একাত্তরের যীশু জগৎজ্যোতি দাস - বীরশ্রেষ্ঠ থেকে বীরবিক্রম
একাত্তরের রণাঙ্গনে যে কজন বীরের নাম শুনলে পাকিস্তানি বাহিনীর বুক কেঁপে উঠত, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ভাটি বাংলার বাঘ হিসেবে পরিচিত জগৎজ্যোতি দাস। তিনি ছিলেন অকুতোভয় 'দাস পার্টি'র অধিনায়ক। তাঁর বীরত্বগাথা যেমন মহাকাব্যিক, তাঁর মৃত্যু পরবর্তী লাঞ্ছনা তেমনি হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটানো এক ট্র্যাজেডি।

TruthBangla

শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মৃতদেহের ছবি দেখেছেন কখনো? দেখে নেন তাহলে। এমন ছবি একটাই আছে। ছবিটা ২২ বছর বয়সী জগৎজ্যোতির। এই ছেলেকে যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হত্যা করতে পেরেছে, সেই প্রাইড ধরে রাখতে শহর থেকে ফটোগ্রাফার এনে ছবি তুলে রেখেছিলো। আজমিরিগঞ্জ বাজারে বাজার ভর্তি শত শত মানুষের সামনেই বাজারের ঠিক মাঝখানে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ঝুলিয়ে পেরেক মেরে জগৎজ্যোতির মৃতদেহ বেঁধে লাশকেই মারতে থাকে। কাঁটাবিদ্ধ যীশুর মুকুটের মত জগৎজ্যোতির ছিল গুলিবিদ্ধ চোখ! ক্রুসবিদ্ধ যীশুর মত জগৎজ্যোতির লাশটি পেরেক ঠুকে রাখা হয়েছিল বৈদ্যুতিক খুঁটিতে!
একাত্তরের রণাঙ্গনে যে কজন বীরের নাম শুনলে পাকিস্তানি বাহিনীর বুক কেঁপে উঠত, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ভাটি বাংলার বাঘ হিসেবে পরিচিত জগৎজ্যোতি দাস। তিনি ছিলেন অকুতোভয় 'দাস পার্টি'র অধিনায়ক। তাঁর বীরত্বগাথা যেমন মহাকাব্যিক, তাঁর মৃত্যু পরবর্তী লাঞ্ছনা তেমনি হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটানো এক ট্র্যাজেডি। আজ আমরা সেই বিস্মৃতপ্রায় বীরের জীবন, লড়াই এবং ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর প্রতারণার গল্প নিয়ে আলোকপাত করব।
বাঙালির পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার লড়াইয়ে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত মিশে আছে। এই দীর্ঘ তালিকায় এমন কিছু নাম আছে যারা শুধু যুদ্ধ করেননি, বরং শত্রুর জন্য আতঙ্কের সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন। জগৎজ্যোতি দাস ছিলেন তেমনই একজন। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি যে বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন, তা পৃথিবীর গেরিলা যুদ্ধের ইতিহাসে বিরল। কিন্তু স্বাধীনতার পর এক অজ্ঞাত কারণে তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান 'বীরশ্রেষ্ঠ' খেতাব থেকে বঞ্চিত করা হয়।
জন্ম ও শৈশব - আগুনের শিখা যেভাবে জ্বলে উঠল
জগৎজ্যোতি দাসের জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে। জীতেন্দ্র দাসের কনিষ্ঠ পুত্র জ্যোতির শৈশব থেকেই ছিল প্রতিবাদী চেতনা। শান্ত স্বভাবের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অদম্য জেদ।
শিক্ষাজীবন ও রাজনীতি: সুনামগঞ্জ কলেজে পড়ার সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নে (মেনন গ্রুপ) যোগ দেন। ১৯৬৯ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে ছাত্রনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
প্রশিক্ষণ: বিশেষ দায়িত্ব পালনে তিনি ভারতের গৌহাটির নওপং কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা আয়ত্ত করেন এবং নকশালপন্থীদের সংস্পর্শে এসে আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভ করেন। এই জ্ঞানই পরবর্তীতে তাঁকে এক দুর্ধর্ষ গেরিলা কমান্ডারে পরিণত করেছিল।

দাস পার্টির উত্থান - ভাটি বাংলার ত্রাস
১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরু হলে জগৎজ্যোতি ভারতের মেঘালয়ে 'ইকো-১' ট্রেনিং ক্যাম্পে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ৫ নং সেক্টরের অধীনে টেকেরঘাট সাব-সেক্টরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বে যুদ্ধ শুরু করলেও তাঁর অসামান্য নেতৃত্বের কারণে গঠিত হয় নিজস্ব গেরিলা দল 'দাস পার্টি'।
গেরিলা আক্রমণের রণকৌশল
ভাটি অঞ্চলের (সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জ) ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তিনি জলপথে পাকিস্তানি বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন।
বার্জ আক্রমণ: ১৬ অক্টোবর ১৬৭১, দাস পার্টি পাকিস্তানি বাহিনীর একটি বড় বার্জ আক্রমণ করে নিমজ্জিত করে।
বদলপুর ও দিরাই অপারেশন: হেলিকপ্টার ব্যবহার করেও পাকিস্তানিরা জগৎজ্যোতিকে রুখতে পারেনি। দিরাই, শাল্লা ও আজমিরীগঞ্জে একের পর এক সফল অভিযানে অসংখ্য রাজাকার ও পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়।
এলএমজি দিয়ে থানা দখল: একক সাহসে মাত্র একটি হালকা মেশিনগান নিয়ে তিনি জামালগঞ্জ থানা দখল করে নিয়েছিলেন, যা সামরিক ইতিহাসে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।
১৬ নভেম্বর ১৯৭১ - মহাকাব্যের শেষ দৃশ্য
দিনটি ছিল ১৬ নভেম্বর। ন্যাশনাল গ্রিডের বিদ্যুৎ লাইন ধ্বংসের উদ্দেশ্যে ৩৬ জনের দল নিয়ে বের হয়েছিলেন জগৎজ্যোতি। কিন্তু বিধিবাম, রাজাকারদের একটি দলের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ায় তাঁদের অবস্থান ফাঁস হয়ে যায়।
বদলপুর বিলের মাঝখানে তাঁরা পাকিস্তানি সেনাদের অ্যাম্বুশে পড়ে যান। দুই দিক থেকে গুলিবর্ষণে একে একে সাতজন সহযোদ্ধা প্রাণ হারান। গোলাবারুদ ফুরিয়ে আসায় এক পর্যায়ে জগৎজ্যোতি ও তাঁর ছায়াসঙ্গী ইলিয়াস একা হয়ে পড়েন।
বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে যখন সন্ধ্যা নামার অপেক্ষা করছিলেন, ঠিক তখনই একটি বুলেট জগৎজ্যোতির চোখে বিদ্ধ হয়। মেশিনগান হাতে উপুড় হয়ে বিলের কাদাপানিতে ঢলে পড়েন এই মহানায়ক।
একাত্তরের যীশু - লাশের ওপর অমানবিক পাশবিকতা
যীশুখ্রিষ্টকে যেভাবে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, জগৎজ্যোতির মরদেহের সাথে পাকিস্তানিরা এবং তাদের দোসররা তার চেয়েও ভয়াবহ আচরণ করেছিল।
খুঁটিতে পেরেকবিদ্ধ লাশ: পরদিন সকালে রাজাকাররা তাঁর লাশ খুঁজে পায়। আজমিরীগঞ্জ বাজারের মাঝখানে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সাথে তাঁর লাশ ঝুলিয়ে পেরেক মেরে আটকে রাখা হয়।
লাশের ওপর অত্যাচার: সারাদিন বাজারের শত শত মানুষের সামনে সেই লাশের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। পাকিস্তানিরা এতটাই ভীত ছিল যে, এই ২২ বছরের তরুণকে মারতে পেরেছে সেই গর্বে শহর থেকে ফটোগ্রাফার এনে লাশের ছবি তুলে রেখেছিল।
শেষ বিদায়: দিনশেষে ক্ষতবিক্ষত দেহটি ভেড়ামোহনা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। জগৎজ্যোতি হয়ে ওঠেন বাংলার 'ক্রুশবিদ্ধ যীশু'।
পুরস্কারের ঘোষণা ও ঐতিহাসিক প্রতারণা
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জগৎজ্যোতির মৃত্যু সংবাদে সারা দেশ শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে একাধিকবার ঘোষণা করা হয়েছিল শহীদ জগৎজ্যোতি দাসকে মরণোত্তর 'বীরশ্রেষ্ঠ' খেতাব প্রদান করা হবে।
কিন্তু স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ঘোষিত তালিকায় তাঁর নাম দেখা যায় 'বীরবিক্রম' হিসেবে। কেন তাঁকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা আজও মেলেনি।
মাহবুবুর রব সাদীর প্রত্যাখ্যান: ৪নং সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার মাহবুবুর রব সাদী এই বৈষম্যের প্রতিবাদে নিজের 'বীরপ্রতীক' খেতাব বর্জন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সামরিক বাহিনীর বাইরেও জগৎজ্যোতির মতো যোদ্ধারা বীরশ্রেষ্ঠ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন।
আজ ৫৩ বছর পরও জগৎজ্যোতি দাসের সঠিক মূল্যায়ন হয়নি। তাঁর সেই ঐতিহাসিক মৃতদেহের ছবি আজও আমাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।
"যে চোখের মণি দিয়ে তিনি স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই চোখেই বিদ্ধ হয়েছিল শত্রুর বুলেট।"
তথ্য সংক্ষেপ | বিবরণ |
জন্ম | ২৬ এপ্রিল ১৯৪৯ |
শহীদ | ১৬ নভেম্বর ১৯৭১ |
পার্টি নাম | দাস পার্টি |
ঘোষিত খেতাব | বীরশ্রেষ্ঠ (অস্থায়ী সরকার কর্তৃক) |
প্রদত্ত খেতাব | বীরবিক্রম |
উপসংহার
গ্যালিলিওর প্রতি করা অন্যায়ের জন্য ভ্যাটিকান চার্চ সাড়ে চারশ বছর পর ক্ষমা চেয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধুর ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দিয়েছে কয়েক দশক পর। সময় এসেছে বীরশ্রেষ্ঠ জগৎজ্যোতি দাসের প্রতি করা ঐতিহাসিক অন্যায়ের অবসান ঘটানোর। বাংলাদেশের নতুন সরকারের কাছে দাবি এই অকুতোভয় বীরের 'বীরশ্রেষ্ঠ' খেতাব ফিরিয়ে দিয়ে ইতিহাসের দায়মুক্তি ঘটানো হোক। জগৎজ্যোতি দাস কেবল একজন মুক্তিযোদ্ধা নন, তিনি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের সেই শিকড়, যা অগণিত ত্যাগের মধ্য দিয়ে এই মাটিকে আঁকড়ে আছে।














