মিরপুর মসজিদের এক কালো পিলার - যেখানে ঘুমিয়ে আছে শত প্রাণ
ঢাকা যখন ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের উল্লাসে মাতোয়ারা, মিরপুর তখনো ছিল এক অবরুদ্ধ জল্লাদখানা। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে এই জনপদ মুক্ত হতে সময় লেগেছিল আরও দেড় মাস। মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের মুসলিম বাজারে অবস্থিত শহীদ বুদ্ধিজীবী জামে মসজিদ। মসজিদের বাকি সবগুলো পিলারই সাদা, শুধু এই পিলারটিই কালো। কিন্তু এই পিলারটি কালো কেন? কারণ এই পিলারটির নিচেই ছিল মুক্তিযুদ্ধের এক ভয়ঙ্কর এক বধ্যভূমি।

TruthBangla
Feb 4, 2026
মিরপুরের প্রতিটি ধূলিকণা যেন এক একটি কান্নার ইতিহাস। ঢাকা যখন ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের উল্লাসে মাতোয়ারা, মিরপুর তখনো ছিল এক অবরুদ্ধ জল্লাদখানা। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে এই জনপদ মুক্ত হতে সময় লেগেছিল আরও দেড় মাস। মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের মুসলিম বাজারে অবস্থিত শহীদ বুদ্ধিজীবী জামে মসজিদ। মসজিদের বাকি সবগুলো পিলারই সাদা, শুধু এই পিলারটিই কালো। কিন্তু এই পিলারটি কালো কেন? কারণ এই পিলারটির নিচেই ছিল মুক্তিযুদ্ধের এক ভয়ঙ্কর এক বধ্যভূমি।
সাধারণ কোনো মুসল্লি যখন এই মসজিদে প্রবেশ করেন, তার নজর কেড়ে নেয় একটি বিশেষ পিলার। মসজিদের অন্যান্য সব পিলার ধবধবে সাদা হলেও ঠিক একটি পিলার রাখা হয়েছে মিশমিশে কালো। এই কালো রঙ কোনো স্থাপত্যশৈলীর অংশ নয়, বরং এটি এক গভীর শোক আর নৃশংসতার নীরব সাক্ষী।
আজকের এই বিশেষ নিবন্ধে আমরা ফিরে তাকাব সেই রক্তস্নাত দিনগুলোতে, উন্মোচন করব মুসলিম বাজার থেকে শুরু করে জল্লাদখানা পর্যন্ত বিস্তৃত সেই ভয়াল বধ্যভূমিগুলোর অজানা ইতিহাস।
নূরী মসজিদ থেকে বুদ্ধিজীবী মসজিদ
১৯৭১ সালে এই মসজিদটির নাম ছিল নূরী মসজিদ। মসজিদটির অবস্থান মিরপুর ১২ নম্বর সেক্টরের মুসলিম বাজারে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এই এলাকাটি ছিল বিহারী এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের শক্ত ঘাঁটি এবং অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকেন্দ্র। মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস এই মসজিদটিকে ব্যবহার করা হয়েছিল বাঙালিদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতনের ব্লুপ্রিন্ট তৈরির কেন্দ্র হিসেবে।
১৯৯৯ সালের ২৭ জুলাই মসজিদটি সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়। মাটি খুঁড়তে গিয়ে নির্মাণ শ্রমিকরা যা আবিষ্কার করেন, তাতে উদঘাটিত হয় এক ভয়াল অধ্যায়ের। কালো রঙের এই পিলারটি যেখানে, সেখানে ছিলো একটি বদ্ধ জমাট বাধা কুয়া। যে কুয়া ঢাকা পড়েছিলো বহুদিনের কালের ধুলায়। মসজিদের নির্মাণ কাজে মাটি খননের সময় ঐ কুয়ো আবিষ্কৃত হয়েছিল তখন।
মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা এই বিশাল কুয়া থেকে বেরিয়ে আসে শত শত মাথার খুলি আর হাড়গোড়। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সেখানে খননকাজ চালিয়ে দেখা যায়, কেবল ওই একটি কুয়াতেই ছিল ৬০০-র বেশি মানুষের দেহাংশ। সেই শহীদের স্মৃতিরক্ষার্থেই আজ ওই পিলারের রঙ কালো রাখা হয়েছে।
মুসলিম বাজার বধ্যভূমি বা নুরী মসজিদ ছিল মিরপুরের মাত্র একটি বধ্যভূমি। মুক্তিযুদ্ধে যে কতোটা আত্মত্যাগের তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিলো মিরপুর। মিরপুরে এমন জায়গা অহরহ পাওয়া গিয়েছিলো।মুক্তিযুদ্ধে ঢাকায় যে ৭৬টি স্বীকৃত বধ্যভূমি ছিলো তার ২৭টি বধ্যভূমির অবস্থানই মিরপুরে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পরেও দেড় মাস অবরুদ্ধ থাকার পর ১৯৭২ সালের আজকের দিন তথা ৩১ জানুয়ারি মুক্ত হয় মিরপুর।
কেন মিরপুর ছিল গণহত্যার ‘আদর্শ’ স্থান?
ঢাকার ভেতরে থেকেও মিরপুর কেন যেন এক অখণ্ড জনপদ বা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো ছিল। একাত্তরে মিরপুরের ভৌগোলিক অবস্থান বর্তমানের মতো উন্নত ছিল না। তখন এটি ছিল একটি নিভৃত পল্লী, যার চারদিকে ছিল বিশাল জলাভূমি আর নিচু জমি। মিরপুরের যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্গম। এর অন্যতম প্রধান কারন মিরপুর ছিল অনেকটা বিরান জনপদ, চতুর্দিকে জলাভূমি, এবং অপেক্ষাকৃত অনেকাংশে নিচু এলাকা।
এখানে বিশাল একটি অংশ ছিল উর্দুভাষী বিহারী, যারা সরাসরি পাকিস্তান বাহিনীকে সহযোগিতা করত। মিরপুর ছিল জনমানবহীন ঝোপঝাড় ও নিচু এলাকাগুলো ছিল লাশ গুম করার সহজ জায়গা। মিরপুর যেন এক জলজ্যান্ত কসাইখানা। গণহত্যার জন্য মিরপুর ছিল এক আদর্শ স্থান।
পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকায় আবিষ্কৃত ৭৬টি বধ্যভূমির মধ্যে ২৭টিই ছিল মিরপুরে। একাত্তরে মিরপুর পরিণত হয়েছিল এক জ্যান্ত কসাইখানায়। ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও মিরপুর মুক্ত হয় ১৯৭২ সালের ৩১শে জানুয়ারি। সেদিন মিরপুরের ডি ব্লক ঈদগাহ মাঠে পাকিস্তানি দোসররা যে পরিমাণ অস্ত্র সমর্পণ করেছিল, তা বহন করতে ৩০টি ট্রাক লেগেছিল। ধারণা করা হয় মুক্তিযুদ্ধে মিরপুরে কমপক্ষে ৫০ হাজারেরও বেশী মানুষকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি, বিহারী, রাজাকার ও আলবদরেরা।
শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি ছিল মৃত্যুপুরী
মিরপুরের বধ্যভূমিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি। মুক্তিযুদ্ধে মিরপুর তো বটেই সমগ্র বাংলাদেশেরই নৃশংসতার বড় উদাহরণগুলোর একটি ছিল শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি। বর্তমানে যেখানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা ভবন থেকে কমার্স কলেজ যাওয়ার কালভার্ট, সেখানেই ছিল সেই বিভীষিকা।
একাত্তরে শিয়ালবাড়ির একপাশে ছিল গহীন জঙ্গল। হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা নিরীহ বাঙালিদের ধরে এনে এখানে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে কুপিয়ে হত্যা করত। অনেক সময় মৃতদেহগুলো সৎকার না করে ফেলে রাখা হতো শিয়াল-কুকুরের খাওয়ার জন্য। স্বাধীনতার পর যখন এই এলাকায় অনুসন্ধান চালানো হয়, তখন কেবল একটি কালভার্টের নিচ থেকেই ৬০ বস্তা মানুষের মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়েছিল। যুদ্ধের আগে শিয়ালবাড়িতে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের বসবাস ছিল, কিন্তু যুদ্ধের পর এটি হয়ে পড়েছিল এক বিরান জনপদ।
কালাপানি ও জহির রায়হানের নিখোঁজ রহস্য
মিরপুরে কালাপানি বধ্যভূমির পূর্ব নাম ছিল কালসিগ্রাম। ১৯৬৪ সাল থেকে বিহারীরা এই গ্রামে আবাস গড়ে তুলেছিল। তখন থেকেই এই এলাকাটি বিহারীদের দখলে যেতে শুরু করে। কালাপানি মূলত নিচু ও নির্জন হওয়ায় বিহারী অসংখ্য সাধারণ মানুষকে হত্যা করে ফেলে গিয়েছিল এখানে।
কালাপানি হত্যাকাণ্ডে সবচেয়ে পৈশাচিক ভূমিকা ছিল তৎকালীন জামায়াত নেতা এ জি খান এবং মিরপুরের ‘কসাই’ খ্যাত আখতার গুন্ডা, মাস্তানা ও সফু গুন্ডার। এরা সবাই ছিল বিহারী নেতা। কালাপানি গণহত্যার আরেক নির্মম সাক্ষী ছিল হাজীদের বহনকারী বিআরটিসির লাল মাইক্রোবাসগুলো। যেগুলোতে করে মূলত হাজীদের বহন করা হতো। তারা এই লাল মাইক্রোবাসগুলো ব্যবহার করত বাঙালিদের ধরে আনার কাজে। শহর বা টেকনিক্যাল মোড় থেকে মানুষদের তুলে এনে এই কালাপানিতে জবাই করা হতো।
শহীদ জহির রায়হান: বাংলার প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক জহির রায়হান তাঁর নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে এই মিরপুরেই নিখোঁজ হন। ১৯৭২ সালের ৩০শে জানুয়ারি তিনি খবর পান যে তাঁর ভাই মিরপুরে বন্দি আছেন। কিন্তু সেখানে গেলে তিনি আর ফিরে আসেননি।
ধারণা করা হয়, কালাপানির সেই শেষ মরণ কামড় তথা যৌথ বাহিনী ও রাজাকার বিহারীদের সম্মুখ যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। আলবদররা তার লাশটাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যায় এবং গুম করে ফেলে। কালাপানি গণহত্যাতেই সর্বশেষ দিনে শহীদ হয়েছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক জহির রায়হান এবং মিরপুরের অ্যাডিশনাল এসপি জিয়াউল হক লোদী সহ অর্ধশত পুলিশ এবং সেনা সদস্য।
মিরপুর বাংলা কলেজ টর্চার সেল
যেখানে ছাত্ররা জ্ঞান চর্চা করার কথা, সেই মিরপুর বাংলা কলেজকে পাকিস্তানিরা বানিয়েছিল এক নারকীয় টর্চার সেল। কলেজের টিচার্স কমনরুমের দক্ষিণে দুটি বিশাল কুয়া ছিল, যেখানে অগণিত ছাত্র এবং সাধারণ মানুষকে হত্যা করে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে এই কুয়া দুটি বিলীন হয়ে গেছে। এই দুটি কুয়া ভর্তি পাওয়া গিয়েছিল অসংখ্য লাশ।
কলেজের অধ্যক্ষের বাসভবনের সামনে পাওয়া গিয়েছিল আরেকটি কুয়া। এই কুয়া ভর্তিও পাওয়া গিয়েছিল অসংখ্য মানুষের লাশ। এছাড়া অধ্যক্ষের কলেজের বাসভবনের পিছনের আম বাগানে পাওয়া গিয়েছিল অসংখ্য মানুষের লাশ। কলেজ ছাত্রাবাসের পিছনে থাকা নিচু জায়গায় এনে হত্যা করা হয়েছিল অসংখ্য মানুষকে। পরে তাদের লাশ ফেলে দেয়া হয়েছিল কলেজ ছাত্রাবাস সংলগ্ন দুটি কুয়াতে। বর্তমানে সেই কুয়াগুলো বিলীন হয়ে গেলেও ইতিহাসের পাতা থেকে সেই রক্তমুছে ফেলা অসম্ভব।
জল্লাদখানায় উল্লাস করতো নরপশুরা
মিরপুর ১০, ১১ ও ১৩ নম্বর সেকশনের মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম ছিল পাম্প হাউজ বা জল্লাদখানা। এটি মূলত একটি সুয়ারেজ রিজার্ভার ছিল। এখানে মানুষকে ধরে এনে জবাই করা হতো এবং দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে সুয়ারেজ রিজার্ভারের মুখ দিয়ে ফেলে দেয়া হতো।
এই বধ্যভূমিতে মূলত হত্যা করা হতো মিরপুর ১০, ১১ এবং ১৩ নম্বর সেকশনের নিরীহ মানুষদের। ১৯৯৯ সালে এখানে খনন চালিয়ে ৭০টি মাথার খুলি এবং ৫৩৯২টি অস্থির খণ্ড পাওয়া যায়। এছাড়া শহীদদের ব্যবহার্য শাড়ি, ওড়না, অলঙ্কার ও তসবিহ উদ্ধার করা হয়।
আলোকদী গ্রামকে মুছে ফেলার চেষ্টা
ঢাকা সেনানিবাসের পাশে মিরপুরের আলোকদী। মিরপুর ডিওএইচএস সংলগ্ন আলোকদী গ্রাম ছিল একাত্তরের আরেক ট্র্যাজেডি। মুক্তিযুদ্ধে বর্বরতা ও নৃশংসতার সবচেয়ে বড় সাক্ষীগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিরপুরের আলোকদী গ্রাম এবং আলোকদী বধ্যভূমি।
মুক্তিযুদ্ধের ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা বিহারী ও রাজাকারদের সহযোগিতায় ঘিরে ফেলেছিল পুরো আলোকদী গ্রাম। গ্রামকে ধসিয়ে দিতে ব্যবহার করা হয়েছিল কামানের গোলা অব্দি। ২৪ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে ২৫ এপ্রিল দুপুর একটা পর্যন্ত চলেছিল পৈশাচিক গণহত্যা। এই গ্রামের আটটি কুয়া পূর্ণ ছিল মানুষের লাশে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী জলাশয়ের ধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়েছিলো নিরীহ গ্রামবাসীকে। এই গ্রামে শহীদের সংখ্যা ২৫০০ থেকে ৩ হাজারের মতো।
শিরনিরটেক ও সারেং বাড়ি বধ্যভূমি
মিরপুরের অন্যতম বধ্যভূমি ছিল শিরনিরটেক বধ্যভূমি। তুরাগ নদীর তীরবর্তী শিরনিরটেক ছিল লাশ গুম করার সবচেয়ে সহজ জায়গা। মুক্তিযুদ্ধে কাউন্দিয়া, দিয়াবাড়ি, বাঘসাত্রা, চান্দারটেক গ্রাম থেকে অসংখ্য মানুষকে তুলে এনে হত্যা করা হয়েছিল শিরনিরটেকে। হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। শিরনিরটেকে গণহত্যার সবচেয়ে বড় কারন ছিল পাশেই তুরাগ নদী থাকায় লাশ ভেসে যেত নদীতে। মিরপুরের বধ্যভূমির গুলোর মধ্যে শিরনিরটেকে কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল রাজাকার এবং পাকিস্তানি সেনারা। আলী হোসেন রাজাকার, ফয়েজ রাজাকার, আইলা গুণ্ডার নেতৃত্বেই চালানো হয়েছিল এই গণহত্যা।
মিরপুর ১ নম্বর সেকশনের শাহ আলী মাজারের উত্তরে মনির উদ্দিন শাহ’র মাজার সংলগ্ন সারেং বাড়ি বধ্যভূমি ছিল মুক্তিযুদ্ধে চরম পৈশাচিকতার সাক্ষী। সারেং বাড়িতে ছিল দুটি বিশাল কুয়া এবং একটি সুয়ারেজ রিজার্ভার। মুক্তিযুদ্ধের সময় সারেং বাড়ি ছিল অনেকটাই নির্জন এবং গাছপালায় পূর্ণ। মূলত সে কারনেই এই স্থানকে গণহত্যার জন্য আদর্শ স্থান হিসেবে বিবেচ্য করা হয়েছিল।
বিহারীরা এখানে বাঙালিদের ধরে এনে গাছে ঝুলিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে পৈশাচিক নির্যাতন চালাতো। এরপর কুপিয়ে হত্যা করতো। ১৯৯২ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ড্রেন পরিষ্কার করতে গিয়ে আবিষ্কার করে যে, সেই রিজার্ভারগুলো হাড়গোড়ে ঠাসা। সুয়ারেজ পরিষ্কার করতে গেলে সুয়ারেজ এবং কুয়া থেকে বেরিয়ে আসে অজস্র মানুষের হাড়গোড়, খুলি ও নানান ব্যবহার্য সামগ্রী।
গোলারটেক বধ্যভূমি ও বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ
মুক্তিযুদ্ধে মিরপুরের গণহত্যার অন্যতম সাক্ষী ছিল গোলারটেক বধ্যভূমি। বর্তমানে মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের পিছনের জায়গাটিই গোলারটেক। বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের একাংশ জুড়েও ছিল বধ্যভূমি। এছাড়া স্মৃতিসৌধের উত্তর দিকে গণকবরটিই আজ একমাত্র সাক্ষী এই বধ্যভূমির। এই গণকবরে কবর দেয়া হয়েছিল ১৮ জনকে। মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন গোলারটেক ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন পরিত্যক্ত কুয়ায় পাওয়া গিয়েছিল শত শত খণ্ড, অখণ্ড হাড়গোড়। পুরো কুয়াই ছিল লাশে পরিপূর্ণ। গোলারটেক ঈদগাহ মাঠের দক্ষিণ পাশে ছিল একটি ডোবা। এই ডোবা ছিল লাশে পরিপূর্ণ। গোলারটেক ১ম, ২য় এবং ৩য় কলোনি জুড়ে ছিল বিহারী কলোনি। যদিও এই এলাকা ছিল হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ তৈরির সময়েও পাওয়া গিয়েছিল অসংখ্য নর কঙ্কাল ও মাথার খুলি।
আমরা আজ যেখানে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাই, সেই গোলারটেক এলাকাটি নিজেই ছিল একটি বিশাল বধ্যভূমি। স্মৃতিসৌধ নির্মাণের সময়ও সেখানে প্রচুর কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছিল। বর্তমানে স্মৃতিসৌধের উত্তর পাশে যে গণকবরটি দেখা যায়, সেটি সেই সময়ের ১৮ জন শহীদের শেষ চিহ্ন বহন করছে।
স্মৃতির মিনার থেকে বর্তমানের দায়িত্ব
মিরপুরের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি শহীদের রক্তে ভেজা। এই জনপদ মুক্ত করার জন্য ১৯৭২ সালের ৩১শে জানুয়ারি যে চূড়ান্ত লড়াই হয়েছিল, সেখানেও বহু পুলিশ ও সেনা সদস্য শহীদ হয়েছিলেন। মিরপুর কেবল একটি এলাকা নয়, এটি আমাদের স্বাধীনতার জন্য দেওয়া চরম মূল্যের এক জীবন্ত জাদুঘর।
আজকের প্রজন্ম যখন মিরপুরের সুউচ্চ দালান বা মেট্রো রেলে ভ্রমণ করে, তখন আমাদের ভুলে গেলে চলবে না সেই কালো পিলারের কথা, সেই জল্লাদখানার কথা। মিরপুরের এই বধ্যভূমিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়েও তা রক্ষা করা অনেক বেশি কঠিন।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















