>

>

মিরপুর মসজিদের কালো পিলার ও জল্লাদখানা - যেখানে ঘুমিয়ে আছে শত প্রাণ

মিরপুর মসজিদের কালো পিলার ও জল্লাদখানা - যেখানে ঘুমিয়ে আছে শত প্রাণ

ঢাকা যখন ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের উল্লাসে মাতোয়ারা, মিরপুর তখনো ছিল এক অবরুদ্ধ জল্লাদখানা। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে এই জনপদ মুক্ত হতে সময় লেগেছিল আরও দেড় মাস। মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের মুসলিম বাজারে অবস্থিত শহীদ বুদ্ধিজীবী জামে মসজিদ। মসজিদের বাকি সবগুলো পিলারই সাদা, শুধু এই পিলারটিই কালো। কিন্তু এই পিলারটি কালো কেন? কারণ এই পিলারটির নিচেই ছিল মুক্তিযুদ্ধের এক ভয়ঙ্কর এক বধ্যভূমি।

TruthBangla

মিরপুর মসজিদের কালো পিলার ও জল্লাদখানা - যেখানে ঘুমিয়ে আছে শত প্রাণ

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১। ঢাকার আকাশে-বাতাসে তখন স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার উড্ডয়ন। রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চারদিকে যখন বিজয়ের বাঁধভাঙা উল্লাস, ঠিক তখনো ঢাকার কোলঘেঁষা এক নিভৃত জনপদ জ্বলছিল নারকীয় হত্যাযজ্ঞের আগুনে। বিজয়ের সেই ক্ষণেও ঢাকা শহরের উত্তর-পশ্চিমের একটি পুরো এলাকা ছিল পরাধীন, অবরুদ্ধ এবং ঘাতকদের দখলে থাকা এক নিশ্ছিদ্র জল্লাদখানা।

সেই এলাকাটি আর কোনটিই নয় আমাদের আজকের আধুনিক, ব্যস্ত ও মুখরিত মিরপুর

পুরো দেশ যখন স্বাধীন, লাল-সবুজের পতাকা যখন পতপত করে উড়ছে সারা বাংলায়, ঠিক তখনো প্রায় দেড় মাস অর্থাৎ ৪৬ দিন পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর দোসর হিংস্র সশস্ত্র বিহারী, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসদের নিয়ন্ত্রণে ছিল মিরপুর। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্ত হওয়ার দেড় মাস পর, ১৯৭২ সালের ৩১শে জানুয়ারি এক রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে চূড়ান্তভাবে মুক্ত হয় এই মিরপুর।

মিরপুরের প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি পুরানো কুয়া, প্রতিটি নালা এবং প্রতিটি ঝোপঝাড় যেন এক একটি কান্নার ইতিহাস, এক একটি পৈশাচিক গণহত্যার নীরব সাক্ষী। ঢাকার ভেতরে আবিষ্কৃত স্বীকৃত ৭৬টি বধ্যভূমির মধ্যে কেবল মিরপুরেই অবস্থিত ছিল ২৭টি ভয়াবহ বধ্যভূমি। আজকের এই সুদীর্ঘ ও বিস্তৃত নিবন্ধে আমরা ফিরে তাকাব মিরপুরের সেই রক্তস্নাত দিনগুলোতে। উন্মোচন করব মুসলিম বাজারের নূরী মসজিদের সেই বিখ্যাত ‘কালো পিলার’-এর রহস্য, শিয়ালবাড়ি ও কালাপানির নরকীয় তাণ্ডব, কালজয়ী চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়ার ট্র্যাজেডি এবং মিরপুর মুক্ত করার শেষ বীরগাথা।

একাত্তরে কেন গণহত্যার ‘আদর্শ’ স্থান ছিল মিরপুর?

আজকে আমরা যে মিরপুরকে আধুনিক মেট্রো রেল, সুউচ্চ ভবন, ঢাকা কমার্স কলেজ বা শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামের এলাকা হিসেবে চিনি, ১৯৭১ সালে এর চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তৎকালীন সময়ে মিরপুরের ভৌগোলিক গঠন এবং জনমিতি (Demographics) ছিল গণহত্যার জন্য অত্যন্ত 'অনুকূল' এবং সুপরিকল্পিত।

উর্দুভাষী বিহারীদের একছত্র আধিপত্য: ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার পর ভারত (বিশেষ করে বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ড) থেকে আগত অসংখ্য উর্দুভাষী মুসলিম পরিবারকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পরিকল্পিতভাবে মিরপুরের ১ থেকে ১২ নম্বর সেকশনে পুনর্বাসিত করে। এর ফলে মিরপুরে স্থানীয় বাঙালি অধিবাসীরা নিজ ভূখণ্ডেই সংখ্যাঘেঘুতে পরিণত হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রের অনুগত এই বিহারী জনগোষ্ঠীর একাংশ বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে ঘোর শত্রুতা হিসেবে গণ্য করে।

১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বিহারী ক্যাডাররা বাঙালি পাড়াগুলোতে ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে থাকে। ২৫ মার্চ রাতে 'অপারেশন সার্চলাইট' শুরু হলে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সরাসরি মদদ, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সহায়তায় তারা পুরো মিরপুরে নিজেদের একচ্ছত্র সশস্ত্র আধিপত্য কায়েম করে। স্থানীয় বাঙালি পরিবারগুলোকে বন্দী বা বিতাড়িত করে পুরো এলাকাকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিরাপদ দুর্গে পরিণত করা হয়।

মূল ঢাকা থেকে দুর্গম ভৌগোলিক যোগাযোগ: একাত্তরে মিরপুরের ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্গম। তৎকালীন মিরপুর ছিল মূল ঢাকা শহরের কোলঘেঁষা অথচ ভৌগোলিকভাবে এক প্রায়-বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। মিরপুরের চারপাশ বেষ্টিত ছিল বিশাল জলাভূমি, নিচু ধানক্ষেত, ঘন ঝোপঝাড় এবং তুরাগ নদীর অববাহিকা দিয়ে। বর্তমান সময়ের মতো প্রশস্ত এভিনিউ, কালভার্ট বা সংযোগ সড়ক তখন ছিল না; মূল শহরের সাথে যোগাযোগের জন্য ছিল মাত্র কয়েকটি সরু পথ।

কোনো বাঙালি ভুলবশত বা বিপদে পড়ে মিরপুর এলাকায় প্রবেশ করলে তাঁর পক্ষে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসা ছিল প্রায় অসম্ভব। ভৌগোলিক এই নির্জনতা ও বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়ে হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা খুব সহজেই যেকোনো বাঙালিকে আটক করে হত্যা করতে পারত, যার খবর মূল ঢাকায় পৌঁছাতে দিন বা সপ্তাহ পেরিয়ে যেত।

নির্জনতা ও লাশ গুমের সুবিধা: মিরপুরজুড়ে সেসময় ছড়িয়ে ছিল অসংখ্য পরিত্যক্ত ইটভাটা, ঝোপঝাড়, গভীর পানির কুয়া (পাম্প হাউস) এবং ওয়াসার বড় বড় পয়োনিষ্কাশন রিজার্ভার (Sewerage Reservoirs)। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসর বিহারী মিলিশিয়া, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস সন্ত্রাসীরা নিখুঁত ছক কষে এসব স্থানকে লাশ গুমের জন্য নির্বাচন করে।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থান যেমন ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট বা রাজারবাগ এলাকা থেকে চোখ বেঁধে বা হাত আটকে ধরে আনা বাঙালিদের মিরপুরের এসব গোপন নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে আসা হতো। পাশবিক নির্যাতনের পর তাঁদের হত্যা করে গভীর কুয়া, স্যূয়ারেজ লাইন বা ডোবায় ফেলে দেওয়া হতো, যাতে কোনো প্রমাণ না থাকে। এই পৈশাচিক কাঠামোর কারণেই মিরপুরকে বলা হতো ‘ঢাকার জ্যান্ত কসাইখানা’

পরিসংখ্যান বলছে, নয় মাসে কেবল মিরপুরেই আনুমানিক ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার)-এরও বেশি নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করে বিভিন্ন বধ্যভূমিতে শিয়াল-কুকুরের খাদ্যে পরিণত করা হয়েছিল।

মিরপুর মসজিদের কালো পিলার ও জল্লাদখানা - যেখানে ঘুমিয়ে আছে শত প্রাণ

নূরী মসজিদ থেকে বুদ্ধিজীবী জামে মসজিদ: ‘কালো পিলার’এর রহস্য

মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের মুসলিম বাজারে অবস্থিত ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী জামে মসজিদ’। এই মসজিদে সাধারণ কোনো মুসল্লি যখন নামাজ আদায় করতে প্রবেশ করেন, তাঁর নজর কেড়ে নেয় অদ্ভুত এক দৃশ্য। মসজিদের পুরো ভেতরের সবকটি পিলার ধবধবে সাদা রসে রাঙানো, কিন্তু ঠিক একটি পিলারকে রাখা হয়েছে কুচকুচে মিশমিশে কালো রঙে।

এই কালো পিলারটি কোনো আধুনিক স্থপতি বা আর্কিটেক্টের খামখেয়ালি নক্সা নয়; এটি ১৯৭১ সালের এক বর্বর গণহত্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক চিরন্তন রক্তস্নাত স্মারক।

১৯৭১ সালে নূরী মসজিদ ও টর্চার সেল: ১৯৭১ সালে এই মসজিদটি 'নূরী মসজিদ' নামে পরিচিত ছিল। এর আশপাশের পুরো মুসলিম বাজার এলাকাটি ছিল সশস্ত্র বিহারী ও জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাদের শক্ত ঘাঁটি। বিহারি অধ্যুষিত মিরপুর অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় গড়ে উঠেছিল সশস্ত্র বিহারি, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর এক শক্তিশালী অভেদ্য ঘাঁটি।

নয় মাস ধরে এই মসজিদটিকে একটি গোপন টর্চার সেল, নির্যাতন কেন্দ্র এবং বাঙালিদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করার ব্লুপ্রিন্ট তৈরির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অবরুদ্ধ বাঙালি, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষদের ধরে এনে এই মসজিদের পেছনের অংশে আঁটসাট কক্ষে বন্দি রাখা হতো। সেখানে চলত অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন এবং বাঙালিদের ওপর পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনা।

জবাইখানা ও পাতকুয়া: মসজিদের ঠিক পেছনেই অবস্থান ছিল এক গভীর পাতকুয়ার। নিভৃত এই স্থানে বাঙালিদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে কিংবা আধমরা অবস্থায় সরাসরি সেই কুয়ায় ফেলে দেওয়া হতো, যাতে কারও মৃত্যুর কোনো আলামত বাইরে না আসে। স্থানটি মুসলিম বাজারের কসাইখানা ও মাংসের দোকানগুলোর ঠিক পেছনে হওয়ায় কসাইখানার রক্তের গন্ধ ও কোলাহলের আড়ালে পৈশাচিক এই নারকীয়তা ঢেকে রাখা সহজ হয়েছিল।

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করলেও মিরপুর শত্রু মুক্ত হতে সময় লেগেছিল আরও প্রায় দেড় মাস। ১৯৭২ সালের ৩১শে জানুয়ারি মিরপুর শত্রুমুক্ত হয়। বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান তাঁর নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে এই মিরপুরের বুকেই চিরতরে নিখোঁজ হয়ে যান।

১৯৯৯ সালের ২৭শে জুলাই ভূগর্ভস্থ গণকবর আবিষ্কার

স্বাধীনতার দীর্ঘ ২৮ বছর পর ১৯৯৯ সালের ২৭শে জুলাই নূরী মসজিদের ভেতরের এই বিভীষিকাময় ইতিহাস প্রকাশ্যে আসে। মসজিদে আগত মুসল্লিদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় স্থানীয় পরিচালনা কমিটি মসজিদ ভবনটি সম্প্রসারণ ও নতুন বহুতল ভিত্তিমূল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়।

মাটি খুঁড়তে গিয়ে শ্রমিকদের কোদাল হুট করে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা এক শক্ত স্ল্যাবে আটকে যায়। কৌতূহলবশত মাটি সরিয়ে প্রাচীন সেই জমে থাকা স্ল্যাবটি তুলতেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এক কুৎসিত গন্ধ এবং বেরিয়ে আসে এক অন্ধকার অবরুদ্ধ কূপ। খবরটি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী (ইঞ্জিনিয়ার্স কোর), মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর যৌথভাবে স্থানটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিয়ম মেনে অতি সাবধানে শুরু হয় ঐতিহাসিক খননকাজ।

সেই অবরুদ্ধ কুয়ার মুখ খুলতেই বেরিয়ে আসে পচা গন্ধের বদলে ইতিহাসের নৃশংসতম নিদর্শন মাথার খুলি, চোয়াল, পাঁজর এবং অসংখ্য মানুষের হাড়গোড়! কেবল ওই একটি কুয়া থেকেই উদ্ধার করা হয় ৬০০-র বেশি মানুষের দেহাংশ ও মাথার খুলি। এর পাশাপাশি উদ্ধার করা হয় শহীদদের ব্যবহৃত শার্ট, প্যান্ট, শাড়ি, টুপি, চশমা, অলঙ্কার, ঘড়ি, ছোটদের জুতো এবং তসবিহ। এই নিদর্শনগুলো প্রমাণ করে যে নারী, পুরুষ, শিশু বা বৃদ্ধ কাউকেই ঘাতকেরা রেহাই দেয়নি।

‘শহীদ বুদ্ধিজীবী জামে মসজিদ’ ও ‘কালো পিলার’

উদ্ধারকৃত মানবদেহাংশ ও শহীদদের জিনিসপত্রের একটি বড় অংশ সংরক্ষণের জন্য স্থানান্তর করা হয় ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে, যা আজও সেই নারকীয় গণহত্যার ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে প্রদর্শিত হয়।

"যে কুয়াটির ভেতরে শত শত বাঙালির রক্তাক্ত দেহাবশেষ ও ইতিহাস চাপা পড়ে ছিল, সেটির ঠিক ওপরের অংশেই তৈরি করা হয় নবনির্মিত মসজিদের একটি প্রধান পিলার বা স্তম্ভ।"

সংস্কার ও সম্প্রসারণের পর মসজিদের পুরো ভেতরের দেয়াল ও অন্যান্য সমস্ত পিলার ধবধবে সাদা রঙে সাজানো হয়। কিন্তু রক্তস্নাত কুয়াটির ওপর নির্মিত নির্দিষ্ট সেই পিলারটিকে ইচ্ছাকৃতভাবেই রাখা হয় কুচকুচে মিশমিশে কালো রঙের।

এই কালো পিলারটি কেবল স্থাপত্যের কোনো অংশ নয়; এটি সাদা রঙের পবিত্রতার মাঝে এক গভীর ক্ষত, নীরব প্রতিবাদ এবং গণহত্যার এক চিরন্তন স্থানিক স্মারক। এটি নির্মাণ করা হয়েছে যাতে নামাজে আসা প্রতিটি মানুষ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনুধাবন করতে পারে আজকের এই মুক্ত বাতাস কত অজস্র প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত।

নামকরণ পরিবর্তন: এই স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দেওয়া শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নূরী মসজিদের নাম চিরতরে পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী জামে মসজিদ’

শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি: কালভার্টের নিচে ৬০ বস্তা নরকঙ্কাল

১৯৭১ সালে তৎকালীন ঢাকা শহরের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত মিরপুর ছিল মূলত অবাঙালি বা বিহারি অধ্যুষিত এলাকা। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর বিহারিরা মিরপুরের বিভিন্ন নির্জন স্থানে একাধিক বধ্যভূমি গড়ে তোলে, যার মধ্যে নৃশংসতার দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি।

মিরপুরের বধ্যভূমিগুলোর মধ্যে নৃশংসতার দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ ও পৈশাচিক ছিল শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি। বর্তমান মিরপুর কমার্স কলেজের পাশ দিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা ভবনের দিকে যে রাস্তাটি গেছে, যেখানে একটি কালভার্ট রয়েছে ঠিক এই স্থানটিই ১৯৭১ সালে ছিল মৃত্যুর এক বিভীষিকাময় উপত্যকা।

২৫শে মার্চ পরবর্তী ঘাতকদের নারকীয় হত্যাকান্ড: পাকিস্তানি বাহিনী যখন বাঙালি নিধনযজ্ঞ শুরু করে, তখন মিরপুরের স্থানীয় বিহারিরাও তাদের সাথে হাত মিলায়। বিহারিরা শিয়ালবাড়ি এলাকায় ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়ে সেখানকার সমস্ত বাঙালি বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। অনেককে নিজ ভিটাতেই হত্যা করা হয়, আর প্রাণভয়ে বাকি বাসিন্দারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

পরবর্তীতে ঢাকা শহর ও এর আশপাশের অঞ্চল যেমন রাজারবাগ, ধানমন্ডি, পুরান ঢাকা, ফার্মগেট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে স্বাধীনতাকামী মানুষ, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ পেশাজীবীদের ধরে এনে এই শিয়ালবাড়িতে জড়ো করা হতো। পাকহানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসর আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকারদের একটি বড় লক্ষ্য ছিল অপহৃত বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযোদ্ধাদের রাতের আঁধারে গাড়ি বোঝাই করে শিয়ালবাড়ির বধ্যভূমিতে নিয়ে আসা।

শিয়ালবাড়ির সেই ভয়াল রাতগুলো: শিয়ালবাড়িতে ঘাতকদের বর্বরতা সমস্ত সীমা অতিক্রম করেছিল। বুলেটের খরচ বাঁচাতে কিংবা বিকৃত মানসিক আনন্দ পেতে বিহারি ও পাকিস্তানি সেনারা ধরে আনা বাঙালিদের লাইন ধরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করাত। তারপর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে, তলোয়ার ও ধারালো রামদা দিয়ে কুপিয়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গচ্ছেদ করে চরম যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করা হতো। এমনকি অনেক সময় অর্ধমৃত মানুষকেও কালভার্টের নিচের কাদামাটিতে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হতো।

হত্যার পর লাশগুলোকে দাফন বা সৎকারের কোনো ব্যবস্থা করা হতো না। কালভার্টের নিচে ও চারপাশের ডোবায় লাশগুলো উন্মুক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হতো। দিন গড়ালেই পচা লাশের গন্ধে পুরো এলাকা ভারি হয়ে উঠত। কয়েক দিনের মধ্যেই মৃতদেহের মাংস খাওয়ার জন্য জঙ্গল থেকে শত শত শেয়াল ও কুকুরের দল নেমে আসত। দিন-রাত পচা লাশের মাংস ছিঁড়ে খাওয়ার এই দৃশ্য এবং শেয়ালের উপদ্রব এতটাই মারাত্মক রূপ নিয়েছিল যে, স্থানটি মানুষের কাছে ‘শিয়ালবাড়ি’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

৬০ বস্তা মানুষের মাথার খুলি

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও মিরপুর এলাকাটি তাৎক্ষণিকভাবে শত্রুমুক্ত হতে পারেনি। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বিহারি ও পাকিস্তানি অবশিষ্টাংশের শক্ত অবস্থানের কারণে ১৯৭২ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মিরপুর অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিল। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী ও স্বাধীনতাকামী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথ অভিযানের মাধ্যমে মিরপুর মুক্ত হয়।

স্বাধীনতার পর যখন এই এলাকায় অনুসন্ধান ও খননকাজ চালানো হয়, তখন পুরো দেশ স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, কেবল শিয়ালবাড়ির কালভার্টের নিচ থেকেই উদ্ধার করা হয়েছিল ৬০ বস্তা মানুষের মাথার খুলি, হাড়গোড় ও কঙ্কাল

কালভার্টের নিচের কাদামাটি ও ডোবা থেকে উদ্ধার করা হয় শত শত ভিকটিমের ছিন্নভিন্ন পোশাক, জুতোর অবশিষ্টাংশ, পরিচয়পত্র, নারীদের শাড়ি ও শিশুদের জামাকাপড়। নরকঙ্কাল উদ্ধারের পর পুরো শিয়ালবাড়ি এলাকাটি এক সম্পূর্ণ জনমানবহীন, ভয়াবহ ও বিরান ভূখণ্ডে পরিণত হয়, যেখানে বহু বছর ধরে সাধারণ মানুষ ভয়ে পা রাখতে পারতেন না।

কালাপানি ও জহির রায়হানের নিখোঁজ রহস্য

মিরপুর ১১ ও ১২ নম্বরের সংযোগস্থলে অবস্থিত কালাপানি বধ্যভূমি (যার পূর্বনাম ছিল কালসিগ্রাম)। ১৯৬৪ সাল থেকে বিহারীরা এই গ্রামটিকে নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। নিচু ও জলাভূমি হওয়ার কারণে এটি পরিণত হয়েছিল লাশ গুম করার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে।

কালাপানির কসাই ও লাল মাইক্রোবাসের আতঙ্ক: কালাপানি গণহত্যার পেছনে সবচেয়ে নির্মম ভূমিকা রেখেছিল স্থানীয় বিহারী নেতা এবং জামায়াতের ক্যাডাররা। এদের মধ্যে অন্যতম ছিল মিরপুরের কসাই হিসেবে খ্যাত আখতার গুন্ডা, মাস্তানা, সফু গুন্ডা এবং এ জি খান

কালাপানি বধ্যভূমির সাথে জড়িয়ে আছে বিআরটিসির লাল রঙের মাইক্রোবাসগুলোর এক ভয়াল ইতিহাস। সাধারণ সময়ে যেগুলো সৌদিগামী হাজীদের বহন করতে ব্যবহৃত হতো, একাত্তরে বিহারীরা সেই বিআরটিসির লাল মাইক্রোবাস নিয়ে ঢাকার টেকনিক্যাল মোড়, ফার্মগেট ও আসাদগেট এলাকা থেকে রাস্তাঘাটে হেঁটে যাওয়া সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক তুলে আনত। এরপর কালাপানিতে এনে তাদের জবাই করা হতো।

জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়া

কালাপানি বধ্যভূমি ও তৎকালীন অবরুদ্ধ মিরপুরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনার অধ্যায় হলো কালজয়ী কথাশিল্পী, ঔপন্যাসিক ও 'স্টপ জেনোসাইড' খ্যাত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়াপ্রেক্ষাপট: ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন জহির রায়হানের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, বিশিষ্ট সাম্যবাদী লেখক ও বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সার। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জহির রায়হান পাগলপারা হয়ে ভাইকে খুঁজছিলেন।

৩০শে জানুয়ারির সেই বার্তা: ১৯৭২ সালের ৩০শে জানুয়ারি জহির রায়হান একটি অজানা ফোনকলের মাধ্যমে খবর পান যে, তাঁর ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে মিরপুর ১২ নম্বরের কালাপানি বা কমার্স কলেজের পেছনের একটি বন্দীশিবিরে আটকে রাখা হয়েছে।

মিরপুরে প্রবেশ ও ট্র্যাজেডি: জহির রায়হান আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশের একটি দলের সাথে অবরুদ্ধ মিরপুরে প্রবেশ করেন। কিন্তু সেটি ছিল সশস্ত্র বিহারীদের পাতা এক চরম ফাঁদ বা অ্যামবুশ (Ambush)। ৩০শে জানুয়ারি কালাপানি এলাকায় পৌঁছানো মাত্রই ঘাতক বিহারী ও পাকিস্তানি সৈন্যরা বহরের ওপর চারদিক থেকে ভারী অস্ত্র ও স্বয়ংক্রিয় রাইফেল দিয়ে প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ শুরু করে।

সেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জিয়াউল হক লোদী, বহু সেনা ও পুলিশ সদস্যের সাথে শহীদ হন অসীম সাহসী জহির রায়হান। ঘাতকেরা তাঁর লাশ টেনেহিঁচড়ে নিয়ে কালাপানির গহীন নালায় গুম করে দেয়। স্বাধীনতার পর সূর্যস্নাত ভোরে বাংলাকে ‘স্টপ জেনোসাইড’ উপহার দেওয়া এই মহান শিল্পী স্বদেশের মাটিতেই নিজ ভাইয়ের সন্ধান করতে গিয়ে অকাতরে প্রাণ দিলেন, কিন্তু তাঁর মরদেহটিও আর কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি।

মিরপুরের প্রধান প্রধান বধ্যভূমি ও নিধন কেন্দ্র

মিরপুরের মাটি পরীক্ষা করলে যেকোনো স্থানেই আজও হয়তো মুক্তিযুদ্ধের নরকঙ্কাল পাওয়া যাবে। নিচে মিরপুরের কয়েকটি প্রধান বধ্যভূমির সংক্ষিপ্ত ভয়াল বিবরণ দেওয়া হলো:

জল্লাদখানা বধ্যভূমি (পাম্প হাউজ)

মিরপুর ১০, ১১ ও ১৩ নম্বর সেকশনের সংযোগস্থলে অবস্থিত জল্লাদখানা ছিল মূলত ঢাকা ওয়াসার একটি বড় সুয়ারেজ রিজার্ভার বা পয়োনিষ্কাশন হাউজ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী এবং তাদের সহযোগী স্থানীয় বিহারী, রাজাকার ও আল-বদর বাহিনী এই স্থানটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ হত্যাপুরীতে রূপান্তর করে।

হত্যাকাণ্ডের পদ্ধতি: নির্জন এই পাম্প হাউজে নিরীহ বাঙালি, মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ পথচারীদের হাত-পা বেঁধে নিয়ে আসা হতো। এরপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে বা অঙ্গচ্ছেদ করে টুকরো টুকরো দেহ সুয়ারেজ রিজার্ভারের ঢাকনা তুলে ভেতরে ফেলে দেওয়া হতো, যাতে কোনো প্রমাণ অবশিষ্ট না থাকে।

খননকার্য ও উদ্ধার: ১৯৯৯ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগে এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খননকার্য চালানো হয়। খননকালে ভূগর্ভস্থ রিজার্ভার থেকে ৭০টি অক্ষত মাথার খুলি এবং ৫,৩৯২টি অস্থির খণ্ড উদ্ধার করা হয়। এর পাশাপাশি শহীদদের পরনের জামাকাপড়, জুতো, চশমা, অলঙ্কার, তসবিহ এবং ব্যক্তিগত ব্যবহার্য দ্রব্যাদি পাওয়া যায়।

বর্তমান রূপ: ২০০৭ সালের ২৩শে এপ্রিল এখানে গড়েতোলা হয় 'জল্লাদখানা স্মৃতিপীঠ'। মূল পাম্প হাউজটিকে অক্ষত রেখে স্থপতি জালাল আহমেদের নকশায় নির্মিত এই স্মৃতিপীঠে রয়েছে একটি ভূগর্ভস্থ প্রদর্শনশালা, যেখানে উদ্ধারকৃত দ্রব্যাদি এবং গণহত্যার ইতিহাস সংরক্ষিত আছে।

মিরপুর বাংলা কলেজ টর্চার সেল

১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষার অন্যতম পবিত্র পীঠস্থান মিরপুর বাংলা কলেজ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী ও সশস্ত্র বিহারীদের প্রধান একটি নারকীয় টর্চার সেলে পরিণত হয়।

পৈশাচিক নির্যাতন কেন্দ্র: কলেজের প্রধান প্রশাসনিক ভবন, অধ্যক্ষের বাসভবন এবং শিক্ষক কমনরুমকে নির্যাতনের মূল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে আনা ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযোদ্ধাদের এখানে এনে লোহার রড, চাবুক এবং বেয়োনেট দিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো।

কুয়া ও গণকবর: কলেজের শিক্ষকের কমনরুমের দক্ষিণে দুটি বিশাল ও গভীর কুয়া ছিল। নির্যাতন শেষে অর্ধেক মৃত বা জীবিত মানুষকে এই কুয়াগুলোতে ফেলে দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হতো। এছাড়া অধ্যক্ষের বাসভবনের পেছনের ঘন আম বাগানটি ব্যবহার করা হতো গণকবর হিসেবে।

বিলম্বিত মুক্ত এলাকা: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও মিরপুর এলাকা বিহারী ও পাকিস্তানি সৈন্যদের দখলে ছিল ১৯৭২ সালের ৩০শে জানুয়ারি পর্যন্ত। ফলে এখানে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত গণহত্যা অব্যাহত ছিল। ৩১শে জানুয়ারি মিরপুর মুক্ত হওয়ার পর বাংলা কলেজের মাঠ, আম বাগান এবং কুয়াগুলো থেকে অজস্র গলিত লাশ ও কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।

আলোকদী গ্রাম গণহত্যা

ঢাকা সেনানিবাসের ঠিক পশ্চিম পাশে অবস্থিত আলোকদী (বর্তমানে ইসিবি চত্বর ও মাটিকাটা সংলগ্ন এলাকা) গ্রামটি ছিল ১৯৭১ সালের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যার কেন্দ্রস্থল।

আক্রমণের প্রেক্ষাপট: ১৯৭১ সালের ২৪শে এপ্রিল মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল এবং সশস্ত্র বিহারী মিলিশিয়ারা চারদিক থেকে আলোকদী গ্রামটি ঘিরে ফেলে। গ্রামটির ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেখানে বহু শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিলেন।

গোলাবর্ষণ ও তাণ্ডব: ২৫শে এপ্রিল ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত অবরুদ্ধ গ্রামের ওপর কামানের গোলা ও ভারী মরটার বর্ষণ করা হয়। আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয় পুরো গ্রামের ঘরবাড়ি। যারা ঘর থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে বের হচ্ছিলেন, তাদের জলাশয়ের পাড়ে ও খোলা মাঠে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়।

ক্ষয়ক্ষতি ও কুয়ার ব্যবহার: মাত্র কয়েক ঘণ্টার এই পৈশাচিক তাণ্ডবে আনুমানিক আড়াই থেকে তিন হাজার নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। পুরো গ্রামের অন্তত ৮টি খাবার পানির কুয়া মানুষের লাশে ঠাসা হয়ে গিয়েছিল। স্বাধীনতার পর আলোকদী গ্রামের খাল-বিল ও ডোবাগুলো থেকে বছরের পর বছর ধরে নরকঙ্কাল ভেসে উঠেছে।

শিরনিরটেক ও সারেং বাড়ি বধ্যভূমি

তুরাগ নদীর তীরবর্তী নির্জন ভৌগোলিক অবস্থান এবং ঘনবসতির সুযোগ নিয়ে এই দুটি স্থানে সুপরিকল্পিতভাবে লাশ গুমের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

শিরনিরটেক বধ্যভূমি: তুরাগ নদীর কোল ঘেঁষে অবস্থিত শিরনিরটেক (বর্তমানে দিয়াবাড়ির কাছাকাছি এলাকা) ছিল একাত্তরের অন্যতম লাশ গুম করার কেন্দ্র। সাভার, কাউন্দিয়া, দিয়া বাড়ি ও চান্দারটেক থেকে সাধারণ মানুষকে ধরে এনে এখানে হাত-পা বেঁধে গুলি বা জবাই করে হত্যা করা হতো। লাশ যেন সহজে গুম হয়ে যায় এবং স্রোতে ভেসে যায়, সে উদ্দেশ্যে সেগুলো তুরাগ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো।

সারেং বাড়ি বধ্যভূমি: মিরপুর ১ নম্বরের শাহ আলী মাজারের উত্তরে অবস্থিত সারেং বাড়িতে ছিল বিশাল দুটি কুয়া এবং একটি সুয়ারেজ ট্যাঙ্ক। অবরুদ্ধ মিরপুরের বিহারী ও পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা শত শত বাঙালিকে ধরে এনে এই সারেং বাড়িতে হত্যা করত।

পরবর্তী আবিষ্কার: ১৯৯২ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা ওই এলাকার নালা ও ড্রেন পরিষ্কার করতে গিয়ে সুয়ারেজ রিজার্ভার থেকে হঠাৎ প্রচুর কঙ্কাল, মাথার খুলি এবং মানুষের হাড় উদ্ধার করেন। এতে পুনরায় উন্মোচিত হয় সারেং বাড়ির সেই ভয়াল ইতিহাস।

৫. গোলারটেক ও বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ এলাকা

আমরা আজ যে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে গিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি, সেই পুরো এলাকাটি ১৯৭১ সালে ছিল রক্তে রাঙানো এক বিশাল বধ্যভূমি।

গোলারটেক এলাকার ভয়াবহতা: তুরাগ নদীর অববাহিকায় অবস্থিত গোলারটেক গ্রাম, ঈদগাহ মাঠ, সংলগ্ন ডোবা এবং পরিত্যক্ত নিচু জমিগুলোকে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী আল-বদর বাহিনী লাশ ফেলার ডাম্পিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করত। ১৪ই ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অনেক শিকারকে রায়েরবাজারের পাশাপাশি এই এলাকায় এনেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

স্মৃতিসৌধ নির্মাণকালীন আবিষ্কার: ১৯৭২ সালে প্রথম স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং পরবর্তীতে স্মৃতিসৌধের আধুনিক রূপদানের সময় মাটি খনন করতে গিয়ে বারবার উঠে এসেছে মানুষের কঙ্কাল, মাথার খুলি এবং পাকিস্তানি বুলেটের খোসা।

১৮ জনের গণকবর: স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণের উত্তর পাশে আজও যে সংরক্ষিত গণকবরটি চোখে পড়ে, তা একাত্তরের ডিসেম্বরে নিহত ১৮ জন অজানা শহীদের চিরনিদ্রার স্থান। পুরো গোলারটেক অঞ্চলটি ছিল হাজারো মুক্তিকামী মানুষের রক্তের শেষ সাক্ষ্য।

মিরপুরের প্রধান প্রধান বধ্যভূমির তুলনামূলক চিত্রলেখ

নিচে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মিরপুরের প্রধান প্রধান বধ্যভূমি, তাদের অবস্থান এবং উদ্ধারকৃত ঐতিহাসিক তথ্যের একটি নিরপেক্ষ ও স্পষ্ট সারণী দেওয়া হলো:

বধ্যভূমির নাম

ভৌগোলিক অবস্থান

গণহত্যার ধরণ ও ঘাতকদের কৌশল

উদ্ধারকৃত ঐতিহাসিক আলামত/তথ্য

মুসলিম বাজার / নূরী মসজিদ

মিরপুর ১২ নম্বর সেকশন

টর্চার সেল; কুপিয়ে ও জবাই করে পেছনের গভীর কুয়ায় লাশ ফেলে দেওয়া হতো।

১৯৯৯ সালে ৬০০-র বেশি মাথার খুলি ও কঙ্কাল উদ্ধার। স্মারক হিসেবে কালো পিলার সংরক্ষিত।

শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি

মিরপুর কমার্স কলেজের পাশে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা ভবন সংলগ্ন

জঙ্গল ও নালায় দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে হত্যা ও শেয়াল-কুকুর দিয়ে খাওয়ানো।

এক কালভার্টের নিচ থেকেই ৬০ বস্তা মানুষের মাথার খুলি ও হাড়গোড় উদ্ধার।

কালাপানি বধ্যভূমি

কালসিগ্রাম, মিরপুর ১১ ও ১২ নম্বরের মাঝামাঝি এলাকা

বিআরটিসির লাল বাসে করে মানুষ তুলে এনে নিচু জমিতে পৈশাচিক গণহত্যা।

চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান ও পুলিশ সুপার জিয়াউল হক লোদী সহ বহু সেনা সদস্য শহীদ।

জল্লাদখানা (পাম্প হাউজ)

মিরপুর ১০, ১১ ও ১৩ নম্বরের সেকশন মোড়

পয়োনিষ্কাশন নর্দমা বা রিজার্ভারে মানুষকে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলে দেওয়া।

১৯৯৯ সালে ৭০টি মাথার খুলি ও ৫,৩৯২টি অস্থির খণ্ড উদ্ধার। বর্তমানে জাদুঘর ও স্মৃতিপীঠ।

মিরপুর বাংলা কলেজ

মিরপুর ১ নম্বর সেকশন

কলেজের টিচার্স কমনরুম ও আম বাগানে টর্চার সেল এবং কুয়ায় লাশ গুম।

প্রিন্সিপালের বাসভবনের পেছনের আম বাগান ও কুয়া থেকে অজস্র নরকঙ্কাল উদ্ধার।

আলোকদী গ্রাম

মিরপুর ডিওএইচএস ও সেনানিবাস সংলগ্ন এলাকা

২৪-২৫ এপ্রিল পুরো গ্রামে কামানের গোলা বর্ষণ ও ব্রাশফায়ারে গণহত্যা।

৮টি কুয়া লাশে ঠাসা ছিল; এক দিনে ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ মানুষ শহীদ।

শিরনিরটেক বধ্যভূমি

তুরাগ নদীর তীর, মিরপুর

নদীর তীরে জবাই করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া।

হাজার হাজার মানুষ শহীদ; আলী হোসেন ও ফয়েজ রাজাকারের তণ্ডবলীলা।

সারেং বাড়ি বধ্যভূমি

শাহ আলী মাজারের উত্তরে, মিরপুর ১

গাছে ঝুলিয়ে নির্যাতন শেষে সুয়ারেজ রিজার্ভারে লাশ নিক্ষেপ।

১৯৯২ সালে ড্রেন পরিষ্কারের সময় রিজার্ভার থেকে অজস্র নরকঙ্কাল উদ্ধার।

৬. রাইনখোলা ও সেনপাড়া পর্বতা বধ্যভূমি

১৯৭১ সালে মিরপুরের রাইনখোলা এবং সেনপাড়া পর্বতা এলাকা দুটি ছিল মূলত নির্জন, ঝোপঝাড় এবং বিলে ঘেরা অঞ্চল। ভৌগোলিক পরিবেশের এই নির্জনতাকে কাজে লাগিয়ে অবাঙালি বিহারী ও অস্ত্রধারী ক্যাডাররা এলাকা দুটিকে স্থায়ী নির্যাতন ও হত্যা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করত।

ঢাকা শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে পালিয়ে যাওয়া গ্রামমুখী পথচারী, কিংবা স্থানীয় সন্দেহভাজন বাঙালি দেখলেই সশস্ত্র ক্যাডাররা তাদের আটকে ফেলত। রাইনখোলা ও সেনপাড়া পর্বতার বিভিন্ন সংযোগস্থলে পাহারাদারি চৌকি বসিয়ে বাঙালিদের ধরে এনে এই নিভৃত স্থানে জমা করা হতো। হত্যা করার আগে বন্দিদের ওপর চালানো হতো অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন।

গোলাবারুদের ব্যবহার কমিয়ে শব্দ গোপন রাখার উদ্দেশ্যে ঘাতকরা প্রায়শই আগ্নেয়াস্ত্রের বদলে ধারালো অস্ত্র, ছুরি ও বেয়োনেট ব্যবহার করত। নির্জন স্থানে এনে অসংখ্য বাঙালিকে কুপিয়ে বা গলা কেটে নৃসংশভাবে হত্যা করা হতো। হত্যাকাণ্ডের পর লাশগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলে রাখা হতো আশপাশের ডোবা, নিচু জমি ও পরিত্যক্ত কূপে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় অধিবাসীরা এই দুই এলাকার মাটি ও কুয়া থেকে বিপুল পরিমাণ কঙ্কাল ও মাথার খুলি দেখতে পান।

৩১শে জানুয়ারি ১৯৭২ রক্তস্নাত মিরপুর মুক্ত হওয়ার বীরগাথা

১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ মুক্ত হলেও মিরপুর কেন ৩১শে জানুয়ারি পর্যন্ত অবরুদ্ধ ছিল? কারণ ১৬ই ডিসেম্বরের পর মিরপুরে অবস্থানরত কয়েক হাজার সশস্ত্র বিহারী ও পাকিস্তানি বাহিনীর অবশিষ্টাংশ আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা মিরপুরকে একটি স্বাধীন 'প্যাকেট' বা পকেট হিসেবে ঘোষণা করে ভেতরে দুর্গ গড়ে তোলে।

৩০শে জানুয়ারির সামরিক অভিযান: মিরপুরের পরিস্থিতি দিন দিন বিপজ্জনক হয়ে উঠলে বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নেয় মিরপুরকে সশস্ত্র মুক্ত করার। ৩০শে জানুয়ারি সকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং বাংলাদেশ পুলিশের একটি সম্মিলিত পরাক্রান্ত বাহিনী অবরুদ্ধ মিরপুর চারদিক থেকে ঘেরা শুরু করে।

মিরপুরের ডি-ব্লক, কালাপানি ও মুসলিম বাজার এলাকা থেকে সশস্ত্র বিহারীরা ভারী মেশিনগান, গ্রেনেড ও রাইফেল দিয়ে যৌথ বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী সম্মুখযুদ্ধ।

৩১শে জানুয়ারি: প্রায় ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা তুমুল লড়াইয়ের পর ৩১শে জানুয়ারি ১৯৭১ সালে যৌথ বাহিনী বিহারীদের দুর্গ গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। পতন ঘটে স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকদের। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের ৪৫ দিন পর, ১৯৭২ সালের ৩১শে জানুয়ারি মিরপুরের বুকে আনুষ্ঠানিকভাবে উড়ানো হয় স্বাধীন বাংলাদেশের রক্তলাল সূর্যখচিত সবুজ পতাকা।

এই শেষ যুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২য় বেঙ্গলের ৪২ জন অসীম সাহসী সেনাসদস্য এবং ৮২ জন পুলিশ সদস্য তাঁদের জীবনের চূড়ান্ত আত্মদান করেন। সেদিন মিরপুর ডি-ব্লক ঈদগাহ মাঠ থেকে আত্মসমর্পণকারী বিহারীদের থেকে যে পরিমাণ আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, তা বহন করে সেনানিবাসে নিয়ে যেতে ৩০টি বিশালাকার সামরিক ট্রাক লেগেছিল!

রক্তের অক্ষরে লেখা স্বাধীনতা

আজকের তরুণ প্রজন্ম যখন মিরপুরের বুক চিরে সাঁজোয়া গতিতে ছুটে চলা অত্যাধুনিক মেট্রো রেলে চড়ে, সুউচ্চ শপিং মলে ঘুরে বেড়ায় কিংবা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের বিজয়ে করতালি দেয় তখন আমাদের একটিবার থামতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমরা আজ যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে উল্লাস করছি, সেই মিরপুরের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি আমাদের পূর্বসূরিদের তাজা রক্তে ভেজা।

মিরপুর ১২ নম্বরের সেই ‘কালো পিলার’ আমাদের শেখায় ফ্যাসিবাদ, উগ্রতা ও ঘাতকদের নারকীয়তা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। জল্লাদখানার সেই গণকবরগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রটি আমরা কোনো দয়াদাক্ষিণ্যে পাইনি; এর পেছনে রয়েছে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়।

মিরপুরের বধ্যভূমিগুলো কেবল ইতিহাস বইয়ের কিছু শুষ্ক পাতা নয়; এগুলো আমাদের জাতীয় চেতনার জীবন্ত স্মারক। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার করে আজ আমাদের দায়িত্ব এই বধ্যভূমিগুলোর সঠিক ইতিহাস রক্ষা করা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ঘাতকদের পৈশাচিকতা তুলে ধরা এবং যে বৈষম্যহীন ও শোষণে মুক্ত বাংলাদেশের জন্য জহির রায়হানরা কালাপানিতে রক্ত দিয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশকে গড়ে তোলা।

মিরপুরের রক্তস্নাত বধ্যভূমি ও শহীদদের স্মৃতি অম্লান হোক। বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Jul 21, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

Jul 13, 2026

/

Post by

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বয়ানটি হলো একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র লড়াই। ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তারা এটিকে চিত্রায়িত করেছিল 'ইসলামী সংহতি রক্ষার অভিযান' হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম কখনো অন্যায়, স্বৈরাচার, লুণ্ঠন ও গণহত্যার পক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.