উইলিয়াম এ. এস. ওডারল্যান্ড - এক ভিনদেশি বীরের অসামান্য মহাকাব্য
একাত্তরের সেই জলন্ত অগ্নিগর্ভে সাত সমুদ্র ১৩ নদী পার হয়ে আসা একজন ডাচ-অস্ট্রেলীয় করপোরেট নির্বাহী যেভাবে বহুজাতিক কোম্পানির শীর্ষ পদের বিলাসিতা ছুঁড়ে ফেলে লাল-সবুজের স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন, তা কেবল বাংলাদেশের ইতিহাসেই নয়, বরং বিশ্বযুদ্ধের সামরিক ইতিহাসেও এক অভূতপূর্ব ও রোমাঞ্চকর ঘটনা। তিনি আর কেউ নন আমাদের চিরকালের পরম বন্ধু, মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্ত একমাত্র বিদেশি নাগরিক বীর প্রতীক উইলিয়াম এ. এস. ওডারল্যান্ড (William A. S. Ouderland)।

TruthBangla

“আমি যা করেছি তা কোনো পুরস্কারের আশায় করিনি, করেছি মানবতার তাগিদে। চোখের সামনে একটি নিরস্ত্র জাতির ওপর পৈশাচিক গণহত্যা হতে দেখে কোনো বিবেকবান মানুষ চুপ করে বসে থাকতে পারে না। আমি কেবল আমার সামরিক অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করে স্বাধীনতার জন্য লড়তে থাকা বাঙালি সন্তানদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম।”
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের লাল-সবুজ পতাকায় মিশে আছে লাখ লাখ শহীদের রক্ত, কোটি বাঙালির অসীম আত্মত্যাগ আর অজস্র নাম না জানা বীরাঙ্গনার দীর্ঘশ্বাস। একটি দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে সেই দেশের আপামর জনতা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু একাত্তরের সেই জলন্ত অগ্নিগর্ভে সাত সমুদ্র ১৩ নদী পার হয়ে আসা একজন ডাচ-অস্ট্রেলীয় করপোরেট নির্বাহী যেভাবে বহুজাতিক কোম্পানির শীর্ষ পদের বিলাসিতা ছুঁড়ে ফেলে লাল-সবুজের স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন, তা কেবল বাংলাদেশের ইতিহাসেই নয়, বরং বিশ্বযুদ্ধের সামরিক ইতিহাসেও এক অভূতপূর্ব ও রোমাঞ্চকর ঘটনা।
তিনি আর কেউ নন আমাদের চিরকালের পরম বন্ধু, মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের জন্য বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্ত একমাত্র বিদেশি নাগরিক বীর প্রতীক উইলিয়াম এ. এস. ওডারল্যান্ড (William A. S. Ouderland)।
পাক সামরিক জান্তার জেনারেলদের ড্রয়িংরুমে চাটুকারিতার ছদ্মবেশে বসে যিনি লালবাগ থেকে টঙ্গী পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের গোপন নকশা তৈরি করেছিলেন; যিনি দিনের বেলা ছিলেন বহুজাতিক কোম্পানি বাটা সু-এর প্রতাপশালী ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD), আর রাতের আঁধারে লুঙ্গি পরে, মুখে কালি মেখে ২ নম্বর সেক্টরের গেরিলা ফায়ারটিমের অগ্রভাগে দাঁড়িয়ে স্টেনগান চালাতেন সেই মহানায়কের রুদ্ধশ্বাস, রোমাঞ্চকর ও আবেগঘন ইতিহাস নিয়ে নিচে একটি বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হলো।
নেদারল্যান্ডস থেকে মেলবোর্ন হয়ে ঢাকা
উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ওডারল্যান্ড (William Abraham Simon Ouderland) ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে।
ডাচ সেনাবাহিনী ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অগ্নিপরীক্ষা
১৯৩৬ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে তরুণ ওডারল্যান্ড রাজকীয় নেদারল্যান্ডস সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৩৯ সালে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দাবানল ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তিনি ডাচ সেনাবাহিনীর একজন দক্ষ সিগন্যালার ও সার্জেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
নাৎসি প্রতিরোধ যুদ্ধ: ১৯৪০ সালে হিটলারের নাৎসি বাহিনী নেদারল্যান্ডস দখল করে নিলে ওডারল্যান্ড কেবল নিয়মিত সেনাসদস্য হিসেবেই লড়াই করেননি, বরং ডাচ ভূগর্ভস্থ প্রতিরোধ আন্দোলন (Dutch Underground Resistance)-এ যোগ দেন।
গেরিলা কৌশল অর্জন: নাৎসি গেস্টাপো ও এসএস বাহিনীর বিরুদ্ধে ছদ্মবেশ ধারণ, গোপন বার্তা আদান-প্রদান, সাবোটাজ (Sabotage) বা নাশকতা চালানো এবং অতর্কিত গেরিলা আক্রমণের যে কৌশল তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শিখেছিলেন, সেটাই কয়েক দশক পর বাংলাদেশের রণাঙ্গনে এক অমূল্য হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল।
বন্দিদশা থেকে পলায়ন: যুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি নাৎসিদের হাতে বন্দি হন। কিন্তু নিজের বুদ্ধিমত্তা ও অসাধারণ শারীরিক সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তিনি নাৎসি বন্দিশালা থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত আত্মগোপনে থেকে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখেন।
অস্ট্রেলিয়া গমন ও বাটা সু কোম্পানিতে নিয়োগ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ওডারল্যান্ড সেনাবাহিনী ছেড়ে দেন এবং নতুন জীবনের খোঁজে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়ে দেশটির নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি বিখ্যাত বহুজাতিক জুতা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘বাটা সু কোম্পানি’ (Bata Shoe Company)-তে জুনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন।
কঠোর পরিশ্রম, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দ্রুত ক্ষমতা এবং অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তিনি দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে কোম্পানির বিশ্বস্ত নির্বাহী হয়ে ওঠেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের শেষভাগে বাটা কোম্পানি তাঁকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ‘বাটা সু কোম্পানি (পাকিস্তান) লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD) হিসেবে ঢাকায় পাঠায়।

একাত্তরের কালরাত্রি ও ওডারল্যান্ডের নৈতিক জাগরণ
১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় এবং ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন অগ্নিগর্ভ, তখন ওডারল্যান্ড ঢাকার টঙ্গীতে বাটা সু কোম্পানির বিশাল কারখানা ও সংলগ্ন বাংলোতে অবস্থান করছিলেন।
২৫ মার্চের কালরাত ও পৈশাচিক বর্বরতা: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঘুমন্ত বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, ওডারল্যান্ড তখন টঙ্গীর বাংলো থেকে বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য গণহত্যা নিজের চোখে দেখতে পান।
পাকিস্তানি সেনারা কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা রাজারবাগেই আক্রমণ চালায়নি, বরং টঙ্গী শিল্পাঞ্চলের নিরস্ত্র বাটা কারখানার শ্রমিক ও সাধারণ বাঙালিদের ওপর নির্বিচারে মেশিনগানের গুলি ও ট্যাঙ্কের গোলা বর্ষণ করে। ওডারল্যান্ড তাঁর বাংলোর জানালা দিয়ে দেখেছিলেন কীভাবে নিরীহ মানুষের ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং নর্দমায় পড়ে থাকছে শত শত মানুষের লাশ।
নাৎসি নির্যাতনের সাথে পাক বর্বরতার তুলনা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির এসএস বাহিনী যেভাবে ইহুদি ও ডাচ নাগরিকদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছিল, ওডারল্যান্ড একাত্তরের মার্চে পাকিস্তানি বাহিনীর আচরণের মধ্যে তার হুবহু মিল খুঁজে পান।
পরে এক স্মৃতিচারণে তিনি লিখেছিলেন:
“আমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের বর্বরতা দেখেছি। কিন্তু ১৯৭১ সালে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনারা যা করছিল, তা নাৎসিদের নিষ্ঠুরতাকেও হার মানিয়েছিল। একজন সাবেক সৈনিক হিসেবে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এই নিরীহ জাতিটির পাশে না দাঁড়ালে ইতিহাস আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করবে না।”
ঢাকার অন্যান্য পশ্চিমা নাগরিকেরা যখন নিজ নিজ দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে প্রাণভয়ে বিশেষ বিমানে ঢাকা ছাড়ছিলেন, তখন অস্ট্রেলীয় নাগরিক ওডারল্যান্ড সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ডাবল এজেন্ট ও ছদ্মবেশী স্পাই: জেনারেলদের ড্রয়িংরুমে এক মুক্তিযোদ্ধা
উইলিয়াম ওডারল্যান্ডের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং কৌশলগত অবদান ছিল গোপন তথ্য সংগ্রহ বা গোয়েন্দাবৃত্তিতে (Espionage)। তিনি অনুধাবন করেছিলেন, কেবল রাইফেল হাতে যুদ্ধ করার চেয়ে শত্রুর গোপন সামরিক নকশা বের করে আনতে পারলে তা মুক্তিযোদ্ধাদের হাজার গুণ বেশি সুবিধা দেবে।
পাক জেনারেলদের ক্লাবে যাতায়াত ও আস্থা অর্জন: যেহেতু ওডারল্যান্ড একজন শুভ্রাঙ্গ ইউরোপীয় নাগরিক এবং পাকিস্তানের অন্যতম বৃহৎ বহুজাতিক কোম্পানির প্রধান ছিলেন, তাই পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তাঁকে তাদের ‘স্বভাবজাত পশ্চিমা বন্ধু’ বলে মনে করত। ওডারল্যান্ড তাঁর এই সামাজিক পরিচয়কে নিখুঁত কভার হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি নিয়মিত ঢাকা সেনানিবাসের অফিসার্স ক্লাব, জিওসি মেস এবং ঢাকা ক্লাবে যেতেন।
তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল টিক্কা খান, পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক প্রধান জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজী এবং রাও ফরমান আলীর মতো কুখ্যাত সামরিক হন্তারকদের সাথে বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন।
পাকিস্তানি জেনারেলরা মদের গ্লাস হাতে আড্ডা দেওয়ার সময় ওডারল্যান্ডকে সম্পূর্ণ ‘আপন লোক’ ভেবে ফ্রি-স্টাইলে সামরিক পরিকল্পনা, সৈন্য স্থানান্তর, কনভয় চলাচলের সময়সূচি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর পরিকল্পিত অভিযানের কথা আলোচনা করতেন।
তথ্য পাচার ও ২ নম্বর সেক্টরের সাথে গোপন নেটওয়ার্ক
আড্ডার ছলে শোনা এই স্পর্শকাতর সামরিক তথ্যগুলো ওডারল্যান্ড তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তিতে ধরে রাখতেন এবং বাংলোয় ফিরে কোড ল্যাঙ্গুয়েজে নোট করে নিতেন।
মেজর খালেদ মোশাররফ ও ক্যাপ্টেন হায়দারের সাথে যোগাযোগ: এই গোপনীয় তথ্যগুলো তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মেজর খালেদ মোশাররফ এবং ক্যাপ্টেন এ টি এম হায়দারের কাছে পাঠিয়ে দিতেন।
অপারেশন নস্যাৎ: ওডারল্যান্ডের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর একাধিক সারপ্রাইজ অ্যাটাক ও অ্যামবুশ পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের বহু জীবন বেঁচে যায় এবং তারা আগেই প্রস্তুত থেকে উল্টো পাকিস্তানি সেনাবহরের ওপর হামলা চালানোর সুযোগ পায়।
বাটা ফ্যাক্টরি যখন মুক্তিসেনাদের গোপন দুর্গ: প্রশিক্ষণ ও রণাঙ্গনে যুদ্ধ
উইলিয়াম ওডারল্যান্ড কেবল ড্রয়িংরুমের চতুর গুপ্তচর ছিলেন না; তিনি ছিলেন ধুলো-কাদায় নেমে লড়াই করা একজন খাঁটি রণাঙ্গনের বীর।
টঙ্গী বাটা কারখানায় গোপন ট্রেনি অ্যাকাডেমি: টঙ্গীতে বাটা সু কোম্পানির সুবিশাল কারখানা প্রাঙ্গণটি চারদিকে উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। এই সীমানাপ্রচীরকে কাজে লাগিয়ে ওডারল্যান্ড কারখানার ভেতরেই গড়ে তোলেন মুক্তিযোদ্ধাদের এক গোপন প্রশিক্ষণ শিবির ও অস্ত্রাগার।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কৌশলে প্রশিক্ষণ: দিনে কারখানা চললেও রাতে তিনি তরুণ বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের সেখানে একত্রিত করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের বিরুদ্ধে তিনি যে নাশকতামূলক ও গেরিলা কৌশল শিখেছিলেন, তা দিয়ে বাঙালি তরুণদের প্রশিক্ষণ দিতেন।
অস্ত্র চালনা ও বিস্ফোরক কৌশল: রাইফেল চালানো, স্টেনগানের নিখুঁত ব্যবহার, হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং ব্রিজে এক্সপ্লোসিভ (C4/TNT) বসিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার কৌশল তিনি হাতে-কলমে শিখিয়েছিলেন।
খাদ্য ও চিকিৎসার রসদ সরবরাহ: বাটা কোম্পানির বিশাল বাজেট ও রিসোর্স ব্যবহার করে তিনি গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের রসদ, ওষুধপত্র, শুকনো খাবার এবং ভারী বুট জুতো সরবরাহ করতেন।
প্রচ্ছন্ন ছদ্মবেশে রণাঙ্গনে ওডারল্যান্ড
বাঙালি তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়েই ওডারল্যান্ড ক্ষান্ত হননি। বহু অপারেশনে তিনি নিজে স্টেনগান হাতে ফায়ারটিমের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
লুঙ্গি ও মুখে কালির ছদ্মবেশ: একজন শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয় রাতে যুদ্ধক্ষেত্রে সহজেই চোখে পড়তে পারেন। তাই ওডারল্যান্ড রাতের অভিযানের সময় সস্তা সাধারণ বাঙালিদের মতো লুঙ্গি পরতেন এবং মুখে ও হাতে কয়লার কালি মেখে শরীর কালো করে নিতেন।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গেরিলা অপারেশন: টঙ্গী, জয়দেবপুর এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন কালভার্ট ও রেললাইন ধ্বংসের অপারেশনে ওডারল্যান্ড সরাসরি অংশ নেন। ৫৪ বছর বয়সেও তরুণ যোদ্ধাদের মতো কাঁদায় হামাগুড়ি দিয়ে শত্রুর বাংকারে গ্রেনেড ছুড়ে মারার সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন তিনি।
বিশ্ববিবেকের কাছে ক্যামেরা হাতে আলোকচিত্রী ওডারল্যান্ড
একটি যুদ্ধ কেবল রণাঙ্গনে জেতা যায় না; আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও মানবিক ময়দানেও জিততে হয়। ১৯৭১ সালে বিশ্বজুড়ে পাকিস্তান সরকার রটাচ্ছিল যে পূর্ব পাকিস্তানে কেবল ‘কিছু ভারতীয় দুষ্কৃতকারী গোলযোগ সৃষ্টি করছে’। পাক সরকারের এই মিথ্যা প্রচারণার মুখোশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খুলে দিতে ওডারল্যান্ড তাঁর ক্যামেরা হাতে তুলে নেন।
প্রামাণ্য ছবি সংগ্রহ ও আন্তর্জাতিক পাচার: বাটা কোম্পানির এমডি হিসেবে তিনি নিজস্ব গাড়িতে ‘ডিপ্লোম্যাটিক ও কর্পোরেট প্রিভিলেজ’ ফ্ল্যাগ লাগিয়ে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অবাধে যাতায়াত করতে পারতেন।
পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা চালিয়ে যেখানে লাশ ফেলে রাখত, ওডারল্যান্ড সেখানে পৌঁছে গোপনে তাঁর ক্যামেরায় সেই বীভৎস দৃশ্যগুলোর ছবি তুলে রাখতেন। তিনি বুড়িগঙ্গার তীরে ভেসে আসা লাশ, ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রামের দৃশ্য এবং বাঙালি নারীদের ওপর নির্যাতনের চাক্ষুষ ছবি ও নথি তৈরি করেন।
অস্ট্রেলিয়া ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সত্য প্রকাশ: যেহেতু বাটা একটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি ছিল, তাই ওডারল্যান্ড কোম্পানির অফিসিয়াল গোপনীয় ডাক ও কুরিয়ার সার্ভিসের আড়ালে এই ছবিগুলো এবং নিজ হাতে লেখা গণহত্যার প্রতিবেদন ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুর হয়ে অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের প্রধান প্রধান সংবাদমাধ্যমে পাঠাতে সক্ষম হন।
তাঁর পাঠানো ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণী অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত হওয়ার পর অস্ট্রেলীয় সরকার ও সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এক শক্তিশালী কূটনৈতিক জনমত গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।
একনজরে বীর প্রতীক উইলিয়াম এ. এস. ওডারল্যান্ড
মুক্তিযুদ্ধে এই অকুতোভয় ভিনদেশি বীরের অনন্য ভূমিকা, অবদান ও জীবনপঞ্জি সংক্ষেপে বোঝার জন্য নিচের সারণীটি তৈরি করা হলো:
বিষয়/ক্ষেত্র | বিবরণ ও ঐতিহাসিক উপাত্ত |
পূর্ণ নাম | উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ওডারল্যান্ড (William A. S. Ouderland) |
জন্ম ও স্থান | ৬ ডিসেম্বর ১৯১৭; আমস্টারডাম, নেদারল্যান্ডস |
নাগরিকত্ব | ডাচ (জন্মসূত্রে) এবং অস্ট্রেলীয় (পরবর্তী জীবন) |
সামরিক পটভূমি | সার্জেন্ট, রাজকীয় নেদারল্যান্ডস সেনাবাহিনী (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৩৬–১৯৪৫); নাৎসি বিরোধী প্রতিরোধ যোদ্ধা |
১৯৭১ সালে পেশাগত পদবী | ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD), বাটা সু কোম্পানি (পাকিস্তান) লিমিটেড, ঢাকা |
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা | ১. গোপন গোয়েন্দাবৃত্তি ও তথ্য সংগ্রহ (ডাবল এজেন্ট) ২. বাটা কারখানায় মুক্তিসেনাদের অস্ত্র ও গেরিলা প্রশিক্ষণ প্রদান ৩. ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে সরাসরি সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ ৪. গণহত্যার ছবি তুলে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রেরণ |
সংযুক্ত সেক্টর ও কমান্ডার | ২ নম্বর সেক্টর; সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ এবং ক্যাপ্টেন এ টি এম হায়দার |
রাষ্ট্রীয় সম্মাননা/খেতাব | বীর প্রতীক (১৯৭২ সালে ঘোষিত); বাংলাদেশের খেতাবপ্রাপ্ত একমাত্র বিদেশি নাগরিক |
স্বাধীনোত্তর অবস্থান | ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বাটা সু কোম্পানির এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন |
জীবনাবসান | ১৮ মে ২০০১ (বয়স ৮৩ বছর); পার্থ, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া |
স্মৃতি রক্ষা স্মারক | ১. ‘ওডারল্যান্ড সড়ক’ (Ouderland Way), গুলশান-২, ঢাকা ২. রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্মাননা প্রদেয় স্মারক |
বীর প্রতীক খেতাব, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার দিনগুলো
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর অর্জিত হয় বাঙালির পরম কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যখন ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে, তখন বিজয়ী মুক্তিসেনাদের সাথে আনন্দের অশ্রুতে ভেসেছিলেন ৫৪ বছরের বয়োবৃদ্ধ অস্ট্রেলীয় নাগরিক উইলিয়াম ওডারল্যান্ড।
খেতাব প্রাপ্তির বিরল সম্মান: স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা, ত্যাগ ও অবদানের জন্য যাঁদের সামরিক খেতাবে ভূষিত করে সেই তালিকায় ৪২৬ জন 'বীর প্রতীক'-এর মধ্যে অত্যন্ত সম্মানের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয় উইলিয়াম এ. এস. ওডারল্যান্ডকে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে তিনি প্রথম এবং একমাত্র বিদেশি নাগরিক, যিনি এই রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। একজন ভিনদেশি হয়েও বাঙালির জাতীয় বীরদের তালিকায় তাঁর নাম চিরকালের জন্য স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে যায়।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সেবা ও অস্ট্রেলিয়ায় প্রত্যাবর্তন: বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কাজেও ওডারল্যান্ড প্রত্যক্ষ অবদান রাখেন। তিনি ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাটা কোম্পানির এমডি হিসেবে ঢাকায় অবস্থান করেন এবং কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক করে বহু ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালি পরিবারের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেন।
১৯৭৫ সালে কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত ‘পার্থ’ (Perth) শহরে ফিরে যান।
পার্থের বাড়িতে উড়ত লাল-সবুজ পতাকা: অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে গেলেও ওডারল্যান্ডের হৃদয় থেকে বাংলাদেশকে কোনোদিন আলাদা করা যায়নি। পার্থ শহরের ‘কুইনস পার্ক’ এলাকায় তাঁর নিজ বাসভবনের সামনে তিনি একটি পতাকাদণ্ড স্থাপন করেছিলেন। সেখানে অস্ট্রেলীয় পতাকার পাশে প্রতিদিন তিনি বাংলাদেশের লাল-সবুজ জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতেন।
তাঁর ঘরে শোভা পেত বঙ্গবন্ধুর ছবি, বীর প্রতীক খেতাবের সনদ এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বিভিন্ন স্মারক। তিনি গর্ব করে আগন্তুকদের বলতেন,
“আমি রক্তের সূত্রে ডাচ কিংবা অস্ট্রেলীয় হতে পারি, কিন্তু আত্মার সূত্রে আমি একজন বাঙালি।”
জীবনাবসান ও চিরন্তন শ্রদ্ধাঙ্কন
২০০১ সালের ১৮ মে, ৮৩ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার পার্থের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই মহান মানবতাবাদী বীর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি দীর্ঘ দিন অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর খবর যখন বাংলাদেশে পৌঁছায়, তখন পুরো দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে।
গুলশানে 'ওডারল্যান্ড সড়ক' (Ouderland Way): বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ এই পরম বন্ধুকে কখনো ভুলে যায়নি। তাঁর স্মৃতিকে চির জাগ্রত রাখতে রাজধানী ঢাকার গুলশান-২ এলাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ককে "ওডারল্যান্ড সড়ক" (Ouderland Way) হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে।
যে কূটনৈতিক পাড়ায় বসে তিনি একদা দেশের স্বাধীনতার গোপন ছক কষেছিলেন, সেখানেই আজ তাঁর নামটি স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে আমাদের চিরকালের কৃতজ্ঞতার স্মারক হয়ে।
প্রারম্ভিক জীবনের কঠিন দিনগুলো ও নাৎসি জেলখানা থেকে পলায়ন
উইলিয়াম ওডারল্যান্ডের শৈশব ও কৈশোর কোনো বিলাসী পরিবেশে কাটেনি। ১৯১৭ সালে আমস্টারডামে জন্ম নেওয়া এই বীরের জীবনযুদ্ধ শুরু হয়েছিল একদম গোড়া থেকেই:
১৭ বছর বয়সে জুতা পালিশকারী: ১৯২০ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত তিনি তাঁর জার্মান মা ও বোনের সাথে জার্মানির কোলন (Köln) শহরে বসবাস করেন। ১৯৩২ সালে ডাচ সমাজতান্ত্রিক দলের কর্মী বাবা তাঁকে নেদারল্যান্ডসে ফিরিয়ে আনেন। দারিদ্র্যের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা ছেড়ে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি রাস্তায় জুতা পালিশের কাজ (Shoe-shining) নেন। সেখান থেকেই পরবর্তীতে বাটা শু কোম্পানিতে একজন সাধারণ কর্মচারীর কাজ পান।
ভাষাগত দক্ষতা: জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসে শৈশব কাটানোর কারণে তিনি জার্মান ও ওলন্দাজ (ডাচ) উভয় ভাষায় মাতৃভাষার মতো সাবলীল ছিলেন। এই দ্বিভাষিক দক্ষতা পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁর গুপ্তচরবৃত্তির প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
ডাচ আন্ডারগ্রাউন্ড ও বন্দিদশা: ১৯৩৬ সালে তিনি ডাচ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং 'রয়্যাল সিগন্যাল কোর'-এ সার্জেন্ট পদে উন্নীত হন। ১৯৪০ সালে হিটলারের বাহিনী নেদারল্যান্ডস দখল করলে তিনি ডাচ অ্যান্টি-নাৎসি আন্ডারগ্রাউন্ড রেজিস্ট্যান্সের গেরিলা কমান্ডো হিসেবে কাজ শুরু করেন।
সাহসিকতার সাথে পলায়ন: একপর্যায়ে নাৎসি Gestapo বাহিনীর হাতে তিনি গ্রেপ্তার হয়ে বন্দি হন। কিন্তু অসম্ভব বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতা দেখিয়ে তিনি প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে নাৎসি জেলখানা ভেঙে পালিয়ে যান এবং যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত গেস্টাপো বাহিনীর বিরুদ্ধে গোপন তথ্য সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণ চালিয়ে যান।
ক্যান্টনমেন্টে ঢোকার গোপন 'পাস' ও জেনারেল নিয়াজীর সাথে মনস্তাত্ত্বিক খেলা
১৯৭০ সালে ঢাকার বাটা কারখানার এমডি হয়ে আসার পর ১৯৭১ সালের মার্চে যুদ্ধ শুরু হলে ওডারল্যান্ড যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা আধুনিক সামরিক ইতিহাসের যেকোনো শীর্ষ স্পাইয়ের গল্পের চেয়ে কম নয়:
২২তম বালুচ রেজিমেন্টের সংযোগ: ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশের জন্য ওডারল্যান্ড প্রথমে ২২তম বালুচ রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন সুলতান নেওয়াজের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। তাঁর মাধ্যমে তিনি সেনানিবাসের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়েন।
বিশেষ 'সিকিউরিটি পাস' (Security Pass): তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান সামরিক জান্তার কাছে তিনি একজন প্রভাবশালী বিদেশি ব্যবসায়ী হওয়ায় ইস্টার্ন কমান্ডের হেডকোয়ার্টার্স থেকে তাঁকে একটি বিশেষ অল-এক্সেস 'সিকিউরিটি পাস' দেওয়া হয়েছিল। এই পাসের বলে তিনি সেনানিবাসের যেকোনো উচ্চ নিরাপত্তা জোনে নিজের গাড়িতে প্রবেশ করতে পারতেন।
জেনারেল নিয়াজীর "Distinguished Friend": ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজী তাঁকে তাঁর "বিশেষ ও সম্মানিত বন্ধু" (Distinguished Friend) বলে মনে করতেন। নিয়াজী ও রাও ফরমান আলী ভাবতেন, একজন ইউরোপীয় ব্যবসায়ী কখনোই বাঙালিদের সমর্থক হতে পারে না। এই অন্ধ বিশ্বাসকেই ওডারল্যান্ড অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। জেনারেলদের সাথে কফি ও হুইস্কি খাওয়ার ফাঁকে তিনি টেবিলের ম্যাপ ও গুরুত্বপূর্ণ কথা গোপন ডায়েরিতে নোট করে নিতেন।
২ নম্বর সেক্টর ও ক্যাপ্টেন এ টি এম হায়দারের সাথে কোডেড বার্তালাপ
ওডারল্যান্ডের সংগৃহীত সামরিক তথ্য কীভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পৌঁছাত, তার পেছনে ছিল এক নিখুঁত নেটওয়ার্ক:
ক্যাপ্টেন হায়দারের সাথে সংকেত: ২ নম্বর সেক্টরের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ক্যাপ্টেন এ টি এম হায়দার এবং সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের সাথে ওডারল্যান্ডের নিয়মিত বার্তা আদান-প্রদান হতো। তিনি বার্তাবাহকের মাধ্যমে বিশেষ সাংকেতিক ভাষায় (Coded Message) খবর পাঠাতেন।
টঙ্গী-ভৈরব রেললাইন বিপর্যয়: ওডারল্যান্ডের দেওয়া সঠিক তথ্যের ভিত্তিতেই মুক্তিযোদ্ধারা টঙ্গী-ভৈরব রেললাইনের ওপর বড় বড় সেতু এবং কালভার্ট উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এতে ঢাকায় পাকিস্তানি সৈন্যদের রসদ ও অস্ত্র পৌঁছানোর পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে যায়।
ঢাকার ক্র্যাক প্লাটুনকে সহায়তা: ঢাকায় যেসব তরুণ আরবান গেরিলা (Crack Platoon) অপারেশন চালাতেন, ওডারল্যান্ড গোপনে তাঁদের বাটা কারখানার কেমিক্যাল ও এক্সপ্লোসিভ সরবরাহ করতেন। অনেক গেরিলা যোদ্ধা আহত হলে টঙ্গী কারখানার গোপন কক্ষে তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন এবং নিজে ড্রেসিং করে দিতেন।
ছবি পাচারের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক: "Bata Diplomatic Mail"
একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনী পুরো সংবাদমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করেছিল। কিন্তু ওডারল্যান্ড কীভাবে গণহত্যার প্রমাণ বিশ্বের কাছে পাঠালেন?
কর্পোরেট মেইল কুরিয়ারের অপব্যবহার: বাটা একটি বহুজাতিক কোম্পানি হওয়ায় প্রতিদিন তাদের অফিশিয়াল চিঠিপত্র ও নথি বিশেষ কুরিয়ারে ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর এবং সুইজারল্যান্ডের হেডকোয়ার্টার্সে যেত। ওডারল্যান্ড তাঁর ক্যামেরায় তোলা হাজার হাজার গণহত্যার নেগেটিভ ছবির রিল (Film Roll) অফিশিয়াল ফাইল ও জুতোর নমুনার ভেতরে লুকিয়ে ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুরে পাচার করে দিতেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে লিক: ব্যাংকক ও সিঙ্গাপুর থেকে বাটার কর্মীরা সেই ছবিগুলো অস্ট্রেলিয়ান ও ইউরোপীয় প্রধান প্রধান সংবাদপত্রে (যেমন- দ্য কেয়ার্নস পোস্ট, অস্ট্রেলিয়ান প্রেস) পৌঁছে দিতেন। এর ফলে বিশ্ববাসী চাক্ষুষ দেখতে পায় কীভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে।
ওডারল্যান্ড এক স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন:
“ইউরোপে আমার তরুণ বয়সের অভিজ্ঞতা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল যে, বিশ্ববাসীকে অন্ধকারে রেখে গণহত্যা চালানো সহজ। তাই আমার প্রথম কাজ ছিল বাংলাদেশের এই নরসংহারের কথা বিশ্ব বিবেককে জানানো।”
স্বাধীনতা-উত্তর জীবন, সম্মাননার অর্থ দান ও অশ্রুসজলবিদায়
স্বাধীনতার পর ওডারল্যান্ডের জীবনের কিছু আবেগঘন ঘটনা ইতিহাসের পাতায় তাঁর মহানুভবতার পরিচয় বহন করে:
১৯৭৮ পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান: ১৯৭৫ সালের আগস্টে শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পরও ওডারল্যান্ড বাংলাদেশ ছেড়ে যাননি। তিনি ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বাটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের শিল্প খাত পুনর্গঠনে শ্রম দেন। ১৯৭৮ সালে অবসর নিয়ে তিনি স্ত্রীর সাথে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে (Perth) স্থায়ী হন।
১৯৯৮ সালের রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণ ও অসুস্থতা: ১৯৯৮ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ঢাকায় এনে আনুষ্ঠানিকভাবে 'বীর প্রতীক' খেতাবের পদক প্রদান করার জন্য রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু তখন তিনি মারাত্মক অসুস্থ থাকায় দীর্ঘ বিমান ভ্রমণ করতে পারেননি।
সম্মানীর অর্থ 'মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট'-এ দান: খেতাবের সাথে প্রাপ্ত নগদ অর্থ ও ভাতা তিনি নিজের জন্য গ্রহণ না করে বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়া "বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট"-এ দান করে দেন, যেন তা অসচ্ছল ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার কাজে লাগে।
শেষ কথা: "Bangladesh Mon Amor": ২০০১ সালের ১৮ মে অস্ট্রেলিয়ার পার্থের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করার পূর্বে তিনি তাঁর স্ত্রী মারিয়া (Maria) এবং একমাত্র কন্যাকে বিছানার পাশে ডেকে বলেছিলেন:
“Bangladesh mon amor” (বাংলাদেশ আমাদের ভালোবাসা)। এই দেশটিকে এবং এই মানুষগুলোকে কোনোদিন ভুলে যেও না। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও বাংলাদেশের প্রতি এই ভালোবাসার ধারা অব্যাহত রেখো।
ইতিহাস ও সংস্কৃতির পাতায় ওডারল্যান্ড
ওডারল্যান্ডের অবদানকে অমর করে রাখতে বিভিন্ন সময়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে:
১. তথ্যচিত্র "বীর প্রতীক ওডারল্যান্ড: আ হিরো অব ফ্রিডম": আ হিরো অব ফ্রিডম নামে একটি চমৎকার প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে একাত্তরে তাঁর জীবন ও সাহসিকতার ঐতিহাসিক দলিল ধারণ করা হয়েছে।
২. গুলশানের ওডারল্যান্ড সড়ক: ঢাকার কূটনৈতিক অঞ্চল গুলশান-২ এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নামকরণ করা হয়েছে ‘ওডারল্যান্ড সড়ক’ (Ouderland Way), যা প্রতিদিন দেশি-বিদেশি মানুষকে এই অসামান্য বীরের ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
৩. জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও সম্মাননা: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্কাইভে উইলিয়াম ওডারল্যান্ডের ব্যবহৃত বেশ কিছু ব্যক্তিগত বস্তু ও তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে।
কেন ওডারল্যান্ড আজকের প্রজন্মের কাছে এক আলোকবর্তিকা?
আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ওডারল্যান্ডের জীবন কেবল একটি ইতিহাসের গল্প নয়; বরং এটি একটি জীবন্ত দর্শন। তাঁর জীবন থেকে আমরা তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই:
মানবতার কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই: ওডারল্যান্ড প্রমাণ করেছেন যে, ন্যায়ের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে কোনো রক্তের বন্ধন বা ভৌগোলিক সীমানার প্রয়োজন হয় না। একজন মানুষ অন্য যেকোনো নির্যাতিত মানুষের জন্য বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারে।
নিজের অবস্থান ও ক্ষমতার নৈতিক ব্যবহার: তিনি যদি চাইতেন, করপোরেট এমডি পদের আড়ালে নিরাপদে থেকে কোটি টাকা আয় করে জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজের পদ, ক্ষমতা ও পরিচিতিকে অমানবিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং একটি জাতির মুক্তির জন্য অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
প্রতিদানহীন ভালোবাসা: তিনি জানতেন যে এই যুদ্ধে তাঁর প্রাণ যেতে পারে, তিনি জানতেন যে যুদ্ধের পর তিনি হয়তো নিজ দেশে ফিরে যাবেন। কোনো পদ-পদবি বা অর্থপ্রাপ্তির মোহ ছাড়া কেবল বিবেকের তাড়নায় তিনি জীবন বাজি রেখেছিলেন।
ঐতিহাসিক উপসংহার ও বিজয়ের সালাম
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্ররা জীবন দিয়েছিলেন। কিন্তু ওডারল্যান্ড ছিলেন সেই বিরল নক্ষত্র, যিনি অন্য এক মহাদেশ থেকে এসে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের লড়াইয়ে নিজের জীবন সঁপে দিয়েছিলেন।
তিনি বাঙালি ছিলেন না রক্তের সূত্রে, কিন্তু তাঁর ধমনীতে প্রবাহিত হয়েছিল বাঙালির স্বাধীনতার অদম্য চেতনা। তিনি ছিলেন একাধারে সৈনিক, সফল কর্পোরেট প্রধান, চতুর দূরদর্শী গুপ্তচর, মানবিক আলোকচিত্রী এবং সর্বোপরি এক অকুতোভয় মুক্তি সংগ্রামী।
স্বাধীনতার ৫ দশকেরও বেশি সময় পার করে দাঁড়িয়ে, আজ যখন আমরা আমাদের লাল-সবুজ পতাকাকে বিশ্বের দরবারে গর্বের সাথে তুলে ধরি, তখন সেই পতাকার প্রতিটি সুতোয় মিশে থাকা উইলিয়াম এ. এস. ওডারল্যান্ডের অবদানকে স্মরণ করা আমাদের ঐতিহাসিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
হে ভিনদেশি নাইট, বীর প্রতীক উইলিয়াম এ. এস. ওডারল্যান্ড বাঙালি জাতি আপনাকে কোনোদিন ভুলবে না। আমাদের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে আপনি অমর, অক্ষয় ও অজেয়। আপনাকে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা, কুর্নিশ এবং লাল সালাম!















