বেলুচিস্তান - পাকিস্তানের ভেতর আরেক পূর্ব পাকিস্তান?
আজ থেকে ৫৪ বছর আগে, ১৯৭১ সালে, বাঙালির আত্মত্যাগ আর বীরত্বের কাছে পরাজিত হয়ে যেভাবে পাকিস্তান নামক তাসের ঘরটি ভেঙে গিয়েছিল, ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ঠিক একই ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তি ঘটছে। পাকিস্তানের ভেতর আজ জন্ম নিয়েছে আরেক ‘পূর্ব পাকিস্তান’, যার নাম বেলুচিস্তান।

TruthBangla

ইতিহাসের এক অমোঘ শিক্ষা হলো রক্ত, অশ্রু আর শোষণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কোনো কৃত্রিম রাষ্ট্রকাঠামো চিরস্থায়ী হতে পারে না। শোষক গোষ্ঠী যখন কোনো বীর জাতিকে তার নিজস্ব ভূখণ্ডে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে চায়, তখন সেই জাতির পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। আর তখনই গর্জে ওঠে স্বাধীনতার অবিনাশী স্লোগান। আজ থেকে ৫৪ বছর আগে, ১৯৭১ সালে, বাঙালির আত্মত্যাগ আর বীরত্বের কাছে পরাজিত হয়ে যেভাবে পাকিস্তান নামক তাসের ঘরটি ভেঙে গিয়েছিল, ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ঠিক একই ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তি ঘটছে। পাকিস্তানের ভেতর আজ জন্ম নিয়েছে আরেক ‘পূর্ব পাকিস্তান’, যার নাম বেলুচিস্তান।
পাকিস্তানের মোট ভৌগোলিক আয়তনের প্রায় ৪২ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত এই খনিজ সমৃদ্ধ অঞ্চলটি ইতিমধ্যে তাদের ঐতিহাসিক "প্রোক্লেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স" বা স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা জারি করেছে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইসলামাবাদের জালিম ও দখলদার সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বালুচদের রক্তক্ষয়ী ও চূড়ান্ত সশস্ত্র সংগ্রাম এক নতুন মাত্রায় রূপ নিয়েছে। ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিসংগ্রাম দেখার সৌভাগ্য যাদের হয়নি, ২০২৬ সালের এই ক্রান্তিলগ্নে বিশ্ববাসী নিজের চোখে দেখছে কীভাবে আরেকটি বীর জাতি একটি অত্যাচারী রাষ্ট্রকে খণ্ডবিখণ্ড করে নিজেদের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিচ্ছে। বর্তমান নিবন্ধে আমরা বেলুচিস্তানের এই মুক্তি সংগ্রামের আদ্যোপান্ত, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, অর্থনৈতিক লুণ্ঠন এবং পাকিস্তানি জান্তার বর্বরতার এক সামগ্রিক ও বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরব।
‘পাক সার জমিন’ বনাম ‘মা চুকে বালুচানি’
একটি স্বাধীন জাতিসত্তার প্রধান ভিত্তি হলো তার আত্মপরিচয়। আমরা বাঙালি বিশ্ব দরবারে এটি যেমন আমাদের অহংকার ও চিরন্তন পরিচয়, ঠিক তেমনি গত ৭৯ বছর ধরে সমস্ত দমন-পীড়নকে পায়ে দলে "আমরা বালুচের সন্তান" এই পরিচয়কে বুকে আঁকড়ে ধরে হাসতে হাসতে জীবন দিচ্ছে বেলুচিস্তানের লাখো মুসলমান।
জাতীয় সঙ্গীত ও পতাকার বিদ্রোহ
বালুচ জাতিসত্তার নিজস্ব স্বকীয়তা এতটাই প্রখর যে, তারা পাকিস্তানের চাপিয়ে দেওয়া জাতীয় সঙ্গীত “পাক সার জমিন সাদবাদ” গাইতে কখনোই রাজি হয়নি। তাদের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয় নিজস্ব জাতীয় সঙ্গীত “মা চুকে বালুচানি” (আমরা বালুচের সন্তান)।
পাকিস্তানের সবুজ-সাদা চাঁদ-তারা খচিত পতাকাকে তারা বহু আগেই নিজেদের দাসত্বের প্রতীক হিসেবে বর্জন করেছে। ২০১৩ সালেই বালুচ মুক্তিকামীরা বিশ্ব গণমাধ্যমের সামনে স্বাধীন বেলুচিস্তানের জাতীয় পতাকার ছবি প্রকাশ করে তাদের অনড় অবস্থান স্পষ্ট করেছিল। আজ ২০২৬ সালে এসে সেই পতাকা বেলুচিস্তানের মুক্তাঞ্চলগুলোতে সগৌরবে উড়ছে।
গাজা বনাম বেলুচিস্তান: আয়তন ও বৈষম্যের এক নির্মম খতিয়ান
গাজা উপত্যকার মোট আয়তন: ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার
বেলুচিস্তানের মোট আয়তন: ৩,৪৭,১৯০ বর্গকিলোমিটার
গাজার তুলনায় বেলুচিস্তান কত গুণ বড়?: ৯৫১ গুণ
তথাকথিত ধর্মীয় ব্যবসায়ী ও ভণ্ড মোল্লাদের ছদ্মবেশ
আমাদের দেশের তথাকথিত কিছু ইসলামী ব্যক্তিত্ব, ধর্ম ব্যবসায়ী ও কাঠমোল্লাদের ভণ্ডামি এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে চরমভাবে উন্মোচিত হয়েছে। মাত্র ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের গাজা অঞ্চলের মুসলমানদের ওপর ইসরায়েলি নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাদের বয়কট নাটক ও মায়াকান্নার শেষ নেই। কিন্তু গাজা থেকে আয়তনে ৯৫১ গুণ বড় বেলুচিস্তানের বুকে যখন প্রতিদিন হাজার হাজার সুন্নি বালুচ মুসলমানকে পাকিস্তানি শিয়ালেরা গুলি করে মারছে, তখন এই ভণ্ডদের মুখে কুলুপ আঁটা।
আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো ধর্ম ব্যবসায়ীকে পাকিস্তানি পণ্য বয়কট করার বা পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দিতে দেখা যায়নি। একই ধর্মের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও লক্ষ লক্ষ বালুচ মুসলমানের এই আর্তনাদ কেন তাদের স্পর্শ করে না? কারণ তারা ইসলামের প্রকৃত অনুসারী নয়, তারা মূলত পাকিস্তানের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী একদল ভণ্ড, যারা ধর্মের নামে স্রেফ ব্যবসা করে। এই দ্বিচারিতা প্রমাণ করে যে, মানুষের মানবিকতা যখন রাজনৈতিক ও অন্ধ পাকিস্তান-প্রেমের কাছে বন্দি হয়, তখন ইসলামের নামধারী এই কাঠমোল্লাদের আসল চেহারা উন্মোচিত হয়ে যায়।
স্বাধীন রাষ্ট্রের রূপরেখা: মুদ্রা, ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব
বেলুচিস্তান আজ আর পাকিস্তানের কোনো অবদমিত প্রদেশ নয়। তারা পৃথিবীর অন্য সব স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মতোই নিজেদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তুলেছে। বালুচদের অবিসংবাদিত নেতা মীর ইয়ার বালুচ ইতিমধ্যে বিশ্বমঞ্চে বেলুচিস্তানের পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।
মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ ও সম্পদ দখল
মীর ইয়ার বালুচ এবং স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:
ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ: বেলুচিস্তানের প্রায় ৮৫ শতাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এখন সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর হাত থেকে বালুচ বীরদের হাতে চলে এসেছে।
খনিজ সম্পদের অধিকার: বিশ্ববিখ্যাত সাইন্দক ও রেকো-ডিকের সোনা ও তামার খনিসহ ১৫০টিরও বেশি সক্রিয় প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র এবং ১,২০০টি কয়লাখনির নিয়ন্ত্রণ এখন বালুচদের নিজস্ব প্রশাসনের অধীনে।
স্বাধীন মুদ্রা: অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে তারা প্রবর্তন করেছে নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা, যার নাম “বেলুচি ফালুস” (Balochi Falus)। এই নতুন মুদ্রা ব্যবস্থাকে স্বাধীনতাকামী জনতা বিপুলভাবে স্বাগত জানিয়েছে।
৫ লাখ সদস্যের সশস্ত্র বাহিনী
স্বাধীন বেলুচিস্তানকে রক্ষা করতে এবং পাকিস্তানি হায়েনাদের চূড়ান্তভাবে বিতাড়িত করতে বালুচ মুক্তিকামীরা নিজেদের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী গড়ে তুলেছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫ লাখ সদস্যের একটি সুপ্রশিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল ডিফেন্স ফোর্স এখন যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়োজিত।
বালুচ যোদ্ধারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, “পাকিস্তানের কোনো সামরিক বাহিনী, যুদ্ধবিমান বা যুদ্ধজাহাজকে আর বেলুচের পবিত্র ভূমি, আকাশসীমা ও উপকূল রেখা ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।” ইসলামাবাদ এই সামরিক পরাজয়ের কথা বিশ্ব দরবারে স্বীকার না করলেও, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বেলুচিস্তানের সিংহভাগ এলাকায় পাকিস্তানের কোনো বেসামরিক বা সামরিক নিয়ন্ত্রণ নেই এটাই ২০২৬ সালের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তব সত্য। তাই আজ তারা "রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান"-এর জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আহ্বান জানিয়েছে।
ইতিহাসের অমোঘ ট্র্যাজেডি: ১৯৪৭-এর চুক্তিভঙ্গ থেকে জোরপূর্বক দখলদারিত্ব
বেলুচিস্তানের এই দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস বুঝতে হলে আমাদের ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পেছনের অধ্যায়টি জানতে হবে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের আগে বেলুচিস্তান কোনো দিনই ব্রিটিশ ভারতের অংশ ছিল না। এটি ছিল মূলত চারটি প্রধান দেশীয় রাজ্য কালাত (Kalat), মাকরান (Makran), লাসবেলা (Lasbela) এবং খারান (Kharan)-এর সমন্বয়ে গঠিত একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন অঞ্চল।
জিন্নাহর বিশ্বাসঘাতকতা ও সামরিক আগ্রাসন
১৯৪৭ সালের ১১ই আগস্ট, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং কালাতের সার্বভৌম শাসক "খান অব কালাত" মীর আহমেদ ইয়ার খানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে বেলুচিস্তানকে একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
বেলুচিস্তান দখলের কৃষ্ণপক্ষ (১৯৪৭-১৯৪৮)
১১ই আগস্ট ১৯৪৭: জিন্নাহ ও খান অব কালাতের চুক্তি (স্বাধীন বেলুচিস্তানের স্বীকৃতি)।
১৫ই আগস্ট ১৯৪৭: পাকিস্তানের জন্ম; বেলুচিস্তান কর্তৃক পাকিস্তানের অংশ হতে আনুষ্ঠানিক অস্বীকৃতি।
২৭শে মার্চ ১৯৪৮: পাকিস্তানের ৭ম বালুচ রেজিমেন্ট কর্তৃক কালাত প্রাসাদ ঘেরাও ও জোরপূর্বক দখল।
১৫ই এপ্রিল ১৯৪৮: রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সমগ্র বেলুচিস্তান দখল।
পাকিস্তানের এই নগ্ন ও জোরপূর্বক দখলদারিত্বকে বালুচ জাতি কোনো দিনই মেনে নেয়নি। ১৯৪৮ সালের জুলাই মাসেই খান অব কালাতের ছোট ভাই প্রিন্স আব্দুল করিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহের ডাক দেন। সেই থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বালুচদের বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে সহ্যাদ্রি আর আরব সাগরের উপকূল।
পাঁচ তরঙ্গের ঐতিহাসিক বিদ্রোহ
গত আট দশকে বালুচ জাতি স্বাধিকারের জন্য প্রধানত পাঁচটি বড় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে:
প্রথম তরঙ্গ (১৯৪৮): প্রিন্স আব্দুল করিমের নেতৃত্বে প্রাথমিক প্রতিরোধ।
দ্বিতীয় তরঙ্গ (১৯৫৮-১৯৫৯): নওয়াব নওরোজ খানের নেতৃত্বে গেরিলা যুদ্ধ, যাকে পাকিস্তান সরকার কোরআন শরীফের ওপর হাত রেখে চুক্তি করার পর প্রতারণামূলকভাবে ফাঁসি দেয়।
তৃতীয় তরঙ্গ (১৯৬৩-১৯৬৯): শের মোহাম্মদ বিজোরানির নেতৃত্বে সুদীর্ঘ পার্বত্য গেরিলা প্রতিরোধ।
চতুর্থ তরঙ্গ (১৯৭৩-১৯৭৭): জুলফিকার আলী ভুট্টোর আমলে পরিচালিত ভয়াবহ যুদ্ধ, যেখানে ইরানের বিমানবাহিনীর সহায়তায় বালুচদের ওপর নির্মম বোমাবর্ষণ করা হয়।
পঞ্চম তরঙ্গ (২০০০ থেকে ২০২৬ - বর্তমান): শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে আধুনিক প্রযুক্তি ও কৌশলগত জোটের মাধ্যমে পরিচালিত চূড়ান্ত স্বাধীনতা যুদ্ধ।
অর্থনৈতিক শোষণ ও সিপেক (CPEC) জুয়া: পাকিস্তান ও চীনের মহালুটপাট
পাকিস্তানের অর্থনৈতিক শোষণের ধরণটি হুবহু ১৯৭১ পূর্ববর্তী পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) শোষণের প্রতিচ্ছবি। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসকেরা পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রায় ৪.৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে লুট করে নিয়ে গিয়েছিল। আজ ঠিক একই কায়দায় বেলুচিস্তানের বুকের ওপর দিয়ে লুণ্ঠনের উৎসব চালাচ্ছে পাকিস্তান ও তার পরম মিত্র চীন।
সিপেক (CPEC) ও লুটের সমীকরণ
পাকিস্তানে চীনের মোট বিনিয়োগ: $৬৫ বিলিয়ন ডলার
বেলুচিস্তানে বিনিয়োগের হার: ৮০% এর ওপরে
ডুডার খনিজ প্রজেক্টের লভ্যাংশ বণ্টন: চীন ও পাকিস্তান ৯০% | বেলুচিস্তান মাত্র ১০%
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ও পাকিস্তানের মৃত্যুঘণ্টা
পাকিস্তান জুড়ে চীনের যে ৬৫ বিলিয়ন ডলারের ‘চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর’ (CPEC) এবং ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (BRI) প্রকল্প চলছে, তার ৮০ শতাংশেরও বেশি বিনিয়োগ হচ্ছে বেলুচিস্তানের মাটিতে (বিশেষ করে গোয়াদার বন্দরে)। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বেলুচিস্তানের লোহা, তামা, সীসা, সোনা, দস্তা, ক্রোমাইট এবং জিপসামের মতো মূল্যবান খনিজ সম্পদ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে লুট করে নিয়ে যাচ্ছে বেইজিং ও ইসলামাবাদের সিন্ডিকেট।
কিন্তু বালুচ মুক্তিযোদ্ধাদের বর্তমান সফল অভিযানের ফলে চীন ও পাকিস্তানের এই কোটি কোটি ডলারের প্রজেক্ট সম্পূর্ণ মুখ থুবড়ে পড়েছে। বেলুচিস্তান যদি পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায় (যা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র), তবে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে যাবে। চীন তার ১ থেকে ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রজেক্টের ভবিষ্যৎ রক্ষার্থে পাকিস্তানের খয়রাতি ও অযোগ্য সরকারের ওপর ভরসা করে দ্বিতীয় কোনো ভুল করবে না। তখন চীন পাকিস্তানের ঘাড়ের ওপর বসে জোর করে সুদে-আসলে টাকা আদায় করবে; তাতে পাকিস্তানের পরনের পাঞ্জাবি আর পায়জামা থাকবে কি না, তা নিয়ে বেইজিংয়ের কোনো মাথাব্যথা থাকবে না। আমেরিকা ও চীনের কাছে বন্ধক দেওয়া পাকিস্তানের সমস্ত খনিজ ক্ষেত্র এখন বালুচদের দখলে চলে যাওয়ায় ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে।
অন্ধকারে নিমজ্জিত এক খনিজ স্বর্গ
যে অঞ্চলের খনিজ গ্যাসে পুরো পাকিস্তানের কলকারখানা আর ঘরবাড়ি সচল থাকে, সেই অঞ্চলের মানুষই আজ ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম বঞ্চনার শিকার। নিচে কিছু প্রামাণ্য পরিসংখ্যান দেওয়া হলো যা পাকিস্তানের বৈষম্যের চেহারাকে নগ্ন করে দেয়:
দারিদ্র্যের হার: পাকিস্তানের জাতীয় গড় দারিদ্র্যের হার যেখানে মাত্র ২৮ শতাংশ, সেখানে খনিজ সম্পদে ঠাসা বেলুচিস্তানের দারিদ্র্যের হার ৪৭ শতাংশ!
শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত: পাকিস্তান সরকার পরিকল্পিতভাবে বেলুচিস্তানের ৭০ শতাংশ মানুষকে সব ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে, যাতে তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে না পারে।
বিশুদ্ধ পানির সংকট: বেলুচিস্তানের ৮৫ শতাংশ মানুষের জন্য ন্যূনতম বিশুদ্ধ খাবার পানির কোনো ব্যবস্থা করেনি পাকিস্তান সরকার।
বিদ্যুৎহীন অন্ধকার: প্রদেশের ৭০ শতাংশ এলাকায় আজও কোনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি।
ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং (বহিরাগত পুনর্বাসন): গোয়াদার ও সিপেক অঞ্চলে স্থানীয় বালুচ যুবকদের কোনো চাকরি না দিয়ে, পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে বহিরাগতদের এনে পুনর্বাসন করা হচ্ছে, যা বালুচদের নিজেদের ভূমিতেই সংখ্যালঘু বানানোর এক সুপরিকল্পিত চক্রান্ত।
রক্তস্নাত বেলুচিস্তান: গুম, খুন ও নারীনির্যাতনের পাকিস্তানী পুরোনো বর্বরতা
পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বর্বরতা হিটলারের নাৎসি বাহিনীকেও হার মানায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মাটিতে তারা যে গণহত্যা আর গণধর্ষণ চালিয়েছিল, আজ বেলুচিস্তানের ঘরে ঘরে তারা ঠিক একই নারকীয় তাণ্ডব চালাচ্ছে।
নিখোঁজ ও গুমের সংস্কৃতি (Kill and Kidnap)
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ভয়েস ফর বালুচ মিসিং পারসন্স’ (VBMP) এবং বিশ্বখ্যাত লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশন-এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২০০৪ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ৭,০০০ থেকে ২১,০০০ বালুচ নাগরিককে জোরপূর্বক গুম করে রেখেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
১৯৭৩-১৯৭৭ সালের যুদ্ধে তারা ৫,৩০০ জন এবং ২০০০ সালের পর থেকে আরও কয়েক হাজার নিরীহ বালুচকে সরাসরি হত্যা করেছে। তাদের নীতি একটাই ‘কিল অ্যান্ড কিডন্যাপ’। রাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন সেলে হত্যা করে লাশ পাহাড়ে বা মরুভূমিতে ফেলে দেওয়া হয়।
নারীনির্যাতন ও ‘হাফ উইডো’-র কান্না
গত কয়েক বছরে বেলুচিস্তানের হাজার হাজার তরুনী ও নারীকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে গেছে পাকিস্তানের কাউন্টার টেরোরিজম ডিপার্টমেন্ট (CTD) ও মিলিটারির লোকেরা। মিলিটারি ক্যাম্পের অন্ধকার টর্চার সেলে এই মুসলিম নারীদের ওপর যে অমানুষিক যৌন সহিংসতা ও গণধর্ষণ চালানো হয়, তা শুনে পাথরের হৃদয়ও কেঁদে উঠবে। ‘জেনোসাইড ওয়াচ’-এর মতে, এটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের নারীদের ওপর চালানো পাকিস্তানি ধর্ষণের অবিকল পুনরাবৃত্তি।
আজ বেলুচিস্তানের শহর ও গ্রামের রাস্তায় হাঁটলে হাজার হাজার “হাফ উইডো” (অর্ধ-বিধবা) নারীদের দেখা মিলবে। এদের স্বামীদের পাকিস্তান সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গেছে; তারা বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে, তা আজ পর্যন্ত এই নারীরা জানে না। তারা না পারছে বিধবার পোশাক পরতে, না পারছে স্ত্রীর অধিকার দাবি করতে। এই অশ্রু আর রক্তের অভিশাপ থেকে পাকিস্তানের মুক্তি নেই।
পতনোম্মুখ দখলদার বাহিনী
যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের জামায়াত-শিবির ও উগ্রপন্থী জঙ্গিদের ব্যবহার করে ভারতের সেভেন সিস্টার্স দখল করার বা বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করার দিবাস্বপ্ন দেখে, তাদের নিজেদের ঘরের ভেতরেই আজ নিজেদের সৈন্যদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। বালুচ যোদ্ধাদের মরণপণ আক্রমণের সামনে পাকিস্তানি কাপুরুষ সৈন্যরা প্রতিদিন কুকুরের মতো মরছে।
এসএটিপি (SATP) এর চোখ কপালে তোলা পরিসংখ্যান
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থা সাউথ এশিয়ান টেরোরিজম পোর্টাল (SATP)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী:
২০০০ থেকে ২০২৬: এই ২৬ বছরে বেলুচিস্তানে প্রায় ৩,৫০০ এর বেশি পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়েছে।
২০২৫ সালের রেকর্ড: মাত্র এক বছরে বালুচ মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় ১,২২৯ জন পাকিস্তানি সেনা খতম হয়েছে।
২০২৬ সালের বর্তমান চিত্র: এই বছরের প্রথম সাত মাসেই ৮০০ এর অধিক পাকিস্তানি সৈন্য চিরতরে কবরে চলে গেছে।
পাকিস্তানি সামরিক মনস্তত্ত্ব: "জিত্তা গেছি" সিন্ড্রোম
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার মাটিতে ৯৩,০০০ সৈন্য নিয়ে টেবিলের নিচে সই করে বিশ্বরেকর্ডধারী আত্মসমর্পণ করার পরও পাকিস্তানিরা তাদের দেশের জনগণকে বুঝিয়েছিল "আমরা জিত্তা গেছি!" ২০২৬ সালেও বেলুচিস্তানে প্রতিদিন লাশ হয়ে ফেরার পরও তাদের লজ্জাহীন প্রোপাগান্ডা মেশিনের দাবি তারা নাকি নিয়ন্ত্রণে আছে!
বর্তমানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বেলুচিস্তানের সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে “অপারেশন শাবান” নামে এক কুখ্যাত ও বর্বর সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। এই অভিযানের নামে তারা নির্বিচারে ড্রোন ও হেলিকপ্টার থেকে বালুচ নারী ও শিশুদের ওপর বোমাবর্ষণ করছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, কামানের গোলা দিয়ে কোনো জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে স্তব্ধ করা যায় না।
পূর্ব পাকিস্তান (১৯৭১) বনাম বেলুচিস্তান (২০২৬)
নিচে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৬ সালের বেলুচিস্তানের বর্তমান স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যকার কাঠামোগত ও ঐতিহাসিক সাদৃশ্যের একটি বিস্তারিত ছক দেওয়া হলো:
বিষয়ের সূচক | পূর্ব পাকিস্তান / বাংলাদেশ (১৯৭১) | স্বাধীন বেলুচিস্তান প্রজাতন্ত্র (২০২৬) | মূল রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক মিল |
ভৌগোলিক ও জনসংখ্যা বৈষম্য | জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ (৫৬%) হলেও পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে আকারে ছোট ছিল। | আয়তনে পাকিস্তানের বৃহত্তম (৪২%), কিন্তু জনসংখ্যার দিক থেকে সংখ্যালঘু (১.৫ কোটি)। | উভয় ক্ষেত্রেই ভূখণ্ডকে স্রেফ কলোনি বা উপনিবেশ হিসেবে ব্যবহার করেছে পাঞ্জাবি শাসকেরা। |
অর্থনৈতিক লুণ্ঠন | পাট ও চামড়া রপ্তানির $৪.৫৬ বিলিয়ন ডলার পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হতো। | সোনা, তামা এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ৯০% লভ্যাংশ চীন ও পাকিস্তান লুট করছে। | সম্পদ নিজেদের মাটির, অথচ তার সুবিধা ভোগ করে কেন্দ্রীয় শোষক গোষ্ঠী। |
সামাজিক বঞ্চনার হার | চাকরি, সেনাবাহিনী এবং বাজেটে বাঙালিদের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য। | ৪৭% দারিদ্র্য হার, ৭০% বিদ্যুৎহীন, ৮৫% বিশুদ্ধ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। | মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রেখে জাতিকে পঙ্গু করার সুপরিকল্পিত চেষ্টা। |
সামরিক জান্তার অপারেশন | বাঙালির বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছিল কুখ্যাত ‘অপারেশন সার্চলাইট’। | বালুচদের দমাতে বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে বর্বর ‘অপারেশন শাবান’। | নিরীহ বেসামরিক নাগরিক, নারী ও শিশুদের লক্ষ্য করে রাষ্ট্রীয় শক্তির গণহত্যা। |
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও যুদ্ধাপরাধ | ৩ লক্ষাধিক নারী ধর্ষণ এবং ৩০ লক্ষ বাঙালির ওপর ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা। | ২০,০০০ এর বেশি গুম (Kill & Dump), হাজার হাজার নারী অপহরণ ও সামরিক ক্যাম্পে ধর্ষণ। | জেনোসাইড ওয়াচ ও লেমকিন ইনস্টিটিউট কর্তৃক উভয় ঘটনাকেই ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি। |
সশস্ত্র প্রতিরোধের ধরণ | সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণে গঠিত হয়েছিল ‘মুক্তিবাহিনী’। | BLA, BRA, BLF সহ ১২টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘বালুচ ডিফেন্স ফোর্স’। | গেরিলা ও প্রথাগত যুদ্ধকৌশলের মিশ্রণে শত্রুকে পরাস্ত করার অভিন্ন নীতি। |
প্রেরণার মূল উৎস ও স্লোগান | বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ ও লিডারশিপ। | দেড় কোটি বালুচ জনতার স্লোগান: “শেখ মুজিবের পথ ধরো; বেলুচিস্তান স্বাধীন করো!” | শৃঙ্খলমুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধুর আপসহীন আপরাইজিং মডেলই আজ বালুচদের একমাত্র আদর্শ। |
বেলুচিস্তানের ভূ-রাজনীতি, ঐতিহাসিক সংঘাত এবং বর্তমান পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, এর ভেতরে এমন কিছু গভীর সমীকরণ রয়েছে যা দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তার সাথে সরাসরি জড়িত।
সুঁই (Sui) গ্যাসের ঐতিহাসিক বঞ্চনা
বেলুচিস্তানের অর্থনৈতিক ক্ষোভের সূচনা কিন্তু সিপেক (CPEC) বা চীনের বিনিয়োগের অনেক আগে হয়েছিল। এর মূল ভিত্তি নিহিত রয়েছে ১৯৫২ সালের একটি আবিষ্কারের মধ্যে।
সুঁই গ্যাসক্ষেত্রের আবিষ্কার: ১৯৫২ সালে বেলুচিস্তানের 'সুঁই' নামক এলাকায় পাকিস্তানের ইতিহাসের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান মেলে। ১৯৫৫ সালের মধ্যে এই গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রধান শিল্পাঞ্চল পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে সরবরাহ করা শুরু হয়।
বৈষম্যের চরম রূপ: ঐতিহাসিক পরিহাস হলো, যে বেলুচিস্তানের গ্যাস দিয়ে পুরো পাকিস্তানের শিল্পকারখানা সচল হলো এবং করাচি-লাহোরের বাসাবাড়িতে রান্নার চুলা জ্বলল, সেই বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটা শহরে গ্যাস সংযোগ পৌঁছাতে পাকিস্তান সরকার সময় নিয়েছিল প্রায় ৩০ বছর (১৯৮০-এর দশক)। এমনকি আজ পর্যন্ত বেলুচিস্তানের সিংহভাগ গ্রামীণ এলাকা এই গ্যাস সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এই সুঁই গ্যাসের রয়্যালটি ও হিসেব নিয়ে বঞ্চনাই বালুচদের মনে প্রথম এই ধারণার জন্ম দেয় যে, তারা পাকিস্তানের নাগরিক নয়, বরং শোষিত ঔপনিবেশিক প্রজা।
২০০৬ সালের টার্নিং পয়েন্ট: নওয়াব আকবর বুগতির হত্যাকাণ্ড
আধুনিক বালুচ প্রতিরোধের (যা পঞ্চম তরঙ্গ নামে পরিচিত) তীব্রতার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে ২০০৬ সালের একটি সামরিক অভিযান।
কে ছিলেন আকবর বুগতি?: নওয়াব আকবর খান বুগতি ছিলেন বেলুচিস্তানের অন্যতম প্রভাবশালী উপজাতীয় প্রধান (Tumandar), যিনি একসময় বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী এবং গভর্নরের দায়িত্বও পালন করেছিলেন। অর্থাৎ, তিনি পাকিস্তানের মূলধারার রাজনীতির অংশ ছিলেন।
গুহা হত্যাকাণ্ড: ২০০০-এর দশকের শুরুতে যখন জেনারেল পারভেজ মোশাররফ কোহলু ও ডেরা বুগতি অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি ও গ্যাসক্ষেত্রের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চান, তখন আকবর বুগতি তার স্বাধিকারের দাবিতে পাহাড়ে গিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ২০০৬ সালের ২৬শে আগস্ট পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কোহলুর পাহাড়ি গুহায় সামরিক অভিযান চালিয়ে ৮১ বছর বয়সী এই প্রবীণ নেতাকে হত্যা করে।
ফলাফল: আকবর বুগতির এই হত্যাকাণ্ড বালুচ আন্দোলনের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়। এর আগে আন্দোলনটি ছিল মূলত আদিবাসী বা গোত্রপ্রধানদের (Sardars) মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বুগতির মৃত্যুর পর এটি শহরের উচ্চশিক্ষিত তরুণ, ছাত্র এবং সাধারণ মধ্যবিত্ত বালুচদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, যা বর্তমানের বিএলএ (BLA) বা বিএলএফ (BLF)-এর মতো আধুনিক গেরিলা সংগঠনের ভিত্তি মজবুত করে।
ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি নিরপেক্ষ Peer-Review
বেলুচিস্তানের এই দীর্ঘ লড়াই, তীব্র মানবিক সংকট এবং লুণ্ঠনের ইতিহাস যেমন সত্য, ঠিক তেমনি একজন সচেতন পাঠক ও বিশ্লেষক হিসেবে আমাদের মাঠপর্যায়ের বর্তমান কূটনৈতিক ও বাস্তব ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানটিও পরিষ্কারভাবে জানা প্রয়োজন:
স্বাধীনতার ঘোষণা বনাম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: বালুচ লিবারেশন আর্মি (BLA) বা প্রবাসে থাকা বালুচ নেতারা প্রতীকীভাবে বা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে "প্রোক্লেমেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স" বা স্বাধীনতার ঘোষণা জারি করলেও, বাস্তব ভূ-রাজনীতি এবং জাতিসংঘের দাপ্তরিক নথিতে বেলুচিস্তান এখনো পৃথিবীর ১৯৬-তম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি।
প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ: বালুচ মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ওপর বড় ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ও গেরিলা জয়লাভ করলেও এবং অনেক গ্রামীণ ও পাহাড়ি অঞ্চলের ওপর তাদের শক্তিশালী গোপন নিয়ন্ত্রণ থাকলেও, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এখনো বড় বড় শহর, প্রধান মহাসড়ক এবং সেনানিবাসগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
মুদ্রা ও সামরিক বাহিনীর আকার: "বেলুচি ফালুস" বা ৫ লাখ নিয়মিত প্রথাগত সশস্ত্র বাহিনীর মতো বিষয়গুলো মূলত মুক্তিকামীদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা বা মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণার অংশ। বাস্তবে এটি এখনো আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চ্যানেল বা প্রথাগত রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষার রূপ নেয়নি। তবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই প্রতিরোধ যে দিন দিন ইসলামাবাদের জন্য নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠছে, তা স্পষ্ট।
সিভিল রেজিস্ট্যান্সের নতুন জোয়ার: ‘বালুচ ইয়াকজেহতি কমিটি’ (BYC)
বেলুচিস্তানের বর্তমান আন্দোলনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি এখন আর শুধু বন্দুকের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। অস্ত্রের পাশাপাশি সেখানে গড়ে উঠেছে এক বিশাল অহিংস ও সিভিল মুভমেন্ট।
নারীদের নেতৃত্ব: ড. মাহরাং বালুচ এবং সামি দ্বীন বালুচের মতো তরুণী ও ছাত্রীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘বালুচ ইয়াকজেহতি কমিটি’ (BYC) বা বালুচ সংহতি কমিটি আজ বেলুচিস্তানের সবচেয়ে বড় গণশক্তি।
লং মার্চের প্রভাব: পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ‘কিল অ্যান্ড ডাম্প’ নীতির বিরুদ্ধে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার স্বজনদের ফিরে পাওয়ার দাবিতে এই কমিটি কোয়েটা ও করাচি থেকে শুরু করে ইসলামাবাদের প্রেস ক্লাব পর্যন্ত হাজার হাজার কিলোমিটার জুড়ে লং মার্চ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করেছে। তারা বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে যে, বালুচ নারীরা আজ শুধু ঘরের কোণে কাঁদছেন না, বরং তারা রাস্তায় নেমে রাষ্ট্রীয় শোষণের বিরুদ্ধে প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছেন।
আফগানিস্তান ও ইরান সংযোগ
বেলুচিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান একে একটি আন্তর্জাতিক সংকটের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছে।
আফগান সীমান্ত: ঐতিহাসিকভাবে বালুচ গেরিলারা পাকিস্তানের আক্রমণের মুখে আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে (হেলমান্দ ও কান্দাহার প্রদেশে) আশ্রয় নিয়ে থাকে। আফগানিস্তানের বর্তমান তালিবান সরকারের সাথে পাকিস্তানের ডুরান্ড লাইন (সীমান্ত) নিয়ে বিরোধ থাকায়, পাকিস্তান প্রায়শই অভিযোগ করে যে আফগান মাটি ব্যবহার করে বালুচ স্বাধীনতাকামীরা তাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে।
ইরানের সিস্তান-বেলুচেস্তান: ইরানের দক্ষিণ-পূর্ব অংশেও বিপুল সংখ্যক বালুচ জনগোষ্ঠীর বসবাস। সেখানে শিয়া সরকারের বিরুদ্ধে সুন্নি বালুচদের সংগঠন ‘জৈশ আল-আদল’ লড়াই করছে। পাকিস্তান ও ইরান উভয় দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে নিজ নিজ ভূখণ্ডে বালুচ বিদ্রোহীদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ আনে, যা এই অঞ্চলের সীমান্তকে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অস্থির করে তুলেছে।
বেলুচিস্তানের প্রধান সম্পদ ও লুণ্ঠনের ঐতিহাসিক খতিয়ান
সম্পদের নাম | মূল অবস্থান (বেলুচিস্তান) | পাকিস্তানের ব্যবহার ও বণ্টন | বালুচদের ক্ষোভের কারণ |
প্রাকৃতিক গ্যাস | সুঁই (Sui), ডেরা বুগতি জেলা। | পাঞ্জাব ও সিন্ধুর শিল্পাঞ্চলে প্রধান সরবরাহ। | স্থানীয় কোয়েটা ও গ্রামীণ অঞ্চলে দশকের পর দশক গ্যাস সংযোগ না দেওয়া। |
সোনা ও তামা | রেকো-ডিক (Reko Diq) ও সাইন্দক। | চীন ও কানাডিয়ান কোম্পানির সাথে চুক্তি করে কেন্দ্র লভ্যাংশ নিচ্ছে। | স্থানীয় জনগণের কোনো অংশীদারিত্ব বা টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন না হওয়া। |
গভীর সমুদ্র উপকূল | গোয়াদার (Gwadar) বন্দর। | চীনের সিপেক (CPEC) প্রকল্পের মূল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত। | স্থানীয় মৎস্যজীবীদের বহিষ্কার ও বহিরাগত পাঞ্জাবিদের কর্মসংস্থান। |
কয়লা ও ক্রোমাইট | হারনাই, চামালান ও দুক্কি অঞ্চল। | পাকিস্তানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ইস্পাত শিল্পে ব্যবহার। | অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ খনিগুলোতে বালুচ শ্রমিকদের স্বল্প মজুরিতে খাটানো। |
বেলুচিস্তানের এই চলমান সংকটটি মূলত একটি জাতির দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ফসল, যা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে বহুলাংশে মিলে যায়। আমরা যদি এই সংকটের সামগ্রিক রূপটি দেখি, তবে স্পষ্ট হয় যে শুধু সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এই বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলের মানুষের মন জয় করা বা তাদের প্রতিরোধ দমন করা সম্ভব নয়।
৮০০ কোটি মানুষের প্রতীক্ষা ও একটি নতুন ভোরের উদয়
পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের মাত্র দুই মাস পর থেকে (১৯৪৮ সালের মার্চ) যে স্বাধীনতার লড়াই শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে তা আজ সফলতার চূড়ান্ত জয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। পাকিস্তানের এই পৈশাচিক অত্যাচার থেকে মুক্তি পেয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বেলুচিস্তানের আত্মপ্রকাশ দেখার জন্য আজ পৃথিবীর ৮০০ কোটি মানুষ অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে।
যে জাতির সন্তানেরা নিজেদের বুক টান করে স্লোগান দেয় “জীবন দেব, কিন্তু বেলুচিস্তান দেব না”, অস্ত্রের মুখে বা ড্রোন হামলা চালিয়ে সেই বীরদের দমানোর সাধ্য পৃথিবীর কোনো পরাশক্তির নেই। বাঙালি জাতি যেমন ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেছিল, ঠিক তেমনি বেলুচিস্তানের ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষও খুব শীঘ্রই তাদের বিজয়ের লাল-সবুজ-নীল পতাকা বিশ্বমঞ্চে সগৌরবে ওড়াবে।
আজ নয়তো কাল, ইসলামাবাদের জালিমদের পতন হবেই এবং পৃথিবীর ১৯৬-তম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে "রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান" তার সার্বভৌম অস্তিত্ব নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে এটাই প্রকৃতির বিচার এবং ইতিহাসের অমোঘ ধ্রুব সত্য।















