>

>

রাজাকার বাহিনীর জন্ম ও বিস্তার যেভাবে হলো - একাত্তরের দেশীয় ঘৃণ্য দালালবাহিনী

রাজাকার বাহিনীর জন্ম ও বিস্তার যেভাবে হলো - একাত্তরের দেশীয় ঘৃণ্য দালালবাহিনী

একাত্তরের রক্তঝরা দিনগুলোতে যখন আপামর বাঙালি স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর, ঠিক তখন পাক-হানাদার বাহিনীকে সরাসরি সহযোগিতা করতে গড়ে উঠেছিল কয়েকটি কুখ্যাত আধাসামরিক বাহিনী। যাদের নাম শুনলে আজও বাংলার মানুষের মনে ঘৃণা ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। রাজাকার, আলবদর ও আলশামস নামগুলো আলাদা হলেও তাদের লক্ষ্য ছিল অভিন্ন: মুক্তিকামী বাঙালিদের দমানো এবং পাকিস্তানিদের অখণ্ডতা রক্ষা করা।

TruthBangla

রাজাকার বাহিনীর জন্ম ও বিস্তার যেভাবে হলো - একাত্তরের দেশীয় ঘৃণ্য দালালবাহিনী

একাত্তরের রক্তঝরা দিনগুলোতে যখন আপামর বাঙালি বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার পরম স্বপ্নে বিভোর, ঠিক তখনই পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর পাশাপাশি তাদের দোসর হিসেবে জন্ম নিয়েছিল কয়েকটি কুখ্যাত আধাসামরিক বাহিনী। ইতিহাসে এরা পরিচিত রাজাকার, আলবদর ও আলশামস নামে। আজ স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পরও এই নামগুলো বাঙালি হৃদয়ে তৈরি করে তীব্র ঘৃণা, ভয়াল আতঙ্ক এবং পরম ক্ষোভের এক মিশ্র অনুভূতির।

বাহিনীগুলোর নাম আলাদা, পোশাক বা বাহ্যিক কর্মপরিধি ভিন্ন হলেও তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল অভিন্ন: মুক্তিকামী বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনকে চূর্ণ করা, পাকিস্তানি উপনিবেশবাদীদের অখণ্ডতা রক্ষা করা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য সরবরাহ করে কিংবা নিজেরা অস্ত্র হাতে নিয়ে নিরীহ বাঙালি নিধন করা।

তৃণমূল পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ও নিরপেক্ষ ইতিহাস তুলে আনার কাজে আমি যুক্ত রয়েছি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। এই দীর্ঘ পথচলায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে দুই শতাধিক সূর্যসন্তান প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধার মুখোমুখি হওয়ার দুর্লভ সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এই বীরদের সাথে মুখোমুখি আলাপে আমি বারবার শিহরিত হয়েছি। তাঁদের স্মৃতিতে আজ ৫০-৫৫ বছর পরেও স্বাধীনতাবিরোধীদের নৃশংস অত্যাচার, ঘরবাড়ি পোড়ানো এবং পশুবৎ হত্যাযজ্ঞের ঘটনাগুলো বিন্দুমাত্র ফিকে হয়ে যায়নি; বরং তা দুপুরের চণ্ড সূর্যের মতোই জীবন্ত ও অমলিন হয়ে আছে।

পাকিস্তানি সেনারা এদেশের ভাষা জানত না, নদী-নালা, খাল-বিল কিংবা গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ চিনত না। কিন্তু ঘরের শত্রু বিভীষণ হয়ে তাদের পথ দেখিয়ে গৃহস্থের আঙিনায় নিয়ে গিয়েছিল এই দেশীয় ঘাতকের দল। মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে রাজাকারদের প্রকৃত রূপ কেমন ছিল? কীভাবে সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর তারা জুলুমের স্টিম রোলার চালিয়েছিল? দুই শতাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি থেকে সংগৃহীত প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, ঐতিহাসিক গবেষণা ও প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতেই এই লেখার অবতারণা।

পাকিস্তানের দেশীয় দোসর বাহিনীর কালো ইতিহাস

মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি অস্ত্রহাতে রণাঙ্গনের যুদ্ধ ছিল না, ছিল আদর্শিক ও রাজনৈতিক সংঘাতও। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যখন বুঝতে পারে যে সমগ্র বাঙালি জাতিকে কেবল বন্দুকের নল দিয়ে দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়, তখন তারা স্থানীয় ধর্মীয় অন্ধত্ব এবং পাকিস্তানপন্থি রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে কাজে লাগিয়ে আধাসামরিক বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা করে।

রাজাকার বাহিনী: গঠন, অর্ডিন্যান্স ও আইনি স্বীকৃতি

১৯৭১ সালের ১৫ মে খুলনার খানজাহান আলী রোডের আনসার ক্যাম্পে ৯৬ জন পাকিস্তানপন্থি সমর্থককে সংগঠিত করে রাজাকার বাহিনীর প্রাথমিক সূচনা ঘটে। জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর এ কে এম ইউসুফ এই বাহিনী গঠনের মূল কারিগর ও উদ্যোক্তা ছিলেন। সূচনা পর্বে পাকিস্তান সরকার এক বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করে পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্যমান আনসার বাহিনীকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে এবং আনসারদের যাবতীয় সম্পদ, অস্ত্র ও অবকাঠামো নতুন গঠিত 'রাজাকার বাহিনী'র অধীনে হস্তান্তর করে। খুলনা শহরের সেই আনসার ক্যাম্পটিই পরবর্তীতে ইতিহাসের 'প্রথম রাজাকার ক্যাম্প' হিসেবে চিহ্নিত হয়।

অর্ডিন্যান্স ও আইনি স্বীকৃতি: ১৯৭১ সালের ৩ আগস্ট 'দ্য ইস্ট পাকিস্তান রাজাকার্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৭১' (East Pakistan Razakar Ordinance, 1971) জারির মাধ্যমে এই বাহিনীকে আনুষ্ঠানিক আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসের দিকে অধ্যাদেশটি কার্যকর হলে রাজাকার বাহিনী একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি আধাসামরিক বাহিনীর (Paramilitary Force) মর্যাদা পায়। এর ফলে বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কেবল রাজনৈতিক শান্তি কমিটির হাতে সীমাবদ্ধ না রেখে সরাসরি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জিএইচকিউ (GHQ) ও প্রাদেশিক সামরিক প্রশাসনের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। প্রতিটি জেলা ও মহকুমা এসডিও (SDO) অফিস এবং থানা থেকে রাজাকারদের মাসিক ভাতা (প্রতি মাসে প্রায় ১৫০ রুপি), সরকারি ইউনিফর্ম ও অফিশিয়াল পরিচয়পত্র প্রদান করা হতো।

নিয়োগ ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক পটভূমি: রাজাকার বাহিনীতে রিক্রুটমেন্টের প্রধান ভিত্তি ছিল পাকিস্তানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর সুপারিশ। শান্তি কমিটির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম এবং পিডিপি (প্রোগ্রেসিভ ডেমোক্রেটিক পার্টি)-র কর্মী-সমর্থকদের মধ্য থেকে সদস্য সংগ্রহ করা হতো। প্রাথমিক পর্যায় শেষে রাজাকার বাহিনীর সদস্য সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৫০ হাজারে উন্নীত হয়। আইনি কাঠামোর আওতায় আসার পর তাদের হাতে সরকারি থ্রি-নট-থ্রি (.303) রাইফেলসহ বিভিন্ন হালকা আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দেওয়া হয় এবং সামরিক ট্রেনিং প্রদান করা হয়।

কমান্ড কাঠামো ও কার্যপরিধি: রাজাকারদের দুটি মূল শাখায় বিভক্ত করা হয়েছিল 'ফিল্ড রাজাকার' (যারা সরাসরি পাক বাহিনীর সাথে সামরিক অভিযানে অংশ নিত) এবং 'সার্ভিস রাজাকার' (যারা পাহারা ও রসদ সরবরাহের কাজে নিয়োজিত ছিল)। পরবর্তীতে এই বাহিনীর সহযোগী হিসেবে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে জড়িত ‘আল-বদর’ এবং অন্যান্য অপশক্তি নিয়ে ‘আল-শামস’ বাহিনীও গড়ে ওঠে। রাজাকারদের মূল কাজ ছিল:

মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান, চলাচলের পথ ও আশ্রয়স্থল সম্পর্কিত স্থানীয় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা। নদী, সেতু, কালভার্ট, রেললাইন ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা পাহারা দেওয়া।গ্রামগঞ্জে পাক সেনাবাহিনীর পথপ্রদর্শক (গাইড) হিসেবে কাজ করা এবং স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধা পাইয়ে দেওয়া। চেকপোস্ট বসিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নজরদারি ও অর্থকড়ি লুটপাট চালানো।

অভিযোগ ও অপরাধমূলক ভূমিকা: পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর "চোখ ও কান" হিসেবে পরিচিত এই বাহিনীটি ১৯৭১ সালে সংঘটিত হত্যা, গণহত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও ধর্মান্তরকরণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল। প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পৌঁছানোর আগেই রাজাকাররা এলাকা কর্ডন বা ঘেরাও করত। প্রতিটি মহকুমা ও থানায় স্থাপিত রাজাকার ক্যাম্পগুলো মূলত মুক্তিকামী বাঙালি ও মুক্তিযোদ্ধাদের নির্যাতন কেন্দ্রে (Torture Cell) পরিণত হয়েছিল।

রাজাকার বাহিনীর জন্ম ও বিস্তার যেভাবে হলো - একাত্তরের দেশীয় ঘৃণ্য দালালবাহিনী

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে প্রথম রাজাকার ক্যাম্প হয়েছিল খুলনার এ বাড়িতেই।

আলবদর বাহিনী: ছাত্রসংঘের ঘাতক চক্র ও বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধারণ রাজাকারদের পাশাপাশি সম্পূর্ণ সুসংগঠিত এবং বিশেষ প্রশিক্ষণে সুসজ্জিত ক্যাডারদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় ‘আলবদর’ নামের এক আধাসামরিক সশস্ত্র বাহিনী। এই বাহিনীর প্রধান মেধা ও সদস্য সরবরাহকারী সংগঠন ছিল তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রসংঘ’ (বর্তমানে ইসলামী ছাত্রশিবির)। এর সাথে কিছু অবাঙালি (বিহারি) এবং উগ্র পাকিস্তানপন্থি তরুণদের যুক্ত করা হয়। ১৯৭১ সালের মে মাসে ময়মনসিংহে তৎকালীন ছাত্রসংঘের জেলা নেতৃত্বের উদ্যোগে প্রথম আলবদর বাহিনী গঠিত হয়। পরবর্তীতে ছাত্রসংঘের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী এবং সাধারণ সম্পাদক আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের নির্দেশনায় একে দেশব্যাপী এক সুসংগঠিত ঘাতক চক্রে রূপান্তর করা হয়।

সামরিক প্রশিক্ষণ ও নির্যাতন কেন্দ্র: সাধারণ রাজাকারের চেয়ে আলবদরদের গঠনকাঠামো ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, বিশ্বস্ত ও অনেক বেশি হিংস্র। এরা সরাসরি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে ভারী অস্ত্র চালনা, ট্র্যাকিং ও গেরিলা দমনের বিশেষ সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। রণাঙ্গনে তারা পাকিস্তানি মিলিটারির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফায়ারিং পজিশনে যুদ্ধ করেছে

আলবদর বাহিনী তাদের স্বাধীন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সারা দেশে মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার পক্ষাবলম্বীদের তথ্য সংগ্রহ করত। ঢাকার মোহাম্মদপুরের শারীরিক শিক্ষা কলেজকে (ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট) আলবদর বাহিনী তাদের প্রধান কার্যালয় ও মূল নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করত, যেখানে শত শত মুক্তিকামী মানুষকে নির্মম নির্যাতন চালানো হতো।

বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা ও তালিকা প্রস্তুত: এই বাহিনীর সবচেয়ে কলঙ্কজনক ইতিহাস হলো ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে বাঙালি জাতিকে চিরতরে মেধাশূন্য করার ঘৃণ্য চক্রান্ত বাস্তবায়ন করা। ডিসেম্বরের শুরুতে পাকিস্তানের পরাজয় সুনিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর সরাসরি নির্দেশ ও নীলনকশায় বুদ্ধিজীবী নিধনের গোপন ছক আঁকা হয়। আলবদর ক্যাডাররা স্থানীয় পরিবেশ ও বুদ্ধিজীবীদের ব্যক্তিগত পরিচয় সম্পর্কে অবহিত থাকায় তারা শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক ও শিক্ষকদের বিস্তারিত তালিকা তৈরির দায়িত্ব পায়।

১০-১৪ ডিসেম্বরের তাণ্ডব ও বধ্যভূমির হত্যাকাণ্ড: প্রস্তুতকৃত তালিকা অনুযায়ী ১০ থেকে ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে সান্ধ্য আইনের সুযোগ নিয়ে আলবদর সদস্যরা নম্বরপ্লেটবিহীন ও কাদা মাখা গাড়িতে করে ঢাকার ঘরে ঘরে হানা দেয়। তারা বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সার, সিরাজুদ্দীন হোসেন, সেলিনা পারভীন, ডা. ফজলে রাব্বী এবং ডা. আলিম চৌধুরীর মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিদের। অপহৃতদের মোহাম্মদপুর কেন্দ্রসহ বিভিন্ন গোপন আস্তানায় নির্যাতন করার পর রায়েরবাজার ইটখোলা ও মিরপুর বধ্যভূমিতে চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ও গুলি করে পশুবৎ হত্যা করা হয়।

আলশামস বাহিনী: বাছাইকৃত ক্যাডার ও গণহতাকাণ্ডের দোসর

আলশামস (আরবি শব্দ, যার অর্থ 'সূর্য') ছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক গঠিত অন্যতম মারাত্মক আধা-সামরিক সহযোগী বাহিনী। বাঙালি নিধনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মিত তিনটি প্রধান সহযোগী বলয়ের (রাজাকার, আলবদর ও আলশামস) মধ্যে এটি ছিল অন্যতম উগ্র সংগঠন। এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম প্রায় তিন হাজারের মতো। তবে সংখ্যায় কম হলেও তারা ছিল চরম শৃঙ্খলিত, গোপনীয়তা রক্ষায় দক্ষ এবং হিংস্র।

গঠন ও রাজনৈতিক সংযোগ: আলশামস বাহিনী মূলত ইসলামী ছাত্র সংঘের সবচেয়ে অনুগত, উগ্র ও বাছাইকৃত কর্মীদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল। তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক কমান্ডের সাথে এই বাহিনীর ছিল সরাসরি ও নিবিড় যোগাযোগ। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের প্রত্যক্ষ অনুমোদন, অস্ত্র সহায়তা ও সামরিক প্রশিক্ষণে আলশামস ক্যাডারদের প্রস্তুত করা হয়।

মাঠপর্যায়ের তাণ্ডব ও যুদ্ধাপরাধ: পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে আলশামস বাহিনী স্বতন্ত্রভাবে এবং যৌথভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে নৃশংস কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত।স্থানীয় পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান শনাক্ত করা, তাদের পরিবারকে জিম্মি করা এবং মুক্তিকামী বাঙালি হত্যায় তারা পাকিস্তান সেনাকে পথ দেখাত।

হিন্দু সম্প্রদায় ও স্বাধীনতার পক্ষের সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, নারী নির্যাতন এবং সম্পত্তি লুটপাটের মাধ্যমে এলাকায় ভীতির রাজত্ব কায়েম করত। যুদ্ধের শেষভাগে মুক্তিবাহিনী ও যৌথ বাহিনীর অগ্রগতি রোধ করতে রসদ পাহারা দেওয়া, সেতু ও স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্ট পাহারা দেওয়ার কাজে আলশামস ক্যাডারদের ব্যবহার করা হতো।

আলবদর ও রাজাকারের সাথে সম্পর্ক: প্রশাসনিক দলিল ও সামরিক খাতায় ‘রাজাকার’, ‘আলবদর’ এবং ‘আলশামস’ এই তিনটি বাহিনীর নাম ও গঠনকাঠামো আলাদা ছিল। আলবদরকে প্রতীকী অর্থে ‘চন্দ্র’ এবং আলশামসকে ‘সূর্য’ হিসেবে অভিহিত করে পাকিস্তানি বাহিনী দুটি ভিন্ন ক্যাডার স্কোয়াড গঠন করেছিল। কিন্তু একাত্তরে মাঠপর্যায়ের সাধারণ মানুষের কাছে এদের স্বতন্ত্র নামের চেয়ে অপরাধের ধরন ছিল অভিন্ন। ফলে সাধারণ মানুষ এদের সকলকেই এক নামে ‘রাজাকার’ হিসেবে চিহ্নিত করত। কেবল নির্দিষ্ট এই আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্যরাই নয়, ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে যারা পাকিস্তানি সেনাদের দালালি ও সহায়তা করেছে, তারা সবাই জনমানসে সার্বিক অর্থে ‘রাজাকার’ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ঐতিহাসিক দলিল ও প্রমাণ: ‘শান্তিকমিটি ১৯৭১’, ‘আলবদর ১৯৭১’ এবং ডা. এম এ হাসানের ‘জনতার ৭১-এর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ’ সহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিতে আলশামস বাহিনীর সুনির্দিষ্ট অপকর্ম ও গণহত্যার বিবরণ নথিভুক্ত রয়েছে। এ বিচার বিভাগীয় ও ঐতিহাসিক গবেষণাগুলো প্রমাণ করে যে, আলশামস বাহিনী ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত গণহত্যার এক নৃশংস চালিকাশক্তি।

এক নজরে একাত্তরের প্রধান ঘাতক সহযোগী বাহিনীসমূহ

নিচে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সমর্থিত প্রধান তিনটি অপশক্তির তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত তথ্য তুলে ধরা হলো:

বাহিনীর নাম

আনুমানিক সদস্য সংখ্যা

মূল রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি

প্রধান ভূমিকা ও ঐতিহাসিক অপকর্ম

রাজাকার

~৫০,০০০ জন

সাধারণ পাকিস্তানপন্থি, মুসলিম লীগ ও তৎকালীন শান্তি কমিটি (মূল উদ্যোক্তা: এ কে এম ইউসুফ)

গ্রাম পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, পাক বাহিনীকে পথ দেখানো, রসদ জোগানো, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও ব্যাপক লুটপাট।

আলবদর

~৭৩,০০০ জন

তৎকালীন ইসলামী ছাত্র সংঘ (ক্যাডারভিত্তিক), অবাঙালি ও উগ্র পাকিস্তানপন্থি গোষ্ঠী

ফ্রন্টলাইন গেরিলা আক্রমণ নস্যাৎ, সরাসরি পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা এবং মুক্তিযুদ্ধের শেষভাগে বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়ন।

আলশামস

~৩,০০০ জন

ইসলামী ছাত্র সংঘের বাছাইকৃত উগ্র ক্যাডার ও জামায়াত সমর্থিত সুনির্দিষ্ট গ্রুপ

ঝটিকা হামলা, টার্গেটেড হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা, অগ্নিসংযোগ এবং পাক সেনাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন।

রণাঙ্গনের বীরদের চোখে দালালি ও নির্মমতার ক্যানভাস: রক্তঝরা ৬টি ঐতিহাসিক ঘটনা

তৃণমূল অনুসন্ধানে গিয়ে যে সকল প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছি, তাঁদের স্মৃতিকথা থেকে উঠে এসেছে রাজাকারদের পশুবৎ আচরণের লোমহর্ষক বাস্তব ইতিহাস। এখানে ৬ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার জবানবন্দিতে একাত্তরের ৬টি প্রামাণ্য ঘটনা উপস্থাপন করা হলো।

পিতা শহীদের রক্তে স্নাত নৌ-কমান্ডো শাহজাহান কবির (বীরপ্রতীক) এর অশ্রুসিক্ত বয়ান

চাঁদপুর অঞ্চলের খ্যাতিমান নৌ-কমান্ডো বীরপ্রতীক মো. শাহজাহান কবিরের কাছে একাত্তরের ইতিহাস মানেই একইসাথে গর্ব এবং পরম স্বজন হারানোর তীব্র যন্ত্রণা। একাত্তরে স্থানীয় জুটমিলের লেবার সর্দার বাচ্চু রাজাকারের কারণে শাহজাহান কবিরকে হারাতে হয়েছিল তাঁর পিতাকে।

তাঁর পিতা ইব্রাহীম বিএবিটি (যিনি স্থানীয়ভাবে 'বিটি সাহেব' নামে পরিচিত ছিলেন) ছিলেন একজন আদর্শবান স্কুল শিক্ষক এবং চাঁদপুর মহকুমা সংগ্রাম কমিটির সক্রিয় সদস্য। ১৯৭১ সালে স্কুল খোলা রাখার পাকিস্তানি নির্দেশ অমান্য করে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুল বন্ধ রাখেন এবং ছাত্রদের সংগঠিত করে ভারতের ট্রেনিং ক্যাম্পে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন। এই তরুণদের যাতায়াত ও খরচের জন্য তিনি চিঠি লিখে টাকা-পয়সাও তুলে দিতেন।

শাহজাহান কবির তাঁর বাবার শাহাদাত বরণের সেই কালরাত্রির কথা স্মরণ করে বলেন:

"অপারেশন জ্যাকপটের আগে আমরা পুরো নৌ-কমান্ডো গ্রুপ নিয়ে গোপনে বাড়িতে উঠি। এই খবরটি স্থানীয় রাজাকারেরা সাথে সাথে পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে পৌঁছে দেয়।

১৭ আগস্ট ১৯৭১। সকালবেলা। ৪-৫টি নৌকায় করে ঘাওরায়া এসে হঠাৎ আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে পাকিস্তানি সেনারা। সাথে ছিল একঝাঁক রাজাকার। বাড়িতে নেমেই তারা ব্রাশফায়ার শুরু করে। আমাকে এবং আমার বাবাকে বেঁধে রসি দিয়ে নির্মমভাবে পেটাতে থাকে। বুটের লাথিতে বাবার পিঠ বাঁকা হয়ে যায়।

সেনারা চিল্লায়: 'নৌ-কমান্ডোরা কোথায়? অস্ত্র কোথায়?'

অমানুষিক মার খেয়েও শিক্ষক বাবা মুখ খোলেননি। বলেন: 'এখানে কেউ আসেনি।'

অনুসন্ধান করে কোনো অস্ত্র না পেয়ে আমাদের হাত-পা বেঁধে নৌকায় তোলে। নৌকার এক কোণে ছিল জুটমিলের লেবার সর্দার বাচ্চু রাজাকার। বাবার ফোলা শরীর দেখে অপর এক সাধারণ রাজাকারের দয়া হয়, সে বাঁধন একটু ঢিল করে দেয়।

পাশেই কামেলি সাহেবের লজে ঢুকে পড়েছিল সেনারা। সেখানে পাটের ক্ষেতে লুকিয়ে ছিল কামেলি সাহেবের মেয়ে ঝরনা, সাথে আট-নয়টি সোনা-টাকার ট্রাঙ্ক। রাজাকারেরা ট্রাঙ্ক লুটপাটে ব্যস্ত হয়ে পড়ে আর সেনাজওয়ানরা মেয়েটির ওপর কুদৃষ্টি দেয়।

এই সুযোগে বাবা আমার কানে কানে ফিসফিস করে বললেন, 'তুই এখান থেকে পালা।'

আমি বললাম, 'আপনার কী হবে বাবা?'

বাবা দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, 'আমার চিন্তা করবি না। তোকে ধরে নিয়ে গেলে তুই নৌ-কমান্ডো জানতে পারলে মেরে ফেলবে, পুরো গ্রুপটাই শেষ হয়ে যাবে। তোদের এই দেশটা স্বাধীন করতে হবে। তুই পালা!'

বাবা নিজের শক্তিতে কৌশলে আমার হাত-পায়ের বাঁধন পুরোপুরি খুলে দিলেন। এটিই ছিল বাবার সাথে আমার শেষ কথা।

নৌকার দুপাশে অস্ত্র হাতে দুজন পাহাড়া দিচ্ছিল। সুযোগ বুঝে একটার পা ধরে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দিয়ে আমি তীব্র ডুব দিলাম। পাড়ে উঠে শুনি ব্রাশফায়ারের শব্দ। আমাকে বাঁচাতে গিয়ে বাবাকে নির্মম টর্চার করে গুলি করে আধমরা অবস্থায় নদীর পাড়ে ফেলে রেখে যায় ওরা। ১৮ আগস্ট বিকেলে গ্রামবাসী বাবার ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করে। সন্তানকে বাঁচাতে নিজের জীবন তুলে দিয়েছিলেন এক শিক্ষক পিতা। সেই জীবন নিয়ে আজও বেঁচে আছি।"

রাজাকার বাহিনীর জন্ম ও বিস্তার যেভাবে হলো - একাত্তরের দেশীয় ঘৃণ্য দালালবাহিনী

হাওর পারের যুদ্ধাহত যোদ্ধা জমির আলীর স্মৃতিকথা: পীর সাহেবের উৎসাহ ও ঘাতক বুধাই-ফকির চেয়ারম্যানের অপকর্ম

৫ নম্বর সেক্টরের যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জমির আলী শোনালেন সুনামগঞ্জ, টেংরাটিলা ও ছাতক অঞ্চলের অভিজ্ঞতা। চৈত্র মাসে যখন পাকিস্তানি আর্মি এই অঞ্চলে আসে, তখন তাদের প্রথম অভ্যর্থনা জানায় স্থানীয় শান্তি কমিটির নেতারা।

জমির আলীর ভাষায়, শান্তি কমিটির মূল নেতৃত্বে ছিলেন আসকর আলী মাস্টার, মাওলানা আবদুস সাত্তার এবং রউস মৌলভী। এরা পাঞ্জাবি সেনাদের জন্য খাসি ও যুবতী মেয়ে সাপ্লাই দিত এবং হিন্দু বাড়িতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক লুটপাট চালাত। তবে ওই এলাকার সবচেয়ে কুখ্যাত রাজাকার ছিল ‘বুধাই’ এবং তার চেয়েও ভয়ঙ্কর ছিল ‘ফকির চেয়ারম্যান’।

জমির আলী বলেন:

"সুরমা নদীর উত্তরে একবার ট্রেনিং নিতে ১৩ জন তরুন ছাত্র বর্ডার পার হচ্ছিল। এই গোপন খবর পাকিস্তানি ক্যাম্পে পৌঁছে দেয় ফকির চেয়ারম্যান। সেনারা এসে সেই ১৩ জন উদীয়মান ছাত্রকে একসাথে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

আমার বয়স তখন ২৩-২৪ বছর। এসব অন্যায় দেখে রক্ত ফুটছিল। কোথায় যাব বুঝতে পারছি না। এমন সময় একদিন বাড়িতে এলেন আমার বড় বাপা ওয়ারেশ আলী পীর সাহেব। তিনি আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, 'যা বাপ, দেশ স্বাধীন কর গে... বসে থাকিস না। এই দেশ অবশ্যই স্বাধীন হবে।' পীর সাহেবের সেই অনুপ্রেরণাতেই আমি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিই।

আমরা ছিলাম গেরিলা গ্রুপ। ছাতকের চর বারকুয়া গ্রামের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল হক ছিল পাক বাহিনীর মস্ত দালাল। তাকে ধরার জন্য বাঁশতলা ক্যাম্প থেকে রাতে রওনা দিই। তার বাড়ি ঘিরে ফায়ার করতেই রাজাকাররা পালায়। আজানের সময় মৌলভীকে গ্রেপ্তার করে আমরা শ্রীপুর গ্রামে আশোক আলীর বাড়িতে আশ্রয় নিই।

কিন্তু শ্রীপুর গ্রামের এক স্থানীয় মসজিদের ইমাম আমাদের উপস্থিতি দেখে চুপিচুপি গিয়ে পাক ক্যাম্পে খবর দেয়। আমরা বর্ডারের দিকে রওনা দেওয়ার পর পাক সেনারা এসে আমাদের না পেয়ে পুরো শ্রীপুর গ্রামটি আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। এই রাজাকারেরা না থাকলে একাত্তরে পাকিস্তানিরা কখনোই এত বড় গণহত্যা চালাতে পারত না।"

কালিয়াকৈরের মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমানের আক্ষেপ: নবম শ্রেণীর দুই অকুতোভয় কিশোরের ট্র্যাজেডি

গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকার মুক্তিযোদ্ধা মো. হাবিবুর রহমান তুলে ধরেন এক হৃদয়বিদারক স্মৃতি। ট্রেনিংয়ে যাওয়ার সময় বয়স ছোট হওয়ায় পিপড়াছিট গ্রামের নবম শ্রেণীর দুই ছাত্র আব্দুস সালাম ও বাবুলকে সাথে নিতে পারেননি তিনি। কিন্তু সালাম ও বাবুল গোপনে গ্রামেই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তথ্য সংগ্রাহক হিসেবে কাজ করত।

হাবিবুর রহমান বলেন:

"কালিয়াকৈরে শান্তি কমিটির লোকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তরুণদের রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করত। দরিদ্র পরিবারের অনেকে বেতন ও ফ্রি রেশনের লোভে এতে নাম লেখাত। আর যারা যেত না, তাদের সরাসরি পাক আর্মির হাতে তুলে দেওয়া হতো।

সালাম ও বাবুল রাজাকারদের আহ্বানে সাড়া দেয়নি। চলাচলের জন্য তখন পাক সেনা ক্যাম্প থেকে 'পাস কার্ড' নিতে হতো। একদিন কার্ড করতে কালিয়াকৈরে গেলে রাজাকাররা সালাম ও বাবুলকে চিনে ফেলে এবং ধরে নিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করে। আজও যখন ওই দুটি ছোট ছেলের কথা মনে হয়, বুকটা কেঁপে ওঠে। যদি ওদের সাথে ভারতে নিয়ে যেতাম, তবে হয়তো তারা বেঁচে থাকত।"

অধ্যাপক আবুল হোসেনের বিশ্লেষণ: 'লুটের মাল জায়েজ' ফতোয়া ও রাজাকারের সামাজিক বিন্যাস

২ নম্বর সেক্টরের নির্ভয়পুর সাব-সেক্টরে ফ্রিডম ফাইটারদের (FF) পরিচালনায় বিশেষ দায়িত্ব পালন করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন। তাঁর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে রাজাকারদের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপচিত্র।

অধ্যাপক আবুল হোসেনের মতে:

"১৯৭১ সালের জুনের পর মুক্তিযোদ্ধাদের চলাফেরা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু, কালভার্ট ও রাস্তার মোড়ে অস্ত্র হাতে পাহাড়ায় থাকত রাজাকারেরা। তারা পাকিস্তানি বাহিনীকে রদস ও পথঘাট চিনিয়ে দিত।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট বোঝা দরকার শান্তি কমিটির মূল ধনী ও প্রভাবশালী নেতারা কিন্তু নিজেদের ছেলেমেয়েকে কখনোই রাজাকার বাহিনীতে পাঠায়নি! তারা এলাকা থেকে দরিদ্র, অভাবী ও পথভ্রষ্ট ছেলেদের ব্রেনওয়াশ করে রিক্রুট করত।

তারা এসব দরিদ্র ছেলেদের বলত: 'মুক্তিযোদ্ধারা কাফের, আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষের ঘরের মাল লুট করা জায়েজ!' এই লুটের মালের লোভ এবং সামান্য বেতনের আশায় অনেক পথভ্রষ্ট যুবক রাজাকার বাহিনীতে ঢুকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। এই রাজাকার-আলবদররা না থাকলে পাকিস্তানি সেনাদের পক্ষে ৯ মাস টিকে থাকা বা লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করা একেবারেই অসম্ভব হতো।"

খুলনার সেকেন্দার আলীর প্রতিশোধের আগুন: বাঙ্কারের নির্যাতন থেকে রণাঙ্গনের গেরিলা

খুলনার নালিয়ার চরের বীর মুক্তিযোদ্ধা সেকেন্দার আলীর গল্পটি রাজাকারদের নির্যাতনের শিকার হয়ে সাধারণ মানুষের মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠার এক চরম দলিল।

আগস্ট মাসে নিজের মেজ ভাইকে দেখতে কালিয়া যাচ্ছিলেন সেকেন্দার আলী। কালিয়া এমপি অফিসে ছিল শান্তি কমিটি ও রাজাকারের যৌথ ক্যাম্প। সেখানে রাজাকারেরা তাঁকে আটকে ফেলে।

সেকেন্দার আলী সেই স্মৃতি ব্যক্ত করে বলেন:

"আমাকে দেখেই রাজাকারেরা চিৎকার করে বলে: 'তুই মুক্তিবাহিনীর লোক! বল মুক্তিবাহিনী কোথায়?'

আমি বলি: 'আমি সারাদিন মাঠে কাজ করি, সন্ধ্যায় ঘুমাই। কোথায় মুক্তিবাহিনী আমি তো জানি না।'

তারা আমাকে বেধড়ক পেটাতে পেটাতে মেজরের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। রাতে একটি বাঙ্কারের সামনে বসিয়ে আমার সামনেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চরম অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। তারা খেয়াল করছিল আমার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় কি না। কারণ প্রতিক্রিয়া দেখালেই তারা বুঝে ফেলবে আমি রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও মুক্তিযোদ্ধা।

সকালে কয়েকটি চড় থাপ্পড় মেরে ছেড়ে দিল। কিন্তু আমার ভেতরে তখন জেদ চেপে গেছে। বিনা অপরাধে আমাকে মারল এবং আমার নেতাকে গালি দিল! বাড়ি ফিরেই বুলু মোল্লার সাথে যোগাযোগ করে এক সকালে ১৯ জন তরুণকে নিয়ে বর্ডার পার হয়ে ট্রেনিংয়ে চলে যাই। শুধুমাত্র রাজাকারদের ওপর প্রতিশোধ নিতেই আমি রণাঙ্গনের গেরিলা হয়েছিলাম।"

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আবুল কাশেমের ট্র্যাজেডি: বাড়ি পোড়ানো, দাদার মানসিক ভারসাম্য হারানো ও মহিউদ্দিনের শাহাদাত

চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহিউদ্দিনের (গাজী মহিউদ্দিন) ছোট ভাই আবুল কাশেমের পরিবারটি রাজাকারদের কারণে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমনুরা জংশনে ছিল প্রচুর বিহারির বসবাস। সেখানে পাক বাহিনীর ক্যাম্পের সাথে যাতায়াতের রাস্তার পাশেই ছিল কাশেমদের বাড়ি।

কাশেমের চাচা মাহতাব উদ্দিন ভারতে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ায় স্থানীয় শান্তি কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় একটি মাদরাসার শিক্ষক এমরান আলীর নেতৃত্বে তাঁদের বাড়ি পোড়াতে আসে রাজাকাররা।

আবুল কাশেম বলেন:

"এমরান আলী একসময় আমাদের স্থানীয় মসজিদের পেশ ইমাম ছিলেন! বাবা তাঁর হাতে-পায়ে ধরে কাকুতি-মিনতি করায় সিদ্ধান্ত হয় শুধু চাচা মাহতাবের ঘরটি পোড়ানো হবে। চোখের সামনেই কেরোসিন, পাটখড়ি ও বাবলা কাঠ দিয়ে আমাদের বাড়ির একটি অংশে আগুন ধরিয়ে উল্লাস প্রকাশ করে রাজাকারেরা।

আমার দাদা হাজি দেরাস উদ্দীন ছিলেন গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ ও সম্মানিত হাজি ব্যক্তি। কিন্তু তাঁর ছেলে মুক্তিযুদ্ধে গেছে এই অপরাধে রাজাকারেরা তাঁকে ছাড়েনি। বাড়ির পাশে ব্রিজের ওপর রাজাকার ক্যাম্প বানিয়ে প্রতিদিন দাদাকে ডেকে নিত। পাক সুবেদার মেজর জোর করে দাদার কাঁঠালের ঝোলা ব্যাগ থেকে প্রতিবার ৫-৬ শত টাকা ছিনিয়ে নিত এবং হুমকি দিত।

শেষভাগে আমার বড় ভাই মহিউদ্দিনও ধরা পড়ে। আমরা বাড়ি ছেড়ে পালালেও বৃদ্ধ দাদা একা ছিলেন। রাজাকাররা বাড়ির দুপাশের পুকুরপাড়ে বাঙ্কার করে দাদাকে দিনরাত মানসিক টর্চার করত। এই উৎপীড়ন সহ্য করতে না পেরে আমার সম্মানিত দাদা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আর স্বাভাবিক হতে পারেননি।

বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে ভাই মহিউদ্দিনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ইপিআর ক্যাম্পে। সেখানে অমানুষিক নির্যাতনের পর তাঁর মাথার বাঁ চোখ দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এই হত্যাকাণ্ডে মূল সহায়তা করেছিল আলাউদ্দিন নামের এক বাঙালি রাঁধুনি, যে পাক সেনাদের দালালি করত। স্বাধীনতার দু-একদিন পর মুক্তিযোদ্ধারা ওই দালাল আলাউদ্দিনকে ধরে এনে গলায় জুতোর মালা পরিয়ে পাঁচ গ্রাম ঘোরানোর পর গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়।"

রাজাকার বাহিনীর জন্ম ও বিস্তার যেভাবে হলো - একাত্তরের দেশীয় ঘৃণ্য দালালবাহিনী

শহীদ ইব্রাহীম বিএবিটি। ছবি: পারিবারিব অ্যালবাম থেকে সংগৃহীত

কেন পাঞ্জাবি সেনাদের চেয়েও খতরনাক ছিল স্থানীয় রাজাকাররা?

রণাঙ্গনের বহু স্মৃতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পাকিস্তানি নিয়মিত বাহিনীর পাঞ্জাবি বা পশতু সেনাদের চেয়েও সাধারণ মানুষের কাছে বহুগুণ বেশি বিপজ্জনক ও আতঙ্কের কারণ ছিল এই স্থানীয় রাজাকাররা। এর মূল কারণগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. স্থানীয় ভৌগোলিক জ্ঞান: পাকিস্তানি সেনারা গ্রামের ভেতরের আঁকাবাঁকা পথ, খাল-বিল বা মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন আস্তানার খোঁজ জানত না। রাজাকাররাই তাদের সুনির্দিষ্ট পথ দেখিয়ে নিয়ে যেত।
২. ভাষাগত সুযোগ: স্থানীয় ভাষা ও মানুষের সামাজিক পরিচিতি রাজাকারদের জানা ছিল। কে মুক্তিযুদ্ধে গেছে, কার ছেলে ভারতে ট্রেনিংয়ে গেছে এই গোপন তথ্যগুলো রাজাকাররাই চিহ্নিত করত।
৩. ব্যক্তিগত শত্রুতা মিটানো: অনেকেই তাদের ব্যক্তিগত জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক আক্রোশ বা সামাজিক দ্বন্দ্ব মেটাতে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়ে প্রতিপক্ষকে 'মুক্তিযোদ্ধা' বানিয়ে পাক সেনার হাতে তুলে দিত।
৪. সম্পদ দখল ও আর্থিক লোভ: হিন্দুদের সম্পত্তি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরবাড়ি লুটপাট করাকে ‘গনিমতের মাল’ বা জায়েজ বলে ফতোয়া দিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করত এই ঘৃণ্য জীবগুলো।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে গড়ে ওঠা রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সৃষ্টি, উদ্দেশ্য ও স্থানীয় অত্যাচারের পাশাপাশি এদের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব, আর্থিক ও সামরিক কাঠামো, প্রধান প্রধান গণহত্যা এবং পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা বিচারের ইতিহাস অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত। নিচে এই সহযোগী নেটওয়ার্কের অজানা ও গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও নীতি-নির্ধারক মণ্ডলী

পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কেবল বুলেটের বলে ঢাকা ও প্রত্যন্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়া ও নিখুঁত পরিকল্পনার জন্য গঠিত হয়েছিল কেন্দ্রীয় বেসামরিক নীতি-নির্ধারক পরিষদ।

কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি (Central Peace Committee)

১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল খাজা খায়ের উদ্দীনের আহ্বানে ঢাকার লালবাগ ময়দানে প্রথম ১৭ সদস্যের একটি নাগরিক কমিটি গঠিত হয়, যা ৯ এপ্রিল ১৪০ সদস্যের ‘কেন্দ্রীয় নাগরিক শান্তি কমিটি’-তে রূপ নেয়। পরবর্তীতে একে ‘কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি’ বলা হয়।

শীর্ষ নেতৃবৃন্দ: খাজা খায়ের উদ্দীন (সভাপতি), এ. এস. এম. সুলাইমান, মৌলভী ফরিদ আহমদ, গোলাম আযম, খান এ সবুর, মাহমুদ আলী এবং শফিকুল ইসলাম।

ভূমিকাসমূহ: জেলা ও থানা পর্যায়ে শান্তি কমিটির শাখা বিস্তার করা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাঙালিদের "ভারতীয় দালাল" হিসেবে অপপ্রচার চালানো, রাজাকারদের অস্ত্র সংস্থানের সুফারিশ করা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িঘর চিহ্নিত করে পাক সেনাবাহিনীকে তালিকা প্রদান করা।

আলবদর বাহিনীর বিশেষ কমান্ড স্ট্রাকচার

আলবদর ছিল মূলত জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্র সংঘ’-এর একটি ক্যাডারভিত্তিক গোপন শাখা।

মতিউর রহমান নিজামী: তৎকালীন সর্বপাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন আলবদর বাহিনীর শীর্ষ প্রধান। বিভিন্ন সভায় নিজামী স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, "আলবদর তরুণরা পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করছে।"

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ: তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি ও ঢাকা শহরের আলবদর প্রধান। বুদ্ধিজীবী নিধনের মূল পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় তাঁর ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়।

মীর কাশেম আলী: আলবদর বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডার এবং অর্থ জোগানদাতা (পরবর্তীতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অপারেশনের মূল দায়িত্বে ছিলেন)।

আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মঈনুদ্দীন: আলবদর বাহিনীর ‘চিফ এক্সিকিউশনার’ বা বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রত্যক্ষ জল্লাদ বাহিনী পরিচালনা করেছিলেন। আশরাফুজ্জামান খানের ব্যক্তিগত ডায়েরিতে বুদ্ধিজীবীদের নাম ও গাড়ির নম্বর উদ্ধার করা হয়েছিল।

অন্যান্য আনুষঙ্গিক ও আঞ্চলিক দালাল বাহিনী

রাজাকার, আলবদর ও আলশামস ছাড়াও পাক সেনাবাহিনী আরও কিছু স্থানীয় আঞ্চলিক সামরিক ও আধা-সামরিক গোষ্ঠী তৈরি করেছিল:

ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্স (EPCAF): ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পূর্ব পাকিস্তান পুলিশ ও আনসার বাহিনীকে পুনর্গঠিত করে EPCAF গঠন করে। এতে অবসরপ্রাপ্ত নন-বেঙ্গলি সামরিক সদস্য ও রাজাকারদের নিয়মিত সৈনিক হিসেবে বেতন দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়।

মুজাহিদ বাহিনী: আনসার ও ইবিআর-এর অল্টারনেটিভ হিসেবে গঠিত একটি নিয়মিত আধাসামরিক ইউনিট।

বিহারি ও নন-বেঙ্গলি মিলিশিয়া: ঢাকা (মিরপুর ও মোহাম্মদপুর), চট্টগ্রাম (খোলাহাটি, ওয়াসা মোড়), সৈয়দপুর, পার্বতীপুর এবং আমনুরায় বিহারি তরুণদের আলাদাভাবে অস্ত্র দিয়ে নিজস্ব ‘মিলিশিয়া স্কোয়াড’ গঠন করা হয়েছিল। এরা ছিল চরম সহিংস এবং স্থানীয় বাঙালি নিধনে অগ্রগামী।

প্রধান প্রধান গণহত্যা ও সহযোগী বাহিনীর ভূমিকা

পাক বাহিনীর পাশাপাশি এসব সহযোগী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে একাধিক বড় বড় গণহত্যার নীল নকশা বাস্তবায়ন করে:

চুকনগর গণহত্যা (২০ মে ১৯৭১): খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে ভারতগামী হাজার হাজার শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল। স্থানীয় রাজাকারেরা এই খবর খুলনার পাক সেনা ক্যাম্পে পৌঁছে দেয়। ২০ মে সকালে রাজাকারদের সহায়তায় পাক সেনারা চুকনগর ঘেরাও করে ব্রাশফায়ার করে। একদিনেই ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়, যা পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম একক বড় গণহত্যা।

পাবনার ডেমরা গণহত্যা (১৪ মে ১৯৭১): পাবনার ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা গ্রামে স্থানীয় শান্তি কমিটি ও রাজাকারেরা পাক সেনাদলকে ডেকে আনে। তারা গ্রামের পুরুষদের বাউসগাড়ীর বিলে একত্র করে এবং নারীদের ঘরে আটকে রাখে। সেখানে একদিনে প্রায় ৮০০ জনের বেশি নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড (১০ - ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১): স্বাধীনতার অন্তিম লগ্নে ১০ থেকে ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক (ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব, মুনীর চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী), চিকিৎসক (ড. ফজলে রাব্বী, ড. আলিম চৌধুরী), সাংবাদিক (সিরাজুদ্দীন হোসেন, সেলিনা পারভীন, শহীদুল্লা কায়সার) সহ শতাধিক বুদ্ধিজীবীকে কাদা মাখা কাদিল্যাক গাড়িতে করে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারিগর ছিল আলবদর বাহিনী, যারা রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে তাঁদের পশুবৎ হত্যা করে।

অর্থায়ন, অস্ত্র সরবরাহ ও 'গনিমত' মতাদর্শ

এই বিশাল অপশক্তি পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল কোটি কোটি টাকা ও বিপুল অস্ত্রের। পাক সরকার ও স্থানীয় দালালরা অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে এই তহবিল পরিচালনা করত:

সরকারি বরাদ্দ ও এসডিও অফিস: প্রতিটি রাজাকার সদস্যকে দৈনিক ৩ রুপি বা মাসে ১৫০ রুপি ভাতা এবং ফ্রি রেশন দেওয়া হতো। এই টাকা তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা বাজেট থেকে পাস হয়ে জেলা ও মহকুমা (SDO) ট্রেজারি থেকে উত্তোলন করা হতো।

'গনিমতের মাল' ফতোয়া ও লুটপাট: সহযোগী বাহিনীর আর্থিক চালিকাশক্তির বড় অংশ আসত হিন্দু সম্প্রদায় এবং মুক্তিকামী বাঙালিদের সম্পত্তি লুটপাট থেকে। শান্তি কমিটির মৌলভী ও নেতারা ফতোয়া দিয়েছিল যে, "মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সমর্থকদের ধন-সম্পদ গনিমতের মাল (যুদ্ধের লুটের মাল), যা হাসিল করা সম্পূর্ণ জায়েজ।" রাজাকারেরা ধান, গরু, সোনা-দানা লুট করে তার একটি অংশ নিজেরা রাখত এবং একটি অংশ স্থানীয় সেনা ক্যাম্পে জমা দিত।

অস্ত্রাগার ও লজিস্টিক: থানা ও আনসার ক্যাম্প থেকে উদ্ধারকৃত পুরোনো থ্রি-নট-থ্রি (303) রাইফেল, হালকা পিস্তল ও রিভলভার রাজাকারদের দেওয়া হতো। অন্যদিকে, আলবদর ও আলশামস বাহিনীকে দেওয়া হতো তুলনামূলক আধুনিক স্টেনগান, চীনা এসএমজি এবং মেশিনগান।

যুদ্ধাপরাধের বিচার, দালাল আইন ও কালানুক্রমিক ইতিহাস

স্বাধীনতার পর থেকে এই দালাল বাহিনীর বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে।

দালাল আইন ১৯৭২ (Collaborators Act 1972)

১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার ‘দালাল আইন (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ ১৯৭২’ জারি করেন। এই আইনের অধীনে প্রায় ৩৭,০০০ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ৩,৭৩৬ জনের বিচার সম্পন্ন হয়ে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।

১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর সরকার এক সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। তবে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয় যে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য এই ক্ষমা প্রযোজ্য নয়। হত্যা ও ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত কয়েক হাজার দালাল কারাগারে বন্দী ছিল।

দালাল আইন বাতিল ও রাজনৈতিক পুনর্বাসন (১৯৭৫ - পরবর্তী)

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর, একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ও সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ‘দালাল আইন ১৯৭২’ অধ্যাদেশটি বাতিল করা হয়। ফলে কারাগারে বন্দী হাজার হাজার চিহ্নিত রাজাকার, আলবদর ও যুদ্ধাপরাধী মুক্তি পায়।

গোলাম আযমসহ অনেক শীর্ষ পলাতক দালালদের দেশে ফেরার এবং রাজনীতি করার আইনি সুযোগ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আশির দশকে শাহ আজিজুর রহমান (যে একাত্তরে জাতিসংঘে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল) প্রধানমন্ত্রী হন এবং নিজামী ও মুজাহিদের মতো আলবদর প্রধানেরা সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT Bangladesh)

দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০১০ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ১৯৭৩ সালের ‘International Crimes (Tribunals) Act’ সংশোধনের মাধ্যমে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। নিচে ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত শীর্ষ সহযোগী বাহিনীর নেতাদের তালিকা দেওয়া হলো:

ব্যক্তির নাম

একাত্তরের পদবী ও বাহিনী

অপরাধের ধরণ

ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত রায় ও শাস্তি

মতিউর রহমান নিজামী

প্রধান, আলবদর বাহিনী (নিখিল পাকিস্তান)

বুদ্ধিজীবী হত্যা, সাঁথিয়া গণহত্যা, আদেশ প্রদান

মৃত্যুদণ্ড (১৬ মে ২০১৬ তারিখে কার্যকর)

আলী আহসান মুজাহিদ

প্রধান, ঢাকা আলবদর বাহিনী

বুদ্ধিজীবী নিধন, শিক্ষক হত্যা, নির্যাতন

মৃত্যুদণ্ড (২২ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে কার্যকর)

মীর কাশেম আলী

চট্টগ্রাম অঞ্চল আলবদর কমান্ডার

ডালিম হোটেলে নির্যাতন সেল পরিচালনা, গণহত্যা

মৃত্যুদণ্ড (৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখে কার্যকর)

মোহাম্মদ কামারুজ্জামান

সংগঠক, আলবদর বাহিনী (ময়মনসিংহ)

সোহাগপুর বিধবা পল্লী গণহত্যা, নির্যাতন

মৃত্যুদণ্ড (১১ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে কার্যকর)

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী

স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক নেতা (চট্টগ্রাম)

গহিরা ও কুণ্ডেশ্বরী ভবনে হত্যা ও নির্যাতন

মৃত্যুদণ্ড (২২ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে কার্যকর)

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী

সদস্য, পিরোজপুর শান্তি কমিটি ও রাজাকার

লুণ্ঠন, ধর্মান্তরিতকরণ, হত্যা

আমৃত্যু কারাদণ্ড (২৭ আগস্ট ২০২৩ তারিখে কারাগারে মৃত্যু)

গোলাম আযম

প্রধান, কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি ও জামায়াত

যুদ্ধের পরিকল্পনা, নির্দেশনা, অপপ্রচার ও নাগরিক হত্যা

৯০ বছরের কারাদণ্ড (২৩ অক্টোবর ২০১৪ তারিখে কারাগারে মৃত্যু)

স্বাধীনতা পরবর্তী ব্যর্থতা ও 'রাজাকার' শব্দের শাশ্বত ধিক্কার

১৯৭১ সালে ৩০ লাখ শহীদ, আড়াই লাখ ধর্ষিতা মা-বোন এবং সমগ্র জাতির নজিরবিহীন আত্মত্যাগের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই যে কাজটি সবচেয়ে অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা ছিল অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার, আলবদর ও আলশামসদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন করে তাদের সঠিক বিচার সম্পন্ন করা তা বিভিন্ন রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা ও পটপরিবর্তনের কারণে থমকে যায়।

পরবর্তীকালে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও এটি নিয়ে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির খেলা খেলা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক সমীকরণ যাই হোক না কেন, সাধারণ বাঙালির হৃদয়ে এবং ইতিহাসের পাতায় ‘রাজাকার’ শব্দটি কোনোদিন ক্ষমা পাবে না।

আজ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় অতিক্রম করার পরও বাঙালি সমাজে ‘রাজাকার’ কেবল একটি ঐতিহাসিক পদবী নয়; এটি মির্জাফরকেও ছাড়িয়ে যাওয়া বিশ্বাসঘাতকতা, স্বজাতিদ্রোহিতা এবং চরম নীচতার এক চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই নামটি ধিক্কারের সাথেই উচ্চারিত হবে।

যে মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছেন শহীদ ইব্রাহীম বিএবিটি কিংবা মহিউদ্দিনের মতো বীর শহীদেরা, সেই স্বাধীন বাংলার আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনি হয় একটাই বার্তা ইতিহাস কোনো রাজাকারের অপরাধ ক্ষমা করেনি, কোনোদিন করবেও না।

তথ্যসূত্র: শান্তিকমিটি ১৯৭১, আলবদর ১৯৭১ (ডা. এম এ হাসান), জনতার ৭১-এর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Jul 21, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

Jul 13, 2026

/

Post by

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বয়ানটি হলো একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র লড়াই। ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তারা এটিকে চিত্রায়িত করেছিল 'ইসলামী সংহতি রক্ষার অভিযান' হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম কখনো অন্যায়, স্বৈরাচার, লুণ্ঠন ও গণহত্যার পক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.