমবির আস্তানা, অর্থায়ন ও নেটওয়ার্ক সমূলে উৎপাটনে সর্ববৃহৎ ‘ক্র্যাকডাউন’ অভিযান শুরু করে।
‘অপারেশন সূর্য দীঘল বাড়ি’ ও শায়খ আবদুর রহমানের পতন
গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ২০০৬ সালের ১লা মার্চ গভীর রাতে সিলেটের শাপলাবাগ এলাকার ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ নামক একটি তিনতলা বাড়ি ঘিরে ফেলে র্যাব ও যৌথ বাহিনী। জেএমবির সর্বোচ্চ নেতা শায়খ আবদুর রহমান তাঁর পরিবার ও অনুসারীদের নিয়ে সেখানে আত্মগোপনে ছিলেন। বাড়িটির ভেতরে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, সুইসাইড ভেস্ট ও গ্রেনেড মজুত থাকায় বাহিনী অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নেয়। প্রায় ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা থমথমে অবরুদ্ধ অবস্থা, মাইকিং ও মনস্তাত্ত্বিক চাপের পর কোনো পথ খোলা না পেয়ে ২০০৬ সালের ২রা মার্চ সকালে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন জেএমবির সর্বময় প্রধান শায়খ আবদুর রহমান।
মুক্তাগাছায় বাংলা ভাই গ্রেফতার ও শীর্ষ কমান্ডের ধস
শায়খ আবদুর রহমানের গ্রেফতারের মাত্র চার দিন পর, ২০০৬ সালের ৬ই মার্চ ভোরে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার এক দুর্গম ও গোপন আস্তানায় অভিযান চালায় র্যাব। আস্তানা ঘেরাও করার সময় পুঁতে রাখা বিস্ফোরকের বিস্ফোরণে গুরুতর আহত অবস্থায় গ্রেফতার হন জেএমবির সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ও সামরিক প্রধান সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই।
একই সময়ের ব্যবধানে ধারাবাহিক অভিযানে গ্রেফতার হন জেএমবির শুরা কমিটির অন্য শীর্ষ নেতারাও যাদের মধ্যে ছিলেন শায়খ আবদুর রহমানের ভাই ও সামরিক শাখার তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত আতাউর রহমান সানি, জামাতা ও সিলেট অঞ্চলের প্রধান আবদুল আউয়াল এবং সামরিক কমান্ডার খালেদ সাইফুল্লাহ। এর মাধ্যমে সংগঠনটির প্রথম সারির পুরো নীতিনির্ধারণী কাঠামো ভেঙে পড়ে।
দ্রুত বিচার ও ঐতিহাসিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
২০০৫ সালের ১৪ই নভেম্বর ঝালকাঠিতে জেলা জাজশিপের দুই বিচারক সোহেল আহমেদ ও জগন্নাথ পাঁড়ে হত্যা মামলায় দেশের ইতিহাসে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করা হয়। ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত ২০০৬ সালের ৬ই মার্চ শীর্ষ নেতাদের দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টেও রায় বহাল থাকে এবং রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হয়।
২০০৭ সালের ২৯শে মার্চ মধ্যরাতে চরম নিরাপত্তার মধ্যে দেশের ৬টি পৃথক কারাগারে একযোগে জেএমবির শীর্ষ ৬ নেতার মৃত্যুদণ্ড ফাঁসির মাধ্যমে কার্যকর করা হয়:
১. শায়খ আবদুর রহমান: গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার।
২. সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই: ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার।
৩. আতাউর রহমান সানি: ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার।
৪. আবদুল আউয়াল: চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার।
৫. খালেদ সাইফুল্লাহ: পটুয়াখালী জেলা কারাগার।
৬. আসাদুল ইসলাম আরিফ: খুলনা জেলা কারাগার (পলাতক থাকায় পরবর্তীতে গ্রেফতারের পর রায় কার্যকর হয়)।
এই ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে বাংলাদেশে উগ্রবাদী ও জঙ্গিবাদী তৎপরতার প্রথম শক্তিশালী নেটওয়ার্কটি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
১৭ই আগস্ট সিরিজ বোমা হামলা মামলার বিচারিক পরিসংখ্যান
১৭ই আগস্টের নজিরবিহীন সিরিজ বোমা হামলার পর সারা দেশের ৬৩টি জেলার বিভিন্ন থানায় মোট ১৬১টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এই মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া ছিল দীর্ঘ, জটিল এবং আন্তর্জাতিক নজরে থাকা একটি আইনি অধ্যায়।
নিচে ১৭ই আগস্টের দেশব্যাপী সিরিজ বোমা সংক্রান্ত আইনি নিষ্পত্তির একমাত্র প্রদেয় সারণী উপস্থাপন করা হলো:
পরিমাপের ক্ষেত্র / সূচক | পরিসংখ্যান ও আইনি তথ্য | বিস্তারিত পর্যালোচনা ও মন্তব্য |
মোট দায়েরকৃত মামলা | ১৬১ টি | হামলার ধরণ অনুযায়ী বিভিন্ন জেলায় বিস্ফোরক ও হত্যা আইনে মামলা হয়। |
বিচার সম্পন্ন হওয়া মামলা | ১০২ টি | দীর্ঘ সাক্ষ্য গ্রহণ ও আলামত পরীক্ষা শেষে রায় ঘোষণা করা হয়। |
বিচারাধীন/প্রক্রিয়াধীন মামলা | ৫৯ টি | অনেক মামলা হাইকোর্টে আপিল ও আসামি পলাতক থাকায় স্থগিত আছে। |
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি | ৩৫ জন | ঝালকাঠি বিচারক হত্যা ও দেশের বিভিন্ন আদালতে হামলা মামলায়। |
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত | ১৩১ জন | মূল সমন্বয়কারী, বোমা প্রস্তুতকারী ও আঞ্চলিক প্রধান পর্যায়ের ক্যাডার। |
বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত | ১৮৪ জন | হামলা চালানো, লিফলেট বিতরণ ও আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে। |
আইনি খালাসপ্রাপ্ত আসামি | ১১৮ জন | সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আলামতের অভাবে আদালত থেকে খালাস পান। |
প্রধান দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব | শায়খ আবদুর রহমান, বাংলা ভাইসহ শূরা সদস্য | ২০০৭ সালের ২৯শে মার্চ শীর্ষ ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। |
(তথ্যসূত্র: কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগ ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স আইনি রেকর্ড শাখা)
'নব্য জেএমবি' ও হলি আর্টিসান ট্র্যাজেডি (২০১৬)
২০০৭ সালে শায়খ আবদুর রহমান, বাংলা ভাইসহ শীর্ষ ছয় নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর জেএমবির চিরাচরিত সাংগঠনিক কাঠামো (যা এখন 'ওল্ড জেএমবি' বা 'পুরাতন জেএমবি' নামে পরিচিত) চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে এবং প্রায় খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে দলটির মূল নেটওয়ার্ক বহু বছর স্তিমিত থাকলেও, সহিংস উগ্রবাদের সুপ্ত বীজ ও মতাদর্শিক প্রভাব সমাজ থেকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি।
আল-কায়েদা থেকে আইএসের দিকে মোড়
২০১৫-২০১৬ সালের দিকে মধ্যপ্রাচ্যে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ‘আইএস’ (ISIS)-এর উত্থান বিশ্বব্যাপী চরমপন্থার নতুন এক ঢেউ সৃষ্টি করে। এর প্রভাবে বাংলাদেশে জেএমবির অবশিষ্টাংশ এবং কিছু গোয়েন্দা-নজরদারির বাইরে থাকা চরমপন্থী গোষ্ঠী একত্রিত হয়ে ‘নব্য জেএমবি’ (Neo-JMB) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই নতুন ধারার নেতৃত্বে ছিলেন কানাডীয়-বাংলাদেশি নাগরিক তামিম চৌধুরী এবং সাংগঠনিক প্রচারক মারজান।
'পুরাতন জেএমবি'র সাথে 'নব্য জেএমবি'র কৌশলগত পার্থক্য ছিল আকাশ-পাতাল। আগের জেএমবি মূলত গ্রামকেন্দ্রিক ও মাদ্রাসাপড়ুয়া তরুণদের ওপর নির্ভরশীল ছিল; অন্যদিকে নব্য জেএমবি শহরের উচ্চবিত্ত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং ইংরেজি মাধ্যমের তরুণদের উগ্রবাদে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। তারা অ্যানালগ ম্যানুয়াল টাইম বোমার বদলে স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র (যেমন একে-২২ রাইফেল), আধুনিক সামরিক গ্রেনেড এবং অ্যাসল্ট ভেস্ট ব্যবহারে পারদর্শী হয়ে ওঠে। ইন্টারনেটের এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তাদের এই বিস্তার ঘটে।
১ জুলাই ২০১৬: হলি আর্টিসান ট্র্যাজেডি
নব্য জেএমবির সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ উন্মোচিত হয় ২০১৬ সালের ১লা জুলাই রাতে ঢাকার কূটনৈতিক পাড়া গুলশানের 'হলি আর্টিসান বেকারি'-তে। পাঁচজন সশস্ত্র সন্ত্রাসী সেখানে অতর্কিত হামলা চালিয়ে দেশি-বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করে। ভয়াবহ এই হামলায় ১৭ জন বিদেশী নাগরিক (ইতালীয়, জাপানি ও ভারতীয়), ৩ জন বাংলাদেশি নাগরিকসহ মোট ২০ জন জিম্মি নির্মমভাবে নিহত হন।
জিম্মিদের বাঁচাতে গিয়ে শুরুতেই শহীদ হন পুলিশের দুই বীর কর্মকর্তা (রবিউল ইসলাম ও সালাউদ্দিন খান)। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মাধ্যমে জিম্মি দশার অবসান ঘটে। ১৭ই আগস্টের সিরিজ বোমাহামলার ১১ বছর পর এই ঘটনা বাংলাদেশকে পুনরায় এক অভূতপূর্ব জঙ্গি হুমকির মুখোমুখি দাঁড় করায়।
বর্তমান কাউন্টার-টেররিজম কাঠামো ও অর্জিত শিক্ষা
১৭ই আগস্টের দেশব্যাপী সিরিজ হামলা এবং পরবর্তীতে হলি আর্টিসান হামলার আকস্মিক ধাক্কা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ তার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা কাঠামোয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। কেবল অপরাধের পর তদন্ত নয়, বরং 'প্রো-অ্যাক্টিভ' বা আগাম তথ্যভিত্তিক অভিযানের নীতি গ্রহণ করা হয়।
বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটের গঠন
সিটিটিসি (CTTC): ২০১৬ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অধীনে ‘কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম’ (CTTC) গঠন করা হয়। বিশেষায়িত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও অভিযানের মাধ্যমে এই ইউনিট কল্যাণপুরের ‘অপারেশন স্টর্ম ২৬’ সহ একাধিক সফল অভিযানে নব্য জেএমবির মূল নেটওয়ার্ক ও আস্তানা ভেঙে দেয়।
এটিকে (ATU): সমগ্র দেশব্যাপী সমন্বিতভাবে উগ্রবাদ দমনের লক্ষ্যে পুলিশ সদর দফতরের অধীনে 'অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট' (ATU) গঠন করা হয়, যা ঢাকার বাইরেও নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান জোরদার করে।
র্যাবের গোয়েন্দা শাখা: র্যাবের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ও স্পেশাল উইংকে আধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করা হয়, যা অনলাইন রিক্রুটমেন্ট ও ডিজিটাল অর্থায়ন ট্র্যাকিংয়ে বড় ভূমিকা রাখে।
১৭ই আগস্ট আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
রাজনৈতিক অন্ধত্ব পরিহার: জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে উগ্রবাদকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার বানানো কিংবা "মিডিয়ার সৃষ্টি" বলে উড়িয়ে দেওয়ার যে ভুল ২০০৪-২০০৫ সালে করা হয়েছিল, তা রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। জাতীয় সুরক্ষায় রাজনৈতিক মতভেদের ঊর্ধ্বে উঠে 'জিরো টলারেন্স' নীতি বজায় রাখা জরুরি।
প্রারম্ভিক লক্ষণ ও প্রযুক্তিগত নজরদারি: সাইবার স্পেস ও ডার্ক ওয়েবে উগ্রবাদের বিস্তার রোধে গোয়েন্দা নজরদারি আধুনিকায়ন করা অত্যন্ত আবশ্যক। যেকোনো ছোটখাটো বিস্ফোরণ, অস্ত্র উদ্ধার বা নিখোঁজ তরুণের ঘটনাকে অবহেলা না করে শুরুতেই তার গভীরে পৌঁছাতে হবে।
ডি-র্যাডিক্যালাইজেশন (উগ্রবাদ মুক্তকরণ) ও সামাজিক প্রতিরোধ: কেবল ফাঁসি বা জেল দিয়ে কিংবা শক্তির প্রয়োগ (Hard Power) করে উগ্রবাদ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর, সঠিক ধর্মীয় ব্যাখ্যা প্রচার, ভুল পথে যাওয়া তরুণদের পুনর্বাসন এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
জেএমবি সংক্রান্ত অজানা কিছু তথ্য
২০০৫ সালের ১৭ই আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার গভীরে অনুসন্ধান করলে কেবল মাঠপর্যায়ের হামলা নয়, বরং এর নেপথ্যে থাকা আন্তর্জাতিক অর্থায়ন, গোয়েন্দা চরম ব্যর্থতা এবং বিচার ব্যবস্থার ওপর সৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক অভিঘাতের বহু অজানা তথ্য উঠে আসে।
জেএমবির জটিল অর্থায়ন ও ‘গনিমাত’ কৌশল: কুয়েত ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কিছু আন্তর্জাতিক এনজিও (যেমন রিভাইভাল অব ইসলামিক হেরিটেজ সোসাইটি বা RIHS)-র তৎকালীন দাতব্য তহবিলের একটি অংশ ছদ্মবেশে জেএমবির গোপন অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্য ও পাকিস্তান থেকে হুন্ডি চ্যানেলের মাধ্যমে চট্টগ্রাম ও ঢাকার গোপন এজেন্টদের কাছে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা পৌঁছানো হতো।
জেএমবি তাদের ভাবাদর্শ অনুযায়ী ব্যাংক, এনজিও কার্যালয় ও বড় ব্যবসায়ীদের অর্থকে ‘গনিমাত’ (যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত মালামাল) গণ্য করত। জামালপুর, বগুড়া ও নওগাঁয় একাধিক ডাকাতির মাধ্যমে তারা শতকিলো বিস্ফোরক কেনার টাকা জোগাড় করেছিল।
আফগান ফেরত জঙ্গি ও আল-কায়দা ম্যানুয়াল: শায়খ আবদুর রহমান এবং হুজি-বি (হারকায়াতুল জিহাদ)-র শীর্ষ নেতারা ১৯৮০-র দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে অর্জিত কৌশলই তারা বাংলাদেশে প্রয়োগ করেন।
আল-কায়দার প্রস্তুতকৃত যুদ্ধের এনসাইক্লোপিডিয়া ‘মৌসুয়াত আল-জিহাদ’ বাংলায় অনুবাদ করে জেএমবির টেকনিক্যাল উইং ম্যানুয়াল বানিয়েছিল। এই ম্যানুয়াল দেখেই তারা ঘড়ির টাইমার ও পটাশিয়াম সম্বলিত পাইপ বোমা বানানো শিখেছিল।
প্রিন্টিং প্রেস ও গোপন প্রচার নেটওয়ার্ক: ঢাকার বাংলাবাজার ও নীলক্ষেতের কয়েকটি গোপন প্রেসে রাতের আঁধারে জেএমবির মুখপত্র 'জাগো মুজাহিদ' এবং ১৭ই আগস্টে ব্যবহৃত হাজার হাজার 'আহবান' লিফলেট ছাপা হয়েছিল।
লিফলেট ও বিস্ফোরক জেলায় জেলায় পৌঁছাতে সাধারণ পার্সেল সার্ভিস ও সবজির ট্রাকের ছদ্মবেশ ব্যবহার করা হতো, যা সাধারণ পুলিশি তল্লাশিতে ধরা পড়েনি।
বিচার বিভাগের মনস্তাত্ত্বিক ধস ও নিরাপত্তায় পরিবর্তন: ১৭ই আগস্টের পর এবং ঝালকাঠিতে বিচারক হত্যার পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো নিম্ন আদালতের বিচারকরা বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরে ও সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়ে এজলাসে বসতে শুরু করেন।
তৎকালীন জজ কোর্ট প্রাঙ্গণে অবাধ যাতায়াত বন্ধ করে আর্চওয়ে, স্ক্যানার মেশিন এবং পুলিশের স্থায়ী তল্লাশি চৌকি বসানোর সংস্কৃতি মূলত এই ঘটনার পরেই বাধ্যতামূলক হয়।
শায়খ আবদুর রহমানের জবানবন্দির চাঞ্চল্যকর তথ্য: ২০০৬ সালে গ্রেফতারের পর ইন্টারোগেশনে শায়খ আবদুর রহমান স্বীকার করেন যে, তিনি ২০০০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে দেশের ৬৩টি জেলায় অন্তত ৩টি করে মোট দুই শতাধিক গোপন 'সেফহাউস' (Safehouse) কিনে বা ভাড়া নিয়ে রেখেছিলেন।
হামলাকারীদের অনেকেই জানত না যে তারা একই দিনে সারা দেশে বোমা ফোটাচ্ছে; তাদের বলা হয়েছিল এটি কেবল স্থানীয় একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি। মূলত কেন্দ্রীয় পরিচালনা পর্ষদ (মজলিস-এ-শূরা) ছাড়া সাধারণ ক্যাডারদের কাছে পুরো ছকটি গোপন রাখা হয়েছিল।
সচেতনতা ও অক্ষুণ্ণ নিরাপত্তার অঙ্গীকার
২০০৫ সালের ১৭ই আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কালিমালিপ্ত অধ্যায় এবং অশুভ শক্তির রক্তক্ষয়ী আস্ফালনের দিন। মাত্র আধা ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের ৬৩টি জেলার প্রায় ৫০০টি স্থানে একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালিয়েছিল নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রপন্থী সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। এই নজিরবিহীন সহিংসতার মূল লক্ষ্য কেবল জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা ছিল না; বরং এ দেশের শত বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের মূল সার্বভৌমত্বকে এক লহমায় ধূলায় মিশিয়ে দেওয়াই ছিল তাদের আসল উদ্দেশ্য। আদালত চত্বর, সরকারি দপ্তর এবং জনসংগমস্থলকে লক্ষ্য করে চালানো এই পৈশাচিক হামলা পুরো জাতিকে এক চরম নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু এ দেশের সাধারণ মানুষ, বিচার বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃঢ় অবস্থানের কারণে জেএমবির সেই মূল উদ্দেশ্য সফল হয়নি। রাজপথে রক্ত ঝরেছে, নিষ্পাপ শিশু ও রিকশাচালক প্রাণ হারিয়েছেন, বিচারকরা শহীদ হয়েছেন কিন্তু বাংলাদেশের মূল স্তম্ভকে স্তব্ধ করা যায়নি।
আজ দুই দশকেরও বেশি সময় পর দাঁড়িয়ে ১৭ই আগস্ট কেবল একটি স্মৃতির পাতা নয়, বরং এটি একটি চিরন্তন শিক্ষা ও স্থায়ী সতর্কবার্তা। উগ্রবাদ এবং জঙ্গিবাদ কোনো নির্দিষ্ট সময়ের বিষয় নয়; সুযোগ পেলেই তারা নতুন কোনো ছদ্মবেশে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। তাই রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা নজরদারির ধারাবাহিক আধুনিকায়ন, আইন প্রয়োগের কঠোরতা এবং বিচারিক তৎপরতা বজায় রাখার পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতার দুর্গ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের নতুন প্রজন্মকে যুক্তি, মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করতে হবে, যেন কোনো অন্ধকার ভাবাদর্শ তাদের বিপথগামী করতে না পারে। ইতিহাসের এই রক্তঝরা ১৭ই আগস্ট যেন আর কোনোদিন নতুন কোনো রূপে ফিরে না আসে আজকের দিনে সেটাই হোক আমাদের সর্বজনীন অঙ্গীকার।
তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স (আইনি রেকর্ড শাখা): ২০০৫ সালের ১৭ই আগস্টের দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার ১৬১টি মামলা, চার্জশিট, বিচারাধীন অবস্থা এবং বিচারিক ফলাফলের অফিশিয়াল পরিসংখ্যান।
২. কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (CTTC) ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (ATU): জেএমবির সাংগঠনিক কাঠামো, ক্যাডার গঠন (এহসার ও গায়রে এহসার), নাইক্ষ্যংছড়ির প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, এনক্রিপ্টেড নেটওয়ার্ক ও 'নব্য জেএমবি' সংক্রান্ত গোয়েন্দা নথি।
৩. র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব): ২০০৬ সালের মার্চে সিলেটে 'অপারেশন সূর্য দীঘল বাড়ি' (শায়খ আবদুর রহমানের আত্মসমর্পণ) এবং মুক্তাগাছায় বাংলা ভাই গ্রেপ্তারের অভিযানভিত্তিক প্রেস রিলিজ ও আলামত রেকর্ড।
৪. ঝালকাঠি জেলা জজ কোর্ট ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট: দুই সহকারী বিচারক (সোহেল আহমেদ ও জগন্নাথ পাঁড়ে) হত্যা মামলার মূল রায়, ডেথ রেফারেন্স ও ফাঁসি কার্যকর সংক্রান্ত আইনি নথিপত্র।
৫. বিবিসি বাংলা (BBC Bangla): ১৭ই আগস্টের হামলার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত বিশেষ আর্কাইভাল রিপোর্ট ও ভিডিও তথ্যচিত্র (যেখানে মনিরুল ইসলাম ও নূর খান লিটনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছিল)।
৬. দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার (The Daily Star): ২০০১-২০০৫ মেয়াদে সাতক্ষীরা, নাটোর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার হামলা, ২০০৪ সালের 'বাংলা ভাই' এর উত্থান এবং ২০০৭ সালের ২৯ মার্চে ৬ শীর্ষ জঙ্গি নেতার ফাঁসি কার্যকর সংক্রান্ত ধারাবাহিক রিপোর্ট।
৭. বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদবিষয়ক গবেষণাগ্রন্থ: প্রবীণ সাংবাদিকদের লেখা বিভিন্ন বই (যেমন নুরুজ্জামান লাবুর উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ বিষয়ক বই ও নিবন্ধসমূহ)।















