দেশের একমাত্র শহীদ মিনার যার নিচে গণকবর - ঝালকাঠির 'মাইলাই'
১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দক্ষিণবঙ্গের ঝালকাঠি শহর এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় যে গণহত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তার বর্বরতা ভিয়েতনামের কুখ্যাত মাইলাই গণহত্যার ঘটনাকেও হার মানিয়ে দেয়। দেশের একমাত্র শহীদ মিনার, যার নিচে ঘুমিয়ে আছে দুই শতাধিক শহীদের গণকবর।

TruthBangla
Dec 9, 2025
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রক্ত, ত্যাগ এবং বীরত্বের মহাকাব্য। কিন্তু এই মহাকাব্যের প্রতিটি পাতায় লুকিয়ে আছে এমন কিছু নৃশংসতার চিহ্ন, যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে গভীর কলঙ্ক। ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দক্ষিণবঙ্গের ঝালকাঠি শহর এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় যে গণহত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তার বর্বরতা ভিয়েতনামের কুখ্যাত মাইলাই গণহত্যার ঘটনাকেও হার মানিয়ে দেয়। ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীর পাড়ে সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটার পর বিজয়ের চিহ্ন হিসেবে নির্মিত হয়েছে এক নীরব সাক্ষী, যা দেশের আর কোনো শহীদ মিনারের নেই, দেশের একমাত্র শহীদ মিনার, যার নিচে ঘুমিয়ে আছে দুই শতাধিক শহীদের গণকবর।
একাত্তরের ঝালকাঠি - বর্বরতার নতুন সংজ্ঞা
ভিয়েতনামের মাইলাই গ্রামে ১৯৬৮ সালের ১৬ মার্চ মার্কিন সেনারা একদিনে ৫০৪ জন নারী-পুরুষকে হত্যা করেছিল। বিশ্বজুড়ে এই ঘটনা ঘৃণার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত ঝালকাঠি গণহত্যা ছিল সুপরিকল্পিত জাতিগত নির্মূল এবং মানবিক মূল্যবোধের চরম অবমাননা।
ঝালকাঠির ট্র্যাজেডি: ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পুরো ঝালকাঠিকে নরকে পরিণত করেছিল। হিন্দু অধ্যুষিত এই শহরে আগুন দেওয়া থেকে শুরু করে ঝালকাঠি ও নলছিটির বিভিন্ন এলাকায় চলেছিল ধারাবাহিক গণহত্যাযজ্ঞ।
ইতিহাসের নীরবতা: এই নৃশংসতার বিস্তারিত তথ্য ও প্রেক্ষাপট অনেক সময় মূলধারার আলোচনায় কম স্থান পায়। এই প্রবন্ধটি ঝালকাঠির সেই অন্ধকার অধ্যায়, গণহত্যার ভয়াবহতা এবং এর একমাত্র জীবিত সাক্ষীর করুণ গল্প তুলে ধরবে।

স্বাধীনতার পর ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীর পাড়ের গণকবর।
ঝালকাঠিতে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রবেশ ও বর্বরতা
২৫ মার্চ 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর পর দেশের অন্যান্য অংশের মতো ঝালকাঠিতেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্রুত তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। বরিশাল ও ঝালকাঠি অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং হিন্দু জনগোষ্ঠীর অধিক উপস্থিতি এই অঞ্চলকে হানাদার বাহিনীর জন্য এক সহজ শিকারে পরিণত করে।
জাতিগত নিধনযজ্ঞ
পাকিস্তানি সেনারা ঝালকাঠিতে পা রাখার পর থেকেই মূলত জাতিগত নিধনযজ্ঞ শুরু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট: হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের নির্মূল করা এবং স্থানীয় বাঙালিদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করা।
অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংস: এপ্রিলের শুরু থেকেই ঝালকাঠি শহরে লাগাতার অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ চালানো হয়। বসতবাড়ি, দোকানপাট এবং জনবসতি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, যা শহরটিকে দ্রুত ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।
অন্যান্য স্থানের মতো এখানেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী স্থানীয় দালাল ও রাজাকারদের ব্যবহার করে। তারা হিন্দুদের বাড়িঘর চিহ্নিত করে এবং তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করে।
কুখ্যাত মাইলাইয়ের সঙ্গে তুলনা
১৯৭১ সালে ৯ নম্বর সেক্টর থেকে প্রকাশিত 'বিপ্লবী বাংলাদেশ' পত্রিকায় এই হত্যাকাণ্ডের কথা উঠে এসেছিল। লেখাটির শিরোনাম ছিল 'ঝালকাঠি না মাইলাই!' এই তুলনাটিই প্রমাণ করে, ঝালকাঠিতে হওয়া গণহত্যার মাত্রা কতটা ভয়াবহ ও আন্তর্জাতিক মানের বর্বর ছিল।
সুগন্ধা নদীর পাড়ের সেই কালরাত - ৩০ মে, ১৯৭১
ঝালকাঠির ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার দিনগুলোর একটি হলো ১৯৭১ সালের ৩০ মে। এই দিন সুগন্ধা নদীর পাড়ে ঘটে যাওয়া গণহত্যাটি ছিল সুপরিকল্পিত ও ঠান্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড।
নিরীহ মানুষের জিম্মি দশা
ঐ দিন পাকিস্তানি সেনারা ঝালকাঠি শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে নিরীহ, নিরস্ত্র সাধারণ মানুষদের ধরে নিয়ে আসে। এর মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন হিন্দু ধর্মালম্বী মানুষ।
মোট ১৯৬ জন মানুষকে সুগন্ধা নদীর পাড়ে দাঁড় করানো হয়েছিল। সংখ্যাটি নিশ্চিত করে দেয়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং ছিল একটি গণহত্যামূলক সামরিক অভিযান।
ধর্মীয় বিভাজনের মিথ্যাচার
এই ১৯৫ জন হিন্দু ধর্মালম্বীর সাথে মাত্র ১ জন মুসলমানও ছিলেন, যিনি সম্ভবত স্থানীয় অধিবাসী ছিলেন অথবা পরিস্থিতিগত কারণে সেখানে ধরা পড়েছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী যদিও ধর্মকে বিভেদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত, কিন্তু গণহত্যার ক্ষেত্রে তারাও শেষ পর্যন্ত ধর্মের গণ্ডি মানেনি এই ঘটনাটি তার প্রমাণ।
চারজন করে হত্যা
সামরিক নির্দেশে এই ১৯৬ জন মানুষকেই ৪ জন করে দলে ভাগ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। প্রতিটি দল ধরে ধরে গুলি করে নদীর পাড়ে ফেলে দেওয়া হয়।
এই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন এবং Execution-এর পদ্ধতি প্রমাণ করে, এটি ছিল আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য পরিকল্পিত এক সামরিক কৌশল।
অমল কংশবণিক - একাকী সাক্ষী ও জীবন্ত ইতিহাস
১৯৬ জন মানুষের মধ্যে ভাগ্যক্রমে বা অলৌকিকভাবে মাত্র একজন মানুষ সেই গণহত্যা থেকে বেঁচে ফিরে আসেন। তিনি হলেন অমল কংশবণিক।
তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। এত অল্প বয়সে দেখা সেই বিভীষিকা সারাজীবনের জন্য তাঁর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। তিনি আজও সেই ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে বেঁচে আছেন।
অমল কংশবণিক তার বেঁচে ফেরার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান, হত্যাকাণ্ড চলাকালীন হুট করে এক পাকিস্তানি সৈন্যর মায়া হওয়ায় তাকে ছেড়ে দেয় সে।
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর চরম বর্বরতার মাঝেও একজন সৈন্যের এই মানবিক সিদ্ধান্ত হয়তো অমলের জীবন রক্ষা করেছিল। এটি প্রমাণ করে, সকল পাকিস্তানিই হয়তো একরকম ছিল না, তবে বাহিনীর কমান্ড ছিল চরম নৃশংসতার পক্ষে।
ইতিহাসের ধারক: অমল কংশবণিক কেবল একজন বেঁচে যাওয়া মানুষ নন, তিনি এই গণহত্যার জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর সাক্ষ্যই নিশ্চিত করেছে, সেই গণহত্যার ভয়াবহতা এবং হতাহতের সঠিক সংখ্যা।
বিজয়ের পর গণকবর ও মাথার খুলি আবিষ্কার
বিজয়ের আনন্দ আসার পর পরই ঝালকাঠির মানুষ সেই ভয়াবহ অতীতের চিহ্নগুলো খুঁজে বের করতে শুরু করে।
বিজয়ের এক বছর পর, ১৯৭২ সালে, সুগন্ধা নদীর পাড়ে সেই হত্যাকাণ্ডের স্থানটিতে খননকাজ শুরু হয়।
দুই শতাধিক খুলি: সেই গণকবর থেকে প্রায় ২০০ মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়। এই সংখ্যাটি ৩০ মে'র হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা এবং সেদিন যারা সেখানে শহীদ হয়েছিলেন, তাদের প্রায় সঠিক সংখ্যাকে নির্দেশ করে।
প্রমাণ: খুলিগুলো ছিল সেই বর্বর হত্যাকাণ্ডের অকাট্য প্রমাণ, যা ইতিহাসের পাতায় চিরদিনের জন্য ঝালকাঠি গণহত্যার সাক্ষ্য হয়ে রইল।
এই গণকবর উন্মোচিত হওয়ার পর সেই শহীদেরা জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি পান। তাঁদের আত্মত্যাগ যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে থাকে, সেই উদ্দেশ্যে নেওয়া হয় উদ্যোগ।
দেশের একমাত্র শহীদ মিনার যার নিচে গণকবর
ঐতিহাসিক ৩০ মে’র হত্যাকাণ্ডের স্থানটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এবং নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেখানেই একটি শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এই শহীদ মিনারটি বাংলাদেশের অন্যান্য শহীদ মিনার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং ব্যতিক্রমী।
গণকবর: এটিই দেশের একমাত্র শহীদ মিনার, যার ঠিক নিচে শুয়ে আছে গণহত্যার শিকার হওয়া দুই শতাধিক শহীদের গণকবর।
প্রতীক: এই স্থাপনাটি কেবল একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়, এটি বধ্যভূমি এবং স্মৃতিস্তম্ভের এক মর্মস্পর্শী সমন্বয়। প্রতি বছর বিশেষ দিনে এখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর সময় মানুষ জানে, তারা একটি পবিত্র কবরের ওপর দাঁড়িয়ে শহীদদের স্মরণ করছে।
এই শহীদ মিনারটি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে একটি নীরব বার্তা দেয়: স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে কত বড় মূল্য দিয়ে, এবং এই মাটিতে মিশে আছে সেইসব নিরপরাধ মানুষের রক্ত, যাদের একমাত্র অপরাধ ছিল তারা ছিল বাঙালি এবং হিন্দু ধর্মালম্বী। এই স্থাপনাটি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
ইতিহাসকে ভুলে না যাওয়ার শপথ
ঝালকাঠির এই গণহত্যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সেই অনালোচিত অধ্যায়গুলোকে তুলে ধরে, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসরদের বর্বরতা কত গভীরে প্রোথিত ছিল।
অমল কংশবণিক-এর মতো জীবন্ত সাক্ষীদের মাধ্যমে আমরা সেই ইতিহাসকে ভুলে না যাওয়ার শপথ নিতে পারি। তাঁদের জীবনের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য এক ঐতিহাসিক দায়। ঝালকাঠির শহীদ মিনার, তার নিচে থাকা গণকবর নিয়ে, কেবল স্থানীয় ইতিহাস নয়, বরং এটি জাতীয় ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি আমাদের শেখায়, স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে জাতি, ধর্ম, নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি।
ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীর পাড়ের সেই নীরব শহীদ মিনার আজও দাঁড়িয়ে আছে, দুই শতাধিক শহীদের আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে, যা আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়, আমাদের স্বাধীনতা রক্তের দামে কেনা এক পবিত্র আমানত।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.















