স্বাধীনতার মহানায়করাই যখন নিজ জাতির গাদ্দারির শিকার হন
চে গুয়েভারার মতো বিশ্ববিপ্লবী থেকে শুরু করে মিশরের দেশপ্রেমিক সেনাপতি মোহাম্মদ কারিম, কিংবা বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান - মহানায়ক হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের জীবনাবসানের নেপথ্যে ছিল সেই জাতিরই একাংশের নিদারুণ গাদ্দারী।

TruthBangla
Oct 8, 2025
ইতিহাসের পাতা উল্টালে কিছু গভীর বেদনাদায়ক সত্য উঠে আসে। সেই সত্য হলো - বিপ্লব, মুক্তি বা স্বাধীনতার জন্য যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁদেরকে প্রায়শই শত্রুর অস্ত্রের আঘাতে নয়, বরং নিজেদেরই জাতির এক অংশের কাপুরুষতা ও বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হতে হয়। চে গুয়েভারার মতো বিশ্ববিপ্লবী থেকে শুরু করে মিশরের দেশপ্রেমিক সেনাপতি মোহাম্মদ কারিম, কিংবা বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান - মহানায়ক হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের জীবনাবসানের নেপথ্যে ছিল সেই জাতিরই একাংশের নিদারুণ গাদ্দারী। এই প্রবন্ধটি সেই ঐতিহাসিক উপাখ্যানগুলোর মাধ্যমে জাতীয় বীরদের আত্মত্যাগ এবং জাতির বিশ্বাসঘাতকতার মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি তুলে ধরবে।
জাতির মহান নেতার আত্মত্যাগ ও জাতির গাদ্দারি
নেতৃত্বের সর্বোচ্চ পর্যায় হলো আত্মত্যাগ। একজন নেতা যখন নিজের জীবন বাজি রেখে জনগণের অধিকার, মুক্তি ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য লড়াই করেন, তখন জনগণও সেই নেতার প্রতি অবিচল সমর্থন জানাবে - এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু ইতিহাস বহুবার প্রমাণ করেছে যে, এই সমীকরণ সবসময় সরল হয় না। ব্যক্তিগত স্বার্থ, ভয়, অজ্ঞতা বা তাৎক্ষণিক ক্ষতির আশঙ্কা - এই সমস্ত কিছুই গণ-আন্দোলনের মূল আদর্শ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
এই প্রবন্ধে আমরা দুটি বিশ্বখ্যাত ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডির মাধ্যমে সেই দার্শনিক প্রশ্নটির উত্তর খুঁজব: যে জাতির জন্য নেতা লড়েন, সেই জাতি কেনই বা সেই নেতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে? এবং এই ঐতিহাসিক সত্যটি কীভাবে বাংলাদেশের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনে এক চরম পরিণতি নিয়ে এসেছিল।
চে গেভারার ট্র্যাজেডি – ভেড়ার পালের ভয়
বিপ্লবী নেতা চে গেভারা - যিনি কিউবার বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে লাতিন আমেরিকার দরিদ্র ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি সেই তিক্ত সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
রাখালের বিশ্বাসঘাতকতা
১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর বলিভিয়ায় চে গেভারা যখন তার গেরিলা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে লুকিয়ে থাকার জায়গায় ধরা পড়েন, তখন জানা যায় যে সেই অঞ্চলের একজন রাখালের বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই তাঁর অবস্থান ফাঁস হয়েছিল। চে গেভারার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঠিক আগে এক বলিভীয় সৈন্য রাখালকে প্রশ্ন করেছিল:
“তুমি কীভাবে এমন একজন মানুষকে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারলে, যে সারাজীবন তোমার জন্য, তোমার অধিকার রক্ষার জন্য লড়েছে?”
রাখালের শান্ত, কিন্তু নির্মম জবাবটি ছিল:
“তার শত্রুর সঙ্গে তার যুদ্ধ আমার ভেড়াগুলোকে ভয় পাইয়েছিল।”
তাৎক্ষণিক শান্তির মূল্য
এই কথোপকথনটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও দার্শনিক সত্যকে উন্মোচন করে। রাখালের কাছে তার ব্যক্তিগত ও তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা, অর্থাৎ তার ভেড়ার পালের নিরাপত্তা, ছিল একজন নেতার সুদূরপ্রসারী আদর্শ বা তার অধিকার রক্ষার সংগ্রামের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ: রাখাল তার অধিকারের জন্য লড়াইয়ের বৃহৎ তাৎপর্য বুঝতে সক্ষম হয়নি, বরং সে শুধু তার দৈনন্দিন জীবনে আসা বিঘ্নটুকুকেই দেখেছিল।
ট্র্যাজেডি: চে গেভারা লাতিন আমেরিকার লাখ লাখ কৃষকের মুক্তির জন্য লড়াই করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এক রাখালের সংকীর্ণ স্বার্থের কাছেই তিনি পরাজিত হলেন। এই ট্র্যাজেডি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে আদর্শিক সচেতনতা ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের অনুপস্থিতি কিভাবে বিপ্লবকে ব্যর্থ করে দিতে পারে।
মোহাম্মদ কারিমের ট্র্যাজেডি – স্বাধীনতার চেয়ে বাণিজ্য বেশি প্রিয়
নেপোলিয়নের মিশর অভিযানকালে মোহাম্মদ কারিম ছিলেন মিশরের অটোমান মামলুক শাসক এবং মহান সেনাপতি। নেপোলিয়নের সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে তিনি কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর পরিণতি ছিল আরও বেশি বেদনাদায়ক, যা একটি জাতির কাপুরুষতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
নেপোলিয়নের প্রস্তাব ও বীরের পরীক্ষা
কারিম বন্দী হওয়ার পর নেপোলিয়নের আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু নেপোলিয়ন তাঁকে ডেকে বললেন:
“তোমার মতো একজন সাহসী দেশ রক্ষাকারীকে হত্যা করতে হচ্ছে বলে আমি অনুতপ্ত। যদি তুমি আমার সেনাবাহিনীর ক্ষতির জন্য ১০,০০০ স্বর্ণমুদ্রা দিতে পারো, আমি তোমাকে ক্ষমা করব।”
কারিম তখন হাসলেন এবং বললেন: “আমার কাছে এত অর্থ নেই, কিন্তু বণিকদের কাছে আমার এক লক্ষেরও বেশি স্বর্ণমুদ্রা পাওনা আছে।”
নেপোলিয়ন তাঁকে সময় দিলেন। কারিম শৃঙ্খলবদ্ধ অবস্থায়, সৈন্য পরিবেষ্টিত হয়ে বাজারে গেলেন - আশা করলেন, যাদের জন্য তিনি জীবন বাজি রেখেছেন, তারা হয়তো সাহায্য করবে।
কাপুরুষ জাতির নির্মমতা
কিন্তু বণিক সমাজ সেই বীরের আহ্বানে সাড়া দিল না। উল্টো, তারা অভিযোগ করল যে আলেকজান্দ্রিয়ার ধ্বংস এবং তাদের ব্যক্তিগত বিপদের একমাত্র কারণ কারিম নিজেই। তারা স্বাধীনতার চেয়ে নিজেদের বাণিজ্য ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি চিন্তিত ছিল।
কারিম ভগ্নমনোরথ হয়ে নেপোলিয়নের কাছে ফিরে এলেন। তখন নেপোলিয়ন যে কথাটি বললেন, তা ইতিহাসে এক চরম সত্য হিসেবে লিপিবদ্ধ:
“আমি তোমাকে এ জন্য হত্যা করবো না যে তুমি আমাদের বিরুদ্ধে লড়েছ, বরং এ জন্য করবো যে তুমি তোমার জীবন উৎসর্গ করেছ এক কাপুরুষ জাতির জন্য—যারা স্বাধীনতার চেয়ে বাণিজ্যকে বেশি ভালোবাসে।”
এই ট্র্যাজেডি প্রমাণ করে যে, যখন একটি জাতি তার স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা এবং জাতীয় বীরের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পদ বা বাণিজ্যকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন তারা নেতার আত্মত্যাগকে অবমাননা করে। আরব সংস্কারবাদী মোহাম্মদ রশিদ রিদা এই ঘটনার সারমর্ম এক বাক্যে তুলে ধরেছিলেন:
“যে ব্যক্তি এক অজ্ঞ জাতির জন্য লড়ে, সে যেন অন্ধদের পথ দেখাতে নিজেকে আগুনে দগ্ধ করে।”
বাংলাদেশের ট্র্যাজেডি – বঙ্গবন্ধু ও এক লক্ষ গাদ্দারের বিষবৃক্ষ
বিশ্ববিপ্লবী চে গেভারা বা মিশরের দেশপ্রেমিক সেনাপতি মোহাম্মদ কারিম তাঁদের সংগ্রামে নিজ জাতির স্বার্থান্ধতার শিকার হয়েছিলেন। এদের চেয়েও বেশি নির্মম পরিণতি বরণ করতে হয়েছিল বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বঙ্গবন্ধু যে জাতির জন্য সারাজীবন লড়েছিলেন, সেই জাতির মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক লক্ষেরও বেশি বিশ্বাসঘাতক - যারা চূড়ান্ত পরিণতিতে তাঁকে এবং তাঁর পুরো পরিবারকে হত্যা করে।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও, এই জাতির জীবনে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এক চরম ট্র্যাজেডি নিয়ে আসে। এই হত্যাকাণ্ড ছিল কেবল একজন ব্যক্তিকে হত্যা করা নয়, এটি ছিল সেই আদর্শের প্রতি আঘাত, যা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন কারাগারে, শুধুমাত্র বাংলার মানুষের অধিকারের জন্য। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় তাঁর মৃত্যু হয় সেই সমাজেরই ভেতর থেকে উঠে আসা বিষাক্ত এক গোষ্ঠীর হাতে।
আজীবন সংগ্রাম – কারাবরণ ও জাতির মুক্তির বীজ বপন
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কখনো ব্যক্তিগত লাভ বা ক্ষমতার জন্য লড়েননি। তাঁর জীবন ছিল আপোষহীন সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের প্রতীক।
আপোষহীন রাজনৈতিক জীবন: ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার এবং চূড়ান্ত স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম ছিল এক অবিরাম যাত্রা। বারবার কারাবরণ তাঁকে তাঁর লক্ষ্য থেকে একচুলও সরাতে পারেনি। তাঁর এই দীর্ঘ কারাবাস প্রমাণ করে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী প্রথম থেকেই বুঝতে পেরেছিল যে, বাঙালির মুক্তির জন্য একমাত্র হুমকি হলেন শেখ মুজিব।
বন্দীত্বে স্বাধীনতা (১৯৭১): ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত ছিল বঙ্গবন্ধুর এক সুদূরপ্রসারী কৌশল। তিনি জানতেন, তাঁর জীবিত থাকাটা হবে আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখার প্রধান চাবিকাঠি। গ্রেফতারের পর তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যেখানে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কারারুদ্ধ রাখা হয়। (করাচি বিমানবন্দরে পাকিস্তানি সামরিক হেফাজতে শেখ মুজিবের ছবি সেই চরম আত্মত্যাগের প্রতীক।)
তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর নামেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় এবং তাঁর কারাবন্দি থাকাটাই আন্তর্জাতিক মহলে স্বাধীনতার যুদ্ধকে ‘মুজিবের বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত করেছিল।
একাত্তরের গাদ্দার – আদর্শিক ও সামরিক বিশ্বাসঘাতকতা
চে গুয়েভারা ও মোহাম্মদ কারিমের মতো বঙ্গবন্ধুও এক চরম বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হন। তবে, বাংলার গাদ্দারীর রূপ ছিল আরও সুসংগঠিত ও আদর্শিক।
এক লক্ষের বেশি গাদ্দার: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আল-বদর, রাজাকার ও আল-শামসের মতো বাহিনীতে লক্ষাধিক ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষ নিয়েছিল। এই 'গাদ্দার'রাই ছিল সমাজের সেই অংশ, যারা স্বাধীনতার চেয়ে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বা পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্যকে বেছে নিয়েছিল। তারা শুধু পাকিস্তানের পক্ষে ছিল না, বরং নিজ জাতির ওপর গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী নিধনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল।
এই গাদ্দারদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, স্বাধীনতার যুদ্ধ কেবল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ছিল না, এটি ছিল নিজ জাতির ভেতরের পাকিস্তান-পন্থী আদর্শ ও বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধেও এক কঠিন সংগ্রাম।
স্বাধীনতার পরও ক্ষমতার পুনর্বাসন: মুক্তিযুদ্ধের পর রাষ্ট্রীয়ভাবে এই গাদ্দারদের আদর্শিক বিষবৃক্ষ সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পরও এই গাদ্দারদের একটি অংশ সমাজের বিভিন্ন স্তরে, এমনকি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরেও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে। এই শক্তিগুলোই ছিল ১৯৭৫ সালের ষড়যন্ত্রের মূল বীজ। এই গোষ্ঠী ক্ষমতার প্রতি লোভ, প্রতিশোধের স্পৃহা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি বিদ্বেষের কারণে ঐক্যবদ্ধ হয়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শ - গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র থেকে উৎখাত করা।
১৫ আগস্টের মর্মান্তিকতা – ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ছিল মোহাম্মদ কারিমের ট্র্যাজেডির এক করুণ পুনরাবৃত্তি। যে স্বাধীন দেশে তিনি ফিরে এসে রাষ্ট্রপ্রধান হলেন, সেই রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ভেতরের একটি অংশই তাঁকে হত্যা করল।
সেনাবাহিনীতে আদর্শিক বিভেদ: মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান ফেরত অফিসার এবং মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মধ্যে যে আদর্শিক বিভেদ তৈরি হয়েছিল, ১৫ আগস্টের ঘটনা ছিল তারই চরম বহিঃপ্রকাশ। হত্যাকাণ্ডের পেছনে সরাসরি যারা যুক্ত ছিল, তারা ছিল সেই গাদ্দারদের আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত বা তাদের সমর্থিত সামরিক কর্মকর্তা।
এই হত্যাকাণ্ড ছিল সেই গাদ্দারদের চূড়ান্ত জয়, যারা স্বাধীনতার আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত ক্ষমতা, প্রতিশোধ এবং পাকিস্তান-পন্থার প্রতি আনুগত্যকে বেছে নিয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের হত্যা: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড কেবল একজন ব্যক্তিকে হত্যা নয়, এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা - গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বাঙালির জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রতি চরম আঘাত।
জাতির ব্যর্থতা: এটি জাতির এক চরম ব্যর্থতা। যে নেতা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বাধীনতা এনে দিলেন, সেই নেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হলো। এটি সেই কাপুরুষতা ও স্বার্থপরতারই প্রতিফলন, যা নেপোলিয়ন দেখেছিলেন আলেকজান্দ্রিয়ার বণিকদের মধ্যে।
উপসংহার
চে গেভারা, মোহাম্মদ কারিম এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই তিনটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি একটি নির্মম সত্যের মুখোমুখি করে: নেতার আত্মত্যাগ তখনই ফলপ্রসূ হয়, যখন সেই জাতি আদর্শিকভাবে সচেতন থাকে এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে জাতীয় মুক্তিকে বেশি মূল্য দেয়।
রাখাল তার ভেড়ার পালের জন্য চে গেভারার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। বণিকেরা বাণিজ্যের জন্য কারিমের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। তেমনি, বাংলাদেশের গাদ্দাররা ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও হীন রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।
এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, স্বাধীনতা অর্জন করা যত কঠিন, সেই স্বাধীনতার আদর্শকে ধারণ করা এবং রক্ষা করা তার চেয়েও কঠিন। যখন কোনো জাতি তার মহানায়ককে অবমাননা করে বা তাঁর হত্যাকারীদের আশ্রয় দেয়, তখন সেই জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর সেই ট্র্যাজেডির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে।
বঙ্গবন্ধুর জীবনাবসান আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যায়, যে জাতির জন্য বীর জীবন দেয়, সেই জাতি যদি তাঁর আত্মত্যাগকে রক্ষা না করে, তবে সেই জাতি এক চরম আদর্শিক শূন্যতা ও অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়। এই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের অবশ্যই জাতীয় আদর্শ, মুক্তি ও ত্যাগের মূল্যবোধকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, যেন আর কোনো মহানায়ককে তাঁরই জাতির বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হতে না হয়।
Explore Topics
Featured Posts
About
TruthBangla shares impactful stories, national developments, and uplifting content that strengthen unity and inspire positive change.














