শহীদ মাওলানা অলিউর রহমান – স্রোতের বিপরীতে এক আলেমের আত্মত্যাগ
যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার আল-বদররা 'এক ইসলাম এক পাকিস্তান' ধারণার পক্ষে ইসলামকে অপব্যবহার করছিল, তখন এই আলেমই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাঙালির মুক্তির সনদ ৬-দফাকে ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ প্রমাণ করে ফতোয়াবাজদের মোকাবিলা করেছিলেন। সেই সাহসিকতার চরম মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর, যখন তিনি আল-বদরদের হাতে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন।

TruthBangla
Nov 24, 2025
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল রণাঙ্গনের বীরত্বগাথা নয়, এটি বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম এবং আদর্শিক ত্যাগেরও এক মহাকাব্য। সেই সংগ্রামের অন্যতম সাহসী সৈনিক ছিলেন মাওলানা অলিউর রহমান - যিনি ছিলেন ইসলামী পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ, লেখক এবং একজন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার আল-বদররা 'এক ইসলাম এক পাকিস্তান' ধারণার পক্ষে ইসলামকে অপব্যবহার করছিল, তখন এই আলেমই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাঙালির মুক্তির সনদ ৬-দফাকে ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ প্রমাণ করে ফতোয়াবাজদের মোকাবিলা করেছিলেন। সেই সাহসিকতার চরম মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর, যখন তিনি আল-বদরদের হাতে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন।
নীরব ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া এক শহীদ মাওলানা
বাংলাদেশের আলেম সমাজে আজ দেশি-বিদেশি নানা প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বের আলোচনা হলেও, দুঃখজনকভাবে শহীদ বুদ্ধিজীবী মাওলানা অলিউর রহমানের নাম খুব কমই উচ্চারিত হয়। অথচ তিনি এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে জাতিকে পথ দেখিয়েছিলেন, যখন ভুল ব্যাখ্যার ধর্ম দিয়ে বাঙালির মুক্তির আন্দোলনকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছিল।
মাওলানা অলিউর রহমান শুধু একজন ইসলামী পণ্ডিত ছিলেন না; তিনি ছিলেন জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের একজন সম্মুখ সারির যোদ্ধা, যিনি কলম এবং সাংগঠনিক শক্তি - উভয় দিয়েই পাকিস্তানিদের ঔপনিবেশিক নীতি এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের ধর্মীয় ফতোয়াবাজির মোকাবিলা করেছিলেন। আমাদের ইতিহাসের এই অনুকরণীয় শহীদকে স্মরণ করা আজ অত্যন্ত জরুরি।
জীবন ও কর্ম – শিক্ষাবিদ থেকে সমাজ সংস্কারক
মাওলানা অলিউর রহমান ১৯১৬ সালে সিলেট জেলার কানাইঘাটের বটাইল গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত বাঙালি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষা এবং কর্মজীবন ছিল জ্ঞানচর্চা ও সমাজসেবার প্রতি নিবেদিত।

শিক্ষা ও অধ্যাপনা: তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত ইসলামী পণ্ডিত ছিলেন। তিনি দীর্ঘকাল উমরগঞ্জ ইমদাদুল উলুম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হিসেবেও এলাকার মানুষের সেবা করতেন।
চিন্তাবিদ ও লেখক: তাঁর ছিল প্রখর রচনার ক্ষমতা। তিনি কেবল মাদ্রাসার পাঠ্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়েও লেখালেখি করতেন।
নারী শিক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা – মুসলিম সমাজে এক পথিকৃৎ
মাওলানা অলিউর রহমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অবদানগুলির মধ্যে অন্যতম হলো নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর ভূমিকা, যা তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে ছিল এক বৈপ্লবিক উদ্যোগ।
মুসলিম মহিলাদের মাদ্রাসা শিক্ষার পথিকৃৎ: বাংলাদেশে মুসলিম মহিলাদের মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁকে অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, ইসলামের সঠিক জ্ঞান অর্জনের জন্য নারীদেরও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থাকা আবশ্যক।
মহিলা ওয়াজ মাহফিলের প্রবর্তন: তিনি কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং মহিলা জলসা বা ইসলামী মহিলা ওয়াজ মাহফিলের প্রবর্তন করেন। এর মাধ্যমে তিনি নারীদের জন্য ধর্মীয় জ্ঞান লাভ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন।
উল্লেখযোগ্য রচনাবলী: নারী শিক্ষা বিষয়ক তাঁর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই আজও তাঁর দূরদর্শিতার সাক্ষ্য বহন করে। এর মধ্যে ‘Islahun Neswan’, ‘Taharatun Neswan’ এবং ‘Talimun Neswan’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই কাজগুলো প্রমাণ করে, তিনি ধর্মের সঙ্গে আধুনিক সমাজের চাহিদার সমন্বয় ঘটাতে আগ্রহী ছিলেন।
রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ৬-দফার পক্ষে ফতোয়াবাজির জবাব
মাওলানা অলিউর রহমান তাঁর রাজনৈতিক জীবনে প্রথমে কিছুটা রক্ষণশীল দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, ষাটের দশকে বাঙালি জাতির মুক্তির পথ স্পষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁর আদর্শিক অবস্থান পরিবর্তন করেন।
আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন ও সংগঠক
প্রথমে তিনি পাকিস্তান মুসলিম লীগ এবং পরে নেজাম-ই-ইসলাম পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে তিনি বাঙালির ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানান।
আদর্শিক পরিবর্তন: এই সমর্থন ছিল তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ধর্মের নামে পাকিস্তানি শাসকরা যে শোষণ চালাচ্ছে, তার থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো বাঙালির অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন।
আওয়ামী ওলামা পার্টি গঠন: তিনি আলেমদের মধ্যে বাঙালির অধিকার আন্দোলন, বিশেষ করে ছয় দফার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। এ লক্ষ্যে তিনি "আওয়ামী ওলামা পার্টি" গঠন করেন এবং এর মাধ্যমে আলেম সমাজকে স্বাধীনতার পক্ষে সংগঠিত করেন।
‘ইসলামের দৃষ্টিতে ছয় দফা’ – কালজয়ী গ্রন্থ
ছয় দফা ঘোষণার পর, যখন পাকিস্তানের মদদপুষ্ট কিছু মৌলবাদী আলেম ও মোল্লারা এটিকে ‘ইসলামবিরোধী’ বলে ফতোয়া দিতে শুরু করে এবং এটিকে ‘পাকিস্তানের ঐক্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ বলে প্রচার করতে থাকে, তখন মাওলানা অলিউর রহমান এক চরম ঝুঁকি নিয়ে সেই ফতোয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়ান।
স্রোতের বিপরীতে: তিনি সেই সময়েই ‘ইসলামের দৃষ্টিতে ছয় দফা’ শীর্ষক একটি বই লেখেন। এই গ্রন্থে তিনি অত্যন্ত যুক্তিনির্ভরভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, ছয় দফা কেবল বাঙালির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারের সনদ নয়, বরং এটি ইসলামে বর্ণিত ন্যায়বিচার ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আদর্শের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর: এই বইটি এবং তাঁর সাংগঠনিক প্রচেষ্টা তাঁকে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচরে পরিণত করে। তিনি আলেমদের নিয়ে ছয় দফার পক্ষে সভা-সমাবেশের আয়োজন করেন, যেখানে বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রধান অতিথি।
মাওলানা অলিউর রহমানের এই পদক্ষেপ ছিল সেই সময়ের জন্য একটি বৈপ্লবিক কাজ। তিনি প্রমাণ করেন, বাঙালির অধিকারের আন্দোলন কোনোভাবেই ইসলামবিরোধী নয়। এই সাহসী ভূমিকা তাঁকে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং তাদের এদেশীয় দালালদের চরম বিদ্বেষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
শাহাদাত বরণ – ১৪ ডিসেম্বরের নির্মম বলি
মাওলানা অলিউর রহমানের মতো বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক নেতারাই ছিলেন আল-বদর এবং পাকিস্তানি বাহিনীর মূল লক্ষ্যবস্তু। কারণ, তাঁরা শুধু অস্ত্র দিয়ে নয়, চিন্তা ও যুক্তি দিয়েও দখলদার বাহিনীর ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছিলেন।
আল-বদরদের হাতে অপহরণ
অপহরণ: ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর, যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে জাতি, ঠিক তখনই ঢাকার লালবাগ এলাকা থেকে আল-বদররা তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। এই অপহরণের মূল কারণ ছিল তাঁর ‘ইসলামের দৃষ্টিতে ছয় দফা’ বইটি এবং ৬-দফার পক্ষে আলেম সমাজকে সংগঠিত করার অপরাধ।
অমানুষিক নির্যাতন: বিজয়ের প্রাক্কালে আল-বদররা বুঝতে পেরেছিল যে তাদের পরাজয় নিশ্চিত। তাই তারা শেষ মুহূর্তে দেশের সেরা সন্তানদের হত্যা করে জাতিকে মেধাশূন্য করতে চেয়েছিল। তিন দিনের দীর্ঘ সময় তাঁকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়।
রায়াবাজার বধ্যভূমিতে শাহাদাত
মৃত্যু: দীর্ঘ নির্যাতনের পর, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১, মাওলানা অলিউর রহমানকে রায়াবাজার বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করা হয়। এই দিনটিকেই বাংলাদেশ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করে।
প্রথম তালিকায় অন্তর্ভুক্তি: ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রথম তালিকায় তাঁর নাম সসম্মানে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মাওলানা অলিউর রহমান যে মূল্য চুকিয়েছিলেন, তা হলো তাঁর আপোষহীন আদর্শের মূল্য। তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে গেলেন যে, ইসলামের নামে শোষণ, অন্যায় ও স্বৈরাচারকে যারা জায়েজ করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে কলম ও কণ্ঠস্বর তুলে ধরা ইসলামেরই শিক্ষা।
আমাদের অনুকরণীয় শহীদ
শহীদ মাওলানা অলিউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি দেখিয়েছেন কীভাবে একজন ধর্মীয় নেতা হয়েও সময়ের প্রয়োজনে প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শ গ্রহণ করা যায়।
আদর্শিক মেরুকরণ: আজ যখন দেশের ওয়াজ মাহফিল বা ধর্মীয় আলোচনায় পাকিস্তানের দালাল মোল্লাদের কথা না বলেও অনেক দেশি-বিদেশি বড় বড় হুজুরের কথা শোনা যায়, তখন মাওলানা অলিউর রহমানের নাম অনুপস্থিত থাকাটা এক গভীর আফসোসের বিষয়। এই অনুপস্থিতি আমাদের দেশের ধর্মীয় নেতৃত্বের আদর্শিক মেরুকরণের দুর্বলতাকেই তুলে ধরে।
অনুপ্রেরণার উৎস: মাওলানা অলিউর রহমান আমাদের সেই সত্যটি মনে করিয়ে দেন যে, পাকিস্তানের দালাল মোল্লারা নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধে শহীদ এই আলেমই আমাদের অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় - নারী শিক্ষা, ন্যায়বিচার, এবং স্বাধীনতার সংগ্রামই একজন প্রকৃত মুসলমানের দায়িত্ব।
উপসংহার
মাওলানা অলিউর রহমানের মতো শহীদ বুদ্ধিজীবীদের জীবন ও আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া অপরিহার্য, যেন তারা বুঝতে পারে - স্বাধীনতা এবং ইসলাম দুটোই সহাবস্থান করতে পারে এবং ধর্মকে ব্যবহার করে যারা শোষণ করতে চেয়েছিল, তারা ছিল আমাদের জাতির শত্রু। তাঁর আদর্শিক সংগ্রামই প্রমাণ করে, বাঙালি আলেমের কাছে মাতৃভূমির অধিকার রক্ষা ছিল ঈমানেরই অংশ।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















