রক্তের দামে স্বাধীনতা – যে সন্তান যুদ্ধাপরাধী পিতাকে ক্ষমা করেনি
“আব্বা, আপনে এই কাজ করলেন! আপনে পাকিস্তানরে ভালোবাসেন, তাই বইলা আমগো একটা বোনরে ওগো হাতে তুইলা দিতেন!” একজন মুক্তিযোদ্ধা তার দেশের প্রতি, তার বোনের প্রতি হওয়া পাশবিক নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে দ্বিধা করেননি। আর সেই পাশবিকতার হোতা যখন হয় তার নিজের জন্মদাতা পিতা।

TruthBangla

“আব্বা, আপনে এই কাজ করলেন! আপনে পাকিস্তানরে ভালোবাসেন, তাই বইলা আমগো একটা বোনরে ওগো হাতে তুইলা দিতেন!”
মুক্তিযুদ্ধ কেবল সম্মুখ সমর, অস্ত্র আর গোলাবারুদের গল্প নয়। এটি ছিল চরম নৈতিকতার পরীক্ষা, যেখানে দেশপ্রেমের কাছে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, এমনকি রক্তের বাঁধনও তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আমাদের পূর্বপুরুষদের ত্যাগের যে অগণিত গাথা রয়েছে, তার মধ্যে কিছু ঘটনা এতই তীব্র যে তা আজও আমাদের হৃদয়ে কাঁপন ধরায়। এটি এমনই এক উপাখ্যান - যখন একজন মুক্তিযোদ্ধা তার দেশের প্রতি, তার বোনের প্রতি হওয়া পাশবিক নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে দ্বিধা করেননি। আর সেই পাশবিকতার হোতা যখন হয় তার নিজের জন্মদাতা পিতা, তখন সেই ত্যাগের মূল্যমান ইতিহাসের সব হিসাবকে ছাড়িয়ে যায়।
এই লেখাটি সালেহ খোকনের 'মুক্তিযুদ্ধ অবিনাশী ঘটনামালা' থেকে নেওয়া এক সত্য ঘটনা, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই বাংলাদেশ আমরা কী দিয়ে কিনেছি।
একাত্তরের নৈতিক পরীক্ষা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল ধর্ম, দেশ ও মানবতার পক্ষে-বিপক্ষের এক বিশাল নৈতিক বিভাজন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন ধর্মের নামে গণহত্যা ও নারী নির্যাতনকে বৈধতা দিচ্ছিল, তখন তাদের দোসররা যাদের অনেকে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিল ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও আদর্শিক অন্ধত্বের কারণে নিজের জাতির সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। এই বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছিলেন লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ।
মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির এবং সহযোদ্ধা নুরুজ্জামানের ঘটনাটি সেই ট্র্যাজেডি এবং প্রতিশোধের এক মর্মস্পর্শী দলিল, যেখানে দেশপ্রেমের কাছে পারিবারিক সম্পর্কও পরাজিত হয়।
রণাঙ্গনের এক সৈনিক - মোহাম্মদ হুমায়ুন কবিরের পটভূমি
মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির ছিলেন সেই প্রজন্মের একজন, যিনি দেশমাতৃকার আহ্বানে জীবন বাজি রেখেছিলেন। তাঁর প্রাথমিক পরিচয় ছিল ফোর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের আলফা কোম্পানিতে। তাঁর বাড়ি ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার বাউতলা গ্রামে।
টেন বেঙ্গলে যোগ দেওয়া
যুদ্ধের এক পর্যায়ে, টেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অনেক সেনা শহীদ হলে ফোর বেঙ্গল থেকে হুমায়ুনসহ ৪-৫টি কোম্পানিকে টেন বেঙ্গলে যুক্ত করা হয়। এখানে হুমায়ুন 'সি' অর্থাৎ চার্লি কোম্পানিতে তাঁর দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।
ছাগলনাইয়া আক্রমণের প্রস্তুতি
মুক্তিযোদ্ধাদের একের পর এক সফল অপারেশনে ছাগলনাইয়া থানায় পাকিস্তানিদের ডিফেন্স দখল করার নির্দেশ আসে। এই গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয় হুমায়ুনের সি কোম্পানিকে।
মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির সেই অপারেশনের বর্ণনা দেন এভাবে, "আমরা প্রথমে রেইকি করি। এক রাতে থানার ৫০০ গজের ভেতরে পজিশন নিই। টের পেয়ে পাকিস্তানি সেনারা গুলি ছুঁড়তে থাকে।"
সেই রাতে প্রকৃতির সহায়তা যেন মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে এসেছিল। হুমায়ুন কবিরের বর্ণনায়: "রাত তখন তিনটা। বৃষ্টিও শেষ, শত্রুর বাঙ্কার থেকে গুলি আসাও বন্ধ... ক্যাপ্টেন দিদার বললেন, 'চার্জ'। আমরা দৌড়ে ওদের বাঙ্কারগুলোতে গিয়ে দেখি গলা-সমান পানি। ওরা সব পালিয়েছে। একাত্তরে এভাবেই বৃষ্টি দিয়ে আল্লাহ আমাদের সহায়তা করেছেন।"
বাঙ্কারের কান্না - এক বীরাঙ্গনার মর্মান্তিক সাক্ষ্য
বাঙ্কার দখলের পর হুমায়ুন কবিরের অভিজ্ঞতা মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং মানবতার চরম বিপর্যয়কে তুলে ধরে।
পুকুর পাড়ের একটি বাঙ্কারে পানি ঢোকেনি। শত্রু আছে ভেবে হুমায়ুন যখন বেয়নেট ফিক্সড করে চার্জ করতে এগোচ্ছিলেন, তখন ভেতর থেকে এক নারী বেরিয়ে এসে তাঁকে জাপটে ধরেন। তাঁর পরনে ছিল রক্তে ভেজা ব্লাউজ আর পেটিকোট।
নারীটি প্রথমে হুমায়ুনকে ইন্ডিয়ান আর্মি ভেবেছিলেন এবং আকুতি করে বলেছিলেন, “মুজে একটা গুলি কর।”
হুমায়ুন যখন বললেন, "বোন, আমি মুক্তিবাহিনী," তখন সেই নারী তাঁকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাঁর আকুতি ছিল: “এরে মুক্তিবাহিনী, তোর আল্লার দোহাই লাগে, আঁরে এউগ্গা গুলি করি দে। তোর শেখ মুজিবের দোহাই লাগে, আঁরে এউগ্গা গুলি করি দে।”
হুমায়ুন সেই নারীকে ক্যাপ্টেন দিদার সাহেবের কাছে নিয়ে যান। সেখানেই উন্মোচিত হয় এক বীভৎস কাহিনি।
তিনি ছিলেন একজন সামরিক অফিসারের স্ত্রী, কিন্তু তাঁর স্বামী তখন কোথায় আছেন, তা তিনি জানতেন না।
তাঁর দুই ছেলেকে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান নিজে পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিয়েছে। ছেলে দুটোকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মায়ের চোখের সামনেই হত্যা করা হয়।
এরপর সেই চেয়ারম্যান তাঁকে পাকিস্তানিদের বাঙ্কারে দিয়ে আসে। সেখানে প্রতিদিন পাকিস্তানি সেনারা তাঁর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে। এই অমানুষিক নির্যাতনের ফলস্বরূপ তিনি আর বেঁচে থাকতে চাননি। আকুতি জানিয়ে বললেন, “আই সিপাহির বউ, স্যার। আন্নে আঁরে গুলি করি দেইন।”
ঘৃণার আগুন - যুদ্ধাপরাধীর মুখোশ উন্মোচন
বীরাঙ্গনা বোনের কথা শুনে মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে জল, আর শরীরে ঘৃণার রক্ত টলমল করে ওঠে। ক্যাপ্টেন দিদার স্থির থাকতে না পেরে সেই জঘন্য অপরাধের হোতাকে ধরে আনার নির্দেশ দেন।
আটজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে সেই বীরাঙ্গনা বোনকে নিয়ে হুমায়ুন কবির রওনা হলেন ছাগলনাইয়ার বেলতলী গ্রামে।
গ্রামটিতে ছিল বিশাল এক বাড়ি। "বড় বড় ছয়টা ঘর। উঠানে বহু নারকেল গাছ, গোয়ালে অনেক গরু।" পিস কমিটির চেয়ারম্যানের বাড়ি যেন জমিদার বাড়ি।
চেয়ারম্যানের খোঁজে বাড়িতে ঢুকে তাঁকে খাটের নিচ থেকে টেনে বের করতেই মুক্তিযোদ্ধারা অবাক হলেন। সেই বীরাঙ্গনার বর্ণনা আর এই লোকটির চেহারা দেখে বিশ্বাস করার উপায় নেই যে, সে এমন জঘন্য অপরাধ করতে পারে। “ইয়া বড় দাড়ি, নুরানি চেহারা, গায়ে বড় জুব্বা, মাথায় টুপি, হাতে তসবিহ।”
মহিলাটি তখনো স্থির ছিলেন। তিনি আঙুল নির্দেশ করে বললেন, “ইজ্জাই চেয়ারম্যান”।
চেয়ারম্যানকে উঠানে একটা নারকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হলো। বন্দুক তার দিকে তাক করা। হঠাৎ পেছন থেকে একজন দৌড়ে এসে বললেন, “রাখেন ভাই। আমার বাপ। আমি মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধা।”
পুত্রের স্টেনগান - রক্তের বাঁধন ছিন্ন
সেই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন ওই এলাকার গেরিলা, যাঁর নাম নুরুজ্জামান। নিয়তির চরম পরিহাসে, জঘন্যতম যুদ্ধাপরাধী লোকটি ছিল তাঁরই জন্মদাতা পিতা। শুধু তাই নয়, নুরুজ্জামান ওই বীরাঙ্গনার স্বামীর বন্ধুও ছিলেন।
নুরুজ্জামান যখন পরিস্থিতি বুঝতে পারলেন, সেই নারী কান্নাজড়ানো কণ্ঠে তাঁর কাছে ছুটে যান এবং অভিযোগ করেন:
“নুরুজ্জামান, তুই এক্কানি চা। আঁর পেটিকোটে রক্তের দিক এক্কানি চা। আজ দশ দিন আমি বাঙ্কারে। তোর আব্বা আঁরে ওগো হাতে তুলি দিছে। আঁর পোলা দুইডারেও ওরা মারছে। তুই আঁরে এউগ্গা গুলি করি দে। আঁর কোনো দাবি থাইকত ন’।”
এই অভিযোগ ছিল কোনো ব্যক্তিগত রাগ নয়, এটি ছিল মানবতার বিরুদ্ধে করা জঘন্যতম অপরাধের বিরুদ্ধে একজন অসহায় নারীর চূড়ান্ত আরজি।
নুরুজ্জামানের হাতেই ছিল স্টেনগানটি। ওই নারীর কথায় তাঁর শরীর কাঁপছিল। সব শুনে তিনি শুধু বললেন:
“আব্বা, আপনে এই কাজ করলেন! আপনে পাকিস্তানরে ভালোবাসেন, তাই বইলা আমগো একটা বোনরে ওগো হাতে তুইলা দিতেন!”
শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের মুখে কোনো উত্তর নেই। তাঁর নুরানি চেহারা ও জুব্বা তখন চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক। রক্তের বাঁধন ছিন্ন করে, দেশের প্রতি এবং নির্যাতিত বোনের প্রতি নিজের দায়িত্ববোধকে ঊর্ধ্বে স্থান দিলেন নুরুজ্জামান।
চোখের নিমিষে নুরুজ্জামান স্টেনগানের ট্রিগার চেপে ধরেন। চেয়ারম্যানের বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায়। যুদ্ধাপরাধী পিতার রক্তেই ভিজে গিয়েছিল সেই মুক্তিযোদ্ধার মুখটি।
এই ঘটনা ছিল নুরুজ্জামানের ব্যক্তিগত জীবনের চরম আত্মত্যাগ। তিনি প্রমাণ করলেন, দেশপ্রেম ও ন্যায়বিচার সকল পারিবারিক বন্ধন ও ব্যক্তিগত ভালোবাসার ঊর্ধ্বে।
স্বাধীনতা, দায় এবং মূল্যবোধের শিক্ষা
এই হৃদয় বিদারক উপাখ্যানটি আমাদের তিনটি মৌলিক শিক্ষা দেয়:
স্বাধীনতার মূল্য: এই বাংলাদেশ আমরা কত সহজে পাইনি। এর পেছনে রয়েছে কেবল শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ নয়, বরং পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক বন্ধন ছিন্ন করার মতো চরম আত্মত্যাগ। নুরুজ্জামানের মতো বীরেরা যুদ্ধাপরাধী পিতাকেও ক্ষমা করেননি।
বিশ্বাসঘাতকতার স্বরূপ: মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা দেশ ও জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তারা প্রায়শই ছিল সমাজের প্রভাবশালী অংশ, যারা ধর্মীয় পোশাক ও ছদ্মবেশের আড়ালে জঘন্যতম অপরাধ করত।
বীরাঙ্গনাদের ঋণ: মুক্তিযুদ্ধে বীরাঙ্গনাদের ত্যাগ ছিল দেশের প্রতি সবচেয়ে বড় ঋণগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাঁদের উপর করা পাশবিক নির্যাতনের প্রতিশোধ নেওয়া ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নৈতিক দায়িত্ব।
এইরকম অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার দেশপ্রেম, নৈতিক দৃঢ়তা এবং চূড়ান্ত ত্যাগের কারণেই আমরা স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছি। এই ইতিহাসকে ভুলে যাওয়া বা বিকৃত করা সেই বীর শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতারই নামান্তর। আমাদের প্রজন্মকে এই গল্পগুলো মনে রাখতে হবে, যাতে আমরা জানতে পারি—মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের ক্ষুদ্র একটি নমুনা হলেও এর মূল্য ছিল আকাশচুম্বী।














