১৫-৩১ আগস্ট ১৯৭৫ - বঙ্গবন্ধু হত্যার ১৫ দিনেই বদলে ফেলা হয় বাংলাদেশকে
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর পরবর্তী দুই সপ্তাহ অর্থাৎ ১৫ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সময়কাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার ও ষড়যন্ত্রমূলক অধ্যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর পরবর্তী ১৫ দিনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো, গণমাধ্যম এবং সামরিক নেতৃত্বে আমূল ও নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছিল। এই ১৫ দিনে কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে উল্টে দেওয়া হয়েছিল, কীভাবে ঘাতক ও তাদের দোসররা ক্ষমতার মসনদে জেঁকে বসেছিল এবং কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে ফেলার নীল নকশা শুরু হয়েছিল, তা আজও আমাদের শিহরিত করে।

TruthBangla

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ক্যালেন্ডারের পাতায় এটি কেবল একটি তারিখ বা সংখ্যা মাত্র নয়; বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বুকে এটি এক চিরস্থায়ী, গভীর ক্ষত। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ঐতিহাসিক বাসভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার মাধ্যমে কেবল একজন রাষ্ট্রপ্রধান বা একটি রাজনৈতিক পরিবারকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়নি; বরং সেই রক্তক্ষয়ী ভোরে কুঠারাঘাত করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের মূল শিকড়ে।
১৫ আগস্টের সেই পৈশাচিক ট্র্যাজেডির পর পরবর্তী ১৫ দিন অর্থাৎ ১৫ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট ১৯৭৫ পর্যন্ত সময়কাল ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার, কলঙ্কিত, ষড়যন্ত্রমূলক ও আশঙ্কাজনক অধ্যায়। এই সংক্ষিপ্ত ১৫ দিনের মধ্যে কীভাবে সুপরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে উল্টে দেওয়া হয়েছিল, কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ঘাতক ও তাদের দোসররা ক্ষমতার মসনদ পাকাপোক্ত করেছিল এবং কীভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে তার মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত করে এক পাকিস্তানি ভাবধারার সামরিক-আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল তা আজও যেকোনো সচেতন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদকে শিহরিত করে।
১৫ আগস্ট পরবর্তী ১৫ দিনের ঘটনাপ্রবাহ কোনো বিচ্ছিন্ন বা স্বতঃস্ফূর্ত সামরিক অভ্যুত্থানের ফল ছিল না। এটি ছিল একটি গভীর ও সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের প্রথম বাস্তবায়ন পর্ব। এই ১৫ দিনে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ, অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখল, মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় চার নেতাসহ প্রগতিশীল শীর্ষ রাজনীতিবীদদের ওপর নিপীড়ন, সামরিক নেতৃত্বে পরিবর্তন, জেলা গভর্নর প্রশাসনিক কাঠামো বাতিল এবং পররাষ্ট্রনীতিতে পাকিস্তানমুখী অক্ষ তৈরির মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মাকে হত্যা করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছিল। নিচে ১৯৭৫ সালের ১৫ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সেই বিভীষিকাময় ১৫ দিনের পুঙ্খানুপুঙ্খ ঐতিহাসিক ও বিশ্লেষণাত্মক পর্যালোচনা তুলে ধরা হলো।
১৫ আগস্টের বিভীষিকা, রক্তপাত ও বঙ্গভবনের ট্র্যাজেডি
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেষ রাতে (ভোররাতে) ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে ঘাতকদের বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর সাথে শাহাদাত বরণ করেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল, তাঁর স্ত্রী সুলতানা কামাল, দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামাল, তাঁর স্ত্রী পারভীন জামাল রোজী, ১০ বছরের অবুঝ শিশু শেখ রাসেল, বঙ্গবন্ধুর অনুজ শেখ আবু নাসের। একই রাতে ঘাতকচক্র পৃথক দল পাঠিয়ে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও তৎকালীন মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তাঁর কন্যা বিউটি, পুত্র আরিফ, নাতি সুকান্ত, ভাগ্নে শহীদ সেরনিয়াবাত, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে ও যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনি এবং তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনিকে। বঙ্গভবনের দিকে রওনা হয়ে ঘাতকদের ঠেকাতে গিয়ে শহীদ হন বঙ্গবন্ধুর প্রধান সামরিক সচিব কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ।
১৫ আগস্ট সকালে রক্তের দাগ শুকানোর আগেই বঙ্গভবনে শুরু হয় এক অসাংবিধানিক ও বেআইনি ক্ষমতার মহড়া। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ ঘাতক মেজরদের (ফারুক, রশীদ, ডালিম, শাহরিয়ার প্রমুখ) প্রত্যক্ষ পাহারায় নিজেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের 'প্রেসিডেন্ট' হিসেবে ঘোষণা করেন।
বঙ্গভবনে তড়িঘড়ি করে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে দিয়ে অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় মোশতাককে শপথ পড়ানো হয়। এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে বাধ্য করা হয় তিন বাহিনী প্রধান সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ, নৌবাহিনী প্রধান কমোডর এম এইচ খান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকারকে। এছাড়াও রক্ষীবাহিনীর প্রধান এন এ নূরুজ্জামানকে সেখানে উপস্থিত রাখা হয়। তিন বাহিনীর প্রধানদের দিয়ে রেডিও ও টেলিভিশনে নতুন অসাংবিধানিক সরকারের প্রতি 'আনুগত্য ও আস্থা' প্রকাশমূলক বক্তব্য প্রচার করানো হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে সামনে দাঁড় করিয়ে ঘাতকদের অসাংবিধানিক সামরিক অভ্যুত্থানকে আইনগত ও রাজনৈতিকভাবে 'ছদ্ম-বৈধতা' দেওয়া। বঙ্গভবন তখন রাষ্ট্রপতির বাসভবন থেকে রূপ নিয়েছিল ঘাতক মেজরদের প্রধান কার্যালয়ে, যেখান থেকে তারা রাষ্ট্রপ্রধানকে পুতুলের মতো নাচিয়ে পুরো দেশ নিয়ন্ত্রণের অপচেষ্টা করছিল।
১৬ আগস্টের সংবাদপত্র ও মেরুদণ্ডহীন সাংবাদিকতা
১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পরদিন, অর্থাৎ ১৬ আগস্ট সকালে যখন জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলো দেশের মানুষের হাতে পৌঁছায়, তখন স্তম্ভিত ও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে পুরো জাতি। সংবাদপত্রগুলোর ভাষা, সংবাদের অঙ্গসজ্জা এবং শিরোনাম দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে, দেশের গণমাধ্যমগুলো তখন বন্দুকের নল ও সামরিক সেন্সরশিপের কাছে কতটা জিম্মি ও মেরুদণ্ডহীন হয়ে পড়েছিল।
১৬ আগস্ট প্রকাশিত দেশের প্রধান প্রধান দৈনিক পত্রিকার শিরোনামগুলোর দিকে তাকালে ইতিহাসের সেই বিভীষিকাময় সত্য উন্মোচিত হয়। সবচেয়ে মর্মান্তিক ও পৈশাচিক বিষয় ছিল, তৎকালীন প্রধান সারির কোনো পত্রিকাতেই প্রথম পাতায় 'হত্যাকাণ্ড', 'নৃশংসতা' কিংবা 'বঙ্গবন্ধুর প্রাণহানি' শব্দটিকে প্রধান শিরোনাম করা হয়নি। বরং শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাত বরণের খবরটিকে অত্যন্ত কৌশলে প্রথম পাতার এক কোণে বা ভেতরের পাতায় অতি ক্ষুদ্র আকারে স্থান দেওয়া হয়েছিল। পত্রিকাগুলায় ছাপা হয়েছিল,
"সশস্ত্র বাহিনী জাতীয় স্বার্থে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের পতন ঘটিয়ে প্রেসিডেন্ট খোন্দকার মুশতাক আহমদের নেতৃত্বে ক্ষমতা গ্রহণ করেছে।"
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খবরটিকে অত্যন্ত অবজ্ঞার সাথে পত্রিকার এক কোণে ছোট করে ছাপানো হয়েছিল। সেখানে লেখা ছিল,
"ক্ষমতা গ্রহণের সময় সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বাসভবনে নিহত হন।"
পত্রিকাসমূহ এমনভাবে সংবাদ প্রচার করেছিল যেন এটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক পরিবর্তন, অথচ পর্দার আড়ালে তখন বন্দুকের নল আর ট্যাংক দিয়ে রাষ্ট্রকে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল।

দৈনিক বাংলা শিরোনাম করেছিল: "খন্দকার মোশতাক নয়া রাষ্ট্রপতি"।
দৈনিক ইত্তেফাক প্রধান সংবাদ বানিয়েছিল: "খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণ"।
দি বাংলাদেশ অবজারভার (The Bangladesh Observer) শিরোনাম দিয়েছিল: "Mushtaque Assumes Presidentship"।
পত্রিকাগুলোতে এমনভাবে সংবাদ পরিবেশন ও সম্পাদকীয় প্রকাশ করা হয়েছিল যেন এটি কোনো রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডি নয়, বরং একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক পরিবর্তন। ঘাতক মেজরদের এবং মোশতাককে উপস্থাপন করা হয়েছিল 'দেশপ্রেমিক' হিসেবে, যারা নাকি রাষ্ট্রকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে! অথচ বাস্তব সত্য ছিল, ঢাকার রাজপথে তখন ভারী ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান টহল দিচ্ছিল, সংবাদপত্রগুলোর কার্যালয়ে পাহারা বসিয়েছিল ঘাতক সেনাদল, এবং প্রতিটি সংবাদ সেন্সর বোর্ড হয়ে তবেই মুদ্রণে যাচ্ছিল। এই সেন্সরশিপের মাধ্যমে দেশের মানুষকে সত্য জানার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল।
খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতা দখল ও সামরিক শাসন
বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েও যিনি বিশ্বাসঘাতকতার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তিনি হলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। ১৫ আগস্টের পর দ্রুততার সাথে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন।
অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের কাছে বঙ্গভবনে শপথ নেন মোশতাক। এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পরিবেশ ছিল থমথমে। তিন বাহিনীর প্রধানরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁরা পৃথক ভাষণে নতুন সরকারের প্রতি তাদের আনুগত্য ও দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করেন। এটি ছিল একটি সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা, যদিও এর মূলে ছিল সম্পূর্ণ সামরিক শক্তি।
ক্ষমতা দখলের সাথে সাথেই ১৫ আগস্ট দেশজুড়ে সামরিক শাসন বা 'মার্শাল ল' জারি করা হয়। গণতন্ত্রকে বুটের তলায় পিষ্ট করে শুরু হয় স্বৈরশাসন।
১৬ আগস্ট থেকে কারফিউ কিছুটা শিথিল করা হলেও জনসাধারণকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত যেন তারা ঘরের ভেতরেই অবস্থান করেন। নতুন সরকার 'দেশপ্রেমিক ও শান্তিপ্রিয়' নাগরিকদের সহযোগিতার আহ্বান জানালেও কার্যত সাধারণ মানুষের ওপর নেমে এসেছিল ভীতি ও আতঙ্ক। রাস্তায় টহল দিচ্ছিল ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান।
টুঙ্গিপাড়ায় দাফন ও একটি নিশব্দ বিদায়
১৬ আগস্ট ১৯৭৫। সমগ্র দেশ যখন এক অজানা আতঙ্ক ও থমথমে স্তব্ধতায় অবরুদ্ধ, তখন ঘাতকচক্রের অন্যতম প্রধান মাথাব্যথার কারণ ছিল বঙ্গবন্ধুর মরদেহ কীভাবে ও কোথায় সৎকার করা হবে। ঢাকায় বঙ্গবন্ধুকে সমাহিত করা হলে সাধারণ মানুষের ভিড় জমতে পারে এবং তা থেকে রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান শুরু হতে পারে এই ভয়ে তড়িঘড়ি করে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকার বাইরে পাঠাবার সিদ্ধান্ত নেয় সামরিক জান্তা।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) থেকে পাঠানো অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়:
"সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের লাশ পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সামরিক হেলিকপ্টারযোগে ফরিদপুর জেলার টুঙ্গিপাড়ায় তাঁহার পৈতৃক ভিটায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং পারিবারিক গোরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।"
কিন্তু 'রাষ্ট্রীয় মর্যাদা'র নামে বাস্তব চিত্রে যা ঘটেছিল, তা ছিল মানবতা ও ধর্মীয় রীতির চরম অবমাননা:
১. গ্রাম অবরুদ্ধকরণ: ১৬ আগস্ট দুপুরে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ হেলিকপ্টারে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। আগে থেকেই পুরো টুঙ্গিপাড়া গ্রামকে সেনাবেষ্টনী দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। গ্রামবাসীদের ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি।
২. অপবিত্র গোসল ও কাফন ব্যবস্থা: স্থানীয় রেডক্রস বা ত্রাণ কেন্দ্র থেকে আনা সস্তা ৫৭০ লণ্ড্রি সাবান দিয়ে বঙ্গবন্ধুর গোসল করানো হয়। কোনো ভালো থান কাপড় না পাওয়ায় ত্রাণ কার্যের জন্য আসা সাধারণ সুতির শাড়ির লাল পাড় ছিঁড়ে তা দিয়ে জাতির পিতাকে কাফন পরানো হয়।
৩. সীমিত উপস্থিতিতে জানাজা: দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ও স্থানীয় কাজী আশরাফ আলী এবং মৌলভী হালিমসহ মাত্র ১৫-২০ জন বয়োবৃদ্ধ স্থানীয় গ্রামবাসী ও কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে জানাজায় অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। কোনো সাধারণ মানুষকে তাঁর শেষ মুখ দেখতে দেওয়া হয়নি। জানাজা শেষে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পারিবারিক কবরস্থানে পিতামাতার কবরের পাশে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
ঘাতকরা ভেবেছিল বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা নিভৃত গ্রাম টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে শেখ মুজিবকে পুঁতে ফেললেই তাঁর রাজনীতি, আদর্শ এবং স্মৃতি চিরতরে মুছে যাবে। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে, টুঙ্গিপাড়ার সেই নিরিবিলি মাটিই পরবর্তীতে পরিণত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থস্থানে এবং জাতীয় চেতনার প্রধান উৎসকেন্দ্রে।
দৃশ্যপট থেকে বঙ্গবন্ধুকে মোছার অভিযান
১৫ আগস্টের পর খন্দকার মোশতাক সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল দুটি প্রথমত, সাধারণ মানুষের মন ও মগজ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মুছে ফেলা; দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে তার ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল মূল ধারা থেকে বিচ্যুত করে পাকিস্তানি ভাবধারার দিকে চালিত করা। এর জন্য ১৬ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে একাধিক বিতর্কিত অধ্যাদেশ ও প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করা হয়।
প্রামাণ্যচিত্র ও সংবাদচিত্র বাজেয়াপ্তকরণ (১৬ আগস্ট)
১৬ আগস্ট তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় থেকে এক কঠোর ও জরুরি আদেশ জারি করা হয়। এতে বলা হয়:
"১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট বা তার পূর্বে মুক্তিপ্রাপ্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর পরিবার, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট সকল প্রামাণ্য চলচ্চিত্র, নিউজ রিল (Newsreel), রেকর্ডকৃত অডিও বক্তব্য ও তথ্যচিত্র তাৎক্ষণিকভাবে বাজার, প্রেক্ষাগৃহ এবং সরকারি আর্কাইভ থেকে তুলে নিতে হবে।"
নির্দেশ দেওয়া হয়, যার কাছেই এসব ভিডিও বা অডিও ক্যাসেট থাকবে, তাকে অতিসত্বর তথ্য মন্ত্রণালয়ে তা জমা দিতে হবে। অন্যথায় সামরিক আইনে তার বিচার করা হবে। এটি ছিল এক নজিরবিহীন 'সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সেন্সরশিপ' যার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস এবং মহানায়কের কণ্ঠস্বর সম্পূর্ণ আড়াল করার চেষ্টা হয়েছিল।
১৭ ও ১৮ আগস্ট: 'স্বাভাবিকতার' মিথ্যা প্রচার এবং জাতীয় নেতারা
১৫ আগস্টের পৈশাচিক ঘটনার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও তার পেছনে থাকা ঘাতক চক্র মারাত্মক এক মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংকটে পড়েছিল। তারা জানতো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং দেশের জনগণের কাছে যদি এই নতুন সরকারকে বৈধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা না যায়, তবে যেকোনো মুহূর্তে বিদ্রোহ ঘটতে পারে। তাই ১৭ ও ১৮ আগস্ট ছিল সরকারের পক্ষ থেকে 'স্বাভাবিকতার নাটক' সাজানোর দুই দিন।
১৭ আগস্ট: মনসুর আলী ও মুশতাক সাক্ষাৎ
১৫ আগস্টের পর থেকেই আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতা ও জাতীয় চার নেতাকে নিজ নিজ বাড়িতে নজরবন্দি করে রাখা হয়েছিল। ১৭ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী এম মনসুর আলীকে বঙ্গভবনে নিয়ে যাওয়া হয় খন্দকার মোশতাকের সাথে সাক্ষাৎ করানোর জন্য।
তৎকালীন সরকারি গণমাধ্যমে এটিকে 'সৌজন্য সাক্ষাৎ' হিসেবে বর্ণনা করা হলেও ঐতিহাসিক সত্য ছিল অন্যরকম। মোশতাক আকুলভাবে চেষ্টা করেছিলেন এম মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে তাঁর গঠিত অবৈধ মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করতে। মোশতাক বিশ্বাস করতেন, ১৯৭১ সালের প্রবাসী সরকারের এই শীর্ষ নেতাদের তাঁর সরকারে আনতে পারলে সাধারণ মানুষ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটিকে মেনে নেবে।
কিন্তু জাতীয় চার নেতা যাঁরা ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন তাঁরা ঘাতক ও বিশ্বাসের ঘাতক মোশতাকের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁরা সাফ জানিয়ে দেন, রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত অবৈধ সরকারের অংশ তাঁরা কোনো অবস্থাতেই হবেন না। জীবনের ঝুঁকি জেনেও চার নেতার এই অটল ঐতিহাসিক প্রত্যাখ্যানই পরবর্তীতে তাঁদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

১৮ আগস্ট: কৃত্রিম প্রাণচাঞ্চল্যের অপপ্রচার
১৫ আগস্টের সেই ভয়াবহতার পর সরকার চেষ্টা করেছিল বহির্বিশ্ব এবং দেশের মানুষের কাছে প্রমাণ করতে যে, পরিস্থিতি একদম 'স্বাভাবিক'। খন্দকার মুশতাক ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই নির্দেশ দেন যে, সকল সরকারি, আধা-সরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের অবিলম্বে কাজে যোগ দিতে হবে।
সারা দেশে স্বাভাবিক কর্ম তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে ১৮ আগস্টের বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশন করা হয়। ১৮ আগস্ট ১৯৭৫ এর প্রধান প্রধান পত্রিকাগুলোতে (যেমন: দৈনিক বাংলা, ইত্তেফাক) বড় বড় ছবি ছাপানো হয় কারওয়ান বাজার বা পুরান ঢাকার রাস্তায় সাধারণ মানুষের চলাচল, দোকানপাট খোলা এবং সচিবালয়ে সরকারি কর্মচারীদের উপস্থিতির দৃশ্য।
খবরের শিরোনাম করা হয়েছিল:
"সারা দেশে স্বাভাবিক কর্মতৎপরতা পুর্নবহাল।"
কিন্তু এই প্রাণচাঞ্চল্যের নিচে লুকিয়ে ছিল এক গুমোট আতঙ্ক এবং শোক। বন্দুকের নলের মুখে মানুষকে স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
মোশতাক সরকার আদেশ জারি করেছিল যে, অফিস-আদালতে বা কারখানায় কেউ অনুপস্থিত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জারিকৃত এক আদেশে বলা হয় যে, প্রত্যেক অফিস ইনচার্জ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাজ সুষ্ঠুভাবে সুনিশ্চিত করার জন্য দায়ী থাকবেন। অফিসে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অবহেলা বরদাস্ত করা হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। কলকারখানায় উৎপাদন শুরু করার জন্য বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়। বন্দুকের নল ও শাস্তির ভয়ে সাধারণ মানুষ কাজে যোগ দিতে বাধ্য হলেও, সেই কৃত্রিম স্বাভাবিকতার নিচে লুকিয়ে ছিল গভীর আতঙ্ক, ক্ষোভ ও স্বজন হারানোর কান্না।
২১ ও ২২ আগস্ট: সামরিক আইনের গেজেট ও জেনারেল ওসমানী
সংবিধানকে সম্পূর্ণভাবে পঙ্গু করে সামরিক শাসনকে আইনি ফ্রেমওয়ার্কে আনার জন্য ২১ ও ২২ আগস্ট দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা বাংলাদেশকে একটি অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার মধ্যে স্থায়ীভাবে বন্দি করে ফেলে।
২১ আগস্ট: সামরিক আইনের আনুষ্ঠানিক গেজেট জারি
১৫ আগস্ট সকালে খন্দকার মোশতাক রেডিওতে সামরিক শাসন জারির কথা বললেও, ২১ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এর সরকারি প্রজ্ঞাপন বা গেজেট জারি করা হয়। এই গেজেটটির প্রধান প্রধান ধারাগুলো ছিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রনীতির জন্য চরম হুমকি রূপ:
ভূতাপেক্ষ প্রভাব (Retrospective Effect): এই অধ্যাদেশটিকে ১৫ আগস্টের প্রথম প্রহর থেকে কার্যকর বলে ঘোষণা করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ও ক্ষমতা দখলকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া।
সংবিধানের অবমূল্যায়ন: বলা হয়, সামরিক আইনের বিধি ও আদেশের সাপেক্ষে সংবিধান বলবৎ থাকবে। অর্থাৎ সংবিধানের ওপর সামরিক আদেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
মৌলিক অধিকার ও বিচার বিভাগ পঙ্গু: যেকোনো নাগরিককে বিনা বিচারে আটকে রাখা এবং তাঁদের বিচার করতে বিশেষ সামরিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল গঠনের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয় রাষ্ট্রপতিকে। এসব ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সাধারণ কোনো হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা যেত না।
২২ আগস্ট: প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে জেনারেল ওসমানীর যোগদান
২২ আগস্টের দৈনিক পত্রিকাগুলোতে বাসস সূত্রে একটি খবর বের হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের দারুণভাবে বিভ্রান্ত ও আহত করেছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল (অব.) এমএজি ওসমানীকে খন্দকার মোশতাক আহমেদের 'বিশেষ প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা' (Defense Advisor) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, ১৫ আগস্টের পর সেনাবাহিনীতে যেসব অফিসার ও জোয়ানদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ ফুটছিল, তাঁদের শান্ত রাখার জন্য মোশতাক কৌশল হিসেবে ওসমানীকে ব্যবহার করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়কের এই পদে যোগদান মোশতাকের অবৈধ সরকারকে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও 'ছদ্ম-বৈধতা' প্রদান করেছিল, যা ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত এক পদক্ষেপ।

২৩ আগস্টের কালরাত্রি - জাতীয় চার নেতাসহ ২৬ নেতা গ্রেফতার
১৫ আগস্ট থেকে পরবর্তী এক সপ্তাহের মধ্যে যখন মোশতাক সরকার বুঝতে পারল যে দেশব্যাপী আওয়ামী লীগের কোনো নেতা বা সাধারণ কর্মী তাঁদের মেনে নিচ্ছে না, এবং জাতীয় চার নেতা কোনো প্রলোভনেই আপস করছেন না, তখন শুরু হয় রাজনৈতিক চরম প্রতিশোধ ও নির্মূল অভিযান।
১৯৭৫ সালের ২৩ আগস্ট রাতটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম একটি কালরাত। এদিন মধ্যরাতে ঘাতক সেনাদল ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে নিজ নিজ বাসভবন থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনের সূর্যসন্তানদের গ্রেফতার করে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।
২৩ আগস্ট রাতে গ্রেফতারকৃত প্রধান নেতাদের তালিকা:
১. সৈয়দ নজরুল ইসলাম (সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি ও প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি)
২. তাজউদ্দীন আহমদ (বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠক)
৩. এম মনসুর আলী (সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী)
৪. এএইচএম কামারুজ্জামান (সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি)
৫. আবদুস সামাদ আজাদ (স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী)
৬. কোরবান আলী (প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী)
...এবং আরও অন্তত ২০ জন সংসদ সদস্য ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা।
গ্রেফতারের মনগড়া ও হাস্যকর অভিযোগ
রেডিও ও ইত্তেফাকসহ তৎকালীন পত্রিকায় প্রজ্ঞাপন জারি করে বলা হয়, এই নেতাদের "দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি এবং রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে" গ্রেফতার করা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তব সত্য ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার এই ২৬ জন নেতার আসল অপরাধ ছিল তাঁরা বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপর পা দিয়ে খন্দকার মোশতাকের খন্দকারশাহীতে যোগ দেননি এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শ বিক্রি করতে রাজি হননি। ২৩ আগস্টের এই গ্রেফতারই মূলত পরবর্তী ৩ নভেম্বর কারাফাটকের ভেতরে জাতীয় চার নেতাকে পৈশাচিকভাবে হত্যা করার রাস্তা প্রস্তুত করে দিয়েছিল।

২৪ আগস্ট - জিয়া সেনাপ্রধান, এরশাদ উপ-সেনাপ্রধান
২৩ আগস্ট রাতে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কণ্ঠরোধ করার ঠিক পরদিন, অর্থাৎ ২৪ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর প্রশাসনিক কাঠামোতে এক সুদূরপ্রসারী ও বিরাট পরিবর্তন আনা হয়। এই একটি সিদ্ধান্ত পরবর্তী দুই দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির সামরিকীকরণ ও গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
২৪ আগস্ট সকালে রাষ্ট্রপতির এক বিশেষ আদেশে সেনাবাহিনী প্রধানের পদ থেকে মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহকে অপসারণ করা হয়। তাঁর স্থলে তৎকালীন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান (Deputy Chief of Staff) মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
একই আদেশে আরও দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়:
১. অপসারিত সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাঁর সেবা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয় (যা ছিল মূলত তাকে দ্রুত রাষ্ট্রদূত বানিয়ে বিদেশে নির্বাসনে পাঠানোর কৌশল)।
২. ভারতে সামরিক প্রশিক্ষণরত ব্রিগেডিয়ার এইচ এম এরশাদকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে সেনাবাহিনীর নতুন 'ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ' (উপ-সেনাপ্রধান) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
২৪ আগস্টের এই একটি আদেশ তৎকালীন প্রেক্ষাপটে ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। খন্দকার মোশতাক ও ঘাতক মেজররা চেয়েছিল সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে এমন একজনকে বসাতে যিনি সামরিক বাহিনীর বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন এবং তাদের অসাংবিধানিক ক্ষমতাকে ধরে রাখতে সাহায্য করবেন। একই দিনে জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হওয়া এবং জেনারেল এরশাদ উপ-সেনাপ্রধানের পদে আসীন হওয়া এই দুই সামরিক কর্মকর্তার হাতেই পরবর্তীতে টানা ১৫ বছর (১৯৭৫-১৯৯০) বাংলাদেশের শাসনক্ষমতা বন্দি ছিল। অর্থাৎ, ২৪ আগস্ট মোশতাক সরকারের এই আদেশটিই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক শাসনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার মূল ভিত্তি রচনা করেছিল।
২৮ আগস্ট: প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ বাতিল ও সামরিক কোর্টের সুপ্রিমেসি
জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতার শেষ দিকে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে একটি বড় ধরনের বৈপ্লবিক সংস্কার হাত নিয়েছিলেন যা ছিল '৬১ জেলা গভর্নর প্রশাসনিক ব্যবস্থা' (District Governor System)। ১৯৭৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে এই ৬১ জন নতুন জেলা গভর্নরের নিজ নিজ জেলায় গিয়ে দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল। এই গভর্নরদের দলে ছিলেন রাজনীতিবিদ, আমলা, শিক্ষক, সমাজসেবক ও নারী প্রতিনিধিরা।
কিন্তু খন্দকার মোশতাক সরকার ভালো করেই জানতো, এই গভর্নর ব্যবস্থা চালু থাকলে তৃণমূল পর্যায় থেকে তাঁদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে। তাই ২৮ আগস্ট ১৯৭৫ সালে একটি অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের 'জেলা প্রশাসন আইন' বাতিল করা হয়।
২৮ আগস্টের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের স্বপ্নকে ধ্বংস করে পুরোনো ঔপনিবেশিক ও আমলাতান্ত্রিক জেলা প্রশাসন পদ্ধতি আবার বহাল করা হয়। একই দিন (২৮ আগস্ট) সরকার সমগ্র বাংলাদেশের জন্য দুটি 'বিশেষ সামরিক আদালত' (Special Martial Law Courts) গঠন করার ঘোষণা দেয়। এই আদালতগুলোর চেয়ারম্যান হিসেবে বসানো হয় উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের।
এর মাধ্যমে সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা বেসামরিক প্রশাসনের ওপর সেনাবাহিনীর পূর্ণ তদারকি ও রাজত্ব কায়েম করা হয়। আদালতগুলোর কাজই ছিল রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সামরিক আইনি বিধির দোহাই দিয়ে দ্রুত সাজা দেওয়া।

পরতে হবে বিশেষ টুপি (২০ আগস্ট)
২০ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গভবনে মোশতাক সরকারের এক বিশেষ ও অদ্ভুত মন্ত্রিপরিষদ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে দেশের অর্থনীতি বা পুনর্বাসন নিয়ে আলোচনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় রাষ্ট্রাচার ও পোশাকি রাজনীতি।
মোশতাক সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে, এখন থেকে সরকারি ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক পরতে হবে। খন্দকার মোশতাক নিজে যে কালো রঙের কিস্তি আকৃতির টুপি পরতেন, সেটিকে একপ্রকার 'জাতীয় টুপি' হিসেবে প্রচার শুরু হয়। মন্ত্রীদের জন্য গলাবন্ধ কোট (প্রিন্স স্যুট), ট্রাউজার এবং মাথায় টুপি পরা বাধ্যতামূলক করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেনা প্রতীক 'মুজিব কোট' ও বাঙালি সংস্কৃতির সাধারণ পোশাককে দৃশ্যপট থেকে ধুয়েমুছে সাফ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই ড্রেস কোড চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা মূলত পাকিস্তানি আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক পোশাকের হুবহু অনুকরণ ছিল।

পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন: পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা
১৫ থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যে দ্রুত ও মারাত্মক পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছিল, তা ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার ওপর আরেকটি বিরাট আঘাত। ১৯৭১ সালে যেসব আন্তর্জাতিক পরাশক্তি ও আঞ্চলিক দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, ১৫ আগস্টের পর তারাই সবচেয়ে বেশি উল্লসিত হয়ে নতুন সরকারকে সমর্থন জানায়।
১৫ আগস্ট বঙ্গভবনে মোশতাক ক্ষমতা নেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে পাকিস্তানকে নতুন সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেন তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। শুধু স্বীকৃতি দিয়েই ভুট্টো ক্ষান্ত হননি; তিনি ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশ সরকারকে তড়িঘড়ি করে ৫০ হাজার টন চাল এবং ১৫ মিলিয়ন গজ সুতি কাপড় 'উপহার' হিসেবে পাঠানো হবে।
পাকিস্তান থেকে চাল ও কাপড় পাঠানোর এই ঘোষণাটি ছিল মানসিকভাবে বাংলাদেশকে আবার তাদের অনুগৃহীত বা নির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার এক নগ্ন রাজনৈতিক চাল।
পাকিস্তানের এই উপহার ও স্বীকৃতির জবাবে খন্দকার মোশতাক অত্যন্ত বিনয়ের সাথে ধন্যবাদ জানিয়ে যে ফিরতি চিঠি বা বার্তা পাঠান, তা তৎকালীন ইত্তেফাক ও অন্য পত্রিকায় ছাপা হয়। চিঠিতে মোশতাক লেখেন:
"আমাদের দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণ পাকিস্তানের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এবং উপমহাদেশে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে উৎসুক হয়ে রয়েছে।"
যে পাকিস্তান ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছিল, চার লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম কেড়ে নিয়েছিল এবং সমগ্র দেশকে ভস্মীভূত করেছিল, সেই শত্রুর সাথে বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে এত দ্রুত সখ্যতা গড়ার চেষ্টা ছিল স্বাধীনতাবাসীর হৃদয়ে চরম চপেটাঘাত। একই সাথে ভারতের সাথে সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান মিত্র সমাজতান্ত্রিক ব্লকের সাথে বাংলাদেশের দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে।
এক নজরে ১৯৭৫ সালের ১৫-৩১ আগস্টের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ
১৫ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট ১৯৭৫ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া প্রধান প্রধান ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সহজে অনুধাবনের জন্য নিচে একটি বিশেষ তথ্যসারণী প্রস্তুত করা হলো:
তারিখ (১৯৭৫) | প্রধান ঘটনা ও গৃহীত সিদ্ধান্ত | জড়িত প্রধান ব্যক্তিত্ব/কর্তৃপক্ষ | রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সুদূরপ্রসারী প্রভাব |
১৫ আগস্ট | ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা; খন্দকার মোশতাক কর্তৃক ক্ষমতা দখল ও অসাংবিধানিক মার্শাল ল জারি। | খন্দকার মোশতাক, ঘাতক মেজরবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ। | গণতান্ত্রিক সংবিধান ধসে পড়া, মুক্তিযুদ্ধের ধারার উল্টো যাত্রা ও সামরিক স্বৈরাচারের সূচনা। |
১৬ আগস্ট | সংবাদপত্রগুলোতে সেন্সরশিপ; 'হত্যাকাণ্ড' শব্দ ব্যবহারে বাধা; টুঙ্গিপাড়ায় অতি গোপনে ও অবমাননাকরভাবে বঙ্গবন্ধুর দাফন; ভিডিও বাজেয়াপ্তকরণ আদেশ। | মোশতাক সরকার, তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়, সামরিক সেন্সর বোর্ড। | ইতিহাস বিকৃতির নীল নকশা, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি মুছে ফেলার সর্বাত্মক রাষ্ট্রীয় চেষ্টা। |
১৭ আগস্ট | সাবেক প্রধানমন্ত্রী এম মনসুর আলীর বঙ্গভবনে মোশতাকের সাথে সাক্ষাৎ; অবৈধ সরকারে যোগদানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান। | এম মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমদ। | জাতীয় নেতাদের আপসহীন মনোভাব প্রকাশ; নেতাদের ওপর চরম ক্ষোভ ও গ্রেফতারের পটভূমি। |
১৮ আগস্ট | দেশে কৃত্রিম প্রাণচাঞ্চল্য ও স্বাভাবিকতা প্রমাণের জন্য সংবাদপত্রগুলোতে জোরপূর্বক ছবি প্রকাশ ও অফিস খোলার আদেশ। | মোশতাক সরকার, গণমাধ্যম ও আমলাতন্ত্র। | বন্দুকের নলে জনগণকে জিম্মি করে 'সব স্বাভাবিক' দেখানোর মিথ্যা মনস্তাত্ত্বিক অপপ্রচার। |
২০ আগস্ট | বঙ্গভবনে মন্ত্রীদের জন্য পোশাকবিধি ও 'কিসতি টুপি' পরা বাধ্যতামূলককরণ; পাকিস্তানি আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির অনুকরণ। | মোশতাক ও তাঁর নতুন গঠিত মন্ত্রিসভা। | সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মোড়ক ব্যবহার করে বাঙালি জাতীয়তাবাদী পোশাক সংস্কৃতি বিলুপ্তির অপচেষ্টা। |
২১ আগস্ট | ১৫ আগস্ট সকাল থেকে কার্যকরের শর্তে সামরিক আইনের আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রজ্ঞাপন; বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের আইন। | খন্দকার মোশতাক ও সামরিক জান্তা। | সংবিধানের ওপর সামরিক অধ্যাদেশের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার পঙ্গু। |
২২ আগস্ট | মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল (অব.) এমএজি ওসমানীকে বিশেষ প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ ও দায়িত্ব গ্রহণ। | জেনারেল (অব.) এমএজি ওসমানী, খন্দকার মোশতাক। | সেনাসদস্য ও সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষোভ প্রশমন এবং বেআইনি সরকারকে 'ছদ্ম-বৈধতা' প্রদান। |
২৩ আগস্ট | জাতীয় চার নেতাসহ (তাজউদ্দীন, নজরুল, মনসুর, কামারুজ্জামান) আওয়ামী লীগের শীর্ষ ২৬ জন প্রভাবশালী নেতাকে মধ্যরাতে গ্রেফতার। | জাতীয় চার নেতা, আবদুস সামাদ আজাদ, কোরবান আলী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। | মুক্তিযুদ্ধের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বকে পুরোপুরি স্তব্ধ করা এবং নভেম্বরের জেলহত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুতকরণ। |
২৪ আগস্ট | জেনারেল কে এম শফিউল্লাহকে সরিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে নতুন সেনাপ্রধান ও জেনারেল এরশাদকে উপ-সেনাপ্রধান নিয়োগ। | কে এম শফিউল্লাহ, জিয়াউর রহমান, এইচ এম এরশাদ। | সামরিক বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের মূল পরিবর্তন এবং বাংলাদেশে টানা ১৫ বছরের সামরিক শাসনের ভিত্তি স্থাপন। |
২৮ আগস্ট | বঙ্গবন্ধুর প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ প্রকল্প '৬১ জেলা গভর্নর প্রথা' বাতিল এবং দুটি বিশেষ সামরিক আদালত গঠন। | খন্দকার মোশতাক ও আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন। | আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক শাসন বহাল করা; প্রগতিশীল প্রশাসনিক সংস্কার নস্যাৎ। |
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও নেপথ্যের গোপন ষড়যন্ত্র
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড কোনো আকস্মিক সামরিক বিশৃঙ্খলা ছিল না; বরং এটি ছিল তৎকালীন স্নায়ুযুদ্ধের (Cold War) প্রেক্ষাপটে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত পরিণতি।
ফিলিপ চেরি ও মাহবুবুল আলম চাষী চক্র
মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ তাঁর বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ 'বাংলাদেশ: দ্য আনফিনিশড রেভল্যুশন' (Bangladesh: The Unfinished Revolution)-এ বিস্তারিত তথ্যপ্রমাণসহ দেখিয়েছেন যে, ঢাকার তৎকালীন মার্কিন দূতাবাসের সিআইএ (CIA) স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি (Philip Cherry) এবং মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাংশ এই অভ্যুত্থানের বিষয়ে আগে থেকেই অবগত ছিল।
কুমিল্লা বার্ডের (BARD) তৎকালীন মহাপরিচালক ও খন্দকার মোশতাকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী মাহবুবুল আলম চাষী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোশতাকের মাধ্যমে মার্কিন যোগাযোগের মাধ্যমটি সচল রাখা হয়েছিল। ১৯৭৪ সালের শেষদিক থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যভাগ পর্যন্ত ঢাকায় ও ঢাকার বাইরে একাধিক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎখাতের পরিকল্পনা ছকা হয়েছিল।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (RAW)-এর আগাম সতর্কবার্তা
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র' (RAW)-এর তৎকালীন প্রধান রবীন্দ্র নাথ কাও (R.N. Kao) ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে এবং ১৯৭৫ সালের প্রারম্ভে নিজে ছদ্মবেশে ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সাথে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে দেখা করেন। তিনি সেনাদলের একটি অসন্তোষী অংশের সম্ভাব্য সামরিক অভ্যুত্থান এবং জীবননাশের আশঙ্কার কথা বঙ্গবন্ধুকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন। কিন্তু সরল বিশ্বাসী ও নিজের জনগণের ওপর অগাধ আস্থা রাখা জাতির পিতা সেই সতর্কবার্তা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, "ওরা আমার সন্তানের মতো, তারা আমার কোনো ক্ষতি করতে পারে না।"
চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর দ্রুত রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন
১৫ আগস্টের পূর্বে যেসব দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে ইতস্তত করছিল, তারা ঘটনার পরপরই তড়িঘড়ি করে স্বীকৃতি প্রদান করে:
সৌদি আরব: ১৫ আগস্টের আগে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিলেও, ১৬ আগস্টেই খন্দকার মোশতাকের সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
চীন: ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট চীন বাংলাদেশকে প্রথম আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক স্বীকৃতি দেয়।
এর মাধ্যমে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী আন্তর্জাতিক অক্ষটি (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চীন-পাকিস্তান-সৌদি আরব) ১৯৭৫ সালের আগস্টের পর বাংলাদেশে নিজেদের প্রভাব পুনর্প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
২৬ সেপ্টেম্বরের 'ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ': বিচারহীনতার সংস্কৃতির আইনি ভিত্তি
বাংলাদেশের আইন ও বিচার বিভাগের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত ও কালাকানুন হিসেবে বিবেচিত হয় ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জারিকৃত 'ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স' (Indemnity Ordinance 1975) বা দায়মুক্তি অধ্যাদেশ।
অধ্যাদেশের মূল বক্তব্য ও অনুচ্ছেদ
খন্দকার মোশতাক আহমদ স্বাক্ষরিত এই অধ্যাদেশের (অধ্যাদেশ নম্বর ৫০/১৯৭৫) মূল কথা ছিল:
"১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে স্বাধীকার ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের স্বার্থে যেসব সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে দেশের কোনো আদালতে, ট্রাইব্যুনালে বা কর্তৃপক্ষের কাছে কোনোপ্রকার দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা, অভিযোগ বা আইনি প্রক্রিয়া চালানো যাবে না।"
সংবিধানে ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে স্থায়ী আইনি সুরক্ষা
পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে 'সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী' পাসের মাধ্যমে এই কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বাংলাদেশের সংবিধানের অংশ বানিয়ে নেওয়া হয়। এর ফলে দীর্ঘ ২১ বছর (১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত) জাতির পিতার সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের বিচার তো দূরের কথা, কোনো থানায় একটি এফআইআর (FIR) করার আইনি অধিকারও দেশের নাগরিকদের ছিল না।
আত্মস্বীকৃত খুনিদের কূটনৈতিক পদায়ন ও রাষ্ট্রীয় সুবিধা প্রদান
১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া ঘাাতক সেনা কর্মকর্তাদের কেবল আইনি সুরক্ষাই দেওয়া হয়নি, বরং রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে উচ্চপদে কূটনৈতিক চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছিল।
১৫ আগস্টের প্রধান ঘাতকদের বিভিন্ন দূতাবাসে যেভাবে চাকরি দিয়ে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল, তার একটি আংশিক তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
মেজর শরিফুল হক ডালিম: বেইজিং (চীন), বুয়েনস আইরেস (আর্জেন্টিনা) ও ত্রিপোলি (লিবিয়া) দূতাবাসে প্রথম সচিব ও রাষ্ট্রদূত।
মেজর খন্দকার আবদুর রশীদ: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পদায়ন এবং পরবর্তীতে লিবিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক দায়িত্ব।
মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পদায়ন ও পরবর্তীতে দেশে ফিরে এসে প্রকাশ্য রাজনীতি করার সুযোগ।
মেজর বজলুল হুদা: ইসলামাবাদে (পাকিস্তান) বাংলাদেশ হাইমিশনের কূটনৈতিক পদ।
মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ: ওয়াশিংটন ডি.সি. (যুক্তরাষ্ট্র) ও রিয়াদে (সৌদি আরব) বাংলাদেশ দূতাবাসে কূটনৈতিক চাকরি।
লেফটেন্যান্ট শাহরিয়ার রশীদ: ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) ও কায়রো (মিশর) দূতাবাসে দায়িত্ব পালন।
ক্যাপ্টেন এ বি এম নূর চৌধুরী: অটোয়া (কানাডা) ও বুয়েনস আইরেস (আর্জেন্টিনা) বাংলাদেশ মিশনে পদায়ন।
পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে এই খুনিরা মিলে প্রকাশ্য রাজনীতিতে নেমে 'ফ্রিডম পার্টি' নামক রাজনৈতিক দল গঠন করে এবং ১৯৮৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে ঘাতক বজলুল হুদাকে জাতীয় সংসদের সদস্য (MP) বানিয়ে সংসদে বসানো হয়।
৩ নভেম্বরের জেলহত্যা ও ৭ নভেম্বরের চরম নৈরাজ্য: ১৯৭৫-এর শেষ পর্যায়
১৫ আগস্টের রক্তপাতের পর ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীর ভেতরের দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করে। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে দুটি বড় ধরনের সামরিক ক্যু ও রক্তপাতের ঘটনা ঘটে।
৩ নভেম্বরের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মম হত্যাকাণ্ড
৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে বঙ্গভবনে বসে খন্দকার মোশতাক এবং ঘাতক মেজর রশীদের নির্দেশে একদল সশস্ত্র ঘাতক (যার নেতৃত্বে ছিল রিসালদার মুসলেহউদ্দিন) ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সুরক্ষিত সেল বা বন্দিশালায় প্রবেশ করে।
সেখানে বন্দি অবস্থায় থাকা বাংলাদেশের প্রথম উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এম মনসুর আলী এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচএম কামারুজ্জামান এই জাতীয় চার নেতাকে এক কক্ষে জড়ো করে ব্রাশফায়ার এবং বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগের মূল নেতৃত্বকে এমনভাবে ধ্বংস করা যাতে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরে আসার মতো কোনো দ্বিতীয় পথ না থাকে।
৩ নভেম্বরের খালেদ মোশাররফের সামরিক অভ্যুত্থান
কারাগারে হত্যার ওই একই রাতে বীর প্রতীক ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে এক পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে।
খালেদ মোশতাককে বন্দি ও পদচ্যুত করেন এবং সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে ধানমণ্ডির বাসভবনে গৃহবন্দি করেন।
ঘাতক মেজরদের (ফারুক, রশীদ, ডালিম ইত্যাদি) সাথে সমঝোতা করে তাদের বিশেষ বিমানে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
৬ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ নিজেকে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দেন।
৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান
খালেদ মোশাররফের ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র চার দিনের মাথায় জাসদের (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এবং কর্নেল (অব.) আবু তাহেরের নেতৃত্বে ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার এক রক্তক্ষয়ী সিপাহী বিদ্রোহ ঘটে।
এই বিদ্রোহের ফলে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হুদা এবং এটিএম হায়দার শেরেবাংলা নগরে নির্মমভাবে নিহত হন।
গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত হয়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর মূল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন এবং ডেপুটি চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর (DCMLA) হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেন।
রাষ্ট্রীয় প্রতীক, আদর্শ ও সাংস্কৃতিক কাঠামো পরিবর্তন
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালের পর কেবল রাজনৈতিক বা আইনি পরিবর্তন আনা হয়নি; বরং প্রাত্যহিক রাষ্ট্রীয় কালচার ও পরিভাষাতেও বড় ধরনের পাকিস্তানিকরণ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা হয়েছিল:
১. বাংলাদেশ বেতার থেকে 'রেডিও বাংলাদেশ': ১৫ আগস্ট সকালে রেডিও স্টেশন দখল করেই পাকিস্তানি পরিভাষার সাথে মিলিয়ে নাম পরিবর্তন করে 'রেডিও বাংলাদেশ' রাখা হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশনের লোগো ও উপস্থাপনার ধারা পাল্টে দেওয়া হয়।
২. 'জয় বাংলা' থেকে 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ': মুক্তিযুদ্ধের মূল উদ্দীপক ও সর্বজনীন স্লোগান 'জয় বাংলা' নিষিদ্ধ করে রেডিও ও সরকারি নথিপত্রে পাকিস্তানি আদলের 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ' ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়।
৩. সংবিধানের মূলনীতিতে পরিবর্তন: ১৯৭৭ সালে এক সামরিক ফরমানের মাধ্যমে সংবিধানে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' নীতি বাদ দিয়ে "সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস" প্রতিস্থাপন করা হয় এবং 'সমাজতন্ত্র'-কে সংজ্ঞায়িত করা হয় 'সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার' হিসেবে।
দীর্ঘ ২১ বছরের আইনি লড়াই ও চূড়ান্ত বিচার প্রক্রিয়া (১৯৯৬–২০১০)
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যে বিচারহীনতার অন্ধকার অধ্যায় শুরু হয়েছিল, তা শেষ হতে দীর্ঘ ২১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল বাঙালি জাতিকে।
১২ নভেম্বর ১৯৯৬: ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল
১৯৯৬ সালের জুনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর ১২ নভেম্বর সপ্তম জাতীয় সংসদে ঐতিহাসিক 'ইনডেমনিটি বাতিল বিল ১৯৯৬' সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ডের বিচারের আইনি পথ উন্মুক্ত হয়।
বিচারিক প্রক্রিয়া ও রায়ের পর্যায়সমূহ:
মামলা দায়ের: ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমণ্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর তৎকালীন রেসিডেন্সিয়াল পিএ মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
নিম্ন আদালতের রায় (১৯৯৮): ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকার বিচারক কাজী গোলাম রসুল ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন।
হাইকোর্টের রায় (২০০১): দীর্ঘ আইনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট ১২ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।
সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় (২০০৯): ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে ১২ জন ঘাতকের ফাঁসির রায় চূড়ান্ত করেন।
ফাঁসি কার্যকর (২০১০ ও ২০২০): ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ৫ জন আত্মস্বীকৃত ঘাতকের (ফারুক, শাহরিয়ার, হুদা, মহিউদ্দিন ও এ কে এম মহিউদ্দিন) ফাঁসি কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১১ এপ্রিল বরখাস্তকৃত ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদকে গ্রেফতার করে ফাঁসি দেওয়া হয়।
অন্ধকার ১৫ দিন ও অপরাজিত বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট এই ১৫ দিনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কেবল কয়েকজন বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার ক্ষমতা দখলের গল্প নয়। এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মাকে হত্যা করার জন্য দেশি-বিদেশি এক পরাশক্তির সুপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান।
এই অন্ধকার ১৫ দিনে বাংলাদেশ কী হারিয়েছিল?
সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভের বিনাশ: ১৯৭২ সালের সংবিধানে যে চার মূলনীতি (জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা) স্থান পেয়েছিল, তা সামরিক ফরমান দিয়ে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
বিচারের বাণী নিরবে রোদন: ১৫ আগস্টের জঘন্য বিচার রুদ্ধ করতে পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর মাসে কুখ্যাত 'ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স' (দায়মুক্তি অধ্যাদেশ) জারি করা হলেও, তার আইনি ভিত্তি এই ১৫ দিনেই তৈরি করা হয়েছিল।
গণতন্ত্রের বদলে সেনাশাসন: ২৪ আগস্টের সামরিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সিভিল প্রশাসনকে অস্ত্রের পাহারায় বন্দি করা হয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে দেশ পরবর্তী ১৫ থেকে ২০ বছর একের পর এক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং সামরিক স্বৈরশাসনের কবলে পড়েছিল।
নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরির অপচেষ্টা: ২৩ আগস্ট দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের গ্রেফতার করে জেলে পুরে এবং ৩ নভেম্বর তাঁদের হত্যা করে দেশকে রাজনৈতিকভাবে অভিভাবকহীন করার পাঁতারা করা হয়েছিল।
কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো, রাষ্ট্রীয় শক্তি ও অস্ত্রের জোরে সাময়িকভাবে ইতিহাসকে আটকে রাখা যায় কিংবা বিকৃত গেজেট প্রকাশ করা যায়, কিন্তু সত্যকে কখনোই চিরতরে মুছে ফেলা যায় না। ঘাতক ও তাদের দোসররা ভেবেছিল ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে রক্ত গড়িয়ে দিয়ে কিংবা টুঙ্গিপাড়ার মাটি চাপা দিয়ে তারা শেখ মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে শেষ করে দিয়েছে।
কিন্তু টুঙ্গিপাড়ার সেই নিরিবিলি প্রান্তর থেকেই আবার স্ফুরণ ঘটেছে বাঙালির স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক চেতনার। দীর্ঘ সময় পর হলেও বাংলাদেশের মানুষ সেই অন্ধকার ১৫ দিনের বিভীষিকাকে পেছনে ফেলে সত্যকে পুনরুদ্ধার করেছে, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার সম্পন্ন করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল ধারায় দেশকে ফিরিয়ে এনেছে। ১৯৭৫-এর এই রক্তঝরা ১৫ দিনের প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের সতর্ক করে দেয় স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা করা কতটা কঠিন এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তিকে ধরে রাখতে হলে কতটা সচেতন থাকা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন















