মিরপুরে যে ব্রীজে ১৫ হাজার মানুষের রক্তের দাগ লেগে ছিল
গাবতলী-আমিনবাজারের সেই পুরনো লোহার ব্রিজ আজ আর নেই। কয়েক বছর আগে একটি বাল্কহেডের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেটি ভেঙে সেখানে তৈরি হয়েছে আধুনিক ছয় লেনের প্রসস্থ সেতু। কিন্তু আধুনিকতার এই প্রলেপ কি মুছে দিতে পেরেছে সেই মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা আর্তনাদ? সেই নদীর জলে মিশে থাকা হাজারো প্রাণের রক্ত? ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই একটি মাত্র ব্রিজে যে বীভৎসতা ঘটেছিল, তা শুনলে আজও শিউরে ওঠে মানুষের হৃদয়।

TruthBangla

গাবতলী-আমিনবাজারের সেই পুরনো লোহার ব্রিজ আজ আর নেই। কয়েক বছর আগে একটি বাল্কহেডের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেটি ভেঙে সেখানে তৈরি হয়েছে আধুনিক ছয় লেনের প্রসস্থ সেতু। কিন্তু আধুনিকতার এই প্রলেপ কি মুছে দিতে পেরেছে সেই মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা আর্তনাদ? সেই নদীর জলে মিশে থাকা হাজারো প্রাণের রক্ত? ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই একটি মাত্র ব্রিজে যে বীভৎসতা ঘটেছিল, তা শুনলে আজও শিউরে ওঠে মানুষের হৃদয়।
গাবতলী-আমিনবাজার লোহার ব্রিজ
গাবতলী থেকে আমিনবাজারের দিকে যাওয়ার পথে তুরাগ নদীর ওপর যে লোহার ব্রিজটি ছিল, সেটি ছিল ঢাকার অন্যতম প্রবেশদ্বার। কিন্তু একাত্তরের নয় মাস এই প্রবেশদ্বারটি পরিণত হয়েছিল এক নৃশংস কসাইখানায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার এবং বিশেষ করে মিরপুর এলাকার বিহারীরা মিলে এখানে গড়ে তুলেছিল এক নরককুণ্ড।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই ব্রিজে প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল সংখ্যক শহীদের মধ্যে মাত্র ৫ জনের বাড়ি ছিল স্থানীয় গ্রামে। বাকি সবাই ছিলেন ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সাধারণ মানুষ, যাঁদের ধরে এনে এখানে শেষ করে দেওয়া হয়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শী মাঝি মোহাম্মদ আলীর স্মৃতিতে সেই বিভীষিকা
তুরাগ নদীর বুকে গত ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে খেয়া পারাপার করছেন ৭৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ আলী। সাভারের কাউন্দিয়া ইউনিয়নের ইসাকাবাদ গ্রামে তার বাড়ি। তুরাগ নদীর উত্তর পাড়ে দাঁড়িয়ে তাকালে সহজেই দেখা যেত সেই পুরনো লোহার ব্রিজটি। একাত্তরের সেই নয় মাস তিনি নিজের চোখে যা দেখেছেন, তা কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়েও ভয়াবহ।
মোহাম্মদ আলী জানান, যুদ্ধের পুরো সময়ে এমন একটি রাতও কাটেনি, যেদিন এই ব্রিজে মানুষ মারা হয়নি। প্রতিদিন বিকেলে বা সন্ধ্যায় পাকিস্তানি সেনারা এবং বিহারীরা ট্রাক ভর্তি করে মানুষ নিয়ে আসত। ব্রিজের দুই পাশে দুটি বাতি ছিল। রাত ১০টা পর্যন্ত বাতিগুলো জ্বলত, যেন চারপাশ স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু রাত ১০টা বাজলেই সেই বাতিগুলো নিভিয়ে দেওয়া হতো। অন্ধকার নেমে আসত তুরাগের বুকে, আর শুরু হতো মৃত্যুর মিছিল।
"প্রতি রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের বিহারি সহযোগীরা ওই ব্রিজে ট্রাক ভরে মানুষ নিয়ে আসত," ঢাকার গাবতলী-আমিনবাজার ব্রিজের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলছিলেন মোহাম্মদ আলী। "আমরা গুলির শব্দ শুনতাম আর দেখতাম তুরাগ নদীতে একটার পর একটা লাশ পড়ছে। যুদ্ধের সময় এমন একটি রাতও আমার মনে পড়ে না, যেদিন সেনারা ওই ব্রিজে মানুষ হত্যা করেনি।"
যুদ্ধের সময়সহ গত ছয় দশক ধরে তিনি তুরাগ নদীতে যাত্রী পারাপার করছেন। তার গ্রাম থেকে গাবতলী-আমিনবাজার ব্রিজটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়, যা গাবতলীর ঠিক উল্টো দিকে তুরাগের উত্তর পাড়ে অবস্থিত।
এমনকি তিন বছর আগেও নদীর দুই পাড়কে সংযুক্ত করত একটি পুরোনো স্টিলের ব্রিজ। সেই পুরোনো ব্রিজের জায়গায় এখন আট লেনের একটি কংক্রিট ব্রিজ নির্মিত হয়েছে, যা ঢাকাকে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোর সাথে যুক্ত করেছে। কিন্তু ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের কাছে এই ব্রিজের উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন; এটিকে পরিণত করা হয়েছিল এক বধ্যভূমিতে।
মোহাম্মদ আলীর বর্ণনা অনুযায়ী, ট্রাকগুলো থাকতো ব্রিজের এক প্রান্তে। সেখান থেকে দড়িতে বাঁধা মানুষকে টেনে হিঁচড়ে ব্রিজের মাঝখানে নিয়ে আসা হতো। এরপর শুরু হতো ব্রাশফায়ার। একের পর এক দেহ বৃষ্টির মতো নদীতে গিয়ে পড়ত।
মাঝি মোহাম্মদ আলী বলেন:
"কখনো কখনো এতো বেশি মানুষ মারা হতো যে একপর্যায়ে তাদের গুলি শেষ হয়ে যেত। তখন তারা দয়া করতো না। বাকিদের ব্রিজের ওপর চিৎ করে শুইয়ে দেওয়া হতো। এরপর বিহারীরা ধারালো ছুরি দিয়ে তাদের জবাই করে নদীতে ফেলে দিত। সারারাত ধরে চলত এই মরণখেলা।"
যখন তুরাগ নদীর মাছ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল মানুষ
একাত্তরের তুরাগ আর আজকের তুরাগ এক নয়। তখন তুরাগ ছিল লাশের নদী। মোহাম্মদ আলী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নদীতে লাশের সংখ্যা এতো বেশি ছিল যে একসময় সেগুলো আর ভেসে যাওয়ার জায়গা পেত না। লাশের স্তূপ জমে নদীর পানি দুর্গন্ধে বিষাক্ত হয়ে গিয়েছিল।
স্থানীয় মানুষ ভয়ে দিনের বেলাতেও ব্রিজের কাছে আসত না। এমনকি যুদ্ধের পর দীর্ঘদিন পর্যন্ত এই অঞ্চলের মানুষ তুরাগ নদীর মাছ খাওয়ার সাহস করেনি। কারণ তারা জানত, এই মাছগুলো মানুষের রক্ত আর মাংস খেয়ে বড় হয়েছে। রাশেদা বেগম নামের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, দিনের বেলায় ব্রিজের নিয়ন্ত্রণ থাকত বিহারীদের হাতে। তারা পাহারা দিত যাতে কেউ নদী থেকে লাশ সরাতে না পারে।
কেন এই ব্রিজে এতো হত্যাকাণ্ড?
একাত্তরে মিরপুর এলাকাটি ছিল বিহারী অধ্যুষিত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সরাসরি মদদে বিহারীরা মিরপুর এবং গাবতলী এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। গাবতলী লোহার ব্রিজটি ছিল ঢাকা থেকে পালানোর অন্যতম পথ। ফলে যারা শহর ছেড়ে গ্রামে যাওয়ার চেষ্টা করত, তারা সহজেই এই মরণফাঁদে আটকা পড়ত।
এছাড়া ঢাকার বিভিন্ন টর্চার সেল বা বধ্যভূমি থেকে মানুষকে ট্রাকে করে এখানে নিয়ে আসা হতো লাশ গুম করার সহজ উপায় হিসেবে। তুরাগ নদীর স্রোতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়া ছিল পাকিস্তানি সেনাদের জন্য একটি পরিকল্পিত কৌশল।
ড. এম এ হাসানের গবেষণা ও তথ্য উপাত্ত
প্রখ্যাত গণহত্যা গবেষক এবং ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ডাঃ এম এ হাসান দীর্ঘদিন ধরে এই বধ্যভূমি নিয়ে কাজ করেছেন। তার গবেষণায় উঠে এসেছে যে, গাবতলী-আমিনবাজার ব্রিজে নিহতের সংখ্যা অন্তত ১৫ হাজার। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, একাত্তরে মিরপুর এবং সংলগ্ন এলাকাগুলো ছিল কার্যত একটি বধ্যভূমির খনি। তিনি বলেন, "পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের বিহারি সহযোগীরা ওই ব্রিজে আনুমানিক ১৫,০০০ মানুষকে হত্যা করেছে।"
গবেষকদের মতে, ঢাকার রায়েরবাজার বা বধ্যভূমিগুলোর চেয়েও কোনো অংশে কম ছিল না এই ব্রিজের গুরুত্ব। কিন্তু পানির নিচে লাশগুলো চলে যাওয়ায় এবং ব্রিজটি পরবর্তীতে সংস্কার ও প্রতিস্থাপিত হওয়ায় অনেক প্রমাণ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।
মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা গবেষকদের মতে, ১৯৭১ সালে পুরো মিরপুর এলাকাটি একটি বিশাল বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল। যুদ্ধের পরপরই গবেষকরা ঢাকায় ৭৬টি বধ্যভূমি শনাক্ত করেছিলেন, যার মধ্যে ২৭টিই ছিল কেবল মিরপুরে।
স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও, এই ব্রিজটি এখনো বধ্যভূমি হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। গাবতলী ব্রিজ মিরপুর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে কেবল একটি।
সরকারি নথিতে এই বধ্যভূমিগুলোর একটিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন গণহত্যা গবেষক এম এ হাসান, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন এবং অধ্যাপক শাহরিয়ার কবির। এই ২৭টি বধ্যভূমির মধ্যে ১৭টিরই এখন কোনো চিহ্ন নেই। বাকি ১০টির মধ্যে কেবল 'জল্লাদখানা' বধ্যভূমিটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃক পূর্ণাঙ্গভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের অভ্যন্তরে থাকা বধ্যভূমিটি কলেজ কর্তৃপক্ষ আংশিকভাবে সংরক্ষণ করেছে।
সম্প্রতি ডেইলি স্টার মিরপুরের আটটি বধ্যভূমি পরিদর্শন করে দেখেছে যে, সেগুলো এখন বহুতল ভবন, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং গ্যারেজ দ্বারা দখল হয়ে আছে। দুটি বধ্যভূমি ময়লা ফেলার ভাগাড় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং একটি তুরাগ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
গাবতলী ব্রিজের গণহত্যা
আমরা প্রায়ই মিরপুরের জল্লাদখানা বা রায়েরবাজার বধ্যভূমির কথা বলি, কিন্তু গাবতলীর এই ১৫ হাজার শহীদের কথা সেভাবে আলোচনায় আসে না। এই মানুষগুলো কারা ছিলেন? তারা হয়তো ছিলেন কোনো বাবা, যিনি পরিবারের জন্য খাবার খুঁজতে বেরিয়েছিলেন; কিংবা কোনো যুবক, যিনি যুদ্ধে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন। নাম না জানা এই ১৫ হাজার মানুষের রক্তে ভেজা তুরাগ নদী আজও আমাদের স্বাধীনতার সাক্ষী হয়ে বয়ে চলেছে।
আজ সেখানে দৃষ্টিনন্দন ছয় লেনের সেতু হয়েছে। যানজট নিরসনে এটি বিশাল ভূমিকা রাখছে। কিন্তু ইতিহাসের ছাত্র বা সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, যে ভিত্তির ওপর আজ আমরা উন্নয়নের ইমারত গড়ছি, তার নিচে মিশে আছে আমাদের পূর্বপুরুষদের হাড় আর রক্ত।
কেউ জানে না সঠিক সংখ্যা
দেশের বধ্যভূমিগুলোর সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কেউ কিছু জানে না।
'১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট' এ পর্যন্ত ৪০টি জেলায় জরিপ চালিয়ে ৮৫৫টি বধ্যভূমি, ১,২৬৪টি গণকবর এবং ১,১১৮টি নির্যাতন কেন্দ্র খুঁজে পেয়েছে। ট্রাস্ট বর্তমানে এই স্থানগুলোর জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) মানচিত্র তৈরি করছে।
অন্যদিকে, 'ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি' তাদের নিজস্ব গবেষণায় ৫,০০০ বধ্যভূমি শনাক্ত করেছে। কমিটি এর মধ্যে ১,০৪০টির জিপিএস মানচিত্র তৈরি করেছে।

গণহত্যা গবেষকরা বলছেন, পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সরকার বধ্যভূমির তালিকা তৈরির কিছু উদ্যোগ নিলেও তা সফল হয়নি।
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ এবং ১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, "আমাদের স্বাধীনতার ৫২ বছর পরও সরকার বধ্যভূমির একটি তালিকা তৈরি করতে পারেনি। এটি একটি সম্পূর্ণ ব্যর্থতা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখানে বড় বাধা। আমলারা এ ধরনের প্রকল্পে গবেষকদের অন্তর্ভুক্ত করতে চান না।"
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। কিছু গবেষকের মতে, মাত্র নয় মাসে আনুমানিক ৩০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছেন। তারা আরও যোগ করেন যে, এই সংখ্যায় সেই ৩-৫ লক্ষ বাংলাদেশিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি যারা জীবন বাঁচাতে ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়ে কলেরা, অপুষ্টি ও অন্যান্য রোগে মারা গিয়েছিলেন।
এই ব্যাপক গণহত্যার পরিকল্পনা যুদ্ধ শুরুর আগেই করা হয়েছিল। প্রখ্যাত লেখক রবার্ট পেইন তার 'Massacre: The Tragedy at Bangla Desh and the Phenomenon of Mass Slaughter Throughout History' বইতে উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক সামরিক সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার জেনারেলদের বলেছিলেন, "ওদের তিন মিলিয়ন (৩০ লক্ষ) মানুষকে মেরে ফেলো, বাকিরা আমাদের হাতের মুঠোয় থাকবে।"
যুদ্ধাপরাধ বিচার ও বধ্যভূমি
যদিও গণহত্যা পুরো বাংলাদেশ জুড়েই সংঘটিত হয়েছিল, তবে কিছু বধ্যভূমি সুপরিকল্পিত গণহত্যাকাণ্ডের জন্য কুখ্যাত ছিল।
যুদ্ধাপরাধের বিচারের সময় অনেক বধ্যভূমি ও নির্যাতন কেন্দ্রে সংঘটিত গণহত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো জোরালোভাবে উঠে আসে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এসব স্থানে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে অনেক কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীকে দণ্ডিত করেছেন।
এ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল গণহত্যা ও অন্যান্য যুদ্ধাপরাধের দায়ে ১৪৩ জন যুদ্ধাপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অন্যান্য সাজা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ডেইলি স্টার দৈবচয়নের ভিত্তিতে দণ্ডিত ৬৩ জন যুদ্ধাপরাধীর রায় বিশ্লেষণ করেছে। বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে দুটি মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়েছে যারা দেশের যেকোনো স্থানে যুদ্ধাপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন এবং যারা নির্দিষ্ট বধ্যভূমি বা নির্যাতন কেন্দ্রে গণহত্যা ও অন্যান্য অপরাধের জন্য মৃত্যু বা কারাদণ্ড পেয়েছেন।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ৪১ জন অন্তত ১৬টি জেলার ৩৭টি বধ্যভূমি ও নির্যাতন কেন্দ্রে গণহত্যা চালিয়েছেন (মানচিত্রে প্রদর্শিত)। এই স্থানগুলোর কোনোটিই দাপ্তরিকভাবে বধ্যভূমি বা নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত নয়।
বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম ও গবেষণা কেন্দ্র ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুর রহমান বলেন, "সরকার যদি সত্যিই বধ্যভূমি ও নির্যাতন কেন্দ্রের তালিকা তৈরি করতে চায়, তবে দুই মাসের বেশি সময় লাগার কথা নয়। এটি লজ্জাজনক যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্বীকৃত বধ্যভূমিগুলোর তালিকা করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কোনো উদ্যোগ নেয়নি।"
এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ডেইলি স্টারকে বলেন, "আমাদের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা থাকলে ভালো হতো। তবে আপনারা রিপোর্টগুলো প্রকাশ করার পর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যেগুলো বধ্যভূমি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমরা পদক্ষেপ নেব।"
ইতিহাসের দায়বদ্ধতা
গাবতলী-আমিনবাজার লোহার ব্রিজের সেই নৃশংসতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো সস্তা অর্জন নয়। ১৫ হাজার মানুষের প্রাণ একটি মাত্র ব্রিজে ঝরে যাওয়া বিশ্বের ইতিহাসে বিরল এবং ভয়াবহ এক ট্র্যাজেডি। এই ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
পুরনো লোহার ব্রিজটি নেই, কিন্তু সেই তুরাগ নদী আছে, সেই ইসাকাবাদ গ্রাম আছে আর আছেন মোহাম্মদ আলীর মতো প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাদের জবানবন্দি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় "একাত্তরে মিরপুর যে কি ছিল, তা ছিল অবিশ্বাস্য ও অবর্ণনীয়।"
তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার














