>

>

রক্তরাঙা একাত্তরের ঈদ - কেমন ছিলো মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ঈদ?

রক্তরাঙা একাত্তরের ঈদ - কেমন ছিলো মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ঈদ?

‘দায়িত্ব’ শব্দটির গভীরতা কতটা হতে পারে? ব্যাকরণের ভাষায় এর সহজ অর্থ হয়তো কর্তব্য, জবাবদিহিতা কিংবা অর্পিত কাজের সুষ্ঠু সম্পাদন। কিন্তু ইতিহাসের কিছু বাঁকে এসে এই সাধারণ শব্দটি এমন এক বিশালতায় রূপ নেয়, যার সামনে দাঁড়িয়ে যেকোনো উচ্চমার্গীয় সংজ্ঞাও ম্লান হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের একাত্তরের রক্তঝরা রণাঙ্গনে এই ‘দায়িত্ব’ শব্দটির অর্থ শুধু কোনো কাগজে-কলমে থাকা আদেশ ছিল না; তা ছিল নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে এক টুকরো স্বাধীন মানচিত্রের স্বপ্নকে পাহারা দেওয়া।

TruthBangla

কেমন ছিলো মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ঈদ?

‘দায়িত্ব’ শব্দটির গভীরতা কতটা হতে পারে? ব্যাকরণের ভাষায় এর সহজ অর্থ হয়তো কর্তব্য, জবাবদিহিতা কিংবা অর্পিত কাজের সুষ্ঠু সম্পাদন। কিন্তু ইতিহাসের কিছু বাঁকে এসে এই সাধারণ শব্দটি এমন এক বিশালতায় রূপ নেয়, যার সামনে দাঁড়িয়ে যেকোনো উচ্চমার্গীয় সংজ্ঞাও ম্লান হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের একাত্তরের রক্তঝরা রণাঙ্গনে এই ‘দায়িত্ব’ শব্দটির অর্থ শুধু কোনো কাগজে-কলমে থাকা আদেশ ছিল না; তা ছিল নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে এক টুকরো স্বাধীন মানচিত্রের স্বপ্নকে পাহারা দেওয়া।

সেই পরম দায়িত্বেরই এক চিরন্তন ও জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ছড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের এক আলোকচিত্রে। ছবিটি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ঈদের দিনে রৌমারী সীমান্তে ধারণ করা।

ছবিটির দিকে তাকালে বুকটা অজানা এক শ্রদ্ধা ও আবেগে কেঁপে ওঠে। দিগন্তবিস্তৃত বাংলার ধানখেতের পাড়ে, সোনালি রোদের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধা। পরনে একটি সাধারণ পরনের লুঙ্গি, খালি গা, আর কাঁচা কাঁধে ঝুলছে একটি সুতির গামছা। কিন্তু তাঁর ডান হাতে ধরা রয়েছে একটি রাইফেল। পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অচেনা তরুণ মুক্তিযোদ্ধার দৃষ্টি অনড়, পুরো অবয়বজুড়ে চরম সতর্কতা। যেখানে পুরো বিশ্বের মুসলমানরা ঈদের দিনে নতুন জামা পরে কোলাকুলি করে, সেমাইয়ের সুবাসে ঘর সাজায় সেখানে এই তরুণ দাঁড়িয়ে আছেন নিজের মাতৃভূমির সীমান্ত আগলে। তিনি জানেন না, বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না; জানেন না তাঁর পরিবার জীবিত আছে কি না। তাঁর একমাত্র চাওয়া এই অবরুদ্ধ মাটিকে শত্রুমুক্ত করতেই হবে।

এই একটিমাত্র ছবি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের জাতীয় জীবনে ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বরের ঈদুল ফিতরটি কতটা ব্যতিক্রমী ছিল। এটি চিরাচরিত আনোন্দ-উচ্ছ্বাসের দিন ছিল না; ছিল বারুদ, রক্ত, উৎকণ্ঠা ও জীবন বাজি রাখার দিন।

একাত্তরের ২০ নভেম্বর: উৎসবের সুবাসের বদলে রক্ত

বাঙালির জীবনে ধর্মীয় উৎসব মানেই স্বজনদের সান্নিধ্য, আনন্দের অনাবিল প্রবাহ আর শৈশবের স্মৃতিচারণ। কিন্তু ১৯৭১ সালের একাত্তরের ঈদুল ফিতর এসেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অচেনা রূপে। সেদিন আকাশজুড়ে ছিল না কোনো ঈদের চাঁদের আলো, ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ছোঁড়া গোলার আলো। বাতাসের সুবাসে ছিল না আতর কিংবা সেমাইয়ের ঘ্রাণ, ছিল ক্ষয়ে যাওয়া বারুদ, জমাট রক্ত আর পোড়া মাটির তীব্র গন্ধ।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে একাত্তরের ২০ নভেম্বর (২৯শে রমজানের সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা সাপেক্ষে) সারা দেশে পালিত হয়েছিল এই ঐতিহাসিক ঈদুল ফিতর। তৎকালীন সময়ে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের ভেতরে থাকা কোটি মানুষ, ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া নিঃস্ব লাখ লাখ বাঙালি এবং রণাঙ্গনে থাকা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এই ঈদ ছিল পরম পরীক্ষার।

একদিকে হানাদার বাহিনীর নৃশংস অত্যাচার, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণের তাণ্ডব; অন্যদিকে স্বজন হারানোর বেদনায় নীল এক একটি পরিবার। অধিকাংশ মানুষের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, স্বজনেরা হারিয়ে গিয়েছিল কালরাত্রির আঁধারে। এমন এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে ঈদের নতুন পোশাক কিংবা কোনো আড়ম্বরের কথা ভাবাও ছিল অবাস্তব। কিন্তু এই সীমাহীন দুঃখের ভেতরেও মুক্তিযোদ্ধাদের মনে প্রজ্জ্বলিত ছিল একটিই মন্ত্র ‘দেশকে যে করেই হোক হানাদার মুক্ত করতে হবে।’

পবিত্র ঈদের দিনেও তাই রণাঙ্গনে থামেনি কামানের গর্জন, থমকে যায়নি গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের স্টেনগানের অবিরাম ফায়ার। তারা জানতেন, এই সাময়িক ত্যাগই এনে দেবে কোটি বাঙালির স্থায়ী আনন্দের দিন একটি স্বাধীন বাংলাদেশ।

যুদ্ধের ময়দানে ঈদের নামাজের বর্ণনা গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলম লিখেছিলেন,

“নালাগঞ্জে জামাত হবে আমগাছ তলায় পুকুরের পাড়ে। মুসলমান ছেলেরা যখন ঈদের জামাতে দাঁড়াবে, তখন হিন্দু ছেলেরা কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে হাতিয়ার হাতে সতর্ক প্রহরায় থাকবে। হিন্দু সহযোদ্ধাদের দেয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে মুসলমান ছেলেরা নামায পড়বে।… হিন্দু ছেলেরা তাদের মুসলমান ভাইদের নামাযের সময় পাহারা দেবার দায়িত্ব পেয়ে যারপরনাই খুশি হয়ে ওঠে। ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে এই যুদ্ধের মাঠে জীবন-মরনের মাঝখানেই সবার বসবাস।”

মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য আত্মদানের, আত্মত্যাগের। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে ‘ঈদের দিন’ বলতে আলাদা কোন তাৎপর্য ছিলোনা। ঈদের দিন কোন কোন রণাঙ্গনে প্রাণ হাতের মুঠোয় রেখে গোটা দিনই যুদ্ধ করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। কোথাও বা নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন স্বদেশের তরে। কেবল তাদের সামনে তখন একটিই গন্তব্য, “দেশকে যে করেই হোক হানাদার মুক্ত করতে হবে।”

মুক্তিযুদ্ধে চলাকালীন সময়ে একাত্তরের ২০ নভেম্বর ঈদুল ফিতর পালিত হয়েছিলো। ঈদুল আজহা বা কুরবানীর ঈদ পালিত হয়েছিলো ৭২ এর ফেব্রুয়ারী মাসে স্বাধীন বাংলাদেশে।

কেমন ছিলো মুক্তিযুদ্ধের সেই ঈদটি। মুক্তিযুদ্ধের ঈদ নিয়ে লিখেছিলাম এই লেখাটি। মুক্তিযুদ্ধের ঈদের দিন দূর্ধর্ষ কয়েকটি অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা।‌

যুদ্ধের ঈদ, ঈদের দিনের যুদ্ধ

আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনবদ্য প্রক্ষেত্র। ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সবাই এক জোয়ালে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন কেবল একটি পরিচয়ে আমরা বাঙালি। মুক্তিযুদ্ধের ঈদের দিনে রণাঙ্গনে গড়ে ওঠা অনন্য এক সম্প্রীতির চিত্র আমরা দেখতে পাই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক মাহবুব আলমের স্মৃতিকথায়।

রণাঙ্গনে তিনি তাঁর দৈনন্দিন জীবনের নানা অনুভূতি ও ঘটনা তিনটি নোটবুকে লিখে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে যা ‘গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে’ নামে কালজয়ী গ্রন্থে রূপান্তরিত হয়। তাঁর সেই দিনলিপি থেকে পাওয়া যায় রণাঙ্গনের ঈদের দিনের এক অভাবনীয় চিত্র।

মুক্তিযুদ্ধের ঈদ প্রসঙ্গে মাহবুব আলম লিখেছিলেন,

“ঈদ এসে গেলো। ছেলেরা ঈদ উৎসব পালনের জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠেছে। একটা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে এরকমের যে, ঈদের দিন পাক আর্মি ব্যাপকভাবে হামলা করবে সীমান্ত এলাকাগুলো জুড়ে। গুজবটা যেভাবেই ছড়াক, যথেষ্ট বিচলিত করে তোলে আমাদের। মুক্তিযোদ্ধারা যখন ঈদের নামাযের জন্য জামাতে দাঁড়াবে ঠিক সে সময়ই নাকি করা হবে এই হামলা! …তাই খুব স্বাভাবিক কারণেই পাকবাহিনীর তরফ থেকে এ ধরনের সম্ভাব্য হামলাকে সামনে রেখে আমরা ঈদুল ফিতর উৎসবে উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত নেই। ঈদের নামায পড়া হবে না, ঈদের উৎসবে হবে না, ভালো খাওয়া-দাওয়া হবে না, ঈদের দিন সবাই হাতিয়ার হাতে শত্রুর অপেক্ষায় ওঁত পেতে বসে থাকবে, এরকম একটা কিছু কেউই যেন মন থেকে মেনে নিতে পারছে না।”

তিনি আরও লিখেছেন:

“ছুটি নেই, আরাম নেই, বিশ্রাম নেই। বড়ো একঘেয়ে আর বিরক্তিকর জীবন সবার। এর মধ্যে ঈদের উৎসব একটা খুশির আবহ নিয়ে এসেছে। …সিদ্ধান্ত হয় ঈদের আগের দিন সবগুলো দল দু’ভাগে ভাগ হবে এবং সমবেত হবে দু’জায়গায়। নালাগঞ্জ আর গুয়াবাড়িতে। ছেলেরা তাদের নিজেদের মতো করেই ঈদ উৎসব পালন করবে।তবে নামায পড়বে একেবারে সীমান্তের ধার ঘেঁষে। গুয়াবাড়িতে সমবেত ছেলেরা ভারতীয় সীমান্তে উঁচু গড়ের পাদদেশে গিয়ে জামাত পড়বে।”

আমগাছ তলায় ঈদের নামাজ ও হিন্দু সহযোদ্ধাদের পাহারা

ঈদের নামাজের প্রসঙ্গে মাহবুব আলমের বর্ণনা পাওয়া যায় অপরুপ সম্প্রীতির চিত্রও। সেই কঠিন বাস্তবতায় নালাগঞ্জ ও গুয়াবাড়ির রণাঙ্গনে যে দৃশ্য তৈরি হয়েছিল, তা পৃথিবীর যেকোনো যুদ্ধের ইতিহাসে বিরল। নালাগঞ্জে পুকুর পাড়ে, আমগাছের ছায়ায় ঈদের নামাজের জামাত কায়েম করার ব্যবস্থা হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠলো নিরাপত্তার। নামাজে দাঁড়ালে যদি শত্রু আক্রমণ করে বসে?

তখনই দৃশ্যপটে এলেন হিন্দু সহযোদ্ধারা। তাঁরা নিজেদের মুসলমান ভাইদের শান্তিতে নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করতে পরম উৎসাহে হাতে অস্ত্র তুলে নিলেন। পুকুর পাড়ের চারপাশ ঘিরে অস্ত্র হাতে সতর্ক প্রহারায় দাঁড়িয়ে গেলেন হিন্দু মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁদের এই পাহারা কেবল একটি সামরিক দায়িত্ব ছিল না; তা ছিল এক আত্মার বন্ধন।

"নালাগঞ্জে জামাত হবে আমগাছ তলায় পুকুরের পাড়ে। মুসলমান ছেলেরা যখন ঈদের জামাতে দাঁড়াবে, তখন হিন্দু ছেলেরা কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে হাতিয়ার হাতে সতর্ক প্রহরায় থাকবে। হিন্দু সহযোদ্ধাদের দেয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে মুসলমান ছেলেরা নামায পড়বে।… হিন্দু ছেলেরা তাদের মুসলমান ভাইদের নামাযের সময় পাহারা দেবার দায়িত্ব পেয়ে যারপরনাই খুশি হয়ে ওঠে। ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে এই যুদ্ধের মাঠে জীবন-মরনের মাঝখানেই সবার বসবাস।”

তিনি আরও লিখেছেন:

“সকাল ন’টায় ঈদের জামাত শুরু হয় পুকুর পাড়ে। আমি নিজে দাঁড়াতে এবং লাঠি ধরে চলাফেরা করতে পারলেও নামায পড়তে পারি না। ওরা সবাই ঈদগাহের মতো জায়গায় পরম পবিত্র মনে নামাযে দাঁড়ায়। আমিও লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি জামাতের কাছাকাছি অবস্থানে। যা হোক, যুদ্ধের মাঠেও তাহলে আমরা নামায পড়তে পারছি। গভীর এক প্রশান্তিতে ভরে ওঠে মন। সতৃষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে আমি তাকিয়ে থাকি ঈদের জামাতের দিকে।"

আমগাছ তলার সেই খোলা মাঠে, হিন্দু সহযোদ্ধাদের রাইফেলের পাহারায় অনুষ্ঠিত সেই ঈদের নামাজ প্রমাণ করেছিল বাঙালির এই যুদ্ধ কোনো ধর্মীয় বিভাজনের যুদ্ধ নয়; এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের, পরাধীনতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধ।

ট্রেঞ্চের জীবন ও শত্রুর গোলাবর্ষণ

মুক্তিযুদ্ধের নিয়মিত বাহিনীর (জেড ফোর্স) ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ডেলটা কোম্পানির অধিনায়ক ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) নুরুন্নবী খান বীর বিক্রম। রণাঙ্গনের ঈদের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি পরবর্তীতে ‘একাত্তরের ঈদের এই দিনে’ শিরোনামে একটি তথ্যবহুল প্রবন্ধ লিখেছিলেন।

নিয়মিত বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ট্রেঞ্চের জীবন ছিল অত্যন্ত কঠিন। ঈদের দিনটিকে কেন্দ্র করে তাদের মনে যে সামান্য প্রত্যাশা ছিল, পাকিস্তানি বাহিনী ভারী আর্টিলারির গোলা ছুড়ে তা তছনছ করে দেয়।

নুরুন্নবী খান বীর বিক্রম লিখেছেন:

“২০ নভেম্বর পবিত্র ঈদের দিনে আমরা আশা করেছিলাম অন্তত এইদিন পাকিস্তানিরা আর্টিলারির গোলা নিক্ষেপ বা সরাসরি আক্রমণ পরিচালনা থেকে বিরত থাকবে। কিন্তু বাস্তবে ছিল এর বিপরীত দৃশ্য। ঈদের দিন সকাল থেকেই পাকিস্তানিরা আমাদের প্রতিটি অবস্থানেই ব্যাপকভাবে আর্টিলারির গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। আমাদের কোনো অবস্থানেই মুক্তিযোদ্ধারা জামাতের সাহায্যে ঈদের নামায পড়ার সুযোগ পায়নি। তাছাড়া ঈদের দিনে গোসল করা, নতুন জামা-কাপড় পরা বা মিষ্টি-সুজি-সেমাই খাওয়া বা উন্নতমানের খাবারেরও কোনো ব্যবস্থা ছিল না।”

একদিকে ট্রেঞ্চজুড়ে শত্রুর কামানের গোলা এসে পড়ছে, মাটি ও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারপাশ, অন্যদিকে পরনের একমাত্র সামরিক পোশাকটি কাদা ও ঘামে ভিজছে। খাদ্য হিসেবে ছিল কেবল শুকনো রুটি কিংবা শুকনা খাবার। কিন্তু এই নির্মমতা মুক্তিযোদ্ধাদের সংকল্পকে এতটুকুও দুর্বল করতে পারেনি; বরং শত্রু বাহিনীর গোলাবর্ষণের জবাবে তাঁদের স্টেনগান ও রাইফেল গর্জে উঠেছিল দ্বিগুণ তেজে।

রায়গঞ্জের অসম যুদ্ধ

মুক্তিযুদ্ধের ঈদের দিনে মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য অসামান্য বীরত্ব আর আত্মত্যাগের সবচেয়ে করুণ অথচ গর্বের ইতিহাস রচিত হয়েছিল ৬ নম্বর সেক্টরে। সেদিন মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে গিয়ে নিজের তাজা প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলেন এক দুর্ধর্ষ তরুণ কর্মকর্তা শহীদ বীর প্রতীক ও বীর উত্তম লেফটেন্যান্ট আবু মঈন মোহাম্মদ আশফাকুস সামাদ।

৬ নম্বর সেক্টরে একের পর এক সফল অপারেশনের পর সেক্টর হেডকোয়ার্টার থেকে আশফাকুস সামাদের বদলির আদেশ এসেছিল। কিন্তু সহযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট আবদুল্লাহর সঙ্গে যৌথভাবে পাকিস্তানি ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অত্যন্ত শক্ত ঘাটি ‘রায়গঞ্জ’ দখলের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই তিনি চূড়ান্ত করে ফেলেছিলেন। দেশকে শত্রুমুক্ত করার অদম্য আকাক্সক্ষায় সামাদ সিদ্ধান্ত নেন, এই গুরুত্বপূর্ণ রায়গঞ্জ যুদ্ধটি শেষ করেই তিনি হেডকোয়ার্টারে যাবেন। কিন্তু তিনি জানতেন না, এই রায়গঞ্জই হতে যাচ্ছে তাঁর জীবনের শেষ রণক্ষেত্র।

ঈদের আগের দিন চাঁদরাতে রাত ৯টার দিকে আশফাকুস সামাদ ও লেফটেন্যান্ট আবদুল্লাহ’র নেতৃত্বে দুই গ্রুপ কমান্ডো পাকিস্তানি হানাদারদের ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের শক্ত ঘাঁটি রায়গঞ্জ দখলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন।

লেফটেন্যান্ট সামাদের দলে ছিলেন কমান্ডো মাহবুব সহ বেশ কয়েকজন দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা। অন্যদিকে লেফটেন্যান্ট আব্দুল্লাহর সঙ্গে ১৫ জন শক্তিশালী কমান্ডো। পূর্বেই নির্ধারণ করা হয়েছিলো ৫০০ গজের মধ্যে গিয়ে সামাদ এবং আবদুল্লাহ নিজেদের পজিশন জানান দিবেন। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা পরে রাত ১১.৩০ এর দিকে এফইউপিতে পৌঁছালে মাত্রই তাঁদের বিন্দুমাত্র অসতর্কতার সুযোগে হানাদার বাহিনী তাঁদের অবস্থান টের পেয়ে যায়। রায়গঞ্জ ব্রিজটি পূর্বেই মুক্তিযোদ্ধারা ধ্বংস করায় হানাদার বাহিনী নদীর উভয় পাশে অবস্থান নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানরত এলাকা আর্টিলারি ও ছয়টি মেশিনগানের গুলিবর্ষণের আওতায় এনে মুক্তিবাহিনীকে একপ্রকার ঘেরাও করে ফেলে।

রায়গঞ্জ ব্রিজের কাছাকাছি পোঁছাতেই আশফাকুস সামাদ দেখলেন ব্রিজের কাছেই ২৫ পাঞ্জাবের এলএমজি বাঙ্কার, তৎক্ষণাৎই তিনি বুঝে গেলেন রেকিতে ভুল হয়েছে এবং তাঁরা হানাদারদের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছেন।

তখন লেফটেন্যান্ট সামাদ শিস দিয়ে সহযোদ্ধাদের শুয়ে পড়তে বললেন। এরপর ওয়্যারলেস সেট চালু করে লেফটেন্যান্ট আব্দুল্লাহর উদ্দেশ্যে ‘হ্যালো আবদুল্লাহ?’ বলতেই হানাদার বাহিনী একযোগে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর আর্টিলারি, মর্টার ফায়ার এবং মেশিনগানের অবিরাম গুলিবর্ষণ শুরু করে। হানাদারদের ভয়াবহ গোলা ও গুলিবর্ষণে টার্গেট এলাকার মধ্যে থাকা আশফাকুস সামাদ সহ মুক্তিযোদ্ধারা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েন।

ঘটনার আকস্মিকতায় এবং শত্রুর ভয়াবহ গোলাবর্ষণে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাথমিক পজিশন তছনছ হয়ে যায়। কিছু মুহূর্তের জন্য চরম বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। এই সংকটময় মুহূর্তে তরুণ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট আশফাকুস সামাদ নিজেকে একটুও বিচলিত হতে দেননি। চরম মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উঁচু গলায় গর্জে উঠে তিনি সহযোদ্ধাদের বললেন,

“কেউ এক ইঞ্চিও পিছু হটবে না। মরলে সবাই মরবো। বাঁচলে সবাই বাঁচবো।”

মুহূর্তের মধ্যে হারানো মনোবল ফিরে পেলেন মুক্তিযোদ্ধারা। শুরু হলো চরম রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। তখন ঈদের দিনের ভোর ঘনিয়ে আসছে।

হানাদারদের আক্রমণের তীব্রতা চতুর্গুণ বেড়ে গেলে আশফাকুস সামাদ এক ভিন্ন পরিকল্পনা আঁটেন। হানাদারদের বিভ্রান্ত করার জন্য দ্রুত তিনি নিজের পজিশন পাল্টে ২০০ গজ পিছনে সরে একটি বাঁশঝাড়ের মধ্যে মেশিনগান পোস্ট স্থাপন করেন। একই সঙ্গে সহযোদ্ধা সুবেদার আরব আলীকে তাঁর পিছনে অবস্থান নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে হানাদারদের আর্টিলারি ফায়ারের বাইরে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু সুবেদার আরব আলী দলনেতাকে একা ফেলে যেতে রাজি নন। তাঁর তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও লেফটেন্যান্ট সামাদ অনড়।

একপর্যায়ে নির্দেশ না শোনায় ক্ষেপে গিয়ে লেফটেন্যান্ট সামাদ বলেই ফেললেন,

“আমার কথা না শুনলে আমরা সবাই মরবো। আপনারা আর্টিলারির বাইরে যান।”

একপর্যায়ে সুবেদার আরব আলী সহ সহযোদ্ধারা পিছু হটলেন। ঠিক তখনই ওয়্যারলেসে ভারতীয় আর্টিলারির সাহায্য চান সামাদ। কিন্তু কোন প্রতিউত্তর এলোনা। তখন হানাদারদের তিনটি মেশিনগানের কভার একাই দিচ্ছিলেন সামাদ। হানাদারদের বিভ্রান্ত করতে অবস্থান বদলের বিকল্প ছিলোনা আশফাকুস সামাদের কাছে। তাই তিনি দ্রুত অবস্থান পাল্টে বাঁশঝাড় থেকে সামান্য সরে কাছেই থাকা একটি শিমুল গাছের নিচে অবস্থান নেন। কিন্তু তাঁর মেশিনগানের অবিশ্রান্ত গুলিবর্ষণ থামেনি একটিবারের জন্যও।

হঠাৎ গোলার আলোতে আশফাকুস সামাদের অবস্থান নির্ণয় করেই হানাদার বাহিনীর তিনটি মেশিনগান পোস্ট একসঙ্গে গর্জে উঠে। একটু দূরে অবস্থান করা মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল হক স্বচক্ষে দেখলেন আশফাকুস সামাদের হেলমেট ফুটো করে কপাল ছিদ্র করে ঢুকে গেছে শত্রুর গুলি। হানাদারদের তীব্র আক্রমণে আশফাকুস সামাদের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

ঈদের পরদিন ২১শে নভেম্বর তাঁর লাশ যখন উদ্ধার করা হয়েছিলো তখন তাঁর পকেটে পাওয়া গিয়েছিলো ঈদের দিনের সকালের নাস্তা হিসেবে রাখা দুটি রুটি আর কিছুটা হালুয়া।

ঈদের দিনে লেফটেন্যান্ট আশকাফুস সামাদ সহ মাত্র কুড়িজন মুক্তিযোদ্ধা দুর্ধর্ষ ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের এক ব্যাটেলিয়ন সেনার মুখোমুখি হয়ে যে বীরত্ব আর দুঃসাহস দেখিয়েছিলে তা মুক্তিযুদ্ধ তো বটেই পৃথিবীর ইতিহাসে যেকোন যুদ্ধের ইতিহাসে বিরল। তাঁদের একটিই লক্ষ্য ছিল সেদিন, হয়তো তাঁরা পাকিস্তানি বাহিনীকে নিঃশেষ করে দিবেন নয়তো নিজেরা শহীদ হবেন। মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য একের পর এক মুক্তিযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও শহীদ হওয়ার আগপর্যন্ত স্টেনগানকে চোখের পলকের জন্য নিজের হাত থেকে সরাননি। সাত আটটি বুলেট লেগেছিলো শরীরে এরপরেও স্টেনগান হাতে চালিয়ে গেছেন লড়াই।

কাদেরিয়া বাহিনীর তাণ্ডব

ঈদের দিনে কেবল সীমান্তেই লড়াই হয়নি; অবরুদ্ধ বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুর সরবরাহ ব্যবস্থা অচল করে দিতে চালিয়েছিলেন একের পর এক ধ্বংসাত্মক অভিযান। টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে কাদেরিয়া বাহিনীর বীরত্ব ছিল পাকিস্তানি সেনাদের জন্য এক মস্ত বড় আতঙ্কের নাম।

ঈদুল ফিতরের দিনে কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের নির্দেশে দুর্ধর্ষ এক অপারেশন পরিচালিত হয়। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কটি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি সাপ্লাই রুট ছিল। এই সড়ক দিয়ে প্রতিনিয়ত ঢাকা থেকে রসদ ও সেনা পৌঁছাত উত্তরবঙ্গে।

ঈদের দিন সকালে কাদেরিয়া বাহিনীর গেরিলা দলগুলো একযোগে ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কের প্রায় ৩০ মাইল দীর্ঘ এলাকায় আঘাত হানে। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানার ভাতকুঁড়া থেকে শুরু করে গাজীপুর মহকুমার কালিয়াকৈর থানার মহিষবাথান পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কে থাকা ছোট-বড় মোট ১৮টি সেতু ও কালভার্ট শক্তিশালী বিস্ফোরক (Plastic Explosive) ব্যবহার করে উড়িয়ে দেওয়া হয়।

এই ১৮টি সেতু উচ্ছেদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও কৌশলগত ভাতকুঁড়া সেতুটি স্বহস্তে বিস্ফোরক বসিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিলেন কাদের সিদ্দিকী নিজে। ঈদের দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার এই ঝটিকা অভিযানে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে পাকিস্তানি বাহিনীর পুরো সামরিক যোগাযোগ এবং রসদ পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। মুক্তাঞ্চলে উল্লাসে ফেটে পড়েন মুক্তিকামী মানুষ।

রক্তভেজা অন্যান্য রণাঙ্গন: ছাগলনাইয়া, হাতীবান্ধা ও জকিগঞ্জ

ছাগলনাইয়া রণাঙ্গন (ফেনী): ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর ঈদুল ফিতরের দিনে ১ নম্বর সেক্টরের অধীনে ফেনীর ছাগলনাইয়ার মোহাম্মদপুর প্রতিরক্ষাব্যূহ রক্ষা করতে গিয়ে অসীম বীরত্ব প্রদর্শন করে শহীদ হন সাতজন মুক্তিযোদ্ধা। এর আগে ৩ নভেম্বর ভারতের উদয়পুরে ১ নম্বর সেক্টরের এক স্ট্র্যাটেজিক কনফারেন্সে ক্যাপ্টেন মাহফুজুর রহমানকে (বীর উত্তম) মুহুরি নদীর পূর্বাঞ্চলীয় সাব-সেক্টরের সার্বিক দায়িত্ব দেওয়া হয়। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেলোনিয়া বালজ ও সংলগ্ন এলাকা শত্রুমুক্ত রাখতে ক্যাপ্টেন মাহফুজ তাঁর অধীনস্থ মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় বাহিনীর ৬ নং জাঠ রেজিমেন্টের সেনাদের নিয়ে ঈদের আগের দিন রাতে চাঁদগাজী বাজারের নিকটবর্তী মোহাম্মদপুরে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যূহ গড়ে তোলেন।

ঈদের দিন ভোরের আলো ফোটার পরপরই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ট্যাংক, ভারী কামান ও বিপুল গোলাবারুদ নিয়ে উক্ত ব্যূহের ওপর তীব্র আক্রমণ চালায়। যৌথ বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে সাঁড়াশি পাল্টা আক্রমণ শুরু করলে শুরু হয় সম্মুখ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। হানাদারদের গোলাবর্ষণে শুরুতেই তিনজন মুক্তিযোদ্ধা বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহীদ হন। সাময়িক বিপর্যয়ে মুক্তিযোদ্ধারা কিছুটা হতোদ্যম হলেও ক্যাপ্টেন মাহফুজের দৃঢ় নেতৃত্ব ও অনুপ্রেরণায় দ্রুত সংগঠিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। শেষপর্যন্ত যৌথ আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে পাকিস্তানি সেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু হটে। তবে পিছু হটার আগে তারা চাঁদগাজী পর্যন্ত পুরো কাঁচা রাস্তায় অসংখ্য অ্যান্টি-পার্সোনাল ও অ্যান্টি-ট্যাংক মাইন পুতে রেখেছিল। যুদ্ধশেষে ক্যাপ্টেন মাহফুজের দল চাঁদগাজীর দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় মাইনের ভয়াবহ বিস্ফোরণে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আরও ২০ জন মুক্তিযোদ্ধা ঘটনাস্থলেই শহীদ হন।

হাতীবান্ধা রণাঙ্গন (লালমনিরহাট): ৬ নম্বর সেক্টরের অধীন লালমনিরহাটের সীমান্তবর্তী হাতীবান্ধা উপজেলায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত শক্ত ঘাঁটি ছিল, যেখান থেকে তারা আশপাশের গ্রামাঞ্চলে নিয়মিত পৈশাচিক গণহত্যা ও নির্মম নির্যাতন চালাত। সেক্টর কমান্ডার উইং কমান্ডার এম খাদেমুল বশারের নির্দেশনায় মুক্তিবাহিনীর চারটি সমন্বিত কোম্পানি ঈদের দিন সকালে হানাদারদের চমকে দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তাঁদের ধারণা ছিল, ঈদের দিন সকালে পাকিস্তানি সেনারা ধর্মীয় শিথিলতা বা বিশ্রামে থাকবে। ২০ নভেম্বর সকাল ৮টার দিকে হাতীবান্ধা ঘাঁটিতে মুক্তিবাহিনীর চারটি কোম্পানি যখন দ্বিমুখী ও চারদিক ঘিরে একযোগে আক্রমণ চালায়, ঠিক তখনই ঘাঁটিতে পাকিস্তানি বাহিনীর কোম্পানি বদল (রিলিভিং) চলছিল। কিছু সেনা হেডকোয়ার্টারে ফিরছিল, কিছু টহলে ছিল এবং নতুন একটি কোম্পানি সবেমাত্র ঘাঁটিতে পৌঁছে দায়িত্ব নিচ্ছিল।

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম আকস্মিক ফায়ারেই পাকিস্তানি বাহিনীর কোম্পানি কমান্ডার ঘটনাস্থলে নিহত হয়। অধিনায়ককে হারিয়ে বিভ্রান্ত ও আতঙ্কিত হানাদার সেনারা ঘাঁটি ফেলে পেছনের দিকে পালাতে শুরু করে। পালানোর সময় তীব্র গুলিবর্ষণে প্রায় ৫০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। প্রায় ১০০০ গজ পেছনে গ্রামের ভেতরে অবস্থিত নিজেদের আর্টিলারি পজিশনে পৌঁছে পাকিস্তানি সেনারা পুনর্সংগঠিত হয়ে মুক্তিবাহিনীর ওপর ভারী আর্টিলারি ফায়ার শুরু করে। পরিস্থিতি বিবেচনায় মুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় আর্টিলারি সহযোগিতার বার্তা পাঠান। ভারতীয় কামানের নিখুঁত ও বিধ্বংসী গোলাবর্ষণে পাকিস্তানি বাহিনীর পুরো ইউনিটটি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা আত্মাহুতি দেন, আর অন্যদিকে প্রায় দেড়শ পাকিস্তানি সেনা নিহত ও মারাত্মকভাবে আহত হয়।

জকিগঞ্জ রণাঙ্গন (সিলেট): ৪ নম্বর সেক্টরের আওতাধীন সিলেট জেলার জকিগঞ্জ সীমান্ত ছিল মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি ঐতিহাসিক রক্তভেজা রণাঙ্গন। সেক্টর কমান্ডার মেজর সি আর দত্তের নেতৃত্বে এবং ভারতীয় ৮ নম্বর মাউন্টেন ডিভিশনের সহযোগিতায় ঈদের আগের রাতে সুরমা নদী অতিক্রম করে মুক্তিযোদ্ধারা জকিগঞ্জের পাকিস্তানি শক্ত ঘাঁটিগুলোর ওপর তীব্র আক্রমণ পরিচালনা করেন। ২০ নভেম্বর ঈদুল ফিতরের দিন ভোরে জকিগঞ্জ বাজার ও পুলিশ স্টেশন সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত করা হয় এবং জকিগঞ্জে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সিলেটের সীমান্তঘেঁষা এই জকিগঞ্জই ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম মুক্ত হওয়া সীমান্ত শহরগুলোর অন্যতম, যেখানে ঈদের আনন্দের সাথেই মিশে গিয়েছিল স্বাধীনতার প্রথম বিজয়ের রক্তিম সূর্য।

কুড়িগ্রাম-উলিপুর রেললাইনে ট্রেন ধ্বংসের অ্যামবুশ

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে ৬ নম্বর সেক্টরের অধীনে কুড়িগ্রাম এলাকাটি সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিল। কুড়িগ্রাম-উলিপুর রেললাইন ব্যবহার করে চিলমারী ও উলিপুর ঘাটের মাধ্যমে হানাদার বাহিনী নিয়মিত রসদ, গোলাবারুদ এবং নতুন সৈন্য পরিবহন করত। এই গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পথ বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে মুক্তিবাহিনীর ‘খায়রুল আলম কোম্পানি’ বারবার প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ ব্যবহার করে রেললাইনে বিস্ফোরণ ঘটায়। তবে পাকিস্তানি বাহিনী সেনাক্ষতি এড়াতে এক চতুর কৌশল গ্রহণ করে। তারা ট্রেনের মূল ইঞ্জিনের ঠিক সামনে মাটি ও বালুভর্তি ওয়াগন যুক্ত করে রাখত। ফলে মাইন বা এক্সপ্লোসিভ থাকলে আগে মাটিবোঝাই ওয়াগনটি বিস্ফোরিত হতো এবং পেছনের বগি ও হানাদার সৈন্যরা সুরক্ষিত থাকত। এই কৌশলের কারণে কিছুদিন মুক্তিযোদ্ধাদের হামলাগুলো কাঙ্ক্ষিত সফলতা পাচ্ছিল না।

হাতীয়ার গণহত্যা ও প্রতিশোধের পরিকল্পনা: ২৩শে রমজান উলিপুরের হাতিয়ায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপর এক পৈশাচিক গণহত্যা চালায়। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে এবং হানাদার বাহিনীর রসদ যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দিতে মুক্তিযোদ্ধারা মরিয়া হয়ে ওঠেন। ১৮ই নভেম্বর (২৮শে রমজান) 'চাঁদ প্লাটুন'-এর কমান্ডার তাহমিদুর রহমান চাঁদ এবং সেকশন কমান্ডার জসীম কোম্পানি কমান্ডার খায়রুল আলমের কাছে এক অভিনব অ্যামবুশের পরিকল্পনা প্রস্তাব করেন। তাদের পরিকল্পনা ছিল সাধারণ এক্সপ্লোসিভের বদলে শক্তিশালী অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মাইন দিয়ে হালাবটগাছতলার কাছে চলন্ত ট্রেনটি পুরোপুরি ধ্বংস করা। হালাবটগাছ এলাকাটি বেলগাছা ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং এর আশেপাশের ভৌগোলিক অবস্থান অ্যামবুশের জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল।

অপারেশনের প্রস্তুতি ও মাইন স্থাপন: পরিকল্পনা অনুযায়ী পবিত্র ঈদের দিন ভোর পাঁচটায় অপারেশন শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোম্পানি হেডকোয়ার্টার থেকে এই অপারেশনের জন্য তিনটি অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মাইন সরবরাহ করা হয়। ঈদের দিন ভোরে ১১ জনের একদল সাহসী মুক্তিযোদ্ধা হালাবটগাছের কাছে রেললাইনের স্লিপারের নিচের মাটি সরিয়ে গোপনে মাইন তিনটি পুঁতে রাখেন। মাটিবোঝাই ওয়াগন পার হয়ে যেন মূল সেনাবহনকারী বগির নিচেই বিস্ফোরণ ঘটে সেভাবেই মাইনের কার্যপদ্ধতি ও টাইমিং হিসাব করা হয়। মাইন থেকে তার টেনে ২০০-৩০০ গজ দূরে ঝোপঝাড়ের আড়ালে নিরাপদ পজিশনে ডেটোনেটর নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন সেকশন কমান্ডার জসীম ও তাঁর সহযোদ্ধারা।

বিস্ফোরণ ও বিপুল ক্ষয়ক্ষতি: ঈদের দিন সকাল ৯টার দিকে কুড়িগ্রাম থেকে উলিপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা একটি পাকিস্তানি ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পূর্বের মতোই ট্রেনের সামনে ছিল মাটিভর্তি ওয়াগন ও তার পেছনে ইঞ্জিন। মাটিবোঝাই প্রথম বগি ও ইঞ্জিনটি মাইন পাতার স্থানটি পার হওয়ার পর শত্রু সৈন্যে ভরা মূল বগিটি অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মাইনের ঠিক ওপর এসে পড়ে। সাথে সাথে সংকেত বুঝে মুক্তিযোদ্ধা জসীম ডেটোনেটরের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটান। বিকট শব্দে তিনটি মাইন একসাথে বিস্ফোরিত হয়ে ট্রেনটির সৈন্যবাহী বগিটি ছিন্নভিন্ন হয়ে রেললাইনের পাশে ছিটকে পড়ে। পেছনের অন্য বগিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত ও লাইনচ্যুত হয়। এই আকস্মিক ও শক্তিশালী হামলায় বগিতে থাকা ১৯ জন পাকিস্তানি সেনা ঘটনাস্থলেই নিহত হয়।

সম্মুখযুদ্ধ ও শত্রুর পিছু হঠা: বিস্ফোরণের পরপরই পেছনের বগিতে বেঁচে থাকা অন্যান্য হানাদার সেনারা নেমে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান লক্ষ্য করে তীব্র গুলিবর্ষণ শুরু করে। সেকশন কমান্ডার জসীমের অধীনে থাকা ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা সীমিত গোলাবারুদ নিয়েই বীরত্বের সাথে পাল্টা আক্রমণ চালান। কিন্তু প্রতিপক্ষের ভারী অস্ত্র ও সৈন্যসংখ্যার তুলনায় মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্লা কিছুটা হালকা হয়ে পড়েছিল। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দুপক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী গোলাগুলি চলে। যুদ্ধের চরম মুহূর্তে পশ্চিম দিক থেকে কৌশলগত ফায়ার সাপোর্ট নিয়ে এগিয়ে আসেন কোম্পানি কমান্ডার আব্দুল হাইয়ের নেতৃত্বাধীন অপর একটি দল। দুই দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে পাকিস্তানি বাহিনী। শেষ পর্যন্ত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে বেঁচে যাওয়া সেনা সদস্যরা কুড়িগ্রামের দিকে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

অবরুদ্ধ ঢাকা ও শহীদজননী জাহানারা ইমামের দিনলিপি

১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর (১৩৯১ হিজরির ১ শাওয়াল) অবরুদ্ধ ঢাকায় উদযাপিত হয়েছিল এক নজিরবিহীন ও বেদনাঘন ঈদ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম গণহত্যা, লুটপাট এবং নিপীড়নের প্রতিবাদে সে বছর বাঙালি জাতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঈদের সমস্ত উৎসব বর্জন করেছিল। রাজধানীতে নতুন পোশাক কেনা, ঘরবাড়ি সাজানো বা আনন্দ-উৎসবের কোনো বর্ণিল আয়োজন ছিল না। পুরো শহর জুড়ে ছিল কারফিউ, সেনা টহল এবং রাজাকার-আলবদরদের ভয়াল নজরদারি। সন্ধ্যা নামলেই ব্ল্যাকআউটের অন্ধকার আর যেকোনো মুহূর্তে ঘরে ঘরে অভিযানের আতঙ্কে ঢাকা রূপ নিয়েছিল এক থমথমে নগরীতে। সাধারণ মানুষ ঈদের নামাজ পড়তে মসজিদে যেতেও শঙ্কা বোধ করছিল, কারণ বহু স্থানে ঈদের জামাত থেকেও তরুণদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছিল।

একদিকে দখলদার বাহিনীর অত্যাচার, অন্যদিকে ক্র্যাক প্লাটুনের দুঃসাহসী তরুণদের একের পর এক গেরিলা অপারেশন ঢাকা শহরের মুক্তিকামী মানুষকে জোগাচ্ছিল প্রতিরোধের সাহস। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, পাওয়ার স্টেশন ও শহরের কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে হামলার পর পাকিস্তানি সেনারা আরও হিংস্র হয়ে ওঠে। ২৯ ও ৩০ আগস্টের রাতে ঢাকা জুড়ে অভিযান চালিয়ে শফী ইমাম রুমী, সুরকার আলতাফ মাহমুদ, বদিউজ্জামান, জুয়েল ও আজাদের মতো বহু বীর তরুণকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। ফলে তৎকালীন ঢাকার ঘরে ঘরে কেবল ছিল স্বজন হারানোর হাহাকার এবং বন্দি সন্তানদের ফিরে পাওয়ার আকুল ব্যাকুলতা।

এই মানসিক যন্ত্রণা ও অবরুদ্ধ জীবনের সবচেয়ে প্রামাণ্য ও হৃদয়বিদারক দলিল হয়ে আছে শহীদজননী জাহানারা ইমামের স্মৃতিকথা "একাত্তরের দিনগুলি"। ২৯ আগস্টের পর থেকে নিজের জ্যেষ্ঠ সন্তান শফী ইমাম রুমীর কোনো খোঁজ না পেয়েও তিনি ও তাঁর স্বামী শরীফ ইমাম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েননি। ২০ নভেম্বরের ডায়েরির পাতায় ঢাকা শহরের সেই থমথমে ও বিষাদময় ঈদের সকালের বর্ণনা উঠে এসেছে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। জাহানারা ইমাম লিখেছিলেন:

“আজ ঈদ। ঈদের কোনো আয়োজন নেই আমাদের বাসায়। কারো জামাকাপড় কেনা হয়নি। দরজা জানালার পর্দা কাচা হয়নি। বসার ঘরের টেবিলে রাখা হয়নি আতরদান। শরীফ, জামি ঈদের নামাজও পড়তে যায়নি। কিন্তু আমি খুব ভোরে উঠে ঈদের সেমাই, জর্দা রেঁধেছি। যদি রুমীর সহযোদ্ধা কেউ আজ আসে এ বাড়িতে? বাবা-মা-ভাই-বোন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কোন গেরিলা যদি রাতের অন্ধকারে আসে এ বাড়ীতে? তাদেরকে খাওয়ানোর জন্য আমি রেঁধেছি পোলাও, কোর্মা, কোপ্তা, কাবাব। তারা কেউ এলে আমি চুপিচুপি নিজের হাতে বেড়ে খাওয়াবো। তাদের জামায় লাগিয়ে দেবার জন্য একশিশি আতরও আমি কিনে লুকিয়ে রেখেছি।”

সন্তান শফী ইমাম রুমীকে পাকিস্তানি ঘাতকেরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল, তার কোনো খোঁজ ছিল না। ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের ‘কণিকা’ নামের যে বাড়িটি একসময় ঢাকার গেরিলা যোদ্ধাদের অস্ত্র লুকানো ও আশ্রয় নেওয়ার অন্যতম নিরাপদ কেন্দ্র ছিল, রুমীর নিখোঁজ হওয়ার পরও সেটি মুক্তির লড়াইয়ের সাথেই যুক্ত ছিল। নিজের সন্তান পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি জেনেও জাহানারা ইমামের মাতৃত্ব সেদিন শুধু এক সন্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা প্রসারিত হয়েছিল দেশের প্রতিটি অজ্ঞাতনামা গেরিলা যোদ্ধার প্রতি।

একাত্তরের সেই ঈদের দিনে কেবল জাহানারা ইমাম নন, ঢাকা শহরের শত শত মায়ের রান্নাঘরে একইভাবে খাবার ঢেকে রাখা হয়েছিল। শহীদ আজাদের মা সাফিয়া বেগম থেকে শুরু করে অগণিত বীর শহীদের মায়েরা দরজায় কড়া নাড়ার শব্দের অপেক্ষায় নিঃশব্দে রাত জাগতেন। রাতের অন্ধকারে যদি কোনো গৃহহীন, ক্ষুধার্ত স্বজনহারা যোদ্ধা দরজায় এসে দাঁড়ায়, তাকে পরম মমতায় খাইয়ে দেওয়ার জন্য মায়েরা প্রস্তুত রেখেছিলেন নিজেদের সামর্থ্যের সবটুকু। ঢাকা রেডিও থেকে প্রচারিত পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডাকে মানুষ চরম ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ঢাকার রাজপথ ও অলিগলি জুড়ে সেদিন উদযাপিত ঈদের আনন্দের জায়গায় স্থান করে নিয়েছিল এক নীরব ও অদম্য সামাজিক প্রতিরোধ।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ঈদুল আজহা (১৯৭২)

১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বরের সেই রক্তঝরা ঈদুল ফিতরের মাত্র ২৬ দিন পর, অর্থাৎ ১৬ই ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতি স্বীকার করেছিল পাকিস্তানি ঘাতক বাহিনী। অর্জিত হয়েছিল আমাদের রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশ।

এরপর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পালিত হয়েছিল প্রথম ঈদুল আজহা (কুরবানির ঈদ)। কিন্তু সেই ঈদের আবহ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার পরম আনন্দ, অন্যদিকে স্বজন হারানোর গভীর শূন্যতা। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সেই স্বাধীন বাংলায় অনেকেই তাঁর সন্তান, পিতা কিংবা স্বামীকে খুঁজে পাননি। বহু পরিবারে কুরবানির আনন্দ ফিকে হয়ে গিয়েছিল অশ্রুজলে।

ফিরে যাওয়া যাক রৌমারী সীমান্তের সেই তরুণ মুক্তিযোদ্ধার কাছে। হাতে রাইফেল, কাঁধে গামছা আর চোখে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে যিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন কালজয়ী সেই আলোকচিত্রে। তিনি কি জানতেন এই ছবি একদিন কোটি বাঙালির হৃদয়ে দেশপ্রেমের অগ্নিশিখা জ্বালাবে?

দায়িত্ব বলতে আমরা যা বুঝি, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ সেই অচেনা বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন দায়িত্ব মানে কেবল নিজের সুখের চিন্তা করা নয়; দায়িত্ব মানে সমষ্টির সুরক্ষার জন্য, দেশের মানচিত্র রক্ষার জন্য নিজের সর্বস্ব বাজি রাখা।

আজ আমরা যখন স্বাধীন দেশে পরম শান্তিতে ঈদের উৎসব উদযাপন করি, নতুন জামা পরে স্বজনদের সাথে হেসে খেলে দিন কাটাই তখন আমাদের স্মৃতির ক্যানভাসে ভেসে ওঠা উচিত ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বরের সেই রক্তভেজা সকালটির কথা। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় সেইসব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, যাঁদের ঈদের পোশাক ছিল কাদা-মাখা সামরিক পোশাক, যাঁদের ঈদের সেমাই ছিল শুকনো রুটি, আর যাঁদের ঈদের কোলাকুলি ছিল স্টেনগানের ট্রিগারে হাত রেখে সহযোদ্ধাকে রক্ষা করার প্রতিজ্ঞা।

একাত্তরের রণাঙ্গনের ঈদ আমাদের ইতিহাস, আমাদের গর্ব এবং আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার অক্ষয় স্মারক। এই বীরত্ব ও ত্যাগের গাথা আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে দায়িত্বশীল হতে শেখায়, দেশকে ভালোবাসতে শেখায়।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Jul 21, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

Jul 13, 2026

/

Post by

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বয়ানটি হলো একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র লড়াই। ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তারা এটিকে চিত্রায়িত করেছিল 'ইসলামী সংহতি রক্ষার অভিযান' হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম কখনো অন্যায়, স্বৈরাচার, লুণ্ঠন ও গণহত্যার পক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.