>

>

মিরপুরে যে ব্রীজে ১৫ হাজার মানুষের রক্তের দাগ লেগে ছিল - তুরাগের রক্তস্রোত

মিরপুরে যে ব্রীজে ১৫ হাজার মানুষের রক্তের দাগ লেগে ছিল - তুরাগের রক্তস্রোত

আধুনিকতার চকচকে প্রলেপ কি মুছে দিতে পেরেছে আজ থেকে সাড়ে পাঁচ দশক আগে সেই মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা হাজারো শহীদের করুণ আর্তনাদ? মুছে দিতে পেরেছে তুরাগ নদীর জলে মিশে থাকা সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বাধিকার সংগ্রামের রক্তভেজা ইতিহাস? ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই একটি মাত্র লোহার সেতুতে যে পৈশাচিক বর্বরতা ও পরিকল্পিত গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী, তাদের দোসর রাজাকার এবং স্থানীয় বিহারীরা তা শুনলে আজও থমকে দাঁড়ায় যেকোনো বিবেকবান মানুষ। গাবতলী-আমিনবাজারের এই বধ্যভূমিটি কেবল একটি ঐতিহাসিক গণহত্যার স্থান নয়, বরং এটি স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও আমাদের রাষ্ট্রীয় অবহেলা।

TruthBangla

মিরপুরে যে ব্রীজে ১৫ হাজার মানুষের রক্তের দাগ লেগে ছিল - তুরাগের রক্তস্রোত

আজকের গাবতলী থেকে আমিনবাজারের দিকে ছুটে চলা পথচারী বা যানবাহন আরোহীদের চোখ পড়ে তুরাগ নদীর ওপর নির্মিত দৃষ্টিনন্দন আধুনিক আট লেনের কংক্রিট সেতুর দিকে। ঢাকা শহরের অন্যতম প্রধান এই পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ ও হাজার হাজার যানবাহন দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাতায়াত করছে। রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে এই সেতুর ভূমিকা নিঃসন্দেহে অপরিসীম। কিন্তু এই আধুনিকতার চকচকে প্রলেপ কি মুছে দিতে পেরেছে আজ থেকে সাড়ে পাঁচ দশক আগে সেই মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা হাজারো শহীদের করুণ আর্তনাদ? মুছে দিতে পেরেছে তুরাগ নদীর জলে মিশে থাকা সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বাধিকার সংগ্রামের রক্তভেজা ইতিহাস?

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই একটি মাত্র লোহার সেতুতে যে পৈশাচিক বর্বরতা ও পরিকল্পিত গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী, তাদের দোসর রাজাকার এবং স্থানীয় বিহারীরা তা শুনলে আজও থমকে দাঁড়ায় যেকোনো বিবেকবান মানুষ। গাবতলী-আমিনবাজারের এই বধ্যভূমিটি কেবল একটি ঐতিহাসিক গণহত্যার স্থান নয়, বরং এটি স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও আমাদের রাষ্ট্রীয় অবহেলা, আমলাতান্ত্রিক ব্যর্থতা এবং স্মৃতি সংরক্ষণে চরম উদাসীনতার এক জীবন্ত দলিল।

গাবতলী-আমিনবাজার বধ্যভূমির ভৌগোলিক গুরুত্ব ও গণহত্যার পটভূমি

১৯৭১ সালে গাবতলী থেকে আমিনবাজারমুখী তুরাগ নদীর ওপর স্থাপিত পুরনো লোহার ব্রিজটি ছিল রাজধানী ঢাকায় আসা এবং ঢাকা থেকে বের হওয়ার প্রধান সড়ক পথ। কৌশলগত দিক থেকে এই স্থানটি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে ঢাকা শহরে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে, তখন ঢাকা ছাড়তে চাওয়া হাজার হাজার আতঙ্কগ্রস্ত সাধারণ মানুষের প্রধান যাতায়াত পথ ছিল এই গাবতলী-আমিনবাজার রুট।

অবরুদ্ধ ঢাকা শহর যখন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়, তখন গ্রামের নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে এই পথ ধরে ধাবিত হচ্ছিল। আর এই সুযোগটিই গ্রহণ করেছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের এদেশীয় দোসররা।

একাত্তরের পুরো নয় মাস ধরে মিরপুর এলাকাটি ছিল অবাঙালি বা বিহারীদের অন্যতম প্রধান শক্তঘাঁটি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সরাসরি সহায়তায় ও ইন্দনে মিরপুর এবং গাবতলী সংলগ্ন এলাকায় বিহারীরা এক নৃশংস সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। গাবতলী লোহার ব্রিজটিকে তারা বেছে নিয়েছিল মানুষ হত্যা এবং লাশ গুম করার এক আদর্শ কেন্দ্র হিসেবে। কারণ, ব্রিজের ওপর থেকে মানুষকে হত্যা করে নিচে তুরাগ নদীতে ফেলে দিলে নদীর তীব্র স্রোত মুহূর্তের মধ্যেই সেই লাশগুলোকে ভাসিয়ে দূরে নিয়ে যেত। ফলে দৃশ্যত স্থানটিকে পরিষ্কার রাখা সম্ভব হতো এবং হত্যার প্রমাণ গোপন করা সহজ হতো।

১০ ঘণ্টার অন্ধকার: একটি নিখুঁত কসাইখানা

গাবতলী-আমিনবাজার লোহার ব্রিজে পরিচালিত গণহত্যাটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং সময় মেপে পরিচালিত এক পৈশাচিক রুটিন। একাত্তরের নয় মাস প্রতি রাতে সেখানে কীভাবে নরক নেমে আসত, তা পর্যালোচনা করলে শিউরে উঠতে হয়।

প্রতিদিন বিকেল কিংবা সন্ধ্যার পর থেকেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও বিহারীরা ঢাকার বিভিন্ন টর্চার সেল, বাসাবাড়ি বা রাস্তা থেকে ধরে আনা নিরীহ মানুষদের ট্রাকে করে গাবতলী ব্রিজে নিয়ে আসত। ব্রিজের দুই প্রান্তে দুটি আলোর বাতি ছিল। সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সেই আলো জ্বালিয়ে রাখা হতো, যাতে বাইরে থেকে দূরবর্তী এলাকার মানুষ কিংবা পথচারীদের মনে হয় ব্রিজের পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু রাত ১০টা বাজার সাথে সাথেই নিভিয়ে দেওয়া হতো সেই বাতি দুটি। পুরো তুরাগ নদী ও গাবতলী ব্রিজ ঢেকে যেত গাঢ় অন্ধকারে। আর সেই অন্ধকারের সুযোগ নিয়েই শুরু হতো নরমেধ যজ্ঞ।

ট্রাকগুলো ব্রিজের এক প্রান্তে এনে দাঁড় করানো হতো। সেখান থেকে রশি বা দড়ি দিয়ে বাঁধা মানুষকে টেনে-হিঁচড়ে, মারতে মারতে ব্রিজের ঠিক মাঝখানে নিয়ে আসা হতো। এরপর সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে চালানো হতো অন্ধ ব্রাশফায়ার। গুলির প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠত পুরো তুরাগ পাড়, আর একের পর এক তাজা প্রাণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে আছড়ে পড়ত নিচের নদীর পানিতে।

কখনো কখনো যখন মানুষের সংখ্যা অতিরিক্ত হতো এবং ঘাতকদের গুলি ফুরিয়ে আসত, তখন তারা নৃশংসতার সব সীমা অতিক্রম করত। বেঁচে থাকা মানুষদের ব্রিজের ওপর চিৎ করে শুইয়ে দেওয়া হতো। এরপর বিহারীরা তাদের কাছে থাকা ধারালো রামদা, তলোয়ার ও ছুরি দিয়ে একের পর এক মানুষকে জবাই করত এবং পেটে পোঁচ দিয়ে নাড়িভুঁড়ি বের করে নদীতে ফেলে দিত, যাতে লাশগুলো পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং ভেসে না ওঠে। সারারাত ধরে চলত এই মরণখেলা, আর ভোরের আলো ফোটার আগেই মুছে ফেলা হতো রক্তের দাগ।

প্রত্যক্ষদর্শী মাঝি মোহাম্মদ আলীর জবাকুড়ানো স্মৃতি

গাবতলী-আমিনবাজার বধ্যভূমির এই বিভীষিকাময় দিনগুলোর সবচেয়ে বড় প্রত্যক্ষদর্শী সাভারের কাউন্দিয়া ইউনিয়নের ইসাকাবাদ গ্রামের বাসিন্দা ৭৮ বছর বয়সী বৃদ্ধ মোহাম্মদ আলী। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তুরাগ নদীর বুকে খেয়া পারাপারের কাজ করছেন এই খেটে খাওয়া মানুষটি। তুরাগ নদীর উত্তর পাড়ে দাঁড়িয়ে তাকালে একসময় স্পষ্ট দেখা যেত সেই ঐতিহাসিক পুরনো স্টিলের লোহার ব্রিজটি।

একাত্তরের সেই নয়টি মাস নিজের চোখে যা দেখেছেন, তা বলতে গিয়ে আজ এত বছর পরও বাষ্পরুদ্ধ হয়ে পড়ে তাঁর কণ্ঠ। তিনি বলেন:

"যুদ্ধের পুরো সময়ে এমন একটি রাতও কাটেনি, যেদিন এই ব্রিজে মানুষ মারা হয়নি। প্রতিদিন বিকেলে বা সন্ধ্যায় পাকিস্তানি সেনারা এবং বিহারীরা ট্রাক ভর্তি করে মানুষ নিয়ে আসত। রাত ১০টা বাজলেই বাতি নিভিয়ে দেওয়া হতো, আর আমরা নদীর ওপার থেকে গুলির শব্দ শুনতাম। এরপর দেখতাম তুরাগ নদীতে একটার পর একটা লাশ গড়িয়ে পড়ছে। বৃষ্টির মতো মানুষ মারা হতো সেই ব্রিজে।"

মোহাম্মদ আলী আরও জানান, ঘাতকরা কতটা নির্মম ছিল। যখন তাদের কাছে গুলি শেষ হয়ে যেত, তখন তারা কোনো দয়া দেখাত না। দড়িতে বাঁধা মানুষগুলোকে ব্রিজের ওপর শুইয়ে দিয়ে বিহারীরা এক এক করে তাদের জবাই করত। রাতের অন্ধকারে নদীর বুক চিরে ভেসে আসত মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের গোঙানি ও আর্তনাদ। কিন্তু নদীর অপর পাড়ে থাকা গ্রামবাসী ভয়ে নিশুতি রাতে আলো জ্বালানোর সাহসও পেত না।

যখন তুরাগের মাছ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল মানুষ

একাত্তরে তুরাগ নদী কোনো সাধারণ নদী ছিল না; তা পরিণত হয়েছিল শহীদের রক্ত আর লাশের এক বিশাল খালের মতো। প্রত্যক্ষদর্শী মোহাম্মদ আলী এবং এলাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের মতে, নদীতে পচা লাশের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে, একপর্যায়ে স্রোতে লাশ ভেসে যাওয়ার জায়গা পর্যন্ত থাকত না। নদীর খাঁড়িতে ও চরে জমে উঠত লাশের স্তূপ।

মাঝি মোহাম্মদ আলী বলেন:

"কখনো কখনো এতো বেশি মানুষ মারা হতো যে একপর্যায়ে তাদের গুলি শেষ হয়ে যেত। তখন তারা দয়া করতো না। বাকিদের ব্রিজের ওপর চিৎ করে শুইয়ে দেওয়া হতো। এরপর বিহারীরা ধারালো ছুরি দিয়ে তাদের জবাই করে নদীতে ফেলে দিত। সারারাত ধরে চলত এই মরণখেলা।"

পচা লাশের দুর্গন্ধে তুরাগ নদীর দুই পারের বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠেছিল। দিনের বেলায়ও মানুষ ভয়ে ব্রিজের আশপাশে ঘেঁষত না। রাশেদা বেগম নামের অপর এক স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী জানান, দিনের বেলায় ব্রিজের দুই প্রান্তে সশস্ত্র বিহারী পাহারা থাকত, যাতে স্থানীয় কোনো বাঙালি নৌকা নিয়ে নদী থেকে স্বজন বা অন্য কারো লাশ উদ্ধার করতে না পারে।

যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলেও দীর্ঘদিন পর্যন্ত গাবতলী, আমিনবাজার, কাউন্দিয়া ও সাভার এলাকার মানুষ তুরাগ নদীর মাছ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। মানুষ জানত, তুরাগের মাছেদের খাদ্য হয়েছিল তাদেরই স্বজন, ভাই ও মুক্তিকামী বাঙালি জাতির তাজা রক্ত ও মাংস। এই মনস্তাত্ত্বিক আঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে, কয়েক বছর ধরে তুরাগের মাছ কেনাবেচা পর্যন্ত স্থবির হয়ে পড়েছিল।

ড. এম এ হাসানের গবেষণা ও ১৫,০০০ শহীদের তথ্য-উপাত্ত

গাবতলী-আমিনবাজার বধ্যভূমির এই গণহত্যার পরিধি কত বিশাল ছিল, তা উঠে এসেছে দেশের প্রখ্যাত গণহত্যা গবেষক এবং 'ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি' এর চেয়ারম্যান ডাঃ এম এ হাসানের দীর্ঘ বছরের মাঠপর্যায়ের গবেষণায়।

'১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট' এ পর্যন্ত ৪০টি জেলায় জরিপ চালিয়ে ৮৫৫টি বধ্যভূমি, ১,২৬৪টি গণকবর এবং ১,১১৮টি নির্যাতন কেন্দ্র খুঁজে পেয়েছে। ট্রাস্ট বর্তমানে এই স্থানগুলোর জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) মানচিত্র তৈরি করছে।

অন্যদিকে, 'ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি' তাদের নিজস্ব গবেষণায় ৫,০০০ বধ্যভূমি শনাক্ত করেছে। কমিটি এর মধ্যে ১,০৪০টির জিপিএস মানচিত্র তৈরি করেছে।

ডাঃ এম এ হাসানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, "পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের বিহারি সহযোগীরা গাবতলী-আমিনবাজার লোহার ব্রিজে নয় মাসে অন্তত ১৫,০০০ মানুষকে হত্যা করেছে।" এই বিশাল সংখ্যক শহীদের তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে গবেষকরা এক চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক সত্য দেখতে পান। এই ১৫ হাজার শহীদের মধ্যে মাত্র ৫ জনের বাড়ি ছিল স্থানীয় সাভার বা গাবতলী সংলগ্ন গ্রামে। অর্থাৎ, বাকি ১৪ হাজার ৯৯৫ জন মানুষই ছিলেন ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অথবা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা শরণার্থী ও সাধারণ নাগরিক।

ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন যাদের গ্রেপ্তার বা অপহরণ করা হতো, তাদের শেষ পরিণতি হিসেবে ট্রাকে করে নিয়ে আসা হতো গাবতলী ব্রিজে। নদী সংলগ্ন হওয়ায় লাশ গুম করার সহজ সুযোগ এবং পাকিস্তানি সেনাদের সাথে স্থানীয় বিহারী মিলিশিয়াদের সরাসরি সহযোগিতা এই স্থানটিকে ঢাকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একটি 'কসাইখানায়' পরিণত করেছিল। গণহত্যা গবেষকদের মতে, নৃশংসতার বিচারে গাবতলী বধ্যভূমি ঢাকার রায়েরবাজার বা জল্লাদখানা বধ্যভূমির চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিল না।

এক নজরে গাবতলী ও মিরপুরের প্রধান বধ্যভূমিসমূহ

মিরপুর এবং গাবতলী এলাকাটি ১৯৭১ সালে কার্যত একটি বিস্তৃত গণহত্যা অঞ্চলে পরিণত হয়েছিল। নিচে উক্ত এলাকার প্রধান বধ্যভূমিগুলোর বিবরণ সম্বলিত একটি তালিকা উপস্থাপন করা হলো:

বধ্যভূমির নাম ও অবস্থান

আনুমানিক নিহতের সংখ্যা ও ধরণ

প্রধান অপরাধী চক্র

বর্তমান স্থলাভিষিক্ত রূপ ও প্রশাসনিক স্বীকৃতি

গাবতলী-আমিনবাজার লোহার ব্রিজ (তুরাগ নদী সংলগ্ন)

১৫,০০০ জন (সাধারণ নাগরিক, শরণার্থী ও বন্দী)

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও স্থানীয় সশস্ত্র বিহারী

আধুনিক ৬/৮ লেনের কংক্রিট সেতু; সরকারিভাবে বধ্যভূমির কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা স্মারক নেই।

জল্লাদখানা বধ্যভূমি (মিরপুর ১০, সেকশন-১১)

কয়েক হাজার (বাঙালি বুদ্ধিজীবী, সাধারণ নাগরিক)

আল-বদর, রাজাকার ও বিহারী মিলিশিয়া

১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন ট্রাস্ট ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃক পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষিত ও স্মারক নির্মিত।

মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ

কয়েক হাজার (ছাত্র, শিক্ষক ও স্থানীয় বাঙালি)

পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্প ও বিহারী সহযোগী

কলেজ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আংশিকভাবে স্মারক স্তম্ভ নির্মিত ও সংরক্ষিত।

শিয়ালবাড়ী বধ্যভূমি (মিরপুর)

হাজারেরও বেশি (নারী, শিশু ও মুক্তিকামী বাঙালি)

বিহারী মিলিশিয়া ও স্থানীয় রাজাকার

দখলকৃত; আবাসিক বহুতল ভবন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

মুসলিম বাজার বধ্যভূমি (মিরপুর ১২)

কয়েক শত (বাঙালি পুলিশ, ছাত্র ও সাধারণ মানুষ)

বিহারী দখলদার ও পাকিস্তানি সেনা

দখল হয়ে গেছে; আবর্জনা ফেলার ভাগাড় ও গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত।

রাইনখোলা ও কালশী বধ্যভূমি

ধারণাতীত (স্থানীয় বাঙালি পরিবারসমূহ)

বিহারী ও কসাই জহুর চক্র

আবাসিক এলাকা ও দোকানপাটের নিচে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত।

বিলুপ্তির পথে মিরপুরের ২৭টি বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও মিরপুর কিন্তু ওই দিন স্বাধীন হয়নি। সশস্ত্র বিহারীদের তীব্র প্রতিরোধ ও অবস্থানের কারণে মিরপুর স্বাধীন হয়েছিল ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি। ফলে মিরপুরে গণহত্যার মাত্রা ছিল দেশের অন্য যেকোনো স্থানের চেয়ে অনেক বেশি পৈশাচিক ও দীর্ঘস্থায়ী।

যুদ্ধের পরপরই গবেষকরা ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় মোট ৭৬টি বধ্যভূমি শনাক্ত করেছিলেন। এর মধ্যে কেবল মিরপুর ও গাবতলী এলাকাতেই পাওয়া গিয়েছিল ২৭টি বধ্যভূমি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পার হয়ে গেলেও এই বধ্যভূমিগুলোর বড় একটি অংশ আজ মানচিত্র থেকে মুছে গেছে।

সম্প্রতি জাতীয় গণমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টার-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মিরপুরের বধ্যভূমিগুলোর যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা দেখে যেকোনো সচেতন নাগরিক স্তম্ভিত হবেন:

১৭টি বধ্যভূমির কোনো চিহ্নই নেই: মিরপুরের ২৭টি বধ্যভূমির মধ্যে ১৭টি বধ্যভূমি আজ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। সেগুলোর ওপর গড়ে উঠেছে বহুতল আবাসিক ভবন, শপিং মল, গাড়ির গ্যারেজ এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।

ময়লার ভাগাড়: দুটি বধ্যভূমির পবিত্র মাটি আজ সিটি কর্পোরেশনের ময়লা-আবর্জনা ফেলার ডাম্পিং স্টেশন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

নদীতে বিলীন: গাবতলী-আমিনবাজার বধ্যভূমির মূল অবকাঠামোর একটা বড় অংশ তুরাগ নদীর পাড় ভাঙন ও নদী পুনখননের ফলে হারিয়ে গেছে।

মাত্র দুটি স্থানে সংরক্ষণ: ২৭টি বধ্যভূমির মধ্যে কেবল মিরপুর ১১ নম্বরের 'জল্লাদখানা' বধ্যভূমিটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগে পূর্ণাঙ্গভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। আর সরকারি বাঙলা কলেজের অভ্যন্তরীণ বধ্যভূমিটি কলেজ কর্তৃপক্ষের নিজস্ব উদ্যোগে আংশিক সংরক্ষিত।

স্বাধীনতার এত বছর পর যারা নিজেদের প্রাণের বিনিময়ে আমাদের একটি স্বাধীন পতাকা ও মানচিত্র উপহার দিলেন, তাদের রক্তস্নাত মাটির ওপর আবর্জনার স্তূপ কিংবা বহুতল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর গড়ে ওঠা জাতির জন্য এক চরম ঐতিহাসিক লজ্জা।

ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের ক্ষোভ: আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

কেন স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও গাবতলী-আমিনবাজারের মতো ১৫ হাজার শহীদের বধ্যভূমি সরকারি গেজেটভুক্ত হলো না? কেন দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার গণকবর আজ অরক্ষিত? এই প্রশ্নের জবাবে ইতিহাসবিদ এবং গণহত্যা গবেষকরা আঙুল তুলেছেন সরকারের প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র এবং নীতি-নির্ধারকদের চরম অবহেলার দিকে।

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এবং '১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট'-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন এ বিষয়ে তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:

"আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও সরকার বধ্যভূমির একটি সর্বজনগ্রাহ্য পূর্ণাঙ্গ জাতীয় তালিকা তৈরি করতে পারেনি। এটি একটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখানে প্রধান বাধা। আমলারা এ ধরনের সংবেদনশীল জাতীয় প্রকল্পে প্রকৃত ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের অন্তর্ভুক্ত করতে চান না, বরং কাগুজে প্রকল্প বানিয়ে দায় সারতে চান।"

বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম ও গবেষণা কেন্দ্র ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমান মনে করেন, নিয়ত ও সদিচ্ছা থাকলে বধ্যভূমির তালিকা করা কোনো কঠিন কাজ ছিল না। তিনি বলেন,

"সরকার যদি সত্যিই বধ্যভূমি ও নির্যাতন কেন্দ্রগুলোর তালিকা তৈরি করতে চাইত, তবে দুই মাসের বেশি সময় লাগার কথা নয়। এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যেসব বধ্যভূমিকে গণহত্যার বিচারিক প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেছে, সেগুলোকেও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় আজ পর্যন্ত দাপ্তরিকভাবে গেজেটভুক্ত বা সংরক্ষণ করেনি।"

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ডেইলি স্টারকে বলেন,

"আমাদের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা থাকলে ভালো হতো। তবে আপনারা রিপোর্টগুলো প্রকাশ করার পর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যেগুলো বধ্যভূমি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমরা পদক্ষেপ নেব।"

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং গণহত্যা গবেষকদের এই সমালোচনার মুখে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সময় সময় আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলে দিন দিন আধুনিকায়নের নামে চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিনিদর্শনগুলো।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) ও বধ্যভূমির আইনি গুরুত্ব

২০০৯ সালে বাংলাদেশে গঠিত 'আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল' (ICT) ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারে এক ঐতিহাসিক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা মামলা, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং রায় বিশ্লেষণের মাধ্যমে উঠে এসেছে যে, বধ্যভূমিগুলো কেবল স্মৃতির স্থান নয় এগুলো ছিল যুদ্ধাপরাধ প্রমাণের প্রধান আইনি দলিল।

ট্রাইব্যুনালের এ পর্যন্ত ঘোষিত রায়গুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যে অন্তত ৪১ জন শীর্ষ অপরাধীর সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে দেশের ১৬টি জেলার ৩৭টি নির্দিষ্ট বধ্যভূমি ও নির্যাতন কেন্দ্রে পরিচালিত গণহত্যার সাথে।

এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় গাবতলী, মিরপুর, রায়েরবাজার এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বধ্যভূমি থেকে উদ্ধারকৃত হাড়গোড়, মাথার খুলি, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি এবং ফরেনসিক আলামত পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকার-আলবদরদের মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু যে বধ্যভূমিগুলো আদালতে যুদ্ধাপরাধ প্রমাণের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হলো, সেই স্থানগুলোকেই রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বধ্যভূমি হিসেবে গেজেটভুক্ত বা সুরক্ষিত করতে ব্যর্থ হয়েছে যা আইনি ও রাজনৈতিক নীতিশাস্ত্রের এক বড় বৈপরীত্য।

১৯৭১-এর জাতীয় গণহত্যার প্রেক্ষাপট

গাবতলী-আমিনবাজারের ১৫ হাজার শহীদের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না; এটি ছিল ১৯৭১ সালে সমগ্র বাংলাদেশে পরিচালিত ৩ মিলিয়ন বা ৩০ লাখ মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার সর্বাত্মক পাকিস্তানি ছকেরই একটি অংশ।

ইয়াহিয়ার গণহত্যার ব্লুপ্রিন্ট

প্রখ্যাত মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক রবার্ট পেইন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত বই 'Massacre: The Tragedy at Bangla Desh and the Phenomenon of Mass Slaughter Throughout History'-এ উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় এক গোপন সামরিক সম্মেলনে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও সামরিক একনায়ক জেনারেল ইয়াহিয়া খান তাঁর জেনারেলাদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন:

"ওদের তিন মিলিয়ন (৩০ লক্ষ) মানুষকে মেরে ফেলো, বাকিরা আমাদের হাতের মুঠোয় এসে যাবে এবং তারা আমাদের হাত থেকেই খাবে।"

(Kill three million of them, and the rest will eat out of our hands.)

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এই পৈশাচিক পরিকল্পনার সরাসরি বাস্তবায়ন ঘটেছিল অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে, যা ৯ মাস ধরে তুরাগ নদী থেকে শুরু করে পদ্মার পাড় পর্যন্ত বজায় ছিল।

এছাড়া গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭১ সালে কেবল দেশের মাটিতেই ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হননি; পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া ১ কোটি শরণার্থীদের মধ্যে আনুমানিক ৩ থেকে ৫ লাখ মানুষ শরণার্থী শিবিরে কলেরা, ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে করুণ মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তারাও এই গণহত্যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিকার।

আজকে যখন সরকারের সদিচ্ছার অভাবে জাতীয় তালিকা আলোর মুখ দেখেনি, তখন বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণা ট্রাস্টগুলো ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করছে। '১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট' এ পর্যন্ত দেশের ৪০টি জেলায় বৈজ্ঞানিক জরিপ চালিয়ে ৮৫৫টি বধ্যভূমি, ১,২৬৪টি গণকবর এবং ১,১১৮টি নির্যাতন কেন্দ্র খুঁজে বের করেছে এবং সেগুলোর জিপিএস (GPS) স্যাটেলাইট ম্যাপিং করছে। অন্যদিকে 'ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি' দেশে প্রায় ৫,০০০টি ছোট-বড় বধ্যভূমির অস্তিত্বের কথা নিশ্চিত করেছে। এই গবেষণাগুলো প্রমাণ করে যে, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ ছিল বস্তুত এক বিশাল বধ্যভূমি।

কেন ১৬ ডিসেম্বরের পরও মিরপুর ও গাবতলী পরাধীন ছিল?

১৬ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকা স্বাধীন হলেও মিরপুর-১ থেকে ১২ নম্বর সেকশন, গাবতলী, আমিনবাজার এবং ডারুস সালাম এলাকাগুলো ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অনুগত হাজার হাজার সশস্ত্র বিহারী মিলিশিয়াদের শক্ত ঘাঁটি। একাত্তরের পুরো ৯ মাস ধরে এই অঞ্চলে বাঙালি জনসংখ্যাকে হয় উচ্ছেদ করা হয়েছিল, না হয় তাঁদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল।

পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণের সময় তাঁদের অস্ত্রের একটি বড় অংশ মিরপুরের সশস্ত্র বিহারীদের হাতে হস্তান্তর করে যায়। ফলে ১৬ ডিসেম্বরের পর সাধারণ বাঙালি বা সদ্য গঠিত বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষে সেখানে প্রবেশ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ১ মাসেরও বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ থেকে এই এলাকাটি এক বিশাল ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার এবং সন্ত্রাসী আস্তানায় পরিণত হয়।

‘অপারেশন মিরপুর’ (৩০-৩১ জানুয়ারি, ১৯৭২): স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সামরিক ক্ষতি

মিরপুর ও গাবতলী এলাকাকে শত্রুমুক্ত করতে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি তৎকালীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বয়ে এক যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হয়, যা ইতিহাসের পাতায় 'অপারেশন মিরপুর' নামে পরিচিত।

৩০ জানুয়ারি ভোরে লেফট্যানেন্ট সেলিম (বেঙ্গল রেজিমেন্ট) এবং সুবেদার ওয়ারেসের নেতৃত্বে ভারতীয় সেনা ও বাংলাদেশ পুলিশের একটি সুসজ্জিত দল মিরপুরে প্রবেশ করে। কিন্তু আগে থেকে তৈরি থাকা সশস্ত্র বিহারীরা বাড়ি ঘর ও গলি থেকে অতর্কিত ব্রাশফায়ার এবং মর্টার হামলা শুরু করে।

ঐতিহাসিক ক্ষয়ক্ষতি: এই একদিনের যুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ৪২ জন বীর সদস্য এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বহু জওয়ান শহীদ হন।

লেফট্যানেন্ট সেলিমের বীরত্ব: লেফট্যানেন্ট সেলিম অবরুদ্ধ সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেন এবং একপর্যায়ে শত্রুর গুলিতে অত্যন্ত নির্মমভাবে শহীদ হন।

৩১ জানুয়ারির মুক্তি: ৩০ জানুয়ারির ভয়াবহ সংঘর্ষের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করে ৩১ জানুয়ারি পুরোপুরি এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে আনে। এর মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হয় বাংলাদেশের সর্বশেষ ভূখণ্ড মিরপুর ও গাবতলী।

শহীদ জহির রায়হানের রহস্যময় অন্তর্ধান ও গাবতলী-মিরপুর লিংক

মিরপুরের বধ্যভূমির ইতিহাসের সাথে চিরদিনের জন্য জড়িয়ে আছে স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক জহির রায়হানের নাম। একাত্তরের আন্তর্জাতিক গণহত্যাবিরোধী প্রামাণ্যচিত্র 'স্টপ জেনোসাইড' (Stop Genocide)-এর নির্মাতা জহির রায়হান কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দালিলিক প্রমাণ সংগ্রাহক।

অন্তর্ধানের পটভূমি ও ট্র্যাজেডি

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর জহির রায়হানের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারকে আল-বদর বাহিনী বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জহির রায়হান উন্মাদের মতো তাঁর ভাইকে ঢাকার বিভিন্ন বধ্যভূমিতে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন।

১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি সকালে জহির রায়হানের কাছে একটি অজানা টেলিফোন কল আসে। অজ্ঞাত স্থান থেকে তাঁকে জানানো হয় যে, তাঁর ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার জীবিত আছেন এবং তাঁকে মিরপুর ১২ নম্বরের একটি নির্দিষ্ট বাড়িতে বন্দি করে রাখা হয়েছে। ভাইয়ের প্রাণ বাঁচাতে জহির রায়হান কালবিলম্ব না করে বাংলাদেশ পুলিশের একটি সশস্ত্র দলের সাথে মিরপুরের দিকে রওয়ানা হন।

মিরপুর ও গাবতলীর সংযোগস্থলে পৌঁছানোর পরই তাঁদের গাড়ি বহর বিহারীদের অতর্কিত অ্যামবুশ (অ্যামবুশ বা ছাঁটাই হামলা)-এর মুখে পড়ে। চারদিক থেকে আসা নির্বিচার গুলিবর্ষণে সেখানে থাকা পুলিশ সদস্য এবং জহির রায়হান ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। দুঃখজনকভাবে, তাঁর মৃতদেহ কোনোদিন আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ধারণা করা হয়, অন্যান্য হাজার হাজার শহীদের মতো তাঁর দেহকেও পাশেই তুরাগ নদীতে অথবা মিরপুরের কোনো গণকবরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

গাবতলী-আমিনবাজার অক্ষের আশপাশের অন্যান্য কুখ্যাত বধ্যভূমিসমূহ

গাবতলী-আমিনবাজার লোহার ব্রিজটি যদি হয় গণহত্যা ও লাশ ফেলার প্রধান 'ডিসপোজাল পয়েন্ট', তবে তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল আরও ডজনখানেক বিশেষায়িত নির্যাতন কেন্দ্র ও বধ্যভূমি।

গোলারটেক বধ্যভূমি (গাবতলী বেড়িবাঁধ সংলগ্ন): গাবতলী পশুর হাটের পেছনের অংশ থেকে শুরু করে বর্তমান বেড়িবাঁধ সংলগ্ন 'গোলারটেক' এলাকাটি ছিল তুরাগ নদীর একেবারে সন্নিকটে। এখানে একটি বিশাল নিচু জমি ও জলাশয় ছিল। গাবতলী ব্রিজ ছাড়াও যখন অতিরিক্ত মানুষকে হত্যা করার প্রয়োজন হতো, তখন ট্রাক ভরে মানুষদের এই গোলারটেক এলাকায় এনে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হতো।

সরকারি বাঙলা কলেজ বধ্যভূমি: গাবতলী ব্রিজে নিয়ে হত্যা করার আগে অনেক বন্দীকে কয়েক দিন ধরে আটকে রাখা হতো মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের ভেতরে। তৎকালীন বাঙলা কলেজের প্রিন্সিপালের বাসভবন এবং কলেজের বিশাল আমবাগানটিকে প্রধান প্রশাসনিক টর্চার সেল বানিয়েছিল পাকিস্তানি আর্মি ও রাজাকাররা।

'ঝোল' বা নির্যাতন পুকুর: কলেজের ভেতরের পুকুরটিতে ধরা পড়া মানুষদের হাত-পা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হতো এবং নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। মারা যাওয়ার পর তাঁদের গলায় ইট বেঁধে পুকুরে বা পাশের নিচু খাদে ফেলে দেওয়া হতো।

কালশী ও রাইনখোলা বধ্যভূমি: মিরপুরের কালশী ও রাইনখোলা ছিল স্থানীয় বিহারী কসাইদের আখড়া। 'জহুর কসাই' নামক এক চিহ্নিত বিহারী অপরাধী সেখানে নিজস্ব কসাইখানা গড়ে তুলেছিল, যেখানে মাংস কাটার বড় রামদা ও ছুরি দিয়ে প্রতিদিন বাঙালি তরুণদের কেটে টুকরো টুকরো করে বস্তাবন্দী করে গাবতলী ব্রিজে নিয়ে তুরাগ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো।

স্থানীয় গ্রামবাসী ও খেয়াঘাটের প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান

গাবতলী-আমিনবাজারের পাশেই সাভারের কাউন্দিয়া, ইসাকাবাদ, ভাকুর্তা, ভাটপাড়া এবং আমিনবাজারের প্রবীণ অধিবাসীরা সেই নয় মাসের এক বিভীষিকাময় দলিল বহন করছেন।

কাউন্দিয়া ও ভাকুর্তার নৌকার মাঝিদের সাক্ষ্য

ইসাকাবাদ গ্রামের খেয়াঘাটের মাঝি মোহাম্মদ আলীর পাশাপাশি কাউন্দিয়া এলাকার তৎকালীন তরুণ ডিঙি নৌকার মাঝিরা পরবর্তীতে গবেষণা ট্রাস্টের কাছে তাঁদের জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁরা জানান:

রাতে যখন গাবতলী ব্রিজে বাতি নিভিয়ে দেওয়া হতো, তখন কেবল গুলির শব্দ নয়, মানুষের চিৎকার ও আকুতি নদীর এপার থেকে স্পষ্টভাবে শোনা যেত।

অনেক সময় গুলি খাওয়ার পরও কেউ কেউ ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়ে নদীতে সাঁতরে আসার চেষ্টা করতেন। কিন্তু নদীর দুই পাড়ে বিহারী পাহারাদাররা টর্চলাইট মেরে নজরদারি রাখত। পানিতে সাঁতার কাটতে দেখা মাত্রই তাঁদের ওপর ওপর থেকে গুলি চালানো হতো।

রাতে গোপনে দাফনের মানবিক ইতিহাস

তুরাগ নদী যখন ভেসে আসা গলিত লাশে ভরে উঠত, তখন স্থানীয় কিছু দুঃসাহসী বাঙালি গ্রামবাসী (যেমন: কাউন্দিয়া ও আমিনবাজারের স্থানীয় বাসিন্দারা) গভীর রাতে নিজেদের জীবন বাজি রেখে ডিঙি নৌকা নিয়ে নদীতে নামতেন। তাঁরা পচা লাশগুলো নদী থেকে টেনে চরে বা খাস জমিতে তুলে এনে গায়েবানা জানাজা পড়ে মাটির নিচে চাপা দিতেন।

এমন শত শত অজ্ঞাতনামা শহীদকে একাত্তরে কাউন্দিয়া ও আমিনবাজারের নদীর পারের মাটিতে কবর দেওয়া হয়েছে, যাদের পরিচয় আজ পর্যন্ত কোনো স্বজন জানতে পারেননি।

আর্কিওলোজিক্যাল ও ফরেনসিক প্রমাণ: ১৯৯৯ সালের জল্লাদখানা খনন

গাবতলী ও মিরপুরের বধ্যভূমিগুলো যে কত ভয়াবহ ছিল, তা প্রামাণ্যভাবে বিশ্ববাসীর সামনে আসে ১৯৯৯ সালে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যৌথভাবে মিরপুর ১১ নম্বরের 'জল্লাদখানা' বধ্যভূমিতে এক ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ পরিচালনা করে।

যদিও গাবতলী-আমিনবাজার ব্রিজের নিচে নদীর স্রোতের কারণে এই ধরনের খননকার্য পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি, তবে জল্লাদখানার এই ফরেনসিক প্রমাণগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) মিরপুর-গাবতলী অঞ্চলে সংঘটিত গণহত্যার দালিলিক প্রমাণ হিসেবে সর্বাত্ত্বকভাবে গৃহীত হয়েছিল।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও মিরপুর-গাবতলী গণহত্যার রায়

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT)-এ যখন একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়, তখন মিরপুর ও গাবতলী অঞ্চলের গণহত্যার বিষয়টি অন্যতম প্রধান অভিযোগ বা চার্জ হিসেবে উত্থাপিত হয়।

আব্দুল কাদের মোল্লা ('মিরপুরের কসাই'): কাদের মোল্লাকে মিরপুর ও গাবতলী অঞ্চলে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড, কবি মেহেরুন্নেসা হত্যা এবং পল্লবীর গণহত্যায় সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

মিরপুরের বিহারী কমান্ডারগণ: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তে উঠে আসে কীভাবে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ এবং স্থানীয় বিহারী পিস কমিটির নেতারা গাবতলী ব্রিজকে কসাইখানা বানাতে পাকিস্তানি আর্মিকে সহায়তা করেছিল।

গাবতলী বধ্যভূমির স্মৃতি সংরক্ষণ না করার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণ

স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও কেন গাবতলী-আমিনবাজারের মতো ১৫ হাজার শহীদের রক্তে ভেজা স্থানটি কোনো সরকারি গেজেট বা জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভে রূপ নিল না তার পেছনে কিছু স্পষ্ট প্রশাসনিক ও কাঠামোগত ঐতিহাসিক কারণ বিদ্যমান:

প্রাকৃতিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন: গাবতলী লোহার ব্রিজটি তুরাগ নদীর ওপর অবস্থিত হওয়ায় এবং পরবর্তীতে বেশ কয়েকবার নদী খনন, বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও অতি সম্প্রতি ৮ লেনের আধুনিক কংক্রিট সেতু নির্মাণের ফলে মূল ভৌত বধ্যভূমির অবকাঠামোটি নদী ও কংক্রিটের নিচে বিলীন হয়ে গেছে।

ডকুমেন্টেশনের অভাব: নিহত ১৫ হাজার শহীদের অধিকাংশ ছিলেন ঢাকার বাইরের বা অন্যান্য এলাকা থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থী। তাঁদের পরিবার জানেও না যে তাঁদের স্বজন গাবতলী ব্রিজে শহীদ হয়েছেন। ফলে সুনির্দিষ্ট বাদী বা পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করার লোক ছিল না।

আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্য: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জাতীয় বধ্যভূমি সুরক্ষা প্রকল্পগুলোর গবেষকদের বাদ দিয়ে কেবল আমলাদের ওপর নির্ভর করার কারণে মাঠপর্যায়ের জরিপগুলো জাতীয় সনদে রূপ নিতে পারেনি।

গাবতলী বধ্যভূমি স্মরণে আমাদের করণীয়

গাবতলী-আমিনবাজার বধ্যভূমি কেবল একটি অতীত ইতিহাস নয়; এটি আমাদের জাতীয় চেতনার এক অমর স্মারক। এই স্মৃতিকে চিরশ্বাশত করে রাখতে রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের অনতিবিলম্বে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:

'আমিনবাজার সেতু স্মারক ফলক' স্থাপন: গাবতলী-আমিনবাজার নতুন সেতুর সংযোগস্থলে বা নদীর উত্তর পাড়ে একটি দৃশ্যমান স্মারক স্তম্ভ স্থাপন করা, যেখানে এই ব্রিজে শহীদ ১৫ হাজার মানুষের আত্মত্যাগের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও মাঝি মোহাম্মদ আলীর মতো প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি খোদাই করা থাকবে।

ডিজিটাল আর্কাইভ ও জিও-ট্যাগিং: গাবতলী ও তার আশপাশের বিলুপ্ত বধ্যভূমিগুলোর অবস্থান জিপিএস (GPS) প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করে তা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা।

তুরাগ পারের পরিবেশ রক্ষা: তুরাগ নদীর যে অংশটিতে হাজার হাজার শহীদের দেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই অংশটিকে পলিউশন বা দখলমুক্ত রেখে একটি 'স্মৃতি নদী অঞ্চল' হিসেবে রক্ষা করা।

গাবতলী-আমিনবাজারের তুরাগ নদীর জল আজ হয়তো শান্ত ও পরিষ্কার মনে হতে পারে, কিন্তু তার পললস্তরে চিরদিনের জন্য মিশে আছে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেওয়া ১৫ হাজার নাম-পরিচয়হীন শহীদের তাজা রক্ত। আধুনিকতার অগ্রযাত্রায় সেই রক্তের ঋণ ভুলে যাওয়া মানে নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা।

ইতিহাসের দায়বদ্ধতা ও আমাদের নৈতিক কর্তব্য

আজ গাবতলী-আমিনবাজারের ওপর তৈরি হওয়া নতুন দৃষ্টিনন্দন সেতুটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও যোগাযোগের প্রতীক হতে পারে। কিন্তু এই সেতু দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি সচেতন মানুষের জানা উচিত এই সেতুর পিলারের নিচে, তুরাগের পলল মাটিতে মিশে আছে আমাদের ১৫ হাজার পূর্বপুরুষের হাড়, রক্ত আর চোখের জল।

আমরা যদি উন্নয়নের নামে ইতিহাসকে ভুলে যাই, যদি কংক্রিটের নিচে আমাদের স্বাধিকার সংগ্রামের ভিত্তিকে চাপা পড়তে দিই, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। গাবতলী-আমিনবাজারের সেই পুরোনো লোহার ব্রিজটি আজ আর নেই, কিন্তু আজও সেই তুরাগ নদী বয়ে চলেছে, সাভারের কাউন্দিয়া গ্রামে আজও বেঁচে আছেন ৭৮ বছরের বৃদ্ধ মাঝি মোহাম্মদ আলীর মতো প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাদের জীবনাবসান ঘটার আগেই এই প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যগুলোকে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়া আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। আমাদের অবহেলা দূরীকরণে জরুরি পদক্ষেপসমূহ:

অবিলম্বে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ: গাবতলী-আমিনবাজার সেতু সংলগ্ন স্থানটিকে অবিলম্বে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারিভাবে গেজেটভুক্ত বধ্যভূমি হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।

স্মৃতিস্তম্ভ ও ফলক নির্মাণ: তুরাগ নদীর তীরে গাবতলী ব্রিজের সন্নিকটে একটি দৃষ্টিনন্দন 'স্মৃতিস্তম্ভ' ও 'তথ্যফলক' স্থাপন করতে হবে, যেখানে মাঝি মোহাম্মদ আলীর জবানবন্দিসহ ১৫ হাজার শহীদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস খোদাই করা থাকবে। যাতে প্রতিদিন এই ব্রিজ দিয়ে যাতায়াতকারী লাখ লাখ মানুষ আমাদের স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে পারে।

তরুণ প্রজন্মের কাছে ইতিহাস পৌঁছানো: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকে কেবল রায়েরবাজার বা জল্লাদখানা নয়, গাবতলী-আমিনবাজারের মতো দেশের বড় বড় বধ্যভূমিগুলোর ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

অবশিষ্ট স্থানগুলোর আইনি সুরক্ষা: মিরপুরের ১০টি আংশিক বিদ্যমান বধ্যভূমিসহ দেশের সমস্ত গণকবর ও বধ্যভূমিকে ভূমিদস্যু ও অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা করতে আইনি সুরক্ষা দিতে হবে।

গাবতলী-আমিনবাজারের সেই ১৫ হাজার নাম-পরিচয়হীন শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। তারা কোনো ধনসম্পদ বা নিজস্ব স্বার্থে প্রাণ দেননি; তারা প্রাণ দিয়েছিলেন একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশের আশায়। আধুনিক অবকাঠামোর চাকচিক্যের নিচে এই বীর শহীদদের ত্যাগ যেন চিরতরে ঢাকা পড়ে না যায় তা নিশ্চিত করাই হোক আমাদের সর্বপ্রধান অঙ্গীকার। ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার এই লড়াইয়ে আমাদের জয়ী হতেই হবে।

পুরনো লোহার ব্রিজটি নেই, কিন্তু সেই তুরাগ নদী আছে, সেই ইসাকাবাদ গ্রাম আছে আর আছেন মোহাম্মদ আলীর মতো প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাদের জবানবন্দি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় "একাত্তরে মিরপুর যে কি ছিল, তা ছিল অবিশ্বাস্য ও অবর্ণনীয়।"

তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Jul 21, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

Jul 13, 2026

/

Post by

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বয়ানটি হলো একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র লড়াই। ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তারা এটিকে চিত্রায়িত করেছিল 'ইসলামী সংহতি রক্ষার অভিযান' হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম কখনো অন্যায়, স্বৈরাচার, লুণ্ঠন ও গণহত্যার পক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.