>
>
মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দেওয়ার সরকারি পুরস্কার ও এদেশীয় দোসরদের গাদ্দারি
মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দেওয়ার সরকারি পুরস্কার ও এদেশীয় দোসরদের গাদ্দারি
বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিমূলে আঘাত হানতে, স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ভেঙে দিতে এবং সাধারণ গ্রামবাংলায় ভয়, সন্দেহ ও অবিশ্বাসের গভীর ফাটল ধরাতে পাকিস্তানি সামরিক সরকার এক নজিরবিহীন ও নিকৃষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তা হলো স্বাধীনতাকামী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান চিহ্নিত করে তাঁদের জীবিত বা মৃত ধরে দেওয়ার বিনিময়ে নগদ অর্থের লোভনীয় পুরস্কার ঘোষণা করে সরকারি গেজেট জারি করা। দৈনিক 'পূর্বদেশ' সহ তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার তদারকিতে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রচারিত এই সরকারি বিজ্ঞপ্তিটি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক আদেশ ছিল না; এটি ছিল একটি স্বাধীনতাকামী জাতিকে অর্থ ও লোভের ফাঁদে ফেলে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত।

TruthBangla

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম কোনো আকস্মিক ঘটনা কিংবা কেবল দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সীমান্ত সংঘাত ছিল না। এটি ছিল শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ রক্তক্ষয়ী গণসংগ্রাম একদিকে শোষণ, শাসন, উগ্র ধর্মান্ধতা ও নির্মমতার বিপরীতে অন্যদিকে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মাতৃভূমির স্বাধীনতার মহান শপথ। ১৯৭১ সালের দীর্ঘ নয়টি মাস ধরে পাকিস্তানি দখলদার সামরিক জান্তা সমগ্র বাংলাদেশে যে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা, গণধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন পরিচালনা করেছিল, তার সমান্তরালে তারা চালিয়েছিল এক বিষাক্ত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিমূলে আঘাত হানতে, স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ভেঙে দিতে এবং সাধারণ গ্রামবাংলায় ভয়, সন্দেহ ও অবিশ্বাসের গভীর ফাটল ধরাতে পাকিস্তানি সামরিক সরকার এক নজিরবিহীন ও নিকৃষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তা হলো স্বাধীনতাকামী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান চিহ্নিত করে তাঁদের জীবিত বা মৃত ধরে দেওয়ার বিনিময়ে নগদ অর্থের লোভনীয় পুরস্কার ঘোষণা করে সরকারি গেজেট জারি করা।
দৈনিক 'পূর্বদেশ' সহ তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার তদারকিতে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রচারিত এই সরকারি বিজ্ঞপ্তিটি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক আদেশ ছিল না; এটি ছিল একটি স্বাধীনতাকামী জাতিকে অর্থ ও লোভের ফাঁদে ফেলে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত। আর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এই নোংরা ছক বাস্তবে রূপদানের জন্য প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়েছিল তাদের এদেশীয় বিশ্বস্ত দোসর জামায়াতে ইসলামী, আল-বদর, আল-শামস ও শান্তি কমিটি গঠিত রাজাকার বাহিনী।
অগণিত বীরের রক্তে কেনা আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে এই ঘটনা কেবল পাকিস্তানি শাসকশ্রেণীর নৈতিক দেউলিয়াত্বকেই নগ্নভাবে উন্মোচিত করে না, বরং একই সাথে তুলে ধরে এদেশীয় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সীমাহীন বিশ্বাসঘাতকতার দলিল। এই নিবন্ধে আমরা একাত্তরের সেই অন্ধকার অধ্যায়, বিতর্কিত সরকারি গেজেটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, পুরস্কারের হিসাব-নিকাশ, দোসরদের নৃশংস ভূমিকা এবং জনগণের প্রতিরোধের গৌরবোজ্জ্বল সত্যগুলো বিস্তারিতভাবে উদঘাটন করব।
মুক্তিযুদ্ধের সামরিক ও আদর্শিক সংঘাত
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল কেবল দুটি সামরিক বাহিনীর মধ্যেকার যুদ্ধ নয়; এটি ছিল স্বাধীনতা ও পরাধীনতা, ন্যায় ও অন্যায়ের এবং দেশপ্রেম ও বিশ্বাসঘাতকতার আদর্শিক সংঘাত। একদিকে যেমন ছিল হাজারো তরুণ-যুবকের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করার অদম্য সাহস, অন্যদিকে তেমনি ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর স্থানীয় দোসরদের চরম গাদ্দারী।
দৈনিক 'পূর্বদেশ' পত্রিকার গেজেট
পাকিস্তানি সামরিক সরকার মুক্তিকামী মুক্তিযোদ্ধাদের 'দুষ্কৃতকারী' বা 'রাষ্ট্রদ্রোহী' হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের দমনে চরম মরিয়া হয়ে উঠেছিল। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রারম্ভে দৈনিক 'পূর্বদেশ'সহ তৎকালীন অন্যান্য পত্রিকায় প্রকাশিত সরকারি গেজেট ও ইশতিহারগুলো তার প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক প্রমাণ বহন করে।
সেই গেজেটগুলোতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাথার দাম নির্ধারণ করে নগদ অর্থ পুরস্কার, জমি ও পদকের প্রলোভন ঘোষণা করা হয়েছিল। কোন মুক্তিযোদ্ধা বা স্বাধীনতাকামীকে জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দিলে বা তাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিলে মোটা অঙ্কের পুরস্কারের যে বিবরণ সরকারিভাবে ছাপা হতো, তা থেকে স্পষ্ট হয় যে পাকিস্তানি বাহিনী স্থানীয় জনসমর্থন পুরোপুরি হারিয়ে কতটা অসহায় হয়ে পড়েছিল।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এই নোংরা কৌশলে স্থানীয় দালাল ও রাজাকাররা তথ্যের জোগানদাতা এবং সহায়তাকারী হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্রীয় গেজেট জারি করে নিজের দেশেরই মুক্তিকামী জনগণকে দমনের এই নজির কেবল প্রশাসনিক দেউলিয়াত্ব নির্দেশ করে না, বরং দোসরদের রাজনৈতিক ও মানসিক পচনের গভীরতাকে উন্মোচিত করে। একাত্তরের বিজয়ের মুখে দাঁড়িয়েও বুদ্ধিজীবী হত্যার নীল নকশা বাস্তবায়নে আল-বদর বাহিনীর এই চরম বিশ্বাসঘাতকতা ইতিহাসের পাতায় এক কালিমালিপ্ত অধ্যায় হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
গেজেটের প্রেক্ষাপট: পরাজয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মরিয়া পাকিস্তান
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার পর সমগ্র বাংলাদেশের আপামর জনতা এক অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। ২৫শে মার্চের কালরাতে পরিচালিত 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ভেবেছিল বাঙালি জাতিকে কয়েক দিনের মধ্যে পুরোপুরি বুটের তলায় পিষে স্তব্ধ করে দেওয়া যাবে। কিন্তু সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)-এর বাঙালি সদস্যরা একজোটে যে প্রতিরোধ ব্যুহ রচনা করেন, তাতে পাকিস্তানি হিসাব-নিকাশ শুরুতেই ওলটপালট হয়ে যায়।
সামরিক ব্যর্থতা, হতাশা ও 'মনসুন অফেনসিভ'
১৯৭১ সালের মাঝামাঝি (জুলাই-আগস্ট) এসে মুক্তিযুদ্ধ এক পূর্ণাঙ্গ সশস্ত্র গণযুদ্ধে রূপ নেয়। মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (মুজিবনগর) গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার সফলভাবে সেক্টরসমূহ পুনর্গঠন করে এবং সমগ্র দেশকে ১১টি সামরিক সেক্টরে বিভক্ত করে বীরঙ্গন তৈরি করে। হাজার হাজার বাঙালি তরুণ ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবিরে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশে ফিরে এসে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে শুরু করে।
বর্ষাকালে (Monsoon Season) নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভৌগোলিক সুবিধা পুরোপুরি মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে চলে যায়। পাকিস্তানি সেনারা জলপথ বা কর্দমাক্ত পথ পেরিয়ে গ্রামাঞ্চলে অভিযানে যেতে চরম আতঙ্কে ভুগত। গেরিলা যোদ্ধারা "হিট অ্যান্ড রান" (Hit and Run) কৌশলে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর রসদ সরবরাহ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়, নৌযান ধ্বংস করে এবং সেনানিবাসগুলোর ওপর হঠাৎ হামলা চালিয়ে নিখোঁজ হয়ে যেত।
মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক ও ইনফরমেশন গ্যাপ
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য প্রধান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায় 'চোরাগোপ্তা হামলা' বা গেরিলা অপারেশন। ঢাকার কেন্দ্রস্থলে 'ক্র্যাক প্লাটুন'-এর দুঃসাহসিক অপারেশনগুলো যেমন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র কিংবা সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে বিস্ফোরণ বিশ্বের গণমাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে নতুন মাত্রা দেয়।
পাকিস্তানি কমান্ড্যান্টরা বুঝতে পেরেছিল যে, সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করে তাদের সুপ্রশিক্ষিত বাহিনীকে পরাজিত করার মতো ভারী অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তখনও পর্যাপ্ত নেই, কিন্তু স্থানীয় বাঙালি সাধারণ জনগণই হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের মূল শক্তি। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি ধানক্ষেত ও পাটক্ষেত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল। পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে সবচেয়ে বড় ঘাটতি ছিল 'সঠিক গোয়েন্দা তথ্য' বা তথ্য সরবরাহকারী জনবলের অভাব। স্থানীয় বাঙালিরা তাদের কোনো তথ্য তো দিতই না, বরং ভুল পথ দেখিয়ে উল্টো মুক্তিযোদ্ধাদের আম্বুশের (Ambush) মুখে ফেলে দিত।
এই পরিস্থিতিতে নিজেদের অবরুদ্ধ অবস্থান থেকে উত্তরণ ঘটাতে এবং অস্ত্র দিয়ে যা অর্জিত হচ্ছিল না তা ছল-চক্রান্তের মাধ্যমে অর্জনের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানি জেনারেলরা এদেশীয় দালালদের পরামর্শে আর্থিক টোপ ফেলার পরিকল্পনা করে।
সরকারি গেজেট ও দৈনিক ‘পূর্বদেশ’
পরাজয় যখন সুনির্দিষ্ট, ঠিক তখনই ১৯৭১ সালের শেষভাগে (বিশেষ করে নভেম্বর ও ডিসেম্বরের শুরুর দিকে) পাকিস্তানি সামরিক জান্তা সংবাদপত্রগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার নিয়ন্ত্রিত ও প্রেস ট্রাস্ট অব পাকিস্তান পরিচালিত সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে দৈনিক 'পূর্বদেশ', দৈনিক 'সংগ্রাম', ও 'দৈনিক পাকিস্তান' অন্যতম।
দৈনিক 'পূর্বদেশ' পত্রিকায় প্রকাশিত সরকারি সামরিক বিজ্ঞপ্তিতে অত্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের "দুষ্কৃতকারী", "ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী" কিংবা "বিচ্ছিন্নতাবাদী" হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাঁদের জীবিত অথবা মৃত ধরে দিতে পারলে নির্দিষ্ট অঙ্কের নগদ টাকা পুরস্কারের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেওয়া হয়।
সরকারি গেজেটে ঘোষিত পুরস্কারের বিস্তারিত হিসাব
নিচে ১৯৭১ সালে প্রকাশিত সরকারি বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধাদের জীবিত, মৃত বা তথ্যের বিনিময়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত পুরস্কারের একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হলো:
মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ঘোষিত সরকারি পুরস্কারের তালিকা
মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রেণিভাগ / ধারার বিবরণ | তৎকালীন সরকারি ঘোষিত পুরস্কার (নগদ টাকা) | আধুনিক মূল্যায়নে প্রলোভনের মাত্রা ও উদ্দেশ্য |
সাধারণ একজন মুক্তিকামী যোদ্ধা/গেরিলাকে ধরিয়ে দিলে | ৫০০ টাকা | একজন গ্রামীণ পরিবারের কয়েক মাসের খোরপোষের সমপরিমাণ টাকা লোভ হিসেবে দেখানো। |
ভারত থেকে সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে আটক করিয়ে দিলে | ৭৫০ টাকা | ভারতের ট্রেনিং ক্যাম্পের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি। |
কোনো সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধাকে তাঁর ব্যবহৃত অস্ত্রসহ পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দিলে | ১,০০০ টাকা | মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে থাকা ভারতীয় ও দখলকৃত পাকিস্তানি অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করা। |
কোনো মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, ক্যাম্প অধিনায়ক বা প্লাটুন লিডারকে ধরিয়ে দিলে | ২,০০০ টাকা | মুক্তিকামী বাহিনীর স্থানীয় নেতৃত্ব শূন্য করা ও সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া। |
পুরো একটি সশস্ত্র গেরিলা গ্রুপকে ফাঁদে ফেলে একসাথে ধরিয়ে দেওয়া বা নিশ্চিহ্ন করা | ১০,০০০ টাকা (সর্বোচ্চ) | তৎকালীন বাজারে এটি ছিল এক বিরাট অংকের অর্থ; লোভী মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগানোর নজির। |
(সূত্র: ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত দৈনিক 'পূর্বদেশ' ও তৎকালীন প্রেস ট্রাস্ট পরিচালিত পত্রিকাসমূহের আর্কাইভ)
অর্থের প্রলোভন ও নৈতিক দেউলিয়াত্ব
১৯৭১ সালে ৫০০ টাকা বা ১০,০০০ টাকা কোনো সাধারণ অর্থ ছিল না। তৎকালীন সময়ে ৫০০ টাকা দিয়ে কয়েক বিঘি জমি কেনা সম্ভব ছিল কিংবা কয়েক বছর একটি পরিবারের জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা যেত। পাকিস্তানি জেনারেলরা ভেবেছিল, যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে যে অর্থনৈতিক মন্দা ও দুর্ভিক্ষাভাব দেখা দিয়েছে, সেখানে টাকার লোভ দেখিয়ে অতি সহজেই দরিদ্র কৃষক বা সুযোগসন্ধানী সামাজিক উপাদানকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে।
কিন্তু ইতিহাসের এই পাতায় এটি চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে রইল যে, কোনো দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে কেবল কয়েক হাজার টাকার বিনিময়ে কেনাবেচা করা যায় না। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এই গেজেটের মাধ্যমে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে নিজেদের চরম নৈতিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করেছিল যেখানে একটি রাষ্ট্র তাঁর নিজের ভূমির সন্তানদের "অপরাধী" আখ্যা দিয়ে মাথায় মূল্য ঝুলিয়ে দেয়।
ঘৃণ্য দোসরদের ভূমিকা: জামায়াতে ইসলামী, আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকার
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ছিল বহিরাগত শক্তি; তৎকালীন পূর্ববঙ্গের অলিগলি, গ্রামগঞ্জের খালবিল বা ঝোপঝাড় সম্পর্কে তাদের কোনো সম্যক ধারণা ছিল না। সরকারি গেজেটে ঘোষিত টাকার খেলা মাঠে বাস্তবায়ন করতে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করে হানাদারদের হাতে তুলে দিতে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল এদেশীয় চার স্তরের স্বাধীনতাবিরোধী নেটওয়ার্ক।
জামায়াতে ইসলামী: বাংলা ভূখন্ডের চিরশত্রু
মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী ও এর শীর্ষ নেতৃত্ব (যেমন: গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ প্রমুখ) প্রকাশ্যে সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় যেকোনো সীমা অতিক্রম করবে।
আদর্শিক বিকৃতি: তারা সাধারণ মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষদের বোঝানোর চেষ্টা করে যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন মূলত 'ইসলামকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র' এবং মুক্তিযোদ্ধারা হচ্ছে 'ইসলাম ও পাকিস্তানের শত্রু'।
শান্তি কমিটি (Peace Committee): ১৯৭১ সালের এপ্রিলের শুরুতেই জামায়াত ও অন্যান্য পাকিস্তানপন্থী দলগুলোর সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় 'শান্তি কমিটি' গঠিত হয়। এই শান্তি কমিটির মূল কাজ ছিল গ্রাম পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িঘর চিহ্নিত করা, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে সংযোগ তৈরি করা।
গেজেট প্রচার: জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র হিসেবে পরিচিত দৈনিক 'সংগ্রাম' পত্রিকায় নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বার্তা এবং সরকার প্রদত্ত পুরষ্কার ও সুযোগ-সুবিধার প্রচার চালানো হতো।
আল-বদর বাহিনী: বুদ্ধিজীবী হত্যার স্পেশাল স্কোয়াড
জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন 'ইসলামী ছাত্রসংঘ' (যা বর্তমানে ছাত্রশিবির নামে পরিচিত)-এর চরমপন্থী কর্মীদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল এক অতি-নৃশংস ঘাতক বাহিনী 'আল-বদর'। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে এই বাহিনীর হিংস্রতা তীব্র রূপ নেয়।
আল-বদর বাহিনীর সদস্যরা ছিল শিক্ষিত ও স্থানীয়ভাবে পরিচিত। তারা সরকারি গেজেটের আলোকেই শহরের প্রতিটি পাড়ায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এবং বিভিন্ন হসপিটালে নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল। কোনো তরুণ বা চিকিৎসক যদি আহত কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে গোপনে সেবা দিতেন, তবে এই আল-বদর সদস্যরা তৎক্ষণাৎ সেই খবর পাকিস্তানি সামরিক হাইকমান্ডের কাছে পৌছে দিত। স্বাধীনতার সূর্য ওঠার ঠিক দুই দিন আগে ১৪ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের আল-বদর বাহিনীই মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
আল-শামস ও রাজাকার বাহিনী: গ্রামীণ নরক গুলজার
আল-শামস: আল-বদর ছাড়াও অন্যান্য ডানপন্থী ধর্মভিত্তিক ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় 'আল-শামস'। তারা মূলত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা, সেতু ও যোগাযোগ কেন্দ্র পাহারা দিত যাতে মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে সাবোটাজ (Sabotage) চালাতে না পারে।
রাজাকার বাহিনী: ১৯৭১ সালের মে মাসে খুলনার সেনারগাতীতে জামায়াত নেতা এ কে এম ইউসুফ ৯৬ জন পাকিস্তানপন্থী কর্মীকে নিয়ে প্রথম 'রাজাকার' বাহিনী গঠন করেন। পরবর্তীতে এটি সরকারিভাবে 'ইস্ট পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স'-এর মাধ্যমে নিয়মিত বেতনভুক্ত বাহিনীতে উন্নীত হয়।
গ্রামাঞ্চলের ক্ষেত্রে এই রাজাকার বাহিনীই ছিল সরকারি গেজেট বাস্তবায়নের মূল হাতিয়ার। তারা ৫০০ বা ১০০০ টাকার লোভ দেখিয়ে গ্রামীণ সমাজের সুবিধাবাদী, চোর-ডাকাত ও ব্যক্তিগত শত্রুতা থাকা মানুষদের তথ্যদাতা বা 'ইনফর্মার' হিসেবে ব্যবহার করত।
সামাজিক বিভাজন, তথ্যদাতা নেটওয়ার্ক ও ব্ল্যাকমেইল
পাকিস্তানি জান্তার এই সরকারি গেজেট কেবল সামরিক কৌশল ছিল না, এটি ছিল একটি গভীর সামাজিকভাবে বিষ ছড়িয়ে দেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র। এর উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক ঐক্য ধ্বংস করে প্রতিটি মানুষকে প্রতিটি মানুষের শত্রুতে পরিণত করা।
ঘরে ঘরে অবিশ্বাসের বীজ বপন: সরকারি গেজেট যখন পত্রিকায় ছাপা হলো এবং হাটে-বাজারে ঢোল পিটিয়ে রাজাকাররা তা প্রচার করতে শুরু করল, তখন সাধারণ পরিবারগুলোর মধ্যে তীব্র মানসিক যন্ত্রণা তৈরি হয়। মা-বাবারা তাঁদের তরুণ ছেলেদের নিয়ে আতঙ্কে রাত কাটাতেন এই ভেবে যে, পাড়ার কোনো অসৎ লোক বা লোভী ব্যক্তি কেবল কয়েকশো টাকার জন্য তাদের ছেলেকে 'মুক্তিযোদ্ধা' বা 'গেরিলা সমর্থক' বলে পাকিস্তানি সেনাদের কাছে ধরিয়ে দেবে না তো?
'ব্লাড মানি' বা রক্তের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন: একাত্তরের সেই চরম সংকটের দিনে এক শ্রেণীর ঘৃণ্য মানসিকতার লোক তৈরি হয়েছিল, যারা টাকার লোভে পাকিস্তানি সেনাদের সাথে চাটুকারিতা করত। তারা রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার পৌঁছে দেওয়া কৃষককে চিহ্নিত করত, ভারতে ট্রেনিং নিতে যাওয়া ছেলেদের পথ আটকে পাকিস্তানি ক্যাম্পে নিয়ে যেত এবং বিনিময় মূল্য হিসেবে সরকারি খাত থেকে ব্লাড মানি (Blood Money) গ্রহণ করত।
মানসিক নতিস্বীকার করানোর অপচেষ্টা: গেজেটের অন্যতম গোপন উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করা। তাদের মেসেজ ছিল এমন:
"তোমরা যাদের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করছ, সেই সাধারণ বাঙালিরাই ৫০০ টাকার লোভে তোমাদের আমাদের হাতে তুলে দেবে। সুতরাং আত্মসমর্পণ করো।"
এটি ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার এক চরম চক্রান্ত।
কেন ব্যর্থ হয়েছিল এই পাকিস্তানী চক্রান্ত?
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের হিসাব-নিকাশ খাতা-কলমে যত নিখুঁত মনে হয়েছিল, বাস্তবতার জমিনে তা ততটাই চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। কয়েক হাজার টাকার লোভ বাঙালি জাতির শতাব্দীর অর্জিত স্বাধীনতার স্বপ্ন ও জাতীয়তাবাদী চেতনার সামনে ভেসে গিয়েছিল।
৫০০ টাকার লোভের চেয়ে দামি ছিল জন্মভূমির স্বাধীনতা
পাকিস্তানি জান্তা বাঙালি জাতির আত্মসম্মান ও দেশপ্রেমকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তারা ভেবেছিল অর্থ দিয়ে সবকিছু কেনা যায়। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ: যে সাধারণ কৃষকের ঘরে নিজের সন্তানদের খাওয়ানোর জন্য এক মুঠো চাল ছিল না, সেই কৃষক নিজের ভিটেমাটি হারানোর ভয় উপেক্ষা করে গভীর রাতে নিজের ঘরে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন।
মায়ের পরম মমতা: বাংলাদেশের মায়েরা নিজেদের সন্তানকে যেভাবে যুদ্ধে পাঠিয়েছেন, তেমনি অচেনা-অজানা মুক্তিযোদ্ধা তরুণদের নিজের পেটের সন্তানের মতো আগলে রেখেছেন। ৫০০ টাকার রাষ্ট্রীয় লোভ তাঁদের নীতি ও দেশপ্রেম থেকে এক চুলও নাড়াতে পারেনি।
কাউন্টার গোয়েন্দা তথ্য ও সাধারণ জনতার ভূমিকা
পরিতাপের বিষয় হলো, পাকিস্তানিরা যে তথ্য নেটওয়ার্ক তৈরি করতে চেয়েছিল, তা উল্টো মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষেই কাজ করেছিল। গ্রামের সাধারণ মানুষই মুক্তিযোদ্ধাদের সতর্ক করে দিত কোথায় কোথায় রাজাকাররা আস্তানা গেড়েছে এবং কার কার কাছে সরকারের গুপ্তচর রয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ কৌশল করে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের ভুয়া খবর দিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় ডেকে এনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রস্তুত রাখা 'অ্যাম্বুশ'-এর মুখে ফেলে দিত। ফলে লোভের ফাঁদ উল্টো পাকিস্তানি হানাদারদের জন্যই মরণফাঁদে পরিণত হয়।
স্বাধীনতার পরবর্তী বিচার, ক্ষোভ ও ঐতিহাসিক দলিল
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। কিন্তু বিজয়ের আনন্দের মাঝেও এই সরকারি গেজেট ও বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষত মুছে যায়নি।
ইতিহাসের দলিল হিসেবে গেজেটের গুরুত্ব: মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দৈনিক 'পূর্বদেশ', 'দৈনিক পাকিস্তান' ও বিভিন্ন সরকারি ফাইনালে সংরক্ষিত এই গেজেটগুলো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত হয়। এই গেজেটটি প্রমাণ করে যে: ১. ১৯৭১ সালের যুদ্ধ কোনো গৃহযুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল একটি সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে একটি সমগ্র জাতির মুক্তি সংগ্রাম। ২. জামায়াতে ইসলামী, আল-বদর ও রাজাকাররা কোনো নিছক রাজনৈতিক দ্বিমত প্রকাশ করেনি; তারা সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং গণহত্যার সহযোগী হিসেবে কাজ করেছিল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও ঐতিহাসিক বিচার: স্বাধীনতার দীর্ঘ চার দশক পর ২০১০ সালে গঠিত 'আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল' (International Crimes Tribunal - ICT)-এ যখন একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়, তখন এই সকল সংবাদপত্রের কাটিং ও সরকারি আদেশ প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
আল-বদর ও শান্তি কমিটির শীর্ষনেতা যেমন মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান এবং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীদের বিরুদ্ধে আনীত অপরাধের প্রমাণে এই ঐতিহাসিক নথিপত্রগুলো সহায়ক ভুমিকা পালন করে। আদালতের রায়ে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি আংশিকভাবে হলেও চার দশকের পুঞ্জীভূত কলঙ্ক থেকে মুক্ত হয়।
কেন এই গেজেট ও ইতিহাস নতুন প্রজন্মের জানা জরুরি?
আজকের স্বাধীন ও আধুনিক বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন আমরা উন্নত সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি, তখন ১৯৭১ সালের এই অন্ধকার ইতিহাস এবং এদেশীয় গাদ্দারদের ঘৃণ্য রূপ জানা নতুন প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
সততা ও অদম্য দেশপ্রেমের শিক্ষা: এই গেজেট আমাদের শেখায় যে, কোনো পরাশক্তি বা অর্থ দিয়ে একটি জাগ্রত জাতিকে কখনো দমিত করে রাখা যায় না। ৫০০ টাকার সরকারি লোভের বিপরীতে আমাদের পূর্বপুরুষরা যে অদম্য দেশপ্রেমের নজির স্থাপন করে গেছেন, তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।
ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে ঢাল: বিভিন্ন সময়ে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এবং তাদের উত্তরসূরিরা ইতিহাস বিকৃত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। তারা দাবি করতে চায় যে তারা কেবল 'পাকিস্তানের অখণ্ডতা' চেয়েছিল, কোনো অপরাধের সাথে যুক্ত ছিল না। কিন্তু ১৯৭১ সালের এই সরকারি গেজেট, সংবাদপত্রের পাতা এবং তাদেরই প্রাকাশ্যে দেওয়া সাক্ষাৎকার প্রমাণ করে তারা কীভাবে সামান্য অর্থের লোভ ও ক্ষমতার জন্য নিজের দেশের ভাইবোনদের জীবন শত্রুর হাতে তুলে দিয়েছিল।
উপসংহার
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের দোসরদের প্রচারিত সেই সরকারি গেজেটটি ছিল মূলত একটি মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডির ক্ষুদ্র এক অন্ধকার অংশ। টাকার লোভে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দেওয়ার সেই ব্যর্থ চক্রান্ত একদিকে যেমন প্রকাশ করে হানাদারদের চরম ভীতি ও নৈতিক পরাজয়, অন্যদিকে তেমনি বিশ্বের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখে দিয়ে যায় সাধারণ বাঙালি জাতির অকৃত্রিম সততা, অসীম সাহস ও স্বদেশের প্রতি অবিচল ভালোবাসার কথা।
আজ যখন আমরা মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিই, তখন আমাদের মনে রাখতে হবে এই পতাকার প্রতিটি সুতায় লেগে আছে হাজারো শহীদ ও লাঞ্ছিত মা-বোনের রক্ত, আর তার সাথে মিশে আছে শত আর্থিক প্রলোভন ও নির্যাতনকে তুচ্ছজ্ঞান করা সাধারণ বাঙালির ত্যাগ। ৫০০ টাকার ঘৃণ্য গেজেট মুছে গেছে ইতিহাসের ডাস্টবিনে, কিন্তু বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নাম এবং তাঁদের প্রতি সাধারণ জনগণের ভালোবাসা অমর হয়ে আছে ও থাকবে অনন্তকাল। একাত্তরের এই রক্তভেজা দলিল আমাদের চিরকাল স্মরণ করিয়ে দেবে স্বদেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি ইতিহাস কখনোই মাফ করে না।















