>
>
ফরাসি বীর জ্যাঁ কুয়ে – একাত্তরে বাংলাদেশের জন্য বিমান ছিনতাই করেছিলেন যিনি
ফরাসি বীর জ্যাঁ কুয়ে – একাত্তরে বাংলাদেশের জন্য বিমান ছিনতাই করেছিলেন যিনি
১৯৭১ সালের 'মুক্তিযুদ্ধ' কীভাবে কেবল বাঙালির রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম থাকেনি, বরং তা পরিণত হয়েছিল পুরো বিশ্বমানবতার এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষায়, তার অন্যতম প্রামাণ্য নজির তৈরি করে গেছেন এক ফরাসি যুবক। ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর, রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত ও শেষ লগ্নে, যখন চারদিকে কামান ও বিমান আক্রমণের গর্জন, তখন ফ্রান্সের প্যারিসে এক অভূতপূর্ব ও অকল্পনীয় ঘটনা ঘটেছিল। তৎকালীন পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারওয়েজ (পিআইএ)-এর একটি বিশাল যাত্রীবাহী বিমান একক সাহসিকতায় ছিনতাই করেছিলেন ৩৮ বছর বয়সী ফরাসি নাগরিক জ্যাঁ কুয়ে (Jean Kay)।

TruthBangla

যারা একাত্তরের গৌরবোজ্জ্বল ও রক্তস্নাত ইতিহাসকে কেবল একটি আঞ্চলিক বিরোধ বা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ফ্রেমে বন্দি করে রাখতে চায়, যারা মুক্তিযুদ্ধের সর্বজনীন মানবিক আবেদনকে অস্বীকার করতে চায় তাদের সামনে ইতিহাস থেকে উচ্চকিত কণ্ঠে তুলে ধরা প্রয়োজন ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা। ১৯৭১ সালের 'মুক্তিযুদ্ধ' কীভাবে কেবল বাঙালির রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম থাকেনি, বরং তা পরিণত হয়েছিল পুরো বিশ্বমানবতার এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষায়, তার অন্যতম প্রামাণ্য নজির তৈরি করে গেছেন এক ফরাসি যুবক।
১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর, রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত ও শেষ লগ্নে, যখন চারদিকে কামান ও বিমান আক্রমণের গর্জন, তখন ফ্রান্সের প্যারিসে এক অভূতপূর্ব ও অকল্পনীয় ঘটনা ঘটেছিল। তৎকালীন পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারওয়েজ (পিআইএ)-এর একটি বিশাল যাত্রীবাহী বিমান একক সাহসিকতায় ছিনতাই করেছিলেন ৩৮ বছর বয়সী ফরাসি নাগরিক জ্যাঁ কুয়ে (Jean Kay)।
প্যারিসের ওর্লি বিমানবন্দরে পিআইএ-এর বোয়িং ৭২০বি বিমানে উঠে ককপিটের দখল নিয়েছিলেন তিনি। তবে কোনো অর্থ, মুক্তিপণ বা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়; তাঁর দাবি ছিল মাত্র একটি ছিনতাইকৃত বিমানের বিনিময়ে ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তে মানবেতর দিন কাটানো অসহায় বাঙালি শরণার্থীদের জন্য দিতে হবে ২০ টন প্রয়োজনীয় ওষুধ, উচ্চমানের মেডিকেল সরঞ্জাম ও জরুরি খাদ্যসাহায্য।
বিশ্বের বিমান ছিনতাইয়ের ইতিহাসে তো বটেই, বরং সমগ্র মানবজাতি ও বিশ্বজনমতের ইতিহাসে জ্যাঁ কুয়ের এই অসমসাহসী দুঃঅপারেশন এক চিরস্মরণীয় ও অনন্য মাইলফলক হয়ে রয়েছে। নিচে ১৯৭১ সালের রক্তঝরা ব্যাকগ্রাউন্ড, জ্যাঁ কুয়ের মনস্তত্ত্ব, ওর্লি বিমানবন্দর ট্র্যাজেডি, নাটকীয় আত্মসমর্পণ এবং বিশ্বমানবতার দরবারে এর চিরন্তন প্রভাব বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করা হলো।
মানবিকতার বিস্ফোরণ ও একাত্তরের বিশ্বজনীনতা
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তঝরা দিনগুলোতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং ভারত সীমান্তে আশ্রয় নেওয়া কোটি মানুষের জীবন বাঁচানো কেবল একটি আঞ্চলিক বিষয় ছিল না। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে শুরু হওয়া 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর গণহত্যা, বাড়িঘর পোড়ানো এবং নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে এক কোটিরও বেশি বাঙালি প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল।
পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয় এবং আসামের বিভিন্ন প্লাবিত ও কাদা-মাটিতে ঘেরা শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ শিশু, নারী ও বৃদ্ধ কলেরার প্রাদুর্ভাব, ডায়রিয়া, তীব্র খাদ্যাভাব এবং শীতের কামড়ে অকাতরে প্রাণ হারাচ্ছিলেন। এই হৃদয়বিদারক মানবিক বিপর্যয় তৎকালীন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রচারিত হতে থাকলে বিশ্বজুড়ে এক নৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বসে জ্যাঁ কুয়ে নামের একজন সাধারণ ফরাসি নাগরিক যখন খবরের কাগজ ও টিভিতে ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে মা-বোনের আর্তনাদ ও নিষ্পাপ শিশুদের মরদেহের ছবি দেখছিলেন, তখন তাঁর বুকের ভেতর বিশ্ববিবেকের এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, মানুষের দুঃখ-কষ্টের কোনো জাতীয়তা, ভৌগোলিক সীমানা বা রাজনৈতিক আদর্শের সীমা থাকে না। হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব সত্ত্বেও, এক অজানা ও অচেনা পরাধীন জাতির জন্য তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজের জীবন ও স্বাধীনতা বাজি রাখার।
একাত্তরের ভয়াবহ প্রেক্ষাপট: যখন বিশ্ববিবেক জাগ্রত হচ্ছিল
১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি বাহিনী যা ঘটিয়েছিল, তা আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম নিকৃষ্ট গণহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত। এই সময়ের তিনটি প্রধান প্রেক্ষাপট জ্যাঁ কুয়ের মতো সংবেদনশীল ও বিপ্লবী চেতনার মানুষকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল:
শরণার্থীদের ঢল ও চরম স্বাস্থ্য সংকট: ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলোতে আশ্রয় নেওয়া এক কোটি শরণার্থীর সামনে সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিল অনাহার ও কোলেরা মহামারী। প্রতিদিন শত শত মানুষ ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে মারা যাচ্ছিল। রেডক্রস এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো যে ত্রাণ পাঠাচ্ছিল, তা ছিল বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
বিশ্ব গণমাধ্যমের সাহসী বস্তুনিষ্ঠতা: ডেইলি টেলিগ্রাফের সাংবাদিক সাইমন ড্রিং, সাইপ্রাসের প্রখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস (যাঁর ‘দ্য রেপ অব বাংলাদেশ’ বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল) এবং চিত্রসাংবাদিকদের বিশ্বস্ত ক্যামেরা বিশ্বের ঘরে ঘরে গণহত্যার নগ্ন সত্য পৌঁছে দিয়েছিল। এই প্রতিবেদনগুলো ইউরোপের স্বাধীনচেতা যুবকদের মনে তীব্র ক্ষোভ, বেদনা ও হতাশার সৃষ্টি করে। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, সাধারণ সভা-সমাবেশ বা সুশীল কূটনৈতিক চাপ এই সামরিক দানবকে থামানোর জন্য যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন কোনো অভাবনীয় সোচ্চার প্রতিবাদ।
যৌথ বাহিনীর অভিযান ও আন্তর্জাতিক ক্ষণগণনা: ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর বিকেলের পর থেকেই পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতের একাধিক বিমানঘাঁটিতে হামলা চালালে ভারত-পাকিস্তান প্রত্যক্ষ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ড পূর্ব রণাঙ্গনে তাদের চূড়ান্ত অভিযান শুরু করে। এই রণমুখী উত্তেজনার মুহূর্তেই বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করে প্যারিসের মাটিতে ঘটে যায় জ্যাঁ কুয়ের সেই দুঃসাহসিক পদক্ষেপ।
পিআইএ বিমান ছিনতাই: ৩রা ডিসেম্বর, প্যারিসের ওর্লি বিমানবন্দর
১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর বিকেলবেলা। প্যারিসের ঐতিহ্যবাহী ওর্লি বিমানবন্দর (Orly Airport) তখন স্বাভাবিক বিমান চলাচলে ব্যস্ত। বিমানবন্দরে অবস্থান করছিল পাকিস্তান আন্তর্জাতিক এয়ারওয়েজের (PIA) একটি যাত্রীবাহী বোয়িং ৭২০বি (Boeing 720B) বিমান। বিমানটি করাচির উদ্দেশ্যে উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
ককপিটে প্রবেশ ও আল্টিমেটাম প্রদান
৩৮ বছর বয়সী ফরাসি নাগরিক জ্যাঁ কুয়ে অত্যন্ত চতুরতা ও সাহসিকতার সাথে সাধারণ যাত্রীদের ভিড়ে পিআইএ-এর বিমানে প্রবেশ করেন। বিমানে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি সোজা ককপিটে ঢুকে পড়েন। বিমান চালক (পাইলট) ও কো-পাইলটের মাথায় নিজের হাত রেখে গম্ভীর কণ্ঠে জানান এই বিমানটি ছিনতাই করা হয়েছে এবং এর নিয়ন্ত্রণ এখন তাঁর হাতে।
জ্যাঁ কুয়ের বুকের সাথে বাঁধা ছিল একটি ছোট চামড়ার ব্যাগ। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন, এই ব্যাগের ভেতর অত্যন্ত শক্তিশালী 'টাইমবোমা' রয়েছে। যদি তাঁর নির্দেশ অমান্য করা হয় বা বিমানটি জোরপূর্বক উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তবে তিনি বোমার বোতাম চেপে পুরো বিমান ধ্বংস করে দেবেন।
জ্যাঁ কুয়ের ঐতিহাসিক ও অলৌকিক দাবি
সাধারণত বিশ্বের বিমান ছিনতাইয়ের ইতিহাসে ছিনতাইকারীদের দাবি থাকে বিপুল পরিমাণের অর্থ বা মুক্তিপণ, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, বা নিরাপদ কোনো দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়। কিন্তু জ্যাঁ কুয়ে ককপিটে দাঁড়িয়ে যা ঘোষণা করেছিলেন, তা শুনে ফরাসি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, ফরাসি সরকার এবং পিআইএ-এর কর্মকর্তারা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
জ্যাঁ কুয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন:
"আমার নিজের জন্য এক ফোঁটা অর্থ বা কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রয়োজন নেই। আমার একমাত্র দাবি ফ্রান্স সরকারকে অবিলম্বে ভারতের শরণার্থী শিবিরে থাকা অসহায় ও মুমূর্ষু বাঙালি শরণার্থীদের জন্য ২০ টন প্রয়োজনীয় মেডিকেল যন্ত্রপাতি, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী বিমানে লোড করতে হবে। এই ত্রাণ বিমানে তোলা হলেই কেবল আমি বিমান ও যাত্রীদের মুক্ত করব!"
পরমুহূর্তেই এই সংবাদ বিশ্বের সমস্ত বড় বড় রেডিও স্টেশন, টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্রের হেডলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। পুরো বিশ্ব জানতে পারে, এক ফরাসি তরুণ হাজার মাইল দূরের এক অচেনা দেশের নিঃস্ব মানুষের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন বাজি রেখে একটি রাষ্ট্রীয় বিমান ছিনতাই করেছেন।
ককপিটের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ও ছদ্মবেশী অপারেশন
বিমান ছিনতাইয়ের বার্তা পেয়েই ওর্লি বিমানবন্দর ঘিরে ফেলে ফরাসি সশস্ত্র পুলিশ, বিশেষ কমান্ডো ও গোয়েন্দা সংস্থা। শুরু হয় এক চরম মনস্তাত্ত্বিক রুদ্ধশ্বাস নাটক।
সরকারের কৌশল ও সময়ক্ষেপণ: ফরাসি সরকার এবং পুলিশ কর্তৃপক্ষ একটি ভয়াবহ কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটে পড়ে যায়। একদিকে জ্যাঁ কুয়ের দাবির নীতিগত নৈতিকতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল আইন ও যাত্রী নিরাপত্তা। ফরাসি পুলিশ ও গোয়েন্দারা সিদ্ধান্ত নেয় সরাসরি শক্তি প্রয়োগ না করে জ্যাঁ কুয়েকে ফাঁদে ফেলার।
তাঁরা বেতার বার্তায় জ্যাঁ কুয়েকে জানান যে, ফরাসি সরকার ও আন্তর্জাতিক রেডক্রস তাঁর মানবিক দাবিতে সম্মত হয়েছে এবং ২০ টন ওষুধ ও ত্রাণসামগ্রী ট্রাকে করে বিমানবন্দরে নিয়ে আসা হচ্ছে। জ্যাঁ কুয়ে যেন বিমানে কোনো আঘাত না হানেন। সরল বিশ্বাসে এই সংবাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন জ্যাঁ কুয়ে।

ছদ্মবেশী অপারেশনের মাধ্যমে গ্রেপ্তার: ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়। রানওয়েতে বড় বড় ট্রাক এনে ত্রাণের বাক্স লোড করার নাটক সাজানো হয়। এর মধ্যে অত্যন্ত কৌশলে রেডক্রসের স্বাস্থ্যকর্মী এবং বিমানের টেকনিশিয়ানের পোশাকে দুজন ফরাসি ছদ্মবেশী পুলিশ অফিসার বিমানে প্রবেশ করেন।
তারা ত্রাণসামগ্রী কীভাবে সাজানো হবে এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত বিষয় আলোচনার কথা বলে জ্যাঁ কুয়েকে ককপিট থেকে বিমানের দরজার দিকে নিয়ে আসেন। জ্যাঁ কুয়ে যখন নিশ্চিত হতে দরজার কাছে আসেন, ঠিক তখনই ওত পেতে থাকা ছদ্মবেশী পুলিশ অফিসাররা তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাঁকে পরাস্ত করে গ্রেপ্তার করেন।
ব্যাগের রহস্য: বোমার বদলে বাইবেল ও অভিধান
গ্রেপ্তার করার পর ফরাসি পুলিশের বোম্ব স্কোয়াড অত্যন্ত সতর্কতার সাথে জ্যাঁ কুয়ের বুকের সাথে বাঁধা সেই রহস্যময় 'টাইমবোমা' সমৃদ্ধ ব্যাগটি খুলল। কিন্তু ব্যাগ খোলার পর সেখানে উপস্থিত অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা ও গোয়েন্দারা এক চরম বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন!
সেই ব্যাগে কোনো বারুদ, তার বা বিস্ফোরক ছিল না! সেখানে শান্তভাবে রাখা ছিল একটি পবিত্র বাইবেল (The Holy Bible) এবং দুটি বিশাল ভাষার অভিধান (Dictionary)।
এই একটি আবিষ্কার জ্যাঁ কুয়ের চরিত্র ও তাঁর অসামান্য মহানুভবতাকে এক মুহূর্তে পরিষ্কার করে দিয়েছিল। তিনি প্রকৃতপক্ষে সন্ত্রাসী ছিলেন না; তিনি কারো ক্ষতি করতে চাননি বা যাত্রীদের ভয় দেখাতে চাননি। সেই 'নকল বোমা' বা ব্যাগটি ছিল মূলত একটি বিশ্বজনীন প্রতীক যা তিনি ব্যবহার করেছিলেন ঘুমন্ত বিশ্ববিবেকের ওপর আঘাত হেনে তাদের জাগিয়ে তোলার জন্য। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, শব্দের চেয়ে এবং পরম করুণাময়ের বাণীর চেয়ে বড় কোনো শক্তিশালী বিস্ফোরক পৃথিবীতে হতে পারে না।
আইনি প্রক্রিয়া, জনতার সমর্থন এবং ২০ টন ত্রাণের বিজয়
গ্রেপ্তারের পর ফরাসি রাষ্ট্রীয় আইনে জ্যাঁ কুয়ের বিরুদ্ধে বিমান ছিনতাই ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অপরাধে মামলা দায়ের করা হয়। বিচারে তাঁর কয়েক বছরের কারাদণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়।
ফরাসি জনতার উত্তাল রাজপথ
জ্যাঁ কুয়েকে গ্রেপ্তারের খবর এবং তাঁর ব্যাগে 'বাইবেল ও অভিধান' পাওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর পুরো প্যারিস ও ফ্রান্সে জনমতের বিশাল ঝড় ওঠে। ফরাসি তরুণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কবি ও সাহিত্যিকরা রাজপথে নেমে আসেন। তারা স্লোগান দিতে থাকেন: "জ্যাঁ কুয়ে কোনো অপরাধী নন, তিনি মানবতার বীর!" ফরাসি মিডিয়া তাঁকে আকাশের 'রবিন হুড' হিসেবে আখ্যায়িত করে।
আদালতে জ্যাঁ কুয়ের আত্মপক্ষ সমর্থন
আদালতে বিচারক যখন জ্যাঁ কুয়েকে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কেন এই বেআইনি ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিয়েছিলেন, তখন বিচারালয়ে দাঁড়িয়ে জ্যাঁ কুয়ে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তা বিচারকসহ সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তিনি বলেছিলেন:
"মাননীয় বিচারক, হাজার হাজার মাইল দূরে প্রতিদিন হাজার হাজার নিষ্পাপ বাঙালি শিশু ও নারী খাদ্যাভাব আর চিকিৎসার অভাবে রাস্তায় তিলে তিলে মারা যাচ্ছে। বিশ্বনেতারা কেবল ভাষণ দিচ্ছেন আর আন্তর্জাতিক মিডিয়া তা প্রত্যক্ষ করছে। আমি রাতে ঘুমাতে পারছিলাম না। আমার মনে হয়েছে, যদি মানবতা বিপন্ন হয়, তবে আইনের চেয়ে মানুষের জীবন বাঁচানো অনেক বেশি জরুরি। আমি কারো ক্ষতি করিনি, আমি কেবল সেই মরণাপন্ন শিশুদের জন্য ওষুধ চেয়েছিলাম।"
বিচারে জ্যাঁ কুয়ের বিরুদ্ধে বিমান ছিনতাইয়ের আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে লঘুদণ্ড হিসেবে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করা হলেও, তাঁর উদ্দেশ্য মহৎ হওয়ায় এবং সার্বজনীন সমর্থনের কারণে তাঁকে কঠোর সাজা ভোগ করতে হয়নি।
আসল বিজয়: ২০ টন ত্রাণ বাংলাদেশ পৌঁছেছিল!
জ্যাঁ কুয়ের এই অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগ ব্যর্থ যায়নি। তাঁর এই অসমসাহসী কর্মকাণ্ডের ফলে ফরাসি সরকার এবং ফরাসি সাধারণ নাগরিক সমাজ এতটাই প্রভাবিত হয়েছিল যে, ফরাসি রেডক্রস ও আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্যোগে জ্যাঁ কুয়ের দাবীকৃত ২০ টন উচ্চমানের চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী বিশেষ বিমানযোগে ভারতের বাংলা সীমান্তে থাকা বাঙালি শরণার্থী শিবিরগুলোতে পাঠানো হয়েছিল।
একজন সাধারণ মানুষের নৈতিক হুঙ্কার কীভাবে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছিল এটি ছিল তার অনন্য উদাহরণ।
এক নজরে জ্যাঁ কুয়ের ঐতিহাসিক বিমান ছিনতাই ও একাত্তর
জ্যাঁ কুয়ের এই মহাকাব্যিক ঘটনা ও এর সাথে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক ডেটা নিচে একটি পরিষ্কার সারণীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
বিষয় / ঘটনা | বিস্তারিত তথ্য ও ঐতিহাসিক উপাত্ত |
মূল নায়ক / চরিত্র | জ্যাঁ কুয়ে (Jean Kay), জন্ম: ১৯৩৩, ফ্রান্স। |
অপারেশনের তারিখ | ৩রা ডিসেম্বর, ১৯৭১ (ভারত-পাকিস্তান প্রত্যক্ষ যুদ্ধ শুরুর দিন)। |
ঘটনাস্থল | ওর্লি বিমানবন্দর (Orly Airport), প্যারিস, ফ্রান্স। |
ছিনতাইকৃত বিমান | পাকিস্তান আন্তর্জাতিক এয়ারওয়েজ (PIA)-এর বোয়িং ৭২০বি (Boeing 720B)। |
কোট করা দাবি | ভারতের শরণার্থী শিবিরে থাকা ১ কোটি বাঙালি শরণার্থীর জন্য ২০ টন প্রয়োজনীয় মেডিকাল সরঞ্জাম, ওষুধ ও খাদ্য। |
নকল বোমার মূল উপাদান | ১টি বাইবেল (The Holy Bible) এবং ২টো ভাষার অভিধান (Dictionary)। |
গ্রেপ্তারের মাধ্যম | রেডক্রস কর্মী ও মেকানিক সেজে আসা ফরাসি ছদ্মবেশী পুলিশের কৌশলগত আক্রমণ। |
আইনি পরিণতি | ৫ বছরের স্থগিত/লঘুদণ্ড এবং ব্যাপক ফরাসি জনসমর্থন লাভ। |
বাস্তব অর্জিত সাফল্য | ফরাসি সরকারের মাধ্যমে অবরুদ্ধ বাঙালি শরণার্থীদের জন্য ২০ টন ত্রাণসামগ্রী ভারতে প্রেরণ। |
জীবনাবসান | ২৩শে ডিসেম্বর, ২০১২ (বয়স: ৭৯ বছর)। |
(তথ্যসূত্র: ফরাসি জাতীয় আর্কাইভস, লে মঁদ (Le Monde) পত্রিকা এবং ১৯৭১ সালের আন্তর্জাতিক প্রেস নথি)
বিশ্বজনীন একাত্তর: জ্যাঁ কুয়ে, অঁদ্রে মালরো এবং বৈশ্বিক নাগরিক সমাজ
জ্যাঁ কুয়ের এই ঘটনাটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল মূলত একাত্তরে বিশ্বজুড়ে গড়ে ওঠা অভূতপূর্ব আন্তর্জাতিক মানবতাবাদী আন্দোলনেরই একটি দৃশ্যমান রূপ।
অঁদ্রে মালরোর হুঙ্কার ও জ্যাঁ কুয়ের কর্ম: ফরাসি সাহিত্যের মহীরুহ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অ্যান্টি-নাৎসি রেজিস্ট্যান্স বীর এবং ফ্রান্সের প্রাক্তন সংস্কৃতিমন্ত্রী অঁদ্রে মালরো (André Malraux) ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে ঘোষণা করেছিলেন যে, তিনি ৭০ বছর বয়সে গিয়েও স্বাধীন বাংলাদেশের তরুণদের পাশে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের হয়ে যুদ্ধবিমানে চড়তে ও ট্যাংক চালাতে প্রস্তুত। মালরোর সেই আহ্বানের মাত্র দুই মাস পর ফরাসি যুবক জ্যাঁ কুয়ে সরাসরি প্যারিসের ওর্লি বিমানবন্দরে পিআইএ-এর বিমান ছিনতাই করে মালরোর সেই মানবতাবাদী দর্শনেরই এক ব্যবহারিক রূপ দিয়েছিলেন।
গান, কবিতা ও রাজপথের যুদ্ধ: একদিকে পণ্ডিত রবিশংকর ও জর্জ হ্যারিসনের নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ঐতিহাসিক 'দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ', মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের 'সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড' কবিতা, অন্যদিকে জ্যাঁ কুয়ের মতো তরুণদের সরাসরি বিমান ছিনতাই সবকিছু প্রমাণ করেছিল যে, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ কেবল ভূখণ্ডের সংগ্রাম ছিল না, তা ছিল প্রতিটি বিবেকবান মানুষের ব্যক্তিগত সংগ্রামের নাম।
জ্যাঁ কুয়ের পরিচয় ও প্রাথমিক জীবন
পূর্ণ নাম ও জন্ম: জ্যাঁ ইউজিন পল কুয়ে (Jean Eugène Paul Kay)। তিনি ১৯৪৩ সালের ৫ জানুয়ারি আলজেরিয়ার মিলিয়ানায় জন্মগ্রহণ করেন।
সামরিক পটভূমি: জ্যাঁ কুয়ে, তাঁর বাবা এবং ভাই তিনজনেই ফরাসি সেনাবাহিনীতে সেবা দিয়েছেন। কুয়ে একজন দক্ষ ইলেকট্রনিক্স টেকনিশিয়ান ও মেকানিক ছিলেন। ১৯৭১ সালের শুরুর দিকে তিনি ইয়েমেনে ফরাসি সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে কর্মরত ছিলেন।
মানসিক রূপান্তর (বিয়াফ্রা যুদ্ধ): ১৯৭১ সালের আগে ১৯৬০-এর দশকের শেষে তিনি নাইজেরিয়ার বিয়াফ্রা গৃহযুদ্ধে অংশ নেন। সেখানে যুদ্ধ, অনাহার এবং লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা তাঁকে চরম যুদ্ধবিরোধী ও একনিষ্ঠ মানবতাবাদী কর্মী হিসেবে গড়ে তোলে। সামরিক বাহিনী ছেড়ে তিনি নিঃস্ব ও রিফিউজিদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।
বিমান ছিনতাইয়ের পটভূমি ও টাইমিং (৩ ডিসেম্বর ১৯৭১)
পরিস্থিতি: ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে প্রায় ১ কোটি বাঙালি ভারতে আশ্রয় নেয়। শরণার্থী শিবিরগুলোতে খাদ্য, স্থান ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দেয় এবং ডায়রিয়া-কলেরায় প্রতিদিন শত শত শিশু মারা যেতে থাকে। এই খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পড়ে জ্যাঁ কুয়ে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন।
কৌশলগত সময় নির্বাচন: ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর উইলি ব্র্যান্ডট ফরাসি প্রেসিডেন্ট জর্জেস পম্পিদুর সাথে শীর্ষ বৈঠকের উদ্দেশ্যে প্যারিসের অর্লি (Orly) বিমানবন্দরে নামেন। বিমানবন্দরজুড়ে ভিআইপি নিরাপত্তার কারণে মূল নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিছুটা শিথিল ছিল, যা জ্যাঁ কুয়ে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন।
ছিনতাই প্রক্রিয়া ও ঐতিহাসিক দাবি
বিমানটির পরিচয়: পাকিস্তান আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের (PIA) বোয়িং ৭২০বি মডেলের বিমান (নাম: City of Comilla, রেজিস্ট্রেশন: AP-AMG, ফ্লাইট নম্বর: PK712)। বিমানটি লন্ডন থেকে প্যারিস হয়ে রোম, কায়রো ও করাচির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা ছিল।
ককপিট দখল (বেলা ১১:৫০): জ্যাঁ কুয়ে সাধারণ যাত্রীর বেশে বিমানে ওঠেন। ককপিটে ঢুকে ৯ মিমি পিস্তল উঁচিয়ে এবং হাতে একটি তারযুক্ত বাক্স দেখিয়ে পাইলটদের ইঞ্জিন বন্ধ করার নির্দেশ দেন। বাক্সে বোমা আছে এবং কথা না শুনলে বিমান উড়িয়ে দেওয়া হবে বলে সতর্ক করেন।
অনন্য মানবিক দাবি: জ্যাঁ কুয়ে কোনো রাজনৈতিক দাবি জানাননি, কোনো অর্থ বা নিজের মুক্তির শর্ত দেননি। তাঁর একমাত্র দাবি ছিল:
"পাকিস্তানি বিমানে অবিলম্বে ২০ টন ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী বোঝাই করে ভারতে আশ্রয় নেওয়া অসহায় বাঙালি শরণার্থীদের কাছে পাঠাতে হবে।"
৬ ঘণ্টার জিম্মি নাটক ও অবসান
সরাসরি সম্প্রচার ও বিশ্বজুড়ে তোলপাড়: প্যারিস বিমানবন্দরে এই ঘটনার খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ফরাসি টেলিভিশনে ঘটনাটি সরাসরি দেখানো হয়। হাজার হাজার সাধারণ ফরাসি মানুষ ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনকারী বিমানবন্দরে জড়ো হয়ে জ্যাঁ কুয়ের দাবির সমর্থনে স্লোগান দিতে থাকে।
ছদ্মবেশী পুলিশ অভিযান: দীর্ঘ ৬ ঘণ্টার আলোচনার পর ফরাসি কর্তৃপক্ষ ও ফরাসি রেড ক্রস দাবি মেনে নেওয়ার ভান করে। ওষুধ বোঝাই করার অজুহাতে রেড ক্রসের ব্যাজ পরা ও মেকানিকের ছদ্মবেশে কয়েকজন পুলিশ সদস্য বিমানে প্রবেশ করে।
গ্রেপ্তার: জ্যাঁ কুয়ে যখন ককপিটের দরজায় ওষুধের বাক্স গ্রহণ করছিলেন, তখন ছদ্মবেশী পুলিশ সদস্যরা তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ককপিটে এক রাউন্ড গুলি ফুটলেও কেউ হতাহত হয়নি। তাঁকে কাবু করে গ্রেপ্তার করা হয়।
বোমার রহস্য উদ্ঘাটন: গ্রেপ্তারের পর তাঁর সেই তথাকথিত 'বোমার বাক্সটি' পরীক্ষা করে দেখা যায়, তাতে কোনো বিস্ফোরক ছিল না! বাক্সের ভেতরে ছিল কেবল কিছু বৈদ্যুতিক তার, একটি ইলেকট্রিক শেভার, একটি বাইবেল, একটি বই এবং কিছু সেফটি পিন। অর্থাৎ তিনি কারো ক্ষতি না করে কেবল বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই এই ঝুঁকি নিয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রভাব ও কুয়ের অর্জন
ঔষধ ও ত্রাণ প্রেরণ: যদিও বিমান ছিনতাই প্রচেষ্টাটি ব্যর্থ হয়, কিন্তু জ্যাঁ কুয়ের এই বীরত্বপূর্ণ কাজ সারা বিশ্বের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। ফরাসি রেড ক্রস এবং 'অর্ডার অফ দ্য নাইটস হসপিটালিয়ার্স অব মাল্টা' (Order of Malta) কথা অনুযায়ী ২০ টন চিকিৎসা সামগ্রী ও ওষুধ সংগ্রহ করে ভারতে বাঙালি শরণার্থীদের কাছে পাঠায়।
কূটনৈতিক মোড়: এই ঘটনা ফরাসি সরকারের পররাষ্ট্র নীতিতে প্রভাব ফেলে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনে, তখন ফ্রান্স তাতে সমর্থন না দিয়ে ভোটদানে বিরত থাকে। একই সাথে ইউরোপে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তীব্রতর হয়।
বিচার, পরবর্তী জীবন ও বাংলাদেশে গোপন সফর
বিচার ও কারাদণ্ড: বিচারে আদালত জ্যাঁ কুয়ের কাজকে 'অপরাধ' হিসেবে দেখলেও তাঁর মানবিক উদ্দেশ্য বিবেচনা করে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু মাত্র দুই বছর পর, ১৯৭৩ সালে তিনি কারামুক্তি পান।
কলকাতায় সেবা: জেল থেকে বের হয়ে তিনি লেবানন ও অস্ট্রেলিয়ায় কিছুদিন মানবিক কাজ করেন। পরবর্তীতে ভারতের কলকাতায় এসে সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের জন্য বিনামূল্যে খাবার রান্না করে বিতরণ করতেন।
বাংলাদেশে গোপন সফর: স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি ১৯৮২ এবং ১৯৮৬ সালে গোপনে সফর করেছিলেন। তবে কোনো প্রচার বা সুবিধা না নিয়ে নীরবে বাংলাদেশ ঘুরে গিয়েছিলেন। সামরিক শাসন দেখে তিনি কিছুটা ব্যথিত হয়েছিলেন।
মৃত্যু: ২০১২ সালের ২৩ ডিসেম্বর ৬৯ বছর বয়সে এই মহান ফরাসি মানবতাবাদী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বিজয়ের মহাকাব্যে এক বিস্মৃত নায়ক
আজ আমরা যখন মুক্ত, সার্বভৌম ও স্বাধীন বাংলাদেশে বসবাস করি, বিজয়ের আনন্দ উদযাপন করি তখন কি আমরা ভেবে দেখি জ্যাঁ কুয়ের মতো কত নীরব বন্ধু এই দেশের অভ্যুদয়ের জন্য নিজেদের ক্যারিয়ার, জীবন ও ভবিষ্যৎ বাজি রেখেছিলেন?
একটি বিস্মৃত ইতিহাসের বেদনাবিধুর রূপ: কী বিচিত্র ও অদ্ভুত আমাদের ইতিহাস সচেতনতা! যে ফরাসি যুবক জ্যাঁ কুয়ে সম্পূর্ণ অচেনা এক দেশের অচেনা মানুষের মুখে একটু খাবার ও ওষুধ তুলে দেওয়ার জন্য বিশ্ব বিমান ছিনতাই করেছিলেন, ফরাসি আদালতে দাঁড়িয়েছিলেন আমাদের দেশের কয়জন মানুষ বা নতুন প্রজন্মের কতজন তাঁর নাম জানে?
জ্যাঁ কুয়ে কিন্তু এই কাজের জন্য পরবর্তীতে কোনো পদক, জমি, বা রাষ্ট্রীয় সম্মাননার আশা করেননি। তিনি নিজের সাধারণ জীবনে ফিরে গিয়েছিলেন। ২০১২ সালের ২৩শে ডিসেম্বর, প্রায় ৭৯ বছর বয়সে এই মহান মানবতাবাদী নিরবে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি তাঁর হৃদয়ে একাত্তরের সেই নিষ্পাপ বাঙালি শিশুদের মুখগুলো লালন করে গেছেন।
আমাদের প্রতি তাঁর অমর বার্তা: জ্যাঁ কুয়ের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতা কোনো সস্তা বিনিময় নয়। এটি রক্তের সাগরে অর্জিত একটি বিশ্বজনীন নৈতিক সত্য। যখন আমরা নিজেদের ইতিহাসের দিকে তাকাব, তখন আমাদের মনে রাখতে হবে বাঙালি কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের অধিবাসী নয়; বিপদের দিনে বিশ্বের যে অকৃত্রিম বন্ধুরা আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, জ্যাঁ কুয়ে তাঁদের মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র।
উপসংহার
১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর প্যারিসের ওর্লি বিমানবন্দরে পিআইএ-এর বোয়িং ৭২০বি বিমানের ককপিটে দাঁড়িয়ে জ্যাঁ কুয়ে যে ঐতিহাসিক বার্তা দিয়েছিলেন, তা আজ অর্ধশতাব্দী পরেও বিশ্ব মানবজাতির জন্য সমভাবে প্রাসঙ্গিক।
আজ আমরা যখন মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে বিশ্ব মানচিত্রে নিজেদের পরিচয় দিই, তখন ফরাসি বীর জ্যাঁ কুয়ের আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে, যখন অন্যায় আর গণহত্যা মানুষের স্বাভাবিক অধিকারকে কেড়ে নেয়, তখন ভৌগোলিক সীমারেখা অর্থহীন হয়ে পড়ে।
প্রিয় ফরাসি ভাই, মহান মুক্তিযোদ্ধা জ্যাঁ কুয়ে আপনাকে আমাদের হৃদয়ের গভীর থেকে সশ্রদ্ধ সালাম ও ভালোবাসা। আপনার মতো মুক্তিকামী বিশ্ব বন্ধুদের অকৃত্রিম ভালোবাসার ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। আপনার স্মৃতি আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরদিন সুবর্ণ অক্ষরে জ্বলজ্বল করবে।















