>
>
কিংবদন্তী বীর প্রতীক তারামন বিবি – ১৩ বছর বয়সে ধরেছিলেন রণাঙ্গনের স্টেনগান
কিংবদন্তী বীর প্রতীক তারামন বিবি – ১৩ বছর বয়সে ধরেছিলেন রণাঙ্গনের স্টেনগান
একজন কিংবদন্তী নারী মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি। কুড়িগ্রামের এক অজপাড়াগাঁয়ে জন্ম নেওয়া তারাবানু নামের এক কিশোরী, যিনি মাত্র ১৩ বছর বয়সে জীবন-মরণের ভয় উপেক্ষা করে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। তাঁর বীরত্বপূর্ণ অবদান, যা দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল, তা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অপরিহার্য অংশ। ১৯৫৭ সালের কোনো এক অজ্ঞাত দিনে কুড়িগ্রাম জেলার চর রাজীবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নের শংকর মাধবপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন তারাবানু।

TruthBangla

“দেশটা তো কেবল বড়দের আছিল না, দেশটা তো আমগোও আছিল। তাই ভাবছিলাম, ছোট মানুষ হয়া যুদ্ধ করলে যদি দেশটা স্বাধীন হয়, তবে ক্ষতি কী?”
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস কেবল পুরুষ যোদ্ধাদের রণহুঙ্কার, ট্যাংক-আর্টিলারির গর্জন কিংবা সুবিন্যস্ত সামরিক কৌশলের গল্প নয়। এটি ছিল সাড়ে সাত কোটি পথহারা বাঙালির বাঁচা-মরার লড়াই যেখানে পুরুষদের পাশাপাশি দেশের মাটি ও মা-বোনের সম্ভ্রম রক্ষায় অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন অসংখ্য নারী। কেউ সেবা দিয়ে, কেউ আশ্রয় দিয়ে, কেউ রসদ ও বার্তা পৌঁছে দিয়ে, আবার কেউ সরাসরি পাকিস্তানি হানাদারদের বুক ঝাঁঝরা করে দিয়ে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন।
এমনই এক রূপকথার মতো অথচ রক্তমাংসের বাস্তব চরিত্র হলেন বীর প্রতীক তারামন বিবি। কুড়িগ্রাম জেলার এক দুর্গম চরাঞ্চলে বেড়ে ওঠা ১৩ বছরের এক সাধারণ অশিক্ষিত কিশোরী তারাবানু কীভাবে সময়ের কঠিন প্রেষণে হয়ে উঠলেন একাত্তরের সর্বকনিষ্ঠ ও বীরত্বপূর্ণ নারী গেরিলা, গোপন স্পাই এবং সম্মুখ সমরের অসম সাহসী যোদ্ধা তার কাহিনী আজও আমাদের শিহরিত করে।
দীর্ঘদিন ইতিহাস ও সমাজের লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এই মহীয়সী নারীর জীবন কেবল যুদ্ধজয়ের গল্প নয়; এটি বিজয়ের পর আমাদের জাতীয় বিস্মৃতি, অবহেলা এবং শেষপর্যন্ত ইতিহাসের পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক বেদনাবিধুর দলিল। আজ বিজয়ের মাসের সূচনাপ্রহরে এবং তাঁর প্রয়াণদিবসে আমরা অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি এই বীরপ্রতীককে।
জীবনসংগ্রাম ও একাত্তরের আগমনি বার্তা
১৯৫৭ সালের কোনো এক অজ্ঞাত দিনে কুড়িগ্রাম জেলার চর রাজীবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নের শংকর মাধবপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন তারাবানু। ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত চরাঞ্চলের চরম দারিদ্র্য, নদীভাঙন আর প্রকৃতির নির্মম নিষ্ঠুরতার সাথে লড়াই করেই কেটেছে তাঁর শৈশব। লেখাপড়ার আলো পৌঁছায়নি সেই দুর্গম চরে; তিন বেলা পেট পুরে খাওয়ার নিশ্চয়তাও ছিল না।
রৌমারী-রাজীবপুর মুক্তাঞ্চল ও ১১ নম্বর সেক্টর
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন সমগ্র বাংলাদেশে নৃশংস গণহত্যা ও নারী নির্যাতন শুরু করে, তখন সারা দেশ কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজীবপুরের ভৌগোলিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত কৌশলগত।
১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে রৌমারী: এই অঞ্চলটি মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টরের অন্তর্গত ছিল, যার দায়িত্বে ছিলেন কিংবদন্তী সামরিক ব্যক্তিত্ব মেজর আবু তাহের (পরবর্তীতে স্কোয়াড্রন লিডার এম হামিদুল্লাহ খানও দায়িত্ব পালন করেন)।
অজেয় রৌমারী: পুরো ৯ মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী রৌমারীকে কখনোই দখল করতে পারেনি। এটি ছিল মুক্ত বাংলাদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীন ভূখণ্ড, যেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবিরের পাশাপাশি অস্থায়ী ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল।
মাত্র ১৩ বছরের কিশোরী তারাবানু চরের আকাশে-বাতাসে গানবোটের বিকট শব্দ, কামানের গর্জন আর দূরদূরান্তের গ্রাম পোড়ানোর ধোঁয়া দেখে আঁতকে উঠেছিলেন। চারপাশের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষেরা যখন দেশ ছাড়ছিল কিংবা সীমান্ত পার হচ্ছিল, তখন এই বালিকাহৃদয়ে অঙ্কুরিত হচ্ছিল দেশের প্রতি এক গভীর ও অলৌকিক ভালোবাসা।
রণাঙ্গনে প্রবেশ: কিশোরী তারাবানু থেকে বীর প্রতীক তারামন
মুক্তিযুদ্ধে তারামন বিবির প্রবেশ কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক ঘোষণার মাধ্যমে হয়নি। হয়েছিল অত্যন্ত সাধারণ এক গৃহস্থালি কাজের মধ্য দিয়ে।
১০ঘরিয়া ক্যাম্প ও রান্নার দায়িত্ব: রাজীবপুরের ১০ঘরিয়া এলাকায় তখন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী সাব-ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল। সেখানে প্রতিদিন শত শত গেরিলা যোদ্ধা অপারেশনের জন্য যাতায়াত করতেন। দিনরাত শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই চালানো এসব মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্নাবান্না করা, হাড়ি-পাতিল ধোয়ামোছা এবং কাপড় কাচার জন্য লোকের মারাত্মক অভাব দেখা দেয়।
একদিবসে স্থানীয় চরেরই সন্তান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহিব হাবিলদার এসে হাজির হন তারাবানুর গরিব ঘরে। তিনি তারাবানুর মা-বাবাকে বুঝিয়ে বলেন,
“ক্যাম্পে ভাইরা দিনরাইত যুদ্ধ করতাছে, খাবার রাঁধার কেউ নাই। মেয়েটারে আমগো ক্যাম্পে পাঠাইয়া দেন, আমরা ওরে পেটের ভাত আর কিছু টাকা দিমু।”
মায়ের দ্বিধা ও নাম পরিবর্তন: ১৩ বছরের একটি নাবালিকা মেয়েকে যুদ্ধের মতো রক্তাক্ত পরিবেশের ক্যাম্পে ছাড়তে মা আলফাতুন্নেছার বুক কেঁপে উঠেছিল। যুদ্ধের বিভীষিকায় মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি চরম আশঙ্কায় ছিলেন। কিন্তু মুহিব হাবিলদার নিজের বোনের মতো আগলে রাখার এবং পবিত্র রাখার নিশ্চয়তা দিলে মা অবশেষে রাজি হন।
ক্যাম্পে আসার পর মুহিব হাবিলদার আদর করে কিশোরী তারাবানুর নামের শেষে যুক্ত করেন ‘মন’ শব্দটি। তিনি বলেন,
“আজ থিকা তুই কেবল তারাবানু না, তুই আমগো ক্যাম্পের মনি, তুই তারামন।”
এই নামই পরবর্তীতে বাংলাদেশের ইতিহাস ও স্বাধীনতার স্মারকে পরিণত হয়।
অস্ত্র পরিষ্কার, সামরিক পাঠ ও সুপারি গাছের ঐতিহাসিক স্কাউটিং
ক্যাম্পে আসার পর তারামনের দিন শুরু হতো খুব ভোরে। চাল ধোয়া, তরকারি কাটা, ১০০-১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধার জন্য বিশাল ডেগে ভাত রান্না করা আর হাঁড়ি ধোয়ার মধ্য দিয়েই তাঁর প্রাথমিক দিনগুলো কাটছিল। কিন্তু কুড়িগ্রামের সেই রক্তঝরা পরিবেশে একটি চটপটে মেয়ের চোখ কেবল রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
অস্ত্রের সাথে অনানুষ্ঠানিক সখ্য: যোদ্ধারা যখন অপারেশন শেষে ক্লান্ত হয়ে ক্যাম্পে ফিরতেন, তখন তাঁদের ব্যবহৃত থ্রি-নট-থ্রি (303 Rifle), সাব-মেশিনগান (SMG) কিংবা লাইট মেশিনগান (LMG) পরিষ্কার করার দরকার হতো। চটপটে তারামন নিজে থেকেই এগিয়ে যেতেন।
তিনি ন্যাকড়া ও তেল দিয়ে অস্ত্রের ভেতরের কাদা-ধুলো পরিষ্কার করতেন। দেখতে দেখতেই তিনি বুঝে ফেলেন কীভাবে একটি রাইফেলের বোল্ট খুলতে হয়, কীভাবে ম্যাগাজিন লোড করতে হয় এবং কীভাবে ট্রিগার চাপতে হয়। তারামনের এই অদম্য কৌতূহল ও নির্ভীকতা দেখে হাবিলদার মুহিব তাঁকে গ্রেনেড ছোড়া এবং থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল চালানোর প্রাথমিক হাতেকলমে শিক্ষা দেন।
সুপারি গাছের উপর থেকে রুদ্ধশ্বাস সতর্কবার্তা: তারামন বিবি কেবল সেবিকা বা রাঁধুনী হয়ে থাকেননি; তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তাঁকে বানিয়ে তুলেছিল এক অনন্য 'স্কাউট' বা নজরদার।
একদুপুরে কোদালকাটি ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা বেশ কয়েকদিনের টানা অপারেশনের পর ক্লান্ত হয়ে দুপুরের ভাত খেতে বসেছেন। চারদিক থমথমে শান্ত। কিন্তু চরের মেয়ে তারামন বিবির মন বলছিল অন্য কথা। তিনি হঠাৎ ক্যাম্পের পেছনের একটি উঁচুমুখী সুপারি গাছে তরতর করে উঠে যান। গাছে উঠে সুপারি গাছের মগডালে বসে দূর নদের দিকে নজর রাখছিলেন তিনি।
হঠাৎ ব্রহ্মপুত্র নদের বুক চিরে তিনি দেখতে পান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি বিশাল গানবোট ও দুটি বার্জ অতি দ্রুত কোদালকাটি আক্রমণের উদ্দেশ্যে ধেয়ে আসছে! তারামন গাছ থেকেই চিৎকার করে উঠেছিলেন:
“ও হাবিলদার ভাই! ও ভাইরা! উঠো, শত্রু আইসা গেল! গানবোট আইসা গেল!”
তাঁর এই আকস্মিক ও জরুরি সতর্কবার্তায় মুক্তিযোদ্ধারা মুহূর্তের মধ্যে হাতের ভাতের থালা ফেলে অস্ত্র হাতে পজিশন নেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পাকিস্তানিরা গানবোট থেকে ভারী গোলাবর্ষণ শুরু করে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা আগেই পজিশন পাওয়ায় পাল্টা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দীর্ঘ সাড়ে তিন ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধে পাকিস্তানিরা পিছু হটে।
সেদিন যদি ১৩ বছরের তারামন সুপারি গাছে উঠে নজরদারি না করতেন, তবে ১০ঘরিয়া ক্যাম্পের শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা দুপুরের খাবারের টেবিলেই পাকিস্তানি গোলার আঘাতে শহীদ হতেন। এই ঘটনার পর ক্যাম্প কমান্ডার ও মুক্তিযোদ্ধারা বুঝতে পারেন এই মেয়ে কেবল রান্না করার জন্য জন্মায়নি, এ হলো সাক্ষাৎ দেশরক্ষক।
গোপন স্পাই ও ছদ্মবেশী অভিযান: কাদার আড়ালে ভেড়ামারি ধ্বংস
১৯৭১ সালের অক্টোবর মাস। কুড়িগ্রাম ও চরাঞ্চলে যুদ্ধের তীব্রতা চরমে। এই সময়ে মুক্তিবাহিনীর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল শত্রুর ক্যাম্পের ভেতরের সঠিক খবরাখবর, বাঙ্কারের অবস্থান এবং সৈন্যসংখ্যার তথ্য। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বা মুক্তিযোদ্ধার পক্ষে পাক বাহিনীর ক্যাম্পের কাছে যাওয়া ছিল অসম্ভব। এই দায়িত্বটি নিজের কাঁধে তুলে নেন তারামন বিবি।
পাগলীর রূপধারণ: কুড়িগ্রামের কোদালকাটির কাছে ভেড়ামারি গ্রামে পাকিস্তানি মিলিটারি একটি মজবুত বাঙ্কার ক্যাম্প গড়ে তুলেছিল। সেই ক্যাম্প উচ্ছেদ না করতে পারলে চরাঞ্চলের দখল নেওয়া সম্ভব ছিল না। তারামন বিবি এক বুদ্ধি চাটলেন-
১. তিনি নিজের গায়ে ও মুখে পচা কাদা ও গোবর মেখে নিলেন।
২. চুলগুলোকে উস্কোখুস্কো করে, ছিঁড়ে যাওয়া নোংরা কাপড় পরে এক অপ্রকৃতস্থ, পাগল ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী কিশোরীর ছদ্মবেশ ধারণ করলেন।
৩. হাত একটি নোংরা টুকরি নিয়ে তিনি কলার ভেলায় চড়ে খাল পার হয়ে সোজা ঢুকে পড়লেন পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পের চৌহদ্দিতে।
শত্রুর নাকের ডগায় বুদ্ধির খেলা: পাকিস্তানি সৈন্যরা দেখল একটি চরের পাগলী মেয়ে গোবর কুড়াতে কুড়াতে বাঙ্কারের কাছাকাছি চলে এসেছে। তারা তাকে দেখে হেসে উঠল, বিদ্রূপ করল, অশালীন গালিগালাজ করল এবং ভয় দেখানোর জন্য শূন্যে গুলি ছুড়ল।
তারামন বিবিও সমান তালে পাগলামির অভিনয় চালিয়ে গেলেন। তিনি সৈন্যদের উদ্দেশ্যে খিস্তিখেউড় করলেন, ভেংচি কাটলেন আর বোকার মতো হাসলেন। কিন্তু তাঁর সেই পাগলীর ছদ্মবেশধারী চোখের আড়ালে তীক্ষ্ণ মগজ হিসাব করছিল-
ক্যাম্পে কতজন পাকিস্তানি সৈন্য আছে?
কোন বাঙ্কারে ভারী মেশিনগান বসানো?
ক্যাম্পের রান্নার জায়গা কোথায় আর গোলাবারুদের ডিপো কোথায়?
কোন সেন্ট্রি কতক্ষণ পর পর ডিউটি পরিবর্তন করে?
পাক হানাদাররা যাকে এক নগণ্য পাগলী মনে করে হাসাহাসি করছিল, সেই কিশোরী তাদের পুরো ঘাঁটির মৃত্যুর পরোয়ানা লিখে ফেলছিল!
খালিয়াভাঙার রাতে আগুনের শিখা
তথ্য সংগ্রহ শেষে কাদা মাখা শরীরে কলার ভেলায় ভেসে নিজের ক্যাম্পে ফেরেন তারামন। ক্যাম্প কমান্ডার হাবিলদার মুহিবের সামনে একদম নিখুঁতভাবে ভেড়ামারি ক্যাম্পের সমস্ত সামরিক বিন্যাস ও দুর্বলতার কথা বর্ণনা করেন।
সেই রাতেই তারামনের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে মুক্তিযোদ্ধারা তিনদিক থেকে অতর্কিত (Surprise Attack) হামলা চালান। নিখুঁত নিশানা ও চমকপ্রদ আক্রমণে ভেড়ামারি পাক সেনাক্যাম্প সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। বহু পাক সৈন্য হতাহত হয় এবং বাকিরা অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায়।

সরাসরি সম্মুখ সমর: থ্রি-নট-থ্রি হাতে কিশোরী যোদ্ধা
তারামন বিবি কেবল স্পাইিং বা নজরদারিতে থেমে থাকেননি। যুদ্ধের শেষ ৩-৪ মাস তিনি সরাসরি থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল হাতে পুরুষ সহযোদ্ধাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছেন।
কোদালকাটি ও অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রে তাণ্ডব
কোদালকাটি, তারাবর, মোহনগঞ্জ এবং গাইবান্ধার ফুলছড়ির রণাঙ্গনে তারামন বিবি সরাসরি ট্রাঞ্চে (মাটি খোড়া বাঙ্কার) শুয়ে শত্রুর দিকে গুলি চালিয়েছেন।
রাইফেল ব্যবহারের দক্ষতা: থ্রি-নট-থ্রি রাইফেলের ওজন ও ব্যাককিক (গুলি ছোড়ার পর পেছনের ধাক্কা) ১৩ বছরের একটি কিশোরীর শরীরের জন্য ছিল প্রচণ্ড ভারী। কিন্তু দেশপ্রেমের উত্তাপে সেই কষ্ট তুচ্ছ হয়ে যেত।
সহযোদ্ধাদের কভার ফায়ার: তিনি কেবল নিজে গুলি চালাননি, অনেক সময় সতীর্থদের কার্তুজ লোড করে দিতেন এবং গুলি ফুরিয়ে এলে দূর থেকে কভার ফায়ার দিয়ে তাঁদের জীবন রক্ষা করতেন।
এক সাক্ষাৎকারে তারামন বিবি তাঁর যুদ্ধের স্মৃতি স্মরণ করে বলেছিলেন:
“যখন যুদ্ধ শুরু হইতো, তখন নিজের জীবনের কথা মনে থাকত না। মনে হইতো এই শয়তানগুলোকে দেশ থিকা না খেদালে আমগো মা-বোনদের রক্ষা নাই। রাইফেল হাতে নিয়া যখন ট্রিগার টানতাম, তখন গায়ের মধ্যে কেমন যেন একটা রক্তের তেজ চইলা আসত!”
এক যুদ্ধে শত্রুর ভারী মর্টারের গোলা ও গ্রেনেড তাঁর খুব কাছে এসে বিস্ফোরিত হয়। গোলার বিকট শব্দে তাঁর কানের পর্দা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তিনি সাময়িকভাবে জ্ঞান হারান। এই আঘাতের মাশুল তাঁকে সারাজীবন শারীরিক অসুস্থতার মাধ্যমে গুণতে হয়েছিল।
বিজয়, বিস্মৃতি ও ২৪ বছরের চরম অন্ধকার
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় হাজার বছরের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন বাংলাদেশ। চারদিকে বিজয়ের আনন্দ, উল্লাস আর জয় বাংলা ধ্বনি।
খেতাব লাভ ও তথ্যের বিচ্ছিন্নতা: স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার মুক্তিযুদ্ধে অনন্য বীরত্বের জন্য তারামন বিবিকে রাষ্ট্রীয় সামরিক সম্মাননা ‘বীর প্রতীক’-এ ভূষিত করে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো এই খবর কোনোদিন চরের দরিদ্র, নিরক্ষর তারামনের কানে পৌঁছায়নি!
যুদ্ধের পর অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের মতো তারামনও রাষ্ট্রীয় কোনো সুবিধা না নিয়ে অত্যন্ত নীরবে নিজের ভিটেমাটিতে ফিরে যান। কাজের তাগিদে, পেটের ভাতের তাগিদে চরের জীবনসংগ্রামে বিলীন হয়ে যান এই দুর্ধর্ষ বীর প্রতীক।
দিনমজুর মজিদের সংসার ও পরিচয়হীনতা: পরবর্তীতে চরের দিনমজুর ও কৃষক আব্দুল মজিদের সাথে তারামন বিবির বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি এক সাধারণ গৃহবধূ হিসেবে সংসার শুরু করেন। দারিদ্র্য এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, তিন বেলা অন্ন জোটানোই দায় হয়ে পড়েছিল।
তারামনের স্বামী আব্দুল মজিদও দীর্ঘ ২৪ বছর জানতেন না যে তাঁর পাশে শুয়ে থাকা জীর্ণদেহের অসুস্থ নারীটি বাংলাদেশের মাত্র তিনজন খেতাবপ্রাপ্ত নারী মুক্তিযোদ্ধার অন্যতম!
পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে সরলভাবে আব্দুল মজিদ বলেছিলেন:
“হ্যায় যে মুক্তিযোদ্ধা, হেইটা বিয়ের পরও বুঝি নাই। লেহা পড়া নাই। চর্যার মধ্যে বাড়ি। পেটের ভাত জোগাড় কোরতেই দিন চইলা যাইত, হ্যাই খবর কেমনে নিমু?”
অভাব, নদীভাঙনে বারবার ঘরবাড়ি হারানো, যক্ষ্মা রোগ এবং অপুষ্টিতে বীর প্রতীক তারামন বিবির শরীর ধীরে ধীরে কঙ্কালসারে পরিণত হতে থাকে। ইতিহাস তাঁকে ভুলে গিয়েছিল, রাষ্ট্র তাঁকে হারিয়ে ফেলেছিল চরের ধূধূ বালুচরে।
১৯৯৫ সালের সংবাদ তোলপাড় ও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি
দীর্ঘ ২৪ বছর পর, ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক মোড়ে এসে উন্মোচিত হয় এক অবিশ্বাস্য সত্য।
বিমল কান্তি দে ও আবদুস সবুর ফারুকীর অক্লান্ত প্রচেষ্টা: ১৯৯৫ সালে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের তৎকালীন অধ্যাপক ও গবেষক বিমল কান্তি দে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিভিন্ন সরকারি গেজেট ও নথি নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি দেখতে পান, খেতাবপ্রাপ্তদের তালিকায় ‘তারামন বিবি, সাং-শংকর মাধবপুর, কুড়িগ্রাম’ নামটি রয়েছে, কিন্তু এই বীর প্রতীক কোথায় আছেন বা তাঁর কী পরিণতি হয়েছে তা কারো জানা নেই।
অধ্যাপক বিমল কান্তি দে কুড়িগ্রামের রাজীবপুর ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক আবদুস সবুর ফারুকীর সাথে যোগাযোগ করেন। দুজনে মিলে গেজেটের ঠিকানা ধরে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে চষে বেড়াতে শুরু করেন।
অবশেষে ১৯৯৫ সালের শেষের দিকে রাজীবপুরের এক প্রত্যন্ত কাঁচা কুঁড়েঘরে তাঁরা খুঁজে পান ভগ্নস্বাস্থ্যের, যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত, দারিদ্র্যে জর্জরিত সেই বীর প্রতীক তারামন বিবিকে!
ভোরের কাগজের সেই কালজয়ী শিরোনাম
১৯৯৫ সালের ২১ নভেম্বর তৎকালীন জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক ‘ভোরের কাগজ’ এর প্রথম পাতায় প্রধান শিরোনাম হিসেবে ছাপা হয়:
“খুঁজে পাওয়া গেছে বীর প্রতীক তারামন বিবিকে”
এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর সারা দেশে তীব্র আলোড়ন ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়। একজন বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত জাতীয় বীর দুই দশক ধরে চরের কুঁড়েঘরে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন এই খবর দেশের সুশীল সমাজ, মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়।
প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পদক প্রদান
সংবাদ প্রকাশের পর রাষ্ট্র দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। ১৯৯৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর, খেতাব ঘোষণার দীর্ঘ ২২ বছর পর, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে তারামন বিবির হাতে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবের পদক, সনদপত্র ও সম্মাননা তুলে দেন।
পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকার তাঁকে রাজীবপুর উপজেলায় জমি, ঘরবাড়ি এবং রাষ্ট্রীয় ভাতা প্রদান করে তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
রণাঙ্গনের বীর প্রতীক তারামন বিবির জীবনপঞ্জি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সারণী
তারামন বিবি বীর প্রতীকের পুরো জীবন, যুদ্ধের অবদান এবং ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ একনজরে বোঝার জন্য নিচে একটি সংহত ও সমৃদ্ধ তথ্য সারণী দেওয়া হলো:
তথ্যের খাত/বিষয় | বিস্তারিত বিবরণ ও ঐতিহাসিক উপাত্ত |
পূর্ণ নাম ও ডাকনাম | তারাবানু (শৈশবের নাম); পরবর্তীতে মুহিব হাবিলদার প্রদত্ত নাম: তারামন বিবি। |
জন্ম ও স্থান | ১৯৫৭ সন; গ্রাম: শংকর মাধবপুর, ইউনিয়ন: কোদালকাটি, উপজেলা: চর রাজীবপুর, জেলা: কুড়িগ্রাম। |
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের বয়স | মাত্র ১৩ বছর (একাত্তরের অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা)। |
মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ইউনিট | ১১ নম্বর সেক্টর (কুড়িগ্রাম-রৌমারী অঞ্চল); ১০ঘরিয়া ও কোদালকাটি সাব-ক্যাম্প। |
কমান্ডার ও দিকনির্দেশক | সেক্টর কমান্ডার: মেজর আবু তাহের; ক্যাম্প ইনচার্জ/উৎসাহদাতা: বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহিব হাবিলদার। |
রণাঙ্গনে প্রাথমিক দায়িত্ব | মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না করা, সেবা দেওয়া, কাপড় কাচা এবং অস্ত্র পরিষ্কার করা। |
সামরিক ভূমিকাসমূহ | ১. স্কাউট (নজরদার), ২. গোপন স্পাই (ছদ্মবেশী তথ্য সংগ্রাহক), ৩. সম্মুখ সমরের অস্ত্রধারী যোদ্ধা। |
উল্লেখযোগ্য যুদ্ধসমূহ | কোদালকাটি, তারাবর, মোহনগঞ্জ, গাইবান্ধার ফুলছড়ি ও ভেড়ামারি পাক ক্যাম্প আক্রমণ। |
ঐতিহাসিক স্পাইিং অভিযান | ভেড়ামারি পাক ক্যাম্পে গায়ে গোবর-কাদা মেখে 'পাগলী গোবর কুড়ানি' সেজে গোপন তথ্য সংগ্রহ। |
বীরত্বসূচক খেতাব | ‘বীর প্রতীক’ (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৯৭৩ সালে ঘোষিত; গেজেট নং ৪৭৮)। |
বিশেষ একক গৌরব | মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্ত মাত্র ৩ জন নারীর একজন (বাকি দুজন: ডা. সেতারা বেগম ও কাকন বিবি)। |
পুনঃআবিষ্কারের রূপকার | গবেষক অধ্যাপক বিমল কান্তি দে এবং রাজীবপুরের শিক্ষক আবদুস সবুর ফারুকী (১৯৯৫ সাল)। |
আনুষ্ঠানিক পদক গ্রহণ | ১৯ ডিসেম্বর ১৯৯৫ (খেতাব ঘোষণার ২২ বছর পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে পদক গ্রহণ)। |
জীবনাবসান ও সমাধি | ১ ডিসেম্বর ২০১৮ (বয়স: ৬১ বছর); কুড়িগ্রামের রাজীবপুরের কাচারীপাড়া পারিবারিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত। |
বীর প্রতীক তারামন বিবির জীবনের অপ্রকাশিত অধ্যায় ও সংগ্রাম
তারামন বিবির জীবন কেবল ১৯৭১ সালের ৯ মাসের যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ ছিল না; যুদ্ধের আগে, যুদ্ধের সময় এবং বিজয়ের পর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁকে লড়তে হয়েছে প্রকৃতি, রোগ, দারিদ্র্য ও অবহেলার বিরুদ্ধে।
কানের স্থায়ী ক্ষতি ও শারীরিক যন্ত্রণা: রণাঙ্গনে যুদ্ধ চলাকালে কোদালকাটি ও তারাবর এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর ছাঁড়া গোলা ও থ্রি-ইঞ্চি মর্টারের বিকট শব্দে তারামন বিবির কান থেকে রক্তক্ষরণ হয়েছিল। সঠিক চিকিৎসার অভাবে তাঁর এক কানের শ্রবণশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সারাজীবন তিনি এক কানে খুব কম শুনতেন এবং মাথায় তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করতেন।
সন্তান ও পরিবার: যুদ্ধের পর সাধারণ জীবনযাপনের সময় দিনমজুর আব্দুল মজিদের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে:
পুত্র: আবু তাহের (১১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক বীর উত্তম মেজর আবু তাহেরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও স্মৃতি থেকে তারামন বিবি তাঁর ছেলের নাম রাখেন ‘আবু তাহের’)।
কন্যা: মারজিনা বেগম।
সিএমএইচ এ শেষ জীবনের চিকিৎসা: দীর্ঘদিন সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় তাঁর ফুসফুসে মারাত্মক সংক্রমণ (COPD) ও যক্ষ্মা বাসা বাঁধে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তাঁকে রংপুর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (CMH) এবং পরবর্তীতে ঢাকা সিএমএইচ-এ এনে উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা তাঁর ফুসফুসে একাত্তরের স্মারক হিসেবে অতিরিক্ত ধোঁয়া ও বারুদের আক্রমণের প্রভাব দেখতে পেয়েছিলেন।
১১ নম্বর সেক্টর ও রৌমারী 'মুক্তাঞ্চল'-এর বিশেষ সামরিক তাৎপর্য
তারামন বিবি যে ১১ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছিলেন, সেই সেক্টরের ভৌগোলিক ও সামরিক গুরুত্ব ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
রৌমারী কেন কখনো পরাধীন হয়নি?
মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে বাংলাদেশের প্রায় সব শহর ও প্রশাসনিক কেন্দ্র পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে চলে গেলেও কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজীবপুর অঞ্চল ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।
১. ভৌগোলিক বাধা: ব্রহ্মপুত্র নদ এবং দুর্গম চরাঞ্চল অতিক্রম করে রৌমারীতে আক্রমণ চালানো পাকিস্তানি ভারী ট্যাংক বা সাঁজোয়া যানের পক্ষে অসম্ভব ছিল।
২. জনগণের দুর্গ: তৎকালীন সেক্টর কমান্ডার মেজর আবু তাহের সাধারণ চরের মানুষ, কৃষক, মজুর ও যুবকদের নিয়ে এক অজেয় প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরি করেছিলেন।
৩. অস্থায়ী কার্যক্রম: রৌমারী মুক্তাঞ্চল থেকেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবর প্রচার, অস্ত্র প্রশিক্ষণ, শরণার্থী ক্যাম্প পরিচালনা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত রিক্রুটমেন্ট চলত।
তারামন বিবি এই ঐতিহাসিক মুক্তাঞ্চলেরই সন্তান ছিলেন, যা তাঁকে মানসিকভাবে শুরু থেকেই অদম্য ও স্বাধীনচেতা করে তুলেছিল।
মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্ত অন্য দুই নারী মুক্তিযোদ্ধা
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য রাষ্ট্রীয় খেতাব (বীর প্রতীক) পেয়েছেন মোট ৩ জন নারী। তারামন বিবি ছাড়া বাকি দুজন বীর নারীর ইতিহাসও সমান রোমাঞ্চকর ও গৌরবময়:
ডা. সেতারা বেগম (বীর প্রতীক)
সেক্টর: ২ নম্বর সেক্টর (অধিনায়ক: মেজর খালেদ মোশাররফ ও পরবর্তীতে মেজর এ.টি.এম হায়দার)।
অবদান: ডা. সেতারা বেগম ছিলেন একজন সামরিক ডাক্তার (ক্যাপ্টেন)। তিনি ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে ভারতের ত্রিপুরার বিশ্রামগঞ্জে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ হাসপাতাল’-এর কমান্ডিং অফিসার ছিলেন।
সংগ্রাম: যুদ্ধক্ষেত্রে গুলিবিদ্ধ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারানো ও গুরুতর আহত শত শত মুক্তিযোদ্ধাকে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন তিনি। পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর চরম সংকটের মধ্যেও তিনি রাতদিন অপারেশন থিয়েটারে চিকিৎসা দিয়ে হাজারও মুক্তিযোদ্ধার প্রাণ বাঁচিয়েছেন।
কাকন বিবি (বীর প্রতীক)
সেক্টর: ৫ নম্বর সেক্টর (অধিনায়ক: মেজর মীর শওকত আলী)।
পটভূমি: কাকন বিবি ছিলেন সিলেট অঞ্চলের খাসিয়া সম্প্রদায়ের এক অদম্য নারী।
অবদান: তিনি ৫ নম্বর সেক্টরের দোয়ারাবাজার, টেংরাটিলা ও ছাতক এলাকায় ছদ্মবেশে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে ঢুকে তথ্য সংগ্রহ করতেন।
নির্যাতন ও প্রত্যাবর্তন: একবার তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে ধরা পড়েন। তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে মৃত মনে করে নদীর পাড়ে ফেলে রাখা হয়। কিন্তু অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরে এসে তিনি পুনরায় অস্ত্র হাতে তুলে নেন এবং সরাসরি সম্মুখ সমরে অংশ নেন।
ছদ্মবেশ, সশস্ত্র যুদ্ধ ও অপ্রকাশিত নারী মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান
মুক্তিযুদ্ধে কেবল এই তিন খেতাবপ্রাপ্ত নারীই নন, আরও বহু নারী সরাসরি অস্ত্র হাতে ও ছদ্মবেশে যুদ্ধ করেছেন, যাঁদের অনেকের নাম ইতিহাসের মূলধারায় কম উচ্চারিত হয়:
পুরুষ সেজে পাবনার রণাঙ্গনে শিরিন বানু মিতিল: ১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে পাবনায় যখন প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়, তখন তৎকালীন ছাত্রী শিরিন বানু মিতিল পুরুষদের পোশাক (শার্ট ও প্যান্ট) পরে, মাথায় টুপি দিয়ে পুরুষের ছদ্মবেশে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল নিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়েন। পাবনা পুলিশ লাইন ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ শত্রুমুক্ত করার লড়াইয়ে তিনি সরাসরি অংশ নেন।
পিরোজপুরের করুণা বেগম: পিরোজপুরের চরাঞ্চলে করুণা বেগম ছিলেন এক ত্রাস। নিজ হাতে এলএমজি (LMG) ও রাইফেল চালিয়ে তিনি পাক বাহিনীর একাধিক গানবোট আক্রমণ ভণ্ডুল করে দেন। তিনি স্থানীয় নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করেছিলেন।
ঐতিহাসিক ‘গোবরা ক্যাম্প’ (Gobra Camp): কলকাতা ও ত্রিপুরা সীমান্তে নারীদের জন্য আলাদা সামরিক ও সেবামূলক ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়েছিল, যার নাম ছিল ‘গোবরা ক্যাম্প’। এখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের প্রায় ৩,০০০ তরুণী ও নারী অংশগ্রহণ করেন।
তাঁদেরকে এনফিল্ড রাইফেল চালানো, হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ, ফার্স্ট এইড (প্রাথমিক চিকিৎসা) এবং ম্যাপ রিডিংয়ের ওপর কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।
অপ্রত্যক্ষ ও অনানুষ্ঠানিক প্রতিরোধ: শাড়ির ভাঁজে গ্রেনেড ও গোপন নেটওয়ার্ক
রণাঙ্গনে সরাসরি যুদ্ধ করার পাশাপাশি কোটি কোটি বাঙালি নারী একাত্তরে যে মনস্তাত্ত্বিক ও গোপন প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তা না থাকলে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে গেরিলা যুদ্ধে জয়ী হওয়া অসম্ভব ছিল।
শাড়ির নিচে গ্রেনেড ও বিস্ফোরক পাচার: ঢাকা শহরের ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ (Crack Platoon) এর বীর মুক্তিযোদ্ধারা যখন ঢাকার ভেতরে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও পেট্রোল পাম্পে বোমাহামলা চালাতেন, তখন তাঁদের অস্ত্র ও প্লাস্টিক বিস্ফোরক (C-4) এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দিতেন নারীরা।
পাকিস্তানি সৈন্যরা রাস্তার চেকে পুরুষদের জামাকাপড় খুলে তল্লাশি করত, কিন্তু নারীদের বোরকা বা শাড়ির তল্লাশি তুলনামূলক কম হতো। এই সুযোগে নারীরা পেটিকোটের ভেতরে, শাড়ির ভাঁজে বা সবজির ঝুড়ির নিচে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল ও স্টেনগানের গুলি এবং গ্রেনেড লুকিয়ে পৌঁছে দিতেন।
আশ্রয়দাত্রী মা ও বোনেরা: ঢাকাসহ সারা দেশে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে বহু পরিবারকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। তবুও কবি সুফিয়া কামাল, আসমা আব্বাসীসহ হাজার হাজার বাঙালি নারী নিজেদের বাড়িকে গেরিলা যোদ্ধাদের হাইডআউট (Hideout) বা গোপন আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছেন। রান্না করে খাইয়েছেন এবং পাহারা দিয়েছেন।
বীরাঙ্গনা বনাম বীর প্রতীক: দৃষ্টিভঙ্গির ঐতিহাসিক পরিবর্তন
মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশে নারীদের ভূমিকা দেখার ক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এক বিশাল বৈষম্য তৈরি হয়েছিল, যা গত দুই দশকে গবেষকদের প্রচেষ্টায় পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে।
১. ১৯৭২ সালের 'বীরাঙ্গনা' উপাধি: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে নির্যাতিত নারীদের সামাজিকভাবে সম্মানিত করতে ‘বীরাঙ্গনা’ (বীর নারী) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। কিন্তু সামাজিকভাবে এই নারীদের অনেকেই পরবর্তীতে অবহেলা ও লাঞ্ছনার শিকার হন।
২. যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি: গবেষকদের মতে, নারীরা কেবল নির্যাতনের শিকার (Victim) ছিলেন না, তারা ছিলেন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ 'সংগ্রামী কারিগর'। তারামন বিবি, কাকন বিবিদের মতো চরিত্রগুলো প্রমাণ করে যে, সুযোগ পেলে বাঙালি নারী রাইফেল হাতে শত্রুর বুক ঝাঁঝরা করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
প্রয়াণ ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা: বিজয়ের মাসের প্রথম প্রহরে মহাপ্রয়াণ
দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা (COPD), যক্ষ্মা, ডায়াবেটিস ও কানের যন্ত্রণায় ভোগার পর, ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর রাত ১টা ৩০ মিনিটে কুড়িগ্রামের রাজীবপুর কাচারীপাড়ায় নিজের বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বীর প্রতীক তারামন বিবি।
যে বিজয়ের মাসের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশ মুক্ত হওয়ার উৎসবে মেতে ওঠে, ঠিক সেই ১ ডিসেম্বরের প্রথম প্রহরেই বিদায় নেন বিজয়ের এই বীর কাণ্ডারী।
জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ পুলিশ এবং স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতিতে তাঁকে দেওয়া হয় পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা (Guard of Honour)। এরপর রাজীবপুর কাচারীপাড়া জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
তরুণ প্রজন্মের জন্য তারামন বিবির শিক্ষার দ্যুতি
বীর প্রতীক তারামন বিবির মহাকাব্যিক জীবন কেবল অতীত ইতিহাসের কোনো গল্প নয়; এটি আজকের এবং অনাগত ভবিষ্যতের স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য এক শাশ্বত প্রেরণার উৎস। তাঁর জীবন থেকে আমরা কয়েকটি মৌলিক শিক্ষা পাই:
দেশপ্রেমের কোনো নির্দিষ্ট বয়স বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাগে না: তারামন বিবি ছিলেন নিরক্ষর, গ্রামের এক অতি দরিদ্র ঘরের বালিকা। কোনো সামরিক একাডেমির ডিগ্রি তাঁর ছিল না, ছিল না কোনো আধুনিক সামরিক ট্রেনিং। কিন্তু তাঁর ছিল একটি হৃদয় যে হৃদয়ে ছিল দেশের প্রতি অগাধ ও শর্তহীন ভালোবাসা। তিনি প্রমাণ করেছেন, দেশকে ভালোবাসতে কোনো বড় ডিগ্রি বা বয়সের প্রয়োজন হয় না।
মুক্তিযুদ্ধে নারীর বীরত্বের নতুন মাত্রা: দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ইতিহাসচর্চায় নারীকে কেবল ‘নির্যাতিতা’ বা ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবেই সীমাবদ্ধ রাখার একটি প্রবণতা ছিল। কিন্তু তারামন বিবি, কাকন বিবি ও ডা. সেতারা বেগমদের মতো নারীরা প্রমাণ করেছেন যে, বাঙালি নারীরা কেবল নির্যাতন সহ্য করেননি প্রয়োজনে তারা কাদার ছদ্মবেশে স্পাই হয়েছেন, সুপারি গাছে উঠে স্কাউটিং করেছেন এবং শত্রুর বুক লক্ষ্য করে স্টেনগান ও রাইফেল চালিয়েছেন।
প্রান্তিক মানুষের ত্যাগের মূল্যায়ন: বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো নির্দিষ্ট এলিট শ্রেণী বা কেবল শহরকেন্দ্রিক আন্দোলনের ফসল নয়। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ভেসে যাওয়া কুড়িগ্রামের দুর্গম চরের অতি সাধারণ মানুষ, কৃষক, মজুর ও কিশোরীমেয়েরা জীবন বাজি রেখেছিলেন বলেই আজ আমরা স্বাধীন মানচিত্র পেয়েছি। প্রান্তিক মানুষদের এই অবদানের কথা আমাদের সবসময় সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ রাখতে হবে।
উপসংহার
বীর প্রতীক তারামন বিবি কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে অংশ নেওয়া কোটি কোটি সাধারণ বাঙালি নারীর সাহসিকতা, ত্যাগ ও অদম্য লড়াইয়ের এক রক্তিম প্রতীক।
১৩ বছরের এক কিশোরী মেয়ে, যে কাদার আড়ালে নিজের রূপ লুকিয়ে শত্রুর বাঙ্কারে ঢুকেছিল, যে সুপারি গাছের উঁচু থেকে দেশকে পাহারা দিয়েছিল, আর যে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল হাতে শত্রুর দিকে গুলি ছুড়েছিল তাঁর ঋণ এই বাংলাদেশ কোনোদিন শোধ করতে পারবে না।
২৪ বছরের বিস্মৃতি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হতে পারে, কিন্তু ১৯৯৫ সালে তাঁর পুনঃআবিষ্কার এবং ২০১৮ সালে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর প্রস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয় বীরদের কখনো মৃত্যু হয় না। ইতিহাস সাময়িকভাবে তাঁদের ভুলে যেতে পারে, কিন্তু সময় ঠিকই তাঁদের মাথার মুকুট ফিরিয়ে দেয়।
আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে, যখনই আমরা লাল-সবুজের পতাকার দিকে তাকাব, তখনই যেন আমাদের মনে পড়ে কুড়িগ্রামের চরের সেই ১৩ বছরের কিশোরী তারাবানুর কথা যার বুকের রক্ত ও ঘামে কেনা হয়েছে এই বাংলাদেশ। বীর প্রতীক তারামন বিবি অমর হয়ে থাকবেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে, শতবর্ষ থেকে সহস্রাব্দ জুড়ে!















