>
>
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ করা পাক আর্মিদের সহযোগী সংগঠনগুলো
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ করা পাক আর্মিদের সহযোগী সংগঠনগুলো
একদল ক্ষমতালোভী, ধর্ম ব্যবসায়ী এবং আদর্শিক অন্ধত্বে ভোগা দেশদ্রোহী, যারা হাত মিলিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে। এই সহযোগী সংগঠনগুলো শুধু মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে সরাসরি গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট এবং চরম মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হয়েছিল। এদের মূল লক্ষ্য ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মকে রুখে দেওয়া।

TruthBangla
Dec 10, 2025
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। একদিকে যেমন বীর মুক্তিযোদ্ধারা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছিলেন, তেমনি অন্যদিকে ছিল একদল ক্ষমতালোভী, ধর্ম ব্যবসায়ী এবং আদর্শিক অন্ধত্বে ভোগা দেশদ্রোহী, যারা হাত মিলিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে। এই সহযোগী সংগঠনগুলো শুধু মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে সরাসরি গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট এবং চরম মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হয়েছিল। এদের মূল লক্ষ্য ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মকে রুখে দেওয়া এবং পাকিস্তানি হুকুমতকে টিকিয়ে রাখা। এই প্রবন্ধে আমরা একাত্তরের সেই ঘৃণ্য সংগঠনগুলো শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর, ও আল-শামস এর গঠন, কার্যক্রম এবং নৃশংসতার চিত্র তুলে ধরব।
জনযুদ্ধের বিপরীতে দেশদ্রোহী ফ্রন্ট
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ, যেখানে আপামর জনতা স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এই জনযুদ্ধের বিপরীতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা স্থানীয় দালালদের নিয়ে একটি সুসংগঠিত 'দেশদ্রোহী ফ্রন্ট' তৈরি করেছিল। এই ফ্রন্টের সদস্যরা ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করত এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে 'ভারতের এজেন্ট' বা 'ইসলাম-বিরোধী' আখ্যা দিয়ে প্রচার করত। তাদের কার্যকলাপ ছিল সুদূরপ্রসারী এবং চূড়ান্তভাবে নৃশংস।
১. শান্তি কমিটি - বিশ্বাসঘাতকতার ভিত্তিপ্রস্তর
মুক্তিযুদ্ধের ঠিক প্রারম্ভেই, যখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর মাধ্যমে গণহত্যা শুরু করে, তখন তাদের প্রয়োজন ছিল স্থানীয় সহায়তা এবং একটি বেসামরিক ছদ্মবেশ। এই প্রয়োজন মেটাতেই জন্ম নেয় কুখ্যাত শান্তি কমিটি। এই সংগঠনটি ছিল হানাদার বাহিনীর চোখ, কান এবং হাত - যারা বাঙালির নিজস্ব জনপদে দাঁড়িয়ে নিজেদের স্বজনদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধরেছিল।
পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সংগঠিত এবং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল 'শান্তি কমিটি' (Peace Committee)। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সামরিক শাসনকে বেসামরিক কাঠামোয় বৈধতা দেওয়া এবং স্থানীয় স্তরে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তৈরি করা।
শান্তি কমিটির প্রতিষ্ঠা ও নেতৃত্ব
'শান্তি কমিটি' হঠাৎ করেই তৈরি হয়নি, বরং সুচিন্তিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর জন্ম হয়েছিল।
গঠনকাল: ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল, যখন মুক্তিযুদ্ধ কেবল তীব্রতা লাভ করছে, তখনই ঢাকাতে এই সংগঠনটি গঠিত হয়। এটি ছিল পাকিস্তানি জান্তার সামরিক কাঠামোকে একটি বেসামরিক সমর্থন দেওয়ার প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব: কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির প্রধান ছিলেন মুসলিম লীগ নেতা খাজা খয়েরউদ্দীন। তাঁর মতো পাকিস্তানপন্থী প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা এই কমিটির নেতৃত্ব দেন।
প্রাথমিক সংগঠক: এই কাঠামো তৈরির পেছনের মূল সংগঠকদের মধ্যে ছিলেন জামায়াতে ইসলামী নেতা অধ্যাপক গোলাম আযম, সায়েম মাসুম ও একিউএম শফিকুল ইসলাম। এই নেতৃত্ব প্রমাণ করে, রাজনৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে কট্টর পাকিস্তানপন্থী দলগুলোর নেতারাই এই বিশ্বাসঘাতকতার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন।
বিস্তৃত কাঠামো ও জনবল
শান্তি কমিটির শক্তি ছিল এর বিস্তৃত সাংগঠনিক জাল। এটি কেবল ঢাকা শহরে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এর বিস্তার ছিল।
সদস্য গঠন: গ্রাম পর্যায়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার এবং পাকিস্তানপন্থী প্রভাবশালী লোকজন নিয়ে কমিটিগুলো গঠিত হতো। এর ফলে, প্রতিটি গ্রামে মুক্তিবাহিনীর সমর্থক কারা এবং কোন পরিবার জাতীয়তাবাদী সেই তথ্য সংগ্রহ করা হানাদার বাহিনীর জন্য সহজ হয়ে গিয়েছিল।
সশস্ত্র প্রশিক্ষণ: এই কমিটি শুধু রাজনৈতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রথম নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ৯৬ জন জামায়াতে ইসলামী সদস্য ছিলেন, যারা খুলনার খানজাহান আলী রোডে একটি আনসার ক্যাম্পে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু করেছিলেন। এর মাধ্যমে কমিটি কার্যত একটি আধা-সামরিক সহযোগী শক্তিতে পরিণত হয়।
মূল উদ্দেশ্য ও রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা
শান্তি কমিটির নাম 'শান্তি' হলেও এর প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি নষ্ট করা এবং পাকিস্তানি হুকুমতকে পুনরুদ্ধার করা।
হুকুমত কায়েমের জনমত: শান্তি কমিটির প্রধান কাজ ছিল দেশে পাকিস্তানি হুকুমত বজায় রাখার পক্ষে জনমত গঠন করা। তারা প্রচার করত যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন হলো 'ভারতের চক্রান্ত' এবং 'ইসলাম-বিরোধী'। এর মাধ্যমে তারা সরলমনা ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করত।
পাকবাহিনীর হয়ে সশস্ত্র অংশগ্রহণ: পূর্ব পাকিস্তানে কথিত 'শান্তি পুনরুদ্ধার' ছিল তাদের বাহ্যিক উদ্দেশ্য। কিন্তু তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল পাকবাহিনীর হয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করা। এর মধ্যে ছিল:
গোয়েন্দা সহায়তা: স্থানীয় এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের গতিবিধি, গোপন আস্তানা এবং সমর্থকদের তথ্য সংগ্রহ করে পাকবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া।
সশস্ত্র অংশগ্রহণ: মুক্তিবাহিনীকে দমন করার জন্য বিভিন্ন অপারেশনে পাকবাহিনীর পাশে থেকে সশস্ত্র অংশগ্রহণ করা।
মানবতাবিরোধী অপরাধ - নৃশংসতার কালো তালিকা
শান্তি কমিটির সদস্যরা কেবল তথ্য সরবরাহ করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধে অংশ নিয়েছিল, যা তাদের নামের 'শান্তি' শব্দটিকে প্রহসনে পরিণত করে।
জাতীয়তাবাদী গ্রেফতার ও নির্যাতন: তারা মুক্তিবাহিনীর সমর্থনকারী এবং জাতীয়তাবাদী বাঙালি জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করত, গ্রেফতার করত এবং নির্মম নির্যাতন করত।
হত্যাযজ্ঞ: সন্দেহভাজনদের হত্যার পর তাদের লাশ গুম করে ফেলা হতো, যা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করত।
সম্পদ লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ: এই কমিটির সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িঘর চিহ্নিত করে পাকবাহিনীর সহায়তায় জ্বালিয়ে দিত। এর উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবার ও সমর্থকদের উপর প্রতিশোধ নেওয়া।
হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ: হিন্দুদের বাড়িঘর ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্যের মধ্যে অন্যতম। লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং অত্যাচার করে তারা হিন্দু সম্প্রদায়কে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে চেয়েছিল, যা ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর নীলনকশার অংশ।
মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের উপর অত্যাচার
শান্তি কমিটির সদস্যদের পাশবিকতার সবচেয়ে ঘৃণ্য দিক ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ফ্যামিলি সদস্যদের হত্যা করা। এর উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া এবং তাঁদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা। এই নৃশংসতা প্রমাণ করে যে, তারা কোনো সামরিক বাহিনী ছিল না, তারা ছিল চরম মাত্রার দেশদ্রোহী ও খুনি।
জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা
প্রাথমিক পর্যায়েই শান্তি কমিটির কার্যক্রমে জামায়াতে ইসলামী সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। প্রথম নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ৯৬ জন জামায়াতে ইসলামী সদস্য ছিলেন, যারা খুলনার খানজাহান আলী রোডে একটি আনসার ক্যাম্পে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু করেছিলেন। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, জামায়াতে ইসলামী প্রথম থেকেই এই দেশদ্রোহী কাঠামোর প্রধান চালিকাশক্তি ছিল।
২. আল-বদর বাহিনী - গণহত্যার সবচেয়ে ঘৃণিত সহযোগী
পাক আর্মির সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে হিংস্র, সুসংগঠিত এবং ঘৃণিত বাহিনী ছিল আল-বদর। এর মূল ভিত্তি ছিল জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন, ইসলামী ছাত্রসংঘ (বর্তমানে ইসলামী ছাত্রশিবির)। এই আধাসামরিক মিলিশিয়া বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল কেবল মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অংশগ্রহণ নয়, বরং বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিকে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়া। ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা হিসেবে আল-বদর বাহিনী আজও ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায় হয়ে আছে।
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যখন ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে তাদের দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং বাঙালিদের উপর গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখন তাদের পাশে এসে দাঁড়ায় জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ (বর্তমানে ইসলামী ছাত্রশিবির)। এই সংগঠনটিই রূপান্তরিত হয় আল-বদর বাহিনীতে। এটি ছিল সামরিক শাসনের প্রতি আদর্শিক আনুগত্য এবং বাঙালির স্বাধীনতার প্রতি চরম ঘৃণা প্রকাশের এক সম্মিলিত শক্তি।
আল-বদর বাহিনীর গঠন ও নেতৃত্ব
আল-বদর বাহিনী রাতারাতি গঠিত হয়নি; বরং এটি ছিল ইসলামী ছাত্রসংঘের সুসংগঠিত সামরিকীকরণের ফল।
গঠন: ১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল ময়মনসিংহে এই বাহিনীর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
গঠনকারী: ময়মনসিংহের ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন এই বাহিনী গঠন করেন।
সমন্বয়ক: তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় প্রধান মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন এই বাহিনীর প্রধান সমন্বয়ক, যিনি সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা দিতেন।
শীর্ষ কমান্ড: এর প্রধান কমান্ডার হিসেবে আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ-এর নামও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।
সদস্য সংখ্যা: আল-বদরকে আদর্শিক সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল এবং প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল প্রতিটি ইউনিটে ৩১৩ জন করে সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা।
সামরিক ধরণ ও লক্ষ্য
আল-বদর ছিল একটি আধা সামরিক সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী, যা সরাসরি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। তাদের মূল উদ্দেশ্যগুলো ছিল স্পষ্ট ও ধ্বংসাত্মক:
অখণ্ড পাকিস্তানের জনমত সৃষ্টি: ছাত্রদের মধ্যে 'অখণ্ড পাকিস্তান' ধারণা জিইয়ে রাখা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বিরুদ্ধে আদর্শিক লড়াই করা।
সশস্ত্র অংশগ্রহণ: মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সামরিক ও সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা।
গুপ্তহত্যা: মূলত বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক এবং মুক্তচিন্তার মানুষদের চিহ্নিত করে তাদের হত্যা করা।
আল-বদরের নৃশংস কার্যক্রম ও মানবতাবিরোধী অপরাধ
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে আল-বদরকে সবচেয়ে ঘৃণিত বাহিনী বলা হয়, কারণ এদের কার্যকলাপ ছিল চরমমাত্রার নিষ্ঠুরতা ও পাশবিকতায় পূর্ণ।
মুক্তিযোদ্ধা নির্যাতন, গ্রেফতার ও হত্যা: আল-বদর সদস্যরা পাকবাহিনীকে নানাভাবে সহায়তা করত। এরা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে নিয়ে আসত এবং নির্মম নির্যাতনের পর পাকসেনাদের হাতে তুলে দিত। অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই বন্দি মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করত।
যৌন নিপীড়নে সহযোগিতা: আল-বদর যুবতী মেয়েদের ধরে এনে পাকিস্তানি সামরিক ক্যাম্পে সরবরাহ করত। এভাবে তারা নারী নির্যাতন ও গণধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে সক্রিয় সহযোগিতা করত।
ধর্মের অপব্যবহার
ইসলামের ইতিহাসের বদর যুদ্ধের আদলে তারা নিজেদের সংগঠনের নাম আল-বদর রাখে। বদর যুদ্ধের সাহাবীদের সংখ্যা ছিল ৩১৩ জন, তাই তারাও তাদের প্রতি ইউনিটে ৩১৩ জন করে সদস্য রাখতো। আল-বদর বাহিনী নিজেদের ইসলাম রক্ষার ঢাল হিসেবে দাবি করত এবং মুক্তিযোদ্ধাদের 'ভারতের এজেন্ট' বা 'ইসলামের শত্রু' বলে অপপ্রচার চালাত। ধর্মকে ব্যবহার করে তারা তাদের নৃশংসতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করত, যা প্রকৃত ইসলামী শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল।
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড - ১৪ ডিসেম্বরের বিভীষিকা
আল-বদর বাহিনীর সবচেয়ে বড় এবং জঘন্যতম অপরাধটি ছিল বিজয়ের প্রাক্কালে, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড।
যখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পারে, তখন তারা বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার শেষ চেষ্টা করে। এই ঘৃণ্য নীলনকশার প্রধান বাস্তবায়নকারী ছিল আল-বদর। তাদের লক্ষ্য ছিল দেশের শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের হত্যা করা, যাতে স্বাধীনতা লাভের পরেও দেশটি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দুর্বল ও পঙ্গু হয়ে থাকে।
আল-বদর সদস্যরা নিখুঁত তালিকা তৈরি করে রাতের অন্ধকারে বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। তাদের চোখ বেঁধে, রায়েরবাজার এবং মিরপুরের বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
আল-বদর এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান সামরিক ও গোয়েন্দা ভূমিকা পালন করেছিল। তারা শুধুমাত্র বুদ্ধিজীবীদের ধরে আনতেই সাহায্য করেনি, অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই হত্যাযজ্ঞে অংশ নিয়েছিল। ১৪ ডিসেম্বরের সেই বিভীষিকাময় রাতের প্রধান ঘাতক শক্তি হিসেবে আল-বদর বাহিনী ইতিহাসের পাতায় চিরকালের জন্য চিহ্নিত হয়ে আছে।
৩. আল-শামস - চট্টগ্রামের সন্ত্রাস ও লুটপাট
আল-বদরের পাশাপাশি গঠিত হয় আরেকটি আধা-সামরিক সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী, আল-শামস। এটিও মূলত মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অংশগ্রহণের জন্য তৈরি হয়েছিল।
আল-শামস (আল-শামস অর্থ: সূর্য বা The Sun) ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে সরাসরি সশস্ত্র ও আদর্শিকভাবে সহায়তা করার জন্য গঠিত একটি বাহিনী। আল-বদর বাহিনীর মতোই একই সময়ে এই সংগঠনটি গঠিত হয় এবং বিশেষত চট্টগ্রাম অঞ্চলে এর নৃশংসতা ছিল ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী।
সংগঠন ও উদ্দেশ্য: আল-শামস এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করা এবং সামরিক জান্তার পক্ষে জনমত তৈরি করা।
সামরিক প্রকৃতি: এটি ছিল একটি আধা-সামরিক সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী, যা স্থানীয়ভাবে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নির্দেশে পরিচালিত হতো।
আল-শামস-এর গঠন ও সদস্যবৃন্দ
আল-শামস বাহিনী ছিল মূলত সেইসব রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে গঠিত, যারা প্রথম থেকেই পাকিস্তানি দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রতি অনুগত ছিল এবং অখণ্ড পাকিস্তানে বিশ্বাস করত।
সংগঠক: মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন আল-শামস-এর অন্যতম প্রধান সংগঠক। এই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রমাণ করে যে, আল-শামস কেবল একটি সামরিক মিলিশিয়া বাহিনী ছিল না, এর পেছনে ছিল শক্তিশালী রাজনৈতিক মদদ।
আল-শামস বাহিনীতে বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা যোগ দিয়েছিল, যা এর আদর্শিক ভিত্তি ও বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে:
ইসলামী ছাত্রসংঘ: আল-বদরের মতো আল-শামস-এও জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যরা সক্রিয় ছিল।
মুসলিম লীগ ও সমমনা দল: মুসলিম লীগসহ অন্যান্য সমমনা ইসলামী দলগুলোর ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা এই বাহিনীতে যোগ দেয়।
বিহারী ও মাদ্রাসা ছাত্র: উর্দুভাষী বিহারীরা এবং মাদ্রাসা ছাত্রদের সংগঠন জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার সদস্যরাও আল-শামস-এর সদস্য ছিল।
এই সদস্যদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিষ্কার হয় যে, আল-শামস ছিল ধর্মীয় ও পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী একটি সহযোগী শক্তি।
অপারেশনাল কার্যক্রম - লজিস্টিক ও গোয়েন্দা সহায়ক
আল-শামস বাহিনীর মূল কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ তৈরি করা এবং একই সাথে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে নানা ধরনের সহায়তা দেওয়া।
আল-বদর বাহিনীর মতোই আল-শামস সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে নিয়ে আসত, তাদের উপর নির্মম নির্যাতন করত এবং চূড়ান্তভাবে পাকসেনাদের হাতে তুলে দিত বা হত্যা করত। তাদের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল:
সশস্ত্র যুদ্ধ: সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করা।
গুপ্তচরবৃত্তি: পাকবাহিনীকে লজিস্টিক এবং গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সহায়তা প্রদান করা। স্থানীয় রাস্তাঘাট, গোপন পথের তথ্য, মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থক ও আশ্রয়দাতাদের তথ্য তারা নিয়মিত সামরিক বাহিনীকে দিত।
শীর্ষনেতাদের ভূমিকা ও টহল
আল-শামস বাহিনীর শীর্ষনেতারা সরাসরি মাঠে থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করত, বিশেষত চট্টগ্রাম অঞ্চলে।
নেতৃত্বের সক্রিয়তা: আল-শামস বাহিনীর শীর্ষনেতা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও তার ছোট ভাই সাইফুদ্দিন কাদের চৌধুরী-এর নাম এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে আলোচিত।
ত্রাসের রাজত্ব: তারা সাতকানিয়া, রাউজান, বোয়ালখালী, পাটিয়া এবং রাঙ্গুনিয়া এলাকায় একটি জিপে টহল দিত এবং তাদের উপস্থিতির মাধ্যমে স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করত।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিভীষিকা
আল-শামস বাহিনী তাদের মূল কাজ ছাড়াও স্থানীয়ভাবে যে মানবতাবিরোধী অপরাধগুলো করেছিল, তা ছিল চরম নৃশংস এবং সুপরিকল্পিত।
টার্গেট ছিল হিন্দু সম্প্রদায়: আল-শামস এর আক্রমণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও সম্পত্তি। তাদের লুটপাট ও অত্যাচার ছিল অকল্পনীয়:
লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ: তারা হিন্দুদের বাড়ি লুটপাট করত এবং সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিত। এর মাধ্যমে তারা হিন্দু জনগোষ্ঠীকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল।
বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের নির্যাতন: মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থনকারী বা জাতীয়তাবাদী বাঙালি সন্দেহে সাধারণ মানুষকেও আল-শামস সদস্যরা রেহাই দেয়নি।
গ্রেফতার ও নির্যাতন: তারা সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করে এবং নির্মম নির্যাতন করত।
হত্যা ও লাশ গুম: নির্যাতন শেষে অনেককে হত্যা করে নির্দয়ভাবে কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দিত, যাতে কোনো প্রমাণ না থাকে। এই নৃশংসতা প্রমাণ করে, আল-শামস বাহিনী বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের মতো জঘন্য অপরাধে লিপ্ত ছিল।
৪. রাজাকার - গণহত্যার মূল সহযোগী ও বেতনভোগী দেশদ্রোহী বাহিনী
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে পরিচিত এবং ঘৃণ্য নাম হলো রাজাকার। এরা ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী পাক আর্মির প্রধান সহায়ক শক্তি।
রাজাকাররা ছিল এমন এক বেতনভোগী সশস্ত্র মিলিশিয়া, যারা নিজেদের জাতির সঙ্গেই চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাটে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। ১৯৭১ সালের মে মাসে খুলনায় গঠিত এই বাহিনী কীভাবে একটি জনযুদ্ধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কাজ করেছিল।
রাজাকার বাহিনী প্রাথমিক গঠন ও সামরিকীকরণ
রাজাকার বাহিনীর জন্ম আকস্মিক ছিল না; এটি ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার একটি সুচিন্তিত কৌশল, যার উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয়ভাবে একটি সশস্ত্র সহযোগী বাহিনী তৈরি করা, যারা জাতীয়তাবাদী বাঙালিদের দমন করবে।
জন্মস্থান ও সময়: রাজাকার বাহিনীর আনুষ্ঠানিক গঠন হয় ১৯৭১ সালের মে মাসে খুলনায়।
প্রাথমিক কাঠামো: শুরুতে এটি কোনো সামরিক বাহিনী ছিল না। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অধীনে থাকা আনসার বাহিনীকে ভেঙে প্রথমে শান্তি কমিটির সহযোগী স্বেচ্ছাসেবক দল হিসেবে রাজাকার প্রতিষ্ঠা করা হয়।
প্রাথমিক নেতৃত্ব: এই বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন পাকিস্তানি জেনারেল টিক্কা খান, আর এর প্রধান হিসেবে ছিলেন ইসলামী ছাত্র সংঘের তৎকালীন নেতা কে এম ইউসুফ।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা: জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগসহ অন্যান্য সমমনা সংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্যাপকভাবে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেয়। এর ফলে এই বাহিনীতে আদর্শিকভাবে পাকিস্তানপন্থী ও ধর্মীয় উগ্রবাদী ব্যক্তিরা ভিড় করে।
বেতনভোগী সশস্ত্র বাহিনীতে রূপান্তর
প্রাথমিক স্বেচ্ছাসেবক পর্যায় থেকে দ্রুতই রাজাকাররা একটি প্রশিক্ষিত সশস্ত্র বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়।
বেতন ও ভাতা: রাজাকারদের পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং প্রাদেশিক সরকার বেতন-ভাতাও প্রদান করত। এই অর্থ দিয়ে তারা স্থানীয় যুবকদের লোভ দেখিয়ে বাহিনীতে টানত।
সামরিক স্বীকৃতি: এই বাহিনীর গুরুত্ব এতটাই ছিল যে, ১৯৭১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান সরকার রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরূপে স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে রাজাকাররা পূর্ণ সামরিক বৈধতা অর্জন করে।
সদস্য সংখ্যা: ধারণা করা হয়, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজারে পৌঁছেছিল।
রাজাকার বাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধের চিত্র
রাজাকার বাহিনীর মূল কাজ ছিল পাকবাহিনীর পক্ষে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা। তবে তাদের সবচেয়ে ঘৃণ্য ভূমিকা ছিল বেসামরিক নাগরিকদের উপর চালানো অমানবিক অত্যাচার, যা ছিল আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ।
গণহত্যায় সক্রিয় অংশগ্রহণ: রাজাকাররা কেবল অস্ত্র হাতে যুদ্ধই করেনি, তারা বাঙালির গণহত্যায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল।
কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নৃশংসতা: এরা জাতীয়তাবাদী বাঙালি এবং মুক্তিবাহিনীকে সমর্থনকারী সন্দেহভাজনদের ধরে এনে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বা বধ্যভূমিতে নিয়ে যেত। সেখানে তাদের উপর চরম নির্যাতন চালানো হতো এবং হত্যা করা হতো।
তথ্য সরবরাহ: এদের স্থানীয় জ্ঞান ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান অস্ত্র। রাজাকাররাই পাকবাহিনীকে মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িঘর চিনিয়ে দেওয়া এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করত।
যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণ
রাজাকার বাহিনীর নৃশংসতার সবচেয়ে জঘন্য দিক ছিল নারী নির্যাতন।
জেনারেল নিয়াজির নির্দেশ: জেনারেল নিয়াজির নির্দেশে রাজাকাররা যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণকে ব্যবহার করেছিল। এটি ছিল বাঙালি জাতির মনোবল ভেঙে দেওয়ার এক পরিকল্পিত কৌশল।
নারী সরবরাহ: এরা সুন্দরী যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে এসে পাকসেনাদের হাতে তুলে দিত, অথবা নিজেরা ধর্ষণ করত। বহু নারীকে গণধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে এই রাজাকারদের হাতে। এই মানবতাবিরোধী কাজটিই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বীরাঙ্গনাদের জন্ম দিয়েছিল।
লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতন
সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় টার্গেট: রাজাকাররা হিন্দুদের বাড়িঘর জ্বালানো, লুটপাট ও অত্যাচারকে একটি পদ্ধতিগত কাজের অংশ হিসেবে বেছে নিয়েছিল। এর মাধ্যমে তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের অসাম্প্রদায়িক ভিত্তিকে আঘাত করতে চেয়েছিল।
মুক্তিযোদ্ধা পরিবার হত্যা: এরা মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের ধরে নিয়ে হত্যা করত, যা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ভাঙার অন্যতম কৌশল।
রাজাকারদের শীর্ষনেতৃত্বের দায়
রাজাকার বাহিনীর নেতৃত্ব কেবল তৃণমূল পর্যায়েই ছিল না, এর পেছনে ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা।
শীর্ষনেতাদের সম্পৃক্ততা: এই বাহিনীর শীর্ষনেতাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর গোলাম আজম ও মুহাম্মদ কামরুজ্জামান, মুসলিম লীগের আব্বাস আলী খান এবং এ এস এম জহুরুল-এর মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা ছিলেন।
আদর্শিক ভিত্তি: এই নেতারা অখণ্ড পাকিস্তানের ধারণাকে ধর্মের মোড়কে প্রচার করতেন এবং এই বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। এই রাজনৈতিক নেতৃত্বই রাজাকারদের নৃশংস কর্মকাণ্ডকে আদর্শিক বৈধতা দিত।
'ভারতের এজেন্ট' অপবাদ
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে শান্তি কমিটি ও রাজাকাররা মুক্তিবাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনকারী বাঙালি জনতাকে 'ভারতের এজেন্ট' বলে ডাকতো এবং সন্দেহভাজনদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ধরে এনে নির্যাতন ও হত্যা করত। এই অপবাদ দেওয়ার পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল:
আদর্শিক বৈধতা: মুক্তিযুদ্ধের জনসমর্থনকে দুর্বল করা এবং বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামকে 'ভারতের চক্রান্ত' হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা।
ধর্মীয় বিভেদ: হিন্দুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অসাম্প্রদায়িক ভিত্তিকে ধ্বংস করা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এই দেশদ্রোহী সংগঠনগুলোর বংশধর এবং তাদের সমর্থকরা স্বাধীনতা লাভের এত বছর পরেও একই পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে চলেছে। তারা আজও মুক্তিবাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনকারী বাঙালি জনতাকে 'ভারতের এজেন্ট' বলে ডাকে, যা প্রমাণ করে একাত্তরের আদর্শিক সংঘাত আজও চলমান।
ইতিহাসের দায় ও ন্যায়বিচার
শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস এই সংগঠনগুলো ছিল ১৯৭১ সালে মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত জঘন্যতম অপরাধগুলোর মূল হোতা। তাদের বিশ্বাসঘাতকতা, ধর্মীয় অপব্যবহার এবং নৃশংসতা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে দীর্ঘায়িত করেছিল এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে হলে এই সহযোগী বাহিনীগুলোর ঘৃণ্য ভূমিকার সঠিক মূল্যায়ন করা অপরিহার্য। পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতাদের বিচার এবং শাস্তি নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য ছিল ন্যায়বিচার ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
একাত্তরের সেই কালো অধ্যায় আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার মূল্য কত রক্তক্ষয়ী এবং কত ভয়াবহ বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম করতে হয়েছিল। এদের কর্মকাণ্ড কেবল অপরাধ ছিল না, তা ছিল বাঙালি জাতির প্রতি চরম আদর্শিক আঘাত। এই ইতিহাস আমাদের ভুললে চলবে না।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















