>

>

স্বাধীনতার মহানায়করাই যখন নিজ জাতির গাদ্দারির শিকার - বীরদের পরম ট্র্যাজেডি

স্বাধীনতার মহানায়করাই যখন নিজ জাতির গাদ্দারির শিকার - বীরদের পরম ট্র্যাজেডি

চে গুয়েভারার মতো বিশ্ববিপ্লবী থেকে শুরু করে মিশরের দেশপ্রেমিক সেনাপতি মোহাম্মদ কারিম, কিংবা বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান - মহানায়ক হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের জীবনাবসানের নেপথ্যে ছিল সেই জাতিরই একাংশের নিদারুণ গাদ্দারী। বিশ্বসভ্যতার বিবর্তনে দেখা যায় বিপ্লব, স্বাধিকার বা সার্বভৌমিক স্বাধীনতার জন্য যেসব মহানায়ক নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের অধিকাংশকেই প্রকাশ্যে বা পরোক্ষভাবে শত্রুর সরাসরি অস্ত্রের আঘাতে জীবন দিতে হয়নি; বরং তাঁরা চরম নির্মমতার শিকার হয়েছেন নিজ জাতির একাংশের কাপুরুষতা, সংকীর্ণ স্বার্থপরতা এবং অতলান্ত বিশ্বাসঘাতকতার।

TruthBangla

স্বাধীনতার মহানায়করাই যখন নিজ জাতির গাদ্দারির শিকার - বীরদের পরম ট্র্যাজেডি

ইতিহাসের ধূলিমলিন পৃষ্ঠাগুলো উল্টালে এমন কিছু নির্মম ও রক্তভেজা সত্যের মুখোমুখি হতে হয়, যা মানুষের বিবেককে স্তব্ধ করে দেয়। বিশ্বসভ্যতার বিবর্তনে দেখা যায় বিপ্লব, স্বাধিকার বা সার্বভৌমিক স্বাধীনতার জন্য যেসব মহানায়ক নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের অধিকাংশকেই প্রকাশ্যে বা পরোক্ষভাবে শত্রুর সরাসরি অস্ত্রের আঘাতে জীবন দিতে হয়নি; বরং তাঁরা চরম নির্মমতার শিকার হয়েছেন নিজ জাতির একাংশের কাপুরুষতা, সংকীর্ণ স্বার্থপরতা এবং অতলান্ত বিশ্বাসঘাতকতার।

লাতিন আমেরিকার দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গলে শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য লড়তে গিয়ে এক সাধারণ রাখালের দালািলতে ধরা পড়া চে গুয়েভারা থেকে শুরু করে সাম্রাজ্যবাদী নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে আলেকজান্দ্রিয়া রক্ষায় বীরত্ব দেখিয়ে নিজ দেশের ব্যবসায়ী সমাজের বিশ্বাসঘাতকতায় প্রাণ দেওয়া মিশরের সেনাপতি মোহাম্মদ কারিম কিংবা হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি জাতিকে স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দেওয়ার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় স্বজাতিরই ঘাতক চক্রের হাতে সপরিবারে নৃশংসভাবে নিহত হওয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ কেবল তিনজন ব্যক্তির জীবনাবসান নয়, এগুলো মানব সভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম তিনটি মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি।

এই বিস্তৃত প্রবন্ধে আমরা এই তিন মহানায়কের সংগ্রাম, তাঁদের জীবনাবসানের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, এবং স্বজাতির গাদ্দারির নেপথ্যে থাকা সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক উপাদানগুলো গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে উন্মোচন করব।

জাতির মহান নেতার আত্মত্যাগ ও জাতির গাদ্দারি

নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পর্যায় হলো নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ। একজন প্রকৃত নেতা যখন নিজের সুখে-স্বাচ্ছন্দ্য, পারিবারিক নিরাপত্তা এমনকি জীবন বাজি রেখে একটি নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে মাঠে নামেন, তখন সাধারণ রাজনৈতিক সমীকরণ অনুযায়ী সেই জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে অখণ্ড সমর্থন ও সুরক্ষার দেয়াল পাওয়ার কথা। কিন্তু মানব ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, সাধারণ জনমানসের চিন্তা এবং মহানায়কদের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ফাঁক থেকে যায়।

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতে, বৈপ্লবিক পরিবর্তন বা স্বাধীনতার জন্য যে সুদীর্ঘ ত্যাগের প্রয়োজন হয়, একটি বৃহৎ সাধারণ জনগোষ্ঠী মনস্তাত্ত্বিকভাবে সেই দীর্ঘমেয়াদি ধকল সহ্য করতে চায় না। তারা প্রায়শই ‘তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা’ ও ‘স্বল্পমেয়াদী সুবিধা’-কে অগ্রাধিকার দেয়। এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী, দখলদার সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং অভ্যন্তরীণ সুযোগসন্ধানী দালালরা জাতীয় বীরদের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করে অথবা খুব সহজেই সামান্য অর্থের বা নিরাপত্তার লোভে তাঁদের শত্রুর হাতে তুলে দেয়।

যে প্রশ্নটি ইতিহাসকে বারেবারে তাড়া করে ফেরে তা হলো- যে জাতির মুক্তির জন্য একজন মহানায়ক নিজের জীবন উৎসর্গ করেন, সেই জাতি বা তার একাংশ কেন সেই নেতার পিঠে ছুরি মারে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা, অর্থনৈতিক স্বার্থপরতা, দাসত্বভিত্তিক অভ্যাসের স্বস্তি এবং সর্বপরি একশ্রেণীর মানুষের চরম ক্ষমতার লোভের মধ্যে।

স্বাধীনতার মহানায়করাই যখন নিজ জাতির গাদ্দারির শিকার - বীরদের পরম ট্র্যাজেডি

চে গুয়েভারার ট্র্যাজেডি: ভেড়ার পালের ভয়

লাতিন আমেরিকার বৈপ্লবিক সংগ্রামের এক অবিনশ্বর প্রতীক আর্নেস্টো ‘চে’ গুয়েভারা। কিউবার সফল বিপ্লবের পর চে চাইলেই সদ্য গঠিত সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী হিসেবে বিলাসী ও নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ কেবল একটি দেশের ভৌগোলিক সীমান্তে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিশ্বজুড়ে যতক্ষণ পর্যন্ত একজন মানুষও শোষিত থাকবে, ততক্ষণ বিপ্লব অসম্পূর্ণ। এই সর্বজনীন মুক্তির তাড়নায় তিনি কিউবার ক্ষমতা ও মর্যাদা ছেড়ে কঙ্গোর জঙ্গলে এবং পরবর্তীতে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে দরিদ্র ও অনগ্রসর দেশগুলোর অন্যতম বলিভিয়ায় পাড়ি জমান।

লা হিগুয়েরার জঙ্গল ও মার্কিন সিআইএ অভিযান

১৯৬৬-৬৭ সালের দিকে বলিভিয়ার পাহাড়ি অঞ্চল ‘লা হিগুয়েরা’-য় চে গুয়েভারা তাঁর ছোট গেরিলা বাহিনী ‘জাতীয় মুক্তি বাহিনী’ (ELN) নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সেই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অনুন্নত কৃষকেরা সমাজতন্ত্র বা সার্বিক জাতীয় মুক্তির সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য অনুধাবন করতে পারছিল না। তার ওপর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং বলিভিয়ার স্বৈরশাসক জেনারেল রেনে ব্যারিইয়েন্তোসের প্রশিক্ষিত রেঞ্জার বাহিনী পুরো অঞ্চলজুড়ে এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছিল।

চে গুয়েভারা ভেবেছিলেন যে কৃষক সমাজ শত শত বছর ধরে শোষিত হচ্ছে, তাঁরা বিপ্লবীদের বুকে টেনে নেবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। দারিদ্র্য ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিপীড়ন স্থানীয় কৃষকদের মনস্তত্ত্বকে এতটাই সংকুচিত করে ফেলেছিল যে তারা অপরিচিত বিপ্লবীদের নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করত।

রাখালের বিশ্বাসঘাতকতা

১৯৬৭ সালের ৮ই অক্টোবর, চে গুয়েভারা এবং তাঁর অল্প কয়েকজন সঙ্গী লা হিগুয়েরার ‘ক্যাব্রাডা ডেল ইউরো’ গিরিখাতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। গোপন সূত্র অনুযায়ী, ওই অঞ্চলেরই এক ছাগল/ভেড়ার রাখাল মার্কিন মদদপুষ্ট বলিভীয় সামরিক বাহিনীর কাছে চে গুয়েভারার অবস্থান ফাঁস করে দিয়েছিল। সামান্য কিছু নগদ অর্থ অথবা সামরিক বাহিনীর ভয় থেকে নিজ পশুপালকে বাঁচাতে সেই রাখাল এই জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতাটি ঘটায়।

৯ই অক্টোবর সকালে লা হিগুয়েরার একটি জরাজীর্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনে চে গুয়েভারাকে বন্দি করে রাখা হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কিছু সময় আগে, বন্দী চে-কে পাহারা দেওয়া এক বলিভীয় তরুণ সৈন্য ওই দালাল রাখালকে ডেকে এনে তীব্র ক্ষোভের সাথে প্রশ্ন করেছিল:

"তুমি কীভাবে এমন একজন মানুষকে শত্রুর হাতে ধরিয়ে দিতে পারলে, যিনি নিজের জীবন বাজি রেখে তোমার মতো নিগৃহীত মানুষের অধিকারের জন্য লড়তে এসেছিলেন?"

রাখালটি অত্যন্ত নির্বিকার ও শান্ত কণ্ঠে জবাব দিয়েছিল:

"তার শত্রুদের সাথে এই যুদ্ধ আর গুলির শব্দ আমার ভেড়ার পালকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছিল। আমার ভেড়াগুলো ঠিকমতো ঘাস খেতে পারছিল না।"

সাধারণের দৃষ্টিভঙ্গি বনাম বীরের দূরদর্শিতা

এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু নির্মম কথোপকথনটি বৈপ্লবিক রাজনীতির সবচেয়ে ট্র্যাজিক দিকটিকে উন্মোচিত করে। রাখালের কাছে চে গুয়েভারার দেওয়া সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দীর্ঘমেয়াদি মুক্তির লড়াইয়ের কোনো বাস্তব মূল্য ছিল না। তার কাছে মূল অগ্রাধিকার ছিল তার কয়েকটি ভেড়ার নিরাপদ বিচরণ। সমাজের একটি বড় অংশ বিশাল সামাজিক পরিবর্তন বা স্বাধীনতার দীর্ঘমেয়াদি সুফল বোঝার চেয়ে দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্র বিঘ্ন দূর করাকে বেশি জরুরি মনে করে।

বিপ্লবের ট্র্যাজেডি: চে গুয়েভারা লাতিন আমেরিকার কোটি কোটি শোষিত কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য চিকিৎসা পেশা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ত্যাগ করে বলিভিয়ার দুর্গম পাহাড়ে এসেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই কৃষক শ্রেণীরই এক সদস্যের সংকীর্ণ মানসিকতা ও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তাঁকে জীবনের মূল্য দিতে হয়। এটি প্রমাণ করে, আদর্শিক সচেতনতাহীন জনগোষ্ঠীকে জোর করে মুক্ত করা যায় না; তাদের ভেতরের দাসত্ববোধই বিপ্লবের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।

মোহাম্মদ কারিমের ট্র্যাজেডি: স্বাধীনতার চেয়ে বাণিজ্য বেশি প্রিয়

১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ফরাসি বাহিনী যখন প্রাচীন ও সমৃদ্ধ মিসর অভিযানে আসে, তখন উত্তর আফ্রিকার সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ঐতিহাসিক তোড়জোড় শুরু হয়। নেপোলিয়নের অত্যাধুনিক ফরাসি রণতরী ও কামানের মুখে প্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী সামরিক শক্তিগুলো যখন দিশেহারা, তখন বন্দরনগরী আলেকজান্দ্রিয়া রক্ষার দায়িত্ব ছিল সেখানকার গভর্নর এবং বিখ্যাত মামলুক সেনাপতি মোহাম্মদ কারিমের কাঁধে।

মোহাম্মদ কারিম জানতেন, নেপোলিয়নের বহর আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। তা সত্ত্বেও আলেকজান্দ্রিয়ার স্বাধীনতা ও জাতীয় সম্মান রক্ষা করতে তিনি সাধারণ নাগরিকদের সংগঠিত করেন এবং চরম বীরত্বের সাথে ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কিন্তু পর্যাপ্ত অস্ত্র ও সহায়তার অভাবে আলেকজান্দ্রিয়ার পতন ঘটে এবং মোহাম্মদ কারিম ফরাসি সেনাদলের হাতে বন্দি হন।

কারিমের অদম্য সাহস ও বীরত্ব দেখে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট মুগ্ধ হয়েছিলেন। নেপোলিয়ন বুঝতে পেরেছিলেন, কারিম কোনো সাধারণ বেতনভুক্ত সৈনিক নন, তিনি নিজের মাতৃভূমির সার্বভৌমত্বের প্রতি গভীর ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক।

নেপোলিয়নের প্রস্তাব ও বীরের পরীক্ষা

বন্দি কারিমকে নেপোলিয়নের সামরিক আদালতে হাজির করা হলো। নেপোলিয়ন কারিমের মুখোমুখি হয়ে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব রাখলেন:

"তোমার মতো একজন অসীম সাহসী দেশপ্রেমিককে হত্যা করতে আমার মন চাইছে না। আমি তোমাকে একটি সুযোগ দিতে চাই। তুমি ফরাসি বাহিনীর যে ক্ষতি করেছ, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে যদি ১০,০০০ স্বর্ণমুদ্রা জরিমানা প্রদান করো, তবে আমি তোমাকে মুক্তি দেব এবং আলেকজান্দ্রিয়ার শাসনভার তোমার হাতেই রেখে দেব।"

মোহাম্মদ কারিম এক মুহূর্তে হেসে উঠলেন এবং বললেন:

"আমার কাছে এই মুহূর্তে নগদ এত স্বর্ণমুদ্রা নেই। তবে আলেকজান্দ্রিয়ার যেসব ধনী বণিক ও ব্যবসায়ীদের ধন-সম্পদ ও সম্মান রক্ষা করতে আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করেছি, তাদের কাছে আমার এক লক্ষাধিক স্বর্ণমুদ্রা পাওনা রয়েছে। আমি নগরীতে গিয়ে সেই অর্থ সংগ্রহ করে আনছি।"

নেপোলিয়ন কারিমের প্রস্তাবে সম্মত হলেন এবং ফরাসি সৈন্যদের নজরদারিতে শৃঙ্খলিত কারিমকে আলেকজান্দ্রিয়ার চত্বর ও বাজারে নিয়ে যাওয়া হলো। কারিম ভেবেছিলেন, যে নগরবাসীদের ব্যবসা-বাণিজ্য, ধন-সম্পদ ও পরিবার রক্ষা করার জন্য তিনি নিজের রক্ত ঝরিয়েছেন, তারা সানন্দে এই ক্ষুদ্র জরিমানা পরিশোধ করে তাদের বীর নায়ককে মুক্ত করে আনবে।

কাপুরুষ জাতির নির্মমতা

আলেকজান্দ্রিয়ার বণিকেরা কারিমকে সাহায্য করতে সরাসরি অস্বীকার করল। তাদের বক্তব্য ছিল, যুদ্ধ হয়ে গেছে, ফরাসিরা এখন নতুন শাসক। এখন এই পুরনো সেনাপতিকে উদ্ধার করতে গেলে ফরাসিদের সাথে তাদের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বণিকেরা কেবল টাকা দিতে অস্বীকার করেই ক্ষান্ত হয়নি; তারা উল্টো শৃঙ্খলিত কারিমের মুখের ওপর অভিযোগ তুলল যে, কারিম ফরাসিদের সাথে অপ্রয়োজনীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলে আলেকজান্দ্রিয়ার ব্যবসায়িক পরিবেশ ধ্বংস করেছেন এবং ফরাসি আক্রমণকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছেন। স্বাধীনতার চেয়ে তাদের কাছে নিজস্ব গুদামের পণ্যের সুরক্ষা এবং বাণিজ্যিক মুনাফা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

নেপোলিয়নের কালজয়ী উক্তি ও কারিমের মৃত্যুদণ্ড

ভগ্ন হৃদয়ে, চরম অপমান ও আত্মগ্লানি নিয়ে সেনাপতি মোহাম্মদ কারিম খালি হাতে নেপোলিয়নের সামরিক তাবুতে ফিরে এলেন। আলেকজান্দ্রিয়ার বণিক সমাজের এই পৈশাচিক ও কাপুরুষোচিত আচরণ দেখে স্বয়ং ফরাসি বিজয়ী নেপোলিয়ন বোনাপার্টও স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন।

নেপোলিয়ন কারিমের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ সই করার সময় যে অমর বাক্যটি উচ্চারণ করেছিলেন, তা আজ অবধি বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে খোদাই হয়ে আছে:

"আমি তোমাকে এজন্য হত্যা করছি না যে তুমি আমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছ। আমি তোমাকে হত্যা করছি এজন্য যে, তুমি তোমার বহুমূল্য জীবন উৎসর্গ করতে গিয়েছিলে এক চরম কাপুরুষ জাতির জন্য-যারা নিজের দেশের স্বাধীনতা ও বীর নেতার চেয়ে নিজেদের ক্ষণস্থায়ী ব্যবসা-বাণিজ্যকে বেশি ভালোবাসে।"

এই ট্র্যাজেডি প্রমাণ করে যে, যখন একটি জাতি তার স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা এবং জাতীয় বীরের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পদ বা বাণিজ্যকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন তারা নেতার আত্মত্যাগকে অবমাননা করে। আরব সংস্কারবাদী মোহাম্মদ রশিদ রিদা এই ঘটনার সারমর্ম এক বাক্যে তুলে ধরেছিলেন:

"যে ব্যক্তি কোনো এক অজ্ঞ ও স্বার্থান্ধ জাতির জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে লড়ে, সে মূলত অন্ধের দলকে পথ দেখাতে গিয়ে নিজের শরীরে আগুন জ্বালিয়ে ধ্বংস হয়।"

বঙ্গবন্ধুর ট্র্যাজেডি: সর্বকালের জঘন্যতম ট্র্যাজেডি ও এক লক্ষ গাদ্দারের বিষবৃক্ষ

চে গুয়েভারা কিংবা মোহাম্মদ কারিমের ট্র্যাজেডি বিশ্ব ইতিহাসে চরম শিক্ষণীয় দুটি ঘটনা হলেও, বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড মানব সভ্যতার ইতিহাসে স্বজাতীয় বিশ্বাসঘাতকতার সবচেয়ে পৈশাচিক ও রক্তভেজা অধ্যায়। চে গুয়েভারা মারা গিয়েছিলেন ভীতিগ্রস্ত কৃষকের গোপন তথ্যে; কারিম প্রাণ দিয়েছিলেন বণিকদের কার্পণ্য ও উদাসীনতায়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রাণ দিতে হয়েছিল তাঁরই পরম ভালোবাসায় গড়ে তোলা স্বাধীন রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একটি উগ্র অংশ এবং তাঁরই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীদের সরাসরি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে।

বাঙালি জাতির হাজার বছরের পরাধীনতার ইতিহাস ভাঙার মূল কারিগর ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক।

আজীবন কারাবরণ: ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট, ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬-দফা (বাঙালির সনদের দাবি), ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় প্রতিটি ধাপে শেখ মুজিবকে জীবনের স্বর্ণালী সময় কাটাতে হয়েছে পাকিস্তান সরকারের অন্ধকার কারাগারের প্রকোষ্ঠে। তাঁর জীবনের চার ভাগের এক ভাগ সময় কেটেছে জেলে।

মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি (১৯৭১): ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন গণহত্যা শুরু করে, তখন বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে তাঁকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল, সামরিক আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বজনমতের চাপ এবং তাঁর অদম্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সামনে পাকিস্তানি জান্তা নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়।

এক লক্ষাধিক গাদ্দারের উপস্থিতি

বঙ্গবন্ধু যে বাঙালি জাতির জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন, সেই একই বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে ১৯৭১ সালে জন্ম নিয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এক দালাল চক্র। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গড়ে তোলা হয়েছিল রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস এবং শান্তি কমিটির মতো সশস্ত্র ঘাতক বাহিনী।

সুসংগঠিত গাদ্দারি: তৎকালীন সময়ে লক্ষাধিক স্থানীয় লোক প্রকাশ্যে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর হয়ে নিজ মাতৃভূমির বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়। তারা কেবল রাজনৈতিকভাবে পাকিস্তানের পক্ষ নেয়নি, বরং নিজ দেশের সাধারণ মানুষের ওপর গণহত্যা, নারী নির্যাতন, লুণ্ঠন এবং ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিল।
আদর্শিক বিষবৃক্ষ: এই রাজাকার ও আল-বদররা ছিল সেই বিষাক্ত গাদ্দার গোষ্ঠী, যারা স্বজাতির স্বাধীন সত্তা ও ভাষার চেয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা এবং ঔপনিবেশিক পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্যকে শ্রেয় মনে করেছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশ, বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্র ও ১৫ই আগস্টের রক্তপাত

১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি শূন্য হাতে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্গঠন শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু ১৯৭১ সালের পরাজিত গাদ্দার গোষ্ঠী, স্বাধীনতা-বিরোধী চক্রান্তকারী এবং অতি-বাম উগ্র রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সক্রিয় ছিল।

পুনর্বাসন ও ছদ্মবেশ: স্বাধীনতার পর প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে ওই দালাল চক্রের একটি বড় অংশ ছদ্মবেশে সামরিক বাহিনী, প্রশাসন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে ঢুকে পড়ে।

খন্দকার মোশতাক ও সামরিক চক্রান্ত: বঙ্গবন্ধুর পরম বিশ্বস্ত বলে পরিচিত খন্দকার মোশতাক আহমেদের মতো চক্রান্তকারীরা এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে থাকা পাকিস্তানপন্থী বা অসন্তুষ্ট কিছু কর্মকর্তা হাত মেলায়।

১৫ই আগস্ট ১৯৭৫: ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে সংঘটিত হয় মানব ইতিহাসের নির্মমতম হত্যাকাণ্ড। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর পরিবার সহধর্মিণী ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেল, পুত্রবধূগণ এবং নিকটাত্মীয়সহ নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

আলেকজান্দ্রিয়া থেকে ধানমন্ডি ৩২

মোহাম্মদ কারিম যেমন আলেকজান্দ্রিয়ার যাদের রক্ষা করেছিলেন, তাদের দ্বারাই পরিত্যক্ত হয়েছিলেন; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও যাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছিলেন সেই বাঙালি জাতির এক পৈশাচিক অংশ তাঁর রক্তে রঞ্জিত করেছিল ধানমন্ডির সিঁড়ি। যে নেতার একটি আঙুলের নির্দেশনায় সাড়ে সাত কোটি বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাঁর ওপর ঘাতকের গুলি বর্ষণের সময় পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের এক অদ্ভুত ও কাপুরুষোচিত নীরবতা আলেকজান্দ্রিয়ার বণিকদের সেই ঐতিহাসিক নির্লজ্জতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

তিন ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির তুলনামূলক রূপরেখা

নিচে বিশ্ব ইতিহাসের এই তিন মহানায়কের আত্মত্যাগ, গাদ্দারি এবং তার নেপথ্যে থাকা সামাজিক প্রেক্ষাপটের একটি পূর্ণাঙ্গ তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

বিশ্লেষণের মাত্রা

চে গুয়েভারা (বলিভিয়া, ১৯৬৭)

সেনাপতি মোহাম্মদ কারিম (মিসর, ১৭৯৮)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (বাংলাদেশ, ১৯৭৫)

ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

লাতিন আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও মার্কিন শোষণের বিরুদ্ধে গেরিলা লড়াই।

সাম্রাজ্যবাদী নেপোলিয়নের মিসর আক্রমণ ও আলেকজান্দ্রিয়া প্রতিরক্ষা।

ঔপনিবেশিক পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ।

প্রত্যক্ষ শত্রুশক্তি

মার্কিন সিআইএ এবং বলিভিয়ার স্বৈরশাসক জেনারেল বারিয়েন্তোসের সেনাবাহিনী।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ফরাসি রাজকীয় সেনাবাহিনী।

পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের আন্তর্জাতিক মিত্র।

বিশ্বাসের ঘাতক / দালাল গোষ্ঠী

লা হিগুয়েরা গ্রামের দরিদ্র ও ভীতিগ্রস্ত রাখাল।

আলেকজান্দ্রিয়ার ধনাঢ্য ও স্বার্থপর বণিক সমাজ।

১৯৭১-এর আল-বদর/রাজাকার চক্র এবং ১৯৭৫-এর সেনা চক্রান্তকারী ও খন্দকার মোশতাক গোষ্ঠী।

গাদ্দারি ও বিসর্জনের মূল মনস্তাত্ত্বিক কারণ

নিজের ভেড়ার পালের সাময়িক নিরাপত্তা এবং গুলির শব্দে ভেড়া ভয় পাওয়ার ভয়।

ব্যক্তিগত সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য রক্ষা ও ফরাসিদের সাথে সুসম্পর্ক রাখার লোভ।

অসীম ক্ষমতার লোভ, পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক আদর্শ, এবং জাতীয়তাবোধের অভাব।

চূড়ান্ত ট্র্যাজিক পরিণতি

লা হিগুয়েরার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অমানবিক নির্যাতনের পর সরাসরি হত্যা।

ফরাসিদের হাতে শিরচ্ছেদ/মৃত্যুদণ্ড কার্যকর।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে সপরিবারে নৃশংস ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড।

ইতিহাসের দার্শনিক শিক্ষা

আদর্শিক চেতনাহীন সমাজ বিপ্লবীর লড়াই বোঝে না, তাৎক্ষণিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়।

যে জাতি স্বজাতির মুক্তির চেয়ে বাণিজ্যে মন দেয়, তারা স্বাধীন থাকার যোগ্যতা হারায়।

স্বজাতীয় ঘাতক বহিরাগত শত্রুর চেয়েও ভয়াবহ; বীরকে সুরক্ষা দিতে না পারা জাতির চরম ব্যর্থতা।

একাত্তরের গাদ্দার: আদর্শিক ও সামরিক বিশ্বাসঘাতকতা

ইতিহাসের পাতায় চে গুয়েভারা বা মোহাম্মদ কারিমের মতো মহান বিপ্লবীদের পতন হয়েছিল বিশ্বস্ত সহচরদের আকস্মিক বিশ্বাসঘাতকতায়। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে যে বিশ্বাসঘাতকতার রূপ দেখা গিয়েছিল, তা কোনো একক ব্যক্তির প্রতারণা ছিল না; সেটি ছিল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিকভাবে সুসংগঠিত এক দীর্ঘমেয়াদী আদর্শিক ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে বীর বাঙালিরা মুখোমুখি হয়েছিলেন নিজ ভূখণ্ডের এক বিশাল গোষ্ঠীর চরম বিরোধিতার, যারা নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনের আকাক্সক্ষাকে ধ্বংস করতে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগীতে পরিণত হয়েছিল।

লক্ষাধিক গাদ্দার ও সংগঠিত গণহত্যা

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কেবল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গণহত্যা চালায়নি, বরং তাদের মূল শক্তি বৃদ্ধি করেছিল স্থানীয় বাঙালিদের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা আধা-সামরিক ও সহযোগী বাহিনীগুলো। ১৯৭১ সালের মে মাসে গভর্নর টিক্কা খানের নির্দেশে ‘রাজাকার’ বাহিনী গঠিত হয় এবং পরবর্তীতে তা ‘ইস্ট পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স’ এর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।

পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রসংঘ’ এর ক্যাডারদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় চরমপন্থী ও দুর্ধর্ষ দুটি বাহিনী আল-বদর এবং আল-শামস। এক লক্ষেরও বেশি সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত এই অপশক্তিগুলো সাধারণ জনগণের তথ্য সংগ্রহ, পথপ্রদর্শন, রাজাকার ক্যাম্প স্থাপন এবং সম্মুখযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রত্যক্ষ সহায়তা করে।

এই ‘গাদ্দার’ গোষ্ঠীগুলো কেবল পেশাদার সৈনিক হিসেবে কাজ করেনি; তারা চালিত হয়েছিল চরম রাজনৈতিক ও আদর্শিক উদ্দেশ্য দ্বারা। নিজ জাতির স্বাধীনতা এবং স্বাধিকারের চেয়ে তারা অর্থনৈতিক সুবিধা, সামাজিক প্রভাব বৃদ্ধি এবং তথাকথিত ধর্মভিত্তিক অখণ্ড পাকিস্তানের প্রতি অন্ধ আনুগত্যকে প্রাধান্য দিয়েছিল। তারা বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো পাশবিক নির্যাতন, লুটপাট, নারী নির্যাতন এবং গণহত্যার সরাসরি অংশীদারে পরিণত হয়। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের শেষভাগে, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরে বাঙালি জাতিকে মেধা ও মননে পঙ্গু করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যে পরিকল্পিত বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল, তার নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছিল এই আল-বদর ও আল-শামস বাহিনীর সদস্যরা।

মুক্তিযুদ্ধের পর রাষ্ট্রীয়ভাবে এই গাদ্দারদের আদর্শিক বিষবৃক্ষ সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পরও এই গাদ্দারদের একটি অংশ সমাজের বিভিন্ন স্তরে, এমনকি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরেও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে। এই শক্তিগুলোই ছিল ১৯৭৫ সালের ষড়যন্ত্রের মূল বীজ। এই গোষ্ঠী ক্ষমতার প্রতি লোভ, প্রতিশোধের স্পৃহা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি বিদ্বেষের কারণে ঐক্যবদ্ধ হয়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শ - গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র থেকে উৎখাত করা।

১৫ আগস্টের মর্মান্তিকতা ও ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড ছিল ইতিহাসের এক নির্মমতম ও করুণ ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি। যে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ বিনির্মাণে তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় কারান্তরালে কাটিয়েছেন এবং বিশ্বমানচিত্রে একটি নতুন জাতির জন্ম দিয়েছেন, সেই স্বাধীন দেশেরই গাদ্দার ও পাকিস্তানী এজেন্ট সামরিক কর্মকর্তাদের হাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁকে স্বপরিবারে প্রাণ দিতে হয়। নিজ ভূখণ্ডে, নিজ প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীরই একটি ষড়যন্ত্রী গোষ্ঠী দ্বারা রাষ্ট্রপ্রধানের নির্মম হত্যাকাণ্ড বিশ্বের রাজনীতি ও সামরিক ইতিহাসে বিরল ও কলঙ্কজনক।

সেনাবাহিনীতে আদর্শিক বিভেদ ও ষড়যন্ত্রের শিকড়

১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর নবগঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে একটি গভীর আদর্শিক ও মানসিক বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে ছিলেন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া অফিসার ও জোয়ানরা, অন্যদিকে ছিলেন পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা সামরিক কর্মকর্তা ও সদস্যরা। পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত অনেক কর্মকর্তার মধ্যেই পাকিস্তানি সামরিক আমলাতন্ত্রের প্রভাব ও মনোভাব বজায় ছিল।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের নেওয়া নানা সিদ্ধান্ত, সেনাবাহিনী পুনর্গঠন নীতি এবং রক্ষীবাহিনীর প্রতিষ্ঠা নিয়ে একাংশের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ গড়ে ওঠে। একইসাথে জাসদ পরিচালিত গণবাহিনীর সশস্ত্র তৎপরতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সেনাবাহিনীর ভেতরের উগ্র ও উচ্চাভিলাষী অংশকে উৎসাহিত করেছিল। ১৫ আগস্টের নির্মম ঘটনা ছিল সেনাবাহিনীতে বিরাজমান এই আদর্শিক দ্বন্দ্ব, চরম বিশৃঙ্খলা এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদের মতো অভ্যন্তরীণ গাদ্দার ও পাকিস্তান-পন্থীদের সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের এক চূড়ান্ত এবং নৃশংস বহিঃপ্রকাশ। এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়া মেজর ডালিম, মেজর রশীদ, মেজর ফারুকদের মতো কর্মকর্তারা স্বাধীনতার মৌলিক চেতনার চেয়ে ব্যক্তিগত ক্ষোভ, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পাকিস্তান-ঘেঁষা ভাবধারার প্রতি অনুগত ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের অস্তিত্ব শেষ করার চেষ্টা

এই হত্যাকাণ্ড কেবল একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারের ধ্বংসসাধন ছিল না, বরং এটি ছিল নবজাত বাংলাদেশের মূল ভিত্তি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর এক সরাসরি আঘাত। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ১৫ আগস্টের পর পুরোপুরি নস্যাৎ করে দেওয়া হয়। সামরিক শাসনের সূচনার মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের চর্চা রুদ্ধ করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংশোধন করে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি থেকে রাষ্ট্রকে বিচ্যুত করা হয়। জয় বাংলা স্লোগান বর্জন, বেতারের নাম 'রেডিও বাংলাদেশ' করা এবং পরবর্তীতে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে হত্যাকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে তার মূল আদর্শ থেকে উল্টো পথে হাঁটার রাজনৈতিক প্রচ্ছদ দেওয়া হয়।

জাতির রাজনৈতিক ও নৈতিক ব্যর্থতা

১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডি তৎকালীন বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সার্বিকভাবে পুরো জাতির এক বিশাল নৈতিক ও কৌশলগত ব্যর্থতাকে উন্মোচিত করে। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিরেক্টরেট অফ মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স (ডিএমআই) সহ বিভিন্ন স্তরে ষড়যন্ত্রের আগাম আভাস থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্র প্রধানের জন্য নিটোল নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে রাষ্ট্র সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে যখন ঘাতকরা আক্রমণ চালায়, তখন রাজনৈতিক সহকর্মী ও প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের অধিকাংশ নেতার নিস্তব্ধতা এবং কাপুরুষোচিত ভূমিকা ছিল অত্যন্ত করুণ।

যে মহান নেতা জীবনবাজি রেখে এক কোটি শরণার্থী ও সাত কোটি মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন, বিপদের দিনে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ানোর মতো রাজনৈতিক দৃঢ়তা কেউ দেখাতে পারেনি। ইতিহাসপ্রসিদ্ধ সামরিক পরাশক্তি বা বড় নেতাদের পতনের ক্ষেত্রে আপনজন ও সহযোদ্ধাদের যে স্বার্থপরতা ও বিশ্বাসঘাতকতা দেখা যায় আলেকজান্দ্রিয়ার বণিক বা রোমান ট্র্যাজেডির মতো বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডেও সেই একই ধরনের ঐতিহাসিক কাপুরুষতা ও চরম হীনতার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

কেন একটি জাতি নিজের মহানায়ককে বিসর্জন দেয়?

ইতিহাসের এই তিনটি মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডি কেবল কাকতালীয় ঘটনা নয়। এর পেছনে কাজ করে গভীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কিছু নিয়ামক। কেন একটি সমাজ বা জাতির এক অংশ নিজের মহানায়ককে শত্রুর হাতে তুলে দেয় বা হত্যা করে? এর কারণগুলোকে নিম্নোক্ত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা যায়:

তাৎক্ষণিক স্বস্তি বনাম দীর্ঘমেয়াদি স্বাধীনতা: সাধারণ মানুষের এক বিশাল অংশ সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক দর্শন বা আদর্শিক স্বাধীনতা বোঝে না। বলিভিয়ার রাখালের কাছে চে গুয়েভারার সমাজতন্ত্রের চেয়ে তার ভেড়ার পালের নীরবতা বড় ছিল।

আলেকজান্দ্রিয়ার বণিকদের কাছে কারিমের বীরত্বের চেয়ে তাদের গুদামের চাল-ডালের ব্যবসা বড় ছিল। বাংলাদেশের চক্রান্তকারীদের কাছে বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রদর্শনের চেয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত ক্ষমতা অর্জন ও ক্ষমতার মসনদে বসা বড় হয়ে উঠেছিল।

এরিক ফ্রম-এর ‘Escape from Freedom’ (স্বাধীনতা থেকে পলায়ন) তত্ত্ব: প্রখ্যাত সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক এরিক ফ্রম তাঁর বিখ্যাত Escape from Freedom গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে মানুষ কখনো কখনো স্বাধীনতার ভার সহ্য করতে না পেরে পুনরায় পরাধীনতা বা স্বৈরাচারের মানসিক আশ্রয়ে ফিরে যেতে চায়। শত শত বছর ধরে পরাধীন থাকা জাতিগুলোর মধ্যে এক ধরনের "দাসত্বের স্বস্তি" তৈরি হয়। যখন একজন মহানায়ক এসে তাদের মুক্ত করেন, তখন সেই মুক্তির সাথে যে দায়িত্ব ও সংগ্রাম আসে, তা সহ্য করতে না পেরে তারা আবার পুরনো শোষকের আদর্শ বা সংক্ষিপ্ত ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে পছন্দ করে।

মেধার প্রতি হিংসা ও হীনমন্যতা: ক্ষুদ্র মনের মানুষেরা কখনো বিশাল ব্যক্তিত্বের মহানায়কদের মেনে নিতে পারে না। তাদের মনে এক ধরনের তীব্র হীনমন্যতা তৈরি হয়। খন্দকার মোশতাক বা সামরিক চক্রান্তকারীরা জানত, বঙ্গবন্ধুর বিশাল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সামনে তারা অতি ক্ষুদ্র। এই হীনমন্যতা ও ঈর্ষা থেকেই জন্ম নেয় চরম প্রতি হিংসা এবং ঘাতকবৃত্তি।

অভ্যন্তরীণ দালাল শ্রেণীর উত্থান: প্রতিটি আন্তর্জাতিক পরাশক্তি কোনো দেশে আধিপত্য বিস্তার করতে চাইলে সরাসরি যুদ্ধ করার চেয়ে ভেতরের দালাল শ্রেণী তৈরি করাকে বেশি লাভজনক মনে করে। সিআইএ বলিভিয়ায় দালালি করিয়েছে স্থানীয়দের দিয়ে।

নেপোলিয়ন সুযোগ নিয়েছেন মিসরীয় বণিকদের স্বার্থপরতার। ১৯৭৫ সালে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা ব্যবহার করেছিল সেনাবাহিনীর ভেতরের পাকিস্তানপন্থী মনোভাবাপন্ন ও উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তাদের।

ইতিহাসের চিরন্তন দায়বদ্ধতা

চে গুয়েভারা, সেনাপতি মোহাম্মদ কারিম এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ট্র্যাজেডি মানবজাতিকে এক মহাজাগতিক সতর্কবার্তা দিয়ে যায়। একটি জাতির মহানায়কেরা বারবার জন্ম নেন না। শতবর্ষের অপেক্ষার পর হয়তো একজন চে গুয়েভারা, একজন মোহাম্মদ কারিম বা একজন শেখ মুজিবের মতো কালজয়ী নেতার আবির্ভাব ঘটে, যিনি একটি পরাধীন ও শোষিত জাতিকে মুক্তির স্বপ্ন দেখান এবং নিজের রক্ত দিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন।

কিন্তু সেই জাতির ভেতরের কাপুরুষতা, কুচক্র, রাজনৈতিক অন্ধত্ব এবং স্বার্থপরতা যদি বীরদের সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারে, তবে সেই জাতিকে এক দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ও ঐতিহাসিক খেসারত দিতে হয়।

চে গেভারা, মোহাম্মদ কারিম এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই তিনটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি একটি নির্মম সত্যের মুখোমুখি করে:

নেতার আত্মত্যাগ তখনই ফলপ্রসূ হয়, যখন সেই জাতি আদর্শিকভাবে সচেতন থাকে এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে জাতীয় মুক্তিকে বেশি মূল্য দেয়।

রাখাল তার ভেড়ার পালের জন্য চে গেভারার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। বণিকেরা বাণিজ্যের জন্য কারিমের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। তেমনি, বাংলাদেশের গাদ্দাররা ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও হীন রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।

এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, স্বাধীনতা অর্জন করা যত কঠিন, সেই স্বাধীনতার আদর্শকে ধারণ করা এবং রক্ষা করা তার চেয়েও কঠিন। যখন কোনো জাতি তার মহানায়ককে অবমাননা করে বা তাঁর হত্যাকারীদের আশ্রয় দেয়, তখন সেই জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর সেই ট্র্যাজেডির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে। বঙ্গবন্ধুর জীবনাবসান আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যায়:

যে জাতির জন্য বীর জীবন দেয়, সেই জাতি যদি তাঁর আত্মত্যাগকে রক্ষা না করে, তবে সেই জাতি এক চরম আদর্শিক শূন্যতা ও অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়।

এই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের অবশ্যই জাতীয় আদর্শ, মুক্তি ও ত্যাগের মূল্যবোধকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, যেন আর কোনো মহানায়ককে তাঁরই জাতির বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হতে না হয়।

Explore Topics

Featured Posts

About

TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.

Related Post

Aug 15, 2025

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানো হয়েছে। ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডির পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বিরোধী শক্তি, বিশেষত জামায়াতে ইসলামী, আল-বদর ইসলামী ছাত্রসংঘ (বর্তমান ইসলামী ছাত্রশিবির) এবং তাদের দোসররা হাজারো গুজব ও বিকৃত গল্প ছড়িয়েছে।

Aug 9, 2026

/

Post by

সুদূর ইরাকের বাগদাদ নগরীর পুণ্যভূমি থেকে শুরু হয়ে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে আসা বাংলার পলিমাটি পর্যন্ত বিস্তৃত তেমনই এক কালজয়ী ও অলৌকিক বংশধারার ইতিহাস হলো টুঙ্গিপাড়ার ঐতিহ্যবাহী 'শেখ পরিবার'। ইসলামের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি সাধক, সুলতানুল আউলিয়া বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)-এর পুণ্যময় রক্তের ধারা কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করে সুদূর ইরাক থেকে এসে বাংলাদেশের রাজনীতি, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের সূতিকাগার টুঙ্গিপাড়ায় শিকড় গেড়েছিল তা এক পরম বিস্ময়কর ইতিহাস।

Aug 9, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধু যে উদার মন নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং পাকি-তোষামোদকারী গোষ্ঠীসমূহকে ক্ষমা প্রদর্শন করেছিলেন, সেই ক্ষমার মহত্ত্ব উপলব্ধি করার মতো মানবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেই পরাজিত অপশক্তির ছিল না। বিষধর সাপকে আশ্রয় দিলে তার হিংস্রতা যেমন কমে না, তেমনি সাধারণ ক্ষমার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নেপথ্যে সংগঠিত হয়েছিল সেইসব দেশদ্রোহী ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী, যারা শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বুকেই মারণ-কামড় বসিয়েছিল।

Jun 22, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে কেবল হাজার বছরের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন; দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কীভাবে এই ভূষিত রূপটি একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। কবে, কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রত্যক্ষ ভোটে শেখ মুজিব এই অনন্য খেতাব অর্জন করেছিলেন? সেই ঐতিহাসিক জরিপে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা সহযোগী অন্যান্য বাঙালি শ্রেষ্ঠরাই বা কারা ছিলেন?

May 23, 2026

/

Post by

একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিকে তাঁর নিজ বাসভবনে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটিয়েছিল সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী কর্মকর্তা ও জওয়ান। কিন্তু এই চরম জাতীয় ট্র্যাজেডির অব্যবহিত পরেই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে চোখের পলকে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছিল, তা কেবল নজিরবিহীনই নয়, বরং চরম বিস্ময় ও লজ্জার এক ঐতিহাসিক দলিল।

May 15, 2026

/

Post by

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালটি নিয়ে দুটি বিপরীতমুখী বয়ান পাওয়া যায়। একদল একে দেখেন ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচারের’ কাল হিসেবে, আর অন্যদল একে দেখেন একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শূন্য হাতে রাষ্ট্র গড়ার মহাবীরত্বগাথা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা এই সময়কালকে কেবল ‘ব্যর্থতা’ বা ‘স্বৈরাচার’ তকমা দিয়ে মুছে ফেলতে চায়। অন্যদিকে, সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসবিদরা দেখেন এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি জাতিকে টেনে তোলার প্রাণপণ লড়াই।

Aug 15, 2025

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যুগে যুগে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানো হয়েছে। ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডির পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বিরোধী শক্তি, বিশেষত জামায়াতে ইসলামী, আল-বদর ইসলামী ছাত্রসংঘ (বর্তমান ইসলামী ছাত্রশিবির) এবং তাদের দোসররা হাজারো গুজব ও বিকৃত গল্প ছড়িয়েছে।

Aug 9, 2026

/

Post by

সুদূর ইরাকের বাগদাদ নগরীর পুণ্যভূমি থেকে শুরু হয়ে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে আসা বাংলার পলিমাটি পর্যন্ত বিস্তৃত তেমনই এক কালজয়ী ও অলৌকিক বংশধারার ইতিহাস হলো টুঙ্গিপাড়ার ঐতিহ্যবাহী 'শেখ পরিবার'। ইসলামের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি সাধক, সুলতানুল আউলিয়া বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)-এর পুণ্যময় রক্তের ধারা কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করে সুদূর ইরাক থেকে এসে বাংলাদেশের রাজনীতি, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের সূতিকাগার টুঙ্গিপাড়ায় শিকড় গেড়েছিল তা এক পরম বিস্ময়কর ইতিহাস।

Aug 9, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধু যে উদার মন নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং পাকি-তোষামোদকারী গোষ্ঠীসমূহকে ক্ষমা প্রদর্শন করেছিলেন, সেই ক্ষমার মহত্ত্ব উপলব্ধি করার মতো মানবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি সেই পরাজিত অপশক্তির ছিল না। বিষধর সাপকে আশ্রয় দিলে তার হিংস্রতা যেমন কমে না, তেমনি সাধারণ ক্ষমার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নেপথ্যে সংগঠিত হয়েছিল সেইসব দেশদ্রোহী ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী, যারা শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বুকেই মারণ-কামড় বসিয়েছিল।

Jun 22, 2026

/

Post by

বঙ্গবন্ধুকে কেবল হাজার বছরের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন; দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ তাঁকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু অনেকেরই হয়তো জানা নেই, কীভাবে এই ভূষিত রূপটি একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। কবে, কোন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের প্রত্যক্ষ ভোটে শেখ মুজিব এই অনন্য খেতাব অর্জন করেছিলেন? সেই ঐতিহাসিক জরিপে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা সহযোগী অন্যান্য বাঙালি শ্রেষ্ঠরাই বা কারা ছিলেন?

Create a free website with Framer, the website builder loved by startups, designers and agencies.