বঙ্গবন্ধু হত্যার ১৫ দিনেই বদলে ফেলা হয় বাংলাদেশকে
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর পরবর্তী দুই সপ্তাহ অর্থাৎ ১৫ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সময়কাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার ও ষড়যন্ত্রমূলক অধ্যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর পরবর্তী ১৫ দিনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো, গণমাধ্যম এবং সামরিক নেতৃত্বে আমূল ও নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছিল। এই ১৫ দিনে কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে উল্টে দেওয়া হয়েছিল, কীভাবে ঘাতক ও তাদের দোসররা ক্ষমতার মসনদে জেঁকে বসেছিল এবং কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে ফেলার নীল নকশা শুরু হয়েছিল, তা আজও আমাদের শিহরিত করে।

TruthBangla
Jan 20, 2026
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি তারিখ মাত্র হলেও বাঙালির ইতিহাসে এটি এক গভীর ক্ষতের নাম। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে যখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়, তখন কেবল একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারকে হত্যা করা হয়নি; বরং চেষ্টা করা হয়েছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মূল শিকড়কে উপড়ে ফেলার।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর পরবর্তী দুই সপ্তাহ অর্থাৎ ১৫ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সময়কাল ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার ও ষড়যন্ত্রমূলক অধ্যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর পরবর্তী ১৫ দিনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো, গণমাধ্যম এবং সামরিক নেতৃত্বে আমূল ও নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছিল। এই ১৫ দিনে কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে উল্টে দেওয়া হয়েছিল, কীভাবে ঘাতক ও তাদের দোসররা ক্ষমতার মসনদে জেঁকে বসেছিল এবং কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে ফেলার নীল নকশা শুরু হয়েছিল, তা আজও আমাদের শিহরিত করে।
১৬ আগস্টের সংবাদপত্র
১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর ১৬ আগস্ট সকালে যখন সংবাদপত্রগুলো মানুষের হাতে পৌঁছাল, তখন সাধারণ মানুষ স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। তৎকালীন সংবাদপত্রের ভাষা ও উপস্থাপনা ছিল অত্যন্ত কৌশলী এবং মেরুদণ্ডহীন।
প্রধান সারির পত্রিকাগুলোর শিরোনামে কোথাও 'হত্যাকাণ্ড' শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। পরিবর্তে বলা হয়েছিল, "সশস্ত্র বাহিনী জাতীয় স্বার্থে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের পতন ঘটিয়ে প্রেসিডেন্ট খোন্দকার মুশতাক আহমদের নেতৃত্বে ক্ষমতা গ্রহণ করেছে।"
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খবরটিকে অত্যন্ত অবজ্ঞার সাথে পত্রিকার এক কোণে ছোট করে ছাপানো হয়েছিল। সেখানে লেখা ছিল, "ক্ষমতা গ্রহণের সময় সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বাসভবনে নিহত হন।" পত্রিকাসমূহ এমনভাবে সংবাদ প্রচার করেছিল যেন এটি একটি স্বতঃস্ফূর্ত রাজনৈতিক পরিবর্তন, অথচ পর্দার আড়ালে তখন বন্দুকের নল আর ট্যাংক দিয়ে রাষ্ট্রকে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল।
খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতা দখল ও সামরিক শাসন
বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েও যিনি বিশ্বাসঘাতকতার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তিনি হলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। ১৫ আগস্টের পর দ্রুততার সাথে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন।
অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের কাছে বঙ্গভবনে শপথ নেন মোশতাক। এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পরিবেশ ছিল থমথমে। তিন বাহিনীর প্রধানরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁরা পৃথক ভাষণে নতুন সরকারের প্রতি তাদের আনুগত্য ও দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করেন। এটি ছিল একটি সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা, যদিও এর মূলে ছিল সম্পূর্ণ সামরিক শক্তি।
ক্ষমতা দখলের সাথে সাথেই ১৫ আগস্ট দেশজুড়ে সামরিক শাসন বা 'মার্শাল ল' জারি করা হয়। গণতন্ত্রকে বুটের তলায় পিষ্ট করে শুরু হয় স্বৈরশাসন।
১৬ আগস্ট থেকে কারফিউ কিছুটা শিথিল করা হলেও জনসাধারণকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত যেন তারা ঘরের ভেতরেই অবস্থান করেন। নতুন সরকার 'দেশপ্রেমিক ও শান্তিপ্রিয়' নাগরিকদের সহযোগিতার আহ্বান জানালেও কার্যত সাধারণ মানুষের ওপর নেমে এসেছিল ভীতি ও আতঙ্ক। রাস্তায় টহল দিচ্ছিল ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান।
১৭ আগস্ট - মনসুর আলী ও মুশতাক সাক্ষাৎ
১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডির পর থেকেই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল মুশতাক সরকারকে সমর্থন দেওয়ার জন্য। ১৭ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী এম মনসুর আলী বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়া খন্দকার মুশতাক আহমদের সাথে দেখা করেন।
তৎকালীন সরকারি মুখপাত্রদের মতে, এটি ছিল একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ বা পরিস্থিতি পর্যালোচনা। কিন্তু ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মুশতাক চেষ্টা করেছিলেন জাতীয় চার নেতাকে নিজের মন্ত্রিসভায় টানতে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রতি অবিচল আস্থাশীল এই নেতারা সেই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। এই প্রত্যাখ্যানই পরবর্তীতে তাঁদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

২৩ আগস্ট - জাতীয় চার নেতাসহ ২৬ নেতা গ্রেফতার
১৫ আগস্টের পর এক সপ্তাহ কাটতে না কাটতেই শুরু হয় শুদ্ধি অভিযানের নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। ২৩ আগস্ট ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কালো দিন। এদিন সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানসহ মোট ২৬ জন শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।
কেন এই গ্রেফতার? মুশতাক সরকার এই নেতাদের বিরুদ্ধে কিছু গৎবাঁধা, হাস্যকর ও বিতর্কিত অভিযোগ আনে, যার মধ্যে ছিল:
দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি: ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্পদ অর্জন।
সমাজবিরোধী তৎপরতা: রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ।
ক্ষমতার অপব্যবহার: সামরিক আইনের বিধিমালার দোহাই দিয়ে তাঁদের কণ্ঠরোধ করা।
প্রকৃতপক্ষে, এই ২৬ নেতার অপরাধ ছিল তাঁরা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের সাথে আপস করতে রাজি হননি এবং খন্দকার মুশতাকের অবৈধ ক্ষমতা দখলকে বৈধতা দেননি। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে আরও ছিলেন প্রভাবশালী নেতা কোরবান আলী এবং আবদুস সামাদ আজাদ। এই গ্রেফতারের মাধ্যমেই মূলত ৩ নভেম্বর জেলের ভেতর তাঁদের হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছিল।

২৪ আগস্ট - জিয়া সেনাপ্রধান, এরশাদ উপ-সেনাপ্রধান
জাতীয় নেতাদের গ্রেফতারের ঠিক পরদিন, অর্থাৎ ২৪ আগস্ট বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনা হয়। এই পরিবর্তনই মূলত পরবর্তী কয়েক দশকের বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়।
মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহকে সরিয়ে তৎকালীন ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে নতুন সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। শফিউল্লাহর চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়, যা ছিল মূলত একটি কৌশলগত নির্বাসন। জিয়াউর রহমানের সেনাপ্রধান হওয়া ছিল সেই সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক ঘটনা।
একই আদেশে ভারতে প্রশিক্ষণরত ব্রিগেডিয়ার এ এইচ এম এরশাদকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয় 'ডেপুটি চিফ অব স্টাফ' হিসেবে। অর্থাৎ, একই দিনে বাংলাদেশের দুই ভবিষ্যৎ সামরিক শাসকের ক্ষমতার সিঁড়ি তৈরি করে দিয়েছিল মুশতাক সরকার।
জেনারেল ওসমানীর ভূমিকা
২২ আগস্ট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ সম্পন্ন হয়। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানীকে খন্দকার মুশতাক আহমদের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাসসের খবর অনুযায়ী, নিয়োগ পাওয়ার পরপরই তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই নিয়োগটি তৎকালীন সময়ে জনমনে এবং সামরিক বাহিনীতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল, কারণ ওসমানী ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক। তাঁর এই অবস্থান মুশতাক সরকারকে এক ধরনের 'ছদ্ম-বৈধতা' দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।

দু’দিন পরে সব ‘স্বাভাবিক’
১৫ আগস্টের সেই ভয়াবহতার পর সরকার চেষ্টা করেছিল বহির্বিশ্ব এবং দেশের মানুষের কাছে প্রমাণ করতে যে, পরিস্থিতি একদম 'স্বাভাবিক'। খন্দকার মুশতাক ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই নির্দেশ দেন যে, সকল সরকারি, আধা-সরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের অবিলম্বে কাজে যোগ দিতে হবে।
জারিকৃত এক আদেশে বলা হয় যে, প্রত্যেক অফিস ইনচার্জ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাজ সুষ্ঠুভাবে সুনিশ্চিত করার জন্য দায়ী থাকবেন। অফিসে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অবহেলা বরদাস্ত করা হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। কলকারখানায় উৎপাদন শুরু করার জন্য বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়।
সারা দেশে স্বাভাবিক কর্ম তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে ১৮ আগস্টের বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশন করা হয়। ১৮ আগস্টের পত্রিকাগুলোতে (ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা) বড় বড় শিরোনামে রাজধানীর 'প্রাণচাঞ্চল্যের' ছবি ছাপা হয়। কিন্তু এই প্রাণচাঞ্চল্যের নিচে লুকিয়ে ছিল এক গুমোট আতঙ্ক এবং শোক। বন্দুকের নলের মুখে মানুষকে স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
টুঙ্গিপাড়ায় দাফনের নামে ইতিহাস আড়াল
১৬ আগস্ট ১৯৭৫। গোটা দেশ তখন অজানা এক স্তব্ধতায় মোড়ানো। অথচ সেই দিনটির সংবাদপত্রগুলোতে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত নিয়ে কোনো শোকবার্তা ছিল না। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) থেকে পাঠানো অতি ক্ষুদ্র একটি সংবাদে জানানো হয়:
"সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের লাশ বিমানযোগে ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং তাঁকে তাঁদের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে।"
রাষ্ট্রীয় মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে সেটি ছিল এক তড়িঘড়ি করা লোক দেখানো প্রক্রিয়া। টুঙ্গিপাড়া গ্রামের মানুষকে জানাযায় অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয়নি। মানুষজন জানতোও না বঙ্গবন্ধুকে কোথায় ও কখন দাফন করা হচ্ছে। মাত্র কয়েকজন গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে জানাজা শেষে টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। যে নেতার আহবানে কোটি মানুষ রাস্তায় নামত, তাঁকে শেষ বিদায় জানানোর সুযোগটুকুও কেড়ে নিয়েছিল ঘাতক সরকার।
দৃশ্যপট থেকে বঙ্গবন্ধুকে মোছার অভিযান
১৫ আগস্টের পরপরই মোশতাক সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল জনগণের মন থেকে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি মুছে ফেলা। ১৬ আগস্ট তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় থেকে এক জরুরি নির্দেশ জারি করা হয়। ১৪ আগস্ট বা তার আগে মুক্তিপ্রাপ্ত বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট সকল প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ও সংবাদ চিত্র (Newsreel) বাজার থেকে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, এই ভিডিও বা চিত্রগুলো যে যার কাছে আছে তারা যেন অবিলম্বে তথ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। এটি ছিল ইতিহাসের এক সুপরিকল্পিত 'সেন্সরশিপ', যার উদ্দেশ্য ছিল নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব ও সচিত্র ইতিহাস আড়াল করা।

পরতে হবে বিশেষ টুপি
২০ আগস্ট ১৯৭৫। বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত হয় মোশতাক সরকারের অন্যতম অদ্ভুত এক মন্ত্রিপরিষদ বৈঠক। সেই বৈঠকে কেবল নীতি নির্ধারণ নয়, বরং নির্ধারণ করে দেওয়া হয় মন্ত্রীদের পোশাক এবং টুপি। খন্দকার মোশতাক যে ধরনের কালো কিস্তি টুপি পরতেন, সেটিকে 'জাতীয় টুপি' হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের জন্য গলাবদ্ধ কোট (প্রিন্স স্যুট), ট্রাউজার ও প্যান্ট নির্দিষ্ট করা হয়। অনেকেই মনে করেন, এই ড্রেস কোড পরিবর্তনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সেই চেনা অবয়ব এবং বাঙালির সাধারণ পোশাক সংস্কৃতির বদলে একটি পাকিস্তানি ঘরানার ছাপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।

সামরিক আইনের শাসন জারি
২১ আগস্টের পত্রিকায় প্রকাশিত রাষ্ট্রপতির ঘোষণা ছিল গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক। খন্দকার মোশতাক ঘোষণা করেন যে, ১৫ আগস্ট সকাল থেকেই দেশে সামরিক আইন (Martial Law) জারি করা হয়েছে।
ঘোষণা করা হয়, সামরিক আইন বিধি ও আদেশের সাপেক্ষে সংবিধান বলবৎ থাকবে। অর্থাৎ, সংবিধানের চেয়ে সামরিক অধ্যাদেশই তখন ছিল বড় শক্তি। রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা দেওয়া হয় যে তিনি যখন খুশি যেকোনো অপরাধের বিচার করতে বিশেষ সামরিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে পারবেন। এর ফলে সাধারণ বিচার ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে পঙ্গু হয়ে যায়।
পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা
১৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির দ্রুত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে মোশতাক সরকারের প্রবল আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর অভিনন্দন বার্তার জবাবে মোশতাক লিখেন, "আমাদের দুই দেশের মধ্যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও উপমহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ উৎসুক রয়েছে।"
যে পাকিস্তান বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকাতে সবটুকু শক্তি ব্যয় করেছিল এবং মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ বাঙালি হত্যা করেছিল, সেই দেশের সঙ্গে দ্রুত সখ্যতা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা ছিল স্বাধীনতাকামী জনগণের জন্য এক বিরাট চপেটাঘাত।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে যে ৬১ জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন, ২৮ আগস্ট মোশতাক সরকার সেটি বাতিল করে দেয়।
১৯৭৫ সালের জেলা প্রশাসন আইনটি একটি অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে বাতিল করা হয়। এর ফলে জেলা গভর্নর, বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট নিয়ে গঠিত সমন্বিত প্রশাসনিক কাঠামোটি ভেঙে যায়। একই দিন (২৮ আগস্ট) সরকার সমগ্র বাংলাদেশের জন্য দুটি বিশেষ সামরিক আদালত গঠন করে। এর মাধ্যমে সিভিল প্রশাসনের ওপর সামরিক নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ স্থায়ী করার পথ সুগম করা হয়।
ইতিহাসের শিক্ষা
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট এই ১৫ দিনে বাংলাদেশের যে পরিবর্তনগুলো হয়েছিল, তা কোনো গণতান্ত্রিক বিবর্তন ছিল না। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত ধসিয়ে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা। এই ১৫ দিন ছিল বাংলাদেশের ‘ডি-অ্যালাইজেশন’ বা বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রথম পর্যায়। ঘাতকরা ভেবেছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলে এবং তাঁর আদর্শের চিহ্নগুলো মুছে ফেললে তারা সফল হবে।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী দেয়, অস্ত্রের মুখে ক্ষমতা দখল করে সাময়িকভাবে ইতিহাস পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করা যায়, কিন্তু চিরস্থায়ী করা যায় না। ৩২ নম্বরের রক্তে ভেজা সিড়ি থেকে যে আদর্শের জন্ম হয়েছে, তা কোনো সামরিক আদেশ বা গেজেট দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। এই ১৫ দিনের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা রক্ষার লড়াই কত কঠিন এবং ষড়যন্ত্রের জাল কত সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















