>

>

একাত্তরে গোপালগঞ্জ গণহত্যা - বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য রক্তস্নাত গোপালগঞ্জ

একাত্তরে গোপালগঞ্জ গণহত্যা - বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য রক্তস্নাত গোপালগঞ্জ

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য জনপদ গোপালগঞ্জ। এই জনপদ কেবল একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। মধুমতী ও আড়িয়াল খাঁর পলিবিধৌত এই জনপদ থেকেই উঠে এসেছিলেন বাঙালির মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান। একাত্তরের রণাঙ্গনে এই মাটি ভিজেছে বীর সন্তানদের রক্তে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই জনপদের মানুষের ত্যাগ, লড়াই এবং বীরত্বগাথা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।

TruthBangla

একাত্তরে গোপালগঞ্জ গণহত্যা - বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য রক্তস্নাত গোপালগঞ্জ

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করতে গেলে যে নামটির সাথে সমগ্র জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের আবেগ ও অস্তিত্ব জড়িয়ে পড়ে, তা হলো গোপালগঞ্জ। মধুমতী, বাইগার, ঘাগোর, আড়িয়াল খাঁ ও কুমার নদীর পলিবিধৌত এবং বাওরবেষ্টিত এই নিভৃত জনপদটি কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক বা ভৌগোলিক সীমানা নয়; বরং এটি আধুনিক স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মভূমি ও চেতনার অবিচ্ছেদ্য সূতিকাগার। এই পলল ভূমির মাটি থেকেই উঠে এসেছিলেন কালজয়ী মহাপুরুষ, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই জনপদের মানুষের ত্যাগ, আত্মদান, অসীম বীরত্বগাথা এবং হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবময়। একদিকে টুঙ্গিপাড়ার টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর পৈতৃক ভিটায় পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্নিসংযোগ ও বর্বরোচিত হামলা, সিও অফিসের টর্চার সেলে হাজারো নিরপরাধ মানুষকে নির্যাতন, মানিকহার ও পাইককান্দি গণহত্যার বিভীষিকা; অন্যদিকে হেমায়েত বাহিনী, মুজিব বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর গেরিলা বীরত্বে শত্রুমুক্ত হওয়ার মহাকাব্যিক বিবরণ একাত্তরের ইতিহাসকে করেছে সমৃদ্ধ। আজকের এই বিশদ ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় আমরা ফিরে যাব ১৯৭১ সালের সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে, যেখানে উন্মোচিত হয়েছিল গোপালগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা হাজারো বীরদের লড়াই ও বিজয়ের মহাকাব্য।

গোপালগঞ্জ - বাঙালির জাতীয়তাবাদের দুর্ভেদ্য দুর্গ

পাকিস্তান আমলে গোপালগঞ্জ ছিল তৎকালীন ফরিদপুর জেলার অধীনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মহকুমা। প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় এর অধীনে তৎকালীন সময়ে তিনটি প্রধান থানা অন্তর্ভুক্ত ছিল গোপালগঞ্জ সদর, কোটালীপাড়া এবং কাশিয়ানী। জলবেষ্টিত এবং নিম্নভূমির ভৌগোলিক গঠনের কারণে যাতায়াত ব্যবস্থা তৎকালীন সময়ে বেশ কঠিন থাকলেও রাজনৈতিক সচেতনতার দিক দিয়ে গোপালগঞ্জ মহকুমা সর্বদা ছিল সারা দেশের অগ্রভাগে।

গোপালগঞ্জ সদর থানার পাটগাতি ইউনিয়নের এক ছায়াঘেরা গ্রাম টুঙ্গিপাড়া। ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ এই টুঙ্গিপাড়াতেই জন্ম নিয়েছিলেন শেখ পরিবারের 'খোকা' যিনি পরবর্তীতে নিজের প্রজ্ঞা, অপরিসীম ত্যাগ ও আপসহীন নেতৃত্বে হয়ে ওঠেন সমগ্র বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, বঙ্গবন্ধু। টুঙ্গিপাড়ার কাদামাটিতে বেড়ে ওঠা বঙ্গবন্ধুর শৈশব ও কৈশোর কাটে এই অঞ্চলের মেহনতি মানুষের সাথে। ফলে এই মাটির সাথে তাঁর হৃদয়ের বন্ধন ছিল আজন্ম ও নাড়ির।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, '৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, '৬৬-এর ঐতিহাসিক ছয় দফা এবং '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান' প্রতিটি রাজনৈতিক মোড়ে গোপালগঞ্জের মানুষ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। সূচনালগ্নে এই অঞ্চলে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী ও আকর্ষণীয় নেতৃত্বের গুণে দ্রুতই তা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। সমগ্র গোপালগঞ্জ পরিণত হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল স্তম্ভে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এই অঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষ একচেটিয়াভাবে নৌকায় ভোট দিয়ে প্রমাণ করেছিল যে, গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শের এক দুর্ভেদ্য দুর্গ।

মার্চের প্রস্তুতি ও ঐতিহাসিক মানিকদাহ ঘাটের ডিফেন্স

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু যখন তাঁর কালজয়ী ভাষণে ঘোষণা করলেন, "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম", তখন সেই ঐতিহাসিক আহ্বানের তরঙ্গাঘাত তাৎক্ষণিকভাবে এসে পৌঁছায় গোপালগঞ্জের কোণে কোণে। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমায় সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।

আওয়ামী লীগের সর্বাত্মক নেতৃত্বে এবং ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সহযোগিতায় দ্রুত গঠিত হয় 'সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ'। মহকুমা সদর থেকে শুরু করে ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি।

যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণ

যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে গোপালগঞ্জ শহরের তৎকালীন পাবলিক স্কুল মাঠ, জয়বাংলা পুকুর পাড় এবং বিভিন্ন থানা সদরে খোলা হয় প্রশিক্ষণ শিবির। স্থানীয় অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য, পুলিশ ও আনসার কর্মকর্তাদের মাধ্যমে হাজার হাজার ছাত্র, যুবক ও কৃষককে প্রাথমিক অস্ত্র চালনা ও গেরিলা কৌশলের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। ডামি কাঠের রাইফেল এবং বাঁশের লাঠি নিয়ে হাজারো তরুণ স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

২৬শে মার্চের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ ও অস্ত্র সংগ্রহ

২৬শে মার্চ কালরাতে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর 'অপারেশন সার্চলাইট' চালানো এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর গোপালগঞ্জে ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি বিচ্ছুরিত হয়। সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ কালবিলম্ব না করে গোপালগঞ্জ মহকুমা পুলিশ লাইনস, সরকারি ট্রেজারি এবং বৌলতলী পুলিশ ফাঁড়িতে অভিযান চালিয়ে সমস্ত সরকারি অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে নেন।

সাহসী বাঙালি পুলিশ ও আনসার সদস্যরা নিজেদের সমস্ত অস্ত্র মুক্তিবাহিনীকে সঁপে দিয়ে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে পড়েন। এর মধ্যে ঢাকা থেকে বেশ কয়েকজন বাঙালি ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (EPR) সদস্য নিজেদের অস্ত্রসহ গোপালগঞ্জে এসে পৌঁছালে প্রাথমিক প্রতিরোধের মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়।

মানিকদাহ ঘাটের ডিফেন্স লাইন

পাকিস্তান সেনাবাহিনী যেকোনো সময় গোপালগঞ্জ শহরে ঢুকে পড়তে পারে এই ভেবে মহকুমার অন্যতম কৌশলগত স্থান 'মানিকদাহ ঘাটে' একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যূহ বা ডিফেন্স লাইন গড়ে তোলা হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ত্যাগ করে আসা পেশাদার সামরিক কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জালাল আহম্মেদের নেতৃত্বে মানিকদাহ ও পোদ্দারের চর এলাকায় প্রায় ১০০ জন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা প্রথম সামরিক প্রতিরোধ গড়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন।

মুক্তিযুদ্ধের কমান্ড কাঠামো ও গোপালগঞ্জের রণাঙ্গনের বীর নায়কেরা

গোপালগঞ্জের যুদ্ধ পরিচালনা এবং সমগ্র মহকুমাকে শত্রুমুক্ত করার জন্য একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত কমান্ড কাঠামো গড়ে উঠেছিল। সামরিক শৃঙ্খলা, দক্ষ স্থানীয় নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক নির্দেশনার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল এই অঞ্চলে।

১. শেখ লুৎফর রহমান (বাচ্চু চৌধুরী): গোপালগঞ্জ সদর এলাকার মুক্তিবাহিনীর মূল কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শেখ লুৎফর রহমান (বাচ্চু চৌধুরী)। তাঁর দক্ষ সংগঠক রূপ এবং রণকৌশলের কারণে সদর এলাকায় মুক্তিবাহিনী দ্রুত সুসংগঠিত হয়ে ওঠে।

২. ইসমত কাদির গামা: গোপালগঞ্জ মহকুমা 'মুজিব বাহিনী' (BLF)-র প্রধান কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন ইসমত কাদির গামা। তরুণ ছাত্র ও যুবকদের সুসংগঠিত করে বিশেষ উচ্চতর গেরিলা প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ অক্ষুণ্ণ রেখে আক্রমণ পরিচালনায় তিনি অসামান্য ভূমিকা রাখেন।

৩. হেমায়েত উদ্দিন (বীর বিক্রম) ও কালজয়ী 'হেমায়েত বাহিনী': গোপালগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত এবং দুর্ধর্ষ অধ্যায়টি রচনা করেছিলেন কোটালীপাড়ার অকুতোভয় সন্তান হেমায়েত উদ্দিন (বীর বিক্রম)। পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে এসে তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে ও সামরিক কৌশলে গঠন করেন এক বিশাল স্থানীয় বাহিনী, যা ইতিহাসে 'হেমায়েত বাহিনী' নামে পরিচিত।

কোটালীপাড়ার দুর্গম জঙ্গল ও বিল পরিবেষ্টিত ভৌগোলিক সুবিধা ব্যবহার করে হেমায়েত উদ্দিন হাজার হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ দেন। তাঁর বাহিনীতে সুসংগঠিতভাবে কয়েকটি ব্যাটালিয়ন ও কোম্পানি গঠিত হয়েছিল। কেবল কোটালীপাড়া নয়, পার্শ্ববর্তী পিরোজপুর, বরিশাল, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ সদরেও হেমায়েত বাহিনীর বীরত্বপূর্ণ হামলা পাকিস্তানি বাহিনীর মনে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল।

৪. ক্যাপ্টেন জালাল আহম্মেদ: একজন পেশাদার সেনাকর্মকর্তা হিসেবে ক্যাপ্টেন জালাল আহম্মেদ গোপালগঞ্জের প্রাথমিক সামরিক ডিফেন্স সাজাতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে ৮ নম্বর সেক্টরের আওতাধীন বিভিন্ন সফল অপারেশনে তাঁর রণকৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পাকবাহিনীর অনুপ্রবেশ, সিও অফিস দখল ও মিনি ক্যান্টনমেন্টের আতঙ্ক

১৯৭১ সালের ৩০শে এপ্রিল গোপালগঞ্জবাসীর জন্য একটি অত্যন্ত কালো এবং বিভীষিকাময় দিন হয়ে আসে। ওই দিন ঢাকা থেকে মেঘনা ও তুরাগ নদী হয়ে জলপথে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ও গোলাবারুদে সজ্জিত মেজর ঘোরীর নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি বিশাল সেনাদল গোপালগঞ্জ শহরে অনুপ্রবেশ করে।

মিনি ক্যান্টনমেন্ট ও নির্যাতন কেন্দ্র

শহরে প্রবেশের পর পাকিস্তানি বাহিনী তৎকালীন সিও অফিস (বর্তমান গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স) দখল করে সেটিকে তাদের প্রধান ঘাঁটি বা 'মিনি ক্যান্টনমেন্ট'-এ রূপান্তরিত করে। একাত্তরের দীর্ঘ নয়টি মাস এই সিও অফিস কমপ্লেক্সটি গোপালগঞ্জের মানুষের কাছে নরক যন্ত্রণা ও মৃত্যুর প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

সিও অফিসে গড়ে তোলা টর্চার সেলে মহকুমার বিভিন্ন গ্রাম ও বাড়িঘর থেকে স্বাধীনতাকামী যুবক, ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ নিরপরাধ মানুষকে ধরে এনে হাত-পা বেঁধে অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো। চাবুকের আঘাত, নখ উপড়ে ফেলা এবং ঝুলিয়ে পেটানোর পর তাদেরকে হত্যা করা হতো।

জয়বাংলা পুকুর বধ্যভূমি (সাবেক পদ্মপুকুর)

সিও অফিস কমপ্লেক্সের ঠিক পাশেই অবস্থিত ছিল তৎকালীন 'পদ্মপুকুর'। পাকবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসর রাজাকাররা প্রতিদিন রাতের আঁধারে কিংবা ভোরে নির্যাতন সহ্য করতে না পারা আধমরা ও মৃত বন্দীদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি চালিয়ে এই পুকুরে ফেলে দিত।

শত শত শহীদের তাজা রক্তে রাঙায়িত হওয়ার কারণে স্বাধীনতার পর ঐতিহাসিক এই বধ্যভূমিটি 'জয়বাংলা পুকুর' নামে পরিচিতি লাভ করে। নয় মাস ধরে এই পুকুরের পানি পচা লাশ ও রক্তে দুর্গন্ধে বিষাক্ত হয়ে পড়েছিল।

গোপালগঞ্জে পরিচালিত অন্যতম প্রধান গণকবর ও গণহত্যার বিবরণ

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শহরে পা রাখার পর থেকেই পুরো গোপালগঞ্জ মহকুমায় 'পোড়ামাটি নীতি' (Scorched Earth Policy) বাস্তবায়ন শুরু করে। শান্তিকমিটি ও রাজাকারদের উসকানিতে তারা বিশেষ করে হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম, আওয়ামী লীগ নেতাদের বাসাবাড়ি এবং সম্ভাব্য মুক্তিকামী মানুষের ঘাঁটিগুলোতে নারকীয় তাণ্ডব চালায়।

ব্যাংকপাড়া, সাহাপাড়া ও শহরের কেন্দ্রস্থলে হামলা

৩০শে এপ্রিল শহরে ঢুকেই পাকবাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের মানচিত্র অনুযায়ী ব্যাংকপাড়ায় অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর বাসভবন, চৌরঙ্গীর মোড়ে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল লতিফের বাসভবন এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে গানপাউডার ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। একই সাথে স্বর্ণপট্টি, সাহাপাড়া, বাজার রোড এবং হীরাবাড়ি রোডের শয়ে শয়ে বসতবাড়ি ও দোকানপাট লুটপাট করে জ্বালিয়ে ছাই করে দেওয়া হয়।

মানিকহার গণহত্যা

গোপালগঞ্জ সদরের মানিকহার গ্রামটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সমর্থক এলাকা। স্থানীয় কুখ্যাত রাজাকার রঙ্গু সিকদারের প্রত্যক্ষ উসকানিতে পাকবাহিনী ও রাজাকারের একটি যৌথ দল মানিকহার গ্রামে আক্রমণ চালায়। তারা গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব বাদশা মোল্যার বাড়িতে চড়াও হয় এবং বাদশা মোল্যাসহ তাঁর পরিবারের ৮ জন সদস্যকে একটি দেওয়ালের সামনে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে পৈশাচিকভাবে হত্যা করে। পুরো গ্রামে সেদিন ডজন ডজন ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

পাইককান্দি গণহত্যা

পাইককান্দি গ্রামের গণহত্যাটি গোপালগঞ্জের অন্যতম নৃশংস ঘটনা। পাকবাহিনী গ্রামটি ঘিরে ফেলে নির্বিচারে গুলি চালাতে চালাতে ভেতরে প্রবেশ করে। স্থানীয় নওশের আলী চৌধুরীর বাড়িতে ঢুকে তারা সেখানে আশ্রয় নেওয়া ১৩ জন নিরপরাধ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এরপর একে একে তাহাজ্জদ আলী মাস্টার ও আফসার আলী চৌধুরীসহ অসংখ্য নিরীহ গ্রামবাসীকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।

বুদ্ধিজীবী সন্তোষ কুমার দাস হত্যা

শিক্ষাবিদ ও স্বাধীনতাকামী বুদ্ধিজীবীদের ওপর আক্রমণ চালানোর অংশ হিসেবে তৎকালীন কায়দে আজম মেমোরিয়াল কলেজের (বর্তমান সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজ) দর্শনের জনপ্রিয় প্রভাষক সন্তোষ কুমার দাসকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে অত্যন্ত পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়। এছাড়া বৌলতলী, সাতপাড়, তিলছড়া এবং গান্ধিয়াশুর গ্রামেও একের পর এক হামলা চালিয়ে শত শত নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

টুঙ্গিপাড়ার বীরত্ব এবং ১৯শে মে বঙ্গবন্ধুর পৈতৃক ভিটায় তাণ্ডব

গোপালগঞ্জের স্বাধীনতার লড়াইয়ের অন্যতম স্পর্শকাতর ও আবেগঘন কেন্দ্রস্থল ছিল টুঙ্গিপাড়া। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা ঢাকায় গৃহবন্দি, তখন টুঙ্গিপাড়ার পৈতৃক ভিটায় অবস্থান করছিলেন বঙ্গবন্ধুর বৃদ্ধ পিতা শেখ লুৎফর রহমান এবং রত্নগর্ভা মাতা সায়েরা খাতুন।

টুঙ্গিপাড়ার তরুণদের অকুতোভয় পাহারা

বঙ্গবন্ধুর বৃদ্ধ পিতামাতা এবং তাঁদের স্মৃতিবিজড়িত ঘরটি রক্ষা করার জন্য টুঙ্গিপাড়ার স্থানীয় একদল সাধারণ তরুণ জীবনের মায়া ত্যাগ করে পাহারা দেওয়ার শপথ নেন। মিন্টু শেখ, ধলা মিয়া শেখ, আরশাদ শেখ, তোরাব আলী এবং বঙ্গবন্ধুর বাড়ির বিশ্বস্ত গৃহকর্মী ইকুসহ আরও একঝাঁক অকুতোভয় যুবক লাঠি ও সামান্য দেশীয় অস্ত্র নিয়ে দিনরাত পালা করে বঙ্গবন্ধুর বাড়িটি আগলে রাখতেন। প্রশিক্ষিত সেনা না হয়েও বঙ্গবন্ধুর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসাই ছিল তাঁদের প্রধান সাহস।

১৯শে মে: টুঙ্গিপাড়ার ইতিহাসে অভিশপ্ত দিন

মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানি গোয়েন্দা বিভাগ ও রাজাকারদের মাধ্যমে খবর যায় যে টুঙ্গিপাড়ায় একদল যুবক বঙ্গবন্ধুর ঘর পাহারা দিচ্ছে এবং সেখানে শেখ লুৎফর রহমান অবস্থান করছেন। এই খবর পাওয়ার পর পাকিস্তানি বাহিনী টুঙ্গিপাড়াকে ধ্বংস করার এক পৈশাচিক নীল নকশা প্রণয়ন করে।

১৯৭১ সালের ১৯শে মে ভোরের আলো ফোটার আগেই প্রায় ১৫০ জন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য আধুনিক স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র ও গানপাউডার নিয়ে বিশাল এক লঞ্চযোগে মধুমতী নদী হয়ে টুঙ্গিপাড়ায় এসে পৌঁছায়। তারা তিন দিক থেকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে।

বঙ্গবন্ধুর ভিটা সুরক্ষায় নিয়োজিত মিন্টু শেখ, ধলা মিয়া, আরশাদ ও তোরাব আলী পলায়ন না করে তাঁদের সীমিত সামর্থ্য নিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ঘাতকদের আধুনিক ব্রাশফায়ারের সামনে তাঁদের প্রতিরোধ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। পাকবাহিনী ওই বীর তরুণদের ধরে অকথ্য নির্যাতন চালানোর পর বাড়ির উঠানে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে।

এরপর পাক সেনারা ঘরে ঢুকে বঙ্গবন্ধুর প্রবীণ পিতামাতাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং গুলি করে হত্যার হুমকি দিয়ে ঘর থেকে বের করে দেয়। এরপর তারা ঐতিহাসিক বাড়িটিতে গানপাউডার ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে ছাই করে দেয়। টুঙ্গিপাড়ার আকাশে সেদিন সারাদিন ধরে কেঁদেছিল বঙ্গবন্ধুর ভস্মীভূত ভিটার কালো ধোঁয়া।

পার্শ্ববর্তী গ্রামসমূহে তাণ্ডব

বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে অগ্নিকুণ্ড জ্বালানোর পর পাক সেনারা ক্ষান্ত হয়নি। তারা ফেরার পথে মধুমতী নদীর তীরবর্তী লেবুতলা, ডুমুরিয়া, উত্তর পাকুরতিয়া এবং ঘাঘর গ্রামে ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। মে মাসের শেষভাগে তারা পুনরায় ফিরে এসে বঙ্গবন্ধুর চাচা শেখ মোশারফ হোসেনের বাড়িতে হামলা চালায় এবং আশপাশের ডজনখানেক গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দেয়।

ঐতিহাসিক মুক্তি সংগ্রাম, রণাঙ্গনের বিবরণ ও গোপালগঞ্জ মুক্ত দিবস

পাকবাহিনীর এই পৈশাচিক আক্রমণের পর গোপালগঞ্জে প্রতিরোধের আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ে। জুন থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত মুক্তিবাহিনী ও হেমায়েত বাহিনীর গেরিলা যোদ্ধারা পাকবাহিনী এবং তাদের সহযোগী রাজাকারদের ওপর একের পর এক ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে পুরো মহকুমাকে কাঁপিয়ে তোলে।

৩রা ডিসেম্বর-কোটালীপাড়া মুক্ত: ডিসেম্বর মাসের শুরুতেই চারদিক থেকে কোটালীপাড়ায় অবস্থানরত রাজাকার ও পাক সেনাদের ওপর হেমায়েত বাহিনীর বীর মুক্তিযোদ্ধারা সাঁড়াশি আক্রমণ পরিচালনা করেন। ৩রা ডিসেম্বর এক ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী মুখোমুখি যুদ্ধের পর কোটালীপাড়া পুরোপুরি হানাদারমুক্ত হয়। এই বিজয়ের মাধ্যমে গোপালগঞ্জ মহকুমায় প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের রক্তলাল পতাকা উত্তোলন করেন হেমায়েত উদ্দিন বীর বিক্রম।

৭ই ডিসেম্বর-গোপালগঞ্জ সদর মুক্ত: কোটালীপাড়ার পতনের পর গোপালগঞ্জ সদরে অবস্থানরত পাক সেনারা চরম ভীত হয়ে পড়ে। ৬ই ডিসেম্বর রাত থেকেই মিত্রবাহিনী এবং ৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথ কমান্ড গোপালগঞ্জ সিও অফিস মিনি ক্যান্টনমেন্টের ওপর চারদিক থেকে হামলা জোরদার করে।

অবস্থা প্রতিকূল দেখে ৭ই ডিসেম্বর ভোরে সিও অফিসে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদল ও তাদের দোসর রাজাকাররা রাতের আঁধারে লঞ্চ ও স্টিমারযোগে ফরিদপুরের দিকে পিছু হটে পালিয়ে যায়। ৭ই ডিসেম্বর সকালে গোপালগঞ্জ শহর সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয় এবং শহরের আকাশে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা সগর্বে উড্ডীন করা হয়।

কাশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়া দুর্গ ও রক্তক্ষয়ী লড়াই (১৬-১৯শে ডিসেম্বর)

যদিও ৭ই ডিসেম্বরের মধ্যে গোপালগঞ্জ সদর ও কোটালীপাড়া শত্রুমুক্ত হয়েছিল, কিন্তু গোপালগঞ্জ মহকুমার কাশিয়ানী উপজেলার ভাটিয়াপাড়া ওয়্যারলেস স্টেশন এলাকাটি তখনও পাকিস্তানি সেনাদলের এক অতি শক্তিশালী দুর্গে পরিণত হয়েছিল। ১৬ই ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে যখন ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে দেশব্যাপী বিজয় সূচিত হয়েছিল, তখনো কাশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়া ছিল অবরুদ্ধ ও স্বাধীনতাবঞ্চিত।

দুর্গের গঠন ও পাকি বাহিনীর অবস্থান

ভাটিয়াপাড়া ওয়্যারলেস স্টেশন এলাকাটি চারদিক থেকে সুরক্ষিত ছিল। সেখানে পাকি বাহিনীর প্রায় এক প্লাটুন নিয়মিত সেনা এবং শতাধিক সুপ্রশিক্ষিত রাজাকার অবস্থান নিয়েছিল। সেখানে ছিল তাদের বিশাল গোলাবারুদের প্রাচুর্য এবং বাংকার। তারা আত্মসমর্পণের সার্বজনীন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

১৬ থেকে ১৮ই ডিসেম্বরের তুমুল লড়াই

কাশিয়ানীকে শত্রুমুক্ত করতে নড়াইল, ফরিদপুর এবং গোপালগঞ্জের তিন দিক থেকে সম্মিলিত মুক্তি ও মিত্রবাহিনী ভাটিয়াপাড়া দুর্গ ঘেরাও করে। এই ঐতিহাসিক যুদ্ধে যৌথভাবে নেতৃত্ব দেন:

লে. কর্নেল জোয়ান: ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সামরিক কৌশলবিদ।
মেজর মঞ্জুর (বীর উত্তম): ৮ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক।
ক্যাপ্টেন হুদা ও কমল সিদ্দিকী: নড়াইল ও আঞ্চলিক মুক্তিবাহিনীর দুর্ধর্ষ কমান্ডার।
ইসমত কadir গামা: গোপালগঞ্জের মুজিব বাহিনী প্রধান।
ক্যাপ্টেন নূর মোহাম্মদ বাবুল: বীর মুক্তিযোদ্ধা।

১৬ই ডিসেম্বর থেকে টানা তিন দিন ও তিন রাত ভাটিয়াপাড়া ওয়্যারলেস স্টেশনের পাকি বাংকার লক্ষ্য করে সাঁড়াশি কামান, মর্টার ও মেশিনগানের গোলাবর্ষণ করা হয়। ১৮ই ডিসেম্বর বিকেলে চূড়ান্ত আক্রমণের মুখে পাকি বাহিনীর সামরিক সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

১৯শে ডিসেম্বর: চূড়ান্ত বিজয়

অবশেষে কোনো উপায় না দেখে ১৯শে ডিসেম্বর সকালে পাকিস্তানি বাহিনীর কমান্ডার ভাটিয়াপাড়া দুর্গ থেকে সাদা পতাকা উড়িয়ে যৌথ কমান্ডের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এই আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ১৬ই ডিসেম্বরের তিন দিন পর সমগ্র গোপালগঞ্জ মহকুমা সম্পূর্ণভাবে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত হয়।

এক নজরে গোপালগঞ্জ মহকুমার রণাঙ্গন ও প্রধান ঐতিহাসিক তথ্যাবলী

গোপালগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান ঘটনাপ্রবাহ ও ঐতিহাসিক সামরিক তথ্যাবলী এক নজরে অনুধাবনের জন্য নিচে একটি তথ্যসারণী প্রস্তুত করা হলো:

বিষয় বা ঘটনার বিবরণ

ঐতিহাসিক স্থান বা ক্ষেত্র

নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি/প্রতিপক্ষ

তারিখ ও সময়কাল

প্রধান ফলাফল ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ও প্রশিক্ষণ

গোপালগঞ্জ মহকুমা সদর ও টুঙ্গিপাড়া

স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও নবাগত ইপিআর সদস্য

মার্চ, ১৯৭১

যুবকদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিশ্চিতকরণ ও থানা হতে অস্ত্র দখল।

মানিকদাহ ঘাটের ডিফেন্স লাইন

মানিকদাহ ঘাট ও পোদ্দারের চর

ক্যাপ্টেন জালাল আহম্মেদ ও মুক্তিবাহিনী

এপ্রিল, ১৯৭১

গোপালগঞ্জ শহরের প্রধান প্রবেশদ্বারে প্রতিরোধ ব্যূহ গঠন।

সিও অফিস দখল ও মিনি ক্যান্টনমেন্ট

বর্তমান সদর উপজেলা পরিষদ

মেজর ঘোরী ও পাকিস্তানি সেনাদল

৩০শে এপ্রিল, ১৯৭১

নির্যাতন কেন্দ্র ও জয়বাংলা পুকুর বধ্যভূমির উৎপত্তি।

মানিকহার ও পাইককান্দি গণহত্যা

মানিকহার ও পাইককান্দি গ্রাম

পাকি আর্মি ও রাজাকার রঙ্গু সিকদার

মে, ১৯৭১

বাদশামোল্লার পরিবারের ৮ জনসহ ডজন ডজন নিরপরাধ মানুষ হত্যা।

টুঙ্গিপাড়ায় হামলা ও অগ্নিসংযোগ

টুঙ্গিপাড়া (বঙ্গবন্ধুর ভিটা)

পাকি সেনাদল ও স্থানীয় রাজাকার

১৯শে মে, ১৯৭১

৪ জন বীর পাহারাদারকে হত্যা ও বঙ্গবন্ধুর পৈতৃক বাড়ি ভস্মীভূত।

কোটালীপাড়া মুক্ত অভিযান

কোটালীপাড়া থানা

হেমায়েত উদ্দিন (বীর বিক্রম) ও হেমায়েত বাহিনী

৩রা ডিসেম্বর, ১৯৭১

গোপালগঞ্জ মহকুমার প্রথম থানা হিসেবে কোটালীপাড়া শত্রু মুক্ত।

গোপালগঞ্জ সদর মুক্ত দিবস

সদর উপজেলা ও সিও অফিস

মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ড

৭ই ডিসেম্বর, ১৯৭১

পাকি বাহিনীর পলায়ন এবং সদর শহরে প্রথম লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন।

ভাটিয়াপাড়া রক্তক্ষয়ী রণাঙ্গন

কাশিয়ানী ভাটিয়াপাড়া ওয়্যারলেস

মেজর মঞ্জুর, লে. কর্নেল জোয়ান ও যৌথবাহিনী

১৬-১৯শে ডিসেম্বর, ১৯৭১

৩ দিন যুদ্ধের পর পাকি বাহিনীর পলায়ন ও চূড়ান্ত গোপালগঞ্জ বিজয়।

‘হেমায়েত বাহিনী’ ও কোটালীপাড়ার স্বাধীন বিলে ‘মুক্তাঞ্চল’ গঠন

গোপালগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে (বরিশাল, পিরোজপুর, মাদারীপুর, বাগেরহাট) মুক্তিযুদ্ধের সময় সবচেয়ে বড় ও সুসংগঠিত স্বাধীন আঞ্চলিক বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠেছিল ‘হেমায়েত বাহিনী’। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাবেক ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সুবেদার হেমায়েত উদ্দিন (বীর বিক্রম)।

দুর্গম বিল অঞ্চলের ভৌগোলিক সুবিধা

কোটালীপাড়ার ভূপ্রকৃতি ছিল বাওর, খাল ও বিশাল বিল (যেমন রামশীল বিল, জহরের কান্দি, বান্ধাবাড়ী) দ্বারা পরিবেষ্টিত। বছরের অধিকাংশ সময় জলমগ্ন থাকার কারণে ভারী সামরিক যান নিয়ে সেখানে প্রবেশ করা পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে অসম্ভব ছিল। এই ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে হেমায়েত উদ্দিন কোটালীপাড়াকে একটি সম্পূর্ণ ‘মুক্তাঞ্চলে’ রূপান্তর করেন।

বাহিনীর বিন্যাস ও শৃঙ্খলা

হেমায়েত বাহিনী কেবল একটি গেরিলা দল ছিল না; এটি একটি সমান্তরাল সামরিক প্রশাসনের মতো পরিচালিত হতো:

কোম্পানি সংখ্যা: এই বাহিনীতে ১৮টি নিয়মিত কোম্পানি এবং বেশ কিছু রিজার্ভ প্লাটুন ছিল, যার সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৫,০০০ জন।

কোর্ট মার্শাল ও বিচার ব্যবস্থা: মুক্তাঞ্চলে কোনো আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গকারী, ডাকাত বা রাজাকার ধরা পড়লে হেমায়েত বাহিনীর নিজস্ব ‘কোর্ট মার্শাল’-এর মাধ্যমে বিচার করা হতো।

নারী গেরিলা প্লাটুন: হেমায়েত বাহিনীর অধীনে আলাদা নারী যোদ্ধা প্লাটুন ছিল। স্থানীয় যুবতীদের অস্ত্র চালনা, গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো, যা তৎকালীন গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে ছিল এক অভাবনীয় বিপ্লব।

রামশীল ও কলাবাড়ী গণহত্যা: জলমগ্ন বিলে নারকীয় তাণ্ডব

গোপালগঞ্জের ইতিহাসের অন্যতম বড় গণহত্যাটি সংঘটিত হয়েছিল কোটালীপাড়া উপজেলার রামশীল ও কলাবাড়ী ইউনিয়নে। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে শহরের আতঙ্কগ্রস্ত হাজার হাজার হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও সাধারণ মানুষ নিরাপত্তার আশায় রামশীল ও কলাবাড়ীর বিল বেষ্টিত গ্রামগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিল।

রামশীল ট্র্যাজেডি

১৯৭১ সালের মে মাসের শেষের দিকে পাকিস্তানি বাহিনী স্পিডবোট ও বিশেষ গানবোট নিয়ে স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় রামশীল বিলে আক্রমণ চালায়। বিলে আশ্রিত মানুষজন নৌকায় করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে চারদিক থেকে তাদের ওপর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ব্রাশফায়ার চালানো হয়।

গুলিবিদ্ধ হয়ে শত শত মানুষ বিলের পানিতে তলিয়ে যায়। যারা সাঁতরে তীরে ওঠার চেষ্টা করেছিল, তাদের ধরে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে জবাই করা হয়। এই গণহত্যায় কত মানুষের প্রাণ গিয়েছিল তার সঠিক সংখ্যা সরকারি নথিতে না থাকলেও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, কেবল রামশীল বিলেই ৫০০-র বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। বেশ কয়েকদিন ধরে বিলের কচুরিপানার নিচে পচা লাশের স্তূপ জমেছিল।

অবরুদ্ধ টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সংগ্রাম ও স্থানীয়দের বলয়

১৯শে মে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর পৈতৃক বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার পর এবং ৪ জন বীর প্রহরীকে হত্যার পর বঙ্গবন্ধুর বৃদ্ধ বাবা শেখ লুৎফর রহমান এবং মা সায়েরা খাতুনের জীবন চরম বিপন্ন হয়ে পড়ে।

বাঁশের ছাওনি ও প্রতিবেশীদের নীরব প্রতিরক্ষা

বাড়ি ভস্মীভূত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর বৃদ্ধ পিতামাতা টুঙ্গিপাড়ার একটি ছোট টিনের চালাঘরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তাদের খাবারের যোগান ও নিরাপত্তার দায়িত্ব গোপনে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন টুঙ্গিপাড়ার সাধারণ গ্রামবাসী।

বিপদসংকেত ব্যবস্থা: পাকিস্তানি গানবোট বা রাজাকারের নৌকা নদী দিয়ে টুঙ্গিপাড়ার দিকে আসছে খবর পেলেই স্থানীয় ছাওয়ালেরা বিশেষ কাশির শব্দ বা ঘণ্টা বাজিয়ে বার্তা ছড়িয়ে দিত।

খাদ্য সরবরাহ: স্থানীয় গৃহকর্মী ইকু ও ধলা মিয়ার স্বজনেরা রাতের আঁধারে বঙ্গবন্ধুর পিতা-মাতার কাছে খাবার পৌঁছে দিতেন।

শান্তি কমিটির ব্যর্থতা: স্থানীয়ভাবে পাকি বাহিনী একটি শান্তিকমিটি গঠনের চেষ্টা করলেও টুঙ্গিপাড়ার সর্বস্তরের মানুষের তীব্র প্রতিরোধ ও বয়কটের মুখে তা কার্যকর হতে পারেনি। কোনো স্থানীয় ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর পরিবারের ক্ষতি করার দুঃসাহস দেখায়নি।

উত্তর গোপালগঞ্জের রণাঙ্গন: মুকসুদপুর ও কাশিয়ানীর মুক্তিযুদ্ধ

গোপালগঞ্জ মহকুমার উত্তরাংশে অবস্থিত মুকসুদপুর ও কাশিয়ানী থানা ছিল ফরিদপুর ও ঢাকা থেকে পাকি বাহিনীর আসার মূল সংযোগস্থল। ফলে এই দুই অঞ্চলে যুদ্ধের তীব্রতা ছিল মারাত্মক।

মুকসুদপুর মুক্তকরণ: মুকসুদপুরে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা এবং মুজিব বাহিনীর সম্মিলিত দল বেশ কয়েকটি সফল আক্রমণ পরিচালনা করে। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে মুকসুদপুর থানা ভবনে অবস্থানরত রাজাকার ও পাকিস্তানি মিলিটারিদের ওপর চারদিক থেকে আক্রমণ চালানো হয়। দীর্ঘ চার ঘণ্টা গোলাগুলির পর রাজাকাররা সাদা পতাকা উড়িয়ে আত্মসমর্পণ করে। মুকসুদপুর গোপালগঞ্জের উত্তর সীমান্তকে মুক্তাঞ্চলে পরিণত করে।

ফুকুররা বধ্যভূমি (কাশিয়ানী): কাশিয়ানীর ফুকুররা ট্রেন স্টেশনের কাছে পাকিস্তানি সেনারা এক ভয়ংকর বধ্যভূমি বানিয়েছিল। খুলনা ও জশোহরগামী ট্রেন থেকে নামিয়ে স্বাধীনতাকামী যাত্রী, যুবক ও হিন্দুদের আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো। পরবর্তীতে ফুকুররা খালের পাড়ে দাঁড় করিয়ে তাদের হত্যা করা হতো। যুদ্ধের পর সেখানে বিরাট গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়।

ভাটিয়াপাড়া দুর্গের প্রথম ও দ্বিতীয় যুদ্ধ (নভেম্বর ও ডিসেম্বর ১৯৭১)

কাশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়া ওয়্যারলেস স্টেশন দুর্গটি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে দুটি বড় যুদ্ধের ইতিহাস রয়েছে।

২৩শে নভেম্বরের প্রথম যুদ্ধ

২৩শে নভেম্বর হেমায়েত উদ্দিনের নেতৃত্বে প্রায় এক হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাটিয়াপাড়া পাকি ঘাঁটিতে প্রথম বড় ধরনের সাঁড়াশি আক্রমণ পরিচালনা করেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময় পাকি ফৌজিদের একটি বুলেট হেমায়েত উদ্দিনের বুকের ডান পাশে বিদ্ধ হয়।

রক্তাপ্লুত অধিনায়ককে সহযোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যান। অধিনায়ক আহত হওয়ায় এবং পাকিদের শক্তিশালী কংক্রিট বাংকারের কারণে সেই আক্রমণ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়, তবে পাকি বাহিনী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।

১৬-১৯শে ডিসেম্বরের চূড়ান্ত যুদ্ধ

১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় পাকি বাহিনীর আত্মসমorphনের পরও ভাটিয়াপাড়ায় নিয়োজিত পাকি ক্যাপ্টেন ও তার সেনাদল আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা বিশ্বাস করত পাকি বাহিনী পুনর্গঠিত হয়ে তাদের উদ্ধার করতে আসবে।

জোটবদ্ধ আক্রমণ: মেজর মঞ্জুর (৮ নং সেক্টর কমান্ডার) এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর লে. কর্নেল জোয়ান যৌথভাবে পদাতিক ও ভারী আর্টিলারি নিয়ে ভাটিয়াপাড়া ঘিরে ফেলেন।

ট্যাংক ও কামানের গোলাবর্ষণ: ১৭ ও ১৮ই ডিসেম্বর দূরপাল্লার ভারী কামান থেকে একের পর এক গোলাবর্ষণ করে পাকিদের মূল কংক্রিট বাংকারগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

চূড়ান্ত পতন: ১৯শে ডিসেম্বর সকালে পাকি সেনাদল ও তাদের সহযোগী রাজাকাররা অস্ত্রের মুখে হাত তুলে বের হয়ে আসে এবং যৌথ বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এর মাধ্যমে সমগ্র গোপালগঞ্জের মাটি সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়।

গোপালগঞ্জের ঐতিহাসিক স্মৃতিনিদর্শন ও বর্তমান সংরক্ষণের বাস্তবতা

স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর গোপালগঞ্জের বিভিন্ন রণাঙ্গন ও বধ্যভূমিগুলোর বর্তমান অবস্থা মিশ্র চিত্র বহন করে:

বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধ ও কমপ্লেক্স (টুঙ্গিপাড়া): টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের সমাধি সৌধ কমপ্লেক্স। তবে ১৯শে মে পৈতৃক ভিটায় হামলার ঐতিহাসিক স্থানগুলো সুনির্দিষ্ট স্মৃতিফলক দ্বারা আরও বেশি চিহ্নিত করার দাবি রয়েছে।

জয়বাংলা পুকুর বধ্যভূমি (সদর সিও অফিস): সিও অফিসের পাশেই ঐতিহাসিক 'জয়বাংলা পুকুর' স্মারক স্তম্ভ হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে। গোপালগঞ্জ সদরের শহীদদের স্মরণে এটি একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

রামশীল ও ফুকুররা স্মারক: রামশীল গণহত্যার স্থানে একটি স্মারক নির্মিত হলেও দুর্গম বিল এলাকায় শহীদের প্রকৃত তালিকা সংরক্ষণের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ।

ভাটিয়াপাড়া রণাঙ্গন: কাশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়া ওয়্যারলেস স্টেশন এলাকাটি মুক্তিযুদ্ধের এক ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে সংরক্ষিত হলেও সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

ইতিহাসের দায়বদ্ধতা ও উপসংহার

গোপালগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল রক্তপাত আর স্বজন হারানোর করুণ বিবরণ নয়; এটি হলো একটি মহকুমার আবালবৃদ্ধবনিতার একতাবদ্ধতা, আত্মত্যাগ এবং বীরত্বগাথার এক অনন্য দস্তাবেজ। যে মাটিতে জন্মেছিলেন কালজয়ী মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান, সেই মাটিকে পাকি বাহিনীর অপশক্তি দিয়ে চিরতরে দাবিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না।

আজকের শান্ত, সবুজ ও রূপসী গোপালগঞ্জের দিকে তাকালে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই মাটির প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে একাত্তরের শহীদদের তাজা রক্ত। টুঙ্গিপাড়ার ভস্মীভূত মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধ, সদর সিও অফিসের জয়বাংলা পুকুর এবং কাশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়া রণাঙ্গন আমাদের প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য সহজ কোনো অর্জনের ফসল নয়।

গোপালগঞ্জ ছিল, আছে এবং চিরকাল থাকবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চেতনার এক অমর প্রতীক হিসেবে। নতুন প্রজন্মের কাছে গোপালগঞ্জের এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া আমাদের সকলের নৈতিক ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ (২য়, ৩য় ও ৪র্থ খণ্ড), ডঃ হারুন-উর-রশিদ, এশিয়াটিক সোসাইটি। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক স্থানীয় গবেষণা গ্রন্থ ও দলিলপত্র

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Jul 21, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

Jul 13, 2026

/

Post by

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বয়ানটি হলো একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র লড়াই। ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তারা এটিকে চিত্রায়িত করেছিল 'ইসলামী সংহতি রক্ষার অভিযান' হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম কখনো অন্যায়, স্বৈরাচার, লুণ্ঠন ও গণহত্যার পক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.