তিন মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়ের আত্মত্যাগ এবং তাদের মানসিক ভারসাম্যহীন বিধবা
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের চিওড়া ইউনিয়নের ভারত সীমান্তবর্তী ছোট সাতবাড়িয়া গ্রামের তিন সহোদর মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের তিন স্বামীহারা জায়ের ট্র্যাজেডি সেই নীরব ইতিহাসেরই এক জলজ্যান্ত সাক্ষী। একাত্তরের আগস্টের এক কালো দিনে এই তিন বীরকে অকথ্য নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়।

TruthBangla
Aug 24, 2025
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল সম্মুখ সমরের গৌরবগাথা নয়, এটি একইসঙ্গে গভীর শোক, চরম আত্মত্যাগ এবং রাজাকারদের ঘৃণ্য বিশ্বাসঘাতকতার এক মর্মন্তুদ দলিল। প্রতিটি বিজয়ের গল্পের পেছনে লুকিয়ে আছে অসংখ্য পরিবারের নীরব কান্না ও অপূরণীয় ক্ষতি। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের চিওড়া ইউনিয়নের ভারত সীমান্তবর্তী ছোট সাতবাড়িয়া গ্রামের তিন সহোদর মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের তিন স্বামীহারা জায়ের ট্র্যাজেডি সেই নীরব ইতিহাসেরই এক জলজ্যান্ত সাক্ষী। একাত্তরের আগস্টের এক কালো দিনে এই তিন বীরকে অকথ্য নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়, আর তাঁদের স্ত্রীরা সেই শোক সহ্য করতে না পেরে হারান মানসিক ভারসাম্য। আজকের দিনে, যখন আমরা স্বাধীনতার অসীম ঋণ স্বীকার করি, তখন এই তিন শহীদ ও তাঁদের তিন নীরব জায়ের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানানো কর্তব্য।
এক পরিবারে তিন বীর, তিন শোক
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বহু পরিবার একসঙ্গে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, কিন্তু কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ঘটনাটি এক বিরল ট্র্যাজেডি। এক বাড়িতে তিন সহোদর ভাই - এহছাক মিয়া, আবুল কাশেম ও মোকসেদুর রহমান একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তাঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন সম্মুখসারির মুক্তিযোদ্ধা।
আজকের দিনটি, অর্থাৎ ২৪ আগস্ট, সেই মর্মান্তিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। এই দিনেই পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের যোগসাজশে এই তিন বীরকে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এই হত্যাকাণ্ড কেবল তিন তরুণের জীবন কেড়ে নেয়নি, এটি তাঁদের স্ত্রী, যারা পরস্পর জা ছিলেন, তাঁদের মানসিক স্থিতিশীলতাও কেড়ে নিয়েছিল। স্বামীদের হারানোর চরম শোক ও আঘাত সহ্য করতে না পেরে তাঁরা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।
এই উপাখ্যানটি একদিকে যেমন বাঙালির অসীম ত্যাগের মহিমা তুলে ধরে, অন্যদিকে রাজাকার ও দালালদের বিশ্বাসঘাতকতার ভয়াবহতা এবং একটি পরিবারের ওপর যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবকে চিত্রিত করে।
রণাঙ্গনে প্রস্তুতি – মুক্তির স্বপ্নে তিন সহোদর
ছোট সাতবাড়িয়া গ্রামটি ছিল ভারত সীমান্তবর্তী, যা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ছিল এক কৌশলগত সুবিধা। এই গ্রামের এহছাক মিয়া, আবুল কাশেম ও মোকসেদুর রহমান তিন ভাইই ছিলেন দেশপ্রেমের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ।
প্রশিক্ষণ ও মুক্তিযুদ্ধে যোগদান
সিদ্ধান্ত: মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকেই, এপ্রিল-মে মাসে, যখন পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হয়, তখন তিন ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।
ভারতে যাত্রা: তাঁরা প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যান এবং সেখানে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই যোগদান প্রমাণ করে যে, একটি পরিবারের তিন সদস্যই একযোগে জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতা অর্জনের অঙ্গীকার করেছিলেন।
যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসা: প্রশিক্ষণ শেষে তিন ভাই ফিরে এসে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
আগস্টের মাঝামাঝি – গৃহে স্বল্পকালীন স্বস্তি
যুদ্ধের একপর্যায়ে আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাজাকারদের দৌরাত্ম্য সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে কিছুটা কমলে, তিন ভাই সিদ্ধান্ত নেন ঝুঁকি নিয়ে হলেও কয়েকদিনের জন্য বাড়িতে এসে রাতে থাকবেন। এই স্বল্পকালীন গৃহে ফেরা ছিল যুদ্ধক্ষেত্র ও পরিবারের মাঝে এক বিরল সংযোগের মুহূর্ত।
২৩ আগস্টের কালো দিন – লুটপাট থেকে বিশ্বাসঘাতকতা
মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় জুড়েই পাকিস্তানি সেনারা রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে নিয়মিতই বিভিন্ন গ্রামে লুটপাট, নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাতো। ২৩ আগস্টের ঘটনাটি শুরু হয়েছিল নিছক লুটপাট দিয়ে, কিন্তু শেষ হয় এক ঘৃণ্য বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে।
প্রথম আঘাত – হানাদারদের আগমন
চৌদ্দগ্রামের জগন্নাথ দিঘি পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে আগত পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে লুটপাটের জন্য ছোট সাতবাড়িয়া গ্রামে আসে।
পাকিস্তানি সেনাদের আগমন সম্পর্কে কিছুই টের পাননি তিন মুক্তিযোদ্ধা। একপর্যায়ে বিভিন্ন বাড়ি থেকে ছাগল, হাঁস, মুরগি, কবুতর লুট করার পর পাকিস্তানিদের একটি দল এই তিন মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতেও যায়।
তিন ভাই দ্রুত পরিস্থিতি সামলে নেন। তাঁরা কোনো প্রতিরোধ গড়লেন না, ফলে পাকিস্তানিরা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে, তারা তিন মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে এসেছে। পাকিস্তানিরা তাদের বাড়ি থেকে হাঁস, মুরগি, ছাগল লুট করে ক্যাম্পের দিকে ফিরতি রওয়ানা হয়। প্রাণ বাঁচিয়ে সেই মুহূর্তে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন তিন সহোদর ও তাঁদের পরিবার।
রাজাকারের ঘৃণ্য বিশ্বাসঘাতকতা
পাকিস্তানি সেনারা যখন চিওড়া বাজারে এসে পৌঁছায়, তখনই ঘটে আসল সর্বনাশ। রাজাকারেরা সেনাদের কাছ থেকে জানতে চায়, তারা কোথা থেকে জিনিসপত্র লুট করেছে। সেনাদের মুখ থেকে শুনে রাজাকারেরা বুঝতে পারে, তারা যেসব বাড়ি থেকে লুট করেছে তার মধ্যে একটি বাড়ি হলো ওই তিন সহোদর মুক্তিযোদ্ধার।
রাজাকারেরা তখন সেনাবাহিনীকে বোঝায় যে, এই তিন ভাই গোপনে বাড়িতে অবস্থান করছে। যদি আজই তাদের ধরিয়ে না দেওয়া হয়, তাহলে সেই মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণে বেঁচে যাবেন এবং পরে তারা আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। রাজাকারদের প্ররোচনাতেই সেনারা দেরি না করে এহছাক মিয়ার বাড়ির দিকে রওয়ানা হন। রাজাকারদের এই পদক্ষেপ ছিল নিছক লুটের সহযোগিতা নয়, বরং ছিল স্বাধীনতার আদর্শের প্রতি চূড়ান্ত গাদ্দারী।
২৪ আগস্ট – নির্যাতন ও নির্মম হত্যাকাণ্ড
পাকিস্তানি সেনাদের আকস্মিক ফিরে আসার খবর এই তিন মুক্তিযোদ্ধার কাছে পৌঁছায়নি। তারা ভেবেছিলেন, যেহেতু সেনারা চলে গেছে এবং সন্দেহ করেনি, তাই তারা নিশ্চিন্ত। চুপিসারে সে বাড়িতে পৌঁছে মুহূর্তের মধ্যে পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের সেই বাড়ি ঘেরাও করে। তিন ভাই পালাতে চাইলেও সশস্ত্র পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে শেষপর্যন্ত ধরা পড়েন।
তাদের মারতে মারতে নিয়ে যাওয়া হয় জগন্নাথ দিঘী পাকিস্তানি ক্যাম্পে। সেখানে সেদিন পুরো রাত্রিতে তাঁদের ওপর চালানো হয়েছিলো অবর্ণনীয় পাশবিক নির্যাতন। তাদের সামরিক পরিচয় জানার পর, পাকিস্তানিরা ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠে।
টানা দেড় দিন ধরে প্রচণ্ড ও অমানুষিক নির্যাতনের পর, ২৪ আগস্ট তাঁদের দিয়ে গর্ত খোঁড়ানো হয়।
সেদিন সন্ধ্যার দিকে সেই গর্তের সামনেই তিন সহোদর শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। হত্যা নিশ্চিত হওয়ার পর, সেই গর্তেই তাঁদের মাটিচাপা দিয়ে দেয়।
এই ঘটনাটি ছিল রাজাকারদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত একটি সুপরিকল্পিত যুদ্ধাপরাধ। এই হত্যাকাণ্ড কেবল সামরিক প্রতিশোধ ছিল না, এটি ছিল দেশপ্রেমের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের এক জঘন্যতম নিদর্শন।
তিন জায়ের ট্র্যাজেডি – নীরব মানসিক আঘাত
স্বামীদের হারানোর খবর এবং তাঁদের ওপর হওয়া পাশবিক নির্যাতনের বিবরণ যখন এই তিন নারীর কানে পৌঁছায়, তখন তাঁদের ওপর নেমে আসে এক চরম মানসিক আঘাত। স্বামী হারানোর চরম শোক ও আঘাত সহ্য করতে না পেরে, তিন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।
এই ট্র্যাজেডির বহু বছর পরও, তাঁরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। বাশার খানের তোলা ছবিতে সেই শহীদ জাদের মানসিক ট্র্যাজেডির নীরব প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। জিজ্ঞেস করলে তাঁরা কিছুই বলতে পারেন না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকেন প্রশ্নকর্তার দিকে।
এই তিন জায়ের নীরব ট্র্যাজেডি প্রমাণ করে যে, যুদ্ধের ক্ষত কেবল শারীরিক নয়, মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক স্তরেও কত গভীর হতে পারে। এই নারীরা তাদের জাতির স্বাধীনতার জন্য চরম মূল্য দিয়েছিলেন - একসঙ্গে তিন স্বামীর আত্মত্যাগ এবং নিজেদের মানসিক স্থিতিশীলতা হারানোর মধ্য দিয়ে।
স্বাধীনতার পরে – ন্যায়বিচার ও বীরদের সম্মান
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর অবশ্য মুক্তিযোদ্ধারা নিষ্ক্রিয় থাকেননি। মুক্তিযোদ্ধারা সেই বিশ্বাসঘাতক রাজাকার দালালকে খুঁজে বের করে হত্যা করেছিলেন। যদিও এই প্রতিহিংসা আইনগতভাবে সমর্থনযোগ্য নয়, কিন্তু সেই সময়ের রণাঙ্গনের তীব্র আবেগ ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা থেকে এই ঘটনা ঘটেছিল।
দেশ স্বাধীনের পরে মুক্তিযোদ্ধারা জগন্নাথ দীঘির পাড়ের সেই গর্ত থেকে তিন সহোদর শহীদ মুক্তিযোদ্ধার দেহাবশেষ উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে এই তিন ভাইকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় তাঁদের বাড়ির পার্শ্ববর্তী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
উপসংহার
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ছোট সাতবাড়িয়া গ্রামের এই তিন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এহছাক মিয়া, আবুল কাশেম ও মোকসেদুর রহমান আমাদের মনে করিয়ে দেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কত কঠিন মূল্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে। তাঁদের আত্মত্যাগ যেমন অসীম, তেমনি তাঁদের তিন জায়ের নীরব মানসিক আঘাতও দেশের স্বাধীনতার এক মর্মন্তুদ দলিল।
এই ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, রাজাকার ও দালালদের বিশ্বাসঘাতকতাই পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতাকে আরও সহজ ও ভয়ঙ্কর করে তুলেছিল। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কোনো ছবি হয়তো আমরা খুঁজে পাইনি, কিন্তু তাঁদের অসীম সেই ত্যাগ স্বীকারকারী তিন নারী ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি আমাদের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।
তাঁদের এই আত্মত্যাগ এবং শহীদ জাদের নীরব ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অনিবার্য অংশ, যার প্রতি আমাদের প্রজন্মের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানো উচিত।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















