একাত্তরে গোপালগঞ্জ গণহত্যা ও উত্তাল গোপালগঞ্জ
বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য জনপদ গোপালগঞ্জ। এই জনপদ কেবল একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। মধুমতী ও আড়িয়াল খাঁর পলিবিধৌত এই জনপদ থেকেই উঠে এসেছিলেন বাঙালির মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান। একাত্তরের রণাঙ্গনে এই মাটি ভিজেছে বীর সন্তানদের রক্তে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই জনপদের মানুষের ত্যাগ, লড়াই এবং বীরত্বগাথা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।

TruthBangla

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য জনপদ গোপালগঞ্জ। এই জনপদ কেবল একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। মধুমতী ও আড়িয়াল খাঁর পলিবিধৌত এই জনপদ থেকেই উঠে এসেছিলেন বাঙালির মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান। একাত্তরের রণাঙ্গনে এই মাটি ভিজেছে বীর সন্তানদের রক্তে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই জনপদের মানুষের ত্যাগ, লড়াই এবং বীরত্বগাথা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। আজকের ব্লগে আমরা ফিরে যাব ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে, যেখানে প্রতিরোধের আগুন জ্বলেছিল গোপালগঞ্জের প্রতিটি ধূলিকণায়। জানব কীভাবে গোপালগঞ্জ সদর, টুঙ্গিপাড়া, কাশিয়ানী ও কোটালীপাড়া পাকিস্তানি হানাদারদের কবল থেকে মুক্ত হয়েছিল।
গোপালগঞ্জ - বাঙালির জাতীয়তাবাদের সূতিকাগার
পাকিস্তান আমলে গোপালগঞ্জ ছিল ফরিদপুর জেলার একটি অন্যতম মহকুমা। প্রশাসনিকভাবে এর অধীনে ছিল তিনটি থানা সদর, কোটালীপাড়া ও কাশিয়ানী। ভৌগোলিকভাবে বাওর ও নদীবেষ্টিত এই নিভৃত জনপদটিই যে একদিন বিশ্বমানচিত্রে একটি স্বাধীন দেশের অভ্যুদয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে, তা হয়তো অনেকেই ভাবেননি।
গোপালগঞ্জ সদর থানার পাটগাতি ইউনিয়নের একটি ছায়াঘেরা গ্রাম টুঙ্গিপাড়া। এখানেই জন্ম নিয়েছিলেন টুঙ্গিপাড়ার সেই 'খোকা', যিনি পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর শৈশব ও কৈশোরের বড় একটা সময় এখানে কাটায় এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের সাথে তাঁর নাড়ির টান ছিল আজন্ম।
প্রত্যন্ত অঞ্চল হলেও গোপালগঞ্জ কখনও রাজনৈতিক সচেতনতায় পিছিয়ে ছিল না। বঙ্গবন্ধুর প্রভাবেই এই প্রত্যন্ত মহকুমাটি বাঙালির জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম প্রধান দুর্গে পরিণত হয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল সবখানেই এখানকার মানুষের সরব উপস্থিতি ছিল। শুরুর দিকে এই অঞ্চলে দীর্ঘকাল মুসলিম লীগের প্রভাব থাকলেও বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এখানকার মানুষ দ্রুতই বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়। ফলে ৭০-এর নির্বাচনেই বোঝা গিয়েছিল, গোপালগঞ্জ হয়ে উঠেছে নৌকার দুর্ভেদ্য দুর্গ।
প্রশিক্ষণ শিবির ও সংগ্রাম পরিষদ
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ যখন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিলেন, তার ঢেউ আছড়ে পড়ল গোপালগঞ্জের প্রতিটি প্রান্তে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পাওয়া মাত্রই গোপালগঞ্জের তিনটি থানায় শুরু হয় যুদ্ধের প্রস্তুতি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির সহযোগিতায় গঠিত হলো 'সংগ্রাম পরিষদ'। এই পরিষদের মূল লক্ষ্য ছিল তরুণদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা।
তরুণ সমাজকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে মহকুমার বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ শিবির খোলা হলো। শুধু থানা সদরেই নয়, বরং প্রত্যন্ত ইউনিয়ন পর্যায়েও এই প্রশিক্ষণ ছড়িয়ে পড়েছিল। টুঙ্গিপাড়াতেও যুবকেরা বাঁশের লাঠি আর ডামি রাইফেল নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। বাঙালির চোখে তখন একটাই স্বপ্ন একটি স্বাধীন দেশ।
২৬শে মার্চের সাহসিকতা
২৬শে মার্চ যখন ঢাকায় ক্র্যাকডাউন শুরু হয় এবং বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, গোপালগঞ্জের মানুষ বসে থাকেনি। সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ওই দিনই গোপালগঞ্জ পুলিশ লাইনস, ট্রেজারি এবং বৌলতলী পুলিশ ফাঁড়িসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করা হয়। শুধু সাধারণ মানুষই নয়, সাহসী পুলিশ ও আনসার সদস্যরা নিজেদের অস্ত্র নিয়ে সাধারণ মানুষের কাতারে এসে দাঁড়ান।
ঢাকা থেকে পালিয়ে আসা কয়েকজন ইপিআর (EPR) সদস্য যুক্ত হওয়ায় প্রতিরোধের শক্তি ও মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বহুগুণ বেড়ে যায়। শহরের প্রবেশের প্রধান পথ মানিকদাহ ঘাটে গড়ে তোলা হয় একটি সম্মিলিত প্রতিরক্ষাব্যূহ।
যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন ও নেতৃত্ব
গোপালগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য দক্ষ এবং অকুতোভয় নেতৃত্বের অভাব ছিল না। যুদ্ধের শুরুতেই কমান্ড কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল।
গোপালগঞ্জ সদর: সদর উপজেলার মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শেখ লুৎফর রহমান ওরফে বাচ্চু চৌধুরী।
মুজিব বাহিনী: গোপালগঞ্জ মহকুমা মুজিব বাহিনীর কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন ইসমত কাদির গামা।
হেমায়েত বাহিনী: কোটালীপাড়া অঞ্চলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হেমায়েত উদ্দিন (বীর বিক্রম) নিজের নামে এক বিশাল বাহিনী গঠন করেন। শুধু কোটালীপাড়াই নয়, গোপালগঞ্জ সদর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলেও তাঁর বাহিনীর বীরত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো।
ক্যাপ্টেন জালাল আহম্মেদ: পাকিস্তান সেনাবাহিনী ত্যাগ করে আসা ক্যাপ্টেন জালাল আহম্মেদ ছিলেন একজন পেশাদার সেনাকর্মকর্তা। তাঁর নেতৃত্বে মানিকদাহ ও পোদ্দারের চর এলাকায় ডিফেন্স লাইন তৈরি করা হয়, যেখানে প্রায় ১০০ জন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানি সেনাদের প্রথম আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন।
কমান্ডারের নাম | দায়িত্ব ও অঞ্চল |
শেখ লুৎফর রহমান (বাচ্চু চৌধুরী) | কমান্ডার, মুক্তিবাহিনী, গোপালগঞ্জ সদর |
ইসমত কাদির গামা | কমান্ডার, মুজিব বাহিনী, গোপালগঞ্জ মহকুমা |
হেমায়েত উদ্দিন (বীর বিক্রম) | প্রধান, হেমায়েত বাহিনী, কোটালীপাড়া |
ক্যাপ্টেন জালাল আহম্মেদ | সামরিক কৌশলী ও প্রতিরক্ষা পরিচালক |
পাকবাহিনীর অনুপ্রবেশ ও মিনি ক্যান্টনমেন্টের বিভীষিকা
৩০শে এপ্রিল দিনটি গোপালগঞ্জবাসীর জন্য ছিল এক বিভীষিকাময় দিন। মেজর ঘোরীর নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে গোপালগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে। তারা তৎকালীন সিও অফিস (বর্তমান সদর উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স) দখল করে সেখানে একটি মিনি ক্যান্টনমেন্ট স্থাপন করে। এই সিও অফিসটিই পরবর্তী ৯ মাস হয়ে ওঠে বিভীষিকা ও মৃত্যুর আরেক নাম।
এই মিনি ক্যান্টনমেন্টটি ছিল মূলত একটি নির্যাতন কেন্দ্র ও বন্দিশিবির। বিভিন্ন গ্রাম থেকে নারী-পুরুষদের ধরে এনে এখানে অমানবিক নির্যাতন করা হতো। কমপ্লেক্সের পাশের পদ্মপুকুর (যা বর্তমানে 'জয়বাংলা পুকুর' নামে পরিচিত) ছিল পাকবাহিনীর বধ্যভূমি। প্রতিদিন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাকে এখানে গুলি করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হতো।
গোপালগঞ্জের গণহত্যা ও নৃশংসতা
পাকবাহিনী গোপালগঞ্জে ঢুকেই তাদের পোড়ামাটি নীতি বাস্তবায়ন শুরু করে। শহরে প্রবেশের পরপরই শুরু হয় ধ্বংসলীলা। স্থানীয় রাজাকার ও দোসরদের সহায়তায় তারা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা এবং আওয়ামী লীগ কর্মীদের বাড়িতে হামলা চালায়।
১. ব্যাংকপাড়া ও সাহাপাড়া আক্রমণ: ৩০শে এপ্রিল শহরে ঢুকেই তারা ব্যাংকপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর বাড়ি, চৌরঙ্গীর মোড়ে আব্দুল লতিফের বাসভবন এবং আওয়ামী লীগ অফিসে অগ্নিসংযোগ করে। এছাড়া স্বর্ণপট্টি, সাহাপাড়া বাজার রোড ও হীরাবাড়ি রোডের বাড়িঘর লুট করে আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
২. মানিকহার গণহত্যা: রাজাকার রঙ্গু সিকদারের উসকানিতে পাকবাহিনী মানিকহার গ্রামে হামলা চালায়। সেখানে বাদশা মোল্যার বাড়িসহ বহু ঘরে আগুন দেওয়া হয়। তারা বাদশা মোল্যাসহ তাঁর পরিবারের ৮ জন সদস্যকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। এটি ইতিহাসে মানিকহার গণহত্যা নামে পরিচিত।
৩. পাইককান্দি গণহত্যা: পাইককান্দি গ্রামে পাকবাহিনী যে তান্ডব চালিয়েছিল, তা শুনলে আজও শিউরে উঠতে হয়। নওশের আলী চৌধুরীর বাড়িতে ঢুকে তারা ১৩ জনকে হত্যা করে। এরপর একে একে তাহাজ্জদ আলী মাস্টার ও আফসার আলী চৌধুরীসহ অসংখ্য নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়।
৪. শহীদ বুদ্ধিজীবী সন্তোষ কুমার দাস: তৎকালীন কায়েদ-ই আযম মেমোরিয়াল কলেজের (বর্তমান সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজ) দর্শনের প্রভাষক সন্তোষ কুমার দাসকে এই নরপিশাচরা নির্মমভাবে হত্যা করে। এছাড়া বৌলতলী, সাতপাড় ও গান্ধিয়াশুর গ্রামেও লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত থাকে।
টুঙ্গিপাড়ার বীরত্ব ও বঙ্গবন্ধুর বাড়ির রক্তাত্ব ইতিহাস
টুঙ্গিপাড়া যেই নামটির সাথে মিশে আছে বাঙালির অস্তিত্ব। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তাঁর বৃদ্ধ পিতামাতা শেখ লুৎফর রহমান এবং সায়েরা খাতুন টুঙ্গিপাড়ার পৈতৃক বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। তাঁদের নিরাপত্তা এবং বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত এই ঘরটি রক্ষা করতে স্থানীয় একদল যুবক এগিয়ে আসেন। টুঙ্গিপাড়ার যুবকরা জীবন বাজি রেখে নেতার বাড়ি পাহারা দেওয়ার শপথ নেয়। মিন্টু শেখ, ধলা মিয়া শেখ, আরশাদ শেখ, তোরাব আলী এবং বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গৃহকর্মী ইকুসহ আরও অনেকে দিনরাত টহল দিতেন।
তাঁরা কোনো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনা ছিলেন না, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা তাঁদের দিয়েছিল অসীম সাহস। হাতে সাধারণ লাঠি কিংবা সামান্য অস্ত্র নিয়ে তাঁরা দিনরাত পালা করে বাড়িটি পাহারা দিতেন। তাঁদের এই ত্যাগের কথা আজও টুঙ্গিপাড়ার প্রবীণদের মুখে মুখে ফেরে।
১৯শে মে - টুঙ্গিপাড়ার ইতিহাসে অভিশপ্ত দিন
১৯৭১ সালের মে মাস। চারদিকে তখন পাক বাহিনীর ধ্বংসলীলা চলছে। পাকিস্তানি গোয়েন্দারা খবর পায় যে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে নিয়মিত টহল দিচ্ছে একদল যুবক এবং সেখানেই বঙ্গবন্ধুর বৃদ্ধ বাবা-মা অবস্থান করছেন। এই খবর পাওয়ার পর পাকিস্তানি সেনারা টুঙ্গিপাড়ায় এক ভয়াবহ অপারেশনের পরিকল্পনা করে।
১৯৭১ সালের ১৯শে মে ছিল টুঙ্গিপাড়ার জন্য এক অভিশপ্ত দিন। ভোরের আলো ফোটার আগেই প্রায় ১৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাকিস্তানি সেনা দল আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বিশাল এক লঞ্চে করে মধুমতী নদী হয়ে টুঙ্গিপাড়ায় হানা দেয়। বঙ্গবন্ধুর বাড়ি পাহারা দেওয়া সেই তরুণরা সেদিন পালিয়ে যাননি। মিন্টু শেখ, ধলা মিয়া, আরশাদ ও তোরাব আলী তাঁদের সীমিত সামর্থ্য নিয়েই বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের সামনে তাঁদের সেই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টেকেনি।
বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সুরক্ষায় নিয়োজিত সেই তরুণদের তারা অকথ্য নির্যাতনের পর তাঁদের সবাইকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর তারা বঙ্গবন্ধুর বৃদ্ধ পিতামাতাকে হত্যার হুমকি দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয় এবং গানপাউডার ছিটিয়ে বঙ্গবন্ধুর পৈত্রিক ভিটা পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।
টুঙ্গিপাড়ায় তাণ্ডব চালিয়েই পাকিস্তানি সেনারা ক্ষান্ত হয়নি। পাক বাহিনী লঞ্চযোগে ফেরার সময় লেবুতলা, ডুমুরিয়া, উত্তর পাকুরতিয়া এবং ঘাঘর গ্রামে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। ঘরবাড়ি লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং নির্বিচারে সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়। মে মাসের শেষদিকে তারা আবারও ফিরে আসে। এবার তাদের লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর চাচা শেখ মোশারফ হোসেনের বাড়ি। তারা সেই বাড়িতেও আক্রমণ করে এবং আশপাশের ডজনখানেক গ্রামে অগ্নিসংযোগ করে। এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল একটাই যাতে কেউ মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে সাহস না পায়।
প্রতিরোধ, বীরত্বের লড়াই ও গোপালগঞ্জ বিজয়
পাকিস্তানিদের এই বর্বরোচিত হামলার পর টুঙ্গিপাড়া ও গোপালগঞ্জ অঞ্চলে প্রতিরোধের আগুন জ্বলে ওঠে। গড়ে ওঠে স্থানীয় দুর্ধর্ষ সব বাহিনী। এর মধ্যে হেমায়েত বাহিনীর নাম ইতিহাসের পাতায় বিশেষভাবে উজ্জ্বল।
ডিসেম্বরের শুরু থেকেই দেশজুড়ে পাকিস্তানি সেনাদের পরাজয়ের ঘণ্টা বাজতে শুরু করে। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া অঞ্চলে হেমায়েত উদ্দিন বীর বিক্রমের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু করেন। ৩রা ডিসেম্বর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর কোটালীপাড়া সম্পূর্ণ শত্রুশূন্য হয়। এটি ছিল গোপালগঞ্জ মুক্ত হওয়ার পথে প্রথম বড় বিজয়।
৭ই ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্রবাহিনী এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি সেনারা সদর এলাকা ছেড়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। বাংলার আকাশে গোপালগঞ্জ সদরে প্রথম উড্ডীন হয় স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা।
গোপালগঞ্জের বাকি অংশ মুক্ত হলেও কাশিয়ানী এলাকাটি তখনও পাকিস্তানি সেনাদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে টিকে ছিল। সেখানকার ভাটিয়াপাড়া ওয়্যারলেস স্টেশনে পাকিস্তানি সেনারা অবস্থান নিয়েছিল এবং এলাকাটিকে দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করেছিল।
কাশিয়ানীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ
সারা দেশ যখন ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় উল্লাসে মেতেছে, কাশিয়ানীর মানুষ তখনও পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দি। পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণের প্রস্তাব বারবার প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। ১৬ থেকে ১৮ই ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে তুমুল লড়াই চলে।
কাশিয়ানীকে মুক্ত করতে নড়াইল ও ফরিদপুর উভয় দিক থেকে সম্মিলিত আক্রমণ চালানো হয়। এই ঐতিহাসিক যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন:
ভারতীয় মিত্রবাহিনীর লে. কর্নেল জোয়ান।
৮নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর মঞ্জুর (যিনি পরবর্তীতে বীর উত্তম খেতাব পান)।
অকুতোভয় ক্যাপ্টেন হুদা, কমল সিদ্দিকী এবং ইসমত কাদির গামা।
ক্যাপ্টেন নূর মোহাম্মদ বাবুল।
১৬, ১৭ ও ১৮ই ডিসেম্বর টানা তিন দিন ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে উভয় পক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। অবশেষে ১৯শে ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনারা বুঝতে পারে যে তাদের আর কোনো উপায় নেই। তারা সাদা পতাকা উড়িয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এর মাধ্যমেই সমগ্র গোপালগঞ্জ মহকুমা সম্পূর্ণরূপে হানাদারমুক্ত হয়।
শেষ কথা: বাঙালির তীর্থভূমি
গোপালগঞ্জ কেবল একটি মহকুমা বা জেলা নয়; এটি প্রতিরোধের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। যে মাটিতে বঙ্গবন্ধুর জন্ম, সেই মাটিতেই পাকিস্তানি হায়েনাদের পরাজয় ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। আজ সেই জয়বাংলা পুকুর কিংবা টুঙ্গিপাড়ার সেই দগ্ধ স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা গর্বের সাথে বলতে পারি গোপালগঞ্জ ছিল, আছে এবং থাকবে বাঙালির চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ (২য়, ৩য় ও ৪র্থ খণ্ড), ডঃ হারুন-উর-রশিদ, এশিয়াটিক সোসাইটি। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক স্থানীয় গবেষণা গ্রন্থ ও দলিলপত্র














