>

>

মাসিক মদীনা ও বঙ্গবন্ধু - একটি ঐতিহাসিক চিঠি এবং পিতৃভক্তির অমর উপাখ্যান

মাসিক মদীনা ও বঙ্গবন্ধু - একটি ঐতিহাসিক চিঠি এবং পিতৃভক্তির অমর উপাখ্যান

বিংশ শতাব্দীর বাংলা ইসলামী সাংবাদিকতার ইতিহাসে 'মাসিক মদীনা' একটি অবিস্মরণীয় নাম। আর এই পত্রিকার নেপথ্যের কারিগর ছিলেন কিংবদন্তি সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটি ছিল অত্যন্ত গভীর এবং ব্যক্তিগত। মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের জীবনভিত্তিক উপন্যাস 'কিংবদন্তির কথা বলছি' বইতে বর্ণিত একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সম্পর্কের টান এবং আদর্শিক ভিন্নতার ঊর্ধ্বে মানুষ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর মহানুভবতা ও পিতৃভক্তির কথা।

TruthBangla

মাসিক মদীনা ও বঙ্গবন্ধু - একটি ঐতিহাসিক চিঠি এবং পিতৃভক্তির অমর উপাখ্যান

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পূর্ব বাংলায় (পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশ) বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কার এবং ইসলামি মূল্যবোধভিত্তিক সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে যে কটি সাময়িকী মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে, তার মধ্যে সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয় ‘মাসিক মদীনা’র নাম। কেবল ধর্মীয় জ্ঞান চর্চায় নয়, বরং বিশুদ্ধ বাংলা ভাষায় ইসলামি সাহিত্যের রস পরিবেশন এবং সাধারণ শিক্ষিত মুসলিম মননে সীরাতে নববী ও ইসলামি ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণে 'মাসিক মদীনা' যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে, তা বাংলা সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। আর এই কালজয়ী সাময়িকীর নেপথ্য কারিগর, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাণপুরুষ ছিলেন ইসলামি সাহিত্য ও সাংবাদিকতার প্রবাদপুরুষ মাওলানা মুহিউদ্দীন খান।

তবে 'মাসিক মদীনা' কেবল একটি পত্রিকার নাম নয়; এর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস, রাজনীতি এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে গভীর এক মানবিকতার গল্প। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের সম্পর্কটি কোনো সাধারণ সম্পাদক ও রাষ্ট্রপ্রধানের সম্পর্ক ছিল না। তা ছিল কয়েক দশকের স্মৃতিতে পুষ্ট, চরম দুঃসময়ে একসাথে জেল খাটার স্মৃতিতে তৈরি এক গভীর, নিষ্কলুষ ও পারিবারিক বন্ধন।

মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের স্বরচিত জীবনভিত্তিক আখ্যান এবং তাঁদের বর্ণাঢ্য জীবনের নানা নথিপত্রে বর্ণিত একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে আদর্শিক বিভাজন কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ অবস্থান কোনোটিই খাঁটি মানুষের ভেতরের দয়া, পিতৃভক্তি এবং ব্যক্তিগত স্নেহের বন্ধনকে মুছে দিতে পারে না। সত্তরের দশকের প্রারম্ভে যখন প্রশাসনিক জটিলতায় ‘মাসিক মদীনা’র প্রকাশনা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন টুঙ্গিপাড়া থেকে আসা একটি চিঠি এবং বঙ্গভবনে ঘটে যাওয়া একটি আবেগঘন মুহূর্ত পত্রিকাটিকে নতুন জীবন দান করেছিল।

এই নিবন্ধে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব বিংশ শতাব্দীর বাংলা ইসলামি সাংবাদিকতার প্রেক্ষাপট, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ও বঙ্গবন্ধুর আধা-শতাব্দীকালের হৃদ্যতা, শেখ লুৎফুর রহমানের ঐতিহাসিক চিঠিটির নেপথ্য কথা এবং বঙ্গভবনের সেই অবিস্মরণীয় ঘটনার সার্বিক বিশ্লেষণ।

বাংলা ইসলামি সাংবাদিকতা ও ‘মাসিক মদীনা’

বাংলাদেশ অঞ্চলের ইসলামি সাহিত্যের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে মুনশী মোহাম্মদ মেহেরউল্লা, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, মাওলানা আকরাম খাঁ বা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো মনীষীগণ বাংলা ভাষায় ইসলামি ভাবধারা চর্চার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে এবং বিশেষ করে ষাটের দশকে বাংলা ভাষায় একটি নিয়মিত, উচ্চমানের, সর্বজনগ্রাহ্য এবং সাহিত্য গুণসম্পন্ন ইসলামি সাময়িকীর তীব্র প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল।

ঠিক এই ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেই ১৯৬১ সালে মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের সম্পাদনায় আত্মপ্রকাশ করে ‘মাসিক মদীনা’

‘মাসিক মদীনা’র স্বকীয়তা ও জনমানসে প্রভাব

‘মাসিক মদীনা’ প্রচলিত কোনো সাধারণ কট্টর বা সংকীর্ণ ধর্মীয় পত্রিকা ছিল না। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান তাঁর দূরদর্শী সম্পাদনার মাধ্যমে পত্রিকাটিকে প্রতিটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের অপরিহার্য অংশে পরিণত করেছিলেন।

সীরাত চর্চায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে আধুনিক প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরার জন্য 'মাসিক মদীনা'র বৈশ্বিক সীরাত সংখ্যাগুলো ছিল সাহিত্য জগতে এক একটি অনন্য সংযোজন।

সহজ-সরল ও বিশুদ্ধ ভাষা: আলেম সমাজ এবং সাধারণ আধুনিক শিক্ষিত সমাজের মধ্যে যে ভাষার দেয়াল ছিল, তা ভেঙে দিয়ে এক প্রমিত, সাবলীল ও মাধুর্যময় বাংলা গদ্যের চর্চা শুরু করে 'মাসিক মদীনা'।

প্রশ্নোত্তর বিভাগ: পত্রিকার ‘জিজ্ঞাসা ও জবাব’ বিভাগটি পাঠকদের ধর্মীয় ও দৈনন্দিন জীবনের নানা জটিল প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সর্বস্তরের মানুষের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

নতুন লেখক তৈরি: অসংখ্য প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ লেখক, গবেষক ও অনুবাদক এই পত্রিকার মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্য জগতে আত্মপ্রকাশ করেন।

ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়া থেকে শুরু করে টেকনাফ-তেঁতুলিয়া পর্যন্ত প্রতিটি অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ ও সাহিত্য অনুরাগী মানুষের কাছে 'মাসিক মদীনা'র একটি কপি পৌঁছানো মানে ছিল একখণ্ড আত্মিক তৃপ্তি। আর এই আত্মিক তৃপ্তির একজন নিয়মিত অংশীদার ছিলেন বঙ্গবন্ধুর পরম শ্রদ্ধেয় পিতা শেখ লুৎফুর রহমান।

দুই কিংবদন্তির প্রথম সাক্ষাৎ ও স্নেহের বন্ধন (১৯৫১–১৯৫২)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের বন্ধুত্বের সূচনা কোনো রাজপ্রাসাদ বা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ভবনে হয়নি। এর শিকড় প্রোথিত ছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ দিনগুলোতে এবং তৎকালীন ঢাকা শহরের ধর্মীয়-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে।

লালবাগ মাদ্রাসা ও প্রথম পরিচয় (১৯৫১): ১৯৫১ সালে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান যখন প্রথম পড়াশোনা ও সাহিত্য চর্চার উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসেন, তখন তিনি অবস্থান নেন লালবাগ মাদ্রাসায়। সেখানে তিনি প্রখ্যাত বুজুর্গ ও প্রবীণ আলেম মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে ছিলেন। সে সময়কার উদীয়মান, তেজস্বী ও আপসহীন তরুণ রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমান নিয়মিত লালবাগ মাদ্রাসায় যেতেন মাওলানা ফরিদপুরীর পরামর্শ ও দোয়া নেওয়ার জন্য।

মাসিক মদীনা ও বঙ্গবন্ধু - একটি ঐতিহাসিক চিঠি এবং পিতৃভক্তির অমর উপাখ্যান

সেখানেই তরুণ শেখ মুজিবের সাথে পরিচয় ঘটে উদীয়মান আলেম ও লেখক মুহিউদ্দীন খানের। শেখ মুজিব ছিলেন বয়সে খানিকটা জ্যেষ্ঠ। মুহিউদ্দীন খানের মেধা, সত্যবাদিতা এবং স্পষ্টভাষিতা দেখে শেখ মুজিব তাঁকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতে শুরু করেন। প্রথম পরিচয় থেকেই তাঁদের মধ্যে এমন এক আন্তরিক আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয় যে, শেখ মুজিব তাঁকে তুই-তোকারি করে ‘খান’ বা ‘মুহিউদ্দীন’ বলে সম্বোধন করতেন।

১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন ও একসঙ্গে কারাবাস: ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের সময় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তরুণ রাজপথের সৈনিক হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান যেমন গর্জে উঠেছিলেন, তেমনি ইসলামি চিন্তাবিদদের পক্ষ থেকে মাওলানা মুহিউদ্দীন খানও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

আন্দোলন দমনপীড়নের অংশ হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উভয়কেই গ্রেপ্তার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায়। কারাগারে প্রায় দেড় মাস তাঁরা একসাথে বন্দী জীবনযাপন করেন। একই সেল বা কাছাকাছি কক্ষে থেকে তাঁদের মধ্যে রাজনীতির পেছনের গল্প, দেশের ভবিষ্যৎ এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের শিকড় আরও গভীরে গিয়ে বসে। রাজনৈতিক আদর্শ বা কর্মক্ষেত্রের ভিন্নতা সত্ত্বেও এই কারাগারে কাটানো দিনগুলো তাঁদের হৃদয়ে এমন এক চিরস্থায়ী পারিবারিক সেতু নির্মাণ করে দিয়েছিল, যা পরবর্তী কোনো ঝড়ঝাপ্টাতেই ভেঙে পড়েনি।

স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশ ও ‘মাসিক মদীনা’র অস্তিত্ব সংকট (১৯৭২)

১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীনতার পর তৎকালীন নতুন সরকার রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন এবং প্রশাসনিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে বেশ কিছু প্রেস ও পাবলিকেশন অ্যাক্ট কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে শুরু করে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব পত্রিকার ভূমিকা অস্পষ্ট ছিল বা প্রশাসনিক অনুমোদনে ত্রুটি ছিল, তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে সেগুলোর ডিক্লারেশন (প্রকাশনার অফিশিয়াল অনুমতিপত্র) পুনর্মূল্যায়ন বা বাতিল করা হতে থাকে।

এই প্রশাসনিক টানাপোড়েন ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বলি হয় ‘মাসিক মদীনা’। যদিও মাওলানা মুহিউদ্দীন খান কখনোই কোনো অশুভ বা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির দোসর ছিলেন না, তথাপি তথ্য মন্ত্রণালয়ের একপেশে ও ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ১৯৭২ সালে হুট করেই ‘মাসিক মদীনা’র ডিক্লারেশন বাতিল করে দেওয়া হয়।

পত্রিকা বন্ধের পর আর্থ-সামাজিক চাপ

টানা দুই-তিন মাস পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ থাকায় মাওলানা মুহিউদ্দীন খান গভীর অর্থকষ্ট ও হতাশায় নিপতিত হন। হাজার হাজার পাঠক নিয়মিত পত্রিকা না পেয়ে প্রেসে চিঠি লিখতে শুরু করেন। কিন্তু ডিক্লারেশন ছাড়া পত্রিকা ছাপা বা ডাকযোগে পাঠানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

প্রশাসনিক এই ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কার কাছে যাবেন বা কীভাবে প্রতিবাদ করবেন, তা ভেবে পাচ্ছিলেন না সম্পাদক। কারণ তৎকালীন সময়ে নতুন স্বাধীন দেশে ক্ষমতার করিডোরে ছিল চরম ব্যস্ততা ও নিরাপত্তার কড়াকড়ি। আর ঠিক এই হতাশাজনক সংকটের মুহূর্তেই ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়া থেকে আসে এক অলৌকিক ও ঐতিহাসিক চিঠি!

টুঙ্গিপাড়া থেকে শেখ লুৎফুর রহমানের চিঠির নেপথ্য কথা

বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফুর রহমান ছিলেন এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার, সুবিচারক, জ্ঞানানুরাগী এবং সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত একজন মানুষ। বৃদ্ধ বয়সে টুঙ্গিপাড়ার নিরিবিলি গ্রামের বাড়িতে তাঁর অবসরের বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিল বিভিন্ন ধর্মীয় বইপুস্তক এবং মানসম্মত পত্রিকা।

শেখ লুৎফুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে ‘মাসিক মদীনা’র বার্ষিক নিয়মিত গ্রাহক হিসেবে রেজিস্টার্ড ছিলেন। তিনি নিয়ম করে প্রতি মাসে ডাকপিয়নের কাছ থেকে পত্রিকার মোড়ক খুলে গভীর মনযোগ দিয়ে তা পাঠ করতেন। কিন্তু ১৯৭২ সালে প্রশাসনিক আদেশে মদীনার ডিক্লারেশন বাতিল হয়ে যাওয়ায় পরপর দু-তিন মাস টুঙ্গিপাড়ার ঠিকানায় কোনো পত্রিকা পৌঁছায়নি।

বকেয়া চাঁদা ও বৃদ্ধ পিতার আকুলতা

শেখ লুৎফুর রহমান জানতেন না যে ঢাকা শহরের তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে এই পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। তিনি সরল বিশ্বাসে ভেবেছিলেন, হয়তো তাঁর বার্ষিক গ্রাহক চাঁদার মধ্যে তিন মাসের বকেয়া জমে গেছে বলে সম্পাদক নিয়ম অনুযায়ী পত্রিকা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন!

একজন আত্মমর্যাদাশীল এবং ন্যায়পরায়ণ বয়োবৃদ্ধ মানুষ হিসেবে তিনি পত্রিকা না পেয়ে ক্ষুব্ধ না হয়ে, অত্যন্ত বিনয় ও মমত্ববোধ নিয়ে স্বহস্তে একটি চিঠি লেখেন পত্রিকার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের উদ্দেশ্যে। চিঠির বুনন ও বক্তব্য ছিল নিম্নরূপ:

"শ্রদ্ধেয় সম্পাদক সাহেব,
সালাম নিবেন। আশা করি কুশলেই আছেন। পর কথা হলো, আমি 'মাসিক মদীনা'র একজন নিয়মিত গ্রাহক। গত দু'মাস ধরে মদীনা পত্রিকা আমার নামে আসছে না। তিন মাসের বকেয়া বাকি ছিল বলে হয়তো আপনি পত্রিকা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন। আমি আমার ছেলে মুজিবকে চিঠি লিখে বলে দেবো, সে যেন আপনার টাকা পরিশোধ করে দেয়। আমি বৃদ্ধ মানুষ, প্রিয় মদীনা পত্রিকা ছাড়া সময় কাটানো অনেক কষ্টকর। আশা করি আগামী মাস থেকে মদীনা পড়তে পারবো। আমার জন্য দোয়া করবেন। আমিও আপনার জন্য দোয়া করি।
ইতি-
শেখ লুৎফুর রহমান
টুঙ্গিপাড়া, ফরিদপুর।"

চিঠির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

এই সংক্ষিপ্ত চিঠিটি কেবল একটি পত্রিকার বকেয়া পরিশোধের অঙ্গীকার ছিল না; এটি ছিল বাংলা সাহিত্যের ও ইতিহাসের এক মহামূল্যবান নথি। চিঠির ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছিল:

সন্তানের প্রতি পিতার অকৃত্রিম আস্থা: শেখ লুৎফুর রহমান জানতেন তাঁর ছেলে ‘মুজিব’ এখন সমগ্র স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি/প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাবার সামান্য কয়েকটি টাকার বকেয়া শোধ করার কথা ছেলেকে বলতে তিনি দ্বিধাবোধ করবেন না।

জ্ঞানের প্রতি গভীর অনুরাগ: জীবনের শেষপ্রান্তে এসেও একজন বৃদ্ধ মানুষের মনের খোরাক ছিল ইসলামি সাহিত্য ও আলেমদের লেখা।

আত্মমর্যাদাবোধ: বিনা মূল্যে বা কারও করুণায় পত্রিকা পড়ার মানসিকতা তাঁর ছিল না; নিজের বকেয়া পরিশোধ করেই তিনি পত্রিকা পড়ার অধিকার বহাল রাখতে চেয়েছিলেন।

চিঠিটি হাতে পেয়ে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান স্তব্ধ হয়ে যান। চিঠির প্রেরকের নামটি দেখেই তিনি বুঝতে পারেন যে এটি সাধারণ কোনো চিঠি নয়; এটি স্বয়ং রাষ্ট্রপ্রধানের পিতার চিঠি! তিনি বুঝতে পারলেন, এই চিঠিই হতে পারে বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘মাসিক মদীনা’র পুনর্জন্মের অলৌকিক চাবিকাঠি।

বঙ্গভবনে বঙ্গবন্ধু ও মাওলানা মুহিউদ্দীন খান

চিঠিটি যত্ন করে নিজের শেরওয়ানির ভেতরের পকেটে রেখে পরদিনই মাওলানা মুহিউদ্দীন খান সোজা বঙ্গভবনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। রাষ্ট্রপতির প্রোটোকল ও কড়া নিরাপত্তা টপকে যখন বার্তা পাঠানো হলো যে 'মাওলানা মুহিউদ্দীন খান' দেখা করতে এসেছেন, তখন মুহূর্ত বিলম্ব না করে তাঁকে বঙ্গবন্ধুর খাস কামরায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো।

"সবাই পর হয়ে গেছে..."

কক্ষে প্রবেশ করতেই দেশের রাষ্ট্রপতি, দূরদর্শী রাজনৈতিক মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর পুরানো বন্ধুকে দেখে আসন ছেড়ে উঠে এলেন। সেই আগের মতো ভরাট, বজ্রকণ্ঠের চিরচেনা আন্তরিকতায় তুই-তোকারি করে বলে উঠলেন:

"তুই এতদিন পর আমাকে দেখতে এলি! এখানে বসার পর সবাই যেন দূরে চলে গেছে, সবাই পর হয়ে গেছে।"

এই একটি বাক্যের ভেতর যেন লুকিয়ে ছিল ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে অবস্থান করা একজন মহৎ মানুষের গভীর একাকীত্ব। চারপাশে শত শত চাটুকার, আমলা এবং রাজনীতিবিদের ভিড়ে বঙ্গবন্ধু খুঁজছিলেন এমন এক বিশ্বস্ত মানুষকে, যার সাথে ক্ষমতার কোনো সম্পর্ক নেই, আছে কেবল পুরানো স্মৃতির নিষ্কলুষ বন্ধন।

ক্ষোভ ও পিএসকে তলব

কুশল বিনিময়ের পর বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করলেন, "বল, তোর খবর কী? দিনকাল কেমন চলছে?"

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান কিছুটা দুঃখভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললেন,

"আমার খবর আর কী থাকবে মুজিব! তোর তথ্য মন্ত্রণালয় তো আমার ‘মাসিক মদীনা’ পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করে দিয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে পত্রিকা বন্ধ।"

কথাটি শোনামাত্রই বঙ্গবন্ধুর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে তাঁর প্রিয় ছোট ভাইতুল্য এবং রাজপথের ভাষাসংগ্রামী মুহিউদ্দীন খানের পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কিছুটা উসখুস করে অত্যন্ত শক্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন:

"তুই তো রাজাকার ছিলি না! তবে তোর পত্রিকা ওরা বন্ধ করবে কেন?"

বঙ্গবন্ধু সাথে সাথে টেবিলে থাকা বেল বাজিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত সচিবকে (পিএস) কামরায় তলব করলেন। পিএস দ্রুত রুমে প্রবেশ করলে অত্যন্ত কড়া সুরে নির্দেশ দিলেন:

"তথ্য সচিবকে এখনই ফোন লাগাও! কোন সাহসে আর কার হুকুমে মদীনা পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করা হলো, আমি তার জবাব চাই!"

বাবার হাতের লেখা, চোখের জল এবং মদীনার পুনর্জাগরণ

ঠিক সেই মুহূর্তে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান পকেট থেকে টুঙ্গিপাড়া থেকে পাওয়া শেখ লুৎফুর রহমানের মূল চিঠিটি বের করে বঙ্গবন্ধুর হাতে বাড়িয়ে দিলেন।

পিতা-পুত্রের অপার্থিব আবেগ: বঙ্গবন্ধু চিঠিটি হাতে নিলেন। কাগজের ওপর তাঁর পরম শ্রদ্ধেয় পিতার পরিচিত হাতের লেখা ও স্বাক্ষর দেখামাত্রই তাঁর চেহারা সম্পূর্ণ বদলে গেল। চিঠিতে লেখা প্রতিটি লাইন যেখানে বৃদ্ধ বাবা লিখেছেন যে তিনি পত্রিকা না পেয়ে কষ্ট পাচ্ছেন এবং ছেলে মুজিবকে বলে টাকা শোধ করিয়ে দেবেন বঙ্গবন্ধু গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগলেন।

পড়া শেষ হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধুর দুই চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। উল্লেখ্য, ওই ঘটনার কিছুদিন আগেই বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফুর রহমান ইন্তেকাল করেছিলেন (বা জীবনের শেষ সায়াহ্নে অসুস্থ ছিলেন)। পিতার স্মৃতি, পিতার প্রতি অগাধ ভক্তি এবং নিজের প্রশাসনের ভুলের কারণে পিতার এই কষ্ট সব কিছু মিলিয়ে দেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি শিশুসুলভ আবেগে কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

তিনি দাঁড়িয়ে মাওলানা মুহিউদ্দীন খানকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন:

"তুই আমার কাছে আরো আগে কেন আসলি না! আজ আমার বাবা দুনিয়াতে নেই... আমি তো হারামজাদাদের ইসলামি কোনো ভালো পত্রিকা বন্ধ করতে বলিনি! আমার বাবা মদীনা পত্রিকা না পেয়ে শেষ বয়সে কত কষ্ট পেয়েছেন!"

তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ও রাজকীয় আতিথেয়তা

কান্না থামিয়ে বঙ্গবন্ধু তৎক্ষণাৎ টেলিফোনে তথ্য সচিবকে তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করলেন। তিনি নির্দেশ দিলেন, আজই, এই মুহূর্তেই 'মাসিক মদীনা'র ডিক্লারেশন পুনর্বহাল করে আদেশের কপি পাঠাতে হবে।

এরপর বঙ্গবন্ধু মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের হাত ধরে বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে নিজের সরকারি গাড়িতে তুললেন। তাঁকে সোজা নিজের বাসভবনে নিয়ে গেলেন, পাশে বসিয়ে দুপুরে দুপুরের খাবার খাওয়ালেন এবং অত্যন্ত সম্মানের সাথে বিদায় জানালেন।

বঙ্গবন্ধুর সেই একটিমাত্র ঐতিহাসিক নির্দেশে 'মাসিক মদীনা' কেবল তার আইনি অধিকারই ফিরে পায়নি, বরং পরবর্তী প্রায় চার-পাঁচ দশক ধরে সমগ্র বিশ্বের বাংলাভাষী পাঠকদের জ্ঞান ও ইমানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার পথ সুগম করেছিল।

এক নজরে ঐতিহাসিক ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্ব

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান এবং 'মাসিক মদীনা'র এই অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক ঘটনাটিকে সংক্ষেপে অনুধাবন করার জন্য নিচের সারণীটি পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে:

অনুষঙ্গ / তথ্য বিষয়

সংশ্লিষ্ট বিবরণ ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব

কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বগণ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (রাষ্ট্রপতি/প্রধানমন্ত্রী), মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (সম্পাদক, মাসিক মদীনা), এবং শেখ লুৎফুর রহমান (বঙ্গবন্ধুর পিতা)।

প্রথম পরিচয়ের স্থান ও সময়

১৯৫১ সালে ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসায়; পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে একসাথে দেড় মাস ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি জীবন।

ঐতিহাসিক সাময়িকী

‘মাসিক মদীনা’ (১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলা ভাষায় অত্যন্ত জনপ্রিয় ইসলামি ও সীরাত সাহিত্য পত্রিকা)।

সংকটের প্রেক্ষাপট (১৯৭২)

স্বাধীনতা পরবর্তীতে প্রশাসনিক ভুল ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক 'মাসিক মদীনা'র ডিক্লারেশন বাতিলকরণ।

চিঠির উৎস

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থেকে প্রবীণ শেখ লুৎফুর রহমান কর্তৃক ৩ মাসের বকেয়া চাঁদা ও পত্রিকা না পাওয়ার কারণ জানতে চেয়ে লেখা চিঠি।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়া

বাবার চিঠি পড়ে অশ্রুপাত, পুরোনো বন্ধুকে জড়িয়ে ধরা এবং তথ্য সচিবকে ভর্ৎসনা করে তাৎক্ষণিক ডিক্লারেশন বহালের নির্দেশ।

মূল বার্তা ও শিক্ষা

রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা, সত্যের প্রতি সম্মান এবং পিতৃভক্তি সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

আদর্শিক ভিন্নতা বনাম মানবিক মূল্যবোধ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের এই অবিস্মরণীয় ঘটনাটি কেবল অতীত ইতিহাসের রস আস্বাদনের কোনো গল্প নয়; এটি আধুনিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক অমূল্য শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা।

রাজনৈতিক ভিন্নতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও স্বাধীন বাংলাদেশের মূল স্থপতি। অন্যদিকে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ছিলেন প্রথাগত ইসলামি ধারার একজন আলেম, রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা এবং ধর্মীয় চিন্তাবিদ।

চিন্তা ও দর্শনের ক্ষেত্রে উভয়ের অবস্থান আলাদা মেরুতে হলেও, তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভেতরে কখনও কোনো কলুষতা বা হিংস্রতা প্রবেশ করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে থেকেও একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে তাঁর ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি। আর মাওলানা মুহিউদ্দীন খানও বঙ্গবন্ধুর প্রতি আজীবন যে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা বজায় রেখেছিলেন, তা তাঁর রচিত ‘কিংবদন্তির কথা বলছি’ বইয়ের পাতায় পাতায় স্বর্ণাক্ষরে ফুটে উঠেছে।

আধুনিক রাজনীতির জন্য শিক্ষা

আজকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেখানে সামান্য মতপার্থক্যের কারণে একে অপরকে শত্রুতে পরিণত করা হয়, মিডিয়া ও সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করার প্রবণতা দেখা যায়, সেখানে বঙ্গবন্ধুর এই ঘটনাটি আমাদের শেখায়:

সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান: প্রশাসনিক ভুল হলে তা সংশোধন করার মতো উদারতা রাষ্ট্রপ্রধানের থাকা উচিত।

ব্যক্তিগত সম্পর্কের মর্যাদা: রাজনৈতিক মতপার্থক্য যেন ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাকে গ্রাস না করে।

পিতার ইচ্ছার প্রতি অম্লান ভক্তি: ক্ষমতার মসনদে থেকেও পিতার সামান্যতম আশা-আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া রাষ্ট্রনায়কের আসল মানবিক পরিচয়।

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ও বাংলা সীরাত সাহিত্যের পথচলা

বঙ্গবন্ধুর সরাসরি হস্তক্ষেপে 'মাসিক মদীনা' রক্ষা পাওয়ার পর, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান তাঁর মেধা ও যোগ্যতার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করেছিলেন। তিনি কেবল একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেই থেমে থাকেননি; বাংলা ভাষায় ইসলামি সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছিলেন।

মারেফুল কুরআনের বঙ্গানুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো পাকিস্তান ও বিশ্বখ্যাত মুফতি শফী (রহ.) রচিত আট খণ্ডের বিশাল কোরআনের তাফসির ‘মাআরেফুল কুরআন’-এর নিখুঁত ও সাবলীল বঙ্গানুবাদ। সৌদি আরবের বাদশা ফাহাদ কুরআন প্রিন্টিং প্রেস থেকে এই অনুবাদটি গ্রহণ করে বিশ্বের কোটি কোটি বাংলাভাষী মানুষের জন্য বিনামূল্যে বিতরণের ব্যবস্থা করে।

‘কিংবদন্তির কথা বলছি’ গ্রন্থপঞ্জি: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান তাঁর দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, ঐতিহাসিক স্মৃতি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ লিপিবদ্ধ করে গেছেন তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থাবলীতে, যার মধ্যে ‘কিংবদন্তির কথা বলছি’ অন্যতম সেরা রত্ন। এই গ্রন্থেই তিনি অত্যন্ত সততা ও আবেগের সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ লুৎফুর রহমান এবং 'মাসিক মদীনা'র পুনর্জন্মের গল্পটি বিশ্ববাসীর কাছে প্রকাশ করে গেছেন।

তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সত্য ইতিহাস কখনো রাজনৈতিক চশমা দিয়ে লেখা যায় না; ইতিহাস লেখা হয় সত্য ও আবেগের কলমে।

ইতিহাস ও স্মৃতির অমর অম্লানতা

ইতিহাসের পাতায় অনেক রাজা-বাদশাহ, রাষ্ট্রপ্রধান ও সম্পাদকের নাম লেখা থাকে। কিন্তু ক্ষমতার দাপট আর রাজনৈতিক হিংসার ভিড়ে যেসব মানবিক ঘটনা হৃদয়ে দাগ কেটে যায়, সেগুলোই কালের পরিক্রমায় অম্লান হয়ে থাকে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, প্রকৃত মহামানবরা ক্ষমতার শীর্ষে উঠেও নিজেদের মাটির শিকড় এবং পুরানো বন্ধন ভুলে যান না। ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়ার এক বৃদ্ধ বাবার ‘মাসিক মদীনা’ পড়ার আকুলতা, আর বঙ্গভবনে এক রাষ্ট্রপ্রধানের বাবার চিঠির অক্ষরে হাত রেখে অঝোর ধারায় চোখের জল ফেলা এ যেন বাংলা সাহিত্যের এক অমর কাব্য!

আজ আগস্টের শোকাবহ দিনগুলোতে বা রাজনীতির উত্তাল তরঙ্গে যখন আমরা পেছনের দিকে তাকাই, তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই মহানুভবতা ও পিতৃভক্তি আমাদের নতুন করে অনুপ্রাণিত করে। অন্যদিকে মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের সত্যবাদিতা ও সাহিত্য সাধনা আমাদের শেখায় কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের আদর্শে অবিচল থাকতে হয়।

'মাসিক মদীনা'র পাতায় পাতায় আজও যে সত্য, সুন্দর ও ইসলামি সংস্কৃতির বার্তা প্রতিধ্বনিত হয়, তার আলোকবর্তিকা একদিন নিভে যেতে পারত প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের আঁধারে। কিন্তু এক মহান পিতার অন্তর্দৃষ্টি এবং এক মহান রাষ্ট্রনায়কের উদারতায় সেই আলো আজ ছড়িয়ে পড়েছে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে। ইতিহাস এই মহানুভবতা ও বন্ধুত্বের গল্পকে চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রাখবে।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 15, 2025

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানো হয়েছে। ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডির পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বিরোধী শক্তি, বিশেষত জামায়াতে ইসলামী, আল-বদর ইসলামী ছাত্রসংঘ (বর্তমান ইসলামী ছাত্রশিবির) এবং তাদের দোসররা হাজারো গুজব ও বিকৃত গল্প ছড়িয়েছে।

Aug 9, 2026

/

Post by

সুদূর ইরাকের বাগদাদ নগরীর পুণ্যভূমি থেকে শুরু হয়ে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে আসা বাংলার পলিমাটি পর্যন্ত বিস্তৃত তেমনই এক কালজয়ী ও অলৌকিক বংশধারার ইতিহাস হলো টুঙ্গিপাড়ার ঐতিহ্যবাহী 'শেখ পরিবার'। ইসলামের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি সাধক, সুলতানুল আউলিয়া বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)-এর পুণ্যময় রক্তের ধারা কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করে সুদূর ইরাক থেকে এসে বাংলাদেশের রাজনীতি, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের সূতিকাগার টুঙ্গিপাড়ায় শিকড় গেড়েছিল তা এক পরম বিস্ময়কর ইতিহাস।

Aug 9, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধু যে উদার মন নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং পাকি-তোষামোদকারী গোষ্ঠীসমূহকে ক্ষমা প্রদর্শন করেছিলেন, সেই ক্ষমার মহত্ত্ব উপলব্ধি করার মতো মানবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেই পরাজিত অপশক্তির ছিল না। বিষধর সাপকে আশ্রয় দিলে তার হিংস্রতা যেমন কমে না, তেমনি সাধারণ ক্ষমার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নেপথ্যে সংগঠিত হয়েছিল সেইসব দেশদ্রোহী ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী, যারা শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বুকেই মারণ-কামড় বসিয়েছিল।

Jun 22, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে কেবল হাজার বছরের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন; দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কীভাবে এই ভূষিত রূপটি একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। কবে, কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রত্যক্ষ ভোটে শেখ মুজিব এই অনন্য খেতাব অর্জন করেছিলেন? সেই ঐতিহাসিক জরিপে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা সহযোগী অন্যান্য বাঙালি শ্রেষ্ঠরাই বা কারা ছিলেন?

May 23, 2026

/

Post by

একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিকে তাঁর নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটিয়েছিল সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী কর্মকর্তা ও জওয়ান। কিন্তু এই চরম জাতীয় ট্র্যাজেডির অব্যবহিত পরেই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে চোখের পলকে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছিল, তা কেবল নজিরবিহীনই নয়, বরং চরম বিস্ময় ও লজ্জার এক ঐতিহাসিক দলিল।

May 15, 2026

/

Post by

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালটি নিয়ে দুটি বিপরীতমুখী বয়ান পাওয়া যায়। একদল একে দেখেন ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচারের’ কাল হিসেবে, আর অন্যদল একে দেখেন একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শূন্য হাতে রাষ্ট্র গড়ার মহাবীরত্বগাথা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা এই সময়কালকে কেবল ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচার’ তকমা দিয়ে মুছে ফেলতে চায়। অন্যদিকে, সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসবিদরা দেখেন এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি জাতিকে টেনে তোলার প্রাণপণ লড়াই।

Aug 15, 2025

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানো হয়েছে। ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডির পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বিরোধী শক্তি, বিশেষত জামায়াতে ইসলামী, আল-বদর ইসলামী ছাত্রসংঘ (বর্তমান ইসলামী ছাত্রশিবির) এবং তাদের দোসররা হাজারো গুজব ও বিকৃত গল্প ছড়িয়েছে।

Aug 9, 2026

/

Post by

সুদূর ইরাকের বাগদাদ নগরীর পুণ্যভূমি থেকে শুরু হয়ে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে আসা বাংলার পলিমাটি পর্যন্ত বিস্তৃত তেমনই এক কালজয়ী ও অলৌকিক বংশধারার ইতিহাস হলো টুঙ্গিপাড়ার ঐতিহ্যবাহী 'শেখ পরিবার'। ইসলামের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি সাধক, সুলতানুল আউলিয়া বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)-এর পুণ্যময় রক্তের ধারা কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করে সুদূর ইরাক থেকে এসে বাংলাদেশের রাজনীতি, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের সূতিকাগার টুঙ্গিপাড়ায় শিকড় গেড়েছিল তা এক পরম বিস্ময়কর ইতিহাস।

Aug 9, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধু যে উদার মন নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং পাকি-তোষামোদকারী গোষ্ঠীসমূহকে ক্ষমা প্রদর্শন করেছিলেন, সেই ক্ষমার মহত্ত্ব উপলব্ধি করার মতো মানবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেই পরাজিত অপশক্তির ছিল না। বিষধর সাপকে আশ্রয় দিলে তার হিংস্রতা যেমন কমে না, তেমনি সাধারণ ক্ষমার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নেপথ্যে সংগঠিত হয়েছিল সেইসব দেশদ্রোহী ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী, যারা শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বুকেই মারণ-কামড় বসিয়েছিল।

Jun 22, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে কেবল হাজার বছরের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন; দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কীভাবে এই ভূষিত রূপটি একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। কবে, কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রত্যক্ষ ভোটে শেখ মুজিব এই অনন্য খেতাব অর্জন করেছিলেন? সেই ঐতিহাসিক জরিপে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা সহযোগী অন্যান্য বাঙালি শ্রেষ্ঠরাই বা কারা ছিলেন?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.