উইলিয়াম এ. এস. ওডারল্যান্ড - এক ভিনদেশি বীরের অসামান্য মহাকাব্য
একাত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে সাত সমুদ্র তেরো নদী ওপার থেকে আসা একজন ভিনদেশি নাগরিক যেভাবে নিজের জীবন বিপন্ন করে বাঙালির মুক্তির নেশায় মত্ত হয়েছিলেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তিনি আর কেউ নন - আমাদের পরম বন্ধু, মহান মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র বিদেশি ‘বীর প্রতীক’ উইলিয়াম এ. এস. ওডারল্যান্ড।

TruthBangla

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন কিছু নাম মিশে আছে, যা শুনলে বিস্ময়ে এবং শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। সাধারণত একটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সেই দেশের মানুষই প্রাণ বাজি রেখে লড়াই করে। কিন্তু একাত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে সাত সমুদ্র তেরো নদী ওপার থেকে আসা একজন ভিনদেশি নাগরিক যেভাবে নিজের জীবন বিপন্ন করে বাঙালির মুক্তির নেশায় মত্ত হয়েছিলেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তিনি আর কেউ নন - আমাদের পরম বন্ধু, মহান মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র বিদেশি ‘বীর প্রতীক’ উইলিয়াম এ. এস. ওডারল্যান্ড।
বাটা সু কোম্পানির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা হয়েও তিনি কীভাবে একজন দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধায় রূপান্তরিত হলেন, কীভাবে তিনি পাকিস্তানি জেনারেলদের ড্রয়িংরুমের খবর পৌঁছে দিতেন মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে - সেই রোমাঞ্চকর এবং আবেগঘন ইতিহাস নিয়েই আজকের এই বিস্তারিত আলোচনা।
উইলিয়াম এ. এস. ওডারল্যান্ড - এক ভিনদেশি বীরের অসামান্য মহাকাব্য
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ, ৬৮ জন বীর উত্তম, ১৭৫ জন বীর বিক্রম এবং ৪২৬ জন বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত যোদ্ধার তালিকায় একটি নাম সবার চেয়ে আলাদা। তিনি উইলিয়াম এএস ওডারল্যান্ড। নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া এই অস্ট্রেলীয় নাগরিক ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে বাটা সু কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। যেখানে অন্যান্য বিদেশিরা প্রাণভয়ে দেশ ছাড়ছিলেন, সেখানে ওডারল্যান্ড বেছে নিয়েছিলেন যুদ্ধের ময়দান। তিনি কেবল অস্ত্র হাতে লড়াই-ই করেননি, বরং তাঁর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা আর গোয়েন্দা দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই বিজয় দিবসে, সেই অকুতোভয় বীরের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
প্রারম্ভিক জীবন - যুদ্ধের পাঠ যেখানে শুরু
উইলিয়াম ওডারল্যান্ড ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে এক অস্থির সময়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয়, ওডারল্যান্ড তখন তরুণ। ১৯৩৬ সালে তিনি নেদারল্যান্ডসের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। একজন দক্ষ সার্জেন্ট হিসেবে তিনি নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। সেই সময়কার গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং কৌশলগুলোই হয়তো তাঁকে কয়েক দশক পর একাত্তরের রণাঙ্গনে অনন্য করে তুলেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান এবং সেখানকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। এরপর তিনি বাটা সু কোম্পানিতে কর্মজীবন শুরু করেন। বাটা কোম্পানির বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৭০ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাটা সু কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (MD) হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ঢাকায় আসেন।

একাত্তরের সেই কালরাত্রি ও ওডারল্যান্ডের পরিবর্তন
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে যখন পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ পরিচালনা করে নির্বিচারে বাঙালি হত্যা শুরু করে, ওডারল্যান্ড তখন ঢাকার টঙ্গীতে বাটা ফ্যাক্টরির বাংলোতে ছিলেন। তাঁর চোখের সামনে দিয়ে তিনি পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংসতা দেখতে পান। টঙ্গী এবং এর আশপাশের এলাকায় নিরস্ত্র মানুষের ওপর যে বর্বরতা চালানো হয়েছিল, তা দেখে ওডারল্যান্ডের ভেতরকার সেই পুরনো যোদ্ধা সত্তা জেগে ওঠে।
তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এটি কেবল একটি গৃহযুদ্ধ নয়; এটি একটি জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া জঘন্যতম গণহত্যা। মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোকে তিনি তাঁর নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন। বাটা কোম্পানির একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা হওয়ার কারণে তিনি পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের কাছে সহজেই যাতায়াত করতে পারতেন। এই সুবিধাটিকেই তিনি যুদ্ধের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন।
ছদ্মবেশী গোয়েন্দা - জেনারেলদের ড্রয়িংরুমে ওডারল্যান্ড
ওডারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল তাঁর গোয়েন্দাবৃত্তি। তিনি একজন বিদেশি এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রধান হওয়ার সুবাদে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। তিনি প্রায়ই ঢাকা সেনানিবাসে পাকিস্তানি অফিসারদের ক্লাবে যেতেন, তাদের সঙ্গে ডিনার করতেন এবং আড্ডায় মেতে উঠতেন।
পাকিস্তানি জেনারেলরা তাঁকে ‘আপন লোক’ এবং ‘পাকিস্তানের শুভাকাঙ্ক্ষী’ মনে করে তাঁর সামনেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতেন। ওডারল্যান্ড সেইসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নোট তৈরি করতেন এবং অত্যন্ত গোপনে সেগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। বিশেষ করে ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ এবং ক্যাপ্টেন এ টি এম হায়দারের সঙ্গে তাঁর গোপন যোগাযোগ ছিল। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধারা অনেক বড় বড় পাকিস্তানি অপারেশন নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন।
সরাসরি সম্মুখ সমর ও প্রশিক্ষণ
ওডারল্যান্ড কেবল তথ্য দিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি টঙ্গী এলাকায় বাটা সু কোম্পানির ভেতরেই একটি গোপন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলেন। তিনি নিজেই মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র চালনা এবং গেরিলা যুদ্ধের উন্নত কৌশল শেখাতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের বিরুদ্ধে লড়াই করার অভিজ্ঞতা তিনি বাঙালি তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন।
মুক্তিযুদ্ধের ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে তিনি একটি বিশেষ গেরিলা দল গঠন করেন। অনেক সময় তিনি লুঙ্গি পরে, মুখে কালি মেখে ছদ্মবেশে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সরাসরি অপারেশনে অংশ নিতেন। একজন ইউরোপীয় নাগরিক হয়েও বাংলার কাদামাটিতে মিশে গিয়ে তিনি যেভাবে স্টেনগান হাতে লড়াই করেছেন, তা ভাবলে আজও অবাক হতে হয়। ঢাকার আশেপাশে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর চালানো বেশ কিছু সফল গেরিলা হামলার পেছনে তাঁর সরাসরি পরিকল্পনা ও অংশগ্রহণ ছিল।
বিশ্ব বিবেকের কাছে আলোকচিত্রী ওডারল্যান্ড
যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা ছিল সেই সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। ওডারল্যান্ড তাঁর ক্যামেরা দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের অসংখ্য ছবি তোলেন। বাটা কোম্পানির নথিপত্র এবং ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের আড়ালে তিনি এই ছবিগুলো গোপনে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমে পাঠাতেন।
তাঁর পাঠানো এই ছবি ও তথ্যগুলো আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত গঠনে বিশাল ভূমিকা রাখে। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, পাকিস্তানিরা কেবল বিদ্রোহ দমন করছে না, বরং তারা পরিকল্পিতভাবে একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করছে।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি - একমাত্র বিদেশি ‘বীর প্রতীক’
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ওডারল্যান্ড কয়েক বছর বাংলাদেশে ছিলেন। তাঁর অসামান্য সাহসিকতা এবং অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করে। বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে তিনিই একমাত্র বিদেশি নাগরিক, যিনি এই বিরল সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।
তিনি ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাটা কোম্পানির এমডি হিসেবে বাংলাদেশে কাজ করেন। এরপর তিনি অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যান। তবে তাঁর হৃদয়ে বাংলাদেশ সব সময় এক বিশেষ জায়গা জুড়ে ছিল। অস্ট্রেলিয়ার পার্থে তাঁর বাড়ির সামনে তিনি সব সময় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে রাখতেন।
প্রয়াণ ও হৃদয়ে বাংলাদেশ
উইলিয়াম ওডারল্যান্ড ২০০১ সালের ১৮ মে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নিজেকে বাংলাদেশের একজন গর্বিত বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিতেন। মৃত্যুর আগে তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "আমি যা করেছি তা মানবতার খাতিরে করেছি। আমি দেখেছি কীভাবে একটি নিরস্ত্র জাতিকে নির্যাতন করা হচ্ছে। আমি কেবল আমার বিবেকের ডাক শুনেছিলাম।"
তাঁর প্রয়াণের পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করা হয় এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে স্মরণ করা হয়। আজও ঢাকার গুলশানে তাঁর নামে একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে, যা আমাদের এই পরম বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতার এক ক্ষুদ্র নিদর্শন।
কেন ওডারল্যান্ড আমাদের জন্য অপরিহার্য?
আজকের প্রজন্মের কাছে ওডারল্যান্ড কেবল একটি নাম নয়, বরং একটি আদর্শ। তিনি শিখিয়েছেন যে:
মানবতার কোনো সীমানা নেই: পরদেশি হয়েও তিনি বাঙালির দুঃখে কেঁদেছেন।
সাহস ও প্রজ্ঞা: কীভাবে নিজের অবস্থানকে দেশের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হয়, তিনি তার সেরা উদাহরণ।
নিঃস্বার্থ ভালোবাসা: কোনো প্রতিদান বা স্বীকৃতির আশা না করেই তিনি মৃত্যুর ঝুঁঁকি নিয়েছিলেন।
বিজয় দিবসের শপথ
বিজয় দিবস মানে কেবল উৎসব নয়, বিজয় দিবস মানে সেইসব সূর্যসন্তানদের স্মরণ করা যারা আমাদের এই লাল-সবুজ পতাকা উপহার দিয়েছেন। সেই তালিকায় উইলিয়াম এ. এস. ওডারল্যান্ড নামটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে, ন্যায়বিচারের লড়াইয়ে একা হয়ে পড়লেও পিছু হটতে নেই।
উইলিয়াম ওডারল্যান্ড কোনোদিন বাঙালি ছিলেন না রক্তের বন্ধনে, কিন্তু তাঁর হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন ছিল বাংলাদেশের জন্য। এই বিজয় দিবসে আমাদের শপথ হোক - ওডারল্যান্ডের মতো বন্ধু ও বীরদের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া।
বীর প্রতীক উইলিয়াম এ. এস. ওডারল্যান্ড, আপনি আমাদের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন। আপনাকে কুর্নিশ, আপনাকে লাল সালাম।














