মাসিক মদীনা ও বঙ্গবন্ধু - একটি ঐতিহাসিক চিঠি এবং পিতৃভক্তির অমর উপাখ্যান
বিংশ শতাব্দীর বাংলা ইসলামী সাংবাদিকতার ইতিহাসে 'মাসিক মদীনা' একটি অবিস্মরণীয় নাম। আর এই পত্রিকার নেপথ্যের কারিগর ছিলেন কিংবদন্তি সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটি ছিল অত্যন্ত গভীর এবং ব্যক্তিগত। মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের জীবনভিত্তিক উপন্যাস 'কিংবদন্তির কথা বলছি' বইতে বর্ণিত একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সম্পর্কের টান এবং আদর্শিক ভিন্নতার ঊর্ধ্বে মানুষ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর মহানুভবতা ও পিতৃভক্তির কথা।

TruthBangla
Dec 26, 2025
বিংশ শতাব্দীর বাংলা ইসলামী সাংবাদিকতার ইতিহাসে 'মাসিক মদীনা' একটি অবিস্মরণীয় নাম। আর এই পত্রিকার নেপথ্যের কারিগর ছিলেন কিংবদন্তি সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটি ছিল অত্যন্ত গভীর এবং ব্যক্তিগত। মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের জীবনভিত্তিক উপন্যাস 'কিংবদন্তির কথা বলছি' বইতে বর্ণিত একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সম্পর্কের টান এবং আদর্শিক ভিন্নতার ঊর্ধ্বে মানুষ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর মহানুভবতা ও পিতৃভক্তির কথা। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা সেই ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপট, মাসিক মদীনার সংগ্রাম এবং বঙ্গবন্ধু ও মাওলানার অম্লান বন্ধুত্বের গভীরতা নিয়ে আলোকপাত করব।
বাংলাদেশে ইসলামী রেনেসাঁ বা জাগরণে যে কটি পত্রিকা মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে, 'মাসিক মদীনা' তার অগ্রগণ্য। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান এই পত্রিকার মাধ্যমে ইসলামের শাশ্বত বাণীকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। কিন্তু সত্তরের দশকের উত্তাল দিনগুলোতে এই পত্রিকার পথচলা সহজ ছিল না। বিশেষ করে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা জটিলতায় পত্রিকাটির প্রকাশনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিল। সেই সংকটে যে মানুষটি ত্রাণকর্তা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি আর কেউ নন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তবে এই সহযোগিতার নেপথ্যে ছিল বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুৎফুর রহমানের একটি অসাধারণ চিঠি।
শেখ লুৎফুর রহমানের চিঠির নেপথ্য কথা
গল্পের শুরু ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়ায়। বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফুর রহমান ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক এবং জ্ঞানানুরাগী মানুষ। বৃদ্ধ বয়সে তাঁর অবসরের প্রধান সঙ্গী ছিল বই এবং পত্রিকা। এর মধ্যে 'মাসিক মদীনা' ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। তিনি এই পত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন। কিন্তু একবার তিন মাসের বকেয়া জমে যাওয়ার কারণে নিয়ম অনুযায়ী পত্রিকা পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়।
প্রিয় পত্রিকা পড়তে না পেরে বিচলিত হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধুর বৃদ্ধ বাবা। তিনি সরাসরি পত্রিকার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খানকে একটি চিঠি লিখেন। চিঠির ভাষা ছিল অত্যন্ত বিনয়ী অথচ দৃঢ়। তিনি লিখেছিলেন:
"শ্রদ্ধেয় সম্পাদক সাহেব,
সালাম নিবেন। আমি 'মাসিক মদীনা'র একজন নিয়মিত গ্রাহক। গত দু'মাস ধরে পত্রিকা আসছে না। তিন মাসের বকেয়া ছিল বলে হয়তো আপনি বন্ধ করে দিয়েছেন। আমি মুজিবকে চিঠি লিখে বলে দেবো, সে যেন আপনার টাকা পরিশোধ করে দেয়। আমি বৃদ্ধ মানুষ, প্রিয় মদীনা পত্রিকা ছাড়া সময় কাটানো কষ্টকর।
ইতি
শেখ লুৎফুর রহমান
টুঙ্গিপাড়া, ফরিদপুর।"
এই একটি চিঠিতেই ফুটে ওঠে একজন বাবার সন্তানের প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং জ্ঞানের প্রতি তাঁর তৃষ্ণা। তিনি জানতেন, তাঁর ছেলে 'মুজিব' এখন দেশের সর্বোচ্চ শিখরে, কিন্তু বাবার ব্যক্তিগত শখের মর্যাদা দিতে সে কখনো কুণ্ঠাবোধ করবে না।
বঙ্গভবনে বঙ্গবন্ধু ও মাওলানা মুহিউদ্দীন খান
চিঠিটি হাতে পাওয়া মাত্রই মাওলানা মুহিউদ্দীন খান আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি জানতেন বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর সম্পর্কটি কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি 'তুই-তোকারি'র পর্যায়ের গভীর বন্ধুত্ব। তখন বাংলাদেশের তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে মাসিক মদীনার ডিক্লারেশন বা প্রকাশনার অনুমতি বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। পত্রিকা বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি সেই চিঠিটি পকেটে নিয়ে বঙ্গভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যান।
বঙ্গবন্ধু তখন দেশের রাষ্ট্রপতি। চারদিকে ব্যস্ততা, নিরাপত্তার কড়াকড়ি। কিন্তু মুহিউদ্দীন খানকে দেখামাত্রই বঙ্গবন্ধু তাঁর সেই চিরচেনা ভরাট কণ্ঠে বলে উঠলেন, "তুই এতোদিন পর আমাকে দেখতে এলি! এখানে বসার পর সবাই যেন দূরে চলে গেছে। পর হয়ে গেছে।" বঙ্গবন্ধুর এই কথায় ক্ষমতার শীর্ষে থাকা একজন মানুষের একাকীত্ব এবং পুরনো বন্ধুর প্রতি তাঁর হৃদয়ের টান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ডিক্লারেশন বাতিল ও বঙ্গবন্ধুর বিস্ময়
কথায় কথায় মাওলানা মুহিউদ্দীন খান তাঁর সমস্যার কথা জানালেন। তিনি বললেন যে, তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে তাঁর পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত অবাক হলেন। তিনি জানতেন মাওলানা মুহিউদ্দীন খান একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ। বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করলেন, "তুই তো রাজাকার ছিলি না, তবে তোর পত্রিকা কেন বন্ধ করবে?" বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিক তাঁর পিএসকে নির্দেশ দিলেন তথ্য সচিবকে কল করার জন্য। তিনি কোনোভাবেই চাননি কোনো অন্যায় হস্তক্ষেপের কারণে একটি মানসম্মত পত্রিকার কণ্ঠরোধ করা হোক। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, বঙ্গবন্ধু মুক্তবুদ্ধি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, বিশেষ করে যখন সেই সাংবাদিক বা সম্পাদক ছিলেন তাঁর ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত।
বাবার হাতের লেখা ও বঙ্গবন্ধুর অশ্রু
ঠিক সেই মুহূর্তে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান তাঁর পাঞ্জাবির পকেট থেকে শেখ লুৎফুর রহমানের সেই চিঠিটি বের করে বঙ্গবন্ধুর হাতে দিলেন। বাবার হাতের পরিচিত অক্ষরগুলো দেখামাত্রই বঙ্গবন্ধুর চেহারা পাল্টে গেল। তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে চিঠিটি পড়লেন।
বাবার মৃত্যুর পর তাঁর শেষ ইচ্ছা বা শেষ আকাঙ্ক্ষার কথা জানতে পেরে বঙ্গবন্ধুর চোখ ছলছল করে উঠল। চিঠিতে বাবা লিখেছিলেন, তিনি প্রিয় মদীনা পত্রিকা ছাড়া থাকতে পারছেন না। বঙ্গবন্ধু তখন কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি মুহিউদ্দীন খানকে জড়িয়ে ধরে শিশুসুলভ আবেগ নিয়ে বলতে লাগলেন, "তুই আমার কাছে আরও আগে কেন আসলি না! আজ আমার বাবা দুনিয়াতে নেই।" উল্লেখ্য যে, ওই সময়কার কিছুদিন আগেই শেখ লুৎফুর রহমান ইন্তেকাল করেছিলেন। বাবার প্রতি বঙ্গবন্ধুর এই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ইতিহাসের এক অনন্য দলিল হয়ে আছে।
মাসিক মদীনার পুনর্জাগরণ ও উত্তরাধিকার
বঙ্গবন্ধুর সরাসরি হস্তক্ষেপে মাসিক মদীনার ডিক্লারেশন ফিরিয়ে দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, কোনো অবস্থাতেই এই ইসলামী পত্রিকা বন্ধ করা যাবে না। এরপর থেকে মাসিক মদীনা আর কখনো থামেনি। মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের সুযোগ্য সম্পাদনায় এই পত্রিকা কেবল বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বের বাংলাভাষী মুসলিমদের কাছে এক নির্ভরতার নাম হয়ে ওঠে।
মাওলানা মুহিউদ্দীন খান কেবল একজন সম্পাদক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সীরাত সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ। তাঁর এই 'মাসিক মদীনা'র মাধ্যমেই বাংলা ভাষায় অনেক প্রথিতযশা লেখকের জন্ম হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সেই উদারতা এবং শেখ লুৎফুর রহমানের সেই সামান্য কয়েক টাকার বকেয়া পরিশোধের অঙ্গীকার আজ বাংলাদেশের ইসলামী সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি রূপকথার মতো মনে হয়।
মানবিক সম্পর্কের জয়গান
'কিংবদন্তির কথা বলছি' বইতে বর্ণিত এই ঘটনাটি আমাদের শেখায় যে, রাজনৈতিক আদর্শ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাবোধ এবং মানবিক সম্পর্ক সবকিছুর ঊর্ধ্বে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের এই স্মৃতিময় কথোপকথন আমাদের দেখায় এক মানবিক বঙ্গবন্ধুকে, যিনি রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তাঁর পিতার একজন সাধারণ গ্রাহক সত্তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। মাসিক মদীনার প্রতিটি পাতায় আজও সেই সত্য ও সুন্দরের বার্তা প্রতিধ্বনিত হয়, যার পথ একদিন প্রশস্ত হয়েছিল এক মহান নেতার মহানুভবতায়।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.














