>

>

একাত্তরের যীশু জগৎজ্যোতি দাস - বীরশ্রেষ্ঠ থেকে বীরবিক্রম

একাত্তরের যীশু জগৎজ্যোতি দাস - বীরশ্রেষ্ঠ থেকে বীরবিক্রম

শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মৃতদেহের ছবি আমরা অনেকেই দেখেছি, কিন্তু একটি বিশেষ ছবি দেখলে আজও স্বাধীন বাংলাদেশের বিবেক থমকে দাঁড়ায়, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। সেই ছবিটি কোনো সাধারণ শহীদের নয়; সেটি ২২ বছর বয়সী এক অকুতোভয় তরুণ গেরিলা কমান্ডারের যার নাম জগৎজ্যোতি দাস। ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনে এই একটি ছেলেকে হত্যা করতে পেরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকাররা এতটাই গর্বিত ও উল্লসিত হয়েছিল যে, সেই ‘প্রাইড’ ধরে রাখতে তারা শহর থেকে বিশেষ ফটোগ্রাফার এনে ছবি তুলে রেখেছিল।

TruthBangla

একাত্তরের যীশু জগৎজ্যোতি দাস - বীরশ্রেষ্ঠ থেকে বীরবিক্রম

শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মৃতদেহের ছবি আমরা অনেকেই দেখেছি, কিন্তু একটি বিশেষ ছবি দেখলে আজও স্বাধীন বাংলাদেশের বিবেক থমকে দাঁড়ায়, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। সেই ছবিটি কোনো সাধারণ শহীদের নয়; সেটি ২২ বছর বয়সী এক অকুতোভয় তরুণ গেরিলা কমান্ডারের যার নাম জগৎজ্যোতি দাস। ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনে এই একটি ছেলেকে হত্যা করতে পেরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকাররা এতটাই গর্বিত ও উল্লসিত হয়েছিল যে, সেই ‘প্রাইড’ ধরে রাখতে তারা শহর থেকে বিশেষ ফটোগ্রাফার এনে ছবি তুলে রেখেছিল।

পরদিন আজমিরীগঞ্জ বাজারে, শত শত মানুষের সামনে, বাজারের ঠিক মাঝখানে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ঝুলিয়ে, পেরেক মেরে জগৎজ্যোতির মৃতদেহ বেঁধে রাখা হয়েছিল। বর্বর পাকিস্তানি ও রাজাকাররা কেবল জীবন্ত মানুষকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা পেরেকবিদ্ধ সেই লাশকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আঘাত করতে থাকে, লাঞ্ছিত করতে থাকে। কাঁটাবিদ্ধ যীশুর মুকুটের মতো জগৎজ্যোতির ছিল গুলিবিদ্ধ চোখ! ক্রুসবিদ্ধ যীশুর মতো জগৎজ্যোতির লাশটি পেরেক ঠুকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল সেই খুঁটিতে।

একাত্তরের রণাঙ্গনে যে কজন বীরের নাম শুনলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বুক কাঁপত, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ভাটি বাংলার বাঘ হিসেবে পরিচিত জগৎজ্যোতি দাস। তিনি ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক এবং দুর্ধর্ষ 'দাস পার্টি'র অধিনায়ক। তাঁর বীরত্বগাথা যেমন মহাকাব্যিক ও রোমাঞ্চকর, তাঁর মৃত্যু-পরবর্তী লাঞ্ছনা তেমনি বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য ও নির্মম ট্র্যাজেডি।

বাঙালির পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার লড়াইয়ে যে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত মিশে আছে, সেই দীর্ঘ তালিকায় জগৎজ্যোতি এমন এক নাম, যিনি শুধু যুদ্ধ করেননি, বরং শত্রুর জন্য আতঙ্কের সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি যে রণকৌশল ও বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন, তা পৃথিবীর গেরিলা যুদ্ধের ইতিহাসে বিরল। কিন্তু স্বাধীনতার পর এক অজ্ঞাত কারণে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা সামরিক ও বেসামরিক বৈষম্যের শিকারে পরিণত করে তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান 'বীরশ্রেষ্ঠ' খেতাব থেকে বঞ্চিত করা হয়।

জন্ম, শৈশব ও প্রাক-যুদ্ধ জীবন

জগৎজ্যোতি দাসের জন্ম ১৯৪৯ সালের ২৬শে এপ্রিল, তৎকালীন সিলেট জেলার (বর্তমান হবিগঞ্জ জেলা) আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে। জীতেন্দ্র দাসের কনিষ্ঠ পুত্র জ্যোতির শৈশব কেটেছিল ভাটি বাংলার হাওরাঞ্চলের মুক্ত বাতাসে। শান্ত ও মৃদুভাষী স্বভাবের আড়ালে তাঁর ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক অদম্য জেদ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র এক প্রতিবাদী চেতনা।

শিক্ষাজীবন ও ছাত্ররাজনীতি

সুনামগঞ্জ কলেজে পড়ার সময় জগৎজ্যোতি সক্রিয়ভাবে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি তৎকালীন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্র ইউনিয়ন’ (মেনন গ্রুপ)-এ যোগ দেন। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক আইয়ুব বিরোধী গণ-আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ও সাহসী ভূমিকা তাঁকে হাওরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে একজন উদীয়মান ও বলিষ্ঠ ছাত্রনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

ভারতের গৌহাটি ও নকশাল আন্দোলনের সংস্পর্শ

একটি বিশেষ রাজনৈতিক ও কৌশলগত দায়িত্ব পালনে তিনি ভারতের আসামের গৌহাটির নওপং কলেজে ভর্তি হন। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা ও উপভাষা আয়ত্ত করেন। এই সময়ে তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম অঞ্চলের তৎকালীন ‘নকশালপন্থী’ বা চরম বামপন্থী আন্দোলনের তাত্ত্বিক ও যোদ্ধাদের সংস্পর্শে আসেন। সেখান থেকেই তিনি আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও গেরিলা যুদ্ধের (Hit and Run) রণকৌশল সম্পর্কে অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং বাস্তব জ্ঞান লাভ করেন। এই বিশেষ সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞানই পরবর্তীতে তাঁকে এক দুর্ধর্ষ ও অপ্রতিরোধ্য গেরিলা কমান্ডারে পরিণত করেছিল।

‘দাস পার্টি’র উত্থান: ভাটি বাংলার নৌ-রুট ও পাকিস্তানি বাহিনীর ত্রাস

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করলে জগৎজ্যোতি আর বসে থাকতে পারেননি। তিনি সীমান্ত পার হয়ে ভারতের মেঘালয়ে যান এবং সেখানে ‘ইকো-১’ (Eco-1) নামক একটি বিশেষ উচ্চতর সামরিক ট্রেনিং ক্যাম্পে গেরিলা যুদ্ধের আধুনিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ৫ নং সেক্টরের অধীনে টেকেরঘাট সাব-সেক্টরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বে যুদ্ধ শুরু করেন। কিন্তু রণক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য সাহসিকতা, ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তা এবং অসাধারণ নেতৃত্বের গুণাবলী দেখে তৎকালীন মুক্তিসংগ্রামের নীতিনির্ধারকেরা তাঁকে একটি স্বতন্ত্র গেরিলা দল গঠনের অনুমতি দেন। তাঁর নামানুসারেই গঠিত হয় সেই বিখ্যাত ও দুর্ধর্ষ গেরিলা স্কোয়াড ‘দাস পার্টি’

গেরিলা আক্রমণের রণকৌশল ও ভাটি বাংলার ভূগোল

সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা এবং হবিগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ হাওর ও নদীবেষ্টিত ‘ভাটি অঞ্চল’ ছিল দাস পার্টির অপারেশনের মূল ক্ষেত্র। এই অঞ্চলের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থান ও জলপথকে জগৎজ্যোতি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। নদী ও হাওরে নৌকার গতিবিধি এবং বর্ষাকালের সুযোগ নিয়ে তিনি জলপথে পাকিস্তানি বাহিনীকে সম্পূর্ণ নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন।

১৬ই অক্টোবরের বিখ্যাত বার্জ অপারেশন: ১৯৭১ সালের ১৬ই অক্টোবর, দাস পার্টি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর একটি বিশাল মারণাস্ত্র ও খাদ্যবাহী বার্জ আক্রমণ করে। জগৎজ্যোতির নিখুঁত নির্দেশনায় গেরিলারা বার্জটি সম্পূর্ণ নিমজ্জিত করে দেয়, যা ছিল ওই অঞ্চলে পাকিস্তানি নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট আঘাত।

বদলপুর ও দিরাই অপারেশন: দাস পার্টির আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পাকিস্তানিরা হাওরাঞ্চলে হেলিকপ্টার ব্যবহার শুরু করে। কিন্তু আধুনিক আকাশপথের আক্রমণও জগৎজ্যোতিকে রুখতে পারেনি। দিরাই, শাল্লা ও আজমিরীগঞ্জে একের পর এক সফল ও ঝটিকা অভিযানে দাস পার্টির হাতে অসংখ্য রাজাকার ও পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়।

এলএমজি দিয়ে একক সাহসে থানা দখল: সামরিক ইতিহাসের অন্যতম অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটেছিল জামালগঞ্জ থানায়। জগৎজ্যোতি দাস মাত্র একটি হালকা মেশিনগান (LMG) নিয়ে, নিজের অসীম সাহসে একক ও সম্মুখ আক্রমণে জামালগঞ্জ থানা অবরুদ্ধ ও দখল করে নিয়েছিলেন। এই ঘটনার পর পাকিস্তানি ক্যাম্পে তাঁর নাম শুনলেই রাজাকারদের হাত থেকে অস্ত্র খসে পড়ত।

একাত্তরের যীশু জগৎজ্যোতি দাস - বীরশ্রেষ্ঠ থেকে বীরবিক্রম

১৬ই নভেম্বর ১৯৭১: বদলপুর বিলের ট্র্যাজেডি

দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৬ই নভেম্বর। বিজয়ের ঠিক এক মাস আগে। তৎকালীন জাতীয় গ্রিডের মূল বিদ্যুৎ লাইন (National Power Grid) ধ্বংস করার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ মিশন নিয়ে ৩৬ জনের একটি দল নিয়ে বের হয়েছিলেন কমান্ডার জগৎজ্যোতি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, যাত্রাপথে স্থানীয় রাজাকার ও আল-বদরদের একটি দল তাদের দেখে ফেলে এবং পাকিস্তানি ক্যাম্পে খবর দেয়। ফলে গেরিলাদের অবস্থান সম্পূর্ণ ফাঁস হয়ে যায়।

রণকৌশল অনুযায়ী বদলপুর বিলের মাঝখান দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁরা চারদিক থেকে পাকিস্তানি নিয়মিত সেনা ও শত শত সশস্ত্র রাজাকারের এক বিশাল এবং সুপরিকল্পিত অ্যাম্বুশে (Ambush) পড়ে যান। খোলা বিলের মাঝে আত্মরক্ষার তেমন কোনো আড়াল ছিল না। দুই দিক থেকে আসা ঝাঁকে ঝাঁকে গুলিবর্ষণের মুখে দাঁড়িয়েও জগৎজ্যোতি পিছু হটেননি। তাঁর সাহসিকতায় যুদ্ধ চলতে থাকে। কিন্তু একপর্যায়ে শত্রুর ভারী অস্ত্রের আঘাতে একে একে তাঁর সাতজন সহযোদ্ধা কোলের ওপর প্রাণ হারান।

দীর্ঘক্ষণ যুদ্ধ চলার পর বিকালের দিকে দাস পার্টির গোলাবারুদ প্রায় শেষ হয়ে আসে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জগৎজ্যোতি তাঁর বাকি সহযোদ্ধাদের নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। একপর্যায়ে মাঠে কেবল দুজন টিকে ছিলেন জগৎজ্যোতি এবং তাঁর ছায়ার মতো থাকা বিশ্বস্ত সঙ্গী ইলিয়াস।

বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে, যখন সূর্যের আলো ম্লান হয়ে আসছিল এবং তারা রাতের অন্ধকারের অপেক্ষা করছিলেন (যাতে অন্ধকারের সুযোগে শত্রুর ব্যূহ ভেদ করা যায়), ঠিক তখনই একটি অভিশপ্ত বুলেট জগৎজ্যোতির চোখ বিদ্ধ করে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। হাতের মেশিনগানটি শক্ত করে ধরা অবস্থাতেই বিলের কাদাপানিতে উপুড় হয়ে ঢলে পড়েন ভাটি বাংলার এই মহানায়ক। অবসান ঘটে এক বীরত্বের মহাকাব্যের।

১৬ই নভেম্বরের যুদ্ধের নেপথ্যে

বদলপুর বিলের সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধের পেছনে ছিল স্থানীয় রাজাকার ও শান্তি কমিটির এক সুনির্দিষ্ট এবং কুৎসিত বিশ্বাসঘাতকতা। ১৬ই নভেম্বর জগৎজ্যোতি যখন তাঁর দল নিয়ে ন্যাশনাল গ্রিডের বিদ্যুৎ লাইন ধ্বংসের মিশনে যাচ্ছিলেন, তখন জলসুখা ও বদলপুর অঞ্চলের কয়েকজন চিহ্নিত রাজাকার তাঁদের গতিবিধি দেখে ফেলে। তারা প্রত্যন্ত হাওর থেকে দ্রুত পায়ে হেঁটে মূল পাকিস্তানি ক্যাম্পে গিয়ে নিখুঁত তথ্য দেয় যে ‘দাস পার্টির জ্যোতি আজ খুব ছোট দল নিয়ে বিল পার হচ্ছে’

সাধারণত গেরিলারা অ্যাম্বুশ করেন, কিন্তু ওই দিন স্থানীয় রাজাকারদের নিখুঁত গাইডেন্সে পাকিস্তানি নিয়মিত সেনারা ভারী মর্টার ও মেশিনগান নিয়ে বিলের তিন দিক থেকে জগৎজ্যোতিদের ঘিরে ফেলেছিল। তা সত্ত্বেও জগৎজ্যোতি যেভাবে প্রায় ৫-৬ ঘণ্টা যুদ্ধ ধরে রেখে সহযোদ্ধাদের বড় অংশকে নিরাপদে বের করে দিয়েছিলেন, তা আধুনিক সামরিক বিদ্যায় এক অনন্য ‘রিট্রিট স্ট্র্যাটেজি’ (Retreat Strategy) হিসেবে গণ্য হতে পারে।

একাত্তরের যীশু: লাশের ওপর অমানবিক পাশবিকতা

মানব ইতিহাসের সমস্ত যুদ্ধকালীন নীতি ও জেনেভা কনভেনশনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জগৎজ্যোতির মরদেহের সাথে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকাররা যে পাশবিক আচরণ করেছিল, তা শুনলে আজও গা শিউরে ওঠে। যীশুখ্রিষ্টকে যেভাবে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, জগৎজ্যোতির লাশের সাথে তারা তার চেয়েও ভয়াবহ বর্বরতা প্রদর্শন করে।

খুঁটিতে পেরেকবিদ্ধ লাশ: ১৭ই নভেম্বর সকালে রাজাকাররা বিলের কাদা থেকে জগৎজ্যোতির পবিত্র মরদেহ খুঁজে পায়। তাদের আনন্দের আর সীমা ছিল না। তারা লাশটি টেনে-হিঁচড়ে আজমিরীগঞ্জ বাজারে নিয়ে আসে। বাজারের ঠিক মাঝখানে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সাথে তাঁর লাশটি ঝুলিয়ে, হাত ও পায়ে বড় বড় লোহার পেরেক মেরে আটকে রাখা হয়।

মৃতদেহের ওপর অসভ্য নির্যাতন: সারাদিন বাজারের শত শত সাধারণ মানুষের সামনে, একাত্তরের সেই বীরের লাশের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। পাকিস্তানি সৈন্যরা এতটাই ভীত ও মানসিকভাবে পরাস্ত ছিল যে, এই ২২ বছরের তরুণকে তারা জীবিতাবস্থায় ছুঁতে পারেনি, তাই মৃত জগৎজ্যোতিকে মারতে পারার আনন্দে তারা শহর থেকে বিশেষ প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার ডেকে এনে লাশের ছবি তুলে নিজেদের ‘বিজয়’ ফ্রেমবন্দি করে রেখেছিল।

নদীতে শেষ বিদায়: দিনশেষে, সারাদিনের অসভ্য উল্লাস শেষে, ক্ষতবিক্ষত ও পেরেকবিদ্ধ দেহটি তারা স্থানীয় ভেড়ামোহনা নদীতে ভাসিয়ে দেয়। নদীমাতৃক বাংলার জলরাশি তার নিজের সন্তানকে বুকে টেনে নেয়। জগৎজ্যোতি দাস এভাবেই হয়ে ওঠেন স্বাধীন বাংলার ‘ক্রুশবিদ্ধ যীশু’।

রণাঙ্গনের ঐতিহাসিক তথ্য সংক্ষেপ

শহীদ জগৎজ্যোতি দাসের সংক্ষিপ্ত জীবন, বীরত্ব ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বৈষম্য নিচের ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

ঐতিহাসিক বিষয় ও ক্ষেত্র

সুনির্দিষ্ট তথ্য ও ঐতিহাসিক বিবরণ

পূর্ণ নাম

জগৎজ্যোতি দাস (রণাঙ্গনের নাম: জ্যোতি)

জন্ম ও স্থান

২৬শে এপ্রিল ১৯৪৯; গ্রাম: জলসুখা, আজমিরীগঞ্জ, হবিগঞ্জ।

শহীদ হওয়ার তারিখ ও স্থান

১৬ই নভেম্বর ১৯৭১; বদলপুর বিল, হাওরাঞ্চল।

দল বা স্কোয়াডের নাম

দাস পার্টি (Das Party) - জলপথের গেরিলা বাহিনী।

অপারেশনাল সেক্টর

৫ নং সেক্টর (টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের অধীনে স্বতন্ত্র গ্রুপ)।

প্রধান বীরত্বগাথা

একক এলএমজি নিয়ে জামালগঞ্জ থানা দখল; পাক বাহিনীর বার্জ নিমজ্জন।

অস্থায়ী সরকারের ঘোষণা

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মরণোত্তর ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবের ঘোষণা।

১৯৭২ সালের রাষ্ট্রীয় পদক

‘বীরবিক্রম’ (চরম বৈষম্য ও প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ)।

মৃত্যু-পরবর্তী ট্র্যাজেডি

আজমিরীগঞ্জ বাজারে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে পেরেক ঠুকে লাশ প্রদর্শন।

‘দাস পার্টি’র অনন্য সাংগঠনিক কাঠামো ও সদস্য নির্বাচন

গেরিলা যুদ্ধের ইতিহাসে কোনো দলের সাফল্য নির্ভর করে তার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও বিশ্বস্ততার ওপর। জগৎজ্যোতি তাঁর দলের সাংগঠনিক কাঠামো তৈরিতে নকশাল আন্দোলনের কৌশল এবং স্থানীয় ভূগোলের মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন।

কঠোর স্ক্রিনিং ও বিশ্বস্ততা: দাস পার্টির সদস্য সংখ্যা কখনোই খুব বড় ছিল না (সাধারণত ৩৬ থেকে ৪০ জন)। জগৎজ্যোতি কেবল তাঁদেরই দলে নিতেন, যাঁদের ভাটি অঞ্চলের নদী, হাওর এবং খালের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে শৈশব থেকে স্পষ্ট ধারণা ছিল। সাঁতারে পারদর্শী এবং দীর্ঘক্ষণ পানির নিচে শ্বাস ধরে রাখতে পারা যুবকদের তিনি প্রাধান্য দিতেন।

আদর্শিক মেলবন্ধন: দাস পার্টিতে যেমন ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের প্রগতিশীল নেতাকর্মীরা, তেমনি ছিলেন স্থানীয় সাধারণ কৃষক ও জেলেরাও। এই মিশ্রণের কারণে দলটি স্থানীয় সাধারণ মানুষের সঙ্গে একীভূত হয়ে যেতে পেরেছিল, যার ফলে পাকিস্তানি বাহিনী শত চেষ্টা করেও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দাস পার্টির কোনো গোপন তথ্য বের করতে পারেনি।

‘হিট অ্যান্ড রান’ রণকৌশল এবং জলপথের ফাঁদ

ভাটি অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ভারী যুদ্ধাস্ত্র এবং যান্ত্রিক যানগুলো বর্ষাকালে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়ত। জগৎজ্যোতি এই দুর্বলতাকেই তাঁর প্রধান শক্তি বানিয়েছিলেন।

নৌকার ছদ্মবেশ: দাস পার্টির গেরিলারা ছদ্মবেশে সাধারণ মাছ ধরার ডিঙি নৌকা ব্যবহার করতেন। নৌকার তলানিতে বা মাছের ঝাঁকার নিচে লুকিয়ে রাখা হতো স্টেনগান ও গ্রেনেড। পাকিস্তানি গানবোট বা রাজাকারের নৌকাগুলো যখন ভাবত এগুলো সাধারণ জেলেদের নৌকা, ঠিক তখনই আচমকা আক্রমণ চালিয়ে চোখের পলকে গেরিলারা হাওরের অন্য প্রান্তে মিলিয়ে যেতেন।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকরণ: জগৎজ্যোতি খুব ভালো করে জানতেন যে, পাকিস্তানিরা মূলত নদী ও সড়কপথের সংযোগ দিয়ে নিজেদের ক্যাম্পগুলোর যোগাযোগ রক্ষা করে। তাই তিনি আজমিরীগঞ্জ, দিরাই ও শাল্লার মধ্যবর্তী ছোট ছোট কাঠের সেতু ও টেলিফোন লাইন উপড়ে ফেলে পাকিস্তানি বাহিনীকে একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত করেছিলেন।

পুরস্কারের ঘোষণা ও ইতিহাসের সুপরিকল্পিত প্রতারণা

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে যখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শহীদ জগৎজ্যোতি দাসের মৃত্যুসংবাদ প্রচারিত হয়, তখন সমগ্র স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতি ও মুজিবনগর সরকার শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সরকারিভাবে একাধিকবার অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছিল যে স্বাধীনতার পর শহীদ জগৎজ্যোতি দাসকে তাঁর নজিরবিহীন বীরত্বের জন্য মরণোত্তর ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ (সর্বোচ্চ সামরিক পদক) খেতাবে ভূষিত করা হবে।

কিন্তু স্বাধীনতার পর, ১৯৭২ সালে যখন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বীরত্বসূচক পদকের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়, তখন এক চরম বিস্ময় ও হতাশার সাথে দেখা যায় জগৎজ্যোতির নাম ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ তালিকায় নেই! তাঁকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাঁর স্থান দেওয়া হয়েছে ‘বীরবিক্রম’ (তৃতীয় সর্বোচ্চ পদক) হিসেবে। কেন এই বীরকে তাঁর প্রাপ্য সর্বোচ্চ সম্মান থেকে বঞ্চিত করা হলো? এর কোনো সুনির্দিষ্ট, যৌক্তিক বা দাপ্তরিক ব্যাখ্যা আজও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কিংবা তাঁর সহযোদ্ধারা পাননি।

মাহবুবুর রব সাদীর ঐতিহাসিক প্রতিবাদ ও পদক বর্জন

এই প্রাতিষ্ঠানিক ও আমলাতান্ত্রিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে রণাঙ্গনের প্রকৃত যোদ্ধারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। ৪ নং সেক্টরের তৎকালীন বীর সাব-সেক্টর কমান্ডার মাহবুবুর রব সাদী এই ঐতিহাসিক অন্যায়ের প্রতিবাদে নিজের লাভ করা ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জন ও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেছিলেন:

"সামরিক বাহিনীর বাইরেও যে বেসামরিক সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে জগৎজ্যোতির মতো সূর্যসন্তানেরা দেশের জন্য এমন অবিশ্বাস্য বীরত্ব প্রদর্শন করে শহীদ হতে পারেন, তা স্বাধীন দেশের তৎকালীন সামরিক নীতিনির্ধারকেরা মানসিকভাবে মেনে নিতে পারেননি। জগৎজ্যোতি বীরশ্রেষ্ঠ পদক পাওয়ার যোগ্যতম দাবিদার ছিলেন।"

আজ স্বাধীনতার এতগুলো বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও জগৎজ্যোতি দাসের সেই বীরত্বের সঠিক রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন হয়নি। তাঁর সেই ঐতিহাসিক, পেরেকবিদ্ধ মৃতদেহের ছবিটি আজও যেন স্বাধীন বাংলাদেশের বিবেক ও রাষ্ট্রকাঠামোর কাছে এক নীরব ও তীব্র প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। যে চোখের মণি দিয়ে তিনি একটি স্বাধীন ও মুক্ত মানচিত্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, ঠিক সেই চোখেই বিদ্ধ হয়েছিল শত্রুর নির্মম বুলেট।

উপসংহার

ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাই, বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর প্রতি চার্চ যে বৈজ্ঞানিক সত্য অস্বীকারের অন্যায় করেছিল, তার জন্য শত শত বছর পর ভ্যাটিকান চার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছিল। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছাত্রত্ব অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়ার কয়েক দশক পর তাঁর ছাত্রত্ব সসম্মানে ফিরিয়ে দিয়ে নিজেদের ইতিহাসের দায়মুক্ত করেছিল।

তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশ কেন তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীরের প্রতি করা এই ঐতিহাসিক অন্যায়ের অবসান ঘটাবে না? ২০২৬ সালের এই নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের বর্তমান ও আপামর জনমানুষের আকাঙ্ক্ষার সরকারের কাছে এটিই আমাদের তীব্র এবং যৌক্তিক দাবি অকুতোভয় গেরিলা কমান্ডার শহীদ জগৎজ্যোতি দাসের প্রতি করা ঐতিহাসিক অন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে তাঁকে মরণোত্তর ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করা হোক।

ইতিহাসের এই ঋণ শোধ করা কোনো দয়া নয়, এটি রাষ্ট্রের নিজের কলঙ্ক মোচনের উপায়। জগৎজ্যোতি দাস কেবল একজন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা নন; তিনি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের সেই গভীরতম শিকড়, যা অগণিত রক্ত, অশ্রু ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে এই স্বাধীন বাংলার মাটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে। তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Jul 21, 2026

/

Post by

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এই ঘৃণ্যতম অপরাধের পেছনে যারা মূল কারিগর ও স্থপতি ছিলেন, তারা বিভিন্ন সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান চরিত্র হলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বেসামরিক বিষয়ক শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা।

Jul 13, 2026

/

Post by

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করে রাখা হয়েছে। বয়ানটি হলো একাত্তরের যুদ্ধটা ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র লড়াই। ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে নিরীহ বাঙালিদের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তারা এটিকে চিত্রায়িত করেছিল 'ইসলামী সংহতি রক্ষার অভিযান' হিসেবে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম কখনো অন্যায়, স্বৈরাচার, লুণ্ঠন ও গণহত্যার পক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

Aug 24, 2025

/

Post by

৪০ জেলায় ১৭,৪৫৪টি গণহত্যা এবং ১,১১৮টি টর্চার সেল? একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত? স্বাধীনতার অর্ধ-শতাব্দী পরেও, যখন বিশ্বজুড়ে জেনোসাইড বা গণহত্যার শিকারদের নিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা হয়, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এই স্বাধীন ভূমিতেই কিছু ব্যক্তি শহীদদের সংখ্যা নিয়ে চরম বিকৃতি ও তামাশা করে থাকে। ফেসবুকে মানুষরূপী নরপশু এসে ৭১-এর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রীতিমতো তামাশা করে। বিশ্বে আর কোন দেশ আছে কিনা যে, তাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে এমন তামাশা করে এমন বিকৃতি করে, দেশের জন্য প্রাণ দেয়া শহীদদের নিয়ে মশকরা করে। সত্যি আমরা একটা অভাগা জাতি।

Aug 8, 2026

/

Post by

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আলোচনাগুলোতে একটি দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা বা সামাজিক ট্যাবু প্রচলিত রয়েছে: "রাজাকার বা দালাল মানেই কেবল পুরুষ।" কিন্তু ইতিহাস ও তৎকালীন প্রামাণ্য নথিপত্র সাক্ষ্য দেয় এই ধারণা একেবারেই সত্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরুষ দালাল ও রাজাকারের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী হিসেবে নারী দালাল, তথ্য সরবরাহকারী, গুপ্তচর ও প্রপাগান্ডাকারী নারী রাজাকারও সক্রিয় ছিল। আজ স্বাধীনতার বহু দশক পরেও কেন নারী রাজাকারদের এই ইতিহাস আড়ালে রয়ে গেল?

Jul 30, 2026

/

Post by

এই যুদ্ধে একদিকে ছিল তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির পরাশক্তিগুলোর সমর্থনপুষ্ট, আধুনিক ও সুসংগঠিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনী; আর অন্যদিকে ছিল বাংলার দামাল সন্তানদের নিয়ে গঠিত অদম্য ‘মুক্তিবাহিনী’, যাদের প্রাথমিক সম্বল ছিল দেশপ্রেম, অমিত সাহস এবং পরবর্তীতে ভারতের সহায়তায় অর্জিত কৌশলগত গেরিলা প্রশিক্ষণ। একাত্তরের রণাঙ্গনের গতিপ্রকৃতি কেবল সেনাসংখ্যা দিয়ে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এই যুদ্ধকে গভীরভাবে বুঝতে হলে বিশ্লেষণ করতে হবে উভয় পক্ষের ব্যবহৃত সমরাস্ত্রের মডেল, প্রযুক্তিগত ক্ষমতা, ক্যালিবার এবং তৎকালীন নদীমাতৃক বাংলার ভূ-প্রকৃতির ওপর সেই সব অস্ত্রের প্রায়োগিক উপযোগিতা।

Jul 24, 2026

/

Post by

মিরপুরের অসংখ্য বধ্যভূমির মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত, ভয়াবহ এবং লোমহর্ষক নাম ‘শিয়ালবাড়ি বধ্যভূমি’। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় প্রধান অনুচর বিহারী, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকাটিকে বেছে নিয়েছিল এক নারকীয় কসাইখানা হিসেবে। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে সেখানে নির্বিচারে জবাই করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মরদেহ ফেলে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর, ডোবা, নালা ও কূপে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে মিরপুরের এই শান্ত জনপদটির নাম ‘শিয়ালবাড়ি’ হলো কেন? কেন এটি একাত্তরে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে কুখ্যাত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.