>

>

স্বাধীনতার ঘোষক বনাম মুক্তিযুদ্ধের স্থপতি - ইতিহাস ও নেতৃত্ব

স্বাধীনতার ঘোষক বনাম মুক্তিযুদ্ধের স্থপতি - ইতিহাস ও নেতৃত্ব

বংশপরম্পরায় বা চায়ের আড্ডায় বাঙালি পরিবারের মাঝে মাঝে এমন কিছু বিতর্ক তৈরি হয়, যা আপাতদৃষ্টে সরল মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে থাকে একটি জাতির ইতিহাস, রাজনীতি এবং মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। উদ্দীপকে উল্লিখিত ভাতিজা এবং ৬০ বছরের চাচার মধ্যকার কথপোকথনটি কেবল একটি পারিবারিক যুক্তিতর্ক নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং তরুণ প্রজন্মের মাঝে ইতিহাসের খণ্ডিত ধারণার একটি জীবন্ত প্রতিফলন।

TruthBangla

গ্রামে একটা প্রচলিত উদ্দীপকসূত্রে একটা ঘটনা বর্ণনা করলাম। ২০/২২ বছরের ভাতিজা কইলো, শেখ মুজিব কি মুক্তিযুদ্ধ করছে? জিয়াউর রহমান যুদ্ধ করসে, স্বাধীনতার ঘোষণা দিসে এবং মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার।

তার ৬০ বছর বয়সী চাচায় কয় দিমু এক চটকানা, শেখ মুজিব হইলো মুক্তিযুদ্ধের জন্মদাতা। তুই কি কোনদিন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা কে ক্লাস নিতে দেখেছিস?

ভাতিজা বললো না, তাইলে বেতন ভোগী ক্লাস টিচারের লগে স্কুলের প্রতিষ্ঠাতার তুলনা দেস কেমনে?

তখন ভাতিজা খানিকটা মিন মিন কইরা পুনরায় কইলো শেখ মুজিব তো যুদ্ধের

সময় পাকিস্তানে ছিল। চাচায় কয়, “হ ! বাংলাদেশ জন্ম দেওয়ার অপরাধে তারে

পাকিস্তানী আর্মি ধইরা নিয়া গেছিল তোর জন্মের সময়ও তোর বাবা বিদেশে ছিলো, তাই বলে কি রাস্তাঘাটে চোর বাটপাররে ধইরা ধইরা বাপ ডাকবি নাকি?

বংশপরম্পরায় বা চায়ের আড্ডায় বাঙালি পরিবারের মাঝে মাঝে এমন কিছু বিতর্ক তৈরি হয়, যা আপাতদৃষ্টে সরল মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে থাকে একটি জাতির ইতিহাস, রাজনীতি এবং মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। উদ্দীপকে উল্লিখিত ভাতিজা এবং ৬০ বছরের চাচার মধ্যকার কথপোকথনটি কেবল একটি পারিবারিক যুক্তিতর্ক নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং তরুণ প্রজন্মের মাঝে ইতিহাসের খণ্ডিত ধারণার একটি জীবন্ত প্রতিফলন।

খণ্ডিত ইতিহাস বনাম সামগ্রিক ইতিহাস

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের পরবর্তী সময়টাতে ইতিহাসের এক ধরনের পরিকল্পিত পুনর্বিন্যাস বা বি-রাজনীতিকরণের চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে একটি বড় সময় ধরে পাঠ্যপুস্তক, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক বক্তৃতায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা তরুণ প্রজন্মের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করে।

মেজর জিয়াউর রহমানের প্রত্যক্ষ ভূমিকা: তিনি সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, যুদ্ধ করেছেন এবং কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালোরাত্রিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন এবং নয় মাস পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন।

এই দুটি সত্যকে যখন ইতিহাসের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা হয়, তখন একজন তরুণের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক "যিনি যুদ্ধে সশরীরে ছিলেন না, তিনি কীভাবে যুদ্ধের প্রধান নায়ক হন?" কিন্তু ইতিহাস কখনোই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; ইতিহাস একটি দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা বনাম বেতনভোগী শিক্ষক

"তুই কি কোনদিন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা কে ক্লাস নিতে দেখেছিস? ... তাইলে বেতন ভোগী ক্লাস টিচারের লগে স্কুলের প্রতিষ্ঠাতার তুলনা দেস কেমনে?"

চাচা এখানে অত্যন্ত চমৎকার এবং সহজবোধ্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপক ব্যবহার করেছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'Architect of the State' (রাষ্ট্রের স্থপতি) বনাম 'Executor of the Plan' (পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী)

একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে যে শ্রম, দূরদর্শিতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়, তার সঙ্গে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার হুবহু মিল রয়েছে।

ক) শেখ মুজিবুর রহমানের 'প্রতিষ্ঠাতা' ভূমিকা (১৯৪৮-১৯৭১)

একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ হঠাৎ করে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ জন্ম নেয়নি। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ ২৩ বছরের একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলন, যার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৪৮-৫২ (ভাষা আন্দোলন): বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম বীজ রোপিত হয় ভাষার মাধ্যমে। শেখ মুজিব এই আন্দোলনের প্রথম সারির সংগঠক ছিলেন এবং জেলে কাটিয়েছেন।

১৯৫৪ (যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন): মুসলিম লীগের একচেটিয়া শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালিদের প্রথম রাজনৈতিক বিজয়।

১৯৬৬ (ছয় দফা আন্দোলন): এটিকে বলা হয় 'বাঙালির ম্যাগনা কার্টা' বা মুক্তির সনদ। এই ছয় দফার ভেতরেই মূলত স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার বীজ লুকিয়ে ছিল।

১৯৬৯ (গণঅভ্যুত্থান): ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং শেখ মুজিব 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা।

১৯৭০ (সাধারণ নির্বাচন): এটি ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (১৬৭/১৬৯ আসন) লাভ করে। এই নির্বাচন বঙ্গবন্ধুকে সমগ্র বাঙালি জাতির পক্ষে কথা বলার এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র আইনি ও গণতান্ত্রিক অধিকার (Democratic Mandate) প্রদান করে।

খ) 'ক্লাস টিচার' বা বাস্তবায়নকারীর ভূমিকা

একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার পর সেখানে ক্লাস নেওয়ার জন্য শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। শিক্ষকরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন, তারা সরাসরি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেন (রণাঙ্গনে যুদ্ধ করার মতো)। কিন্তু শিক্ষকের চাকরি, বেতন এবং ক্লাসের অস্তিত্ব নির্ভর করে স্কুলটি টিকে থাকার ওপর।

১৯৭১ সালে মেজর জিয়াউর রহমানসহ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসাররা, ইপিআর, আনসার এবং সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা যে বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ করেছিলেন, তা ছিল সেই 'ক্লাস নেওয়ার' মতো। তারা ছিলেন দেশের বীর সন্তান ও পেশাদার সৈনিক। কিন্তু তারা কার অধীনে, কোন আইনি অধিকারে যুদ্ধ করছিলেন? তারা যুদ্ধ করছিলেন ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়ী জনপ্রতিনিধিদের গঠিত 'মুজিবনগর সরকার'-এর অধীনে, যার রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

স্বাধীনতার ঘোষণা এবং আইনি বৈধতা (Legitimacy)

ভাতিজার একটি বড় যুক্তি ছিল জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। এখানে ইতিহাসের নিখাদ সত্যটি জানা জরুরি।

২৭শে মার্চ ১৯৭১ তারিখে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান যে ঘোষণাটি পাঠ করেছিলেন, তার শুরুটা ছিল এমন:

"I, Major Ziaur Rahman, on behalf of our Great Leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, do hereby declare the independence of Bangladesh..."

(আমি, মেজর জিয়াউর রহমান, আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি...)

ঘোষণা বনাম সার্বভৌমত্বের অধিকার

আন্তর্জাতিক আইন (International Law) অনুযায়ী, যেকোনো ব্যক্তি চাইলেই একটি দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন না। যদি কোনো সামরিক কর্মকর্তা হঠাৎ করে একটি দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাকে 'বিদ্রোহী' বা 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' (Mutineer or Separatist) হিসেবে গণ্য করে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার একমাত্র কারণ ছিল এর পেছনে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গণরায় ছিল। বঙ্গবন্ধু ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে (২৫শে মার্চ রাত ১২টা ২০ মিনিটের পর) ওয়ারলেসের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। জিয়াউর রহমানসহ অন্যান্যরা পরবর্তীতে সেই ঘোষণাই পুনর্ব্যক্ত করেন।

মানদণ্ড

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

মেজর জিয়াউর রহমান

রাজনৈতিক অবস্থান

জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি ও অবিসংবাদিত জাতীয় নেতা।

সেনাবাহিনীর একজন মেজর (চাকরিজীবী)।

আইনি কর্তৃত্ব

১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে প্রাপ্ত সর্বময় ক্ষমতা।

সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক বা আইনি ম্যান্ডেট ছিল না।

ভূমিকা

স্বাধীনতার মূল পরিকল্পনাকারী, নির্দেশক এবং প্রতীক।

নির্দেশ বাস্তবায়নকারী, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সেক্টর কমান্ডার।

আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি

বিশ্বনেতারা তাকে বাংলাদেশের প্রধান হিসেবে দেখতেন।

তাকে একজন বীর বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তা হিসেবে দেখা হতো।

বাবার অনুপস্থিতি এবং পিতৃত্বের অধিকার

"বাংলাদেশ জন্ম দেওয়ার অপরাধে তারে পাকিস্তানী আর্মি ধইরা নিয়া গেছিল। তোর জন্মের সময়ও তোর বাবা বিদেশে ছিলো, তাই বলে কি রাস্তাঘাটে চোর বাটপাররে ধইরা ধইরা বাপ ডাকবি নাকি?"

চাচার এই দ্বিতীয় রূপকটি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, কিছুটা রূঢ় হলেও সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত গভীর। এটি মূলত 'জাতির পিতা' (Father of the Nation) ধারণার যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করে।

ক) কেন বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে বন্দী ছিলেন?

বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে চাইলে আত্মগোপনে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি সচেতনভাবেই তা করেননি। তিনি জানতেন, তিনি যদি পালিয়ে যান, তবে পাকিস্তানি জান্তা পুরো ঢাকাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবে এবং আন্তর্জাতিক মহলে প্রচার করবে যে, "শেখ মুজিব ভারতের সহায়তায় পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে পালিয়ে গেছেন।"

নিজের জীবন উৎসর্গ করে তিনি নিজ বাসভবনে অবস্থান করেন এবং গ্রেফতার বরণ করেন। এই গ্রেফতার বরণ ছিল একটি রাজনৈতিক কৌশল। এর ফলে:

১. বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে প্রমাণিত হয় যে, পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর অন্যায়ভাবে সামরিক হামলা চালিয়েছে।

২. বাঙালি জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধ একটি বৈধ আত্মরক্ষার যুদ্ধ (War of Self-Defense) হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়।

খ) অনুপস্থিতি কি অবদানকে অস্বীকার করে?

একটি শিশুর জন্মের সময় তার বাবা যদি জীবিকার তাগিদে বা কোনো অনিবার্য কারণে বিদেশে বা কারাগারে থাকেন, তবে কি শিশুর পিতৃত্ব বদলে যায়? কখনোই না। কারণ শিশুটির অস্তিত্বের মূল কারণ হলেন তার পিতা।

ঠিক তেমনি, নয় মাস বঙ্গবন্ধু সশরীরে বাংলাদেশে ছিলেন না, কিন্তু পুরো মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে তাঁর নামে, তাঁর ছবিকে সামনে রেখে। মুক্তিযোদ্ধাদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা এবং রণধ্বনি ছিল "জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু"। মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তাঁরই অর্পিত ক্ষমতা বলে।

সুতরাং, ভৌগোলিক অনুপস্থিতি কখনো রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক 'পিতৃত্ব'কে খর্ব করতে পারে না।

তরুণ প্রজন্মের বিভ্রান্তি - কারণ ও প্রতিকার

ভাতিজার এই মানসিকতা বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির একটি বড় সংকটের চিত্র তুলে ধরে। তরুণ প্রজন্ম কেন ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্ত হয়?

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ইতিহাস চর্চা: ১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘ ২১ বছর এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করা হয়েছে। এক পক্ষ বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে, অন্য পক্ষ আবার অনেক সময় বাকিদের অবদানকে খাটো করে দেখেছে।

পপ-কালচার এবং তাৎক্ষণিকতার প্রভাব: বর্তমান তরুণ প্রজন্ম দীর্ঘ প্রক্রিয়া বা রাজনৈতিক দর্শনের চেয়ে 'ইনস্ট্যান্ট অ্যাকশন' বা তাৎক্ষণিক বীরত্বকে বেশি পছন্দ করে। তাদের কাছে মনে হয়, যিনি বন্দুক হাতে যুদ্ধ করছেন বা রেডিওতে ঘোষণা দিচ্ছেন, তিনিই একমাত্র নায়ক। কিন্তু সেই বন্দুকের ট্রিগারে আঙুল তোলার পেছনের যে ২৩ বছরের রাজনৈতিক প্রস্তুতি, তা তারা অনুধাবন করতে পারে না।

বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের অভাব: পাঠ্যপুস্তকে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাস লেখার কারণে তরুণেরা প্রকৃত সত্য উদঘাটনে বিভ্রান্ত হয়।

সমন্বিত ইতিহাসের প্রয়োজনীয়তা

উদ্দীপকের আড্ডার শেষাংশে ভাতিজার 'মিন মিন' করা স্বর প্রমাণ করে যে, সত্য এবং যৌক্তিক রূপকের সামনে খণ্ডিত যুক্তি টিকতে পারে না।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি কোনো একক ব্যক্তির জাদুদণ্ডে তৈরি হয়নি। তবে এই রাষ্ট্র সৃষ্টির একটি নির্দিষ্ট 'নিউক্লিয়াস' বা কেন্দ্রবিন্দু ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সেই কেন্দ্রবিন্দু, যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে পুরো বাঙালি জাতি।

মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি, একজন বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর অবদানকে ছোট করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু তাঁর অবদান আর বঙ্গবন্ধুর অবদান এক পাল্লায় মাপা ঐতিহাসিক অবিচার। একজন হলেন রাষ্ট্রের স্থপতি (Founder), আর অন্যজন হলেন সেই রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ডিফেন্ডার বা ফ্রন্টলাইন ফাইটার (Fighter)।

চাচার এই গ্রামীণ ও সহজ রূপক দুটি আমাদের চোখ খুলে দেয়। এটি আমাদের শেখায় যে, ইতিহাসের ক্লাস টিচারকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে যেন আমরা স্কুলের প্রতিষ্ঠাতাকে ভুলে না যাই এবং যুদ্ধের ময়দানের সেনাপতিকে সম্মান করতে গিয়ে যেন জাতির পিতাকে অস্বীকার না করি। একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে টিকে থাকতে হলে তরুণ প্রজন্মকে ইতিহাসের এই সামগ্রিক সত্যটিকে মেনে নিতেই হবে।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Apr 14, 2026

/

Post by

২৫ মার্চ, ১৯৭১। বাঙালির ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় কালরাত। সেই রাতে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক এক নৃশংস নিধনযজ্ঞের মাধ্যমে বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। এই যজ্ঞের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালির জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রাণকেন্দ্র। সেই রাতে হানাদার বাহিনী কেবল সাধারণ মানুষকেই হত্যা করেনি, তারা বেছে বেছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান আমাদের শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের ওপর চালিয়েছিল বর্বরোচিত আক্রমণ।

Apr 14, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ। পুরো বাংলাদেশ যখন এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে দাঁড়িয়ে, তখন চট্টগ্রামের পাহাড় ঘেরা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে রচিত হচ্ছিল ইতিহাসের এক পৈশাচিক ট্র্যাজেডি। সেদিন রাতে অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনী তাদেরই সহকর্মী, নিরস্ত্র এবং ঘুমন্ত বাঙালি সেনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সমরাস্ত্রের গর্জনে কেঁপে উঠেছিল চট্টগ্রামের আকাশ, আর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ইবিআরসির পবিত্র মাটি।

Mar 23, 2026

/

Post by

দায়িত্ব কাকে বলে? ছবিটি মুক্তিযুদ্ধের ঈদের দিনে রৌমারী সীমান্তে এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধার। হাতে রাইফেল ও গামছা কাঁধে অচেনা এই তরুণ মুক্তিযোদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন সতর্ক পাহারায়। আমাদের জাতীয় জীবনে যে ঈদটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। একাত্তরের ঈদের দিনটি এসেছিলো ভীষণ অচেনা রূপে। চিরায়ত আনন্দ উচ্ছ্বাসের বদলে ঈদের দিনটি ছিল উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগের। রণাঙ্গনে এই দিনটি ছিল লড়াইয়ের।

Feb 4, 2026

/

Post by

ঢাকা যখন ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের উল্লাসে মাতোয়ারা, মিরপুর তখনো ছিল এক অবরুদ্ধ জল্লাদখানা। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে এই জনপদ মুক্ত হতে সময় লেগেছিল আরও দেড় মাস। মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের মুসলিম বাজারে অবস্থিত শহীদ বুদ্ধিজীবী জামে মসজিদ। মসজিদের বাকি সবগুলো পিলারই সাদা, শুধু এই পিলারটিই কালো। কিন্তু এই পিলারটি কালো কেন? কারণ এই পিলারটির নিচেই ছিল মুক্তিযুদ্ধের এক ভয়ঙ্কর এক বধ্যভূমি।

Feb 2, 2026

/

Post by

গাবতলী-আমিনবাজারের সেই পুরনো লোহার ব্রিজ আজ আর নেই। কয়েক বছর আগে একটি বাল্কহেডের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সেটি ভেঙে সেখানে তৈরি হয়েছে আধুনিক ছয় লেনের প্রসস্থ সেতু। কিন্তু আধুনিকতার এই প্রলেপ কি মুছে দিতে পেরেছে সেই মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা আর্তনাদ? সেই নদীর জলে মিশে থাকা হাজারো প্রাণের রক্ত? ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই একটি মাত্র ব্রিজে যে বীভৎসতা ঘটেছিল, তা শুনলে আজও শিউরে ওঠে মানুষের হৃদয়।

Feb 1, 2026

/

Post by

একাত্তরের রক্তঝরা দিনগুলোতে যখন আপামর বাঙালি স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর, ঠিক তখন পাক-হানাদার বাহিনীকে সরাসরি সহযোগিতা করতে গড়ে উঠেছিল কয়েকটি কুখ্যাত আধাসামরিক বাহিনী। যাদের নাম শুনলে আজও বাংলার মানুষের মনে ঘৃণা ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। রাজাকার, আলবদর ও আলশামস নামগুলো আলাদা হলেও তাদের লক্ষ্য ছিল অভিন্ন: মুক্তিকামী বাঙালিদের দমানো এবং পাকিস্তানিদের অখণ্ডতা রক্ষা করা।

Apr 14, 2026

/

Post by

২৫ মার্চ, ১৯৭১। বাঙালির ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় কালরাত। সেই রাতে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক এক নৃশংস নিধনযজ্ঞের মাধ্যমে বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। এই যজ্ঞের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালির জ্ঞান-বিজ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রাণকেন্দ্র। সেই রাতে হানাদার বাহিনী কেবল সাধারণ মানুষকেই হত্যা করেনি, তারা বেছে বেছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান আমাদের শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের ওপর চালিয়েছিল বর্বরোচিত আক্রমণ।

Apr 14, 2026

/

Post by

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ। পুরো বাংলাদেশ যখন এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে দাঁড়িয়ে, তখন চট্টগ্রামের পাহাড় ঘেরা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে রচিত হচ্ছিল ইতিহাসের এক পৈশাচিক ট্র্যাজেডি। সেদিন রাতে অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনী তাদেরই সহকর্মী, নিরস্ত্র এবং ঘুমন্ত বাঙালি সেনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সমরাস্ত্রের গর্জনে কেঁপে উঠেছিল চট্টগ্রামের আকাশ, আর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ইবিআরসির পবিত্র মাটি।

Mar 23, 2026

/

Post by

দায়িত্ব কাকে বলে? ছবিটি মুক্তিযুদ্ধের ঈদের দিনে রৌমারী সীমান্তে এক তরুণ মুক্তিযোদ্ধার। হাতে রাইফেল ও গামছা কাঁধে অচেনা এই তরুণ মুক্তিযোদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন সতর্ক পাহারায়। আমাদের জাতীয় জীবনে যে ঈদটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। একাত্তরের ঈদের দিনটি এসেছিলো ভীষণ অচেনা রূপে। চিরায়ত আনন্দ উচ্ছ্বাসের বদলে ঈদের দিনটি ছিল উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগের। রণাঙ্গনে এই দিনটি ছিল লড়াইয়ের।

Feb 4, 2026

/

Post by

ঢাকা যখন ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের উল্লাসে মাতোয়ারা, মিরপুর তখনো ছিল এক অবরুদ্ধ জল্লাদখানা। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে এই জনপদ মুক্ত হতে সময় লেগেছিল আরও দেড় মাস। মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের মুসলিম বাজারে অবস্থিত শহীদ বুদ্ধিজীবী জামে মসজিদ। মসজিদের বাকি সবগুলো পিলারই সাদা, শুধু এই পিলারটিই কালো। কিন্তু এই পিলারটি কালো কেন? কারণ এই পিলারটির নিচেই ছিল মুক্তিযুদ্ধের এক ভয়ঙ্কর এক বধ্যভূমি।

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.