>

>

রক্তের দামে স্বাধীনতা – একাত্তরের রণাঙ্গনে যে সন্তান যুদ্ধাপরাধী পিতাকে ক্ষমা করেনি

রক্তের দামে স্বাধীনতা – একাত্তরের রণাঙ্গনে যে সন্তান যুদ্ধাপরাধী পিতাকে ক্ষমা করেনি

“আব্বা, আপনে এই কাজ করলেন! আপনে পাকিস্তানরে ভালোবাসেন, তাই বইলা আমগো একটা বোনরে ওগো হাতে তুইলা দিতেন!” ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে রক্ত দিয়েছেন, তার গাণিতিক হিসাব হয়তো ইতিহাসে লেখা আছে। কিন্তু যে মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক মূল্য তাঁরা চুকিয়েছেন, তার পরিমাপ কোনো পার্থিব স্কেলে সম্ভব নয়। দেশের প্রতি ভালোবাসা যখন নিজের রক্তের বাঁধন, পারিবারিক মায়া এবং আত্মজাত সম্পর্কের চেয়েও ঊর্ধ্বে উঠে যায়, তখন জন্ম নেয় ইতিহাস কাঁপানো সব উপাখ্যান।

TruthBangla

রক্তের দামে স্বাধীনতা – একাত্তরের রণাঙ্গনে যে সন্তান যুদ্ধাপরাধী পিতাকে ক্ষমা করেনি

“আব্বা, আপনে এই কাজ করলেন! আপনে পাকিস্তানরে ভালোবাসেন, তাই বইলা আমগো একটা বোনরে ওগো হাতে তুইলা দিতেন!”

মুক্তিযুদ্ধ কেবল দুটি সামরিক বাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষ, ক্যানন বা আর্টিলারির বিকট গর্জনের গল্প নয়; মুক্তিযুদ্ধ ছিল মানুষের নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং ন্যায়বিচারের এক মহাসমুদ্রসম পরীক্ষা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে রক্ত দিয়েছেন, তার গাণিতিক হিসাব হয়তো ইতিহাসে লেখা আছে। কিন্তু যে মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক মূল্য তাঁরা চুকিয়েছেন, তার পরিমাপ কোনো পার্থিব স্কেলে সম্ভব নয়।

দেশের প্রতি ভালোবাসা যখন নিজের রক্তের বাঁধন, পারিবারিক মায়া এবং আত্মজাত সম্পর্কের চেয়েও ঊর্ধ্বে উঠে যায়, তখন জন্ম নেয় ইতিহাস কাঁপানো সব উপাখ্যান। এমনই এক অবিশ্বাস্য ও হৃদয়বিদারক সত্য ঘটনা সংরক্ষিত রয়েছে বিশিষ্ট গবেষক সালেহ খোকনের ‘মুক্তিযুদ্ধ অবিনাশী ঘটনামালা’ গ্রন্থে। যেখানে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তাঁর দেশের প্রতি, তাঁর সম্ভ্রমহারা বোনের প্রতি হওয়া অমানুষিক নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে বিন্দুমাত্র ইতস্তত করেননি যদিও সেই জঘন্য অপরাধের প্রধান হোতা ছিলেন তাঁরই জন্মদাতা পিতা!

এই নিবন্ধে আমরা কেবল একটি অপারেশন বা একটি বিচারকাজের গল্প বলব না; বরং বিশ্লেষণ করব একাত্তরের সেই কঠিন মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট, যেখানে পিতৃস্নেহ হেরে গিয়েছিল দেশপ্রেমের কাছে, আর ধর্মীয় ছদ্মবেশের আড়ালে উন্মোচিত হয়েছিল নরপশুদের আসল চেহারা।

একাত্তরের পরীক্ষা ও দ্বিজাতিতত্ত্বের আড়ালে চরম বিশ্বাসঘাতকতা

১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর এই নয়টি মাস তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান পরিণত হয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নির্যাতন কেন্দ্রে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন ধর্মের দোহাই দিয়ে এবং ‘পাক সারজমিন’ রক্ষার নামে বাঙালির ওপর নির্বিচারে গণহত্যা, লুটপাট ও নারী নির্যাতন চালাচ্ছিল, তখন তাদের সহযোগী হিসেবে দাঁড়িয়েছিল এদেশীয় কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক পরাশক্তি।

ধর্মীয় ছদ্মবেশ ও সুবিধাবাদী মানসিকতা: একাত্তরের ঘাতক ও শান্তি কমিটির নেতারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমাজে বেশ প্রভাবশালী ছিল। তাদের মুখে থাকত ধর্মের বুলি, গায়ে জড়ানো থাকত টুপি, জুব্বা আর হাতে তসবিহ। কিন্তু এই বাহ্যিক ধার্মিকতার আবডালে লুকিয়ে ছিল চরম পশুবৃত্তি ও বিশ্বাসঘাতকতা।

তারা একদিকে স্থানীয় সাধারণ মানুষকে ইসলামের রক্ষার দোহাই দিত, অন্যদিকে পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের মনোরঞ্জনের জন্য অবলীলায় তুলে দিত বাঙালি মা-বোনদের।নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা, প্রতিবেশীর ভিটেমাটি দখল করা কিংবা পাকিস্তানি কর্তাদের নজর কাড়ার জন্য তারা নিজের গ্রামের, নিজের চেনা মানুষদের ওপর চালিয়েছে অকথ্য বর্বরতা।

এই নৈতিক চরম পতনের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন হাজার হাজার তরুণ মুক্তিযোদ্ধা, যাঁদের কাছে দেশের স্বাধীনতা এবং নির্যাতিত মা-বোনের সম্মান রক্ষা করার চেয়ে বড় কোনো ধর্ম ছিল না।

রণাঙ্গনের বীর সৈনিক: মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির ও ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট

এই মহাকাব্যিক কাহিনীর অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী ও কারিগর হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির। তাঁর বীরত্বগাথা ও সামরিক জীবনের পটভূমি একাত্তরের নিয়মিত বাহিনীর কঠিন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পুনর্গঠন ও 'কে-ফোর্স'

১৯৭১ সালে মেজর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে গঠিত হয় 'কে-ফোর্স' (K-Force)। এই ফোর্সের অন্যতম পরাক্রমশালী ইউনিট ছিল ৪র্থ ও ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট।

১. মৃত্যুঞ্জয়ী ৪র্থ বেঙ্গল: মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু একের পর এক সম্মুখ সমরে বহু সৈনিক শহীদ ও আহত হন।

২. ১০ম বেঙ্গলের জন্ম: যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে ১ম, ৩য়, ৪র্থ ও ৮ম বেঙ্গলের অবশিষ্ট সৈনিকদের সমন্বয়ে নতুন করে ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (Ten Bengal) গঠন করা হয়।

৩. হুমায়ুন কবিরের সংযুক্তি: ৪্থ বেঙ্গলের আলফা (A) কোম্পানি থেকে হুমায়ুন কবির সহ একদল অভিজ্ঞ সৈনিককে ১০ম বেঙ্গলের ‘চার্লি’ (C) কোম্পানিতে স্থানান্তর করা হয়। এই চার্লি কোম্পানিকেই পরবর্তীতে দেওয়া হয়েছিল ফেনীর ছাগলনাইয়া থানা মুক্ত করার কঠিনতম দায়িত্ব।

ছাগলনাইয়া আক্রমণের রুদ্ধশ্বাস সময়চিত্র: বৃষ্টি, কাদা ও বাঙ্কার দখল

১৯৭১ সালের শেষভাগে, যৌথ ও যৌথ-মুক্তিবাহিনীর চতুর্মুখী আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতিরক্ষা দুর্গগুলো একে একে ভেঙে পড়ছিল। ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানা ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি অত্যন্ত শক্ত ঘাঁটি। এখান থেকে তারা আশেপাশে ব্যাপক নির্যাতন চালাত এবং ভারত সীমান্তমুখী গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করত।

রেইকি ও ৫০০ গজের ভয়াবহ অবস্থান: ছাগলনাইয়া আক্রমণের পূর্বপ্রস্তুতি সম্পর্কে মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবির বলেন,

"আমরা প্রথমে পুরো এলাকা রেইকি করি। চরম ঝুঁকি নিয়ে এক রাতে ছাগলনাইয়া থানার মাত্র ৫০০ গজের ভেতরে গিয়ে অবস্থান নিই। শত্রুরা আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে অবিরাম মেশিনগান ও থ্রি-ইঞ্চি মর্টারের গুলি ছুড়তে থাকে। আমাদের মাথার ওপর দিয়ে আগুনের গোলা যাচ্ছিল।"

প্রকৃতির অদৃশ্য সহায়তা: পাক বাহিনীর ভারী গোলাবর্ষণের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন। কিন্তু রাত ৩টার দিকে অলৌকিকভাবে আবহাওয়া বদলে যায়। আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি নামল। এই বৃষ্টি পাকিস্তানি সৈন্যদের বাঙ্কারগুলোকে প্লাবিত করে দেয়।

বৃষ্টির শব্দের কারণে এবং পানি উঠে যাওয়ার ফলে শত্রুর বাঙ্কার থেকে গুলি আসা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। ১০ম বেঙ্গলের সি কোম্পানির অধিনায়ক ক্যাপ্টেন দিদার চিৎকার করে নির্দেশ দিলেন: "চার্জ!"

বীর মুক্তিযোদ্ধারা বেয়োনেট ফিক্সড করে দৌড়ে শত্রুর বাঙ্কারে গিয়ে পৌঁছান। গিয়ে দেখেন বাঙ্কারগুলো গলা-সমান পানিতে ডুবে গেছে এবং নিশ্চিত মৃত্যু নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্র ফেলে অন্ধকার রাতে পালিয়ে গেছে। একাত্তরে এভাবেই অনেক সময় প্রকৃতি ও স্রষ্টার অদৃশ্য হাত সাহায্য করেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের।

রক্তের দামে স্বাধীনতা – একাত্তরের রণাঙ্গনে যে সন্তান যুদ্ধাপরাধী পিতাকে ক্ষমা করেনি

বাঙ্কারে এক বীরাঙ্গনা বোনের মর্মান্তিক সাক্ষ্য

ছাগলনাইয়া থানা দখল হলেও আসল ট্র্যাজেডি অপেক্ষা করছিল থানা ভবনের পেছনের এক পুকুরপাড়ের বাঙ্কারে। যে বাঙ্কারটি উঁচু জায়গায় থাকার কারণে সেখানে পানি ঢোকেনি।

বীরাঙ্গনার আকুতি: হুমায়ুন কবির যখন বাঙ্কারের দরজায় বেয়োনেট উঁচু করে সতর্কভাবে প্রবেশ করছিলেন, তখন ভেতরের অন্ধকার থেকে এক নারী সহসা বেরিয়ে এসে তাঁকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরেন। সেই দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখা কঠিন ছিল।

নারীটির পরনে ছিল রক্ত ও কাদায় ভেজা ছেঁড়া ব্লাউজ আর পেটিকোট। শরীরজুড়ে অমানুষিক নির্যাতনের চিহ্। প্রথমে মুক্তিযোদ্ধাদের খাঁকি পোশাক ও হেলমেট দেখে তিনি মনে করেছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনী এসেছে। তাই ভাঙা উর্দুতে আকুতি জানান:

“মুজে একটা গুলি কর।” (আমাকে একটা গুলি করে মেরে ফেলো)

হুমায়ুন কবির যখন সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, "বোন, ভয় নেই, আমি মুক্তিবাহিনী," তখন সেই সম্ভ্রমহারা নারী হুমায়ুন কবিরকে ধরে উচ্চস্বরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। নোয়াখালী-ফেনী অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় তিনি আকুতি জানান:

“এরে মুক্তিবাহিনী, তোর আল্লার দোহাই লাগে, আঁরে এউগ্গা গুলি করি দে। তোর শেখ মুজিবের দোহাই লাগে, আঁরে এউগ্গা গুলি করি দে।”

নরপশুদের বীভৎসতার বিবরণ

হুমায়ুন কবির সেই বোনকে অতি সযত্নে ক্যাপ্টেন দিদারের কাছে নিয়ে যান। সেখানে যে গল্প উন্মোচিত হয়, তা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন:

১. স্বামীর পরিচয়: তিনি ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত একজন বাঙালি সামরিক অফিসারের স্ত্রী।
২. সন্তানদের নির্মম হত্যা: যুদ্ধের সময় তিনি তাঁর দুই ছোট ছেলেকে নিয়ে গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান তাঁর সন্ধান পেয়ে যায়। চেয়ারম্যান নিজে পাকিস্তানি সেনাদের ডেকে এনে ওই মায়ের চোখের সামনে তাঁর দুটি ছোট নিষ্পাপ সন্তানকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে!
৩. বাঙ্কারে পশুবৃত্তি: সন্তানদের হত্যার পর সেই চেয়ারম্যান নিজে লোকটিকে চুলে ধরে টেনে এনে তুলে দেয় পাকিস্তানি সেনাদের বাঙ্কারে। গত ১০ দিন ধরে প্রতিদিন, প্রতি রাতে পাকিস্তানি সেনারা তাঁর ওপর নরকীয় পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে।

নিজের দুই সন্তানের নির্মম মৃত্যু আর নিজের সম্ভ্রম হারানোর পর সেই নারীর বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছা ছিল না। তাই তিনি বারবার আকুতি জানাচ্ছিলেন তাঁকে যেন একটা গুলি করে এই নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

বেলতলী গ্রামে অভিযান: নূরানী চেহারার আড়ালে নরপশু

বীরাঙ্গনা বোনের এই ভয়াবহ ও বিভৎস নির্যাতনের বিবরণ শুনে সি কোম্পানির অধিনায়ক ক্যাপ্টেন দিদার এবং উপস্থিত আটজন মুক্তিযোদ্ধার শরীর ঘৃণায় ও ক্রোধে কাঁপতে থাকে। ক্যাপ্টেন দিদার এক মুহূর্ত দেরি না করে নির্দেশ দিলেন সেই নরপশু শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানকে যেকোনো মূল্যে ধরে আনতে হবে।

চেয়ারম্যানের বাড়িতে হানা: হুমায়ুন কবিরসহ আটজন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা সেই বীরাঙ্গনা বোনকে সাথে নিয়ে রওনা হলেন ছাগলনাইয়ার বেলতলী গ্রামে। গ্রামে গিয়ে দেখা গেল সেই চেয়ারম্যানের বাড়ি যেন এক রাজপ্রাসাদ! বিশাল উঠোন, বড় বড় ছয়টি ঘর, চারদিকে নারিকেল ও সুপারি বাগান, গোয়ালঘরে অজস্র গরু। বাঙালিদের রক্ত আর ধনসম্পদ লুট করে গড়ে তোলা এক শোষকের সাম্রাজ্য।

ছদ্মবেশের আড়ালে আসল চেহারা: মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র উঁচিয়ে বাড়িতে ঢুকে তাণ্ডব চালাতে শুরু করেন। শেষপর্যন্ত ভেতরের একটি ঘরের খাটের নিচ থেকে টেনে বের করা হয় সেই পিস কমিটির চেয়ারম্যানকে। কিন্তু তাঁকে দেখে মুক্তিযোদ্ধারা এক মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন!

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির রূপ ছিল দেখার মতো-

চেহারা: মুখে ইয়া বড় দাড়ি, দেখতে একদম ‘নূরানী’ চেহারা।
পোশাক: ধবধবে সাদা বড় জুব্বা, মাথায় সাদা টুপি, আর ডান হাতে ক্রমাগত তসবিহ জপছিলেন।

প্রথম দর্শনে যে কারও মনে হতে পারে ইনি অত্যন্ত পরহেজগার ও সুফিসাধক ব্যক্তি। কিন্তু সেই বীরাঙ্গনা বোন কালবিলম্বে না করে বাঘিনীর মতো সামনে এগিয়ে এসে আঙুল নির্দেশ করে বললেন: “ইজ্জাই চেয়ারম্যান!” (এই লোকটাই সেই চেয়ারম্যান!)

নুরুজ্জামানের আত্মপ্রকাশ, রক্তের চরম টান ও বীরত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

মুক্তিযোদ্ধারা মুহূর্তের মধ্যে সেই পিস কমিটির চেয়ারম্যানকে টেনে উঠোনে নিয়ে আসেন। উঠোনের একটি বিশাল নারিকেল গাছের সাথে তাঁকে শক্ত করে রশি দিয়ে বাঁধা হয়। ৮টি থ্রি-নট-থ্রি রাইফেলের নল তখন চেয়ারম্যানের বুক বরাবর তাক করা।

ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে ধুলো উড়িয়ে এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধা এক দৌড়ে উঠোনে এসে উপস্থিত হন। তিনি চিৎকার করে বললেন:

“রাখেন ভাই! গুলি করবেন না! অয় আমার বাপ! আমি মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধা!”

পরিহাসের চরম শিখা, যিনি ছুটে এসেছিলেন, তিনি ওই ছাগলনাইয়া এলাকারই একজন দুর্ধর্ষ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান। আর সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, যে বীরাঙ্গনার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে, তাঁর স্বামী (বাঙালি সামরিক অফিসার) ছিলেন এই নুরুজ্জামানেরই ঘনিষ্ট বন্ধু!

নুরুজ্জামান যখন উঠোনে এসে দাঁড়ালেন, তখন সেই বীরাঙ্গনা বোন কান্নায় ভেঙে পড়ে নুরুজ্জামানের জামা ধরে ঝাঁকাতে লাগলেন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন:

“নুরুজ্জামান, তুই এক্কানি চা। আঁর পেটিকোটে রক্তের দিক এক্কানি চা। আজ ১০ দিন আমি ওগো বাঙ্কারে। তোর আব্বা আঁরে ওগো হাতে তুলি দিছে! আঁর পোলা দুইডারেও ওরা মারছে! তুই আঁরে এউগ্গা গুলি করি দে, আঁর কোনো দাবি থাইকত ন’!”

স্টেনগানের ট্রিগার ও রক্তে ভেজা ইতিহাস

এই কথাগুলো যখন নুরুজ্জামানের কানে পৌঁছাল, তখন তাঁর হাতের স্টেনগানটি কাঁপছিল। তিনি তাকাচ্ছেন নারিকেল গাছে বাঁধা নিজের জন্মদাতা পিতার দিকে যার মুখে এখনও সেই নূরানী দাড়ি ও হাতে তসবিহ, আর অন্যদিকে তাকাচ্ছেন নিজের বন্ধুর স্ত্রীর দিকে যার জীবন ও সম্ভ্রম ধ্বংস করে দিয়েছে এই পিতা।

নুরুজ্জামান তাঁর পিতার কাছে এগিয়ে গেলেন। চোখে অশ্রু আর তীব্র ঘৃণা নিয়ে গর্জে উঠে বললেন:

“আব্বা, আপনে এই কাজ করলেন! আপনে পাকিস্তানরে ভালোবাসেন, তাই বইলা আমগো একটা বোনরে ওগো হাতে তুইলা দিতেন!”

পিস কমিটির চেয়ারম্যানের মুখে কোনো কথা ছিল না। তাঁর তসবিহ জপানো হাত থমকে গিয়েছিল। তাঁর সেই তথাকথিত নূরানী চেহারা তখন পরিণত হয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে জঘন্য অপরাধীর রূপক হিসেবে।

নুরুজ্জামান আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেননি। পিতৃস্নেহ, রক্তের টান, পারিবারিক মায়া সবকিছুকে এক নিমিষে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে তিনি তাঁর হাতের স্টেনগানের ট্রিগার চেপে ধরলেন!

‘স্টেনগানের তীব্র ব্রাশফায়ারে’ ঝাঁঝরা হয়ে গেল স্বঘোষিত পিস কমিটির চেয়ারম্যানের বুক। চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল এক রাজাকারের শ্বাসপ্রশ্বাস। পিতার বুক চিরে ছিটকে আসা তপ্ত রক্তে ভিজে গিয়েছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামানের মুখ ও পোশাক!

এক নজরে ছাগলনাইয়া অপারেশন ও সংকলিত তথ্য

ঘটনাটির ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতা, সামরিক প্রেক্ষাপট এবং জড়িত ব্যক্তিবর্গের তথ্য সংক্ষেপে উপস্থাপন করতে একটি তথ্যপূর্ণ সারণী নিচে দেওয়া হলো:

তথ্যের বিষয়

বিস্তারিত বিবরণ ও ঐতিহাসিক উপাত্ত

মূল উৎস ও গ্রন্থ

সালেহ খোকন রচিত ঐতিহাসিক দলিল গ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধ অবিনাশী ঘটনামালা’

প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনাকারী

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির (১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, 'সি' কোম্পানি)।

অপারেশনের স্থান

ছাগলনাইয়া থানা ও বেলতলী গ্রাম, জেলা: ফেনী।

সামরিক ইউনিট

কে-ফোর্সের অধীনস্থ ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (মূলত ৪র্থ বেঙ্গল থেকে পুনর্গঠিত)।

সি কোম্পানি কমান্ডার

ক্যাপ্টেন দিদার (১০ম ইস্ট বেঙ্গল)।

নির্যাতিত বীরাঙ্গনা

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত এক বাঙালি সেনা অফিসারের স্ত্রী।

অপরাধের প্রকৃতি

২ সন্তানকে বেয়োনেট দিয়ে হত্যা এবং সামরিক অফিসারের স্ত্রীকে ১০ দিন বাঙ্কারে যৌনদাসী রাখা।

ዋ প্রধান অপরাধী

বেলতলী গ্রামের পিস কমিটির চেয়ারম্যান (ধর্মীয় পোশাকধারী ও ছদ্মবেশী দরবেশ)।

প্রধান চরিত্র (মুক্তিযোদ্ধা)

বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান (স্থানীয় গেরিলা যোদ্ধা ও অপরাধীর আপন পুত্র)।

চূড়ান্ত পরিণতি

দেশের স্বাধিকার ও বোনের সম্ভ্রমের বিচারে পুত্র নুরুজ্জামান কর্তৃক পিস কমিটির চেয়ারম্যান পিতাকে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর।

এই উপাখ্যানের সামাজিক, নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

নুরুজ্জামানের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত কেবল একটি প্রতিশোধের গল্প নয়; এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর। এই ঘটনাটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে অন্য যেকোনো সাধারণ যুদ্ধ থেকে আলাদা করে দেয়।

রক্তের চেয়ে দেশপ্রেম ও ন্যায়বিচার বড়: সমাজবিজ্ঞানে এবং মানব ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী বন্ধন ধরা হয় পিতা ও পুত্রের রক্ত সম্পর্ককে। কিন্তু নুরুজ্জামান প্রমাণ করেছিলেন, যে পিতা নিজের দেশের মা-বোনকে শত্রুর হাতে তুলে দেয়, যে পিতা অবুঝ শিশুদের হত্যায় সহায়তা করে সে আর পিতা থাকে না; সে হয়ে ওঠে মানবজাতির শত্রু। ন্যায়বিচারের বিচারে নিজের রক্তকে বিসর্জন দেওয়ার এমন নজির ইতিহাসে বিরল।

ধর্মীয় ভণ্ডামির চপেটাঘাত: চেয়ারম্যানের নূরানী দাড়ি, টুপি, জুব্বা আর তসবিহ প্রমাণ করে যে, ধর্মকে একাত্তরে কীভাবে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা ধর্মের নাম দিয়ে সবচেয়ে অধর্মের কাজগুলো করেছিল। নুরুজ্জামানের ছোঁড়া গুলি কেবল তাঁর পিতার বুকে লাগেনি, তা লেগেছিল সেই সময়ের সকল ধর্মীয় ভণ্ডামির মুখে।

বীরাঙ্গনাদের ঋণ শোধের চেষ্টা: একাত্তরে আমাদের বীরাঙ্গনা বোনেরা যে অমানবিক কষ্ট সহ্য করেছেন, তা কোনো কিছু দিয়েই শোধ করা সম্ভব নয়। নুরুজ্জামান যখন নিজের পিতাকে গুলি করেন, তখন তিনি মূলত একজন বন্ধুর স্ত্রী এবং সমগ্র বাংলাদেশের নির্যাতিত বীরাঙ্গনাদের রক্তের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করার চেষ্টা করেছিলেন।

ঘটনার উৎস ও গবেষক সালেক খোকনের কাজ

গবেষক সালেক খোকন এক যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রান্তিক ও নিভৃতচারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখি হয়ে মুক্তিযুদ্ধের অশ্রুত ও অপ্রকাশিত ঘটনাগুলো সংকলন করছেন। তাঁর গবেষণাগ্রন্থ ‘মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী ঘটনামালা’ এবং সাহিত্য সাময়িকী ‘কালি ও কলম’ এ প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির (যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা)-এর এই চাক্ষুষ সাক্ষ্যটি জানা যায়।

হুমায়ুন কবির নিজেই ৪্থ ইস্ট বেঙ্গল থেকে রূপান্তরিত ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘সি’ (চার্লি) কোম্পানিতে থেকে ফেনী ও ছাগলনাইয়া অঞ্চলে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন।

বিলোনিয়া পকেট ও ছাগলনাইয়া যুদ্ধ

১৯৭১ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ফেনীর বিলোনিয়া পকেট (Belonia Bulge) এবং ছাগলনাইয়া দখল করা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত জরুরি ছিল।

পাক বাহিনীর শক্ত ঘাঁটি: ছাগলনাইয়া থানা ও আশেপাশের বাঙ্কারগুলোতে পাকিস্তানি ৩৯ বালুচ ও ফোরটিন পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বিপুল অস্ত্র ও সৈন্য মোতায়েন ছিল। সীমান্ত ঘেঁষা হওয়ায় এখান থেকে তারা ভারতীয় সীমানায় এবং আশেপাশের গ্রামে প্রতিনিয়ত ভারী কামানের গোলার বিস্ফোরণ ঘটাত।

বৃষ্টি ও বাঙ্কার দখল: মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবিরের বিবরণ অনুযায়ী, বেলুনিয়া মুক্ত করার পরপরই নির্দেশ আসে ছাগলনাইয়া আক্রমণ করার। এক রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে ও হাঁটু সমান কাদা পেরিয়ে সি কোম্পানির অধিনায়ক ক্যাপ্টেন দিদারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালান। বৃষ্টির কারণে পাকিস্তানি সৈন্যদের বেশিরভাগ বাঙ্কারে পানি ঢুকে গিয়েছিল, ফলে তারা অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায়।

শান্তি কমিটি ও রাজাকারদের অপরাধের প্রকৃতি

একাত্তরে স্থানীয় শান্তি কমিটি (Peace Committee) ও রাজাকারদের ভূমিকা কেবল রাজনৈতিক সমর্থনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মূল চোখ ও কান।

ধর্মীয় পোশাক ও ছদ্মবেশ: ছাগলনাইয়ার বেলতলী গ্রামের সেই পিস কমিটি চেয়ারম্যানের মতো বহু রাজাকার নেতা বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত ধার্মিক রূপ ধারণ করত (নূরানী দাড়ি, টুপি, জুব্বা, হাতে তসবিহ)। কিন্তু ভেতরের পরিচয় ছিল অত্যন্ত ক্রূর ও নৃশংস।

সম্পত্তি দখল ও নারী নির্যাতন: পাক সেনাদের খুশি রাখতে এবং এলাকায় নিজেদের একক আধিপত্য বজায় রাখতে তারা সাধারণ বাঙালির ঘরবাড়ি লুট করত, জমি দখল করত এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মীয়স্বজন বা স্বাধীনতার সমর্থক পরিবারগুলোর মা-বোনদের তালিকা তৈরি করে বাঙ্কারে পাঠাত।

পাসবিকতার মাত্রা: ওই বীরাঙ্গনা নারী ছিলেন একজন বাঙালি সামরিক অফিসারের স্ত্রী। পিস কমিটির চেয়ারম্যান তাঁর দুই নিষ্পাপ সন্তানকে মায়ের চোখের সামনে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে এবং তাঁকেও ১০ দিন ধরে বাঙ্কারে পাশবিক নির্যাতনের জন্য আটকে রাখে।

পারিবারিক দ্বিমুখী অবস্থান ও নুরুজ্জামানের মহত্তম ত্যাগ

১৯৭১ সালে অনেক পরিবারেই মতাদর্শিক এবং নৈতিক কারণে চরম দ্বিধা ও বিভাজন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সন্তান মুক্তিযোদ্ধা আর পিতা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান এমন পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক।

বন্ধুর স্ত্রীর সম্ভ্রম ও রক্তের ডাক: গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান যখন জানতে পারেন, যে নারীর জীবন ও সন্তানদের ধ্বংস করা হয়েছে তিনি তাঁরই সহযোদ্ধা/বন্ধুর স্ত্রী, এবং এই জঘন্য অপরাধের কারিগর তাঁর নিজের জন্মদাতা পিতা তখন তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত।

পিতৃস্নেহের ওপর ন্যায়বিচারের জয়: পিতাকে গাছে বেঁধে যখন অন্য মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করতে যাচ্ছিলেন, নুরুজ্জামান নিজেই এগিয়ে যান। পিতার ধর্মীয় ভণ্ডামি ও দেশদ্রোহিতার বিরুদ্ধে তিনি নিজ হাতে স্টেনগানের ব্রাশফায়ার করেন। পিতার বুক চিরে আসা তপ্ত রক্তে নুরুজ্জামানের মুখ ও পোশাক ভিজে গিয়েছিল। এটি প্রমাণ করে একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ব্যক্তি বা রক্তের সম্পর্কের চেয়ে ন্যায়বিচার ও দেশপ্রেম কতটা ঊর্ধ্বে ছিল।

সহযোদ্ধাদের ত্যাগের অন্যান্য সমান্তরাল দৃষ্টান্ত

সালেক খোকনের এই গবেষণায় একই সামরিক অপারেশনের আশেপাশের আরও কিছু বীর মুক্তিযোদ্ধায় ত্যাগ ও বেদনার কথা উঠে এসেছে:

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা বাকি মোল্লা: ১৯৭১ সালের জুনে যুদ্ধাহত হন, যাঁর ডান পা কেটে ফেলতে হয়। যুদ্ধশেষে বাড়ি ফিরে দেখেন রণাঙ্গনে থাকাকালীনই তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও গর্ভের সন্তান মারা গেছেন।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হান্নান: ২ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধের সময় নোয়াবাদী রেললাইনের কাছে টুইন্স মর্টারের স্প্লিন্টার পায়ে ঢোকে, যা সারাজীবনের জন্য তাঁকে পঙ্গু করে দেয়।

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজউদ্দীন: ১১ নম্বর সেক্টরের রাঙামাটি (ময়মনসিংহ) এলাকায় শরীরে ৫টি গুলি খেয়েও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান।

ইতিহাস বিকৃতি প্রতিরোধ ও আমাদের বর্তমান দায়বদ্ধতা

আজ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পর দাঁড়িয়ে যখন আমরা মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিই, তখন অনেক সময়ই আমরা ভুলে যাই এই মাটি কতটা রক্ত আর কত অশ্রুতে ভিজে আছে।

ইতিহাসকে হৃদয়ে ধারণ করা: নুরুজ্জামানের মতো বীরেরা যদি নিজের পিতাকে ক্ষমা না করতে পারেন, তবে আজ আমরা কীভাবে একাত্তরের ঘাতক ও তাদের দোসরদের আদর্শকে ক্ষমা করতে পারি? আমাদের প্রজন্মকে জানতে হবে যে, আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি রচিত হয়েছে নুরুজ্জামানদের আত্মত্যাগ ও বীরত্বের ওপর।

বীরাঙ্গনাদের ত্যাগের স্বীকৃতি: আমাদের সমাজে এখনও বীরাঙ্গনাদের যে কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। নুরুজ্জামান একাত্তরের রণাঙ্গনে দাঁড়িয়ে একজন বীরাঙ্গনার আক্ষেপ ও চোখের পানির মূল্যায়ন করেছিলেন নিজের পিতাকে দণ্ড দিয়ে। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে সেই বোনদের সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া আমাদের রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত দায়িত্ব।

উপসংহার

১৯৭১ সালের সেই রক্তঝরা দিনে ছাগলনাইয়া থানার বেলতলী গ্রামের নারিকেল গাছের তলায় যে ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তা কোনো কল্পকাহিনী নয়। তা ছিল একটি জাতির জন্মলগ্নের চরমতম সত্য।

নুরুজ্জামান যখন স্টেনগানের ট্রিগার চেপে ধরেছিলেন, তখন তাঁর চোখ দিয়ে হয়তো জল পড়ছিল, কিন্তু তাঁর হাত কাঁপেনি। কারণ তিনি জানতেন, আজ যদি তিনি পিতার মায়ায় একজন যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমা করে দেন, তবে ইতিহাস বাংলাদেশকে ক্ষমা করবে না।

“আব্বা, আপনে এই কাজ করলেন!” নুরুজ্জামানের এই শেষ প্রশ্নের উত্তর সেদিন তাঁর পিতা দিতে পারেননি। কিন্তু এই প্রশ্নটি একাত্তরের সকল রাজাকার, অল-বদর, আল-শামস এবং তাদের দোসরদের মুখে চপেটাঘাত হয়ে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে।

মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের কেবল একটি মানচিত্র আর লাল-সবুজের পতাকা দিয়ে যাননি; তাঁরা আমাদের দিয়ে গেছেন এক অদম্য অনমনীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার শিক্ষা। যে দেশে নুরুজ্জামানের মতো বীরেরা জন্ম নেন, যে দেশে বীরাঙ্গনাদের অশ্রুর বিচারে সন্তান পিতার বুকে গুলি চালাতে দ্বিধা করে না সেই দেশের স্বাধীনতাকে কোনো শক্তি কখনো মুছে ফেলতে পারবে না। নুরুজ্জামান ও হুমায়ুন কবিরদের এই অম্লান বীরত্বগাথা আমাদের পথ দেখাবে অনন্তকাল।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Jul 21, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

Jul 13, 2026

/

Post by

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বয়ানটি হলো একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র লড়াই। ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তারা এটিকে চিত্রায়িত করেছিল 'ইসলামী সংহতি রক্ষার অভিযান' হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম কখনো অন্যায়, স্বৈরাচার, লুণ্ঠন ও গণহত্যার পক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.