পাকিস্তান কেন কাশ্মীর ও বাংলাদেশকে শান্তিতে থাকতে দেয় না?
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যেভাবে কাশ্মীরে নিজেদের অধিকার দাবি করে এবং তথাকথিত ‘আজাদি’র বুলি আওড়ায়, ঠিক একই শাসকগোষ্ঠী ১৯৭১ সালের পূর্ব পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) চালিয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম অর্থনৈতিক শোষণ, সাংস্কৃতিক নিপীড়ন এবং নির্মম গণহত্যা। এমনকি বর্তমান সময়েও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে তারা যে কায়দায় স্থানীয় মানুষের ওপর ঔপনিবেশিক শাসন ও লুণ্ঠন চালাচ্ছে, তা তাদের চরম ভণ্ডামিকে বিশ্ব দরবারে উন্মোচিত করে দেয়।

TruthBangla

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে যে নতুন রাজনৈতিক মানচিত্রের জন্ম হয়েছিল, তার গর্ভেই রোপিত হয়েছিল বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক সংকট। ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে তাড়াহুড়ো করে তৈরি করা ‘পাকিস্তান’ নামক কৃত্রিম রাষ্ট্রটি একদিকে যেমন নিজের ভৌগোলিক অসঙ্গতির কারণে বেশিদিন টিকতে পারেনি, অন্যদিকে তেমনি তার জন্মলগ্ন থেকে শুরু হওয়া কাশ্মীর সংকট আজ অবধি এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে জিম্মি করে রেখেছে।
ইতিহাসের এক অদ্ভুত সমান্তরাল রেখায় আমরা দেখতে পাই, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যেভাবে কাশ্মীরে নিজেদের অধিকার দাবি করে এবং তথাকথিত ‘আজাদি’র বুলি আওড়ায়, ঠিক একই শাসকগোষ্ঠী ১৯৭১ সালের পূর্ব পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) চালিয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম অর্থনৈতিক শোষণ, সাংস্কৃতিক নিপীড়ন এবং নির্মম গণহত্যা। এমনকি বর্তমান সময়েও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে তারা যে কায়দায় স্থানীয় মানুষের ওপর ঔপনিবেশিক শাসন ও লুণ্ঠন চালাচ্ছে, তা তাদের চরম ভণ্ডামিকে বিশ্ব দরবারে উন্মোচিত করে দেয়। বর্তমান প্রবন্ধে আমরা কাশ্মীরের ঐতিহাসিক বিভাজনের পটভূমি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল কারণসমূহ, দুই ভাগে বিভক্ত কাশ্মীরের বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈপরীত্য এবং দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা টিকিয়ে রাখার নেপথ্য কারণগুলো বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করব।
কাশ্মীর কেন ভারত-পাকিস্তান দুইভাগে বিভক্ত?
১৯৪৭ সালে যখন ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যায়, তখন শুধু ব্রিটিশ শাসিত সরাসরি অঞ্চলই নয়, বরং ৫৬০টিরও বেশি আধা-স্বায়ত্তশাসিত ‘দেশীয় রাজ্য’ (Princely States) ছিল। ব্রিটিশদের তৈরি করা ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্স অ্যাক্ট’ অনুযায়ী এই রাজ্যগুলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল যে তারা ভৌগোলিক অবস্থান ও জনসংখ্যার ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করে ভারত অথবা পাকিস্তানের যেকোনো একটির সাথে যুক্ত হতে পারবে, অথবা চাইলে সম্পূর্ণ স্বাধীন হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
এই ৫৬০টি রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যটি ছিল জম্মু ও কাশ্মীর। কাশ্মীরের এই ঐতিহাসিক বিভাজনটি যেভাবে ধাপে ধাপে ঘটেছিল, তার কালানুক্রমিক ইতিহাস নিচে আলোচনা করা হলো:
আগস্ট ১৯৪৭: মহারাজার স্বাধীনতা ঘোষণা ও রাজনৈতিক দ্বিধা
দেশভাগের সময় জম্মু ও কাশ্মীরের জনসংখ্যা ছিল মূলত মুসলিম প্রধান (প্রায় ৭৭%), কিন্তু এর শাসক ছিলেন হিন্দু ডোগরা রাজবংশের মহারাজা হরি সিং। মহারাজা হরি সিং দূরদর্শী বা রাজনৈতিকভাবে উচ্চাভিলাষী ছিলেন; তিনি ভারত বা পাকিস্তান কোনো পক্ষেই যোগ না দিয়ে কাশ্মীরকে একটি সুইজারল্যান্ডের মতো সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পাকিস্তানের সাথে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি (Standstill Agreement) স্বাক্ষর করেন যাতে বাণিজ্য ও যোগাযোগ সচল থাকে। পাকিস্তান এই চুক্তিতে সই করলেও তাদের মূল লক্ষ্য ছিল কাশ্মীরকে যেকোনো মূল্যে নিজেদের ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করা। অন্যদিকে, ভারতের তৎকালীন নেতৃত্ব মহারাজার চূড়ান্ত ও আইনি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ধৈর্য ধারণ করে থাকে।
অক্টোবর ১৯৪৭: পাকিস্তানি উপজাতিদের ছদ্মবেশী আক্রমণ
কাশ্মীর পাকিস্তানের সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিচ্ছে না দেখে পাকিস্তানের তৎকালীন নীতিনির্ধারক ও সামরিক কর্তারা ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। ১৯ অক্টোবর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের মদদপুষ্ট, আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হাজার হাজার পশতু উপজাতীয় লড়াকু এবং ছদ্মবেশী পাকিস্তানি সেনা সদস্য কাশ্মীরের সীমান্ত অতিক্রম করে এক ভয়াবহ আক্রমণ চালায়। তারা সীমান্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ওপর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করতে করতে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। মহারাজা হরি সিংয়ের নিজস্ব সীমিত ও অপ্রস্তুত বাহিনী এই সুসংগঠিত আধুনিক আক্রমণ ঠেকিয়ে রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
২৬ অক্টোবর ১৯৪৭: ঐতিহাসিক ভারতভুক্তি চুক্তি (Instrument of Accession)
যখন পাকিস্তানি হামলাকারীরা শ্রীনগরের প্রায় দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়, তখন উপায়ান্তর না দেখে মহারাজা হরি সিং ভারতের তৎকালীন সরকারের কাছে জরুরি সামরিক সহায়তার আকুতি জানান। ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন এবং প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু স্পষ্ট শর্ত দেন যে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ভারত কোনো বিদেশী রাষ্ট্রে সৈন্য পাঠাতে পারে না; সাহায্য পেতে হলে কাশ্মীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের অংশ হতে হবে।
এই চরম সংকটের মুখে, ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭ তারিখে মহারাজা হরি সিং আনুষ্ঠানিকভাবে 'ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন' (Instrument of Accession) বা ভারতভুক্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই আইনি দলিল স্বাক্ষরের পর পরই, ২৭শে অক্টোবর সকাল থেকে ভারতীয় বিমানবাহিনীর জওয়ানেরা বীরত্বের সাথে শ্রীনগরে অবতরণ করে এবং পাকিস্তানি হামলাকারীদের পিছু হটাতে শুরু করে।
১৯৪৭-১৯৪৮: প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ
ভারতীয় সেনারা যখন উপজাতি ছদ্মবেশীদের কাশ্মীর উপত্যকা থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছিল, তখন পাকিস্তান তাদের পরাজয় নিশ্চিত দেখে সরাসরি নিজেদের নিয়মিত সেনাবাহিনী ও ভারী সাঁজোয়া বহর যুদ্ধে নামিয়ে দেয়। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয়, যা দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং শীতকালীন আবহাওয়ার কারণে কোনো পক্ষই পুরো কাশ্মীরকে সম্পূর্ণভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি।
১ জানুয়ারি ১৯৪৯: জাতিসংঘের মধ্যস্থতা ও যুদ্ধবিরতি
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে (UN Security Council) নিয়ে যান। জাতিসংঘের দীর্ঘ আলোচনার পর, ১ জানুয়ারি ১৯৪৯ সালে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি (Ceasefire) ঘোষণা করা হয়। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিয়ম হয়, দুই দেশের সেনাবাহিনী যে যেখানে অবস্থান করছে, যুদ্ধ ঠিক সেই মুহূর্তেই সেখানে থমকে যাবে এবং একটি ‘যুদ্ধবিরতি রেখা’ টানা হবে।
যুদ্ধের শেষ ফল ও কাশ্মীরের স্থায়ী বিভাজন
কোনো দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনা বা স্থায়ী চুক্তি ছাড়াই, কেবল যুদ্ধের ময়দানে দুই দেশের সেনাবাহিনীর অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে কাশ্মীর রাজ্যটি স্থায়ীভাবে দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়।
লাইন অব কন্ট্রোল (LoC): ১৯৪৯ সালের সেই সাময়িক যুদ্ধবিরতি রেখাটিই পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ঐতিহাসিক সিমলা চুক্তির পর নতুন নামকরণ পায়, যা আজ বিশ্বজুড়ে 'লাইন অব কন্ট্রোল' বা LoC নামে পরিচিত।
পাকিস্তানের অংশ (প্রায় ৪০%): যুদ্ধ থামার মুহূর্তে পাকিস্তানি বাহিনী কাশ্মীরের যে উত্তর ও পশ্চিমাংশ নিয়ন্ত্রণ করছিল, তা পাকিস্তানের অধীনেই থেকে যায়। পাকিস্তান একে দুটি অংশে ভাগ করে শাসন করছে ‘আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর’ (AJK) এবং ‘গিলগিত-বালতিস্তান’ (GB)।
ভারতের অংশ (প্রায় ৬০%): ভারতীয় সেনাবাহিনী শ্রীনগরসহ কাশ্মীরের যে দক্ষিণ ও পূর্বাংশ সফলভাবে রক্ষা করতে পেরেছিল, তা ভারতের নিয়ন্ত্রণে আসে। এটি মূলত জম্মু, কাশ্মীর উপত্যকা এবং লাদাখ অঞ্চল নিয়ে গঠিত, যা বর্তমানে ভারতের সরাসরি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ কেন পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা চেয়েছিল?
১৯৪৭ সালে যখন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতের বুক চিরে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির জন্ম হলো, তখন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছেই এটি একটি অলৌকিক ও অবাস্তব ভৌগোলিক কাঠামো বলে মনে হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল প্রায় ১২০০ মাইল, যার মাঝখানে ছিল সম্পূর্ণ ভারত ভূখণ্ড। এই দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে একমাত্র মিল ছিল কাগজের কলমের ধর্ম; কিন্তু ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, খাদ্যভ্যাস, জলবায়ু এবং জীবনযাত্রার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য ছিল।
বাঙালি জাতি পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করার যে সিদ্ধান্ত ১৯৭১ সালে নিয়েছিল, তা কোনো হুট করে নেওয়া আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘ ২৪ বছরের ধারাবাহিক পদ্ধতিগত শোষণ, বঞ্চনা, বর্ণবাদী আচরণ এবং নির্মম নিপীড়নের বিরুদ্ধে জমতে থাকা ক্ষোভের এক ঐতিহাসিক বহিঃপ্রকাশ। এর প্রধান কারণগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো:
ভাষার ওপর আঘাত ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন
পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬% মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও, ১৯৪৮ সালেই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ধৃষ্টতার সাথে ঘোষণা করেন "উর্দু এবং কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা"। একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতির মুখের ভাষাকে কেড়ে নিয়ে সংখ্যালঘু পাঞ্জাবি এলিটদের ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার এই চক্রান্ত বাঙালি মেনে নেয়নি।
মায়ের ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য বাঙালিকে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে হয়েছিল। এই মহান ভাষা আন্দোলনই বাঙালিদের মনে প্রথম এই রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দেয় যে, পাকিস্তানের শাসকের আসনে যারা বসে আছে, তারা আসলে বাঙালিদের কোনো দিন ভাই বলে ভাবেনি; বরং তারা বাঙালিদের সংস্কৃতি, ভাষা ও নিজস্ব পরিচয়কে চিরতরে মুছে দিয়ে একটি কলোনি বানাতে চায়।
চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য ও লুণ্ঠন
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছিল পাকিস্তানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড। পূর্ব পাকিস্তানের উর্বর মাটিতে উৎপাদিত সোনালী আঁশ পাট এবং চা বিশ্ববাজারে রপ্তানি করে যে সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো, তার সিংহভাগই গায়ের জোরে কেটে নিয়ে যাওয়া হতো পশ্চিম পাকিস্তানে।
বাজেট ও উন্নয়ন বৈষম্য: প্রতি বছর কেন্দ্রীয় বাজেটের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বরাদ্দ করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য। পূর্ব পাকিস্তানের টাকায় সিন্ধু নদের ওপর বাঁধ দেওয়া হতো, পাঞ্জাবের চারণভূমি সবুজ করা হতো এবং লুণ্ঠিত টাকায় মরুভূমির বুকে গড়ে তোলা হয়েছিল পাকিস্তানের বিলাসবহুল নতুন রাজধানী ‘ইসলামাবাদ’।
সস্তা বাজার হিসেবে ব্যবহার: পূর্ব পাকিস্তানকে মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের উৎপাদিত নিম্নমানের পণ্যের একটি সস্তা করদ রাজ্য বা বাজার (Market) এবং কাঁচামাল সরবরাহকারী অঞ্চল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বাঙালিরা নিজেরা উৎপাদন করেও নিজেদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারত না।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বঞ্চনা
জনসংখ্যার দিক থেকে বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী বা প্রশাসনিক কোনো পর্যায়েই বাঙালিদের কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে দেওয়া হতো না।
আমলাতান্ত্রিক বৈষম্য: সিপাহসালার ও সিভিল সার্ভিসের (আমলাতন্ত্র) শীর্ষ পদগুলোতে বাঙালিদের অনুপাত ছিল নগণ্য (মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ)।
সামরিক বৈষম্য: সামরিক বাহিনীতে বাঙালি অফিসার ছিল মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ। পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও পাঞ্জাবি আমলারা বাঙালিদের অত্যন্ত নিচু চোখে দেখত এবং তাদের "দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক" বা কম ঈমানদার মুসলমান মনে করত।
১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড় 'ভোলা' এবং পাকিস্তানের উদাসীনতা
১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে পূর্ব উপকূলে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় 'ভোলা' আঘাত হানে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় ৫ লাখ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এই চরম মানবিক বিপর্যয়ের পরও তৎকালীন কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকার ত্রাণ, উদ্ধারকাজ ও পুনর্বাসনে চরম অবহেলা ও উদাসীনতা দেখায়।
তৎকালীন সামরিক জান্তা প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান কয়েকদিন পর অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শনে আসেন এবং কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়েই ফিরে যান। এই ঘটনাটি বাঙালিদের চূড়ান্তভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, পাকিস্তানি শাসকদের কাছে বাঙালির জানমালের মূল্য একটি পশুর চেয়েও কম।
১৯৭০-এর নির্বাচনের ম্যান্ডেট প্রত্যাখ্যান (চূড়ান্ত আঘাত)
১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম অবাধ ও সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদে স্পষ্ট ও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (১৬৭টি আসন) লাভ করে। গণতান্ত্রিক নিয়ম অনুযায়ী বাঙালিদের সরকার গঠন করার এবং পুরো পাকিস্তানের শাসনভার নেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান এবং পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বাঙালির এই গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটকে মেনে নিতে পারেননি। তারা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানান এবং আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে গোপনে পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র ও সৈন্য জড়ো করতে থাকেন।
যখন গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা পাওয়ার সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হলো এবং ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরীহ, নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে মানব ইতিহাসের অন্যতম বর্বর ও নৃশংসতম গণহত্যা শুরু করল, তখন ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতা ঘোষণা করা এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া বীর বাঙালির সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না।
দুই কাশ্মীরের বৈপরীত্য: ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে উন্নয়ন
ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের পর থেকে, শাসনব্যবস্থা, আইনি কাঠামো এবং ভৌত অবকাঠামোতে এক বৈপ্লবিক ও যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলা বিশেষ মর্যাদার নামে যে রাজনৈতিক স্থবিরতা ছিল, তা ভেঙে এই অঞ্চলকে ভারতের মূল অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্রোতধারার সাথে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় কাশ্মীরি জনগণ বেশ কিছু অভূতপূর্ব সুবিধা ভোগ করছেন:
সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকারের সমতা
৩৭০ ধারা বহাল থাকার সময় ভারতের বহু কল্যাণমুখী ও প্রগতিশীল আইন কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ পেত না। কিন্তু বর্তমান পরিবর্তনের পর ভারতের অন্য সব রাজ্যের মতো এখানেও কেন্দ্রীয় আইনগুলো সম্পূর্ণরূপে কার্যকর হয়েছে।
অধিকারের সম্প্রসারণ: স্থানীয় কাশ্মীরি জনগণ এখন সরাসরি 'শিক্ষার অধিকার আইন' (Right to Education) এবং 'তথ্য অধিকার আইন' (Right to Information) এর মতো শক্তিশালী নাগরিক অধিকারের সুফল পাচ্ছেন।
অনগ্রসর শ্রেণির ক্ষমতায়ন: সমাজের পিছিয়ে পড়া, এতদিন ধরে প্রান্তিক ও বৈষম্যের শিকার হওয়া বিভিন্ন উপজাতি (যেমন গুজ্জর, বকরওয়াল) এবং তফসিলি জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের (Reservation) সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে, যা আগে ধারণার বাইরে ছিল।
যোগাযোগ ও মেগা অবকাঠামোগত উন্নয়ন
কাশ্মীরের পাহাড়ি দুর্গমতাকে জয় করতে ভারত সরকার রেকর্ড পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে, যা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দিচ্ছে:
চিনাব ব্রিজ (Chenab Bridge): 'উধমপুর-শ্রীনগর-বারামুলা রেল লিঙ্ক' (USBRL) প্রকল্পের অধীনে চিনাব নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ রেল সেতু, যা আইফেল টাওয়ারের চেয়েও উঁচু। এটি কাশ্মীর উপত্যকাকে ভারতের মূল রেল নেটওয়ার্কের সাথে সরাসরি যুক্ত করেছে।
মেগা টানেল প্রকল্প: জোজিলা (Zojila) এবং জেড-মোরহ (Z-Morh) টানেলের মতো এশিয়ার দীর্ঘতম সুড়ঙ্গ পথগুলোর নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে, যা শীতকালে তুষারপাতের সময়ও কাশ্মীরের সাথে লাদাখ ও ভারতের মূল ভূখণ্ডের বারো মাসের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করবে।
নগর আধুনিকায়ন: শ্রীনগর ও জম্মু শহরের ট্রাফিক জট কমাতে এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ওয়াটার মেট্রো ও আধুনিক লাইট মেগা মেট্রো রেলের কাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের আধুনিকায়ন
স্থানীয় মানুষকে চিকিৎসার জন্য যেন দিল্লির মতো দূরবর্তী শহরে দৌড়াতে না হয়, সেজন্য বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে:
এইমস (AIIMS) হাসপাতাল: কাশ্মীরের অবন্তিপোরা এবং জম্মুতে দুটি অত্যাধুনিক 'অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস' (AIIMS) হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হচ্ছে।
উচ্চশিক্ষা: যুবসমাজের মেধা বিকাশের জন্য ভারতের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আইআইটি (IIT) এবং আইআইএম (IIM)-এর স্থায়ী ক্যাম্পাস জম্মু ও কাশ্মীরে চালু করা হয়েছে, যা স্থানীয় শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের ক্যারিয়ার গড়তে সাহায্য করছে।
ডিজিটাল প্রশাসন ও সুশাসন
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জম্মু ও কাশ্মীর সরকার 'ডিজিটাল জে অ্যান্ড কে' (Digital J&K) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রায় সমস্ত সরকারি সেবা সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক করেছে। জমির রেকর্ড ১০০% ডিজিটালাইজেশন করার ফলে সাধারণ গরিব কৃষকদের জমিজমা সংক্রান্ত আইনি হয়রানি, বছরের পর বছর চলা মামলা এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের (দালাল) দৌরাত্ম্য সম্পূর্ণরূপে দূর হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পর্যটন খাতের ঐতিহাসিক জোয়ার
আগের তুলনায় পাকিস্তান স্পন্সরড সন্ত্রাসবাদ, পাকিস্তানের দেওয়া টাকায় পাথর ছোঁড়া (Stone pelting) এবং হুটহাট বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ডাকা হরতাল বা বন্ধের সংস্কৃতি নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাওয়ায় কাশ্মীরে এক অভূতপূর্ব শান্তি ফিরে এসেছে। এর সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে পর্যটন খাতে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বছরে ২ কোটিরও বেশি পর্যটক কাশ্মীর ভ্রমণ করছেন। এটি সরাসরি স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী, হাউসবোট মালিক, ডাল লেকের শিকারা চালক, ঐতিহ্যবাহী পশমিনা হস্তশিল্প শিল্পী এবং ট্যুর অপারেটরদের পকেটে সরাসরি অর্থ পৌঁছে দিচ্ছে। এছাড়া নতুন নতুন বৃহৎ জলবিদ্যুৎ ও সৌরশক্তি প্রকল্পের মাধ্যমে এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ ঘাটতি দূর করার টেকসই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তৃণমূল গণতন্ত্রের শক্তিশালীকরণ
কাশ্মীরে দীর্ঘকাল ধরে মাত্র কয়েকটি রাজনৈতিক পরিবার ক্ষমতার চাবিকাঠি নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু বর্তমান ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা (পঞ্চায়েত, ব্লক ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল এবং ডিস্ট্রিক্ট Development Council) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ক্ষমতা সরাসরি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক স্থানীয় ও সাধারণ নির্বাচনগুলোতে সাধারণ কাশ্মীরি জনগণের রেকর্ডসংখ্যক (কোথাও কোথাও ৬০-৭০% এর বেশি) স্বতঃস্ফূর্ত ও শান্তিপূর্ণ ভোটদান প্রমাণ করে যে, তারা সহিংসতার পথ ছেড়ে বুলেটের বদলে ব্যালটের মাধ্যমে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চায় বিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন।
দুই কাশ্মীরের বৈপরীত্য: পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে শোষণ ও মানবাধিকার বিপর্যয়
ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে যখন উন্নয়নের জোয়ার বইছে, তার ঠিক উল্টো পিঠে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর যা ‘আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর’ (AJK) এবং ‘গিলগিত-বালতিস্তান’ (GB) নামে পরিচিত সেখানে চলছে চরম অন্ধকার ও ঔপনিবেশিক কায়দায় লুণ্ঠন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা যেমন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW), অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন স্বাধীন প্রতিবেদনের আলোকে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বঞ্চনার মূল দিকগুলো নিচে উন্মোচিত করা হলো:
রাজনৈতিক অধিকার হরণ ও বঞ্চনা
আপাতদৃষ্টিতে আজাদ কাশ্মীরের একটি নিজস্ব সংসদ, প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট থাকলেও, তা আসলে একটি পুতুল নাচ ছাড়া আর কিছুই নয়।
আনুগত্যের কালো আইন: আজাদ কাশ্মীরের অন্তর্বর্তী সংবিধানে একটি চরম অগণতান্ত্রিক ধারা রয়েছে। সেখানে কেউ যদি কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে চান, রাজনৈতিক দল গঠন করতে চান অথবা সাধারণ একটি সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করতে চান, তবে তাঁকে একটি বাধ্যতামূলক হলফনামায় সই করতে হয় যে “তিনি কাশ্মীরকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার আদর্শে সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাসী”। এর ফলে যারা কাশ্মীরের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার কথা বলেন (যেমন ধর্মনিরপেক্ষ বা জাতীয়তাবাদী বালুচ ও কাশ্মীরি দলগুলো), তারা আইনিভাবেই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও কোণঠাসা হয়ে পড়েন।
ইসলামাবাদের পরোক্ষ একনায়কত্ব: আসল ক্ষমতা থাকে ‘আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর কাউন্সিল’-এর হাতে, যার স্থায়ী চেয়ারম্যান হলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। ইসলামাবাদ থেকে পাঠানো একজন ওআইসি (OIC) আমলা বা সেনা কর্মকর্তাই পুরো অঞ্চলের বাজেট ও নীতি নির্ধারণ করেন।
গিলগিত-বালতিস্তানের ঝুলে থাকা পরিচয়: গিলগিত-বালতিস্তান অঞ্চলের অবস্থা আরও করুণ। পাকিস্তান তাদের নিজেদের পূর্ণাঙ্গ প্রদেশ হিসেবেও স্বীকৃতি দেয় না, আবার আজাদ কাশ্মীরের মতো ন্যূনতম কাগজে-কলমে বিশেষ মর্যাদাও দেয় না। তারা কয়েক দশক ধরে এক সাংবিধানিক গোলকধাঁধায় আটকে আছে, যার ফলে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে তাদের কোনো স্থায়ী বা কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নেই।
অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক সম্পদের নির্মম শোষণ
পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডের (বিশেষ করে পাঞ্জাব প্রদেশের) অর্থনীতি সচল রাখতে কাশ্মীরের নদী ও প্রাকৃতিক সম্পদকে নির্মমভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্তু তার কোনো সুফল স্থানীয় মানুষ পায় না।
বিদ্যুতের অন্ধকার রাজনীতি: পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে মাংলা বাঁধ (Mangla Dam) এবং নীলম-ঝিলামের (Neelum-Jhelum) মতো বিশাল বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। এখান থেকে উৎপাদিত অত্যন্ত সস্তা বিদ্যুৎ পাইপলাইনের মাধ্যমে পাকিস্তানের লাহোর, ফয়সালাবাদ ও করাচির শিল্পকারখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। অথচ, চরম পরিহাসের বিষয় হলো, কাশ্মীরের স্থানীয় জনগণকেই চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে হয় এবং দিনে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা তীব্র লোডশেডিংয়ের মধ্যে অন্ধকারে কাটাতে হয়।
রয়্যালটি থেকে বঞ্চিত: স্থানীয় নদী ব্যবহার করা হলেও তার কোনো রয়্যালটি বা লভ্যাংশ এই অঞ্চলের উন্নয়নে খরচ করা হয় না। এ নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে (বিশেষ করে ২০২৩ ও ২০২৪ সাল জুড়ে এবং ২০২৫-এর শুরুতে) সাধারণ মানুষ 'জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি'-র (JKJAAC) ব্যানারে আটা ও বিদ্যুতের ভর্তুকির দাবিতে ও শোষণের বিরুদ্ধে বিশাল গণআন্দোলন, ধর্মঘট ও আইন অমান্য আন্দোলন করেছে, যা পাকিস্তানি রেঞ্জার্স বাহিনী বুলেটের জোরে দমন করার চেষ্টা করেছে।
স্থানীয়দের ক্ষোভ: স্থানীয় আন্দোলনকারীদের একটি বিখ্যাত স্লোগানই হয়ে উঠেছে "পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটায় কাশ্মীরের নদীগুলো, কিন্তু কাশ্মীরের সাধারণ মানুষকে মোমবাতি জ্বালিয়ে রাত কাটাতে হয়।"
বাক-স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন
এই অঞ্চলে পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) এবং আধাসামরিক বাহিনী ফ্রন্টিয়ার কোপসের (FC) রাজত্ব চলে। সেখানে কোনো সাংবাদিক বা অ্যাক্টিভিস্ট যদি সম্পদের বৈষম্য, সেনাবাহিনীর দুর্নীতি কিংবা সিপেক প্রজেক্টের নামে জমি দখলের বিরুদ্ধে একটি লাইনও লেখেন, তবে তাঁকে সাথে সাথে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বা ‘ভারতের এজেন্ট’ তকমা দিয়ে চিরতরে গুম করে দেওয়া হয়।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ২০০৪ থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত হাজার হাজার কাশ্মীরি ও গিলগিতের তরুণকে কোনো বিচার ছাড়াই নিরাপত্তা বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে, যাদের অনেকেরই লাশ পরবর্তীতে পাহাড়ি উপত্যকায় পাওয়া গেছে।
অবকাঠামোগত ও নাগরিক সেবার অবহেলা
এখানে কোনো বড় শিল্পকারখানা, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়নি। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো মানুষ যদি হৃদরোগ বা ক্যান্সারের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হন, তবে স্থানীয় স্তরে কোনো উন্নত চিকিৎসা না থাকায় তাঁকে বাধ্য হয়ে শত শত মাইল দূরবর্তী রাওয়ালপিন্ডি বা ইসলামাবাদের হাসপাতালের বারান্দায় গিয়ে পড়ে থাকতে হয়। কর্মসংস্থানের তীব্র সংকটের কারণে এখানকার শিক্ষিত যুবসমাজের একটি বিশাল অংশ বাধ্য হয়ে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপে গিয়ে সস্তা ও কায়িক শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছে।
সিপেক (CPEC) ও ভূমি অধিকার নিয়ে চীনা আগ্রাসন
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC)-এর মূল রুটটি গিলগিত-বালতিস্তানের বিতর্কিত ও পরিবেশগতভাবে ভঙ্গুর অঞ্চলের ওপর দিয়ে গেছে। এই মেগা প্রকল্পের জন্য স্থানীয় মানুষের পৈতৃক চাষের জমি ও ঘরবাড়ি জোরপূর্বক সামরিক বাহিনীর সহায়তায় অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যার কোনো সঠিক ক্ষতিপূরণ স্থানীয় গরিব মানুষ পায়নি।
তাছাড়া, এই করিডোরের মাধ্যমে হাজার হাজার চীনা ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে স্থানীয় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে এবং কারাকোরাম অঞ্চলের অতি সংবেদনশীল হিমবাহগুলো দ্রুত গলে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে বড় ধরণের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পাকিস্তান কেন কাশ্মীর ও বাংলাদেশকে শান্তিতে থাকতে দিতে চায় না?
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে পাকিস্তান। ধর্মীয় উন্মাদনা আর সামরিকতন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই রাষ্ট্রটি তার জন্মলগ্ন থেকেই প্রতিবেশী অঞ্চলের ওপর কোনো না কোনোভাবে আগ্রাসন চালিয়ে আসছে। ২০২৬ সালের এই বর্তমান সময়ে এসেও পাকিস্তানের সেই চিরন্তন যুদ্ধাংদেহী ও অন্তর্ঘাতমূলক চরিত্রের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।
পাকিস্তানের এই আগ্রাসনের দুটি প্রধান রূপ আমরা দেখতে পাই:
কাশ্মীরের ক্ষেত্রে: এটি মূলত ভৌগোলিক, সামরিক এবং প্রত্যক্ষ ছায়াযুদ্ধের (Proxy War) রূপ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে: এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন- ভূখণ্ডগত বিরোধ না হলেও এটি মূলত ঐতিহাসিক পরাজয়ের গ্লানি, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং গভীর রাজনৈতিক অন্তর্ঘাতের ছক।
বিগত ৭৯ বছর ধরে পাকিস্তান একদিকে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের জীবনকে নরকে পরিণত করেছে, অন্যদিকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে লজ্জাজনক পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রের জাল বুনে চলেছে।
কাশ্মীর প্রসঙ্গে পাকিস্তানের নীতি: ৭৯ বছরের ব্যর্থতা ও ছায়াযুদ্ধ
১৯৪৭ সালের পর থেকে বিগত ৭৯ বছর ধরে পাকিস্তান বিভিন্ন সময়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যুদ্ধের মাধ্যমে কাশ্মীরকে নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। ১৯৪৮, ১৯৬৫ এবং ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধসহ একাধিকবার ভারতের সাথে সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। কিন্তু প্রতিবারই তারা রণক্ষেত্রে লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হয়েছে। সরাসরি যুদ্ধে কাশ্মীরের এক ইঞ্চি মাটিও দখল করতে না পেরে পাকিস্তান পরবর্তীতে তাদের রণকৌশল পরিবর্তন করে এবং শুরু করে এক জঘন্য ছায়াযুদ্ধ বা 'প্রক্সি ওয়ার' (Proxy War)।
স্থানীয় কাশ্মীরিদের অস্ত্রায়ণ ও সন্ত্রাসবাদের বিস্তার
সরাসরি যুদ্ধে ভারতের সাথে পেরে উঠতে ব্যর্থ হয়ে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) এবং সামরিক বাহিনী কাশ্মীরে উগ্রপন্থী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে মদদ দেওয়া শুরু করে। তারা স্থানীয় ও বহিরাগত যুবকদের অস্ত্র ও অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে সন্ত্রাসী ট্রেনিং দেয় এবং ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে অনুপ্রবেশ করায়। পাকিস্তানের এই চাপিয়ে দেওয়া ছায়াযুদ্ধের কারণে বিগত কয়েক দশক ধরে জম্মু ও কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ একটি দিনের জন্যও শান্তিতে ঘুমাতে পারেনি।
পাকিস্তানের প্রক্সি ওয়ার ও স্থানীয় কাশ্মীরিদের উভয়সংকট: পাকিস্তান স্পন্সরড সন্ত্রাসীরা দুইদিন পর পরই উপত্যকায় সন্ত্রাসী হামলা চালায়। এর ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত সরকারকে সেখানে কঠোর দমন নীতি ও সামরিক অভিযান চালাতে হয়। এই সন্ত্রাসী ধরতে গিয়ে অনেক সময় স্থানীয় নিরীহ নাগরিকদের হয়রানি ও আইনগত কঠোরতার মুখোমুখি হতে হয়।
অন্যদিকে, স্থানীয় তরুণরা যদি এই পাকিস্তানি জঙ্গি বা মিলিট্যান্ট বাহিনীতে যোগ দিতে অস্বীকার করে, তবে জঙ্গি সংগঠনগুলো স্বয়ং সেই কাশ্মীরি পরিবারগুলোর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। অর্থাৎ, পাকিস্তানি প্রক্সি ওয়ারের কারণে কাশ্মীরের মানুষ এক নির্মম উভয়সংকটের বলী।
জল-রাজনীতি (Hydro-Politics)
কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের এই অন্ধ মোহ ও উত্তেজনার পেছনে গভীর ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। পাকিস্তান মূলত একটি একক নদী অববাহিকা নির্ভর দেশ, যার প্রধান লাইফলাইন হলো সিন্ধু নদ (Indus River) এবং এর উপনদীগুলো (ঝিলাম ও চিনাব)। এই নদীগুলোর মূল উৎস ও প্রবাহ পথ কিন্তু কাশ্মীর অঞ্চলের ওপর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে।
পাকিস্তান ভালো করেই জানে, কাশ্মীর যদি সম্পূর্ণভাবে ভারতের সাথে স্থায়ী সুস্থিতি লাভ করে, তবে তাদের পানির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে (যদিও ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি আজও কার্যকর রয়েছে)। এই পানির নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষার এক চরম মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক থেকেই কাশ্মীরকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া পাকিস্তান।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘ভয়ের ব্যবসা’
পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোতে সামরিক বাহিনী (Pakistan Army) কোনো নির্বাচিত সরকারের অধীনে নয়, বরং তারাই পরোক্ষভাবে রাষ্ট্র চালায়। নিজেদের এই অসীম ক্ষমতা, রাষ্ট্রীয় সম্পদে একচেটিয়া আধিপত্য এবং জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ সামরিক খাতে বরাদ্দ করার বিষয়টিকে জনগণের সামনে বৈধ করার জন্য তাদের একটি ‘শত্রু’র প্রয়োজন হয়। আর সেই তৈরি করা শত্রু হলো ভারত।
সেনাবাহিনী প্রতিনিয়ত পাকিস্তানের জনগণের সামনে কাশ্মীর সংকট ও ভারতের ভয়কে জিইয়ে রাখে। কাশ্মীরে যদি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তবে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ সেনাবাহিনীর এই আকাশচুম্বী বাজেট ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। ফলে নিজেদের অস্তিত্ব ও ক্ষমতার লোভেই পাকিস্তানি জেনারেলরা কাশ্মীর ইস্যুটিকে চিরকাল জ্বলন্ত রাখতে চায়।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি: ঐতিহাসিক ক্ষত ও পরাজয়ের গ্লানি
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের বৈরিতা কোনো সীমান্ত বিরোধের বিষয় নয়। এটি মূলত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির কাছে তাদের ৯৩ হাজার বীর সৈন্যের ঐতিহাসিক ও লজ্জাজনক আত্মসমর্পণের গ্লানি থেকে তৈরি। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিকে পৈশাচিক কায়দায় দমন করতে গিয়ে নিজেরাই খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাওয়ার এই ঐতিহাসিক চপেটাঘাত পাকিস্তান আজও মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। সেই পরাজয়ের পর থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশকে পঙ্গু ও অস্থিতিশীল করার জন্য পাকিস্তান নানা কায়দায় অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতি চালিয়ে আসছে।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক স্তব্ধতা
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজ চলছিল, তখন পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যাপক ষড়যন্ত্র শুরু করে।
মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করা: পাকিস্তান তাদের কূটনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ধনী মুসলিম দেশগুলো (যেমন সৌদি আরব, তুরস্ক ও অন্যান্য ওআইসি ভুক্ত দেশ) যাতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয় এবং কোনো প্রকার সাহায্য না করে, তার জন্য তীব্র লবিং চালায়। এর ফলে সদ্য স্বাধীন দেশ হিসেবে মুসলিম বিশ্বের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য পেতে বাংলাদেশের বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।
১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষে পাকিস্তানের ভূমিকা: ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, তার পেছনেও পাকিস্তানের পরোক্ষ হাত ছিল। পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে লবিং করে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দকৃত আন্তর্জাতিক খাদ্য সাহায্য ও ঋণ আটকে দেওয়ার চক্রান্ত করেছিল। আমেরিকার তৎকালীন পিএল-৪৮০ (PL-480) আইনের অধীনে গমবাহী জাহাজ আটকে দেওয়ার পেছনে পাকিস্তানের কূটনৈতিক চাল কাজ করেছিল, যার ফলে সময়মতো খাদ্য না পেয়ে বাংলাদেশে এক চরম মানবিক বিপর্যয় ঘটেছিল।
১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্ট: বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড
বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের স্থাপত্য ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে পাকিস্তানের গভীর ও সুদূরপ্রসারী ব্লু-প্রিন্ট ছিল।
১৯৭৫-এর নির্মমতায় পাকিস্তানের অন্তর্ঘাতমূলক রূপরেখা: স্বাধীনতার পর পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা সামরিক কর্মকর্তা (Repatriated Officers) এবং সেনাবাহিনীর ভেতরের কিছু উচ্চাভিলাষী ও পদলোভী কর্মকর্তাদের উস্কে দিয়ে এক কৃত্রিম কোন্দল তৈরি করেছিল পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা। পাকিস্তানের লালিত রাজাকার, আল-বদর এবং তাদের রাজনৈতিক দোসররা এই ষড়যন্ত্রে সরাসরি লিপ্ত ছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে তারা মূলত বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাকে ধ্বংস করে দেশটিকে আবার একটি মিনি-পাকিস্তানে রূপ দেওয়ার অপচেষ্টা করেছিল।
জামায়াতে ইসলামী ও জঙ্গীবাদের বিস্তার
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অন্ধকার যুগের সূচনা হয়। পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ মদদ ও অর্থায়নে মুক্তিযুদ্ধের আমলনামায় চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকারদের পুনর্বাসন করা হয়।
সাংগঠনিক বিস্তার: পাকিস্তানের সৃষ্টি করা ‘জামায়াতে ইসলামী’ তাদের কুখ্যাত এজেন্ডা নিয়ে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে সাংগঠনিক কাঠামো বিস্তার করে।
ধর্মীয় উগ্রবাদের চাষ: নব্বইয়ের দশক এবং ২০০০ সালের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ধর্মের নামে যত বড় বড় জঙ্গি সংগঠন (যেমন জেএমবি, হুজি ইত্যাদি) তৈরি হয়েছিল, তার প্রতিটির পেছনে পাকিস্তানের আইএসআই-এর অর্থ ও আধুনিক অস্ত্রের যোগান ছিল। বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর ও উগ্রবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে প্রমাণ করতেই পাকিস্তান এই ধর্মীয় জঙ্গিবাদের বীজ এদেশের মাটিতে বপন করেছিল।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে যে ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যা এবং ২ লক্ষাধিক নারীকে নির্যাতন করেছিল, তার জন্য পাকিস্তান রাষ্ট্রগতভাবে আজ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ও নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। উল্টো, বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা শুরু করে, তখন পাকিস্তানের পার্লামেন্টে (National Assembly) বাংলাদেশের এই অভ্যন্তরীণ বিচার প্রক্রিয়ার নিন্দা জানিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাস করা হয়। এটি একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ আইনি ও বিচার ব্যবস্থার ওপর চরম এবং নগ্ন হস্তক্ষেপ।
অর্থনৈতিক ঈর্ষা ও মনস্তাত্ত্বিক অস্বস্তি
বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন, রপ্তানি (আরএমজি সেক্টর), বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে পাকিস্তানকে বহুদূরে ফেলে এগিয়ে গেছে। আজ যখন পাকিস্তান ঋণের বোঝা ও মুদ্রাস্ফীতিতে দেউলিয়া হওয়ার পথে, তখন বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি।
এই চরম বাস্তব বৈপরীত্য পাকিস্তানের নীতিনির্ধারক ও পাঞ্জাবি এলিটদের জন্য তীব্র মনস্তাত্ত্বিক অস্বস্তির কারণ। তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না যে, যাদের তারা ‘ভুখা বাঙালি’ বলে অবহেলা করত, তারা আজ তাদের চেয়ে অনেক উন্নত জীবনযাপন করছে। এছাড়া আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে পাকিস্তান তাদের নিজেদের জন্য একটি বড় কৌশলগত অসুবিধা (Strategic Disadvantage) হিসেবে দেখে।
কামানের গোলা কিংবা ধর্মের নামে উগ্রবাদ ছড়িয়ে কোনো বীর জাতিকে চিরকাল দমন করে রাখা যায় না। বাঙালি জাতি যেমন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সমস্ত আধুনিক সাঁজোয়া বহরকে ধূলিসাৎ করে বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছিল, ঠিক তেমনি কাশ্মীরের মানুষও আজ পাকিস্তানের এই ছদ্মবেশী প্রক্সি ওয়ারের আসল রূপ ধরে ফেলেছে। পাকিস্তান যতক্ষণ না তাদের সামরিকতন্ত্রের মোহ ত্যাগ করবে এবং তাদের নীতিনির্ধারকেরা উগ্রবাদী ও অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতি থেকে সরে আসবে, ততক্ষণ তারা নিজেরা যেমন দেউলিয়া দশা থেকে মুক্ত হতে পারবে না, তেমনি দক্ষিণ এশিয়াতেও শান্তি আসবে না।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক তুলনা ও শোষণের খতিয়ান
নিচে দক্ষিণ এশিয়ার এই তিনটি প্রধান ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক অঞ্চলের রাজনৈতিক অবস্থান, শোষণের ধরণ এবং বর্তমান শাসন কাঠামোর একটি সুবিন্যস্ত তুলনামূলক ছক উপস্থাপন করা হলো:
সূচক ও বৈশিষ্ট্য | পূর্ব পাকিস্তান / বাংলাদেশ (১৯৪৭-১৯৭১) | ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর (বর্তমান) | পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর (AJK ও GB) |
ভৌগোলিক ও জনসংখ্যা অবস্থান | পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬% নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল ছিল। | ভারতের উত্তর সীমানার কৌশলগত ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। | পাকিস্তানের মোট আয়তনের এক বিশাল পাহাড়ি ও কৌশলগত অংশ। |
রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক মর্যাদা | কাগজে-কলমে প্রদেশ হলেও মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের একটি কলোনি বা উপনিবেশ ছিল। | ৩৭০ ধারা বাতিলের পর ভারতের অন্য সব রাজ্যের মতো পূর্ণ সাংবিধানিক অধিকারপ্রাপ্ত। | নামমাত্র স্থানীয় সরকার, আসল ক্ষমতা ইসলামাবাদের ‘কাশ্মীর কাউন্সিল’ ও আইএসআই-এর হাতে। |
অর্থনৈতিক অধিকার ও সম্পদের বণ্টন | পাটের সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে লুট করা হতো। | বিলিয়ন ডলারের কেন্দ্রীয় প্যাকেজ, নিজস্ব সম্পদের ওপর স্থানীয় পঞ্চায়েতের অধিকার। | মাংলা ও নীলম-ঝিলামের বিদ্যুৎ পাঞ্জাবে যায়; স্থানীয়রা বিদ্যুৎহীন ও চড়া মূল্যের শিকার। |
নাগরিক ও আইনি অধিকার | সিভিল সার্ভিস ও সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ। | শিক্ষার অধিকার (RTE), তথ্য অধিকার (RTI) এবং অনগ্রসরদের জন্য কোটা সুবিধা। | নির্বাচনে দাঁড়াতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তির পক্ষে হলফনামা দিতে হয়। |
অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সেবা | ২৫ বছরে পূর্ব পাকিস্তানে কোনো বড় মেগা প্রজেক্ট বা নতুন রাজধানী করা হয়নি। | চিনাব রেল ব্রিজ, জোজিলা টানেল, এইমস হাসপাতাল, আইআইটি ও আইআইএম ক্যাম্পাস। | উন্নত হাসপাতালের চরম অভাব; সিপেক (CPEC) প্রকল্পের নামে স্থানীয় জমি দখল ও পরিবেশ ধ্বংস। |
নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি | ১৯৭১ সালে চালানো হয়েছিল কুখ্যাত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ ও গণহত্যা। | সন্ত্রাসবাদ কমে যাওয়ায় পর্যটনের জোয়ার (বছরে ২ কোটির বেশি পর্যটক), শান্ত পরিবেশ। | ‘কিল অ্যান্ড ডাম্প’ পলিসি; অধিকারের কথা বললে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। |
ঐতিহাসিক পরিণতি ও বর্তমান রূপ | ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। | অর্থনৈতিক মূলধারার সাথে যুক্ত হয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও সুশাসনের দিকে অগ্রসরমান। | শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র গণঅন্দোলন (জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির ব্যানারে প্রতিবাদ)। |
১৯৭১-এর পরাজয় এবং পাকিস্তানের ‘হাজার ক্ষত’ নীতি
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানের ৯৩ হাজার সৈন্যের ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ শুধু তাদের ভূখণ্ডই কেড়ে নেয়নি, বরং তাদের সামরিক অহংকারে এমন এক স্থায়ী আঘাত হেনেছিল যা তাদের পরবর্তী প্রতিরক্ষা নীতিকে বদলে দেয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক নীতিনির্ধারকেরা (বিশেষ করে জেনারেল জিয়া-উল-হক) বুঝতে পারেন যে, প্রথাগত বা সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে ভারতের সাথে জেতা পাকিস্তানের পক্ষে অসম্ভব। এর ফলে জন্ম নেয় "Bleed India Through a Thousand Cuts" বা "হাজার ক্ষতের মাধ্যমে ভারতকে রক্তক্ষরণ করা" নীতি। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল সরাসরি যুদ্ধ না করে কাশ্মীরে প্রক্সি ওয়ার (ছায়াযুদ্ধ), উগ্রপন্থী অনুপ্রবেশ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্থ ও অস্ত্র জুগিয়ে ভারতকে ভেতর থেকে দুর্বল করা। অর্থাৎ, ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান হারানোর ক্ষোভ ও গ্লানি ঢাকতেই পাকিস্তান ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে কাশ্মীরে চরমপন্থী সহিংসতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
শিমলা চুক্তি (১৯৭২): বাংলাদেশ ও কাশ্মীরের কূটনৈতিক সংযোগ
অনেকেই হয়তো জানেন না যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সমাপ্তির সাথেই কাশ্মীরের বর্তমান সীমান্ত বা LoC-র আইনি স্বীকৃতি সরাসরি জড়িত। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর, ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো ভারতের সিমলায় একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে মিলিত হন।
এই চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ থামার মুহূর্তে কাশ্মীরে দুই দেশের সেনাবাহিনী যে অবস্থানে ছিল, তাকেই আনুষ্ঠানিক ও স্থায়ীভাবে ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ (LoC) হিসেবে মেনে নেওয়া হবে। শিমলা চুক্তিতে পাকিস্তান লিখিতভাবে মেনে নেয় যে, কাশ্মীর সংকটের সমাধানে তারা কোনো তৃতীয় পক্ষ বা আন্তর্জাতিক মঞ্চকে (যেমন জাতিসংঘ) জড়াবে না এবং ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই এর সমাধান করতে হবে। যদিও পাকিস্তান পরবর্তীতে এই চুক্তি বারবার লঙ্ঘন করেছে।
অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব বনাম সামরিক বাজেট
বর্তমান সময়ে এসে পাকিস্তান চরম অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অভাব এবং আইএমএফ (IMF)-এর ঋণের ওপর ভর করে দেশটি চলছে। তাসত্ত্বেও তাদের সামরিক বাজেট বা কাশ্মীর নীতির কোনো পরিবর্তন কেন হয় না?
সামরিক বাহিনীর ব্যবসা (Milbus): পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী কেবল দেশ রক্ষা করে না, বরং তারা সে দেশের রিয়েল এস্টেট, ব্যাংকিং, সার কারখানা এবং বড় বড় করপোরেট ব্যবসার নিয়ন্ত্রক।
ভয়ের বিপণন: সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য) পূরণ না করে কেন সেনাবাহিনীর পেছনে এত টাকা ঢালা হচ্ছে এই প্রশ্নটি যাতে পাকিস্তানের নাগরিকেরা তুলতে না পারেন, সেজন্যই রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রতিনিয়ত “ভারত আমাদের ধ্বংস করতে চায় এবং কাশ্মীর আমাদের মুক্ত করতে হবে” এই ন্যারেটিভ বা ভয়ের গল্পটি বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
ইতিহাসের শিক্ষা ও ন্যায়ের জয়
ইতিহাসের পাতা ও বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে একটি সত্য অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে প্রতিভাত হয় বন্দুকের নল, সাঁজোয়া বহর কিংবা ধর্মের চাদর দিয়ে কোনো জাতিকে চিরকাল শোষণ করে রাখা যায় না। ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি পাকিস্তানের পৈশাচিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রমাণ করেছিল যে, আত্মসম্মান ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা সমস্ত অন্যায়ের চেয়ে শক্তিশালী।
আজ কাশ্মীরের দুই অংশের চিত্র বিশ্ববাসীর চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। একদিকে ভারত শাসিত কাশ্মীর যেখানে মেগা অবকাঠামো, মেগা টানেল, বিশ্বের সর্বোচ্চ রেল সেতু, আইআইটি-এইমস হাসপাতাল এবং কোটি কোটি পর্যটকের সমাগমে এক নতুন ভোরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে; অন্যদিকে পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীর ও গিলগিত-বালতিস্তানের মানুষ আজ এক ফালি আটা ও নিজেদের নদীর বিদ্যুতের ন্যায্য অধিকারের জন্য রাস্তায় নেমে পাকিস্তানি বুলেটের মুখোমুখি হচ্ছে।
পাকিস্তানের এই দ্বিমুখী নীতি, একদিকে কাশ্মীরের স্বাধীনতার নামে ছদ্মবেশী উগ্রবাদ ছড়ানো এবং অন্যদিকে নিজের অধীনস্থ কাশ্মীরি ও বালুচদের ওপর ঔপনিবেশিক কায়দায় লুণ্ঠন চালানো আজ বিশ্ব দরবারে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে পড়েছে। পাকিস্তান যতক্ষণ না তাদের সামরিকতন্ত্রের মোহ ত্যাগ করবে, ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাইবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর প্রক্সি ওয়ার বা ছদ্মবেশী যুদ্ধ বন্ধ করবে, ততক্ষণ তারা নিজেরাও কখনো একটি সফল রাষ্ট্র হতে পারবে না এবং এই অঞ্চলেও স্থায়ী শান্তি আসবে না। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই শোষকের পতন নিশ্চিত এবং নির্যাতিত মানুষের অধিকারের জয় অবশম্ভাবী।















