মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান এবং পাকিস্তানের পরাজয়ের ক্ষত
বিগত ৫৪-৫৫ বছর ধরে একদল পঙ্গপাল প্রতিনিয়ত অপপ্রচার চালিয়ে আসছে যে, ১৯৭১ সালে ভারত নাকি বাংলাদেশকে মুক্ত করেনি, বরং পাকিস্তান ভেঙে এদেশকে লুটপাট করেছে। এমনকি অতি অবাস্তব দাবি করা হয় যে, এদেশের কলকারখানা, কোটি কোটি টাকার অস্ত্র, এমনকি বদনা পর্যন্ত ভারতীয় বাহিনী লুট করে নিয়ে গেছে!

TruthBangla

স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে আজ ২০২৬ সালে এসেও বাংলাদেশের একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী এবং তাদের উগ্রপন্থী দোসররা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ছদ্মবেশী প্ল্যাটফর্মে একটি ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে চলেছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরাজয়ের যে ক্ষত, তা তাদের দোসরদের বুকে আজও দগদগে। আর সেই পরাজয়ের গ্লানি ও ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় এক চরম অকৃতজ্ঞ ও কুৎসিত ন্যারেটিভ “ভারতভীতি ও ভারত-বিরোধিতা”।
বিগত ৫৪-৫৫ বছর ধরে একদল পঙ্গপাল প্রতিনিয়ত অপপ্রচার চালিয়ে আসছে যে, ১৯৭১ সালে ভারত নাকি বাংলাদেশকে মুক্ত করেনি, বরং পাকিস্তান ভেঙে এদেশকে লুটপাট করেছে। এমনকি অতি অবাস্তব দাবি করা হয় যে, এদেশের কলকারখানা, কোটি কোটি টাকার অস্ত্র, এমনকি বদনা পর্যন্ত ভারতীয় বাহিনী লুট করে নিয়ে গেছে!
একজন সচেতন নাগরিক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ হিসেবে যখন আমি এই আজগুবি প্রোপাগান্ডাগুলোর মুখোমুখি হই, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে এটি স্রেফ ইতিহাসকে কলঙ্কিত করার এবং পাকিস্তানের ঐতিহাসিক পরাজয়কে আড়াল করার একটি সুসংগঠিত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। আজ সময় এসেছে ইতিহাসের দলিল, সামরিক পরিসংখ্যান এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে এই পঙ্গপালদের মুখে চড়কচাপড় মেরে প্রতিটি মিথ্যার অবসান ঘটানো।
পাকিস্তানের তথাকথিত ‘অস্ত্রাগার’
অপপ্রচারকারীদের অন্যতম প্রধান মিথ্যাচার হলো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে নাকি পাকিস্তানের বিশাল অস্ত্রের খনি ও কারখানা ছিল, যা ভারতীয় সেনাবাহিনী লুট করে নিয়ে গেছে। আসুন এই আজগুবি দাবির সামরিক বাস্তবতা খতিয়ে দেখা যাক।
পূর্ব পাকিস্তানে কোনো অস্ত্র কারখানা ছিল না
ঐতিহাসিক ও সামরিক সত্য হলো, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে পাকিস্তানের নিজস্ব কোনো অস্ত্র তৈরির কারখানা বা প্রোডাকশন ইউনিট ছিলই না। গাজীপুরে অবস্থিত ‘পাকিস্তান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি’ (POF) এবং ঢাকা ও রাজাপুরে অবস্থিত ‘সেন্ট্রাল অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি’ (COD) কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ উৎপাদন কেন্দ্র ছিল না। এগুলো ছিল মূলত পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পাঠানো অস্ত্র ও গোলাবারুদের ‘সাপ্লাই সেন্টার’ বা বিতরণ কেন্দ্র মাত্র। পশ্চিম পাকিস্তানের ওয়াহ ক্যান্টনমেন্ট (Wah Cantt) থেকে উৎপাদিত অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কার্গো জাহাজ ও বিমানের মাধ্যমে এই কেন্দ্রগুলোতে এনে মজুত করা হতো এবং তা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে মোতায়েনকৃত সেনাদের রসদ জোগানো হতো।
আমেরিকা ও চীনের সামরিক অন্ধত্ব
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজেদের সক্ষমতায় চলেনি। তৎকালীন বৈশ্বিক রাজনীতিতে বাঙালিদের ওপর চালানো ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যাকে আড়াল করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গণচীন সরাসরি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
মার্কিন সহায়তা: ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও জনমত উপেক্ষা করে পাকিস্তানকে ১৪.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের মারণাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছিল।
চীনা সহায়তা: বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে এবং নির্বিচারে মানুষ হত্যার জন্য চীন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত পাকিস্তানি বাহিনীকে ৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের বিপুল অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা দিয়েছিল।
পঙ্গপালদের দ্বিমুখী নীতি
এখানেই প্রোপাগান্ডাকারীদের ভণ্ডামি স্পষ্ট হয়। ১৯৭১ সালে চীন ও আমেরিকা যখন পাকিস্তানকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে বাঙালি নিধনে সহায়তা করল, তখন এই পঙ্গপালদের চোখে কোনো দোষ ধরা পড়ে না। দোষ হয় কেবল তখনই, যখন ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) আমাদের ১ কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়, মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভেটো দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করে! ভারত কেন আমাদের পাশে দাঁড়াল এবং পাকিস্তানকে ইতিহাসের সবচেয়ে লজ্জাজনক পরাজয় উপহার দিল এই ক্ষোভ, হিংসা আর মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণায় পাকিস্তানের এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের গত ৫৪ বছর ধরে রাতে ঘুম নেই।
রণক্ষেত্রের ক্ষয়ক্ষতি এবং পাকিস্তানের পরাজয়ের গ্লানি
পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে কত বড় সামরিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল, তা তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেখলেই স্পষ্ট হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আর্থিক ও সামরিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে, ভারতের দেওয়া অস্ত্র ও প্রশিক্ষণে বলীয়ান হয়ে পাকিস্তানের ১ লক্ষ ৭৫ হাজার নিয়মিত ও আধা-সামরিক সৈন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল।
পরাজয়ের লজ্জায় মাথা খেয়ে পাকিস্তানের দোসররা এই যুদ্ধকে ‘ভারতের ষড়যন্ত্র’ বলে প্রচার করে। অথচ বাস্তব সত্য হলো, গত ৭৮ বছরের ইতিহাসে পাকিস্তানের কোনো দেশের সাথেই কোনো যুদ্ধে জেতার একক রেকর্ড নেই।
বিমান বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ: ১৯৭১ সালের মাত্র ১৩ দিনের প্রথাগত যুদ্ধে পাকিস্তানের তৎকালীন অত্যাধুনিক ৭৫টি যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছিল।
ট্যাংক ধ্বংসের মহাকাব্য: এক যশোর ক্যান্টনমেন্ট ও তার আশেপাশের এলাকাতেই মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত আক্রমণে পাকিস্তানের ১৯টি সাঁজোয়া ট্যাংক পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।
অপারেশন জ্যাকপট: ভারতের মাটিতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং ভারতীয় নৌবাহিনীর দেওয়া গোপন মাইনে সজ্জিত হয়ে বীর বাঙালি নৌ-কমান্ডোরা ‘অপারেশন জ্যাকপট’ পরিচালনা করেন। এর মাধ্যমে মোংলা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ বন্দরে পাকিস্তানের প্রধান প্রধান যুদ্ধজাহাজ, সাপ্লাই ভেসেল ও গানবোট ধ্বংস করে নদীর তলদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এগুলো কোনো ছোটখাটো বিষয় ছিল না; এটি ছিল একটি সুশিক্ষিত ও আধুনিক নৌবাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার মতো ঐতিহাসিক সামরিক অপারেশন।
১৫টি জাহাজের আজগুবি গালগল্প ও চট্টগ্রাম বন্দরের বাস্তবতা
পাকিস্তানের হয়ে দালালি করা কিছু বাঙালি কুলাঙ্গার রটিয়েছে যে, যুদ্ধের পর ভারত নাকি ১৫টি বড় বড় কার্গো জাহাজে করে পাকিস্তানের রেখে যাওয়া ২৭০০ কোটি টাকা মূল্যের অস্ত্র ভারতে লুট করে নিয়ে গেছে। এই মিথ্যাচারটি যে কতটা গণ্ডমূর্খতাসম্পন্ন, তা একটু বৈজ্ঞানিক ও লজিস্টিক্যালি চিন্তা করলেই বোঝা যায়।
চট্টগ্রাম বন্দরের মাইন ও নৌ-বাস্তবতা
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে, তখন পাকিস্তানি নৌবাহিনী চট্টগ্রাম ও চালনা (মোংলা) বন্দরের প্রবেশপথে শত শত মাইন (Sea Mines) পুঁতে রেখেছিল এবং অসংখ্য জাহাজ ডুবিয়ে বন্দরের স্বাভাবিক চ্যানেল সম্পূর্ণ ব্লক করে দিয়েছিল। যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের অনুরোধে সাড়া দিয়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (রাশিয়া) নৌবাহিনী রিয়ার অ্যাডমিরাল জুয়েনকোর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বন্দরে মাইন অপসারণের এক বিশাল ও ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন শুরু করে।
এই মাইন পরিষ্কার করে চট্টগ্রাম বন্দরকে পুরোপুরি নিরাপদ ও সচল করতে রাশিয়ার নৌবাহিনীর সময় লেগেছিল প্রায় ৪ বছর (১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের শেষভাগ)।
এখন প্রশ্ন হলো, যে বন্দরের চ্যানেল মাইন দিয়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে, যেখানে সাধারণ নৌযান চলাই অসম্ভব ছিল, সেখানে কোন আলাদিনের চেরাগ দিয়ে ভারত ১৫টি বিশাল আকৃতির মালবাহী জাহাজ বন্দরে ভেড়াল এবং ২৭০০ কোটি টাকার অস্ত্র বোঝাই করে ভারতের দিকে নিয়ে গেল? এই আজগুবি গল্পের কি কোনো যৌক্তিক ভিত্তি আছে?
পাকিস্তানের কোনো সামরিক বাজেটই ছিল না পূর্ব পাকিস্তানের জন্য
বাস্তবতা হলো, ১৯৭১ সালে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক আমদানি-রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং তীব্র অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে পাকিস্তান নিজে দেউলিয়া হওয়ার পথে ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট সামরিক বাজেট বা স্থায়ী সম্পদ ছিল না। তারা সীমান্ত ও যুদ্ধের যাবতীয় অস্ত্র সাময়িকভাবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে উড়ে আসা বিমানে বা জাহাজে করে নিয়ে এসেছিল।
এমনকি তারা বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের এতটাই অবিশ্বাস করতো যে, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী বা বিমানবাহিনীর কোনো উচ্চ পদে বা কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় কোনো বাঙালিকে নিয়োগ দেওয়া হতো না। তাহলে পাকিস্তান আমাদের জন্য কোন ‘সোনার খাজনা’ রেখে গিয়েছিল, যা ভারত এসে নিয়ে গেল?
আইনি ও আন্তর্জাতিক প্রমাণের অভাব
বিগত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে অনেক ভারত-বিরোধী ও পাকিস্তানপন্থী সরকার ক্ষমতায় এসেছে। জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে এরশাদ এবং পরবর্তীতে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বহু বছর দেশ শাসন করেছে। ভারত যদি সত্যিই ২৭০০ কোটি টাকার অস্ত্র বা ফ্যাক্টরি লুট করে নিয়ে যেত, তবে কেন জিয়াউর রহমান বা খালেদা জিয়ার সরকার জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালতে ভারতের বিরুদ্ধে একটি মামলাও দায়ের করতে পারল না? কেন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে এর পক্ষে একটিমাত্র অফিশিয়াল বা নথিবদ্ধ প্রমাণও তারা উপস্থাপন করতে পারেনি? আসলে চামড়ার মুখ দিয়ে যা ইচ্ছা তাই বললেই তা ইতিহাসের দলিল হয় না, তার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রমাণ লাগে, যা এই পঙ্গপালদের কাছে কখনোই ছিল না।
শূন্য থেকে সশস্ত্র বাহিনী গঠন: ভারতের উপহার ও বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা
অপপ্রচারকারীরা দাবি করে যে ভারত নাকি আমাদের সব অস্ত্র নিয়ে গেছে। তাহলে আমার প্রশ্ন ভারত যদি সব অস্ত্রই নিয়ে গিয়ে থাকে, তবে যুদ্ধের পর গঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন উপ-প্রধান জিয়াউর রহমান কি লাঠি হাতে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে সিকিউরিটি গার্ডের দায়িত্ব পালন করছিলেন? আমাদের জোয়ানরা কি গাছের ডাল দিয়ে কুচকাওয়াজ করতো?
প্রকৃত সত্য হলো, স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রতিটি ইটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ভারতের সরাসরি অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ এবং উপহারের মাধ্যমে।
১. বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জন্ম (Kilo Flight)
১৯৭১ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর, যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থাতেই ভারতের নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি পরিত্যক্ত রানওয়েতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়, যা ‘কিলো ফ্লাইট’ নামে পরিচিত। ভারত সরকার বাংলাদেশকে উপহার হিসেবে দিয়েছিল:
১টি ডিসি-৩ (DC-3) ডাকোটা বিমান
১টি টুইন অটার (Twin Otter) বিমান
১টি অ্যালুয়েট-৩ (Alouette III) হেলিকপ্টার
এই উপহারের বিমানগুলো দিয়েই আমাদের বীর বিমান সেনারা ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর মধ্যরাতে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও চট্টগ্রামের তেল ডিপোতে সফল বিমান হামলা চালিয়ে পাকিস্তানি রসদ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে, ১৯৭২ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি স্বাধীন দেশে একটিমাত্র ডিসি-৩ বিমান নিয়ে ‘বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্স’ (পরবর্তীতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স) যাত্রা শুরু করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ১০ই ফেব্রুয়ারি এক পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের সময় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। এই সংকটের মুহূর্তে ভারত সরকার আবারও এগিয়ে আসে এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বাংলাদেশকে দুটি ফকার এফ-২৭ (Fokker F-27) যাত্রীবাহী বিমান উপহার দেয়, যা দিয়ে আমাদের বেসামরিক বিমান চলাচল সচল হয়। এরপর ১৯৭২ সালের ৪ঠা মার্চ ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশকে একটি বোয়িং ৭০৭ চার্টার্ড বিমান প্রদান করে।
২. বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ভিত্তি
১৯৭১ সালের জুলাই মাসে ভারতের নৌবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এবং তাদের উপহার দেওয়া দুটি যুদ্ধজাহাজ ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’ এবং মাত্র ৪৫ জন নৌ-কমান্ডো নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল পথচলা শুরু হয়েছিল। যে নৌবাহিনীর নিজের অস্তিত্বই ছিল ভারতের দেওয়া জাহাজের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এই আহম্মকরা কীভাবে প্রচার করে যে তাদের ‘বাপ পাকিস্তান’ এখানে সোনার জাহাজ রেখে গিয়েছিল আর ভারত তা চুরি করেছে? এদের ন্যূনতম লজ্জাবোধও নেই।
৩. বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অস্ত্র ও রসদ
১৯৭১ সালের জুন মাসে ভারতের দেওয়া লক্ষ লক্ষ আধুনিক রাইফেল, মেশিনগান, গোলাবারুদ এবং ভারতীয় সরকারের দেওয়া তহবিল থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বেতন ও রেশনের মাধ্যমেই আমাদের নিয়মিত সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন সেক্টর গঠিত হয়েছিল। অস্ত্র দিল ভারত, প্রশিক্ষণ দিল ভারত, আর যুদ্ধ শেষে ভাব নেয় পাকিস্তানের দোসরেরা!
প্রোপাগান্ডার মূল হোতা: সিদ্দিক সালিক ও মেজর জলিলের সত্য কাহিনী
এই যে ভারত কর্তৃক অস্ত্র ও ফ্যাক্টরি লুটের গালগল্প, এর জন্মদাতা কে? ইতিহাসের পাতা ওল্টালে আমরা দুজন মূল চরিত্রকে খুঁজে পাই, যারা এই বিষাক্ত মিথ্যার বীজ বপন করেছিলেন।
ক) সিদ্দিক সালিকের মনস্তাত্ত্বিক চাল
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে যৌথ বাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার সামনে যখন জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করেন, তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক বন্দী হিসেবে ভারতের কারাগারে যান। পরবর্তীতে ভারতের জেল থেকে মুক্তি পেয়ে পাকিস্তানে ফিরে তিনি তাঁর বিখ্যাত বই "Witness to Surrender" (আত্মসমর্পণের সাক্ষী) লেখেন।
৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের এই কাপুরুষোচিত আত্মসমর্পণের যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লজ্জা, তা ঢাকতে সিদ্দিক সালিক তাঁর বইয়ে প্রথম এই তত্ত্ব আবিষ্কার করেন যে ভারতীয় বাহিনী নাকি পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ও অস্ত্র লুট করে নিয়ে গেছে। এটি ছিল বিশ্ববাসীর সামনে পাকিস্তানের পরাজয়কে ছোট করে দেখানোর একটি সস্তা চক্রান্ত।
খ) মেজর জলিলের কোর্ট মার্শাল ও চরম বিশ্বাসঘাতকতা
সিদ্দিক সালিকের দেওয়া এই গালগল্পে এদেশের মাটিতে রসদ সরবরাহ করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ৯ নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর এম এ জলিল। প্রোপাগান্ডাকারীরা মেজর জলিলকে একজন মহান দেশপ্রেমিক হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়, যিনি নাকি ‘ভারতীয় লুটপাটের প্রতিবাদ করতে গিয়ে’ গ্রেফতার হয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তব সামরিক রেকর্ড কী বলে?
১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের মাত্র ১৫ দিনের মাথায়, ১৯৭১ সালের ৩১শে ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর সরাসরি আদেশে মেজর জলিলকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর লুটপাটের প্রতিবাদের কোনো অভিযোগ ছিল না; তাঁর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল বিজয়-পরবর্তী বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে খুলনা ও সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় নিজস্ব বাহিনী দিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক ডাকাতি, থানা লুট এবং ব্যক্তিগতভাবে সম্পদ পাচারের মতো গুরুতর অপরাধ।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মেজর জলিলের যথাযথ কোর্ট মার্শাল হয়েছিল এবং বঙ্গবন্ধু সরকার ও পরবর্তী জিয়াউর রহমান সরকার উভয় আমলেই তিনি বিভিন্ন অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত ও দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। এই ক্ষোভ ও রাজনৈতিক দেউলিয়াগ্রস্ততা থেকে মুক্তি পেয়ে মেজর জলিল জাসদের রাজনীতিতে যোগ দেন এবং তৎকালীন সময়ে জামায়াতে ইসলামীকে পুনর্বাসিত করতে জাসদের ছায়াতলে আশ্রয় দেন।
সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, যে মানুষটি নাকি জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন, ১৯৮৯ সালে তাঁর রহস্যময় মৃত্যু হলো পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে! তিনি কি মৃত্যুর আগে চিকিৎসার জন্য বা আশ্রয়ের জন্য পৃথিবীর আর কোনো দেশ খুঁজে পাননি? আসলে এরা ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ছদ্মবেশী গুপ্তচর।
ইতিহাসে এমন বিশ্বাসঘাতকতা নতুন কিছু নয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও জার্মানির যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নে জন্ম নেওয়া উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা গেনরিখ লিউশকভ (Genrikh Lyushkov) যেভাবে নিজের দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে জার্মানির নাৎসি বাহিনীর প্রধান গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করেছিলেন, মেজর জলিলের ভূমিকাও ছিল ঠিক তেমনই।
জাসদের লুঙ্গির তলায় জামায়াতের পুনর্বাসন
মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামী ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সেই সময় প্রায় ৩০ হাজার চিহ্নিত রাজাকার, আল-বদর ও খুনিকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু জামায়াতের ভণ্ড নেতারা অত্যন্ত চতুরতার সাথে জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)-এর ভেতরে অনুপ্রবেশ করে।
জাসদের ছায়াতলে ঢুকে তারা সেই ৩০ হাজার চিহ্নিত বন্দী রাজাকারকে রাতারাতি ‘৩০ হাজার জাসদ কর্মী বা মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে নতুন নাম দেয়, যাদের নাকি শেখ মুজিব সরকার হত্যা বা বন্দী করেছে! জাসদের উগ্র ও হঠকারী রাজনীতিকে ব্যবহার করে জামায়াত এদেশে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল, আর তাদের মূল হোতারা পালিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানে।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও রিজার্ভের তাত্ত্বিক চড়চাপড়
আজ ২০২৬ সালের ৭ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বিশাল জাতীয় বাজেট আর শক্তিশালী অর্থনৈতিক বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে যারা ভাবছেন ১৯৭১ সালেও বাংলাদেশ হয়তো এমনই উন্নত ছিল, তাদের মাথায় ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক জ্ঞানের চরম অভাব রয়েছে।
ক) লণ্ডভণ্ড বাংলাদেশ ও শূন্য কোষাগার
১৯৭১ সালের যুদ্ধের ঠিক আগে, ১৯৭০ সালে বাংলাদেশে শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ‘গোর্কি’ আঘাত হেনেছিল, যাতে প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ মারা যায়। একদিকে ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড দেশ, অন্যদিকে ৯ মাসের যুদ্ধ ও গণহত্যা। তার ওপর, পরাজয় নিশ্চিত আঁচ করতে পেরে পাকিস্তানি দোসরেরা বিজয়ের ঠিক আগের দিনগুলোতে বাংলাদেশের সেন্ট্রাল ব্যাংকের সমস্ত কারেন্সি নোট, সোনা এবং বৈদেশিক মুদ্রা পুড়িয়ে ছাই করে দেয় অথবা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাচার করে দেয়। ১৬ই ডিসেম্বর স্বাধীন সরকারের হাতে দেশ পুনর্গঠনের জন্য একটা ফুটো পয়সাও ছিল না।
খ) ৩১৩ থেকে ৪০ হাজার কারখানার মহাকাব্য
১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন, তখন পাকিস্তান আমলের মাত্র ৩১৩টি পরিত্যক্ত, ভাঙাচোরা ও বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু করতে হয়েছিল। সেই ৩১৩টি কারখানা থেকে আজ ২০২৬ সালে বাংলাদেশ চল্লিশ হাজারেরও বেশি আধুনিক কারখানার এক বিশাল শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
ভারত যদি গত ৫৪ বছর ধরে বাংলাদেশ লুটই করত, তবে বাংলাদেশের আজ আফ্রিকার কোনো দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশের মতো ভিক্ষা করার কথা ছিল। যেখানে পাকিস্তানের পাঞ্জাবের ব্যবসায়ী ও তাদের চেম্বার অব কমার্স ভারতের বিরুদ্ধে ২১০ কোটি টাকার কারখানার ক্ষয়ক্ষতির দাবি তুলছে, সেখানে বাংলাদেশের কিছু অকৃতজ্ঞ পঙ্গপাল প্রচার করছে যে ভারত নাকি ১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ফ্যাক্টরি আমাদের মাথার ওপর দিয়ে ওড়ায়ে নিয়ে গেছে! এমন হাস্যকর ও অকৃতজ্ঞ জাতি পৃথিবীর আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
গ) রিজার্ভের বাস্তব চপেটাঘাত
আসুন আমরা পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বর্তমান রিজার্ভের একটি সাধারণ অর্থনৈতিক তুলনা করি, যা এই প্রচারণাকারীদের মুখে সবচেয়ে বড় চড় মারবে:
পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থা: স্বাধীনতার ৭৮ বছর হয়ে গেলেও পারমাণবিক শক্তিধর এবং বাংলাদেশের চেয়ে পাঁচ গুণ বড় পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আজ ১০ বিলিয়ন ডলারের নিচে ঘোরাফেরা করছে। তারা দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচতে বিশ্বব্যাংক আর আইএমএফের পায়ে ধরে কাঁদছে।
বাংলাদেশের রূপান্তর: অন্যদিকে, ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার যখন ক্ষমতা ছাড়ে, তখন বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল মাত্র ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সেই ১ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ শেখ হাসিনার দূরদর্শী অর্থনৈতিক নেতৃত্বে পরবর্তী বছরগুলোতে সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে গিয়ে পৌঁছেছিল, যা পাকিস্তানের রিজার্ভের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
যদি ২৩ বছর পাকিস্তানিরা আমাদের শোষণ করে থাকে এবং গত ৫৪ বছর ধরে ভারত আমাদের লুট করে থাকে, তবে বাংলাদেশের হাতে কি কোনো ‘আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ’ ছিল যে আমাদের অর্থনীতি এভাবে রকেটের গতিতে এগিয়ে গেল আর পাকিস্তানের অর্থনীতি ডাস্টবিনে চলে গেল? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর প্রোপাগান্ডাকারীদের কাছে নেই।
অপপ্রচার বনাম ঐতিহাসিক বাস্তবতা
পাঠকদের সুবিধার্থে জামায়াত-শিবির ও পঙ্গপালদের মূল অপপ্রচার এবং তার বিপরীতে অকাট্য ঐতিহাসিক সত্যগুলো নিচে একটি সুনির্দিষ্ট টেবিল ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
অপপ্রচারের বিষয় (Myth) | বাস্তব তথ্য ও ঐতিহাসিক প্রমাণ (Reality) | তথ্যের উৎস ও দলিল (Source) |
ভারত ১৫টি জাহাজে করে ২৭০০ কোটি টাকার অস্ত্র লুট করেছে। | চট্টগ্রাম বন্দর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত মাইন ও sunken ship দিয়ে ব্লক ছিল। রাশিয়ার নৌবাহিনীর মাইন পরিষ্কার করতে ৪ বছর লেগেছে। জাহাজ চলাচল অসম্ভব ছিল। | সোভিয়েত নৌবাহিনীর মাইন সুইপিং রেকর্ড (১৯৭২-৭৫) |
ভারত বাংলাদেশের সব কলকারখানা নিয়ে গেছে। | মাত্র ৩১৩টি পরিত্যক্ত কারখানা নিয়ে বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করে, যা আজ ২০২৬ সালে ৪০,০০০ ছাড়িয়েছে। | বাংলাদেশ শিল্প মন্ত্রণালয় ও প্রথম বাজেট (৩০ জুন ১৯৭২) |
মেজর জলিল ভারতীয় লুটপাটের প্রতিবাদ করায় বন্দী হন। | মেজর জলিলকে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে জেনারেল ওসমানীর আদেশে ব্যাংক ও থানা ডাকাতির অভিযোগে গ্রেফতার ও কোর্ট মার্শাল করা হয়। ১৯৮৯ সালে তিনি ইসলামাবাদে মারা যান। | বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আর্কাইভ ও কোর্ট মার্শাল রেকর্ড |
ভারত চিরদিনের জন্য বাংলাদেশ দখল করতে চেয়েছিল। | মুক্তিযুদ্ধের মাত্র ৩ মাসের মাথায়, ১৯৭২ সালের ১২ই মার্চ ভারতীয় সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ সম্মান ও শৃঙ্খলার সাথে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়। | আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও ১৯৭২ সালের যৌথ ঘোষণা |
পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানে বিশাল সামরিক বাজেট রেখে গিয়েছিল। | পূর্ব পাকিস্তানে কোনো অস্ত্র কারখানা ছিল না। গাজীপুর POF ও ঢাকা COD ছিল স্রেফ পশ্চিম পাকিস্তানের অস্ত্র সরবরাহের গুদাম। | গ্লোবাল সিকিউরিটি ও মিলিটারি হিস্ট্রি ডাটাবেজ |
১ কোটি শরণার্থী বাংলাদেশের ওপর স্থায়ী বোঝা ছিল। | ভারত সরকার ৮২৬টি ক্যাম্পে ১ কোটি মানুষকে আশ্রয় দেয় এবং ফিরে আসার সময় ৯০ লক্ষ মানুষকে ২ সপ্তাহের ফ্রি রেশন, নগদ টাকা ও চিকিৎসা দেয়। | ইউএনএইচসিআর (UNHCR) ও ভারত সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় রিপোর্ট (১৯৭২) |
এক কোটি শরণার্থী ও অভূতপূর্ব সৈন্য প্রত্যাহার
সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসের পাতা ওল্টালে আপনি এমন একটিও উদাহরণ দেখাতে পারবেন না, যেখানে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র আরেকটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে ১ লক্ষ সৈন্যের মাধ্যমে বিজয় নিশ্চিত করার পর, কোনো প্রকার রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক স্বার্থ ছাড়াই মাত্র তিন মাসের মধ্যে নিজের দেশে ফিরে গেছে।
ক) শরণার্থীদের জন্য ভারতের ত্যাগ
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার মুখে পড়ে বর্ডার পার হওয়া ১ কোটি নিঃস্ব বাঙালি শরণার্থীকে আশ্রয় দিতে ভারত সরকার পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ে ৮২৬টি আশ্রয়ণ কেন্দ্র বা রিফিউজি ক্যাম্প নির্মাণ করেছিল। ভারতের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রতিদিন ১ কোটি মানুষের অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের জোগান দেওয়া কতটা কঠিন ছিল, তা সহজেই অনুমেয়।
শুধু তাই নয়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন শরণার্থীরা বাংলাদেশে ফিরে আসছিলেন, তখন ভারত সরকার প্রায় ৯০ লক্ষ শরণার্থীকে সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে দুই সপ্তাহের অগ্রিম ড্রাই রেশন, নগদ পকেট মানি এবং বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা সেবা ও যানবাহন দিয়ে বর্ডার পার করে দিয়েছিল।
খ) সৈন্য প্রত্যাহারের ঐতিহাসিক নজির
১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগ পর্যন্ত এই বিশাল শরণার্থী পুনর্বাসন ও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ সময় লেগেছিল। আর এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার মাত্র ১২ থেকে ১৫ দিনের মাথায় অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১২ই মার্চ তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুরোধে সাড়া দিয়ে সম্পূর্ণ ভারতীয় মিত্রবাহিনীকে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি থেকে চিরতরে প্রত্যাহার করে নেন।
ভারত যদি আসলেই ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব সারেন্ডার’ (Instrument of Surrender)-এর সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশকে নিজের অঙ্গরাজ্য বানাতে চাইত বা দখল করতে চাইত, তবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সেই সময় সদ্য স্বাধীন ও সামরিকভাবে দুর্বল বাংলাদেশের পক্ষে ভারতকে ঠেকানো অসম্ভব ছিল।
কিন্তু ভারতের মহানুভবতা, ত্যাগ, এবং আমাদের স্বাধীনতার প্রতি তাদের অকৃত্রিম সম্মান ছিল বলেই তারা নিঃস্বার্থভাবে ফিরে গিয়েছিল। ভারতের এই সাহসিকতা, মানবিকতা ও বিশাল আত্মত্যাগকে আজ যারা ‘দুর্বলতা’ বা ‘লুটপাট’ বলে গালি দেয়, তারা আসলে আহম্মক, অকৃতজ্ঞ এবং কুলাঙ্গার ছাড়া আর কিছুই নয়।
আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আইন এবং ‘পাকিস্তানি অস্ত্রের মালিকানা’
অপপ্রচারকারীরা যে দাবি করে "ভারত পাকিস্তানের ফেলে যাওয়া ২৭০০ কোটি টাকার অস্ত্র লুট করেছে", তা আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আইন (International Laws of War) এবং জেনেভা কনভেনশনের মৌলিক নীতি অনুযায়ী সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রসূত।
ক) ‘ওয়ার ট্রফি’ ও যৌথ কমান্ডের অধিকার
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, একটি যুদ্ধে যখন কোনো সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে, তখন তাদের ব্যবহৃত সমস্ত অস্ত্র, গোলাবারুদ, ট্যাংক এবং যুদ্ধবিমান বিজয়ী বাহিনীর (Capturing Forces) আইনি সম্পত্তি বা ‘War Booty’ / ‘War Trophy’ হিসেবে গণ্য হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী কিন্তু এককভাবে বাংলাদেশের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি; তারা আত্মসমর্পণ করেছিল ‘ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ কমান্ড’ (Joint Command of India and Bangladesh) এর কাছে।
খ) ওগুলো বাংলাদেশের সম্পদ ছিল না, ছিল গণহত্যার হাতিয়ার
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে সাঁজোয়া ট্যাংক (যেমন: মার্কিন Patton Tank), কামান বা সেবার জেট (F-86 Sabre) ব্যবহার করেছিল, সেগুলো বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ছিল না। ওগুলো ছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আনা এদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে খুন করার মারণাস্ত্র।
যেহেতু ভারত এই যুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পশ্চিম এবং পূর্ব দুই ফ্রন্টেই একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক যুদ্ধ লড়েছিল এবং তাদের হাজার হাজার সৈন্য শহীদ হয়েছিল, তাই যৌথ কমান্ডের চুক্তি অনুযায়ী ভারী সামরিক সরঞ্জামগুলোর একটি অংশ ভারত তাদের যুদ্ধলব্ধ সম্পত্তি হিসেবে নিয়ে যায়, যা সম্পূর্ণ আইনসম্মত। একে ‘লুটপাট’ বলা কেবল আইনি মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
সোভিয়েত নাবিক ইউরি রেদকিন-এর আত্মত্যাগ: ‘জাহাজ লুট’ তত্ত্বের কফিনে শেষ পেরেক
আগের আলোচনায় আমি উল্লেখ করেছি যে, চট্টগ্রাম বন্দর মাইন দিয়ে ব্লক থাকায় ভারত কর্তৃক ১৫টি বড় বড় জাহাজে অস্ত্র লুটের গল্পটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এই সত্যটিকে আরও বেশি সুপ্রতিষ্ঠিত করে সোভিয়েত ইউনিয়নের নৌবাহিনীর এক বীর নাবিকের আত্মত্যাগের ইতিহাস।
১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে সোভিয়েত নৌবাহিনীর একটি বড় দল রিয়ার অ্যাডমিরাল অ্যান্ড্রি জুয়েনকোর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। বন্দরটি এতটাই বিপজ্জনক অবস্থায় ছিল যে, মাইন অপসারণের কাজ চলাকালীন ১৯৭২ সালের ১৩ই জুলাই সোভিয়েত নাবিক ইউরি রেদকিন (Yuri Redkin) একটি মাইনের বিস্ফোরণে শহীদ হন। চট্টগ্রাম বন্দরে এখনো এই বীর সোভিয়েত নাবিকের সমাধি রয়েছে এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রতি বছর তাঁকে সামরিক সম্মান জানায়।
এখন সাধারণ বুদ্ধিতে চিন্তা করুন ১৯৭২ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত যেখানে স্বয়ং পরাশক্তি রাশিয়ার আধুনিক ডাইভাররা মাইন বিস্ফোরণে মারা যাচ্ছেন, বন্দর সচল করতে হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর বা ১৯৭২ সালের শুরুর দিকে ভারত কীভাবে বড় বড় ১৫টি কার্গো জাহাজ এনে নিশ্চিন্তে অস্ত্র বোঝাই করে নিয়ে চলে গেল? এই একটি ঐতিহাসিক মৃত্যুই প্রমাণ করে যে জামায়াত-শিবিরের ছড়ানো সেই জাহাজের গল্পটি ছিল স্রেফ টেবিল টক এবং মনগড়া ফ্যান্টাসি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকা পোড়ানো এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কারেন্সি ক্রাইসিস
পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের ব্যাংকার দোসরেরা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য এক জঘন্য অর্থনৈতিক নাশকতা চালিয়েছিল, যা বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানে না।
টাকা পুড়িয়ে ছাই করা: ১৯৭১ সালের ১০ থেকে ১৫ই ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা এবং সিলেটের ‘স্টেট ব্যাংক অফ পাকিস্তান’-এর আঞ্চলিক শাখাগুলো থেকে কোটি কোটি টাকার কারেন্সি নোট (তৎকালীন পাকিস্তানি রূপী) ব্যাংকের ভল্ট থেকে বের করে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
সোনার বার পাচার: ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা সমস্ত সোনার বার এবং বৈদেশিক মুদ্রা সামরিক বিমানের মাধ্যমে করাচিতে পাচার করে দেওয়া হয়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর সরকারের কাছে দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য নতুন নোট ছাপানোর মতো কোনো সিকিউরিটি প্রেস বা অর্থ ছিল না। সেই চরম অর্থনৈতিক ক্রাইসিসের সময় আবারও এগিয়ে আসে ভারত। ভারতের সিকিউরিটি প্রেস থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ‘টাকা’ (নোট) ছেপে দেওয়া হয়েছিল এবং ভারত সরকার সাময়িকভাবে তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের বাজার সচল রেখেছিল। যারা প্রচার করে "ভারত বাংলাদেশের বদনা-ঘটি লুট করেছে", তাদের জিজ্ঞেস করা উচিত যে ভারত আমাদের নিজেদের পকেটের টাকা ছেপে দিয়ে বাজার সচল করেছে, তারা আমাদের ঘটি-বাটি চুরি করতে আসবে কেন?
জাসদ এবং জামায়াতে ইসলামীর ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ আঁতাত
মুক্তিযুদ্ধের পর জামায়াতে ইসলামী আইনিভাবে নিষিদ্ধ হলে তাদের নেতারা ছদ্মবেশ ধারণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি নেয়। তারা তৎকালীন সময়ে নবগঠিত এবং সরকারের ঘোর বিরোধী দল ‘জাসদ’ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)-এর ভেতরে ব্যাপকভাবে অনুপ্রবেশ করে।
কেন তারা জাসদকে বেছে নিয়েছিল?
সরকার বিরোধী প্ল্যাটফর্ম: জাসদ তখন বঙ্গবন্ধুর সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্রহাতে গণবাহিনী গঠন করে লড়ছিল। জামায়াতের টার্গেট ছিল এই বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করা।
রাজাকারদের মুক্তিযোদ্ধা সাজানো: ট্রাইব্যুনাল থেকে বাঁচতে হাজার হাজার চিহ্নিত আল-বদর ও রাজাকার জাসদের কর্মী সেজে যায়। পরবর্তীতে এই চক্রটিই প্রচার করতে শুরু করে যে, "বঙ্গবন্ধু সরকার ৩০ হাজার জাসদ কর্মীকে হত্যা করেছে।" মূলত ওই ৩০ হাজারের বিশাল অংশই ছিল ছদ্মবেশী রাজাকার ও আল-বদর, যাদের জামায়াত-শিবির আজ জাসদ বা সাধারণ ‘মুক্তিকামী’ সাজিয়ে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করে।
পাকিস্তানের বর্তমান রিজার্ভ সংকট বনাম বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চড়চাপড়
বর্তমান ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক সূচকের দিকে তাকালে এই পঙ্গপালদের সমস্ত ভারত-বিরোধিতা এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। তারা দাবি করে, ভারত গত ৫৪ বছর ধরে বাংলাদেশকে চুষে খাচ্ছে। আসুন স্রেফ সংখ্যার খেলায় বাস্তবতাকে বুঝে নিই:
অর্থনৈতিক দেউলিয়া পাকিস্তান: যে পাকিস্তানের জন্য এই পঙ্গপালদের এত বুক ফাটানো কান্না, সেই পাকিস্তানের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (Foreign Exchange Reserves) গত কয়েক বছর ধরে মাত্র ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে। তাদের পুরো দেশ চলছে আইএমএফ, চীন এবং সৌদি আরবের ঋণের ওপর।
লুট হওয়া বাংলাদেশের উত্থান: অন্যদিকে, গত ৫৪ বছর ধরে ভারতের হাতে তথাকথিত ‘লুট’ হওয়ার পরও বাংলাদেশের রিজার্ভ স্বাভাবিক সময়ে ৩২ থেকে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। এমনকি ২০২৬ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের একক অর্থনীতির আকার এবং মাথাপিছু আয় পাকিস্তানকে বহু পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে।
যদি ভারত সত্যিই বাংলাদেশকে লুট করতো, তবে বাংলাদেশের রিজার্ভ থাকার কথা ছিল শূন্য, আর পাকিস্তানের রিজার্ভ থাকার কথা ছিল আকাশের উঁচুতে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। এর থেকেই প্রমাণিত হয়, পাকিস্তানীদের রেখে যাওয়া কোনো ‘সোনার খনি’ ছিল না, যা ছিল তা হলো এদেশের মানুষের রক্ত চোষা শাসন। আর বাংলাদেশ আজ যা অর্জন করেছে, তা এদেশের মানুষের পরিশ্রম এবং সঠিক বন্ধুত্বের ফসল।
অকৃতজ্ঞতার কুয়াশা ও সত্যের সূর্যোদয়
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্য হলো মিথ্যা দিয়ে সাময়িকভাবে মানুষের চোখ বেঁধে রাখা যায়, কিন্তু সত্যের সূর্যোদয়কে কোনোদিন ঠেকানো যায় না। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের নতজানু আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে এদেশের মাটিতে যে প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, তার গায়ে কালিমা লেপন করতে গত সাড়ে পাঁচ দশক ধরে যে প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে, তা আজ ২০২৬ সালের এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সম্পূর্ণ মুখ থুবড়ে পড়েছে।
অস্ত্র ছিল ভারতের, প্রশিক্ষণ ছিল ভারতের, অর্থ ছিল ভারতের, আর ১ কোটি মানুষের আশ্রয়ের জোগানদাতাও ছিল ভারত। যুদ্ধ শেষে যারা পাকিস্তানের ভাঙা চামচ ও রেখে যাওয়া শূন্য গোডাউনকে ‘সোনার খনি’ বানিয়ে ভারতকে চোর সাজাতে চায়, তাদের এই নোংরা রাজনীতি এদেশের মানুষ ধরে ফেলেছে।
আসুন, আমরা আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে জানি, আমাদের প্রকৃত বন্ধুদের সম্মান করতে শিখি এবং যে পঙ্গপালের দল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বসে প্রতিনিয়ত পাকিস্তানের হয়ে দালালি করে ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করে, তাদের এই আজগুবি মিথ্যা প্রোপাগান্ডাকে তথ্যের আলো দিয়ে চিরতরে অন্ধকার বিনেষ্ট করি। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এবং থাকবে; কোনো ছদ্মবেশী রাজাকারের বংশধরদের মিথ্যাচার এই সত্যকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারবে না।














